ক্যাম্পাসের গভীর টানে আবদ্ধ

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সেমিস্টারের শুরুর দিকটা সাধারণত শান্ত থাকে, কিন্তু সিলেট ক্যাফেটেরিয়ার পেছনের বটতলাটায় কখনোই প্রশান্তি স্থায়ী হতো না। বিশেষ করে যখন সাদাত সেখানে উপস্থিত থাকত। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র সাদাতকে পুরো ক্যাম্পাস চেনে তার তীক্ষ্ণ চোখ আর অনমনীয় মেজাজের জন্য। চায়ের কাপে হালকা চুমুক দিয়ে সে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের স্থির চাহনিতে এক ধরনের বিষাদময় কর্তৃত্ব ফুটে উঠত, যা চাইলেও কেউ এড়িয়ে যেতে পারত না।

ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল লাল ইটের তৈরি এক নম্বর একাডেমিক ভবনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসা মেয়েটার দিকে। ইতি। সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। নীল রঙের একটা সাধারণ সালোয়ার-কামিজ পরা, কাঁধে ঝুলানো একটা কালো কাপড়ের ব্যাগ। ইতি এই ক্যাম্পাসে একেবারে নতুন, আর তার চোখের মধ্যে একটা নিষ্পাপ চাঞ্চল্য খেলা করছিল, যা সাদাতের চোখে ছিল ভীষণ রকমের বিরক্তি আর তীব্র আকর্ষণের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

সাদাত তার আড্ডার মাঝপথেই উঠে দাঁড়াল। বন্ধুদের কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে হেঁটে গেল ইতির গন্তব্যের দিকে। ইতি তখন বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ডিপার্টমেন্টের প্রশাসনিক দপ্তরের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনে ছায়ার মতো সাদাত এসে দাঁড়াতেই সে থেমে গেল। ইতি একটু অবাক হয়ে তাকাল। সাদাতের চেহারা গম্ভীর, চোখে কোনো হাসি নেই।

"তুমি ইতি, তাই না?" সাদাতের গলা শান্ত, কিন্তু সেখানে ছিল এক ধরনের অদৃশ্য চাপ।

ইতি কিছুটা ইতস্তত করে বলল, "জি, ভাইয়া। কিছু বলবেন?"

"তুমি গত পরশু দিন সেন্ট্রাল লাইব্রেরির বাইরে সাদের সঙ্গে কথা বলছিলে," সাদাত কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি আসল কথায় চলে এল। "ক্যাম্পাসে চলাফেরার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, যা হয়তো নতুন এসেছ বলে জানো না। সবার সঙ্গে অতিরিক্ত মেলামেশা এখানে ভালো চোখে দেখা হয় না।"

ইতির কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। মেয়েটা মিষ্টি দেখতে হলেও মোটেও দুর্বল নয়। সে চোখের পলক না ফেলে জবাব দিল, "ভাইয়া, আমি কার সঙ্গে কথা বলব বা বলব না, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এতে নিয়মের কোনো লঙ্ঘন হয়নি।"

সাদাত একধাপ এগিয়ে এল। তাদের মধ্যে দূরত্ব কমে এল কয়েক ইঞ্চিতে। তার গায়ের মৃদু পারফিউমের গন্ধ আর চোখের ভেতরের গভীর, অন্ধকার চাহনি ইতিকে একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। সাদাত নিচু গলায় বলল, "আমার এরিয়ার ভেতরে যা কিছু ঘটে, তার সবকিছুই আমার সীমানার মধ্যে পড়ে। আর আমি আমার নজর থেকে কোনো কিছুকে সহজে সরতে দিই না। ভবিষ্যতে সতর্ক থেকো।"

কথাটা শেষ করেই সাদাত কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের বন্ধুদের দিকে হেঁটে চলে গেল। ইতি সেখানে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে এক অদ্ভুত রাগ আর অজানা শঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। ছেলেটা কে? নিজেকে কী মনে করে সে? আর কেনই বা সে এত অধিকার নিয়ে তার জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করতে চাইছে?

সেই সন্ধ্যার পর থেকে ঘটনাগুলো দ্রুত বদলাতে শুরু করল। ক্যাম্পাসের গোলচত্বর, টংয়ের দোকান, কিংবা ক্যাফেটেরিয়া—ইতি যেখানেই যাক না কেন, সে অনুভব করত কোনো এক নীরব উপস্থিতি তাকে অনবরত অনুসরণ করছে। সাদাত কখনো তার সামনে এসে সরাসরি কথা বলত না, কিন্তু সবসময় দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকে পর্যবেক্ষণ করত।

একদিন লাইব্রেরি থেকে বের হতে হতে ইতির বেশ রাত হয়ে গেল। ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলো তখন ফাঁকা, রাস্তার দুপাশের গাছগুলোর ছায়া দীর্ঘ হয়ে এসেছে। হঠাৎ তার পেছনে পদশব্দ শোনা গেল। ইতি দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। ভয়ে তার বুক দুরুদুরু করছিল। কিছুটা পথ যেতেই হঠাৎ কেউ তার হাত ধরে এক পাশে টেনে নিয়ে গেল। ইতি চিৎকার দিতে যাবে, অমনি কেউ একজন তার মুখে শক্ত হাত চেপে ধরল।

"চুপ," একটা পরিচিত, গভীর কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ভেসে এল।

ইতি চোখ মেলে দেখল সাদাত। তারা এখন ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারের পেছনের নির্জন পাইন বাগানের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। সাদাতের হাত তখনও তার মুখে, আর অন্য হাতটা দিয়ে সে ইতিকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। সাদাতের বুকের ভেতরের দ্রুত স্পন্দন ইতি নিজের গায়ে অনুভব করতে পারছিল।

"তুমি আমাকে এত ভয় পাও কেন?" সাদাত মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু হাতটা সোজা গিয়ে থামল ইতির চিবুকে। আঙ্গুলের শক্ত ছোঁয়ায় ইতির মুখটা ওপরে তুলে ধরে সাদাত তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ইতি রেগে গিয়ে বলল, "ছাড়ুন আমাকে! আপনি যা করছেন, সেটা অপরাধ। আপনি আমাকে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে পারেন না।"

সাদাত হালকা একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো ভালোবাসা ছিল না, ছিল বিষাক্ত এক ধরনের পূর্ণ আধিপত্যের আশ্বাস। "আমি তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করছি না, ইতি। আমি শুধু তোমাকে আমার করে নিচ্ছি। তুমি বুঝতে পারছ না, কিন্তু তোমার এই ক্যাম্পাসে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই তুমি অন্য কারো হওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেছ।"

"আমি আপনার সম্পত্তি নই!" ইতি সাদাতের বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সাদাত একচুলও নড়ল না।

"তুমি আমার সম্পত্তি নাও হতে পারো, কিন্তু তুমি আমার একমাত্র আবেশ," সাদাত এক পা আরও কাছে এসে ইতির কানের কাছে ঝুঁকলো। তার কণ্ঠস্বর ছিল ফিসফিসে কিন্তু ভীষণ গম্ভীর। "তুমি যত দূরে যাওয়ার চেষ্টা করবে, আমি তত কাছাকাছি আসব। তুমি যত আমাকে ঘৃণা করবে, আমি তোমাকে তত বেশি আমার এই বিষাক্ত জালে জড়িয়ে নেব। ভেবে দেখো, এই ক্যাম্পাসে আমার কথার বাইরে এক পা ফেলার ক্ষমতা কারো নেই, এমনকি তোমারও না।"

ইতির চোখ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারছিল না, এই লোকটার ভালোবাসার নাম কি আধিপত্য নাকি ধ্বংস? সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল সাদাতের চোখে একটা গভীর তৃষ্ণা, যা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিতে চায়। অথচ এই ভয়ঙ্কর রূপটার পেছনে কোথায় যেন একটা ভাঙা, একা মানুষের হাহাকার লুকিয়ে আছে বলে ইতির মনে হতে লাগল।

সাদাত বুড়ো আঙুল দিয়ে ইতির চোখের জলটুকু মুছে দিল। তার স্পর্শে এবার যেন সামান্য নমনীয়তা ছিল, কিন্তু চোখের চাহনি ছিল তেমনই একগুঁয়ে আর বিপজ্জনক। "আজ বাড়ি যাও। তবে মনে রেখো, কাল সকালে প্রথম ক্লাসের পর আমি তোমার জন্য ক্যাফেটেরিয়ায় অপেক্ষা করব। না আসলে পরিণতি ভালো হবে না।"

সাদাত ধীরে ধীরে ইতিকে ছেড়ে দিয়ে ছায়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল। ইতি একা দাঁড়িয়ে রইল সিলেটের সেই ঠাণ্ডা বাতাসের মাঝে। তার শরীর কাঁপছিল, মন বলছিল এই লোকটার থেকে অনেক দূরে পালিয়ে যেতে। কিন্তু ভেতরের এক রহস্যময় অদ্ভুত আকর্ষণ তাকে যেন অদৃশ্যে কোনো শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলছিল, যা সে চাইলেও ছিঁড়ে ফেলতে পারছিল না।

পরদিন সকাল থেকেই সিলেটের আকাশ মেঘলা ছিল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কদম তলার দিকে নামতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। ইতির প্রথম ক্লাসের শিক্ষক ছিলেন খুব কড়া, কিন্তু আজ ক্লাসের পুরোটা সময় ইতির মন এক জায়গায় স্থির ছিল না। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক একটা দীর্ঘ বছর মনে হচ্ছিল। সাদাতের হুমকিটা তার মনে অনবরত দোলা দিচ্ছিল।

ক্লাস শেষ হতেই ইতি ক্যাফেটেরিয়ার দিকে না গিয়ে সোজা বিপরীত দিকে হাঁটা দিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সাদাতের কোনো অন্যায় ভয় দেখানো আদেশ সে মেনে নেবে না। সে দ্রুত পায়ে উইমেনস হলের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু শহীদ মিনারের মোড় ঘুরতেই একটা কালো মোটরবাইক এসে ইতির একদম সামনে ব্রেক কষল। টায়ারের বিকট শব্দে ইতি চমকে পিছিয়ে গেল।

বাইকে বসে থাকা লোকটা তার হেলমেট খুলতেই বেরিয়ে এল সাদাতের বিষাদময়, ক্ষুব্ধ চেহারা। বৃষ্টির হালকা পানির ফোঁটা তার চুলে জমা হয়ে আছে, আর চোখের দৃষ্টি যেন আগুনের ফিনকি ছড়াচ্ছে।

"আমি বলেছিলাম ক্যাফেটেরিয়ায় আসতে," সাদাত বাইক থেকে নেমে ধীরপায়ে ইতির দিকে এগিয়ে এল।

ইতি নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলল, "আমি আপনার কোনো আদেশ শুনতে বাধ্য নই সাদাত ভাই। আমাকে পথ ছাড়ুন, আমি হলে যাব।"

সাদাত একটু অট্টহাসি হাসল, কিন্তু তার সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। সে এক ঝটকায় ইতির কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। টান মেরে তাকে নিজের আরও কাছে নিয়ে আসল। ইতির হাতের ওপর সাদাতের আঙুলগুলোর চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে ইতি ব্যথায় সামান্য কেঁকিয়ে উঠল।

"তুমি বারবার ভুলে যাও ইতি, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া কতটা বিপজ্জনক," সাদাতের কণ্ঠস্বর কম্পিত ছিল এক অদ্ভুত আবেশে। "তোমাকে আমি ভালোবেসে কাছে ডাকিনি, আমি তোমাকে আমার উপস্থিতির ভয়টুকু বোঝাতে চেয়েছিলাম। তুমি কি ভেবেছ এই ক্যাম্পাসে আমার কথা অমান্য করে তুমি সহজে পার পেয়ে যাবে?"

"আপনি যা করছেন তা কোনো ভালোবাসা নয়, এটা একটা মানসিক অসুস্থতা!" ইতি নিজের হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল। "আমাকে ছেড়ে দিন, নইলে আমি এবার সরাসরি ভিসি স্যারের কাছে যাব।"

সাদাত একচুলও নড়ল না। উল্টো সে নিজের শরীর দিয়ে ইতিকে রাস্তার পাশের একটা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের কাণ্ডের সঙ্গে চেপে ধরল। তাদের মাঝে এখন আর কোনো ব্যবধান রইল না। বৃষ্টির পানি ইতি আর সাদাত দুজনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সাদাতের ঘন নিঃশ্বাস ইতির কপালে এসে পড়ছিল।

"যাও, ভিসি স্যার কেন, পুরো শহরের প্রশাসনকে ডেকে আনো," সাদাত ফিসফিস করে ইতির কানের কাছে বলল, তার এক হাত সোজা চলে গেল ইতির ভিজা চুলের ভেতর। "কিন্তু জেনে রেখো, তারা তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। আমি তোমাকে এমন এক জায়গায় আটকে রাখব, যেখানে তোমার পুরো পৃথিবী শুধু আমার নামেই শুরু হবে আর আমার নামেই শেষ হবে।"

ইতি ভয়ে আর রাগে কাঁপছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, সাদাতের চোখের খুব গভীরে চোখ পড়তে ইতির মনে হলো, এই হিংস্র রূপটার নেপথ্যে কোথাও ভয়ংকর এক শঙ্কা কাজ করছে। যেন ইতি যদি তার হাত থেকে বের হয়ে যায়, তবে সাদাত নিজেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই অদ্ভুত নির্ভরশীলতা, এই তীব্র একচেটিয়া অধিকারবোধ ইতিকে স্তব্ধ করে দিল।

ঠিক তখনই দূর থেকে কয়েকজন ছাত্রকে হেঁটে আসতে দেখে সাদাত ইতির কবজি ছেড়ে দিল, তবে নজর সরাল না। সে পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে ইতির ভেজা মুখটা সাবধানে মুছে দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণ আগের সেই হিংস্র লোকটা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল, তার জায়গায় চলে এল এক যত্নশীল কিন্তু অদ্ভুত এক পুরুষ।

"তুমি ভিজছ," সাদাত নরম গলায় বলল, কিন্তু চাহনিতে সেই আগের মতোই অধিকারের স্পষ্ট ছাপ। "আজকের দিনটা আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বৈকালিক আড্ডায় কিল রোড ধরে যখন হাঁটা দেবে, তখন যেন একা না দেখি। কারণ এরপর যদি তোমার আশেপাশে অন্য কাউকে দেখি, তবে তার পরিণতি ভালো হবে না।"

সাদাত বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। একবারও পেছনে না তাকিয়ে সে তীব্র গতিতে চালিয়ে চলে গেল। ইতি সেখানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে লাগল। তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। সে বুঝতে পারছিল, সাদাতের এই অন্ধকার ভালোবাসা তাকে ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে, কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো—সে এই বিষাক্ত টানের হাত থেকে নিজের মনকে পুরোপুরি সরাতে পারছে না।

সিলেটের আকাশ ঘনীভূত মেঘে ছেয়ে গিয়েছিল। টিলার ওপর থেকে নিচে নেমে আসা হালকা ঠান্ডা বাতাস আর পাইন গাছের খসখস শব্দে পরিবেশটা এক থমথমে রূপ ধারণ করেছিল। সাদাতের হুমকিকে তোয়াক্কা না করার চেষ্টা করেও ইতি শেষ পর্যন্ত কিল রোডের দিকেই পা বাড়াল। মন বলছিল এই ভুলটা করা উচিত নয়, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত ভয় আর উদগ্র কৌতুহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

কিল রোডের শেষ মাথায় পৌঁছাতেই ইতির চোখে পড়ল সাদাত একাই দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে জ্বলন্ত একটি সিগারেট, যা থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে। ইতিকে দেখতে পেয়ে সে সিগারেটের অবশিষ্টাংশটুকু এক ঝটকায় মাটিতে ফেলে বুটজুতো দিয়ে পিষে দিল।

"আমি জানতাম তুমি আসবে," সাদাত এগিয়ে এসে একদম ইতির মুখোমুখি দাঁড়াল। তার চোখে এক বিজয়ীর তৃপ্তি ভেসে উঠল।

ইতি চোখ মুখ শক্ত করে বলল, "আমি আপনার ভয়ে আসিনি। আমি এসেছি স্পষ্ট করে বলতে যে, এসব নাটক বন্ধ করুন। আপনি আমার ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারেন না।"

সাদাত উত্তর না দিয়ে ইতির আরও কাছাকাছি চলে এল। সে ইতির প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিল। এক হাত বাড়িয়ে খুব ধীরে ইতির কাঁধের ওপর নেমে আসা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দিল। আঙুলের আলতো ছোঁয়াতেই ইতি শিউরে উঠল, অথচ সে পিছিয়ে যেতে পারল না। এক অদৃশ্য শক্তির বাঁধনে যেন সে অবশ হয়ে যাচ্ছিল।

"এটা নাটক নয়, ইতি," সাদাত একবারে নিচু স্বরে উচ্চারণ করল। "তুমি আমার মস্তিষ্কের এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছ, যেখান থেকে তোমাকে বের করার কোনো উপায় আমার জানা নেই। তুমি দূরে যেতে চাইলে আমার ভেতরের রাক্ষসটা জেগে ওঠে, তোমাকে নিজের সীমানায় আটকে রাখতে ইচ্ছে করে।"

"আপনার এই মানসিক অসুস্থতাকে ভালোবাসা বলে না, সাদাত ভাই!" ইতি তীব্র গলায় প্রতিবাদ করতে চাইল, কিন্তু তার গলার আওয়াজ কাঁপছিল।

সাদাত হালকা হেসে ইতির থুতনি চেপে ধরে মুখটা সামান্য ওপরে তুলল। ইতির চোখের একদম ভেতরে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলল, "যে নামই দাও না কেন, সত্যিটা এটাই—এই ক্যাম্পাসে তুমি শুধু আমার। তোমার হাসির শব্দ, তোমার চোখের জল, এমনকি তোমার ভয়—সবকিছুর ওপর একমাত্র অধিকার আমার। অন্য কেউ যদি তোমার দিকে নজর দেওয়ার দুঃসাহস করে, তবে তাকে আমি চুরমার করে দেব।"

ইতির বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। এই বিষাক্ত অধিকারবোধ তাকে একাধারে আতঙ্কিত আর মোহগ্রস্ত করছিল। সে বুঝতে পারছিল, সাদাতের তীব্র আকর্ষণের এই জটিল জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

হঠাৎ করেই টিলার ওপর ভারী বৃষ্টি নেমে এল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো চত্বর নির্জন হয়ে গেল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তাদের ভিজিয়ে দিতে লাগল। কিন্তু সাদাত একচুলও নড়ল না, সে স্থির দৃষ্টিতে ইতির দিকে তাকিয়ে রইল। ইতির ভেজা চেহারায় ভেসে ওঠা ভয়ের বদলে এবার অন্য এক তীব্র অনুভূতির জোয়ার দেখতে পেল সাদাত—এক পরম আত্মসমর্পণ, যা ইতি নিজে মুখে স্বীকার না করলেও তার চোখ দুটো স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল।

বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে কিল রোডের চারপাশটা আরও নির্জন হয়ে পড়ল। টিলার ওপর থেকে নেমে আসা পানির ধারা আর ভেজা মাটির গন্ধ যেন পরিবেশের সেই বিষাক্ত পরিবেশটাকে আরও গভীর করে তুলছিল। ইতির নীরব আত্মসমর্পণ সাদাতের চোখের ভেতরের হিংস্র ভাবটাকে মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিল। সেই চোখে এখন আধিপত্যের পাশাপাশি এক গভীর আর্দ্রতা আর আকুলতা ভেসে উঠল।

সাদাত ধীরপায়ে ইতির আরও কাছে সরে এল। ইতির ভেজা কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো নিজের দীর্ঘ আঙুল দিয়ে খুব যত্নে সরিয়ে দিল। এবার তার স্পর্শে কোনো জোর ছিল না, কিন্তু ছিল এক প্রবল একচেটিয়া টান।

"তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো ইতি," সাদাতের গভীর কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের মধ্যেও ইতির কানে স্পষ্ট বাজল। "কিন্তু এই ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে তোমার অস্তিত্বের শেষ সীমারেখা পর্যন্ত—আমি তোমাকে অন্য কারও হতে দেব না। তুমি আমার এমন এক অনুভূতি, যা আমি নিজের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও আগলে রাখব।"

ইতি নিজের ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে যেতে অনুভব করল। সে সাদাতের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এই ছেলেটির কঠোর আর ভয়ংকর বহিরাবরণের নিচে লুকিয়ে আছে ভীষণ এক একাকিত্ব। যে একাকিত্ব শুধুই ইতিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। সাদাতের এই তীব্র, অন্ধ আর অবসেসিভ ভালোবাসা যতটা বিপজ্জনক, ঠিক ততটাই তীব্র এক আকর্ষণে ভরা।

ইতি হালকা কাঁপা স্বরে বলল, "আপনি আমাকে এভাবে ভয় দেখিয়ে রাখতে চান? এত হিংস্রতা নিয়ে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখা যায়?"

সাদাত একটু নিচু হয়ে ইতির ভেজা চিবুকে নিজের কপাল ঠেকালো। দুজনের উষ্ণ নিঃশ্বাস পরস্পরের মুখে গিয়ে আছড়ে পড়ছিল।

"যেখানে হারানোর ভয় তীব্র, সেখানে নম্রতা থাকে না ইতি," সাদাত ফিসফিস করে বলল। "আমি তোমাকে হারাব না। তুমি যদি আমার জন্য নরকও হতে চাও, আমি সেই নরকেই আটকে থাকতে রাজি।"

ইতি চোখ বন্ধ করে ফেলল। সাদাতের এই বাহুডোর, তার এই বাঁধনভাঙা রোমাঞ্চ আর একচ্ছত্র অধিকারের সুর তাকে পুরোপুরি অবশ করে ফেলছিল। তার ভেতরের সমস্ত জমা রাখা রাগ, বিরক্তি আর প্রতিরোধ যেন বৃষ্টির জলের সাথেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল।

সাদাত ধীরে ধীরে ইতির ভেজা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। আগের মতো চেপে শক্ত করে নয়, বরং নিজের আঙুলের ফাঁকে ইতির আঙুলগুলো গলিয়ে দিয়ে শক্ত এক শক্ত বন্ধন তৈরি করল।

"চলো," সাদাত নিচু গলায় বলল। "আজকের পর থেকে তোমার একলা হাঁটার সব পথ বন্ধ।"

ইতি কোনো প্রতিবাদ করল না। সে নিঃশব্দে সাদাতের পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করল। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে দুজন যখন কিল রোড ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল, ইতি বুঝতে পারছিল—সে সাদাতের এই ভয়ংকর জালে কেবল জড়িয়েই পড়েনি, বরং সে নিজেই এখন এই সম্পর্কের গভীরে ডুবে গিয়ে ফিরে আসার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।

সেই বৃষ্টির সন্ধ্যার পর থেকে ক্যাম্পাসের হাওয়া পুরোপুরি বদলে গেল। সাদাতের সেই হিংস্র আর অবসেসিভ রূপটার পেছনে ইতি যে প্রবল একাকিত্ব আর ভালোবাসার হাহাকার দেখেছিল, তা সময়ের সাথে সাথে এক নতুন মোড় নিতে শুরু করল। সাদাত ইতির প্রতি আগের মতোই ভীষণ অধিকারপ্রবণ ছিল, কিন্তু সেই অধিকারবোধের মধ্যে এখন আর ভয় কিংবা ব্ল্যাকমেইলের ছায়া ছিল না; বরং সেখানে জমা হয়েছিল এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের অনুভূতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হতেই সাদাত সরাসরি ইতির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতির পরিবার প্রথমে সাদাতের জেদি আর গম্ভীর ব্যক্তিত্ব দেখে কিছুটা দ্বিধায় পড়েছিল, কিন্তু ইতির প্রতি সাদাতের নিঃশর্ত, অনমনীয় দায়িত্ববোধ আর গভীর অনুরাগের কাছে তাদের সব দ্বিধা ধুয়েমুছে যায়।

কয়েক মাসের ব্যবধানে সাদাত সিলেটের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে। ইতি তখনো নিজের ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। শহরের গোলমার্কেট এলাকার কাছাকাছি টিলার চূড়ায় তারা ছোট, ছিমছাম একটা বাড়ি ভাড়া নেয়, যেখান থেকে প্রতিদিন সকালে সিলেটের শান্ত নীল আকাশ আর সবুজ টিলার সারি স্পষ্ট দেখা যায়।

এক বিষণ্ণ বিকেলেই ইতির হাত ধরে সে তাকে নিয়ে এসেছিল এই নতুন বাড়িতে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের আলো যখন ইতির মুখে এসে পড়ছিল, সাদাত পিছন থেকে এসে ইতিকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার চিবুক গিয়ে থামল ইতির কাঁধে।

"একদিন এই ক্যাম্পাসের রাস্তায় দাঁড়িয়ে তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে, এত হিংস্রতা নিয়ে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখা যায় কি না," সাদাত নিচু গলায় বলল, যার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। "আজ কি উত্তর পেয়েছ?"

ইতি ঘুরে দাঁড়াল। সাদাতের চোখের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে একফালি মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে সাদাতের কপালে জমে থাকা একগোছা চুল সরিয়ে দিল। যে চোখ দুটো একসময় ইতির মনে ভয় আর তীব্র আতঙ্ক তৈরি করত, আজ সেখানে শুধুই উপচে পড়া মায়া আর গভীর ভালোবাসা।

"উত্তরটা অনেক আগেই পেয়েছি," ইতি মৃদু স্বরে বলল। "আপনার ভালোবাসাটা বিষাক্ত ছিল না, সাদাত ভাই। বিষাক্ত ছিল আপনার হারানোর ভয়টা। আপনি ভালোবাসতে জানতেন, কিন্তু সেটা প্রকাশের রাস্তাটা ছিল বড্ড বেশি উগ্র।"

সাদাত হালকা হেসে ইতিকে আরও কাছে টেনে নিল। ইতির কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, "তোমার সেই উগ্র সাদাত আজও বদলায়নি ইতি। সে এখনো তোমাকে নিজের সীমানার বাইরে এক ইঞ্চিও যেতে দেবে না। শুধু তফাৎ এটাই—এখন আর তোমাকে ভয় দেখিয়ে আটকে রাখার দরকার হয় না, কারণ তুমি নিজেই আমার সমস্ত রাজ্যজুড়ে মিশে আছ।"

ইতি সাদাতের বুকে মাথা রাখল। সাদাতের বুকের ভেতরের দ্রুত আর দৃঢ় স্পন্দন শুনতে শুনতে তার মনে হলো, এতগুলো ঝড়ঝাপটা, দ্বিধা আর টানাপোড়েনের পর সে অবশেষে তার আসল ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। যে ভালোবাসার শুরু হয়েছিল এক তীব্র ঝড় আর বিষাক্ত আধিপত্যের ভয় দেখিয়ে, তা আজ এসে পৌঁছেছে এক অনন্ত প্রশান্তি আর চিরন্তন একতার মিষ্টি মোহনায়।

....
👁 24