আট বছরের নীরব অপেক্ষা

বৃষ্টির ঝাপসা শাঁসে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল সদরঘাটের স্টিমার টার্মিনাল। নদী আর আকাশের সীমানা চেনা যাচ্ছিল না আজ; মেঘ যেন বুক চেঁপে নেমে এসেছে বুড়িগঙ্গার কালচে পানির বুক চিরে। সেই ঘোলাটে ঝড়ের দিনে মেঘলা চলে গিয়েছিল। প্লেনের টিকিট ছিল ঢাকা থেকে লন্ডনের, কিন্তু নীলকে ও বিদায় জানিয়েছিল নদীর এই ঘাটটায় দাঁড়িয়ে। রওনা হওয়ার আগে মেঘলা নীলের হাতের তালুতে চেপে ধরেছিল একটা হালকা হলুদ খাম। খামটা নীল-মোড়ানো ছিল, তার ওপর আঁকা ছিল ছোট একটা নীল পদ্ম। মেঘলা নীলকে বলেছিল, "এই চিঠির ভেতর যা আছে, সেটা তুমি তখনই পড়বে যখন আমি আবার ফিরব। তার আগে যদি খাম খোলো, তবে জানবে আমাদের মধ্যে সব বাঁধন কেটে গেছে। আমি ফিরে এসে তোমাকে একটা না-বলা কথা বলব, নীল।"

কথাটা নীল রেখেছিল। কিন্তু চিঠিটা নীল ধরে রাখতে পারেনি। সেই উত্তাল ঝড়ের সন্ধ্যায় টার্মিনাল থেকে ফেরার পথে নীলের ছোট বোন ছোঁয়ার হাত থেকে বইয়ের ব্যাগটা নদীতে পড়ে যায়। ব্যাগের সামনের পকেটেই রাখা ছিল মেঘলার দেওয়া সেই কাঙ্ক্ষিত চিঠি। বুক চিরে হাহাকার উঠে এসেছিল নীলের, নদীর উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে ও তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিল খামটা। ডুবুরি নামিয়েও লাভ হয়নি। গভীর ও বিষাক্ত পানির গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল মেঘলার সুবাসমাখা সেই না-বলা কথাগুলো।

বছর কেটেছে নদীর স্বাভাবিক স্রোতের মতোই। আটটা দীর্ঘ বছর। এই আট বছরে পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি গলি, ছাদে মেলা সুতির শাড়ি আর সন্ধেবেলার চায়ের দোকানের আড্ডাগুলো একটুও বদলায়নি। শুধু বদলে গেছে নীল। নীল এখন আর্কিটেক্ট। ধানমন্ডির একটা নামকরা ফার্মে ও কাজ করে। শান্ত, চুপচাপ আর কিছুটা গ গম্ভীর মেজাজের মানুষ হিসেবে ওর নাম আছে। কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা যে আট বছর ধরে একটা খামের শূন্যতায় ধু-ধু মরুভূমি হয়ে আছে, তা কেউ জানত না।

নীলের এই নিশ্চুপ বিষাদময় জীবনে হুট করেই আবির্ভাব হয়েছিল তিয়ার। তিয়া নীলেরই সহকর্মী। খুব প্রাণবন্ত, চঞ্চল আর স্পষ্টবাদী। তিয়া জানত নীলের অতীতে একজন মেঘলা ছিল, কিন্তু সে এ-ও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সেই অতীত শুধুই এক অতীত। নীলের চোখের নীরবতা তিয়াকে টানত। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সম্পর্কের সুতো তৈরি হয়েছিল, যা ভালোবাসার চেয়েও বেশি ছিল নির্ভরশীলতার। অন্তত নীল এটাই ভেবেছিল। তিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকেও নীলকে পছন্দ করা হয়েছিল। কোনো আনুষ্ঠানিক আংটি বদল না হলেও, দুই পরিবারের ভেতরেই একটা আলগা সম্মতি গড়ে উঠেছিল যে খুব শিগগিরই নীলের সঙ্গে তিয়ার বিয়েটা হয়ে যাবে।

কিন্তু ভাঙনটা এল একদম আকস্মিকভাবে।

শ্রাবণের এক বিষণ্ণ বিকেলে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরের লেকের পাড়ে বসেছিল তিয়া আর নীল। তিয়ার হাতে ছিল নীলের পুরানো একটা ক্যাড ফাইল আর ডায়েরি। ডায়েরির পাতায় পাতায় আঁকা ছিল মেঘলার বিচিত্র সব পোর্ট্রেট। কোনো পাতায় মেঘলা কাঁদছে, কোনো পাতায় খোলা চুলে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিয়া অনেকক্ষণ গম্ভীর হয়ে পাতাগুলো উল্টাল। তারপর খুব নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল, "নীল, তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না। তুমি যাকে খুঁজে ফেরো, সে এই আঁকাগুলোর মাঝে বেঁচে আছে। তুমি আমাকে একটা মিথ্যা আশ্রয় বানিয়েছ, তাই না?"

নীল সজল চোখে লেকের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো উত্তর দিল না। নীলের এই নীরবতাই ছিল তিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত। তিয়া ডায়েরিটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। বলল, "আমি কোনো দ্বিতীয় পছন্দ হতে আসিনি, নীল। যে মানুষটার মন আটকে আছে আট বছর আগের কোনো বৃষ্টিতে, তার পাশে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।"

তিয়া চলে গেল। আর ঠিক সেই দিনটির পরদিনই নীলের জীবনে আছড়ে পড়ল আরেকটা ঝড়।

লন্ডন থেকে আট বছর পর বাংলাদেশ ফিরে এল মেঘলা।

শহরের এক অভিজাত ক্যাফেতে মেঘলার সঙ্গে নীলের দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু নীল কোনো বিলাসবহুল ক্যাফেতে মেঘলাকে ডাকেনি। ও মেঘলাকে ডেকেছিল তাদের শৈশবের স্মৃতিজড়ানো বুড়িগঙ্গার সেই পুরানো ঘাটের কাছাকাছি, একটা ছোট ছাদ-ক্যাফেতে।

মেঘলা যখন নীলকে দেখতে পেল, সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আট বছরে মেঘলা বদলে গেছে অনেকটাই। আরো একটু কৃশ, পরনে নীল রঙের শাড়ি, খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে—ঠিক যেমনটা নীল ওর ডায়েরিতে একেঁছিল শতশত বার। মেঘলার চেহারায় অভিজাত এক গাম্ভীর্য এসেছে, কিন্তু তার সেই গাঢ় চোখের দৃষ্টি মোটেও বদলায়নি। সেই চোখে এখনো হাজার প্রশ্ন, আর এক সমুদ্র গোপন তৃষ্ণা।

"তুমি একদম বদলাওনি, নীল," মেঘলা সামনে এসে দাঁড়াতেই ওর চেনা গলার সুর নীলের বুকে কাঁপন ধরাল।

নীল সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ। অনেক কষ্টে ও বলল, "তুমিও তো বদলাওনি, মেঘলা। কেমন ছিলে?"

মেঘলা আলতো হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নীরব অভিযোগ। ও চেয়ার টেনে বসল। তারপর একদৃষ্টিতে নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি আমায় চিঠি লিখে উত্তর দাওনি কেন, নীল? আমি তো তোমাকে ঠিকানা দিয়ে গিয়েছিলাম। আর সবচেয়ে বড় কথা... আমি তো তোমাকে যে কথাটা বলব বলে চিঠিটা দিয়েছিলাম, তার উত্তর পাওয়ার জন্য এত বছর ধরে পথ চেয়ে বসে রইলাম।"

নীল থমকে গেল। ওর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। নীল ভাবত চিঠিটা হারিয়ে যাওয়ার কথা মেঘলা হয়তো সময়ের টানে ভুলে গেছে। কিন্তু মেঘলা তো চিঠিটার উত্তরের জন্যই আটকে ছিল!

ঠিক তখনই ক্যাফের বাইরে মেঘলা বৃষ্টি নামল। যেন আট বছর আগের সেই বিষণ্ণ দিনটা আবার ফিরে এল। কিন্তু নীল তো তখনো মেঘলাকে বলতে পারেনি যে, তিয়ার সঙ্গে তার একটা সামাজিক টানাপোড়েন চলছে, তিয়া ভুল বুঝে তার জীবন থেকে সরে গেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা—সেই চিঠি নীল কোনোদিন চোখেই দেখেনি!

মেঘলা নীলের নিস্তব্ধতা দেখে কিছুটা ঝুঁকে এল। টেবিলের ওপর রাখা নীলের ডান হাতটার ওপর নিজের নরম দুটি হাত রাখল। আট বছর পর মেঘলার পর্শ পায় নীলের শরীরে বিদ্যুতের মতো একটা শিহরণ খেলে গেল। মেঘলার চোখের মণি দুটো কাঁপছিল। ও খুব ফিসফিস করে বলল, "নীল, তুমি কি আজও জানো না আমি ওই চিঠিতে কী লিখেছিলাম? তুমি কি সত্যি জানো না, কেন আমি সব ফেলে আবার এই শহরে ফিরে এসেছি?"

নীল মেঘলার হাতের ছোঁয়া অনুভব করছিল, আর বুকের ভেতর অনুভব করছিল এক প্রচণ্ড অপরাধবোধ ও তীব্র ভালোবাসা। একদিকে তিয়ার সঙ্গে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝির কাদা, অন্যদিকে মেঘলার এই অপলক ভালোবাসা ও অজানা চিঠির রহস্য। নীল কীভাবে মেঘলাকে বলবে যে সেই চিঠি হারিয়ে গেছে নদীর অতল গভীরে?

নীল মেঘলার হাতের ওপর আরেকটা হাত রাখল। বুড়িগঙ্গার ওপর তখন আষাঢ়ের ভারী বৃষ্টি নামছে। নদীর পানির ওপর ফোটা কাটছে মেঘের ফোঁটা। সেই বৃষ্টির শব্দের মাঝে নীল কোনোমতে বলল, "মেঘলা, আমি... আমি চিঠিটা..."

কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্যাফের দরজায় এসে দাঁড়াল একটা পরিচিত অবয়ব। ভেজা চুলে, চোখে জল আর ক্রোধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিয়া! তিয়ার হাতে একটা পুরোনো পলিথিনে মোড়ানো, কিছুটা কালচে হয়ে যাওয়া নীল ফিতা বাঁধা খাম!

যে খামটা আট বছর আগে বুড়িগঙ্গায় হারিয়ে গিয়েছিল, আজ আট বছর পর কীভাবে তা তিয়ার হাতে? নীলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মেঘলাও অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল। তিন জোড়া চোখের মাঝখানে এখন ঝুলছে আট বছরের হারিয়ে যাওয়া সেই রহস্যময় চিঠি, যা বদলে দিতে যাচ্ছে সবার জীবন!

ক্যাফের কাচের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তিয়ার শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল। তার শাড়ির আঁচলটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে একদম লেপ্টে গেছে গায়ের সাথে। তিয়ার ডান হাতে শক্ত করে ধরা সেই কালচে, শেওলা-ধরা পলিথিনের ভেতরে থাকা নীল ফিতা বাঁধা খামটা।

নীল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আট বছর আগে যে চিঠি বুড়িগঙ্গার কালচে পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল, তা কীভাবে তিয়ার হাতে আসতে পারে? নীল হড়বড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

"তিয়া? তুমি... তুমি এই চিঠি কোথায় পেলে?" নীলের গলা দিয়ে যেন স্বর ফুটছিল না।

তিয়া ভেতরে এক পা বাড়াল। তার ভেজা পায়ের ছাপে ক্যাফের চকচকে মেঝেবোঝাই হয়ে যেতে লাগল। তিয়ার দৃষ্টি নীলের ওপর থেকে গিয়ে পড়ল মেঘলার ওপর। টেবিলের পাশে নীল শাড়ি পরা যে মেয়েটি বসে আছে, তাকে চ চিনতে তিয়ার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। নীলের স্কেচবইয়ের পাতা থেকে যেন রূপ নিয়ে উঠে এসেছে সাক্ষাৎ মেঘলা।

তিয়া বিষাদের একটা হাসল। সেই হাসিতে যন্ত্রণা আর আত্মসম্মানের সংমিশ্রণ। সে এ এগিয়ে এসে চিঠিটা সশব্দে ফেলে দিল নীলের টেবিলের ওপর।

"কোথায় পেয়েছি, তা জেনে তোমার কী লাভ, নীল?" তিয়া খুব নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "তুমি তো ভাবতে তোমার শৈশবের প্রেম বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে গেছে। কিন্তু বিধাতা তো তোমার মিথ্যার নাটক সহ্য করতে পারেননি। ছোঁয়া... তোমার বোন ছোঁয়া এই খামটা এতগুলো বছর নিজের ঘরের একটা পুরোনো তোশকের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। নদীর পানিতে ব্যাগটা পড়েনি নীল, সেদিন ভয়ে আর ঈর্ষায় তোমার বোন খামটা ওখান থেকে সরিয়ে নদী থেকে ব্যাগ পড়ে যাওয়ার নাটক করেছিল! ও চায়নি তোমার জীবনে কোনো মেঘলা থাকুক।"

কথাগুলো যেন বাজ হয়ে খসে পড়ল নীলের মাথায়। তার প্রিয় ছোট বোন ছোঁয়া, যাকে সে এত ভালোবাসে, সে তার সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে? মেঘলার দেওয়া চিঠিটা তাহলে আট বছর ধরে ওদের ঘরের ভেতরেই বন্দি ছিল?

মেঘলাও শিউরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তার চোখ দুটো বিষ্ময়ে স্থির হয়ে গেছে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "ছোঁয়া? ছোঁয়া এমন করল?"

তিয়া মেঘলার দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের কোণে পানি জমা হলেও সে তা গড়িয়ে পড়তে দিল না। শক্ত গলায় বলল, "হ্যাঁ, আপনার দেওয়া চিঠি ছোঁয়াই সরিয়েছিল। কাল রাতে নীলের স্কেচবই নিয়ে আমাদের ঝগড়া হওয়ার পর ছোঁয়া অপরাধবোধে ভুগে কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে এসে এই চিঠিটা দিয়ে গেছে। ও ভেবেছিল এটা আমাকে দিলে আমি নীলকে ক্ষমা করে দেব, নীলের সংসার বাঁচাব। কিন্তু ও জানে না, যার মন অন্য কারো না-বলা কথায় আটকে থাকে, তাকে কোনো চিঠি দিয়ে ধরে রাখা যায় না।"

তিয়া নীলের দিকে একপলক তাকাল। তার চোখে কেবলই এক গভীর শূন্যতা। "নীল, তুমি মুক্ত। তোমার হারিয়ে যাওয়া প্রেম আর না-পড়া চিঠি—দুটোই তোমার সামনে। আমাকে আর মাঝখানে দাঁড়াতে হবে না। ভালো থেকো।"

নীল কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, "তিয়া, শোনো—" কিন্তু তিয়া কোনো কথা না শুনেই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ক্যাফ থেকে বের হয়ে গেল। বৃষ্টিতে নিমিষেই মিলিয়ে গেল তার অবয়ব।

ক্যাফের ভেতর তখন এক শ্মশান নীরবতা। কেবল বাইরে বৃষ্টির ছটফটানি আর টেবিলের ওপর রাখা সেই বিষাদমাখা কালচে পলিথিন।

নীল আস্তে আস্তে চেয়ারে বসে পড়ল। তার মাথার ভেতরে সহস্র যন্ত্রের গর্জন। একদিকে তিয়ার সরে যাওয়া, বোন ছোঁয়ার এই মারাত্মক ছলনা, অন্যদিকে আট বছর ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা মেঘলার নিঃশব্দ ভালোবাসা।

মেঘলা ধীরে ধীরে নীলের সামনের চেয়ারটায় বসল। সে হাত বাড়িয়ে পলিথিনটা খুলল। এত বছরে কাগজের কোণগুলো কিছুটা নোনা ধরেছে, ফিতাটার রঙও মলিন হয়ে গেছে। কিন্তু মেঘলার হাতের লেখার সেই পরিচিত টান এখনো নীল কালিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

মেঘলা খামটা খুলে ভেতর থেকে চার ভাজ করা কাগজটা বের করল। তারপর সেটা নীলের দিকে এগিয়ে দিল। মেঘলার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে এসে থামল তার ঠোঁটের ওপরে।

"পড়ো, নীল। আট বছর ধরে যে উত্তরটার জন্য আমি লন্ডনের নির্জন রাতে একা একা কেঁদেছি, আজ সেই চিঠি তুমি পড়ো।" মেঘলার গলার সুর ভাঙা, তীব্র আবেগে আচ্ছন্ন।

নীলের হাত কাঁপছিল। পলিথিনের গন্ধ আর মেঘলার পারফিউমের সুবাস মিশে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়েছে। সে চিঠিটা খুলল। পাতায় পাতায় মেঘলার সেই আবেগময় সোজা সোজা লেখা:

‘নীল,
তোমাকে কোনোদিন মুখে বলতে পারিনি, কারণ ভয়ে ছিলাম যদি আমাদের এই সুন্দর বন্ধুত্বটা ভেঙে যায়। কিন্তু আজ আমি দূরে চলে যাচ্ছি, তাই এই সত্যটা চেপে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নীল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কোনো শৈশবের খেলা হিসেবে নয়, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি শুধু তোমার ভালোবাসাকে অনুভবে ধারণ করি। আমি লন্ডনে গিয়ে শুধু তোমার একটা উত্তরের অপেক্ষায় থাকব। তুমি যদি এই চিঠির উত্তরে বলো "ফিরে এসো", আমি আমার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার—সব কিছু ছেড়ে প্রথম ফ্লাইটেই তোমার কাছে ফিরে আসব। আর তুমি যদি আমাকে শুধু শিশুকালের বন্ধুই মনে করো, তবে কোনো দিন কিছু বোলো না, আমি বুঝে নেব। কিন্তু জেনো, এই মেঘলা শুধুই নীলের...’

চিঠিটা পড়া শেষ হতে হতে নীলের চোখ ঝাপসা হয়ে এল। চোখের পানি ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়ল চিঠির পাতায়, যেখানে আট বছর আগের মেঘলার অনুভূতিগুলো শুকিয়ে আটকে ছিল।

নীল মাথা তুলল। মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে কী তীব্র হাহাকার, কী বিপুল প্রেম! আট বছর ধরে মেয়েটা ভেবে এসেছে নীল তার ভালোবাসাকে উপেক্ষা করেছে, তাকে উত্তর দেওয়ার যোগ্য মনে করেনি! আর নীল ভেবে এসেছে মেঘলা তাকে ভুলে দূরে চলে গেছে!

"মেঘলা..." নীলের গলা দিয়ে কান্নার তোড় বেরিয়ে আসতে চাইল। সে টেবিল ডিঙিয়ে মেঘলার দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল।

মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নীলের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। আট বছরের জমে থাকা নীরব কান্না ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সেই ক্যাফের কোণে। নীলের গায়ের জামা ভিজে যেতে লাগল মেঘলার তপ্ত চোখের জলে। নীল মেঘলাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কত বছর, কত শত নির্ঘুম রাত সে এই সুবাসটার জন্য ব্যাকুল হয়ে একেঁছে!

"আমি জানতাম না, মেঘলা! খোদার কসম, আমি জানতাম না!" নীলের কণ্ঠ ভিজে একাকার। "চিঠিটা আমার কাছে কোনোদিন পৌঁছায়নি। আমি তো ভেবেছি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ!"

মেঘলা নীলের শক্ত বুকে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, "তুমি আমায় ভালোবাসতে, নীল? এখনো ভালোবাসো?"

নীল মেঘলার মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে ধরল। বৃষ্টির সিক্ত আলোয় মেঘলার ভিজতে থাকা চোখ আর লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো নীলের খুব কাছে। নীলের নিঃশ্বাস মেঘলার গালে এসে লাগছিল।

"আমি কোনোদিন অন্য কাউকে ভালোবাসিনি, মেঘলা," নীল অতল ভালোবাসায় আচ্ছন্ন গলায় বলল। "আমার স্কেচবইয়ের প্রতিটি পাতায়, আমার নীরবতায় শুধু তুমিই ছিলে। কিন্তু..."

নীলের কথাটা শেষ হলো না। সে থেমে গেল।

মেঘলা নীলের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে হুট করেই একটা অজানা আতঙ্কের ছায়া দেখতে পেল সে।

নীল হঠাৎ করে তিয়ার কথাটা মনে করে শিউরে উঠল। তিয়া আজ তার কারণে নিঃস্ব হয়ে ফিরে গেছে। আর ছোঁয়া... তার নিজের বোন, কেন এত বড় পাপ করল?

ঠিক তখনই নীলের ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার বাবার নাম।

নীল ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে তার বাবার আর্ত চিৎকার ভেসে এল, "নীল! তুই কোথায়? শিগগির হাসপাতালে আয়! তিয়া রোড অ্যাক্সিডেন্ট করেছে... আর ছোঁয়া... ছোঁয়া নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে বিষ খেয়েছে!"

ফোনটা নীলের হাত থেকে খসে মেঝেবোঝাই শান্ত পানিতে পড়ে গেল। মেঘলা আর নীলের সেই তীব্র প্রেমের আলিঙ্গনের মাঝখানে যেন আবার চাবুকের মতো নেমে এল ক্রূর বাস্তব।

বাবার কান্নার আওয়াজটা নীলের ফোনের স্পিকার পেরিয়ে যেন পুরানো ঢাকার পুরো বাতাসকে নিস্তব্ধ করে দিল। ধানমন্ডির সেই ক্যাফের কাচের জানালার বাইরে বৃষ্টি তখন রূপ নিয়েছে মুষলধারে। নীলের মাথার ওপর যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশটা ভেঙে পড়েছে।

একদিকে আট বছর পর ফিরে পাওয়া জীবনের একমাত্র ভালোবাসা মেঘলা, তার সিক্ত চোখের না-বলা কথা আর হাতের মুঠোয় চেপে ধরা সেই ঐতিহাসিক চিঠি। অন্যদিকে তার কারণে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়া, আর নিজের পেটের বোনের এমন মারাত্মক অপরাধবোধের পরিণতি।

"কী হয়েছে নীল? তুমি অমন করে দাঁড়িয়ে আছো কেন?" মেঘলার কণ্ঠ আতঙ্কে কেঁপে উঠল। নীলের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে সে নীলের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরল।

নীল মেঘলার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে গভীর হাহাকার আর তীব্র অপরাধবোধ। "ছোঁয়া বিষ খেয়েছে মেঘলা... আর তিয়া... তিয়া হাসপাতাল রোডে বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।"

কথাটা শুনেই মেঘলার হাতটা নীলের হাত থেকে আলগা হয়ে পড়ে গেল। মেঘলার বুকের ভেতরেও একটা মোচড় দিল। সে জানত না, এত বছর পর তার ভালোবাসার প্রকাশ এভাবে রক্ত আর অনুশোচনার স্রোত বইয়ে দেবে।

"চলো, নীল! আমাদের এখনই হাসপাতালে যেতে হবে," মেঘলা নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে বলল।

তারা দুজনে ক্যাফ থেকে বের হয়ে একটা সিএনজি নিয়ে সরাসরি স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পুরোটা পথ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। সিএনজির পলিথিনের পর্দা বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছিল ভেতরে। মেঘলা আড়চোখে নীলের দিকে তাকাচ্ছিল। নীলের কপালে রগ ভেসে উঠেছে, সে নিজের দুটো হাত শক্ত করে চিপে ধরে আছে। আট বছর ধরে যে ভালোবাসার তৃষ্ণায় তারা দুজন ছটফট করছিল, আজ যখন সেই বাঁধন ভাঙল, ঠিক তখনই চারপাশের বাস্তবতা তাদের চাবুকের মতো আঘাত করল।

হাসপাতালে পৌঁছাতেই নীলের বাবা আর মা নীলের দিকে ছুটে এলেন। মায়ের চোখ কেঁদে ফুলে লাল হয়ে গেছে। নীলকে দেখেই মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, "নীল রে, তোর বোনটা কী কাজ করল রে! ও যদি না বাঁচে আমি কী নিয়ে বাঁচব?"

নীল ধপ করে করিডোরের একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। "ছোঁয়া এখন কেমন আছে, মা?"

"পাকস্থলী ওয়াশ করা হয়েছে। আইসিইউতে রাখা আছে, ডক্টর বলেছেন চব্বিশ ঘণ্টা না গেলে কিছু বলা যাচ্ছে না," বাবা নিচু গলায় বললেন। তার চোখ যায় মেঘলার দিকে। আট বছর আগের সেই ছোট মেয়েটিকে আজ পূর্ণাঙ্গ এক নারী হিসেবে দেখে তিনি অবাক হলেন, তবে সেই পরিস্থিতিতে কোনো প্রশ্ন করার মানসিকতা কারো ছিল না।

ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের জরুরি বিভাগ থেকে তিয়ার বাবা বের হয়ে এলেন। নীলের ওপর চোখ পড়তেই তার চেহারা রাগে আর কষ্টে হিংস্র রূপ নিল। তিনি সোজা এগিয়ে এসে নীলের শার্টের কলার চেপে ধরলেন।

"তুই আমার মেয়েটাকে শেষ করে দিলি, নীল!" তিয়ার বাবা চিৎকার করে উঠলেন। "আমার মেয়েটা তোকে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিল। আর তুই তাকে ফেলে ওই পুরানো স্মৃতির পেছনে ছুটলি? তিয়ার মাথায় মারাত্মক চোট লেগেছে, সার্জারি চলছে! যদি আমার মেয়ের কিছু হয়, আমি তোকে আর তোর পরিবারকে ক্ষমা করব না!"

নীল কোনো প্রতিবাদ করল না। সে নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে জানে, এই অন্যায়ের কোনো জবাব তার কাছে নেই। প্রেম কখনো পাপ হতে পারে না, কিন্তু অপ্রকাশিত প্রেম আর ভুল বোঝাবুঝি যে এতগুলো জীবন বিষিয়ে দিতে পারে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

মেঘলা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল, নীল কীভাবে ভেঙে পড়ছে। যে ছেলেটি আজ সকালে তার সব ছিল, সে যেন এক নিমেষে সবার অপরাধী হয়ে উঠেছে। মেঘলা ধীরে ধীরে তিয়ার বাবার দিকে এগিয়ে গেল।

"আঙ্কেল, নীলকে দোষ দেবেন না," মেঘলা খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল। "সব দোষ পরিস্থিতির। নীল কোনোদিন তিয়াকে ঠকায়নি, সে কেবল একটা সত্যের মুখোমুখি হতে চেয়েছিল। আপনি নীলকে মারুন, কিন্তু ওকে মানসিক অপরাধী বানাবেন না।"

তিয়ার বাবা তীব্র ঘৃণা নিয়ে মেঘলার দিকে তাকালেন। "তুমি কে? ওহ, তুমিই সেই মেঘলা? যার জন্য আমার মেয়ের আজকে এই অবস্থা? চলে যাও এখান থেকে! আমাদের জীবনের মোড় ঘোরানো নাটক দেখার জন্য নিশ্চয়ই তোমরা এখানে আসোনি!"

মেঘলা আর কিছু বলতে পারল না। তার গলার কাছে কান্না আটকে এল। নীল মেঘলার দিকে তাকাল, তার চোখে এক করুণ মিনতি। "মেঘলা... তুমি দয়া করে এখন বাড়ি যাও। এই পরিবেশ তোমার সহ্য হবে না।"

মেঘলা নীলের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কী তীব্র আকর্ষণ, আবার একই সাথে কত বড় এক দেয়াল! আট বছর পর কাছে এসেও তারা আবার কত দূরে।

"আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না, নীল," মেঘলা দৃঢ় গলায় বলল। "আট বছর আগে ভুল বোঝাবুঝিতে দূরে চলে গিয়েছিলাম। এবার আমি তোমার পাশে থেকে এই ঝড় সহ্য করব।"

মেঘলা হাসপাতালের করিডোরের অন্য এক কোণে গিয়ে বসল। দীর্ঘ সময় ধরে সার্জারি চলল তিয়ার। আর ওদিকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছোঁয়া। রাত গভীর হতে লাগল। হাসপাতালের নীরব করিডোরে কেবল ভেন্টিলেটরের বিযোড় শব্দ আর বাইরে বৃষ্টির ফোটা পড়ার আওয়াজ।

রাত ৩টের দিকে আইসিইউর দরজা খুলল। ডাক্তার বের হয়ে এলেন। নীল আর তার বাবা-মা ছুটে গেলেন।

"পেশেন্টের সেন্স এসেছে," ডাক্তার বললেন। "তিনি কেবল একজনের নাম জপছেন... ‘নীল ভাই’।"

নীল দ্রুত আইসিইউর ভেতরে ঢুকল। কাচের ভেতরের বিছানায় তার ছোট বোন ছোঁয়া শুয়ে আছে, মুখে অক্সিজেনের মাস্ক, হাত-পা ঠান্ডা। নীল ছোঁয়ার পাশে গিয়ে বসল, ছোঁয়ার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল।

"ছোঁয়া... তুই একি করলি রে বোন?" নীলের চোখে পানির বন্যা।

ছোঁয়া খুব কষ্ট করে চোখের পাতা খুলল। মাস্কের ভেতর থেকেই তার ফিসফিসে গলার আওয়াজ বের হলো, "নীল ভাই... আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি আট বছর আগে খুব বড় পাপ করেছিলাম। আমি মেঘলা আপুর চিঠি লুকিয়েছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম মেঘলা আপু তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে। কিন্তু আমি তো তোর জীবনটাই নষ্ট করে দিলাম..."

ছোঁয়ার চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়ল। "আমি তিয়া আপুকে সব বলেছিলাম... ভেবেছিলাম তিয়া আপু তোকে ধরে রাখবে... কিন্তু..."

"তুই আর কোনো কথা বলবি না," নীল বোনের কপালে চুমু খেয়ে বলল। "তুই সুস্থ হ, সব ঠিক হয়ে যাবে।"

ছোঁয়া নিচু গলায় বলল, "না নীল ভাই... কিছু ঠিক হবে না যতক্ষণ না তুমি নিজের মনকে সত্যিটা বলো। মেঘলা আপু তোমাকে কতটা ভালোবাসে আমি আজ বুঝেছি। তুমি ওর কাছে যাও... তিয়া আপুর জীবন থেকে তুমি সরে এসে ভালোই করেছ, তিয়া আপু কোনোদিন তোমার মনের মেঘলাকে মুছে ফেলতে পারত না।"

নীল আইসিইউ থেকে বের হয়ে আসতেই দেখতে পেল তিয়ার সার্জারি রুমের লাল আলোটা নিভে গেছে। তিয়ার ডাক্তার বের হয়ে এসে এক বিষণ্ণ খবর দিলেন, "সার্জারি সফল হয়েছে, কিন্তু মাথায় মারাত্মক আঘাতের কারণে পেশেন্টের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিয়া হয়তো আর কোনোদিন চোখে দেখতে পাবে না..."

মুহূর্তের মধ্যে করিডোরের বাতাস যেন থমকে গেল। মেঘলা আর নীল একে অপরের দিকে তাকাল। তিয়া আর কখনো দেখতে পাবে না! আর তার এই অন্ধত্বের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী নীলের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।

নীলের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে মেঘলার দিকে তাকাল। মেঘলার চোখেও তখন অঝোর ধারা। আট বছরের জমে থাকা অনুরাগের সেই গভীর প্রেম আজ এক এমন নিষ্ঠুর মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভালোবাসাকে জয় করতে গেলে ধ্বংস হয়ে যায় অন্য একটি নির্দোষ জীবন।

নীল কি পারবে তিয়াকে এই অন্ধত্বের অন্ধকারে ফেলে মেঘলার হাত ধরে নতুন করে জীবন শুরু করতে? নাকি মেঘলার না-বলা ভালোবাসা আবার হারিয়ে যাবে কোনো নীরব ত্যাগের ভিড়ে?

হাসপাতালের শীতল আলোয় তিয়ার ডাক্তারের সেই কথাটা যেন একটা ধারালো চাবুকের মতো এসে পড়ল নীলের বুকে। "তিয়া আর কোনোদিন চোখে দেখতে পাবে না..."

করিডোরের বাতাস যেন এক নিমিষে ভারী হয়ে উঠল। তিয়ার বাবার আর্তনাদে হাসপাতালের দেয়ালগুলো কেঁপে উঠল। তিনি হাটু মুড়ে মেঝেবোঝাই শান্ত মেঝের ওপর বসে পড়লেন, আর তিয়ার মা অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়লেন এক নার্সের কোলে।

নীল দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার ভেতরে সহস্র শোরগোল। সে জানত তিয়া তাকে ভালোবাসত, হয়তো সেই ভালোবাসাটা ছিল কিছুটা একপেশে, কিন্তু তিয়ার অনুভূতিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। আজ নীলের পুরানো স্মৃতি আর ফেলে আসা প্রেমের ঝড় এসে এক নিমেষে তিয়ার জীবনটাকে অন্ধকার করে দিল। তিয়া কোনোদিন আর শহরের রূপ দেখতে পাবে না, কোনোদিন আর আলো দেখতে পাবে না। এই অপরাধবোধের বোঝা নীল কীভাবে বয়ে বেড়াবে?

মেঘলা আস্তে আস্তে নীলের পাশে এসে দাঁড়াল। মেঘলার নিজের চোখ দিয়েও জলের ধারা বইছিল। সে জানে, এই মুহূর্তে নীলের বুকের ভেতরে কী মারাত্মক তান্ডব চলছে।

"নীল..." মেঘলা নিচু গলায় ডাকল। তার গলার সুর কাঁপছিল।

নীল মেঘলার দিকে তাকাল। সেই চোখে কী তীব্র যন্ত্রণা! নীল কেঁদে ফেলে বলল, "মেঘলা, আমি এখন কী করব? তিয়া আমার জন্য নিজের চোখ দুটো হারিয়ে ফেলল! ছোঁয়া আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়ছে আমার একটা চিঠির জন্য! আমি কি অভিশপ্ত, মেঘলা? আমার প্রেমে কি কেবলই ধ্বংস লেখা ছিল?"

মেঘলা নীলের দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। সে নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল, "না নীল, তুমি অভিশপ্ত নও। অভিশপ্ত আমাদের এই নিয়তি, আমাদের এই না-বলা কথাগুলো। কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। তিয়ার পাশে এখন আমাদের দাঁড়াতে হবে। তিয়াকে এই অন্ধকার থেকে বের করে আনার দায়িত্ব আমাদের।"

মেঘলার এই আত্মত্যাগ আর মানসিক শক্তি দেখে নীল স্তম্ভিত হয়ে গেল। যে মেয়েটি আটটি বছর ধরে তার একটা উত্তরের জন্য একা একা লন্ডনে দিন কাটিয়েছে, আজ নিজের অধিকার আর ভালোবাসাকে দূরে সরিয়ে রেখে সে অন্য এক মেয়ের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখাচ্ছে।

ভোর হওয়ার আগেই তিয়াকে কেবিনে স্থানান্তর করা হলো। তিয়ার মাথার আর চোখের ওপর চওড়া সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা। নীল আর মেঘলা পা টিপে টিপে কেবিনের ভেতরে ঢুকল।

তিয়ার জ্ঞান এসেছে। সে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ছিল। দরজার শব্দ পেতেই সে হাতড়ে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করল। "কে? বাবা? কে এসেছে?"

নীল ধীর পায়ে এ এগিয়ে গিয়ে তিয়ার বিছানার পাশে বসল। সে তিয়ার একটা হাত নিজের কাঁপতে থাকা হাতের মুঠোয় নিল। "তিয়া... আমি নীল।"

তিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ব্যান্ডেজের তলা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে বালিশে পড়তে লাগল। তিয়া হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না, বরং খুব শান্ত গলায় বলল, "নীল... আমার চারপাশটা এত অন্ধকার কেন? সকাল হয়নি এখনো?"

নীলের বুকটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে কথা বলতে পারছিল না, তার গলা দিয়ে কান্নার তোড় বেরিয়ে আসতে চাইছে।

ঠিক তখনই মেঘলা এগিয়ে এসে তিয়ার অন্য হাতটা ধরল। "তিয়া... সকাল হয়েছে। তবে সূর্যের আলোটা ফুটতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। আমরা তোমার পাশে আছি।"

তিয়া মেঘলার গলার সুর চিনতে পারল। সে ফিসফিস করে বলল, "মেঘলা আপু? আপনিও এখানে?"

"হ্যাঁ তিয়া, আমি এখানেই আছি। আর আমি কোথাও যাচ্ছি না," মেঘলা খুব মমতা মেখে বলল।

তিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত রকম শান্ত আর বিষণ্ণ। "আপনাকে সেদিন ক্যাফেতে দেখে আমার খুব হিংসা হয়েছিল, মেঘলা আপু। নীল যে স্কেচগুলো আঁকত, আমি ভেবেছিলাম সেগুলো কেবলই কাল্পনিক কোনো রূপকথা। কিন্তু আপনাকে দেখার পর বুঝেছি, নীল সত্যি একটা জ্যান্ত মানুষের প্রেমে আটকা পড়েছিল আট বছর ধরে। আমি জোর করে সেই হৃদয়ে ঢুকতে চেয়েছিলাম। আমার এই অন্ধত্ব হয়তো সেই জোর করারই শাস্তি..."

"না তিয়া! এমন কথা একদম বলবে না!" নীল আকুল হয়ে তিয়ার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। "কোনো শাস্তি নয়, সব দোষ আমার। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি তিয়া, তোমার জীবনে যতদিন আলো ফিরে না আসে, আমি তোমার হাত ছাড়ব না। আমি তোমার চোখ হব, আমি তোমার পথ হব।"

কথাটা শুনে কেবিনের ভেতরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল।

মেঘলা নীলের দিকে তাকাল। নীলের চোখের দৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক দৃঢ়তা, কিন্তু একই সাথে পরম বেদনার ছায়া। মেঘলা বুঝল, নীল দায়িত্বশীল এক পুরুষ। নীল ভালোবাসতে জানে, তাই সে কোনো অন্যায় বা অপরাধবোধের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের প্রেমের প্রাসাদ গড়তে পারে না। তিয়াকে এই অবস্থায় ফেলে নীল যদি মেঘলার কাছে চলে যায়, তবে নীল সারা জীবন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।

মেঘলা কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে তিয়ার কেবিন থেকে বের হয়ে এল।

হাসপাতালের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মেঘলা ভোরের তপ্ত বাতাসের দিকে তাকিয়ে রইল। পুবের আকাশে তখন লালচে রক্তিম আলো ফুটছে। বুড়িগঙ্গার ওপর থেকে মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঠছে নতুন করে।

মেঘলা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আট বছর আগের সেই বিষাদমাখা নীল ফিতা বাঁধা চিঠিটা বের করল। যে চিঠিতে লেখা ছিল তার কিশোরী বেলার তীব্র অনুভূতি, যে চিঠি তাদের দুটো জীবনকে আট বছর ধরে আটকে রেখেছিল।

মেঘলা চিঠিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল। তারপর হালকা একটা ফুঁ দিয়ে চিঠির ধুলো ওড়ালো।

নীল কেবিন থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে এল। মেঘলাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ধীর পায়ে পেছনে এসে দাঁড়াল। "মেঘলা..."

মেঘলা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক স্বর্গীয় হাসি। সে বলল, "নীল, আট বছর আগে আমি তোমাকে একটা উত্তর পাওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি বুঝেছি, ভালোবাসার চেয়েও বড় কিছু এই পৃথিবীতে আছে... তা হলো ত্যাগ আর দায়িত্ব।"

মেঘলা চিঠিটি নীলের হাতে ফিরিয়ে দিল।

"তুমি তিয়ার পাশে থাকো, নীল," মেঘলা খুব গাঢ় আর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলল। "তিয়া এখন তোমার ওপর নির্ভরশীল। আমি যদি আজ তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাই, তবে আমাদের প্রেম কোনোদিন পবিত্র থাকবে না। আমরা সারা জীবন অপরাধবোধের আগুনে জ্বলব। তুমি তিয়াকে ভালো রাখো, তাকে সুস্থ করে তোলো।"

"আর তুমি, মেঘলা?" নীলের গলা ধরে এল। "তুমি আবার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?"

মেঘলা নীলের চোখের খুব কাছে নিজের মুখটা আনল। মেঘলার তপ্ত নিঃশ্বাস নীলের গালে গিয়ে লাগল। মেঘলা আলতো করে নীলের কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল। আট বছরের সমস্ত ব্যাকুলতা, সমস্ত তৃষ্ণা যেন সেই একটি চুম্বকে সোপর্দ হয়ে গেল।

"আমি কোথাও যাচ্ছি না, নীল," মেঘলা ফিসফিস করে বলল। "আমি এই শহরেই থাকব। তবে প্রমিক হিসেবে নয়... তোমার শক্তির উৎস হয়ে। যদি কোনোদিন তিয়া আবার আলো ফিরে পায়, যদি কোনোদিন নিয়তি আমাদের সত্যি এক করে... সেদিন আমি তোমার এই বুকে মাথা রাখব। তার আগে পর্যন্ত, আমাদের না-বলা কথাগুলো এই বাতাসে ডানা মেলে উড়ুক।"

মেঘলা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করল।

নীল দাঁড়িয়ে রইল ব্যালকনিতে, হাতে সেই পুরোনো চিঠি আর বুকে এক তীব্র, গভীর রোমান্সের দীর্ঘশ্বাস। আট বছর পর মিলন হয়েও তারা আবার বিচ্ছিন্ন, কিন্তু এই বিচ্ছেদ কোনো পরাজয়ের নয়—এ যেন ভালোবাসার এক মহিমাময় পরীক্ষা।

কিন্তু নিয়তি কি এত সহজেই তাদের ইতি টানতে দেবে? নাকি শেষ পর্বে অপেক্ষা করছে এমন এক নতুন মোড়, যা পাল্টে দেবে নীল, মেঘলা আর তিয়ার সমস্ত হিসেব-নিকাশ?

ভোরের আলো তখন পুরপুরি ফুটে উঠেছে। হাসপাতালের ব্যালকনিতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি সূর্যের আলোয় হীরের মতো চকচক করছিল। নীল একদৃষ্টিতে মেঘলার হেঁটে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘলার শাড়ির নীল আঁচলটা করিডোরের মোড়ে মিলিয়ে যাওয়ার পর নীলের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল।

আটটা বছর তারা একে অপরের অপেক্ষায় কাটিয়েছে। আজ যখন সব সত্যি সামনে এল, তখন দায়িত্বের কাছে থমকে দাঁড়াল তাদের অনুরাগ। কিন্তু এই তো ভালোবাসার আসল রূপ। প্রেম মানে তো কেবল প্রাপ্তি নয়, ভালোবাসার মানুষের সম্মান রক্ষা করাও যে প্রেমেরই অংশ!

দুই মাস পর...

ধানমন্ডির পুরোনো সেই লেকের পাড়ে গাছের ছায়ায় বসেছিল তিয়া আর নীল। তিয়ার চোখের ওপর এখন আর কোনো চওড়া সাদা ব্যান্ডেজ নেই। তবে তার চোখে আঁধার এখনো রয়ে গেছে, যদিও তা চিরকালের জন্য নয়।

তিন সপ্তাহ আগে থাইল্যান্ড থেকে এক বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন ঢাকায়। তিয়ার চোখের রেটিনা পুরোপুরি নষ্ট হয়নি, কেবল মারাত্মক ট্রমার কারণে স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে গিয়েছিল। টানা এক মাসের ফিজিওথেরাপি আর অ্যাডভান্সড লেজার সার্জারির পর তিয়া এখন ঝাপসা আলো আর অস্পষ্ট ছায়া দেখতে পায়। ডাক্তার আশা দিয়েছেন, আর কয়েক মাসের মধ্যেই তিয়া সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে।

তিয়া লেকের মৃদু বাতাসের পর্শ নিচ্ছিল। সে আস্তে করে নীলের দিকে মুখ ফেরাল। নীলের অবয়বটা এখন তার চোখে এক ঝাপসা আলোর মতো দেখায়।

"নীল?" তিয়া খুব নিচু গলায় ডাকল।

"বলো তিয়া," নীল আলতো করে তিয়ার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

তিয়া একটু হাসল। "তুমি এই দুটো মাস আমার পাশে এক মুহূর্তের জন্যও সরোনি। আমার ওষুধ খাওয়া, ডাক্তারের কাছে নেওয়া, আমাকে হাঁটা শেখানো—সব তুমি এক হাতে করেছ। কিন্তু নীল... তুমি কি জানো, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলেও মনের দৃষ্টি কখনো ঝাপসা হয় না?"

নীল চুপ করে রইল।

তিয়া নিজের হাতটা নীলের হাত থেকে আলগা করে নিল। "আমি প্রতি রাতে খেয়াল করেছি, তুমি যখন ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন তুমি কেবিনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে। তোমার সেই নিঃশ্বাসের শব্দে কী তীব্র হাহাকার থাকত, তা আমি শুনতে পেতাম নীল। তুমি আমাকে দায়িত্ব পালন করে ভালো রেখেছ ঠিকই, কিন্তু তোমার মনটা তো আটকে আছে সেই মেঘলার কাছেই।"

"তিয়া, আমি—" নীল কিছু বলতে যেতেই তিয়া তাকে থামিয়ে দিল।

"না নীল, আর মিথ্যা সান্ত্বনা দিও না," তিয়া খুব মমতাময় কণ্ঠে বলল। "ছোঁয়া সেদিন আইসিইউ থেকে সুস্থ হয়ে বের হওয়ার পর আমাকে সব বলেছিল। মেঘলা আপু সেদিন হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাননি, উনি এতগুলো দিন আড়ালে থেকে আমার চিকিৎসার জন্য সব ব্যবস্থা করেছেন। ব্যাংকক থেকে সেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে মেঘলা আপুই তার নিজের ওখানকার চেনা পরিচিতি ব্যবহার করে নিয়ে এসেছিলেন! উনি প্রতিদিন হাসপাতালে এসেছেন, আমার খবর নিয়েছেন, কিন্তু তোমার সামনে আসেননি যাতে তুমি বিচলিত না হও।"

নীল স্তম্ভিত হয়ে তিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘলা? মেঘলা এত কিছু করেছে আড়ালে থেকে?

তিয়া নীলের মুখটা নিজের দুটো হাতের মাঝখানে নিল। ঝাপসা চোখে নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "যে মেয়েটা তোমার ভালোবাসার মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজের অধিকার ত্যাগ করতে পারে, আর নেপথ্যে থেকে সাহায্য করতে পারে, সেই ভালোবাসাকে অস্বীকার করা মহা পাপ নীল। আমি আলো ফিরে পাচ্ছি, কিন্তু তোমার জীবন থেকে যদি আমি মেঘলা আপুকে কেড়ে নিই, তবে আমি চিরকালের জন্য অন্ধ হয়ে যাব। তুমি যাও নীল... মেঘলা আপুর কাছে যাও।"

নীলের চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে তিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও তিয়া..."

"তোমাকে ক্ষমা করার কিছু নেই নীল। তুমি মুক্ত," তিয়া মুচকি হেসে বলল। "যাও, বুড়িগঙ্গার ঘাট হয়তো এখনো কারো অপেক্ষায় আছে।"

নীল আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।

সে পাগলের মতো ছুটে গেল সদরঘাটের সেই পুরোনো টার্মিনালটার দিকে। বৃষ্টির দিনে ঠিক যেখানটায় মেঘলা দাঁড়িয়েছিল আট বছর আগে। শ্রাবণের শেষ বিকেল, আকাশজুড়ে আবার মেঘ জমেছে। কালচে নদীর পানি বাতাসে দোলা খাচ্ছে।

টার্মিনালের একদম শেষ মাথায়, নদীর পাড়ে একটা লাল সুতির শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। বাতাসে তার খোলা চুল উড়ছে।

নীল দৌড়ে গিয়ে সেই অবয়বটার কাছে থামল। তার বুকের হাঁপানি কমছিল না।

"মেঘলা!" নীল চিৎকার করে ডাকল।

মেয়েটি আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল। মেঘলার চোখে তখন জল আর ঠোঁটে সেই চিরপরিচিত মিষ্টি হাসি।

নীল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মেঘলাকে টেনে এনে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আট বছরের জমে থাকা ব্যাকুলতা, ত্যাগের বেদনা, আর গভীর অনুরাগের সমস্ত তৃষ্ণা যেন সেই একটি আলিঙ্গনে মিশে গেল। মেঘলা নীলের গলার কাছে মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে লাগল। নীলের হাত দুটি মেঘলার পিঠ শক্ত করে চেপে রাখল, যেন এই রূপসীকে আর কোনোদিন পৃথিবীর কোনো নিয়তি তার কাছ থেকে আলাদা করতে না পারে।

"তুমি জানতে আমি আসব?" নীল আচ্ছন্ন কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল।

মেঘলা নীলের বুকে মুখ রেখেই বলল, "আমি জানি নীল, সত্য ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়তি তাকে নিজের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়।"

মেঘলা নীলের চোখের দিকে তাকাল। নীলের মুখটা দুই হাতে চেপে ধরে সে তার ঠোঁট দুটো নীলের ঠোঁটের খুব কাছে নিয়ে এল। দুই হৃদয়ের তপ্ত নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল। আট বছর আগে যে না-বলা কথাটি চিঠির নোনা পাতায় আটকে ছিল, আজ নদীর পাড়ে ঝুম বৃষ্টি নামার ঠিক আগের মুহূর্তে মেঘলা নীলের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমাকে ভালোবাসি নীল... আট বছর আগেও বাসতাম, আজও বাসি, আর মরণের পর পর্যন্ত বাসব।"

নীল মেঘলার কপালে নিজের গভীর ভালোবাসার চুম্বকের পর্শ এঁকে দিল। বুড়িগঙ্গার ওপরে তখন নামল মুষলধারে বৃষ্টি। তবে এই বৃষ্টি আর বিষাদের নয়, এই বৃষ্টি দুই বিষাদময় আত্মার এক হওয়ার আনন্দে উছলে ওঠা এক মহা উৎসবের।

হারিয়ে যাওয়া চিঠিটা আজ আর কোনো কাগজের পাতায় নেই, তা খোদাই হয়ে গেছে দুটি ভালোবাসার আত্মায়—চিরকালের জন্য।

 

....
👁 17