নীরবতার শেষ অধ্যায়

শ্রাবণ মাসের নামল বৃষ্টিতে ভেজা ঢাকা শহরের বাতাসটা বেশ ভারী হয়ে ছিল। ধানমন্ডি লেকের উত্তর পাড়ের ওই পুরোনো কদম গাছটার নিচে ছাতা বন্ধ করে বসে ছিল সায়ন। প্রতিচ্ছবির মতো পাঁচ বছর আগের একটা বৃষ্টিভেজা বিকেলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে অদিতির। সেদিনও এই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তারা শেষবারের মতো কথা বলেছিল, যদিও অদিতি সেদিন সায়নকে জানায়নি যে এটাই তাদের শেষ দেখা।

অদিতি গাড়ির জানালার কাচ একটু নামিয়ে বাইরের ভিজে যাওয়া শহরটাকে দেখল। পাঁচ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এই পাঁচ বছরে ঢাকার রাস্তাগুলো বদলেছে, উড়ালপুল বেড়েছে, কিন্তু অদিতির বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধের পাথরটা এক চুলও নড়েনি। কোনো একটা কথা না বলে, হুট করে নিজের ফোন নম্বরটা বন্ধ করে দিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে ও রাজ্য ছেড়ে পালিয়েছিল। কারণ তখন ওর জীবনটা এমন এক ঘূর্ণাবর্তে এসে দাঁড়িয়েছিল যেখানে নিজেকে বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছিল, সায়নকে রক্ষা করা তো দূরের কথা। বাবা-মায়ের অসমাপ্ত সম্পর্কের দায়, পারিবারিক ঋণের বোঝা আর মানসিক যন্ত্রণার এক চরম মুহূর্তে অদিতি শুধু পালিয়েছিল। ও ভেবেছিল, ওর অনুপস্থিতি হয়তো সায়নকে কিছুদিনের জন্য কষ্ট দেবে, তারপর সায়ন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু অদিতি বোঝেনি, সায়নের মতো মানুষেরা সহজে কাউকে ভালোবাসে না, আর একবার বাসলে সেই অনুভূতি কোনো শর্ত বা সময়ের ফ্রেমে আটকে থাকে না।

অদিতি গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে লেকের পার ধরে এগোতে লাগল। ওর পরনে একটা নীল রঙের সুতি শাড়ি, ঠিক যেমনটা সায়ন পছন্দ করত। প্রতি পদক্ষেপে অদিতির বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে দুলছিল। সায়নের সাথে ও যোগাযোগ করেনি ঠিকই, কিন্তু ওর এক পরিচিত ছোট বোন মিরা মাঝে মাঝে সায়নের খবর দিত। মিরাই কিছুদিন আগে ফোন করে অদিতিকে বলেছিল, "অদিতি খালা, তুমি চলে যাওয়ার পর সায়ন ভাই প্রতিদিন বিকেল চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত ধানমন্ডি লেকের ওই কদম গাছটার নিচে এসে বসে থাকে। বৃষ্টি হোক, কড়া রোদ হোক, কিংবা প্রচণ্ড কাজের চাপ—ও একবারের জন্য হলেও ওখানে আসবেই। কারো সাথে কথা বলে না, শুধু লেকের পানির দিকে তাকিয়ে থাকে।"

এই একটা খবর অদিতির সমস্ত সাজানো জীবনটাকে এক মুহূর্তে ওলটপালট করে দিয়েছিল। ও বুঝেছিল, ওর পালিয়ে যাওয়াটা মুক্তি দেয়নি, বরং সায়নকে এক অসীম অপেক্ষার খাঁচায় বন্দি করে রেখে এসেছে।

কদম গাছটার কাছাকাছি আসতেই অদিতির থমকে দাঁড়াল।

সায়ন বসে আছে। ওর কাঁধ দুটো আগের চেয়ে সামান্য চওড়া হয়েছে, চুলগুলো একটু এলোমেলো, গায়ে ধূলিমলিন একটা কালো শার্ট। ওর চোখের নিচে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা অদিতির চোখে পড়ল সায়নের বসার ভঙ্গিতে। পাঁচ বছর আগে সায়নের মধ্যে একটা চঞ্চলতা ছিল, একটা সতেজ হাসি সর্বদা লেগে থাকত ওর মুখে। অথচ আজকের সায়ন যেন এক নিরেট পাথরের মূর্তি। যেন ওর চারপাশে একটা অদৃশ্য, অভেদ্য দেয়াল তুলে রাখা হয়েছে, যার ভেতরে অন্য কোনো মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

অদিতি আস্তে আস্তে হেঁটে এসে সায়নের ঠিক সামনে দাঁড়াল। ওর ছায়াটা সায়নের পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল।

সায়ন মাথা তুলল না। সে কেবল শান্ত গলায় বলল, "আজ লেকে লোক কম। অন্য কোনো বেঞ্চে গিয়ে বসলে ভালো হয়।"

সায়নের এই নিরাসক্ত, বরফশীতল কন্ঠস্বর শুনে অদিতির চোখের কোণে পানি জমে উঠল। সায়ন যে ওকে চিনতে পারেনি তা নয়, কিন্তু ও এমন ভাব করছে যেন অদিতির উপস্থিতি ওর জীবনে বিন্দুমাত্র কোনো আলোড়ন তৈরি করছে না।

"সায়ন..." অদিতির গলা দিয়ে শব্দটা খুব কষ্ট করে বের হলো।

সায়ন এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। কিন্তু সেই চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো অভিমান নেই, এমনকি কোনো চমকও নেই। এক গভীর, শূন্য দৃষ্টি। যে দৃষ্টিতে কোনো আলো নেই, কেবল এক বিশাল অন্ধকার গহ্বর।

"অদিতি?" সায়নের কণ্ঠে কোনো আবেগ ফুটল না। সে যেন খুব সাধারণ এক পরিচিত মানুষের নাম উচ্চারণ করল। "কেমন আছ? ভালো তো?"

অদিতি কদম গাছটার নিচে কাঠের বেঞ্চের এক কোণে বসল। সায়নের শরীর সামান্য দূরে সরে গেল—অত্যন্ত সচেতনভাবে, যেন অদিতির ছোঁয়াও ও এড়াতে চায়।

"সায়ন, আমি..." অদিতি শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। "তুমি কেমন আছ?"

"আমি যেমন ছিলাম, তেমনই আছি। বা বলা ভালো, আমি কেমন আছি তাতে তো কখনো কারো কিছু এসে যায়নি," সায়ন লেকের ঘোলা পানির দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলল। "তুমি হঠাৎ পাঁচ বছর পর এখানে? ঢাকা তো তুমি পছন্দ করতে না।"

"আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি, সায়ন। আমি জানি আমি যা করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিল না..."

সায়ন হাত তুলে অদিতিকে থামিয়ে দিল। ওর মুখের চেহারায় এক বিন্দু বিরক্তি ছাড়া আর কিছুই ফুটল না। "তুমি ভুল করছ, অদিতি। ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? তুমি তো আমাকে কোনো আঘাত করোনি। তুমি তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়েছ, আমি আমারটা। এতে ক্ষমা চাওয়ার মতো কিছু নেই।"

সায়নের এই অতিরিক্ত অস্বাভাবিক শান্ত ভাবটা অদিতির বুকে তীরের মতো বিঁধল। ও জানত সায়ন যদি ওর ওপর চিৎকার করত, ওকে গালি দিত, কিংবা কেঁদে ফেলত—তাহলে ও বুঝত সায়নের ভেতরে সুপ্ত ভালোবাসাটা এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা, এই বরফজমা দেয়াল প্রমাণ করে দিচ্ছে যে সায়ন নিজের ভেতরের আবেগগুলোকে একবারে মেরে ফেলেছে। ও নিজেকে এমন এক দুর্গে বন্দি করে ফেলেছে যেখানে কষ্টের আলো-বাতাসও পৌঁছায় না।

"তুমি কি প্রতিদিন এখানে আসতে?" অদিতি কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

সায়ন হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। "কেন আসতাম, সেটা জেনে তোমার কী লাভ? অতীত নিয়ে কথা বলা সময়ের অপচয়। আমার এখন উঠা দরকার, অফিসে কিছু কাজ বাকি আছে।"

সায়ন উঠে দাঁড়াল। ও একবারের জন্যও অদিতির চোখের দিকে তাকাল না।

"সায়ন, দাঁড়াও!" অদিতিও তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। ও সায়নের হাতটা চেপে ধরতে চাইল, কিন্তু সায়ন চট করে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। সেই স্পর্শ এড়ানোর মধ্যে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল কেবল এক চূড়ান্ত দূরত্ব বজায় রাখার তীব্র চেষ্টা।

"আমাকে স্পর্শ কোরো না, অদিতি," সায়নের গলায় এবার প্রথমবার হালকা একটা স্পষ্ট সতর্কতা শোনা গেল। "যে মানুষটা পাঁচ বছর আগে মরে গেছে, তাকে আর জাগানোর চেষ্টা কোরো না। তুমি নিজের পথে ফিরে যাও। আমি আমার জায়গায় বেশ আছি।"

সায়ন ধীরে ধীরে হেঁটে লেকের পার ধরে চলে গেল। ও একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। অদিতির চোখের পানি তখন বাধ ভাঙা বৃষ্টির মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

অদিতি ভিজে যাওয়া কাঠের বেঞ্চে বসে পড়ল। ও সায়নের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সায়নের চলে যাওয়াটা সাধারণ কোনো চলে যাওয়া নয়। পাঁচ বছর আগে অদিতি একা চলে গিয়েছিল, আর সেই কষ্টটা সায়ন কখনো কাউকে প্রকাশ করতে পারেনি। ও সেই অব্যক্ত যন্ত্রণাকে বুকের ভেতর পুষে রেখে নিজেকে তিলে তিলে পাথর বানিয়ে ফেলেছে।

সায়ন হয়তো ভেবেছিল ও অদিতিকে ভুলে গেছে, কিন্তু প্রতিদিন এই কদম গাছটার নিচে এসে নিঃশব্দে বসে থাকাটাই প্রমাণ করে, সায়নের আত্মাটুকু পাঁচ বছর আগের সেই বিকেলেই আটকে আছে। অদিতির বুকে এক গভীর হাহাকার জেগে উঠল। ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, সায়নের তুলে নেওয়া এই অদৃশ্য দেয়াল ও ভাঙবেই। সায়নের জমে থাকা সমস্ত কষ্ট ও নিজের বুকে টেনে নেবে, এমনকি যদি তার জন্য অদিতিকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে হয়, তবুও।

বৃষ্টির তেজ আরও বাড়ল। লেকের পানি অশান্ত হয়ে উঠেছে। অদিতি একা বসে রইল কদম গাছটার নিচে, সায়নের ফেলে যাওয়া শূন্যতার মুখোমুখি হয়ে। সম্পর্কের এই দ্বিতীয় অধ্যায় যে প্রথমটার চেয়েও কত কঠিন আর যন্ত্রণাদায়ক হতে চলেছে, তা অদিতি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল।

ধানমন্ডি লেকের ওপর সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিটা এখন থামলেও বাতাসটা প্রচণ্ড হিমশীতল। অদিতির ভিজে যাওয়া সুতি শাড়িটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, কিন্তু ভেতরের কান্নার যে ঝড় উঠেছে, তার কাছে বাইরের এই ঠান্ডা বাতাস কিছুই নয়। সায়নের বরফশীতল চাহনি আর ছোঁয়া এড়ানোর দৃশ্যটা বারবার অদিতির চোখের সামনে ভেসে উঠছে। পাঁচ বছর আগের যে সায়নকে ও চিলতে রোদের মতো উষ্ণ আর হাসিখুশি দেখে গিয়েছিল, সেই মানুষটার ভেতর আজ কেবলই এক শ্মশানের নীরবতা।

পরদিন সকালে অদিতি আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। ধানমন্ডির পুরোনো ফ্ল্যাটটায় ও একাই উঠেছে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর অদিতির নিজস্ব বলতে তেমন কিছু অবশিষ্ট ছিল না, তবে ঢাকার এই শহরের একটা ছোট কোণে সায়নের উপস্থিতিই ওর জন্য এখন একমাত্র আশ্রয়। মিরাকে ফোন করে সায়নের অফিসের ঠিকানাটা জোগাড় করল অদিতি। সায়ন এখন ঢাকার একটা প্রনাম্য আইটি সংস্থায় টিম লিড হিসেবে কাজ করে। মিরা এ-ও জানিয়েছিল, সায়ন এখন আর কারো সাথে অহেতুক মেলামেশা করে না। কাজ শেষ হলে সোজা বাসায় ফেরে, অথবা গিয়ে বসে লেকের পাড়ে। ওর কোনো বন্ধু নেই, কোনো সামাজিক জীবন নেই।

কারওয়ান বাজারের এক বিশালাকার কর্পোরেট ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল অদিতি। সাড়ে এগারোটা বাজে। কাচের দেয়ালঘেরা আধুনিক এক বিশাল অফিস। অভ্যর্থনাকক্ষে গিয়ে অদিতি সায়নের নাম বলতেই দায়িত্বরত তরুণী একগাল হেসে বলল, "স্যার তো এখন মিটিংয়ে আছেন। আপনি একটু ওয়েটিং লাউঞ্জে বসুন।"

অদিতি কাচের দেয়ালের ওপাশে তাকাতেই সায়নকে দেখতে পেল। একটা লম্বা কনফারেন্স টেবিলে একপাশে বসে আছে সায়ন। গায়ে গাঢ় নীল রঙের ফরমাল শার্ট, হাত গুটানো। গলার টাই খানিকটা আলগা। ও খুব মন দিয়ে সহকর্মীদের প্রেজেন্টেশন শুনছে, মাঝে মাঝে কিছু কড়া নির্দেশনা দিচ্ছে। সায়নের এই পেশাদার, আত্মবিশ্বাসী রূপটা অদিতির অচেনা। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করতেই অদিতি দেখল—সায়নের চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো ক্লান্ত আর গাম্ভীর্যের চাদরে ঢাকা। মাঝেমধ্যে ও নিজের কপালের রগ দুটো চেপে ধরছে, যেন প্রচণ্ড কোনো মাথাব্যথা চেপে রেখে কাজ করে যাচ্ছে।

ঘণ্টাখানেক পর মিটিং শেষ হলো। সায়ন কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে নিজের গ্লাসের কেবিনে ঢোকার মুখে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। ওয়েটিং লাউঞ্জে অদিতিকে বসে থাকতে দেখে ওর ভ্রূ জোড়া সামান্য কুঁচকে গেল।

সায়ন ধীরপায়ে অদিতির দিকে হেঁটে এল। ওর মুখে কোনো হাসির রেখা নেই।

"এখানে কেন এসেছ, অদিতি?" সায়নের গলা একদম নিচু, কিন্তু ভারী।

অদিতি উঠে দাঁড়িয়ে হাতের ছোট টিফিন ক্যারিয়ারটা একটু শক্ত করে ধরল। "আমি... আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। মিরা বলেছিল তুমি আজকাল দুপুরে নাকি ঠিকমতো খাও না। অফিসের ক্যাফেটেরিয়ার খাবার তোমার সহ্য হয় না।"

সায়ন অদিতির হাতের টিফিন ক্যারিয়ারটার দিকে একবার তাকাল, তারপর অদিতির চোখের দিকে। সেই চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই, আছে একধরনের শীতল ক্লান্তি।

"অদিতি, এটা কোনো নাটকের মঞ্চ নয়," সায়ন একদম শান্তভাবে বলল। "তুমি পাঁচ বছর পর হঠাৎ এসে আমার ব্যক্তিগত জীবনে ঢোকার চেষ্টা করছ, এটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। তুমি কি ভাবছ, দু-একদিন টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে আসলেই পুরোনো সব ভুল মুছে যাবে?"

"আমি তো ভুল মোছার চেষ্টা করছি না, সায়ন!" অদিতির গলা কেঁপে উঠল, ও চারপাশের মানুষের কথা চিন্তা করে নিজেকে সামলে নিল। "আমি শুধু তোমার যত্ন নিতে চাই। আমি জানি আমি অপরাধী। কিন্তু তুমি নিজের ওপর এই অত্যাচার কেন করছ? তুমি কেন সবাইকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছ?"

সায়ন হালকা এক পদক্ষেপে অদিতির একদম কাছাকাছি চলে এল। এত কাছাকাছি যে অদিতি সায়নের গায়ের পরিচিত আফটারশেভের ঘ্রাণ পাচ্ছিল—যে ঘ্রাণটা পাঁচ বছর ধরে অদিতির স্মৃতিতে তাড়া করে বেড়িয়েছে। সায়ন অদিতির চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রল। ওর চোখ দুটো এত কাছ থেকে দেখে অদিতির বুক কেঁপে উঠল; সেখানে রাগ নেই, শুধু এক অতল বিষাদ জমা হয়ে পাথর হয়ে গেছে।

"অত্যাচার?" সায়ন ফিসফিস করে বলল, ওর গলার স্বরে এক অদ্ভুত হাহাকার লুকানো ছিল। "তুমি এটাকে অত্যাচার বলছ? অদিতি, পাঁচ বছর আগে যেদিন তুমি কোনো একটা শব্দ না বলে চলে গেলে, সেদিন আমি প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবতাম আমি কী ভুল করেছিলাম। আমি কি তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসিনি? আমি কি তোমার যোগ্য ছিলাম না? প্রতি রাতে কারওয়ান বাজারের এই বহুতল ভবনের ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে আমার মনে হতো নিচে লাফিয়ে পড়ি। কিন্তু আমি তা-ও করিনি। কারণ আমি অপেক্ষা করছিলাম। সেই অপেক্ষার যন্ত্রণাটা কেমন, তা তোমার এই সাজানো ক্ষমা চাওয়ার গল্প দিয়ে মেটানো যাবে না।"

অদিতির চোখের কোণ বেয়ে টুপ করে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। ও হাত বাড়িয়ে সায়নের হাতটা ধরতে গেল। "সায়ন, আমার পরিস্থিতিটা শোনো একবার..."

সায়ন এবার আর হাত সরাল না, কিন্তু ওর হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে রইল। অদিতির উষ্ণ ছোঁয়াও যেন সায়নের ভেতরের সেই বরফ গলাতে পারছে না।

"আমি তোমার পরিস্থিতি শুনতে চাই না, অদিতি," সায়ন হাতটা ধীরগতিতে ছাড়িয়ে নিল। "কারণ শুনতে গেলে আমাকে আবার বিশ্বাস করতে হবে। আর আমি দ্বিতীয়বার নিজেকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার ঝুঁকি নিতে পারব না। এই যে দেয়ালটা দেখছ আমার চারপাশে? এটা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এটা ভাঙলে আমি মরে যাব।"

সায়ন পকেট থেকে নিজের ওয়ালেট বের করে টিফিন টিফিন ক্যারিয়ারটার দিকে নির্দেশ করে বলল, "তোমার খাবারের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু দয়া করে কাল থেকে আর এসব নিয়ে এসো না। আমার সহকর্মীরা নানা কথা বলবে।"

সায়ন আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে নিজের কেবিনে ঢুকে গেল এবং কাচের দরজাটা বন্ধ করে দিল। অদিতি বাইরে দাঁড়িয়ে দেখল, সায়ন কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসে দু হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। ওর পিঠটা সামান্য কাঁপছে—ও কি কাঁদছে? নাকি নিজের জমানো কষ্টটাকে আবারও বুকের গভীরে ঠেলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে?

অদিতি টিফিন বক্সটা কোণায় একটা টেবিলে রেখে দিল। ও বুঝল, সায়নের ওপর রাগ করা বা ওর দূরে সরে যাওয়াটা অবহেলা নয়, ওটা সায়নের আত্মরক্ষার শেষ কবচ। পাঁচ বছর আগের অদিতির রেখে যাওয়া ক্ষতে সায়ন এমন এক আস্তরণ তৈরি করেছে, যা স্পর্শ করতে গেলেই ও নিজে যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে।

অদিতি অফিস ভবন থেকে বের হয়ে ঢাকার রাজপথে এসে দাঁড়াল। তীব্র যানজট আর কোলাহলের মাঝে ও মনে মনে বলল, "তুমি যতই দূরে ঠেলে দাও সায়ন, তোমার এই নীরব যন্ত্রণা আমি মুছে দেবই। তুমি যদি পাথর হয়ে থাকো, আমি সেই পাথরে প্রতিদিন ভালোবেসে আঘাত করব। তোমার ভেতরের কান্নাটা যতক্ষণ না বাইরে আসছে, আমি এক পা-ও নড়ব না।"

আকাশে আবার কালচে মেঘ জমতে শুরু করেছে। অদিতির মনে হলো, সায়নের দেয়াল ভাঙার এই যুদ্ধটা দীর্ঘ হতে চলেছে, কিন্তু ও এবার পিছপা হওয়ার জন্য ফিরে আসেনি।

বিকেলের আলোটা ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। অদিতির ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বারান্দায় হালকা শীতল হাওয়া বইছে। দুদিন ধরে ও সায়নের অফিসে যায়নি, কিন্তু ও বসেও থাকেনি। মিরা মারফত ও খবর পেয়েছে যে সায়নের শারীরিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। অতিরিক্ত কাজের চাপ, অসময়ে খাওয়া-দাওয়া আর দীর্ঘদিনের ঘুমহীনতা সায়নকে একদম শেষ করে দিচ্ছে।

আজ শুক্রবার, ছুটির দিন। অদিতি জানত এই দিনটাতে সায়ন ধানমন্ডির লেকে আসবে না, কারণ ছুটির দিনে সেখানে প্রচুর মানুষ থাকে, যা সায়নের সহ্য হয় না। কিন্তু ও কোথায় যেতে পারে? অদিতির স্মৃতির পাতা উল্টে হঠাৎ মনে পড়ে গেল পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পারের একটা পুরোনো ক্যাফের কথা—'হৃদয়পুর'। পাঁচ বছর আগে সায়ন যখনই খুব হতাশ বা ক্লান্ত থাকত, তখন ও অদিতিকে নিয়ে ওই শান্ত ক্যাফেটার ছাদে গিয়ে বুড়িগঙ্গার দিকে তাকিয়ে বসে থাকত।

অদিতি কোনো দ্বিধা না করে পুরান ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো। বিকেল নামতেই ও গিয়ে পৌঁছাল 'হৃদয়পুর' ক্যাফের ছাদে।

অদিতির অনুমান ভুল ছিল না। ছাদের এক কোণে, যেখানে আড়াকাত হয়ে নদীর ওপরের খোলা আকাশ দেখা যায়, সেখানে কাঠের একটা উঁচু চেয়ারে বসে আছে সায়ন। ওর হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। পাঁচ বছর আগে সায়ন ধূমপান করত না; অদিতির বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল দৃশ্যটা দেখে। সায়নের পরনে সাধারণ একটা ধুসর রঙের টি-শার্ট আর জিন্স। ও নদীর দিকে তাকিয়ে একটানা ধোঁয়া ছেড়ে যাচ্ছে, দৃষ্টি যথারীতি বিষাদগ্রস্ত ও উদাসীন।

অদিতি নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে সায়নের ঠিক পেছনের চেয়ারটায় বসল। সায়ন ধোঁয়ার আড়াল থেকে মুখ না ফিরিয়েই বলে উঠল, "তুমি কীভাবে জানলে আমি এখানে থাকব?"

সায়নের এই তীক্ষ্ণ অনুভূতি দেখে অদিতি অবাক হলো না। ও নিচু স্বরে বলল, "যে মানুষটাকে আমি নিজের চেয়েও বেশি চিনেছি, তার মনের রাস্তাগুলো তো আমার মুখস্থ থাকবেই, সায়ন।"

সায়ন হাতের সিগারেটটা ছাইদানিতে চেপে নিভিয়ে দিল। তারপর চেয়ার ঘুরে অদিতির মুখোমুখি হলো। "তুমি কেন আমাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছ না, অদিতি? তুমি কেন বারবার আমার অতীতে আঁচড় কাটছ?"

অদিতি সায়নের দিকে আরও একটু এগিয়ে বসল। ওদের দুজনের মধ্যে ব্যবধান এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। "কারণ তুমি শান্তিতে নেই, সায়ন! তুমি শান্তির নাটক করছ। তুমি নিজেকে একটা খাঁচায় বন্ধ করে রেখেছ আর ভাবছ তুমি ভালো আছ। তোমার এই চোখ দুটো মিথ্যা বলতে পারে না। তুমি প্রতিদিন তিলে তিলে জ্বলছ।"

"জ্বলছি তো কী হয়েছে?" সায়ন হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল। ওর গলার আওয়াজে এতদিন ধরে জমা রাখা ক্ষোভ আর যন্ত্রণার বাঁধ ভাঙার এক ইঙ্গিত পাওয়া গেল। "আমার জ্বালায় তোমার কী আসে যায়? তুমি তো সেদিন পেছনে ফিরেও তাকাওনি! তুমি জানতে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম? আমি আমার পরিবার, আমার ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ওপরে তোমাকে রেখেছিলাম। আর তুমি একটা চিরকুট পর্যন্ত না রেখে আমায় ফেলে চলে গেলে? ভেবেছিলে সায়ন একটা খেলনা? কিছুদিন কাঁদবে, তারপর ভুলে যাবে?"

সায়নের বুকের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। ওর চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, চোখের কোণে জমেছে টলটলে পানি। এই প্রথমবার সায়ন নিজের নিখুঁত বরফশীতল ভাবমূর্তিটা ভেঙে অদিতির সামনে নিজের ক্ষোভ উগরে দিল।

অদিতি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও ধীরগতিতে দু হাত দিয়ে সায়নের শক্ত চোয়াল দুটো চেপে ধরল। সায়ন সরার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু অদিতির হাতের ভালোবাসার আকুলতায় ও যেন স্থির হয়ে গেল।

"আমি তোমাকে ফেলেনি, সায়ন," অদিতির চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। "আমার বাবা তখন ঋণের দায়ে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। যে মানুষগুলোর কাছে আমার বাবা দেনাদার ছিলেন, তারা আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল। আমার পরিবারকে বাঁচাতে আমাকে রাতের অন্ধকারে শহর ছাড়তে হয়েছিল। আমি তোমাকে জানালে তুমি আমার সাথে আসতে চাইতে, নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করতে, হয়তো ওই গুন্ডাদের হাতে তোমার ক্ষতি হতো। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম বলেই তোমার জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম, সায়ন! আমি তোমাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারিনি!"

অদিতির প্রতিটি শব্দে জমে থাকা পাঁচ বছরের যন্ত্রণা সায়নের কানে গিয়ে আছড়ে পড়ল। সায়ন স্তব্ধ হয়ে অদিতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অদিতির চোখের পানির ফোঁটাগুলো সায়নের হাতে এসে পড়ছে।

"তুমি আমার জীবন বাঁচাতে গিয়ে আমাকে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে দিলে, অদিতি?" সায়নের গলাটা এবার একদম ভেঙে গেল। ওর স্বরের সেই কৃত্রিম কঠোরতা মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। "তুমি ভেবেছ তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ? তুমি আমাকে প্রতিদিন মেরেছ।"

অদিতি সায়নের কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকালো। সায়নের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস অদিতির ঠোঁটে এসে পড়ছে। কত শত শত দিন, কত হাজার পথ চলার পরে এই দুটি প্রাণ আবার এত কাছাকাছি এসেছে। সায়নের হাত দুটো কাঁপছিল, ও অদিতির কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে ধরে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।

সায়নের শক্তিশালী বাহুডোরে অদিতি নিজেকে সঁপে দিল। সায়ন নিজের মাথাটা অদিতির কাঁধে লুকিয়ে কেঁদে উঠল—এক অবরুদ্ধ, দীর্ঘদীঘল কান্না, যা পাঁচ বছর ধরে ওর বুকের ভেতর জমে বরফ হয়ে ছিল। সায়নের চোখের পানিতে অদিতির নীল শাড়ির কাঁধ ভিজে যেতে লাগল।

"আমি অনেক চেষ্টা করেছি অদিতি... আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমাকে ঘৃণা করার," সায়ন অদিতির পিঠে হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে কেঁদে কেঁদে বলল। "কিন্তু আমি পারিনি। প্রতিদিন এই বুকে শুধু তোমার নামটাই বেজেছে। তুমি কেন ফিরে এলে? কেন আমার এই সাজানো নিঃসঙ্গতা নষ্ট করলে?"

অদিতি সায়নের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ওর কানে কানে বলল, "আমি এসেছি তোমার ওই দেয়ালটা ভাঙতে, সায়ন। তোমার জমে থাকা সব কান্না ধুয়ে দিতে। আর কখনো আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না, মিছে কোনো বিপদের ভয়েও না।"

বুড়িগঙ্গার বুক ছুঁয়ে আসা মেহগনি বাতাসের সাথে ভেসে গেল দুজন মানুষের নিরব হাহাকার। সায়নের বরফের দেয়ালটায় আজ বড় একটা ফাটল ধরেছে, কিন্তু অদিতির বুকে জমা থাকা ভালোবাসার আগুনে সেই বরফ কি পুরোপুরি গলবে? নাকি পাঁচ বছরের এই ক্ষত সম্পর্কের গাছে আবার নতুন কোনো ঝড় নিয়ে আসবে?

বুড়িগঙ্গার ছাদ থেকে নেমে আসার পর চারদিন কেটে গেছে। সেই বিকেলে সায়নের ভেঙে পড়া আর অদিতির কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে ফেলার পর যেন ওদের মধ্যকার অদৃশ্য দেয়ালটার অনেকটা বরফ গলে গিয়েছিল। কিন্তু ভালোবাসা তো কেবল আবেগের ঝড় নয়, পাঁচ বছরের জমে থাকা ক্ষত আর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াটা অনেক কঠিন।

সায়ন আগের চেয়ে খানিকটা সহজ হলেও অদিতির সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এখনো একপ্রকার দূরত্ব বজায় রাখছিল। ও অদিতির ফုန်း ধরত, কথা বলত, কিন্তু কোথাও যেন এক সংশয় ওকে তাড়া করে বেড়াত—অদিতি আবার কোনো বিপদে পড়ে ওভাবে হুট করে হারিয়ে যাবে না তো?

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অদিতি সায়নের ফ্ল্যাটে গেল। ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের এক পুরোনো ভবনের তিনতলায় একা থাকে সায়ন। ঘরটায় ঢুকতেই অদিতির বুকটা হাহাকার করে উঠল। ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো, ধুলোর আস্তর পড়েছে অনেক জায়গায়। টেবিলে ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্লু-প্রিন্ট আর ফাইলের স্তূপ। সায়ন এখন দেশের এক নামকরা অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ডিজাইনার।

অদিতি নীরবে ঘরটা গুছাতে শুরু করল। পর্দাগুলো টেনে দিতেই বারান্দার সতেজ বাতাস ঘরে ঢুকল। ও যখন সায়নের পড়ার টেবিলটা পরিষ্কার করছিল, তখন ড্রয়ারের এক কোণে একটা কালো বাঁধানো ডায়েরি দেখতে পেল।

ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতেই অদিতির হাত কেঁপে উঠল। প্রতিটা পাতায় কেবল একটা নাম—'অদিতি'। তারিখ ধরে ধরে সায়ন গত পাঁচ বছরের প্রতিটি দিনের অনুভূতি লিখে রেখেছে।
“আজ ১৬ই আগস্ট। তিন বছর হলো ও নেই। আজ ধানমন্ডির লেকে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। অদিতি, তুমি কি কোথাও ভিজছ? নাকি আমাকে একা ভিজতে দিয়ে ভালো আছ?”
“আজ ২৩শে নভেম্বর। চার বছর চার মাস। শহরের সবাই হাসছে, শুধু আমার ভেতরটা মরুভূমি। অদিতি, তুমি ফিরে এলে আমি হয়তো তোমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদব, কিংবা কিছুই বলব না। কারণ আমার ভালোবাসার প্রকাশ তো তুমি কেড়ে নিয়েছ।”

ডায়েরির পাতাগুলো অদিতির চোখের পানিতে ভিজে যেতে লাগল। ও বুঝতে পারল, সায়নের এই নীরবতা, এই বাহ্যিক কঠোরতা আসলে ওর আত্মরক্ষার শেষ বর্ম ছিল। ও নিজেকে ভেতরে ভেতরে কতটা দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করেছে, তা এই ডায়েরি না দেখলে অদিতি কোনোদিন জানতে পারত না।

ঠিক তখনই দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো। সায়ন ঘরে ঢুকল। গায়ে অফ-হোয়াইট শার্ট, হাতে কিছু কেনাকাটার ব্যাগ। অদিতিকে ওর পড়ার টেবিলে ডায়েরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সায়ন থমকে গেল।

সায়নের চোখের দৃষ্টি আবার কঠোর হয়ে উঠল, কিন্তু সেই কঠোরতার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর লজ্জা আর উন্মুক্ত হয়ে পড়ার ভয়।

"তুমি অন্যের অনুমতি ছাড়া আমার ড্রয়ার খুললে কেন, অদিতি?" সায়নের গলা শান্ত হলেও ভেতরে এক তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

অদিতি ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরে সায়নের দিকে হেঁটে এল। "এগুলো কী, সায়ন? তুমি প্রতিদিন আমার জন্য এভাবে তিলে তিলে জ্বলেছ? আর মুখে বলতে তুমি আমাকে ভুলে গেছ?"

সায়ন ব্যাগগুলো টেবিলে রেখে অদিতির কাছ থেকে ডায়েরিটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। "ওগুলো অতীত! অতীতের ভুলগুলো জমে থাকা কিসসা! ওসবের কোনো অর্থ নেই।"

"অর্থ নেই?" অদিতি সায়নের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। "তোমার এই রক্তক্ষরণের কোনো অর্থ নেই? সায়ন, তুমি আমাকে শাস্তি দাও, আমাকে যা খুশি বলো, কিন্তু নিজের এই যন্ত্রণা আর লুকিয়ে রেখো না। আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি কতটা ভেঙে পড়েছ!"

সায়ন ডায়েরিটা টানের সাথে হাত থেকে ফেলে দিল। কাঠের মেঝেতে ডায়েরিটা পড়ে সশব্দে ছড়িয়ে গেল।

"হ্যাঁ! ভেঙে পড়েছি!" সায়ন চিৎকার করে উঠল। ওর চোখের ভেতরে এক তীব্র যন্ত্রণা ফুটে উঠল। "আমি ভেঙে পড়েছি কারণ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তুমি সত্যি ফিরে এসেছ! আমি প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে পারি না, অদিতি! আমার মনে হয় এই বুঝি সকাল হবে আর আমি দেখব তুমি আবার নেই! তুমি আমার জীবনটাকে একটা ধোঁকা বানিয়ে দিয়েছ। আমি তোমাকে ক্ষমা করতে চাই, তোমাকে জড়িয়ে ধরে আমার সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিতে চাই... কিন্তু আমার ভেতরের সেই ভীতি আমাকে থামিয়ে দিচ্ছে। যদি তুমি আবার চলে যাও?"

সায়নের এই আকুলতায় অদিতির বুক ভেঙে গেল। অদিতি এক মুহূর্তও দেরি না করে সায়নের গলার দুপাশে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল।

সায়ন সরার সুযোগ পাওয়ার আগেই অদিতি সায়নের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

পাঁচ বছরের সমস্ত বিচ্ছেদ, অশ্রু, নিঃসঙ্গতা আর যন্ত্রণার এক তীব্র প্রলয় যেন সেই স্পর্শে মিশে গেল। সায়ন প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই ওর এতদিনের জমে থাকা সমস্ত বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সায়ন অদিতিকে তীব্র ভালোবাসায় নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল। ওর শক্ত হাতের বাঁধনে অদিতি অনুভব করল সায়নের সেই হারিয়ে যাওয়া আকুলতা, সেই অপ্রকাশিত গভীর ভালোবাসা।

সায়নের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আর ভিজে যাওয়া গাল অদিতির চেহারায় আছড়ে পড়ছিল। সায়ন অদিতির কপালে, গালে পরম অনুরাগে চুমু দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে আর কখনো ছেড়ে যেও না, অদিতি... আমি সত্যি সত্যি মরে যাব।"

অদিতি সায়নের বুক জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "কখনো না, সায়ন। মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই আমাকে তোমার কাছ থেকে আলাদা করতে পারবে না।"

ঘরের ভেতরের সেই নীরবতায় কেবল দুটো মানুষের হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পাঁচ বছর ধরে যে ভালোবাসার আলো নিভে গিয়েছিল, আজ তা আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে।

কিন্তু সুখের এই মায়াবী অধ্যায়ের মাঝেই হঠাৎ সায়নের ফোর বাজল। ফোনের স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর ভেসে উঠছিল। সায়ন ফোনটা ধরতেই ওপাশের কথা শুনে ওর মুখের রঙ বদলে যেতে লাগল।

সায়ন অদিতির দিকে তাকাল—সেই চোখে আবার ফিরে এল এক অজানা শঙ্কা আর দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। অদিতি বুঝতে পারল, ওদের অতীত কেবল ক্ষমা আর ভালোবাসায় শেষ হয়নি, এমন কোনো অধ্যায় এখনো বাকি আছে যা ওদের এই নতুন ভালোবাসাকে আবারও পরীক্ষার মুখে ফেলে দিতে চলেছে।

সায়নের হাত থেকে ফোনটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো। ফোনের ওপাশের ভারী গলার আওয়াজটা অদিতির কানেও পৌঁছাল না, কিন্তু সায়নের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে ওর বুকের ভেতরটা অচেনা আতঙ্কে কেঁপে উঠল।

সায়ন ফোনটা পকেটে রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অদিতির মুখোমুখি হয়ে ওর দু হাত নিজের হাতের তালুতে নিয়ে শক্ত করে ধরল।

"কার ফোন ছিল, সায়ন?" অদিতির গলা কাঁপছিল। "কী হয়েছে?"

সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অদিতির চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো সংশয় বা অভিমান নেই, আছে কেবল অদিতিকে রক্ষা করার এক তীব্র অঙ্গীকার।

"পাঁচ বছর আগে যে মানুষগুলোর ভয়ে তোমার বাবা দেনার দায়ে শহর ছেড়ে পালিয়েছিলেন, তাদের একজন আজ আমাকে ফোন করেছিল," সায়ন শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল। "ওরা জানত না তুমি কোথায় আছ। কিন্তু তুমি ঢাকায় ফিরে আমার সাথে দেখা করতে শুরু করার পর থেকেই ওরা তোমার ওপর নজর রাখছিল। আজ ওরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলল, তোমার বাবার পুরোনো ঋণের হিসেব নাকি তোমাকেই মেটাতে হবে, নয়তো..."

অদিতির শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। পাঁচ বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি আবার ওর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল—রাতের অন্ধকারে বাড়ি ছেড়ে পালানো, গুন্ডাদের ক্রমাগত হুমকি আর পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অদিতি ভয়ে সায়নের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল।

"সায়ন, তুমি আবার বিপদে পড়ে যাবে!" অদিতি আকুল হয়ে কেঁদে উঠল। "ওরা খুব বিপজ্জনক লোক। আমি কালই ঢাকার বাইরে চলে যাব। আমি তোমার জীবনে আবার কোনো ঝড় আসতে দেব না!"

সায়ন এক ঝটকায় অদিতিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকের ধুকপুকানি অদিতির গালে আছড়ে পড়ছিল।

"পাঁচ বছর আগে তুমি আমায় না বলে পালিয়ে গিয়ে আমাকে বাঁচাওনি, অদিতি," সায়ন অদিতির চুলে নিজের মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল। "বরং আমাকে এক জ্যান্ত শ্মশানে ফেলে রেখে গিয়েছিলে। কিন্তু আজ সায়ন আর আগের সেই দুর্বল ছেলেটা নেই। এই পাঁচ বছরে আমি নিজেকে এমনভাবে তৈরি করেছি যাতে আমার ভালোবাসাকে কাড়তে এলে যে কাউকে চরম মূল্য দিতে হয়। এবার আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না।"

সায়ন অদিতির চোখের পানি নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তারপর অদিতির কপালে পরম ভালোবাসায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। সেই চুম্বনে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল এক অটুট বিশ্বাসের উষ্ণতা।

পরদিন সকালে সায়ন একা সেই লোকগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। ও পাঁচ বছর আগের মতো আবেগের বশে ভুল করার মানুষ এখন আর নয়। সায়ন ওর পরিচিত এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এবং নিজস্ব আইনি দলের সাহায্যে সেই ঋণখেলাপী অপরাধী চক্রটির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সায়নের বুদ্ধিমত্তা আর সাহসের কাছে সেই চক্রটি নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়, কারণ সায়ন প্রমাণ করে দেয় যে অদিতির বাবার থেকে দাবিকৃত অর্থটা সম্পূর্ণ অবৈধ ও তোলাবাজির সামিল ছিল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অদিতির জীবনের ওপর ঝুলে থাকা সমস্ত কালো মেঘ কেটে গেল। যে অতীতের ভয়ে ও পাঁচ বছর ঘরছাড়া হয়েছিল, সায়ন নিজের শক্তি দিয়ে সেই অতীতকে চিরতরে ধুলোয় মিশিয়ে দিল।

এক মাস পরের এক মেঘলা বিকেল।

ধানমন্ডি লেকের উত্তর পাড়ের সেই পুরোনো কদম গাছটার নিচে ছাতা বন্ধ করে বসে আছে সায়ন আর অদিতি। হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছে। অদিতির পরনে একটা লাল-নীল মেশানো শাড়ি, মাথাটা সায়নের চওড়া কাঁধে রাখা। সায়নের এক হাত অদিতির কোমর পেঁচিয়ে রাখা, অন্য হাত দিয়ে ও অদিতির আঙুলের সাথে নিজের আঙুল পেঁচিয়ে ধরে আছে।

পাঁচ বছর আগে এই জায়গাটাতেই ওদের বিচ্ছেদ ঘটেছিল। এই কদম গাছটাই সাক্ষী ছিল সায়নের নিঃশব্দ কান্নার, সায়নের তুলে নেওয়া সেই বরফশীতল অদৃশ্য দেয়ালের। কিন্তু আজ সেই একই গাছের নিচে বসে থাকা সায়নের মুখে কোনো বিষাদ নেই। ওর চোখে এখন ফুটে উঠেছে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।

"জানো সায়ন," অদিতি সায়নের হাতের ওপর নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, "আমি ভেবেছিলাম তোমার ভেতরের সেই পাথর হয়ে যাওয়া সায়নকে আমি হয়তো কোনোদিন আর খুঁজে পাব না। তোমার ওই বরফের দেয়ালটা আমার বুক ভেঙে চুরমার করে দিত।"

সায়ন অদিতির পানে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে পাঁচ বছর পর সেই পুরোনো সুন্দর হাসিটা ফিরে এসেছে—যে হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কেবল ভালোবাসার প্রাচুর্য।

সায়ন অদিতির মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল। বৃষ্টিতে অদিতির গাল দুটো ভিজে উঠেছে। সায়ন ধীরে ধীরে অদিতির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল। লেকের বাতাসের হিমশীতলতা ওদের এই গভীর, তৃষ্ণার্ত অনুরাগের কাছে হার মেনে গেল।

"সেই দেয়ালটা তো আমার ওপর তোমার অধিকারের দেয়াল ছিল, অদিতি," সায়ন অদিতির চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। "তুমি ছাড়া অন্য কেউ যেন আমার ভেতরে ঢুকতে না পারে, তাই আমি নিজেকে বন্ধ করে রেখেছিলাম। আমি জানতাম, যে মানুষটা আমার আত্মাকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল, সে একদিন না একদিন ফিরে এসে সেই দেয়াল ভাঙবেই।"

বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ল, কিন্তু আজ আর কারো পালিয়ে যাওয়ার তাড়া নেই। সায়নের বুকের ভেতর অদিতি খুঁজে পেয়েছে ওর জীবনের একমাত্র ঠিকানা, আর সায়নের পাঁচ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হয়েছে অদিতির পরম ভালোবাসায়।

কদম গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টুপটুপ করে লেকের পানিতে ঝরে পড়ছিল। দুটি ব্যাকুল হৃদয় পাঁচ বছরের বিরহ পেরিয়ে অবশেষে এক হয়ে গেল—এমন এক বন্ধনে, যা কোনো ঝড়, কোনো আঘাত আর কখনো ভাঙতে পারবে না।

....
👁 12