শান্ত মেয়ের হঠাৎ চমক

গাঢ় সবুজ ছায়ায় ঘেরা ছোট্ট এক গ্রামীন শহরের মেঠো পথ। দুপাশে ঘন গাছপালা, আর তার মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পিচঢালা রাস্তা। সেই রাস্তার এক কোণে অবস্থিত ‘নবগ্রাম হাই স্কুল’। প্রতিদিন বিকেলে যখন স্কুলের শেষ ঘণ্টা বাজত, সাদা ফ্রক আর নীল সালোয়ার পরা মেয়েদের কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠত।

রিয়া তখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী। শান্ত, লাজুক আর বড্ড বেশি চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে সে। চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত মায়াবী ছায়া, আর চুলে সব সময় দুটো বেনি করা থাকত। ঝগড়াঝাঁটি কিংবা অতিরিক্ত হইচইয়ের মধ্যে রিয়াকে কখনো খুঁজে পাওয়া যেত না। ক্লাসের পড়া শেষ করে সোজা বাড়ি ফেরা, আর নিজের ঘরের জানালায় বসে বাইরের আকাশ দেখা—এই ছিল তার দিনপঞ্জি। রিয়ার এই শান্ত রূপের বিপরীতে ছিল তার চারপাশের এক নতুন অনুভূতি, যা সে নিজেই তখনো ঠিকমত বুঝে উঠতে পারছিল না।

স্কুলের ঠিক মোড়ের মাথায় একটা পুরোনো অশ্বত্থ গাছ ছিল। সেই গাছের নিচে প্রতিদিন একটা তরুণ ছেলের দল আড্ডা দিত। তাদের হাসির শব্দ, মোটরসাইকেলের হর্নের শব্দ আর চ্যাঁচামেচতি চারপাশ গমগম করত। ওই দলের মূল আকর্ষণ ছিল ঈশান। ঈশান বয়সে রিয়ার চেয়ে বেশ কিছুটা বড়। শহরের নামকরা কলেজে পড়ে সে। চালচলনে একধরনের বেপরোয়া ভাব, চুলে একটু আলগা স্টাইল আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত জেদ। ঈশানের ব্যক্তিত্ব এমন ছিল যে, মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকলে যে কেউ একবার হলেও থমকে তাকাত।

রিয়া প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দূর থেকে ঈশানকে দেখত। ঈশান যখন তার বন্ধুদের সাথে হো হো করে হেসে উঠত, কিংবা বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল, রিয়ার বুকের ভেতর অজানা এক ধুকপুকানি শুরু হতো। কৌতূহলী চোখে রিয়া হয়তো একপলক তাকাত, কিন্তু ঈশানের দৃষ্টি রিয়ার দিকে পড়ার আগেই সে মাথা নিচু করে হেঁটে চলে যেত। রিয়ার এই মিষ্টি লজ্জা আর মনে মনে ঈশানকে একটু একটু ভালো লাগার গল্পটা শুরু হয়েছিল একেবারে নিঃশব্দে।

ঈশান কি রিয়াকে খেয়াল করত? সেটা রিয়া জানত না। তবে মাঝে মাঝে যখন ওদের আড্ডার পাশ দিয়ে রিয়া হেঁটে যেত, ঈশানের বন্ধুরা হঠাৎ চুপ হয়ে যেত বা ঈশানকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিত। রিয়া বুক ঢিপঢিপ অবস্থায় দ্রুত পায়ে সেখান থেকে সরে পড়ত। ঈশানের প্রতি সেই ভালো লাগাটা রিয়া কখনো কাউকে বলেনি, এমনকি তার সবথেকে কাছের বান্ধবীকেও না। ওটা ছিল রিয়ার একান্তই নিজের এক গোপন জগত।

সময় তার নিজের গতিতে বইছিল। এভাবে চলতে চলতেই হঠাৎ একদিন সেই শান্ত আর একঘেয়ে জীবনে একটা বড় রূপান্তর আসলো। তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক কেবল রিয়ার মতো গ্রামের মেয়েদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। রিয়াও নতুন একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছিল, যেখানে কোনো ছবি ছিল না, শুধু ছিল কিছু কবিতার ক্যপশন।

একদিন রাতে পড়া শেষ করে রিয়া যখন ফোনটা হাতে নেয়, তখন তার নোটিফিকেশন প্যানেলে একটা রিকোয়েস্ট ভেসে ওঠে। নামটি দেখে রিয়ার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল—"ঈশান রহমান"।

রিয়ার হাত দুটো কেঁপে উঠেছিল। ঈশান তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে! কিভাবে পেল তার আইডি? সে কি রিয়াকে চেনে? হাজারো প্রশ্ন রিয়ার মনে ঘুরপাক খেতে লাগল। রিয়া কয়েক মিনিট থমকে বসে রইল, তারপর বুকের ভেতরের ধুকপুকানি সামলে নিয়ে আস্তে করে 'একসেপ্ট' বোতামে চাপ দিল।

একসেপ্ট করার সাথে সাথেই মেসেঞ্জারে বার্তা এলো—
"হাই, কেমন আছো শান্ত মেয়েটা?"

রিয়ার উত্তর দিতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল। সে টাইপ করল, "ভালো। আপনি?"
"আমিও ভালো। প্রতিদিন স্কুল শেষে মাথা নিচু করে হেঁটে যাও, ভাবলাম একটু কথা বলি।"

ঈশানের এই একটা বার্তাই রিয়ার চেনা পৃথিবীকে এক লহমায় বদলে দিল। মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা দূরত্বের সেই মানুষটা যে হঠাৎ এতটা কাছে এসে মেসেজ দেবে, রিয়া তা কল্পনাও করতে পারেনি। সেই রাত থেকেই শুরু হলো তাদের প্রতিদিনের কথা বলা।

ঈশান ছিল গুছিয়ে কথা বলায় ওস্তাদ। রিয়া যা বলতে ভয় পেত, ঈশান সেসব কথা কত সহজেই না বলে ফেলত! রিয়ার শান্ত স্বভাবের বিপরীত ছিল ঈশানের এই চঞ্চলতা। ধীরে ধীরে রিয়ার প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হতে লাগল ঈশানের মেসেজের অপেক্ষা করা। সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত—ঈশানের একটা কথা না শুনলে যেন রিয়ার দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

রিয়া তখনও জানত না, এই চেনা ভালো লাগার আড়ালে কেমন এক অজানা কালবৈশাখী ঝড় অপেক্ষা করছে তার জন্য। ছোট ছোট অনুভূতিগুলো কীভাবে এক গভীর প্রেমে রূপ নিতে যাচ্ছে, তা বুঝে ওঠার আগেই রিয়া ঈশানের অনুভূতির গভীরে তলিয়ে যেতে লাগল।

দিনগুলো বেশ কেটে যাচ্ছিল। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ছোট্ট একটা ‘হাই’ দিয়ে যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল, তা আস্তে আস্তে রূপ নিতে লাগল দারুণ এক অভ্যাসে। রিয়া প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনে ঈশানের বার্তার জন্য অপেক্ষা করত। ঈশানও রিয়ার প্রতিটা কথা খুব মন দিয়ে শুনত, বা অন্তত রিয়াকে তেমনই মনে করাত।

রিয়া ছিল খুব সাধারণ আর সরল মনের মেয়ে। কিন্তু ঈশানের ছোঁয়ায় যেন তার চারপাশের চেনা জগতটা নতুন রঙে রঙিন হতে শুরু করল। ঈশান তাকে মাঝে মাঝে গভীর রাতের দিকে কল দিত। রিয়ার ফিসফিস করে কথা বলা, আর ঈশানের ভারী গলার গম্ভীর আওয়াজ—সব মিলিয়ে রিয়া এক নতুন মায়াজালে জড়িয়ে পড়তে লাগল। রিয়ার মনে ঈশানের জায়গাটা ততদিনে কেবল ভালো লাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা গভীর ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল।

একদিন শুক্রবার বিকেলে রিয়ার বাড়ির সবাই কাজে বাইরে গিয়েছিল। বাড়িতে শুধু রিয়া আর তার আম্মা ছিলেন। আম্মা নিচের তলায় রান্নাঘরে বিকালের নাস্তা বানাতে ব্যস্ত। রিয়া একলা ঘরে একটু বিরক্ত হয়ে আর বিকেলের হালকা বাতাস গায়ে মাখতে তাদের বাড়ির দোতলার ছাদে গেল।

ছাদটা বেশ বড় ছিল, চারপাশে অনেক রঙের ফুলের টব রাখা। বিকেলে রৌদ্রের আলো কমে আসছিল, মিষ্টি একটা হাওয়া বইছিল। রিয়া ছাদের এক কোণে রেলিং ধরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশানের কথা ভাবছিল। ঠিক এমন সময় তার হঠাৎ মনে হলো, পেছনে যেন কেউ এসে দাঁড়িয়েছে।

একটা মিষ্টি আতরের সুবাস বাতাসে ভেসে আসতেই রিয়া হঠাৎ চমকে উঠে পেছনে তাকাল।

তাকিয়েই রিয়ার চোখ ছানাবড়া! রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার জোগাড়। তার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে ঈশান!

ঈশানের গায়ে কালো রঙের একটা শার্ট, চুলে হালকা হাওয়া খেলা করছে, আর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি।

রিয়া ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। বুক এমনভাবে ঢিপঢিপ করছিল যেন এখনই বুকের খাঁচা ভেঙে হৃদপিণ্ডটা বাইরে বেরিয়ে আসবে। আম্মা নিচে যেকোনো সময় উপরে চলে আসতে পারেন, আর পাড়ার লোক যদি ঈশানকে এখানে দেখে ফেলে, তবে কি মহা বিপদটাই না হবে!

রিয়া ভয়ার্ত গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল, "আপনি! আপনি এখানে কীভাবে এলেন? মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার? প্লিজ, এখনই চলে যান, আম্মা দেখলে আমায় মেরে ফেলবে!"

ঈশান কোনো কথা বলল না। শুধু ধীর পায়ে রিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার চোখে একধরনের দুষ্টুমি মাখানো চাহনি। ঈশানকে আরও কাছে আসতে দেখে রিয়ার শ্বাস প্রায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।

ঈশান একধাপ এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল, "ভয় পাচ্ছ কেন, শান্ত মেয়ে? আমি তো শুধু তোমাকে একটু দেখতে এসেছি। মেসেজে তো অনেক কথা বলো, সামনে এলে এত ভয় পাও কেন?"

"ঈশান ভাই, প্লিজ মজা করবেন না! চলে যান বলছি! কেউ দেখে ফেললে কালকে আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে," রিয়া প্রায় কেঁদে ফেলার মতো করে হাত জোর করল।

ঈশান রিয়ার এই সহজ-সরল ভীতি দেখে একটু হাসল। তারপর বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, যাচ্ছি। এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"

কথাটা বলে ঈশান দরজার দিকে হাঁটা দিল। রিয়াও একপ্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু হঠাৎ নিচ থেকে রিয়ার আম্মার গলা ভেসে এল—"রিয়া! ছাদে কী করিস রে? নিচে আয়, নাস্তা রেডি!"

আম্মার গলার আওয়াজ শুনতেই রিয়ার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে দ্রুত ছাদের সিঁড়ির দরজার দিকে দৌড়ে যেতে চাইল নিচে নেমে যাওয়ার জন্য।

কিন্তু রিয়া দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই ঈশান তার লম্বা পা ফেলে ছাদের দরজার গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঈশান দরজার কাঠের ফ্রেমের দুপাশে দুই হাত রেখে পুরো রাস্তাটা আটকে দিল।

রিয়া থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ঈশানের চওড়া বুকের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে সে।

"ঈশান ভাই, সরুন! আম্মা উপরে আসছে, প্লিজ রাস্তা ছাড়ুন!" রিয়া আকুতি ঝরে পড়া গলায় বলল।

ঈশান সরলো না। সে দরজায় দুহাত আটকে রেখে একটু ঝুঁকে রিয়ার মুখের দিকে তাকাল। ঈশানের চোখ দুটো যেন রিয়ার চোখের ভেতর ডুব সাঁতার দিচ্ছিল। ঈশান মৃদু হেসে বলল, "ছাড়ব না। যদি না ছাড়ি, কি করবে?"

"পায়ে পড়ি আপনার, সরুন! আম্মা দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে!" রিয়ার চোখে তখন কান্নার জল ছলছল করছে।

ঈশান রিয়ার চোখ ভরা ভয় আর সরলতা দেখে আর বেশি জ্বালাতন করল না। রিয়ার এত গা ঘেঁষে থাকা আর তার থরথর করে কাঁপা শরীরটা দেখে ঈশানের চোখে হঠাৎ এক অদ্ভুত দৃষ্টি ভেসে উঠল। সে এক সেকেন্ডের জন্য রিয়ার চোখের দিকে একমনে তাকিয়ে রইল।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা থেকে হাত দুটো সরিয়ে নিল। ঈশান ধীর গলায় বলল, "যাও। তবে এই ভয়টা কিন্তু বেশ মিষ্টি লাগে।"

রিয়া আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, পেছন ফিরে না তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। তার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি তখনও থামেনি।

সেদিন রাতের বেলা রিয়া যখন ঘরে একা শুয়ে ছিল, তখন ফোনটা বেজে উঠল। ঈশানের মেসেজ—
"আজ তোমাকে অত কাছে দেখে আমার কী হয়েছিল জানো? খুব ইচ্ছে করছিল তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখি। জানি না কেন এমন মনে হচ্ছিল..."

পর্দার দিকে তাকিয়ে রিয়ার দু গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এক অজানা রোমাঞ্চ আর ভালো লাগায় তার মন ভেসে যাচ্ছিল। সে তখনও জানত না, এই ভালোবাসার ছদ্মবেশে তার জন্য কী ভয়ানক পরিণতি অপেক্ষা করে আছে।

ছাদের সেই ঘটনার পর দিনগুলো বেশ এক অন্য রকম আবেশে কাটছিল। ঈশানের প্রতি রিয়ার মনের টান দিন দিন যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ঈশানের মিষ্টি কথা আর সেই ছাদের ছোঁয়া রিয়ার দিনরাত্রির সব চিন্তাজুড়ে বসেছিল। রিয়া এখন ঈশানকে শুধু ভালোবাসেই না, তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাসও করতে শুরু করেছে।

কয়েক দিন পরের কথা। বিকেলে রিয়া সবেমাত্র পড়তে বসেছে, এমন সময় তার ফোনে মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ঈশানের নাম।

ঈশান লিখেছে, "আজ বিকেলে কি একবার ছাদে আসতে পারবে? মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমার সাথে দেখা করতে।"

রিয়া একটু ইতস্তত করে লিখল, "না ঈশান ভাই, আজ আম্মা বাড়িতেই আছেন। ধরা পড়লে খুব বিপদ হবে। প্লিজ আজ না।"

ঈশান উত্তর দিল, "তুমি যদি না আসো, তবে আমি নিচেই চলে আসব। তোমার আম্মার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকব। এবার ভাবো কী করবে।"

ঈশানের এই জেদি স্বভাব রিয়ার বেশ জানা ছিল। সে খুব ভালো করেই জানত, ঈশান যা বলে তা করে দেখাতে পারে। কোনো উপায় না দেখে রিয়া বুক কাঁপিয়ে আস্তে আস্তে দোতলার ছাদে উঠে গেল।

ছাদের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই রিয়া দেখল ঈশান ছাদের এক কোণে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলো এসে পড়েছে তার মুখে। রিয়া দূর থেকেই বলল, "বলুন কী বলবেন? আমি বেশি সময় থাকতে পারব না, আম্মা যেকোনো সময় ডাকবেন।"

ঈশান কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে রিয়ার দিকে হেঁটে এল। রিয়ার খুব কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। ঈশানের চোখে আজ এক অদ্ভুত মাতাল করা দৃষ্টি, যা রিয়াকে কেমন যেন অস্থির করে তুলল।

ঈশান আলতো করে রিয়ার এক হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, "আমায় একবার জড়িয়ে ধরবে রিয়া? শুধু কয়েক সেকেন্ডের জন্য..."

রিয়া চমকে উঠে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। মাথা নেড়ে ভয় পাওয়া গলায় বলল, "না না! এসব কী বলছেন? এসব একদম ঠিক নয়। আমি পারব না, প্লিজ ছাড়ুন আমাকে!"

কিন্তু ঈশান আজ থামার পাত্র ছিল না। রিয়ার অমতকে পাত্তা না দিয়ে সে এক ঝটকায় রিয়াকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল। খুব শক্ত করে দুহাত দিয়ে রিয়াকে জড়িয়ে ধরল। রিয়ার মুখটা গিয়ে ঠেকেছে ঈশানের চওড়া বুকের মাঝামাঝি। ঈশানের গায়ের তামাক আর সুগন্ধির তীব্র ঘ্রাণ রিয়ার চেনা জগৎকে এক মুহূর্তেই ওলটপালট করে দিল।

ঈশান রিয়ার কানে কানে ফিসফিস করে বলে উঠল, "সেদিন যখন ছাদের গেটে তোমাকে আটকেছিলাম, ঠিক তখন থেকেই তোমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরার খুব ইচ্ছে করছিল। জানি না কেন, তোমাকে বুকের মাঝে না রাখলে আমার আর শান্তি হচ্ছিল না..."

রিয়ার শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল। সে ঈশানের বুকের ভেতর বন্দি হয়ে স্থির হয়ে রইল। ভয় আর এক অজানা রোমাঞ্চে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। কয়েক মুহূর্ত পর ঈশান আস্তে করে বাঁধন আলগা করতেই রিয়া এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে নিজের ঘরে চলে এল। নিজের বিছানায় তোশক চেপে ধরে রিয়া কিছুক্ষণ হাঁপাল। তার গা তখনো জ্বলছিল ঈশানের উষ্ণ ছোঁয়ায়।

কিন্তু এই মিষ্টি রোমাঞ্চের আয়ু যে এতটা কম হবে, তা রিয়া স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

ঘটনার ঠিক দুদিন পর। রিয়া রাতে নিজের পড়ার টেবিলে বসেছিল। হঠাৎ ফোনে ফেসবুকের ইনবক্সে একটা অপরিচিত আইডি থেকে পর পর অনেকগুলো মেসেজ আসতে শুরু করল।

আইডিটা খুলতেই রিয়ার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। মেসেজগুলো পাঠিয়েছে এক মেয়ে, যে দাবি করছে সে ঈশানের আসল প্রেমিকা!

মেসেজে একের পর এক নোংরা ও জঘন্য গালাগালি লেখা। মেয়েটি লিখেছে, "তোর মতো ছোটলোকের মেয়েকে ঈশান টাইমপাস হিসেবে ব্যবহার করছে! তুই একটা চরিত্রহীন মেয়ে, অন্যের বয়ফ্রেন্ডের পেছনে লাগতে লজ্জা করে না? ঈশান শুধু আমাকেই ভালোবাসে, তোর মতো পথচলতি মেয়েকে ও খেলায় ব্যবহার করে।"

মেয়েটি তাদের বেশ কিছু অন্তরঙ্গ ছবি আর মেসেজের স্ক্রিনশোটও পাঠিয়ে দিল, যা দেখে রিয়ার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে যাকে নিজের সবটুকু বিশ্বাস দিয়ে ভালোবেসেছিল, সে তাকে এভাবে প্রতারিত করল? রিয়া নিজেকে সামলাতে পারছিল না। তার কান্না কোনো বাধ মানছিল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে নিজের মুখ বালিশে চেপে ধরল, যাতে আম্মা শুনতে না পান।

পরদিন সকালে উঠে রিয়া কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিল। সে ঈশানকে মেসেঞ্জারে আর ফোন কল—সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিল। ঈশানের সাথে সব যোগাযোগ একলহমায় বন্ধ করে দিল। ঈশান বারবার অন্য নাম্বার থেকে ফোন করার চেষ্টা করলেও রিয়া আর সে ফোন ধরল না।

রিয়ার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। শান্ত, লাজুক মেয়েটি এক লহমায় যেন ভীষণ একা হয়ে গেল। তার প্রথম ভালোবাসা, তার প্রথম ছোঁয়া—সবকিছুই এভাবে এক নিমেষে ধুলোয় মিশে যাবে, তা সে কখনোই ভাবতে পারেনি।

ঈশানকে ব্লক করে দেওয়ার পর রিয়ার দিনগুলো ভীষণ বিষণ্ণতায় কাটছিল। চোখের জল মোছা আর পড়াশোনায় মন দেওয়ার চেষ্টা করার ব্যর্থ লড়াই—এই ছিল রিয়ার দৈনন্দিন জীবন। ঈশানের ওপর জমে থাকা প্রচণ্ড অভিমান আর প্রতারিত হওয়ার কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

তখন বর্ষাকাল। আকাশে সব সময় কালো মেঘের ঘনঘটা।

একদিন বিকেলে রিয়া তার প্রতিদিনের মতো প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল। প্রাইভেটে যাওয়ার রাস্তাটা ছিল একটু নির্জন। পথের মাঝখানে একটা অনেক বড় পুরোনো বাগান ছিল। ঘন গাছগাছালি আর বড় বড় আম-জাম গাছে ঘেরা সেই বাগানের পথটা পার হয়েই তাকে যেতে হতো।

রিয়া যখন বাগানের ঠিক মাঝামাঝি নির্জন পথটায় পৌঁছাল, ঠিক তখনই হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো। বৃষ্টির ফোঁটা এত তীব্র ছিল যে সামনে কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। রিয়া উপায় না দেখে দৌড়ে গিয়ে বাগানের মাঝখানের একটা বিশাল কদম গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিল। তার পরনের পোশাক আর বইয়ের ব্যাগ ততক্ষণে অর্ধেকের বেশি ভিজে গেছে।

বৃষ্টির টিনের চালের মতো শব্দের মাঝে রিয়া হঠাৎ শুনল কার যেন পায়ের শব্দ।

রিয়া চমকে উঠে পেছনে তাকাতেই দেখল বৃষ্টিতে ভিজে একসার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঈশান!

ঈশানের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, চুল থেকে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে অনেকক্ষণ ধরেই রিয়ার পিছু নিচ্ছিল।

ঈশানকে দেখেই রিয়ার গা জ্বলে উঠল। সে একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ছাতার তোয়াক্কা না করে বৃষ্টির মধ্যেই হেঁটে চলে যেতে চাইল।

কিন্তু ঈশান দ্রুত এগিয়ে এসে এক ঝটকায় রিয়ার হাতটা চেপে ধরল।

"হাত ছাড়ুন আমার! আপনার সাহস কীভাবে হয় আমার সামনে আসার?" রিয়া চিৎকার করে উঠল, কিন্তু বৃষ্টির শব্দে তার গলার আওয়াজ মিলিয়ে গেল।

ঈশান অনুনয় ঝরে পড়া গলায় বলল, "রিয়া, প্লিজ আমার কথাটা একটু শোনো! যে আইডি থেকে তোমাকে মেসেজ দেওয়া হয়েছিল, ওটা আমার অতীত ছিল। আমি ওর সাথে সব শেষ করে দিয়েছি। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি রিয়া, বিশ্বাস করো আমাকে!"

"মিথ্যুক! এক বর্ণও বিশ্বাস করি না আপনাকে! ছাড়ুন বলছি, নইলে আমি চেঁচাব!" রিয়া গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কান্নায় তার গলা বুজে আসছিল।

রিয়ার এই অবহেলা আর দূরে ঠেলে দেওয়া দেখে ঈশানের ভেতরের জেদ আর রাগ হঠাৎ মাথায় চড়ে বসল। সে কোনো কথা না শুনে এক টান মেরে রিয়াকে নিজের গায়ের সাথে লেপটে নিল।

রিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঈশান এক হাতে রিয়ার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল আর অন্য হাতে তার মুখটা চেপে ধরে সোজাসুজি রিয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

রিয়া চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল। সে ঈশানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ঈশানের শক্তির সামনে রিয়া একেবারেই অসহায়।

বৃষ্টির ঝুম ঝুম শব্দের মাঝে শুরু হলো এক অনিয়ন্ত্রিত, তীব্র গভীর রোমান্স। ঈশানের কামড় আর চুম্বনের গভীরতায় রিয়ার প্রতিরোধ আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে আসতে লাগল। বৃষ্টির ঠান্ডা জল তাদের শরীরে এসে পড়ছিল, কিন্তু ঈশানের উন্মাদ ছোঁয়ায় রিয়ার শরীর জুড়ে তখন আগুন জ্বলছিল। ঈশান রিয়ার ঘাড়, গলা আর ঠোঁটে নিজের অধিকারের ছাপ এঁকে দিতে লাগল। রিয়ার ভেতরের সব অভিমান সেই বৃষ্টি আর উগ্র কামনার উত্তাপে গলে জল হয়ে গেল। রিয়া একসময় ঈশানের ভেজা শার্ট আঁকড়ে ধরে নিজেকে সমর্পণ করে দিল।

কয়েক মিনিট ধরে চলা সেই উন্মাদ ভালোবাসার পর ঈশান যখন রিয়াকে ছাড়ল, রিয়া তখন হাঁপাচ্ছে। তার চোখের জলের সাথে বৃষ্টির জল মিশে একাকার।

ঈশান রিয়ার ভেজা কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধু আমার, শান্ত মেয়ে। তোমাকে অন্য কারো হতে দেব না।"

পরবর্তী কিছুদিন তাদের মধ্যকার সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে গেল। সম্পর্ক আবার আগের জায়গায় ফিরে এলো, কিন্তু এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

আস্তে আস্তে ঈশানের আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করা, কল না ধরা, কথায় কথায় এড়িয়ে যাওয়া—এসব বাড়তে লাগল। আর কিছুদিন যেতেই রিয়া জানতে পারল, ঈশান আবার তার সেই পুরোনো প্রেমিকার কাছেই ফিরে গেছে! রিয়ার সাথে সে শুধুই একটা খেলা খেলেছিল।

রিয়ার দুনিয়া আবার অন্ধকার হয়ে গেল। সে পুরোপুরি একা হয়ে পড়ল। তার শান্ত মনটা এবার একেবারেই ভেঙে ছাই হয়ে গেল।

মানসিক কষ্ট সহ্য করতে না পেরে রিয়া সিদ্ধান্ত নিল সে এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে রিয়া পরিবারের অনুমতি নিয়ে অনেক দূরের এক শহরে কলেজে ভর্তি হয়ে চলে গেল। ঈশান আর তার স্মৃতি থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে নেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টায় রিয়া নিজেকে গুটিয়ে নিল।

দূর শহরের নতুন পরিবেশ, অচেনা মানমানুষ আর কলেজের ব্যস্ততা—কোনো কিছুই রিয়ার বুকের ভেতরের সেই দাহ কমাতে পারছিল না। ঈশানের দেওয়া অপমান আর প্রতারণার ক্ষত বুকে নিয়েই সে দিন পার করছিল। কিন্তু ভাগ্য যেন রিয়ার জন্য আরও করুণ কিছু লিখে রেখেছিল।

কয়েক মাস কেটে যাওয়ার পর, রিয়ার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর আশঙ্কার জন্ম হলো। ঈশানের সাথে কাটানো সেই বৃষ্টিভেজা নির্জন বিকেলের ভুল আর তাদের মধ্যকার সম্পর্কের স্মৃতি রিয়াকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে ফিরত। গ্রামে গুঞ্জন উঠতে শুরু করেছিল, আর রিয়ার মনে হতে লাগল তার ইজ্জত, তার সম্মান যেন সমাজের চোখে ধ্বংস হয়ে গেছে।

ভীষণ মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রিয়া নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন পর ঈশানকে একটা গোপন নাম্বারে কল করল।

ওপাশ থেকে ঈশানের সেই পরিচিত, অথচ এখন ভীষণ ঠান্ডা ও অপরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো, "কে?"

রিয়া কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় ফিসফিস করে বলল, "ঈশান, আমি রিয়া... প্লিজ আমার কথাটা একটু শোনো। আমি আর পারছি না। গ্রামে নানা কথা হচ্ছে, আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। আমাদের তো অনেক কিছু হয়ে গেছে... আমার ইজ্জত নষ্ট হয়ে গেছে ঈশান। তুমি প্লিজ আমাকে বিয়ে করো! আমাকে এই অপমান থেকে বাঁচাও!"

রিয়ার কান্নায় ভেজা অনুনয় শুনে ওপাশ থেকে ঈশান একটুও নরম হলো না। বরং তার গলায় ফুটে উঠল চরম অবহেলা আর ঘৃণা।

ঈশান নিষ্ঠুরভাবে হেসে উঠে বলল, "কী বললি? বিয়ে? তোক আমি বিয়ে করব? তোর মতো একটা সোজা-সাপ্টা দেখতে যে মেয়ে এত সহজে একটা ছেলের সাথে নির্জনে জড়িয়ে পড়তে পারে, তার আবার ইজ্জত! তুই একটা নোংরা আর নষ্ট মেয়ে! তোর সাথে যা হয়েছে, সব তোর ইচ্ছেতেই হয়েছে। এখন আমার ঘাড়ে এসে দোষ চাপাচ্ছিস?"

রিয়ার গলার কাছে যেন কিছু একটা আটকে গেল। রক্ত হিম হয়ে যাওয়া গলায় সে বলল, "ঈশান! তুমি এ কী বলছ? তুমিই তো আমাকে জোর করেছিলে, তুমিই তো বলেছিলে তুমি আমাকে ভালোবাসো..."

"চুপ কর একদম!" ঈশান ধমকে উঠল। "তোর মতো মেয়েদের আমি ভালো করেই চিনি। বাজারে তোর মতো অনেক মেয়ে ঘুরে বেড়ায়। নিজের চরিত্র ঠিক রাখতে পারিসনি, এখন এসেছিস বিয়ের নাটক করতে? আর কোনদিন আমাকে কল দিবি না। তুই একটা ভালো মেয়ে না, তুই একটা চরিত্রহীন নষ্ট মেয়ে!"

কথাটা শেষ করেই ঈশান খট করে ফোনটা কেটে দিল।

ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রিয়া স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে আর জলও ঝরছিল না। 'নষ্টা মেয়ে', 'চরিত্রহীন'—কথাগুলো তার মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল। যাকে সে নিজের সবটুকু দিয়ে বিশ্বাস করেছিল, সে তাকে এই প্রতিদান দিল? রিয়া বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। তার পুরো পৃথিবীটা একমুহূর্তে ছাই হয়ে গেল।

এরপরের দিনগুলো রিয়ার জন্য ছিল জীবন্ত নরকতুল্য। সে পুরোপুরি একা হয়ে গেল। কারোর সাথে কথা বলত না, ঠিকমতো খেত না। জানালায় বসে শুধু শূন্য চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার হাসিখুশি চেনা রূপটা একদম বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

এরই মধ্যে একদিন রিয়ার আব্বা ফোন করে জানালেন, তার জন্য একটা খুব ভালো বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। ছেলে প্রতিষ্ঠিত, পরিবারও খুব ভালো। রিয়ার মতামত না নিয়েই দুই পরিবার কথা পাকা করে ফেলেছে।

রিয়া প্রতিবাদ করার মতো কোনো শক্তি নিজের ভেতর খুঁজে পেল না। সে ভাবল, যে জীবনের কোনো মূল্য তার কাছে আর নেই, সে জীবন নিয়ে যা খুশি হোক। রিয়ার অমতেই বিয়ের সব আয়োজন চূড়ান্ত হয়ে গেল।

রিয়া জানত না, এই বিয়ের প্রস্তাবটা কার কাছ থেকে এসেছে। সে ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি যে অদৃশ্য এক সুতো তাকে আবার কোন রহস্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে!

বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। সারা বাড়ি জুড়ে আলোর রোশনাই, মেহমানদের হাঁকডাক আর সানাইয়ের মিষ্টি সুর। কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝে রিয়া ছিল এক জীবন্ত লাশ। লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি, ভারী গহনা আর গাঢ় মেকআপে তাকে অপরূপ দেখাচ্ছিল বটে, কিন্তু তার চোখের কোণে জমে থাকা জল আর থমথমে মুখটা বলে দিচ্ছিল সে কতটা নিঃস্ব।

যার কাছে সে নিজের সম্মান হারিয়েছে, সে তাকে 'নষ্টা' বলে ছুড়ে ফেলেছে। এখন আরেকজন অচেনা মানুষের হাতে নিজেকে তুলে দিতে হচ্ছে—এই ভাবনায় রিয়ার নিঃশ্বাস আটকে আসছিল।

কাজী ডেকে আকদ সম্পন্ন হয়ে গেল। রিয়া কাঁপা হাতে সই করে দিল কবুলনামায়। তার মনে হচ্ছিল সে যেন নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করছে। বিয়ে শেষ হওয়ার পর বরপক্ষ রিয়াকে নিয়ে রওনা হলো বরের বাড়িতে।

রাতের নিস্তব্ধতায় বরের সুসজ্জিত ফুলসজ্জার ঘরে রিয়া একা বসেছিল। বিশাল বিছানাটা রজনীগন্ধা আর গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো। রিয়া বিছানার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে নিঃশব্দে কাঁদছিল। সে মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, অচেনা বর ঘরে এলে সে তাকে সব বলে দেবে—বলে দেবে সে কোনো ভালো মেয়ে নয়, তার মন আর শরীর সবই এক প্রতারকের হাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।

হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো।

কারো ভারী পায়ের শব্দ রিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। রিয়া কান্নার তোড়ে মাথা তুলল না।

একটা সুপরিচিত, দম্ভমাখা ভারী গলা ভেসে এলো—"কী গো নতুন বউ? বিয়ের রাতেই কান্না শুরু করে দিলে?"

কণ্ঠটা কানে পৌঁছাতেই রিয়ার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমাট বেঁধে গেল! এই তো সেই গলা, যে গলা তাকে 'চরিত্রহীন' বলে গালি দিয়েছিল!

রিয়া দ্রুত মাথা তুলে তাকাল। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঈশান!

গায়ে বরবেশের শেরওয়ানি, মুখে সেই চেনা বাঁকা হাসি আর চোখে এক অদ্ভুত জয়ের আলো।

রিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার চোখ দুটো ভয়ে আর অবিশ্বাসে বড় বড় হয়ে উঠল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "তু... তুমি? এখানে? বর... বর কোথায়?"

ঈশান একটু হেসে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রিয়ার খুব কাছে বিছানায় বসল। রিয়ার চিবুকটা নিজের আঙুল দিয়ে শক্ত করে ওপরে তুলে ধরে বলল, "বোর আবার কোথায় থাকবে? তোমার বর তো তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, আমার শান্ত মেয়ে।"

রিয়া অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। "মানে? তুমি... তুমি আমায় বিয়ে করেছ? কিন্তু তুমি তো..."

ঈশান রিয়ার ঠোঁটে নিজের একটা আঙুল চেপে ধরে তাকে থামিয়ে দিল। ঈশানের চোখে তখন অনুশোচনা আর উপচে পড়া ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

"হ্যাঁ, আমিই এই বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম," ঈশান ধীর গলায় বলল। "তোর আব্বার কাছে গিয়ে হাত জোড় করে তোকে চেয়ে নিয়ে এসেছি। তুই জানতে না, কারণ আমি চেয়েছিলাম তোকে এভাবে সারপ্রাইজ দিতে।"

রিয়া ঈশানের হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে ফুসে উঠল, "সারপ্রাইজ? এটাকে নাটক বলে! তুমি আমায় গালি দিয়েছিলে, নষ্টা বলেছিলে, ফিরিয়ে দিয়েছিলে! এখন আবার এই ভণ্ডামি কেন?"

ঈশান রিয়ার দু হাত শক্ত করে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। তার গলায় এবার সত্যি কারের হাহাকার ঝরে পড়ল, "আমাকে মাফ করে দে রিয়া! আমি ওই মেয়েটার মায়াজালে আটকে গিয়ে তোর সাথে চরম অন্যায় করেছিলাম। তোকে নষ্টা বলেছিলাম যাতে তুই আমাকে ঘৃণা করে ভুলে যাস, কারণ তখন আমি নিজেকে তোর যোগ্য মনে করছিলাম না। কিন্তু তোকে ছেড়ে দেওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি, তোকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন। তোর ওই কান্না, তোর ওই মান-অভিমান সব আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। তাই তোকে সারা জীবনের জন্য নিজের করে পেতে এই নাটকটা করতে হয়েছে।"

রিয়ার চোখে জল ছলছল করে উঠল। রাগ, অভিমান, আর ভালোবাসার ঝড় একসঙ্গে তার বুকের ভেতর আছড়ে পড়ল। ঈশানকে সে ঘৃণা করতে চেয়েছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে ঈশানের চোখের আকুতি দেখে রিয়ার সব রাগ যেন বরফের মতো গলতে শুরু করল।

ঈশান রিয়ার খুব কাছে এসে তার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর মিষ্টি করে হেসে বলল, "অনেক কাঁদিয়েছি তোকে, আর না। এবার সব মান-অভিমান ভুলে আমাকে একটু ক্ষমা করা যায় না, আমার বেনি পরা শান্ত মেয়ে?"

রিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঈশানের বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ঈশান তাকে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে হাত বোলাতে লাগল। এতদিনের জমে থাকা সব মেঘ একলহমায় কেটে গিয়ে ভালোবাসার নতুন এক ভোর নেমে এলো তাদের জীবনে।

ঈশানের বুকের উত্তাপে মুখ গুঁজে কান্নার তোড় থামতেই রিয়া আস্তে আস্তে মাথা তুলল। ঈশানের শার্টের সামনের অংশটা রিয়ার চোখের জলে ভিজে একাকার। ঈশান খুব মায়া ভরা চোখে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে রিয়ার গাল থেকে অশ্রুর শেষ ফোঁটাটুকু মুছে দিল।

"এখনও রাগ হয়ে আছে, হম?" ঈশান একটু নিচু স্বরে, মিষ্টি কণ্ঠে শুধাল।

রিয়া ঈশানের বুকে একটা হালকা কিল মেরে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, "রাগ হবে না? তুমি আমায় কতটা কষ্ট দিয়েছ জানো? ওইসব বাজে কথা না বললেই কি চলত না? আমি তো সত্যি সত্যিই ভেবেছিলাম তুমি আমায় আর কোনোদিন ভালোবাসো না।"

ঈশান রিয়ার দুই গাল নিজের দুই হাতের তালুতে ধরে মুখটা সোজা করল। রিয়ার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে বলল, "ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, রিয়া। তোকে কষ্ট দিয়ে আমি নিজেও তো এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে পারিনি। প্রতিদিন রাতে তোকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা আমাকে শেষ করে দিচ্ছিল। কিন্তু আজ থেকে আর কোনো কান্না নয়, শুধু ভালোবাসা।"

কথাটা বলেই ঈশান হালকা দুষ্টুমি ভরা হাসি হেসে রিয়ার বেনারসির আঁচলটা ধরে এক টান দিল।

রিয়া চমকে উঠে বলল, "এ-এই! কী করছ?"

"কী আবার করব? বর হিসেবে নিজের পাওনা আদায় করব," ঈশান চোখে দুষ্টুমির চকচানি নিয়ে বলল।

"একদম না! আমি এখনো তোমাকে ক্ষমা করিনি। সরে বসো!" রিয়া ভান করা রাগ দেখিয়ে বিছানার কোণে সরে যেতে চাইল।

কিন্তু ঈশান তাকে সরার কোনো সুযোগই দিল না। সে এক ঝটকায় রিয়াকে টেনে একদম নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। রিয়ার কোমরে ঈশানের শক্ত হাতের বেষ্টনী, আর রিয়ার পিঠ এসে ঠেকেছে ঈশানের চওড়া বুকে। রিয়ার ঘাড়ের কাছে ঈশানের গরম নিঃশ্বাস এসে পড়তেই রিয়ার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শহরণ খেলে গেল।

ঈশান রিয়ার কাঁধ থেকে বেনারসির আঁচলটা একটু সরিয়ে দিয়ে সেখানে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

"ঈশান... ছাড়ো না, লজ্জা লাগছে," রিয়া চোখ বন্ধ করে ধীর গলায় বলল। তার গলার আওয়াজ কাঁপছিল।

"লজ্জা পাওয়ার আর কিছুই নেই, শান্ত মেয়ে। তুমি এখন পুরোপুরি আমার," ঈশান ফিসফিস করে বলল।

ঈশান আস্তে আস্তে রিয়াকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করল। রিয়া চোখ খুলতেই ঈশানের চোখের সেই গাঢ়, উন্মাদ ভালোবাসা দেখতে পেল—যে ভালোবাসার জন্য সে এতদিন চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছিল। ঈশান রিয়ার চিবুক ধরে নিজের দিকে একটু তুলে আনল, আর তারপর ধীরে ধীরে রিয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

এবার আর কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো ছলনাবাজি নেই—আছে শুধু ভালোবাসার চরম আকুলতা। রিয়াও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ঈশানের গলায় দু হাত জড়িয়ে ধরে সেই গভীর অনুভূতির সাগরে নিজেকে ভাসিয়ে দিল।

বৃষ্টির রাতের সেই অপূর্ণতা আর বেদনার পর, আজকের এই সুসজ্জিত গোলাপ আর রজনীগন্ধার ঘরে তাদের প্রেম পেল এক পূর্ণাঙ্গ রূপ। ঈশানের প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটা গভীর চুম্বন আর সোহাগের উত্তাপে রিয়ার এতদিনের জমে থাকা সব মান-অভিমান, দুঃখ আর ভয় কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

বিছানার চারপাশে ছড়ানো ফুল আর মোমের মিষ্টি আলোর মাঝে শুরু হলো তাদের নতুন এক জীবনের গল্প। সারা রাতের সেই অনাবিল দুষ্টুমি, গভীর রোমান্স আর আদরের পর ভোরের আলো যখন জানালায় এসে পড়ল, তখন রিয়া ঈশানের চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল।

আর ঈশান? সে রিয়ার কপালে শেষ একটা ভালোবাসা মাখা চুমু দিয়ে মনে মনে বলল—এই শান্ত মেয়েটি শুধু তার ছিল, তার আছে, আর সারাজীবন তারই থাকবে।

 

....
👁 70