পুরনো বন্ধুত্বের নতুন বাঁধন

গ্রামের নাম রূপপুর। ছায়াঘেরা, পাখিডাকা এক শান্ত জনপদ, যেখানে সকালের শুরুটা হয় পাখির কলকাকলি আর মেঠো পথের তাজা ধুলোর গন্ধে। এই গ্রামেরই এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে শাফিদের পুরনো টিনের ঘরটি। শাফি গ্রামের ছেলে—একহারা গড়ন, উজ্জ্বল তামাটে গায়ের রং আর চোখেমুখে এক ধরণের গভীর প্রজ্ঞার ছাপ। সে শহরের এক ভালো সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে, কিন্তু মাটির প্রতি টান তাকে রূপপুরেই আটকে রেখেছে। সকালে বাবার সাথে কাস্তে হাতে মাঠে যাওয়া, বিকেলে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিখরচায় পড়ানো আর সন্ধ্যায় খালের পাড়ে বসে বাঁশের বাঁশিতে সুর তোলা—এই নিয়েই তার জগৎ। শাফির বাবা আলতাফ হোসেন গ্রামের একমাত্র হাইস্কুলের হেডশিক্ষক। পাশাপাশি নিজের কিছু জমিজমা আছে, যেখানে তিনি নিজের হাতে ফসল ফলান। অতি সাধারণ জীবন হলেও আলতাফ সাহেবের সম্মান রূপপুর ও আশেপাশের দশ গ্রামে এক নামে বিস্তৃত।

তবে শাফির এই শান্ত জীবনে ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দিল এক হেমন্তের সকালে।

সেদিন ভোরে শাফি ধানক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে ছিল। সোনালি ধানের শীষে ভোরের শিশিরভেজা আলো পড়ে যেন মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে। বাতাসে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। এমন সময় মেঠো পথ ধরে এক ধুলো উড়ানো কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি রূপপুরের মাটির রাস্তায় এসে থামল। গ্রামের কৌতুহলী মানুষ গাড়িটার চারপাশে ভিড় জমালো। এমন চকচকে গাড়ি এই অজপাড়া গাঁয়ে সচরাচর দেখা যায় না। গাড়ি থেকে নামলেন রাজ্জাক সাহেব—ঢাকার নামজাদা ব্যবসায়ী, ধনি এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন মানুষ। কিন্তু এই প্রাচুর্যের অন্তরালে আলতাফ সাহেবের সাথে তার সম্পর্কটা বহু পুরনো। ষাট ও সত্তরের দশকে দুজনেই এই রূপপুরের স্কুলেই একসাথে পড়াশোনা করেছেন। বড় হয়ে রাজ্জাক সাহেব পাড়ি জমান শহরে, ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে হয়ে যান কোটিপতি, আর আলতাফ সাহেব রয়ে যান নিজের মাতৃভূমিতেই, আলোর প্রদীপ জ্বেলে পথ দেখানোর দায়িত্বে।

গাড়ির পেছনের দরজা খুলে নেমে এলো এক রূপসী তরুণী। নাম তার রশ্নি। রশ্নি রাজ্জাক সাহেবের একমাত্র কন্যা। রূপের অহংকার, শহরের জাঁকজমক আর বাবার অপরিমেয় প্রাচুর্য তাকে করে তুলেছে চরম একগুঁয়ে, আত্মকেন্দ্রিক আর রাগচটকা। তার পরনে শহরের একদম আধুনিক পোশাক, চোখে চশমা, আর মুখজুড়ে গ্রামের এই ধুলোবালি ও কাদার প্রতি স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।

গাড়ি থেকে নেমেই রশ্নি বিরক্তি ভরা গলায় বলে উঠল, "বাবা! তুমি আমাকে এই কোন জঙ্গলে নিয়ে এলে? এখানকার বাতাসেই তো ধুলো আর গোবরের গন্ধ! আমি এক মিনিটও এখানে থাকতে পারব না।"

রাজ্জাক সাহেব মৃদু হেসে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, "মা রশ্নি, একটু ধৈর্য ধরো। এটা তোমার কাকা আলতাফ হোসেনের গ্রাম। আর এই মাটিটা আমার শিকড়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কয়েকটা দিন আমরা এখানে শান্তিতে কাটাব।"

রশ্নি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার চোখে স্পষ্ট অবহেলা। ঠিক তখনই শাফি ক্ষেতের কাজ শেষ করে হাতে কাস্তে আর কাঁধে গামছা নিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। বাবার পাশে দাঁড়ানো এই অজানা অতিথিদের দেখে সে দূর থেকেই বিনয়ের সাথে সালাম দিল, "আসসালামু আলাইকুম, চাচাজান।"

রাজ্জাক সাহেব শাফির দিকে তাকালেন। এক নজর দেখেই তার চোখ জুড়িয়ে গেল। স্বাস্থ্যবান, সুপুরুষ আর নম্র এক যুবক। তিনি শাফিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "তুমিই শাফি না? মাশাআল্লাহ, কত বড় হয়ে গেছ! আমি তোমার বাবার ছেলেবেলার বন্ধু রাজ্জাক।"

শাফি হাসিমুখে বলল, "জি চাচাজান, বাবা আপনার কথা প্রায়ই বলেন। আপনার আসার খবর পেয়ে বাবা বাড়িতে অপেক্ষা করছেন। চলুন, আমাদের গরিবখানায় চলুন।"

রশ্নি চশমার ওপর দিয়ে শাফির দিকে তাকাল। মাথায় এলোমেলো চুল, গায়ে ঘামে ভেজা খদ্দরের জামা, আর পায়ে কাদা লেগে থাকা সাধারণ একটা ছেলে। রশ্নি মনে মনে চরম অবজ্ঞা করল শাফিকে। একজন সাধারণ চাষা ছাড়া শাফি যে আর কিছুই নয়, তা রশ্নির দৃষ্টিতেই পরিষ্কার হয়ে উঠল। শাফিও তা খেয়াল করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে রয়ে গেল এক চিলতে শান্ত হাসি।

তারা আলতাফ সাহেবের পুরনো কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাড়িতে পৌঁছাল। আলতাফ সাহেব তার বহু বছরের পুরনো বন্ধুকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। দুই বন্ধুর এই আবেগঘন মিলন দেখে সবার মন ভরে গেলেও রশ্নির মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। তাকে যে ঘরটিতে থাকতে দেওয়া হলো, তা গ্রামের হিসেবে যথেষ্ট ভালো হলেও শহরের বিলাসবহুল এসি রুমের তুলনায় রশ্নির কাছে সেটা ছিল যেন একটা খাঁচা। কাঠের তৈরি খাট, মাথার ওপর একটা সাধারণ ফ্যান, আর জানালার বাইরে শুধু মেঠো পথ আর গাছের সারি।

দুপুরের খাবার টেবিলে আলতাফ সাহেবের স্ত্রী পরম যত্নে দেশি মুরগির ঝোল, নদীর তাজা মাছের ঝোল আর ক্ষেতের খাঁটি শাক-সবজি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করলেন। রাজ্জাক সাহেব তৃপ্তি নিয়ে খেতে লাগলেন, কিন্তু রশ্নি চামচ দিয়ে থালা ঠেলে দিল।

"এসব কি তেল-মসলাযুক্ত খাবার? আমি ওটস আর সালাদ ছাড়া দুপুরে কিছু খাই না। আর এই পানির গ্লাসে তো কোনো ফিল্টার করা পানি নেই! এসব খেলে আমার ইনফেকশন হয়ে যাবে," রশ্নি বেশ চেঁচিয়েই বলে উঠল।

ঘরের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। আলতাফ সাহেব লজ্জিত হলেন, কিন্তু শাফি খুব শান্তভাবে পানির গ্লাসটি রশ্নির সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে বলল, "আমাদের গ্রামের কুয়োর পানি শহরের ফিল্টারের চেয়েও বেশি খাঁটি, আপা। তবে আপনি যখন খাবেন না, জোর করার কিছু নেই। আপনার জন্য ডাবের পানি নিয়ে আসছি।"

রশ্নি শাফির এই শান্ত ব্যবহারে আরও বেশি জ্বলে উঠল। "আমাকে আপা বলবে না! তোমার সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। আর তোমার এই চাষাড়ে উপদেশ আমার একদম দরকার নেই।"

রাজ্জাক সাহেব কড়া গলায় বললেন, "রশ্নি! বয়সে আর সম্মানে ওরা তোমার চেয়ে ছোট নয়। ব্যাভার ঠিক করো!"

রশ্নি রাগে গজগজ করতে করতে টেবিল ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল। শাফি শুধু একবার দরজার দিকে তাকাল, তারপর বাবার থালায় আরেকটু ভাত তুলে দিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলতে লাগল।

বিকেলের দিকে সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, তখন রাজ্জাক সাহেব শাফিকে ডেকে বললেন, "শাফি বাবা, রশ্নি তো সারাটা দিন ঘরে বসে রাগ দেখাচ্ছে। তুমি ওকে একটু বাইরের পরিবেশটা ঘুরিয়ে নিয়ে এসো না? ও হয়তো একটু খোলা বাতাস পেলে শান্ত হবে।"

শাফি প্রথমে একটু ইতস্তত করল, কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, "ঠিক আছে চাচাজান। আমি চেষ্টা করে দেখছি।"

শাফি গিয়ে রশ্নির ঘরের দরজায় নক করল। রশ্নি বিরক্ত মুখে দরজা খুলে বলল, "আবার কি চাই?"

"চাচাজান বললেন আপনাকে গ্রামটা একটু ঘুরিয়ে দেখাতে। বাইরে বিকেলটা বেশ সুন্দর। আসবেন?" শাফি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।

রশ্নি ঘরে বসে থাকতে থাকতে সত্যি হাঁপিয়ে উঠেছিল। সে ভাবল, বাইরে গেলে অন্তত এই পচা ঘরের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে। সে পার্সটা কাঁধে ঝুলিয়ে একজোড়া দামি ব্র্যান্ডের হাই হিল জুতো পরে বেরিয়ে এলো।

"ঠিক আছে, কিন্তু একদম বেশি দূর যাবে না। আর আমার থেকে অন্তত দুই গজ দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটবে," রশ্নি হুঙ্কার দিয়ে বলল।

শাফি মৃদু হেসে বলল, "যেমন আপনার আদেশ।"

দুইজনে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। একপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, অন্যপাশে খালের নীল জল। রশ্নি তার হাই হিল জুতো নিয়ে কাঁচা মাটির রাস্তায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না। বারবার তার পা মচকে যাচ্ছিল, আর সে শাফির উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে গালিগালাজ করছিল। শাফি আগে আগে হাঁটছিল আর গ্রামের নানা গল্প বলছিল—কোন গাছে কী পাখি ডাকে, কোন খালের জল কত গভীর। কিন্তু রশ্নির সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না। সে শুধু ভাবছিল, কখন এই নরকতুল্য গ্রাম ছেড়ে সে তার প্রিয় ঢাকা শহরে ফিরে যাবে।

হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা বড় গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে যাওয়া মেঠো পথে এসে পৌঁছাল। সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল বলে পথটা কিছুটা পিচ্ছিল আর কাদাময় ছিল। শাফি রশ্নিকে সতর্ক করে বলল, "রশ্নি সাহেব, একটু সাবধানে হাঁটুন। সামনে পথটা পিচ্ছিল আর গোবর ফেলা আছে।"

রশ্নি তার কথার কোনো পাত্তাই দিল না। অহংকারের সুরে বলল, "আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না। আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।"

কথাটা শেষ হতে না হতেই রশ্নির হাই হিল জুতো কাদার মধ্যে পিছলে গেল। সামলাতে না পেরে সে সরাসরি রাস্তার পাশে থাকা তাজা, নরম গরুর গোবরের স্তূপের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল!

তার পুরো রাজকীয় ড্রেস, হাত, এবং বিশেষ করে তার ডান পা গোবরের ভেতরে ডুবে গেল।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য রশ্নি স্তব্ধ হয়ে রইল। কী ঘটেছে তা বিশ্বাস করতেই যেন তার সময় লাগল। তারপর যখন সে নিজের পোশাক আর পায়ের দশা দেখল, তার মুখের রূপ বদলে গেল। পরম মুহূর্তেই রশ্নি বিকট চিঁচিঁ শব্দে কেঁদে উঠল, "ও মাগো! আমার নতুন ড্রেস! আমার ব্র্যান্ডের জুতো! ইয়া আল্লাহ, এই পচা গোবর আমার গায়ে!"

রশ্নি কাদার আর গোবরের মাঝে বসেই পা ছড়িয়ে শিশুদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।

শাফি প্রথমে দৌড়ে এসে তাকে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু রশ্নির এই করুণ অথচ হাস্যকর অবস্থা দেখে সে আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। শাফি হাতের গামছাটা মুখে চেপে ধরে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত না পেরে একদম মাঠে হাঁটু মুড়ে বসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হাসতে লাগল। তার হাসির শব্দে যেন পুরো মাঠ কেঁপে উঠল।

রশ্নি কান্নার মাঝেই চোখ তুলে শাফির দিকে তাকাল। শাফিকে এভাবে মাটিতে গড়িয়ে হাসতে দেখে তার রাগ যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল।

"তুমি হাসছো? তোমার মতো একটা ছোটলোকের বাচ্চা আমার এই অবস্থা দেখে হাসছো?" রশ্নি গোবর মাখা হাত তুলে চ্যাঁচাতে লাগল, "আমি তোমাকে চাকরিচ্যুত করব, তোমাকে পুলিশে দেব! থামো তুমি!"

শাফি হাসি সামলাতে সামলাতে চোখ থেকে জল মুছে দাঁড়িয়ে বলল, "দুঃখিত রশ্নি সাহেব, কিন্তু আপনাকে এই মুহূর্তে যা লাগছে না... একদম গোবরের রানি!"

রশ্নির চোখ দিয়ে রাগে-ক্ষোভে সত্যি সত্যি জল গড়িয়ে পড়ল। সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবার গোবরে পা পিছলে পড়ে যেতে নিচ্ছিল, কিন্তু এবার শাফি চট করে এগিয়ে গিয়ে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। রশ্নির রাগে লাল হয়ে যাওয়া চোখ আর শাফির দুষ্টুমিতে ভরা শান্ত দুটি চোখ। শাফি তার হাত ধরে টেনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল, তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল, "গ্রামের মাটি আর গোবরকে এত ঘৃণা করবেন না। এই গোবর দিয়েই কিন্তু বীজ নতুন প্রাণ পায়। চলুন, আপনাকে খালের জলে ধুয়ে দিই।"

রশ্নি হাতটা ঝাটকা মেরে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু শাফির বাঁধন ছিল মজবুত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও, নিজের অহংকার ভাঙার প্রথম চোট সহ্য করে রশ্নিকে শাফির পিছু পিছু খালের ঘাটের দিকে এগোতে হলো। রূপপুরের আকাশে তখন সন্ধ্যার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে, আর সেই লাল আলোয় শুরু হলো দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মানুষের এক অদ্ভুত উপাখ্যান।

খালের ঘাটে এসে রশ্নি যেন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাঁটু পর্যন্ত শাড়ির আঁচল কোনোমতে তুলে খালের পানিতে পা ডুবিয়ে ধুতে ধুতে সে আবারও চোখ দিয়ে জল ফেলতে লাগল। রূপপুরের শান্ত খালের স্বচ্ছ পানিতে তার দামি পোশাকের গোবর ধুয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার মনের ভেতরের ক্ষোভ আর অহংকার যেন আরও বেশি করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। শাফি ঘাটের বাঁধানো সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে শান্ত মনে দৃশ্যটা দেখছিল। সে নিজের কাঁধের গামছাটা ভিজিয়ে রশ্নির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "এই গামছাটা দিয়ে হাত-পা ভালো করে মুছে নিন। সুতি কাপড়, কাদা-গোবর তাড়াতাড়ি পরিষ্কার হয়ে যাবে।"

রশ্নি একনজর গামছাটার দিকে তাকাল, তারপর ঝাড়ি মেরে শাফির হাত থেকে সেটা ফেলে দিল পানির মধ্যে। "তোমার এই নোংরা গামছা ছোঁয়ার চেয়ে আমার হাত-পা এভাবে থাকা অনেক ভালো! তুমি ইচ্ছা করে আমাকে ওই রাস্তায় নিয়ে গিয়েছ, তাই না? যাতে আমি বিপদে পড়ি আর তুমি হাসতে পারো!"

শাফি ভিজে যাওয়া গামছাটা পানি থেকে তুলে নিংড়াতে নিংড়াতে মৃদু হাসল। "আমি তো আপনাকে আগেই বারণ করেছিলাম রশ্নি সাহেব, ওখানকার পথটা পিচ্ছিল। কিন্তু শহরের মানুষেরা তো আর আমাদের মতো ছোটলোকের কথা কানে তোলে না। যাই হোক, অন্ধকার নেমে আসছে, এবার বাড়িতে ফেরা দরকার।"

রশ্নি আর কোনো কথা না বলে রাগে ফুসতে ফুসতে শাফির পেছনে হাঁটতে শুরু করল। তার হাই হিল জুতোর একটি গোড়ালি ভেঙে গেছে, ফলে সে হেলেদুলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। শাফি কয়েকবার সাহায্য করতে চাইলেও রশ্নি চোখ পাকিয়ে তাকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়।

বাড়িতে পৌঁছানোর পর রাজ্জাক সাহেব আর আলতাফ সাহেব উঠোনে বসেই চা খাচ্ছিলেন। রশ্নির এই কাদা-গোবর মাখা করুণ দশা দেখে রাজ্জাক সাহেব আঁতকে উঠলেন। "এ কী রশ্নি! তোমার এই অবস্থা হলো কী করে?"

রশ্নি অমনি বাবার কাঁদে মুখ লুকিয়ে কান্নার নাটক শুরু করে দিল। "বাবা! এই শাফি আমাকে ইচ্ছা করে গোবরের গর্তে ফেলে দিয়েছে! আর নিজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখে হেসেছে। আমি আর এক মুহূর্তও এই গ্রামে থাকব না, তুমি আমাকে এখনই ঢাকায় নিয়ে চলো!"

রাজ্জাক সাহেব শাফির দিকে তাকালেন। শাফি মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বলল, "চাচাজান, আমি উনাকে বারণ করেছিলাম। উনি শুনেননি, জুতো পিছলে পড়ে গেছেন। আমার হাসাটা অন্যায় হয়েছে, তার জন্য আমি লজ্জিত।"

আলতাফ সাহেব শাফিকে মৃদু শাসন করে রশ্নিকে শান্ত হতে বললেন। কিন্তু রশ্নির মন শান্ত হলো না। সে নিজের ঘরে গিয়ে ধড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিল এবং বাকি রাত আর ঘর থেকেই বের হলো না।

পরদিন সকালে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। আলতাফ সাহেব ও রাজ্জাক সাহেব সকালের নাশতা শেষ করে উঠোনে বসে দীর্ঘদিনের পুরনো স্মৃতির রোমান্থন করছিলেন। হঠাৎ রাজ্জাক সাহেব গম্ভীর হয়ে আলতাফ সাহেবের হাত দুটো চেপে ধরলেন।

"আলতাফ, বহু বছর ধরে আমি একটা স্বপ্ন বুকে লালন করে আসছি," রাজ্জাক সাহেব আবেগঘন কণ্ঠে বললেন। "আমাদের ছোটবেলার বন্ধুত্বের বন্ধনটাকে আমি চিরস্থায়ী করতে চাই। তোমার শাফি শুধু যোগ্য ছেলেই নয়, অসাধারণ এক মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ। আমি আমার রশ্নিকে শাফির হাতে তুলে দিতে চাই।"

কথাটা শুনে আলতাফ সাহেব চমকে উঠলেন। "রাজ্জাক, তুমি এ কী বলছো! শাফি গ্রামের এক সাধারণ মাস্টার্স পাস ছেলে, বাবার সাথে চাষাবাদ করে। আর রশ্নি শহরের কোটিপতির মেয়ে, অত বিলাসে মানুষ। ওদের জোড় তো মিলবে না বন্ধু!"

"টাকা-পয়সা দিয়ে মানুষ বিচার হয় না আলতাফ," রাজ্জাক সাহেব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। "রশ্নি একটু অহংকারী আর একগুঁয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমি জানি শাফির মতো শান্ত ও ধৈর্যশীল ছেলেই পারবে ওকে সঠিক পথে আনতে। আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।"

এদিকে দরজার আড়াল থেকে রশ্নি এই কথা শুনে ফেটে পড়ল। সে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। "কখনই না! বাবা, তুমি পাগল হয়ে গেছ? এই খেত-চাষা শাফির সাথে আমার বিয়ে দেবে? আমি আমার স্ট্যাটাসের বাইরের কোনো মানুষকে বিয়ে তো দূরের কথা, কথা বলতেও ঘৃণা করি! আমার লাইফে সানজিল আছে, আমি সানজিলকে ভালোবাসি!"

রাজ্জাক সাহেবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে কঠোর স্বরে বললেন, "সানজিল কেমন ছেলে তা আমার ভালো করেই জানা আছে। শুধু আমার টাকার লোভে ও তোমার পেছনে ঘোরে। রশ্নি, আমার সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তোমার নেই। এই বিয়ে হবে, এবং এই গ্রামেই হবে!"

রশ্নি কান্নাকাটি, চিৎকার ও ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর শুরু করে দিল। কিন্তু রাজ্জাক সাহেব তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। অন্যদিকে শাফিও বাবাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে নিজের অনিচ্ছার কথা জানাল। "বাবা, রশ্নি শহরের মেয়ে। ওর মন আর চিন্তাভাবনা অন্যরকম। জোর করে করা কোনো সম্পর্ক কখনো সুখী হতে পারে না।"

আলতাফ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বাবা শাফি, রাজ্জাক আমার ছোটবেলার বন্ধু। ও আমার কাছে হাত পেতেছে। তাছাড়া ও চায় ওর মেয়ের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত হোক। রাজ্জাকের এই অনুবোধ আমি ফেরাতে পারি না। তুই কি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে এই বিয়েতে রাজি হবি না?"

বাবার সজল চোখের দিকে তাকিয়ে শাফির আর কোনো কথা বের হলো না। নীরব সম্মতি জানিয়ে সে মাথা নিচু করল।

পরের দুদিনের মধ্যেই একদম ঘরোয়া পরিবেশে রূপপুরের বাড়িতেই শাফি ও রশ্নির বিয়ে সম্পন্ন হলো। কাজি ডেকে আকদ করানো হলো। রশ্নির মুখে ছিল চরম ক্ষোভ আর ঘৃণার ছায়া, আর শাফির মুখে ছিল বিষাদ ও দায়িত্ববোধের চাপ। বিয়ের পর রাজ্জাক সাহেব শাফিকে আলাদা ডেকে বললেন, "শাফি বাবা, আমি জানি এই বিয়েটা রশ্নি সহজে মেনে নেয়নি। তবে তুমি ওকে ঢাকায় নিয়ে যাও। আমার ঢাকায় অনেক খালি বাসা আছে, তোমরা সেখানে থাকবে। আর তোমার একটা ভালো সরকারি বা করপোরেট চাকরির ব্যবস্থা আমি করে দেব।"

শাফি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলল, "চাচাজান—মানে বাবা, আপনার মেয়ের দায়িত্ব আমি নিলাম। তবে চাকরির ব্যাপারে আমাকে মাফ করবেন। আমি নিজের যোগ্যতায় চাকরি খুঁজব, আপনার কোনো সুপারিশ বা অনুগ্রহ আমি নেব না।" শাফির আত্মমর্যাদাবোধ দেখে রাজ্জাক সাহেব মুগ্ধ হলেন।

বিয়ের পরদিন সকালে শাফি ও রশ্নি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সুসজ্জিত গাড়িতে পাশাপাশি বসে থাকলেও দুজনের মাঝে ছিল সুবিশাল এক অদৃশ্য প্রাচীর। রশ্নি জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে এক ফোঁটা জল চোখের কোণ থেকে মুছে বিড়বিড় করে বলল, "শাফি, তোমার এই চাষাড়ে জীবন আর অহংকার ভাঙতে আমি বেশিদিন সময় নেব না। ঢাকায় গিয়ে তোমাকে আমি বুঝিয়ে দেব কোটিপতির মেয়ের সাথে পাঙ্গা নেওয়ার ফল কী!"

শাফি শুধু একবার রশ্নির দিকে শান্ত নজরে তাকাল। মনে মনে বলল, "শহরের ঝলমলে আলোতে যে মনটা অন্ধ হয়ে আছে, তাকে সত্যের আলো দেখাতে আমারও কোনো তাড়াহুড়ো নেই।"

গাড়ি রূপপুরের মেঠো পথ ছেড়ে ঢাকার ব্যস্ত রাজপথের দিকে এগিয়ে চলল, আর তার সাথেই শুরু হলো দুটো ভিন্ন স্রোতের এক অসম লড়াই।

ঢাকা শহরের ব্যস্ততা রূপপুরের শান্ত পরিবেশের চেয়ে একদম আলাদা। রাজ্জাক সাহেবের দেওয়া গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে উঠে রশ্নির আচরণ সম্পূর্ণ বদলে গেল। নিজের চেনা জগতে ফিরে এসে তার ভেতরের অহংকার আর রাগ নতুন রূপ নিল। সে শাফির সাথে কোনো স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা চিন্তাও করল না, বরং বাবার চোখ বাঁধতে শাফির সাথে এক অদ্ভুত অভিনয়ের খেলায় মেতে উঠল।

রাজ্জাক সাহেব প্রতিদিন রাতে ফোন করে মেয়ের খবরাখবর নেন। বাবার কাছে নিজের পছন্দমতো জীবনধারা বজায় রাখার জন্য রশ্নি শাফির সামনে এসে মিষ্টি হাসির ভান করত, আর ফোন রাখা মাত্রই তার চেহারা বিষিয়ে উঠত।

একদিন সকালে রশ্নি ড্রয়িংরুমে এসে শাফিকে বলল, "শোন শাফি, বাবার সামনে কিন্তু আমরা হ্যাপি কাপল। কিন্তু বাস্তবে আমার লাইফে হস্তক্ষেপ করার কোনো চেষ্টা করবে না। আমি সানজিলের সাথে দেখা করব, বাইরে যাব, ড্রিঙ্কস করব—এতে তোমার কোনো অধিকার নেই কথা বলার। তুমি এই ঘরে জাস্ট একজন অতিথি, যার মেয়ার শেষ হলেই কেটে পড়বে।"

শাফি তখন নিজের একটা পুরোনো শার্ট ইস্ত্রি করছিল। সে শান্তভাবে রশ্নির দিকে তাকিয়ে বলল, "চাচাজানকে মিথ্যা বলে খুশি রাখার অভিনয় আপনি করতে পারেন রশ্নি সাহেব, আমি পারি না। তবে আমি আপনার কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাব না, যতক্ষণ না তা আমার পরিবারের সম্মানে আঘাত করে।"

"তোমার আবার সম্মান!" রশ্নি উপহাসের সুরে হেসে উঠল। "আজ বিকেলে রেডি থেকো। তোমাকে একটু শহর ঘুরিয়ে দেখাব। বাবা বলেছে তোমাকে শহরের ক্যাফে আর শপিং মলগুলো দেখাতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবাকে দেখাতে আমাকে যেতে হচ্ছে।"

বিকেলে শাফি একটা বিষণ্ণ সাধারণ সুতির শার্ট আর ট্রাউজার পরে তৈরি হলো। রশ্নি তার দিকে একনজর তাকিয়ে চরম বিরক্তিতে চোখ ছোট করল, কিন্তু কিছু বলল না। তারা ধানমন্ডির এক অভিজাত ক্যাফেতে গিয়ে বসল। ক্যাফেতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হলো সানজিল—রশ্নির তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড। সানজিল শহরের নামজাদা এক ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে, গায়ে আধুনিক সব ব্র্যান্ডের পোশাক, আর আচরণে স্পষ্ট উদ্ধত্য।

সানজিল এসেই রশ্নির পাশে বসল এবং শাফির দিকে অতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাল।

রশ্নি শাফিকে দেখিয়ে বলল, "সানজিল, একে তো চেনোই। আমার গ্রামে গিয়ে বাবার জোর করে দেওয়া স্বামী—শাফি।"

সানজিল শব্দ করে হেসে উঠল। "ওহ! সেই ভিলেজ বয়? রশ্নি, তুমি সত্যিই এই টাইপের এক চাষার সাথে এক ছাদের নিচে থাকছো? ও তো ক্যাফের এই চেয়ারটায় বসারও যোগ্য নয়! গায়ে তো মেঠো ধুলোর গন্ধ এখনো লেগে আছে।"

শাফি চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিল। তার শান্ত চেহারায় কোনো বিরক্তির ছাপ ফুটল না।

সানজিল শাফির নীরবতাকে দুর্বলতা ভেবে আরও চেপে ধরল। "হে বুনো হাঁস! শহরে তো এলে, কিন্তু ঢাকা শহরে টিকে থাকতে গেলে টাকা আর স্মার্টনেস লাগে। গ্রামে গবাদিপশু চড়ানো আর ঢাকার করপোরেট ওয়ার্ল্ডে চাকরি করা এক কথা নয়। তোমার মতো মাস্টার্স পাস খেত-খামারির চাকরি হবে ওই কোনো দোকানের পিয়ন বা গার্ডের!"

শাফি কফির কাপটা ধীরে টেবিলে নামিয়ে রাখল। তারপর সানজিলের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "সানজিল সাহেব, মানুষের যোগ্যতা মাপা হয় তার চরিত্র আর প্রজ্ঞা দিয়ে, তার গায়ে লাগা ব্র্যান্ডের পোশাক বা বাপের টাকায় কেনা গাড়িতে নয়। আমি মাটির কাজ জানি বলে নিজেকে লজ্জিত মনে করি না, কারণ এই মাটির ফসলেই আপনাদের মতো মানুষের পেট চলে। আর চাকরির কথা বলছেন? যোগ্যতা থাকলে রাস্তা থেকেই রাজপ্রাসাদে যাওয়া যায়, তার জন্য বাবার সুপারিশ লাগে না।"

সানজিল শাফির মুখের ওপর এমন কড়া জবাব আশা করেনি। সে রাগে লাল হয়ে উঠল, কিন্তু রশ্নি মাঝখান থেকে কথা ঘুরিয়ে নিল। তবে রশ্নির মনেও শাফির এই আত্মমর্যাদাবোধ এক ধাক্কা দিল, যা সে মুখে স্বীকার করল না।

পরের কয়েকদিন শাফি একাই ঢাকার রাজপথে চাকরির পেছনে ছুটতে লাগল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিল। কেউ তাকে গ্রামের ছেলে বলে গুরুত্ব দিল না, কেউ আবার অভিজ্ঞতা না থাকায় ফিরিয়ে দিল। কিন্তু শাফির মনোবল ভেঙে পড়ল না। সে নিজের মেধা ও যোগ্যতার ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে গেল।

এদিকে রশ্নির বেপরোয়া জীবনধারা দিন দিন বাড়তে লাগল। সে শাফিকে ছোট করার কোনো সুযোগ ছাড়ত না।

একদিন রাতের ঘটনা। শাফি সারাদিন ইন্টারভিউ দিয়ে ক্লান্ত হয়ে রাত দশটার দিকে ফ্ল্যাটে ফিরল। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই তার নাকে এলো কড়া মদের ঝাঁঝালো গন্ধ। রশ্নি সেখানে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, তার হাতে আধা-খালি এক গ্লাস ড্রিঙ্কস। টেবিলের ওপর আরও দুটো খালি বোতল। রশ্নি নেশার ঘোরে প্রায় বেহুঁশ অবস্থা, তার চুল এলোমেলো, চোখ দুটি লাল হয়ে আছে।

শাফি থমকে দাঁড়াল। সে ভেবেছিল রশ্নি হয়তো রাগচটকা বা অহংকারী, কিন্তু মেয়েটা যে নিজের ভেতরে এতটা বিষাদ আর বিশৃঙ্খলা পুষে রেখেছে, তা সে বুঝতে পারেনি।

শাফি ধীরপায়ে রশ্নির দিকে এগিয়ে গেল। "রশ্নি সাহেব? আপনি ড্রিঙ্কস করেছেন?"

রশ্নি কড়া চোখে শাফির দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার দৃষ্টি ঘোলাটে। সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। "হ্যাঁ করেছি! তাতে তোমার কী? তুমি কে আমাকে আটকানোর? সানজিল আমাকে আজ অপমান করেছে... বাবা আমাকে বোঝে না... সবাই আমাকে ব্যবহার করে!"

কথাগুলো বলতে বলতে রশ্নি শাফির শার্টের কলার চেপে ধরল। নেশার ঘোরে সে নিজের ভার সামলাতে না পেরে শাফির বুকের ওপর ঢলে পড়ল। শাফি দ্রুত তাকে দুই বাহু দিয়ে ধরে ফেলল যাতে সে মাটিতে পড়ে না যায়।

রশ্নি মুখ তুলে শাফির দিকে তাকাল। শাফির চোখে কোনো রাগ বা লালসা ছিল না, ছিল কেবল এক গভীর সহানুভূতি আর যত্ন। শহরের আধুনিক ছেলেদের মতো শাফির চোখে কোনো ছলনা নেই—এই প্রথম রশ্নি তা খুব কাছ থেকে অনুভব করল। রশ্নির হাত দুটো শাফির গলা জড়িয়ে ধরল। নেশার তীব্র ঘোরে সে শাফির বুকের ওপর মাথা রেখে বিড়বিড় করতে লাগল, "তুমি এত শান্ত কেন শাফি? কেন তুমি আমাকে গালি দাও না?"

রশ্নির উত্তপ্ত শ্বাস শাফির গলায় এসে লাগল। শাফির বুকের ভেতরও এক তোলপাড় শুরু হলো। এক অদ্ভুত মোহাবিষ্ট মুহূর্তে রশ্নি শাফির আরও কাছাকাছি চলে এলো, তাদের ঠোঁটের দূরত্ব কমে এলো শূন্যে। রশ্নি নিজের সমস্ত আবেগ আর হতাশা যেন শাফির মাঝে বিলীন করে দিতে চাইল। শাফিও নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। রাতের নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর প্রাণ এক গভীর, উত্তপ্ত ও নিবিড় অনুভূতির স্রোতে ভেসে গেল।

পরদিন সকালে জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো রশ্নির মুখে এসে পড়ল। রশ্নির প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে ঘুম ভাঙল।

চোখ খুলেই সে নিজেকে শাফির পাশে আবিষ্কার করল। শাফির এক হাত এখনো রশ্নির কোমর জড়িয়ে রয়েছে। কাল রাতের সমস্ত ঘটনা ঝাপসা স্মৃতির মতো রশ্নির মনে ভেসে উঠল।

রশ্নির শরীর মুহূর্তের মধ্যে রিঅ্যাক্ট করে উঠল। সে শাফিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল এবং বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল।

শাফিরও ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ ডলতে ডলতে রশ্নির দিকে তাকাল।

রশ্নি রাগে, লজ্জায় আর ক্ষোভে কাঁপছিল। সে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা কাচের গ্লাসটা তুলে দেয়ালে ছুড়ে মারল। গ্লাসটা চুরমার হয়ে ভেঙে গেল।

"হাউ ডেয়ার ইউ!" রশ্নি বিকট গলায় চ্যাঁচাতে লাগল, "তুমি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছ, তাই না? চাষা কোথাকার! তুমি ভেবেছ কাল রাতের পর আমি তোমাকে মেনে নেব? আমি তোমাকে ঘৃণা করি শাফি! তুমি একটা নোংরা লোক!"

শাফি চুপচাপ বিছানায় বসে রইল। তার শান্ত চোখ দুটিতে কালকের সেই গভীর অনুভূতির জায়গায় আবার ফিরে এসেছে এক ঠান্ডা গা গম্ভীর ভাব। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "সুযোগ আমি নিইনি রশ্নি সাহেব, কাল রাতে যা ঘটেছে তাতে দুজন মানুষেরই আবেগ ছিল। তবে যদি এটাকে আপনি আপনার ভুল মনে করেন, তবে নিশ্চিত থাকুন—এই ভুল আর কখনো হবে না।"

শাফি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল। রশ্নি হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে মাথায় হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বুঝতে পারছিল না—তার এই রাগটা কি শাফির ওপর, নাকি শাফির প্রতি তার মন দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে নিজের ওপর?

সেই রাতের পর থেকে শাফি ও রশ্নির ভেতরের দূরত্ব আরও একধাপ বেড়ে গেল, কিন্তু সেই দূরত্বের পেছনে জমে রইল এক অনাবিষ্কৃত নীরব টান। রশ্নি মুখ ফুটে প্রকাশ না করলেও প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে শাফির অনুপস্থিতি অনুভব করত। শাফি এখন আর আগের মতো রশ্নির মুখোমুখি হতো না। সকাল সকাল নাশতা না করেই সে নিজের ফাইলপত্র নিয়ে বের হয়ে যেত শহরের অলিগলিতে চাকরির সন্ধানে, আর ফিরত গভীর রাতে, যখন রশ্নি ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে বিছানায় শুয়ে থাকত।

দিনগুলো কাটছিল এক অদ্ভুত স্নায়ুযুদ্ধে। এরই মধ্যে ঘটে গেল এক বড় পরিবর্তন।

শাফি তার নিজের মেধা ও যোগ্যতায় দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এক মাল্টিন্যাশনাল এগ্রো-ফার্মভিত্তিক করপোরেট গ্রুপে ইন্টারভিউ দিয়েছিল। গ্রামের কৃষি নিয়ে তার বাস্তব জ্ঞান, চমৎকার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে পরিচালনা পর্ষদ তাকে সরাসরি জুনিয়র প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দিল।

চাকরি পাওয়ার পর শাফি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলতে শুরু করল। সে বুঝতে পেরেছিল, এই কর্পোরেট জগতে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রজ্ঞা দিয়ে চলবে না, বহিঃপ্রকাশও উন্নত করতে হবে। প্রথম মাসের বেতন ও সাইনিং বোনাস পেয়েই শাফি নিজের জন্য কাস্টম-মেড স্যুট, ব্র্যান্ডের জুতো আর মার্জিত ঘড়ি কিনল। তার ভেতরের সেই চাষাড়ে ছাপ রাতারাতি উবে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক রুচিশীল, আত্মবিশ্বাসী ও আধুনিক সুপুরুষের অবয়ব।

একদিন বিকেলে রশ্নি সোফায় বসে টিভি দেখছিল। এমন সময় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল শাফি।

রশ্নি অভ্যাসবশত বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে তাকাল, কিন্তু পর মুহূর্তেই তার হাত থেকে টিভির রিমোটটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো। শাফির পরনে নেভি ব্লু থ্রি-পিস স্যুট, পায়ে চকচকে চামড়ার জুতো, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। তার পুরো অবয়ব থেকে এক ধরণের সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব ঠিকরে বের হচ্ছে। রশ্নি কয়েক সেকেন্ডের জন্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। এই কি সেই মেঠো পথের কাদা-গোবর মাখা শাফি?

শাফি রশ্নির থমকে যাওয়া চাহনি খেয়াল করল, কিন্তু মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে ড্রয়িংরুম অতিক্রম করে নিজের রুমে যাওয়ার আগে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "আজ সন্ধ্যায় রাজ্জাক বাবা আর আলতাফ বাবা আমাদের একসাথে ডিনারে ডেকেছেন। আপনি তৈরি হয়ে নিন, আমি গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছি।"

রশ্নি গলার আওয়াজ পেয়ে যেন হুঁশে ফিরে এলো। সে নিজের বিষম খাওয়া ভাব সামলে নিয়ে কড়া গলায় বলল, "গাড়ি মানে? তোমার কাছে আবার গাড়ি এলো কোথা থেকে? বাবার গাড়ি নিশ্চয়ই চেয়ে নিয়েছ?"

শাফি পকেট থেকে নতুন গাড়ির চাবিটা বের করে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে শান্ত হেসে বলল, "কোম্পানি থেকে ডিরেক্টর পদের জন্য আমাকে নতুন সুজুকি সিয়াজ দেওয়া হয়েছে। বাবার অনুগ্রহ নেওয়ার অভ্যাস আমার কোনোকালেই ছিল না, রশ্নি সাহেব।"

কথাটা বলেই শাফি রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল। রশ্নি সেখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শাফির এই নাটকীয় পরিবর্তন আর সাফল্য তার অহংকারে এক বিশাল বড় চোট দিল। সে ভাবতেই পারছিল না যে ছেলেটাকে সে এবং তার বয়ফ্রেন্ড সানজিল অবজ্ঞা করেছিল, সে এত দ্রুত উন্নতির শীর্ষে উঠে যাবে।

রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর পর রাজ্জাক সাহেব ও আলতাফ সাহেব দুজনকেই দেখে খুব খুশি হলেন। রাজ্জাক সাহেব শাফির স্যুটেড-বুটেড লুক আর নতুন কোম্পানির সাফল্যের গল্প শুনে গর্বে বুক ফুলিয়ে ফেললেন।

"আমি জানতাম আলতাফ!" রাজ্জাক সাহেব শাফির পিঠ চাপড়ে বললেন, "তোমার ছেলে রত্ন! ও যে নিজের যোগ্যতায় এই জায়গায় পৌঁছাবে, তা আমি প্রথম দিনই ওর চোখে দেখেছিলাম।"

আলতাফ সাহেবের চোখ দুটো আনন্দের জলে ভরে উঠল। তিনি শাফির মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন। কিন্তু পুরো খাবার টেবিল জুড়ে রশ্নি ছিল একদম চুপচাপ। তার চোখ বারবার গিয়ে পড়ছিল শাফির ওপর। শাফি কত সাবলীলভাবে বড় বড় বিষয় নিয়ে কথা বলছে, কত মার্জিতভাবে কাঁটাচামচ ব্যবহার করছে! সানজিল যে শাফিকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল, সেই সানজিলও হয়তো আজ শাফির সামনে দাঁড়ালে ফিকে হয়ে যাবে।

বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে রশ্নি হঠাৎ নীরবতা ভাঙল। "তুমি সত্যিই বদলে গেছ শাফি। ভাবিনি তুমি এত দূর যেতে পারবে।"

শাফি ড্রাইভিংয়ে চোখ রেখে ধীরকণ্ঠে বলল, "মানুষ বদলায় না রশ্নি সাহেব, পরিস্থিতি মানুষকে প্রকাশ করে। আমি গ্রামেও যা ছিলাম, আজ স্যুটেড-বুটেড হয়েও তা-ই আছি। পরিবর্তন এসেছে শুধু আপনার চোখে।"

রশ্নি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার মনের ভেতরে জমে থাকা অহংকারের বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছিল, কিন্তু সানজিলের সাথে তার পুরোনো সম্পর্কের টান আর নিজের জেদ তাকে সত্যিটা স্বীকার করতে দিচ্ছিল না।

পরদিন দুপুরে সানজিল রশ্নিকে ফোন করল।

"হেই রশ্নি! আজ সন্ধ্যায় গাজীপুরের একটা প্রাইভেট ডেকোরেটেড রিসোর্টে একটা দারুণ পার্টি আছে। শুধু আমরা কজন ক্লোজ ফ্রেন্ড থাকব। তুমি কালারফুল একটা ড্রেস পরে চলে এসো, আমি তোমাকে পিক করব," সানজিলের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো।

রশ্নি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। ইদানীং সানজিলের আচরণ তার কাছে কেমন যেন সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। তাছাড়া শাফির প্রতি তার মনের কোণে জন্ম নেওয়া অদ্ভুত অনুভূতির কারণে সে সানজিলকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নিজের একগুঁয়ে স্বভাব আর শাফিকে দেখানোর জন্য সে রাজি হয়ে গেল।

"ঠিক আছে সানজিল, আমি যাব," রশ্নি সায় দিল।

সন্ধ্যায় সানজিল এসে রশ্নিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু রশ্নি ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, সানজিলের এই আমন্ত্রণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত। শাফির কাছে নিজের অপমান আর রশ্নির বাবার বিপুল সম্পত্তির লোভ সানজিলকে এক দানবীয় রূপ নিতে বাধ্য করেছিল। অন্যদিকে, শাফি যখন অফিস থেকে ফিরছিল, তখন তার মনটা এক অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে উঠছিল। রশ্নি ঘরে নেই এবং তার ফোন বন্ধ দেখে শাফির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের মেঘ ঘনিয়ে আসছিল রশ্নির মাথার ওপর, যা তাদের দুজনের জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দিতে চলেছে।

সানজিলের গাড়ি গাজীপুরের নির্জন রিসোর্টের সামনে এসে থামল। রিসোর্টটি শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, চারপাশ ঘন জঙ্গলে ঘেরা। গাড়ি থেকে নেমে রশ্নির মনটা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। রিসোর্টে কোনো আলো ঝলমলে পার্টির আবহ নেই, বরং চারপাশ একদম থমথমে আর নিস্তব্ধ।

"সানজিল, তোমার ফ্রেন্ডরা কোথায়? এখানে তো কাউকে দেখছি না!" রশ্নি কিছুটা ইতস্তত করে বলল।

সানজিল ঠোঁটের কোণে এক কুটিল হাসি হেসে রশ্নির কাঁধে হাত রাখল। "আহা রশ্নি, এত ছটফট করছ কেন? আজ কোনো ভিড়ভাট্টা নেই। আজ শুধুই তুমি আর আমি। চল ভেতরে চল।"

রশ্নি অস্বস্তি বোধ করে সানজিলের হাতটা সরিয়ে দিল। "না সানজিল, তুমি আমাকে বলেছিলে ফ্রেন্ডরা থাকবে। আমি এই নির্জন জায়গায় একা থাকব না। আমাকে এখনি ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে চল।"

কথাটা বলেই রশ্নি পেছনে ঘুরে গাড়ির দিকে যেতে চাইল, কিন্তু সানজিল খপ করে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের চাহনি রাতারাতি বদলে গেছে, সেখানে হিংস্রতা আর লালসার স্পষ্ট ছাপ।

"অনেক হয়েছে রশ্নি!" সানজিল রশ্নিকে হিঁচড়ে রিসোর্টের কটেজের ভেতরের রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। "তোমাকে অনেক তোয়াজ করেছি! তোমার ওই অহংকার আর রূপের বাহাদুরি আজ আমি শেষ করব। ভেবেছিলে ওই খেত-চাষা শাফির সাথে নাটক করে আর আমাকে ঘোরাবে? তোমার বাবার সব সম্পত্তি আর তোমাকে আজ আমি আমার বানিয়ে নেব!"

রশ্নি বুঝতে পারল সে এক গভীর ফাঁদে পড়েছে। সে সানজিলের হাত থেকে রেহাই পেতে চিৎকার করতে শুরু করল, "সানজিল, ছেড়ে দাও আমাকে! ছাড়ো বলছি! তুমি এত নিচ হতে পারো আমি ভাবতেও পারিনি!"

সানজিল রশ্নিকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের বিছানার ওপর ফেলে দিল এবং বাইরে থেকে ঘরের দরজার লক আটকে দিল। রশ্নি দৌড়ে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি বুঝতে পেরেছিল—যে সানজিলকে সে এতদিন বন্ধু ও ভালোবাসার মানুষ ভেবে এসেছে, সে আসলে এক রূপধারী শয়তান। আর যে শাফিকে সে অবজ্ঞা করেছিল, অপমান করেছিল, সেই শাফিই ছিল খাঁটি সোনার মতো এক মানুষ।

বিছানার ওপর ভেঙে পড়ে রশ্নি আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল, "শাফি... আমাকে বাঁচাও শাফি! আমি ভুল করেছি..."

এদিকে ঢাকায় শাফির মন কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছিল না। সে রশ্নির ল্যাপটপ অন করতেই সানজিলের সাথে রশ্নির চ্যাটের কিছু অংশ তার চোখে পড়ে, যেখানে গাজীপুরের রিসোর্টের লোকেশন পাঠানো ছিল। শাফি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের নতুন গাড়ির গতি সর্বোচ্চ বাড়িয়ে সে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তার চোয়াল শক্ত, চোখে ঝড়ের মতো আগুন।

রিসোর্টের ঘরে সানজিল রশ্নির খুব কাছাকাছি চলে এলো। রশ্নি তাকে বাধা দেওয়ার জন্য কাচের ফ্লাস্ক, টেবিল ল্যাম্প যা পেল সানজিলের দিকে ছুড়ে মারতে লাগল। কিন্তু সানজিল রশ্নির দুটি হাত গায়ের জোরে চেপে ধরে তাকে বিছানায় পিষে ফেলার চেষ্টা করল।

"কাঁদো রশ্নি, যত পারো কাঁদো! আজ তোমাকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই এখানে!" সানজিল অট্টহাসি হেসে উঠল।

রশ্নি তার শেষ শক্তি দিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করে নিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে—বিকট শব্দে কাঠের শক্ত দরজাটা ভেঙে চৌচির হয়ে গেল!

দরজার ধুলোবালি আর কাঠের টুকরোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শাফি। তার কোট খোলা, শার্টের হাতা গুটানো, আর চোখ দুটো যেন জ্বলন্ত অঙ্গার!

সানজিল চমকে উঠে পেছনে তাকাল। "তুই? তুই এখানে কীভাবে আসলি খেত-চাষা—"

সানজিল কথাটা শেষ করার আগেই শাফি চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সানজিল যে হাত দিয়ে রশ্নিকে ধরেছিল, শাফি এক নিমেষে সানজিলের সেই হাতটা ধরে সজোরে মুচড়ে দিল।

মড়মড় শব্দে সানজিলের হাতের হাড় ভেঙে গেল, আর সানজিল বিকট চিৎকারে মেঝতে লুটিয়ে পড়ল। শাফি সেখানেই থামল না। সানজিলের শার্টের কলার ধরে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে পরপর কয়েকটি কড়া রড-মার্কা ঘুষি বসিয়ে দিল সানজিলের মুখে। রক্তে ভেসে গেল সানজিলের মুখমণ্ডল। শাফি তাকে এক লাথি মেরে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল। সানজিল যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

ঘরের কোণে আতঙ্কে কাঁপতে থাকা রশ্নি চোখ মেলে তাকাল। শাফি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। শাফির চোখে এখন আর সেই রাগ নেই, সেখানে শুধু রশ্নির জন্য গভীর উদ্বিগ্নতা।

শাফি অত্যন্ত যত্নে নিজের গায়ের স্যুটটা খুলে রশ্নির গায়ে জড়িয়ে দিল। "রশ্নি সাহেব... আপনি ঠিক আছেন?"

শাফির সেই চেনা কণ্ঠ আর স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথে রশ্নির ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। সে আর এক মুহূর্তও না ভেবে শাফির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শাফির কোমর জড়িয়ে ধরে সে তার বুকে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।

"আমাকে ক্ষমা করে দাও শাফি! আমি খুব খারাপ, আমি খুব বড় ভুল করেছি!" রশ্নি কান্নার তোড়ে কথা বলতে পারছি না, শাফির শার্ট তার চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে। "আমি তোমাকে চিনতে পারিনি শাফি! আমাকে ছেড়ে কখনো যেও না, প্লিজ!"

শাফি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর সে আলতো করে নিজের দুটো হাত রশ্নির পিঠে ও মাথায় বুলিয়ে দিল। শাফির বুকে রশ্নি খুঁজে পেল তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

শাফি নিচু স্বরে বলল, "ঝড় কেটে গেছে রশ্নি সাহেব। বাড়ি চলুন।"

রশ্নি শাফির বুক থেকে মুখ তুলে শাফির চোখে চোখ রাখল। এবার আর সেই চোখে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল কেবল অগাধ ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণ। শাফি রশ্নির হাতটি নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।

পরদিন সকালে ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বারান্দায় মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে। শাফি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল। রশ্নি পেছন থেকে এসে শাফিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তার হাতে দুটো চায়ের কাপ।

"আজ কিন্তু আমি নিজে হাতে তোমার জন্য চা বানিয়েছি," রশ্নি শাফির কাঁধে মাথা রেখে মিষ্টি হেসে বলল। "আর হ্যাঁ, আজ থেকে আমাকে আর 'রশ্নি সাহেব' বলে ডাকবে না, শুধু 'রশ্নি' বলে ডাকবে।"

শাফি রশ্নির দিকে ঘুরে রশ্নির কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। "ঠিক আছে, আমার রশ্নি।"

দুই ভিন্ন জগতের মানুষের অহংকার আর ভুলের পথ পেরিয়ে অবশেষে ভালোবাসা জয়ী হলো। রূপপুরের মেঠো পথের সেই ধুলোবালি আর ঢাকার ঝলমলে আলো—সব যেন আজ এক সুন্দর ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা পড়ে গেল।

গাজীপুরের সেই দুর্ঘটনার পর থেকে গুলশানের ফ্ল্যাটের বাতাসটাই যেন পুরোপুরি বদলে গেছে। বিষাদ, ক্ষোভ আর ঘৃণার জায়গা জুড়ে এখন স্থান করে নিয়েছে এক অদ্ভুত নিবিড় মায়া। রশ্নি তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি পেয়ে গেছে—সে বুঝেছে কোনটা সস্তা চাকচিক্য আর কোনটা খাঁটি ভালোবাসার আশ্রয়। তবে এত সহজে কি নিজের ভেতর বছরের পর বছর লালন করা ভুলগুলো পুষিয়ে নেওয়া যায়? রশ্নির মনে এখন প্রতিদিন এক নতুন অনুশোচনার জন্ম নেয়।

সকালের মিষ্টি রোদ বারান্দায় ছিটকে পড়েছে। শাফি ইস্ত্রি করা রেডি স্যুট পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধছিল। আয়নায় সে খেয়াল করল, রশ্নি দরজার পাশে অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা।

শাফি আয়নার ভেতর থেকেই রশ্নির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। "কী ব্যাপার রশ্নি? সকালে এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"

রশ্নি এগিয়ে এসে চায়ের কাপটি ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল। তারপর খুব সাবধানে শাফির হাতের টাইটি ধরে নিজে বাঁধার চেষ্টা করতে করতে বলল, "আমি ভাবছিলাম... এতদিন আমি তোমার সাথে কতটা খারাপ ব্যবহার করেছি, তাই না শাফি? তোমাকে খেত-চাষা বলেছি, তুচ্ছ করেছি... অথচ তুমি আজ আমাকে যে সম্মান আর নিরাপত্তা দিয়েছ, তা শহর জুড়েও আমি কারও কাছে পাইনি।"

রশ্নির গলায় কান্নার কানাগলি টের পেয়ে শাফি রশ্নির হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। "অতীত আঁকড়ে ধরে রেখে লাভ নেই রশ্নি। ভুল মানুষেরই হয়। আসল বিষয় হলো, ভুলের পর মানুষ সত্যটা চিনতে পেরেছে কি না। তোমার এই অনুশোচনাই প্রমাণ করে তোমার মনটা পচা নয়, শুধু অহংকারের ধুলো জমেই ঢাকা পড়েছিল।"

রশ্নি শাফির বুকের ওপর আলতো করে কপাল ঠেকালো। "ধন্যবাদ শাফি... আমাকে নিজের করে নেওয়ার জন্য।"

ঠিক সেই মুহূর্তে রশ্নির ফোনে একটা কল এলো। ফোনটি রাজ্জাক সাহেবের। রশ্নি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাজ্জাক সাহেবের অস্থির কণ্ঠ ভেসে এলো, "রশ্নি মা! তোরা কোথায়? আলতাফ রূপপুর থেকে হঠাৎ ঢাকায় এসেছে। ওর প্রেশার হঠাৎ খুব বেড়ে গিয়ে বুক চেপে ধরেছে! আমি ওকে এখনই স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করেছি, তোরা তাড়াতাড়ি আয়!"

খবরটা শোনামাত্র শাফির হাতের ফাইলপত্র নিচে পড়ে গেল। তার মুখের হাসি এক নিমেষে মিলিয়ে গেল চিন্তার কালছায়ায়। "বাবার কী হয়েছে রশ্নি?"

রশ্নি শাফির হাত ধরে দ্রুত বলল, "চলো শাফি, জলদি চলো! বাবা স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি!"

দুজন দ্রুত গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাল। আলতাফ সাহেবকে সিসিইউতে (CCU) রাখা হয়েছে। সিসিইউর বাইরে রাজ্জাক সাহেব অস্থির হয়ে পায়চারি করছিলেন। শাফিকে দেখেই রাজ্জাক সাহেব তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।

"শাফি রে, আমি খুব ভয় পেয়ে গেছি! গ্রাম থেকে হঠাৎ তোর বাবা আমাকে না জানিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিল তোদের সারপ্রাইজ দেবে বলে। কিন্তু স্টেশনে নেমেই ওর বুকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়..."

শাফি সিসিইউর কাচের জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে শুয়ে থাকা বাবার নিঃশ্বাসের সাথে মেশিনের ওঠানামা দেখছিল। যে বাবা সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, কখনো কারও কাছে কিছু চাননি, সেই বাবা আজ হাসপাতালের বিছানায় নিঃসহায়! শাফির শক্ত চোখ দুটো দিয়েও অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল।

রশ্নি এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে শাফির এই ভেঙে পড়া দেখছিল। এতদিন শাফিকে সে দেখেছে পাহাড়ের মতো শক্ত আর শান্ত এক মানুষ হিসেবে। আজ সেই শাফির চোখের জল রশ্নির বুকে তীরের মতো বিঁধল। রশ্নি শাফির পাশে এসে দাঁড়াল এবং শাফির এক হাত নিজের দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল।

"শাফি, শক্ত হও। বাবার কিছু হবে না, আমি কথা দিচ্ছি," রশ্নি শাফির চোখের জল নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিল।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। রাজ্জাক সাহেব ও শাফি চট করে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গেলেন।

ডাক্তার বললেন, "আলতাফ সাহেবের হার্টে দুটি বড় ব্লক ধরা পড়েছে। উনার অবস্থা আশঙ্কাজনক। যত দ্রুত সম্ভব একটা জরুরি বাইপাস সার্জারি করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, উনার রক্তের গ্রুপ 'ও নেগেটিভ' (O-negative), যা অত্যন্ত বিরল। আমাদের ব্লাড ব্যাংকে এই রক্তের সংকট চলছে। আজ রাতের মধ্যে চার ব্যাগ ও-নেগেটিভ রক্ত না পাওয়া গেলে আমরা অপারেশন শুরু করতে পারব না।"

কথাটা শুনে সবার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল। ও-নেগেটিভ রক্ত ঢাকায় চট করে পাওয়া কঠিন!

শাফি দ্রুত নিজের ফোন বের করে বন্ধুদের এবং নানা ব্লাড ব্যাংকে ফোন করতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে ও-নেগেটিভ রক্তের ব্যবস্থা হলো না। শাফির চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে এলো।

ঠিক তখনই রশ্নি শাফির হাত থেকে ফোনটা সরিয়ে নিল। তার চোখে এক অন্যরকম দৃঢ়তা।

"শাফি, ভেঙে পড়ো না। আমি ব্যবস্থা করছি," রশ্নি দৃঢ় কণ্ঠে বলল।

রশ্নি সঙ্গে সঙ্গে তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে একটি জরুরি ব্লাড ডোনেশন পোস্ট দিল, যেখানে তার লাখের ওপর ফলোয়ার ছিল। পাশাপাশি সে তার কলেজের পুরোনো ফ্রেন্ড সার্কেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভলান্টিয়ার ক্লাবগুলোতে একের পর এক ফোন করতে শুরু করল। রশ্নি যে অহংকারী মেয়ে ছিল, সে আজ ব্লাড ব্যাংকের কর্মীদের কাছে, অচেনা তরুণ-তরুণীদের কাছে আলতাফ সাহেবের রক্তের জন্য আকুতি জানাচ্ছে, হাত জোর করছে।

ঘণ্টাখানেকের মাথায় রশ্নির চেষ্টার ফল মিলল। তিনজন তরুণ রশ্নির ফোন ও পোস্ট দেখে সশরীরে স্কয়ার হাসপাতালে এসে উপস্থিত হলো রক্ত দেওয়ার জন্য। আর চতুর্থ ব্যাগ রক্তের জন্য রশ্নি নিজেই নিজের রক্ত দিল, কারণ কাকতালীয়ভাবে রশ্নির নিজের রক্তের গ্রুপও ছিল 'ও নেগেটিভ'!

রক্ত দেওয়ার পর রশ্নির শরীর কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সে ড্রেসিং রুমে বেডে শুয়ে ছিল। শাফি স্যালাইনের বোতলের পাশে এসে দাঁড়াল। শাফি রশ্নির দিকে তাকাল—মেয়েটির মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখে এক পরম তৃপ্তির হাসি।

শাফি নিচু হয়ে রশ্নির মাথায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। "তুমি আজ আমার বাবাকে নতুন জীবন দিলে রশ্নি। আমি তোমার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"

রশ্নি শাফির হাতটি টেনে নিয়ে নিজের গালে রাখল। "ঋণ বলছো কেন শাফি? উনি কি শুধু তোমার বাবা? উনি তো আমারও বাবা। আর গ্রামের সেই গোবরের দিনে তুমি যদি আমাকে কাদা থেকে না তুলতে, তবে আজ হয়তো আমি ভালো মানুষ হওয়ার সুযোগই পেতাম না।"

রাতের শেষ প্রহরে আলতাফ সাহেবের সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলো। ডাক্তাররা নিশ্চিত করলেন, রোগী এখন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত।

সিসিইউর বাইরে দাঁড়িয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রাজ্জাক সাহেব আলতো হেসে শাফি ও রশ্নির দিকে তাকালেন। দুটো ভিন্ন মনের মানুষ আজ এক বিপদের সুতোয় বাঁধা পড়ে কীভাবে একে অপরের আত্মায় পরিণত হয়েছে, তা দেখে একজন বাবার বুক গর্বে ভরে গেল।

কিন্তু শহরের এই আলো ঝলমলে জীবনের আড়ালে রূপপুরের স্মৃতি আর আলতাফ সাহেবের ইচ্ছা আবার তাদের কোন নতুন বাঁকে নিয়ে যাবে, তা দেখার অপেক্ষা এখনো বাকি।

হাসপাতালের সেই থমথমে পরিবেশ কেটে যাওয়ার পর আলতাফ সাহেবের শরীরের উন্নতি দ্রুত হতে লাগল। টানা এক সপ্তাহ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পর অবশেষে ডাক্তার তাঁকে ছাড়পত্র দিলেন। তবে শক্ত নির্দেশ রইল—আগামী কয়েক মাস তাঁকে পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে, কোনো প্রকার মানসিক চাপ বা শারীরিক পরিশ্রম করা যাবে না।

হাসপাতাল থেকে আলতাফ সাহেবকে রাজ্জাক সাহেবের গুলশানের বাসায় নিয়ে আসা হলো। রাজ্জাক সাহেব নিজেই আলতাফ সাহেবের যত্ন নেওয়ার সব ব্যবস্থা করলেন, কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আসল যত্ন নেওয়ার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিল রশ্নি।

যে রশ্নি কখনো নিজের চায়ের কাপটি পর্যন্ত তুলে টেবিল থেকে রান্নাঘরে রাখেনি, সেই রশ্নি এখন প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। আলতাফ সাহেবের সময়মতো ওষুধ দেওয়া, ডাক্তারের চার্ট মেনে কম তেলের পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, আর আলতাফ সাহেবের পাশে বসে রূপপুরের স্কুলেই তাঁর দিনকালের গল্প শোনা—এ যেন এক অন্য রশ্নি!

একদিন সকালে আলতাফ সাহেব বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন। রশ্নি ট্রেতে করে গরম সুপ আর নাস্তা নিয়ে এসে পাশে বসল।

"বাবা, গরম গরম সুপটা খেয়ে নিন তো। আজ কিন্তু এতে একদম নুন কম দিয়েছি, আপনার প্রেশারের কথা মনে রেখে," রশ্নি চামচ দিয়ে সুপ তুলে আলতাফ সাহেবের মুখের কাছে ধরে বলল।

আলতাফ সাহেব তৃপ্তির হাসি হেসে সুপটা খেলেন। তারপর রশ্নির মাথায় হাত রেখে স্নিগ্ধ গলায় বললেন, "মা রশ্নি, তোর সেবা পেয়ে আমি তো প্রায় সুস্থই হয়ে গেছি। কিন্তু আমার মনটা যে রূপপুরে পড়ে আছে রে মা। মেঠো পথ, খালের বাতাস আর স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর পড়া শুনলে আমার এই শরীর আর অসুস্থ থাকে না।"

রশ্নি আলতাফ সাহেবের হাতে হাত রেখে বলল, "বাবা, আপনি দ্রুত পুরো সুস্থ হয়ে উঠুন। তারপর শাফি আর আমি আপনাকে নিজে গিয়ে গ্রামে রেখে আসব। আর এবার গ্রামে গিয়ে আমি কিন্তু আপনার সাথে কাঁচা মাটির মেঠো পথে খালি পায়ে হাঁটব, গোবর দেখে আর ভয় পাব না!"

আলতাফ সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। রশ্নির এই আত্মিক পরিবর্তন দেখে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাফির মনটা এক অজানা শান্তিতে ভরে গেল।

বিকেলে শাফি অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরল। শাফির প্রজেক্ট এখন সাফল্যের চূড়ায়। তার নেতৃত্বেই কোম্পানি এক বিশাল এগ্রো-কর্পোরেট ডিল সাইন করেছে, যা শাফিকে কোম্পানির সর্বকনিষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট (VP) পদের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।

রুমের ভেতর ঢুকেই শাফি দেখল রশ্নি একটা পুরোনো অ্যালবামের পাতা উল্টাচ্ছে। শাফি পেছন থেকে এসে রশ্নির কাঁধে হাত রাখল।

"কী দেখছো এত মনোযোগ দিয়ে?" শাফি জিজ্ঞেস করল।

রশ্নি অ্যালবামের একটা ছবি শাফিকে দেখাল। ছবিটা ছিল রাজ্জাক সাহেব আর আলতাফ সাহেবের ছোটবেলার—দুজনে রূপপুরের মেঠো পথে খালি গায়ে হেসে দাঁড়া তুলে দাঁড়িয়ে আছেন।

"আমি ভাবছিলাম শাফি," রশ্নি ঘুরে শাফির চোখের দিকে তাকাল, "আমাদের বাবারা কত সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসেছেন। অথচ ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না। আর আমি? শহরের দম্ভ আর প্রাচুর্যের অহংকারে অন্ধ হয়ে সত্যিটাকে দেখতেই পাইনি। আমি তোমার সাথে কত বড় অন্যায় করেছিলাম!"

শাফি রশ্নির ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাকে থামাল। "পুরোনো কথা আর বলবে না রশ্নি। তুমি আজ যা, তা-ই আমার জন্য পরম প্রাপ্তি।"

রশ্নি শাফির বুক জড়িয়ে ধরে বলল, "শাফি, আমি সানজিলের নামে কেস ফাইল করেছি। সে যে অপরাধ করেছে, তার শাস্তি তাকে পেতে হবে। আমি আর কোনো ভীরুতা বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হবো না। আমি চাই আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায়টা একদম পরিষ্কার আর সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হোক।"

শাফি রশ্নির সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। "আমি সবসময় তোমার পাশে আছি রশ্নি।"

কয়েক দিন পরেই রাজ্জাক সাহেবের গুলশানের বাসভবনে আয়োজিত হলো এক বিশেষ পারিবারিক সান্ধ্যকালীন সভা। আলতাফ সাহেব এখন অনেকটাই সুস্থ। ঘরে উপস্থিত আছেন রাজ্জাক সাহেব, আলতাফ সাহেব, শাফি আর রশ্নি।

রাজ্জাক সাহেব শাফি আর রশ্নির দিকে তাকিয়ে হাত দুটো এক করে বললেন, "তোদের বিয়ের সূচনাটা হয়েছিল একটা জেদ আর বাধ্যবাধকতার ভেতর দিয়ে। গ্রামে খুব তাড়াহুড়ো করে আকদ করানো হয়েছিল। রশ্নি তখন তোকে মেনে নিতে পারেনি, আর শাফিও ছিল অনিচ্ছুক। কিন্তু আজ তোদের দুজনের চোখের আলো বলে দিচ্ছে, তোরা একে অপরকে সত্যি ভালোবেসে ফেলেছিস।"

আলতাফ সাহেব রাজ্জাক সাহেবের কথায় সায় দিয়ে বললেন, "হ্যাঁ রাজ্জাক, ঠিকই বলেছিস। ঝড়ের দিন কেটে গেছে, এখন বসন্তের আলো এসেছে।"

রাজ্জাক সাহেব মুচকি হেসে বললেন, "তাই আমি ঠিক করেছি, আগামী সপ্তাহে আমরা শহরের সব বড় বড় আত্মীয়স্বজন আর আলতাফ তোর রূপপুরের মানুষদের ডেকে এক বিশাল সংবর্ধনার অনুষ্ঠান (Grand Reception) করব। সেখানে রশ্নি আর শাফির বিয়েটা আবার নতুন করে উদ্‌যাপিত হবে—তবে এবার বাধ্যবাধকতায় নয়, দুজনের পূর্ণ ভালোবাসায়!"

কথাটা শুনে রশ্নি লজ্জায় শাফির দিকে তাকাল, আর শাফির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই শান্ত, রোদমাখা মেঠো হাসি।

রশ্নি মনে মনে আলতাফ সাহেব আর শাফির রূপপুরের মাটিকে ধন্যবাদ দিল। যে মাটি তাকে কাদার স্পর্শে অহংকার ভাঙতে শিখিয়েছিল, সেই মাটির ছেলেই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার ও ভালোবাসার ঠিকানা হয়ে উঠেছে।

কিন্তু উৎসবের আগে সানজিলের চক্রান্ত কি শেষবারের মতো কোনো ছায়া ফেলবে, নাকি শাফি ও রশ্নির এই ভালোবাসা সব বাধা পেরিয়ে নিয়ে যাবে এক নিখাদ হ্যাপি এন্ডিংয়ের দিকে?

সানজিলের দম্ভ আর অপরাধের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে বেশিদিন সময় লাগেনি। রশ্নির সাহসিকতা এবং শাফির সহযোগিতায় আইনের হাত অবশেষে সানজিলের ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। পুলিশ যখন রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ এবং রশ্নির স্টেটমেন্টের ভিত্তিতে সানজিলকে গ্রেফতার করতে তার বাড়িতে হানা দেয়, তখন সে পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার অপকর্ম, জালিয়াতি ও নারীদের ব্ল্যাকমেইল করার ইতিহাস সামনে আসায় আদালত তাকে কঠোর শাস্তির আদেশ দেন। সানজিলের পতন রশ্নির জীবনের শেষ বিষাক্ত ছায়াটুকুও চিরতরে মুছে দিল।

এরই মধ্যে এসে পৌঁছাল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।

ঢাকার আলো ঝলমলে এক অভিজাত কনভেনশন সেন্টারে আয়োজন করা হয়েছে শাফি ও রশ্নির গ্র্যান্ড রিসেপশন। তবে এই জমকালো আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি ছিল রাজ্জাক সাহেব ও শাফির নেওয়া এক চমৎকার সিদ্ধান্ত। শুধু শহরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আর নামজাদা ব্যক্তিরাই নয়, রূপপুর গ্রাম থেকে বাস ভর্তি করে আনা হয়েছে শাফির বাবার পুরনো সহকর্মী, গ্রামের সাধারণ কৃষক, আর শাফির সেই ছোট্ট স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের।

ঝলমলে আলোয় পুরো হলরুম আলোড়িত। শহরের উচ্চবিত্ত মানুষদের পাশাপাশি রূপপুরের মেঠো মাটির মানুষগুলোর উপস্থিতি যেন এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

মঞ্চে পাশাপাশি বসে আছে শাফি ও রশ্নি।

শাফির পরনে ব্ল্যাক টাক্সিডো, গায়ে আভিজাত্য আর চোখে সেই চিরচেনা প্রজ্ঞার ছায়া। আর তার পাশে রশ্নি—ধানি রঙের এক চমৎকার ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়িতে সজ্জিত, চোখেমুখে আর কোনো অহংকার বা রাগের ছাপ নেই, সেখানে শোভা পাচ্ছে কেবল ভালোবাসা, বিনয় ও আত্মিক প্রশান্তি।

রশ্নি একে একে রূপপুরের সেই মানুষদের কাছে গিয়ে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করল। যে রশ্নি একদিন গ্রামের মানুষকে তুচ্ছ করেছিল, সেই রশ্নি আজ শাফির গ্রামের বৃদ্ধ কৃষকদের পা ছুঁয়ে সালাম করল, বাচ্চাদের পরম আদরে জড়িয়ে ধরল।

আলতাফ সাহেব ও রাজ্জাক সাহেব মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন। দুই বৃদ্ধ বন্ধুর চোখে আজ আনন্দের জল।

রাজ্জাক সাহেব আলতাফ সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "দেখলি আলতাফ? আমার অহংকারী রশ্নি আজ তোর মেঠো মাটির সোনা হয়ে গেছে। সত্যি, ভালোবাসা আর ভালো মানুষের সান্নিধ্য মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে!"

আলতাফ সাহেব হেসে বললেন, "মাটি আর মানুষ কখনো আলাদা নয় রাজ্জাক। শিকড়কে যে ভালোবাসতে শেখে, সে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।"

রাতের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শাফি রশ্নিকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাইরে খোলা আকাশ, শান্ত হাওয়া বইছে। শাফি রশ্নির দিকে তাকিয়ে তার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

"কী ভাবছো রশ্নি?" শাফি নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

রশ্নি শাফির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শাফির স্যুটের কলারটা পরম মমতায় ঠিক করে দিতে দিতে বলল, "ভাবছি আমাদের সেই প্রথম দিনের কথা। গ্রামের সেই মাটির পথ, তোমার ওপর আমার সেই অহেতুক রাগ, আর সেই গোবরের গর্তে পড়ে যাওয়ার কথা!"

কথাটা বলেই রশ্নি শব্দ করে হেসে উঠল। শাফিও নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না।

রশ্নি শাফির চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু ও আবেগঘন গলায় বলল, "জান শাফি? সেদিন আমি গোবরে পড়িনি, আসলে আমি তোমার ওই শান্ত, খাঁটি চোখে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু নিজের অহংকারের কারণে তা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে। আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমি এক চাষার বউ, আমি শাফির বউ।"

শাফি রশ্নির মাথাটা পরম যত্নে নিজের বুকে টেনে নিল। রশ্নির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, "আর আমি গ্রামের সেই সাধারণ শাফি, যে আজ শহরের এই রানিকে নিজের মনের রাজপ্রাসাদে চিরদিনের জন্য বন্দি করে ফেলেছে।"

চাঁদের আলো এসে পড়ল তাদের দুজনের ওপর। ভালোবাসার শক্তি, আত্মমর্যাদাবোধ আর সত্যি চেনার যে সফর রূপপুরের এক মেঠো পথ থেকে শুরু হয়েছিল, ঢাকার আলো ঝলমলে রাজপথে এসে তা খুঁজে পেল এক নিখাদ, সুন্দর ও চিরন্তন পূর্ণতা।

....
👁 14