ভোরের আলো ফোটার আগেই রূপসীপুর গ্রামের বাতাসে ভেসে আসে শিউলি ফুলের ভেজা সুবাস আর বাঁশঝাড়ের মড়মড় শব্দ। কিন্তু এই শান্ত সকালের আবহকে তোয়াক্কা না করে মজিদ মাস্টারের দোতলা ভিটেবাড়িতে তখন অন্যরকম যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। যুদ্ধটা কোনো জমিজমা নিয়ে নয়, যুদ্ধটা সায়েম আর মায়াকে কেন্দ্র করে।
একই গ্রামে জন্ম, একই সাথে বড় হওয়া, অথচ ছোটবেলা থেকেই সায়েম আর মায়ার সম্পর্ক যেন দা-কুমড়ো। প্রাইমারি স্কুলের বার্ষিক দৌড় প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে এসএসসির রেজাল্ট—সবখানেই একে অপরকে টপকে যাওয়ার এক অদৃশ্য আর আদিম প্রতিযোগিতা। মায়ার মেধা ছিল ধারালো, আর সায়েমের জেদ ছিল পাহাড়সম। সায়েম যদি টেস্ট পরীক্ষায় ৯২ পেয়ে প্রথম হতো, মায়া পরেরবার রাত জেগে পড়াশোনা করে ৯৩ পেয়ে সায়েমের মুখের সামনে রেজাল্ট শিট দোলাত। এই ছিল তাদের জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম।
কিন্তু নিয়তির খেলা বড় অদ্ভুত। মায়ার বাবা আর সায়েমের বাবার এককালের গভীর বন্ধুত্বের খাতিরে, আর দুই পরিবারের সায় থাকায় শেষ পর্যন্ত এই দুজনকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হলো। বিয়ের খবর শুনে গ্রামের মানুষ ভেবেছিল এবার হয়তো দুজন শান্ত হবে। কিন্তু আসল খেলা তো কেবল শুরু হতে যাচ্ছিল।
বিয়ের রাতে বাসরঘরে ঢুকে সায়েম যখন খাটের একপাশে একটু আধশোয়া হয়ে বসার চেষ্টা করল, মায়া তার লাল বেনারসির আঁচলটা ঝেড়ে একেবারে হুঙ্কার দিয়ে উঠল।
"একদম ওই সীমানা পার হবি না, সায়েম! তোর বাপের ভিটে হতে পারে, কিন্তু এই ঘর আর এই খাটের একচ্ছত্র মালিকানা আমার। বাঁ পাশের পুরো অর্ধেকটা আমার, ডান দিক তোর। একটু এদিক-ওদিক হলে একদম কাঁথা কেড়ে নিয়ে মেঝেতে শুইয়ে দেব।"
সায়েম তার ট্রেডমার্ক বাঁকা হাসিটা হেসে হাতদুটো মাথার নিচে রাখল। উজ্জ্বল বাতিটার আলোয় মায়ার রাগে লাল হয়ে ওঠা মুখটা দেখতে তার মন্দ লাগছিল না। তবে মুখ ফুটে সেটা স্বীকার করা মানেই আত্মসমর্পণ।
"ওরে আমার রানীরে! ঘরের মালিকানা আবার কবে থেকে পেলি? আর কাঁথা কাড়বি তুই? ভোর চারটায় যখন শীত করবে, তখন তুই নিজেই আমার কাঁথার নিচে ঢুকতে আসবি, দেখে নিস।"
"স্বপ্নেও না!" মায়া চোখ কপালে তুলে বালিশটা টেনে নিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল।
প্রথম রাতটা এভাবেই যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে কাটলেও পরদিন সকাল থেকেই শুরু হলো আসল খেলা। মায়া স্থির করেছিল, সায়েমকে এমন শিক্ষা দেবে যাতে জীবনে কখনো তার সাথে লাগতে না আসে। শৈশবের সব হার-জিতের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করবে সে।
সকালবেলা সায়েম ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় চুল আঁচড়াচ্ছিল। অফিসের একটা জরুরি কাজে তাকে পাশের শহরে যেতে হবে। মায়া আড়চোখে সায়েমকে দেখল। সায়েমের চওড়া কাঁধ, সাদা ফতুয়ায় তাকে বেশ সুপুরুষ দেখাচ্ছে সত্যি, কিন্তু মায়ার মাথাতে তখন অন্য ভুত চাপানো।
সায়েমের অভ্যাস খুব ভোরে ওঠার, আর তার জন্য সে মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে। মায়া আগের রাতেই সুযোগ বুঝে সায়েমের ফোনের অ্যালার্ম দুই ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়েছিল, সাথে সাথে অ্যালার্মের সুর বদলে অত্যন্ত কর্কশ এক ক্যাসেটের আওয়াজ সেট করে রেখেছিল। কিন্তু সায়েমের ভাগ্য ভালো, আজকে তার নিজ থেকেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তবে মায়ায় তৈরি ফন্দি অন্য রূপ নিল।
সায়েম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুগন্ধি মাখতে যাবে, ঠিক তখনই মায়া খুব ভালো মেয়ের মতো ট্রিক করে একটা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল।
"এই নাও, তোমার চা। মা বানিয়ে পাঠালেন," মায়া মিষ্টি হেসে বলল। সেই হাসিতে এত বিষাক্ত সৌন্দর্য ছিল যে সায়েমের মনে তখনই খটকা লাগা উচিত ছিল।
সায়েম চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করে নিয়ে চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিল। আর সাথে সাথেই তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। নোনতা আর চরম ঝাল এক অদ্ভুত স্বাদ মুখে ছড়িয়ে পড়ল। চায়ের চটজলদি প্রতিক্রিয়ায় সায়েম খাসতে শুরু করল। মায়া চায়ের মধ্যে চিনির বদলে তিন চামচ লবণ আর খানিকটা গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে রেখেছিল।
"কী রে, সায়েম সাহেব? মজিদ মাস্টারের ছেলে হয়ে চায়ের স্বাদ সহ্য হচ্ছে না?" মায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে সারা ঘর যেন একঝলক তাজা বাতাসে ভরে গেল।
সায়েম টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা খেয়ে নিজেকে সামলে নিল। তার গলার রগ দুটো ফুলে উঠেছিল রাগে। কিন্তু সে মায়াকে হাসতে দেখে মুখে আর কিছু বলল না। ধীর পায়ে মায়ার একদম কাছে এসে দাঁড়াল।
হঠাৎ সায়েমের এই কাছাকাছি চলে আসায় মায়ার হাসিটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। সায়েমের গায়ের একটা মিষ্টি মেহগনি আর চন্দনের সুবাস মায়ার নাকে ধাক্কা দিল। সায়েম মায়ার দিকে এক ধাপ এগিয়ে আসতেই মায়া পিছু হটে দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল।
সায়েম তার লম্বা হাত দুটো মায়ার দুই পাশে দেয়ালের ওপর রাখল। তাদের মধ্যকার দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। মায়ার বুকটা ঢিপঢিপ করতে শুরু করল।
"চা-টা বেশ ছিল, মায়াবতী," সায়েম গলার স্বর খাঁটি সিসার মতো ভারী করে বলল। তার চোখ দুটো মায়ার ঠোঁটের দিকে নেমে এলো, তারপর আবার চোখে চোখ মেলাল। "তবে প্রতিশোধের স্বাদ কিন্তু এর চেয়েও বেশি মিষ্টি হয়। মনে রাখিস।"
সায়েমের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস মায়ার কপালে আর গালে এসে লাগছিল। মায়ার মনে হলো তার হাঁটু দুটো কেমন যেন দুর্বল হয়ে আসছে। ছোটবেলা থেকে কত ঝগড়া করেছে, কিন্তু সায়েমের এই রূপ তো সে কখনো দেখেনি! সায়েমের চোখের এই অদ্ভুত গভীরতা মায়াকে কাঁপিয়ে দিল।
"স-সায়েম, সর এখান থেকে..." মায়া আমতা আমতা করে বলল, তার চিরাচরিত তেজ যেন এক মুহূর্তে কোথায় উধাও হয়ে গেছে।
সায়েম একটা বাঁকা হাসি দিল। মায়ার কানের কাছে মুখ এনে মৃদু স্বরে বলল, "আজকে তো শুরু মাত্র। হিসাব নিকাশ অনেক বাকি, বউ।"
এই বলে সায়েম এক ঝটকায় সরে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে নিজের ঘড়ি আর মানিব্যাগ তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মায়া সেখানেই পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তার হাতদুটো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, অথচ গাল দুটো আগুনে পুড়ছিল। নিজের বুকের অস্বাভাবিক স্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল সে।
'না, এভাবে হেরে গেলে চলবে না,' মায়া মনে মনে নিজেকে শক্ত করল। 'সায়েমকে নতি স্বীকার করাতেই হবে।'
বিকেলবেলায় সায়েম যখন অফিস থেকে ফিরল, তখন সে বেশ ক্লান্ত। সারা শরীর ঘামে ভেজা। ঘরে ঢুকেই সে সোজা বাথরুমে গেল হাত-মুখ ধুতে। কিন্তু সায়েম জানত না, মায়া দুপুরে বাথরুমের মেঝের এক কোণায় সাবানের ফেনা এমনভাবে জমিয়ে রেখে এসেছে যে একটু অসাবধান হলেই আছাড় নিশ্চিত।
সায়েম বাথরুমে ঢোকার পর মায়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মনে মনে গোনার চেষ্টা করছিল—এক, দুই, তিন... এবার নিশ্চয়ই ধপাস করে শব্দ হবে!
কিন্তু কোনো আছাড়ের শব্দ হলো না। উল্টো বাথরুমের দরজা খুলে গেল এবং সায়েম মায়ার হাত ধরে এক টান মারল।
মায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই সোজা বাথরুমের ভেতরে সায়েমের শক্ত বুকের ওপর গিয়ে পড়ল। সায়েম চট করে শাওয়ারের নলটা অন করে দিল।
ঠান্ডা জলের তীব্র ধারা দুজনের ওপর পড়তে শুরু করল। মায়া চমকে উঠে সায়েমের জামা শক্ত করে চেপে ধরল।
"সায়েম! কী করছিস এসব? ছাড় আমায়!" মায়া শ্যাওলা রঙের শাড়ি আর ভেজা চুলে জলের ফোঁটা মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছিল।
সায়েম মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরো কাছে টেনে নিল। জলের ধারায় দুজনের পোশাক পুরোপুরি ভিজে শরীরের সাথে সেঁটে গেছে। সায়েমের এক হাত মায়ার ভেজা পিঠের ওপর ভিজে যাওয়া শাড়ির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এলো। তার আঙুলের ছোঁয়া মায়ার শিরদাঁড়ায় একটা অচেনা বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল।
"তুই ভেবেছিলি আমি তোর এই ছোটখাটো ট্র্যাপে পা দেব?" সায়েম মায়ার চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠস্বর এখন অনেকটাই গম্ভীর এবং গভীর রোমান্সে ভরা।
মায়া সায়েমের চোখের দিকে তাকাল। সায়েমের চোখে কোনো রাগ ছিল না, সেখানে ছিল এক অধরা অধিকারবোধের আগুন। মায়ার ঠোঁট দুটো ভয়ে আর আবেগে কাঁপছিল।
"তুই বড্ড দুষ্টু হয়েছিস, মায়া," সায়েম মায়ার ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। এক দীর্ঘ, উষ্ণ পরশ।
মায়ার চোখ দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে এলো। যে সায়েমের সাথে সে সারাজীবন মারামারি করেছে, সেই সায়েমের এই স্পর্শে এত জাদু লুকিয়ে ছিল? মায়ার ভেজা হাত দুটো সায়েমের কাঁধে জমে রইল, সে আর সায়েমকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিতে পারল না।
জলের ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে দুইজন শত্রু যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গেল, যেখানে ঝগড়ার চেয়েও বেশি শক্তিশালী এক অনুভূতির বীজ রোপিত হতে শুরু করেছে।
শাওয়ারের নিচে সেই ভেজা মুহূর্তটার পর থেকে ঘরের বাতাস যেন এক অদ্ভুত ভারাক্রান্ত নীরবতায় থমকে গেছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে মায়া যখন তোয়ালে দিয়ে মাথার ভিজে চুল মুছছিল, তখন আয়নায় চোখ পড়তেই সে নিজেকে চিনতে পারছিল না। গাল দুটো এখনো লাল হয়ে আছে, আর চোখের কোণে জমে আছে এক অচেনা আবেশ।
সায়েম ততক্ষণে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে শুকনো একটা সুতির ফতুয়া আর লুঙ্গি পরে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে রূপসীপুরে। বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে শেষ বিকালের লালচে আলো এসে পড়েছে সায়েমের চওড়া পিঠে।
মায়া ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে আয়নার কাঁচ দিয়ে সায়েমকে দেখল। লোকটা এত শান্ত কীভাবে থাকে? একটু আগেই তো বাথরুমে অতটা কাছাকাছি এলো, মায়ার ভেতরে সব উলটপালট করে দিল, অথচ এখন যেন কিছুই হয়নি! এই ভেবে মায়ার মনে আবার জিদ চেপে বসল। হার মেনে নেওয়া তো মায়ার অভিধানে নেই।
রাতের খাবারের টেবিলে দুই পরিবারের সবাই একসাথে বসেছিল। সায়েমের বাবা আর মায়ার বাবা পুরোনো দিনের গল্প নিয়ে ব্যস্ত। মায়া আর সায়েম পাশাপাশি বসে থাকলেও কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছিল না। তবে টেবিলের নিচে সায়েম হঠাৎ করে মায়ার পায়ে নিজের পা দিয়ে হালকা একটা স্পর্শ করল।
মায়া চমকে উঠে সায়েমের দিকে তাকাল। সায়েম তখন খুব শান্ত মুখে মজিদ মাস্টারের সাথে কথা বলছে, যেন তার পা দুর্ঘটনাবশত মায়ার পায়ে লেগেছে। কিন্তু মায়া ভালো করেই জানত, এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা সায়েমের নতুন চাল। মায়া টেবিলের নিচে সায়েমের পায়ে নিজের শক্ত জুতো দিয়ে হালকা চাপ দিতেই সায়েমের মুখের হাসির রেখা একটু শক্ত হলো, তবে সে প্রকাশ করল না।
খেয়েদেয়ে ঘরে ফেরার পর শুরু হলো দ্বিতীয় দফার পরিকল্পনা। মায়া দেখল, সায়েম বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছে।
ঘরের ফ্যানটা মৃদু শব্দে ঘুরছে। মায়া আলমারি থেকে নিজের একটা পাতলা সুতির চাদর বের করে সোজা মশারির রিংয়ের ওপর রেখে দিল, যাতে বাতাস সায়েমের গায়ে ঠিকমতো না লাগে। তারপর সে এসে খাটের নিজের অংশে শুয়ে পড়ল।
"ফ্যানের বাতাস পাচ্ছিস তো, সায়েম সাহেব?" মায়া বেশ খোঁচা মেরে বলল।
সায়েম ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, "তোর কি মনে হয় এই ছোটখাটো কৌশলে আমার ঘুম নষ্ট হবে? আমি গ্রামের ছেলে, গাছের ছায়াতেও ঘুমাতে পারি।"
"দেখা যাবে রাত বারোটার পর কে কার ঘুম নষ্ট করে," মায়া মুখ বাঁকিয়ে দেয়ালের দিকে ফিরে শুলো।
ঘড়ির কাঁটা রাত একটার ঘর পার হলো। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে আসা শিয়ালের হাঁক ছাড়া পুরো বাড়ি নিঝুম। মায়া মশারির ভেতর এপাশ-ওপাশ করছে। চাদর টাঙিয়ে দেওয়ার কারণে ঘরের গরমটা যেন আরো বেড়ে গেছে। সায়েম ল্যাপটপ বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই।
মায়ার খুব গরম লাগছিল। তার ওপর গায়ের ওপর পাতলা কাঁথাটাও ভার মনে হচ্ছে। সে চুপিচুপি সায়েমের দিকে ফিরল।
আকাশের আবছা চাঁদের আলো জানালার ফাঁক গলে এসে পড়েছে সায়েমের মুখে। সায়েম চিত হয়ে ঘুমাচ্ছে। তার বুকের সুতির ফতুয়ার দুটো বোতাম খোলা, ছাতিটা নিয়মিত তালে ওঠানামা করছে। ঘুমানোর সময় সায়েমের মুখের সেই জেদি ভাবটা একদম নেই। তাকে বড্ড নিষ্পাপ আর মায়াবী লাগছে।
মায়া নিজের অজান্তেই খানিকটা এগিয়ে গেল সায়েমের দিকে। সায়েমের মুখের এত কাছাকাছি সে কখনো আসেনি। সায়েমের নাকের ডানপাশে ছোট একটা তিল আছে, যা দিনে খেয়াল করা যায় না। মায়ার হাতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে এলো সায়েমের গালের কাছে। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে সায়েমের চিবুকটা ছুঁতে চাইল সে।
ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত মায়ার কবজি ধরে ফেলল।
মায়া ভীতি আর লজ্জায় শিউরে উঠল। সায়েমের চোখ দুটো খোলা! চাঁদের আলোয় সেই চোখ দুটো যেন গভীর এক জলাশয়ের মতো জ্বলজ্বল করছে। সায়েম তো ঘুমায়নি!
"অন্যের ওপর নজরদারি চালানো কি ভালো, মায়াবতী?" সায়েমের গলার স্বর রাতে গভীর ঘুম ভাঙা মানুষের মতো ভাঙা আর মারাত্মক কামনাময়।
"ছ-ছাড় সায়েম! আমি এমনি দেখছিলাম তোর মশা কামড়াচ্ছে কি না," মায়া বানিয়ে একটা মিথ্যা ছক কষার চেষ্টা করল, কিন্তু হাত ছাড়ানোর তীব্র চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।
সায়েম এক টানে মায়াকে নিজের বুকের ওপর নিয়ে এলো। মায়ার দুটো হাত আটকে গেল সায়েমের শক্ত ছাতির সাথে। মায়ার বুকটা সায়েমের বুকের সাথে পিষে গেল, আর তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়তে লাগল।
"মশা তাড়ানোর অজুহাতটা বড্ড পুরনো হয়ে গেছে, মায়া," সায়েম মায়ার কাঁধের শাড়ির আঁচলটা একটু সরিয়ে দিল। তার ঠান্ডা আঙুল মায়ার খোলা ঘাড়ে স্পর্শ করতেই মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সায়েমের ঠোঁট এবার মায়ার কানের লতিতে এসে ঠেকলো। আলতো কামড় বসিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "তুই ছোটবেলা থেকে আমার সাথে জিততে চেয়েছিস, তাই না? কিন্তু এই খেলায় তুই কোনোদিন জিততে পারবি না।"
"কেন পারবো না?" মায়া সায়েমের চোখের দিকে তাকিয়ে বুক ফুলিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল, যদিও তার গলার আওয়াজ কাঁপছিল।
"কারণ এই খেলায় হারলেই আসল জয়," সায়েম মায়ার ভেজা ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল বুলিয়ে দিল।
সায়েমের সেই আঙুলের স্পর্শে মায়ার শরীর জুড়ে এক অপূর্ব শিহরণ খেলে গেল। সায়েম ধীরে ধীরে তার মুখটা মায়ার দিকে নামিয়ে আনল। মায়া বুঝতে পারছিল কী হতে চলেছে। তার হৃদয় এত জোরে লাফাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল বুক ভেঙে বেরিয়ে যাবে।
সায়েমের উষ্ণ ঠোঁট যখন মায়ার ঠোঁট স্পর্শ করল, মায়া আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। যে সায়েমকে সে এতদিন প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে এসেছে, সেই সায়েমের আলিঙ্গনে সে নিজেকে সঁপে দিল। মায়ার হাত দুটো জড়িয়ে ধরল সায়েমের গলা। সায়েম মায়াকে আরো গভীরে টেনে নিল নিজের মধ্যে, এক অপার ভালোবাসার আবেশে।
সেই গভীর রাতে, প্রতিশোধ আর রাগের সব দেওয়াল চুরমার হয়ে ভেসে গেল এক অনাবিল কামনার সাগরে।
সকালে যখন ঘরের মধ্যে ভোরের নরম আলো এসে পড়ল, মায়ার ঘুম ভাঙল এক অদ্ভুত উষ্ণতায়। সে দেখল, সায়েমের এক হাত তার কোমরে শক্ত করে জড়ানো, আর মায়ার মাথা সায়েমের বুকের ওপর রাখা। সায়েম এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মায়া সায়েমের বুকের লোমে আঙুল দিয়ে বোলাতে বোলাতে একটা মিষ্টি হাসি দিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল কালকের রাতের অ্যালার্মের কথা!
মায়া চট করে বালিশের তলা থেকে সায়েমের ফোনটা বের করল। গতরাতে সে অ্যালার্ম বদলে রেখেছিল। মায়া অ্যালার্মটা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই সায়েমের ফোন একটা নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। সায়েমের অফিসের এক নারী সহকর্মী রিটা একটা মেসেজ পাঠিয়েছে—
"কাল রাতের প্ল্যানটা কিন্তু ফাইনাল, সায়েম। তোমার জন্য অপেক্ষা করব।"
মেসেজটা দেখেই মায়ার বুকের ভেতরটা এক ঝটকায় মুচড়ে উঠল। তার মিষ্টি হাসির জায়গা নিল এক ভীষণ হিংসা আর সন্দেহ।
রিটার মেসেজটা ফোনের পর্দায় জ্বলজ্বল করতেই মায়ার ভেতরের ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিটা যেন একসাথে জেগে উঠল। একটু আগের সেই মিষ্টি অনুভূতি, সায়েমের বুকের ওম—সবকিছু এক মুহূর্তে বিষের মতো তিতা হয়ে গেল। মায়াই তো মায়া, সে কাঁদবার পাত্রী নয়, সে আঁচড় কাটতে জানে।
সায়েমের হাতটা নিজের কোমর থেকে ঝটক মেরে সরিয়ে দিয়ে মায়া বিছানায় উঠে বসল। সায়েমের ঘুম ভেঙে গেল মায়ার এই আচমকা নড়াচড়ায়। সে চোখ কচলিয়ে ধীরেসুস্থে মায়ার দিকে তাকাল।
"কী হলো মায়াবতী? সকালে উঠেই আবার তেজ দেখাচ্ছ যে?" সায়েম একটু হেসে হাত বাড়িয়ে মায়াকে আবার নিজের কাছে টানতে চাইল।
কিন্তু মায়া এক ঝটকায় সায়েমের হাত সরিয়ে দিল। তার চোখ দুটো রাগে লাল। "আমাকে ছুঁবি না, সায়েম! তোর এই ভণ্ডামি অন্য কারো কাছে গিয়ে দেখা। রিটার কাছে যা!"
'রিটা' নামটা শুনেই সায়েমের ভ্রু খানিকটা কুঁচকে গেল, তবে তার মুখে ফুটে উঠল এক রহস্যময় বাঁকা হাসি। সায়েম বালিশে হেলান দিয়ে বসে হাত দুটো বুকের ওপর বাঁধল।
"ওহ, তো আমার ফোন চেক করা হচ্ছিল? তা রিটা কী লিখল যে এত রাগ?"
"তুই খুব ভালো করেই জানিস সে কী লিখেছে!" মায়া বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে পেঁচাল। "কাল রাতের প্ল্যান ফাইনাল? তোকে নিয়ে অপেক্ষা করবে? এসব কী সায়েম? বিয়ের পরদিন থেকেই তুই অন্য মেয়ের সাথে এসব শুরু করলি?"
সায়েম সোজা হয়ে দাঁড়াল। মায়ার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই মায়া এক পা পিছিয়ে গেল। কিন্তু সায়েম চট করে মায়ার দুই কোনাই ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল।
"মায়া, তুই কি হিংসা করছিস?" সায়েমের গলার আওয়াজ নিচু, কিন্তু তার মধ্যে এক প্রবল প্ররোচনা।
"হিংসা? তোর মতো একটা চালবাজকে আমি হিংসা করতে যাব? স্বপ্নেও না!" মায়া সায়েমের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সায়েমের বাঁধন ছিল লোহার মতো শক্ত।
"তাহলে এত চিৎকার কেন?" সায়েম মায়ার গালের একপাশে নেমে আসা একগোছা চুল আঙুল দিয়ে কানের পেছনে সরিয়ে দিল। তার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে মায়ার রাগ আর গায়ের জ্বালা যেন অদ্ভুতভাবে মিশে যেতে লাগল। "আমি যদি রিটার সাথে মিট করি, তোর কী?"
মায়ার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল। সায়েমের এই বেপরোয়া উত্তর সে সহ্য করতে পারছিল না। রাগের মাথায় সে কিছু না ভেবেই সায়েমের ছাতিতে ধাক্কা দিল, কিন্তু সায়েম সরলো না। উল্টে সায়েম মায়াকে এক ঝটকায় দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
"ছাড় আমায় সায়েম..." মায়ার গলা জড়িয়ে এলো।
"ছাড়ব না," সায়েমের চোখ মায়ার চোখে আটকে রইল। "তুই যদি স্বীকার করিস যে তোর কষ্ট হচ্ছে, যে তুই আমাকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারছিস না, তবেই ছাড়ব।"
"তুই একটা..."
মায়াকে কথা শেষ করতে দিল না সায়েম। সায়েমের ঠোঁট সজোরে নেমে এলো মায়ার ওপর। এটা রাতের মিষ্টি স্পর্শ ছিল না; এই চুমুতে ছিল অধিকারবোধ, কিছুটা রাগ, আর এক অধরা তীব্র আকর্ষণ। মায়া প্রথমে হাত দিয়ে সায়েমের পিঠে আঘাত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সায়েমের ভেজা, উষ্ণ আর উদগ্র গ্রাস মায়ার সব প্রতিরোধ এক মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল।
মায়ার হাত দুটো সায়েমের পিঠ চেপে ধরে তার শার্টটা মুচড়ে ধরল। মায়াও সায়েমের এই বাঁধনে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সায়েম যখন মায়ার ঠোঁট ছেড়ে দিল, দুজনেরই নিঃশ্বাস তখন দ্রুত চলছিল।
সায়েম মায়ার কপালে কপাল ঠেকাল। "রিটা আমার অফিসের ক্লায়েন্ট, মায়া। কাল আমাদের একটা প্রজেক্টের চুক্তি স্বাক্ষর আছে। সেই প্ল্যানের কথাই বলছিল সে।"
কথাটা শুনে মায়া চমকে উঠল। সে সায়েমের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো মিথ্যা ছিল না, কেবল মায়াকে জ্বালানোর এক চতুর আনন্দ ছিল।
"তুই... তুই জেনেবুঝে আমাকে কষ্ট দিলি?" মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
"কষ্ট নয় মায়াবতী, তোকে পরীক্ষা করছিলাম। দেখতে চাইছিলাম এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পেছনে তোর বুকেও আমার জন্য একই আগুন জ্বলছে কি না," সায়েম মায়ার গালে ঠোঁট ছোঁয়াাল, তারপর নিচে নেমে তার উন্মুক্ত ঘাড়ে এক গভীর চুম্বন বসাল।
মায়ার শরীর আবার কেঁপে উঠল। সায়েমের দাঁতের সামান্য কামড় ঘাড়ে লাগতেই মায়া সায়েমের চুল আঁকড়ে ধরে একটা অস্ফুট শব্দ করল। সায়েম মায়ার হাত ধরে তার বুকে রাখল, যেখানে হৃদস্পন্দন রীতিমতো দৌড়াচ্ছিল।
"শুনতে পাচ্ছিস?" সায়েম ফিসফিস করে বলল। "এই শব্দটা কেবল তোর জন্য।"
মায়ার রাগ যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার ভেতরের অভিমানটুকু রয়ে গেল। সে সায়েমের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ছোটবেলা থেকে তারা লড়ে এসেছে, কিন্তু আজ সায়েম তাকে এমন এক খেলায় নামিয়ে দিয়েছে, যেখানে হারলেই কেবল পরম শান্তি।
"তবুও..." মায়া সায়েমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোর সাথে আমার হিসাব কিন্তু এখনো চুকেনি, সায়েম। চায়ের লবণের শোধ তুই নিছিস, বাথরুমের শোধ নিছিস... কিন্তু এই সন্দেহ দেওয়ার শোধ আমি নেব।"
সায়েম হো হো করে হেসে উঠল। তার সেই প্রাণখোলা হাসি মায়ার বুকের ভেতর আবার আলোড়ন সৃষ্টি করল। সায়েম মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরো কাছে টেনে বলল, "আমি তো তোর খাঁচায় ধরা দিতে প্রস্তুত, মায়াবতী। তুই কীভাবে শোধ নিবি, নে।"
মায়া সায়েমের ঠোঁটে এক পলকের জন্য নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। "আজ রাতে তৈরি থাকিস সায়েম সাহেব। আজকের খেলাটা আমি খেলব।"
সায়েম মায়ার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে ভাবল, লড়াইটা কিন্তু এখন আর শত্রুতায় নেই, লড়াইটা এখন রূপ নিয়েছে এক তীব্র, নেশাক্ত ভালোবাসায়।
সারাদিন ধরে রূপসীপুর গ্রামের আকাশটা মেঘলা হয়ে ছিল। বিকেলের দিকে মুষলধারে বৃষ্টি নামল, যেন মেঘের সব জমিয়ে রাখা কষ্ট একসাথে ধুয়েমুছে দিতে চায়।
মায়াকে সারাদিন খুব একটা দেখা যায়নি। সায়েম যখন শহর থেকে কাজ সেরে ফিরল, ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাইরের বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাস জানালার পর্দা পেরিয়ে ঘরে এসে ঢোকল। সায়েম ভিজে যাওয়া শার্টটা বদলে ঘরে এসে দেখল, মায়া সেখানে নেই।
তবে ঘরটা অন্যরকম লাগছে। মায়া ঘরে কয়েকটা মাটির প্রদীপ জ্বেলে রেখেছে। সেই হালকা হলুদ আলো-ছাঁয়ায় পুরো ঘরটায় এক অদ্ভুত রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়েছে। সায়েম বিছানার ওপর বসতেই দেখল, তার বালিশের নিচে একটা ছোট খাম রাখা।
খামটা খুলতেই তাতে মায়ার হাতের সুবিন্যস্ত লেখায় লেখা—
"হিসাব মেটানোর সময় এসেছে, সায়েম সাহেব। পেছনের বারান্দায় এসো, তবে খালি হাতে নয়, তোমার অহংকারটা ঘরে রেখে এসো।"
সায়েমের মুখে আবার সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে ধীরপায়ে পেছনের বারান্দার দিকে হেঁটে গেল।
পেছনের বারান্দাটা রূপসীপুরের সবুজ বাগান আর বাঁশঝাড়ের দিকে মুখ করা। বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর অন্ধকারের মাঝে বারান্দায় রাখা হ্যারিকেনের হালকা আলো। সেখানে একটা বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল মায়া। তার পরনে একটা গাঢ় লাল রঙের শাড়ি, চুলে সুবাসিত বকুল ফুলের গাজরা। বৃষ্টিতে তার শাড়ির আঁচল কিছুটা ভিজেছে, আর প্রদীপের আলোয় মায়ার চোখ দুটো কোনো মায়াবী হরিণীর মতো জ্বলজ্বল করছে।
সায়েম গিয়ে মায়ার একদম সামনে দাঁড়াল। "আমাকে ডেকে পাঠালে, মায়াবতী? কী শোধ নিতে চাও?"
মায়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে আজ কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক অগাধ অনুরাগের খেলা। মায়া সায়েমের খুব কাছাকাছি এলো, এত কাছে যে সায়েম মায়ার সুবাসিত চুলের ঘ্রাণ পাচ্ছিল।
"ছোটবেলা থেকে তুই আমাকে প্রতিবার হারিয়েছিস, সায়েম। স্কুলে প্রথম হওয়া, খেলায় জেতা... কিন্তু আজ আমি তোকে এমন এক জায়গায় হারাব, যেখান থেকে তুই কোনোদিন বের হতে পারবি না," মায়াবতী গলায় বলল মায়া।
সে সায়েমের কলারটা ধরে তাকে টান মেরে নিজের দিকে নামিয়ে আনল। সায়েম বাধা দিল না। মায়া এবার সায়েমের ঠোঁটে আলতো করে একটা কামড় বসাল।
সায়েম চমকে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তার দুই হাত মায়ার কোমরে চেপে বসল। "এই বুঝি তোর প্রতিশোধ?" সায়েমের গলার আওয়াজ নিচু আর কামনাময়।
"না, প্রতিশোধ তো এখনো শুরুই হয়নি," মায়া সায়েমের কান থেকে কলারবোন পর্যন্ত নিজের ঠোঁটের ছোঁয়া এঁকে দিতে দিতে বলল। "আজ রাতে আমি তোকে বন্দি করব, সায়েম। এই ভালোবাসার বন্দিশালায়।"
সায়েম আর সহ্য করতে পারল না। সে মায়াকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। মায়া একটা ছোট চিৎকার দিয়ে সায়েমের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সায়েম তাকে ঘরে নিয়ে এসে সজোরে বিছানায় নামিয়ে দিল।
ঘরের প্রদীপের হালকা আলোয় দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর ভেতরের তীব্র অনুভূতির উত্তাপ যেন এক হয়ে গেল। সায়েম মায়ার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার ভেজা ঠোঁটে গভীর আর উদগ্র এক চুম্বন বসাল। মায়াও তার সবটুকু তীব্রতা দিয়ে সায়েমকে আঁকড়ে ধরল।
সায়েমের হাত ধীরে ধীরে মায়ার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত পেটে নামল। মায়া শিউরে উঠে সায়েমের চুলে হাত জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
"তুই বড্ড ভয়ানক শোধ নিচ্ছিস, মায়া," সায়েম মায়ার গাল বেয়ে কানের নিচে নরম ত্বকে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল।
"তোর এই বন্দিদশা যেন সারাজীবন থাকে, সায়েম," মায়া সায়েমের কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে বলল।
যে লড়াই শত্রুতা দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা আজ রূপসীপুরের এই বৃষ্টিভেজা রাতে এক পরিপূর্ণ, আত্মহারা প্রেমে পরিণত হলো। দুজন দুজনের অস্তিত্বে বিলীন হয়ে গেল, কোনো হার-জিত ছাড়াই।
সকালে যখন বৃষ্টি থেমে রোদ উঠল, সায়েম চোখ খুলে দেখল মায়া তার বুকের সাথে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু দরজায় হঠাৎ বিকট শব্দে ধাক্কা পড়তে শুরু করল—
"সায়েম! মায়া! তাড়াতাড়ি ওঠো! মজিদ মাস্টারকে পাওয়া যাচ্ছে না, উনি নাকি হঠাৎ নিখোঁজ!"
দরজায় মজিদ মাস্টারের নিখোঁজ হওয়ার খবরটা যেন ভোরের রোদেলা শান্ত পরিবেশটাকে এক লহমায় তছনছ করে দিল। সায়েম এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মায়াও বুক চাবড়ে উঠে বসে শাড়ির আঁচলটা গায়ে পেঁচিয়ে নিল। কাল রাতের সেই মধুর আবেশ, শরীরের তপ্ত স্পর্শ—সব যেন মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে এক তীব্র অনিশ্চয়তার কালো ছায়া নেমে এলো ঘরে।
"কী বলছিস তুই, সায়েম? বাবা কোথায় যাবে?" মায়ার গলা থরথর করে কাঁপছিল। তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল।
সায়েম দ্রুত শার্টটা গায়ে গলিয়ে মায়ার কাছে এলো। মায়ার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের শক্ত দুহাতে চেপে ধরে বলল, "তুই শান্ত হ, মায়া। মাস্টার মশাই কোথাও যাননি, নিশ্চয়ই আশেপাশে কোথাও গেছেন। আমি দেখছি।"
সায়েমের সেই দৃঢ় স্পর্শ আর আশ্বস্ত করা চাহনিতে মায়া কিছুটা বল পেল। ছোটবেলা থেকে মজিদ মাস্টারকে সায়েমও নিজের বাবার মতোই শ্রদ্ধা করে এসেছে। যত লড়াই-ঝগড়াই থাকুক না কেন, মায়ার বাবাকে সায়েম নিজের আড়ালে আগলে রাখত।
সারা গ্রামে হইচই পড়ে গেল। গ্রামের পুকুরপাড়, নদীর ঘাট, পুরোনো স্কুলঘর—কোথাও বাদ রইল না। সায়েম বৃষ্টির কাদা মেখে সারাদিন ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজল। মায়া ঘরের দাওয়ায় বসে একমনে খোদার কাছে দোয়া করতে লাগল আর চোখের জল ফেলতে লাগল।
বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামছে, তখন সায়েম ভিজে একসার হয়ে বাড়ি ফিরল। তার মুখ গম্ভীর, চোখে ভীষণ উদ্বেগ।
"পায়নি, সায়েম?" মায়া ছুটে এসে সায়েমের জামা ধরে হাহাকার করে উঠল।
সায়েম মায়াকে এক টানে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। তার ভিজে যাওয়া গায়ে মায়ার মুখটা গুঁজে গেল। সায়েমের বুকের ধুকপুকানি তখন ভীষণ দ্রুত।
"তোর বাবার চশমা আর লাঠিটা নদীর ওপারে পুরোনো জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গেছে, মায়া," সায়েম নিচু কিন্তু ভারী গলায় বলল। "আমি ওখানে যাচ্ছি। তুই ঘরে থাকবি।"
"না! আমিও যাব!" মায়া সায়েমের শার্ট আঁকড়ে ধরে জাঁকিয়ে বসল। "আমি তোকে একা যেতে দেব না। আমার বাবাকে আমি নিজে খুঁজতে যাব।"
সায়েম মায়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ভয় আর জেদ এক হয়ে ফুটে উঠেছে। সায়েম মায়ার কপালে একটা গভীর স্পর্শ দিয়ে বলল, "বেশ, তবে আমার হাত ছাড়বি না একদম। যে বিপদই আসুক, তুই আমার ছায়ায় থাকবি।"
নদী পার হয়ে অন্ধকারে আচ্ছন্ন পুরোনো জমিদার বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত নেমে এলো। চারপাশ ঘুটঘুট অন্ধকার, কেবল সায়েমের হাতের টর্চের আলোটুকু পথ দেখাচ্ছিল। ভাঙা দেয়াল, শ্যাওলা পড়া ইট আর ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র ডাকে পরিবেশটা বেশ থমথমে।
হঠাৎ জমিদার বাড়ির ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট কাশির শব্দ শোনা গেল।
"বাবা!" মায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সায়েমের হাত ছাড়িয়ে সে ভেতরে দৌড় দিল।
"মায়া, দাঁড়াও!" সায়েম চিৎকার করে পেছনে ছুটল।
ভিতরের একটা বড় ঘরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলতেই মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল। মজিদ মাস্টার মেঝেতে বসে আছেন, কিন্তু তার হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা! আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের কুখ্যাত চোরাকারবারি রফিক ও তার দলবল। মজিদ মাস্টার স্কুলের জমির দলিল নিয়ে তাদের অবৈধ দখলদারিতে বাধা দিয়েছিলেন, তাই তাকে অপহরণ করা হয়েছে।
"ওরে মায়ারে, পালা এখান থেকে! এরা ভালো লোক না!" মজিদ মাস্টার চিৎকার করে উঠলেন।
রফিক একটা বাঁকা হাসি দিয়ে খেঁকিয়ে উঠল, "আরে মাস্টার, মেয়েকে ডেকে ভালোই হলো। জামাইকেও নিয়ে এসেছে দেখছি। আজ সব হিসেব একবারে চুকিয়ে দেব।"
রফিক মায়ার দিকে এগোতেই সায়েম বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল রফিকের ওপর। সায়েমের এক ঘুুসিতে রফিক ছিটকে গিয়ে পড়ল মেঝেতে। রফিকের সাথে থাকা বাকি দুজন লোক সায়েমকে ঘিরে ফেলল।
শুরু হলো এক অসমান লড়াই। সায়েম একা তিনজনের সাথে লড়ছে। মায়া ভয়ে চিৎকার করতে করতে ঘরের কোণে পড়ে থাকা একটা কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে এক গুণ্ডার মাথায় সজোরে আঘাত করল। গুণ্ডাটা ঘুরে মায়াকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
মায়াকে মাটিতে পড়তে দেখে সায়েমের মাথায় যেন চণ্ডীর রূপ ভর করল। সায়েমের ভেতরের প্রেমিক আর প্রতিদ্বন্দ্বী যেন এক হয়ে আগ্নেয়গিরি হয়ে ফুটতে লাগল। সে রফিকের গলার কোণ ধরে এমন এক আছাড় মারল যে রফিক নিস্তেজ হয়ে গেল। অন্য দুজনকে সায়েম এমন নিষ্ঠুরভাবে মারতে শুরু করল যে তারা প্রাণ ভয়ে রফিকের অচেতন শরীর তুলে নিয়ে সেখান থেকে চম্পট দিল।
ঘরটা আবার শান্ত হয়ে এলো। সায়েম হাঁপাচ্ছিল, তার কপাল কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। সে দ্রুত গিয়ে মজিদ মাস্টারের বাঁধন খুলে দিল।
"বাবা, আপনি ঠিক আছেন?" সায়েম জিজ্ঞেস করল।
"আমি ঠিক আছি রে বাপি, কিন্তু তুই..." মজিদ মাস্টার চোখের জল ফেললেন।
মায়া ধীরপায়ে সায়েমের সামনে এসে দাঁড়াল। সায়েমের কপাল থেকে লাল রক্ত গাল বেয়ে নামছে। মায়ার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল এই দৃশ্য দেখে। সে শাড়ির আঁচলটা ছিঁড়ে নিয়ে সায়েমের কপালে সজোরে চেপে ধরল।
"তুই পাগল, সায়েম? নিজের জীবনের মায়া নেই তোর?" মায়া কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে উঠল।
সায়েম রক্তমাখা মুখে একটা বাঁকা হাসি দিল। মায়ার ভেজা চোখ দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "তোর চোখের জলের চেয়ে আমার এই রক্তের দাম অনেক কম, মায়াবতী। তোকে আর তোর পরিবারকে রক্ষা করার জন্য আমি হাজারবার নিজের জীবন বাজি রাখতে পারি।"
মায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মজিদ মাস্টারের সামনেই সে সায়েমকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সায়েমের এক হাত মায়ার পিঠে জমা হলো, অন্য হাত দিয়ে সে মায়ার চোখের জল মুছিয়ে দিল।
ঝড় কেটে গেছে, কিন্তু এই বিপদের মেঘ তাদের সম্পর্কের বাঁধনকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই—রয়ে গেছে কেবল এক অপরিসীম, আত্মত্যাগী প্রেম।
জমিদার বাড়ির সেই ভয়াল রাত কাটিয়ে মজিদ মাস্টারকে সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরিয়ে আনার পর পুরো রূপসীপুর গ্রাম যেন সায়েমের প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠল। গ্রামে রফিকের চোরাকারবারির আখড়া ভেঙে পুলিশি সহায়তায় শান্ত ফিরিয়ে আনা আর শশুরের মান বাঁচাতে সায়েমের এই বীরত্ব মায়ার চোখে সায়েমের অবস্থান পুরোপুরি বদলে দিল।
বিপদের কাল মেঘ কেটে যাওয়ার পর মজিদ মাস্টার দুজনকে আশীর্বাদ করে নিজের ঘরে বিশ্রাম নিতে গেলেন। কিন্তু ঘরের ভেতর তখন অন্য এক ঝড়ের প্রস্তুতি চলছে—তবে সে ঝড় কোনো রাগ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, সে ঝড় শুধুই নিবিড় ভালোবাসার।
রাত তখন অনেক। গ্রামের বাঁশঝাড়ের ওপর রূপালী জোছনা ঢেলে পড়েছে। ঘরের বারান্দায় মায়া দাঁড়িয়ে ছিল একাকী। তার পরনে একটা নীল রঙের সুতির শাড়ি, ভেজা চুল পিঠের ওপর ছড়ানো। কপালে লাল সিঁদুরের টিপটা চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে।
ধীরপায়ে সায়েম এসে মায়ার পেছনে দাঁড়াল। সায়েমের কপালে এখনো ব্যান্ডেজ বাঁধানো, তবে তার চোখের সেই গভীরতা আর বাঁকা হাসিটা একই রকম রয়ে গেছে। সায়েম পেছন থেকে দুহাতে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে সেঁটে নিল।
মায়া কোনো বাধা দিল না। সে নিজের মাথাটা সায়েমের কাঁধে এলিয়ে দিল।
"কপালের ব্যথাটা কমেনি এখনো, সায়েম সাহেব?" মায়া আলতো করে সায়েমের আহত কপালে নিজের হাত রাখল।
সায়েম মায়ার ঘাড়ে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় কণ্ঠে বলল, "এই ব্যথার কোনো অস্তিত্বই নেই, মায়াবতী, যখন তুই আমার এত কাছে থাকিস। আজ বল তো, কে জিতল আর কে হারল?"
মায়া ঘুরে দাঁড়িয়ে সায়েমের বুকে হাত রাখল। সায়েমের শার্টের বোতামের ফাঁক দিয়ে তার উষ্ণ বুকের ছোঁয়া পাচ্ছিল মায়া। সে সায়েমের চোখে চোখ রেখে বাঁকা হেসে বলল, "তুই ভেবেছিলি তুই জিতেছিস? একদম না! তুই তো আমার প্রেমের জালে সারাজীবনের জন্য বন্দি হয়ে গেছিস। বন্দি কখনো জেতে?"
সায়েম হো হো করে হেসে উঠল। তারপর এক টানে মায়াকে আরো কাছে নিয়ে এলো। দুজনের মুখের দূরত্ব তখন শূন্যে নেমে এসেছে।
"আমি তো স্বেচ্ছায় তোর কাছে হেরেছি, মায়া," সায়েম মায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল। "ছোটবেলা থেকে তোকে হারানোর জেদটা আসলে তোকে পাওয়ার এক সুপ্ত ইচ্ছা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তোকে না জ্বালিয়ে যে আমার দিন চলত না।"
মায়ার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল, তবে সে জল আনন্দের। সে নিজের দুই হাত সায়েমের গলায় জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে এক তীব্র, অনুরাগী চুম্বন বসাল।
সায়েমও মায়াকে এক ঝটকায় বাহুডোরে তুলে নিয়ে ঘরের বিছানার দিকে পা বাড়াল।
ঘরের প্রদীপের আলোটা বাতাস এসে নিভিয়ে দিয়ে গেল। জানালার খোলা ফাঁক দিয়ে রাতের ঠাণ্ডা বাতাস আর জোছনার আলো এসে পড়ল বিছানায়। সায়েম মায়াকে বিছানায় শায়িত করে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। সায়েমের ভেজা, উষ্ণ ঠোঁট মায়ার গাল, চিবুক আর কলারবোন অতিক্রম করে ধীরে ধীরে আরও নিচে নেমে গেল।
মায়ার শরীরের প্রতিটি কোণ সায়েমের স্পর্শে শিউরে উঠতে লাগল। মায়া সায়েমের শার্টের কাপড় শক্ত করে চেপে ধরে এক গভীর আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
"তুই কেবল আমার, মায়া..." সায়েমের নিশ্বাস মায়ার উন্মুক্ত পেটে আছড়ে পড়ল।
"আমি চিরকাল তোরই ছিলাম, সায়েম..." মায়া সায়েমের চুল আঁকড়ে ধরে সায়েমকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
সেই গভীর রাতে, ছোটবেলার সব ঝগড়া, অ্যালার্মের দুষ্টুমি, চায়ের লবণের শোধ আর অতীত প্রতিযোগিতার সব দেয়াল চুরমার হয়ে ভেসে গেল এক সীমাহীন আত্মিক আর শারীরিক মিলনের গভীরে।
সকালের নরম রোদ যখন জানালার পর্দা টপকে এসে পড়ল, তখন সায়েমের বুকের ওপরে মাথা রেখে প্রশান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন মায়া। সায়েম মায়ার ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে তার কপালে এক দীর্ঘ ভালোবাসার পরশ আঁকল।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মিষ্টি গল্পটা আজ থেকে এক পূর্ণাঙ্গ, অমলিন ভালোবাসার নতুন অধ্যায়ে রূপ নিল, যার কোনো শেষ নেই।
....