বিয়ের সানাইয়ের শব্দ যখন শেষ হলো, তখন রাত পেরিয়ে ভোর হওয়ার পথে। লাল বেনারসি, ভারি গহনা আর মাথায় চওড়া ঘোমটা টেনে ঘরের এক কোণে বসে ছিল নেহা। ওর শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে, কিন্তু মনের ভেতর চলছে অজানা এক ঝড়। এক রাজকীয় আয়োজনে রিফাতের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। সমাজ যাকে বলে ‘আদর্শ সম্বন্ধ’—ধনী পরিবার, সুদর্শন বর, আর সম্ভ্রান্ত বংশ। কিন্তু নেহার কাছে রিফাত সম্পূর্ণ এক অচেনা পুরুষ।
হঠাৎ দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দে নেহার বুকটা কেঁপে উঠল। রিফাত ভেতরে ঢুকল। পরনের শেরোয়ানিটা খুলে সে আলনাতে ছুঁড়ে মারল। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত তিনটে। রিফাতের চেহারায় কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই, বরং চোখের দৃষ্টিতে রয়েছে এক অদ্ভুত তীব্রতা। সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে নেহার একদম সামনে দাঁড়াল।
নেহা মাথা নিচু করে রইল। রিফাত নিচু হয়ে নেহার চিবুক ধরে মুখটা উপরে তুলল। ওর আঙুলের স্পর্শ শক্ত, কিন্তু আলতো। নেহার চোখে চোখ রেখে রিফাত একটা হালকা হাসি দিল। সেই হাসিতে ভালোবাসা নাকি অন্য কোনো অধিকারের তৃপ্তি ছিল, নেহা বুঝতে পারল না।
"তুমি জানো নেহা, এই দিনটার জন্য আমি কতদিন অপেক্ষা করেছি?" রিফাতের কণ্ঠস্বর বেশ নিচু, কিন্তু ভারী।
নেহা কিছু বলতে পারল না। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শুধু আলতো করে মাথা নাড়ল।
রিফাত নেহার ঘোমটাটা ধীরে ধীরে সরিয়ে দিল। লাল আলোর নিচে নেহার মুখটা যেন এক অপূর্ব কাব্যের মতো লাগছিল। রিফাত ওর গালের ওপর হালকা হাত বুলিয়ে দিল।
"তুমি এখন সম্পূর্ণ আমার," রিফাত ফিসফিস করে বলল। "শুধু আমার। এই ঘরে, এই জীবনে আর এই নিশ্বাসে তোমার আর কোনো নিজস্ব সত্তা নেই।"
কথাটা শুনে নেহার শরীরের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ভালোবাসা প্রকাশ করার এই ভঙ্গিটা কেমন যেন শোনালো। কিন্তু নতুন বিয়ের ঘোরে নেহা বিষয়টাকে খুব গভীরে নিয়ে ভাবল না। সে ভাবল, হয়তো পুরুষের ভালোবাসার ধরন এমনই হয়—একটু তীব্র, একটু জেদী।
রিফাত বিছানায় নেহার পাশে বসল। নেহার হাত দুটো নিজের শক্ত দুটি হাতের মুঠোয় নিল। রিফাতের ছোঁয়া পেতে নেহার শরীর শিউরে উঠল। রিফাত নেহার দিকে ঝুঁকে এল। ওর সুগন্ধি আর পুরুষালী উত্তাপ নেহাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। রিফাত নেহার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতেই নেহা চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
"আমাকে ভয় পাচ্ছ?" রিফাত শুধালো।
"না..." নেহা খুব কষ্টে উত্তর দিল।
"পাওয়া উচিতও নয়," রিফাতের ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটল। "কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসব নেহা। এত ভালোবাসব যে তুমি সেই ভালোবাসার চাপে দম আটকে মারা যেতে চাইবে। কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।"
কথাগুলোর মাঝে এক চরম আকর্ষণ আর ভয়ের মিশেল ছিল। রিফাত নেহার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। রাতের নীরবতায় রিফাতের ঘন নিশ্বাস নেহার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছিল। রিফাত অত্যন্ত পরম মমতায় নেহার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলালো। কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরতার মাঝে কেমন যেন এক অধিপত্যের গন্ধ ছিল। নেহা নিজেকে রিফাতের বাহুডোরে সঁপে দিল, কিন্তু তার মনে এক অজানা বিষাদ দানা বাঁধতে শুরু করল।
পরদিন সকালের আলো যখন ঘরে এসে পড়ল, নেহার ঘুম ভাঙল রিফাতের আগেই। তার সমস্ত শরীরে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ক্লান্তি। রিফাত তখনও নেহাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছিল। রিফাতের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া নেহার জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। রিফাত যেন ঘুমেও নেহাকে বন্দি করে রেখেছে।
নেহা আলতো করে রিফাতের হাতটা সরানোর চেষ্টা করতেই রিফাত চোখ মেলল। চোখের পলকে ওর ঘুমন্ত চেহারার কোমলতা উধাও হয়ে গেল।
"কোথায় যাওয়ার চেষ্টা করছ?" রিফাতের কণ্ঠ চড়ে গেল।
"সকাল হয়ে গেছে রিফাত... শাশুড়ি আম্মা হয়তো ডেকে পাঠাবেন," নেহা ভয়ে ভয়ে বলল।
রিফাত শক্ত করে নেহার কবজি চেপে ধরল। ব্যথায় নেহার মুখটা কোঁকড়ে উঠল।
"আমি যতক্ষণ না চাইব, তুমি এই বিছানা ছেড়ে এক পা-ও নড়বে না," রিফাত গম্ভীর কণ্ঠে বলল। "আমার অনুমতি ছাড়া এই ঘরের বাইরে তোমার কোনো পৃথিবী নেই।"
"রিফাত, হাতটা ছাড়ো, লাগছে..." নেহা চোখ ভর্তি জল নিয়ে বলল।
নেহার চোখের জল দেখে রিফাতের দৃষ্টিভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গেল। সে নেহার কবজি ছেড়ে দিয়ে সাথে সাথে ওকে বুকে টেনে নিল। নেহার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বলল, "আহা সোনা আমার, কেঁদো না। আমি তোমাকে ভালোবাস বলেই তো কাছে রাখতে চাই। তুমি চলে গেলে আমার কষ্ট হয় যে! তুমি কি চাও আমি কষ্ট পাই?"
রিফাতের এই হঠাৎ পরিবর্তন নেহাকে চমকে দিল। একটু আগেই যে লোকটা কঠিনভাবে হাত চেপে ধরেছিল, সে-ই এখন ছোট বাচ্চার মতো আদর করছে!
"না, আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও," নেহা নিচু কণ্ঠে বলল।
"তাহলে কখনো আমার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার কথা চিন্তা করবে না। বুঝলে?" রিফাত নেহার কপালে আর গালে চুমুর বৃষ্টি ছড়িয়ে দিল।
নেহা রিফাতের বুকে মুখ লুকাল। সে বুঝতে পারছে না এই ভালোবাসা নাকি ভালোবাসার নামে এক অদৃশ্য জেলখানা। রিফাতের ছোঁয়ায় যেমন এক তীব্র উন্মাদনা আর মাতলব আছে, তেমনই রয়েছে এক ভীতিপ্রদ অন্ধকার।
সকালের নাশতার টেবিলে গিয়েও নেহা একই অভিজ্ঞতা লাভ করল। রিফাত নিজেই নেহাকে খাইয়ে দিচ্ছিল, সবার সামনে নেহার যত্ন নিচ্ছিল। কিন্তু নেহার ফোন বাজতেই রিফাতের চোখ মুখ আবার বদলে গেল।
ফোনটা ছিল নেহার ছোট ভাইয়ের। নেহা ফোনটা রিসিভ করতেই রিফাত তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল এবং স্পিকার অন করল।
"আপু! কেমন আছিস?" ওপাশ থেকে ছোট ভাই ফাহিম বলল।
"আমি ভালো আছি ফাহিম, তুই..." নেহা কথা শেষ করার আগেই রিফাত কলটা কেটে দিল।
"তোমার বাপের বাড়ির লোক তোমাকে এত ঘনঘন ফোন দেবে না," রিফাত ঠান্ডা গলায় বলল। "এখন থেকে তোমার সব মনোযোগ শুধু এই পরিবারের ওপর আর আমার ওপর থাকবে।"
শাশুড়ি আম্মা পাশেই বসে ছিলেন, তিনি হেসে বললেন, "আহা রিফাত, বউকে এত আগলে রাখিস কেন? একটু তো নিজের পরিবারের সাথে কথা বলতে দে।"
"আম্মা, তুমি মাঝখানে কথা বলবে না," রিফাত রুক্ষভাবে বলল। "নেহা এখন আমার বউ। ও কার সাথে কথা বলবে, না বলবে সেটা আমি ঠিক করব।"
পুরো ডাইনিং টেবিলে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল। নেহার বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল। সে বুঝতে পারল, রিফাত কেবল একজন স্বামী নয়—সে এক চরম একচ্ছত্র শাসক। সে নেহাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসা নেহার স্বাধীনতা, নেহার হাসি, এমনকি নেহার নিজের অস্তিত্বকে প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাবে।
বিকেলে নেহা যখন নিজের ঘরে একা বসে জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল, রিফাত পেছন থেকে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। নেহার ঘাড়ে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে খুব মৃদু স্বরে বলল, "তুমি কি আমার ওপর রেগে আছ, নেহা?"
"না," নেহা উত্তর দিল।
"রাগ কোরো না। আমি তোমাকে এত ভালোবাসি যে অন্য কারোর সাথে তোমাকে ভাগ করতে পারি না। এমনকি তোমার নিজের ভাইয়ের সাথেও না। তুমি শুধু আমার, নেহা... শুধু আমার।"
রিফাতের ঠোঁট আবার নেহার স্পর্শে ব্যাকুল হয়ে উঠল। নেহা কোনো বাধা দিল না।
নতুন পরিবেশ, অজানা ঘরসংসার আর রিফাতের অদ্ভূত সব আচরণে নেহার জীবন যেন একটা অচেনা গোলকধাঁধায় পড়ে গেল। বিয়ের এক সপ্তাহ পার হতে চলল, কিন্তু নেহা যেন নিজের ছায়াকেও ভয় পেতে শুরু করেছে। রিফাতের ভালোবাসার ধরনটা বড় বিচিত্র—এক মুহূর্তে সে পৃথিবীর সবচেয়ে অনুগত ও পাগল প্রেমিক স্বামী, তো পরের মুহূর্তেই সে এক কঠোর ও ক্ষমতাহীন শাসক।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নেহা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে তার চুল আঁচড়াচ্ছিল। আয়নায় নিজেকে দেখে তার নিজেরই অচেনা লাগছিল। চোখের নিচে হালকা কালি, গায়ের বেনারসির আভিজাত্য মলিন হয়ে এসেছে মনের ভেতরের অস্থিরতায়।
হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল রিফাত। তার হাতে একটি সুন্দর দামি শপিং ব্যাগ। রিফাতের মুখে এক গাল উজ্জ্বল হাসি, চোখ দুটো আনন্দে চকচক করছে।
"নেহা! দেখো তোমার জন্য কী এনেছি," রিফাত ব্যাগটা নেহার কোলের ওপর রেখে বলল।
নেহা ব্যাগ খুলতেই দেখল ভেতরে চমৎকার একটি নীল রঙের জামদানি শাড়ি। রংটা এত সুন্দর যে নেহার চোখ জুড়িয়ে গেল।
"পছন্দ হয়েছে?" রিফাত নেহার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল, আয়নায় নেহার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল।
"খুব সুন্দর রিফাত... অনেক ধন্যবাদ," নেহা হালকা হেসে বলল।
"তাহলে এখনই এটা পরো। আজ আমরা বাইরে ডিনার করব," রিফাত নেহার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল।
নেহার মনে কিছুটা স্বস্তি এলো। ভাবল, হয়তো বাইরে গেলে পরিবেশটা একটু হালকা হবে। সে শাড়িটা নিয়ে ওয়াশরুমে গেল এবং শাড়ি পরে বের হয়ে এলো। নীল শাড়িতে নেহাকে সত্যিই রাজকন্যার মতো লাগছিল।
রিফাত নেহার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর কাছে এসে নেহার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। রিফাতের নিশ্বাস নেহার কানে আছড়ে পড়ল, "তোমাকে এত সুন্দর লাগছে যে আমার ইচ্ছে করছে না তোমাকে বাইরের কেউ দেখুক। আমার মন চাইছে তোমাকে এই ঘরে বন্দি করে রাখি, যেন তোমার রূপ শুধু আমি একাই উপভোগ করতে পারি।"
কথাগুলো শুনতে রোমান্টিক মনে হলেও নেহার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। রিফাত নেহার গালে দীর্ঘ এক চুমু দিল। কিন্তু ঠিক পরমুহূর্তেই রিফাতের চোখ গেল নেহার গলায়। নেহা গলায় একটি ছোট ও সাধারণ সোনার চেইন পরেছিল, যা তার বাবা বিয়েতে উপহার দিয়েছিল।
মুহূর্তের মধ্যে রিফাতের হাসিখুশি মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টিতে নেমে এলো এক ভয়ঙ্কর কালো মেঘ।
"এই চেইনটা কেন পরেছ?" রিফাতের কণ্ঠের উত্তাপ এক মুহূর্তে বদলে গেল।
নেহা চমকে উঠে হাত দিয়ে চেইনটা ছুঁলো, "এটা... এটা তো বাবা দিয়েছিল বিয়ের দিন। তাই পরলাম..."
"আমি তোমাকে আজ সকালে একটা হিরের নেকলেস কিনে দিয়েছিলাম না?" রিফাত নেহার দিকে এক পা এগিয়ে এসে নিচু অথচ কঠিন গলায় বলল। "সেটা পরোনি কেন?"
"ওটা অনেক ভারী রিফাত, তাই একটু হালকা..."
নেহা কথা শেষ করার আগেই রিফাত এক ঝটকায় নেহার গলার চেইনটা টান মেরে ছিঁড়ে ফেলল।
"আহ!" নেহা ব্যথায় কেঁদে উঠল। তার নরম গলায় লাল দাগ বসে গেল।
রিফাত ছিঁড়ে যাওয়া চেইনটা মেঝето ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর নেহার দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করাল।
"তোমার শরীরে যা কিছু থাকবে, তা আমার দেওয়া হতে হবে! তোমার বাপের বাড়ির কোনো কিছুর জায়গা এখানে নেই! বুঝেছ তুমি?" রিফাত গর্জে উঠল।
নেহার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে ব্যথায় ও ভয়ে কাঁপছিল, "রিফাত... লাগছিল আমার..."
নেহার চোখের জল দেখতেই রিফাতের কঠিন চেহারাটা ধপ করে নিভে গেল। সে যেন হঠাৎ করে জেগে উঠল। নিজের হাতের দিকে তাকাল, তারপর নেহার কান্নার দিকে তাকাল। রিফাতের মুখাবয়বে চরম অনুশোচনা ফুটে উঠল।
"ওহ খোদা! আমি কী করলাম!" রিফাত দ্রুত নেহাকে হাঁটু গেড়ে জড়িয়ে ধরল। নেহার পেটে মুখ গুঁজে দিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলতে লাগল, "আমাকে মাফ করে দাও সোনা... আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি নেহা। তোমাকে অন্য কারোর দেওয়া কিছু পরা অবস্থায় দেখলে আমার হিংসা হয়! আমি চাই তুমি কেবল আমার দেওয়া জিনিসে সাজো। তুমি আমায় মাফ করবে না?"
রিফাত নেহার গলায় ছিঁড়ে যাওয়া স্থানে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতে লাগল। নেহার গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিল। এই মানুষটাকে সে কীভাবে বুঝবে? এক মুহূর্তে সে শয়তানের মতো হিংস্র, আবার পরের মুহূর্তেই অবোধ শিশুর মতো ক্ষমা প্রার্থনাকারী!
"ঠিক আছে রিফাত... ছাইড়ো না..." নেহা ফিসফিস করে বলল।
রিফাত উঠে দাঁড়িয়ে নেহার গালের জল পরম মমতায় মুছে দিল। নিজের হাতে ড্রয়ার থেকে ভারী হিরের নেকলেসটা বের করে নেহার গলায় পরিয়ে দিল। তারপর নেহার কপালে গভীর এক ভালোবাসার ছোঁয়া দিল।
"এখন তোমাকে একদম আমার মনের মতো লাগছে," রিফাত মিষ্টি হেসে বলল। "চলো, রেস্তোরাঁয় যাওয়া যাক।"
রেস্তোরাঁয় পৌঁছে নেহার দম যেন আরও আটকে আসতে লাগল। পুরো ডিনার টেবিলে রিফাত অত্যন্ত যত্নশীল স্বামীর ভূমিকা পালন করছিল। সে নেহার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিল, নেহার হাত চেপে ধরে রাখছিল। কিন্তু নেহার মনে হচ্ছিল, সে কোনো খাঁচায় বসে আছে।
খাওয়ার মাঝপথে নেহার কলেজের এক পুরনো বন্ধু সাজিদ কাকতালীয়ভাবে সেই রেস্তোরাঁয় এলো। নেহাকে দেখে সে এগিয়ে এলো।
"নেহা! আরে কেমন আছিস? তোকে তো বিয়েতে কত সুন্দর লাগছিল!" সাজিদ হেসে বলল।
নেহা একটু ইতস্তত করে বলল, "হ্যাঁ সাজিদ... ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?"
"ভালো। ইনিই বুঝি রিফাত ভাই?" সাজিদ হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল।
রিফাত ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল। কিন্তু সে সাজিদের সাথে হাত মেলাল না। তার চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক নৃশংস আক্রোশ।
"আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলার আগে আমার দিকে তাকানো শেখো," রিফাত বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল।
সাজিদ হকচকিয়ে গেল, "মানে? রিফাত ভাই, আমি তো শুধু..."
"নেহা, চলো," রিফাত আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নেহার হাত টেনে ধরল।
"রিফাত, শোনো... ও তো শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ করছিল..." নেহা নিচু স্বরে বলতে চাইল।
কিন্তু রিফাত কোনো কথা শুনল না। নেহার হাত প্রায় হেঁচড়ে টেনে রেস্তোরাঁ থেকে বের করে গাড়িতে গিয়ে তুলল। গাড়িতে উঠে রিফাত গাড়িটা প্রচণ্ড গতিতে চালাতে শুরু করল। স্টিয়ারিং হুইলে তার হাতের রগগুলো ফুলে উঠছিল।
"রিফাত! আস্তে চালাও! দুর্ঘটনা ঘটবে!" নেহা ভয়ে চিৎকার করে উঠল।
রিফাত কোনো উত্তর দিল না। গাড়িটা সশব্দে বাড়ির গ্যারেজে এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেহাকে একপ্রকার টেনেই নিজের ঘরে নিয়ে এলো রিফাত। ঘরের দরজা ধাম করে বন্ধ করে নেহাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। রিফাতের নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল, চোখের মনিগুলো বিষাক্ত দেখাচ্ছিল।
"কে ওই লোকটা? কেন ও তোমার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছিল?" রিফাত নেহার চিবুক চেপে ধরে বলল।
"ও আমার কলেজের বন্ধু রিফাত, বিশ্বাস করো আর কিছুই না!" নেহা কাঁদতে কাঁদতে বলল।
"তোমার কোনো পুরুষ বন্ধু থাকতে পারে না!" রিফাত চিৎকার করে উঠল। "তোমার জগতের একমাত্র পুরুষ আমি! আর কেউ না!"
কথাটা বলেই রিফাত নেহার ঠোঁটে আছড়ে পড়ল। তার এই চুম্বন মোটেও নরম ছিল না, তার মধ্যে ছিল রাগ, জেলাসি আর চরম এক হিংস্র রোমান্স। নেহা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারল না। রিফাতের শক্ত দুটি বাহু নেহাকে পিষে মারার মতো জড়িয়ে রাখল।
রিফাত নেহার নীল জামদানি শাড়িটা এক টানে ছিঁড়ে ফেলল। নেহার শরীরটা নগ্ন ক্যানভাসের মতো ফুটে উঠল রিফাতের সামনে। রিফাত নেহার উন্মুক্ত কাঁধে ও পিঠে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল। নেহার আর্তনাদ ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল, কিন্তু রিফাত থামল না।
সে নেহাকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। ভালোবাসার নামে এক তপ্ত শোষণে মেতে উঠল রিফাত। তার প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি আলিঙ্গন নেহার মনে করিয়ে দিচ্ছিল—সে এখন থেকে শুধু একজন মানুষেরই বন্দি।
রাত যখন গভীর হলো, তখন রিফাত ক্লান্ত হয়ে নেহার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। তার এক হাত তখনও নেহার কোমর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল।
চাঁদের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে এসে পড়েছে। নেহা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। তার কাঁধে রিফাতের কামড়ের দাগ জ্বলছে, গলায় বাবার দেওয়া চেইনের লাল ক্ষতচিহ্ন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি রক্তক্ষরণ হচ্ছে তার মনের ভেতরে।
নেহা বুঝতে পারল, সে এক বিষাক্ত ভালোবাসার ফাঁদে আটকে গেছে। এই ভালোবাসা থেকে মুক্তি নেই, কারণ এই ভালোবাসার নাম রিফাত। আর রিফাতের প্রেম মানেই এক ধীরে ধীরে আত্মাহুতি দেওয়া।
ভোরের আলো ফোটার আগেই নেহার ঘুম ভেঙে গেল। সমস্ত শরীরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি ও ব্যথা। রিফাত তখনও তার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, ঠিক যেন কোনো অবোধ শিশু। ওর শান্ত ও নি নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে নেহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কাল রাতের সেই হিংস্র লোকটা আর এই ঘুমন্ত লোকটা কি সত্যিই একই মানুষ?
নেহা খুব সাবধানে নিজেকে রিফাতের বাঁধন থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু একটু নড়তেই রিফাতের হাত দুটো আবার নেহার কোমর শক্ত করে চেপে ধরল।
"কোথায় যাচ্ছ?" চোখ না খুলেই ঘুমজড়ানো ভারী গলায় শুধাল রিফাত।
"একটু ওয়াশরুমে যাব..." নেহা নিচু কণ্ঠে উত্তর দিল।
রিফাত চোখ মেলল। ওর চোখের চাহনিতে কাল রাতের সেই তান্ডবের কোনো ছাপ নেই। সে অত্যন্ত পরম আদরে নেহার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
"তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমাকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না," রিফাত মিষ্টি হেসে বলল।
নেহা দ্রুত বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকাতেই তার চোখ জলে ভরে উঠল। গলার নিচে লালাভ কামড়ের দাগ, কাঁধে রিফাতের নখের গভীর ক্ষত। নিজের শরীরটাকে তার বড্ড অচেনা লাগছে। এই দাগগুলো কেবল শরীরের নয়, এগুলো তার স্বাধীনতার ওপর পড়া এক একটি সিলমোহর।
পরের কয়েকদিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল। রিফাত নেহার ওপর নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। সে নেহার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটা একপ্রকার কেড়েই নিল।
"তোমাকে তো বাইরে যেতে হয় না, আর ঘরে ল্যান্ডলাইন আছে। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়," শান্ত গলায় যুক্তি দিয়েছিল রিফাত। নেহা প্রতিবাদ করার সাহস পায় নাই।
একদিন দুপুরে শাশুড়ি আম্মা নেহার ঘরে এলেন। হাতে একটা ছোট বাটি, তাতে নেহার প্রিয় আম কাসুন্দি মাখা।
"বউমা, নাও একটু খেয়ে দ্যাখো। সকাল থেকে তো কিছুই খেলে না," শাশুড়ি আম্মা স্নেহের স্বরে বললেন।
নেহা বাটিটা হাতে নিয়ে একটু হাসল, "ধন্যবাদ আম্মা।"
শাশুড়ি আম্মা নেহার পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। হঠাৎ তার চোখ গেল নেহার হাতের কবজিতে থাকা কালশিটে দাগগুলোর দিকে। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"বউমা... রিফাত তোমাকে ভালোবাসে," শাশুড়ি আম্মা খুব নিচু গলায় বললেন। "ওর রাগটা একটু বেশি, ছোটবেলা থেকেই যা চায় তা নিজের করে পেতে পছন্দ করে। একটু সহ্য করে নিও মা। সব সংসারেই তো একটু-আধটু এমন হয়।"
নেহা অবাক হয়ে শাশুড়ির দিকে তাকাল। একজন মা কি করে নিজের ছেলের এই মানসিক অত্যাচারকে সাধারণ ব্যাপার বলে উড়িয়ে দিতে পারেন?
"আম্মা, এটাকে রাগ বলা যায় না," নেহা ধীর কণ্ঠে বলল। "এটা এক ধরনের বন্দিদশা। উনি আমাকে শ্বাস নিতেও দেন না।"
শাশুড়ি আম্মা আর কথা বাড়ালেন না। কেবল একটা দুঃখী হাসি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নেহা বুঝল, এই বাড়িতে তার কষ্ট বোঝার মতো কেউ নেই।
বিকেলে হঠাৎ নেহার মা আর বাবা ওদের বাড়িতে দেখতে এলেন। মেয়েকে দেখতে পেয়ে নেহার চোখে জল এসে গেল। সে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
"কেমন আছিস আম্মা?" বাবার কণ্ঠ শুনে নেহার ভেতরের সব কান্নারা বাঁধ ভাঙতে চাইল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
"ভালো আছি বাবা। তোমরা কেমন আছ?"
ড্রয়িংরুমে সবাই বসে চা খাচ্ছিল। ঠিক তখনই রিফাত অফিস থেকে ফিরে এলো। শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখে সে অত্যন্ত বিনয়ী আচরণ করল। কদমবুসি করে কুশল জিজ্ঞেস করল। রিফাতের এই ভদ্র ও সভ্য রূপ দেখে যে কেউ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জামাই বলে মনে করবে।
চা পর্ব শেষে নেহার বাবা বললেন, "রিফাত বাবা, নেহাকে দু-একদিনের জন্য আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছিলাম। ওর মা খুব মিস করছে ওকে।"
মুহূর্তের মধ্যে রিফাতের হাসিখুশি চেহারাটা হিমশীতল হয়ে গেল। তবে সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেকে সামলে নিল।
"আঙ্কেল, আমি তো নেহাকে পাঠাতে এক পায়ে রাজি," রিফাত আফসোসের সুরে বলল। "কিন্তু সমস্যা হলো, আগামী পরশুই আমার একটা জরুরি বিজনেস ট্রিপ আছে বান্দরবানে। নেহাকে ছাড়া আমি তো এক দিনও থাকতে পারি না। তাই ওকে আমার সাথে যেতেই হবে। অন্য আরেকদিন না হয় যাবে?"
নেহার বাবা হেসে বললেন, "ও আচ্ছা, তাই নাকি? ঠিক আছে বাবা, কাজের ক্ষতি করে যাওয়ার দরকার নেই। পরে আসবে এখন।"
নেহা স্তব্ধ হয়ে রিফাতের দিকে তাকাল। কোনো বিজনেস ট্রিপের কথা রিফাত তাকে আগে বলেনি। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, এটা কেবল তাকে বাবার বাড়ি না পাঠানোর একটা বাহানা।
বাবা-মা চলে যাওয়ার পর রিফাত নেহাকে ঘরে ডেকে নিয়ে দরজা লক করে দিল।
"তুমি কি তোমার বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য খুব ব্যাকুল হয়ে উঠেছ?" রিফাত নেহার কাঁধে হাত রেখে বলল।
"মা-বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করে রিফাত, এতে অন্যায় কী?" নেহা সাহস সঞ্চয় করে প্রশ্ন করল।
রিফাত নেহার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল, "অন্যায় এটাই যে, তোমার কাছে আমার চেয়ে অন্য কেউ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে! তুমি কি জানো না, তুমি আমার কাছ থেকে দূরে গেলে আমি পাগল হয়ে যাই?"
"রিফাত, এটা ভালোবাসা নয়! এটা এক ধরনের রোগ!" নেহা চিৎকার করে উঠল।
কথাটা শোনামাত্রই রিফাত সজোরে নেহার গালে এক থাপ্পড় মারল। নেহা সামলাতে না পেরে খাটের ওপর পড়ে গেল। ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
রিফাত ধীরে ধীরে নেহার দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে হিংস্রতার চরম শিখা। সে নেহার চুল শক্ত করে ধরে তাকে নিজের দিকে টানল।
"আমাকে রোগগ্রস্ত বললে নেহা?" রিফাতের কণ্ঠস্বর নিচু কিন্তু বিষাক্ত। "তাহলে শোনো, এই রোগের নামই প্রেম। আর এই প্রেমে তোমাকেও আমার সাথে জ্বলতে হবে।"
রিফাত নেহাকে খাট থেকে টেনে তুলে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নেহার ঠোঁটের রক্তে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে দিয়ে এক হিংস্র চুম্বনে মেতে উঠল। নেহা ছটফট করছিল, কিন্তু রিফাতের পশুর মতো শক্তির কাছে সে পুরোপুরি পরাস্ত।
রিফাত নেহার পরনের শাড়িটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। ঘরে এসি চললেও রিফাতের উত্তপ্ত নিশ্বাসে ঘাম ঝরছিল। সে নেহার নরম পেটে ও বুকে নিজের ঠোঁট আর দাঁতের ছাপ বসিয়ে দিল। ভালোবাসার অজুহাতে নেহার ওপর চলল এক অমানবিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার।
রাত যখন নিঝুম, নেহা বিছানার কোণে নিথর হয়ে পড়ে রইল। তার চোখের জল এখন শুকিয়ে গেছে। শরীর আর মনের সমস্ত অনুভূতির যেন মৃত্যু ঘটেছে।
রিফাত পাশেই শুয়ে পরম সুখে ঘুমাচ্ছে। তার এক হাত নেহার পেটের ওপর শক্ত করে রাখা।
নেহা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই সোনার খাঁচায় কি তাকে সারা জীবন পচে মরতে হবে? নাকি এই অন্ধকারের শেষ কোথাও আলো আছে? কিন্তু যে শিকল ভালোবাসার নামে পরানো হয়, তা ভাঙা কি এতই সহজ?
পরদিন সকালে সূর্যের তীব্র আলো যখন জানালার পর্দা টপকে ঘরে এসে পড়ল, নেহার চোখ জ্বলছিল। কাল রাতের তান্ডবের পর সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারেনি। তার সমস্ত শরীর যেন অসাড় হয়ে আছে। বিছানার পাশে রিফাত শুয়ে আছে, ওর শান্ত ঘুমে ঢাকা মুখটা দেখলে বোঝার উপায় নেই যে কাল রাতে এই লোকটাই তাকে এক হিংস্র দানবের মতো দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে।
নেহা ধীর পায়ে খাট থেকে নামল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের ছায়াকে দেখে নিজেরই ঘেন্না লাগল। ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা লাল রক্ত, ঘাড়ে ও বুকে রিফাতের নখ আর দাঁতের গভীর ক্ষত। এগুলো শুধু ক্ষতের দাগ নয়, এগুলো নেহার অপমানের ও বন্দিদশার চিহ্ন।
হঠাৎ পেছনে রিফাতের উপস্থিতি টের পেল নেহা। রিফাত এসে পিছন থেকে নেহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর চিবুকটা নেহার উলঙ্গ কাঁধে রাখল।
"কাল রাতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল নেহা," রিফাত ফিসফিস করে বলল। ওর নিশ্বাস নেহার চামড়ায় আছড়ে পড়ল। "তোমার এই কান্নাকাটি, তোমার এই যন্ত্রণায় ছটফট করা—এগুলো আমাকে আরও পাগল করে তোলে। তুমি আমার প্রতিটা আঘাত সহ্য করো, আর তাতেই প্রমাণিত হয় তুমি শুধু আমার।"
নেহা কোনো কথা বলল না। কথা বলার শক্তিও তার অবশিষ্ট ছিল না। সে আয়নায় রিফাতের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে এক পরম তৃপ্তি আর চরম আধিপত্য ছাড়া আর কিছুই নেই।
"চলো, আজ তোমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাব," রিফাত নেহার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল।
"আমার শরীর ভালো নেই রিফাত... আমি কোথাও যেতে চাই না," নেহা খুব নিচু কণ্ঠে বলল।
রিফাতের নরম চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই হিংস্র লোকটা আবার জেগে উঠল। সে এক ঝটকায় নেহার চুল ধরে টেনে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরাল।
"আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি নেহা, আদেশ করেছি," রিফাতের কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠান্ডা। "আমার সাথে হাসিমুখে বাইরে যাবে। আর সেখানে এমন ভাব করবে যেন তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী। বুঝেছ?"
নেহা শুধু মাথা নাড়ল। অশ্রু চেপে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
বিকেলে রিফাত নেহাকে ঢাকার এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল। নেহাকে এক চমৎকার বেগুনি রঙের থ্রি-পিস পরিয়েছিল সে, যেন গলার আর কাঁধের সব দাগ ঢেকে থাকে। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে এক আদর্শ দম্পতি—সুদর্শন বর আর রূপসী বউ।
টেবিলে বসে রিফাত নিজ হাতে নেহার প্লেটে খাবার তুলে পাচ্ছিল। লোক দেখানোর মতো যত রকমের যত্ন নেওয়া যায়, তার সবই করছিল সে।
"একটু হাসো নেহা," রিফাত মিষ্টি হেসে টেবিলের নিচে নেহার উরু চেপে ধরে বলল। ওর হাতের চাপ এত শক্ত ছিল যে নেহার হাড় মড়মড় করে উঠল।
নেহা কৃত্রিম এক হাসি ফুটিয়ে তুলল তার ঠোঁটে।
ঠিক তখনই তাদের টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল নেহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী তানভীর। তানভীর বেশ হাসিখুশি স্বভাবের ছেলে।
"নেহা! আরে তুই এখানে?" তানভীর চমকে উঠে বলল। "বিয়ের পর তো তোকে আর দেখাই যায় না! কেমন আছিস?"
নেহা আতঙ্কে রিফাতের দিকে তাকাল। রিফাতের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেছে, চোখের কোণে ফুটে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর খুনের তীব্রতা।
"আমি... ভালো আছি তানভীর," নেহা তোতলাতে তোতলাতে বলল। "ইনি আমার স্বামী, রিফাত।"
তানভীর অত্যন্ত অমায়িক ভঙ্গিতে হাত বাড়াল, "হ্যালো রিফাত ভাই! আমি নেহার ভার্সিটির ফ্রেন্ড..."
রিফাত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সে হাত মেলাল না। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টেবিলের ওপর বেশ কিছু টাকা ছুঁড়ে মারল।
"নেহা, গাড়িতে গিয়ে বসো," রিফাত এক অদ্ভুত নিচু থমথমে গলায় বলল।
"রিফাত, শোনো..."
"আমি বলেছি গাড়িতে গিয়ে বসো!" রিফাত দাঁতে দাঁত চেপে গর্জাল।
তানভীর হকচকিয়ে গেল, "ভাই, কোনো সমস্যা?"
নেহা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। ওর সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপছিল। সে জানত, আজ রাতে তার জন্য বড় কোনো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর রিফাত গাড়িতে এসে বসল। তার মুখ থমথমে, কোনো কথা বলল না। পুরো পথ গাড়ি চালাল চরম গতিতে। গাড়ি চালাচ্ছিল যেন কোনো উন্মাদ।
বাড়িতে পৌঁছে নেহাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে গেল সে। দরজায় ডাবল লক মেরে দিয়ে নেহাকে সজোরে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল।
"কতজনের সাথে তোমার প্রেম ছিল নেহা?" রিফাত হিংস্র পশুর মতো চিৎকার করে উঠল।
"কারোর সাথে না! বিশ্বাস করো রিফাত, তানভীর শুধু আমার সহপাঠী ছিল!" নেহা কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করল।
"মিথ্যা কথা!" রিফাত নেহার চুলে শক্ত মুষ্টি টেনে ধরে ওর মুখটা সিলিংয়ের দিকে তুলে ধরল। "প্রতিটা পুরুষ তোমার দিকে ওভাবে তাকায় কেন? কেন তুমি ওদের সুযোগ দাও? তুমি কি আমার একা হয়ে থাকতে পারো না?"
"আমি তো তোমারই রিফাত! আর কারোর নই!" নেহা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
"না! তোমার মনে এখনও অন্য পুরুষের চিন্তা আছে! আমি আজ তোমার ভেতর থেকে সব মুছে দেব!"
রিফাত উন্মাদ হয়ে উঠল। সে নেহার জামা এক টানে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। নেহার শরীর থেকে কাপড় আলগা হয়ে ঝরে পড়ল মেঝето। রিফাত নেহাকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিল।
সে তার বেল্টটা খুলে নেহার দুই হাত খাটের পেছনের শক্ত কাঠের সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। নেহা ছটফট করছিল, "রিফাত দয়া করো! আমাকে এভাবে বেঁধো না! আমি কোথাও যাব না!"
কিন্তু রিফাত তখন ভালোবাসার উন্মাদনায় অন্ধ। সে নেহার কোনো আকুতিই শুনল না।
"তুমি শুধুই আমার বন্দি নেহা," রিফাত নেহার ওপর ঝুকে পড়ে তার ঠোঁটে বিষাক্ত চুমু বসাল।
রিফাতের ছোঁয়া আজ আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক, আরও বেশি তীব্র। সে নেহার উন্মুক্ত শরীরের প্রতিটা অংশে নিজের শাসনের মোহর এঁকে দিতে লাগল। নেহার আর্তনাদ আর কান্নায় ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু রিফাতের কানে তা পৌঁছাল এক অদ্ভুত সুমধুর সংগীতের মতো। ভালোবাসার নামে এই এক তরফা ও হিংস্র শোষণে নেহা বারবার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো।
রাত যখন শেষ প্রহরে এসে পৌঁছাল, রিফাত নেহার বাঁধন খুলে দিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল। নেহা তখন নিথর, আধমরা এক পুতুলের মতো পড়ে আছে।
রিফাত পরম স্নেহে নেহার কপালে ও ভিজে যাওয়া চোখে চুমু দিল।
"আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি নেহা," রিফাত মিষ্টি ফিসফিস করে বলল। "এত ভালোবাসি যে তোমাকে শেষ করে দিতেও আমার দ্বিধা হবে না। কখনো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না, কেমন?"
নেহা বন্ধ চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই বিষাক্ত অন্ধকারের কোনো শেষ নেই। রিফাতের ভালোবাসা এক অফুরন্ত নরক, আর সে সেই নরকের এক চিরস্থায়ী বন্দি।
ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল, তখন নেহার শরীর অবশ হয়ে পড়েছিল। খাটের সাথে বাঁধা হাতের কবজিতে জখমের লাল দাগ স্পষ্ট। পাশে রিফাত শুয়ে আছে—তার মুখে এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি আর শান্ত ভাব। যেন রাতে কোনো ঝড়ই বয়ে যায়নি এই ঘরে।
নেহা ধীরগতিতে বিছানা থেকে উঠল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল। ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের দিকে তাকাল। আয়নায় দৃশ্যমান এই নারীটিকে সে আর চিনতে পারছে না। চোখ দুটো বসে গেছে, ঠোঁট ফেটে রক্ত জমাট বেঁধেছে, আর সমস্ত শরীরে কালশিটে দাগ।
নেহা শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে পানির নিচে দাঁড়িয়ে রইল। ঠান্ডা পানি যখন তার ক্ষতগুলোতে স্পর্শ করছিল, তখন সে কোনো আর্তনাদ করল না। তার চোখ থেকে এক ফোটা জলও পড়ল না। কান্নার সীমা আজ সে পার করে এসেছে। হৃদয়ের গভীরে জমাট বেঁধেছে এক চরম নীরবতা।
সকাল আটটায় রিফাত প্রস্তুত হয়ে ডাইনিং টেবিলে এলো। নেহা ততক্ষণে টেবিল গুছিয়ে দিয়েছে। সে একটি লম্বা হাতার ওড়না দিয়ে তার শরীরের সব ক্ষত ঢেকে রেখেছে।
রিফাত নেহার কাছে এসে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। নেহার ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, "কাল রাতের জন্য রাগ করে আছ, সোনা? তুমি তো জানোই, তোমাকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে কথা বলতে দেখলে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি না।"
নেহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে শান্ত গলায় বলল, "না, আমি রাগ করিনি। নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে নাও।"
রিফাত নেহার এই স্বাভাবিক আচরণে কিছুটা অবাক হলো, তবে বেশ সন্তুষ্টও হলো। সে ভাবল, নেহা হয়তো অবশেষে তার এই ভালোবাসার তীব্রতা বুঝতে পেরেছে এবং নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে।
"আজ আমি তোমাকে একটা বিশেষ চমক দেব," রিফাত খেতে খেতে বলল। "বিকালে রেডি থেকো।"
নেহা শুধু মাথা নাড়ল। তার মনে কোনো কৌতূহল ছিল না।
বিকালে রিফাত নেহাকে নিয়ে এক বিশাল শপিং মলে গেল। সেখানে সে নেহার জন্য প্রচুর দামি জামাকাপড়, গহনা আর প্রসাধন সামগ্রী কিনতে শুরু করল। যে দোকানদারই নেহার দিকে তাকাচ্ছিল, রিফাত সাথে সাথে তাকে আড়চোখে দেখছিল। কিন্তু নেহা সেদিকে কোনো নজরই দিল না। সে এক যান্ত্রিক পুতুলের মতো রিফাতের পেছনে পেছনে হাঁটছিল।
হঠাৎ শপিং মলে নেহার বড় বোন তুলির সাথে দেখা হয়ে গেল। তুলি তার স্বামীর সাথে কেনাকাটা করতে এসেছিল।
"নেহা!" তুলি আনন্দিত হয়ে নেহার দিকে এগিয়ে এলো।
নেহা থমকে দাঁড়াল। বোনকে দেখে তার পাথরের মতো জমে থাকা মনটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।
"আপু..." নেহার গলা থেকে শব্দ বের হতে চাইল না।
তুলি নেহাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু জড়িয়ে ধোরা মাত্রই নেহার মুখ থেকে ব্যথার একটা হালকা উফ শব্দ বের হলো। তুলি নেহার থেকে আলাদা হয়ে ওর মুখের দিকে ভালো করে তাকাল। ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গলার কালশিটে দাগটা তুলির নজর এড়াতে পারল না।
"নেহা, তোর গলার এই দাগ কিসের? তোর মুখ এমন ফ্যাকাশে কেন?" তুলি চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করল।
ঠিক তখনই রিফাত এসে ওদের মাঝে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি।
"আরে তুলি আপু! কেমন আছেন?" রিফাত খুব বিনয়ের সাথে বলল। "নেহার শরীরটা আসলে গতকাল থেকে একটু খারাপ। অ্যালার্জি হয়েছে খুব, তাই গলায় দাগ পড়েছে। ডাক্তার দেখাব ভাবছি।"
তুলি রিফাতের কথার মিথ্যাচার বুঝতে পারল না, তবে নেহার থমথমে মুখ দেখে তার সন্দেহ থেকে গেল।
"নেহা, তুই কি ঠিক আছিস?" তুলি আবার জিজ্ঞেস করল।
নেহা রিফাতের দিকে তাকাল। রিফাতের চোখে ফুটে উঠেছে এক সুক্ষ্ম হুঁশিয়ারি—যদি এক শব্দও অন্যরকম বলে, তবে আজ রাতে এর পরিণতি কী হতে পারে!
নেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোনকে বলল, "হ্যাঁ আপু, আমি একদম ঠিক আছি। রিফাত আমার খুব যত্ন নেয়।"
তুলি মিষ্টি হেসে বলল, "হ্যাঁ, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। রিফাত তোকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে।"
বোন চলে যাওয়ার পর রিফাত নেহার হাতটা প্রচণ্ড জোরে চেপে ধরল।
"খুব ভালো অভিনয় করেছ নেহা," রিফাত নেহার কানের কাছে মুখ এনে বলল। "আমার কথা শুনলে তুমি এভাবেই ভালো থাকবে।"
গাড়িতে বাড়ি ফেরার পথে নেহা জানালার বাইরে তাকাল। তার ভেতরে একটা গভীর সিদ্ধান্ত দানা বাঁধছিল। যে হিংস্র ভালোবাসায় সম্মান নেই, যে ভালোবাসায় মুক্ত বাতাস নেই—তা ভালোবাসা নয়, তা এক বিষাক্ত বন্দিদশা। এতদিন সে সহ্য করেছে, কেঁদেছে, ভয় পেয়েছে। কিন্তু আজ তার কান্না শেষ হয়ে গেছে।
বাড়িতে পৌঁছে ঘরে ঢুকতেই রিফাত দরজা বন্ধ করে দিল। সে শপিং ব্যাগগুলো খাটের ওপর ছুঁড়ে ফেলে নেহাকে টান মেরে কাছে নিয়ে এলো।
"আজ তুমি আমার কত বড় অনুগত স্ত্রী হয়েছ জানো?" রিফাত নেহার বেগুনি ওড়নাটা এক টানে খুলে ফেলল। "তোমার এই শান্ত রূপ আমাকে আরও বেশি উত্তেজিত করছে।"
রিফাত নেহার ঘাড়ে ও ঠোঁটে হিংস্রভাবে কামড়ে ধরল। কিন্তু আজ নেহা কোনো ছটফট করল না, কান্নাকাটিও করল না। সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিফাতের ভালোবাসার উন্মাদনার মধ্যে নেহার এই নির্জীব প্রতিক্রিয়া রিফাতকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলল।
"তুমি কাঁদছ না কেন?" রিফাত নেহার চুল ধরে ঝাঁকা দিল। "চিঁৎকার করো! কান্না করো! আমাকে আটকাও!"
নেহা রিফাতের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল এক অসীম শূন্যতা।
"যাকে তুমি ভালোবাসার নামে মেরে ফেলেছ রিফাত, সে তো আর কাঁদবে না," নেহা খুব শান্ত বরফের মতো গলায় বলল।
রিফাত মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নেহার এই ভীতিহীন নীরবতা তার ভেতরের অহংকার আর ক্ষমতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। রিফাত গর্জে উঠে নেহাকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল এবং এক চরম তাণ্ডবে মেতে উঠল।
সেই গভীর রাতে, রিফাতের হিংস্র ভালোবাসার তপ্ত নিশ্বাসের নিচে শুয়ে নেহা বুঝে গেল—এই নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে চলেছে। কিন্তু এই অন্ধকার খেলা কোথায় গিয়ে শেষ হবে?
সেই রাতের পর থেকে নেহার নীরবতা যেন এক নীরব বিষের মতো রিফাতের ভেতর ছড়াতে লাগল। রিফাত ভেবেছিল শক্ত হাতে চেপে ধরলে, নিজের শাসনের শিকলে বাঁধলে নেহা ভয় পেয়ে চিরকাল অনুগত থাকবে। কিন্তু ভয় পাওয়ার বদলে নেহার চোখে এখন জন্ম নিয়েছে এক নিস্তব্ধ উদাসীনতা। আর এই উদাসীনতাই রিফাতকে ভেতরে ভেতরে পাগল করে তুলছিল।
সকালবেলা রিফাত যখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল, নেহা ঘড়ির কাঁটার মতো যান্ত্রিকভাবে তার টাই এনে দিল, শার্টের বোতাম বদলে দিল। কিন্তু নেহার চোখ দুটো ছিল একদম নির্জীব, যেন সে কোনো মানুষ নয়—একটি রোবট।
রিফাত নেহার কোমর ধরে নিজের দিকে টেনে আনল।
"আমার দিকে তাকাও নেহা," রিফাত নিচু গর্জনে বলল।
নেহা চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে ছিল এক অসীম শূন্যতা। কোনো ভয় নেই, রাগ নেই, এমনকি কোনো কষ্টও নেই।
"তুমি এভাবে তাকাচ্ছ কেন?" রিফাত নেহার চিবুক চেপে ধরে বলল। "আগের মতো কাঁদো! রাগ দেখাও! আমায় আটকানোর চেষ্টা করো!"
"তুমি তো এটাই চেয়েছিলে রিফাত," নেহা অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল। "তোমার ইচ্ছার বাইরে আমার তো কোনো মন বা আত্মা থাকতে পারে না। তাই আমি আমার মনকে মেরে ফেলেছি। এখন তুমি যার ওপর অধিকার দেখাচ্ছ, সে কেবল একটা খালি শরীর।"
কথাটা রিফাতের কানে চাবুকের মতো লাগল। সে নেহাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। নেহা খাটের কোণে গিয়ে পড়ল, কিন্তু তার মুখে কোনো ব্যথার ছাপ ফুটল না।
"তুমি মিথ্যা বলছ!" রিফাত চেঁচিয়ে উঠল। "তুমি আমাকে ভালোবাসো! তুমি আমার ছাড়া আর কারোর হতে পারো না!"
নেহা হালকা একটু হাসল—এক বিষাক্ত ও মলিন হাসি। সে কোনো কথা না বলে আবার নিজের কাজে মন দিল। রিফাত রাগ সামলাতে না পেরে পাশের টেবিলের কাঁচের ফুলদানিটা মেঝето আছড়ে ভেঙে ফেলল। কাঁচের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু নেহা একবারের জন্যও চমকে উঠল না।
দুপুরে রিফাত হঠাৎ না জানিয়েই অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এলো। তার মনে এক অদ্ভুত ভীতি বাসা বেঁধেছিল—নেহা বুঝি তাকে ছেড়ে চলে গেল! সে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল।
দেখল নেহা শান্তভাবে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে তার হালকা গোলাপি শাড়ির আঁচল উড়ছে। নেহাকে অক্ষত ও নিজের ঘরে দেখতে পেয়ে রিফাতের বুক থেকে এক বিশাল পাথর নেমে গেল।
সে ধীর পায়ে নেহার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নেহার ঘাড়ে মুখ গুঁজে ব্যাকুল হয়ে বলতে লাগল, "নেহা... আমাকে ছেড়ে কখনো যেয়ো না। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমি জানি আমি মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে উঠি, কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে হারানোর ভয়েই আমি এমন করি।"
নেহা ব্যালকনির রেলিং ধরে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
"যে পাখি ডানা মেলে উড়তে চায়, তাকে শিকলে বেঁধে রাখলে সে বাঁচে না রিফাত," নেহা ধীরস্বরে বলল। "তুমি আমাকে ভালোবেসে বন্দি করোনি, তুমি আমাকে নিজের ক্ষমতার মোহে বন্দি করেছ।"
রিফাত নেহার শরীরটা ঘুরিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড় করাল।
"আমি আজ থেকে আর তোমাকে আঘাত করব না, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি!" রিফাত নেহার দুটি হাত নিজের বুকের ওপর রেখে বলল। "কিন্তু তুমিও কথা দাও, তুমি আগের মতো আমার সাথে হাসবে, আমাকে জড়িয়ে ধরবে, আমার প্রেমে সাড়া দেবে।"
নেহা রিফাতের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে চরম আকুতি, কিন্তু তার পেছনের সেই দানবটা এখনও ওত পেতে বসে আছে। নেহা বুঝতে পারল, রিফাতকে হারাতে হলে তার এই মনস্তাত্ত্বিক খেলার ভেতরেই ঢুকতে হবে।
"ঠিক আছে রিফাত," নেহা হালকা হেসে রিফাতের গালে একটা আলতো ছোঁয়া দিল। "তুমি যা চাও, তা-ই হবে।"
নেহার এই আচমকা পরিবর্তনে রিফাতের চোখ আনন্দে জ্বলে উঠল। সে ভাবল, নেহা অবশেষে তার প্রেমে পুরোপুরি নত স্বীকার করেছে। সে নেহাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।
সেদিনের বিকেলের আলোয় রিফাতের স্পর্শে ভালোবাসা আর আকুতির তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। রিফাত পরম ব্যাকুলতায় নেহার ঠোঁট, ঘাড় আর বুকে নিজের ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিতে লাগল। নেহা এবার নিজেকে ফিরিয়ে নিল না। সেও কৃত্রিম এক উষ্ণতায় রিফাতকে জড়িয়ে ধরল, ওর চুলে হাত বুলে দিল।
রিফাত যখন উন্মত্ত আনন্দে নেহার শরীরে নিজেকে সঁপে দিচ্ছিল, তখন নেহা মনে মনে তার পরবর্তী পদক্ষেপের ছক আঁকছিল।
রাত গভীর হলে রিফাত ক্লান্ত হয়ে নেহার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। সে ভাবছিল সে আজ জয়ী হয়েছে। কিন্তু রিফাতের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নেহার মনে ফুটে উঠল এক শক্ত প্রতিজ্ঞা।
সোনার খাঁচার বন্দি পাখি এবার খাঁচার তালা খোলার গোপন চাবি খুঁজে পেয়েছে। রিফাতের ভালোবাসার অন্ধত্ব আর চরম নির্ভরশীলতাই হবে তার দুর্বলতা। আর সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই নেহা এই বিষাক্ত নরক থেকে মুক্তির পথ তৈরি করবে।
নেহা বুঝতে পেরেছিল, রিফাতের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী পুরুষকে শক্তি দিয়ে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাকে হারাতে হলে তার একমাত্র দুর্বলতা—অর্থাৎ নেহার প্রতি তার অন্ধ ও বিষাক্ত আসক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। নেহা তার স্বভাব সম্পূর্ণ বদলে ফেলল। সে এখন রিফাতের প্রতি অত্যন্ত অনুগত, সোহাগী এবং প্রেমময় স্ত্রীর অভিনয় করতে শুরু করল।
সকালে রিফাতের ঘুম ভাঙার আগেই নেহা সুন্দর করে সেজে তার পাশে গিয়ে বসত। রিফাতের চুলে আঙুল চালিয়ে আলতো করে চুমা দিত।
"রিফাত, ওঠো... সকাল হয়ে গেছে," নেহা মিষ্টি হেসে বলত।
রিফাত চোখ মেলেই যখন নেহার হাসি মুখ আর ভালোবাসায় ভরা দৃষ্টি দেখত, তার মনে অহংকারের পাহাড় জমে উঠত। সে ভাবত, তার হিংস্র ভালোবাসা এবং কঠোর শাসন অবশেষে কাজ করেছে—নেহা এখন পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে।
"তুমি সত্যি বদলে গেছ নেহা," রিফাত একদিন নেহাকে জড়িয়ে ধরে পরম তৃপ্তিতে বলেছিল।
নেহা রিফাতের বুকে মুখ লুকিয়ে শয়তানি এক হাসি চেপে বলত, "তুমি যা চেয়েছিলে, আমি তো কেবল সেটাই হয়েছি রিফাত। তোমার প্রেমে নিজেকে সঁপে দিয়েছি।"
এই মিথ্যে প্রেমের ঘোরে রিফাত নেহার ওপর তার নজরদারি আস্তে আস্তে শিথিল করতে শুরু করল। সে এখন আর নেহার মোবাইল আটকে রাখত না, নেহাকে ঘরে বন্দি করে রাখার তাগিদও কমতে লাগল। কারণ তার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল, নেহা তাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবে না।
নেহা এই সুযোগটাই চাচ্ছিল। সে খুব গোপনে রিফাতের ড্রয়ার থেকে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের ছবি তুলে নিল এবং তার মোবাইল ফোনে সেভ করে রাখল। এগুলো ছিল রিফাতের বাবার কোম্পানির কিছু অবৈধ লেনদেনের তথ্য ও রিফাতের নিজস্ব কিছু গোপন ব্ল্যাকমেইলিং নথি, যা রিফাত তার শত্রুদের দমানোর জন্য ব্যবহার করত।
একদিন সন্ধ্যায় রিফাত বাড়ি ফিরলে নেহা তার জন্য চমৎকার এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এলো। নেহা খুব সুন্দর একটি কালো শাড়ি পরেছিল। রিফাত নেহার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ওকে টেনে কোলে বসিয়ে নিল।
"তোমাকে আজ খুব মায়াবী লাগছে নেহা," রিফাত নেহার কাঁধের শাড়িটা একটু সরিয়ে ঘাড়ের চামড়ায় নিজের গরম নিশ্বাস ফেলল।
"রিফাত, তোমার সাথে একটা ছোট আবদার ছিল," নেহা রিফাতের গালে হাত বুলিয়ে বলল।
"বলো সোনা, তুমি যা চাইবে তা-ই দেব," রিফাত নেহার ঠোঁটে হালকা চুমু দিয়ে বলল।
"পরশু আমার ছোট ভাই ফাহিমের জন্মদিন। আমি কি ওকে একটু আমাদের বাড়ি ডেকে এনে কেক কাটতে পারি? শুধু ও আসবে, আর কেউ না," নেহা খুব নিষ্পাপ কণ্ঠে আবদার করল।
রিফাত একটু ইতস্তত করল। তার পুরোনো সন্দেহপ্রবণ মানসিকতা আবার জেগে ওঠার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নেহা সাথে সাথে রিফাতের গলা জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে এক তপ্ত ও গভীর চুমু বসাল। রিফাতের শরীরের সব প্রতিরোধ সেই কামাতুর ছোঁয়ায় মুহূর্তে গলে গেল।
"ঠিক আছে নেহা... শুধু তোমার ভাই আসবে। কিন্তু অন্য কোনো পুরুষ যেন এই বাড়িতে পা না দেয়," রিফাত ঘন নিশ্বাসে বলল।
"ধন্যবাদ রিফাত! তুমি কত ভালো!" নেহা রিফাতের বুকে মাথা রেখে মৃদু হাসল।
ফাহিমের জন্মদিনের দিন বিকেলে ফাহিম তাদের বাড়িতে এলো। রিফাত তখন অফিসে ছিল। ফাহিমকে ঘরে ডেকে এনে নেহা দরজা বন্ধ করে দিল।
"আপু! তুই কেমন আছিস? তোর চেহারা এমন শুকনো কেন?" ফাহিম উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।
নেহা আর দেরি করল না। সে তার শাড়ির আঁচল সরিয়ে গলার ও পিঠের পুরনো কালশিটে দাগগুলো ভাইকে দেখাল। ফাহিম তা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
"এই জানোয়ারটা তোর সাথে এই অত্যাচার করছে? চল আপু, তুই এখনই আমার সাথে চল!" ফাহিম নেহার হাত চেপে ধরল।
"না ফাহিম, এত সহজে পালানো যাবে না," নেহা বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল। "যদি আমি এমনি এমনি পালাই, রিফাত তার টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে আমাকে আর আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দেবে। ও একটা পাগল।"
নেহা তার মোবাইল ফোনটা বের করে ফাহিমের হাতে দিল।
"এই ফোনে রিফাতের অবৈধ ব্যবসার সব তথ্য আছে। এই ছবিগুলো আর আমার শরীরের এই ক্ষতের মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে তুই সরাসরি শহরের সেরা আইনজীবীর কাছে যাবি। আমরা আদালতের মাধ্যমে এমনভাবে আইনি ব্যবস্থা নেব যাতে ও সারাজীবনের জন্য গরাদের পেছনে যায় অথবা আমার ধারেকাছে আসার সাহস না পায়।"
ফাহিম বিস্ময়ে বোনের দিকে তাকাল। সেই ভীতু, কোমল নেহা আর নেই—তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভীষণ প্রতিশোধপরায়ণ নারী।
"তুই পারবি তো আপু এই নরকে আর দু-একদিন থাকতে?" ফাহিম চিন্তিত হয়ে শুধাল।
"আমি পারব," নেহার চোখে এক অদ্ভুত আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। "যে বিষ ও আমাকে রোজ খাইয়েছে, সেই বিষেই আজ আমি ওকে মারব।"
সন্ধ্যায় রিফাত যখন বাড়ি ফিরল, ফাহিম ততক্ষণে চলে গেছে। ঘরে ঢুকেই রিফাত নেহাকে বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল।
"আজ রাতে তোমাকে আমার এক অন্য রূপ দেখাব নেহা," রিফাত নেহার কানে ফিসফিস করে বলল। "আজ আমাদের প্রেমে কোনো বাধা নেই।"
নেহা হাসিমুখে রিফাতের বাহুডোরে ধরা দিল। সে রিফাতের সব হিংস্র প্রেম আর স্পর্শ নীরবে সহ্য করে নিল, কারণ সে জানত—এই তান্ডব আর বেশিদিনের নয়। শয়তানের পতনের দিন ঘনিয়ে এসেছে।
রিফাতের অহংকার আর অন্ধ প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতি ঘনিয়ে এলো এক কালবৈশাখী সন্ধ্যায়। ঝড়ের শোঁ শোঁ শব্দে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠছিল। ঘরের মধ্যে রিফাত নেহার চুলে সুগন্ধি মেখে দিচ্ছিল, তার মুখে পরম তৃপ্তির হাসি। সে ভাবছিল, নেহাকে সে চিরকালের মতো জয় করে নিয়েছে।
হঠাৎ করেই নিচতলায় বিকট শব্দে দরজা ভাঙার আওয়াজ হলো। রিফাত চমকে উঠে নেহার দিকে তাকাল।
"কে এলো এই অসময়ে?" রিফাতের চেহারায় ক্ষণিকের ভীতি ফুটল।
নেহা কোনো কথা না বলে শান্ত ভঙ্গিতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চেহারায় এতদিন পর ফুটে উঠেছে এক রাজকীয় আত্মবিশ্বাস।
"নেহা, তুমি এখানে থামো, আমি দেখছি," রিফাত ঘরের দরজা খুলতেই পুলিশের এক বিশাল দল তার ঘরে এসে প্রবেশ করল। সাথে নেহার ছোট ভাই ফাহিম ও তাদের পারিবারিক আইনজীবী।
"রিফাত চৌধুরী, আপনাকে শারীরিক নির্যাতন, গৃহবন্দিত্ব এবং বেআইনি অর্থ লেনদেনের অপরাধে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে," ডিবি পুলিশ অফিসার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন।
রিফাত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, "আপনাদের সাহস কীভাবে হয় আমার ঘরে ঢোকার? আপনারা জানেন আমি কে? নেহা, পুলিশকে বলো এগুলো সব ভুল!"
নেহা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে রিফাতের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
"পুলিশ কোনো ভুল করছে না রিফাত," নেহা অত্যন্ত বরফের মতো ঠান্ডা ও স্পষ্ট গলায় বলল। "সব প্রমাণ আমি নিজে পুলিশকে দিয়েছি। তোমার অবৈধ লেনদেনের সব নথি, আমার শরীরের জখমের স্ক্যান রিপোর্ট—সব এখন আদালতের হেফাজতে।"
কথাটা শোনামাত্রই রিফাতের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, বিশ্বাসহীন চোখে সে নেহার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি... তুমি আমার সাথে প্রতারণা করলে নেহা?" রিফাত চিৎকার করে উঠল, ওর কণ্ঠে রাগ আর চরম মানসিক বেদনার মিশ্রণ। "আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম! পৃথিবীর সব সুখ তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম!"
"ওটা ভালোবাসা ছিল না রিফাত, ওটা ছিল এক বিষাক্ত রোগ!" নেহা গর্জে উঠল, তার গলার স্বর ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনি তুলল। "ভালোবাসা কখনো কারোর আত্মসম্মান কেড়ে নেয় না, ভালোবাসায় কোনো বন্দিদশা থাকে না! তুমি আমাকে ভালোবাসোনি, তুমি আমাকে তোমার খাঁচায় বন্দি করে রাখতে চেয়েছিলে। আর সেই সোনার খাঁচা আমি আজ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলাম।"
পুলিশ অফিসার রিফাতের দু-হাতে শক্ত হাতকড়া পরালেন।
রিফাত যখন হাতকড়া পরা অবস্থায় নেহার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সে এক পা এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে নেহার সামনে বসে পড়ল।
"নেহা! দয়া করে এমন কোরো না! আমি মরে যাব তোমাকে ছাড়া! আমাকে একটা সুযোগ দাও, আমি ভালো হয়ে যাব!" রিফাতের কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে নেহার পা দুটো চেপে ধরতে চাইল।
কিন্তু নেহা এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে কোনো দয়া বা অনুশোচনা ছিল না।
"তোমার প্রেমের নরক থেকে আমার মুক্তি চাই রিফাত। আজ থেকে তোমার আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই," নেহা নিচু হয়ে রিফাতের হাত দুটো নিজের পা থেকে সরিয়ে দিল।
পুলিশ রিফাতকে টেনে তুলে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে লাগল। রিফাত যেতে যেতে পশুর মতো আর্তনাদ করতে লাগল, "নেহা! তুমি শুধু আমার! তুমি আর কারোর হতে পারো না! আমি ফিরে আসব নেহা... আমি ফিরে আসব!"
রিফাতের সেই বিষাক্ত ভালোবাসার আর্তনাদ ধীরে ধীরে রাতের ঝড়ের শব্দের সাথে মিলিয়ে গেল।
কয়েক মাস পর।
আদালত নেহাকে রিফাতের থেকে সম্পূর্ণ আইনি divorce বা তালাক মঞ্জুর করেছে এবং রিফাতের দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হয়েছে। রিফাতের হিংস্র ভালোবাসার শিকল থেকে নেহা আজ শতভাগ মুক্ত।
নেহা তার বাবার বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। বিকেলের স্নিগ্ধ রোদ তার মুখে এসে পড়েছে। ঘাড়ে আর গলার সেই পুরনো কালশিটে দাগগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে, আর মনের ভেতরের ক্ষতগুলোও এখন শুকিয়ে আসার পথে।
বাতাসে হালকা একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে নেহার চুল এলোমেলো করে দিল। নেহা চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ, মুক্ত নিশ্বাস নিল। এতদিন পর তার মনে হচ্ছে, সে সত্যিই বেঁচে আছে।
আজ আর কোনো ভয় নেই, কোনো শাসন নেই, নেই ভালোবাসার নামে অপমানিত হওয়ার যন্ত্রণা। নেহা জানালার বাইরে তাকাল—সামনে এক বিশাল, উন্মুক্ত ও নীল আকাশ তার জন্য অপেক্ষা করছে। নেহা তার নিজের ডানা মেলে সেই মুক্ত আকাশে উড়াল দেওয়ার জন্য তৈরি।
....