নিয়মের বাইরে এক সকাল

ঢাকা শহরের সকালগুলো সবসময় এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো দিয়ে শুরু হয়। যান্ত্রিক কোলাহল, গাড়ির হর্ন, আর ফুটপাত ধরে হেঁটে চলা শত শত ব্যস্ত মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণ ব্যস্ততা। কিন্তু গুলশানের অভিজাত কর্পোরেট টাওয়ার 'নেক্সাস গ্রুপ'-এর দশম তলার পরিবেশটা শহরের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে একদম আলাদা। সেখানে বাতাসের আর্দ্রতা থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের চলার গতি, সবকিছুই নির্ধারিত হয় একজনের মাপে। তিনি রায়ান রহমান। বয়স বত্রিশ, পদবি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, আর ব্যক্তিত্ব? শক্ত পাতলা কাচের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু সমানভাবে ধারালো।

রায়ানের টেবিলে সময়মতো ফাইল না পৌঁছানো মানে পুরো ডিপার্টমেন্টের জন্য কালো দিন নেমে আসা। তার পুরো দিনটা চলত সুনির্দিষ্ট একটা ছকে। সকাল নয়টা ঠিক নয়টাতেই অফিসের দরজা দিয়ে তিনি ভেতরে পা রাখবেন, নয়টা বেজে পাঁচ মিনিটে ব্ল্যাক কফি তার টেবিলে হাজির থাকবে, আর সাড়ে নয়টায় শুরু হবে প্রতিদিনের রিভিউ মিটিং। এই বাঁধাধরা ছকে গত তিন বছরে এক সেকেন্ডের জন্যও কোনো হেরফের হয়নি। অন্তত গত মাস পর্যন্ত তো নয়ই।

ঝামেলাটা শুরু হয়েছিল ঠিক চার সপ্তাহ আগে, যখন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিল মিষ্টি। পুরো নাম মেহজাবীন জাহান মিষ্টি। বয়স তেইশ, উজ্জ্বল চোখ আর হাসলে গালে পড়া নরম একজোড়া টোল—এটাই তার বাহ্যিক পরিচয় হতে পারত। কিন্তু নেক্সাস গ্রুপের কর্মীদের কাছে মিষ্টির আসল পরিচয় হলো, সে এমন এক ঘূর্ণিঝড় যা রায়ানের গড়ে তোলা কাচের দুর্গটাকে প্রতি মুহূর্তে ঝাঁকুনি দেয়।

মিষ্টি কাজ একদম খারাপ করে না। মার্কেটিং রিসার্চের ডেটা গোছানো বা প্রেজেন্টেশন স্লাইড তৈরিতে তার মেধা স্পষ্ট। কিন্তু সমস্যা হলো তার অদম্য কৌতূহল আর অদ্ভুত সব চিন্তাভাবনা। সে কাজ করার চেয়ে কাজ নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন করতে বেশি ভালোবাসে, আর সেই প্রশ্নের প্রধান নিশানা হন রায়ান রহমান নিজেই।

সকাল পৌনে নয়টা। রায়ান তার কাচঘেরা ঘরের ভেতর বড় রিভলভিং চেয়ারটায় বসে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পরনে নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা গাঢ় নীল শার্ট, টাইয়ের নটটা গলার কাছে শক্ত করে বাঁধা। তার চোখে সুরুচির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখের কোণে জমতে থাকা বিরক্তির ভাঁজটাও লুকানো কঠিন।

হঠাৎ দরজায় হালকা নক হলো। রায়ান চোখ না তুলেই গম্ভীর গলায় বললেন, "ভেতরে আসুন।"

ভেতরে যে প্রবেশ করল, তাকে দেখার জন্য রায়ানের নজর তোলারও প্রয়োজন ছিল না। হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার কামিজ পরা মিষ্টি, হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি।

"স্যার, আপনার কফি," মিষ্টি ট্রে-টা টেবিলে রাখতে রাখতে বলল।

রায়ান চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে মিষ্টির দিকে তাকালেন। তারপর কফির কাপটার দিকে একনজর দেখে আবার মিষ্টির দিকে চাইলেন। "মিষ্টি, আজ নিয়ে আমি আপনাকে তিন নম্বর বার বলছি—কফি এনে দেওয়া কোনো ইন্টার্নের কাজ নয়। অফিসের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে এটার জন্য।"

মিষ্টি মিষ্টি করে একটু হাসল। তার গালের টোলটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। "আমি জানি স্যার। কিন্তু রফিক ভাই আজ একটু ব্যস্ত ছিলেন, আর আমি ভাবলাম আপনি আবার ব্ল্যাক কফি না পেলে তো পুরো অফিসের ওপর ঝড় তুলবেন! তাই নিজেই বানিয়ে নিয়ে এলাম।"

"আমার মেজাজ বা আমার কফি নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি নিজের কাজে মনোযোগ দিন," রায়ান নিজের কন্ঠ যথাসম্ভব ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করলেন।

"কাজ তো সব শেষ স্যার! গত সপ্তাহের সেলস রিপোর্ট আমি গতকাল রাত আটটাতেই মেইল করে দিয়েছি," মিষ্টি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল। তারপর টেবিলে একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, "আচ্ছা স্যার, একটা প্রশ্ন করব? কিছু মনে করবেন না তো?"

রায়ানের কপালে ভাঁজ গভীর হলো। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি জানেন, মিষ্টি যখন এই ভঙ্গি করে, তখন কোনো না কোনো অহেতুক প্রশ্ন আসতে চলেছে। "কী প্রশ্ন?"

"আপনি কি সবসময় এই নীল আর কালো রঙের বাইরে কিছু পরেন না? মানে, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আপনার আলমারিতে হয়তো শুধু এই দুটো রঙের শার্টই ঝুলানো আছে। একটু লাল বা হলুদ পরলে কিন্তু আপনাকে বেশ মানাবে!"

রায়ান স্তব্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ড মিষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন। অফিসের কেউ তার সামনে জোরে শ্বাস নিতেও ভয় পায়, আর এই তেইশ বছরের মেয়েটি তার পোশাকের রঙের পছন্দ নিয়ে মন্তব্য করছে!

"মিষ্টি," রায়ানের গলাটা আরো এক ধাপ নেমে গেল, যেখানে রাগ নয়, বরং এক ধরণের তীব্র কর্তৃত্ব প্রকাশ পেল। "এটা একটা কর্পোরেট অফিস। কোনো ফ্যাশন শো নয়। আপনি কি কাজের বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে আপনার ডেস্কে ফিরে যাবেন?"

মিষ্টি এতটুকু দমল না। বরং তার চোখে এক ধরণের দুষ্টুমির ঝিলিক দেখা গেল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "ঠিক আছে স্যার, যাচ্ছি! কিন্তু কাল যদি আপনি একটা লাল টাই পরে আসেন, আমি কিন্তু একদম অবাক হব না!"

এই বলে সে রায়ানের উত্তরের অপেক্ষা না করেই দ্রুত ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজার কাচের বাইরে থেকে একবার তাকিয়ে এক চিলতে হাসি উপহার দিয়ে গেল।

রায়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইলেন। বুকের ভেতরে একটা অজানা অস্বস্তি। মেয়েটাকে কড়া ভাষায় বকে দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু প্রতিবারই যখন তিনি মিষ্টিকে কড়া কিছু বলতে যান, তার ওই অবাধ্য চোখ দুটো আর গালে ফুটে ওঠা টোলটা যেন রায়ানের সব কঠোরতা চুরমার করে দেয়। রায়ান নিজেকে সামলানোর জন্য কফির কাপে চুমুক দিলেন। অসাধারণ হয়েছে কফিটা। ঠিক যেভাবে তিনি পছন্দ করেন—একটুও চিনি ছাড়া, কড়া আর সুগন্ধি। এই মেয়েটি কীভাবে যেন রায়ানের একদম ছোটখাটো পছন্দগুলোও নিখুঁতভাবে বুঝে ফেলে, অথচ মুখে দেখায় যেন সে কিছুই বোঝে না।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে অফিসের ব্যস্ততা বাড়তে লাগল। রায়ান কনফারেন্স রুমে তিন ঘণ্টার একটা দীর্ঘ মিটিং শেষ করে যখন নিজের ঘরে ফিরলেন, তখন দুপুর আড়াইটা। কাজের চাপে মাথাটা ধরে গেছে। তিনি টাইয়ের নটটা কিছুটা ঢিলে করে চেয়ারে বসতেই তার নজর গেল টেবিলের এক কোণে রাখা একটা ছোট কাগজের টুকরোর দিকে।

কাগজটিতে রঙিন কলম দিয়ে লেখা: 'কাজের চাপে মাথা ব্যথা করলে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি আর এই চকলেটটা খেয়ে নিন। বসদেরও মাঝে মাঝে মিষ্টি কিছু খাওয়া উচিত।'

কাগজের পাশেই রাখা একটা ডার্ক চকলেটের বার।

রায়ান হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তার ঠোঁটের কোণে না চাইতেও খুব হালকা, প্রায় অদৃশ্য একটা হাসি ফুটে উঠল। রায়ান দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। দশম তলার কাচ দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেলেন, নিচে মিষ্টি অন্যান্য ইন্টার্নদের সাথে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। খোলা বাতাস তার চুলগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

রায়ান হাতের চকলেটটার মোড়ক খুললেন। একটা ছোট টুকরো মুখে দিতেই তিক্ততার বদলে এক অদ্ভুত মিষ্টি স্বাদ তার জিভে ছড়িয়ে পড়ল। রায়ানের চোখ জোড়া আটকে রইল নিচের ওই মিষ্টি মেয়েটার ওপর। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কিন্তু তার এই ভীষণ গুছানো, নিয়মকানুনে বাঁধা জীবনের মাঝখানে মিষ্টি নামের এই মেয়েটি কীভাবে যেন অজান্তেই এক অদ্ভুত সুর তুলে চলেছে।

বিকেলের দিকে যখন মিষ্টি ফাইল সই করাতে আবার রায়ানের রুমে এলো, রায়ান তখন নিজের ল্যাপটপে ডুবে ছিলেন।

"স্যার, এই ফাইলগুলোতে সই লাগবে," মিষ্টি শান্ত গলায় বলল।

রায়ান ফাইলগুলো হাতে নিয়ে সই করতে করতে হঠাৎ বললেন, "চকলেটের জন্য ধন্যবাদ।"

মিষ্টি একটু অবাক হলো, তারপর তার পুরো মুখটা এক পরম তৃপ্তির হাসিতে ভরে উঠল। "বললাম না স্যার, আপনার মাঝে মাঝে মিষ্টি কিছু দরকার। আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন বলুন তো? জীবনটা তো এত কঠিন নয়।"

রায়ান সই করা শেষ করে ফাইলটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন। চোখের নজর মিষ্টির মুখের ওপর স্থির রেখে শান্ত কিন্তু গভীর কণ্ঠে বললেন, "জীবন কঠিন নয়, মিষ্টি। কিন্তু জীবনকে নির্দিষ্ট নিয়মে না চালালে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। আর আমি এলোমেলো জিনিস একদম পছন্দ করি না।"

মিষ্টি ফাইলটা বুকে চেপে ধরে একটু ঝুঁকে রায়ানের চোখের দিকে তাকাল। দুজনের চোখের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। রায়ানের বুকের ভেতরে কিসের যেন একটা তীব্র স্পন্দন ঘটে গেল। মিষ্টির চোখের সেই গভীরতা রায়ানকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল।

"কখনো কখনো কিছুটা এলোমেলো হওয়া ভালো, রায়ান স্যার," মিষ্টি খুব নিচু স্বরে বলল, তার গলায় আর সেই আগের দুষ্টুমি ছিল না, ছিল এক অজানা আকর্ষণ। "সবকিছু নিয়মে চললে সারপ্রাইজ কোথায় থাকে?"

মিষ্টি কথাটি শেষ করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আর রায়ান নিজের চেয়ারে পাথরের মতো বসে রইলেন। নিজের বুকের ভেতর হূৎপিণ্ডের দ্রুত গতি তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। এই মেয়েটি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কেন তার মিষ্টি একটা কথা, তার উপস্থিতি রায়ানের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা আত্মনিয়ন্ত্রণকে এভাবে ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে?

সন্ধ্যা নেমে এসেছে শহরের বুকে। অফিসে একে একে সবাই কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু রায়ানের ঘরে এখনো আলো জ্বলছে। তিনি টেবিলের ওপর হাত রেখে বসে আছেন, আর ভাবছেন মিষ্টির শেষ কথাটি নিয়ে—'সবকিছু নিয়মে চললে সারপ্রাইজ কোথায় থাকে?'

রায়ান এখনো জানতেন না, মিষ্টি তার জন্য কী বিশাল এক 'সারপ্রাইজ' পরিকল্পনা করে রেখেছিল, যা আগামী দিনেই পুরো অফিসের চেহারা বদলে দিতে চলেছে। আর সেই পরিকল্পনার মুখোমুখি হয়ে রায়ানের ভেতরের বরফ কীভাবে গলতে শুরু করবে, তা ছিল তার ধারণারও বাইরে।

পরদিন সকালের সূর্যটা যেন অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিল। তবে নেক্সাস গ্রুপের দশম তলার বাতাস ছিল অস্বাভাবিক রকমের থমথমে। অফিসে সচরাচর যে গুঞ্জন বা কিবোর্ডের খটখট শব্দ পাওয়া যায়, আজ তার বদলে বিরাজ করছে অদ্ভুত এক নীরবতা। কারণ, পুরো মার্কেটিং টিমের কর্মচারীরা আজ মিটিং রুমে একত্রিত হয়েছে এক পরম গোপনীয় মিশনে, আর সেই মিশনের মূল পরিকল্পনাকারী আর কেউ নয়—ইন্টার্ন মিষ্টি।

মিষ্টি কনফারেন্স টেবিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে সবাইকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল। তার পরনে আজ হালকা বাসন্তী রঙের একটা সালোয়ার কামিজ, চোখে মুখে এক পরম আত্মবিশ্বাসের ছাপ।

"শুনুন আপনারা সবাই," মিষ্টি নিচু গলায় কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলল, "আজ আমাদের বস রায়ান সাহেবের বার্থডে। অথচ উনি নিজে হয়তো ভুলেই গেছেন! আমরা যদি আজকে উনাকে একটা বিশাল চমক না দিতে পারি, তবে আমাদের এই ক্রিয়েটিভ টিমে থাকার কোনো মানেই হয় না।"

সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তানভীর ভাই কিছুটা চিন্তিত মুখে বললেন, "মিষ্টি, কাজটা কি ঠিক হবে? রায়ান স্যার কিন্তু এসব একদম পছন্দ করেন না। গত বছর আমরা কার্ড দিতে গিয়েছিলাম, উনি গম্ভীর মুখে সেটা রেখে ফাইল খোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে চাকরিটাই না শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়!"

মিষ্টি তানভীর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসল। "আপনি ভয় পাচ্ছেন তানভীর ভাই? আরে, বসের সেই শক্ত বরফের বর্ম ভাঙার দায়িত্ব আমার। আপনারা শুধু আমি যেভাবে বলব, ঠিক সেভাবে কাজগুলো করবেন। আজ আমরা কোনো সাধারণ কেক কাটা পার্টি করব না। আজ হবে এক বিশেষ পরিকল্পনা!"

মিষ্টি তার থলে থেকে কতগুলো ছোট ছোট রঙিন চিরকুট আর গোপন নির্দেশনাবলী বের করে সবার হাতে তুলে দিল। পরিকল্পনাটি ছিল বেশ বিচিত্র এবং নাটকীয়। রায়ানের পুরো দিনের ছকটাকে এমনভাবে ওলটপালট করে দেওয়া হবে, যাতে তিনি বাধ্য হন নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে।

ঠিক নয়টা বেজে পাঁচ মিনিটে রায়ান অফিসে প্রবেশ করলেন। তার প্রতিদিনের মতো আজকেও পরনে ডিপ গ্রে রঙের স্যুট, চোখে সেই গম্ভীর ভাব। কিন্তু অফিসে ঢোকার সাথে সাথেই তার ভ্রূ কুঁচকে গেল। রিসিভশন খালি, করিডোরে কেউ নেই। পুরো অফিস যেন নির্জন এক ভূতের বাড়ি!

রায়ান দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেলেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

তার সুশৃঙ্খল, পরিষ্কার টেবিলটার ওপর রাখা আছে একটা বিশাল গোলাকার কাচের জার। আর সেই জারের ভেতরে কিলবিল করছে অন্তত ৫০টি ছোট ছোট রঙিন চিরকুট! তার ল্যাপটপ, ফাইল বা কফির কাপের কোনো চিহ্নই সেখানে নেই। টেবিলের ওপর শুধু একটা ছোট কার্ড রাখা, তাতে লেখা—

'শুভ জন্মদিন, স্যার! আজ আপনার কোনো মিটিং নেই, কোনো ফাইল রিভিউ নেই। আজকে আপনাকে এই ৫০টি চিরকুটের রহস্য উন্মোচন করতে হবে। প্রতিটি চিরকুটে আছে আপনার জীবনের কোনো না কোনো ছোট ধাঁধা বা নির্দেশ। শুরু করুন প্রথম চিরকুট দিয়ে!'

রায়ানের মেজাজ মুহূর্তের মধ্যে সপ্তমে চড়ে গেল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলেন, "মিষ্টি! তোমার সাহস তো কম নয়!"

তিনি দ্রুত রুমের বাইরে এসে ড্রয়ার থেকে ব্যাকআপ চাবি নিয়ে সোজা কনফারেন্স রুমের দিকে এগোলেন। তার ধারণা ছিল সবাই হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু কনফারেন্স রুমের দরজা খুলতেই যা দেখলেন, তাতে তার রাগের পারদ যেন শূন্যে নেমে এলো।

পুরো রুমটা অন্ধকারে ঢাকা। আর ঠিক মাঝখানে একটা ছোট টেবিলে মোমবাতি জ্বলছে। মোমবাতির হালকা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে মিষ্টি। তার মুখে সেই পরিচিত, নিষ্পাপ হাসি।

"শুভ জন্মদিন, রায়ান স্যার," মিষ্টি আলতো গলায় বলল।

রায়ান বেশ কয়েক পা এগিয়ে এলেন। তার বুকের ভেতরে রাগের ঢেউ ওঠার কথা ছিল, কিন্তু মোমবাতির আলোয় মিষ্টির ওই মায়াবী মুখের দিকে তাকাতেই তার সব রাগ যেন এক মুহূর্তে বাতাসে মিলিয়ে গেল। মিষ্টির পরনের বাসন্তী জামাটা এই আলোয় তাকে যেন কোনো এক অন্য জগতের পরীর মতো দেখাচ্ছে।

"এসবের মানে কী, মিষ্টি?" রায়ান নিজের কণ্ঠ যথাসম্ভব শক্ত রেখে বললেন, যদিও সেই কণ্ঠে আগের মতো ধার ছিল না। "অফিসকে খেলাধুলার জায়গা বানিয়েছেন? সবাই কোথায়?"

মিষ্টি রায়ানের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখন খুবই কম। মিষ্টির শরীর থেকে ভেসে আসা হালকা বেলি ফুলের সুবাস রায়ানের ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে অবশ করে দিচ্ছিল।

"সবাই আজ হাফ-ডে লিভে আছে স্যার, আমার অনুরোধে," মিষ্টি রায়ানের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল। "আর আজকের দিনটা শুধু আপনার জন্য। আপনি প্রতিদিন অন্য সবার জন্য নিয়ম বানান, আজ না হয় একটা দিন নিয়ম ভাঙার আনন্দে মেতে উঠুন?"

"আমি এসব ফাজিলামো পছন্দ করি না," রায়ান মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।

কিন্তু মিষ্টি তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। সে হাত বাড়িয়ে রায়ানের টাইয়ের নটটা হালকা একটু ঢিলে করে দিল। রায়ানের সারা শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল! তিনি মিষ্টির এই দুঃসাহসে স্তব্ধ হয়ে গেলেন, কিন্তু হাত সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো শক্তি যেন তার শরীরে ছিল না।

"আপনার এই চোখ দুটো মিথ্যা বলতে পারে না, স্যার," মিষ্টি খুব নিচু, গভীর স্বরে বলল। তার কণ্ঠের উষ্ণতা রায়ানের কানে এসে লাগল। "আমি জানি, এই গম্ভীর চেহারার পেছনে একটা মানুষ আছে, যে ভালোবাসতে চায়, একটু হাসতে চায়। কেন নিজেকে এত গুটিয়ে রাখেন বলুন তো?"

রায়ান সোজা মিষ্টির চোখের দিকে তাকালেন। মোমবাতির কাঁপা আলোয় মিষ্টির চোখের তারা দুটো অদ্ভুত এক আকর্ষণে চকচক করছে। রায়ানের হাত দুটো নিজের অজান্তেই উঠে এলো এবং তিনি মিষ্টির নরম গাল দুটো আলতো করে ছুঁয়ে দিলেন। তার আঙুলের ছোঁয়ায় মিষ্টির শরীরের ভেতর দিয়েও যেন এক শিরশিরে অনুভূতি বয়ে গেল। মিষ্টি চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে নিল।

"তুমি আমাকে পাগল করে দেবে, মিষ্টি," রায়ান ফিসফিস করে বললেন। তার গলার আওয়াজ কাঁপছিল। "আমি কখনো কারো জন্য এভাবে নিয়ন্ত্রণ হারাইনি।"

মিষ্টি চোখ খুলে রায়ানের দিকে তাকাল। তার গালে মৃদু লালচে আভা ফুটে উঠেছে। "নিয়ন্ত্রণ হারানোর নামই তো জীবন, রায়ান। সব জায়গায় হিসেব মেলাতে নেই।"

ঠিক সেই মুহূর্তে কনফারেন্স রুমের লাইটগুলো একসাথে জ্বলে উঠল!

"হ্যাপি বার্থডে স্যার!"

একসাথে চিৎকার করে উঠল পুরো মার্কেটিং টিম, যারা এতক্ষণ পেছনের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল।

রায়ান দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিলেন, তার মুখটা সামান্য লাল হয়ে উঠল লজ্জায় আর অপ্রস্তুত ভাব নিয়ে। মিষ্টিও একটু পিছিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে রয়ে গেল এক বিজয়ের হাসি।

পুরো টিম মিলে কেক কাটল, উল্লাস করল। রায়ান হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার মন আর সেখানে ছিল না। তার মন পড়ে রইল ওই কয়েক সেকেন্ডের নীরবতায়, যখন মিষ্টির গালের উষ্ণতা তার আঙুলে লেগেছিল।

পার্টি শেষ হওয়ার পর সবাই যখন একে একে চলে গেল, রায়ান নিজের ঘরে ফিরে এলেন। কফির বদলে আজ তার টেবিলে রাখা ছিল এক গ্লাস বেলি ফুলের শরবত আর মিষ্টির নিজ হাতে লেখা একটা ছোট চিঠি।

রায়ান চিঠিটা খুললেন। তাতে লেখা—
'আজকের সারপ্রাইজটা কেমন লাগল স্যার? বরফ কি একটুও গলল না? আজ সন্ধ্যায় যদি আপনার কোনো কাজ না থাকে, তবে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বেলি তলায় আমার জন্য একটু অপেক্ষা করবেন? বস হিসেবে নয়, রায়ান হিসেবে।'

রায়ান চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন। তার বাঁধাধরা, শীতল জীবনের কঠিন দেয়ালগুলো যেন একটা একটা করে ভেঙে পড়ছিল। তিনি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। মেঘলা আকাশ, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। কিন্তু রায়ানের ভেতরের মনটা আজ এক অদ্ভুত আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে—এক গভীর, অনাস্বাদিত প্রেমে।

ধানমন্ডি লেকের চারপাশটা ততক্ষণে সন্ধ্যার হালকা আঁধারে ঢেকে গেছে। একটু আগে হয়ে যাওয়া ঝুম বৃষ্টির পর বাতাসটা ভীষণ ঠাণ্ডা আর সোঁদা গন্ধে ভারী। লেকের পানিতে পারের বাতিগুলোর আলো পড়ে এক অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য তৈরি করেছে।

বেলি তলার কাছের একটা কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলেন রায়ান। পরনে ফর্মাল স্যুট নেই, তার বদলে আজ তিনি পরেছেন একটি সাধারণ গাঢ় নীল রঙের কুর্তা। তার দীর্ঘ কর্পোরেট জীবনে এমন উন্মুক্ত জায়গায় বসে কারো জন্য অপেক্ষা করার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ঘড়ির দিকে তাকালেন রায়ান—সন্ধ্যা সাতটা বাজতে দশ মিনিট। জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডে যিনি সময় মেনে চলেন, আজ তিনি নিজেই নির্ধারিত সময়ের বিশ মিনিট আগে এসে বসে আছেন।

হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত বেলি ফুলের সুবাস আর নুপুরের হালকা রুনঝুন শব্দ। রায়ান পেছনে ফিরতেই থমকে গেলেন।

ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় দাঁড়িয়ে আছে মিষ্টি। পরনে সুতির একখানা জলছাপ শাড়ি, চুলে বেলি ফুলের গজরা জড়ানো, আর হাতে কাচের একগুচ্ছ সবুজ রেশমি চুড়ি। বৃষ্টিতে ভেজা সন্ধ্যার বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে। মিষ্টিকে এই রূপ রূপকথার কোনো রাজকন্যার চেয়ে কম লাগছিল না।

"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম, তাই না?" মিষ্টি মৃদু হেসে রায়ানের পাশে এসে বসল।

রায়ান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তার চোখ দুটো মিষ্টির স্নিগ্ধ মুখের ওপর আটকে রইল। বুকচাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তোমার জন্য সারা জীবনও অপেক্ষা করা যায়, মিষ্টি।"

কথাটা বলেই রায়ান নিজেই কিছুটা অবাক হলেন। এই গম্ভীর, মেপে মেপে কথা বলা রায়ান রহমান কীভাবে এত সহজে মনের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে ফেললেন?

মিষ্টি চমকে রায়ানের দিকে তাকাল। তার চোখের তারায় এক অদ্ভুত বিস্ময় আর ভালোলাগার ঝিলিক। "বাহ্ স্যার! আপনি তো চমৎকার কথা বলতে পারেন! কোথায় গেল সেই গম্ভীর বস?"

"বসকে তো তুমি আজ সকালেই কনফারেন্স রুমে খুন করে ফেলেছ," রায়ান একটু হেসে বললেন। তার এই খোলামেলা হাসি মিষ্টি আগে কখনো দেখেনি। রায়ানের হাসলে চোখের কোণে যে ছোট ভাঁজ পড়ে, তা মিষ্টির মনকে এক অজানা দোলায় দুলিয়ে দিল।

হঠাৎ ঝিরঝির করে আবার বৃষ্টি নামল। আশেপাশের দু-একজন পথচারী ছাতা মাথায় দ্রুত সরে গেল, কিন্তু রায়ান আর মিষ্টি নিজেদের জায়গায় স্থির বসে রইল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মিষ্টির মুখে-চোখে এসে পড়ছে, আর সে চোখ বন্ধ করে সেই স্পর্শ উপভোগ করছে।

রায়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি হাত বাড়িয়ে মিষ্টির মুখের ওপর এসে পড়া ভেজা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিলেন। রায়ানের আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে মিষ্টি শিহরিত হয়ে চোখ খুলল।

"রায়ান..." মিষ্টির গলার আওয়াজটা এক অদ্ভুত অনুভূতির তীব্রতায় কেঁপে উঠল। এই প্রথম সে রায়ানের নামের পর 'স্যার' শব্দটি বাদ দিল।

"বলো," রায়ান আরো একটু কাছে সরে এলেন। মিষ্টির নিঃশ্বাসের তপ্ত বাতাস রায়ানের মুখে এসে লাগছিল।

"আপনি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন? নাকি এটা কেবলই এক মুহূর্তের মোহ?" মিষ্টির চোখে এক গভীর আকুলতা।

রায়ান মিষ্টির দুটো হাত নিজের শক্ত দুটি হাতের তালুতে তুলে নিলেন। রেশমি চুড়ির টুংটাং শব্দে চারপাশটা যেন আরো রোমান্টিক হয়ে উঠল। রায়ান মিষ্টির হাতের পিঠে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালেন। এক দীর্ঘ, গভীর চুম্বনে জানিয়ে দিলেন তার মনের ব্যাকুলতা।

"আমি কোনোদিন ভালোবাসিনি কাউকে, মিষ্টি। আমার পৃথিবীটা ছিল শুধু সংখ্যা, ফাইল আর নির্জনতার। সেখানে তুমি এসেছ ঝড়ের মতো, সব এলোমেলো করে দিয়েছ। এখন আমার এই এলোমেলো জীবনটাকেই সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়, শুধু তুমি আছ বলে।" রায়ানের কণ্ঠ গম্ভীর কিন্তু ভালোবাসার গভীরতায় পূর্ণ।

মিষ্টির চোখ বেয়ে একবিন্দু আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। সে মাথাটা রায়ানের প্রশস্ত বুকে রাখল। রায়ান তার শক্ত দু-হাত দিয়ে মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরলেন নিজের বুকের খুব কাছে। টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ, লেকের পানির ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ আর দুজনের হূৎপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

কতক্ষণ তারা এভাবে বসে ছিল, তার কোনো হিসেব ছিল না। কিন্তু সুখের সময় বুঝি সবসময় দ্রুত চলে যায়।

মিষ্টির ফোনটা হঠাৎ তীব্র শব্দে বেজে উঠল। মিষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রায়ানের বুক থেকে মাথা তুলে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে 'বাবা' লেখা দেখে তার মুখের স্নিগ্ধ ভাবটা এক মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল এক তীব্র আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার ছাপ।

"হ্যালো, বাবা..." মিষ্টির গলা কেঁপে উঠল।

ফোনের ওপাশ থেকে কী যেন বলা হলো, মিষ্টির হাতের ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার মুখ একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

"কী হয়েছে, মিষ্টি?" রায়ান চিন্তিত হয়ে মিষ্টির কাঁধ ধরলেন।

মিষ্টি চোখ দুটো বড় বড় করে রায়ানের দিকে তাকাল, তার চোখে তখন কান্নার জল। "রায়ান... বাবা জেনে গেছেন। বাবা জেনে গেছেন আমি আপনার অফিসে কাজ করি। উনি কাল সকালেই আমাকে চিরতরে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিচ্ছেন... আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!"

কথাটা যেন রায়ানের মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগেই যে স্বর্গ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, তা যেন এক লহমায় ধুলোয় মিশে যেতে লাগল।

মিষ্টি কোনো কিছু না ভেবেই উঠে দাঁড়াল। "আমাকে এখনই যেতে হবে, রায়ান। বাবা লোক পাঠিয়েছেন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।"

"মিষ্টি, দাঁড়াও! আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলব!" রায়ান মিষ্টির হাত চেপে ধরলেন।

"না রায়ান, এখন নয়! বাবা ভীষণ রাগী মানুষ। উনি কিছু শুনবেন না," মিষ্টি কান্নাভেজা চোখে রায়ানের দিকে তাকাল। সে তার এক হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রায়ানের গাল স্পর্শ করল। "যদি আমাদের ভালোবাসা সত্যি হয়, আমরা আবার এক হব। কিন্তু আপাতত আমাকে যেতে হবে।"

মিষ্টি দ্রুত পা চালিয়ে বৃষ্টির মধ্যে মিলিয়ে গেল। রায়ান নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন বেলি তলার নিচে। তার হাতে এখনো লেগে আছে মিষ্টির চুড়ির সুবাস আর গালের উষ্ণতা, অথচ সেই মিষ্টিই এখন তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, আর রায়ানের বুকে জমতে থাকা ভালোবাসার নদীটা এক উত্তাল ঝড়ে রূপ নিচ্ছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা-ই ঘটুক না কেন, মিষ্টিকে তিনি কিছুতেই তার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দেবেন না।

বৃষ্টির রাতটা রায়ানের জন্য ছিল এক দীর্ঘ ও নির্ঘুম কাব্যের মতো। ঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে সারা রাত কেটে গেল, চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠল বৃষ্টির আলোয় মিষ্টির ওই কান্নাভেজা মুখটা। সকালে যখন সূর্য উঠল, রায়ানের ভেতরের দ্বিধা বা ভয় সব উধাও হয়ে গেছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক কঠোর একগুঁয়েমি। যে মানুষকে তিনি এতদিন নিজের অজান্তেই বুকের গভীরে আগলে রাখতে শিখেছেন, তাকে এত সহজে অন্যের হাতে সঁপে দেওয়া রায়ানের অভিধানে নেই।

অফিসে পৌঁছেই রায়ান মিষ্টির জরুরি ফাইলপত্র পরীক্ষা করলেন। এইচআর ডিপার্টমেন্ট থেকে মিষ্টির স্থায়ী ঠিকানার নম্বর আর বিস্তারিত জোগাড় করতে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় লাগল না। চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা নাসিরাবাদের এক ধনাঢ্য ও রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান মিষ্টি—তার বাবা চৌধুরী ইকরাম হোসেন, শহরের নামকরা ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

রায়ান এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে নিজের পিএ-কে ডেকে সব মিটিং ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট এক সপ্তাহের জন্য বাতিল করতে বললেন। নিজের ব্যক্তিগত গাড়িটা নিয়ে তিনি সোজা ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের দিকে রওনা দিলেন।

গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা একশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, আর রায়ানের বুকের ভেতরের স্পন্দন তার চেয়েও দ্রুত। টানা চার ঘণ্টা ড্রাইভিংয়ের পর দুপুরে যখন রায়ান চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে মিষ্টিদের বিশাল বাংলোবাড়ির সামনে পৌঁছালেন, তখন আকাশ আবার মেঘলা হয়ে এসেছে।

বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই দারোয়ান তাকে বাধা দিল। রায়ান গম্ভীর ও আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন, "চৌধুরী ইকরাম হোসেন সাহেবের সাথে কথা বলব। বলুন ঢাকা থেকে নেক্সাস গ্রুপের রায়েন রহমান এসেছেন।"

কর্পোরেট দুনিয়ায় ইকরাম হোসেনের সাথে নেক্সাস গ্রুপের নাম অপরিচিত নয়। রায়ানের ব্যক্তিত্ব আর পরিচয়ের জোরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে ভেতরের এক বিশাল ড্রয়িংরুমে নিয়ে যাওয়া হলো।

কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী আর আভিজাত্যে ভরা সেই ঘরে বসে ছিলেন সত্তোরোর্ধ্ব প্রবীণ পুরুষ ইকরাম হোসেন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, চেহারায় এক ধরনের কঠোর আভিজাত্যের ছাপ।

"রায়ান রহমান, তাই তো?" প্রবীণ কণ্ঠের ভারিক্কি আওয়াজ ভেসে এলো। "নেক্সাস গ্রুপের সর্বকনিষ্ঠ ডিরেক্টর আমার বাড়িতে হঠাৎ কী মনে করে?"

রায়ান সোজা ইকরাম হোসেনের মুখোমুখি বসলেন। কোনো রকম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা রায়ানের স্বভাব নয়। তিনি সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমি কোনো ব্যবসার কাজে আসিনি, চৌধুরী সাহেব। আমি এসেছি আপনার মেয়ে মিষ্টির জন্য।"

এক মুহূর্তে ঘরের পরিবেশ বিষাক্তের মতো থমকে গেল। ইকরাম হোসেনের চোখের দৃষ্টি আরো কঠিন হয়ে উঠল। "তোমার সাহস তো কম নয় তরুণ! আমার মেয়ের নাম তোমার মুখে? ও ঢাকায় পড়তে গিয়েছিল, কোনো প্রেম-ভালোবাসার নাটক করতে নয়। কাল রাতে আমি সব শুনেছি। আর সেই কারণেই আগামী সপ্তাহে ওর বিয়ে আমি আমার বন্ধুর ছেলের সাথে ঠিক করেছি।"

"আপনি যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, তা ভুল," রায়ান শান্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্ত গলায় বললেন। "মিষ্টি আপনাকে ভয় পায়, সম্মান করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি তার জীবনের সিদ্ধান্ত তার অনিচ্ছায় চাপিয়ে দেবেন। আমি মিষ্টিকে ভালোবাসি, আর মিষ্টিও আমাকে ভালোবাসে।"

"ভালোবাসা দিয়ে পেট চলে না, আর আমার পরিবারের একটা সুনাম আছে!" ইকরাম হোসেন টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়ালেন। "তুমি একজন সামান্য চাকরিজীবী বা ডিরেক্টর হতে পারো, কিন্তু আমার পরিবারের যোগ্য নও। এখনই বের হয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে, নইলে নিরাপত্তারক্ষী ডাকতে বাধ্য হব!"

ঠিক সেই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমের পেছনের পর্দা ঠেলে ভেতরে ছুটে এলো মিষ্টি। তার পরনে একদম সাদামাটা একটা সুতির সালোয়ার, চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে। মিষ্টিকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু রায়ানের গলার আওয়াজ পেয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।

"বাবা! প্লিজ!" মিষ্টি কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবার পায়ের কাছে গিয়ে বসল। "তুমি রায়ানকে এভাবে বলতে পারো না। উনি কোনো খারাপ মানুষ নন। আমি উনাকে ভালোবাসি বাবা, উনি ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করব না!"

রায়ান দ্রুত এগিয়ে এসে মিষ্টির হাত ধরে তাকে সোজা করে দাঁড় করালেন। মিষ্টির চোখের জল নিজের শক্ত আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে নিচু গলায় বললেন, "কাঁদবে না মিষ্টি। তোমার চোখের জল ফেলার দিন শেষ। আমি যখন এসেছি, তোমাকে নিয়ে বা তোমার বাবার সম্মতি নিয়েই ফিরব।"

রায়ান মিষ্টিকে নিজের পেছনে আড়াল করে আবার ইকরাম হোসেনের দিকে ফিরলেন। রায়ানের চোখে তখন কোনো ভীতি ছিল না, ছিল এক অপরাজেয় পুরুষালী দীপ্তি।

"চৌধুরী সাহেব," রায়ান খুব শান্ত স্বরে বললেন, "আপনি আভিজাত্য আর পরিচয়ের কথা বলছেন তো? আপনার বন্ধু যে টেক্সটাইল গ্রুপের মালিক, তাদের পুরো সাপ্লাই চেইনের ষাট ভাগ কন্ট্রোল করে নেক্সাস গ্রুপ। আমি চাইলে এক ঘণ্টার মধ্যে সেই ডিল বাতিল করে দিতে পারি। কিন্তু আমি তা করব না। কারণ আমি আপনাকে হুমকি দিয়ে মিষ্টিকে পেতে চাই না।"

রায়ান একটু থামলেন, তারপর নিজের মানিব্যাগ থেকে একটা ছোট লাল ভেলভেটের বাক্স বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন।

"আমি মিষ্টিকে ভালোবাসি কারণ সে আমাকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে। আমার এই কঠিন বরফের মতো হৃদয়টাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আপনি আজ আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু মিষ্টির মন থেকে আমাকে মুছতে পারবেন না। আমি চট্টগ্রামেই আছি। তিন দিন সময় দিলাম আপনাকে। আপনি নিজে দাঁড়িয়ে আমাদের বিয়ে দেবেন, নতুবা আমি মিষ্টিকে আইনিভাবে নিজের করে নিয়ে যাব। পছন্দ আপনার—সম্মানের সাথে জামাই মেনে নেবেন, নাকি জেদের বশে মেয়ের চিরকালের শত্রু হবেন।"

কথাগুলো বলে রায়ান মিষ্টির দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অপরিসীম প্রতিশ্রুতি আর নিশ্চিন্ততার আশ্বাস। রায়ান মিষ্টির হাতটা হালকা চেপে ধরে ছেড়ে দিলেন, তারপর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

মিষ্টি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রায়ানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে। আর ড্রয়িংরুমে প্রবীণ ইকরাম হোসেন নিজের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন—এক তরুণের এই অভূতপূর্ব চোখের তেজ আর গভীর ভালোবাসা দেখে তার ভেতরের কঠিন অহংকার যেন প্রথমবারের মতো কেঁপে উঠল।

চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসন ব্লু-র বিশ তলার ঘর থেকে নিচে পুরো শহরটাকে দেখা যায়। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি আর কালো মেঘের আনাগোনা। রায়ান কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হাতে কফির কাপ নিয়ে একদৃশ্যে তাকিয়ে ছিলেন বাইরের দিকে।

ইকরাম হোসেনকে দেওয়া তিন দিনের সময়সীমার আজ শেষ দিন। গত দুই দিন ধরে রায়ানের একটা মুহূর্তও শান্তিতে কাটেনি। তিনি মিষ্টির সাথে কোনো যোগাযোগের চেষ্টা করেননি, কারণ তিনি চেয়েছিলেন মিষ্টির পরিবার যেন বুঝতে পারে রায়ানের ভালোবাসা কোনো আবেগীয় ঝোঁক নয়, বরং গভীর আত্মবিশ্বাস।

হঠাৎ রায়ানের ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে এক অপরিচিত নম্বর। রায়ান ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই পরিচিত, কাঁপা কাঁপা অথচ পরম মিষ্টি কণ্ঠ।

"রায়ান..."

রায়ানের বুকটা এক অদ্ভুত আনন্দে কেঁপে উঠল। তিনি চোখ দুটো বন্ধ করে শান্ত গলায় বললেন, "বলো মিষ্টি। তোমার বাবার সিদ্ধান্ত কী?"

ওপাশ থেকে মিষ্টি একটু ফুপিয়ে উঠল, তবে সেই কান্নায় কষ্টের চেয়ে স্বস্তি ছিল বেশি। "বাবা আপনার সাথে দেখা করতে চান, রায়ান। আজ সন্ধ্যায় আমাদের পৈতৃক বাড়ি—নাসিরাবাদের বাংলোতে। বাবা বলেছেন, আপনি একা যেন আসেন।"

"আমি আসছি," রায়ান কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিলেন।

সন্ধ্যা সাতটা। বৃষ্টির বেগ কিছুটা বেড়েছে। রায়ান ঠিক সময়মতো ইকরাম হোসেনের বাংলোর সামনে গিয়ে গাড়ি থামালেন। আজ তার পরনে মার্জিত কালো রঙের একটি বন্ধগলা সুট। চোখ-মুখে কোনো অনিশ্চয়তা নেই, আছে কেবল এক গভীর স্থৈর্য।

ড্রয়িংরুমে ঢোকা মাত্রই রায়ান দেখলেন পরিবেশটা আগের দিনের মতো উত্তপ্ত নয়, বরং বেশ শান্ত। ঘরে শুধু ইকরাম হোসেন বসে আছেন, হাতে কিছু ফাইল আর পুরোনো একখানা অ্যালবামের পাতা।

রায়ান গিয়ে সালাম জানিয়ে তার মুখোমুখি বসলেন।

ইকরাম হোসেন চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে রায়ানের দিকে তাকিয়ে থাকার পর তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"গত তিন দিনে আমি তোমার ব্যাপারে অনেক খোঁজখবর নিয়েছি, রায়ান," প্রবীণ গলায় কিছুটা ক্লান্তি আর কিছুটা নমনীয়তা প্রকাশ পেল। "তোমার কর্পোরেট ইমেজের বাইরে তোমার পেছনের গল্পটাও আমি জেনেছি। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে নিজের চেষ্টায় আজকের এই অবস্থানে আসা, কোনো অন্যায় বা দুর্নীতির আশ্রয় না নিয়ে সততার সাথে ক্যারিয়ার তৈরি করা—এসব কিছু আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।"

রায়ান চুপ করে শুনে গেলেন, কোনো কথা বললেন না।

ইকরাম হোসেন টেবিলের ওপর থেকে লাল ভেলভেটের বাক্সটি—যা রায়ান তিন দিন আগে ফেলে গিয়েছিলেন—তা রায়ানের দিকে এগিয়ে দিলেন।

"আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আমার আভিজাত্যের অহংকারে আঘাত পেয়ে রাগের মাথায় বড় বড় কথা বলেছ। কিন্তু মিষ্টির চোখে তোমার জন্য যে ভালোবাসা আর তোমার চোখে মিষ্টির জন্য যে প্রতিশ্রুতির তেজ আমি দেখেছি, তা টাকা বা আভিজাত্য দিয়ে কেনা যায় না। আমার বন্ধুকে আমি মানা করে দিয়েছি।"

রায়ানের মুখে হালকা এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। "ধন্যবাদ, চৌধুরী সাহেব।"

"আমাকে সাহেব বলবে না, বাবা বলতে পারো," ইকরাম হোসেনের কণ্ঠে বাবাসুলভ স্নেহের স্পর্শ ফুটে উঠল। "তবে আমার একটা শর্ত আছে। বিয়ে চট্টগ্রামেই হবে, আর সম্পূর্ণ আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যে। তুমি রাজি?"

"আপনার প্রতিটি শর্ত আমার মাথা পেতে মঞ্জুর," রায়ান বিনীতভাবে বললেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পেছনের কাঠের দরজা ঠেলে মিষ্টি ভেতরে প্রবেশ করল। তার পরনে লাল-সোনালি সুতির জামদানি শাড়ি, চুলে তাজা বেলি ফুলের সুবাসিত মালা। মিষ্টির চোখ দুটো জলে টলমল করছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে এক অপরূপ সুন্দর হাসি।

ইকরাম হোসেন উঠে দাঁড়িয়ে মিষ্টির হাত ধরে রায়ানের হাতের ওপর এনে রাখলেন। "আমার মা-টাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম রায়ান। ও একটু চঞ্চল, একটু অবুঝ। কিন্তু ওর মনটা কাচের মতো পরিষ্কার। ওকেই সামলানোর দায়িত্ব এখন তোমার।"

ইকরাম হোসেন তাদের দুজনকে একা থাকার সুযোগ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ঘরে তখন কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বৃষ্টির মিষ্টি শব্দ। রায়ান মিষ্টির নরম দুটো হাত নিজের মুঠোয় জড়িয়ে ধরলেন। মিষ্টি একটুও দেরি না করে রায়ানের বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল। তার দু-হাত জড়িয়ে ধরল রায়ানের কোমর।

"আমি জানতাম আপনি আসবেন," মিষ্টি ফিসফিস করে বলল, তার চোখের জলে রায়ানের শার্টের বুক ভিজে যাচ্ছে। "আমি জানতাম আমার কঠোর বরফ-বস আমাকে কখনো এভাবে হেরে যেতে দেবেন না।"

রায়ান মিষ্টির থুতনি ধরে তার মুখটা একটু ওপরে তুললেন। মিষ্টির গালের ওপর গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুটা নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে নিলেন। রায়ান মিষ্টির কপালে এক দীর্ঘ, গভীর ও পবিত্র চুম্বন আঁকলেন।

"তোমাকে হারানোর চেয়ে আমার নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো, মিষ্টি," রায়ান নিচু, গভীর স্বরে বললেন। তার কণ্ঠ জুড়ে ছিল অপরসীম ভালোবাসা। "তোমার ওই দুষ্টুমি আর অবাধ্য হাসি ছাড়া আমার এই গোছানো জীবনটা যে একদম অর্থহীন।"

মিষ্টি মিষ্টি করে হাসল, তার গালে সেই সুপরিচিত টোলটা আবার জেগে উঠল। "তাহলে কি এখন থেকে বসের সব নিয়ম আমি ভাঙতে পারি?"

"আজ থেকে আমার জীবনের সব নিয়ম শুধু তোমার ইশারাতেই চলবে," রায়ান মিষ্টির কোমর ধরে তাকে আরো কাছে টেনে নিলেন।

দুজনের ঠোঁটের দূরত্ব কমে এলো, আর বাইরের ঝুম বৃষ্টি যেন তাদের এই দীর্ঘ বিরহ শেষের গভীর মিলনকে সাক্ষী রেখে আরো মুখরিত হয়ে উঠল। আগামীকালই তাদের নতুন জীবনের এক রঙিন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ির আদলে সাজানো বাংলো প্রাঙ্গণে আজ যেন আলোর উৎসব লেগেছে। চারপাশ লাল, হলুদ আর কাঁচা সোনার রঙের গাঁদা আর বেলি ফুলে ঢাকা। বাতাসে সুগন্ধি ধূপ আর আতরের মায়াবী সুবাস। সানাইয়ের মিষ্টি সুর মেখে এক অপরূপ আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে শুভ সন্ধ্যায়।

রায়ানের পরনে আজ রাজকীয় শেরওয়ানি, মাথায় মেরুন রঙের পাগড়ি। তার সেই আগের গম্ভীর, কেজো চেহারার লেশমাত্র নেই। তার বদলে মুখে রাজত্ব করছে পরম তৃপ্তি আর ভালোবাসার এক স্নিগ্ধ আভা। অফিসের সহকর্মীরা সবাই ঢাকা থেকে চলে এসেছে। তানভীর ভাই রায়ানের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন, "স্যার, সত্যি বলছি, আপনাকে আজ বস নয়, নিখাদ কোনো প্রেমিক রূপকথার রাজপুত্র লাগছে!"

রায়ান হালকা হেসে শুধু ঘড়ির দিকে তাকালেন। তার চোখে কেবল একজনেরই অপেক্ষা।

ঠিক তখনই সানাইয়ের সুর বদলে গেল। ধীর পায়ে ফুলের সাজানো ছাদ থেকে নেমে এলো মিষ্টি। পরনে ভারী লাল জামদানি শাড়ি, শরীরে সোনালি গয়নার দ্যুতি, মাথায় সূক্ষ্ম কারুকাজের ওড়না। চুলে আগের মতোই জড়িয়ে আছে তাজা বেলি ফুলের মালা। মিষ্টি তার লজ্জা রাঙা চোখ দুটো তুলে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ানের বুকের ধুকপুকানি যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এই রূপ, এই মিষ্টি হাসি কেবল তার—শুধু তার একার।

কাজী সাহেব যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আক্‌দের খুতবা পড়ে মিষ্টিকে জিজ্ঞাসা করলেন, মিষ্টি একনজর রায়ানের দিকে তাকাল। রায়ানের চোখের সেই গভীর আশ্বাস দেখে তার সব ভয় দূর হয়ে গেল। মিষ্টি খুব স্পষ্ট, মিষ্টি কণ্ঠে বলল, "কবুল।"

রায়ানের পালা এলে তিনি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। গম্ভীর কিন্তু পরম মমতায় উচ্চারণ করলেন, "কবুল।"

এক মুহূর্তে পুরো আঙিনা আনন্দ আর করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল। ইকরাম হোসেন চোখের জল মুছে দুই সন্তানকে কাছে ডেকে বুকভরে দোয়া করে দিলেন।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত তখন বেশ গভীর। কোলাহল শান্ত হয়ে এসেছে। ফুল দিয়ে সাজানো নতুন বর-কনের ঘরটি যেন এক টুকরো স্বর্গ। কাচের জানালা দিয়ে বাইরের নিঝুম রাতের আলো-ছায়া এসে পড়েছে বিছানায়।

রায়ান ঘরের দরজা বন্ধ করে মিষ্টির দিকে এগিয়ে এলেন। মিষ্টি খাটের কোণে বসে রেশমি আঁচল আঙুলে পেঁচাচ্ছিল, তার বুকের ভেতরের স্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

রায়ান মিষ্টির পাশে এসে বসলেন। মিষ্টির মাথায় হাত রেখে আলতো করে তার ওড়নাটি সরিয়ে দিলেন। গয়নার আলো আর মোমের ম্লান আলোয় মিষ্টির লজ্জা রাঙা মুখটা অদ্ভুত এক মায়ায় জ্বলজ্বল করছে।

"মিষ্টি..." রায়ান নিচু, গভীর স্বরে ডাকলেন।

মিষ্টি চোখ তুলে তাকাতেই রায়ানের বলিষ্ঠ হাত দুটো তাকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের খুব কাছাকাছি টেনে নিল। রায়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস মিষ্টির ঘাড়ে এসে আছড়ে পড়ল। মিষ্টি শিউরে উঠে রায়ানের শেরওয়ানির কলার শক্ত করে চেপে ধরল।

"তোমাকে যখন প্রথম দিন অফিসে কফি হাতে নিয়ে ঢুকতে দেখেছিলাম," রায়ান মিষ্টির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, "তখনই বুঝেছিলাম আমার গুছানো, হিসেবি পৃথিবীটা আর আগের মতো থাকবে না। তুমি এসে আমার সব শৃঙ্খল ভেঙে দিলে।"

মিষ্টি একটু হেসে তার গালের টোলটা ভাসিয়ে তুলল। "আর আপনি? আপনি তো আমাকে প্রতিদিন আপনার ওই গম্ভীর চাউনি দিয়ে ভয় দেখাতেন! অথচ ভেতরে বরফের নিচে একটা বিশাল ভালোবাসার সমুদ্র লুকিয়ে রেখেছিলেন।"

"সেই সমুদ্র এখন শুধুই তোমার, মিষ্টি," রায়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।

তিনি মিষ্টির থুতনি আলতো করে ধরে তার ভেজা, মেহেন্দির সুবাসে ভরা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন। এক দীর্ঘ, গভীর, তৃষ্ণার্ত চুম্বন। সব অপেক্ষা, সব বাধা পেরিয়ে দুজনের আত্মা যেন এক সুতোয় বেঁধে গেল। মিষ্টি তার নরম দুটো হাত রায়ানের গলায় জড়িয়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল রায়ানের অনুভূতির কাছে।

ঘরের দীপশিখাটা হালকা বাতাসে কেঁপে উঠল, বাইরের আকাশে চাঁদটা মেঘের আড়াল থেকে হেসে উঠল। রায়ান আর মিষ্টির এই গল্পটি হয়তো শুরু হয়েছিল এক গম্ভীর বস আর চঞ্চল ইন্টার্নের হিসেব-নিকেশের গোলকধাঁধায়, কিন্তু তার সমাপ্তি ঘটল এক অমর, গভীর ও চিরন্তন ভালোবাসার বাঁধনে।

তাদের জীবন এখন আর শুধু নির্দিষ্ট কোনো নিয়মে বাঁধা নয়—তা এখন প্রেমে, দুষ্টুমিতে আর একসাথে পথচলার অফুরন্ত আনন্দে ভরপুর এক পরিপূর্ণ গল্প।

 

....
👁 19