অহংকারের পতন ও প্রায়শ্চিত্ত

ঝুম বৃষ্টিতে ভিজছিল পুরান ঢাকার অলিগলি। ভিক্টোরিয়া পার্কের মোড়ে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা সাজিদের মেজাজ তখন চরম তুঙ্গে। পরনে তার ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট, যার চারপাশ ইতিমধ্যেই কাদার ছিটেয় একাকার। ঘড়িতে বাজে বিকেল চারটা বেজে ত্রিশ মিনিট। মেয়েটার আসার কথা ছিল বিকেল তিনটায়। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা ধরে এই অঝোর ধারায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু সাজিদ দাঁড়িয়ে আছে। তার রগের শিরাগুলো চোয়ালের টানে স্পষ্টভাবে ভেসে উঠছে। রাগ তার মেজাজের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। এই শহরে তার মতো একগুঁয়ে আর খিটখিটে ছেলে খুব কমই আছে, আর তার এই ধৈর্যের শেষ সীমানা পরীক্ষা করতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে হেনাই।

হুট করেই একটা হলুদ রিকশা এসে থামল সাজিদের ঠিক সামনে। রিকশার হুড তোলা, ভেতর থেকে লাল শাড়ি পরা একটা মেয়ে নেমে এল। মেয়েটির হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি, কপালে ছোট একটা টিপ আর ভেজা চুলগুলো পিঠে এলমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে কোনো আফসোস বা অনুশোচনা ছাড়াই সাজিদের দিকে তাকাল সে। ওই এক জোড়া হরিণচোখ, যার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত একঘেয়ে বিজয়ীর হাসি।

"দেড় ঘণ্টা, হেনা! দেড় ঘণ্টা ধরে আমি এই কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি! তোমার কি সময়ের কোনো জ্ঞান নেই? নাকি ভেবেছ আমি তোমার গোলাম, যখন ডাকবে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকব?" সাজিদের গলার স্বর বৃষ্টির শব্দ ভেদ করে গর্জে উঠল।

হেনা শান্ত হাতে নিজের ছাতাটা মেলল। সাজিদের দিকে একধাপ এগিয়ে এসে মুখটা কিছুটা বাঁকিয়ে বলল, "চিল্লাচ্ছ কেন? রাস্তাঘাটে মানুষ দেখছে না? আর আমি তো ইচ্ছা করে দেরি করিনি। জ্যাম ছিল। তোমার মতো তো আর আমার নিজস্ব বাইক নেই যে উড়ে চলে আসব!"

"মিথ্যা বলা বন্ধ করো!" সাজিদ তীব্র চোয়াল চেপে চেপে বলল। "তুমি দেড়টার সময় বাসা থেকে বের হয়েছ, আমি তোমার ছোট ভাইকে ফোন করেছিলাম। বাকি সময় কোথায় ছিলে? কার সাথে ছিলে?"

হেনার মুখে ফুটে থাকা হালকা হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার চোখ দুটোতে রাগের আগুন জ্বলে উঠল। সাজিদের এই এক অভ্যাস—সবকিছুতেই সন্দেহ করা আর নিজের মতো করে হিসেব মেলানো। হেনা এক পা পিছিয়ে গিয়ে বিষাক্ত এক হাসিতে বলল, "কার সাথে ছিলাম তাতে তোমার কী? তুমি আমার অভিভাবক নাকি? প্রতিদিনের এই জজের মতো জেরা আমার একদম পছন্দ না সাজিদ। তোমার এত সন্দেহ থাকলে আমার সাথে দেখা করতে এলে কেন?"

"কারণ আমি বোকা!" সাজিদ ঝটকা মেরে হেনার ছাতাটা সরিয়ে দিয়ে তার কবজি চেপে ধরল। চেপে ধরা হাতের জোর এতটাই বেশি ছিল যে হেনার কাঁচের চুড়িগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে শব্দ করে উঠল। "আমি বোকা বলেই প্রতিদিন তোমার এই ফালতু বাহানা সহ্য করি। তুমি কী ভাবো নিজেকে? তুমি যা খুশি তা-ই করবে আর আমি চুপচাপ মেনে নেব?"

হেনা তার হাত ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল, কিন্তু সাজিদের লোহার মতো শক্ত মুঠোর সামনে সে ব্যর্থ। ব্যথায় হেনার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে নামল, যদিও বৃষ্টির জলের কারণে তা আলাদা করা যাচ্ছিল না। সে সাজিদের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল, তাতে ছিল তীব্র অভিমান আর বিষ।

"হাত ছাড়ো সাজিদ," হেনার কণ্ঠস্বর এবার অস্বাভাবিক রকম নিচু এবং বরফের মতো ঠান্ডা। "আমার হাত ছাড়ো, নইলে আমি চিৎকার করে লোক জড়ো করব।"

"করো লোক জড়ো! দেখাও সবাইকে তোমার নাটক!" সাজিদ গর্জে উঠল ঠিকই, কিন্তু হেনার চোখের জল দেখে অবচেতনভাবেই তার হাতের বাঁধন কিছুটা ঢিলে হয়ে গেল।

সেই সুযোগে হেনা টান মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তার লাল হয়ে যাওয়া কবজিতে সাজিদের আঙুলের স্পষ্ট ছাপ পড়ে গেছে। সে কয়েক সেকেন্ড সাজিদের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে ভালোবাসার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের বিষাক্ত তীব্রতা। হেনা ধীর গলায় বলল, "তুমি মানুষ নও সাজিদ। তুমি একটা জল্লাদ। তোমার সাথে থাকা মানে নিজের আত্মসম্মান প্রতিদিন বিক্রি করা। আজ আমি বুঝে গেছি, তোমার সাথে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।"

"হ্যাঁ, সব দোষ তো আমারই!" সাজিদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "তুমি মহারানী, তুমি যা করবে সেটাই ঠিক। তোমার এই ঢং আর নিতে পারছি না আমি। তুমি কি চাও বলতো? দিনরাত আমাকে নাচাতে চাও?"

"আমি আর কিছুই চাই না," হেনা নিজের ভিজে যাওয়া আঁচলটা টেনে শক্ত করে ধরে ঘুরে দাঁড়াল। "আর কখনো আমার সামনে আসার চেষ্টা করবে না। আমার পথে পা বাড়ালে আমি কী করতে পারি তোমার জানা নেই।"

হেনা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বৃষ্টির মধ্যে কাদাপানি ছিটিয়ে সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল ভিক্টোরিয়া পার্কের ভেতরের গলির দিকে।

সাজিদ দাঁড়িয়ে রইল একা। রাগে তার সারা শরীর রি রি করছে। সে চাইলেই হেনার পেছনে ছুটে গিয়ে তাকে আটকে দাঁড় করাতে পারত, কিন্তু তার অহংকার তাকে বাধা দিল। নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে সে সজোরে আছাড় মারল রাস্তার জমে থাকা জলের মধ্যে। স্ক্রিনটা চুরমার হয়ে গেল।

"ভেবেছ আমি তোমার পেছনে ঘুরব? কখনো না! হেনা, তুমি নিজেকে কী ভাবো আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব!" বিড়বিড় করে নিজেকেই শাপশাপান্ত করতে লাগল সাজিদ।

কিন্তু হেনা যত দূরে যাচ্ছিল, সাজিদের বুকের ভেতরের খালি জায়গাটা ততটাই তীব্রভাবে জ্বলে উঠছিল। এটা ভালোবাসা না অত্যাচার, সে নিজেও জানে না। কিন্তু হেনা ছাড়া তার চলে না, আবার হেনাকে সহ্য করাও তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ওদিকে গলির মোড়ে এসে একটা বন্ধ দোকানের চালার নিচে দাঁড়াল হেনা। শরীর ভিজছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ভিজছে তার ভেতরটা। সাজিদের তীব্র ভালোবাসা আর এই ভয়ঙ্কর অধিকারবোধ—দুটোই তাকে দিন দিন শেষ করে দিচ্ছে। আজ বিকেলে হেনা সত্যি সত্যি দেরি করেছিল কারণ সে সাজিদের জন্য একটা বিশেষ উপহার কিনতে গিয়ে আটকে পড়েছিল। সাজিদের প্রিয় ব্র্যান্ডের একটা হাতঘড়ি কেনার জন্য সে দুই ঘণ্টা ধরে নিউমার্কেটের দোকান ঘুরেছে। কিন্তু সাজিদ তাকে কোনো কথা বলার সুযোগই দিল না। সরাসরি সন্দেহ, সরাসরি আঘাত।

হেনা তার ব্যাগ থেকে ছোট লাল রঙের উপহারের বাক্সটা বের করল। ভিজে কিছুটা নরম হয়ে গেছে বাক্সটা। সে একঝলক বাক্সের দিকে তাকাল, তারপর এক তীব্র আক্রোশে আর অভিমানে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিল পাশের ড্রেনের কালো পানির মধ্যে।

"তুমি আমার উপহারের যোগ্য নও সাজিদ," হেনা ফিসফিস করে বলল। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে তার। "তুমি শুধু আঘাত করতেই জানো। কিন্তু আমিও হেনা, তোমাকে এত সহজে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি আমি দেব না। তোমাকে কাঁদাব আমি, ঠিক যতটা তুমি আমাকে আজ কাঁদালে।"

ঝুম বৃষ্টি তখনও থামেনি। ঢাকা শহরের এই বিষাক্ত মেঘলা আবহাওয়ার নিচে দুটো মানুষ নিজের নিজের ক্ষোভ আর অভিমান বুক চেপে ধরে আলাদা দুটি অভিমুখে হেঁটে চলে গেল। সম্পর্কটা যে সাধারণ নয়, তা দুজনেই জানে। একে অপরকে ভালোবেসে ধ্বংস করার এই খেলা কেবল শুরু হলো।

মাথার ওপর মেঘের ঘনঘটা আরও বাড়ল। সাজিদ বাইকটা স্টার্ট দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে ছুটে চলল ভেজা রাস্তা ধরে। হেনা একটা চলতি সিএনজিতে উঠে বসল, যার পেছনের কাঁচে লেখা—'ভালোবাসা এক বিষাক্ত বিষ'।

দুজন মানুষের মধ্যে দূরত্বের দেয়ালটা আজ এক ধাক্কায় অনেক উঁচুতে উঠে গেল। কিন্তু এই নীরবতা যে ঝড়ের আগের পূর্বাভাস, তা বোঝার মতো মানসিক অবস্থা তখন কারও ছিল না। আজ রাতে কেউই ঘুমোবে না, আজ রাতে কেবল দুটো ভিন্ন ঘরে জন্ম নেবে প্রতিশোধ আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

একটানা তিনদিন কেটে গেছে। কোনো যোগাযোগ নেই। সাজিদের চূর্ণ-বিচূর্ণ ফোনটা এখনও ড্রয়ারের কোণে পড়ে আছে। নতুন ফোন কিনেছে ঠিকই, কিন্তু হেনার নম্বরটা মুখস্থ থাকা সত্ত্বেও সে ডায়াল করেনি। অহংকার তাকে শক্তভাবে আটকে রেখেছে। কিন্তু এই তিনটে দিন সাজিদের কাছে ছিল নরকযন্ত্রণা তুল্য। রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। চোখ বন্ধ করলেই মনে পড়ে যায় ঝুম বৃষ্টির মধ্যে হেনার সেই বিষাক্ত, শান্ত কণ্ঠ—'তুমি মানুষ নও সাজিদ, তুমি একটা জল্লাদ।'

কথাটা কাঁচের টুকরোর মতো সাজিদের বুকের ভেতর বিঁধে আছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সে সারাদিন ধানমন্ডির লেকের পাড়ে বসে থাকে, চেইন স্মোকারদের মতো একের পর এক সিগারেট ফুঁকে আর হেনার কথা ভাবে। প্রতিদিনের অভ্যাস অনুযায়ী মেয়েটা একবারও ফোন দিল না? এত বড় সাহস?

অন্যদিকে হেনার অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়। সাজিদ ভেবেছিল হেনা হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরে কেঁদে কেটে ভাসাবে, কিন্তু হেনা অন্য ধাতুতে গড়া। সেও নিজের জিদ ধরে রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে গিয়ে সে স্বাভাবিক থাকার ভান করে, বন্ধুদের সাথে হেসে কথা বলে, কিন্তু ভেতরের রক্তক্ষরণ থামে না। সাজিদ একবারও তার খোঁজ নিল না, একটা বার ক্ষমা চাইল না—এই অভিমান তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।

চতুর্থ দিন বিকেলে সাজিদ আর সহ্য করতে পারল না। তার ভেতরের সন্দেহ আর একগুঁয়েমি তাকে চালনা করতে লাগল। সে নিজের অ্যাপাচি বাইকটা স্টার্ট দিয়ে সোজা চলে এল হেনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। হেনা তখন ক্লাস শেষে লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে তার এক সহপাঠী—রিয়াদের সাথে হেসে হেসে কথা বলছিল।

দূর থেকে দৃশ্যটা দেখেই সাজিদের মাথার রগ দগদগ করে উঠল। চোখ লাল হয়ে এল তার। গাড়ি থেকে নেমে সে হনহন করে এগিয়ে গেল তাদের দিকে।

"হেনা!" সাজিদের হুংকারে আশপাশের দু-চারজন শিক্ষার্থী চমকে তাকাল।

হেনা চমকাল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে নিজের মুখের ভাব স্বাভাবিক করে নিল। চোখের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি খেলে গেল তার, কিন্তু পর মুহূর্তেই তা ঢেকে ফেলল চরম শীতলতায়। সে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল, "রিয়াদ, তুমি যাও। আমি কাল নোটসগুলো নিয়ে নেব।"

রিয়াদ কিছুটা সংশয় নিয়ে সাজিদের দিকে তাকাল। সাজিদের চেহারা তখন আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রিয়াদ আর দাঁড়াল না, দ্রুত সটান হেঁটে চলে গেল।

হেনা শান্ত ভঙ্গিতে হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে দাঁড়াল। "এখানে কী করছ তুমি? আর এভাবে চিল্লাচ্ছ কেন?"

"ও কে?" সাজিদ হেনার একেবারে কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, যার মধ্যে ছিল মারাত্মক বিষাক্ততা। "ওই ছেলের সাথে এত কীসের হাসি-ঠাট্টা? এইজন্যই তাহলে আমার ফোন ধরছিলে না? নতুন কেউ জুটে গেছে?"

হেনার মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে সাজিদের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। "আমার জীবনে কে আসবে আর কে যাবে, তা নিয়ে তো তোমার মাথা ব্যথার কথা না। তুমিই তো বলেছিলে আমি ঢং করি, আমার কোনো আত্মসম্মান নেই। তাহলে এখানে কেন এসেছ?"

"প্রশ্নের উত্তর দাও হেনা! এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না!" সাজিদ এক হাত বাড়িয়ে হেনার কাঁধ চেপে ধরতে চাইল, কিন্তু হেনা চট করে পিছিয়ে গেল।

"হাত দেবে না একদম!" হেনা গর্জে উঠল। "তোমার এই জোর খাটার দিন শেষ সাজিদ। তুমি ভেবেছ তুমি রাগ দেখাবে, আমার গায়ে হাত তুলবে আর আমি প্রতিবার তোমার পায়ে এসে পড়ব? অতটা সস্তা ভাবো আমাকে?"

"আমি সস্তা ভাবি না, কিন্তু তুমি আমাকে পাগল বানাচ্ছ!" সাজিদ নিজের চুল খামচে ধরল। তার কণ্ঠে এবার রাগের সাথে মেশানো ছিল চরম ব্যাকুলতা। "তিনদিন ধরে আমি ঘুমাইনি হেনা! আমি মরে যাচ্ছি ভেতরে ভেতরে! আর তুমি এখানে অন্য ছেলেদের সাথে হেসে হেসে আড্ডা দিচ্ছ? তোমার বুক কাঁপে না?"

"না, কাঁপে না," হেনা মুখের উপর বয়ে যাওয়া এক গোছা চুল পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল। "কারণ তুমি আমাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছ। তোমার সন্দেহ, তোমার অনিয়ন্ত্রিত রাগ—এগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। তুমি আমাকে ভালোবাসো না সাজিদ, তুমি আমাকে বন্দি করে রাখতে চাও। ওটা ভালোবাসা নয়, ওটা একটা রোগ!"

"রোগ?" সাজিদ থমকে গেল। তার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তেই অহংকার আবার তার ওপর ভর করল। সে হিংস্র হেসে বলল, "হ্যাঁ, রোগ! আর এই রোগের ওষুধ তুমি। তুমি যদি ভেবে থাকো আমাকে এভাবে তিলে তিলে মেরে ফেলে তুমি অন্য কারও সাথে শান্তিতে থাকবে, তবে তোমার ধারণা ভুল। আমি তোমাকে সুখে থাকতে দেব না হেনা। প্রয়োজন হলে আমি নিজেকে শেষ করব, তোমাকেও শেষ করব!"

হেনা এক মুহূর্ত সাজিদের দিকে তাকিয়ে রইল। সাজিদের এই চরম পাগলামি তাকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতর একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া হলো। এই হিংস্রতা, এই অধিকারবোধ—এত যন্ত্রণা দেওয়ার পরও কেন জানি এটাই সাজিদের প্রতি তার টান। হেনা বুঝতে পারে, তারা দুজনই অসুস্থ। দুজনের এই সম্পর্কের কেমিস্ট্রিটাই বিষাক্ত।

হেনা সোজা হয়ে দাঁড়াল। "আমাকে হুমকি দিচ্ছ?"

"হুমকি নয়, সতর্কবার্তা," সাজিদ বাইকের চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল। "আজ রাত আটটায় তোমার ধানমন্ডির সেই প্রিয় রেস্তোরাঁয় আসবে তুমি। আমি অপেক্ষা করব। যদি না আসো... তবে কাল সকালে আমার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পাবে। সিদ্ধান্ত তোমার।"

কথাটা বলেই সাজিদ হেনার কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের বাইকে গিয়ে বসল। বিকট শব্দে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে সে তীরের মতো ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেল।

হেনা দাঁড়িয়ে রইল নিথর হয়ে। তার চোখ দুটো নোনা জলে ঝাপসা হয়ে এসেছে। সাজিদের প্রতি তার চণ্ড অভিমান, গলার ভেতর জমে থাকা রাগ—সবকিছু এক মুহূর্তেই ভয়ে রূপান্তরিত হলো। ছেলেটা সব করতে পারে। তার রাগের মাথার কোনো ঠিক নেই।

"কেন এমন করো তুমি সাজিদ?" হেনা নিজের মনেই বিড়বিড় করল। বিকেলের রোদ তখন মরে আসছে, আকাশে কালো মেঘ জমেছে আবার। ঢাকা শহরের ইট-কাঠের জঙ্গলে দুটো পথভ্রষ্ট আত্মা আবার এক ভয়ঙ্কর মুখোমুখি সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হেনা জানে, সে আজ রাতে যাবে। না গিয়ে তার উপায় নেই। কারণ সাজিদকে শাস্তি দেওয়ার আগেই যদি সে সাজিদকে হারিয়ে ফেলে, তবে তার নিজের বেঁচে থাকারও আর কোনো অর্থ থাকবে না।

রাত ঠিক আটটা। ধানমন্ডির সেই নিরিবিলি রেস্তোরাঁটার এক কোণে বসে ছিল সাজিদ। টেবিলের ওপর দুটো কফির কাপ ধোঁয়া ছাড়ছে, কিন্তু সেগুলোর দিকে কারও খেয়াল নেই। হেনা এসেছে ঠিক সময়েই, কিন্তু তার মুখে জমাট বেঁধে আছে অমাবস্যার অন্ধকার।

সাজিদ কিছুটা শান্ত হওয়ার ভান করে হেনার হাতটা টেবিলের ওপর থেকে ধরতে গেল, কিন্তু হেনা ঝটকা মেরে হাত টেনে সরিয়ে নিল।

"হাত ছোঁবে না সাজিদ। আমি তোমার ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে এখানে এসেছি, কোনো প্রেম নিবেদন শুনতে আসিনি।" হেনার গলার আওয়াজ কাঁচের মতো ধারালো।

সাজিদের চোখের কোণে আবার আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। তার ইগোতে মারাত্মক আঘাত লেগেছে। সে সামনের কফির কাপটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঝুঁকে বসল হেনার দিকে। "ব্ল্যাকমেইল? আমি তোমাকে ভালোবেসে ডেকেছি, হেনা। কিন্তু তোমার এই অহংকার আমার বরদাশত হচ্ছে না।"

"ভালোবাসা?" হেনা একটা বিষাক্ত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "যে ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই, যে ভালোবাসায় প্রতিদিন আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়, ওটা ভালোবাসা নয় সাজিদ। ওটা একটা মানসিক ব্যাধি! তুমি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাও। আমি কার সাথে কথা বলব, কোথায় যাব, কী পরব—সব তোমার নির্দেশে চলতে হবে? আমি তোমার কোনো কেনা গোলাম নই!"

সাজিদ টেবيله সজোরে একটা ঘুষি মারল। পাশের দু-তিনটে টেবিল থেকে মানুষজন ঘুরে তাকাল। সাজিদ সেদিকে তোয়াক্কা না করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "আমি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না! কিন্তু আমি সইতে পারি না যখন অন্য কোনো পুরুষ তোমার দিকে তাকায়! তোমাকে হাজারবার বলেছি, ওই রিয়াদের সাথে আমার কোনোদিন বনিবনা হয়নি, আর তুমি জেনেশুনে ওর সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলে? তুমি ইচ্ছা করে আমাকে জ্বালাও হেনা, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাও!"

হেনা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সাজিদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে ব্যাগ থেকে একটা কাগজের খাম বের করে সাজিদের দিকে ছুঁড়ে দিল।

"এটা কী?" সাজিদ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।

"খুলে দেখো," হেনার গলায় গভীর হতাশা।

সাজিদ খামটা খুলে দেখল ভেতরে নিউমার্কেটের একটা ঘড়ির দোকান থেকে কেনা মানি রিসিট। তারিখটা সেই ঝুম বৃষ্টির দিনের—যেদিন তাদের বিশাল ঝগড়া হয়েছিল। সেখানে লেখা, হেনা দেড় ঘণ্টা ধরে দোকানে অপেক্ষা করে সাজিদের পছন্দের হাতঘড়িটা অর্ডারে তৈরি করিয়েছিল।

সাজিদ থমকে গেল। তার মুখের কঠোর ভাবটা এক মুহূর্তে উবে গেল।

হেনা চোখের জল সামলে নিয়ে বলল, "ঐদিন আমার দেরি হয়েছিল কারণ আমি তোমার জন্য ওই সারপ্রাইজটা তৈরি করছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তোমার জন্মদিনের আগে তোমাকে এই বিশেষ উপহারটা দেব। কিন্তু তুমি? তুমি আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিলে না। সরাসরি কাদা ছিটালে আমার চরিত্রের ওপর! ড্রেনের পানিতে ফেলে দিয়ে এসেছি আমি ওই ঘড়িটা, যেমনটা তুমি ড্রেনে ফেলে দিয়েছ আমার আবেগ।"

সাজিদের বুকের ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে ধরল। অপরাধবোধের এক তীব্র ঢেউ এসে ধাক্কা দিল তার অহংকারে। সে তোড়জোড় করে হেনার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। এবার হেনা আর ছাড়ানোর চেষ্টা করল না, কিন্তু তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

"হেনা... আমি... আমি জানতাম না," সাজিদের গলার স্বর কেঁপে উঠল। তার চিরচেনা সেই উগ্রতা মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও, প্লিজ। আমি সত্যি বুঝতে পারিনি।"

"ক্ষমা?" হেনা নিজের চোখ দুটো মুছল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে ছিল চরম স্থিরতা। "ক্ষমা চাইলেই কি সব আগের মতো হয়ে যায়? তোমার এই চটাং চটাং মেজাজ, গ গায়ে হাত তোলার উস্কানি, সন্দেহ—এগুলো প্রতিদিনের নাটক সাজিদ। তুমি ক্ষমা চাইবে, দুই দিন পর আবার একই কাজ করবে।"

"না! এবার আমি নিজেকে বদলাব, আমি কসম খাচ্ছি!" সাজিদ আকুল হয়ে বলল।

"তোমার কসমের কোনো দাম নেই আমার কাছে," হেনা উঠে দাঁড়াল। "আমি ক্লান্ত সাজিদ। তোমার এই বিষাক্ত প্রেম আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। আজ আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি।"

সাজিদও ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। "কীসের সিদ্ধান্ত?"

"আমি তোমার কাছ থেকে বিরতি চাই। কোনো ফোন নয়, কোনো দেখা করা নয়। আগামী এক মাস আমরা কেউ কারও সামনে আসব না।"

"না! সেটা সম্ভব না!" সাজিদ প্রায় চিৎকার করে উঠল। "আমি তোমাকে ছাড়া এক দিনও থাকতে পারি না, তুমি জানো তা!"

"থাকতে হবে," হেনা শক্ত কণ্ঠে বলল। "যদি এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ তুমি চাও, তবে আমাকে এই এক মাস সময় দাও। আর যদি এই সময়ের মধ্যে তুমি আমার পিছু নাও, তবে মনে রাখবে সাজিদ—তুমি আমাকে চিরতরে হারাবে।"

হেনা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সাজিদকে রেস্তোরাঁর মাঝখানে পাথর বানিয়ে রেখে সে হনহন করে বের হয়ে গেল।

সাজিদ ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার মাথা ঘুরছে। হেনার শেষ কথাগুলো তার কানে ঘণ্টার মতো বাজছে। এক মাস? হেনা ছাড়া এক মাস কাটানো তার জন্য মৃত্যুর চেয়েও কঠিন। কিন্তু এবার সে বুঝতে পারছে, হেনা রসিকতা করছে না। সে যদি নিজের ভেতরের এই বিষাক্ত উগ্রতা না কমায়, তবে সত্যি সত্যি হেনাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলবে।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। সাজিদ শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকাল। 

এক মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সময় যেন থমকে ছিল। সাজিদের জন্য এই ত্রিশটা দিন ছিল এক ভয়ঙ্কর আত্মদহনের দিন। সে হেনাকে দেওয়া কথা রেখেছিল—কোনো ফোন করেনি, ক্যাম্পাসের আশপাশে ঘুরঘুর করেনি। তবে নিজেকে বদলানোর এক মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছিল সে। রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য পেশাদার কাউন্সেলরের কাছে যাওয়া শুরু করেছে। নিজের ভুলগুলো প্রতিদিন ডায়েরির পাতায় লিখে সে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছে। যে অহংকার আর সন্দেহ তার চোখ অন্ধ করে রেখেছিল, সেগুলোকে সে একে একে ভুল প্রমাণ করতে শিখছিল।

তবে হেনার জন্য এই এক মাস শান্তিতে কাটেনি। সে ভেবেছিল সাজিদকে দূরে রাখলে সে মুক্ত বাতাস শ্বাস নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটল। যত দিন যাচ্ছিল, সাজিদের সেই উগ্র অধিকারবোধ, সেই আকুল চোখের চাহনি তার মনজুড়ে হাহাকার তৈরি করছিল। হেনা বুঝতে পারল, সাজিদ বিষাক্ত ঠিকই, কিন্তু সেই বিষের নেশাতেই সে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাজিদের চরম পাগলামির অন্তরালে যে নিঃশর্ত ভালোবাসা ছিল, তা অন্য কারও মধ্যে পাওয়া অসম্ভব।

আজ এক মাস পূর্তির দিন। সন্ধ্যার পর ধানমন্ডির লেকের পাড়ে হেনা একা বসে ছিল। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে কাঠের বেঞ্চে বসে সে ঝরা পাতার দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানত না সাজিদ আসবে কি না, কিন্তু তার বুকের ভেতর এক অজানা তোলপাড় চলছে।

হুট করেই একটা ছায়া এসে পড়ল হেনার ওপর। হেনা মুখ তুলে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাজিদ। মাত্র এক মাসে মানুষটা যেন অনেকটা বদলে গেছে। চোখের নিচে কালি, আগের সেই উদ্ধত আর রাগী ভাবটা চট করে চোখে পড়ে না। সেখানে জমা হয়ে আছে এক গভীর ক্লান্তি আর শান্ত করুণ ভাব।

"এক মাস হয়ে গেছে, হেনা," সাজিদের গলাটা কেমন যেন ভেঙে এলো।

হেনা চুপ করে রইল। সে সাজিদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার বুকের ধুকপুকানি দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

সাজিদ হেনার পাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে বেঞ্চে বসল। সে হাত বাড়িয়ে হেনাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল না, যা আগের সাজিদের স্বভাববিরুদ্ধ। সাজিদ পকেট থেকে একটা ছোট ডায়েরি বের করে হেনার কোলের ওপর রাখল।

"এটা কী?" হেনা নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

"আমার পাপের হিসাব," সাজিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "এই ত্রিশ দিনে আমি প্রতিদিন লিখেছি আমি কোথায় কোথায় তোমার সাথে অন্যায় করেছি। কোথায় কোথায় আমার উগ্র মেজাজ তোমাকে আঘাত করেছে। আমি চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছি হেনা। আমি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছি। আমার ভেতরের এই বিষাক্ত উগ্রতা আমি হটাতে চাই, শুধু তোমার জন্য।"

হেনা ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। প্রতিটা পাতায় সাজিদের হাতের লেখায় অনুশোচনা আর ভালোবাসার আকুতি স্পষ্ট। হেনার চোখের কোণে জল জমে উঠল।

সাজিদ হেনার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, "তুমি ঠিকই বলেছিলে, আমার ভালোবাসাটা একটা রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি তোমাকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে তোমার শ্বাস আটকে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে হারাতে পারব না। তুমি যদি এখনো আমাকে ক্ষমা করতে না পারো, আমি আবার অপেক্ষা করব। কিন্তু প্লিজ, আমার জীবন থেকে একদম চলে যেও না।"

হেনার অভিমানের বরফ গলে জল হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হেনার ভেতরে থাকা সেই বিষাক্ত ভালোবাসার খেয়াল চেপে বসল। সে ডায়েরিটা বন্ধ করে একপাশে রেখে দিল। তার মুখে ফুটল এক কঠিন ও রহস্যময় হাসি।

"তুমি ভাবছ এই এক মাসের ডায়েরি লিখে আর থেরাপিস্টের কাছে গিয়ে সব ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে সাজিদ?" হেনা উঠে দাঁড়াল।

সাজিদ চমকে উঠে দাঁড়াল। "হেনা... তুমি কী বলছ?"

"তুমি আমাকে এতদিন কষ্ট দিয়েছ, মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছ," হেনা সাজিদের বুকের ওপর এক আঙুল দিয়ে ধাক্কা দিল। "এখন আমার পালা। এত সহজে তোমাকে মুক্তি দেব না আমি। তুমি যদি আমাকে সত্যিই পেতে চাও, তবে তোমাকে আরও জ্বলতে হবে।"

সাজিদ থমকে গেল। সে হেনার চোখে কোনো ঘৃণা দেখল না, দেখল এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অধিকারবোধ। হেনা তাকে ছাড়বেও না, আবার এত সহজে আপনও করে নেবে না।

"তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব হেনা," সাজিদ হেনার দুটো হাত নিজের হাতে জড়িয়ে নিল। এবার সে উগ্র নয়, বরং ব্যাকুল। "তুমি আমাকে যত ইচ্ছা শাস্তি দাও, কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেও না।"

হেনা তার হাত সরাল না। সাজিদের ব্যাকুলতা তাকে এক অদ্ভুত মানসিক তৃপ্তি দিল। সে সাজিদের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "শাস্তির কেবল প্রথম ধাপ শেষ হলো, সাজিদ। আসল খেলা তো এবার শুরু হবে।"

রাতের আঁধারে ঢাকার লেকের পাড়ে বাতাস ভারী হয়ে এল। দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, কিন্তু তাদের সেই ভালোবাসার ধরণটাই ব্যাকুল, উগ্র আর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে ভরা। এক মাস পর তারা আবার কাছাকাছি এল ঠিকই, কিন্তু সেই পুরনো সম্পর্কের তীব্রতা আর অভিমানের ঝড় সাথে করেই আনল।

পরবর্তী কয়েকটা দিন সাজিদের জন্য হয়ে উঠল এক নতুন পরীক্ষা। হেনা তাকে নিজের ছন্দে নাচাতে শুরু করল। সাজিদ আগে যেভাবে হেনাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করত, হেনা এখন ঠিক সেই একই অস্ত্র প্রয়োগ করছে সাজিদের ওপর—তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কায়দায়। সে সাজিদকে ফোন করতে মানা করে, কিন্তু নিজে যখন ইচ্ছা তখন ফোন করে মাঝরাতে জাগিয়ে রাখে। সাজিদ একটুখানি রাগের আভাস দেখালেই হেনা শীতল গলায় মনে করিয়ে দেয়, "তোমার কিন্তু রাগ নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল, সাজিদ!"

সাজিদ নিজেকে প্রচণ্ড চাপে রাখছিল। সে সত্যি ভালোবাসে মেয়েকে, তাই হেনার এই মানসিক খেলা সে মুখ বুজে সহ্য করছিল। কিন্তু কতক্ষণ?

শুক্রবার দুপুরে ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে হেনা সাজিদকে ডেকে পাঠাল। সাজিদ নির্ধারিত সময়ের আধঘণ্টা আগেই পৌঁছে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। হেনা এলো আরও এক ঘণ্টা পর, কিন্তু একা নয়—তার সাথে সেই রিয়াদ।

সাজিদ বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। হেনার পাশে রিয়াদকে হাসিমুখে হাঁটতে দেখে তার ভেতরের ঘুমন্ত পশুটায় যেন আবার টান পড়ল। রগের শিরাগুলো উপচে ওঠার উপক্রম হলো, চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তবে চিকিৎসকের শেখানো নিয়ম মেনে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের উগ্রতা দমন করার প্রাণপণ চেষ্টা করল।

"হাই সাজিদ," হেনা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল। "রিয়াদের সাথে দেখা হয়ে গেল রাস্তায়, ও-ও এদিকেই আসছিল, তাই সাথে নিয়ে এলাম।"

রিয়াদ কিছুটা ইতস্তত করে বলল, "হাই সাজিদ। কেমন আছ?"

সাজিদ রিয়াদের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো যেন কাঁচের মতো ঠান্ডা ও ধারালো। সে শক্ত গলায় বলল, "ভালো। হেনা, আমার সাথে তোমার একা কথা ছিল।"

"আহা, অত তাড়া কিসের?" হেনা কৃত্রিম হেসে রিয়াদের দিকে তাকাল। "রিয়াদ, তুমি বসো না আমাদের সাথে। সাজিদ আজকাল খুব ভালো গল্প বলতে পারে।"

সাজিদ বুঝতে পারছিল হেনা ইচ্ছা করে তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। সে তাকে সেই পুরনো উগ্র সাজিদ বানাতে চায়, যাতে আবার সে আঙুল তুলতে পারে। কিন্তু সাজিদ এবার হেনার পাতানো ফাঁদে পা দিতে রাজি নয়।

সে হেনার দিকে একধাপ এগিয়ে গেল। রিয়াদকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সরাসরি হেনার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তুমি যা করার চেষ্টা করছ, আমি তা বুঝি হেনা। তুমি আমাকে পরীক্ষা করছ। কিন্তু অন্য কাউকে এই নাটকের মাঝখানে টেনে এনে তুমি ঠিক করছ না।"

হেনা চোখের ভ্রূ নাচালো। "কেন? ভয় পাচ্ছ নাকি সাজিদ? তোমার সেই আত্মবিশ্বাস কোথায় গেল?"

সাজিদ হেনার চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর সে হেনার কোনো তোয়াক্কা না করে রিয়াদের দিকে ঘুরল। সাজিদের কণ্ঠে এখন কোনো গর্জন নেই, কিন্তু এক ভয়ঙ্কর গম্ভীরতা আছে।

"রিয়াদ," সাজিদ শান্ত গলায় বলল। "তুমি ভালো ছেলেই মনে হয়। কিন্তু তুমি যদি এই মুহূর্তের মধ্যে এখান থেকে না যাও, তবে হেনা আর আমার মাঝের ঝামেলাটা তোমার ঘাড়ে এসে পড়বে। আর বিশ্বাস করো, তুমি সেটার মাঝে পড়তে চাও না।"

সাজিদের কথার ধরন আর চোখের স্থির চাহনি দেখে রিয়াদ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হেনার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, "হেনা, আমি পরে কথা বলব।" সে দ্রুত হেঁটে চলে গেল।

রিয়াদ চলে যেতেই হেনা রেগে উঠে বলল, "তুমি ওকে ভয় দেখালে কেন সাজিদ? তোমার এই অভ্যাস এখনো গেল না?"

"আমি কাউকে ভয় দেখাইনি," সাজিদ এক পা পিছিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল। "আমি শুধু ওকে সত্যিটা বললাম। আর তুমি, হেনা—তুমি আমার সাথে খেলা করছ। তুমি চাও আমি আবার চিল্লাই, তোমার গায়ে হাত তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করি, যাতে তুমি আমাকে আবার দোষী বানাতে পারো।"

হেনা থমকে গেল। সাজিদের এই ঠান্ডা প্রতিক্রিয়া সে আশা করেনি। সে ভেবেছিল সাজিদ রিয়াদের ওপর চড়াও হবে, চিৎকার করবে। কিন্তু সাজিদের এই অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণ হেনার ভেতরের অহংকারকে নাড়িয়ে দিল।

"তুমি নিজেকে খুব চালাক ভাবছ, তাই না?" হেনা ভেজা গলায় বলল, তার চোখে অভিমানের জল জমে উঠছে। "তুমি ভাবছ তুমি বদলে গেছ আর আমি নাটক করছি?"

"আমি বদলানোর চেষ্টা করছি হেনা, কিন্তু তুমি আমাকে বদলাতে দিচ্ছ না!" সাজিদ এবার তীব্র ব্যাকুলতায় বলে উঠল, তার গলার স্বর কিছুটা কাঁপছে। "তুমি আমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজে বিষাক্ত হয়ে উঠছ। এই খেলা আমাদের দুজনকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। তুমি কি সত্যি এটা চাও?"

হেনা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সাজিদের চোখের ভেতরের সেই অসহায়ত্ব আর গভীর ভালোবাসার আকুতি দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে সাজিদকে তিলে তিলে পোড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু দেখতে পাচ্ছে সেই আগুনে সে নিজেও পুড়ছে।

হেনা নিজের মুখটা দুই হাতে ঢেকে ফেলল। দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান, কষ্ট আর রাগের বাঁধ ভেঙে সে ফোঁপাতে শুরু করল।

সাজিদ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে হেনার কাছে এসে সজোরে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। হেনা এবার আর সরে গেল না, বরং সাজিদের শার্টটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠল।

"আমি তোমাকে ভালোবাসি হেনা," সাজিদ হেনার চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল। "কিন্তু আমাদের এই উগ্রতা থামাতেই হবে। নইলে আমরা কেউ বাঁচব না।"

উভয়ের বিষাক্ত প্রেমের আবর্তে এটি ছিল প্রথম এক টুকরো শান্তির স্পর্শ, কিন্তু তাদের ভেতরের ঝড় পুরোপুরি শান্ত হতে তখনও অনেকটা বাকি।

সেই বিকেলে ধানমন্ডির লেকে সাজিদের বুকে মাথা রেখে হেনার কান্না থামলেও, তাদের সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ভাঙন এত সহজে জোড়া লাগার ছিল না। ব্যাকুল ভালোবাসার পর মুহূর্তেই আবার নেমে আসে এক অজানা জড়তা। হেনা বুঝতে পেরেছিল সাজিদ সত্যি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তার নিজের ভেতরের যে ক্ষোভ আর অভিমান জন্মেছিল, তা তাকে সাজিদকে পুরোপুরি আপন করে নিতে বাধা দিচ্ছিল।

দুদিন পর, সাজিদ হেনাকে নিয়ে সোজা চলে গেল পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে, সদরঘাট এলাকায়। ঢাকার এই জায়গাটা সাজিদের খুব প্রিয়, কিন্তু হেনা ভিড় আর কোলাহল একদম পছন্দ করে না। সাজিদ হেনার হাত ধরে বুড়িগঙ্গার ওপর একটা ছোট্ট কাঠের নৌকায় গিয়ে বসল।

সূর্য তখন পাটে বসছে। বুড়িগঙ্গার পানিতে লালচে রোদের আলো ঠিকরে পড়ছে। হেনা শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে একপাশে চুপচাপ বসে রইল। সাজিদ তার উল্টো পাশে বসে হেনার বিষণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, "এখানে কেন এনেছি জানো?"

হেনা নদীর কালচে জলের দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বলল, "না। আর জানার ইচ্ছাও নেই। তুমি তো নিজের খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত নিতেই অভ্যস্ত।"

সাজিদ মুচকি হাসল। আগের সাজিদ হলে হয়তো এই কথায় আবার খেপে উঠত, কিন্তু এখন সে ধৈর্য ধরতে শিখেছে। সাজিদ পকেট থেকে একটা পুরনো ছোট্ট লাল রঙের প্লাস্টিকের বাক্স বের করে হেনার দিকে বাড়িয়ে দিল।

"এটা কী?" হেনা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।

"খুলে দেখো," সাজিদ বলল।

হেনা ধীরহাতে বাক্সটা খুলল। ভেতরে রয়েছে একটা খুব সাধারণ কাঁচের চুড়ি, যা মাঝখান থেকে ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছিল, আর সেটাকে আইসট্যাপ দিয়ে খুব যত্ন করে জোড়া লাগানো হয়েছে। হেনা থমকে গেল। এটা সেই ঝুম বৃষ্টির দিনের চুড়ি—যেদিন সাজিদ উগ্র হয়ে হেনার কবজি চেপে ধরেছিল আর হেনার হাতের চুড়ি ভেঙে গিয়ে রক্তারক্তি হয়েছিল।

হেনার চোখ দুটো এক মুহূর্তে ছলছল করে উঠল। সে বিস্ময় নিয়ে সাজিদের দিকে তাকাল।

সাজিদ নদীর বাতাসের দিকে মুখ করে ধীর গলায় বলতে শুরু করল, "যেদিন আমি তোমার গায়ে আঘাত করেছিলাম, ওই ভাঙা চুড়ির টুকরোটা রাস্তার কাদায় পড়ে ছিল। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ওটা কুড়িয়ে পকেটে নিয়েছিলাম। এই এক মাস ধরে প্রতিদিন আমি এই জোড়া লাগানো চুড়িটার দিকে তাকাতাম। এটা আমাকে মনে করিয়ে দিত আমি কত বড় একটা পশু। হেনা, ভাঙা চুড়ি আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে ফাটলের দাগটা চিরকাল থেকে যায়।"

হেনা কোনো কথা বলতে পারল না। তার গলার ভেতরটা যেন আটকে এল।

"আমি জানি," সাজিদ হেনার হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে নিয়ে খুব আলতো করে স্পর্শ করল, "আমি তোমার মনে যে ফাটল তৈরি করেছি, তা কোনোদিন পুরোপুরি মুছবে না। কিন্তু হেনা, আমি আজীবন সেই ফাটলটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করব। আমি আর কোনোদিন তোমার ওপর রাগ দেখাব না, কোনোদিন সন্দেহ করব না। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না-ও করো, অন্তত আমাকে এই সুযোগটা দাও যাতে আমি প্রতিদিন তোমার কাছে প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি।"

হেনার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে জোড়া লাগানো কাঁচের চুড়িটার ওপর পড়ল। সাজিদের এই অকপট স্বীকারোক্তি আর অনুশোচনা হেনার দেয়াল তুলে রাখা অভিমানকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, সাজিদের এই বিষাক্ত প্রেমের অন্তরালে এখন কেবলই এক আত্মত্যাগী রূপ ফুটে উঠেছে।

কিন্তু হেনা এত সহজে নিজেকে সমর্পণ করার মেয়ে নয়। তার নিজেরও যে একটা অহংকার আছে। সে চোখের জল মুছে কিছুটা কড়া গলায় বলল, "তুমি ভাবছ এত সহজে সব মুছে যাবে সাজিদ? একটা ভাঙা চুড়ি দেখিয়ে আর দুটো মিষ্টি কথা বলে তুমি আমাকে ভুলিয়ে দেবে?"

"না, হেনা," সাজিদ মাথা নাড়ল। "আমি ভোলানোর চেষ্টা করছি না। আমি শুধু তোমাকে সত্যিটা বলছি। তুমি আমাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলে না? দাও। কিন্তু এই বিষাক্ত দূরত্ব তৈরি করে নয়। আমার সাথে থেকে, আমাকে প্রতিদিন তিলে তিলে ভালোবাসার শিকলে বেঁধে শাস্তি দাও।"

হেনা কিছুক্ষণ সাজিদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চোখে আর সেই আগের হিংস্রতা নেই, উগ্র অধিকারবোধ নেই—সেখানে কেবল হেনার আশ্রয়ের ব্যাকুলতা।

হেনা কাঠের নৌকাটার কাঁধে মাথা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর গলায় বলল, "যদি তুমি আবার কখনো সেই পুরনো সাজিদ হয়ে ওঠো, তবে সেদিন আমি বুড়িগঙ্গার এই জলে নিজেকে ভাসিয়ে দেব, কিন্তু তোমার কাছে আর ফিরব না।"

সাজিদ হেনার মাথায় নিজের হাতটা রাখল। "সেদিন আসার আগেই আমার মৃত্যু হবে, হেনা।"

নৌকাটি নদীর বুকে ভাসতে ভাসতে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে লাগল। বুড়িগঙ্গার মাতাল হাওয়ায় দুটো মনের বিষাক্ত দেয়ালটা ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু নতুন করে বিশ্বাস গড়ে তোলার এই পথ যে কতটা কঠিন, তা তারা দুজনেই জানে। সম্পর্কের বিষ কেটে গিয়ে আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু শেষ পরিণতির দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়া বাকি।

সদরঘাটের সেই সন্ধ্যাটার পর থেকে সাজিদ আর হেনার মধ্যকার দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছিল। সাজিদের আচরণের পরিবর্তনটা ছিল চোখে পড়ার মতো। সে নিজের উগ্র মেজাজকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল, হেনার যেকোনো কথায় অধৈর্য না হয়ে শোনার অভ্যাস করছিল। কিন্তু তাদের এই বিষাক্ত সম্পর্কের শিকড় এতটাই গভীরে যে, বাইরের ঝড়ের চেয়ে তাদের নিজেদের ভেতরের ভয়টাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল।

পারস্পরিক বিশ্বাসের এই নতুন রূপটি পরীক্ষা করার জন্য যেন নিয়তি নিজেই এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করল।

হেনার পরিবার থেকে তার বিয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু হয়েছিল। হেনার বাবা একজন অত্যন্ত শক্ত মেজাজের মানুষ। তিনি একপ্রকার জোড়াজুড়ি করেই হেনার জন্য এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সরকারি কর্মকর্তা পাত্র ঠিক করে ফেললেন। হেনা তার বাবাকে সাজিদের কথা জানানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সাজিদের সাধারণ মধ্যবিত্ত পটভূমি আর কোনো স্থায়ী চাকরি না থাকার কারণে তার বাবা সরাসরি তা নাকচ করে দেন। এমনকি হেনার ওপর কড়া নজরদারি শুরু হলো, তার বাইরে বের হওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।

সাজিদ যখন হেনার ছোট বোনের মাধ্যমে খবরটা পেল, তার ভেতরের সেই পুরনো উগ্র সিংহটা যেন আবার জেগে উঠতে চাইল। তার রক্ত ফুটতে শুরু করল। সে সোজা বাইক নিয়ে হেনার বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

হেনা দোতলার জানালা দিয়ে সাজিদকে দেখতে পেল। সাজিদের চেহারায় আবার সেই পুরনো হিংস্র ভাব, চোখের রগ লাল হয়ে আছে। সাজিদ পকেট থেকে ফোন বের করে হেনাকে মেসেজ পাঠাল—'পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে নামো, নইলে আমি তোমার বাবার সামনে গিয়ে উঠব।'

হেনা বুক কেঁপে উঠল। সে জানত, সাজিদ যদি আজ তার বাবার সাথে ঝামেলায় জড়ায়, তবে সব শেষ হয়ে যাবে। সে কোনো মতে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে নিচে নেমে এল।

বাসার পাশের গলিতে এসে হেনা সাজিদের হাত ধরে টেনে এক কোণে নিয়ে গেল।

"তুমি এখানে কী করছ সাজিদ?" হেনা হাঁপাচ্ছিল। "তুমি কি মাথা খারাপ করে ফেলেছ?"

"হ্যাঁ! আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!" সাজিদ হেনার দুটো কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল। তার গলার স্বর কমানোর চেষ্টা করলেও সেখানে ছিল চরম ক্ষোভ। "তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে? তুমি আমাকে এতদিন বদলে যাওয়ার কথা বলে এখন অন্য কারও সাথে সংসার করার নাটক করছ? আমি তোমায় অন্য কারও হতে দেব না হেনা! দরকারে আমি তোমাকে এখান থেকে তুলে নিয়ে যাব!"

হেনা সাজিদের চড়া মেজাজ দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু এবার সে ভয় পেল না। সে সাজিদের হাত দুটো নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল না, বরং শক্ত করে ধরে রইল।

"তুমি আবার সেই পুরনো সাজিদ হয়ে যাচ্ছ," হেনা শান্ত কিন্তু অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে বলল। "তুমি ভেবেছ আমি স্ব ইচ্ছায় এটা করছি? তুমি কি বিশ্বাস করো না যে আমি তোমাকে ভালোবাসি?"

"তাহলে তুমি তোমার বাবাকে না বলছ না কেন?" সাজিদ গর্জে উঠল।

"আমি চেষ্টা করছি সাজিদ!" হেনা কেঁদে ফেলল। "কিন্তু তুমি যদি এখন এসে গুন্ডামি করো, তবে আমার বাবা কোনোদিন আমাদের মেনে নেবেন না। তোমার এই উগ্রতা দেখেই সবাই ভয় পায়। তুমি কেন বোঝো না, জোর করে সবকিছু জয় করা যায় না!"

সাজিদ থমকে গেল। হেনার চোখের জল আর তার গলার ভেতরের অসহায়ত্ব তাকে এক মুহূর্তেই কাঁপিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, তার এই হুটহাট উগ্র মেজাজই হেনার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সে হেনার হাত দুটো ছেড়ে দিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে গেল।

"আমি... আমি দুঃখিত হেনা," সাজিদ নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল গলির দেওয়াল ঘেঁষে। তার চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। "আমি আবার ভুল করছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলব।"

হেনা সাজিদের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে সাজিদের ভেজা চোখ দুটো মুছে দিয়ে তার কপালে নিজের কপাল ঠেকালো।

"আমাকে বিশ্বাস করো সাজিদ," হেনা ফিসফিস করে বলল। "আমি শুধুই তোমার। কিন্তু আমাদের এই লড়াইটা রাগের মাথায় জিতলে চলবে না। তোমাকে প্রমাণ করতে হবে তুমি একজন দায়িত্বশীল মানুষ। আমার বাবাকে হারানোর সুযোগ আমাদেরই তৈরি করতে হবে।"

সাজিদ হেনার হাতটা আঁকড়ে ধরল। "আমি কী করব বলো? তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব।"

"আগামী পরশুদিন পাত্রপক্ষ আমাদের বাসায় আসছে," হেনা সাজিদের চোখের দিকে তাকাল। "তুমি সেদিন সরাসরি আমার বাবার সামনে আসবে। কোনো উগ্রতা নয়, কোনো হুমকি নয়। তুমি একজন ভদ্র ও দায়িত্বশীল পুরুষের মতো আমার বাবার মুখোমুখি হয়ে নিজের ভালোবাসার অধিকার চাইবে। পারো না তুমি আমার জন্য নিজের এই অনিয়ন্ত্রিত অহংকার ভেঙে চুরমার করতে?"

সাজিদ হেনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এ যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নিজের উগ্র অহংকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রিয় মানুষটার জন্য নমনীয় হওয়া।

"আমি আসব হেনা," সাজিদ দৃঢ় কণ্ঠে বলল। "আমি তোমার বাবার পায়ে পড়তে হলেও পিছপা হব না। তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি আমার শেষবিন্দু দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করব।"

ঢাকার সেই অন্ধকার গলিতে দুটো মন আবার নতুন এক শপথ নিল। সম্পর্কটা যা একসময় ছিল কেবলই উগ্রতা, অভিমান আর বিষাক্ত নিয়ন্ত্রণের খেলা, তা এখন আত্মত্যাগ আর দায়িত্ববোধের চরম পরীক্ষার মুখোমুখি।

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত পরশুদিন। হেনার বাসায় ড্রয়িংরুমে তখন ভারী নীরবতা। সোফায় বসে আছেন হেনার গম্ভীর বাবা, পাশাপাশি পাত্র আর তার অভিভাবকেরা। পাত্রপক্ষের লোকজনের অহংকারী কথাবার্তায় পরিবেশটা বেশ ভারী হয়ে আছে। হেনা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল, তার হাত দুটি ঘেমে একাকার। সে জানত না সাজিদ আদৌ আসবে কি না, নাকি তার অহংকার তাকে আবার আটকে দিল।

ঠিক তখনই দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল।

হেনার বাবা গিয়ে দরজা খুলতেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাজিদ। পরনে মার্জিত হালকা নীল রঙের ফুলহাতা শার্ট, চুল আঁচড়ানো, চোখে কোনো উগ্রতা নেই—বরং এক অদ্ভুত শান্ত দৃঢ়তা। সাজিদ কোনো অসভ্যতা করল না, অত্যন্ত নম্রভাবে হেনার বাবার সালাম নিয়ে ভেতরের ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল।

"আপনি কে?" হেনার বাবা কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন।

সাজিদ পাত্রপক্ষের দিকে একঝলক তাকাল, তারপর সোজা হেনার বাবার সামনে গিয়ে নিজের অহংকার চুরমার করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হেনা আড়াল থেকে দৃশ্যটা দেখে নিজের মুখে হাত চাপা দিল। চিরকালের একগুঁয়ে, উদ্ধত সাজিদ আজ হেনার বাবার পায়ের কাছে মাথা নোয়াচ্ছে!

"চাচা," সাজিদ অত্যন্ত শান্ত কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, "আমি সাজিদ। আমি হেনার সাথে পড়াশোনা করি। আমি জানি আজ এখানে যা হচ্ছে তাতে আমার এভাবে আসাটা অন্যায়। কিন্তু আমার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।"

"তোমার সাহস তো কম নয়!" হেনার বাবা গর্জে উঠলেন। "বেরিয়ে যাও এখান থেকে!"

"আমি চলে যাব চাচা," সাজিদ মাথা তুলে বলল, তার চোখে জলের বিন্দু কিন্তু কণ্ঠে অটল স্থিরতা। "তবে একটা কথা শুনে যান। আমি কোটিপতি নই, সরকারি চাকরিও আমার নেই। একটা ছোট স্টার্টআপে কাজ শুরু করেছি মাত্র, কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি—আগামী দুই বছরের মধ্যে আমি নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব যা হেনার যোগ্য। আমি একসময় খুব উগ্র আর অনিয়ন্ত্রিত মেজাজের মানুষ ছিলাম, কিন্তু আপনার মেয়েকে ভালোবাসতে গিয়ে আমি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছি। আপনি আজ আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু আমার ভালোবাসাকে অপমান করবেন না। হেনা ছাড়া আমার এই জীবনের কোনো মূল্য নেই।"

পাত্রপক্ষের লোকেরা সাজিদের এই কাণ্ড দেখে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল এবং বিয়ে ভাঙার ঘোষণা দিয়ে বেরিয়ে গেল। হেনার বাবা চরম রেগে সাজিদের গায়ে হাত তোলার জন্য হাত তুললেন, কিন্তু হেনা আড়াল থেকে ছুটে এসে সাজিদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াল।

"বাবা, থামো!" হেনা কান্নায় ভেঙে পড়ল। "তুমি যা করার আমার সাথে করো! সাজিদ যা বলেছে তা সত্যি। ও নিজেকে আমার জন্য বদলে ফেলেছে। তুমি যদি ওকে তাড়িয়ে দাও, তবে আমার লাশ বের হবে এই ঘর থেকে!"

হেনার বাবা হেনার চোখে সেই চরম উগ্র ভালোবাসার জেদ দেখতে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই দুটো পাগল মানুষকে আলাদা করা অসম্ভব। এরা একে অপরকে ধ্বংসও করতে পারে, আবার একে অপরের জন্য নিজেদের বিলিয়েও দিতে পারে। দীর্ঘ নীরবতার পর হেনার বাবা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত নামিয়ে নিলেন।

"তোমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমি তোমাকে দুই বছর সময় দিলাম সাজিদ," হেনার বাবা কঠিন গলায় বললেন। "যদি নিজেকে প্রমাণ করতে পারো, তবেই হেনা তোমার হবে। আর যদি তোমার সেই পুরনো মেজাজের একটা আঁচও আমার মেয়ে পায়, তবে আমি তোমাকে ক্ষমা করব না।"

সাজিদ চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। হেনার বাবার দিকে তাকিয়ে এক গভীর কৃতজ্ঞতার মুচকি হাসি হাসল।

হেনা আর সাজিদ বাসার বাইরের ছাদে এসে দাঁড়াল। আকাশ আজ পরিষ্কার, ঝুম বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। হালকা মিষ্টি বাতাস বইছে তাদের চুলে।

সাজিদ হেনার দিকে ফিরল। হেনার চোখে তখনও জলের দাগ, কিন্তু তার ঠোঁটে ফুটে উঠেছে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর হাসিটা। সাজিদ এবার আর কোনো উগ্রতায় নয়, অত্যন্ত ভালোবাসায় হেনার দুটো হাত নিজের হাতে তুলে নিল।

"শাস্তি কি শেষ হলো হেনা?" সাজিদ ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল।

হেনা সাজিদের বুকের সাথে নিজেকে সঁপে দিল। সাজিদের হৃদস্পন্দন এখন একদম শান্ত, সেখানে আর কোনো ঝড়ের তাণ্ডব নেই। হেনা মুখ তুলে সাজিদের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "না, সাজিদ। বিষাক্ত ভালোবাসার শাস্তি শেষ হয়েছে, কিন্তু সারা জীবন ভালোবেসে আটকে রাখার সাজা তো কেবল শুরু হলো।"

সাজিদ হেনাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ঢাকার আকাশে তখন এক নতুন ভোরের রোদ ফুটছে। যে সম্পর্ক একদিন শুরু হয়েছিল সন্দেহ, রাগ, অভিমান আর চরম বিষাক্ততায়—আজ তা অনুশোচনা, আত্মত্যাগ আর সুদৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে এক মিষ্টি ও সুখী সমাপ্তি পেল। তাদের বিষাক্ত প্রেম রূপ নিল এক অমর ভালোবাসার গল্পে।

 

....
👁 15