লিফটের নীরব হৃদয়ের স্পর্শ

ঢাকা শহরের জ্যাম পেরিয়ে যখন আরিশ ওদের নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন বিকেলের রোদটা বেশ নরম হয়ে এসেছে। ফ্ল্যাটটা ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডে, ছয়তলায়। ছায়াঘেরা শান্ত একটা গলি, বাতাসে হালকা কামিনী ফুলের গন্ধ। আরিশের বয়স পঁচিশ, পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী। শান্ত, গোছানো আর কিছুটা গম্ভীর স্বভাবের ছেলে সে। চা ছাড়া তার সকাল শুরু হয় না, আর পরিচ্ছন্নতা তার প্রথম পছন্দ। নতুন বাসায় সব জিনিসপত্র এখনো ঠিকঠাক গুছিয়ে ওঠা হয়নি, ঘরের মধ্যে কার্টনের পাহাড়। কাজের ক্লান্তি দূর করতেই সে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লাল চা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে একটু জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু তার সেই শান্তি স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক মুহূর্ত।

হঠাৎ করেই ওপরের অর্থাৎ সাততলার বারান্দা থেকে একটা ভেজা সুতির ওড়না সোজা এসে পড়ল আরিশের মুখের ওপর! চায়ের কাপটা হাত থেকে মেঝেকে প্রায় ছুঁই ছুঁই করছিল, কোনোমতে সামলে নিল সে। ওড়নাটার ভেজা স্যাঁতসেঁতে গন্ধে তার মেজাজটাই তিতে হয়ে গেল। ওড়নাটা মুখ থেকে সরিয়ে ওপরের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল একটি মেয়েকে।

মেয়েটির নাম তিথি। বয়স তেইশ-চব্বিশের বেশি হবে না। এলোমেলো চুল, কপালে ছোট একটা কালো টিপ, পরনে সাধারণ সুতির সালোয়ার-কামিজ। চোখে একরাশি চঞ্চলতা আর মুখে এক অদ্ভুত দুষ্টুমির হাসি। সে বারান্দার গ্রিল ধরে নিচু হয়ে ওপর থেকে দেখছিল।

"হ্যালো! আপনি কি চোখে দেখতে পান না?" আরিশ ওড়নাটা হাতে নিয়ে কিছুটা চড়া গলায় বলল, "ভেজা কাপড় এভাবে অন্যের মাথায় ফেলে দেওয়ার কোনো মানে হয়?"

তিথি মোটেও দমল না। বরং চোখ দুটি বড় বড় করে ভুরু কুঁচকে জবাব দিল, "বাতাস তো আর আমার কথায় চলে না, ভাইয়া! আর আপনার মুখটাও তো মাশাল্লাহ বেশ বড়, তাই হয়তো ওড়নাটা এসে ল্যান্ড করেছে। এতে চিল্লাইয়া এত ক্যাঁচাল করার কী আছে?"

'ভাইয়া' ডাকটা শুনে আরিশের কান গরম হয়ে গেল। সে তো এইমাত্র এই বিল্ডিংয়ে এসেছে, আর শুরুতেই এই অভিজ্ঞতা?

"প্রথমত, আমি আপনার ভাইয়া নই," আরিশ রুক্ষ গলায় বলল। "দ্বিতীয়ত, ব্যালকনিতে কাপড় শুকানোরও একটা নিয়ম থাকে। এভাবে পানি ঝরানো ওড়না নিচে ফেলাটা অত্যন্ত অসভ্যতা।"

তিথি বারান্দার গ্রিলে চিবুক রেখে ফিক করে হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কোনো অপরাধবোধ ছিল না, ছিল নিখাদ মজা পাওয়ার ছাপ। সে বলল, "অসভ্যতা? নতুন এসেছেন বুঝি? আমাদের এই বিল্ডিংয়ের নিয়ম হলো, বাতাসে ওড়না উড়লে সেটাকে অসভ্যতা বলে না, ওটাকে বলে আবহাওয়া সংকেত! যান, ওড়নাটা একটু দয়া করে ছাদে দিয়ে আসবেন, নাকি নিচে ফেলবেন?"

আরিশ রাগ ধরে রাখতে না পেরে ওড়নাটা বারান্দার রেলিংয়ের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে ভেতরে চলে গেল। প্রথম দিনেই মেজাজটা খিঁচড়ে গেল তার। মনে মনে ভাবল, এ কেমন বিদঘুটে মেয়ের পাল্লায় পড়ল সে!

পরদিন সকালแปcheck: repeat 'পরদিন সকাল' check logic context.

পরদিন সকাল ৮টা। আরিশের অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। সে তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে নিচে নামল। ধানমন্ডির এই আটতলা বিল্ডিংয়ে একটাই লিফট। লিফটের বোতাম টিপে সে অপেক্ষা করছিল। লিফটটা ছাদ থেকে নিচে নামছে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে লিফটের দরজা খুলতেই আরিশ দেখল ভেতরে তিথি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা পানির বোতল আর কানে ইয়ারফোন।

আরিশ ভেতরে ঢুকতে যেতেই তিথি একপা এগিয়ে লিফটের দরজার ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়াল। হাত দিয়ে দরজা চেপে ধরে বলল, "সরি, লিফট ফুল!"

আরিশ অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল। লিফটের ভেতরে তিথি ছাড়া আর কেউ নেই।

"আপনি কি ঠাট্টা করছেন?" আরিশ ভ্রূ কুঁচকে বলল, "ভেতরে তো শুধু আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। ফুল হলো কীভাবে?"

"আমার ব্যক্তিত্বের ওজন এত বেশি যে এই লিফটের ক্যাপাসিটি শেষ হয়ে গেছে," তিথি অতি গম্ভীর মুখে বলল, "আর তাছাড়া, আমি আগে এসেছি। আপনি পরের ট্রিপে যান।"

"এটা কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, এটা অ্যাপার্টমেন্টের লিফট!" আরিশ একপ্রকার জোর করেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। তিথির খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াতে হলো তাকে।

লিফটের ছোট আবদ্ধ জায়গাটায় হঠাৎ করেই পরিবেশটা বদলে গেল। তিথির শরীর থেকে হালকা বকুল ফুলের বা হাসনাহেনার মতো একটা মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছিল। আরিশের গায়ের দামি পারফিউমের গন্ধের সাথে সেই দেশি ফুলের সুবাস মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করল। লিফট নিচে নামছে, আর দুজন দুজনের একদম কাছে। তিথির চঞ্চল চোখ দুটো এই প্রথম কিছুটা স্থির হলো। সে আরিশের দিকে আড়চোখে তাকাল। ছেলেটার ধারালো চোয়াল, সুঠাম গড়ন আর পরিচ্ছন্ন চেহারায় একটা আলাদা গাম্ভীর্য আছে, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

আরিশও চোখ নামিয়ে তিথিকে দেখছিল। ওড়না পরা মেয়েটির ফর্সা ঘাড়ে দু-একটা ছোট চুল উঁকি দিচ্ছে। রাগটা যেন নিমেষেই কোথায় উবে যেতে চাইল, কিন্তু আরিশ নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখতে শক্ত হয়ে রইল।

"পরের বার থেকে সময় মেপে নামবেন," লিফটের দরজা খুলতেই তিথি একটু ঝুঁকে আরিশের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "নইলে সিঁড়ি দিয়ে নামার অভ্যাস করতে হবে, নতুন প্রতিবেশী!"

কথাটা বলেই তিথি একরকম দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। আরিশ লিফটের দরজায় দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা স্পষ্টত তাকে জ্বালাতন করছে, কিন্তু এই জ্বালাতনের পেছনে কেমন যেন একটা অদ্ভুত আকর্ষণ লুকিয়ে আছে, যা আরিশ আগে কখনো অনুভব করেনি।

ঝগড়ার আসল লড়াইটা শুরু হলো তিন দিন পর, পার্কিং লট নিয়ে।

আরিশ তার ধূসর রঙের গাড়িটা নিজের নির্ধারিত জায়গায় পার্ক করতে গিয়ে দেখে, সেখানে একটা লাল রঙের স্কুটি বাঁকা করে রাখা। ওই স্কুটিতে করে পুরো জায়গাটা ব্লক হয়ে আছে। আরিশ হর্ন বাজাল কয়েকবার। কেউ এলো না। অগত্যা তাকে গাড়ি থেকে নেমে সিকিউরিটি গার্ড খালেক চাচাকে ডাকতে হলো।

"খালেক চাচা, এই স্কুটি কার? আমার জায়গায় পার্ক করা কেন?"

খালেক চাচা অপরাধীর মতো হেসে বললেন, "ওটা তো সাততলার তিথি আম্মার স্কুটি। প্রতিদিন তো খালিই থাকে, তাই মনে হয় রাইখা গেছে।"

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো তিথি। পরনে জিন্স আর কুর্তি, চুলে হাত খোঁপা করা। হাতে স্কুটির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে সে শান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে এলো।

"আমার স্কুটি আপনার জায়গায় পার্ক করেছি বলে এত চিল্লাচিল্লি করছেন কেন?" তিথি ভ্রূ নাচিয়ে বলল।

"আপনার নির্ধারিত জায়গা হলো 'পি-৭', আর এটা 'পি-৬'।" আরিশ গলার স্বর নামিয়ে কিন্তু শক্তভাবে বলল, "আপনার যানবাহন যেখানে-সেখানে রাখার অভ্যাসটা বদলানো দরকার।"

"আহা, এত নিয়মকানুন দেখান কেন বলুন তো?" তিথি আরিশের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। তিথি মুখ তুলে আরিশের চোখে চোখ রাখল। তার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। "ঢাকা শহরে জায়গা কম, একটু মানিয়ে গুছিয়ে থাকা শেখেননি? এত যে মেজাজ দেখান, রক্তচাপ বেড়ে যাবে তো!"

আরিশ তিথির চোখের দিকে তাকাল। তিথির চোখের মণিদুটো গাঢ় বাদামী, রোদের আলোয় যেন জ্বলজ্বল করছে। এত কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলায় আরিশের হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই দ্রুত হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে একধাপ পিছিয়ে গেল।

"আমি কোনো নিয়ম ভাঙা পছন্দ করি না। আপনি এখনই স্কুটি সরান।"

"আর যদি না সরাই?" তিথি চ্যালেঞ্জের সুরে বলল। সে ঠোঁট টিপে হাসছিল, আরিশকে রাগাতে পেরে তার যেন আলাদা এক আনন্দ হচ্ছে।

"তাহলে আমি নিজেই ওটা সরিয়ে রাস্তায় রেখে আসব," আরিশ হুমকি দিল।

"হাত দিয়ে তো দেখুন!" তিথি দুই হাত বুকে বেঁধে দম্ভের সাথে দাঁড়াল।

দুই প্রতিবেশীর এই যুদ্ধ দেখে খালেক চাচা অলক্ষ্যে হেসে ফেললেন। তিনি অনেক বছর ধরে এই বিল্ডিংয়ে আছেন, কিন্তু এমন মিষ্টি যুদ্ধ আগে দেখেননি।

শেষ পর্যন্ত তিথিকেই স্কুটি সরাতে হলো, কারণ আরিশ সত্যি সত্যিই স্কুটির হ্যান্ডেল ধরে টান দিতে যাচ্ছিল। তবে স্কুটি সরাতে সরাতে তিথি বিড়বিড় করে বলে গেল, "দাঁড়ান, শোধ আমি তুলবই। এমন জব্দ করব না, মনে রাখবেন!"

সেই সুযোগ তিথি পেয়েও গেল দু-দিন পর, এক বৃষ্টিভেজা রাতে।

শ্রাবণের ভারী বৃষ্টি নামছিল ঢাকায়। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ঝুম বৃষ্টির সাথে তীব্র বাতাস। হঠাৎ করেই পুরো এলাকার বিদ্যুৎ চলে গেল। চারদিক অন্ধকার।

আরিশ তার ড্রয়িংরুমে মোমবাতি জ্বালিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছিল। হঠাৎ তার বারান্দার থাই গ্লাসে জোর কড়া নাড়ার শব্দ। বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় সে দেখল, বারান্দায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে ভিজছে!

আরিশ তড়িঘড়ি করে থাই গ্লাস খুলতেই ভেতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল তিথি। সে একদম ভিজে একাকার। ভিজে যাওয়া চুলগুলো তার মুখের ওপর লেপ্টে আছে, আর বৃষ্টির পানিতে জামাকাপড় শরীর ছাঁচে বসে গেছে।

"আপনি এখানে? এই রাতে বারান্দা দিয়ে?" আরিশ চরম বিস্ময়ে বলল।

"আমাদের বারান্দার পাশের পাইপ ধরে আপনার বারান্দায় নেমেছি," তিথি কাঁপতে কাঁপতে বলল। বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাসে তার ঠোঁট দুটো কাপছিল। "আমার ঘরের দরজা বাইরে থেকে লক হয়ে গেছে, আর ভেতরে মস্ত বড় একটা টিকটিকি! আমি একলা ঘরে ওটার সাথে থাকতে পারব না।"

আরিশ চোখ বড় বড় করে তাকাল, "টিকটিকির ভয়ে আপনি সাততলা থেকে ছয়তলার বারান্দায় নেমে এলেন? আপনি কি পাগল?"

"আমি পাগল না!" তিথি চটে গিয়ে বলল, কিন্তু তার পর মুহূর্তেই ঠান্ডায় সে কেঁপে উঠল।

আরিশের সব রাগ এক মুহূর্তে জল হয়ে গেল। মেয়েটার চঞ্চলতা আর দুষ্টুমির আড়ালে যে একটা ভীষণ অবুঝ আর ছোট মানুষের মতো রূপ আছে, তা আজ প্রথম প্রকাশ পেল। আরিশ তড়িঘড়ি করে তার বেডরুম থেকে একটা শুকনো তোয়ালে আর নিজের একটা বড় মাপের সুতির চাদর নিয়ে এলো।

"নাও, এটা দিয়ে মাথা মোছো আর চাদরটা গায়ে দাও," আরিশ নরম সুরে বলল। প্রথমবার সে তিথিকে 'আপনি'র বদলে কিছুটা আপন সুরে বলল।

তিথি তোয়ালেটা নিয়ে চুলে জড়াল। অন্ধকার ঘরে শুধু মোমবাতির আলো। সেই আলো-ছায়ার খেলায় আরিশের মুখটা অন্যরকম দেখাচ্ছিল। ভীষণ মায়াবী, ভীষণ পুরুষালী।

আরিশ নিজেই চাদরটা তিথির কাঁধে জড়িয়ে দিতে গেল। চাদর জড়াতে গিয়ে আরিশের হাত আলতো করে স্পর্শ করল তিথির ভেজা কাঁধ আর গাল। তিথি চমকে উঠে আরিশের দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। মোমবাতির হলুদ আলোয় তিথির ভেজা চোখের পাতাগুলো চকচক করছিল। আরিশের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। তিথির খুব কাছাকাছি গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল।

তিথিও যেন বোবা হয়ে গেছে। তার ভেজা শরীরের উষ্ণতা আর আরিশের হাতের ছোঁয়া—দুজনের মধ্যেই এক অজানা রোমাঞ্চের ঢেউ তুলে দিল। ঝগড়া, শত্রুতা সব যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে গেল ওই একটি মুহূর্তে। আরিশের মন বলছিল মেয়েটিকে বুকের কাছে টেনে নিতে, আর তিথির মনে হচ্ছিল আরিশের এই গম্ভীর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিতে।

কিন্তু পর মুহূর্তেই সামলে নিল দুজন। তিথি চোখ নামিয়ে চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়াল।

"চা খাবেন?" আরিশ গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করল, গলার স্বর কিছুটা কাঁপছিল।

তিথি মাথা নেড়ে সায় দিল, "হুম... যদি আদা দিয়ে একটু কড়া করে বানান।"

চা বানাতে বানাতে আরিশের মনে হলো, এই মেয়েটি তার শান্ত, গোছানো জীবনে ঝড় তুলতে এসেছে। কিন্তু এই ঝড়টাকে কেন যেন আরিশ আর অপছন্দ করতে পারছে না।

চা হাতে এনে দেওয়ার পর তিথি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "চা-টা কিন্তু মোটেও ভালো হয়নি।"

আরিশ হেসে ফেলল। এই প্রথম তিথি আরিশের ঠোঁটে এমন এক মোহনীয় হাসি দেখল।

"ভালো না লাগলে খেয়েন না," আরিশ বলল।

"খাব। আপনাকে জব্দ করার জন্য এই বাজে চাও পুরোটা শেষ করব," তিথি দুষ্টুমি করে বলল।

বিদ্যুৎ এল আরও ঘণ্টাখানেক পর। কিন্তু ততক্ষণে ধানমন্ডির সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয়, দুজন জেদী মানুষের অলক্ষ্যে ভালোবাসার প্রথম বীজটি রোপিত হয়ে গেছে। তারা কেউই তা স্বীকার করল না, কিন্তু দুজনের হৃদস্পন্দন জানিয়ে দিল—লড়াইটা এবার আর শুধু ঝগড়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়াবে অন্য কোনো গভীরে।

পরদিন সকালে বৃষ্টি থেমে রোদ উঠলেও ধানমন্ডির সেই গলিতে অচেনা এক রোদ ছড়িয়ে পড়েছিল। আরিশের মন সকালে উঠেই কেমন যেন আনমনা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধার সময় সে বারবার বারান্দার দিকে তাকাচ্ছিল। রাতে তিথির সেই ভেজা রূপ, মোমবাতির আলোয় তার চঞ্চল চোখের শান্ত হয়ে যাওয়া, আর চাদর জড়িয়ে দেওয়ার সেই স্পর্শ—সবকিছুই আরিশের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু আরিশের অহংকার আর ব্যক্তিত্বের দেওয়াল খুব শক্ত। সে নিজেকে বোঝাল, ওটা শুধুই একটা সাধারণ রাতের ঘটনা, এর বেশি কিছু নয়।

তবে তিথি যে মোটেও ওসব অনুভূতির তোয়াক্কা করে শান্ত বসে থাকার মেয়ে নয়, তা প্রমাণ হতে বেশি সময় লাগল না।

সকাল সাড়ে নয়টা। আরিশ তার গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চক্ষু চড়কগাছ! তার চকচকে ধূসর রঙের গাড়ির উইন্ডশিল্ডে বড় বড় অক্ষরে একটা লাল রঙের চিরকুট আঠা দিয়ে সাঁটানো। আরিশ চিরকুটটা খুলে পড়তে লাগল। তাতে লেখা:

"প্রিয় অতি-নিয়মনিষ্ঠ প্রতিবেশী,
গতকাল রাতের চা অত্যন্ত জঘন্য হয়েছিল। তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আপনাকে আজ পুরো দিনে অন্তত তিনবার হাসতে হবে। আর হ্যাঁ, আপনার গাড়ির বাম পাশের চাকার হাওয়া কিন্তু অর্ধেক গায়েব!
— ইতি, আপনার লিফট-সঙ্গী তিথি।"

আরিশ চাকার দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যি চাকা বসে গেছে! তবে তিথি চাকা ফুটো করেনি, কেবল চাকার ভালভ ঢিলা করে কিছুটা হাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।

"এই মেয়েটা তো আস্ত একটা বিপদ!" আরিশ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো—চিরকুটটা পকেটে পুরতে গিয়ে তার ঠোঁটের কোণে না চাইতেও একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিথির শর্তানুসারে যা ছিল দিনের প্রথম হাসি।

প্রতিশোধের সুযোগ আরিশ পেয়ে গেল সেদিনই বিকেলে।

তিথি ধানমন্ডি লেকের পাড়ে একটা রেস্তোরাঁয় তার বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল। আরিশ তার এক বসের সাথে মিটিং শেষ করে সেই একই রেস্তোরাঁর এক কোণে এসে বসেছিল। তিথির নজর কিন্তু আগেই চলে গেছে আরিশের দিকে। সে তার বন্ধুদের সাথে কথা বললেও আড়চোখে বারেবারে আরিশের নীল শার্ট আর গম্ভীর ভঙ্গি লক্ষ্য করছিল।

আরিশ ওয়েটারকে ডেকে কায়দা করে তিথিদের টেবিলের বিলটা নিজে মিটিয়ে দিল। তারপর তিথিদের টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হালকা হেসে বলল, "আজকের বিকেলের কফিটা আমার পক্ষ থেকে। গতকাল রাতের বাজে চায়ের ক্ষতিপূরণ।"

তিথি অবাক হয়ে বলল, "আপনি আমাদের বিল দিলেন কেন? আমি কি আপনার কাছে ভিক্ষা চেয়েছি?"

আরিশ একটু ঝুঁকে তিথির কানের কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, "ভিক্ষা নয়, এটা হলো জব্দ করার প্রথম ধাপ। এখন থেকে আপনি যখনই এই রেস্তোরাঁয় কফি খাবেন, আমার কথা মনে পড়বে। প্রতিটা চুমুকে মনে পড়বে, বিলটা আমি দিয়েছি।"

তিথির মুখটা মুহূর্তের জন্য হাঁ হয়ে গেল। আরিশ যে এভাবে প্রকাশ্যে তাকে ঘায়েল করবে, সে ভাবতেই পারেনি! আরিশ একগাল চওড়া হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেল। তিথি তার বন্ধুদের সামনে লজ্জায় লাল হয়ে গেলেও মনে মনে আরিশের এই নতুন রূপ দেখে বুকটা ধক করে উঠল। ছেলেটার গলার স্বর এত গভীর কেন?

লড়াইটা আরও জমজমাট হলো সপ্তাহান্তে, ধানমন্ডির কচি-কাঁচার মেলার মাঠে এক মেলায়।

বিল্ডিংয়ের সবাই মিলে ছোটখাটো এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। তিথি লাল রঙের সুতির শাড়ি আর হাতে কাঁচের চুড়ি পরে এসেছিল। এলোমেলো চুলে লাল শাড়িতে তাকে দেখতে একদম অন্যরকম লাগছিল—যেন রূপকথার কোনো ডানাকাটা পরী, যে কেবল দুষ্টুমি করতেই পৃথিবীতে এসেছে।

আরিশ এসেছিল কালো পাঞ্জাবি পরে। আরিশকে কালো পাঞ্জাবিতে দেখে তিথি কিছুক্ষণের জন্য চোখ ফেরাতে পারল না। কিন্তু নিজের ইগো সামলে নিয়ে সে আরিশের দিকে এগিয়ে গেল।

"বাহ্, আজ তো একদম নবাব সিরাজউদ্দৌলা সেজে এসেছেন!" তিথি খোঁচা মেরে বলল।

আরিশ তিথিকে ওপর-নিচ একবার দেখে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আর আপনাকে তো একদম রক্তকরবীর নন্দিনী মনে হচ্ছে। তবে শাড়িটা একটু সামলে সামলে হাঁটাই ভালো, নইলে আবার বাতাসে উড়ে অন্য কারও বারান্দায় পড়তে পারে।"

"আমার শাড়ি যেখানেই পড়ুক, আপনার তাতে কী?" তিথি চোখ বড় করে বলল।

ঠিক তখনই মেলায় একটা খেলা শুরু হলো—'দম্পতি ও প্রতিবেশী প্রতিযোগিতা'। খেলায় বেলুন ফাটানো আর চোখ বেঁধে সঙ্গী চেনার নিয়ম। অন্য প্রতিবেশীরা জোর করে আরিশ আর তিথিকে জুটি বানিয়ে দিল।

"আমি এই বাচাল মেয়ের সাথে খেলায় অংশ নেব না," আরিশ সোজা না করে দিল।

"ওহ, ভয় পাচ্ছেন নাকি? হেরে যাওয়ার ভয়ে পালাচ্ছেন?" তিথি চ্যালেঞ্জ ছিটাল।

সেই চ্যালেঞ্জে কাজ হলো। আরিশ রাজি হয়ে গেল।

খেলার নিয়ম ছিল: তিথির চোখে কাপড় বাঁধা থাকবে, আর সে শুধুমাত্র হাত দিয়ে স্পর্শ করে ভিড়ের মধ্যে থেকে আরিশকে খুঁজে বের করবে। আরিশ সহ আরও পাঁচজন ছেলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল।

তিথির চোখে কালো কাপড় বেঁধে দেওয়া হলো। সে হাত বাড়িয়ে একে একে ছেলেদের মুখ, হাত আর কাঁধ স্পর্শ করতে লাগল। প্রথম দুজনকে ছুঁয়েই সে মাথা নাড়ল—না, এরা নয়।

তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল আরিশ।

তিথি যখন হাত বাড়াল, তার নরম আঙুলগুলো এসে স্পর্শ করল আরিশের চিবুক আর ধারালো চোয়াল। আরিশের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। তিথির আঙুলগুলো চিবুক পেরিয়ে আলতো করে আরিশের গলায় ও কাঁধে এসে থামল। তিথির স্পর্শে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল আরিশের শরীরে। আরিশের বুকের দ্রুত স্পন্দন তিথির হাতের তালুতে স্পষ্ট ধরা পড়ছিল।

তিথির হাত দুটি আরিশের বুকে থমকে গেল। সেই চঞ্চল মেয়েটির বুকের ভেতরও তখন কালবৈশাখী ঝড় বইছে। আরিশের গায়ের বকুল আর পারফিউমের সেই চেনা গন্ধ... তিথির আর বুঝতে বাকি রইল না।

"এটা আরিশ," তিথি ভিড়ের মাঝে ফিসফিস করে বলে উঠল, কিন্তু তার চোখে তখন আর সেই আগের দুষ্টুমি ছিল না, ছিল এক গভীর আবেশ।

কাপড় খুলে তিথি যখন আরিশের দিকে তাকাল, তখন আরিশও তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল কয়েক মুহূর্ত। চারপাশের মানুষের হাততালির শব্দ যেন তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল না। সেই স্পন্দনে শুধুই ভালোবাসার সুর বাজছিল, যা তারা মুখ ফুটে বলতে পারছে না, কিন্তু হৃদয় দিয়ে তীব্রভাবে অনুভব করছে।

মেলা শেষে রাত তখন ১১টা। বিল্ডিংয়ের লিফটে দুজনে আবার একা।

তিথি নিজের শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। আজকের মেলা আর স্পর্শের পর দুজনের মাঝেই এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। সেই চঞ্চল তিথি যেন আজ বড্ড শান্ত।

"আমাকে এত সহজে চিনে ফেললে কীভাবে?" আরিশ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল। এই প্রথম সে তিথিকে 'তুমি' করে বলল।

তিথি চমকে আরিশের দিকে তাকাল। আরিশের 'তুমি' ডাকটা তার কানে যেন সুরের মতো বাজল। তিথি নিজের ধুকপুক করতে থাকা বুকটা চেপে ধরে হালকা হেসে বলল, "আপনার ওই জঘন্য রাগী চিবুক আর কাঠের মতো শক্ত কাঁধ চেনা খুব কঠিন কিছু না।"

"সত্যিই তাই? নাকি আমার হৃদস্পন্দনটা তোমার খুব চেনা হয়ে গেছে?" আরিশ এক ধাপ এগিয়ে এল তিথির কাছে।

তিথির পিঠ গিয়ে ঠেকলো লিফটের দেওয়ালে। আরিশ তার দু-পাশে হাত রেখে তিথিকে একপ্রকার বন্দি করে ফেলল। আরিশের গভীর চোখ দুটো তিথির ঠোঁট আর চোখে ঘোরাফেরা করছিল।

তিথির বুক দুলছিল দ্রুত নিঃশ্বাসে। সে কোনো মতে বলল, "আপনি... তুমি বেশি কথা বলছ, আরিশ।"

"আর তুমি বড্ড কম বলছ আজ," আরিশ ঝুঁকে এল তিথির গালে। দুজনের নিঃশ্বাসের উত্তাপ মিশে যাচ্ছিল বাতাসে। গভীর এক অনুরাগে আরিশের ঠোঁট তিথির কপালে আলতো স্পর্শ করল।

লিফটের দরজা খোলার ঘণ্টা বেজে উঠতেই তিথি হঠাৎ আরিশের বুক ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল।

"আগামীকাল কিন্তু আমি পার্কিংয়ে নিজের গাড়ি রাখব, আটকানোর চেষ্টা করবেন না!" কথাটি আধো-লজ্জা আর আধো-হুমকির সুরে বলে তিথি দ্রুত লিফট থেকে নেমে নিজের ঘরের দিকে দৌড় দিল।

আরিশ অন্ধকার লিফটে দাঁড়িয়ে নিজের বুকে হাত রাখল। হৃদস্পন্দনটা আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। মিষ্টি এই যুদ্ধের ময়দানে সে যে ইতিমধ্যেই হেরে গেছে, তা আর বুঝতে বাকি রইল না। কিন্তু তিথি কি তার জয় স্বীকার করবে? নাকি শুরু হবে নতুন কোনো নাটক?

সেই রাতের লিফটের চুমুর পর থেকে তিথি যেন একটু বেশিই এড়িয়ে চলতে লাগল আরিশকে। চঞ্চল মেয়েটি হঠাৎ করেই কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে। বারান্দায় এখন আর তার ভেজা ওড়না ওড়ে না, সকালের লিফটে তার আর জেদ দেখা যায় না, এমনকি পার্কিং লটেও তার লাল স্কুটিটা একদম সোজা হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

কিন্তু এই দূরত্ব আরিশের বুকজুড়ে তৈরি করল এক অদ্ভুত হাহাকার। আরিশ খেয়াল করল, ঝগড়া না হলে তার দিন শুরু হতে চায় না। তিথির সেই তীক্ষ্ণ খোঁচা, মিষ্টি হাসি আর জেদী চোখ দুটো না দেখলে তার কাজের টেবিল ফাঁকা লাগে।

শুক্রবার বিকেল। আকাশজুড়ে নেমে এসেছে ঘন কালো মেঘ। একটু পরেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। সাততলার ছাদ থেকে পানি নামার পাইপটা হঠাৎ আটকে গিয়ে ছাদ ভেসে যাওয়ার উপক্রম। ভবনের কেয়ারটেকার খালেক চাচা অসুস্থ, তাই আরিশ নিজেই ছাদের চাবি নিয়ে উপরে গেল ড্রেন পরিষ্কার করতে।

ছাদের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আরিশ থমকে দাঁড়াল।

বৃষ্টির তোড়ে পুরো ছাদ যখন ভিজছে, ঠিক তখন ছাদের এক কোণে ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে আছে তিথি! পরনে তার হালকা নীল রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ। সে দুই হাত ছড়িয়ে মুখ উঁচু করে বৃষ্টি স্পর্শ করছে। তার চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁটে এক স্বর্গীয় শান্তি। চুলে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

আরিশ ড্রেন পরিষ্কারের কথা একদম ভুলে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তিথির দিকে।

তিথি চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখল আরিশকে। তার মুখে জমে থাকা শান্তিটা নিমেষেই বদলে গেল বিষাদে আর সংকচে। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, "আপনি এখানে কেন?"

"তুমি বৃষ্টিতে ভিজছ কেন? শরীর খারাপ করবে তো," আরিশ গম্ভীর কিন্তু পরম মমতায় বলল।

"আমার যা ইচ্ছা করব! আপনাকে কেন জবাব দিতে যাব?" তিথি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছাদ থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো।

কিন্তু আরিশ তার হাতটা ধরে ফেলল। শক্ত কিন্তু কোমল এক বাঁধন। তিথি চমকে উঠে আরিশের দিকে তাকাল। আরিশের ভিজে যাওয়া শার্টের ফাঁক দিয়ে সুঠাম বুক দেখা যাচ্ছে, চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে।

"আর কতদিন এভাবে পালাবে, তিথি?" আরিশ একদম তিথির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল। বৃষ্টির পানির মতোই তার গলা ভারী শোনালো।

"আমি পালাচ্ছি না," তিথি চোখ ছানাবড়া করে নিজের হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, "হাত ছাড়ুন! কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?"

"ভাবুক! আমি আর পরোয়া করি না," আরিশ এক ঝটকায় তিথিকে নিজের কাছে টেনে আনল। তিথি সোজা এসে আছড়ে পড়ল আরিশের বুকে।

ঝুম বৃষ্টির শব্দে চারপাশ তখন মুখরিত। তিথির বুকের ভেতরের ধুকপুকানি আরিশের বুকের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। তিথি হাত দুটো দিয়ে আরিশের ভেজা জামা শক্ত করে চেপে ধরল। সে মুখ তুলে আরিশের চোখে চোখ রাখল। তিথির ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় কাঁপছিল।

"তুমি প্রতিদিন আমার সাথে ঝগড়া করো, আমাকে জব্দ করার ফাঁদ পাতো... কিন্তু এখন আমার চোখে তাকাতে তোমার এত ভয় কিসের?" আরিশ পরম যত্নে তিথির মুখটি দুই হাতের তালুতে তুলে নিল।

তিথির চোখের কোণে বৃষ্টির জলের সাথে মিশে গেল কয়েক ফোঁটা চোখের জল। সে অভিমানের সুরে বলে উঠল, "কারণ আমি আপনাকে সহ্য করতে পারি না! আপনি এত গোছানো কেন? এত গম্ভীর কেন? কেন আপনি আমার শান্ত মনটাকে এভাবে এলোমেলো করে দিলেন?"

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই আরিশ নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল তিথির ভেজা ঠোঁটে।

বৃষ্টির তীব্র ছাঁটের মাঝে এক পরম উষ্ণতায় দুজন ডুবে গেল। তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আরিশের গলায় দুই হাত জড়িয়ে ধরে সেই আবেগে সাড়া দিল। ঢাকার বুকে তখন হাজারো গাড়ি আর মানুষের ব্যস্ততা, কিন্তু ছাদের ওপর এই দুটি মানুষের কাছে পৃথিবীর সব কিছু স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তিথির শরীরের মিষ্টি বকুল ফুলের গন্ধ আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিশে আরিশকে মাতাল করে তুলছিল। আরিশের হাতের স্পর্শে তিথির গায়ে শিহরণ জেগে উঠল। তিথি আরিশের বুকে মাথা রেখে এক গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল, যেন যুগের পর যুগ ধরে সে এই আশ্রয়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিল।

কয়েক মিনিট পর আরিশ ধীরে ধীরে তিথির মুখ থেকে নিজের ঠোঁট সরালো। তিথির গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে, সে আরিশের বুকের ভেতরেই নিজের মুখ লুকিয়ে রাখল।

"এখনো বলবে আমাকে সহ্য হয় না?" আরিশ তিথির চুলে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল।

তিথি আরিশের পেটে আলতো করে একটা কিল মেরে বলল, "পচা লোক একটা! আপনি বড্ড সুযোগসন্ধানী।"

"তুমিই তো আমাকে বাধ্য করলে," আরিশ তিথির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরও আঁকড়ে ধরল।

"কিন্তু সমস্যা তো অন্য জায়গায়, আরিশ," তিথি হঠাৎ একটু বিষণ্ণ গলায় বলল, তার চঞ্চলতা আবার কোথাও যেন হারিয়ে গেল।

আরিশ তিথিকে সামান্য দূরে সরিয়ে তার দিকে তাকাল, "কী সমস্যা?"

তিথি চোখ নামিয়ে বলল, "আমার বাবা আমার জন্য এক প্রবাসী ছেলের বিয়ের সম্বন্ধ দেখছেন। আগামী রোববার তারা আমাদের বাসায় আসছে।"

কথাটা শুনে আরিশের বুকটা যেন একমুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বৃষ্টির ঝাপসা আলোয় তিথির মুখটা বড্ড করুণ দেখাচ্ছিল।

"তুমি কী চাও?" আরিশ তিথির চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল।

"আমি..." তিথি কেঁদে ফেলল, "আমি তো ওই বাজে লোকটার সাথে ঝগড়া করে সারাজীবন কাটাতে চাই, যে লাল চা ভালো বানাতে পারে না!"

আরিশের মুখে এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে তিথিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কানে কানে বলল, "তাহলে রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করো, তিথি। তোমার প্রতিবেশী শুধু ঝগড়া করতেই জানে না, নিজের ভালোবাসাকে ছিনিয়ে আনতেও জানে।"

বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছিল দুজনপ্রেমিকের গায়ে। ঝগড়া আর জেদের দেয়াল ভেঙে অবশেষে ভালোবাসার গোপন কথাটি ডালপালা মেলল সেই একলা বৃষ্টিভেজা রাতে।

রোববার বিকেল। সাততলার ফ্ল্যাটের বাতাবরণে এক থমথমে নীরবতা।

তিথির বাবা তালুকদার সাহেব ড্রয়িংরুমে পায়চারি করছেন। তিথি ঘরের কোণে বসে লাল রঙের একটা ঢাকাই জামদানি শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচাচ্ছে। আজ কানাডা প্রবাসী অয়ন আর তার বাবা-মা আসছে তিথিকে দেখতে। কিন্তু তিথির মনটা পড়ে আছে একতলা নিচে, সেই ধূসর শার্ট পরা কাঠখোট্টা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের ঘরে। গত দু-দিন আরিশের কোনো পাত্তা নেই। ফোন করলেও ধরেনি, বারান্দাতেও তাকে দেখা যায়নি।

'পচা লোকটা কি তবে ভয় পেল?'—তিথির চোখে পানি চলে এলো।

ঠিক বিকেল পাঁচটায় দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।

তিথির মা দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলেন পাত্রের বাবা-মা আর পাত্র অয়ন। অয়নের পরনে স্যুট-ব্লেজার, চোখে চশমা, চেহারায় এক ধরনের অহংকারী ভাব। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে অয়নদের ঠিক পেছনেই ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল আরেকজন।

কালো রঙের একখানা ধবধবে সুতির পাঞ্জাবি, হাতে মিষ্টির বড় একটা প্যাকেট, মুখে আত্মবিশ্বাসের ধীর-স্থির হাসি। আরিশ!

তিথি শাড়ির আঁচল ছেড়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ ছানাবড়া!

"আসতে কি একটু দেরি হয়ে গেল?" আরিশ শান্ত গলায় বলল এবং মিষ্টির প্যাকেটটা টি-টেবিলে রাখল।

তালুকদার সাহেব চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে আরিশের দিকে তাকালেন। "তুমি কে বাবাজী? তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না।"

"চাচা, আমি নিচের ছয়তলার আরিশ," আরিশ বিনীতভাবে বলল, "আপনাদের নতুন প্রতিবেশী। ভাবলাম নতুন প্রতিবেশীর ঘরে মেহমান এসেছে, একটু খবরাখবর নিই।"

অয়ন বিরক্ত হয়ে আরিশকে ওপর-নিচ দেখে বলল, "লুক, আমরা একটা পার্সোনাল ফ্যামিলি ম্যাটারে কথা বলছি। আই থিঙ্ক তোমার এখন যাওয়া উচিত।"

আরিশ অয়নের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক ঠান্ডা প্রতিদ্বন্দিতার তেজ। সে অয়নকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তালুকদার সাহেবের দিকে ফিরে বলল, "চাচা, আপনার মেয়েকে কিন্তু প্রতিদিন গাড়ির চাকার হাওয়া ঢিলা করা বা ভুল জায়গায় স্কুটি রাখার অপরাধে পুলিশে দেওয়া উচিত।"

ড্রয়িংরুমের সবাই স্তম্ভিত! পাত্রের মা মুখ হাঁ করে রইলেন।

তিথি রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে বলল, "আরিশ! তুমি..."

"তবে সমস্যা হলো," আরিশ এক ধাপ তিথির দিকে এগিয়ে গেল, "মেয়েটা যতবারই অসভ্যতা করে, ততবারই তাকে আমার আরও বেশি ভালো লেগে যায়।"

"হোয়াট ইজ দিস ননসেন্স!" অয়ন সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। "এসব কী ফাজিলমো?"

"ফাজিলমো নয়, সত্যি," আরিশ এবার তিথির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার সামনে সে তিথির চোখের দিকে তাকাল। "চাচা, কানাডা থেকে আসা এই ভদ্রলোক আপনার মেয়েকে বছরে একবার ঘুরতে নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু আমি আপনার মেয়েকে প্রতিদিন ধানমন্ডির জ্যামে আটকে রেখে তার হাজারটা ঝগড়া সহ্য করতে পারব। ওর ফেলা ওড়না ছাদ থেকে কুড়িয়ে এনে দিতে পারব আর বৃষ্টির রাতে আদা চা বানিয়ে খাইয়ে ওর টিকটিকির ভয় ভাঙাতে পারব।"

তিথির বুকের ভেতরে যেন হাজারটা বাদ্য বেজে উঠল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু এবার তা কষ্টের নয়—চরম আনন্দের জল।

তালুকদার সাহেব চোখ বড় বড় করে আরিশের কথা শুনছিলেন। পাত্রের মা চটে গিয়ে বললেন, "তালুকদার সাহেব! এসব কী তামাশা? আমরা কি এখানে অন্য কারও প্রেমের নাটক দেখতে এসেছি? চলুন অয়ন, এখানে আমাদের কোনো কাজ নেই!"

অয়নরা রাগে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে তখন শুধু বিষম নীরবতা।

তালুকদার সাহেব শক্ত মুখে আরিশের দিকে এগিয়ে এলেন। "তোমার সাহস তো কম নয় ছোকরা! আমার ড্রয়িংরুমে ঢুকে আমার মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দিলে?"

আরিশ একটুও দমল না। সে সোজা তালুকদার সাহেবের চোখে চোখ রেখে বলল, "সাহস না থাকলে কি আর এই চঞ্চল মেয়েটার বর হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়, বলুন? আপনি পরীক্ষা নিয়ে দেখতে পারেন চাচা। আমি তিথিকে কতটা ভালোবাসতে পারি, তার কোনো হিসাব আমার জানা নেই।"

তালুকদার সাহেব কিছুক্ষণ আরিশের গম্ভীর আর দৃঢ় চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ করেই তার কঠোর মুখটা নরম হয়ে এলো। তিনি তিথির দিকে তাকালেন। তিথি তখন মাথা নিচু করে শাড়ির আঁচল কামড়াচ্ছে, কিন্তু তার গালের রージュ জানান দিচ্ছে সে কতটা সুখী।

"মেয়ে আমার গত দু-দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে খালি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে," তালুকদার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমি তো ভাবতাম মেয়েটা জ্যামে আটকে আছে, এখন দেখছি ও তো একদম প্রেমে আটকে গেছে!"

তিথি লজ্জায় দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

রাত তখন একটা।

বিল্ডিংয়ের ছাদটা একদম নিঝুম। বৃষ্টি নেই, তবে আকাশে ফুটফুটে জোছনা। চাঁদের আলোয় ছাদ ভেসে যাচ্ছে।

তিথি ছাদে গিয়ে দেখল আরিশ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের কালো পাঞ্জাবিটা রাতের বাতাসে হালকা উড়ছে। তিথি খুব পা টিপে টিপে পেছনে এসে দাঁড়াল।

আরিশ না ফিরেই বলল, "আর কত আড়ালে থাকবে? কাছে এসো।"

"আপনি কীভাবে বুঝলেন আমি এসেছি?" তিথি মুখ বাঁকিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল।

"তোমার ওই বকুল ফুলের গন্ধ," আরিশ ঘুরে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় তিথিকে জামদানি শাড়িতে কোনো ডানাকাটা পরীর চেয়ে কম লাগছে না।

আরিশ আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে তিথির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে একদম পিষে ফেলল।

"উফ, আরিশ! কী করছ? কেউ দেখে ফেলবে!" তিথি হালকা ধস্তাধস্তি করার ভান করল।

"দেখুক," আরিশের গলার স্বর গভীর আর মাতাল শোনালো। সে তিথির ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। আরিশের গরম নিঃশ্বাস তিথির খোলা ঘাড়ে পড়তেই তিথির সারা শরীরে শিউরে উঠল।

আরিশ আলতো করে তিথির কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর গাল বেয়ে নেমে এলো তার ভেজা ঠোঁটে। তিথি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আরিশের কালো পাঞ্জাবির কলার শক্ত করে চেপে ধরে গভীর প্রেমে জড়িয়ে ধরল তার প্রতিদিনের শত্রুকে—যে এখন তার একমাত্র আশ্রয়।

জোছনার আলোয় দুজন প্রেমিকের শরীর আর মন একাকার হয়ে গেল। আরিশ তিথির মুখটি বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে জব্দ করার প্রতিযোগিতাটা কিন্তু এখনো শেষ হয়নি, তিথি।"

তিথি আরিশের বুকে থুতনি রেখে মিষ্টি করে হেসে বলল, "আমি তো হেরে গেছি আরিশ... তোমার এই বুকে নিজেকে বন্দি করে।"

রোববারের সেই ঝড়ের পর দুটি পরিবারই শেষ পর্যন্ত তাদের মেলামেশা ও ভালোবাসা মেনে নিল। ধানমন্ডির সেই আটতলা বিল্ডিংয়ের পরিবেশটাই যেন হঠাৎ বদলে গেল। ঝগড়ার জায়গাটা নিল এক অদ্ভুত মায়াবী টান। তবে স্বভাব কি আর এত সহজে বদলায়? ভালোবাসার রঙ যতই গাঢ় হোক না কেন, আরিশ আর তিথির সেই মিষ্টি রেষারেষি আর খুনসুটি কিন্তু থামল না।

দুই পরিবারের সম্মতিতে ঠিক ছয় মাসের মাথায় ধুমধাম করে তাদের আকদ ও সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো।

বিয়ের দিন সকাল। ধানমন্ডির এক কনভেনশন সেন্টার সেজে উঠেছে আলো আর নানা রঙের দেশি ফুলে।

কনে সাজে তিথিকে দেখে যেন চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। গাঢ় লাল রঙের জামদানি শাড়ি, কপালে ছোট টিপ, সোনা ও মুক্তোর গয়না, আর হাত ভর্তি লাল-সবুজ কাঁচের চুড়ি। তবে তার সাজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তার মুখের সেই চেনা দুষ্টুমি আর লাজুক হাসির ককটেল।

অন্যদিকে আরিশ পরেছিল ধবধবে সাদা রেশমি শেরওয়ানি আর মাথায় ম্যাচিং পাগড়ি। তাকে দেখাচ্ছিল কোনো এক আভিজাত্যময় রাজকুমারের মতো।

কাজী সাহেব যখন আকদের খাতা এগিয়ে দিলেন, তিথি কলমটা হাতে নিয়ে আরিশের দিকে তাকাল। তার চোখে জল আর মুখে হাসি। তিনবার 'কবুল' বলার সময় তার গলাটা সামান্য কেঁপে উঠেছিল। আরিশ যখন তিথির দিকে তাকিয়ে সাইন করল, তখন তার গম্ভীর মুখে ফুটে উঠেছিল এক স্বর্গীয় প্রাপ্তির তৃপ্তি।

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত প্রায় শেষ। নতুন বৌকে নিয়ে আরিশ ফিরে এলো নিজের সেই পরিচিত ফ্ল্যাটে—ছয়তলার সেই গোছানো নীড়ে, যা এতদিন কেবল একা একটা ছেলের ঠিকানা ছিল। আজ থেকে সেই ঠিকানা দুজনের।

বেডরুমে ঢুকেই তিথি খাটের ওপর জমে থাকা গোলাপের পাপড়িগুলো দেখে মুচকি হাসল।

আরিশ দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে এলো। ঘরে হালকা চন্দনের সুবাস ছড়ানো, ডিম লাইটের নরম আলোয় ঘরের আবহটা ভীষণ রোমান্টিক হয়ে আছে।

আরিশ এসে দাঁড়াল তিথির একদম সামনে। তিথি খাটের কোণে বসে নিজের শাড়ির আঁচল নিয়ে খেলছিল। তার বুকের ভেতর তখন প্রবল তোলপাড়। এতদিনের ঝগড়াটে মেয়েটি যেন আজ এক লাজুক কনে।

আরিশ হাঁটু গেড়ে বসল তিথির সামনে। পরম যত্নে তিথির দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

"এখনো কি আমাকে জব্দ করার কোনো নতুন প্ল্যান আছে, ম্যাডাম?" আরিশের গলার স্বর গভীর আর চরম অনুরাগে ভরা।

তিথি চোখ তুলে আরিশের চোখের দিকে তাকাল। চাঁদের মতো আলো ছড়ানো তিথির চোখ দুটোয় আজ আর কোনো অহংকার নেই, আছে কেবল নিঃশ্বাসের চেয়েও সত্যি ভালোবাসা।

"আপনাকে তো সারা জীবনের জন্য জব্দ করে নিয়েছি, আরিশ," তিথি ফিসফিস করে বলল, "এখন আর কোনো প্ল্যান লাগে?"

আরিশ হালকা হেসে তিথির কপাল ছুঁয়ে নিজের ঠোঁট রাখল। এক পরম পবিত্র স্পর্শ। তিথি চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরিশ আস্তে আস্তে তিথির গয়নাগুলো একে একে খুলে দিতে লাগল। প্রতিটা গয়না খোলার সাথে সাথে আরিশের আঙুলের ছোঁয়া তিথির গায়ে যেন বিদ্যুতের মতো খেলে যাচ্ছিল।

তিথিকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিয়ে আরিশ ওকে বিছানায় শুইয়ে দিল। আরিশ ঝুঁকে এলো তিথির ওপর। দুজনের নিঃশ্বাসের উত্তাপ মিশে গেল এক হয়ে।

"তুমি আমার শান্ত জীবনের কালবৈশাখী ঝড়, তিথি," আরিশ তিথির চুলে আঙুল চালিয়ে ফিসফিস করে বলল।

"আর তুমি আমার এলোমেলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানা," তিথি আরিশের গলায় দুই হাত পেঁচিয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।

সেই গভীর রাতে, কোনো ঝগড়া নয়, কোনো প্রতিযোগিতা নয়—ছিল শুধুই দুটো ব্যাকুল হৃদয়ের এক হয়ে যাওয়া। ওড়না উড়ার সেই প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া পথচলা শেষ পর্যন্ত এসে মিলল এক অনন্ত ভালোবাসার সমুদ্রে।

এক বছর পর।

ধানমন্ডির সেই গলিতে নরম রোদ ফুটেছে। আরিশ তার গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াতেই ওপর থেকে ভেজা সুতির ওড়না নয়, এবার সোজা একটা পানির ঝাপটা এসে পড়ল তার ধবধবে পরিষ্কার গাড়ির ওপর!

আরিশ ওপরের দিকে তাকাতেই দেখল, তিথি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে। তার কোলে তিন মাসের একটি ফুটফুটে ছোট্ট কন্যাসন্তান—যার নাম তারা রেখেছে 'আরিশা'।

"হ্যালো! আপনি কি গাড়িতে পানি দেওয়া বন্ধ করবেন?" আরিশ কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে চিল্লাল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে উপচে পড়া হাসি।

"উফ! এই এক বছর ধরে একই কথা শুনছি," তিথি ওপর থেকে আরিশাকে কোলে নিয়ে নাচাতে নাচাতে বলল, "মেয়েকে নিয়ে নিচে নামছি, লিফটে হোল্ড করে রাখুন। আর হ্যাঁ, গাড়ির চাকা ঢিলা আছে কি না চেক করে নেবেন কিন্তু!"

 

....
👁 31