রাগী স্বামীর নিঃশব্দ শাস্তি

সকালের স্নগ্ধ আলোটা বেডরুমের জানালার পর্দা গলে ঘরের নরম কাঠের মেঝেতে এসে পড়েছে। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে সাতটা।

রাফি বিছানায় শুয়ে গভীরভাবে ঘুমাচ্ছিল। শান্ত, ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে তার বুকের চওড়া ছাতিটা ওঠানামা করছে। একটু পরই তার এক বিদেশি ক্লায়েন্টের সাথে ভিডিও কনফারেন্স। অথচ তার সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ অ্যালার্মটা বাজার কথা ছিল ঠিক সাতটায়। কিন্তু কেন বাজেনি, সেটা রাফির জানা নেই।

বিছানার ওপর হালকা নীল রঙের একটি সুতি শাড়ি পরে হাঁটুতে থুতনি রেখে বসে ছিল নীলা। তার গাঢ় কাজলকালো চোখে দুষ্টুমির চকচকে ঝিলিক। রাতে ঘুমানোর আগে রাফি যখন তার মোবাইল ফোনটা একদম নিখুঁতভাবে সাতটার অ্যালার্ম দিয়ে বেডসাইড টেবিলে রেখেছিল, নীলা খুব সাবধানে সেটা সাইলেন্ট করে বন্ধ করে দিয়েছিল। রাফি যখন অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে অফিসের ফাইল কিংবা ল্যাপটপ নিয়ে মেতে থাকে, নীলার বুকটা অদ্ভুত এক অনাদরে দুলে ওঠে। এই গম্ভীর মানুষটাকে একটু অস্থির করে তোলার মধ্যেই নীলার রাজ্যের আনন্দ।

নীলা ঝুঁকে পড়ে রাফির মুখের ওপর। তার ভেজা চুলের কয়েক ফোঁটা জল ফুপিয়ে গিয়ে পড়ে রাফির শক্ত, তীক্ষ্ণ চোয়ালের ওপর। পানির ঠাণ্ডা স্পর্শ পেয়ে রাফির হালকা ভাজ পড়ে কপালে। বন্ধ চোখ দুটো একটু নড়ে ওঠে।

নীলা হালকা হেসে মাথা নিচু করে রাফির ঠোঁটের ঠিক পাশে নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছোঁয়ায়। আলতো একটু স্পর্শ, কিন্তু তাতে আগুনের আঁচ।

রাফি চোখ মেলে তাকাল। ঘুমের ঘোরে প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও নীলাকে এত কাছাকাছি দেখতে পেয়ে তার লম্বা হাত দুটো দিয়ে নীলার সরু কোমরটা জড়িয়ে ধরে টেনে নিল নিজের বুকের ওপর।

"এত সকালে কাকে এভাবে ফাঁদে ফেলার প্ল্যান চলছে, নীলা?" গম্ভীর, ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল রাফি। ঘুমের জন্য তার গলাটা বেশ খাঁদযুক্ত শোনালো।

নীলা রাফির বুকের ওপর মুখ রেখে মিটিমিটি হাসল। নিজের নরম হাতের আঙুল দিয়ে রাফির খালি বুকের হালকা পশমে আলতো করে খেলা করতে করতে বলল, "কাউকে তো ফাঁদে ফেলার দরকার নেই। যে আগেই আটকে গেছে, তাকে নিয়ে একটু খেলা করতেই তো বেশি মজা।"

রাফি নীলার গালের ওপর জমে থাকা এক গোছা চুল আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার হাতটা নেমে গেল নীলার উন্মুক্ত পিঠের দিকে। পিঠের নরম চামড়ায় রাফির শক্ত হাতের স্পর্শ লাগতেই নীলার ভেতরের এক অদ্ভুত শিহরণ দৌড়ে গেল। রাফির চাহনি ততক্ষণে ভারী হয়ে এসেছে। নীলার মেদহীন কোমরে হাতের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে রাফি নিজেকে একটু ওপরে তুলল।

"তুমি দিন দিন খুব বেশি দুষ্টু হয়ে যাচ্ছ," রাফির গলা আরও নিচু হয়ে এলো। নীলার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আলতো করে একটা উষ্ণ পরশ একে দিল সে।

নীলা চোখ দুটো বন্ধ করে হালকা একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। রাফির এই রূপটা তার ভীষণ প্রিয়। যে মানুষটা সারা পৃথিবীর সামনে ভীষণ কঠোর আর মেপে কথা বলা কর্মকর্তা, সে মানুষটা নীলার এই বাঁধনহারা ভালোবাসার সামনে এসে একদম অন্যরকম হয়ে যায়। নীলা রাফির গলার পেছন দিয়ে হাত পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে আনল। দুজনের নিঃশ্বাসের উত্তাপ এখন একসাথে মিশে যাচ্ছে।

রাফি আর কোনো সুযোগ দিল না। নীলার গোলাপি ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে শক্ত করে আটকে দিল। গভীর, তীব্র সেই স্পর্শে যেন সকালের সমস্ত নিরবতা ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে চাইল। রাফির উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আর বুকের ভেতরের ধুকপুকানি নীলাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক গভীর সাগরে। নীলার শাড়ির আঁচলটা আলতো করে মেঝের ওপর খসে পড়ল। রাফির ভেজা হাত নীলার শরীরের স্পর্শকাতর খাঁজগুলোতে নামতেই নীলার বুকটা ধক করে উঠল।

"রাফি..." নীলা আধবোজা চোখে ক্লান্ত গলায় ডাকল।

"হুম?" রাফির ঠোঁট তখন নীলার ঘাড় আর কানের লতিতে উষ্ণতার দাগ রেখে যাচ্ছে। নীলার পুরো শরীর রিভরিভ করে কাঁপছে।

রাফি নীলার ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই দেয়াল ঘড়ির দিকে নজর গেল নীলার। পৌনে আটটা বেজে গেছে! নীলার হঠাৎ খেয়াল হলো, দুষ্টুমিটা হয়তো একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে এবার। মিটিং আটটায়।

নীলা হুট করে রাফির বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে মৃদু হেসে বলল, "রাফি, রাফি শোনো... মিটিং!"

রাফি চোখ বন্ধ করেই নীলার কোমর শক্ত করে ধরে রেখে বলল, "ধুর, অ্যালার্ম তো এখনো বাজেনি। এখন কোনো কথা নয়।"

"কিন্তু অ্যালার্ম তো বাজবে না রাফি..." নীলা একটু পিছলে বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করল।

রাফি চোখ খুলল। চাহনিতে তীব্র নেশা আর গভীর বাসনা জমে আছে। কিন্তু নীলার কথার ধরন দেখে তার চোখ একটু সরু হয়ে এলো। "মানে? বাজবে না মানে?"

নীলা এক লাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নিল। চঞ্চল পায়ে দরজার দিকে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে পকেট থেকে রাফির ফোনটা বের করে মিষ্টি করে একটা হাসি দিল।

"কারণ অ্যালার্মের সাথে সাথে আমি ফোনের নোটিফিকেশন আর ওয়াইফাইটাও বন্ধ করে দিয়েছিলাম কাল রাতে! আর তোমার ঘড়িতে এখন পৌনে আটটা বাজে!"

কথাটা বলেই নীলা দরজার বাইরে এক প্রকার দৌড় দিল।

বিছানায় বসা রাফির মাথার ভেতরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে ঠাণ্ডা থেকে আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠল। সে চট করে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাল। সত্যি, পৌনে আটটা! আর মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যে তার পুরো কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রজেক্টের নোটিশ আর কনফারেন্স লাইভ হওয়ার কথা। অথচ কোনো প্রিপারেশন নেই, ল্যাপটপ অন নেই, ফাইল রেডি নেই!

রাফি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল। তার রক্তচাপ যেন এক লহমায় শতগুণ বেড়ে গেল। এতদিনের নীলার ছোটখাটো সব দুষ্টুমি—কখনো জুতো লুকিয়ে রাখা, কখনো মোজা পাল্টে দেওয়া, কখনো চায়ের মধ্যে চিনির বদলে সামান্য লবণ মিশিয়ে দেওয়া—এসব রাফি সবসময় ভালোবেসে সহ্য করেছে, উপভোগও করেছে। কিন্তু আজকের ঘটনাটা শুধুই দুষ্টুমি নয়, এটা তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে দিতে পারে।

রাফি ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত মুখে পানি দিয়ে কোনোমতে শার্ট চাপাল। ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং টেবিলে আসতেই দেখল নীলা ট্রেতে গরম চায়ের কাপ আর নাশতা নিয়ে দোটানায় দাঁড়িয়ে আছে। নীলা ভেবেছিল রাফি হয়তো প্রতিদিনের মতো আজও তার দিকে তাকিয়ে একটা ভুয়া রাগের ভঙ্গি করবে, তারপর তাকে টেনে এনে কোলে বসিয়ে চায়ে চুমুক দেবে।

কিন্তু রাফি নীলার দিকে একবারের জন্যও তাকাল না। তার মুখটা একবারে পাথরের মতো শক্ত আর ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চোখ দুটো লাল।

রাফি দ্রুত তার ল্যাপটপ আর ব্রিফকেসটা হাতে নিল।

নীলা অপরাধীর মতো নিচু গলায় বলল, "রাফি... চা-টা অন্তত খেয়ে যাও? আর... আর আমি সত্যি বুঝি নাই যে এত দেরি হয়ে যাবে..."

রাফি হাঁটা থামাল। তবে নীলার দিকে ফিরল না।

খুব শান্ত, অতিরিক্ত গম্ভীর কিন্তু বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় রাফি বলল, "আমার জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা রসিকতা, সেটার তফাত যদি তুমি এখনো বুঝতে না পারো নীলা, তবে আর কিছু বলার নেই। আমার কোনো নাশতা লাগবে না।"

কথাগুলো বলে রাফি দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর সজোরে দরজাটা আটকে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বিকট শব্দে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজে নীলা চমকে উঠল।

নীলার হাতের ট্রেইটা যেন কেঁপে উঠল। রাফি এর আগেও অনেকবার রাগ করেছে, কিন্তু আজকের এই শান্ত, বরফশীতল কন্ঠস্বর আর চোখ তুলে না তাকানোর মধ্যে যে অভিমান আর যন্ত্রণা ছিল, তা নীলা বিয়ের পর এই প্রথম দেখল।

নীলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ঘরজুড়ে এখন এক বিষণ্ণ নীরবতা। সোফায় পড়ে থাকা রাফির টাইটার দিকে তাকিয়ে নীলার চোখ দুটো হালকা জলে ভরে এলো। সে বুঝতে পারল, এবার তার সীমানা পার হয়ে গেছে। রাফি সত্যি সত্যি তার ওপর ভীষণ অভিমান করেছে। আর এই অভিমান ভাঙানো যে মোটেও সহজ হবে না, সেটা নীলার চেয়ে ভালো আর কে জানে!

নীলা নিজের ঠোঁট কামড়ে সোফায় গিয়ে বসল। রাফির সেই সকালের তীব্র আলিঙ্গন, তার গায়ের চেনা ঘ্রাণ আর শেষমুহূর্তের বরফশীতল চাহনি—সবকিছু যেন নীলার বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত তোলপাড় সৃষ্টি করতে লাগল। রাফিকে মানাতেই হবে, যেকোনো মূল্যে।

দরজা বন্ধ হওয়ার সেই বিকট শব্দটা এখনো যেন নীলার কানে প্রতিধ্বনি তুলে বাজছে।

ডাইনিং টেবিলের ওপর বাষ্প উঠতে থাকা চায়ের কাপ দুটো এখন একদম ঠাণ্ডা। নীলা স্তব্ধ হয়ে সোফায় বসে রইল কিছুক্ষণ। পুরো বাসাটায় এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা নীরবতা। রাফি চলে যাওয়ার সময় তার চোখের সেই অচেনা, বরফশীতল চাহনি নীলার বুকের ভেতর হাজারটা ছুঁচের মতো ফুটছে। এতদিনের মিষ্টি সম্পর্কটার ওপর যেন এক নিমেষে একরাশ কালোর মেঘ এসে জমেছে।

নীলা হাত বাড়িয়ে সোফায় পড়ে থাকা রাফির ঘাম আর পারফিউম মেশানো নীল রঙের টাইটা হাতে নিল। বুকের কাছে টেনে এনে চোখ বন্ধ করল সে। রাফির এই সতেজ পুরুষালী ঘ্রাণটাই নীলার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। অথচ আজকের সকালে সেই মানুষটাকেই সে নিঃশব্দে একরাশ অপমানে ডুবিয়ে দিয়েছে। রাফির ক্যারিয়ারের এই মিটিংটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নীলা ভালো করেই জানত। রাফি দিনের পর দিন রাত জেগে এই প্রজেক্টের ফাইল তৈরি করেছে, কত শত পরিকল্পনা করেছে। আর নীলা কি না নিজের এক মুহূর্তের ক্ষণিক আনন্দের জন্য সব নষ্ট করে দিতে বসেছিল!

হঠাৎ নীলার মন বলে উঠল—না, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। রাফি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে নীলার এই দুষ্টুমির তো কোনো মূল্যই থাকে না।

নীলা চটজলদি উঠে দাঁড়াল। চোখের পানি মুছে নিজেকে প্রস্তুত করল। যেকোনো মূল্যে আজ রাফির রাগ ভাঙাতে হবে। শুধু রাগ ভাঙানো নয়, রাফিকে আবার আগের মতো নিজের প্রেমে আর কামনায় ব্যাকুল করে তুলতে হবে। নীলার চোখে এবার অপরাধবোধের পাশাপাশি এক নতুন চঞ্চলতার আলো জ্বলে উঠল।

নীলা প্রথমে রাফির ল্যাপটপের অতিরিক্ত চার্জার আর টেবিলে ফেলে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি একটা ড্রাইভ খুঁজে বের করল, যা রাফি তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। এগুলো তো অন্তত অফিসে পৌঁছে দেওয়ার অজুহাত হবে!

ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। নীলা আলমারি খুলে একটা গাঢ় লাল রঙের ঢাকাই জামদানি শাড়ি বের করল। রাফি লাল রঙ বড্ড ভালোবাসে। লাল শাড়িতে নীলাকে দেখলে নাকি রাফির ভেতরের সমস্ত সংযম বাঁধ ভেঙে যায়। নীলা শাড়িটা একদম নিপুণভাবে পরা শুরু করল। নাভির ঠিক নিচে শাড়ির ভাজ আটকে, খোলা পিঠে আঁচল ছড়িয়ে দিল। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দিয়ে সামান্য সুগন্ধি ছিটিয়ে নিল ঘাড়ের কাছে আর কানের লতিতে। চোখে গাঢ় করে আঁকল কাজল। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।

প্রস্তুত হয়ে নীলা সোজা রাফির অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

অফিসের বিলাসবহুল বহুতল ভবনে পৌঁছে নীলার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। রাফির প্রাইভেট কেবিনের সামনে এসে নীলা এক মুহূর্ত দাঁড়াল। গ্লাস ডোরের ওপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে রাফিকে। তার গায়ের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, হাতের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। সে খুব মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে, চোখ দুটো এখনো ক্লান্ত আর গম্ভীর।

নীলা দরজা হালকা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।

দরজা খোলার শব্দে রাফি মুখ তুলে তাকাল। লাল শাড়িতে নীলাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য রাফির চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। নীলার এই মোহনীয় রূপের সামনে যে কোনো পুরুষের বুক কেঁপে ওঠার কথা, রাফিরও হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে তার ভেতরের সমস্ত আবেগ চেপে বরফের মতো শক্ত মুখ করে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ ফেরাল।

"এখানে কেন এসেছ নীলা?" রাফির গলায় কোনো অনুভূতি নেই, একদম সমতল আর ঠাণ্ডা।

নীলা ধীরে ধীরে হেঁটে রাফির টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে পেনড্রাইভ আর চার্জারটা বের করে টেবিলে রেখে নিচু গলায় বলল, "তুমি কাল রাতের এই ড্রাইভটা ফেলে গিয়েছিলে রাফি। খুব জরুরি ছিল, তাই দিতে এলাম।"

"রাখা শেষ? এবার তুমি যেতে পারো। আমি খুব ব্যস্ত," রাফি ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলে কাঠখোট্টা গলায় বলল।

নীলা টেবিল ঘুরে সোজা রাফির রিভলভিং চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। রাফি তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নীলা দমার পাত্রী নয়। সে হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে রাফির হাতের ওপর নিজের শাড়ির আঁচলসহ হাতটা রাখল। নীলার গায়ের মিষ্টি পারফিউম আর কামিনী ফুলের সুবাস রাফির নাকে এসে ধাক্কা দিল।

নীলা রাফির মুখের কাছে নিজের মুখ এনে খুব মিষ্টি আর অপরাধীর মতো নরম গলায় বলল, "মিটিংটা কি খুব খারাপ হয়েছে রাফি? তুমি কি আমার ওপর খুব বেশি রাগ করে আছো?"

রাফি চেয়ার ছেড়ে এক নিমেষে দাঁড়িয়ে পড়ল। নীলার অত কাছাকাছি থাকাটা যেন তার সংযমের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছিল। সে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে গ্লাসের জানালার দিকে ফিরে দাঁড়াল।

"রাগ?" রাফি একটি তিক্ত হাসি হাসল। "তুমি রাগ আর অভিজ্ঞতার তফাত বোঝো না নীলা? আজকের মিটিংটার জন্য আমি ছয় মাস ধরে খেটেছি। সকালে তোমার ওই নোংরা রসিকতার জন্য মিটিংয়ের প্রথম দশ মিনিট আমি জয়েনই করতে পারিনি। ক্লায়েন্টের সামনে আমার ইমেজ কোথায় গেছে, ধারণা আছে তোমার? তুমি সবকিছুকে শুধু খেলা মনে করো!"

রাফির এই তীব্র আর রুক্ষ আওয়াজ নীলার কলিজায় গিয়ে লাগল। নীলা আর সামলাতে পারল না। সে পেছন থেকে গিয়ে রাফির শক্ত কোমরটা দু-হাতে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা রাফির চওড়া পিঠে চেপে ধরল।

"আই অ্যাম সরি রাফি... প্লিজ, আমাকে এভাবে দূরে ঠেলে দিও না। আমি সত্যি বুঝতে পারিনি। আমাকে যা শাস্তি দিতে চাও দাও, কিন্তু এভাবে অচেনা মানুষের মতো কথা বোলো না।" নীলার কণ্ঠে তীব্র কান্নার তোড়।

নীলার বুকের ধুকপুকানি আর চোখের জলের আর্দ্রতা রাফির পিঠে লাগতেই রাফির ভেতরের জমাট বরফটা গলতে শুরু করল। নীলার ওপর রাগের চেয়ে তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়টাই বেশি ছিল। নীলা যখন এভাবে তার গায়ে এসে পড়ে, তখন রাফি আর রাফি থাকে না।

রাফি এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। নীলার দু-হাত ধরে তাকে নিজের দিকে টান দিল। নীলা ছিটকে এসে রাফির শক্ত বুকের ওপর পড়ল। দুজনের দূরত্ব এখন শূন্য।

রাফি নীলার থুতনিটা আঙুল দিয়ে শক্ত করে ওপরে তুলল। নীলার চোখের জল আর গাঢ় কাজলের দাগ মিশে একাকার হয়ে আছে, ঠোঁট দুটো ভয়ে আর আবেগে কাঁপছে। রাফির চোখ জোড়া আঁধার ঘন হয়ে এলো। তার দৃষ্টি নীলার ভেজা ঠোঁট আর খোলা পিঠের ওপর আটকে গেল।

"তুমি চাও আমি তোমাকে শাস্তি দিই, তাই তো?" রাফি ফিসফিস করে বলল, তার কন্ঠস্বর এখন আর রাগের নয়, তাতে মিশে গেছে এক তীব্র, অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনা।

নীলা হালকা করে মাথা নাড়ল। সে রাফির চোখের দিকে তাকাতে পারছে না, আবার চোখ সরাতেও পারছে না।

রাফি নীলার কোমরটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে কাঠের বিশাল এক্সিকিউটিভ টেবিলটার সাথে চেপে ধরল। নীলার শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরে গেল, রাফির গরম নিঃশ্বাস সোজা গিয়ে পড়ল নীলার উন্মুক্ত বুক আর ঘাড়ে।

"তুমি আমার ওপর তোমার ওই চপলতা দিয়ে রাজত্ব করতে চাও নীলা," রাফি নীলার কানের লতিতে দাঁত দিয়ে হালকা কামড় বসাল, যার শিহরণে নীলা মাথা পেছনে হেলে দিয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। "কিন্তু তুমি ভুলে যাও, এই রাফি যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন তুমি সামলাতে পারো না।"

রাফি এক হাতে নীলার পিঠ চেপে ধরে অন্য হাতে নীলার লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁট দিয়ে নির্মমভাবে চুষে নিতে শুরু করল। এই চুমুতে কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল এক তীব্র অধিকারবোধ আর শাস্তির মাখামাখি। নীলা রাফির শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। রাফির এই ব্যাকুল, উদগ্র রূপটাই তো সে দেখতে চেয়েছিল!

অফিসের নিস্তব্ধ কেবিনের ভেতর দুজনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আর লিপস্টিকের মৃদু শব্দ যেন বাতাসের ঘনত্ব বাড়িয়ে দিল। রাফির হাত নীলার শাড়ির ভাজ ঠেলে তার সুগঠিত কোমরে গভীরে চেপে বসতে লাগল। নীলার মুখ থেকে একটা হালকা যন্ত্রণার এবং একই সাথে পরম তৃপ্তির শব্দ বের হয়ে এলো—"উফফ... রাফি..."

রাফি হঠাৎ চুমু থামাল। নীলার লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁট আর আধবোজা চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। নীলা ভেবেছিল রাফির রাগ বুঝি পানি হয়ে গেছে।

কিন্তু রাফি নীলাকে হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার চাহনি আবার আগের মতো রহস্যময় আর শক্ত হয়ে উঠল।

শাড়ির সামলিয়ে নীলা অবাক হয়ে তাকাল। "রাফি?"

রাফি নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে এক সুদূর হাসি হাসল। "এটা কোনো ক্ষমা নয় নীলা। এটা জাস্ট একটা ট্রেলার ছিল। তুমি ভেবেছ এত সহজে তুমি পার পেয়ে যাবে? আজকের রাতের জন্য তৈরি থেকো। আজ রাতে তোমাকে বোঝাব, ভুল মানুষের সাথে ভুল খেলা খেলেছ তুমি।"

কথাটা বলে রাফি দরজার দিকে আঙুল তুলে শান্ত গলায় বলল, "এখন বাসায় যাও। আমার কাজ আছে।"

নীলার বুকের ভেতরটা কেমন এক অজানা আশঙ্কায় আর তীব্র উত্তেজনায় কেঁপে উঠল। রাফির চোখে আজ সে যে আগুন দেখেছে, তা ক্ষমা করার আগুন নয়, তা নীলাকে নিঃশেষ করে দেওয়ার আগুন।

অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথটায় নীলার মনজুড়ে এক অদ্ভুত দোলাচল খেলা করছিল। একদিকে রাফির দেওয়া সেই ব্যাকুল, তপ্ত চুমুর শিহরণ এখনো তার ঠোঁটে আর চামড়ায় লেগে আছে, অন্যদিকে রাফির শেষ কথাটা তার বুকের ভেতর এক অজানা উত্তেজনার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।

"আজকের রাতের জন্য তৈরি থেকো..."

রাফির সেই গম্ভীর, ভারী কন্ঠের হুমকিটা নীলার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক গভীর কামনার কাঁপন তুলে দিচ্ছে। রাফি যখন শান্ত থাকে, তখন সে এক গম্ভীর পাহাড়। কিন্তু যখন তার ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠে, তখন তাকে সামলানো যে কতটা কঠিন—তা নীলা খুব ভালো করেই জানে।

বাসায় ফিরেই নীলা নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করল। আজকের রাতটা কোনো সাধারণ রাত হতে পারে না। আজ রাফি তাকে শাস্তি দেবে, আর সে পরম আনন্দে সেই শাস্তির সাগরে ডুব দেবে।

নীলা প্রথমে শاور থেকে ভালো করে স্নান করে নিল। হালকা সুবাসিত শাওয়ার জেলের সুগন্ধ তার শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। আলমারি খুলে সে এক অনন্য পোশাক বেছে নিল—একটি ঘন কালো রঙের পাতলা জর্জেটের শাড়ি। কালোর ওপর হালকা সোনালি পাড়। রাফি তাকে কালো শাড়িতে দেখতে বড্ড ভালোবাসে।

নীলা কোনো পেটিকোট বা ভারী ব্লাউজ পরল না, অত্যন্ত নিপুণভাবে শাড়িটা এমনভাবে পেঁচিয়ে পরল যেন তার মেদহীন কোমর, উন্মুক্ত পিঠ আর সুগঠিত শরীরের বাঁধন একদম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চুলগুলো ভেজা অবস্থাতেই পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে নীলার নিজেরই বুক ধক করে উঠল। চোখে গাঢ় সুরমা আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপগ্লস—নীলা যেন এক মায়াবী রূপসী রাতের অপ্সরী হয়ে উঠল।

সোবার ঘরটাকেও নীলা নতুন করে সাজাল। ম্লান, নরম লাল আলো জ্বালিয়ে দিল ঘরের কোণে। বেডসাইড টেবিলে সুগন্ধি মোম জ্বালিয়ে দিল, যার হালকা সুবাস আর হালকা লালচে আলো সারা ঘরে এক রহস্যময় ভালোবাসার আবহ তৈরি করল।

রাত নয়টা বাজতেই দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো। নীলার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

রাফি ভেতরে ঢুকল। ঘরের পরিবেশ আর লালচে আলো দেখে তার পা জোড়া এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে কোটটা খুলে সোফায় রাখল। তার চোখের চাহনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। নীলা ঘরের এক কোণে হালকা হেসে দাঁড়িয়ে ছিল।

রাফি কোনো কথা না বলে সোজা নীলার দিকে এগিয়ে এলো। তার হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল এক শিকারীর মতো ধীর স্থির ভাব।

নীলার সামনে এসে রাফি দাঁড়াল। রাফির গায়ের দামি পারফিউম আর রাতের ঠাণ্ডা বাতাসের সুবাস নীলার নাকে এসে ধাক্কা দিল। রাফি এক দৃষ্টিতে নীলার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিল। কালো পাতলা শাড়িতে নীলার উন্মুক্ত পিঠ আর নাভির নিচে নেমে যাওয়া শাড়ির ভাজ দেখে রাফির চোখের মণি দুটো যেন আরও গাঢ় আর অন্ধকার হয়ে এলো।

"খুব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে দেখছি?" রাফির গলাটা অনেক নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরনের অস্বাভাবিক দখলদারিত্বের সুর।

নীলা রাফির বুকের কাছে এক পা এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, "তুমিও তো বলেছিলে তৈরি থাকতে..."

রাফি কোনো উত্তর দিল না। সে হুট করে নীলার এক হাত ধরে এক টান দিল। নীলা ছিটকে এসে রাফির শক্ত, সুগঠিত বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। নীলার দুটি নরম হাত রাফির শার্টের ওপর আছড়ে পড়ল। রাফি নীলার ওপরের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁট দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল।

অফিসের চুমুটা ছিল ক্ষোভের, কিন্তু এবারের পরশটা ছিল এক তীব্র আদিম কামনার। রাফির ঠোঁটের উষ্ণতায় নীলা যেন এক নিমেষে গলে যেতে লাগল। সে রাফির গলার পেছনে হাত পেঁচিয়ে ধরে নিজেকে রাফির সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

রাফি নীলাকে এক হাতে কোলে তুলে নিল। নীলা হালকা একটা চিৎকার দিয়ে রাফির গলা জড়িয়ে ধরল। রাফি নীলাকে নিয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে শুইয়ে দিল। নীলার ভেজা চুলগুলো সাদা চাদরের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।

রাফি নীলার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার চোখের চাহনিতে কোনো ক্ষমা নেই, আছে শুধু এক অধীর গ্রাস করার তৃষ্ণা।

"আজ রাতে আমি কোনো ক্ষমা করব না নীলা," রাফি নীলার কানের পাশে ফিসফিস করে বলল। তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নীলার ঘাড়ে আছড়ে পড়তে নীলা চোখ বন্ধ করে ফেলল। "আজ রাতে তুমি শুধু আমার এই রাগ আর তীব্রতা সহ্য করবে।"

রাফি নিজের শার্টের বোতামগুলো এক টানে খুলে ফেলল। তার চওড়া, পশমযুক্ত শক্ত বুকটা নীলার নরম বুকের ওপর চেপে বসল। ত্বকের সাথে ত্বকের এই সরাসরি স্পর্শে নীলা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। রাফির হাত নীলার শাড়ির ভাজে নেমে গেল। খুব ধীরগতিতে, কিন্তু নিপুণভাবে সে নীলার শাড়ির বন্ধন আলগা করতে শুরু করল।

রাফির শক্ত আঙুলগুলো নীলার কোমরের স্পর্শকাতর চামড়ায় গেঁথে বসতেই নীলার শরীরটা ধনুকের মতো বেকে উঠল। "উফফ... রাফি..."

"শব্দ কোরো না," রাফি নীলার গালের ওপর নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। তার ঠোঁট আর দাঁত নীলার থুতনি, ঘাড় আর কানের লতিতে এক তৃষ্ণার্ত শিকারীর মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। মাঝেমধ্যে দাঁতের আলতো কামড়ে নীলা যন্ত্রণায় আর সুখে শিউরে উঠছিল।

কালো জর্জেটের শাড়িটা বিছানার এক কোণে খসে পড়ল। নীলা এখন রাফির সামনে প্রায় অনাবৃত। লাল আলোর নিচে নীলার ফর্সা, মসৃণ শরীর যেন এক অপূর্ব ভাস্কর্য। রাফির চোখ দুটো কামনায় আর ভালোবাসায় জ্বলজ্বল করে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

রাফির হাত নীলার উরু আর নিতম্বের খাঁজে নেমে গিয়ে তাকে নিজের দিকে শক্ত করে চেপে ধরল। রাফির প্রতিটি স্পর্শে ছিল এক কঠিন উন্মাদনা। সে নীলার উন্মুক্ত স্তনযুগলের ওপর নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। চুষে আর কামড়ে নীলাকে কামনার চরম সীমায় নিয়ে যেতে লাগল রাফি। নীলা রাফির পিঠে নিজের নখ দিয়ে আঁচড় কেটে দিল, তার মুখ থেকে শুধুই বের হয়ে আসছে এক অবশ করা শীৎকার।

"রাফি... প্লিজ... আমি আর পারছি না..." নীলা কাঁপতে থাকা গলায় অনুনয় করল।

কিন্তু রাফি আজ থামার পাত্র নয়। সে নীলার দুটি হাত মাথার ওপর নিয়ে চাদরের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর নীলার ভেতরের সমস্ত ব্যাকুলতা আর তৃষ্ণাকে চূর্ণ করে দিয়ে নিজের সমস্ত পুরুষালী তীব্রতা নিয়ে নীলার শরীরে মিশে গেল।

এক গভীর, চরম ভালোবাসার ঝড়ে মেতে উঠল দুজনে। ঘরের নীরবতা ভেঙে শুধুই ভেসে আসতে লাগল দুজনের দ্রুগতি নিঃশ্বাস আর চাদরের সাথে শরীরের ঘর্ষণের শব্দ। রাফির প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে নীলা যেন এক নতুন স্বর্গে পৌঁছে যাচ্ছিল। রাফি তাকে কোনো ছাড় দিল না, তার গভীর, দীর্ঘ উত্তাপ দিয়ে নীলার প্রতিটি কোণ জয় করে নিল।

দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই আদিম মিলন। কামনার চরম শিখরে পৌঁছে দুজন যখন একসাথে এক স্বর্গীয় সুখে কেঁপে উঠল, তখন ঘরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে এসেছে।

রাফি নীলার ওপর ভেঙে পড়ল। দুজনই তখন হাঁপাচ্ছে, শরীরজুড়ে ঘামের বিন্দু। রাফি নীলাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কপালে এক দীর্ঘ, উষ্ণ পরশ একে দিল।

নীলা রাফির বুকের পশমে মুখ লুকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে বলল, "তোমার... তোমার রাগ কি এবার কমেছে?"

রাফি অন্ধকার ঘরে নীলার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আর রাগ ছিল না, কিন্তু এক রহস্যময় গভীরতা ফুটে উঠল।

রাফি হালকা একটা বিষণ্ণ হাসি হেসে নীলার গালটা স্পর্শ করল, "শরীর শান্ত হয় নীলা... কিন্তু যে বিশ্বাস আর কষ্টের জায়গাটা সকালে ভেঙেছ, সেটা কি এত সহজে জোড়া লাগে?"

কথাটা বলেই রাফি নীলাকে ছেড়ে দিয়ে বিছানার ওপর অন্যদিকে মুখ ফিরে শুয়ে পড়ল।

এক মুহূর্তের মধ্যে নীলার ভেতরের সমস্ত সুখের অনুভূতি যেন বরফ হয়ে জমে গেল। সে বুঝতে পারল, রাফি তার শরীরকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু তার মন এখনো বহুদূরে অভিমান করে বসে আছে।

রাফি বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরো ঘরটায় এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।

নীলা অনাবৃত গায়ে চাদরটা বুকের ওপর চেপে ধরে চুপচাপ শুয়ে রইল। কিছুক্ষণ আগেই রাফির যে স্পর্শ তার শরীরে আগুনের মতো জ্বলছিল, এখন সেই শরীরটাই বরফের মতো ঠাণ্ডা লাগছে। বিছানায় এত কাছে শুয়ে থেকেও মানুষটার মনের দূরত্ব যে কতটা, নীলা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। রাফি শরীর দিয়ে তাকে জয় করেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের মনটাকে এক অদৃশ্য প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে।

রাফির নিঃশ্বাসের শব্দ এখন নিয়মিত। হয়তো সে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিংবা ঘুমানোর ভান করছে। নীলা আস্তে করে বিছানা থেকে নামল। মেঝের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা কালো জর্জেটের শাড়িটা তুলে গায়ে জড়িয়ে নিল। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেই রাতের ঠাণ্ডা বাতাস নীলার খোলা পিঠে আর মুখে এসে লাগল।

নীলার চোখে জল জমে উঠল। রাফি প্রতিদিন সকালে তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে ভালোবাসার চুমু দিয়ে ঘুম থেকে উঠত। অথচ আজ সে শুধু শারীরিক তীব্রতা টুকু উজাড় করে দিয়ে নিজের ভেতরের আত্মঅভিমান ধরে রেখেছে। নীলা নিজের ভুলটা বুঝতে পারছে—ব্যবসায়িক জীবনে রাফির সততা আর সিরিয়াসনেস কতটা গভীরে। নীলার খামখেয়ালি রসিকতা সেই জায়গাটাতেই আঘাত করেছে।

রাত গড়িয়ে সকাল হলো।

রাফি ঘুম থেকে উঠে সোজা শাওয়ার নিতে চলে গেল। প্রতিদিনের মতো আজ সে নীলাকে ডাকার বা ছোঁয়ার চেষ্টা করল না। টেবিল কাপড়ে ধোঁয়া ওঠা পরাটা আর ডিম ভাজা সাজিয়ে নীলা অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল। রাফি ফ্রেশ হয়ে একটা ফ্যাকাশে ধূসর শার্ট পরে ডাইনিং টেবিলে এলো।

নীলা নিচু গলায় বলল, "নাশতাটা করে নাও রাফি। আজ আর চা বানিয়ে দুষ্টুমি করিনি।"

রাফি প্লেটের দিকে একবার তাকাল, তারপর এক গ্লাস পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখল। তার মুখ আগের মতোই ভাবলেশহীন, অতিরিক্ত শান্ত।

"আমার অফিসের এক সহকর্মীর সাথে আজ বাইরে লাঞ্চের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে," রাফি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল। "আর সকালে নাশতা করার মতো ক্ষুধা আমার নেই।"

"রাফি, প্লিজ..." নীলা এগিয়ে এসে রাফির হাতের ওপর নিজের নরম হাতটা রাখল। "তুমি কি এভাবে না খেয়ে চলে যাবে? আমাকে যে শাস্তি দেওয়ার দাও, কিন্তু নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?"

রাফি নিজের হাতটা ধীরে ধীরে নীলার হাতের স্পর্শ থেকে সরিয়ে নিল। নীলার চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল, "আমি তোমাকে কোনো শাস্তি দিচ্ছি না নীলা। তুমি তো যা চেয়েছিলে কাল রাতে পেয়েছ। তোমার চপলতা দিয়ে তুমি শরীর মেটাতে পারো, কিন্তু মন তো মেটাতে পারো না। আমি শুধু তোমাকে সময় দিচ্ছি, যাতে তুমি বুঝতে পারো কোনটা জীবন আর কোনটা খেলা।"

কথাটা বলেই রাফি এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

রাফির যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে নীলার বুকটা ফেটে যেতে চাইল। রাফির শেষ কথাটা তার মনে শূলের মতো বিঁধল—'তুমি তো যা চেয়েছিলে কাল রাতে পেয়েছ।' রাফি ভাবছে সে শুধু নিজের শারীরিক চাহিদার জন্য কাল রাতের নাটকটা করেছিল?

নীলা সিদ্ধান্ত নিল, এভাবে সে হার মানবে না। রাফি যদি পাথর হয়ে যায়, তবে নীলা আগ্নেয়গিরি হয়ে সেই পাথর গলাবে। আজই তাকে বোঝাতে হবে, কাল রাতের ভালোবাসা কোনো অভিনয় ছিল না, ছিল রাফিকে হারানোর ভয়ে আঁকড়ে ধরার আকুলতা।

বিকেলে নীলা রাফির অফিসে যাওয়ার বদলে সোজা রাফির প্রিয় এবং নির্জন রিসোর্টটাতে একটা প্রাইভেট কটেজ বুক করল। ঢাকার অদূরে গাজীপুরের বনাঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত এই কটেজটিতে তারা বিয়ের পর প্রথম ঘুরতে এসেছিল।

নীলা রাফির ফোনে একটা মেসেজ পাঠাল—"আমি জানি তুমি আমার ওপর ভীষণ বিরক্ত। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় শেষবারের মতো গাজীপুরের সেই কটেজটায় এসো। তুমি না এলে আমি বুঝব তোমার জীবনে নীলা নামের কেউ আর অবশিষ্ট নেই। আমি সারারাত অপেক্ষা করব।"

মেসেজটা পাঠানোর পর নীলার বুক দুরুদুরু করতে লাগল। রাফি কি আসবে? নাকি এই আকুতিটাকেও রসিকতা ভেবে উড়িয়ে দেবে?

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।

কটেজের খোলামেলা কাঠের ব্যালকনিতে হালকা আলো জ্বলছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বনভূমির ঠাণ্ডা বাতাস। নীলা একটি ঘন বেগুনি রঙের শিফন শাড়ি পরেছে, ব্লাউজটা ব্যাকলেস, যা তার পিঠের সাদা চামড়াকে উন্মুক্ত করে রেখেছে। কপালে ছোট একটি বেগুনি টিপ। কটেজের ঘরের ভেতর সুগন্ধি ধূপ জ্বলছে।

ঘড়িতে সময় গড়াচ্ছে—আটটা... সাড়ে আটটা... নয়টা।

নীলা ব্যালকনির কাঠের রেলিং ধরে বাইরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। চারপাশ অন্ধকার। চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে নীলার। তবে কি রাফি সত্যি এলো না? তবে কি তাদের এই সুন্দর সম্পর্কটা এত ছোট একটা ভুলের মাসুল হিসেবে ভেঙে যাবে?

ঠিক তখনই কটেজের কাঠের সিঁড়িতে ভারী বুটের শব্দ পাওয়া গেল।

নীলা চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল।

অন্ধকার ফুঁড়ে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল রাফি। তার গায়ের কোটটা হাতে ঝুলছে, শার্টের কলারের বোতাম খোলা, চুলগুলো বাতাসে একটু এলোমেলো। তার চোখে মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চাহনিতে সেই তীব্র ক্ষোভ আর ভালোবাসায় মাখামাখি এক অদ্ভুত আলো।

নীলা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। রাফি সত্যিই এসেছে!

রাফি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ঢুকল। দরজাটা নিজের পেছনে সজোরে আটকে দিল। তারপর কোনো কথা না বলে সোজা এসে নীলার সামনে দাঁড়াল।

"তুমি কি ভাবো বলতো নীলা?" রাফির গলাটা কিছুটা উত্তেজিত আর ভারী। "একটা মেসেজ পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করবে আর আমি পাগলের মতো ছুটে আসব? তুমি আমাকে কেন এভাবে খেলাচ্ছ?"

নীলা কিছু বলল না। সে শুধু রাফির চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন ভালোবাসার চরম আকুলতা আর অনুশোচনার অশ্রু। নীলা এক পা এগিয়ে গিয়ে রাফির বুকের ওপর নিজের পুরো শরীরটা ছেড়ে দিল। দু-হাতে রাফির পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

"আমি কোনো খেলা খেলছি না রাফি... আমি তোমাকে ভালোবাসি। কাল রাতের প্রতিটা স্পর্শ সত্যি ছিল, প্রতিটা অনুভূতি সত্যি ছিল। তুমি আমাকে ছেড়ে এভাবে দূরে সরে থেকো না, আমি মরে যাব..." নীলা কাঁদতে কাঁদতে শার্টের ওপরই রাফির বুকে আলতো কামড় আর চুমু খেতে লাগল।

নীলার এই অনিয়ন্ত্রিত কান্না আর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ রাফির ভেতরের সব শক্ত বরফ এক সেকেন্ডে গলিয়ে দিল। রাফি আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না।

রাফি নীলার চুলগুলো মুঠোর মধ্যে ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। নীলার চোখের জল আর লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দেখে রাফির বুকের ভেতরটাও তোলপাড় হয়ে উঠল।

"তুমি বড্ড দুষ্টু নীলা... তোমাকে শাস্তি দেওয়া আমার সাধ্যে নেই," রাফি ফিসফিস করে বলল।

পর মুহূর্তেই রাফি নীলার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। তবে এবারের চুমুটা কালকের মতো রুক্ষ ছিল না। এতে ছিল এক ব্যাকুল ভালোবাসার তৃষ্ণা, ক্ষমা করার আকুলতা আর গভীর আদিম আকর্ষণ। নীলা রাফির গলা পেঁচিয়ে নিজেকে শতভাগ সঁপে দিল।

রাফির হাত নীলার ব্যাকলেস ব্লাউজের উন্মুক্ত পিঠে উঠে আসতেই নীলার শরীর শিউরে উঠল। রাফি নীলাকে কোলপাঁজা করে তুলে নিয়ে সোজা ঘরের বিশাল কিং-সাইজ বিছানার দিকে পা বাড়াল।

আগের রাতের রাগ আজ এক মহা মিলনের অগ্নিকুণ্ডে রূপ নিতে চলেছে।
কটেজের সেই নিরিবিলি ঘরে সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া আর নরম আলোয় এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে।

রাফি নীলাকে নিয়ে সোজা বিশাল বিছানাটার ওপর নামিয়ে দিল। বেগুনি রঙের শিফন শাড়িটা সাদা চাদরের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। নীলার চোখ দুটো তখনো ভেজা, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে আর চোখের পাতায় তখন পরম প্রাপ্তির শিহরণ। রাফি যে শেষ পর্যন্ত তার আকুতিতে সাড়া দিয়ে ছুটে এসেছে, সেটাই যেন নীলার বুকের সব জমে থাকা পাথর সরিয়ে দিয়েছে।

রাফি নীলার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার চোখের গাম্ভীর্য এখনো পুরোপুরি যায়নি, কিন্তু সেই ভাবলেশহীন বরফের জায়গা নিয়েছে এক উদগ্র বাসনা। সে নীলার ভেজা চোখে আর গালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

"আমার ওপর আর কখনো এরকম খেলা খেলবে না, নীলা?" রাফির ভারী ফিসফিসানি নীলার কানের কড়িতে গিয়ে বিঁধল।

নীলা রাফির শার্টের কলারটা চেপে ধরে নিজের দিকে আরও টেনে আনল। তার বুকটা ঘন ঘন ওঠানামা করছে। "কখনো না... তুমি ছাড়া আমার এই দুষ্টুমির তো কোনো দাম নেই, রাফি। আমি শুধু তোমাকে চাই..."

কথাটা শেষ হতে পারল না। রাফি নীলার মুখটা নিজের দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে গভীর চুমুতে তলিয়ে গেল। এবারের স্পর্শে কোনো কঠিন রাগ ছিল না, ছিল এক আদিম তৃষ্ণা—যে তৃষ্ণায় রাফি নীলাকে আবার পুরোপুরি নিজের করে পেতে চায়। নীলাও তার ঠোঁটের বাঁকগুলো রাফির মুখের ভেতরের কামনার কাছে সমর্পণ করে দিল।

রাফির এক হাত চলে গেল নীলার শাড়ির আঁচলে। আলতো এক টানে শিফনের পাতলা শাড়িটা নীলার শরীর থেকে আলাদা হয়ে বিছানার পাশে খসে পড়ল। নীলার ব্যাকলেস ব্লাউজের ফিতে দুটো রাফির নিপুণ আঙুলের স্পর্শে এক নিমেষে আলগা হয়ে গেল।

খোলা পিঠের নরম ও উষ্ণ চামড়ায় রাফির শক্ত, উত্তপ্ত হাত লেগে থাকতেই নীলার শরীরটা কামনার সুখে ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। সে হালকা একটা হাঁপ ছেড়ে রাফির নাম ধরে ডেকে উঠল, "উফফ... রাফি..."

"হুমম?" রাফি নীলার কানের লতিটা দাঁতে চেপে ধরে আলতো করে কামড় দিল। নীলার ঘাড় আর গলার খাঁজে রাফির ঠোঁট নেমে এলো। সেখানে গরম নিঃশ্বাস আর চুমুর দাগ একে দিতে দিতে রাফি নীলার সুগঠিত মেদহীন কোমর চেপে ধরল।

রাফি নিজের শার্ট আর প্যান্ট খুলে দূরে ছুড়ে ফেলল। তাদের দুজনের নগ্ন চামড়ার সরাসরি স্পর্শে কটেজের ঠাণ্ডা ঘরের তাপমাত্রা যেন এক লহমায় শতগুণ বেড়ে গেল। রাফির চওড়া, লোমশ বুকের সাথে নীলার কোমল বুকের ঘর্ষণ নীলাকে এক অদ্ভুত নেশায় বুঁদ করে ফেলল।

নীলা তার হাত দুটো রাফির পিঠের শক্ত পেশীতে ছড়িয়ে দিল। রাফির প্রতিটি পেশীর ওঠানামা সে নিজের নখ দিয়ে অনুভব করতে লাগল। রাফি নীলার একটি উরু নিজের কোমরের পাশে টেনে এনে আরও গভীর ভালোবাসায় লিপ্ত হলো।

ঘরের মধ্যে শুধুই তখন আছড়ে পড়ছে দুজনের দ্রুতগতির শ্বাস-প্রশ্বাস আর শিউরে ওঠা ভালোবাসার ব্যাকুল শব্দ।

"রাফি... তুমি আমাকে এত ভালোবাসো?" নীলা আধবোজা চোখে, ব্যাকুল গলায় ফিসফিস করে বলল।

রাফি নীলার ঠোঁটে আরেকটা গভীর চুমু দিয়ে তার চোখে চোখ রাখল। তার চোখে তখন এক অগাধ সাগরের ভালোবাসা। "ভালোবাসি বলেই তো তোমার এত অন্যায়ের পরও নিজেকে ধরে রাখতে পারি না, নীলা। তুমি আমার এমন এক নেশা, যা ছাড়া আমি অচল।"

কথাটা বলেই রাফি নীলার সমস্ত শরীরজুড়ে চরম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করল। রাফির প্রতিটি উত্তপ্ত আঘাত নীলাকে যেন জীবনের এক অন্য স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছিল। নীলা রাফির কাঁধে নিজের দাঁত হালকা করে বসিয়ে দিয়ে ভালোবাসার সেই কঠিন তীব্রতা সহ্য করে নিচ্ছিল। পরম আনন্দে আর চরম সুখে নীলার চোখ থেকে দু-ফোঁটা আনন্দের জল চাদরে গিয়ে মিশল।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আবেগঘন ঝড়ের পর, দুজনেই যখন একসাথে কামনার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেল, তখন পুরো ঘর জুড়ে নেমে এলো এক পরম শান্তি।

রাফি নীলার ওপর ভেঙে না পড়ে, তাকে নিজের বুকের একদম ভেতরে টেনে নিল। নীলা রাফির শক্ত বুকের পশমে মুখ লুকিয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাফি নীলার পিঠের খোলা চামড়ায় হাত বোলাতে বোলাতে তার কপালে মিষ্টি একটি চুমু একে দিল।

"আজ রাতটা শুধু আমাদের," রাফি নিচু গলায় বলল।

নীলা হালকা হেসে রাফির বুকে আরেকটু চেপে বসল। সে ভেবেছিল সব ঝামেলা হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু সে জানত না, কটেজের বাইরে রাতের আঁধারে অন্য এক ঝড় তাদের অপেক্ষায় তৈরি হচ্ছে, যা তাদের এই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে আবার ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত!

রাফির শক্ত বুকের ওম আর গাজীপুরের বনাঞ্চলের নিঝুম রাতের শান্ত বাতাস—সব মিলিয়ে নীলার মনে হচ্ছিল সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে। নীলা রাফির বুকের লোমে ক্যানভাসের মতো আঙুল দিয়ে কাল্পনিক ছবি আঁকছিল। রাফি নীলার ভেজা চুলগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে গভীর ভাবনায় ডুবে ছিল।

হঠাৎ করেই কটেজের পেছনের জানালার বাইরে কিছু একটা ভাঙার শুকনো শব্দ হলো।

এক নিমেষে রাফির শরীর শক্ত হয়ে উঠল। সে নীলাকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে সজাগ হয়ে বসে পড়ল। রাফি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরে দরজার দিকে তাকাল। নীলাও ধড়ফড় করে উঠে বসে বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল।

"কী হয়েছে, রাফি?" নীলা ভীতি জড়ানো নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।

"চুপ," রাফি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীলাকে শান্ত থাকতে বলল। সে বিছানা থেকে নেমে দ্রুত প্যান্ট আর শার্টটা চাপিয়ে নিল।

ঠিক তখনই কটেজের মূল দরজায় সজোরে লাথি মারার শব্দ হলো! এক, দুই, তিনবার—তারপর বিকট শব্দে কাঠের দরজার লক ভেঙে দুজন লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। তাদের হাতে চকচকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র আর লাঠি।

নীলা ভয়ে একটা ছোট চিৎকার দিয়ে বিছানার এক কোণে কুঁকড়ে গেল। রাফি দ্রুত নীলার সামনে এসে ঢাল হয়ে দাঁড়াল।

লোকগুলোর মধ্যে একজন কুৎসিত হেসে বলল, "স্যার, কটেজটা বুক করার সময় ভাবছিলেন খুব শান্তিতে রাত কাটাবেন? এই নির্জন রিসোর্টে রাত কাটাতে গেলে তো ট্যাক্স দিতে হয়!"

অন্যজন কটমট চোখে নীলার অনাবৃত ঘাড় আর খোলা পিঠের দিকে তাকিয়ে একটা বিশ্রী কমেন্ট করে উঠল, "বউ তো খাসা রে ভাই! টাকা-পয়সা সব দে, আর ম্যাডামকেও একটু..."

লোকটার মুখ থেকে অশালীন কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রাফি সিংহের মতো গর্জে উঠল। বছরের পর বছর জিম করা রাফির শক্ত শরীর আর রাগ যখন মাথায় চেপে বসে, তখন সে রূপান্তর হয়ে যায় অন্য এক মানুষে।

রাফি এক মুহূর্ত দেরি না করে সামনের লোকটার মুখের ওপর এক শক্ত ঘুষি বসাল। বিকট শব্দে লোকটা পেছনের টেবিলে গিয়ে পড়ল। টেবিলের ওপর থাকা কাঁচের জগ আর গ্লাসগুলো চুরমার হয়ে ভেঙে গেল। অন্য লোকটা ধারালো রামদা নিয়ে রাফির দিকে কোপ মারতে এলে রাফি এক হাত দিয়ে তার কবজি ধরে ফেলল, তারপর হাঁটু দিয়ে লোকটার পেটে সজোরে এক লাথি মারল।

কটেজের ভেতরে তুমুল হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। নীলা ভয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করছে, "রাফি! সাবধানে!"

রাফি একাই দুজন ডাকাতকে আছড়ে ফেলছিল, কিন্তু পেছনের লোকটা সামলে উঠে মেঝের ভেঙে যাওয়া কাঁচের একটা বড় টুকরো নিয়ে রাফির দিকে তেড়ে এলো। রাফি ডাকাতটাকে সামলাতে গিয়ে পুরোপুরি খেয়াল করেনি। লোকটা রাফির পিঠের দিকে কাঁচের সোজা এক পোচ বসিয়ে দিল!

"রাফিইইই!" নীলা গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল।

রাফি যন্ত্রণায় এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু দমল না। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটার ঘাড়ে এক কঠিন কোপ মেরে তাকে দরজার বাইরে ফেলে দিল। আঘাতের তীব্রতায় দুজন ডাকাতই রক্তের দাগ রেখে রাতের আঁধারে বনের দিকে পালিয়ে গেল।

কটেজের ভেতরে তখন রক্ত আর কাঁচের টুকরো ছড়ানো।

রাফি একহাতে দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল। তার সাদা শার্টের পেছনের অংশ লাল হয়ে উঠেছে। রক্ত চুইয়ে চুইয়ে মেঝের ওপর পড়ছে।

নীলা ছুটে এলো। সে রাফির শরীরের রক্ত দেখে নিজের শরীরের পোশাক বা ভয়ের কথা সব ভুলে গেল। চাদর ফেলে দিয়ে সে শাড়ির অংশ দিয়ে রাফির ক্ষতস্থান চেপে ধরল। নীলার চোখ দিয়ে তখন অঝোর ধারায় পানি পড়ছে।

"রাফি... তোমার রক্ত পড়ছে! ও আল্লাহ, আমি কী করব!" নীলা কাঁদতে কাঁদতে কাঁপতে লাগল।

রাফি দেয়াল ধরে ঘুরল। যন্ত্রণায় তার মুখটা শক্ত হয়ে থাকলেও নীলার চোখের জল দেখে সে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল। নীলার থুতনিটা আলতো করে ধরে রাফি ফিসফিস করে বলল, "তুমি না বলেছিলে আমার জন্য মরে যাবে? আমার একটু রক্ত পড়লেই তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে কীভাবে চলবে, নীলা?"

নীলা রাফির বুকের ওপর নিজের মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও রাফি! আমার এই কটেজে আসার পাগলামির জন্যই তোমার আজ এই অবস্থা! আমি আর কখনো কোনো দুষ্টুমি করব না, সত্যি বলছি!"

রাফি নীলাকে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। পিঠের যন্ত্রণাটা যেন নীলার ভালোবাসার এই ব্যাকুলতার কাছে একদম ফিকে হয়ে গেল।

"পাগলি একটা..." রাফি নীলার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

রাফি তাকে রিসোর্টের সিকিউরিটিকে কল করতে বলল। কিছুক্ষণ পর সিকিউরিটির লোকেরা এলো, ফার্স্ট এইড দিয়ে রাফির ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হলো। ভাগ্যিস ক্ষতটা খুব গভীর ছিল না।

রাত তখন তিনটা।

কটেজের বিছানায় রাফি কাত হয়ে শুয়ে আছে। তার শার্ট খোলা, পিঠে সাদা ব্যান্ডেজ। নীলা পরম মমতায় রাফির পাশে বসে তার কপালে হাত বিকিয়ে দিচ্ছে। নীলার চোখে ঘুম নেই, আছে শুধু ভালোবাসার আর ভয়ের শিউরে ওঠা এক অদ্ভুত অনুভূতি।

রাফি চোখ মেলে নীলার দিকে তাকাল। সে হাত বাড়িয়ে নীলার খালি কোমরটা ধরে তাকে নিজের কাছাকাছি টেনে আনল।

"এখনো কাঁদছ?" রাফির গলাটা কিছুটা দুর্বল হলেও তাতে ভালোবাসার উষ্ণতা কানায় কানায় ভরা।

নীলা নিচু হয়ে রাফির ঠোঁটে এক পরম ভালোবাসার মিষ্টি চুমু দিল। "আজ রাতে আমি তোমাকে একটুও কষ্ট দেব না। আজ আমি শুধু তোমার সেবিকা।"

রাফি এক সুদূর হাসি হেসে নীলাকে নিজের বুকের একপাশে চেপে ধরল, "তাহলে কাল সকালে কিন্তু আমার দ্বিগুণ সেবা লাগবে, নীলা..."

বিপদের এই ঝড় যেন তাদের দুজনকে আরও শক্ত বন্ধনে বেঁধে দিল। কিন্তু এই গজিয়ে ওঠা সম্পর্কের ওপর আবার কী নতুন চক্রান্ত আসতে চলেছে, তা তাদের অজানা ছিল।

গাজীপুরের সেই ভয়াবহ রাতের পর কেটে গেছে দিনতিনেক। রাফির পিঠের ক্ষতটা এখন অনেকটাই শুকিয়ে এসেছে, তবে নীলার পরিচর্যায় কোন কমতি নেই।

রাফি এখন পুরো সুস্থ। আজ রোববার, রাফি আবার অফিসে ফিরেছে। সকালের রোদমাখা ঘরটায় বসে নীলা এক কাপ গরম কফি হাতে ভাবছিল—জীবনের এই দুুলুনিগুলো যেন তাদের ভালোবাসাকে আরও গভীর, আরও গাঢ় করে তুলেছে। এখন আর তাদের মাঝে কোন অভিমানের দেয়াল নেই, আছে শুধু একে অপরকে গভীরভাবে পাওয়ার ব্যাকুলতা।

দুপুরের দিকে নীলার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এলো।

"হ্যালো, নীলা বলছ?" ওপাশ থেকে একটি পরিচিত অথচ বেশ কিছুদিন না শোনা গলার আওয়াজ ভেসে এলো।

নীলা একটু অবাক হয়ে বলল, "হ্যাঁ, বলছি। কিন্তু আপনি কে?"

"আমি ফারিয়া। রাফির অফিসের জুনিয়র সহকর্মী। নীলা, আমি খুব বিপদে পড়ে তোমাকে ফোন করেছি। রাফিস্যার অফিসে হুট করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার প্রচণ্ড জ্বর আর পিঠের ব্যথায় উনি কথা বলতে পারছেন না। উনি বারবার তোমার নাম নিচ্ছেন, কিন্তু হাসপাতালে যেতে রাজি হচ্ছেন না। তুমি কি প্লিজ জলদি অফিসে আসতে পারবে?"

কথাটা শুনেই নীলার হাতের কফির কাপটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। রাফির ক্ষতটা কি তবে ইনফেকশন হয়ে গেল? সে সকালে তো একদম ভালো ছিল! নীলা আর এক মুহূর্ত চিন্তা করার সময় পেল না। তড়িঘড়ি করে একটা সাধারণ সালোয়ার-কামিজ গায়ে চাপিয়ে সোজা রাফির অফিসের উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে ছুটে গেল।

অফিসে পৌঁছে নীলা লিফট ধরে সোজা রাফির কেবিনের তলায় গেল। কিন্তু কেবিনের কাছে আসতেই দেখল চারপাশ অদ্ভুত নীরব। অন্যান্য কর্মচারীরা যার যার টেবিলে কাজ করছে, কিন্তু রাফির প্রাইভেট কেবিনের দরজার কাঁচের পর্দা টানা।

নীলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে আর কোনো প্রোটোকল না মেনে এক ধাক্কায় কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

কিন্তু ভেতরে ঢুকে নীলা যা দেখল, তার জন্য সে একদম প্রস্তুত ছিল না।

কেবিনের ভেতর রাফি সুস্থ-সবল অবস্থায় তার বিশাল এক্সিকিউটিভ চেয়ারে বসে আছে। আর তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফারিয়া নামের সেই সুন্দরী মেয়েটি। মেয়েটি রাফির খুব কাছাকাছি ঝুঁকে পড়ে ল্যাপটপের ফাইল দেখাচ্ছিল, যেন তাদের মধ্যে কোনো দূরত্বই নেই।

নীলাকে এভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাফি আর ফারিয়া দুজনেই অবাক হয়ে তাকাল।

"নীলা? তুমি এখানে? এই সময়ে?" রাফি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল।

নীলার চোখ দুটো তখন ফারিয়ার দিকে আটকে আছে। সে ফারিয়াকে চিনতে পারল—এ তো সেই মেয়ে, যে তাকে ফোনে বলল রাফি অসুস্থ!

ফারিয়া একটু চতুর হাসি হেসে বলল, "আরে নীলা আপু! তুমি চলে এলে? আসলে স্যার আজ সকাল থেকেই প্রজেক্টের কাজে এত ডুবে ছিলেন যে কিছু খাচ্ছিলেন না। তাই আমি একটু ডিস্টার্ব করে তোমাকে কল দিয়েছিলাম, ভাবলাম তুমি এলে স্যার হয়তো একটু ব্রেক নেবেন।"

নীলা এক মুহূর্তে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারল। ফারিয়া তাকে মিথ্যা কথা বলে ডেকে এনেছে, কিন্তু কায়দা করে সেটাকে রাফির সামনে একটা সাধারণ বিষয় বানিয়ে ফেলল। ফারিয়ার চোখে নীলা এক স্পষ্ট নার্সিসিস্টিক ঈর্ষার আলো দেখতে পেল। মেয়েটি ইচ্ছে করেই রাফির কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করছে এবং নীলাকে ছোট করতে চাইছে।

নীলা কিন্তু এবার আর আগের মতো ভয় পেল না বা কান্না করল না। গাজীপুরের রাতের পর নীলা আর সেই চপল, অবুঝ মেয়েটি নেই। সে এখন রাফির বিবাহিত স্ত্রী—যার ওপর অন্য কারো নজর সে সহ্য করবে না।

নীলা ধীর পায়ে হেঁটে রাফির কাছে গেল। ফারিয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে রাফির শার্টের কলারটা নিজের হাতে সোজা করে দিল। তারপর রাফির কপালে নিজের নরম হাত রেখে আলতো করে ছুয়ে বলল, "কই, জ্বর তো নেই! তবে ফারিয়া বলল তুমি নাকি আমার জন্য খুব ছটফট করছ?"

কথাটা শুনে রাফি ফারিয়ার দিকে এক কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল। রাফি বোকা নয়, সে ফারিয়ার এই অতিরিক্ত চালাকি আর চালটা এক নিমেষে ধরে ফেলল।

রাফি গম্ভীর গলায় ফারিয়াকে বলল, "ফারিয়া, আপনাকে আমি কাজের জন্য রেখেছি, আমার পার্সোনাল লাইফ বা আমার স্ত্রীকে মিথ্যা বলে ডাকার জন্য নয়। ইউ মে লিভ নাউ। আর কাল থেকে আপনার ডেস্ক যেন অন্য ফ্লোরে শিফট করা হয়।"

ফারিয়ার মুখটা এক মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তো ভেবেছিল নীলা এসে চিৎকার-চেঁচামেচি করবে আর রাফি নীলার ওপর বিরক্ত হবে। কিন্তু উল্টো রাফি তাকেই অফিস থেকে সরাতে বসেছে! ফারিয়া অপমানে নিচু মুখে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হতেই রাফি নীলার দিকে তাকাল। রাফির চোখে এখন এক অন্যরকম মুগ্ধতা। নীলা যেভাবে শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামলেছে, তা রাফির মন জয় করে নিয়েছে।

রাফি কেবিনের গ্লাস ডোরের লকটা সজোরে আটকে দিল। তারপর নীলার দিকে এক পা এগিয়ে এসে তাকে এক ঝটকায় নিজের কোলের কাছে টেনে নিল।

"তুমি তো দিন দিন বেশ বুদ্ধিমতী হয়ে উঠছ নীলা..." রাফি ফিসফিস করে বলল, তার হাত নীলার কামিজের পেছনের ফিতে আলগা করতে শুরু করল।

নীলা রাফির বুকে নিজের দুটি হাত রেখে মিটিমিটি হেসে বলল, "আমার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে আমি ছেড়ে দেব ভেবেছ? তুমি শুধুই আমার, রাফি।"

রাফির চোখের মনি দুটো আবার সেই গভীর কামনার রঙে বদলে গেল। কেবিনের ওই বন্ধ দরজার আড়ালে, নিজের কাজের টেবিলেই রাফি নীলাকে কোলে বসিয়ে নিল।

"তাহলে আজ অফিসেও তোমার এই অধিকারটা বুঝিয়ে দাও নীলা," রাফি নীলার উন্মুক্ত ঘাড়ে নিজের গরম ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে নিচু গলায় গর্জাল।

অফিসের প্রাইভেট কেবিনের ভেতরে শুরু হলো তাদের আরেক তীব্র, বেপরোয়া ভালোবাসার নতুন অধ্যায়।

অফিসের প্রাইভেট কেবিনের মেহগনি কাঠের টেবিলটার ওপর নীলাকে বসিয়ে রেখে রাফি যেন তার সমস্ত সত্তা দিয়ে নীলাকে গ্রাস করছিল। বাইরের পৃথিবীর সব ব্যস্ততা আর ফারিয়ার সেই চক্রান্তের অপমান তখন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। রাফির উত্তপ্ত ঠোঁট আর সাবলীল স্পর্শে নীলার শরীরের প্রতিটা রন্ধ্র শিউরে উঠছিল।

কেবিনের বন্ধ দরজার ওপাশে অফিসের থমথমে নীরবতা, আর এপাশে দুজন মানুষের এক অনিয়ন্ত্রিত, ব্যাকুল কামনার ঝোর। রাফি নীলার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় ফিসফিসানিতে বলল, "তুমি শুধু আমার নীলা... একমাত্র আমার।"

নীলা রাফির চুলে হাত পেঁচিয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার মুখ থেকে শুধুই বের হয়ে আসছিল গভীর ভালোবাসার এক অবশ করা শীৎকার। অফিসে ধরা পড়ার ভয় আর ভালোবাসার এই বেপরোয়া তীব্রতা—দুটো মিলে যেন এক পরম স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করল।

সেদিনের পর থেকে রাফি আর নীলার সংসারে এক নতুন ভোরের সূচনা হলো।

আজ শুক্রবারের এক শান্ত, রোদঝলমলে সকাল। নীলা রান্নাঘরে ব্যস্ত। বাটিতে করে তৈরি করছে গরম গরম হালুয়া আর লুচি। গত কয়েকদিনের সব অপূর্ণতা আর ভুলের গ্লানি পেরিয়ে তাদের দাম্পত্য জীবন এখন এক গভীর, পরিপক্ব ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। নীলার সেই চপলতা আর দুষ্টুমিগুলো এখনো আছে, কিন্তু এখন তাতে যুক্ত হয়েছে রাফির প্রতি এক গভীর সম্মান আর অগাধ অধিকারবোধ।

হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত হাত এসে নীলার সরু কোমরটা পেঁচিয়ে ধরল। রাফি তার ভেজা চুল আর সতেজ গায়ের সুবাস নিয়ে নীলার পিঠে নিজের চওড়া বুকটা চেপে ধরে দাঁড়াল। নীলার উন্মুক্ত ঘাড়ে আলতো এক উষ্ণ চুমু এঁকে দিল সে।

নীলা হালকা হেসে রাফির হাতের ওপর হাত রেখে পেছনে ঘাড় হেলে বলল, "আজকে কিন্তু অ্যালার্ম বন্ধ করিনি, আর চায়ে লবণও দিইনি! তবুও এত সকালে ঘুম ভাঙল যে?"

রাফি নীলাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। নীলার চোখে কাজল, আর গালে চুল এসে পড়েছে। রাফি নীলার গালটা পরম মায়ায় ছুয়ে দিল। তার চোখে এখন শুধুই এক অগাধ ভালোবাসার মহাসমুদ্র।

"যে ঘুম ভাঙালে তোমাকে এত কাছে পাওয়া যায়, সেই ঘুমে আর মন ভরে না নীলা," রাফি নিচু, ভারিক্কি গলায় বলল।

নীলা একটু দুষ্টুমি করে রাফির শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে এক টান দিল। চোখ ছোট ছোট করে বলল, "আচ্ছা? গম্ভীর সাহেব তা এতদিনে বুঝি তার দুষ্টু বউটার প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খেলেন?"

রাফি এক সুদূর মিষ্টি হাসি হাসল। তারপর নীলাকে এক ঝটকায় কোলের ওপর তুলে নিল। নীলা হালকা হেসে রাফির গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকাল।

রাফি নীলাকে নিয়ে সোজা বেডরুমের দিকে পা বাড়াল। জানালার হালকা খোলা পর্দা দিয়ে সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে তাদের বিছানায়। রাফি নীলাকে চাদরের ওপর আলতো করে নামিয়ে দিল, তারপর নিজেও নীলার পাশে শুয়ে তাকে নিজের বুকের একদম ভেতরে টেনে নিল।

"তোমার ওই দুষ্টুমিগুলো যদি না থাকত নীলা, তবে আমি হয়তো সারাজীবন এক গম্ভীর আর পাথর মানুষই থেকে যেতাম," রাফি নীলার কপালে এক দীর্ঘ, পরম স্বস্তির চুমু একে বলল। "তুমি এসে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছ, আমার এই একঘেয়ে জীবনে আলো এনেছ।"

নীলা রাফির শক্ত বুকের পশমে নিজের মুখটা আরও একটু গুঁজে দিল। রাফির হৃৎস্পন্দনের সেই ধুকপুক শব্দটা নীলার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সুর বলে মনে হলো।

নীলা নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, "আর তুমি এসে আমাকে আমার সম্পূর্ণ আশ্রয় দিয়েছ, রাফি। আমি সারা জীবন তোমার এই রাগী, কিন্তু গভীর ভালোবাসায় মোড়া মানুষটার বুকেই আটকে থাকতে চাই।"

বাহিরে তখন বসন্তের হালকা মিষ্টি বাতাস বয়ে যাচ্ছে। জানালার বাইরে পাখির কলকাকলি আর ঘরের ভেতরে দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের ওম। জীবনের সব ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব আর অভিমানের মেঘ কেটে গিয়ে রাফি আর নীলার ভালোবাসার আকাশ এখন একদম নীল, স্নিগ্ধ আর চিরন্তন।

তারা একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে আবার ডুবে গেল এক নতুন ভোরের পরম ভালোবাসার আশ্রয়ে—যেখানে আর কোনো অভিমান নেই, আছে শুধু আজীবন একসাথে বেঁধে থাকার এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার।

....
👁 48