নীরবতার গভীরে লুকোনো আকুলতা

পাহাড়ের গায়ে ঘন কুয়াশা জমে থাকলে দূর থেকে মনে হয় গোটা শহরটাই যেন এক অলৌকিক বাষ্পের সাগরে ভাসছে। মেঘলা সকালের সেই কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে খাগড়াছড়ির শান্ত, নির্জন আঁকাবাঁকা পথ ধরে যখন বাসটা এগোচ্ছিল, মায়া তখন গাড়ির কাচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঢাকার ইট-কাঠের খাঁচা, প্রতিদিনের ট্রাফিক জ্যাম, অফিসের কৃত্রিম শীতাতপ যন্ত্রের ঠাণ্ডা বাতাস আর যান্ত্রিক ব্যস্ততা ছেড়ে হঠাৎ এই সবুজ পাহাড়ের কোলে নিজেকে আবিষ্কার করাটা তার জন্য সহজ ছিল না।

একটা বহুজাতিক এনজিও-র ফিল্ড অ্যাসাইনমেন্টে মায়াকে ছয় মাসের জন্য পাহাড়ি অঞ্চলের এই ছোট শহরে বদলি করা হয়েছে। ক্যারিয়ারের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রস্তাবটা ফেরাতে পারেনি সে, কিন্তু বুকজুড়ে ছিল অজানা এক শঙ্কা আর শহরের কোলাহল হারানোর হালকা কষ্ট। গাড়ি থেকে নেমে যখন সে নিজের কাঁধের ভারি ব্যাগটা সামলে দাঁড়াল, পাহাড়ি বাতাসের তাজা ও ঠান্ডা পরশ তার মুখে এসে লাগল।

মায়ার জন্য একটা পুরোনো কাঠের বাংলো টাইপ কটেজ ঠিক করা হয়েছিল। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত সেই কটেজের সামনের বারান্দায় দাঁড়ালে পুরো উপত্যকা চোখে পড়ে। প্রথম দু-তিন দিন অফিসের কাজে আর নিজের ঘর গোছাতেই কেটে গেল। অফিসের সহকর্মীরা সবাই বেশ আন্তরিক, কিন্তু মায়ায় মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকত সন্ধ্যার পরেই। কারণ, এই শহরে সন্ধ্যা নামলেই অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা ছেয়ে যায়, যা ঢাকার মেয়ে মায়ার অভ্যস্ত জীবনের একেবারেই বিপরীত।

চতুর্থ দিনের বিকেলে ঝুম বৃষ্টি নামল। পাহাড়ের বৃষ্টি যেন কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না, এক নিমেষে আকাশ কালো করে মুষলধারে ঝরতে শুরু করে। মায়া তখন কটেজের অদূরে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিয়েছে। বাঁশের তৈরি ছোট টং দোকান, চাল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। দোকানে মায়া ছাড়া আর কেউ ছিল না, কেবল কোণে এক তরুণ বসে ছিল। হাতে একটা কাঠের ছোট টুকরো আর ধারালো ছুরি, সে খুব মন দিয়ে কী যেন খোদাই করছিল।

মায়া খেয়াল করল, ছেলেটার গায়ে একটা হালকা ছাই রঙের জ্যাকেট, চুলগুলো কিছুটা উস্কোখুস্কো আর চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। সে নিজের খেয়ালেই কাজ করে যাচ্ছিল, মায়ার উপস্থিতিকে যেন পাত্তাই দিল না। শহরে সবাই মায়ার দিকে কৌতুহল নিয়ে তাকায়, কারণ সে নতুন মুখ। কিন্তু এই তরুণ একদম ব্যতিক্রম।

"এক কাপ আদা চা পাওয়া যাবে?" মায়া দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল।

দোকানদার কিছু বলার আগেই কোণের ছেলেটি মুখ না তুলে গম্ভীর গলায় বলল, "চাচা ভেতরে গেছে। একটু দাঁড়ান, উনি চা বসাচ্ছেন।"

ছেলেটির গলার স্বর ভারী, শান্ত কিন্তু কেমন যেন রুক্ষ। মায়া হালকা একটু বিরক্ত হলো। কথা বলার ভঙ্গিতে কোনো সৌজন্য নেই। মায়া কেবল বলল, "ওহ, ঠিক আছে।"

কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে যখন দোকানদার এলো, তখনো বৃষ্টি কমেনি। মায়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কোণে বসা ছেলেটির দিকে আবার তাকাল। ছেলেটি এখন কাঠের খোদাই কাজ বন্ধ করে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিল।

"আপনি কি স্থানীয়?" মায়া কৌতুহল সামলাতে না পেরে প্রশ্নটা করল।

ছেলেটি ধীরে ধীরে চোখ ফেরাল। তার চোখের দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল, যা মায়ার বুকের ভিতর হালকা একটা দুলুনি দিল। কুচকুচে কালো মনি, কিন্তু গভীরতা অনেক।

"না। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এখানেই আছি। নাম রুদ্র," সংক্ষেপে উত্তর দিল সে।

"আমি মায়া। ঢাকা থেকে এসেছি, একটা এনজিও-র কাজে..."

মায়াকে কথা শেষ করতে না দিয়েই রুদ্র উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে বৃষ্টিতে ভিজেই দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। তার এমন অসামাজিক আর উদাসীন ব্যবহারে মায়ার মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। শহরে কত লোক মায়ার সাথে দুটো কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকে, আর এই রুদ্র তাকে পাত্তাই দিল না! চরম এক অহংকারী আর অভদ্র ছেলে বলে মনে হলো তার রুদ্রকে।

কিন্তু পাহাড়ের আবহাওয়া আর ভাগ্যের খেলা বোঝা দায়। পরের সপ্তাহেই মায়াকে পাহাড়ি অঞ্চলের এক দুর্গম গ্রামে গিয়ে স্থানীয় নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর ডেটা সংগ্রহ করতে হলো। পথ সুগম নয়, কাদা আর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যেতে হবে। অফিসের গাড়ি একটা দূর পর্যন্ত গিয়ে আর যেতে পারল না। চালক জানাল, সেখান থেকে বাইকে বা হেঁটে যেতে হবে, আর পাহাড়ি পথে পথপ্রদর্শক হিসেবে যাকে রাখা হয়েছে সে ইতিমধ্যেই সেখানে অপেক্ষা করছে।

গাড়ি থেকে নেমে মায়া যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, তাকে দেখে তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। কালচে জিন্স আর কাদার দাগ লাগা বুট পরে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র। হাতে দুটো হেলমেট।

"আপনি?!" মায়া অবাক হয়ে বলল।

রুদ্র কোনো আবেগ প্রকাশ না করে একটা হেলমেট মায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। "রাস্তা খুব একটা ভালো না। বাইকের পেছনে বসলে শক্ত করে ধরে রাখবেন, নয়তো পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।"

মায়ার ইচ্ছে করছিল কাজ বাতিল করে ফিরে যেতে। এই গম্ভীর, খিটখিটে আর অভদ্র ছেলেটার সাথে সে বাইকের পেছনে বসে যাবে? কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব তাকে আটকে দিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হেলমেটটা মাথায় পরে সে রুদ্রর বাইকের পেছনে গিয়ে বসল।

বাইক চলতে শুরু করার পরই মায়া বুঝল পাহাড়ি পথের ভয়াবহতা। খাড়া ঢাল আর বাঁকে বাইক যখন দুলছিল, মায়াকে না চাইতেও রুদ্রর শক্ত কাঁধ দুটো চেপে ধরতে হলো। রুদ্রর গায়ের থেকে কড়া বৃষ্টির জল আর পাহাড়ি হাওয়ার একটা অদ্ভুত গন্ধ আসছিল। রুদ্রর পিঠের সাথে মায়ার স্পর্শ লাগতেই মায়ার শরীরে কেমন যেন এক অচেনা শিহরণ খেলে গেল। রুদ্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাইক চালাচ্ছিল, তার প্রতিটা মুভমেন্ট ছিল একদম নিখুঁত আর নিয়ন্ত্রিত।

হঠাৎ একটা গভীর গর্তে বাইকের চাকা পড়তেই মায়া সামলাতে না পেরে রুদ্রর কোমর জড়িয়ে ধরল ভয়ে।

বাইক থামাল রুদ্র। ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। হেলমেটের ভেতর থেকে রুদ্রর গভীর চোখ দুটো মায়ার একদম কাছাকাছি। মায়ার বুকের ভেতর তখন হাতুড়ির পেটন চলছে।

"ঠিক আছেন?" রুদ্রর কণ্ঠে এবার আর আগের মতো রুক্ষতা ছিল না, কিছুটা কোমলতা ছিল।

মায়া দ্রুত রুদ্রর কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিল। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল লজ্জায়। "হ্যাঁ... হ্যাঁ, ঠিক আছি। আপনি একটু সাবধানে চালাতে পারেন না?"

রুদ্রর ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটল—যা মায়া এই প্রথম দেখল। হাসলে ছেলেটাকে অবিশ্বাস্য রকমের আকর্ষণীয় লাগে।

"পাহাড়ের পথ সাবধানেই চলছি, মায়া। শহর আর পাহাড় কিন্তু এক নয়। এখানে ভয় পেলে চলবে না, শক্ত হয়ে ধরে রাখতে জানতে হয়।"

রুদ্রর শেষ কথাটার অর্থ কেবল বাইক চালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না যেন। মায়ার মনে হলো, রুদ্রর কণ্ঠের সেই গভীরতা আর চোখের দৃষ্টি তাকে কেমন যেন এক অজানা মোহের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের বাতাসে প্রথমবার মায়ায় নিজের হৃদস্পন্দন এত স্পষ্টভাবে শুনতে পেল, আর সেই স্পন্দনের নাম যেন হয়ে উঠছিল—রুদ্র।

বাইকের পেছনে বসে থাকার সেই মুহূর্তটার পর থেকে মায়ার ভেতরের পুরো জগৎটাই যেন এক ওলটপালট হয়ে গেল। আগে যে রুদ্রকে মায়ার ভীষণ অসামাজিক, অভদ্র আর অহংকারী মনে হতো, সেই রুদ্রর দিকে এখন মায়া আর চোখ তুলে সহজভাবে তাকাতে পারে না। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা আর বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে যখন তারা সেই দুর্গম গ্রামে পৌঁছাল, তখন রুদ্রর রূপ যেন একেবারেই বদলে গেল।

গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো রুদ্রকে দেখেই চিল চিৎকার করে ছুটে এলো। রুদ্র তার জ্যাকেটের পকেট থেকে কিছু চকলেট আর রঙিন পেনসিল বের করে তাদের হাতে তুলে দিল। মায়া কটেজের এক কোণে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছিল, যে ছেলেটা শহরের মানুষের সাথে দুটো কথা বলতে ইতস্তত করে, সে এই পাহাড়ি মানুষগুলোর সাথে কত সাবলীলভাবে হেসে হেসে কথা বলছে! তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে, বয়স্ক মানুষের কাঁধে হাত রেখে পরম মমতায় কথা শুনছে।

দিনভর গ্রামের নারীদের সাথে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করতে মায়ার বেশ পরিশ্রম হয়েছিল। বিকেলে কাজ শেষ হতে হতে আকাশ আবার কালচে মেঘে ছেয়ে গেল। পাহাড়ি আবহাওয়ার কোনো ভরসা নেই। রুদ্র এসে মায়ার পাশে দাঁড়াল।

"ঝড় নামবে মনে হচ্ছে। মায়া, আমাদের এখনই রওনা হতে হবে। পাহাড়ি কাদার রাস্তায় বৃষ্টি নামলে বাইক নামানো খুব বিপজ্জনক হয়ে যাবে।"

মায়া মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।

তারা বাইক নিয়ে কিছুটা পথ এগোতেই নামল কালবৈশাখীর মতো তুমুল ঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি। বাতাসের তোড়ে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার উপক্রম। রুদ্র বাইক থামাতে বাধ্য হলো। রাস্তার পাশে পাহাড়ের খাঁজে তৈরি একটা ছোট পরিত্যক্ত কাঠের মাচা বা কুঁড়েঘর পাওয়া গেল। কোনো মতে বাইকটা একপাশে দাঁড় করিয়ে রুদ্র আর মায়া সেই কুঁড়েঘরের চালে আশ্রয় নিল।

চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। কুঁড়েঘরের ছোঁড়া বাঁশের বাতা ডিঙিয়ে ঝাপ্টা বাতাস আর বৃষ্টির জলের কণা ভেতরে ঢুকে গায়ে লাগছে। মায়ার গাছে পরনের সুতির জামা ভিজে একাকার। ঠান্ডায় তার শরীর ঠকঠক করে কাঁপছিল। পাহাড়ের এই ঠাণ্ডা বৃষ্টি যেন হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়।

রুদ্র জ্যাকেটটা খুলে এক ঝাকুনি দিয়ে পানি ফেলে দিল। তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে দেখল মায়া থরথর করে কাাঁপছে, তার ঠোঁট দুটো নীল হয়ে এসেছে।

রুদ্র আর এক মুহূর্ত ইতস্তত না করে এগিয়ে এলো। নিজের পরনের হালকা সুতির শুকনো চাদর জাতীয় জ্যাকেটটা মায়ার গায়ে জড়িয়ে দিল।

"না, আপনার ঠান্ডা লাগবে..." মায়া বাধা দিতে চাইল।

"চুপ করে থাকুন," রুদ্র শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।

রুদ্র মায়ার আরও কাছে সরে এলো। কুঁড়েঘরটা এতই ছোট যে দুজন মানুষের মাঝখানে খুব বেশি দূরত্ব রাখার উপায় ছিল না। বাতাসের একটানা গর্জন আর টিনের চালে বৃষ্টির সোঁদাগন্ধী শব্দের মাঝে মায়া নিজের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল।

রুদ্র দেশলাই জ্বালিয়ে কুঁড়েঘরের কোণে থাকা কিছু শুকনো কাঠের ছাল আর পাতা দিয়ে ছোট করে আগুন জ্বালাল। আগুনের লালচে আলোয় রুদ্রর মুখের ধারালো অবয়ব ফুটে উঠল। তার ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে কপালে আর বুকে। মায়ায় চোখ ফেরাতে পারছিল না। শহরের চকচকে, সুসজ্জিত, মেকি পুরুষদের চেয়ে এই পাহাড়ি বাতাসে ভিজে থাকা রুদ্রকে তার অনেক বেশি পুরুষালী আর রহস্যময় মনে হতে লাগল।

"আপনি এত কম কথা বলেন কেন, রুদ্র?" আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল মায়া।

রুদ্র আগুনের দিকে তাকিয়েই থেকে হালকা হাসল। "শব্দ অনেক সময় মিথ্যা বলে, মায়া। নীরবতা কখনো মিথ্যা বলে না। পাহাড়ে মানুষ যত কম কথা বলে, তত পাহাড়কে বেশি শুনতে পায়।"

"কিন্তু সব নীরবতা কি ভালো? কোনো কোনো নীরবতা তো অন্যকে কষ্টও দেয়," মায়া রুদ্রর চোখের দিকে তাকাল।

রুদ্র প্রথমবার মায়ার চোখে চোখ রাখল। আগুনের আলো তাদের দুজনের মুখের ওপর নাচছিল। রুদ্র ধীরে ধীরে মায়ার আরও কাছে সরে এলো। এতটাই কাছাকাছি যে মায়া তার গায়ের উত্তাপ অনুভব করতে পারছিল। রুদ্র হাত বাড়িয়ে মায়ার কপালে লেপটে থাকা ভিজে চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল।

রুদ্রর হাতের আঙুলের উষ্ণ পরশ মায়ার ত্বকে স্পর্শ করতেই মায়ার যেন নিঃশ্বাস আটকে গেল। শরীরে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর শিহরণ খেলে গেল তার। মায়া চোখ বুজে ফেলল এক অচেনা আবেশে।

"সব নীরবতা কষ্টের নয়, মায়া," রুদ্রর কণ্ঠস্বর ছিল একদম নিচু, গভীর আর নেশাক্ত। "কিছু নীরবতা থাকে, যেখানে দুটো মন কোনো কথা না বলেও সব বুঝে যায়।"

মায়া চোখ মেলল। রুদ্রর চোখ দুটো এখন তার ঠোঁটের দিকে নেমে এসেছে। রুদ্রর হাত মায়ার গাল বেয়ে নেমে এসে ধরে রাখল তার ঘাড়ের কাছে। মায়ার হৃদস্পন্দন তখন এত দ্রুত চলছিল যে মনে হচ্ছিল তার বুক ফেটে যাবে। মায়া পালাতে চায়নি, বরং নিজেকে রুদ্রর এই অচেনা উষ্ণতার গভীরে সঁপে দিতে চেয়েছিল।

রুদ্র মায়ার মুখের আরও কাছে ঝুঁকে এলো। মায়া স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল রুদ্রর তপ্ত নিঃশ্বাস তার গালে আর ঠোঁটে পড়ছে। শহর, কাজ, অতীতের সব স্মৃতি যেন এই পাহাড়ি বৃষ্টির রাতে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। মায়ার ভেতরে এক চরম কামনার আর ভালোবাসার জোয়ার উঠছিল।

ঠিক তখনই ঝড়ের একটা প্রচণ্ড ঝাপ্টায় কুঁড়েঘরের একপাশের বাঁশের ঝাঁপ খসে পড়ল। সেই শব্দে যেন দুজনেরই মোহাচ্ছন্নতা ভেঙে গেল।

রুদ্র ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিল। নিজের হাত দুটো শক্ত করে এক করে বসল সে। রুদ্রর চোখে একটা অদ্ভুত কষ্ট আর দ্বিধা ফুটে উঠল, যা মায়াকে বিভ্রান্ত করে দিল।

"ঝড় কমে এসেছে। আমাদের যাওয়া দরকার," রুদ্র একদম ঠান্ডা গলায় বলল, যেন কিছুক্ষণ আগে তাদের মধ্যে কিছুই ঘটেনি।

কিন্তু মায়া জানে, যা ঘটে গেছে, তা মোছার কোনো উপায় নেই। মায়ার বুকের ভেতর ভালোবাসার এক প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাত ঘটে গেছে। সে রুদ্রকে ভালোবেসে ফেলেছে—নিঃশর্তভাবে, গভীর ব্যাকুলতায়। কিন্তু রুদ্র কেন মাঝপথে এমন ব্যাকুল হয়েও নিজেকে গুটিয়ে নিল? রুদ্রর ওই কষ্টমাখা চোখের পেছনে কিসের এত বড় দ্বিধা লুকিয়ে আছে?

বাইক যখন শহরের দিকে ফিরছিল, মায়া এবার আর ভয়ের কারণে রুদ্রকে ধরল না; সে নিজের ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার নিয়ে রুদ্রর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ভেজা পিঠে নিজের গাল চেপে রাখল। রুদ্রও এবার তাকে বাধা দিল না, কেবল বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল পাহাড়ের অন্ধকার বুক চিরে।

সেই বৃষ্টির রাতের পর থেকে মায়া আর রুদ্রর সম্পর্কটা যেন একদম বদলে গেল। পাহাড়ি শহরের নিস্তব্ধ বাতাসও এখন তাদের ভেতরের সেই অব্যক্ত অনুভূতির কথা বলত। মায়া এখন আর আগের মতো কটেজে বন্দি হয়ে থাকে না। প্রতিদিন বিকেল হলেই সে অফিসের কাজ সেরে ছোট চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসে, যেখানে রুদ্র কাঠ খোদাই করে কিংবা একমনে কটেজের বারান্দায় বসে বই পড়ে।

রুদ্রর মাঝেও এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছিল। আগে সে যেমন মায়াকে দেখলে একদম চুপ করে থাকত বা এড়িয়ে যেত, এখন আর তা করত না। মায়া সামনে এলে রুদ্রর চোখের কোণে এক চিলতে মিহি আলো ফুটে উঠত। তবে তার সেই মোহাচ্ছন্ন গম্ভীর ভাবটা কিন্তু কমেনি। পাহাড়ি এই রুক্ষ আর একলা মানুষটার ভেতরের এই গভীরতাই মায়াকে আরও তীব্রভাবে আকর্ষণ করত।

এক শান্ত বিকেলেই ঘটনা। পাহাড়ের সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে তলিয়ে যাচ্ছে। পুরো আকাশজুড়ে লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের এক রূপকথার ক্যানভাস। রুদ্র মায়াকে নিয়ে পাহাড়ের একদম চূড়ার এক নির্জন ভিউপয়েন্টে নিয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে পুরো শহরটাকে ছোট খেলনাবাড়ির মতো দেখায়।

পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস মায়ার চুলগুলো উড়িয়ে রুদ্রর চোখেমুখে ফেলছিল। মায়া হালকা হেসে তার উরন্ত চুলগুলো সামলাতে চাইল।

"থাক না, বেশ লাগছে তো," রুদ্র আলতো করে বলল।

মায়া চমকে রুদ্রর দিকে তাকাল। রুদ্র তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তার চোখে একরাশ গভীর ভালোবাসা আর আকুলতা।

মায়া পা বাড়িয়ে রুদ্রর একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে এখন কেবল এক আঙুলের দূরত্ব। "রুদ্র, আপনি আমার কাছে একটা রহস্যের মতো। এত কাছে আসেন, অথচ মনে হয় অনেক দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন। কেন এমন করেন?"

রুদ্র একমুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মায়ার দুটো হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। রুদ্রর হাতের তালুর উষ্ণতা মায়ার শরীরের রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে পড়ছিল।

"মায়া, কিছু মানুষ পাহাড়ের মতো একা থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু কিছু মায়া এসে সেই অভ্যাসে আগুন ধরিয়ে দেয়," রুদ্রর গলায় ভালোবাসার চরম আর্তি ঝরে পড়ছিল।

রুদ্র মায়ার হাত দুটো টেনে নিয়ে নিজের বুকের ওপর রাখল। মায়া হাতের তালুতে অনুভব করল রুদ্রর হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন। শহরের কোনো পুরুষের কাছে মায়া এমন খাঁটি, এতটা তীব্র ভালোবাসা কখনো পায়নি।

রুদ্র এক হাত দিয়ে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। মায়ার শরীর কেঁপে উঠল এক অজানা আবেশে। রুদ্র তাকে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে টেনে নিল। তাদের চারপাশের বিশ্ব যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

"মায়া... আমি হয়তো চাইলেও তোমাকে আমার জীবন থেকে মুছে ফেলতে মানব না," রুদ্র বিড়বিড় করে বলল।

মায়া নিজের দু-হাত দিয়ে রুদ্রর ঘাড় জড়িয়ে ধরল। রুদ্রর উষ্ণ ঠোঁট মায়ার কপালে, গালে পরম মমতায় আর তীব্র কামনায় নেমে এলো। মায়া চোখ বুজে সেই স্পর্শ নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে অনুভূতির সাগরে শুষে নিতে লাগল। রুদ্রর ঠোঁট যখন মায়ার ঠোঁট ছুঁয়ে দিল, তখন পাহাড়ি হাওয়ায় যেন ভালোবাসার এক প্রবল অগ্ন্যুৎপাত ঘটে গেল। মায়াও নিজের সমস্ত ব্যাকুলতা দিয়ে রুদ্রকে আঁকড়ে ধরল। তাদের এই গভীর চুম্বন ছিল পাহাড়ি সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে বোনা এক অমলিন প্রেমের সাক্ষ্য।

সেই রাতের পর তাদের দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কাটতে লাগল। পাহাড়ের নির্জন পথ ধরে হাত ধরে হাঁটা, ঝরনার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো আর এক অপরকে জানার ব্যাকুলতা। রুদ্র মায়াকে পাহাড়ি নানা ফুলের মালা বানিয়ে দিত, মায়ার ভেজা চুলে আঙুল চালিয়ে ব্যাকুল হয়ে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে রাখত। মায়া পুরোপুরি রুদ্রর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। সে ভুলেই গিয়েছিল যে তার পাহাড়ে থাকার মেয়াদ মাত্র ছয় মাসের।

কিন্তু সুখে থাকা দিনগুলোর সাথে সাথেই সময়ও দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল। দেখতে দেখতে দেখতে মায়ার ফিল্ড অ্যাসাইনমেন্টের শেষ মাস চলে এলো।

একদিন সকালে ঢাকা হেড অফিস থেকে ফোন এলো। মায়ার কাজের রিপোর্ট তারা অত্যন্ত পছন্দ করেছে। তাকে পদোন্নতি দিয়ে ঢাকায় মূল কার্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী সপ্তাহেই তাকে ঢাকা ফিরে যেতে হবে।

খবরটা শোনার পর মায়ার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ এক অজানা ভীতি আর শূন্যতা ভর করল। এই শহর, এই পাহাড়, এই মেঘ—আর সবার ওপরে রুদ্র! রুদ্রকে ছেড়ে সে ঢাকায় কীভাবে ফিরে যাবে? সে কি পারবে আবার সেই যান্ত্রিক শহরের ইট-কাঠের খাঁচায় ফিরে যেতে, যেখানে রুদ্রর বুক জড়িয়ে শোয়ার উত্তাপ থাকবে না?

মায়া দৌড়ে রুদ্রর কটেজের দিকে গেল। তার চোখ দুটি পানিতে টলমল করছিল। আজ তাকে রুদ্রর সাথে শেষ সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। সে রুদ্রকে বলবে, রুদ্র যেন তার সাথে ঢাকায় চলে যায়, কিংবা সে নিজেই চাকরি ছেড়ে এই পাহাড়েই রুদ্রর পাশে সারাজীবন থেকে যাবে। কিন্তু মায়া জানত না, কটেজের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার জন্য অপেক্ষা করছে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা।

কটেজের কাঠের দরজাটা আধখোলা ছিল। মায়া বুকের ভেতর একরাশ উৎকণ্ঠা আর জলছবি নিয়ে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।

টেবিলের ওপর অগোছালোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কতগুলো পুরনো খবরের কাগজের কাটিং, কিছু আইনি নথি আর কতগুলো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি। ঘরের কোণে একটা বড় ভ্রমণ ব্যাগ অর্ধেক গোছানো অবস্থায় পড়ে আছে। আর রুদ্র ঘরের জানালায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে একটা মদের গ্লাস। তার চোখেমুখে সেই চিরচেনা ভালোবাসার বদলে এখন ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত নির্দয়তা আর গভীর বিষাদ।

"রুদ্র...?" মায়ায় থমকে যাওয়া কণ্ঠস্বর ঘরটিতে প্রতিধ্বনিত হলো।

রুদ্র মায়ার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে আজ এক ফোঁটাও প্রেম নেই, বরং এমন এক বরফশীতল দূরত্ব যা মায়াকে স্তব্ধ করে দিল।

"তুমি এখানে কেন এসছ, মায়া?" রুদ্রর কণ্ঠ একদম যান্ত্রিক।

"অফিস থেকে ফোন এসেছিল... আমার ঢাকায় ফেরার সময় হয়ে গেছে, রুদ্র। আগামী সপ্তাহেই আমাকে চলে যেতে হবে," মায়া কান্নার বেগ সামলে এগিয়ে গেল। "আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, রুদ্র। তুমি আমার সাথে ঢাকায় চল, নয়তো আমি এই পাহাড়ে তোমার কাছে থেকে যাব! আমি চাকরি ছেড়ে দেব!"

মায়া রুদ্রর হাত দুটো আঁকড়ে ধরতে চাইল। কিন্তু রুদ্র এক ঝটকায় মায়ার হাত ছাড়িয়ে দিল। মায়া ছিটকে খানিকটা পিছিয়ে গেল।

"ঢাকায় চলে যাও, মায়া। আর কখনো এই পাহাড়ে ফিরে আসার ভুল কোরো না," রুদ্র একদম ঠান্ডা গলায় বলল।

"তুমি কী বলছ এসব?!" মায়ার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ল। "এতদিন যা ঘটল আমাদের মাঝে... সেই সব স্পর্শ, সেই গভীর রাতগুলো, বৃষ্টির রাতের চুম্বন, আমার ঠোঁটে তোমার ঠোঁটের সেই ব্যাকুলতা... সব কি মেকি ছিল? তুমি কি আমাকে একটুও ভালোবাসোনি?"

রুদ্র মায়ার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মায়ার ভেজা চোখে চোখ রেখে এক নিষ্ঠুর হাসি হাসল। "ভালোবাসা? মায়া, পাহাড়ের নির্জনতা মানুষকে সাময়িক অন্ধ করে দেয়। ওটা কেবলই দুটো শরীর আর দুটো একা মনের আকর্ষণ ছিল, অন্য কিছু নয়। তুমি শহরের মেয়ে, আবেগ বেশি। এটাকে ভালোবাসা ভেবে ভুল কোরো না।"

কথাগুলো যেন মায়ার বুকে চাবুকের মতো এসে লাগল। মায়ায় বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই রুদ্রই কয়েক দিন আগে তাকে বুক জড়িয়ে ধরে বলেছিল সে মায়াকে ভুলতে পারবে না!

"মিথ্যা কথা!" মায়া চিৎকার করে উঠল। "তোমার চোখ বলছে তুমি মিথ্যা বলছ! রুদ্র, তুমি আমার দিকে তাকিয়ে বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো না!"

মায়া আকুল হয়ে রুদ্রর বুকের জ্যাকেট চেপে ধরল। রুদ্রর ঠোঁট জোড়া কাঁপছিল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছিল মায়ার এই করুণ ব্যাকুলতায়। রুদ্রর ইচ্ছে করছিল মায়াকে বুকে টেনে নিয়ে সব সত্য বলে দিতে, কিন্তু সে নিজের আবেগকে চরম নিষ্ঠুরতায় দমন করল। সে মায়ার দু-হাত শক্ত করে ধরে বুক থেকে সরিয়ে দিল।

"তুমি সত্য জানতে চাও, তাই তো?" রুদ্র টেবিলে থাকা খবরের কাগজের কাটিং আর নথিপত্রগুলো মায়ার দিকে ছুঁড়ে দিল। "দেখো এগুলো।"

মায়া কাঁপতে থাকা হাতে মেঝেকে পড়ে থাকা কাগজগুলো তুলল। পাঁচ বছর আগের খবরের কাগজের হেডলাইন—ঢাকার নামকরা চিকিৎসকের স্ত্রী ও সন্তানের রহস্যাবৃত মৃত্যু: প্রধান অভিযুক্ত স্বামী পলাতক।

নথিপত্রে রুদ্রর পুরো নাম লেখা—রুদ্র চৌধুরী। সে কোনো পাহাড়ি সাধারণ কাঠ খোদাইশিল্পী নয়, সে ঢাকার একজন সাবেক প্রখ্যাত সার্জন। পাঁচ বছর আগে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। আর সেই দুর্ঘটনার পেছনে রুদ্রর এক সহকর্মীর ষোড়যন্ত্র ছিল, যার জন্য রুদ্রকে অপরাধী বানিয়ে আইনি মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। রুদ্র আইন আর সমাজের চোখ থেকে নিজেকে লুকিয়ে এই পাহাড়ে এসে আত্মগোপন করে আছে। সে এক পলাতক আসামী, এক ভাঙা সত্তা, যার কোনো ভবিষ্যত নেই।

"আমি এক মৃত মানুষ, মায়া," রুদ্রর কণ্ঠ এবার ভাঙা শোনালো, কিন্তু সে কঠোর থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। "আমার অতীত রক্তে আর অভিশাপে মাখা। পুলিশ এখনও আমাকে খুঁজছে। যেকোনো দিন আমার ঠাঁই হবে জেলে, অথবা নিঃসঙ্গ কোনো মৃত্যুতে। তুমি আমার জীবনে কেবল এক পথভুল করা পথিক। তোমার সাথে আমার কোনো ভবিষ্যত নেই।"

মায়া স্তম্ভিত হয়ে নথিপত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তার পুরো পৃথিবীটা এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল। যে মানুষকে সে নিজের জীবন বলে মেনে নিয়েছিল, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক অন্ধকার অতীত!

"তুমি কি ভেবেছিলে, আমার মতো এক পলাতক আসামীর সাথে তুমি সুখী হবে?" রুদ্র মায়ার কানের কাছে গিয়ে বিষাক্ত সুর জড়িয়ে বলল। "আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি মায়া, পাহাড়ের একঘেয়েমি কাটাতে। এবার নিজের সুশৃঙ্খল শহরে ফিরে যাও। আমাকে ভুলে যাও।"

মায়ায় আর নিজেকে সামলাতে পারল না। একরাশ অপমান, বিশ্বাসভঙ্গ আর চরম ভালোবাসার যন্ত্রণায় তার বুক ফেটে কান্না এলো। সে রুদ্রর দিকে এক করুণ দৃষ্টি ফেলে সজোরে কটেজের দরজার বাইরে ছুটে বেরিয়ে গেল।

রুদ্র জানালার কাচ ধরে দাঁড়িয়ে দেখল মায়া পাহাড়ি কাদার পথ ধরে কেঁদে কেঁদে ছুটে চলে যাচ্ছে। মায়া যখন দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, রুদ্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাতে থাকা মদের গ্লাসটা দেওয়ালে আছড়ে ভেঙে ফেলল সে। হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠল রুদ্র।

"আমাকে ক্ষমা করে দিও, মায়া... তোমাকে বাঁচাতেই যে আমাকে তোমার নজরে শয়তান হতে হলো," রুদ্র বিড়বিড় করে কাঁদতে লাগল।

মায়াকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু তার অন্ধকার অতীতের ছায়া মায়ার সুন্দর জীবনে পড়ুক, তা রুদ্র কোনোদিন হতে দেবে না। তাই নিজের ভালোবাসাকে হত্যা করে মায়াকে তার থেকে দূরে ঠেলে দিল সে।

পরদিন সকালে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার শেষ বাস। কটেজে বসে মায়া সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি। তার বুকজুড়ে কেবল রুদ্রর সেই নিষ্ঠুর কথাগুলো আর তার চোখের পেছনের লুকানো কান্নাটা তোলপাড় করছিল। মায়াকে এখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা নিতে হবে—সে কি এই সত্যি মেনে নিয়ে চিরতরে ঢাকায় ফিরে যাবে, নাকি রুদ্রর এই সাজানো মিথ্যার পেছনের খাঁটি ভালোবাসাটাকে খুঁজে বের করবে?

ঢাকার বাসের টিকিটটা মায়ার হাতে মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। বাসের ইঞ্জিন চালু হয়ে গেছে, চারপাশের যাত্রীরা নিজেদের সিটে গিয়ে বসছে। মায়া বাসের কাচের মধ্য দিয়ে বাইরের ঘন কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়গুলোর দিকে তাকাল। তার চোখের কোণ বেয়ে অবিন্যস্তভাবে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। রুদ্রর সেই নিষ্ঠুর কথাগুলো—'আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি'—বারবার তার কানে বাজছিল।

কিন্তু বাসের চাকা যখন ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল, মায়ার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলো। সে রুদ্রর চোখ দুটোকে কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। যে মানুষের চোখে মায়াকে স্পর্শ করার সময় সমুদ্রের মতো গভীর আর খাঁটি আকুলতা ফুটে উঠত, সেই মানুষটা কোনোদিন মেকি হতে পারে না! রুদ্রর সেই কঠোর কথার পেছনে লুকিয়ে থাকা নিঃশব্দ কান্নাটা মায়া স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল। রুদ্র তাকে ভালোবাসে না বলে তাড়িয়ে দেয়নি, বরং নিজের অন্ধকার অতীত থেকে মায়াকে রক্ষা করতেই সে এই শয়তানের মুখাভিনয় করেছে।

"গাড়ি থামান!" মায়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

বাসের চালক আর যাত্রীরা অবাক হয়ে তাকাল। মায়া আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। নিজের ভারী ব্যাগপত্র বাসেই ফেলে রেখে কেবল হৃদয়ের তীব্র টানে সে বাস থেকে নেমে দৌড়াতে শুরু করল। পাহাড়ি কাদার আঁকাবাঁকা পথ ধরে সে ছুটে চলল রুদ্রর কটেজের দিকে। বৃষ্টি আবার নামতে শুরু করেছে, বাতাসের তোড়ে তার চুলগুলো উড়ছিল, পায়ে কাদা লেগে সে কয়েকবার আছাড়ও খেল, কিন্তু মায়াকে আজ কোনো কিছুই থামাতে পারবে না।

আধা ঘণ্টা টানা দৌড়ে মায়া যখন রুদ্রর কটেজের সামনে পৌঁছাল, তখন কটেজের দরজা খোলা। ভেতরে রুদ্র ট্রাভেল ব্যাগের জিপ বন্ধ করছিল। তার কটেজ ছাড়ার সব আয়োজন শেষ। সে আজই এই শহর ছেড়ে অন্য কোনো অজপাড়াগাঁয়ে লুকিয়ে পড়তে চেয়েছিল, যেন মায়াকে আর কখনো দেখতে না হয়।

মায়াকে দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে দেখে রুদ্রর হাত থেকে ব্যাগটা পড়ে গেল। রুদ্রর চোখে চরম বিস্ময় আর একরাশ যাতনা ফুটে উঠল।

"মায়া?! তুমি... তুমি এখনো যাওনি? বাস তো ছেড়ে দেওয়ার কথা!" রুদ্র নিজেকে সামলে নিয়ে আবার সেই রুক্ষ গলার সুর আনার চেষ্টা করল। "এখানে কেন এসেছ আবার? আমি তো তোমাকে সব বলে দিয়েছিলাম!"

মায়া এক পা এক পা করে ভেতরে ঢুকল। তার সারা শরীর বৃষ্টিতে ভিজ একাকার, কপালে আর হাঁটুতে কাদার দাগ, কিন্তু তার চোখ দুটোতে ছিল এক অবিচল, পর্বতসম দৃঢ়তা।

মায়া রুদ্রর একদম সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়াল। কিছু না বলে সে সজোরে রুদ্রর গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। চড়ের শব্দটা নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনি তৈরি করল।

রুদ্র চমকে উঠে গাল চেপে ধরে মায়ার দিকে তাকাল।

"তুমি খুব বড় অভিনেতা, তাই না রুদ্র?" মায়ার চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর ছিল অকম্পিত। "তুমি ভেবেছিলে তোমার ওই সাজানো মিথ্যাগুলো আমি বিশ্বাস করব? তুমি ভেবেছিলে আমাকে শয়তান সেজে তাড়িয়ে দিলেই আমি আমার ভালোবাসাকে ভুল বুঝে চলে যাব?"

"মায়া, তুমি বোঝছ না..." রুদ্র মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

মায়া দু-হাত দিয়ে রুদ্রর মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। "আমি সব বুঝি, রুদ্র! তুমি নিজেকে এক পলাতক আসামী ভাবো, তাই তো? তুমি ভাবো তোমার অতীত আমার জীবন নষ্ট করে দেবে? কিন্তু তুমি কি এটা বোঝো না যে, তোমাকে ছাড়া এই সুন্দর জীবনটা আমার জন্য এক জ্যান্ত কবর ছাড়া আর কিছুই নয়?"

রুদ্রর ভেতরের শক্ত বাঁধটা এবার এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল। মায়ার এই পাগলামি, এই নিঃশর্ত আর নির্ভীক ভালোবাসা রুদ্রর সব প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। রুদ্রর চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

"আমি এক অভিশপ্ত মানুষ, মায়া..." রুদ্র কাঁপানো গলায় বিড়বিড় করল। "আমার সাথে থাকলে তোমাকে সারাজীবন পালিয়ে বেড়াতে হতে পারে, সমাজ তোমাকে আঙুল তুলবে..."

"তুলুক!" মায়া রুদ্রর ঠোঁটে নিজের হাত রাখল। "পুরো পৃথিবী একদিকে আর তুমি একদিকে, রুদ্র। আমি তোমার অতীতকে ভালোবাসিনি, আমি ভালোবেসেছি এই মানুষটাকে—যে পাহাড়ে কাঠ খোদাই করে, যে ঝড়ের রাতে আমাকে নিজের চাদরে ঢেকে রাখে, যে নীরবতায় কথা বলে। তোমার আইনি লড়াই হোক বা পালিয়ে বেড়ানো, আমি তোমার প্রতিটা পদক্ষেপে তোমার হাত ধরে থাকব।"

রুদ্র আর নিজের ভেতরের সুপ্ত ব্যাকুলতাকে আটকে রাখতে পারল না। সে এক চরম কামনায় আর গভীর ভালোবাসায় মায়াকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মায়ায় নিজের মুখ রুদ্রর তপ্ত বুকে গুঁজে দিল। রুদ্র মায়ার কপালে, গালে আর ঠোঁটে ব্যাকুল হয়ে নিজের স্পর্শ এঁকে দিতে লাগল—যেন পাঁচ বছরের জমে থাকা সব অন্ধকার, সব একা থাকা এই এক মুহূর্তে মায়ার ভালোবাসায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে।

"আমি তোমাকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না, মায়া... কখনোই না," রুদ্র মায়ার চুলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

"কাউকে ছাড়তে হবে না, রুদ্র," মায়া রুদ্রর মুখটা তুলে ধরে তার চোখে চোখ রাখল। "আমরা ঢাকায় ফিরব। কিন্তু পালিয়ে নয়। আমি তোমার সাথে থেকে সেই পাঁচ বছর আগের মিথ্যা মামলার আইনি লড়াই লড়ব। তোমাকে মুক্ত করব। আর যদি পাহাড়েই ফিরতে হয়, তবে একদিন সত্যিটাকে জয় করেই আমরা এই পাহাড়ে নিজেদের ছোট্ট একটা ঘর বানাব।"

রুদ্র মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে এক নতুন আলোর দিশা পেল। এতদিন সে কেবল পালিয়ে বেরিয়েছে, কিন্তু আজ মায়ার ভালোবাসা তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর আর বেঁচে থাকার সাহস এনে দিয়েছে।

কটেজের বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি থামতে শুরু করেছে। মেঘ সরিয়ে পাহাড়ি চূড়ায় আবার এক চিলতে মিষ্টি রোদ ফুটে উঠছে। রুদ্র মায়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। ঢাকা ফেরার বাস হয়তো চলে গেছে, কিন্তু তাদের জীবনের আসল যাত্রা—ভালোবাসার শক্তিতে অতীতকে জয় করার যাত্রা—আজ কেবল শুরু হলো।

....
👁 16