ছায়ানীড়ে দুষ্টুমির মিষ্টি যুদ্ধ

ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালিতে গোল দাগ দেওয়া তারিখটার পর আজ ঠিক তেইশ দিন হলো। ঢাকার ব্যস্ততা ছাড়িয়ে এই ঢাকার কাছের মফস্বল শহরটার শান্ত একপাড়ায় নাবিলদের দোতলা বাড়ি। বাড়িটার নাম 'ছায়ানীড়'। চারপাশটা গাছগাছালিতে ঘেরা, যেন এক চিলতে শান্তির বাগান। কিন্তু সেই শান্তির বাগানে তেইশ দিন আগে যে তুফান এসে উপস্থিত হয়েছে, তার নাম তিশা।

তিশা ছটফটে, দুরন্ত আর কথায় কথায় হেসে ওঠা এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। আর তার ঠিক বিপরীতে নাবিল—একটি প্রাইভেট ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, গম্ভীর, মেপে কথা বলা এবং চরম নিয়মকানুনে চলা এক গোছানো মানুষ। প্রতিদিন সকালে সাড়ে সাতটায় তার চা চাই, আটটায় প্রাতরাশ, আর পৌনে নয়টায় ল্যাপটপ ব্যাগে পুরে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা। বিয়ের তেইশটা দিনেই তিশা বুঝে গেছে, এই শান্ত-শিষ্ট জলপ্রপাতটাকে যদি একটু না কাঁপানো যায়, তবে জীবনে রোমাঞ্চের মারাত্মক অভাব ঘটবে। তাই স্বামী নামক এই অতল গম্ভীর মানুষটিকে একটু জ্বালানো, একটু চঞ্চল করে তোলার পূর্ণ দায়িত্ব সে নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে।

আজ শুক্রবার। সরকারি ছুটির দিন। নাবিলের সকালে ঘুম থেকে ওঠার কোনো তাড়া নেই। সকাল সাড়ে আটটা বাজে, জানালার পর্দা ভেদ করে হালকা মিষ্ট রোদ এসে পড়েছে বিছানার একপাশে। নাবিল উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে, এক হাত মাথার নিচে দেওয়া। নীল রঙা সুতির পায়জামা আর ফতুয়া পরে তিশা দরজায় এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে শয়তানির ঝিলিক। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা আদা-এলাচের গরম চা।

পা টিপে টিপে বিছানার পাশে এসে বসল তিশা। নাবিলের ঘুমন্ত চেহারার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল। লোকটা ঘুমালে একদম ছোট বাচ্চার মতো দেখায়। লম্বা পাপড়িগুলো চোখের কোলে লেপ্টে আছে, তামাটে রঙের কপালে দুটো চুলের গোছা এসে পড়েছে। তিশা চায়ের কাপটা সাইড টেবিলে রাখল। তারপর নিজের চুলের খোপার বাঁধনটা আস্তে করে খুলে দিল। তার কোমর ছাপানো একরাশ কালো চুল ছড়িয়ে পড়ল ঘাড়ের ওপর। তিশা নিচু হয়ে তার ভিজে ভিজে সুবাসিত চুলের ডগাটা এনে আলতো করে নাবিলের নাকে আর গালে বোলাতে লাগল।

নাবিল ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থাতেই একবার নাক কুঁচকাল। হাত দিয়ে অদৃশ্য কিছু একটা সরানোর চেষ্টা করল। তিশা মুখ চেপে হেসে আবার চুলগুলো তার গলায় বোলাতে লাগল। এবার নাবিল একটু বিরক্ত হয়ে গলার কাছে হাত নিয়েই শক্ত কিছু একটার স্পর্শ পেল—তিশার হাত।

চোখ না খুলেই গভীর ও ভারী গলায় নাবিল বলল, "তিশা, সকাল সকাল তোমার এই দুষ্টুমি শুরু না করলে চলছে না?"

তিশা চোখ গোল গোল করে বলল, "আরে! তুমি জেগে আছো? আমি তো ভাবলাম রাজপুত্র এখনো ঘুমিয়ে। ওঠো ওঠো, সকাল নয়টা বাজে। তোমার প্রিয় আদা চা ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে যাচ্ছে।"

নাবিল আস্তে করে চোখ খুলল। তিশার উজ্জ্বল, হাস্যোজ্জ্বল মুখটা তার ঠিক চোখের সামনে। তিশার গায়ের চন্দন আর হালকা বেলি ফুলের সুবাস নাবিলের নাকে এসে ধাক্কা দিল। এত সকালে এই দৃশ্যটা যে কোনো পুরুষের জন্যই এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করে। কিন্তু নাবিল তার মুখের গাম্ভীর্য ধরে রাখার প্রাণপণে চেষ্টা করে বলল, "নয়টা বেজে গেছে? তুমি আমাকে আগে ডাকোনি কেন?"

"তুমি এত সুন্দর করে ঘুমাচ্ছিলে যে তুলতে মন চাইল না," তিশা ঠোঁট উল্টে নির্দোষ ভঙ্গিতে বলল।

নাবিল দ্রুত উঠে বসার চেষ্টা করতেই ঘটল বিপদ। বিছানা থেকে পা নামাতে গিয়ে সে দেখল তার এক জোড়া জুতো বা চটি—কিচ্ছু বিছানার পাশে নেই। শুধু তাই নয়, সাইড টেবিলে তার প্রিয় চশমাটাও নেই।

নাবিল ভ্রু কুঁচকে তিশার দিকে তাকাল। "তিশা, আমার চশমা কোথায়?"

তিশা মেঝের দিকে তাকিয়ে যেন খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলল, "চশমা? অালমারির ওপরে ছিল না? নাকি বাথরুমে রেখে এলে? ইশ, তোমার না ভুলে যাওয়ার রোগ দিন দিন বাড়ছে নাবিল!"

নাবিল ভালো করেই জানে এটা তিশারই কাজ। কিন্তু প্রমাণের অভাবে সে কিছু বলতে পারছে না। চশমা ছাড়া তার চারপাশটা একটু অস্পষ্ট দেখায়। সে চশমা খোঁজার জন্য বিছানা থেকে নামতে গেল, অমনি তিশা তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।

"কোথায় যাচ্ছ? চা-টা তো শেষ করো!" তিশা আদুরে গলায় বলল।

নাবিল এক হাত তিশার হাতের ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল, "তুমি চশমাটা কোথায় লুকিয়েছ তিশা? ভালোয় ভালোয় দিয়ে দাও। আমার আজ অনেক কাজ আছে।"

"আমি লুকাব কেন?" তিশা মুখ বাঁকাল। "তুমি আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ! এত সকালে স্বামী ভালোবেসে চা করে নিয়ে এলো, আর তুমি তার নামে চুরি করার অপবাদ দিচ্ছ? খুব খারাপ তুমি!"

নাবিল নিঃশ্বাস ফেলল। তিশার এই নাটকীয় রূপ তার অজানা নয়। সে চায়ের কাপটা হাতে নিল। এক চুমুক দিয়েই নাবিলের মুখের হাঁ পরিবর্তন হয়ে গেল। প্রচণ্ড তেতো আর নোনতা! চায়ে চিনির জায়গায় সমুদ্রের লবণ আর বোধহয় একটু বেশিই আদা বেটে দেওয়া হয়েছে!

নাবিল কাশতে কাশতে চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে দিল। "তিশা! চায়ে কি দিয়েছ তুমি?"

তিশা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে যেন পুরো ঘরটা মুখরিত হয়ে গেল। সে নাবিলের কাশের তোয়াক্কা না করে তার খুব কাছে সরে এলো। বিছানায় নাবিলের একদম গা ঘেঁষে বসে তার দুহাতে নাবিলের শার্টের কলারটা চেপে ধরে নিজের দিকে একটু টেনে আনল।

"কেমন লাগল আমার স্পেশাল লাভ-টি?" তিশার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক, আর ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি।

নাবিল চোখ ছোট ছোট করে তিশার দিকে তাকাল। তিশার এত কাছে চলে আসা, তার তপ্ত নিঃশ্বাস নাবিলের ঠোঁটের ওপর এসে পড়া—নাবিলের গাম্ভীর্যের বরফ এক মুহূর্তে গলতে শুরু করল। নাবিল তিশার কোমরে তার শক্ত এক হাত পেঁচিয়ে ধরল। হঠাৎ এই টানে তিশা একটু হকচকিয়ে গেল, কিন্তু সামলে নিয়ে নাবিলের বুকের ওপর হাত রাখল।

"তুমি মনে করো তুমি একা দুষ্টুমি করতে পারো, তাই না?" নাবিল ফিসফিস করে বলল। তার কণ্ঠস্বর এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর ও গভীর, যা তিশার ভেতরে এক অজানা রোমাঞ্চের শিহরণ তৈরি করল।

তিশা নাবিলের চোখের দিকে তাকাল। চশমা ছাড়া নাবিলের এই ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে এখন এক অদ্ভুত নেশা। তিশা তো ভেবেছিল নাবিল হয়তো রেগে যাবে বা রাগ দেখিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবে। কিন্তু লোকটা তাকে এভাবে বুকে টেনে নেবে, তা সে ভাবেনি।

তিশা তোত্লাতে তোত্লাতে বলল, "না... মানে... তুমি তো গম্ভীর মানুষ। রাগ করবে ভেবেছিলাম..."

"রাগ?" নাবিল তিশার মুখের আরও কাছে সরে এলো। তাদের নাকের ডগা প্রায় ছুঁই ছুঁই। নাবিলের এক হাতের আঙুলগুলো তিশার কোমর ঘেঁষে পিঠের ওপর উঠে এলো। তিশা চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল এক অজানা আবেশে। হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই তিনগুণ বেড়ে গেছে তার।

নাবিল তিশার কানের কাছে গিয়ে অত্যন্ত নরম কিন্তু মাদকতাময় গলায় বলল, "আমার শোধ নেওয়ার কৌশলটা কিন্তু একদম অন্যরকম, তিশা। চায়ে লবণ দিয়েছ, তার শাস্তি তো পেতেই হবে।"

তিশা চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু স্বরে বলল, "কী... কী শাস্তি?"

নাবিল কিছু বলল না। তার ঠোঁট দুটি আলতো করে ছুয়ে গেল তিশার কানের লতি, তারপর আস্তে করে নেমে এলো তার উন্মুক্ত ঘাড়ের ওপর। তিশার পুরো শরীর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে কেঁপে উঠল। সে নাবিলের শার্টটা খামচে ধরল। নাবিলের উষ্ণ পরশ তার চামড়ায় এক তীব্র উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। যে লোকটা সারাদিন গম্ভীর থাকে, যার মুখে কথা কম, সেই লোকটার ভালোবাসার এই গভীর রূপ তিশাকে একদম অসার করে দিল।

নাবিল তিশার গাল দুটো দুহাতে ধরে তার মুখটা একটু ওপরে তুলল। তিশা চোখ খুলতেই দেখল নাবিল তার দিকে এক গূঢ় হাসিতে তাকিয়ে আছে। নাবিল তিশার গোলাপী ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো মিলিয়ে দিল। এক দীর্ঘ, গভীর আর আবেশময় চুমু। তিশা প্রথমটায় থমকে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সঁপে দিল নাবিলের এই ব্যাকুল আলিঙ্গনে। চায়ের তেতো স্বাদটা এক নিমেষে উবে গিয়ে যেন মধুর চেয়েও মিষ্টি এক অনুভূতিতে রূপ নিল।

বেশ কিছুক্ষণ পর নাবিল যখন তাকে ছাড়ল, তিশা তখন প্রায় হাঁপাচ্ছে। তার দুগল লাল হয়ে উঠেছে রক্তিম আভায়। সে চোখ তুলে নাবিলের দিকে তাকাতে পারছিল না।

নাবিল তার পকেট থেকে নিজের চশমাটা বের করে চোখে পরল। তারপর একটি মুচকি হাসি দিয়ে বলল, "তুমি ভেবেছিলে আমি জানতাম না চশমাটা আমার ড্রয়ারের পেছনে কভারের ভেতর লুকানো ছিল? আর আমার ফোনটা যে কাল রাতে তুমি বেডসাইড ল্যাম্পের পেছনে রেখেছ, সেটাও আমি জানি।"

তিশা হাঁ করে নাবিলের দিকে তাকাল। "তুমি... তুমি জানতে? তাও তুমি না জানার ভান করছিলে?"

"নাহলে তোমাকে এত কাছে পাওয়ার বাহানা কীভাবে পেতাম বল?" নাবিল একটু বাঁকা হেসে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।

তিশা বিছানায় বসে নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে রইল। তার বুক এখনো দুরুদুরু করে কাঁপছে। সে যে নাবিলকে জব্দ করতে গিয়ে নিজেই চরমভাবে জব্দ হয়ে গেল, তা বুঝতে তার বাকি রইল না।

সকালের ধাক্কা সামলে তিশা দুপুরবেলা আবার নতুন প্ল্যান আঁটল। ডাইনিং টেবিলে আজ দুপুরের খাবারের আয়োজন হয়েছে বেশ জমকালো। তিশার শাশুড়ি অর্থাৎ নাবিলের আম্মা পারভীন বেগম নিজের হাতে ইল মাছের ঝোল আর মুরগির কষা মাংস রান্না করেছেন। তিশা শাশুড়িকে সাহায্য করেছে।

খাবার টেবিলে সবাই বসেছে। নাবিলের আব্বা, আম্মা, নাবিল আর তিশা। নাবিল খেতে খুব ভালোবাসে, বিশেষ করে মুরগির রেজালা বা কষা মাংসের রান তার চরম প্রিয়। বাটিতে দুটোমাত্র খাসি কিংবা মুরগির লেগপিস থাকে।

পারভীন বেগম বললেন, "নাবিল, নে তোর পছন্দের রানের পিসটা নে।"

নাবিল বাটির দিকে হাত বাড়াতে যাবে, অমনি তিশা দ্রুত হাত চালিয়ে সবচেয়ে বড় লেগপিসটা তুলে নিজের প্লেটে নিয়ে নিল! শুধু তাই নয়, তিশা বাটির অন্য লেগপিসটাও তুলে নাবিলের আব্বার প্লেটে দিয়ে দিল।

নাবিল হাত বাড়িয়ে থমকে গেল। সে তিশার দিকে তাকাল। তিশা খুব নিষ্পাপ মুখে লেগপিসটায় এক কামড় দিয়ে বলল, "উফ! আম্মা, রান্নাটা যা হয়েছে না! আমার না আজ খুব মাংস খেতে ইচ্ছে করছিল। নাবিল, তুমি তো আবার ডায়েট করছ বলছিলে কালকে, তাই তোমার জন্য এই সিনের পিসগুলো রেখেছি, কেমন?"

নাবিলের আব্বা হেসে ফেললেন। "হ্যাঁ রে নাবিল, তুই তো আজকাল একটু মোটা হচ্ছিস। তিশা ঠিকই করেছে। তুই হাড্ডি আর সিনের মাংস খা।"

আম্মাও মুচকি হাসলেন। নাবিল তিশার দিকে তাকাল। তিশা তখন মিটিমিটি হাসছে আর জিব বের করে নাবিলকে ভেংচি কাটল, যা পরিবারের অন্য কেউ দেখতে পেল না।

নাবিল মনে মনে বলল, 'রোদ উঠবে, জলও পড়বে... দাঁড়াও ম্যাডাম!'

খাওয়া-দাওয়া শেষে দুপুরে সবাই যার যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। নাবিল ল্যাপটপে অফিসের কিছু জরুরি ইমেইল চেক করছিল। তিশা ঘরে ঢুকে দরজাটা হালকা টেনে দিল। তার মনে আজ এক পরম তৃপ্তি—সকালে হারলেও দুপুরে সে নাবিলকে একদম হারিয়ে দিয়েছে! তার প্রিয় খাবার চুরি করে খেয়ে তাকে যেভাবে বোকা বানিয়েছে, তাতে তিশার নিজেকে খুব বিজয়ী মনে হচ্ছে।

তিশা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে ডাবল রিফ্লেকশনে দেখল নাবিল ল্যাপটপ বন্ধ করে বিছানা থেকে নামছে। সে সোজা এগিয়ে এলো তিশার পেছনে।

তিশা চিরুনি থামিয়ে আয়নায় নাবিলের চোখের দিকে তাকাল। "কী হলো? এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?"

নাবিল পেছন থেকে তিশার দুহাত ধরে ফেলল। তারপর আলতো করে তিশাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। ঘরের পর্দাগুলো টানা, ঘরজুড়ে এক মায়াবী আলো-ছায়ার খেলা।

নাবিল কম্বলের মতো উষ্ণতায় তিশাকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলল। তিশা পিছু হটার চেষ্টা করতেই দেয়ালের সাথে গিয়ে ঠেকল। নাবিল তার দুই হাত দেয়াল আর তিশার দুপাশে রেখে তিশাকে পুরোপুরি ঘিরে ফেলল।

"তুমি আমার রানের পিসটা চুরি করে খেলে তিশা?" নাবিলের কণ্ঠ যেন এক গভীর নদীর গর্জন, তাতে মিশে আছে চরম আকর্ষণ।

"চুরি... চুরি কেন হবে? আমি তো খেয়েছি... আম্মা তো কিছু বলেনি," তিশা বুক উঁচিয়ে ধড়ফড়ানি সামলানোর চেষ্টা করল।

"আমার প্রিয় জিনিস কেড়ে নিলে কিন্তু তার বদলে আমাকে অন্য কিছু দিতে হয়," নাবিল ঝুঁকে এলো তিশার কানের কাছে। তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল তিশার কাঁধের খোলা অংশে, যেখানে শাড়ির আঁচলটা একটু সরে গিয়েছিল।

তিশার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল। সে হাত দিয়ে নাবিলের বুক ঠেলতে গিয়েও যেন শক্তি পাচ্ছিল না। নাবিলের সুঠাম শরীর, তার পুরুষালী ঘ্রাণ আর এই তীব্র শারীরিক উপস্থিতি তিশার সমস্ত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল।

"কী... কী চাও তুমি?" তিশার গলা দিয়ে কাঁপাকাঁপা স্বর বের হলো।

"যা তুমি চুরি করেছ, তার চেয়ে অনেক বেশি দামি কিছু," নাবিল তিশার থুতনিটা আঙুল দিয়ে ওপরে তুলল।

নাবিলের চোখ দুটোতে এখন আর সেই শান্ত, গম্ভীর ব্যাংক কর্মকর্তার ছাপ নেই। সেখানে জ্বলছে এক আদিম, গভীর ভালোবাসার আগুন। সে তিশার ঠোঁটে, গালে, ঘাড়ে নিজের ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে লাগল। তিশা তার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নাবিলকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের ভেতরের ঝড়টা এখন নাবিলের বুকের ঝড়ের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। তিশা বুঝতে পারল, খেলাটা সে শুরু করেছিল ঠিকই, কিন্তু এর নিপুণ খেলোয়াড় আসলে এই শান্ত মানুষটাই!

কয়েক মুহূর্ত পর নাবিল তিশাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "এটা তো কেবল শুরু, তিশা। কে কাকে বেশি জ্বালাতে পারে, তার হিসেব কিন্তু এখনো বাকি!"

তিশা নাবিলের বুকে মুখ লুকিয়ে এক অদ্ভূত আবেশে হেসে ফেলল। এই দুষ্টুমি, এই গভীর ভালোবাসা আর মিষ্টি লড়াইয়ের শুরুটা যেন তাদের নতুন জীবনের এক অসামান্য অধ্যায় হয়ে উঠল। কিন্তু তিশাও তো ছাড়ার পাত্রী নয়, আগামীকালের জন্য তার মাথার ভেতরে ইতিমধ্যেই নতুন কোনো দুষ্টুমির পোকা নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে!

বিকেলের মিষ্টি আলোটা যখন 'ছায়ানীড়'-এর উঠোনে এসে থমকে দাঁড়ায়, তখন চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক চিলতে ভেজা মাটির গন্ধ। দুপুরের সেই ব্যাকুল আর পাগল করা ভালোবাসার আমেজ কাটিয়ে তিশা যখন নিচে এলো, তার মুখে তখনও হালকা লজ্জার রেশ। তবে তিশার ভেতরের দুষ্টু মেয়েটা কিন্তু খুব বেশি সময় শান্ত থাকার পাত্রী নয়। নাবিল তাকে প্রেমে কাবু করে জব্দ করেছে ঠিকই, কিন্তু তিশা মনে মনে পণ করেছে—এই যুদ্ধে সে এত সহজে হার মানবে না।

বিকেল বেলা নাবিল সাধারণত বারান্দায় বসে কফি খেতে খেতে বই পড়ে। তিশা রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ গরম কফি বানাল। তবে এবার আর কোনো নুন বা আদার কারসাজি নয়, এবার তার পরিকল্পনা অন্যরকম। তিশা ট্রেতে কফির কাপ নিয়ে দোতলার বারান্দায় গেল।

নাবিল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে একটা উপন্যাসের পাতা ওল্টাচ্ছিল। পরনে হালকা নীল রঙের টি-শার্ট আর ক্যাজুয়াল ট্রাউজার। চোখে চশমা। তিশা কফির কাপটা তার পাশের টেবিলে রাখল।

নাবিল বই থেকে চোখ না তুলে মৃদু হেসে বলল, "আজ আবার কফিতে কী মেশানো হয়েছে? বিষ না অন্য কিছু?"

তিশা গাল ফুলিয়ে একপাশে বসে পড়ল। "তুমি আমাকে এত খারাপ ভাবো? রোজ রোজ কি একই দুষ্টুমি ভালো লাগে? একদম খাঁটি কফি, খেয়ে দেখো।"

নাবিল বইটা কোলে রেখে কফির কাপে এক চুমুক দিল। সত্যি, কফিটা দারুণ হয়েছে। সে তিশার দিকে তাকিয়ে বলল, "হুম, প্রশংসা করতেই হয়। তবে এই নিঃস্বার্থ সেবার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর মতলব আছে?"

"কোনো মতলব নেই!" তিশা চোখ ঘুরাল। তারপর হঠাৎ খুব মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল, "আচ্ছা নাবিল, তোমার ফোনটা একটু দেবে? আমার ফোনে রিচার্জ শেষ, আম্মাকে একটা জরুরি কল করব।"

নাবিল কোনো সন্দেহ না করেই পকেট থেকে তার আইফোনটা বের করে তিশার হাতে দিল। তিশা ফোনটা নিয়েই একটা বিজয়ীর হাসি দিল, যা নাবিলের চোখ এড়াল না। কিন্তু নাবিল কিছু বলল না, দেখতে চাইল তিশা এবার কী নতুন চাল চালতে যাচ্ছে।

তিশা ফোনটা নিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে এলো। সে জানত, নাবিল অফিসের কাজ বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে একটা নির্দিষ্ট ডায়েরি আর এই ফোনটার ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। তিশা দ্রুত নাবিলের ফোনের সেটিংস-এ ঢুকে ভাষা বদলে 'জাপানি' করে দিল! শুধু তাই নয়, ফোনের অ্যালার্ম টোনটা বদলে একটা বিকট চিৎকার করা হাসির শব্দ সেট করে দিল এবং সময় দিল সন্ধ্যা ছয়টা।

সব কাজ শেষ করে ফোনটা অত্যন্ত যত্ন সহকারে আবার বারান্দায় গিয়ে নাবিলের হাতে ফেরত দিল। "হয়ে গেছে, থ্যাংক ইউ!"

নাবিল ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করতেই থমকে গেল। পুরো ফোনের সব অ্যাপের নাম, নোটিফিকেশন—সবকিছু হাবিজাবি জাপানি অক্ষরে লেখা! সে ভ্রু কুঁচকে তিশার দিকে তাকাল। তিশা তখন খুব মন দিয়ে বারান্দার টবে ফুটমান বেলি ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে শিষ দিচ্ছে, যেন সে কিছুই জানে না।

"তিশা..." নাবিলের গলায় সতর্কবার্তা।

"বলুন জনাব?" তিশা খুব নিরীহ ভঙ্গিতে ঘাড় কাত করল।

"আমার ফোনের ভাষা জাপানি হলো কীভাবে?"

"তাই নাকি? কই দেখি?" তিশা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখার ভান করে বলল, "ওমা! তাই তো! তোমার ফোন বুঝি হঠাৎ দূর প্রাচ্যের প্রেমে পড়ল? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি সব জানো, সব বোঝো। তা জাপানি ভাষাটা কি এখন পড়তে পারছ না, গম্ভীর সাহেব?"

নাবিল কিছুক্ষণ তিশার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তিশার চোখেমুখে উপচে পড়া আনন্দ আর দুষ্টুমির ঝিলিক। নাবিল বুঝে গেল, তিশা তাকে জব্দ করার নতুন ফাঁদ পেতেছে। সে কিন্তু রেগে গেল না, বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি।

নাবিল ফোনটা পকেটে রেখে বেশ শান্ত গলায় বলল, "ঠিক আছে। ভাষা বদলাতে না পারি, ক্ষতি নেই। কিন্তু এই অপরাধের খেসারত কিন্তু তোমাকে দিতে হবে, তিশা।"

"কিসের খেসারত?" তিশা চোখ গোল গোল করল।

নাবিল কিছু না বলে ইজিচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। সে তিশার দিকে একপা একপা করে এগোতে লাগল। তিশা পিছাতে পিছাতে বারান্দার রেলিংয়ে গিয়ে ঠেকলো। চারপাশটা তখন বিকেলের লালচে আলোয় ভরে গেছে।

নাবিল তিশার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ ও সুঠাম শরীরের ছায়া তিশার ওপর এসে পড়ল। নাবিল তিশার দুপাশে রেলিং ধরে তাকে সম্পূর্ণ আটকে দিল।

"তুমি আমার সহজ সরল ফোনটাকে বিভ্রান্ত করেছ, আর আমি তোমার এই চঞ্চল মনটাকে বিভ্রান্ত করব," নাবিল নিচু ও ভারী গলায় বলল।

"নাবিল... এটা বারান্দা... নিচে আম্মা আছেন..." তিশা থতমত খেয়ে বলল। তার হৃদস্পন্দন আবার বাড়তে শুরু করেছে। নাবিলের এই অদম্য শারীরিক আকর্ষণ আর চোখের নীরব আহ্বান তিশাকে ব্যাকুল করে তোলে।

"থাকুক," নাবিল তিশার চিবুকটা আলতো করে স্পর্শ করল। "তুমি যখন আমাকে জ্বালাও, তখন তো চারপাশের কথা ভাবো না। এখন সহ্যের পালা তোমার।"

নাবিল ঝুঁকে এলো। তার তপ্ত নিঃশ্বাস তিশার ঠোঁটে আর গালে এসে আঘাত করতে লাগল। তিশা চোখ বন্ধ করে ফেলল। নাবিল তার ঠোঁট দুটো তিশার খোলা ঘাড়ে আর গলার ভাঁজে চেপে ধরল। এক তীব্র, উষ্ণ রোমাঞ্চ তিশার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। সে নাবিলের শার্টটা শক্ত করে ধরে নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করল।

নাবিলের ভালোবাসার ধরণটাই এমন—ভীষণ গম্ভীর, কিন্তু অতল গভীর। তিশাকে নিজের আবেগের আবর্তে ভাসিয়ে নিতে তার কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না। তিশার মনে হলো সে যেন এক মায়াজালের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে থেকে পালানোর কোনো পথ নেই, আর সে পালাতেও চায় না।

ঠিক সেই মুহূর্তে—ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ছয়টা বাজল!

আর অমনি নাবিলের পকেট থেকে বেজে উঠল সেই বিকট, অদ্ভুত হাসির শব্দ! "হা হা হা হা!"

হঠাৎ এই শব্দে দুজনেই চমকে উঠল। আবেশময় পরিবেশটা এক মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তিশা চোখ খুলে ফিনফিন করে হেসে ফেলল। নাবিল পকেট থেকে ফোন বের করে বিরক্ত মুখে তাকাল। তিশা ততক্ষণে নাবিলের বাহু গলিয়ে ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে।

বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে তিশা ফিসফিস করে বলল, "অ্যালার্ম কেমন লাগল, বর মশাই? জাপানি ভাষায় উদ্ধার করো এবার!" কথাটি বলেই সে হি হি করে হাসতে হাসতে দৌড়ে ঘরের ভেতর পালিয়ে গেল।

নাবিল ফোনের দিকে তাকিয়ে একবার মাথা নাড়ল, তারপর তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক চরম ভালোবাসামাখা হাসি। সে বিড়বিড় করে বলল, "আসুক রাত... তারপর দেখছি তোমার এই শয়তানি কোথায় যায়।"

রাত তখন সাড়ে এগারোটা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। নাবিল ও তিশার শোবার ঘরটি হালকা নীল নাইটল্যাম্পের আলোয় আলোকিত। তিশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার চুল আঁচড়াচ্ছিল। হালকা সুতির রাতের পোশাক পরা, মুখটা ধুয়ে এসে একদম তাজা দেখাচ্ছে তাকে।

বিকেলের জয়ের আনন্দে তিশা বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিল। সে ভেবেছিল নাবিল হয়তো ফোন নিয়ে ব্যস্ত বা ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আয়নায় সে দেখতে পেল, নাবিল বিছানায় বসে বই পড়ার ভান করলেও তার নজর আসলে তিশার দিকেই।

তিশা চিরুনিটা রেখে বিছানার দিকে এগোতেই নাবিল চট করে বইটা পাশে রেখে দিল। তিশা শুতে যাওয়ার আগেই নাবিল তার হাত ধরে এক টান মারল।

তিশা ছিটকে এসে সোজা নাবিলের বুকের ওপর পড়ল!

"উফ! নাবিল! কী করছ কী?" তিশা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

"দিনের বকেয়া হিসেব মেটাচ্ছি," নাবিল তিশার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার চোখ দুটি তখন গভীর কামনায় ও ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আছে।

নাবিল তিশার দুটো হাত মাথার ওপরে ধরে তোশকের সাথে চেপে ধরল। তিশা নড়াচড়া করার চেষ্টা করল, কিন্তু নাবিলের শক্তির কাছে সে সম্পূর্ণ নিরুপায়। নাবিলের সুগঠিত শরীরের ওজন ও উষ্ণতা তিশাকে এক অদ্ভুত আবেশে বন্দি করে ফেলল।

"তুমি মনে করেছ ওই বিকট অ্যালার্ম দিয়ে তুমি বেঁচে গেলে?" নাবিল তিশার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল।

তিশা ঢোক গিলে বলল, "আমি তো... আমি তো একটু মজা করছিলাম..."

"তাহলে এবার আমার মজার পালা," নাবিল তিশার কানে কামড় দিল আলতো করে।

তিশার মুখ থেকে এক হালকা অনুভূতির চিৎকার বেরিয়ে আসতে গিয়েও থেমে গেল। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। নাবিলের ঠোঁট তখন তিশার কপাল, গাল, থুতনি পেরিয়ে আবার এসে পৌঁছাল তার তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে।

এই চুম্বন বিকেলের মতো কেবল এক চিলতে ছিল না, এটা ছিল এক গভীর, দহনকারী ভালোবাসা। নাবিল তার সমস্ত আবেগ দিয়ে তিশাকে নিজের করে নিতে লাগল। তিশা তার বন্দি হাত দুটো মুক্ত পেয়ে নাবিলের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল। সে নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে নাবিলের এই বুনো ভালোবাসা গ্রহণ করতে লাগল।

ঘরের আবহাওয়া তখন ভীষণ উত্তপ্ত। বাইরের নীরবতার মাঝে কেবল তাদের দুজনের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ। নাবিল তিশার গায়ের চাদরটা সরিয়ে দিল, তার হাতের পরশ তিশার শরীরের প্রতিটা ভাঁজে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তিশা অনুধাবন করল, তার মিষ্টি এই শয়তানিগুলোর বদলা হিসেবে নাবিল তাকে যে ভালোবাসা দিচ্ছে, তা যেকোনো পরাজয়ের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।

অনেকক্ষণ পর, যখন ঘরের আলো-ছায়ায় দুজন দুজনের খুব কাছে ঘেঁষে শুয়ে আছে, তিশার মাথা নাবিলের চওড়া বুকের ওপর। নাবিল তার আঙুল দিয়ে তিশার সিল্কের মতো মসৃণ চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।

তিশা মৃদু গলায় বলল, "নাবিল?"

"হুম?"

"তুমি ফোনটা ঠিক করতে পেরেছ?"

নাবিল মুচকি হাসল। "অফিসের আইটি বিভাগের এক ছোট ভাইকে দিয়ে সন্ধ্যাতেই ঠিক করিয়ে এনেছি। তবে তোমাকে বলিনি, কারণ না বললে তুমি রাত ৮টায় নিজের হাতে আমাকে বানিয়ে কফি খাওয়াতে আসতে না।"

তিশা মাথা তুলে নাবিলের দিকে তাকাল। "তুমি এত চালাক?"

"চালাক না হলে তোমার মতো শয়তান মেয়েকে সামলানো যায়?" নাবিল তিশার কপালে চুমু খেল। "এখন ঘুমাও। কাল সকালে তোমার জন্য আরেকটা চমক আছে।"

তিশা আবার নাবিলের বুকে মুখ লুকাল। কিন্তু তার মাথায় ঘুরতে লাগল—কালকের চমকটা কী হতে পারে? আর কীভাবে সে নাবিলকে আবার নতুন করে চমকে দিতে পারে! তাদের এই দুষ্টুমি আর ভালোবাসায় মোড়া মিষ্টি যুদ্ধটা যে আরও অনেক দূর যাবে, তা স্পষ্ট।

পরদিনের মিষ্টি সকালটা যেন একটু ভিন্ন আমেজ নিয়ে এল ছায়ানীড়ে। কাল রাতের সেই মাতাল করা ভালোবাসার পর তিশার ঘুম ভেঙেছে বেশ দেরিতে। তিশা যখন চোখ খুলল, দেখল জানালার ভারী পর্দাগুলো সরানো, ঘরজুড়ে রোদের ঝলমলে খেলা। আর তার পাশের বিছানা খালি। নাবিল ইতিমধ্যেই উঠে পড়েছে।

তিশা আলসেমি ভেঙে বিছানায় উঠে বসল। তার শরীরজুড়ে কাল রাতের আকুল ভালোবাসার এক মিষ্টি আমেজ তখনও লেগে আছে। হঠাতই তার মনে পড়ল, কাল রাতে ঘুমানোর আগে নাবিল বলেছিল আজ সকালে তিশার জন্য একটা চমক অপেক্ষা করছে!

কী হতে পারে সেই চমক? তিশা চটপট বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো।

ডাইনিং রুমে যেতেই তিশার চোখ তো ছানাবড়া! টেবিলে নাস্তার হরেক রকম আয়োজন। নরম ফুলকো লুচি, আলুর দম, আর তার সাথে রসগোল্লা। কিন্তু চমকটা খাবারে নয়, চমকটা স্বয়ং নাবিল!

নাবিল আজ পরনে একটা সাদা রঙের ফতুয়া আর সুতির জিন্স পরে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে এক বাটি গরম গরম সুজির হালুয়া।

তিশার শাশুড়ি পারভীন বেগম হেসে বললেন, "দেখ তিশা, তোর বর আজ সকালে উঠে নিজেই তোর জন্য পছন্দের লুচি আর হালুয়া বানানোর আবদার করল! আমাদের তো রান্নাঘরে ঢুকতেই দেয়নি!"

তিশা অবাক হয়ে নাবিলের দিকে তাকাল। যে লোকটা সামান্য ডিম ভাজতেও হাত পুড়িয়ে ফেলার ভয়ে থাকে, সে আজ সকালে উঠে তার জন্য নাস্তা বানিয়েছে?

নাবিল বাটিটা টেবিলে রেখে তিশার দিকে তাকিয়ে একটা গভীর, মিষ্টি হাসি দিল। "কী হলো ম্যাডাম? অবাক হলে? কাল রাতে তো বলেছিলাম, তোমার জন্য চমক আছে।"

তিশা টেবিলের সামনে এসে বসল। নাবিল নিজেই তিশার প্লেটে গরম লুচি আর হালুয়া বেড়ে দিল। তিশা এক কামড় দিয়ে দেখল—লুচিটা দারুণ মচমচে হয়েছে, আর হালুয়ার স্বাদও চমৎকার!

তিশা নাবিলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, 'বাহ্ গম্ভীর সাহেব! তুমি তো প্রেমে ভাসিয়ে জব্দ করার নতুন কৌশল বের করেছ! কিন্তু আমি এত সহজে পটে যাওয়ার মেয়ে নই।'

খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই যখন যার যার কাজে ব্যস্ত, নাবিল তখন ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে অফিসের ফাইল দেখছিল। তিশা এক বাটি পেয়ারা মেখে নিয়ে পাশে এসে বসল। তিশার মাথায় তখন নতুন দুষ্টুমির পোকা নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে।

তিশা কাঁটাচামচ দিয়ে একটা পেয়ারার টুকরো নাবিলের মুখের সামনে ধরল। "নাও, একটু খাও।"

নাবিল ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলে মুখ হাঁ করল। কিন্তু তিশা চট করে হাতটা সরিয়ে নিয়ে নিজেই পেয়ারার টুকরোটা খেয়ে ফেলল!

নাবিল চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। "এটা কী হলো?"

"কোথায় কী?" তিশা একদম নিষ্পাপ মুখে বলল। "আমি তো আমার মুখে দিতে যাচ্ছিলাম, তুমি ভাবলে কেন তোমাকে দিচ্ছি?"

নাবিল এক হাত দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে দিল। তার দৃষ্টিতে এখন খেলাধুলার মেজাজ। "তুমি আবার শুরু করেছ, তাই না?"

তিশা বাটিটা সোফার টেবিলে রেখে নাবিলের খুব কাছাকাছি ঘেঁষে বসল। তার হাত দুটো নাবিলের কাঁধের ওপর তুলে দিল। "কেন? ভয় পাচ্ছ নাকি, ব্যাংকার সাহেব?"

নাবিল তিশার এই সাহস দেখে এক মুহূর্তে তিশার কোমর ধরে তাকে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। তিশা হঠাৎ এই টানে সামান্য চিৎকার করে উঠতে গিয়েও সামলে নিল।

"ভয়? তোমাকে?" নাবিল তিশার মুখের একদম কাছে নিজের মুখ নিয়ে এলো। নাবিলের চোখের সেই চেনা আগ্নেয়গিরির মতো চাহনি দেখে তিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

নাবিল তিশার কানে ফিসফিস করে বলল, "তুমি তো আগুন নিয়ে খেলছ তিশা। এই আগুনে যে তুমি নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তা কি জানো?"

তিশা নিজের মেজাজ ধরে রাখার চেষ্টা করে বলল, "দেখা যাক কে কাকে পোড়ায়!"

কথাটি শেষ হতেই তিশা নাবিলের গালে আলতো করে একটা কামড় দিয়েই এক লাফে তার কোল থেকে নেমে দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে পালাতে গেল! কিন্তু নাবিলও এবার তৈরি ছিল। সে মুহূর্তের মধ্যে সোফা ছেড়ে উঠে এসে দরজার মুখেই তিশাকে ধরে ফেলল।

নাবিল এক টানে তিশাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে ভেজানো দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল। কাঠের দরজার সাথে তিশার পিঠ আটকে গেল, আর তার ঠিক সামনেই দাঁড়ানো এক উত্তপ্ত, প্রেমিক নাবিল।

"অনেক পালিয়েছ তিশা," নাবিল নিচু ও কামনাময় স্বরে বলল।

নাবিলের এক হাত তিশার গলার পেছনে চলে গেল, আর অন্য হাত দিয়ে সে তিশার পাতলা কোমরটা চেপে ধরল। তিশার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত চলছিল যে মনে হচ্ছিল বুক ফেটে বেরিয়ে যাবে। নাবিল ঝুঁকে এসে সোজা তিশার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

এবারের চুম্বনটা ছিল প্রবল, ব্যাকুল আর তীব্র বাসনায় ভরা। তিশার কোনো প্রতিরোধ করার সুযোগই রইল না। নাবিলের ঠোঁটের স্পর্শে সে যেন নিমেষেই গলে জল হয়ে গেল। তিশা তার দুহাত দিয়ে নাবিলের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঘরের নীরবতা ভেদ করে তাদের দুজনের ঘন নিঃশ্বাস আর ভালোবাসার শব্দ প্রতিধ্বনি হতে লাগল।

নাবিল আস্তে আস্তে তিশার ঠোঁট ছেড়ে তার থুতনি, গলা আর বুকের ওপরের অংশে নিজের ভালোবাসার তীব্র পরশ আঁকতে লাগল। তিশার মুখ থেকে মৃদু এক তৃপ্তির কোঁকানি বেরিয়ে এলো। সে চোখ বন্ধ করে নাবিলের এই উদ্দাম ভালোবাসায় নিজেকে সমর্পণ করে দিল।

নাবিল তিশাকে এক টানে শূন্যে তুলে নিয়ে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল। তিশার ওপরে নেমে এসে নাবিল তার চোখের দিকে তাকাল। তিশার কালো ডাগর চোখ দুটো তখন লাজে আর ভালোবাসায় ভেজা।

"এখন বলো, কে কাকে পোড়াচ্ছে?" নাবিল তিশার চুলের গোছা সরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করল।

তিশা আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে কেবল নাবিলের বুকে হাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের এই গভীর রোমাঞ্চময় মিলনে দুপুরের সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়ে রইল।

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নেমে এল, তিশা বিছানায় শুয়ে নাবিলের বুকের ওপর মাথা রেখে শান্ত হয়ে বসে ছিল। নাবিল তার আঙুল দিয়ে তিশার খালি পিঠে আলতো করে নকশা আঁকছিল।

তিশা চোখ বুজে বলল, "তুমি এত দুষ্টু কীভাবে হলে বলতো? আগে তো মনে হতো তুমি একটা রোবট!"

নাবিল মৃদু হেসে তিশার কপালে চুমু খেল। "রোবটকে মানুষ বানানোর দায় তো তুমিই নিয়েছ ম্যাডাম। তবে একটা কথা মনে রাখবে, চঞ্চল বাতাসকে থামানোর শক্তি কেবল গভীর সমুদ্রেরই থাকে।"

তিশা হেসে উঠে নাবিলের বুকে একটু হালকা ঘুষি মারল। "উফ! তোমার এই ভাবগম্ভীর ডায়ালগ!"

তবে মনে মনে তিশা স্বীকার করল, নাবিলের এই গভীর ভালোবাসার সমুদ্রে ডুব দিতে তার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কিন্তু একই সাথে তার মাথায় আবার ঘুরতে শুরু করেছে নতুন এক পরিকল্পনা!

আগামীকাল তারা এক আত্মীয়ের বিয়েতে যাবে। সেখানে অনেক মানুষের সামনে নাবিলকে কীভাবে বোকা বানানো যায়, সেই জাল বুনতে শুরু করল তিশা।

পরদিন বিকেলে পুরো 'ছায়ানীড়' বাড়িজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। নাবিলের দূরসম্পর্কের এক খালাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান আজ সন্ধ্যায়। ঢাকার এক নামীদামী কমিউনিটি সেন্টারে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন।

তিশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত। পরনে গাঢ় বেগুনি রঙের একটা কাতান শাড়ি, সাথে ম্যাচিং কাঁচের চুরি আর হালকা গহনা। চুলের খোঁপায় গুজে নিয়েছে একজোড়া তাজা বেলি ফুলের গজরা। আয়নায় নিজের রূপ দেখে তিশার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নাবিল। কালো রঙের একটি সুতির শাটিন শেরওয়ানি পরেছে সে। চশমাটা চোখে আঁটা, চুলগুলো পেছনের দিকে পরিপাটি করে আঁচড়ানো। নাবিলকে এত রাজকীয় আর সুপুরুষ দেখাচ্ছে যে তিশা কয়েক মুহূর্তের জন্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে চেয়ে রইল।

নাবিল আয়নায় তিশার প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। তিশার বেগুনি শাড়ি আর বেলি ফুলের সাজে তাকে অপরূপা লাগছে। নাবিল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তিশার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

"কাউকে আজ এত সুন্দর লাগার অনুমতি কে দিয়েছে?" নাবিল তিশার উন্মুক্ত কাঁধে নিজের চিবুক রেখে ফিসফিস করে বলল।

তিশা এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ উল্টে বলল, "অনুমতি আবার কার লাগবে? আমি তো সব সময়ই সুন্দর। তুমি বরং তোমার গাম্ভীর্য ধরে রাখার অনুমতি নাও!"

নাবিল তিশার কোমর পেঁচিয়ে ধরে নিজের দিকে আর একটু ঘেঁষে নিল। "আজ রাতে কিন্তু এই সুন্দর রূপের খেসারত দিতে হবে, তৈরি থেকো।"

তিশা বুক ফুলিয়ে বলল, "আগে বিয়ের বাড়িতে গিয়ে টিকে দেখাও, তারপর রাতের কথা ভাবা যাবে!"

তিশার মনে তখন লুকিয়ে ছিল এক মহা-পরিকল্পনা। কাল রাতে আর সকালে যে পরাস্ত সে হয়েছে, তার প্রতিশোধ সে আজ সবার সামনে নেবে।

কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছানোর পর চারপাশের আলো আর কোলাহলে পরিবেশটা বেশ জমজমাট। আত্মীয়স্বজনরা নাবিল ও তিশাকে ঘিরে ধরল। নতুন দম্পতিকে নিয়ে সবার কত কৌতুহল, কত গল্প।

নাবিল পুরুষদের আড্ডায় আব্বার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। তিশা সুযোগ বুঝে রান্নাঘরের দিকে গেল, যেখানে বাবুর্চিরা খাবারের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেখান থেকে অতি সাবধানে এক চিমটি মারাত্মক ঝাল লাল মরিচের গুঁড়ো একটা ছোট টিস্যুতে মুড়ে নিয়ে এলো সে।

খাবারের টেবিলে যখন সবাই বসল, নাবিলের প্লেটে বিরিয়ানির সাথে বোরহানি দেওয়া হলো। নাবিল যখন একটু অন্যমনস্ক হয়ে খালার সাথে কথা বলছিল, তিশা টেবিলের নিচে পা দিয়ে নাবিলের পায়ে আলতো করে ধাক্কা দিল। নাবিল তিশার দিকে তাকাতেই তিশা এক অদ্ভুত মায়াবী হাসি উপহার দিল। আর সেই সুযোগেই অন্য হাত দিয়ে বোরহানির গ্লাসে সেই লাল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে একটু নেড়ে দিল!

"নাবিল, এই বোরহানিটা দারুণ হয়েছে। খাও না একটু," তিশা খুব যত্নশীল স্ত্রীর মতো গ্লাসটা নাবিলের দিকে এগিয়ে দিল।

নাবিল তিশার দিকে এক পলক তাকাল। তিশার চোখে এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ। নাবিল বুঝে গেল বোরহানির মধ্যে নিশ্চিত কোনো কারসাজি আছে। কিন্তু খালার সামনে তিশার হাত থেকে গ্লাস না নেওয়াটা অসভ্যতা হবে।

নাবিল বোরহানির গ্লাসটা হাতে নিল। তারপর এক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটাল! সে গ্লাসটা নিজের ঠোঁটে না লাগিয়ে সোজা তিশার মুখের সামনে তুলে ধরল।

"আমি তো পরে খাব। আমার লক্ষ্মী বউটা আগে একটু খেয়ে বলুক তো কেমন হয়েছে?" নাবিল ভীষণ আদুরে গলায় বলল।

তিশার বুকের ভেতর অমনি 'গুরুম' করে বাজ পড়ল! সে চোখ গোল গোল করে নাবিলের দিকে তাকাল। নাবিলের চোখে তখন এক চরম শয়তানি হাসি।

"না... মানে... আমি পরে খাচ্ছি, তুমি খাও না!" তিশা তোত্লাতে তোত্লাতে বলল।

"আরে নাও না তিশা, জামাই এত ভালোবেসে দিচ্ছে!" পাশে বসা খালা হেসে উঠলেন।

তিশা আর কোনো উপায় না পেয়ে ভয়ে ভয়ে গ্লাসে এক ছোট্ট চুমুক দিল। আর সাথে সাথেই—ঝাল! তীব্র ঝালে তিশার জিব আর গলা যেন জ্বলে গেল! সে কাশতে কাশতে লাল হয়ে উঠল।

নাবিল দ্রুত পানির গ্লাস তিশার দিকে এগিয়ে দিয়ে তিশার পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। "ওমা! এত আস্তে খাও! দেখলে তো, আমার ভালোবাসা সহ্য করতে পারলে না!"

তিশা ঢকঢক করে পানি খেয়ে নাবিলের দিকে আগুনের দৃষ্টিতে তাকাল। নাবিল ঝুঁকে এসে তিশার কানে ফিসফিস করল, "নিজের খোঁড়া গর্তে নিজেই পড়লে তো ম্যাডাম? বোরহানির ঝালটা কেমন লাগল?"

তিশা রাগ আর ঝালে ফুঁসতে লাগল, কিন্তু সবার সামনে কিছু বলতে পারল না।

রাত একটার দিকে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে তারা বাড়ি ফিরল। ঘরে ঢুকেই তিশা শাড়ির আঁচলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খাটে গিয়ে বসে পড়ল। গাল ফুলিয়ে একপাশে মুখ ফিরিয়ে রইল সে।

নাবিল ঘড়ির চাবি খুলতে খুলতে তিশার দিকে তাকাল। "কী হলো? বেগম সাহেবা কি খুব রেগে আছেন?"

"তুমি একটা খুব খারাপ লোক!" তিশা অভিমানী গলায় বলল। "তুমি জানতে বোরহানিতে ঝাল আছে, তাও আমাকে খাওয়ালে!"

"আর তুমি যে আমার গ্লাসে মরিচ মেশালে, সেটা বুঝি খুব ভালো কাজ?" নাবিল চশমাটা খুলে সাইড টেবিলে রাখল।

নাবিল এবার ধীরে ধীরে তিশার দিকে এগিয়ে এলো। তার গায়ের শেরওয়ানিটা খোলা, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার চাহনিতে এখন আর কোনো রসিকতা নেই, সেখানে কেবলই এক তীব্র উন্মাদনা।

নাবিল তিশার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তিশার মুখটা দুহাতে তুলে ধরে বলল, "তোমার এই রাগী মুখটা না দেখতে বড্ড সুন্দর লাগে।"

তিশা মুখ সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু নাবিল তার এক হাত দিয়ে তিশার খোপাটা খুলে দিল। কোমর ছাপানো চুলগুলো এক মুহূর্তে তিশার পিঠে ছড়িয়ে পড়ল।

"নাবিল... ছাড়ো আমাকে," তিশা দুর্বল প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করল।

নাবিল তিশার কথা শুনল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় তিশাকে কোলে তুলে নিল। তিশা চমকে উঠে নাবিলের গলা জড়িয়ে ধরল। নাবিল তাকে নিয়ে সোজা বিছানায় শুইয়ে দিল এবং নিজে তার ওপর নেমে এলো।

"আজকের বোরহানির ঝালটা কিন্তু আমি অন্যভাবে মেটাব তিশা," নাবিল নিচু, মাতাল গলায় বলল।

নাবিল ঝুঁকে এসে তিশার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এ চুম্বন কেবল ভালোবাসার ছিল না, এতে ছিল এক বুনো অধিকার বোধ। তিশার ভেতরের সব রাগ, সব অভিমান মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে মিলিয়ে গেল। সে নাবিলের ভালোবাসার তীব্রতায় নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল।

নাবিলের হাতের উষ্ণ স্পর্শ তিশার শাড়ির ভাঁজ খুলে ফেলল। নাবিল তিশার ঘাড়ে, বুকের কাছে আর পেটে নিজের উষ্ণ ঠোঁটের চিহ্ন একে দিতে লাগল। তিশার পিঠ বিছানা থেকে একটু ওপরে উঠে এলো এক অজানা আবেশে। সে নাবিলের চুলগুলো খামচে ধরে তার আবেশময় অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে লাগল।

ঘরের মৃদু আলোয় তাদের দুটো শরীর একাকার হয়ে গেল। বিয়ের বাড়ির মিষ্টি ক্লান্তি আর রোমাঞ্চকর ভালোবাসায় রাতের সময়টা যেন থমকে রইল। তিশা অনুধাবন করল, নাবিলকে সে যত জ্বালাতে চায়, নাবিল তাকে তত বেশি ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়।

শেষ রাতে, যখন তিশা নাবিলের বুকের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে ছিল, নাবিল তার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল, "কাল কিন্তু আমাদের হানিমুনে যাওয়ার কথা তিশা। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে তোমাকে কীভাবে সামলাব বলতো?"

ঘুমের ঘোরেও তিশা নাবিলের শার্টটা আঁকড়ে ধরে মুচকি হাসল। সমুদ্রের নোনা জলে যে আরও বড় কোনো ঝড় অপেক্ষা করছে, তার প্রস্তুতি সে মনে মনে নিতে শুরু করে দিয়েছে।

পরদিন বিকেলে কক্সবাজারের সৈকতে যখন সূর্যাস্তের লালচে আলো ছড়িয়ে পড়ল, তখন সমুদ্রের নোনা বাতাসে এক অদ্ভুত মায়া। ঢাকায় বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ভাব থাকলেও এখানকার আকাশ একদম পরিষ্কার। নীল সমুদ্রের ওপর হেলে পড়া সূর্যটাকে যেন এক টুকরো সোনার মতো দেখাচ্ছে।

হোটেল সাইমন-এর বারান্দা থেকে সমুদ্রের এই রূপ স্পষ্ট দেখা যায়। তিশা হালকা গোলাপি রঙের একটি সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ভেজা চুলগুলো সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছিল। ঢাকা থেকে বিমানে আসার পর থেকেই তিশার মনে নতুন এক রোমাঞ্চ। এটা তাদের বিয়ের পর প্রথম একা কোথাও ঘুরতে আসা।

নাবিল ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এলো। পরনে সাদা শর্টস আর হাফ হাতা প্রিন্টেড শার্ট। চোখের চশমাটা বদলে চোখে এখন ডার্ক সানগ্লাস। নাবিলকে এই ক্যাজুয়াল লুকে দারুণ হ্যান্ডসাম লাগছে।

নাবিল পেছন থেকে এসে তিশার কাঁধে হাত রাখল। "কী ভাবছ ম্যাডাম? সমুদ্রের গাম্ভীর্য দেখে নিজের গাম্ভীর্য হারানোর ভয়ে আছো নাকি?"

তিশা ঘুরে দাঁড়িয়ে নাবিলের সানগ্লাসটা এক ঝটকায় খুলে নিজের চোখে পরে নিল। "উফ! তোমার এই ডায়ালগবাজি থামাবে? সমুদ্রের ঢেউ দেখে আমার মনে হচ্ছে তোমাকে যদি এই জলে এক বার চুবিয়ে দেওয়া যেত!"

নাবিল এক পা এগিয়ে তিশাকে রেলিংয়ের সাথে চেপে ধরল। "চুবাবে? চেষ্টা করে দেখতে পারো। তবে মনে রেখো, সমুদ্রের জল কিন্তু ভীষণ নোনা আর গভীর। একবার ডুব দিলে ওঠার পথ পাবে না।"

নাবিল সানগ্লাসের নিচ দিয়ে তিশার চোখের দিকে তাকাল। তিশার ঠোঁটে সেই চেনা বাঁকা হাসি। তিশা মনে মনে বলল, 'দাঁড়াও গম্ভীর সাহেব, আজ সমুদ্রে তোমার সব গাম্ভীর্য আমি ধুয়ে মুছে সাফ করব।'

সন্ধ্যায় তারা সি-বিচে হাঁটতে নামল। সমুদ্রের পাড়ে তখন ঝাউবনের ছায়া নেমে এসেছে। তিশা খালি পায়ে বালুর ওপর হাঁটছিল আর পানির ছোট ছোট ঢেউগুলো এসে তাদের পা ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ তিশা দেখতে পেল কাছেই কয়েকজন স্থানীয় ছেলে পানির বাইক আর স্পিডবোট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিশার মাথায় দুষ্টুমির পোকা নড়ে উঠল। সে নাবিলের হাত ধরে টেনে বলল, "নাবিল! চলো না স্পিডবোটে উঠি!"

নাবিল একটু ইতস্তত করে বলল, "সন্ধ্যা নেমে আসছে তিশা, এখন লাইফ জ্যাকেট ছাড়া স্পিডবোটে ওঠা ঠিক হবে না। তাছাড়া পানি এখন বেশ উত্তাল।"

"আরে তুমি তো বড্ড ভীতু!" তিশা মুখ বাঁকাল। "একটা ব্যাংকার যে এত ভয় পায়, তা আমার জানা ছিল না। তুমি না বললে গভীর সমুদ্রে ডুব দেওয়ার কথা? এখন এতটুকু পানিতেই ভয়?"

নাবিল তিশার এই উস্কানিতে একটু হাসল। "ঠিক আছে, চলো। কিন্তু কোনো বিপদ হলে কিন্তু দায় তোমার।"

তারা দুজনে একটা লাইফ জ্যাকেট পরে স্পিডবোটে গিয়ে বসল। চালক যখন বোট স্টার্ট দিল, বিকট শব্দে বোটটি ঢেউয়ের ওপর লাফিয়ে উঠতে লাগল। পানির ছিটে এসে তাদের শরীরে লাগছিল। তিশা আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

নাবিল তিশাকে এক হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখল। বোট যখন তীর থেকে কিছুটা দূরে, তিশা নাবিলের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, "নাবিল, ওই দেখো কী সুন্দর একটা ঝিনুক ভেসে যাচ্ছে!"

নাবিল বোটের একপাশে ঝুঁকে তিশার দেখানো দিকে তাকাতেই—তিশা চট করে নাবিলের পকেট থেকে তার মানিব্যাগ আর রুমালটা বের করে নিজের জ্যাকেটের ভেতর লুকিয়ে ফেলল! শুধু তাই নয়, সে নাবিলের সানগ্লাসটাও হাত সাফাই করে নিল।

নাবিল সোজা হয়ে বসে পকেটে হাত দিতেই দেখল পকেট গায়েব! সে ভ্রু কুঁচকে তিশার দিকে তাকাল।

"তিশা! আমার মানিব্যাগ কোথায়?"

তিশা বাতাসের দিকে হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল, "ওমা! বাতাস এত তেজ, হয়তো সমুদ্রে পড়ে গেছে! কিংবা কোনো কালপুরুষ এসে নিয়ে গেছে! আমি কী জানি?"

নাবিল তিশার চাল বুঝে গেল। সে ড্রাইভারকে বোট তীরের দিকে ঘোরাতে বলল।

তীরে নেমে তিশা তো হেসেই খুন। সে হাসতে হাসতে বালুর ওপর দিয়ে দৌড়াতে লাগল। "ধরে দেখাও তো ব্যাংকার সাহেব! মানিব্যাগ না পেলে কিন্তু আজ রাতের হোটেলের বিল তুমি দিতে পারবে না!"

নাবিল শান্ত পায়ে তিশার পেছনে এগোতে লাগল। তিশা দৌড়াতে গিয়ে হঠাৎ ভেজা বালুতে পা পিছলে পড়ে যেতে নিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে নাবিল চিলতের মতো ছোঁ মেরে তিশার কোমর ধরে ফেলল। তিশা না পড়ে সোজা এসে আছড়ে পড়ল নাবিলের চওড়া বুকে।

সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দের মাঝে দুজন দুজনের একদম কাছাকাছি। তিশার বুক ধড়ফড় করছে। সে নাবিলের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে আর কোনো রসিকতা নেই, কেবলই এক মাতাল করা ভালোবাসা আর আদিম আকর্ষণ।

নাবিল তিশাকে সামলে নিয়ে এক টানে তাকে কাছে টেনে আনল। তিশার জ্যাকেটের ভেতর হাত দিয়ে সে মানিব্যাগ আর সানগ্লাস উদ্ধার করল ঠিকই, কিন্তু তিশাকে ছাড়ল না।

"তুমি সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আমার সাথে চোর-পুলিশ খেলছ তিশা?" নাবিলের কণ্ঠস্বর উত্তাল ঢেউয়ের মতোই গভীর।

"নাবিল... এটা বিচের পাড়... লোকজন দেখছে," তিশা তোত্লাতে তোত্লাতে বলল।

"দেখুক," নাবিল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তিশার গালে আর গলার ভাঁজে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। নোনা বাতাস আর নাবিলের তীব্র ভালোবাসার স্পর্শে তিশা শিউরে উঠল।

নাবিল তিশাকে শূন্যে তুলে নিয়ে সমুদ্রের ছোট একটা ঢেউয়ের ওপর গিয়ে দাঁড়াল। হালকা পানির ঝাঁপটা এসে তাদের ভিজিয়ে দিল। নাবিল তিশার ভেজা চুলে হাত রেখে তার ঠোঁটে এক দীর্ঘ, ব্যাকুল চুম্বন আঁকল।

নোনা পানির স্বাদ আর নাবিলের ঠোঁটের গভীর উষ্ণতা মিলেমিশে তিশার মনপ্রাণ অবশ করে দিল। তিশা নাবিলের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সেই চুম্বনে সাড়া দিল। সমুদ্রের বিশালতার সামনে তাদের এই ভালোবাসা যেন এক স্বর্গীয় রূপ নিল।

রাত নয়টায় তারা হোটেলে ফিরল। দুজনেরই জামাকাপড় সামান্য ভেজা। ঘরে ঢুকে নাবিল সোজা এসি অন করে দরজায় খিল এঁটে দিল।

তিশা বাথরুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু নাবিল তার হাত ধরে টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।

"কোথায় যাচ্ছ?" নাবিলের গলায় এক অদম্য কামনার ডাক।

"ভেজা জামা বদলাতে..." তিশা নিচু চোখে বলল।

"বদলানোর দরকার নেই," নাবিল তিশার পিঠের চেইনটা আস্তে করে নিচে নামিয়ে দিল।

তিশার সুতির পোশাকটি নিমিষে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল। ঘরে কেবল ডিম লাইটের হালকা আলো। তিশার ভেজা শরীর এই মায়াবী আলোয় এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছিল।

নাবিল তিশাকে তুলে নিয়ে সোজা বিছানায় শুইয়ে দিল। নাবিলের সুগঠিত অনাবৃত শরীর তিশার ওপর নেমে এলো। তার হাতের আলতো পরশ তিশার উরু, পেট আর বুকের ওপর এক আগ্নেয়গিরির শিখা জ্বালিয়ে দিল।

"নাবিল..." তিশা এক গভীর আবেগে কেঁপে উঠে নাবিলের নাম ধরে ডাকল।

"হুম?" নাবিল তিশার কানের কাছে ফিসফিস করল।

"তুমি এত ভালোবাসো কেন আমাকে?"

"কারণ তোমার এই দুষ্টুমিগুলো আমাকে প্রতিদিন নতুন করে তোমার প্রেমে ফেলে," নাবিল তিশার ঠোঁটে আবার নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল।

সেই রাতে সমুদ্রের গর্জনকে ছাপিয়ে উঠেছিল তাদের দুজনের নিবিড় ভালোবাসার শব্দ। নাবিলের প্রতিটা স্পর্শে তিশা অনুধাবন করল, এই মানুষটি বাইরে যতটাই বরফের মতো শান্ত, ভেতরে ততটাই আগুনের মতো উত্তপ্ত। আর সেই আগুনে নিজেকে রোজ নতুন করে পোড়াতে তিশার কোনো দ্বিধা নেই।

পরদিন সকালে তারা ঢাকায় ফিরবে। কিন্তু তিশার মাথার ভেতরে ইতিমধ্যেই শেষ পর্বের জন্য সবচেয়ে বড় চমকটা দানা বাঁধতে শুরু করেছে!

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের সেই উন্মাদনায় ভরা দিনগুলো কাটিয়ে ঢাকার ব্যস্ত জীবনে ফিরে এসেছে নাবিল আর তিশা। কিন্তু 'ছায়ানীড়'-এর হাওয়ায় খেলা করা সেই মিষ্টি দুষ্টুমি আর ভালোবাসার আমেজ এতটুকু কমেনি, বরং দিন দিন তা যেন আরও গাঢ় রূপ নিচ্ছে।

আজ শনিবার। তিশার এক বিশেষ পরিকল্পনা সফল করার সেরা দিন। বিয়ের পর থেকে নাবিল তাকে প্রতিটা চাল ভেস্তে দিয়ে প্রেমে কাঁপিয়ে দিয়েছে। তিশা পণ করেছে, শেষ চালে সে এমন এক চাল চালবে, যাতে নাবিল চিরদিনের মতো জব্দ হয়ে যায় এবং তার সেই চিরচেনা গম্ভীর রূপ এক নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

দুপুরবেলা নাবিল স্টাডি রুমে বসে ল্যাপটপে ব্যাংকের কিছু জরুরি রিপোর্ট তৈরি করছিল। তার চোখে চশমা, কপালে হালকা চিন্তার ভাঁজ। তিশা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত নাবিলকে দেখল। শার্টের হাতা গোটানো, পেনের মুখ কামড়ে ধরে গম্ভীর মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা নাবিলকে দেখে তিশার মনটা আবার একটু উদাস হলো—লোকটা প্রেমে যেমন ভয়ঙ্কর, কাজেও তেমনই একনিষ্ঠ।

তিশা পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল। হাতে তার দুটো ধোঁয়া ওঠা মাটির কাপে স্পেশাল এলাচ চা।

"কাজ থামাও গম্ভীর সাহেব, চায়ের সময় হয়েছে," তিশা খুব মিষ্টি গলায় বলল।

নাবিল ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তিশার দিকে তাকাল। তিশার পরনে আজ একখানা হালকা নীল সুতির শাড়ি, চুলগুলো আলগা করে বাঁধা। তিশাকে দেখে নাবিলের মুখের চিন্তার রেখাগুলো এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। সে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল।

"আজ চায়ে কী দিয়েছ? বিষ, নুন, নাকি অন্য কিছু?" নাবিল বাঁকা হেসে বলল।

তিশা এক কাপ চা নাবিলের হাতে দিয়ে অন্য কাপটা নিয়ে তার কোলে এসে বসে পড়ল! নাবিল একটু চমকে গিয়েও সামলে নিল, এক হাত দিয়ে তিশার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

"আজ চায়ে কিছুই দিইনি নাবিল। আজ যা দেব, তা তুমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারোনি," তিশা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে নাবিলের চোখে চোখ রাখল।

নাবিল তিশার এই অদ্ভুত শান্ত আর মায়াবী চোখ দুটো দেখে একটু চিন্তায় পড়ল। "কী বলতে চাও তিশা? নতুন কোনো শয়তানি?"

তিশা কিছু বলল না। সে নিজের আঁচলের তলা থেকে একটা ছোট মেটালিক গিফট বক্স বের করল। লাল ফিতে দিয়ে বাঁধানো। সে বাক্সটা নাবিলের হাতের তালুতে রাখল।

"খুলে দেখো। তবে খোলার পর কিন্তু কোনো গাম্ভীর্য দেখানো চলবে না," তিশা আদুরে গলায় বলল।

নাবিল কৌতুহল চেপে রাখতে পারল না। সে আলতো করে ফিতেটা খুলে ছোট বাক্সটার ঢাকনা সরাল। বাক্সের ভেতরে তুলা দিয়ে মোড়ানো একটা জিনিস রাখা।

নাবিল জিনিসটা হাতে তুলল। ওটা একটা ডিজিটাল প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট। আর সেখানে খুব স্পষ্টভাবে ভেসে উঠছে—'দুটো গাঢ় গোলাপী দাগ'!

নাবিল স্তব্ধ হয়ে গেল। ব্যাংকের সবচেয়ে জটিল হিসেব এক সেকেন্ডে মিলিয়ে ফেলা মানুষটি যেন এই দুটো গোলাপী দাগের সমীকরণ মেলাতে পারছে না। তার হাতের আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল। সে বারবার কিটটার দিকে তাকাচ্ছে, আর তারপর তিশার মুখের দিকে।

"তিশা... এটা... এটা সত্যি?" নাবিলের গলায় চরম বিস্ময় আর এক অজানা ব্যাকুলতা।

তিশা চোখ দুটো ভিজে উঠল এক অনাবিল আনন্দে। সে মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ল। "হ্যাঁ নাবিল। তোমার আর আমার ভালোবাসার একটা ছোট্ট অংশ এখন আমার ভেতরে বাড়ছে। এবার বলো, কে কাকে চিরদিনের জন্য জব্দ করল?"

নাবিল এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ কথা হারিয়ে ফেলল। তারপরই সেই গম্ভীর নাবিল যেন এক অন্য মানুষে পরিণত হলো! সে চট করে তিশাকে নিজের বুকের সাথে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল যে তিশা নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। নাবিলের চোখ থেকে দু-ফোঁটা আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ে তিশার ঘাড়ে লাগল।

"তুমি আমাকে সত্যিই হারিয়ে দিলে তিশা... চিরদিনের মতো হারিয়ে দিলে," নাবিল আবেগপ্লুত গলায় ফিসফিস করে বলল।

নাবিল তিশাকে কোল থেকে নামিয়ে আস্তে করে সোফায় বসাল। তারপর নিজে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে তিশার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। নাবিলের মুখে এখন এমন এক অসামান্য হাসির ঝিলিক, যা তিশা আগে কখনো দেখেনি।

"আমি বাবা হতে যাচ্ছি?" নাবিল তিশার পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখল, যেন কোনো পরম পবিত্র সম্পদ স্পর্শ করছে।

"হ্যাঁ জনাব। এখন থেকে কিন্তু তোমার সব গাম্ভীর্য তুলে তুলে আলমারিতে তুলে রাখতে হবে। কারণ কয়েক মাস পর তোমাকে সামলাতে হবে দু-দুটো চঞ্চল বাচ্চাকে—একটা আমি, আর একটা তোমার এই পুতুলটা!" তিশা চোখে দুষ্টুমির হাসি নিয়ে বলল।

নাবিল উঠে দাঁড়িয়ে তিশাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। তিশা হেসে উঠে নাবিলের গলা জড়িয়ে ধরল।

"নাবিল! কী করছ? নিচে আম্মা আছেন!" তিশা মৃদু চিৎকার করে বলল।

"আজ কাউকে ভয় পাই না," নাবিল তিশাকে সোজা শোবার ঘরে নিয়ে এসে ভেজানো দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল।

বিছানায় তিশাকে খুব সাবধানে আর পরম মমতায় শুইয়ে দিল নাবিল। সে তিশার ওপরে নেমে এলো, কিন্তু এবারের স্পর্শে কোনো বুনো উন্মাদনা ছিল না, সেখানে ছিল এক অতল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর তীব্র অনুরাগ।

নাবিল তিশার কপালে দীর্ঘ এক চুম্বন আঁকল। তারপর আস্তে আস্তে নেমে এলো তার ঠোঁটে, গালে, আর ঘাড়ে। নাবিলের এই সোহাগে তিশার চোখ দুটো বুজে এলো। তিশা অনুধাবন করল, তার শয়তানি আর মিষ্টি চপলতা দিয়ে সে এই গম্ভীর মানুষটার ভেতরের যে রূপটা বাইরে এনেছে, তা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

নাবিল তিশার পেটের কাছে শাড়ির সরিয়ে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। এক গভীর আবেশময় অনুভূতির জোয়ারে তিশার শরীর কেঁপে উঠল। সে নাবিলের চুলে আঙুল চালিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

"এখন থেকে তোমার প্রতিটা শয়তানির হিসেব আমি ভালোবাসা দিয়ে সুদে-আসলে উসুল করব তিশা," নাবিল তিশার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল।

"আমিও তো সেটাই চাই বর মশাই," তিশা নাবিলের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল।

ঘরের বাইরে তখন বিকেলের সোনাঝরা রোদ ছায়ানীড়ের সবুজ পাতায় খেলা করছে। আর ঘরের ভেতরে দুজন প্রেমিক হৃদয় নিজেদের নতুন এক পৃথিবীর সূচনা করছিল—যেখানে মিষ্টি লড়াই আছে, জ্বালানো-পোড়ানোর খেলা আছে, আর আছে সমুদ্রের চেয়েও গভীর এক নিঃশর্ত ভালোবাসা।

তিশা ও নাবিলের এই মিষ্টি ভালোবাসার যুদ্ধ কখনোই শেষ হওয়ার নয়, কারণ প্রতিটা পরাজয়েই যে লুকিয়ে আছে এক পরম বিজয়!

....
👁 44