পুরাতন ঢাকার এক সাবেকীবাড়ির তিন তলার ঘরটি থেকে আতরের হালকা সুবাস ভেসে আসছে। মেহরাব সদ্যই এশার নামাজ শেষ করে জায়নামাজটি সুন্দর করে ভাজ করে আলমারির ওপর তুলে রাখল। মেহরাবের জীবনটা বেশ গোছানো, অনুশাসনে ভরা। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, পরিমিত জীবনযাপন আর ব্যবসায়িক সততা—এসব নিয়ে তার সুখ্যাতি এলাকার সবার মুখে মুখে। তবে মেহরাবের এই সুশৃঙ্খল জীবনের আড়ালে একটি বড় ত্রুটি ছিল, তা হলো তার তীব্র রাগ আর মেজাজ। রেগে গেলে তার চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে আসে, কোনো প্রকার যুক্তি বা নরম কথা তার সেই রাগের দেওয়াল ভাঙতে পারে না।
কয়েক মাস আগেই মেহরাবের আক্দ হয়েছে নিলার সাথে। নিলা মেয়েটা খুবই লক্ষ্মী, শান্ত আর পর্দাশীল। বিয়ের পর থেকেই নিলা মেহরাবের মেজাজের ধরণ বুঝে খুব সাবধানে চলত। শশুড়বাড়ির প্রত্যেকের সেবা করা, সময়মতো মেহরাবের পছন্দের খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেওয়া, আর মেহরাবের সব কড়া নির্দেশ মেনে চলাই ছিল নিলার দৈনিক রুটিন। মেহরাব ধার্মিক হলেও নিলার দিকে কখনো অনুরাগের চোখে তাকাত না, বরং ঘরের ছোটখাটো ভুলত্রুটি হলেই কড়া মেজাজে নিলাকে শাসন করত। নিলা স্বামী হিসেবে মেহরাবকে সম্মান করত, কিন্তু সেই শাসনের ভয়ে তার ভেতরে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক সব সময় চেপে থাকত।
সেদিন ছিল শুক্রবারের রাত। দিনভর তীব্র গরমের পর আকাশে হালকা মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। মেহরাব ব্যবসার কাজে বাইরে গিয়েছিল, ফিরতে বেশ রাত হবে বলেই জানিয়েছিল। নিলা সন্ধ্যার পর পর সব কাজকর্ম শেষ করে নিজের রুমে আসে। টেবিলের একপাশে রাখা ছিল তার বিয়ের সময় মেহরাবের বোন তাকে যে সুতি জামদানি শাড়িটা উপহার দিয়েছিল, সেটি। শাড়িটা গাঢ় নীল রঙের, রূপালী সুতোর কাজ করা। শাড়িটার দিকে তাকিয়ে নিলার মনে হঠাৎ এক চিলতে শখ জেগে উঠল। প্রতিদিন তো সাধারণ সুতি থ্রি-পিস বা সুতি শাড়িতেই নিজেকে পেঁচিয়ে রাখা হয়, আজ একটু নিজের জন্য সাজলে কেমন হয়? মেহরাব তো ঘরে নেই, ফিরতেও দেরি হবে।
নিলা কবাটটা ভালো করে আটকে দিল। পরম যত্নে শাড়িটা পরে প্রসাধনীর ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। চুলগুলো খুলে পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিল, চোখে সামান্য সুরমা লাগাল আর কপালে দিল ছোট একটি টিপ। আয়নায় নিজের অবয়ব দেখে নিলা নিজেই একটু লাজুক হাসল। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ড্রেসিং টেবিলের হালকা হলদে আলোয় নিজেকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল সে। যেন নিজের মধ্যেই নিজের এক নতুন রূপ খুঁজে পাওয়ার খেলা!
ঠিক সেই মুহূর্তেই কোনো শব্দ না করে ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ হলো। মেহরাব হাতের চাবি দিয়ে কবাট খুলে ঘরে ঢুকেছে, যা নিলা টের পায়নি। মেহরাব ঘরে ঢুকেই ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজগোজরত নিলাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। কিন্তু সেই থমকে যাওয়া ভালোবাসার ছিল না, তা ছিল তীব্র বিরক্তির। মেহরাবের চোখের কোণ দুটো রাগে কঠোর হয়ে উঠল। সাজগোজের এই বাহুল্য আর শাড়ির আঁচল এভাবে অগোছালো রেখে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটাকে মেহরাব এক ধরনের হালকা আচরণ বলে ধরে নিল।
"এসবের অর্থ কী নিলা?" মেহরাবের গ গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিঝুম ঘরে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।
নিলা চমকে উঠে পেছনে তাকাল। মেহরাবকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার হাত থেকে সুরমার কৌটোটা নিচে পড়ে গেল। সে দ্রুত আঁচল তুলে শরীর ঢেকে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
মেহরাব গটগট করে এগিয়ে এল নিলার দিকে। তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে নিলার চোখের দিকে তাকিয়ে মেজাজ হারিয়ে বলল, "আমার ঘরে এসব সস্তা নাটক কেন? কার জন্য এই সাজগোজ? এত রাতে এমন পোশাক পরে আয়নার সামনে ঢং করার মানে কী? তোমাকে কি আমি এ উদ্দেশ্যে বিয়ে করে এনেছি? একজন শান্ত-শিষ্ট মেজাজের মেয়ের এমন বেহায়াপনা সাজ কি শোভা পায়?"
মেহরাবের প্রতিটি কথা নিলার বুকে বিঁধল। সে কিছু বলতে চাইল, "আমি... আসলে... আপনি তো দেরিতে আসবেন বলেছিলেন..."
"থামো!" মেহরাব ধমকে উঠল। "নিজের ভুল ঢাকতে যুক্তি দেখাবে না। আমি তোমাকে কতবার বলেছি, ঘরের মধ্যেও আত্মসংযম বজায় রাখবে। যা তা সাজগোজ আর ঢং আমার পছন্দ নয়। সব আলো নিভিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করো, ফালতু সময় নষ্ট করবে না।"
মেহরাব আলমারি থেকে নিজের পোশাক নিয়ে তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। সজোরে ওয়াশরুমের দরজা আটকানোর শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল।
নিলার চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল। তার বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে হাত দিয়ে মুখ চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। সে তো কোনো অন্যায় করেনি, কেবল নিজের একটু শখ থেকে সেজেছিল। স্বামীর কটূ কথা আর এই রূপ অপমান তার সহ্য হচ্ছিল না। আয়নার দিকে তাকিয়ে সে তড়িঘড়ি করে কপাল থেকে টিপটা মুছে ফেলল। সুরমার টান মোছার চেষ্টা করতেই গাল দুটো কালো হয়ে গেল। আর ঘরে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি তার ছিল না।
অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে নিলা সোজা তিন তলার বিশাল বারান্দাটায় চলে গেল।
বারান্দার লোহার গ্রিল ধরে নিলা ডুকরে কেঁদে উঠল। রাতের শীতল হাওয়া তার ভেজা গাল স্পর্শ করে যাচ্ছিল। নিচে পুরান ঢাকার সরু গলিগুলো নিঝুম হয়ে গেছে, কেবল রাস্তার মোড়ের ল্যাম্পপোস্টের আলোটা মিটমিট করে জ্বলছে। নিলার মনে হচ্ছিল, এই সুবিশাল পৃথিবীতে তার মনের অনুভূতি বোঝার মতো কেউ নেই। যার সান্নিধ্য, যার একটু মিষ্টি কথা তার প্রাপ্য ছিল, তার কাছ থেকে কেবল মিলল অপমান আর ঘৃণা। নিলা দু হাতে মুখ ঢেকে বারান্দার এক কোণে বসে পড়ল। তার পরনের নীল শাড়িটা বারান্দার মেঝেতে লুটিয়ে রইল।
এদিকে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে মেহরাবের রাগ কিছুটা কমল। সে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে নিলার দিকে তাকানোর জন্য চোখ ঘোরাল, কিন্তু ঘরে নিলাকে দেখতে পেল না। ঘর একদম খালি, প্রসাধনীগুলো ড্রেসিং টেবিলে অগোছালো হয়ে পড়ে আছে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর সুরমার কৌটোটা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মেহরাব থমকে দাঁড়াল। সে আয়নার দিকে তাকাল, যেখানে কয়েক মিনিট আগে নিলা দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ করেই মেহরাবের মনে একটা অদ্ভুত অনুশোচনা ধাক্কা দিল। নিলা তো কোনো অন্যায় কাজ করছিল না। একটি মেয়ে তার নিজের ঘরে, নিজের স্বামীর জন্য বা নিজের শখে একটু সাজতেই পারে। সে কি নিলাকে একটু বেশিই কড়া কথা বলে ফেলেছে? 'সস্তা নাটক', 'বেহায়াপনা'—এসব শব্দ ব্যবহার করা কি তার মতো একজন সচেতন মানুষের পক্ষে উচিত হয়েছে? নিলা কখনো তার কোনো কথার প্রতিবাদ করেনি, কোনোদিন কোনো দাবি করেনি। আজ প্রথমবার সে একটু হেসেছিল, আর সে-ই তার সেই হাসিটুকু এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিল?
মেহরাবের মনে অপরাধবোধ জাগল। সে তো ইসলাম শেখে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাহ পড়ে, যেখানে স্ত্রীদের সাথে কোমল আচরণ করার নির্দেশ স্পষ্ট দেওয়া আছে। অথচ সে নিজের সামান্য মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না!
মেহরাব ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
বারান্দায় এসে সে দেখল নিলা কোণায় বসে আছে, তার কাঁধ দুটো কান্নার তোড়ে কাঁপছে। নীল শাড়ির আঁচলটা মাটিতে ছড়িয়ে আছে। মেহরাব কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরটা এক অজানা মোচড় দিয়ে উঠল। নিলার এই নিঃশব্দ কান্না মেহরাবের ভেতরের কঠিন রাগটাকে মুহূর্তেই গলিয়ে দিল।
মেহরাব গায়ের পাঞ্জাবিটা সামলে নিয়ে নিলার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল। সে নিচু গলায় ডাকল, "নিলা..."
নিলা কোনো উত্তর দিল না, কেবল কান্নার বেগটা আরো বেড়ে গেল। সে মুখ না তুলে শরীরটা আরো গুটিয়ে নিল।
মেহরাব নিলার ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে হাত বাড়িয়ে নিলার কাঁধে হাত রাখতে চাইল, কিন্তু দ্বিধায় পড়ে হাতটা টেনে নিল। তারপর খাঁটি মন থেকে অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল, "নিলা, শোনো... আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি অতটা কড়া কথা না বললেও পারতাম। আমি রেগে গিয়েছিলাম, কিন্তু এভাবে তোমাকে অপমান করা আমার একদম উচিত হয়নি। আমাকে ক্ষমা করে দাও নিলা..."
নিলা মুখ না তুলে কেবল মাথা নাড়াল, যার অর্থ সে কথা বলতে চায় না। তার চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরে পড়ছিল।
মেহরাব আবার বলতে গেল, "দেখো নিলা, আমি সত্যি অনুতপ্ত—"
ঠিক তখনই, মেহরাবের কথা শেষ হওয়ার আগেই, বাইরের মেঘলা আকাশজুড়ে বিকট শব্দে কড়কড় করে বাজ ডেকে উঠল! কালবোশেখী ঝড়ের পূর্বসংকেত দিয়ে পুরো পুরান ঢাকা থমকে গেল এক নিমেষে। বিজলীর তীব্র আলো বারান্দার অন্ধকার চিরে নিলা আর মেহরাবের ওপর এসে পড়ল। সেই আলোকের ঝলকানির পরপরই চারদিক কাঁপিয়ে প্রচণ্ড শব্দে আবার কড়কড় করে বিদ্যুৎ চমকাল।
নিলা সব সময় বজ্রপাত আর প্রচণ্ড শব্দে ভীষণ ভয় পেত। এই বিকট শব্দে নিলা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল যে, তার ভেতরের সব অভিমান, রাগ আর দ্বিধা এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
কোনো কিছু না ভেবে, নিলা ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়িয়ে সরাসরি মেহরাবের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে মেহরাবকে দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজল।
"ওগো... বাঁচাও! আমি খুব ভয় পাচ্ছি!" নিলা আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে অস্পষ্ট কণ্ঠে কেঁদে উঠল।
মেহরাব এই আকস্মিক ঘটনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। নিলার নরম শরীরটা যখন তার শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে গেল, নিলার চুলের সুবাস আর নীল শাড়ির স্পর্শ যখন মেহরাবের অনুভূতির দুয়ারে আঘাত করল, তখন মেহরাবের ভেতরের সমস্ত পুরুষালি গাম্ভীর্য নিমেষেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
মেহরাবের হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিলার পিঠ আর কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। সে নিলাকে আরো কাছে টেনে নিল।
বাহিরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। বাতাসের তোড়ে বৃষ্টির ছাট এসে বারান্দায় আছড়ে পড়ছে, আর মেহরাবের বুকে নিলার হৃদস্পন্দন তখন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। মেহরাবের জীবনে এই প্রথম কোনো নারীর এত নিবিড় স্পর্শ!
বাইরে বৃষ্টির বেগ ক্রমশ বাড়ছে। শ্রাবণের বারিধারায় পুরান ঢাকার চাদ ছাদ আর সরু গলিগুলো সিক্ত হয়ে উঠছে। আর তিন তলার সেই ফাঁকা বারান্দায়, ভিজতে থাকা হাওয়ার মাঝে মেহরাবের বুকের সাথে লেপ্টে আছে নিলা। বজ্রপাতের আতঙ্কে নিলার ছোট শরীরটা এখনো থরথর করে কাঁপছে। মেহরাব নিঃশব্দে নিলার পিঠে নিজের চওড়া হাতটা রেখে ওকে আরো নিবিড়ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরল।
মেহরাবের এতদিনের গড়ে তোলা শক্ত বরফের দেওয়াল যেন নিলার এক ফোঁটা স্পর্শে আর এক বিন্দু উষ্ণতায় গলতে শুরু করেছে। এতদিন সে ধর্ম পালন করেছে, নৈতিকতা মেনে চলেছে, কিন্তু ঘরের এই অর্ধাঙ্গিনীর দিকে সুভাব আর গভীর অনুরাগের চোখে তাকানোর অনুধাবন সে কখনো করেনি। আজ নিলার শরীরের সুবাস, তার ভিজে যাওয়া নীল শাড়ির কোমলতা আর এই নির্ভরতার টানে মেহরাবের বুকের ভেতরের রক্তে যেন এক অন্যরকম দোলা লাগল।
"নিলা... শান্ত হও, আমি আছি তো। আর কড়কড় শব্দ হবে না..." মেহরাব একদম নিলার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল।
মেহরাবের মেজাজী আর গম্ভীর কণ্ঠের জায়গায় এই অনুতপ্ত, কোমল আর অদ্ভুত মাদকতাময় স্বর শুনে নিলার ধুকপুকানি কিছুটা কমে এল। কিন্তু ভয়ের জায়গায় এখন তার পুরো শরীর জুড়ে এক অজানা শিউরে ওঠার অনুভূতি গ্রাস করল। সে টের পেল, মেহরাবের দুটো হাত তাকে কোনো সাধারণ শক্তিতে নয়, পরম মমতায় আর ভালোবাসার মোহে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নিলা মাথা তুলে মেহরাবের চোখের দিকে তাকাল।
বারান্দার বাইরে থেকে আসা ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো আর বৃষ্টির ছাঁটে মেহরাবের মুখটা দেখা যাচ্ছিল। যে চোখে কিছুক্ষণ আগেও কেবল রাগ আর বিরক্তি ছিল, সেখানে আজ এক গভীর তৃষ্ণা, অনুশোচনা আর অদ্ভুত এক মোহের ছায়া।
নিলা অপরাধীর মতো নিচু স্বরে বলল, "আমাকে... ক্ষমা করবেন না? আমি সত্যি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে সাজিনি। কেবল..."
কথাটা নিলা শেষ করতে পারল না। মেহরাব নিজের একটি আঙুল নিলার ভেজা ঠোঁটের ওপর আলতো করে চেপে ধরল।
"আর একটা কথাও বলবে না নিলা," মেহরাব গভীর চোখে নিলার দিকে তাকিয়ে বলল। "ভুল আমার ছিল। আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি। যে রূপ দেখার সৌভাগ্য কেবল আমার, সেই রূপ দেখে আমি রেগে গিয়ে কত বড় বোকামি করেছি, তা এখন বুঝতে পারছি।"
কথাটা শেষ করেই মেহরাব তার অন্য হাত দিয়ে নিলার চিবুক ধরে মুখটা একটু ওপরের দিকে তুলল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে মুছে যাওয়া সুরমার হালকা ছোপ নিলার গালে এখনো লেগে আছে, যা এই আবছা আলোয় তাকে অপরূপা করে তুলেছে। মেহরাব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নিলার ভেজা গালে সে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াাল।
নিলার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুতের এক তীব্র স্রোত বয়ে গেল। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে মেহরাবের শার্টের কাপড়টা দু হাতে খামচে ধরল। এতদিনের কঠোর মেহরাব, যে কথায় কথায় ধমক দিত, সে আজ এভাবে তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছে—এটা যেন নিলার কাছে এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।
মেহরাব নিলাকে কোলপাঁজা করে তুলে নিল। নিলার নীল শাড়ির আঁচলটা বাতাসে উড়তে লাগল। নিলা লজ্জায় মেহরাবের ঘাড়ে মুখ লুকাল। মেহরাব ধীর পায়ে বারান্দা থেকে সোজা শয়নকক্ষে নিয়ে এল নিলাকে। কবাটটা সজোরে আটকে দিয়ে ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিল সে। কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির শব্দ আর দূরের হালকা আলোর রেখা ঘরের ভেতরের পরিবেশকে আরো মায়াবী করে তুলল।
মেহরাব নিলাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিলা লজ্জায় এপাশে কাত হয়ে শুতে গেলে মেহরাব তার হাত ধরে তাকে আবার নিজের দিকে ফেরাল। মেহরাবের পরনের শার্ট আর চাদর সে খুলে ছুঁড়ে ফেলল একপাশে।
"আজ রাতে কোনো দূরত্ব থাকবে না নিলা," মেহরাব নিলার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর স্বরে বলল। "আমি এতদিন অনেক ভুল করেছি, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আজ আমাকে সব ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দাও।"
নিলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। স্বামীর এই রূপ সে কখনো দেখেনি। যে মানুষটির ভয়ে সে এত দিন তটস্থ থাকত, তার এই চরম সোহাগ আর ব্যাকুলতা নিলার ভেতরের সব অভিমান আর ভয় নিমেষেই ধুয়ে মুছে দিল। সে দু হাত বাড়িয়ে মেহরাবের গলা জড়িয়ে ধরল।
সেই রাতে বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে লাগল, আর ঘরের ভেতরে জমে থাকা সব দূরত্ব গলে এক হয়ে গেল। মেহরাবের গভীর সোহাগ, ভালোবাসা আর ভালোবাসার তীব্র বন্যায় নিলা নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। মেহরাবও নিলার প্রতিটি সুবাস, প্রতিটি স্পর্শ নিজের ভেতরে শুষে নিল। এতদিন সে যা কিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছিল, নিলার অনুরাগের সাগরে ডুব দিয়ে সে যেন নতুন এক জীবনের স্বাদ পেল।
সকালে যখন জানালার পর্দা ঠেলে ভোরের সোনাঝরা রোদ ঘরে এসে পড়ল, তখনো মেহরাব নিলাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। নিলার এলোমেলো চুলগুলো মেহরাবের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
নিলা আস্তে করে চোখ মেলতেই দেখল মেহরাব গভীর নজরে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নিলার চেহারায় লজ্জা চুইয়ে পড়ল। সে মেহরাবের বুক থেকে সরে গিয়ে কম্বলটা গ গায়ে টানার চেষ্টা করতেই মেহরাব তার কোমর ধরে আবার টান মেরে নিজের বুকের ওপর নিয়ে এল।
"কোথায় যাওয়া হচ্ছে?" মেহরাবের মুখে এক রহস্যময়, মিষ্টি হাসি।
নিলা লজ্জায় চোখ নিচু করে বলল, "সকাল হয়ে গেছে তো... ওজু করে ফজরের সালাত আদায় করতে হবে। তাছাড়া শাশুড়ি আম্মা যদি জেগে যান—"
"আম্মা কিছু বলবেন না," মেহরাব নিলার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল। "আজকে আমার নিলাকে কোথাও যেতে দেব না। আজ আমার পুরো দিনটাই তোমার জন্য বরাদ্দ।"
নিলার বুকটা কেঁপে উঠল, তবে এবার আর ভয়ে নয়, পরম সুখে। কাল রাতের মেহরাব আর আজকের এই মেহরাব যেন সম্পূর্ণ দুজন আলাদা মানুষ! মেহরাবের চোখে আজ আর কোনো রাগ নেই, আছে কেবল ভালোবাসার এক অফুরন্ত নদী।
ভোরের নরম রোদ নিলার গালে এসে পড়েছিল। মেহরাবের বুকে মাথা রেখে সে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছিল। যে মানুষটির গলার সামান্য কড়া আওয়াজে একসময় নিলার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যেত, সেই মানুষটিই আজ তার চুলগুলো আলতো করে গুছিয়ে দিচ্ছে, গালে ঘন ঘন আঁকি বুকি কাটছে।
"নিলা, এভাবে তাকিও না," মেহরাব নিলার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল। "তোমার এই শান্ত চোখ দুটো এখন আমাকে আরো বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।"
নিলা লজ্জায় মেহরাবের বুকে মুখ গুজে দিল। "আপনি বড্ড বদলে গেছেন। কাল রাত পর্যন্ত তো কত রাগ ছিল!"
মেহরাব নিলাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেসে উঠল। "সেই মেহরাব কাল রাতের ঝড়ে বৃষ্টিতে ভেসে গেছে নিলা। এখন যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে কেবল তোমার ভালোবাসার কাঙাল।"
মেহরাব আর নিলা একসাথে ওজু করে ভোরের সালাত আদায় করল। সালাত শেষে মেহরাব যখন মোনাজাত করল, তখন নিলার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় ধরে আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করল তাদের এই নতুন সূচনার জন্য।
দিনটি ছিল শনিবার, মেহরাবের ব্যবসায়িক ছুটির দিন। সাধারণত ছুটির দিনে মেহরাব ঘরে বসে হিসাব-নিকাশ করত বা বন্ধুদের সাথে দ্বীনি আলোচনায় ব্যস্ত থাকত। কিন্তু আজকের দিনটি সম্পূর্ণ আলাদা।
সকালে নিলা যখন রান্নাঘরে গিয়ে শাশুড়ির কাজে হাত লাগাতে গেল, মেহরাবও পিছু পিছু রান্নাঘরে গিয়ে হাজির। মেহরাবকে রান্নাঘরে দেখে নিলার শাশুড়ি তো অবাক!
"কী রে মেহরাব, তুই হঠাৎ সকালে রান্নাঘরে?" শাশুড়ি শুধালেন।
মেহরাব নিলার দিকে একনজর আড়চোখে তাকিয়ে হেসে বলল, "আম্মা, আজ নিলা রান্না করবে না। আজ তোমাদের সবাইকে আমি নিজের হাতে নাশতা বানিয়ে খাওয়াব। আর নিলা আজ শুধু বিশ্রাম নেবে।"
কথাটা শুনে নিলার শাশুড়ি মুখে মিটমিট করে হাসলেন। নিলা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে রইল। মেহরাবের এই প্রকাশ্য সোহাগ আর তোয়াজ নিলার কাছে এক নতুন অনুভূতি।
সারাদিন ধরে মেহরাব নিলাকে চোখের আড়াল হতে দিল না। নিলা যে ঘরেই যায়, মেহরাব কোনো না কোনো অজুহাতে সেখানে হাজির হয়। কখনো পিছন থেকে এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরে, কখনো আবার নিলার চিবুক ছুঁয়ে ভালোবাসার পরশ দিয়ে যায়।
দুপুরের খাবারের পর মেহরাব নিলাকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে আটকে দিল।
"আজকে আমরা কোথাও বের হব না," মেহরাব নিলাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল। "আজকে সারাদিন শুধু আমি আর তুমি।"
"কিন্তু ঘরে সবাই আছে, শাশুড়ি আম্মা কী ভাববেন?" নিলা মৃদু আপত্তি জানানোর চেষ্টা করল।
"আম্মা সব বোঝেন," মেহরাব দুষ্টুমির হাসি হেসে নিলার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। "এখন একদম চুপ। আমার চোখ দুটো বন্ধ করো আর আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকো।"
নিলা আর না করতে পারল না। সে আলতো করে মেহরাবের চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে লাগল। মেহরাব চোখ বন্ধ করে নিলার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল।
বিকেলের দিকে মেহরাব নিলার জন্য আলমারি খুলে কাল রাতের সেই নীল জামদানি শাড়িটা বের করে আনল।
"আজকে এই শাড়িটা আবার পরো নিলা," মেহরাব পরম আগ্রহ নিয়ে বলল। "কাল রাতে তো আমি এই রূপের মূল্য দিতে পারিনি, আজ আমাকে সেই সুযোগটা দাও।"
নিলা বাধ্য মেয়ের মতো শাড়িটা পরে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। মেহরাব নিজে এসে নিলার পেছনে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দুটো মুখ পাশাপাশি ফুটে উঠল। মেহরাব নিজ হাতে নিলার খোঁপায় গাজরা পেঁচিয়ে দিল, তারপর নিলার কপালে একটি গভীর চুমু একে দিল।
"তুমি আমার ঘরের আলো নিলা," মেহরাব নিলার কাঁধে নিজের মুখ রেখে বলল। "তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি কত বড় পাপ করেছি, তা ভাবলেও এখন আমার ভয় করে।"
নিলা পেছন ঘুরে মেহরাবের বুকে হাত রেখে বলল, "অতীতে যা হয়েছে তা ভুলে যান। আপনি যে আমাকে এত ভালোবাসেন, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।"
মেহরাব নিলাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। নিলার হাসির শব্দে আর মেহরাবের সুগভীর অনুরাগে মেখে গেল সমস্ত ঘর। যে ঘরে একসময় রাগের আর ভয়ের থমথমে পরিবেশ থাকত, সেখানে আজ কেবল ভালোবাসার সুবাস। মেহরাব যেন এখন এক পুরোদস্তুর প্রেমিক পুরুষ, যে তার স্ত্রীকে প্রতি মুহূর্তে ভালোবাসার সাগরে ভাসিয়ে রাখতে চায়।
দিনগুলো এখন আর আগের মতো কাটছিল না। পুরান ঢাকার সেই নিঝুম বাড়িটায় এখন সারাদিন নিলার চুড়ির রুনঝুন শব্দ আর মেহরাবের চঞ্চল পায়ের ছাপ। মেহরাব যে মানুষটি একসময় মেজাজের তাড়নায় কথা বললেই ধমকে উঠত, সেই মেহরাব এখন নিলাকে চোখের আড়াল করলেই যেন অস্থির হয়ে পড়ে।
দোকানে গিয়েও মেহরাবের মন পেঁচে থাকে বাড়িতে। দুপুর না হতেই সে নিলাকে ফোন করে বসে।
"নিলা, কী করছ?" ফোনে মেহরাবের অনুরাগী কণ্ঠ ভেসে আসে।
নিলা রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে ফিসফিস করে বলে, "আমি আম্মার সাথে রান্নার জোগাড় করছি। আপনি হঠাৎ এত দুপুরে ফোন করলেন যে? কোনো দরকার?"
"দরকার ছাড়া কি নিজের স্ত্রীকে ফোন করা যায় না?" মেহরাব ওপাশ থেকে মৃদু হেসে বলে, "আমার মনটা তোমার কাছেই পড়ে আছে নিলা। কাজকর্মে মন বসছে না। মন চাইছে এখনই ছুটে চলে আসি।"
"অসভ্যতা করবেন না তো," নিলা লজ্জায় লাল হয়ে চারপাশ দেখে নিয়ে বলে, "বিকালে আসবেন, এখন রাখুন।"
মেহরাব আর দেরি না করে বিকাল পাঁচটা বাজতেই কাজ শেষ করে তড়িঘড়ি ঘরে ফিরে আসে। ঘরে ঢুকেই সে সোজা নিলার কাছে চলে যায়। নিলা তখন শোবার ঘরে কাপড় গুছোচ্ছিল। মেহরাব পেছন থেকে এসে নিলাকে জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল।
"আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে?" নিলা মেহরাবের হাতের স্পর্শে শিউরে উঠে বলল।
"তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল," মেহরাব নিলাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তার গালে কপালে সোহাগের পরশ ছড়িয়ে দিল। "দোকানের হিসাবপত্র আজ আর ভালো লাগছিল না। আমার আসল হিসাব তো তোমার কাছে।"
নিলা মেহরাবের এই বাঁধ ভাঙা ভালোবাসা দেখে অবাক না হয়ে পারে না। সে মেহরাবের বুকে মাথা রেখে শান্ত স্বরে বলল, "আপনি সত্যি অনেক বদলে গেছেন। মাঝে মাঝে আমার বিশ্বাসই হতে চায় না, এটা কি আমার সেই রাগী স্বামী, নাকি অন্য কেউ!"
মেহরাব নিলার চিবুকটা আলতো করে ধরে বলল, "মানুষ যখন তার জীবনের আসল নেয়ামত চিনতে পারে না, তখন সে অন্ধ হয়ে থাকে। আমি তোমাকে চিনতে ভুল করেছিলাম নিলা। কিন্তু এখন আমি সেই ভুল আর করব না। তোমাকে সুখে রাখাই এখন আমার সবচেয়ে বড় কাজ।"
সন্ধ্যায় মেহরাব নিলাকে নিয়ে পুরান ঢাকার গলির মিষ্টি আর নুনতা খাবার কিনে এনে একসাথে বসে খেল। আগের মতো মেহরাব আর আলাদা গাম্ভীর্য নিয়ে বসে থাকে না। নিলাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া, নিলার মুখের কাছে মিষ্টি তুলে ধরে দুষ্টুমি করা—এসব যেন এখন মেহরাবের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
ঘরের বড়রাও মেহরাবের এই পরিবর্তন দেখে ভেতরে ভেতরে অনেক খুশি। কড়া মেজাজের ছেলেটা এখন হাসিখুশি থাকে, ঘরের পরিবেশটাই যেন বদলে গেছে।
রাতের বেলা মেহরাব নিলাকে নিয়ে তিন তলার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশে আজ কোনো মেঘ নেই, ঝকঝকে চাঁদের আলো বারান্দার মেঝেতে এসে পড়েছে। চাঁদের আলোয় নিলার মুখটা অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছিল।
মেহরাব নিলাকে পেছন থেকে পেঁচিয়ে ধরে বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। নিলার চুলে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে মেহরাব নিচু স্বরে বলল, "নিলা, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ? সেই রাতের কড়া কথাগুলোর কথা কি এখনো তোমার মনে পড়ে?"
নিলা মেহরাবের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে শান্তভাবে উত্তর দিল, "সেই রাতের কথা আমার মনে আছে ঠিকই, কিন্তু অনুযোগ হিসেবে নয়। ওই রাতটা না আসলে হয়তো আমি কোনোদিন আপনার এই মায়াবী রূপটা দেখতে পেতাম না। আপনার সেই কড়া কথার পর বৃষ্টি আর এই আঁকড়ে ধরা—সবটাই যেন আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের কাছে উপহার হয়ে এসেছিল।"
মেহরাব নিলার গালে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল, "তুমি সত্যিই অনেক ভালো নিলা। আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি।"
মেহরাব নিলাকে কোলে তুলে নিয়ে আবার ঘরে ফিরে এল। কবাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাইরে আলো-আঁধারির খেলায় মেখে গেল তাদের একান্ত ঘরটি। মেহরাবের প্রতিটি সোহাগে, প্রতিটি নিবিড় স্পর্শে নিলার প্রতি তার ভালোবাসা আরো গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। মেহরাবের হৃদয়ে এখন শুধুই নিলার রাজত্ব, আর নিলার মনে এখন মেহরাবই তার একমাত্র ভরসার আকাশ।
সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। মেহরাব আর নিলার ভালোবাসার রঙিন সংসারটি এখন যেন আরো বেশি সুবাসিত, আরো বেশি পরিপূর্ণ। মেহরাবের সেই পুরনো তীব্র রাগ আর মেজাজের কড়া ছাপ এখন একেবারেই বিলীন হয়ে গেছে। যে ঘরে একসময় ভয়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করত, সেই ঘরে এখন সারাদিন বইতে থাকে এক অনাবিল শান্তির বাতাস।
মেহরাব এখন প্রতিদিন কাজ শেষ করে সোজা বাড়ি ফিরে আসে। কোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা নেই, কোনো অহেতুক দেরি নেই। তার সমস্ত জগত এখন নিলাকে ঘিরে। প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় নিলার জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসা তার নিয়মে পরিণত হয়েছে—কখনো নিলার পছন্দের বেলি ফুলের গাজরা, কখনো বা পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গরম জিলাপি, আবার কখনো নতুন সুতি শাড়ি।
নিলাও স্বামী হিসেবে মেহরাবকে উজাড় করে ভালোবাসে। স্বামীর যত্ন নেওয়া, তার প্রতিটি পছন্দের খেয়াল রাখা এবং একই সাথে পরিবারের সবার সেবা করা—সবই নিলা করে পরম সুখে।
সেদিন ছিল এক মেঘলা বিকেল। বাইরে হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। মেহরাব একটু সকালেই কাজ সেরে ঘরে ফিরে এসেছে। নিলাকে নিয়ে তিন তলার বারান্দায় বসে তারা দুজন ধোঁয়া ওঠা চা উপভোগ করছিল।
মেহরাব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নিলার দিকে তাকাল। নিলার পরনে লাল রঙের একটি সুতি শাড়ি, কপালে ছোট টিপ আর খোঁপায় গোঁজা তাজা বেলি ফুল। মেহরাব চায়ের কাপটা একপাশে রেখে নিলার হাত দুটো নিজের মুঠোয় চেপে ধরল।
"কী দেখছেন এত?" নিলা একটু লাজুক হেসে শুধাল।
"দেখছি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্তকে," মেহরাব নিলার হাতের পিঠে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল। "আজ থেকে কয়েকমাস আগের সেই কালবোশেখী ঝড়ের রাতটার কথা মনে আছে নিলা?"
নিলা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, "মনে থাকবে না আবার? সেই রাতে আপনি যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন!"
মেহরাব পরম অনুশোচনায় নিলার গালে হাত রেখে বলল, "আল্লাহর দরবারে আমি শত কোটি শুকরিয়া জানাই নিলা, তিনি আমাকে সময়মতো হেদায়েত দিয়েছেন। আমি কত বড় মূর্খ ছিলাম যে তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়েছিল। তবে আজ আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি—আমার জীবনের সব গাম্ভীর্য, সব রাগ এখন তোমার এই ভালোবাসার সাগরে ডুবে গেছে।"
নিলা মেহরাবের বুকের ওপর মাথা রেখে শান্ত স্বরে বলল, "আমার আর কোনো আফসোস নেই ওগো। আপনি আমাকে যেভাবে ভালোবেসে আগলে রেখেছেন, একজন নারীর জীবনে এর চেয়ে বড় আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে?"
মেহরাব নিলাকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। বাইরে বৃষ্টির মিষ্টি ছাঁট তাদের স্পর্শ করে যাচ্ছিল, আর ভেতরে তারা দুজনে উপভোগ করছিল একে অপরের হৃদয়স্পন্দন।
রাত বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টির শব্দ আরও তীব্র হতে লাগল। মেহরাব ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিল। ঘরের ভেতরে জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আবছা আলোয় মেহরাব নিলাকে তার বুকে টেনে নিল। মেহরাবের গভীর সোহাগ আর ভালোবাসার বন্যায় নিলা নিজেকে হারিয়ে ফেলল পরম তৃপ্তিতে। তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি ক্ষণ এখন যেন এক গভীর অনুরাগের কাব্য।
মেহরাব নিলার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু একে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও নিলা, তুমি আমার দ্বীনের ও ইহকালের অর্ধাঙ্গিনী। মরণ পর্যন্ত তোমাকে এভাবেই ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখব।"
নিলা মেহরাবের গলা জড়িয়ে ধরে শান্ত মনে চোখ বুজল। জীবনের ঝড় কেটে গিয়ে তাদের সংসারে এখন চিরস্থায়ী সুখের রোদ হাসছে। ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে শুরু হওয়া তাদের এই সম্পর্কটি আজ গভীর ভালোবাসা, সম্মান আর অপার্থিব সোহাগের শক্ত বাঁধনে পরিণত হয়েছে, যা কোনোদিন ভাঙার নয়।
....