ত্যাগের অন্তরালে অপবাদ

শ্রাবণের মেঘগুলো যেন আকাশজুড়ে এক বিশাল কালো চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা পৌনে সাতটা। গুলশান দুই নম্বর বাসস্ট্যান্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। আচমকা নামা মুষলধারে বৃষ্টিতে সাময়িক আশ্রয় খুঁজতে সবাই হুটোপুটি খেয়ে আটকে পড়েছে পেছনের যাত্রীছাউনিটুকুর নিচে।

রাইসা তার ভেজা সুতি ওড়নাটা জড়িয়ে ধরে এককোণে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। সন্ধ্যার শেওলা ধরা আলো আর গুড়ি গুড়ি পানির ঝাঁপটায় চারপাশটা কেমন যেন আবছা দেখাচ্ছে। অফিসের কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার এই সময়টাতেই বৃষ্টিটা নামতে হলো! বাস আসার কোনো লক্ষণ নেই, সিএনজিওয়ালারা দ্বিগুণ ভাড়া হেঁকেও রাজি হচ্ছে না। হাতের ব্যাগটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে রাইসা নিজের ভেজা জুতোটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই মাথার ওপরের ঠাণ্ডা পানির ফোঁটা পড়া হুট করে বন্ধ হয়ে গেল।

বিস্মিত হয়ে মুখ তুলতেই রাইসার চোখ আটকে গেল কালো এক জোড়া গভীর চোখের ওপর। তার মাথার ওপর সুশৃঙ্খলভাবে ধরা একটা বড় কালো ছাতা। ছাতাটা ধরে আছে এক তরুণ। পরনে নেভি ব্লু শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। বৃষ্টির ছাট এসে ছেলেটার একপাশের কাঁধ একদম ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার পুরো মনোযোগ রাইসার ওপর।

"আপনি অনেকটাই ভিজে গেছেন। ছাতাটা ধরুন," ছেলেটার কণ্ঠস্বর বেশ ভারী, কিন্তু অদ্ভুত এক পেলবতা আছে তাতে।

রাইসা একটু ইতস্তত করে বলল, "না... মানে, ঠিক আছে। আপনি ভিজছেন তো।"

"আমি পুরুষ মানুষ, একটু বৃষ্টিতে ভিজলে কিছু হবে না। আর আপনার শরীর ছোঁয়া বাতাস কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা," ছেলেটি ঠোঁটের কোণে মৃদু একটু হেসে ছাতার বাঁটটা রাইসার হাতের কাছে এগিয়ে দিল।

রাইসা আঙুল দিয়ে ছাতাটা ধরতে গিয়ে ভুলবশত তরুণটির হাত স্পর্শ করে ফেলল। এক মুহূর্তের সেই সামান্য উষ্ণ ছোঁয়া রাইসার বুকের ভেতর এক অজানা কম্পন সৃষ্টি করল। ইলেকট্রিক শকের মতো একটা অনুভূতি বিদ্যুৎ বেগে খেলে গেল তার সমস্ত শিরায়-উপশিরায়। রাইসা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। নিজের অজান্তেই রক্তিম হয়ে উঠল তার দু’গাল।

"আমার নাম আবীর," ছাতাটা রাইসার হাতে স্থির করে দিয়ে তরুণটি হাত বাড়িয়ে দিল বৃষ্টির পানির দিকে।

"আমি রাইসা," খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল সে।

আবীর রাইসার দিকে তাকাল। বৃষ্টি ভেজা এই আলো-আঁধারিতে রাইসাকে সত্যি কোনো রূপকথার কবিতার মতো লাগছে। কপালে এসে পড়া কয়েকটা ভেজা চুল, ঠোঁটের সামান্য কাঁপন আর সেই মায়াবী হরিণচোখ—আবীর যেন প্রথম দর্শনেই হারিয়ে গেল এক নাম না জানা মোহে। সেদিন রাতের ধূলিমলিন বাসস্ট্যান্ডে বৃষ্টির শব্দের মাঝেও দুজন মানুষের হৃদয়ের শব্দ যেন পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। আবীর রাইসাকে বাসে তুলে দেওয়া পর্যন্ত ছাতা ধরে পাশে দাঁড়িয়ে রইল। গাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে জানালার কাঁচের ওপাশ থেকে রাইসা যখন আবীরের দিকে তাকাল, আবীর এক অদ্ভুত সুন্দর হাসি দিল। সেই হাসি রাইসার মনে সারারাত এক মিঠে ঢেউ তুলে রাখল।

সেই থেকে শুরু। কাকতালীয়ভাবে বা ইচ্ছে করেই হোক, পরের দিনগুলোতেও গুলশানের সেই নির্দিষ্ট মোড়টিতে রাইসার সাথে আবীরের নিয়মিত দেখা হতে লাগল। কখনো একসাথে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ লাল চা হাতে ফুটপাতে হাঁটা, তো কখনো আবার ঝুম বৃষ্টির রাতে রিকশার হুড তুলে দিয়ে শহর ঘোরার গল্প।

মাস চারেক কেটে গেল। তাদের সম্পর্কের রসায়ন কেবল পরিচয়ে আটকে রইল না, রূপ নিল এক সুগভীর প্রেমে। আবীরের উপস্থিতি রাইসার জন্য হয়ে উঠল বাতাসে শ্বাস নেওয়ার মতোই স্বাভাবিক ও জরুরি। আবীর ছিল ভীষণ যত্নশীল। রাইসার একটু মন খারাপের ভাষা সে বুঝে ফেলত মুহূর্তেই। রাইসা যখন কথা বলত, আবীর এমনভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে শুনত, যেন এই মহাবিশ্বে রাইসার কণ্ঠ ছাড়া আর কোনো সুরের অস্তিত্ব নেই।

একদিন রাতে ধানমন্ডি লেকের নির্জন পাড়ে দুজনে বসে ছিল। চারপাশটা নিস্তব্ধ, শুধু লেকের পানিতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর শহরের দূরবর্তী কোলাহলের প্রতিধ্বনি। আবীর রাইসার ডান হাতটা নিজের দুই হাতের উষ্ণতায় মুড়ে নিল।

"রাইসা?"

"বলো আবীর?" রাইসা আবীরের কাঁধে মাথা রেখে মৃদু স্বরে বলল।

"তোমার এই হাতটা আমি আর কখনো ছাড়তে চাই না। জীবন যতটাই কঠিন হোক, পরিস্থিতি যতটাই বিপরীতে যাক—আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?" আবীরের চোখে ভালোবাসার পাশাপাশি এক পরম ব্যাকুলতা ভেসে উঠল।

রাইসা আবীরের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো ছলনা ছিল না, ছিল কেবল অতল ভালোবাসা। রাইসা আবীরের বুকের কাছে আরও একটু চেপে এসে বলল, "তোমাকে বিশ্বাস না করলে যে আমি নিজেকেও বিশ্বাস করতে পারব না, আবীর। তোমাকে ছাড়া এখন আমার আর কোনো অস্তিত্ব নেই।"

আবীর রাইসার কপালে এক দীর্ঘ, গাঢ় পরশ এঁকে দিল। সেই স্পর্শে ছিল এক অপরিসীম আবেগ, এক পবিত্র অঙ্গীকার। বাতাস তখন তাদের চারপাশে ভালোবাসার সুর ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সবকিছু যেন একটা সুন্দর স্বপ্নের মতো এগোচ্ছিল।

কিন্তু রাইসা জানত না, এই পরম আনন্দের পেছনের অন্ধকারের ঘুনপোকাগুলো ইতোমধ্যেই তাদের কুরে কুরে খেতে শুরু করেছে। রাইসার পরিবার অর্থাৎ তার বাবা আকমল সাহেব ছিলেন বেশ অভিজাত এবং গম্ভীর মেজাজের মানুষ। কিন্তু ইদানীং রাইসা লক্ষ্য করছিল, তার বাবা মাঝরাতেই হুটহাট ঘুম থেকে উঠে পড়েন, ড্রয়িংরুমে পায়চারি করেন। এক অজানা আতঙ্কে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে থাকে।

ঘটনার সুত্রপাত ঘটে একদিন বিকেলে। আবীর আর রাইসা একসাথে উত্তরার এক ক্যাফেতে বসেছিল। কথা প্রসঙ্গে রাইসা তার পরিবারের কথা, তার বাবার পুরনো ব্যবসা আর বাবার এককালের পার্টনারের কথা বলছিল।

"বাবা প্রায়ই একটা পুরনো ঘটনার কথা ভেবে আফসোস করেন," রাইসা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল। "আজ থেকে বিশ বছর আগে বাবার পার্টনার নাকি বাবার সাথে বিরাট এক বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। সেই লোকটা বাবার সমস্ত সম্পত্তি কারচুপি করে নিজের নামে লিখে নিয়ে বাবাকে রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছিল। এমনকি সেই মানসিক আঘাতে আমার ছোট ফুপু মারা যান। সেই মানুষটার নাম নাকি ছিল মোজাম্মেল হক।"

কথাটা শোনামাত্রই আবীরের হাত থেকে কফির চামচটা সশব্দে টেবিলে পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আবীরের মুখের সব রঙ উবে গেল। তার উজ্জ্বল চোখ দুটোতে ফুটে উঠল এক অসীম আতঙ্ক আর বিহ্বলতা।

"কী হলো আবীর? তুমি এমন করে কাঁপছ কেন?" রাইসা উদ্বিগ্ন হয়ে আবীরের হাত স্পর্শ করতে গেল।

আবীর দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে হাঁপাচ্ছিল। "রাইসা... তোমার বাবার পার্টনারের নাম... মোজাম্মেল হক ছিল?"

"হ্যাঁ," রাইসা অবাক হয়ে বলল, "কেন বলো তো? তুমি কি ওনাকে চেনো?"

আবীর কোনো উত্তর দিল না। সে শূন্য দৃষ্টিতে রাইসার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে যেন এক অশুভ ঝড়ের সংকেত। রাইসার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। আবীরের এই আচমকা পরিবর্তন, তার ফ্যাকাশে মুখ আর এই অপ্রকৃতিস্থ নীরবতা যেন বড় কোনো বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

বৃষ্টির সেই রোমাঞ্চকর সন্ধ্যায় যে গল্পের সূচনা হয়েছিল, তার পেছনে যে এত বড় একটা ছায়া লুকিয়ে আছে, রাইসা তা কল্পনাও করতে পারেনি।

ক্যাফের ভেতর এসিটার ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যেও আবীরের কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে রাইসার কোনো প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে দ্রুতবিল পরিশোধ করে একপ্রকার পালিয়েই গেল সেখান থেকে। রাইসা স্তব্ধ হয়ে টেবিলে বসে রইল। তার মনে এক অদ্ভুত শঙ্কার জন্ম নিল—যে ছেলেটা তাকে আগলে রাখতে এক মুহূর্ত দেরি করে না, সে আজ তাকে এভাবে ফেলে চলে গেল?

পরের তিনটে দিন আবীরের ফোন বন্ধ। রাইসা শতবার চেষ্টা করেও তার সাথে যোগাযোগ করতে পারল না। মনের ভেতর জমে থাকা সন্দেহ আর আকুলতা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। শেষমেশ না পেরে রাইসা সিদ্ধান্ত নিল সে আবীরের বাসায় যাবে। আবীর তার আগের এক কথোপকথনে ধানমন্ডির সেই পুরানো দ্বিতল বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিল।

পরদিন বিকেলে রাইসা গিয়ে দাঁড়াল সেই বাড়ির সামনে। গেটে নাম লেখা—"হক মঞ্জিল"। ভেতরে ঢুকতেই রাইসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ড্রয়িংরুমে ঝুলানো একটি বড় বাঁধানো ছবি দেখে তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। ছবিতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন যে প্রবীণ ভদ্রলোক, রাইসার বাবার দেয়া বিবরণ অনুযায়ী তিনিই মোজাম্মেল হক! আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কিশোর বয়সের আবীর।

ঠিক তখনই আবীর দোতলা থেকে নেমে এল। রাইসাকে তাদের ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবীর পাথর হয়ে গেল।

"তুমি এখানে রাইসা?" আবীরের মেজাজ আজ একদম স্বাভাবিক নয়, তার কণ্ঠস্বরে গভীর বিষাদ।

"আবীর... এই লোকটা তোমার কে হন?" রাইসার কণ্ঠ কাঁপছিল, চোখে অশ্রুর সায়র।

আবীর চোখ নামিয়ে নিল। নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল, "তিনি আমার বাবা। মোজাম্মেল হক আমার বাবা, রাইসা।"

এক মুহূর্তে রাইসার পুরো পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেল। যে মানুষটার পরিবারের কারণে রাইসার বাবা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন, যে পরিবারের পাষাণ আচরণের কারণে তার ফুপু অকালে প্রাণ হারিয়েছিলেন—আবীর সেই পরিবারেরই সন্তান!

"তুমি... তুমি জানতে?" রাইসার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। "তুমি জানতে আমি কার মেয়ে? এজন্যই কি তুমি বৃষ্টিভেজা সেই সন্ধ্যায় আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলে? প্রতিশোধ নিতে? নাকি আমাদের পরিবারকে আরও একবার শেষ করে দিতে?"

আবীর দ্রুত এগিয়ে এসে রাইসার দুটো হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, "না রাইসা! আল্লাহর দোহাই লাগে এমন কথা বোলো না! আমি قسم খেয়ে বলছি, তোমাকে ভালোবাসার আগে আমি বিন্দুমাত্র জানতাম না তুমি আকমল সাহেবের মেয়ে। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি, রাইসা! আমার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই!"

"ছাড়ো আমাকে!" রাইসা তীব্র ঘৃণায় আবীরের হাত ঝেড়ে ফেলে দিল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল। "ভালোবাসা? যে পরিবারের হাতে আমার পরিবারের ধ্বংস লেখা হয়েছিল, সেই পরিবারের রক্তের সাথে আমি ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ব? কোনোদিন না! তোমার ছোঁয়াও এখন আমার কাছে বিষের মতো মনে হচ্ছে!"

"রাইসা, আমার কথাটুকু শোনো! অতীতে কী হয়েছিল তার পুরো সত্যিটা তুমি জানো না—" আবীর আকুতি জানিয়ে বলল।

"আর কোনো সত্যি শোনার বাকি নেই আবীর। তুমি আমার জীবন থেকে দূরে সরে যাও। আজকের পর থেকে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই। আমাকে আর কোনোদিন ফোন করবে না, আমার সামনে আসবে না।"

রাইসা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। আবীরের সমস্ত আকুল অনুনয় আর চিৎকার পেছনে ফেলে সে তীব্র গতিতে বের হয়ে এল বাড়িটা থেকে।

বাড়ি ফিরে রাইসা নিজেকে নিজের ঘরের ভেতরে বন্দি করে ফেলল। দরজায় খিল এঁটে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল তার বুকের ভেতরটা কেউ যেন টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। আবীরের সাথে কাটানো সেই মধুর স্মৃতিগুলো—সেই ঝুম বৃষ্টির ছাতা, লাল চা, লেকের পাড়ে আবীরের সেই উষ্ণ পরশ আর ভালোবাসার অঙ্গীকার—সবকিছু যেন এখন ধারালো ছুরি হয়ে তার বুকে বিঁধছে। ভালো সেও বাসে, তীব্রভাবে বাসে, কিন্তু নিজের বাবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা পরিবারের সন্তানকে কীভাবে মেনে নেবে সে?

অন্যদিকে আবীরের অবস্থাও বেগতিক। রাইসার চলে যাওয়ার পর সে ভেঙে পড়ল পুরোপুরি। কিন্তু সে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। রাইসার এই অপমান আর দূরত্ব সে সহ্য করতে পারছিল না, আবার রাইসাকে হারানো তার পক্ষে অসম্ভব। সে জানত, রাইসা যা জেনেছে তা কেবল মুদ্রার এক পিঠ। বিশ বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস না জানলে রাইসার এই ভুল বোঝাবুঝি কোনোদিন মিটবে না।

রাইসা নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু কাজের ফাঁকেই মনের অজান্তে ভেসে উঠত আবীরের সেই মায়াবী চোখ দুটো। তিনদিন পর রাইসা অফিস থেকে বের হতেই দেখতে পেল রাস্তার উল্টো পাশে দাঁড়িয়ে আছে আবীর। তার চোখের নিচে গভীর কালো দাগ, জামাকাপড় এলোমেলো, চোখ দুটো লাল। আবীর রাস্তার ওপাশ থেকেই রাইসার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রাইসা এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালেও, পর মুহূর্তেই পা চালিয়ে অন্য দিকে হেঁটে চলে গেল। সে নিজেকে শক্ত রাখতে চাইছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল।

আবীর পিছু ছাড়ল না। রাইসা যেখানেই যেত—অফিসের নিচে, বাসস্ট্যান্ডে—আবীর দূরে কোথাও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকত। সে রাইসার কাছে গিয়ে কোনো জোর করছিল না, শুধু নিজের উপস্থিতি দিয়ে বোঝাচ্ছিল সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

ঝড়বৃষ্টির আরেকটা রাত। রাইসা তার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের মুষলধারে বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল গলির মোড়ের ল্যাম্পপোস্টটার নিচে। ছাতা ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে আবীর! বৃষ্টিতে পুরো ভিজে চপচপ করছে সে, শরীর শীতে কাঁপছে, তবুও দৃষ্টি সোজা রাইসার বারান্দার দিকে।

রাইসার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। তার ইচ্ছে করছিল ছুটে নিচে গিয়ে আবীরকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি থেকে সরিয়ে আনতে, তার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে। কিন্তু বাবার সেই বিষণ্ণ মুখ আর ফুপুর করুণ পরিণতি তাকে আটকে দিল। রাইসা বারান্দার পর্দাটা টেনে ভেতরে চলে এল, কিন্তু চোখ দুটো বুজতেই আবীরের সেই ভিজে যাওয়া করুণ মুখটা ভেসে উঠল।

পরদিন সকালে রাইসা খবর পেল—আবীর তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। আর ঠিক তখনই রাইসার দরজায় এসে দাঁড়াল এক অচেনা মধ্যবয়সী লোক, যার হাতে একটি পুরনো ডায়েরি আর কিছু কাগজপত্র।

দরজায় দাঁড়ানো মাঝবয়সী লোকটিকে দেখে রাইসা কিছুটা অবাক হলো। লোকটির মুখাবয়বে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। হাতে একটা পুরনো চামড়ায় বাঁধানো লাল রঙের ডায়েরি আর কিছু আইনি কাগজপত্রের ফাইল।

"আপনি রাইসা?" লোকটির কণ্ঠস্বর খুব নীচু ও সশ্রদ্ধ।

"হ্যাঁ, আমি রাইসা। কিন্তু আপনি কে?" রাইসা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল।

"আমি মোজাম্মেল হক সাহেবের ব্যক্তিগত আইনজীবী, মোস্তাক আহমেদ। আবীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে আমাকে এই ফাইল আর ডায়েরিটা আপনার হাতে তুলে দিতে বলে গেছে। সে বলেছিল, তার ভালোবাসার শেষ পরীক্ষাটা যেন আমি আপনার কাছে পৌঁছে দিই।"

আইনজীবী মোস্তাক আহমেদ ডায়েরিটা রাইসার হাতে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "মা, তুমি যা শুনেছ বা জেনেছ, তা অর্ধেকমাত্র। সত্যের আরেকটা দিক আছে যা বিশ বছর ধরে ঢাকা পড়ে ছিল। তুমি এই ডায়েরিটা পড়লেই বুঝতে পারবে আবীর বা তার বাবা মোজাম্মেল সাহেব কোনো অপরাধী ছিলেন না।"

আইনজীবী চলে যাওয়ার পর রাইসা নিজের ঘরে এসে দরজা আটকে দিল। টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটার দিকে সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার হাত কাঁপছিল। আবীর এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে, আর এই ডায়েরিতে নাকি লুকিয়ে আছে সেই অতীত রহস্যের উত্তর! ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে রাইসা ডায়েরিটি খুলল। ডায়েরির পাতায় মোজাম্মেল হকের হাতের লেখা। ডায়েরির বিশ বছর আগের পাতাগুলোতে যে সত্য লেখা ছিল, তা পড়তে পড়তে রাইসার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল।

প্রকৃতপক্ষে, বিশ বছর আগে আকমল সাহেব এবং মোজাম্মেল হকের যৌথ ব্যবসায় বড় ধরনের আর্থিক তছরুপ করেছিল তাঁদেরই কোম্পানির তৃতীয় এক পার্টনার, কায়সার সাহেব। কায়সার অত্যন্ত চতুরতার সাথে সমস্ত জালিয়াতির দায় চাপিয়ে দিয়েছিল আকমল সাহেবের ওপর এবং আকমল সাহেবকে গ্রফতার করানোর চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু মোজাম্মেল হক সাহেব যখন এই চক্রান্তের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি আকমল সাহেবকে বাঁচানোর জন্য নিজের সমস্ত সম্পত্তি বন্ধক রেখে এবং নিজের ওপর সমস্ত দায়ভার তুলে নিয়ে আকমল সাহেবকে মামলা থেকে রেহাই পাইয়ে দেন। মোজাম্মেল সাহেব নিজে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন কেবল তাঁর বন্ধু আকমল সাহেবকে নিঃশ্বাসের বাতাসটুকু ফিরিয়ে দিতে!

কিন্তু কায়সার সাহেব আকমল সাহেবের মনকে এমনভাবে বিষিয়ে দিয়েছিলেন যে, আকমল সাহেব ধরে নিয়েছিলেন মোজাম্মেল হকই আসল অপরাধী। আর রাইসার ফুপুর যে করুণ মৃত্যু হয়েছিল, তা ছিল কায়সার সাহেবের পাঠানো গুন্ডাদের ভয়ে পালাতে গিয়ে হওয়া এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা! মোজাম্মেল সাহেব নিজের ওপর এই অপবাদ নীরবে সহ্য করে গেছেন, কিন্তু বন্ধু আকমল সাহেবের কাছে কোনোদিন নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি। তিনি চাননি আকমল সাহেব জানুক যে তাঁর বিশ্বাস করা অন্য পার্টনার কায়সারই ছিল আসল শয়তান।

ডায়েরির শেষ পাতায় আবীরের নিজের হাতে লেখা একটি ছোট্ট চিঠি রাখা ছিল।

"রাইসা, আমার বাবা সারা জীবন যে অপবাদ সহ্য করে গেছেন, আমি চাইনি সেই অপবাদের বোঝা আমাদের পবিত্র ভালোবাসাকে ধ্বংস করে দিক। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি রাইসা। বাবার মতো আমিও হয়তো আমার ভালোবাসাকে রক্ষা করতে গিয়ে শেষ হয়ে যাব, কিন্তু কোনোদিন তোমার ভালোবাসাকে মিথ্যে হতে দেব না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিলেও আমি ধন্য, না করলেও আমার এই আত্মা শুধু তোমাকেই ভালোবেসে যাবে।"

চিঠিটা পড়ে রাইসার বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় হয়ে গেল। অঝোরে জল ঝরতে লাগল তার চোখ থেকে। কী ভয়ঙ্কর এক ভুল বোঝাবুঝির ওপর দাঁড়িয়ে সে আবীরকে এতবড় অপমান করেছিল! যে ছেলেটি বৃষ্টিতে ভিজে তার জন্য অপেক্ষা করেছে, যে ছেলেটির বাবা তাদের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য নিজের সবকিছু কুরবানি দিয়েছিলেন—সেই আবীরকে সে বিষের মতো দূরে ঠেলে দিয়েছে!

রাইসা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। চোখের জল মুছতে মুছতে সে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে এল। বাইরে তখনো হালকা বৃষ্টি পড়ছে। রাইসার মনে হচ্ছিল তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বহু দেরিতে ফেলা এক একটি অপরাধের অনুশোচনা। সে সোজা ছুটে গেল হাসপাতালে।

হাসপাতালের ২০৪ নম্বর কক্ষ। বেডে শুয়ে আছে আবীর। অক্সিজেন মাস্ক মুখে লাগানো, স্যালাইনের নল হাতে, শরীর প্রচণ্ড জ্বরে পুড়ছে। তার চেহারার উজ্জ্বলতা উবে গিয়ে ফুটে উঠেছে এক গভীর মলিনতা। রাইসা ঘরে ঢুকেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আবীরের বেডের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আবীরের নিস্তেজ ডান হাতটা নিজের দু’হাতে জড়িয়ে ধরল।

"আবীর..." রাইসা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও আবীর! আমি খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছি! আমি সত্যিটা জানতাম না..."

রাইসার কান্নার শব্দে এবং তার অশ্রুর উষ্ণ ছোঁয়ায় আবীর আস্তে আস্তে চোখের পাতা খুলল। দুর্বল দৃষ্টিতে রাইসার দিকে তাকাল সে। মাস্কের ভেতর দিয়েই সে মৃদু হাসার চেষ্টা করল। তার কাঁপা কাঁপা হাতটা তুলে সে রাইসার ভেজা গাল স্পর্শ করল।

"রাইসা... তুমি এসেছ?" আবীরের অস্পষ্ট ক্ষীণ শব্দ রাইসার কানে পৌঁছাল।

"আমি এসেছি আবীর, আর কোনোদিন আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তুমি প্লিজ ভালো হয়ে যাও," রাইসা আবীরের হাতে নিজের মুখ গুঁজে কেঁদে উঠল।

আবীর পরম মায়ায় রাইসার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তাদের এই অশ্রুসিক্ত পুনর্মিলনে ঘরের বাতাসও যেন এক নিবিড় ভালোবাসার আবেগে ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু তাদের এই ভালোবাসার পথ কি এত সহজেই মসৃণ হয়ে যাবে? রাইসার বাবা আকমল সাহেব কি এই বিশ বছরের পুরনো সত্য মেনে নিয়ে আবীরকে রাইসার জীবনে স্থান দেবেন?

হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ কেবিনে রাইসা এক মুহূর্তের জন্যও আবীরের পাশ ছাড়ল না। দিন-রাত এক করে সে আবীরের সেবা করতে লাগল। আবীরের তীব্র জ্বর আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল, কিন্তু তার শরীরের দুর্বলতা তখনও কাটেনি। রাইসা যখন পরম যত্ন সহকারে বাটিতে করে হালকা স্যুপ আবীরের ঠোঁটের কাছে তুলে ধরত, আবীর মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদৃষ্টিতে রাইসার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।

"তুমি এভাবে নিজের যত্ন না নিয়ে আমার পেছনে এত সময় নষ্ট করছ কেন রাইসা?" আবীর ক্ষীণ অথচ গভীর স্বরে বলল, তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো রাইসার গালে ভেসে থাকা ক্লান্তির ছাপ স্পর্শ করে।

রাইসা আবীরের গালে নিজের হাত রেখে মৃদু হেসে বলল, "তোমার যত্ন নেওয়া মানেই যে আমার নিজের যত্ন নেওয়া, আবীর। তোমাকে এভাবে হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমার আত্মা কেঁপে উঠেছিল। আমার জীবনের সবটুকু আলো তো তোমার ওই কালো দুটো চোখের ভেতরেই।"

আবীরের চোখে জল চলে এল। সে রাইসার ভেজা হাতটা তুলে ধরে নিজের ঠোঁটে শক্ত করে চেপে রাখল। সেই গভীর চুম্বনে ছিল অনুরাগের পরম উত্তাপ, এক জন্মজন্মান্তরের নিবিড় প্রতিশ্রুতি। কেবিনের সেই নরম আলোয় তাদের দুজনের হৃদয়ের স্পন্দন যেন এক হয়ে বাজছিল। রাইসা তার কপাল আবীরের কপালে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বুজল—সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি গলে গিয়ে সেখানে তখন কেবল ভালোবাসার প্লাবন।

কিন্তু রাইসা জানত, তাদের এই ভালোবাসার পথ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক করতে হলে তাকে এখন সবচেয়ে বড় বাধাটি পার হতে হবে—তার বাবা আকমল সাহেবকে সব সত্যি জানাতে হবে।

তিনদিন পর আবীরের শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে রাইসা সেই লাল ডায়েরি আর আইনজীবীর দেওয়া ফাইলটা নিয়ে সোজা ড্রয়িংরুমে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আকমল সাহেব তখন বিষণ্ণ মনে পেপার পড়ছিলেন। রাইসার থমথমে আর গম্ভীর মুখ দেখে তিনি পেপারটা পাশে সরিয়ে রাখলেন।

"কী হয়েছে রাইসা? তোকে ক'দিন ধরে খুব চিন্তিত আর ক্লান্ত লাগছে," আকমল সাহেব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন।

রাইসা বাবার সামনের কাঁচের টেবিলে লাল ডায়েরি আর আইনি ফাইলটা রেখে শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, "বাবা, আজ আমি তোমাকে এমন একটা সত্যি বলব, যা তুমি বিশ বছর ধরে ভুল জেনে আসছ। আর এই সত্যিটা শোনার পর তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুমি কাকে বিশ্বাস করবে।"

আকমল সাহেব ডায়েরির দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকালেন। "কিসের ডায়েরি এটা?"

"এটা মোজাম্মেল হক সাহেবের ডায়েরি," রাইসার কথা শেষ হওয়ার আগেই আকমল সাহেবের মুখ হিংস্র ও বিষণ্ণ হয়ে উঠল।

তিনি চেয়ার ছেড়ে একঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, "মোজাম্মেল! ওই বিশ্বাসঘাতকের নাম তুই আমার বাড়িতে নিচ্ছিস? যে লোকটা আমার সংসার ছারখার করেছিল, যার প্রতারণার কারণে তোর ফুপুর করুণ মৃত্যু হয়েছিল—"

"না বাবা! মোজাম্মেল চাচা কোনো বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না!" রাইসা উচ্চস্বরে কিন্তু কান্নাজড়ানো গলায় প্রতিবাদ করে উঠল। "আসল শয়তান ছিল কায়সার সাহেব! কায়সার তোমাকে জালিয়াতির মামলায় ফাঁসাতে চেয়েছিল, আর তোমাকে বাঁচানোর জন্য মোজাম্মেল চাচা নিজের সব সম্পত্তি বন্ধক রেখে নিজের ঘাড়ে সব অপবাদ তুলে নিয়েছিলেন!"

আকমল সাহেব এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রাইসার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে জল ঝরছিল। সে বাবাকে হাত ধরে এনে চেয়ারে বসাল এবং ডায়েরির পাতাগুলো খুলে দিল। মোজাম্মেল হকের বিশ বছর আগের সেই করুণ ও আবেগঘন স্বীকারোক্তি, সাথে আইনজীবীর সত্যায়িত কায়সারের সেই সমস্ত আসল ব্যাংকিং জালিয়াতির কাগজপত্র—সব কিছু আকমল সাহেবের চোখের সামনে তুলে ধরল।

আকমল সাহেব কাঁপতে থাকা হাতে ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগলেন। প্রতিটি লাইন পড়ার সাথে সাথে তাঁর মুখের কঠোর ভাব মিলিয়ে গিয়ে ফুটে উঠতে লাগল চরম বিহ্বলতা। বিশ বছর ধরে যে ক্ষোভ, ঘৃণা আর অপমানের আগুন তিনি বুকে পুষে রেখেছিলেন, তা যেন এক মুহূর্তেই অনুশোচনার ছাইয়ে পরিণত হলো। তাঁর হাত থেকে ডায়েরিটা নিচে পড়ে গেল।

"আমি... আমি মোজাম্মেলকে এত বড় ভুল বুঝলাম?" আকমল সাহেব দু'হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। "সে আমাকে জেল থেকে আর ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের সবকিছু কুরবানি করে দিল, আর আমি তাকে আজীবন অভিশাপ দিয়ে গেলাম?"

রাইসা বাবার হাঁটুতে মাথা রেখে বলল, "বাবা, মোজাম্মেল চাচার ছেলে আবীরকেই আমি ভালোবাসি। আর সেই আবীর আজ হাসপাতালে জীবনের সাথে লড়াই করছে। সেও তার বাবার মতো নিষ্পাপ, সে কেবল তার বাবার সম্মান ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল।"

আকমল সাহেব চোখ মুছে ধীরপায়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর চোখে তখন এক অপূরণীয় অপরাধবোধ আর ব্যাকুলতা। "চল রাইসা... আমাকে এখনই সেই ছেলেটার কাছে নিয়ে চল। আমি ওকে দেখতে চাই, আমি মোজাম্মেলের ছেলের কাছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলের ক্ষমা চাইব।"

রাইসা আর আকমল সাহেব দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও জানত না, বিশ বছর আগের সেই নির্মম সত্য প্রকাশ পাওয়ার খবর এতক্ষণে পৌঁছে গেছে আসল অপরাধী কায়সার সাহেবের কানেও। কায়সার সাহেব তার পুরনো পাপের বিচার এড়াতে এখন এক নতুন ও ভয়ানক চক্রান্তের জাল বুনছেন!

হাসপাতালের বারান্দা দিয়ে আকমল সাহেব যখন ধীরপায়ে এগোচ্ছিলেন, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন অনুশোচনার ভারী পাথরে পিষ্ট হচ্ছিল। কেবিনের দরজার কাঁচ দিয়ে আবীরকে দেখে তাঁর চোখে জল এসে গেল। আকমল সাহেব ভেতরে ঢুকে আবীরের শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

শব্দ পেয়ে আবীর চোখ মেলল। সামনে রাইসার বাবাকে দেখে সে দ্রুত ওঠার চেষ্টা করতেই আকমল সাহেব স্নেহভরে তার কাঁধে হাত রেখে তাকে থামালেন।

"উঠো না বাবা, শুয়ে থাকো," আকমল সাহেবের গলা বুজে আসছিল। তিনি আবীরের ভিজে যাওয়া হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। "আমাকে ক্ষমা করে দাও, আবীর। বিশ বছর ধরে আমি মোজাম্মেল আর তোদের ওপর অমানুষিক অন্যায় করেছি। তোর বাবার সেই মহান ত্যাগের কথা না জেনে আমি তাঁকে অভিশাপ দিয়েছি। আজ আমার পাপের অনুশোচনা করারও কোনো ভাষা নেই।"

আবীর চোখ ভিজে ওঠা হাসিতে আকমল সাহেবের দিকে তাকাল, "আপনি ক্ষমা চাইবেন না চাচা। বাবা সব সময় বলতেন, আপনার সাথে তাঁর সম্পর্কের বাঁধন অনেক গভীরে। তিনি শুধু নিজের বন্ধুর সম্মান রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। আজ আপনি সত্যিটা বুঝেছেন, বাবা ওপারে থেকেও হয়তো শান্তি পাচ্ছেন।"

এমন সময় কেবিনের বাইরে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ পাওয়া গেল। রাইসা দরজা খুলে দেখতে পেল, আইনজীবীর পাঠানো খবর পুলিশে পৌঁছানোর পর পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালে, আর তাদের সাথে হাতকড়া পরা অবস্থায় আটক করা হয়েছে কায়সারকে! বিশ বছর ধরে আড়ালে থাকা সেই আসল প্রতারক আজ নিজের অপরাধের শাস্তি থেকে আর বাঁচতে পারল না। কায়সার যখন পুলিশের গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, রাইসা আর আকমল সাহেব এক গভীর প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। অত অতীতের মেঘ অবশেষে কেটে গিয়ে সত্যের উজ্জ্বল আলো ফুটে উঠেছে।

তিন সপ্তাহ পর।

শ্রাবণের সেই অঝোর ধারা আজও নামছে, তবে আজকের বৃষ্টির রূপটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকাশে কোনো কালো মেঘের ঘনঘটা নেই, বরং হালকা এক স্নিগ্ধ আমেজ ছড়ানো। গুলশানের সেই পুরনো বাসস্ট্যান্ডে রিকশা থামাল আবীর। রাইসার হাতে সে একটি বড় কালো ছাতা তুলে দিল—ঠিক যেমনটা দিয়েছিল তাদের প্রথম দেখা হওয়ার সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।

রাইসা শাড়ি পরেছে, চুলগুলো পিঠে ছড়ানো। আবীরের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক মধুর হাসি। আবীর ছাতাটা মেলে ধরে রাইসার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দুজনের শরীরের দূরত্ব মিলিয়ে গেল এক পরম ভালোবাসার উত্তাপে।

"মনে আছে রাইসা, এই বাসস্ট্যান্ডেই তুমি আমার ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিলে?" আবীর রাইসার চিবুক ধরে আলতো করে ওপরে তুলল।

রাইসা আবীরের গাঢ় কালো চোখের গভীরে হারিয়ে গিয়ে বলল, "মনে থাকবে না কেন? সেদিন তো শুধু ছাতার নিচে আসিনি, সোজা তোমার মনের গহীনে ঢুকে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন কি জানতাম, এই ছাতাটা আমার সারাজীবনের আশ্রয় হয়ে উঠবে?"

আবীর রাইসার লালচে হয়ে যাওয়া গালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। সেই উষ্ণ পরশে রাইসার সারা শরীরে এক অনির্বচনীয় শিহরণ খেলে গেল। রাইসা লজ্জা আর আবেগে আবীরের বুকের মাঝে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলল। আবীর তার এক হাত দিয়ে রাইসার কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে ধরে রইল, যেন চিরকালের জন্য তাকে নিজের সাথে বেঁধে নিল।

বৃষ্টির টুপটুপ শব্দ, শেওলা ধরা আলো আর তাদের হৃদয়ের গভীর স্পন্দন যেন পুরো পৃথিবীকে এক অন্যরকম প্রেমে ভরিয়ে দিল।

....
👁 13