অপরাধবোধের কারা থেকে মুক্তি

ঢাকা শহরের পুরানো এক যৌথ পরিবারের বাড়ি—‘নীলকণ্ঠ মঞ্জিল’। নামটা নীলকণ্ঠ হলেও বাড়ির রঙ এখন ফিকে হয়ে এসেছে। এই বিশালাকার বাড়ির দোতলার ডান পাশের বড় ঘরটায় নীরার বসবাস, আর ঠিক তার মুখোমুখি ঘরটা এখন আয়ানের।

পরিবারের জটিল সম্পর্কের সমীকরণ এবং কিছু অনাকাঙ্খিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আজ একই ছাদের নিচে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে নীরা ও আয়ান। নীরা—বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করা চঞ্চল, দুরন্ত এবং ছটফটে এক মেয়ে। যার উপস্থিতি পুরো বাড়িটাকে চাঙ্গা করে রাখে। কথা বললে মনে হয় যেন কোথাও ঝরনা বইছে। অন্যদিকে আয়ান একদম তার বিপরীত। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কাজের বাইরে নিজের একটা গুটিয়ে নেওয়া পৃথিবী আছে তার। গম্ভীর, শান্ত, মেপে কথা বলা—এমন এক মানুষ, যার মুখে এক চিলতে হাসি দেখাও মহা দুর্লভ ব্যাপার।

আজ সকালের পরিবেশটাও খুব একটা সুবিধার ছিল না। চায়ের টেবিল থেকেই যুদ্ধের সূচনা।

"ফুফু, আমার আরজি ডাস্ট ছাড়া একদম চলে না। এই চাটগাঁইয়া কড়া চা কে খেতেই পারে না!"—নীরা কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে বেশ শব্দ করেই টেবিলে নামিয়ে রাখল।

ঠিক উল্টো পাশে বসা আয়ান নিজের ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ঠান্ডা গলায় বলল, "চা চা-ই হয়। সকালবেলা এত নাটক না করে চুপচাপ খাওয়া যায় না?"

নীরা চোখ বড় বড় করে তাকাল। "নাটক? আপনি আমাকে নাটক করতে বলছেন? দেখুন আয়ান সাহেব, আপনার গম্ভীর মুখটা সহ্য করা এমনিতেই কঠিন, তার ওপর সকালে উঠে এমন জ্ঞান দেওয়া বন্ধ করুন!"

আয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিনটা আলতো করে নামিয়ে রাখল। তার দৃষ্টি এবার সরাসরি নীরার ওপর। সেই চাহনিতে এত গভীর শান্ত ভাব ছিল যে নীরা এক মুহূর্তের জন্য যেন খেই হারিয়ে ফেলল। কিন্তু আয়ান শুধু ধীর গলায় বলল, "বাড়িটা একটা শান্ত জায়গা। প্রতিদিন সকালে এই চিল চিৎকার না করলেই নয়?"

"আমি চিল চিৎকার করছি? বাহ!" নীরা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ওড়নাটা দুলে উঠল হাওয়ায়। "আপনার সাথে কথা বলাই বেকার!"

কথাটা বলেই নীরা হনহন করে নিজের ঘরে চলে গেল। আয়ান নীরার চলে যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, কিন্তু বুকের ভেতর কোথায় যেন এক ফোঁটা অকারণ অস্বস্তি এসে দোলা দিল।

কয়েকদিন পর। ঢাকার আকাশে তখন শ্রাবণের মেঘ। বৃষ্টি নামল অঝোর ধারায়। বিকেলের দিকে নীরার তীব্র জ্বর এল। শরীর কামড়ে ধরেছে, কপাল আগুনে পুড়ছে। বাড়িতে ফুফু ছাড়া তখন আর কেউ ছিল না, তিনিও প্রতিবেশীর বাড়িতে গেছেন বিশেষ কাজে।

নীরার ঘরের দরজা একটু খোলাই ছিল। আয়ান অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে যাওয়ার সময় হালকা একটা গোঙানির শব্দ পেল। থমকে দাঁড়াল সে। আস্তে করে দরজায় তোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

নীরা বিছানায় কাঁথা গায়ে গুটিয়ে শুয়ে আছে। মুখটা লাল হয়ে উঠেছে জ্বরে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ। আয়ান কাছে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে নীরার কপালে ছোঁয়াতেই আয়ানের নিজের বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। এত তাপ!

"নীরা?" আয়ানের গলার গম্ভীর সুরটা এক মুহূর্তে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। সেখানে নেমে এল এক অদ্ভুত নরম টান।

নীরা আধবোজা চোখে তাকাল। "আয়ান... খুব ঠান্ডা লাগছে..."

আয়ান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। ওড়না দিয়ে নীরার মাথাটা ভালো করে ঢেকে দিল। রান্নাঘরে গিয়ে গরম পানি ফুটিয়ে আনল, সাথে ভেজা তোয়ালে। পুরোটা রাত আয়ান সেই বিছানার পাশে একটা কাঠের চেয়ার টেনে বসে রইল। নীরার কপালে বারবার ভিজা তোয়ালি জলপট্টি হিসেবে বসিয়ে দিতে লাগল সে।

ভোরের দিকে নীরার জ্বর কিছুটা কমল। ঘুম ভাঙতেই নীরা দেখল, ঘরের কোণের চেয়ারটায় মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে আছে আয়ান। তার শার্টের হাতা গুটানো, চশমাটা একপাশে রাখা, আর তার চোখেমুখে তীব্র ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু তবুও মানুষটার চোখে যেন এক অপরিসীম মায়া লেগে আছে।

নীরা বিছানায় উঠে বসল। এই প্রথমবার তার মনে হলো, আয়ান মানুষটা যতটা বরফের মতো ঠান্ডা, তার ভেতরের হৃদয়টা ঠিক ততটাই উষ্ণ।

দিন যেতে লাগল, আর তাদের মধ্যকার অদৃশ্য দেওয়ালটা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল। এখন আর সকালে শুধু ঝগড়া হয় না, মাঝে মাঝে মিষ্টি এক চিলতে হাসির আদান-প্রদানও হয়।

একদিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো। পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেছে। ঘর অন্ধকার। নীরা অন্ধকারে বেশ ভয় পায়। সে নিজের ঘরে খাটের ওপর পা গুটিয়ে বসে ছটফট করছিল।

হঠাৎ দরজায় মোমবাতির আলো জ্বলতে দেখা গেল। হাত মোমবাতি হাতে ভেতরে ঢুকল আয়ান। মোমের হালকা হলুদ আলোয় আয়ানের ধারালো মুখাবয়ব যেন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

"ভয় পাচ্ছ?" আয়ান ধীরপায়ে কাছে এসে দাঁড়াল।

"না... মানে, একটুখানি," নীরা নিচু গলায় বলল।

আয়ান খাটের পাশে মোমবাতিটা রাখল। তারপর নীরবতা ভেঙে নীরার ঠিক পাশে এসে বসল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব বলতে মাত্র কয়েক ইঞ্চির। নীরা আয়ানের গায়ের মৃদু সুবাস পাচ্ছিল—একটা সোঁদা মাটির আর চন্দনের মিশ্র গন্ধ।

"তোমার হাতটা দেখি?" আয়ান হাত বাড়াল।

নীরা না বলতে পারল না। সে কুণ্ঠিত হয়ে নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা আয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল। আয়ান নীরার নরম, উষ্ণ হাতটা নিজের বড়, শক্ত দুটি হাতের তালুর মধ্যে তুলে নিল। সেই ছোঁয়ায় নীরার শরীরের রক্তে যেন এক আশ্চর্য আলোড়ন সৃষ্টি হলো। সে শিরদাঁড়ায় একটা মিষ্টি শিহরণ অনুভব করল।

"আমি তো আছি, নীরা," আয়ান নীরার চোখের দিকে তাকাাল। সেই চোখে ছিল এক গভীর, অস্পষ্ট আকর্ষণ। মোমের আলোয় নীরার কাজলকালো চোখ দুটো চকচক করছিল। আয়ানের চোখ নেমে এল নীরার লালচে ঠোঁটের ওপর।

নীরা নিজের অজান্তেই আয়ানের একটু কাছে সরে এল। আয়ানের এক হাত আস্তে করে নীরার গাল স্পর্শ করল। আয়ানের হাতের বুড়ো আঙুলটা নীরার গালে মৃদু ঘষা দিল। নীরা চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল, এক গভীর আবেগে তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। দুটি হৃদয়ের স্পন্দন যেন এক হয়ে বাজছিল সেই অন্ধকারের মাঝে। মোমবাতিটার আলো তাদের ছায়াকে দেওয়ালে এক করে দিয়েছিল।

কিন্তু, ঠিক সেই মুহূর্তেই নিচে কারো চাবির শব্দ হলো। গাড়ির হর্ন বাজল। ফুফু ফিরে এসেছেন।

আয়ান হঠাৎ ঝটকা দিয়ে নিজেকে সামলে নিল। সে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক অজানা ভীতি আর অপরাধবোধের ছায়া।

"আমি... আমি আসি," দ্রুত পায়ে আয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, নীরার দিকে না তাকিয়েই।

নীরা অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল, তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল। যে মায়ার ছোঁয়া সে আয়ানের স্পর্শে পেয়েছিল, তা তো মিথ্যা হতে পারে না। তবে আয়ান কেন হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নিল?

পরদিনের সকালটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। আগের রাতের সেই তীব্র আবেগ আর ঘন হয়ে আসা স্পর্শের পর নীরা ভেবেছিল আয়ানের সাথে তার সম্পর্কের সমীকরণ এক নিমেষে বদলে গেছে। কিন্তু সকালে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সেই ভুল ভাঙল।

আয়ান ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছিল। তার পরনে ইস্ত্রি করা শার্ট, চোখে অচেনা গাম্ভীর্য। নীরা হালকা হেসে তার কাছে এসে দাঁড়াতেই আয়ান মুখ তুলে তাকাল। কিন্তু সেই চোখে কাল রাতের মোমবাতির আলোয় দেখা দেওয়া মায়া বা তীব্র আকাঙ্ক্ষার কোনো চিহ্ন ছিল না। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক হিমশীতল দূরত্ব।

"চা খাবে?" নীরা মৃদু কণ্ঠে শুধাল, তার গলায় প্রত্যাশার সুর।

আয়ান হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে কফির কাপটা রেখে দিল। "না, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর শোনো নীরা, কাল রাতে কারেন্ট ছিল না বলে আমি তোমার ঘরে ছিলাম। আশা করি বিষয়টাকে অন্যভাবে নেবে না। ওটা স্রেফ মানবিক খাতির ছিল।"

কথাটা বলেই আয়ান নিজের ল্যাপটপ ব্যাগটা তুলে নিয়ে দ্রুত হেঁটে বের হয়ে গেল। নীরা দরজার কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 'মানবিক খাতির?' যে ছোঁয়ায় রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল, যে চাহনিতে বুকের ভেতর ঝড় উঠেছিল—সেটা স্রেফ মানবিক খাতির? নীরার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। মান-অভিমানের এক ভারী মেঘ এসে জমে উঠল তার মনের আকাশে।

পরপর কয়েকদিন কেটে গেল। আয়ানের এই দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। সে খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, আর ফেরে একদম গভীর রাতে—যখন নীরা নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে বা ঘুমানোর ভান করে থাকে। কিন্তু নীরা লক্ষ্য করল, আয়ান তাকে এ এড়িয়ে চললেও তার খেয়াল রাখা বন্ধ করেনি।

নীরার প্রিয় লেবুর ঘ্রাণের সাবান, তার পছন্দের ডালিম ফল কিংবা তার প্রিয় ব্যান্ডের গান যা ইদানীং রেডিওতে বাজে—সবকিছুই বাড়িতে ঠিকঠাক চলে আসছে। অথচ আয়ান তার সামনে আসছে না। এই বৈপরীত্য নীরাকে পাগল করে তুলছিল। ভালোবাসার অধিকার না দিয়ে দূর থেকে যত্ন করার এই নির্মম খেলা সহ্য করা কঠিন।

বৃষ্টির এক মেঘলা বিকেলে নীরা সিদ্ধান্ত নিল সে এভাবে পালিয়ে থাকতে দেবে না আয়ানকে।

রাত এগারোটা। ছাদের ওপর হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। আয়ান ছাদের এক কোণে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে জ্বালানো সিগারেট—যা সে সচরাচর খায় না, কেবল তীব্র মানসিক চাপে থাকলেই হাতে নেয়। হঠাৎ ছাদের দরজায় শব্দ হলো।

আয়ান পেছন ফিরে তাকাল না, যেন সে আগে থেকেই জানত নীরা আসবে। সে হাতের সিগারেটটা সঙ্গে সঙ্গে নিভিয়ে ফেলে দূরে ছুড়ে দিল।

"এত রাতে ছাদে কী করছ, নীরা? নিচে যাও, বৃষ্টিতে ভিজলে আবার জ্বর আসবে।" আয়ানের গলাটা কড়াকড়ি করার চেষ্টা ছিল, কিন্তু সুরটা কেঁপে গেল।

নীরা এক পা এক পা করে আয়ানের একদম সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে জল আর ক্ষোভ একসাথে মিশে ছিল। "আপনার সমস্যাটা কী, বলুন তো আয়ান সাহেব?"

"আমার কোনো সমস্যা নেই।" আয়ান পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল।

নীরা ছটফটে ভঙ্গিতে সোজা আয়ানের বুকে হাত দিয়ে তাকে আটকে দিল। আয়ান থমকে দাঁড়াল। নীরার হাতের ছোঁয়া তার বুকে লাগতেই এক অদৃশ্য বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল আয়ানের শরীর জুড়ে।

"আপনি আমার চোখ দেখে কথা বলুন!" নীরার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট দাবি, "যে মানুষটা কাল পর্যন্ত আমার এত যত্ন নিত, সামান্য সর্দিতেও ছটফট করত, সে হঠাৎ আমাকে এভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে কেন? কাল রাতে যখন আমার হাত ধরেছিলেন, যখন আমার মুখের এত কাছে এসেছিলেন... তখন কি সব অভিনয় ছিল? বলুন!"

আয়ানের ভেতরের কঠিন বরফটা যেন গলতে শুরু করল, কিন্তু তার জায়গায় তীব্র যন্ত্রণা জেগে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে এক গভীর শ্বাস নিল। তারপর হঠাৎই নীরাকে এক হেঁচকা টানে আরও কাছে টেনে আনল।

নীরা চমকে উঠে আয়ানের বুকের সাথে লেপ্টে গেল। বৃষ্টির পানি তাদের দুজনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আয়ানের এক হাত চট করে নীরার কোমর পেঁচিয়ে ধরল, আর অন্য হাতটা নীরার ভেজা চুলের ভেতর আঙুল গলিয়ে দিয়ে তার মাথাটা নিজের দিকে কাত করে ধরল।

"তুমি জানতে চাও কেন এড়াচ্ছি?" আয়ানের ফিসফিসানি ধরা পড়া কণ্ঠ একদম নীরার ঠোঁটের কাছে এসে আছড়ে পড়ল। আয়ানের চোখের ভেতর এক তীব্র, ব্যাকুল রোমান্স ভেসে উঠল, যা দমন করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না।

"আমি এড়াচ্ছি কারণ আমি তোমার যত কাছাকাছি আসছি, তত নিজেকে সামলাতে পারছি না নীরা। তোমাকে স্পর্শ করলে আমার মনে হয় পৃথিবীর সব নিয়ম ভাঙি। তোমার এই চোখে তাকালে আমার ভুলে যেতে ইচ্ছে করে যে আমি কত বড় এক অপরাধী!"

আয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস নীরার গালে, ঘাড়ে এসে পড়ছিল। নীরা কোনো কথা বলতে পারল না, সে স্তব্ধ হয়ে আয়ানের চোখে চোখ রেখে রইল। সেই ব্যাকুলতা, সেই লালসা আর গভীর ভালোবাসার টানে নীরার বুক উঠানামা করছিল। আয়ানের ঠোঁট দুটো কুণ্ঠাহীনভাবে নীরার ভিজা কপালে, গাল ছুঁয়ে এক তীব্র ভালোবাসায় এসে মিলল নীরার ঘাড়ের নরম ত্বকে।

নীরা আবেশে চোখ বন্ধ করে আয়ানের শার্টের কাপড়টা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। হৃদস্পন্দন তখন কোনো বাঁধা মানছিল না। ছাদের ওই বৃষ্টিতে, রাতের নির্জনতায় দুজনের ভালোবাসা যেন এক বাঁধভাঙা নদীর মতো উথলে উঠল। আয়ান নীরার ঠোঁটের কোণে নিজের ঠোঁট আলতো করে ছুঁইয়ে দিল—এক তীব্র কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক চুমু।

কিন্তু পরক্ষণেই, ঠিক আগের রাতের মতোই, আয়ান হঠাৎ শিউরে উঠে নীরাকে ছেড়ে দিল। সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে আত্মগ্লানি।

"না... নীরা, এটা ভুল। আমি তোমার যোগ্য নই," আয়ান হাপাচ্ছিল।

"কেন ভুল? কিসের ভুল আয়ান? আপনি আমাকে ভালোবাসেন, আমি জানি!" নীরা কাঁপতে থাকা গলায় চেঁচিয়ে উঠল।

"কারণ আমার অতীত!" আয়ান হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। "আমার অতীত আমাকে তোমাকে ভালোবাসতে দেয় না। আমি যদি তোমার কাছে আসি, আমি তোমাকে ধ্বংস করে দেব নীরা। আমার জীবনে একটা ঘটনা ঘটেছিল... এমন এক কালো অতীত, যা জানলে তুমি নিজেই আমাকে ঘৃণা করবে।"

কথাটা বলেই আয়ান বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই ছাদ থেকে দ্রুত নেমে চলে গেল।

নীরা ছাদের মধ্যখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার গায়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মনের ভেতর জ্বলছে এক প্রশ্ন। কী সেই অতীত? কী এমন গোপন সত্য লুকিয়ে রেখেছে আয়ান, যা তাদের এই উদ্দাম, গভীর রোমান্সের মাঝে মস্ত এক প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে? নীরা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—যে অতীত আয়ানকে কষ্ট দিচ্ছে, সেই সত্য সে খুঁজে বের করবেই।

আয়ানের সেই আকস্মিক স্বীকারোক্তি আর ছাদ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর নীলকণ্ঠ মঞ্জিলে যেন এক ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল। নীরা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিল না। আয়ানের চোখে সে স্পষ্ট দেখেছে এক তীব্র লালসা, এক অনাবিল ভালোবাসা—অথচ সেই ভালোবাসার পথেই আটকে রয়েছে এক অদৃশ্য দেয়াল।

পরদিন সকালে আয়ান যথারীতি খুব ভোরেই অফিসে চলে যায়। নীরা সিদ্ধান্ত নেয়, ঘরের মধ্যে বসে তিল তিল করে জ্বলে-পুড়ে মরার চেয়ে সে আয়ানের ঘরের ভেতরটাই একটু ভালো করে তন্নতন্ন করে খুঁজবে। যে রহস্য তার জীবনের সুখ কেড়ে নিচ্ছে, তাকে জানতেই হবে।

আয়ানের ঘরটা সবসময় সাজানো-গোছানো থাকে। নীরা আলমারির পেছনে, টেবিলের ড্রয়ারে—সব জায়গায় খুঁজল। অবশেষে স্টাডি টেবিলের একদম নিচের একটা লক করা ড্রয়ারের চাবি সে খুঁজে পেল আয়ানেরই এক পুরোনো বইয়ের ভাঁজে। চাবি ঘুরিয়ে ড্রয়ার খুলতেই বের হয়ে এল একগুচ্ছ পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং, কয়েকটা আইনি দলিল, আর একটি মেয়েদের ঘড়ি—যার কাচ ভাঙা এবং বেল্টে শুকনো রক্তের কালো দাগ।

খবরের কাগজের কাটিংগুলোর শিরোনাম দেখে নীরার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।
"উত্তরায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: চালকের অসাবধানতায় প্রাণ গেল এক তরুণীর।"
ঘটনাটি চার বছর আগের। নীরা পত্রিকাগুলোর পাতা উল্টে পড়তে লাগল। পুরো প্রতিবেদনে যা লেখা ছিল, তার সারমর্ম একটাই—আয়ান রাতে গাড়ি চালানোর সময় এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ে। গাড়িতে তার সাথে ছিল তার তৎকালীন বাগদত্তা, মেহজাবীন। দুর্ঘটনায় গাড়ি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মেহজাবীন ঘটনাস্থলেই মারা যায়, আর আয়ান অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। কিন্তু মূল আঘাত ছিল অন্য জায়গায়—আদালতের নথিতে লেখা, মেহজাবীনের পরিবার আয়ানের বিরুদ্ধে মারাত্মক অবহেলা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলা করে। আয়ান যদিও প্রমাণের অভাবে জামিন পায়, কিন্তু নিজের মনের আদালতে সে নিজেকে মেহজাবীনের খুনি হিসেবেই ধরে নেয়।

পত্রিকাগুলো হাতে ধরে নীরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল স্টাডি টেবিলের মেঝেতে। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। আয়ান নিজেকে অপরাধী মনে করে! সে মনে করে, সে সুখী হওয়ার বা কাউকে ভালোবাসার যোগ্য নয়। প্রতিবার নীরার কাছাকাছি এলে তার মেহজাবীনের কথা মনে পড়ে, নিজের প্রতি অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খায়!

সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে এক বিকট কালবৈশাখী ঝড় উঠল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, আর আকাশে বিজলির তীব্র চমক। রাত প্রায় ১০টা, আয়ান তখনও ফেরেনি। নীরার মনে এক অজানা শঙ্কা দোলা দিতে লাগল। আয়ানের ওপর এই বৃষ্টির রাতে গাড়ি চালানোর প্রভাব কী হতে পারে, ভেবেই তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল।

রাত সাভে দশটা নাগাদ ড্রয়িংরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।

নীরা ছুটে গেল নিচে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে আয়ান। সম্পূর্ণ ভিজা, জামাকাপড় কাদা ও জলে একাকার। তার চোখ দুটো লাল, আর হাঁটার ছন্দ এলোমেলো। আয়ান মদ্যপ অবস্থায় ছিল না, কিন্তু মানসিক তীব্র যন্ত্রণায় সে যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।

"আয়ান!" নীরা ছুটে গিয়ে তার হাত ধরল।

আয়ান ঘাড় তুলে নীরার দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক অপার শূন্যতা আর সীমাহীন যন্ত্রণা। নীরাকে দেখেই আয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দু-পা এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে নীরার সামনে মেঝেতে বসে পড়ল, আর দুই হাত দিয়ে নীরার কোমর জড়িয়ে ধরে তার পেটে মুখ লুকাল।

একজন শক্ত, গম্ভীর পুরুষের এই অসংবৃত আত্মসমর্পণ দেখে নীরার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।

"নীরা... আমি অপরাধী," আয়ানের ধরা গলায় ফিসফিসানি ভেসে এল, "আমি মেহজাবীনকে বাঁচাতে পারিনি। আমার ভুল ছিল নীরা... আমি গাড়ি সামলাতে পারিনি। আমি কেমন করে তোমাকে ভালোবাসব? আমি যদি তোমাকেও হারিয়ে ফেলি? আমি তো কাউকে খুশি রাখার যোগ্য নই..."

নীরা আয়ানের ভেজা চুলে নিজের আঙুল চালিয়ে দিল। তারপর নিজেও নিচে হাঁটু গেড়ে বসে আয়ানের মুখটা তুলে ধরল নিজের দুই হাতের তালুতে। আয়ানের গালে জমে থাকা বৃষ্টির জল আর অশ্রু একসাথে মিশে গেছে।

"আপনি অপরাধী নন, আয়ান," নীরা আয়ানের একদম কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, চোখের পানি ধরে রেখেই। "ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল। চার বছর ধরে আপনি নিজের জীবনটাকে শেষ করছেন এই মিথ্যে অপরাধবোধ বয়ে নিয়ে? মেহজাবীন চলে গেছে, কিন্তু আপনি তো বেঁচে আছেন! আর আপনার সেই বেঁচে থাকা জীবনের ভেতর আমি ঢুকতে চাই।"

আয়ান নীরার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। নীরা জানে! সে সব জেনে গেছে!

"তুমি... তুমি জেনেছ?" আয়ানের গলায় অবিশ্বাস।

"হ্যাঁ, আমি জেনেছি," নীরা আয়ানের ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট আনল। তাদের নিঃশ্বাসের উত্তাপ পরস্পরের মুখে আছড়ে পড়ছিল। "আর জানার পর আপনাকে আমি আরও বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছি আয়ান। আপনি পালিয়ে যেতে পারবেন না।"

আয়ানের সব প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তার অক্ষিগোলকে তখন এক তৃষ্ণার্ত ভালোবাসা আর তীব্র কামনার উন্মাদনা। সে এক হেঁচকা টানে নীরাকে কোলের মধ্যে তুলে নিল। নীরার শাড়ির আঁচল মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

আয়ান নীরাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে সোজা তার শোবার ঘরে নিয়ে এল। বিছানায় নীরাকে শুইয়ে দিয়ে সে নীরার ওপর ঝুঁকে পড়ল। কামরায় মোমবাতির অস্পষ্ট আলো আর বাইরের বিজলির চমক মিলে এক মায়াবী রূপকথা তৈরি করছিল।

আয়ানের ভেজা ঠোঁট দুটো এবার কোন দ্বিধা ছাড়াই নীরার ঘাড়ে, কলারবোনে তীব্র ভালোবাসায় চেপে বসল। নীরা শিউরে উঠে আয়ানের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিল। সেই ছোঁয়া স্রেফ কোনো সান্ত্বনা ছিল না; ওটা ছিল দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার মিলন। আয়ানের বুড়ো আঙুল ধীরে ধীরে নীরার কামিজের ফিতা আর পেটের চামড়া ছুঁয়ে যেতে লাগল। প্রতিটা স্পর্শে নীরার শরীর মোমের মতো গলে যাচ্ছিল।

আয়ান নীরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডোবাল। এক দীর্ঘ, গভীর, ব্যাকুল চুম্বন—যার মধ্যে মিশে ছিল বিগত কয়েকদিনের সব অভিমান, আকুলতা আর উন্মাদ রোমান্স। নীরা আয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেকে সঁপে দিল সেই অতল ভালোবাসার সাগরে। তাদের শ্বাসের দাপটে আর কামরার ভেতরে উষ্ণতায় বাইরের বৃষ্টি যেন থমকে গেল।

অনেকটা সময় পর, যখন ঘরের মোমবাতিটা নিভে এল, আয়ান নীরার বুকের ওপর মাথা রেখে শান্ত হয়ে শুয়ে রইল। নীরার হাত তখনও আলতো করে বুলিয়ে যাচ্ছিল আয়ানের চুলে। নীরা ভাবল, অবশেষে আয়ান বোধহয় তার অতীতকে পেছনে ফেলে এসে তার বাহুডোরে আশ্রয় নিল।

কিন্তু নীরা জানত না, ভোর হতেই আয়ানের এই অপরাধবোধ আবার নতুন কোনো রূপ নিয়ে তাদের মাঝে এসে দাঁড়াবে। ভালোবাসা কি আসলেই এত সহজে পুরোনো পাপের ছায়াকে মুছে দিতে পারে?

রাতের সেই ব্যাকুল কালবৈশাখী আর উন্মাদ ভালোবাসার রেশ কাটতেই ভোরের প্রথম আলো নীলকণ্ঠ মঞ্জিলের জানালায় এসে পড়ল। ঘরের বাতাস তখনও কাল রাতের সেই তীব্র রোমান্স আর সোঁদা সুবাসে ভারী হয়ে আছে।

নীরা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। তার গায়ে আয়ানের ভারী একটা শার্ট জড়ানো, আর তার কোমর জড়িয়ে ধরে আয়ান তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আয়ানের শান্ত, ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে নীরার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক অপূর্ব জয়ের হাসি। চার বছর ধরে নিজের চারপাশে আয়ান যে কঠিন দেয়াল তুলে রেখেছিল, কাল রাতে সেই দেয়াল নীরা নিজের ভালোবাসা দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

নীরা আলতো করে আয়ানের চুলে হাত বুলাল। তার স্পর্শে আয়ানের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। আয়ান ধীরভেঙে চোখ খুলল।

দুজনের চোখাচোখি হতে এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। নীরা ভাবল, আয়ান তাকে দেখে হাসবে, হয়তো কালকের মতো আবারও তাকে বুকের গভীরে টেনে নেবে। কিন্তু আয়ানের চোখে কাল রাতের সেই তীব্র তৃষ্ণা বা ব্যাকুলতার জায়গায় ফুটে উঠল এক নিদারুণ আত্মগ্লানি আর শূন্যতা।

আয়ান এক ঝটকায় সরিয়ে নিল তার হাত। সে সোজা হয়ে বিছানায় বসে পড়ল, তার চোহারা নিমেষেই ফ্যাকাশে আর কঠিন হয়ে গেল।

"আয়ান?" নীরা মৃদু কণ্ঠে ডাকল, তার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।

আয়ান খাটের এক পাশে পা নামিয়ে বসে রইল, নীরার দিকে না তাকিয়েই। তার গলার আওয়াজ এতটাই যান্ত্রিক আর বরফের মতো ঠান্ডা শোনাল যে নীরা শিউরে উঠল।

"কাল রাতে... যা হয়েছে, তা একটা মস্ত বড় ভুল ছিল নীরা," আয়ানের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু সে নিজেকে কঠোর রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। "আমি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এই ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।"

নীরা যেন আকাশ থেকে পড়ল। "ভুল? আয়ান, আপনি আমার সাথে কাল রাতে যা ভাগ করে নিয়েছেন, ওটা ভালোবাসা ছিল! আপনি মেহজাবীনের স্মৃতি বয়ে নিয়ে নিজেকে শাস্তি দিচ্ছেন, কিন্তু কাল রাতে আপনি আমাকে সত্যি ভালোবেসেছিলেন!"

আয়ান হঠাৎ লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখে রক্তের মতো লাল ছায়া। "ভালোবাসা?" আয়ান চিৎকার করে উঠল, যার প্রতিধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো পুরো ঘরে। "আমি নিজেকে শাস্তি দিচ্ছি কারণ আমি শাস্তিরই যোগ্য! কাল রাতে আমি যখন তোমাকে স্পর্শ করছিলাম, যখন তোমাকে চুমু খাচ্ছিলাম... এক মুহূর্তের জন্য আমি মেহজাবীনকে ভুলে গিয়েছিলাম! তুমি বোঝো এর মানে কী? এর মানে আমি একজন বিশ্বাসঘাতক! আমি যাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তাকে শেষ করে দিয়ে আজ অন্য একটা মেয়ের শরীরে নিজের সুখ খুঁজছি!"

আয়ানের এই কটু আর নিষ্ঠুর শব্দগুলো নীরার বুকে বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল। 'অন্য একটা মেয়ের শরীরে নিজের সুখ'—কথাটা নীরার গাল বেয়ে টপটপ করে জল ঝরিয়ে দিল।

নীরা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে আয়ানের শার্টের হাতা শক্ত করে চেপে ধরে আয়ানের একদম সামনাসামনি এসে দাঁড়াল। "আপনি আমাকে স্রেফ একটা 'মেয়ে' বলছেন? কাল রাতে যে মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে আপনি কেঁদেছিলেন, যার ঠোঁটে আপনার ঠোঁট মিশেছিল, সে আপনার কাছে শুধুই নিজের সুখ খোঁজার উপায় ছিল?"

আয়ান নিজের মুখ ফিরিয়ে নিল। সে জানে সে মিথ্যে বলছে, সে জানে নীরাকে আঘাত দেওয়াটা তার নিজেকে আঘাত দেওয়ার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু আয়ানের ভেতরের সেই বিষাক্ত অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। মেহজাবীনের চলে যাওয়া আর তার পরিবারের সেই মারাত্মক অভিযোগ আয়ানের আত্মবিশ্বাসের শেষ বিন্দুটুকুও শেষ করে দিয়েছে। সে নিজেকে কোনো আনন্দের যোগ্য মনে করতে পারে না।

"তুমি আজই তোমার নিজের জিনিসপত্র গুটিয়ে নাও নীরা," আয়ান নির্দয়ভাবে বলল, "ফুফুকে আমি বলে দেব। তুমি ঢাকার অন্য কোনো হোস্টেল বা তোমার বান্ধবীর বাসায় উঠে যাও। একই ছাদের নিচে থাকলে এই ভুল আবারও হবে। আর আমি তোমাকেও আমার এই নরকের মধ্যে টানতে চাই না।"

"আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন?" নীরার গলা বুজে এল।

"আমি তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি," আয়ান গাম্ভীর্যের চাদর মুড়ি দিয়ে নিজের শার্টটা পিন করে ঘরের বাইরে পা বাড়াল।

দরজায় পৌঁছাতেই নীরা পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, "আপনি মুক্ত করছেন না আয়ান, আপনি একজন কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাচ্ছেন! আপনি আপনার অতীতকে ভালোবাসেন না, আপনি আপনার এই অপরাধবোধের আঁধারকে বেশি ভালোবাসেন। কিন্তু মনে রাখবেন আয়ান সাহেব, নীরা কারো দয়ার পাত্রী নয়। আপনি যদি চান আমি চলে যাই, তবে আমি চলেই যাব। কিন্তু আপনার এই পাথর হৃদয় যেদিন আমার ভালোবাসার জন্য হাহাকার করবে, সেদিন আপনি আমাকে আর পাবেন না!"

কথাগুলো শেষ হতেই নীরা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। আয়ান দরজায় এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তার ভেতরের প্রতিটা শিরা-উপশিরা চিৎকার করে বলছিল পেছনে ফিরে নীরাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে, তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলতে—'তুমি যেও না, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।' কিন্তু আয়ানের পায়ের শিকল তাকে আটকে রাখল। আয়ান না তাকিয়েই ধীরপায়ে হেঁটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দুপুরের মধ্যে নীরা তার ব্যাগ গুছিয়ে ফেলল। যে ঘরটায় এতগুলো দিন তার চঞ্চলতায় মুখরিত ছিল, তা এক নিমেষে খাঁ খাঁ করতে লাগল। ফুফু অনেক কান্নাকাটি করলেন, কিন্তু নীরা তার সিদ্ধান্তে অটল। সে একটা ট্যাক্সি ডেকে নীলকণ্ঠ মঞ্জিল ছেড়ে চলে গেল তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়া মায়রা বেগমের ফ্ল্যাটে।

সন্ধ্যায় আয়ান যখন ফাঁকা বাড়িটায় পা রাখল, সারা বাড়িটা তার কাছে একটা কবরস্থানের মতো মনে হলো। নীরার ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে তার ব্যবহৃত পারফিউমের হালকা মিষ্টি সুবাস এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর পড়ে আছে নীরার একটা ভাঙা কাচের চুড়ি।

আয়ান ধীরে ধীরে নীরার বিছানায় গিয়ে বসল। সেখানে এখনও নীরার শরীরের উত্তাপের স্মৃতি যেন জড়িয়ে আছে। আয়ান নীরার সেই ভাঙা চুড়িটা হাতে তুলে নিল। তার শক্ত বরফের মতো মানসিক বাঁধটা এবার এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল।

অন্ধকার ঘরে একাকী আয়ান হাত দুটো মুখে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। যে রোমান্স, যে ছোঁয়া সে কাল রাতে পেয়েছে, তা কোনো ভুল ছিল না—ওটাই ছিল তার জীবনের একমাত্র খাঁটি সত্য। কিন্তু নিজের ভেতরের অহংকার আর মিথ্যে পাপাচারের ভয়ে সে তার জীবনের আসল আলোকেই নিভিয়ে দিয়েছে।

এদিকে, নীরার জীবনে সেই রাতেই এক নতুন মোড় এল। ট্যাক্সি থেকে নেমে মায়রা বেগমের বাসায় ওঠার পরই নীরার মাথা ঘুরে উঠল। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক ক্লান্তি আর বমি ভাব।

নীরা কি স্রেফ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে, নাকি কাল রাতের সেই তীব্র উন্মাদনার স্মৃতি তাদের দুজনকে এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে দিয়েছে—যার ফলাফল এখনও আয়ানের অগোচরে রয়ে গেছে?

নীলকণ্ঠ মঞ্জিল ছেড়ে আসার পর তিনটা দিন কেটে গেছে। নীরা এখন মায়রা বেগমের শান্ত, একাকী ফ্ল্যাটটির একটি ছোট ঘরে অবস্থান করছে। ঘরের জানালার পাশে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ—বাতাস আসলেই লাল পাপড়িগুলো বারান্দায় এসে পড়ে। কিন্তু নীরার মনজুড়ে তখন শুধুই এক ধূসর মরুভূমি।

শারীরিক ক্লান্তি আর মনের প্রবল ঝড় নীরাকে একদম নিস্তেজ করে ফেলেছিল। এর ওপর যোগ হয়েছে এক নতুন শারীরিক উপসর্গ—ঘন ঘন বমি ভাব আর মাথা ঘোরা। সকালে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েও সে কয়েকবার দেয়াল ধরে সামলে নিয়েছে নিজেকে।

নীরার এই আচমকা শারীরিক পরিবর্তন মায়রা বেগমের চোখ এড়ায়নি। তিনি অভিজ্ঞ মহিলা। তিনি নীরাকে নিয়ে সোজা শহরের এক নামজাদা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেন।

হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর অ্যান্টিসেপ্টিকের তীব্র গন্ধের মাঝে বসে নীরা যখন ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা করছিল, তার হৃদপিণ্ড যেন ছাতি ফেটে বের হয়ে আসতে চাইছিল।

ডাক্তার হাসিমুখে নীরার রিপোর্টের দিকে তাকালেন। তারপর নীরার দিকে তাকিয়ে খুব সাধারণ কিন্তু এক ঝটকা দেওয়া গলায় বললেন, "অভিনন্দন নীরা দেবী, আপনি সন্তানসম্ভবা। সাড়ে তিন সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা আপনি।"

ডাক্তারের শব্দগুলো যেন নীরার কানে ঘণ্টার মতো বাজতে লাগল। 'অন্তঃসত্ত্বা?' নীরা স্তব্ধ হয়ে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল। সেই ঝড়ের রাতে, মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয় আয়ানের সাথে তার যে তীব্র, বাঁধভাঙা মিলন ঘটেছিল—তা কেবল দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার অভিসার ছিল না, তা ছিল এক নতুন প্রাণের সৃষ্টি!

একদিকে চরম বিস্ময় আর আনান্দ, অন্যদিকে এক গহীন শঙ্কা নীরার বুক চিরে বের হয়ে এল। এই সন্তান আয়ানের। যে মানুষটি তাকে 'নিজের ভুল' বলে দূরে ঠেলে দিয়েছে, যে মানুষটা তাকে স্রেফ নিজের শারীরিক আবেগ মেটানোর মাধ্যম বলে অপমান করেছিল, সেই মানুষের রক্ত এখন নীরার শরীরে বড় হচ্ছে!

"আপনি কি আপনার স্বামীর সাথে কথা বলতে চান?" ডাক্তার সাধারণভাবেই শুধালেন।

নীরা এক মুহূর্ত থমকে রইল। তারপর শক্ত গলায় উত্তর দিল, "না। এই সন্তান শুধুই আমার।"

নীরা হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রিকশায় চড়ে বসল। বাতাসে তার চুল উড়ছিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—আয়ান যদি ভালোবাসাকে মানতে না পারে, তবে এই সন্তানের ওপর তার কোনো অধিকার থাকবে না। নীরা একা হাতেই নিজের সন্তানকে বড় করবে। আয়ানের কাছে গিয়ে আর কোনোদিন দয়া বা ভালোবাসার ভিক্ষা চাইবে না।

এদিকে নীলকণ্ঠ মঞ্জিলে আয়ানের জীবনটা নরক হয়ে উঠেছিল। নীরা চলে যাওয়ার পর থেকে সে প্রায় না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে। অফিসের কাজে তার কোনো মন নেই। বাড়ি ফিরলেই মনে হয় প্রতিটা ইটে নীরার হাসির শব্দ, নীরার পায়ের নুপুরের আওয়াজ আর সেই ঝড়ের রাতে নীরার কাঁপা কাঁপা গলার ফিসফিসানি—'আমি আপনাকে ভালোবাসি আয়ান।'

আয়ান বুঝেছে, নিজেকে অপরাধী প্রমাণের চক্করে পড়ে সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রত্নটাকে হারিয়ে ফেলেছে। মেহজাবীনের স্মৃতি তাকে যতটা না কষ্ট দিত, নীরার অনুপস্থিতি তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিষাক্ত তীরের মতো তার বুক চিরে দিচ্ছে।

এক সন্ধ্যায় আয়ান আর সহ্য করতে না পেরে নীরার বন্ধু অনিকের কাছে গেল। অনিক নীরা কোথায় আছে জানত, কিন্তু সে আয়ানকে তীব্র ধিক্কার জানাল।

"তুমি একটা স্বার্থপর মানুষ, আয়ান!" অনিক গর্জে উঠল। "যে মেয়েটা তোমার ভেতরের সব অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিল, তাকে তুমি নিজের মিথ্যে অহংকারের জন্য বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে? নীরা তোমাকে ভালোবাসত! আর তুমি তাকে দিয়েছ স্রেফ অপমান!"

আয়ান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে অঝোর ধারায় জল নামল। "আমি ভুল করেছি অনিক... আমি অন্ধ ছিলাম। আমি নীরাকে ছাড়া বাঁচতে পারছি না। আমাকে বলো সে কোথায়? আমি তার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইব, তাকে ফিরিয়ে আনব!"

অনিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে মায়রা বেগমের বাসার ঠিকানাটা দিল। "যাও, কিন্তু মনে রেখো—নীরা আর আগের মতো চঞ্চল নেই। তাকে তুমি গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছ।"

আয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের গাড়িটা তীব্র গতিতে ছুটিয়ে দিল মায়রা বেগমের ফ্ল্যাটের দিকে। তখন বাইরে ঝুম বৃষ্টি নামছিল—ঠিক সেই রাতের মতোই।

মায়রা বেগমের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীরা বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার তীব্র শব্দ। মায়রা বেগম দরজা খুলতেই আয়ান ঝড়ো হাওয়ার মতো ভেতরে ঢুকে পড়ল। আয়ানকে দেখে নীরা যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল।

আয়ানের পরনে কোট নেই, শার্ট ভেজা, চোখের নিচে গভীর কালি, আর মুখজুড়ে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি। মানুষটার হাল দেখে নীরার মনের এক কোণে মায়া জেগে উঠলেও সে নিমেষেই নিজেকে কঠিন করে ফেলল।

"তুমি এখানে কেন এসেছ, আয়ান সাহেব?" নীরা বরফশীতল কণ্ঠে বলল।

আয়ান কোনো কথা না বলে সোজা নীরার সামনে এসে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। একজন অহংকারী, গম্ভীর পুরুষের এই পতন দেখে মায়রা বেগমও অবাক হয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।

আয়ান হাত দুটো বাড়িয়ে নীরার দুটি পা জড়িয়ে ধরল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও নীরা... প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো," আয়ানের গলা কান্নায় বুজে আসছিল। "আমি কাপুরুষ, আমি অন্ধ ছিলাম। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি বুঝেছি তুমি ছাড়া আমার এই জীবনে আর কোনো অর্থ নেই। মেহজাবীন আমার অতীত ছিল, কিন্তু তুমি... তুমি আমার বর্তমান, আমার ভবিষ্যৎ, আমার শ্বাসপ্রশ্বাস! তুমি ছাড়া আমি স্রেফ একটা জ্যান্ত লাশ।"

নীরা নিচের দিকে তাকাল। আয়ানের ভেজা চুলে নিজের হাত ছোঁয়ানোর জন্য তার মন আঁকুপাঁকু করছিল, কিন্তু সে নিজের পা ছাড়িয়ে নিল।

"দেরি হয়ে গেছে আয়ান," নীরা মুখ ফিরিয়ে বলল। "যে ভালোবাসাকে আপনি 'ভুল' বলেছেন, যে স্পর্শকে আপনি স্রেফ নিজের 'সুখ খোঁজার উপায়' বলেছিলেন, সেই সম্পর্কের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আপনি দয়া করে চলে যান।"

"আমি যাব না!" আয়ান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক হেঁচকা টানে নীরাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে আনল।

নীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আয়ানের বুকের মধ্যে আটকে গেল। আয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস নীরার ঘাড়ে এসে পড়ছিল। আয়ানের হাত দুটো নীরার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেছিল, ঠিক যেমনটা সেই ব্যাকুল রাতে ধরেছিল।

"তুমি আমাকে ঘৃণা করো, আমাকে শাস্তি দাও নীরা, কিন্তু আমার থেকে দূরে যেও না," আয়ান নীরা গালে, কপালে আর ঠোঁটের কোণে পাগলের মতো অনুতাপের চুমু আঁকতে লাগল। "আমি তোমাকে আর কোনো দিন ছাড়ব না। আমার বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলছে, তা শুধুই তোমার ভালোবাসার জন্য। আমাকে ফিরিয়ে নিও না, কিন্তু আমাকে তোমার গোলাম করে রেখে দাও!"

আয়ানের এই অদম্য ভালোবাসা আর আকুলতার সামনে নীরা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। আয়ানের সোঁদা সুবাস আর তার শরীরের উত্তাপ নীরার ভেতরের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমানকে গলিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই নীরার মাথাটা আবার চক্কর দিয়ে উঠল।

তীব্র মাথা ঘোরায় নীরা আয়ানের বুকের ওপর ঢলে পড়ল।

"নীরা! নীরা কী হয়েছে তোমার?" আয়ান আতঙ্কে নীরাকে পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিল।

নীরা আধা-চেতন অবস্থায় আয়ানের জামার কলারটা শক্ত করে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলল, "আমাকে ছেড়ে দাও আয়ান... তোমার অপরাধবোধ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু আমাদের ভুলের মাশুল এখন অন্য কেউ বহন করছে..."

আয়ান চমকে উঠল। "মানে? কিসের কথা বলছ তুমি নীরা?"

নীরার ব্যাগ থেকে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া প্রেসক্রিপশন আর মেডিকেল রিপোর্টটি মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। আয়ান এক হাতে নীরাকে ধরে রেখে অন্য হাতে মেঝের সেই কাগজটি তুলে নিল। রিপোর্টের প্রতিটি শব্দ পড়ার সাথে সাথে আয়ানের চোখের কোণ দিয়ে ফের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল—তবে এবার যন্ত্রণার নয়, এক পরম অলৌকিক অনুভূতির।

নীরা গর্ভবতী। সে তাদের সন্তানের মা হতে চলেছে!

মেঝেতে পড়ে থাকা প্রেসক্রিপশনের শব্দগুলো পড়ার পর আয়ানের মাথার ভেতরে যেন এক একসাথে হাজারটা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। 'অন্তঃসত্ত্বা'।

আয়ান হাত থেকে কাগজটা ফেলে দিল না, বরং সেটা বুকের সাথে চেপে ধরল। তার চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। কোল ঢলে পড়া নীরাকে সে আরও শক্ত, আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের সাথে পেঁচিয়ে ধরল। যে মিলনকে সে নিজের মনের বিষাক্ত অপরাধবোধের কারণে 'ভুল' আখ্যা দিয়েছিল, বিধাতা সেই মিলনের বুক থেকেই এক নতুন জীবনের সৃষ্টি করেছেন!

আয়ান আস্তে করে নীরাকে সোফায় শুইয়ে দিল। নীরা তখন তীব্র মানসিক চাপ আর দুর্বলতায় চোখ বুজে হাঁপাচ্ছে। আয়ান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাঁটু গেড়ে নীরার সামনে বসল। তার কাঁপতে থাকা হাত দুটো সোজা গিয়ে থামল নীরার পেটের ওপর।

আয়ান মাথা নুইয়ে নীরার পেটে নিজের মুখ লুকাল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস নীরার পাতলা শাড়ির ওপর দিয়ে ত্বকে এসে আছড়ে পড়ল।

"নীরা..." আয়ানের গলা কান্নায় একবারে বুজে এসেছিল। সে নীরার পেটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াাল—এক অপরিসীম শ্রদ্ধা, অনুশোচনা আর তীব্র ভালোবাসার চুমু। "আমার সন্তান? আমাদের ভালোবাসা... সত্যি হয়ে বাঁচবে?"

নীরা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আয়ানকে তার পেটে মুখ রেখে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে নীরার পাষাণ হয়ে যাওয়া মনটাও যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নীরা ঠান্ডা গলায় বলল, "হাত সরান আয়ান সাহেব। এই সন্তানের ওপর আপনার কোনো অধিকার নেই। যে সম্পর্ককে আপনি 'পাপ' বা 'ভুল' মনে করেন, সেই সম্পর্কের ফলকে ভালোবাসার নাটক করবেন না।"

আয়ান মুখ তুলল। তার চোখে এখন আর কোনো অপরাধবোধের ছায়া নেই, মেহজাবীনের স্মৃতির কোনো কুয়াশা নেই—সেখানে জ্বলজ্বল করছে শুধুই নীরা আর তাদের অনাগত সন্তানের প্রতি এক অনমনীয়, উন্মাদ অধিকারবোধ।

আয়ান এক হেঁচকা টানে নীরাকে সোফা থেকে তুলে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। নীরা সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আয়ান নিজের দুই বাহুর শক্ত বাঁধনে নীরাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।

"অধিকার নেই?" আয়ানের কণ্ঠস্বর নিচু কিন্তু ভীষণ গভীর শোনাল। সে নীরার একদম কাছে মুখ নিয়ে এল, তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র এক সুতোর। "আমার শরীরে যতক্ষণ রক্ত বইছে, ততক্ষণ তোমার আর এই সন্তানের ওপর শুধুই আমার অধিকার, নীরা। তুমি আমাকে ঘৃণা করো, আমাকে লাথি মেরে ফেলে দাও, কিন্তু এই সত্যিটা পাল্টাতে পারবে না যে তোমার ভেতরে আমার অংশ বড় হচ্ছে।"

আয়ানের সেই তপ্ত নিঃশ্বাস নীরার মুখে, গালে এসে পড়ছিল। নীরা আয়ানের বুকের ওপর ধাক্কা দিয়ে বলল, "ছাড়ুন আমাকে! আপনি স্বার্থপর! যখন ইচ্ছা কাছে টানবেন, আর যখন ইচ্ছা তাড়িয়ে দেবেন—আমি আপনার হাতের খেলনা নই!"

"আমি স্বার্থপর!" আয়ান একঝটকায় নীরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

ওটা কোনো শান্ত চুমু ছিল না; ওটা ছিল বিগত কয়েকদিনের বিরহ, আর্তি আর অধিকার আদায়ের এক তীব্র, বাঁধভাঙা আকুলতা। নীরা প্রথমে ছটফট করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আয়ানের উন্মাদ ভালোবাসার টানে তার সব প্রতিরোধ ভেসে গেল। নীরা নিজের অজান্তেই আয়ানের কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। আয়ানের হাতের আঙুল নীরার কোমর চিরে পিঠের ওপর তীব্র ভালোবাসায় চেপে বসল।

দীর্ঘক্ষণ পর আয়ান যখন ঠোঁট সরাল, দুজনেরই শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছিল। নীরার গাল দুটো লজ্জায় আর আবেগে লাল হয়ে উঠেছিল, চোখে জলের সাথে মিশে ছিল এক অপূর্ব মাদকতা।

আয়ান নীরার কপালে কপাল ঠেকাল। "আমি জানি আমি তোমাকে আঘাত দিয়েছি নীরা। আমার ভেতরের অতীত আমাকে অন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু কাল রাতে তুমি চলে যাওয়ার পর আমি বুঝেছি, মেহজাবীনকে হারানোর আফসোসের চেয়ে তোমাকে হারানোর ভয় হাজার গুণ বেশি মারাত্মক। আমি যদি মেহজাবীনকে বাঁচাইতে নাও পেরে থাকি, তোমাকে আর আমাদের সন্তানকে বুক দিয়ে রক্ষা করব। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাস এখন থেকে শুধুই তোমাদের।"

নীরা চোখ বন্ধ করে এক গভীর শ্বাস নিল। সে আয়ানের বুকে নিজের কান রাখল। আয়ানের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা পাগলের মতো বাজছিল—ঠিক যেমনটা সেই ঝড়ের রাতে বাজছিল।

"আপনি সত্যিই আমাদের ছেড়ে যাবেন না তো?" নীরা অভিমানী গলায় ফিসফিস করে উঠল।

"মরতে পারি, কিন্তু তোদের ছেড়ে কোথাও যাব না," আয়ান নীরাকে পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিল।

"কী করছেন? নামান আমাকে!" নীরা চমকে উঠল।

"বাড়িতে চল। নীলকণ্ঠ মঞ্জিল তোমার আর আমাদের বাচ্চার অপেক্ষায় খাঁ খাঁ করছে। আজ আর কোনো অজুহাত শুনব না," আয়ান একবুক হাসি নিয়ে নীরাকে কোলে করেই দরজার দিকে পা বাড়াল।

মায়রা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। তিনি মুখে হালকা তৃপ্তির হাসি নিয়ে সরে দাঁড়ালেন।

বৃষ্টির রাজপথে আয়ানের গাড়ি আবার নীলকণ্ঠ মঞ্জিলের দিকে ছুটল। কিন্তু এবার গাড়ির পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আয়ান এক হাতে স্টিয়ারিং ধরেছে, আর অন্য হাত দিয়ে নীরার হাতটা নিজের শক্ত তালুর মধ্যে পেঁচিয়ে ধরে রেখে বুকের কাছে চেপে রেখেছে। নীরা আড়চোখে আয়ানের দিকে তাকাল—সেই গম্ভীর, বরফের মতো ঠান্ডা মানুষটার চোখে আজ এক অপূর্ব রোমান্স আর পিতৃত্বের আলো জ্বলজ্বল করছে।

বাড়িতে পৌঁছানোর পর আয়ান নীরাকে নিজের হাত ধরে ঘরে নিয়ে এল। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তাদের স্বাগত জানাতে সেখানে একজন অচেনা প্রবীণ ব্যক্তি বসে ছিলেন—মেহজাবীনের বাবা, অর্থাৎ আয়ানের প্রাক্তন হবু শ্বশুর!

তাকে দেখে আয়ানের মুখ মুহূর্তের মধ্যে আবার থমকে গেল।

মেহজাবীনের বাবা দাঁড়িয়ে উঠলেন। তার হাতে একটি পুরোনো ফাইল। তিনি আয়ান ও নীরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "আয়ান, চার বছর ধরে যে মিথ্যেটা তুমি বয়ে বেড়াচ্ছ, আজ তার শেষ টানতে এসেছি। মেহজাবীনের মৃত্যুর পেছনের আসল সত্যটা তোমার জানা দরকার..."

আয়ান আর নীরা একে অপরের দিকে তাকাল। যে অতীতকে আয়ান এতকাল নিজের পাপ মনে করে এসছে, সেখানে কি তবে লুকিয়ে আছে কোনো বড় ষড়যন্ত্র?

মেহজাবীনের বাবার হাতের ফাইলটার দিকে তাকিয়ে আয়ান থমকে দাঁড়াল। চার বছর ধরে যে মানুষটা আয়ানকে নিজের মেয়ের খুনি ভেবে অভিশাপ দিয়ে এসেছে, আজ তার কণ্ঠে কোনো ক্ষোভ নেই, আছে এক গভীর অনুশোচনা।

"চাচাজান? আপনি এখানে?" আয়ান বিস্ময় সামলে উঠতে না পেরে বলল।

মেহজাবীনের বাবা, রফিক সাহেব, এক গভীর শ্বাস ফেলে নীরার দিকে তাকালেন। নীরার হাতটা তখনও আয়ানের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা। রফিক সাহেব এগিয়ে এসে ফাইলটা আয়ানের হাতে তুলে দিলেন।

"আয়ান, আমি আজ তোমাকে ক্ষমা চাইতে এসেছি," রফিক সাহেবের গলা কেঁপে উঠল। "চার বছর আগে আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মেহজাবীনকে হারানোর শোকে আমি তোমাকেই দায়ী করেছিলাম। কিন্তু কয়েকদিন আগে মেহজাবীনের ব্যবহৃত পুরোনো ডায়েরি আর সেই রাতের গাড়ির মেকানিকের শেষ স্বীকারোক্তি আমার হাতে আসে।"

আয়ান আর নীরা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে ফাইলটার পাতা ওল্টাতে লাগল। সেখানে পরিষ্কার ভাষায় ঢাকা মেডিকেল ও পুলিশের ফরেনসিক রিপোর্ট সংযুক্ত করা ছিল।

রফিক সাহেব বলতে লাগলেন, "সেই বৃষ্টির রাতে দুর্ঘটনা তোমার ভুল চালনার জন্য হয়নি, আয়ান। মেহজাবীন দীর্ঘদিন ধরে চরম মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিল। সে তোমার সাথে এনগেজমেন্ট ভাঙতে চেয়েছিল কারণ সে অন্য কাউকে ভালোবাসত, কিন্তু পরিবারের চাপে তোমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছিল। সেই রাতে চলন্ত গাড়িতে মেহজাবীন নিজেই স্টিয়ারিং ধরে এক মারাত্মক টানাটানি শুরু করেছিল—সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল! গাড়ির ব্র্রেকও আগে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তুমি তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলে, নিজের জীবন বাজি রেখেছিলে।"

কথাগুলো শুনে আয়ানের হাত থেকে ফাইলটা হাত গলে নিচে পড়ে গেল। চারটে বছর! চারটে দীর্ঘ বছর সে নিজেকে অপরাধী ভেবে নিজের জীবনকে নরক বানিয়েছে, নিজের ভালোবাসাকে লাথি মেরে দূরে ঠেলে দিয়েছে—সবই একটা মিথ্যে অপরাধবোধের কারণে! সে মেহজাবীনের খুনি ছিল না, সে ছিল স্রেফ এক নির্মম পরিস্থিতির শিকার।

রফিক সাহেব আয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। "তুমি কোনো অপরাধ করোনি বাবা। আমি মিথ্যে অহংকারে তোমাকে শাস্তি দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করে দিও।"

রফিক সাহেব আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে নীলকণ্ঠ মঞ্জিল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

পুরো ড্রয়িংরুমে তখন মহাশূন্যতা। আয়ান হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। এই কান্না আনন্দের নয়, এই কান্না চার বছরের জমাটবদ্ধ যন্ত্রণার খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসার কান্না।

নীরা এক মুহূর্ত দেরি না করে আয়ানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে আয়ানের মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। "দেখেছেন আয়ান? আপনি নির্দোষ ছিলেন! আপনি নিজেকে মিথ্যে একটা খাঁচায় বন্ধ করে রেখেছিলেন।"

আয়ান নীরার দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো ছায়া নেই, কোনো অপরাধবোধ নেই—সেখানে এখন শুধুই নীরার জন্য এক অসীম, অদম্য ভালোবাসা।

আয়ান এক হেঁচকা টানে নীরাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আয়ানের মাথাটা নীরার ঘাড়ে গিয়ে ঠেকে গেল। সে গুমরে কেঁদে উঠে নীরার ঘাড়ে আর কানের লতিতে পাগোলপারা চুমু খেতে লাগল।

"নীরা... আমি নির্দোষ! আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারি! আমি আর কোনো অপরাধী নই!" আয়ানের ফিসফিসানি নীরার শরীরে এক শিহরণ তুলে দিল।

"হ্যাঁ আয়ান, আপনি সম্পূর্ণ আমার," নীরা আয়ানের ভেজা চুলে আঙুল গলিয়ে দিয়ে তার ঠোঁট দুটোকে আয়ানের ঠোঁটের সাথে মিলিয়ে দিল।

সেই চুম্বন ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। আগেরবারের মোমবাতির আলোয় পাওয়া স্পর্শে ছিল সংশয় আর রোমান্সের আবেশ, কিন্তু আজকের ছোঁয়ায় মিশে রইল শতভাগ পূর্ণতা আর অধিকারের অনাবিল স্বাদ। নীরা আয়ানের গলা পেঁচিয়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি উজার করে দিল। আয়ানের হাত দুটো নীরার কোমর আর পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক তীব্র কামনায়।

আয়ান নীরাকে পাঁজকোলা করে তুলে সোজা নিজের রুমে নিয়ে এল। ঘরের দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

আজ কোনো বৃষ্টি নেই, মোমবাতি নেই—ঘরের ভেতরে গোধূলির লালচে আলো ছড়ানো। আয়ান নীরাকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। আয়ানের চোখের সেই সুগভীর, তৃষ্ণার্ত চাহনি নীরার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিল।

আয়ান ধীরে ধীরে নীরার শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিল। তার হাত নেমে এল নীরার উন্মুক্ত পেটে—যেখানে তাদের সন্তান বেড়ে উঠছে। আয়ান সেখানে মুখ রেখে দীর্ঘক্ষণ নিজের ঠোঁট চেপে রাখল, যেন প্রতিটা স্পর্শে সন্তানকে আর নীরাকে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিতে চায়।

"তুমি আমার অন্ধকার জীবনটাকে আলো দিয়ে ভরিয়ে দিলে নীরা," আয়ান নীরার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট ঘষে ঘষে নিচু গলায় বলল।

"আর আপনি আমার সব অভিমান কেড়ে নিলেন," নীরা আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

আয়ানের ভেজা ঠোঁট আর তপ্ত নিঃশ্বাস নীরার গাল, গলা, কলারবোন পেরিয়ে বুক ছুঁয়ে নামতে লাগল। নীরা শিউরে উঠে আয়ানের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিল। দুজনের উত্তপ্ত শ্বাসের শব্দে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অতীত হারিয়ে গেছে, শঙ্কা মুছে গেছে—রয়ে গেছে স্রেফ দুটি দেহের এক হয়ে যাওয়ার তীব্র, পাগল করা আকুলতা।

পুরো বিকেল আর সন্ধ্যাজুড়ে নীলকণ্ঠ মঞ্জিলের সেই ঘরটি সাক্ষী হয়ে রইল দুটি ব্যাকুল আত্মার পরম মিলনের।

কিন্তু সুখে ভাসতে থাকা এই দম্পতির জীবনে কি সব ঝড় সত্যিই থেমে গেছে? নাকি সন্তানকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো ঝড়ের সূচনা হতে যাচ্ছে?

গোধূলির আলো পেরিয়ে নীলকণ্ঠ মঞ্জিলে এখন এক মায়াবী রাতের বিস্তৃতি। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা হালকা নাইটল্যাম্পের আলোয় আয়ান ও নীরার রূপকথা যেন এক পূর্ণাঙ্গ মাত্রা পেয়েছে। চার বছরের জমাটবদ্ধ অন্ধকার, ভুল বোঝাবুঝি আর দূরত্বের সব দেয়াল ভেঙে তারা এখন এক নতুন ভোরের মুখোমুখি।

পরদিন সকালের পরিবেশটা ছিল নীলকণ্ঠ মঞ্জিলের ইতিহাসের সেরা সকাল।

সূর্যের প্রথম আলো ডাইনিং টেবিলে এসে পড়েছে। নীরা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল চায়ের আয়োজন নিয়ে। আগের সেই চঞ্চলতা তার মুখে ফিরে এসেছে, তবে তার সাথে যুক্ত হয়েছে মাতৃত্বের এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা। নীরা ট্রেতে করে চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই পিছন থেকে দুটি শক্ত বাহু তাকে জড়িয়ে ধরল।

নীরা চমকে উঠে মৃদু হাসল। "আয়ান! ছাড়ুন, হাতে গরম চা পড়ে যাবে তো!"

আয়ান নীরার কাঁধে নিজের থুতনি রেখে এক গভীর শ্বাস নিল। নীরার গলার কাছে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে আয়ান বলল, "একদম ছাড়ব না। চার বছর অনেক দূরে থেকেছি নীরা, আর এক মুহূর্তও তোমাকে আমার বুক থেকে দূরে সরতে দেব না।"

নীরা ট্রেটা পাশের টেবিলে রেখে আয়ানের দিকে ঘুরল। আয়ানের মুখে এখন আর সেই বরফের মতো ঠান্ডা ভাব বা গম্ভীরতার ছাপ নেই। সেখানে ফুটফুটে আলো ছড়াচ্ছে এক সুখী পুরুষের তৃপ্তি। নীরা আয়ানের শার্টের কলারটা একটু সোজা করে দিতে দিতে বলল, "খুব তো রোমান্স দেখাচ্ছেন! অফিসে যাবেন না আজ?"

"আজ কোনো অফিস নেই," আয়ান নীরাকে এক হেঁচকা টানে নিজের একদম কাছে নিয়ে এল। আয়ানের এক হাত সোজা চলে গেল নীরার পেটের ওপর, যেখানে তাদের ভালোবাসার নতুন চারাটি ডালপালা মেলছে। "আজ শুধুই আমার বউ আর আমার বাচ্চার দিন। আমি সারাটা দিন তোমাদের কাছে বসে থাকব, আর তোমার এই লালচে ঠোঁটের মিষ্টি হাসি দেখব।"

আয়ানের এই খোলামেলা আর গভীর রোমান্টিক কথা শুনে নীরা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে আয়ানের বুকে মুখ লুকাল। আয়ান নীরাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে তার চুলে নিজের ঠোঁট চেপে রাখল।

কয়েক মাস কেটে গেল অতি দ্রুত। নীরা ও আয়ানের জীবন এখন ভালোবাসার একেকটি রঙিন সুতো দিয়ে বোনা এক সুন্দর চাদর। আয়ান এখন আর সেই আগের কাজের পাগল কর্পোরেট কর্মকর্তা নয়; সে এখন এক দায়িত্বশীল, প্রচণ্ড যত্নশীল প্রেমিক ও স্বামী। নীরার প্রতিটা ছোট ছোট চাহিদা—মাঝরাতে তার তেঁতুলের আচার খাওয়ার বায়না কিংবা মাঝরাতে হঠাৎ গান শোনার শখ—আয়ান মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি নিয়ে পূরণ করে।

নীরার গর্ভাবস্থার আট মাস চলছে তখন। নীরার চঞ্চলতা এখন অনেকটাই কমেছে, তার শারীরিক গঠনে এসেছে এক অপার্থিব রূপ।

এক শান্ত বিকেলে, ছাদের ওপর মৃদু হাওয়া বইছিল। আয়ান ছাদের দোলনায় নীরাকে নিয়ে বসেছিল। নীরার মাথাটা আয়ানের চওড়া বুকে হেলানো, আর আয়ানের এক হাত নীরার ফুলে ওঠা পেটে আলতো করে বুলে যাচ্ছে।

"আয়ান?" নীরা নিচু গলায় ডাকল।

"হুম?"

"আমাদের বাচ্চাটা কার মতো দেখতে হবে বলুন তো? আপনার মতো গম্ভীর আর একগুঁয়ে, নাকি আমার মতো দুরন্ত?"

আয়ান হেসে উঠল। সে নীরার থুতনিটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তারপর ধীরে ধীরে নীরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল—এক দীর্ঘ, মায়াবী ও তৃপ্তিদায়ক চুমু।

ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে আয়ান বলল, "আমি চাই ও অবিকল তোমার মতো হোক নীরা। চঞ্চল, প্রাণবন্ত আর ভালোবাসায় ভরপুর। কারণ তোমার মতো একজন আলোই আমার এই অন্ধকার জীবনকে স্বর্গে পরিণত করেছে।"

নীরা আয়ানের চোখে চোখ রাখল। সেই চোখে আজ কোনো মেহজাবীনের স্মৃতির কালো ছায়া নেই, কোনো পাপাচারের ভয় নেই—সেখানে জ্বলজ্বল করছে শুধুই নীরার প্রতি এক চিরন্তন ও অটল ভালোবাসা।

মাস খানেক পর, নীলকণ্ঠ মঞ্জিলের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল এক নতুন প্রাণের কান্নার শব্দ। নীরা ও আয়ানের কোলে এল এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। হাসপাতালের কেবিনে নীরা যখন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল, আয়ান তার ছোট্ট কন্যাসন্তানকে কোলে নিয়ে নীরার পাশে এসে বসল।

আয়ান এক হাতে তার সন্তানকে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে নীরার কপালে জমিয়ে রাখা ঘাম মুছে দিল। সে নীরার কপালে এক দীর্ঘ, ভালোবাসাময় চুমু এঁকে দিল।

"ধন্যবাদ নীরা," আয়ানের চোখ দিয়ে খুশির জল গড়িয়ে পড়ল নীরার গালে। "আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখানোর জন্য, আমাকে ভালোবাসার এই পূর্ণতা দেওয়ার জন্য।"

নীরা ধীরভেঙে চোখ খুলে আয়ানের দিকে তাকাল, তারপর তাকাল তাদের ছোট্ট নিষ্পাপ সন্তানের দিকে। নীরার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির হাসি।

নীলকণ্ঠ মঞ্জিলের পুরোনো দেয়ালগুলো আজ আর ফিকে মনে হয় না। সেখানে এখন ভালোবাসার রং লেগেছে। যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল তীব্র ঝগড়া আর অভিমান দিয়ে, মাঝপথে যা থমকে গিয়েছিল মেকি অপরাধবোধের ধাক্কায়—আজ তা পূর্ণতা পেল এক পরম প্রেম, তীব্র রোমান্স আর নতুন এক প্রাণের আগমনে।

আয়ান নীরার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে রাখল। তারা জানে, জীবনের পথ যতই কঠিন হোক না কেন, তাদের এই গাঢ় ভালোবাসা প্রতিটা বাধা পার করে এভাবেই এক হয়ে থাকবে চিরকাল।

 

....
👁 17