অন্ধকারের চিরন্তন টান

শ্রাবণের এক মেঘলা বিকেলে তৃষার ডাকবাক্সে প্রথম চিঠিটা এসে পৌঁছেছিল। কাঠের পুরোনো দরজার গায়ে ঝুলতে থাকা নীল রঙের ডাকবাক্সটা কতকাল ধরে খালি পড়ে থাকে, তা তার মনে নেই। অথচ সেই দিন হালকা বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজতে ভিজতে ডাকপিয়ন যখন একটা হলুদ খাম রেখে গেল, তৃষা কিছুটা অবাকই হয়েছিল। খামের ওপর নাম লেখা ছিল—‘আহমেদ পারভেজ’। ঠিকানাটা তৃষাদের এই চারতলা পুরোনো বাড়িরই, কিন্তু এই নামে এখানে কেউ থাকে না।

তৃষা ভেবেছিল ভুল করে এসেছে। পিয়নকে ফিরিয়ে দেবে বলে খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু হাতের ওপর পেঁচার মতো কালির অক্ষরে লেখা নিজের অচেনা এক ঠিকানার প্রতি কেন যেন তার অহেতুক কৌতূহল জেগে উঠল। খামটা আঠা দিয়ে শক্ত করে আটকানো ছিল না, ভেজা বাতাসের টানে যেন নিজেই একটু খুলে যাচ্ছিল। কৌতূহলের কাছে হার মেনে তৃষা চিঠিটা খুলে ফেলল। আর সেই প্রথম দিনই তার বুকের ভেতর একটা তীব্র, অচেনা মোচড় দিয়ে উঠেছিল।

চিঠিতে লেখা ছিল:

    "আজকাল তোমার রাতে ঘুম হয় না, তাই না? বারান্দার কোনায় দাঁড়িয়ে তুমি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকো। তোমার পায়ের কাছে জমে থাকা নীরবতা আমি স্পষ্ট শুনতে পাই। তুমি একা নও, তৃষা। তুমি নিজেকে যতই আড়াল করো, আমি তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের শব্দ চিনি।"

চিঠির শেষের পাতায় লেখা ছিল না কোনো প্রেরকের নাম। শুধু লেখা—‘ইতি, তোমার ছায়া।’

তৃষার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। খামের ওপর নাম আহমেদ পারভেজের, কিন্তু চিঠির ভেতরে সরাসরি তার নিজের নাম লেখা! কে এই মানুষ? কীভাবে সে জানে তৃষার রাত জাগার অভ্যাসের কথা? বিগত কয়েক মাস ধরে মানসিকভাবে এক কঠিন সময় পার করছিল সে। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর আর বাবার চাকরির সুবাদে একা বড় হতে হতে তার ভেতরটা ভীষণ একাকী আর শূন্য হয়ে পড়েছিল। কাউকে সে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারত না। অথচ এই অজ্ঞাত মানুষটা এক নিমিষে তার ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে তুলে ধরেছে এক টুকরো কাগজে।

দিন গড়াতে লাগল। প্রতিদিন ঠিক দুপুর আড়াইটায় ডাকপিয়ন এসে একই নামে চিঠি দিয়ে যায়। আর তৃষা ঘরের দরজা বন্ধ করে অধীর আগ্রহে সেই চিঠিগুলো পড়তে শুরু করে। চিঠির ভাষাগুলো সাধারণ প্রেমপত্রের মতো মিষ্টি ছিল না, তার মধ্যে ছিল এক ধরনের গাঢ়, দমবন্ধ করা অধিকারবোধ।

তৃতীয় দিনের চিঠিতে লেখা ছিল:

    "আজ নীল রঙের জামাটা পড়েছ কেন? তোমাকে তো সাদা রঙে বেশি সুন্দর লাগে। নীল রঙে তোমাকে ভীষণ বিষণ্ণ দেখায়। আমি চাই না তুমি ছাড়া আর কেউ তোমার ওই বিষণ্ণতা দেখুক। তুমি শুধু আমার কাছেই উন্মুক্ত থাকবে।"

চিঠিটা পড়ার পর তৃষা চমকে উঠে ঘরের জানালাগুলোর দিকে তাকাল। তার মানে কেউ তাকে সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখছে! তার ভেতর একই সাথে তীব্র ভয় আর এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি হতে লাগল। সাধারণ কেউ হলে হয়তো থানায় যেত বা ভয়ে ঘর ছেড়ে পালাত। কিন্তু তৃষার সেই বিষাক্ত ভালোবাসার টানটা অদ্ভুতভাবে ভালো লাগতে শুরু করল। কেউ একজন তার প্রতিটি পদক্ষেপ খেয়াল করছে, তাকে এত তীব্রভাবে নিজের করে চাইছে—এই অনুভূতি তার শূন্য জীবনে এক ধরনের পাগলামি আর উন্মাদনা নিয়ে এলো। এই ভালোবাসা স্বাভাবিক নয়, এতে অধিকারবোধের নামে ভয়ংকর একটা বিষ ছড়িয়ে আছে, কিন্তু তৃষা সেই বিষেই যেন আসক্ত হয়ে পড়ছিল।

চিঠিগুলোর রহস্য উদ্ঘাটন করার ভূত চাপল তার মাথায়। কে এই আহমেদ পারভেজ? আর কেই-বা তাকে নিয়ে এত অদ্ভুত খেলা খেলছে?

পরদিন দুপুরে চিঠি আসার নির্ধারিত সময়ের আগেই তৃষা গেটের পেছনে লুকিয়ে রইল। ডাকপিয়ন এসে যখন খামটা বাক্সে ফেলছিল, তৃষা একপ্রকার লাফিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
"চাচা, এই চিঠিগুলো কে দেয়? আপনি কোথা থেকে পান?" তৃষার গলায় স্পষ্ট অস্থিরতা।

বয়স্ক ডাকপিয়ন চমকে উঠে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বলল, "আম্মা, এসব চিঠি তো কোনো পোস্ট অফিস থেকে আসে না। লালবাগের মোড়ের ওই পুরোনো বইয়ের দোকানের এক ছেলে আমাকে প্রতিদিন ভোরে এসে এই খামগুলো দিয়ে যায়। বলে, পৌঁছে দিতে।"

কথাটা শুনেই তৃষার বুকের ভেতর ড্রাম বাজতে শুরু করল। লালবাগের মোড়ের সেই পুরোনো বইয়ের দোকান—'জ্ঞানকানন'। তৃষা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। গায়ে একটা কালো চাদর জড়িয়ে সোজা হেঁটে চলে গেল সেই দোকানের উদ্দেশ্যে।

বৃষ্টি তখন ঝিরঝির করে পড়তে শুরু করেছে। বিকালের আলো প্রায় কমে এসেছে। সরু গলি পেরিয়ে তৃষা যখন দোকানটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, চারপাশটা কাঠের গুঁড়ো আর পুরোনো বইয়ের গন্ধে ভারী হয়ে ছিল। ভেতরে ধূপের মিষ্টি সুবাস আর আবছা আলো। দোকানের ভেতরে হাজার হাজার বইয়ের স্তূপের মাঝে একজন তরুণ বসে ছিল। পরনে সাধারণ সুতির কুর্তা, চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা, আর শান্ত একজোড়া চোখ। সে এতই শান্ত আর মার্জিত ভঙ্গিতে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল যে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই তার ভেতর কোনো ঝড় থাকতে পারে।

তৃষা দোকানে ঢুকে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাঁপানো গলায় বলল, "আহমেদ পারভেজ কে?"

ছেলেটি ধীরে ধীরে বই থেকে চোখ তুলে তৃষার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোনায় হালকা, কিন্তু গভীর এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
"আমি পারভেজ নই, তৃষা। আমার নাম আরিয়ান।" তার কণ্ঠস্বরটা যেন কোনো জাদুকরী বাঁশির সুরের মতো শান্ত, অথচ তাতে এক তীব্র শীতলতা ছিল।

তৃষা পিছিয়ে যেতে চাইল, "আপনি... আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে? আপনিই কি প্রতিদিন ওই চিঠিগুলো পাঠান?"

আরিয়ান ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তৃষার দিকে হেঁটে আসার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক ধরনের শিকারির আত্মবিশ্বাস ছিল। তৃষার একদম কাছে এসে দাঁড়িয়ে সে তৃষার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো যেন তৃষার আত্মাকে ভেদ করে ভেতরটা পড়ে ফেলছিল।

"চিঠিগুলো আমিই লিখি," আরিয়ান ভীষণ নিচু আর গম্ভীর গলায় বলল, "তবে ওগুলো আমার লেখা নয়। ওগুলো অন্য কারো কথা, যা আমি শুধু তোমার পর্যন্ত পৌঁছে দিই।"

"কার কথা? আর আপনি আমাকে এভাবে ভয় দেখাচ্ছেন কেন? আপনি আমাকে নজরদারিতে রাখেন কীভাবে?" তৃষার চোখ দিয়ে প্রায় পানি চলে আসছিল ভয়ে আর এক অজানা উত্তেজনায়।

আরিয়ান হাত বাড়িয়ে তৃষার গালের কাছে আসা একটা ভেজা চুল আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। স্পর্শটা এতই অধিপত্যপূর্ণ আর তীব্র ছিল যে তৃষা জমে গেল।

"ভয় পাচ্ছ?" আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, "তোমার তো ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু তুমি পালাচ্ছ না কেন? কারণ তুমি জানো, এই পুরো দুনিয়ায় আমি ছাড়া আর কেউ তোমাকে এত গভীরভাবে অনুভব করতে পারবে না। তুমি আমার এই বিষাক্ত নজরদারি উপভোগ করছ, তৃষা।"

তৃষা কোনো উত্তর দিতে পারল না। আরিয়ানের কথাগুলো শতভাগ সত্যি। সে নিজেকে এই লোকটার মায়াজাল থেকে মুক্ত করতে পারছে না।

আরিয়ান তার পকেট থেকে আরেকটি পরিচিত হলুদ খাম বের করে তৃষার হাতে বাড়িয়ে দিল।
"এটা চার নম্বর পর্বের চিঠি। বাড়ি গিয়ে পড়ো। আজ রাতে জানতে পারবে, তোমার মায়ের মৃত্যুর দিন আসলে কী ঘটেছিল। আর তোমার অতীত কীভাবে এই আহমেদ পারভেজের সাথে জড়িয়ে আছে।"

তৃষা চিঠিটা হাতে নিয়ে শিউরে উঠল। মায়ের মৃত্যু? সে তো জানত তার মা রোগে ভুগে মারা গেছেন! তবে কি এতে অন্য কোনো অন্ধকার রহস্য লুকিয়ে আছে?

আরিয়ান তৃষার থুতনিটা ধরে সামান্য ওপরে তুলে ধরে এক ভয়ংকর সুন্দর হাসল। "বাড়ি যাও তৃষা। আর মনে রেখো, তুমি যেখানেই যাও, যার সাথেই থাকো না কেন... শেষ পর্যন্ত তুমি শুধুই আমার।"

আরিয়ানের কাছ থেকে সেই হলুদ খামটা নিয়ে তৃষা যখন বইয়ের দোকান থেকে বের হয়ে এল, তখন রাতের অন্ধকার লালবাগের গলিগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। টিপটিপ বৃষ্টিতে তার কালো চাদরটা ভিজে ভারী হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি ভারী লাগছিল বুকের ভেতরটা। আরিয়ানের সেই স্পর্শ, তার তীব্র দৃষ্টি আর অধিকারবোধে ভরা থমথমে কণ্ঠস্বর তৃষার পুরো অস্তিত্বে আলোড়ন তুলে দিয়েছে।

বাড়ি ফিরে ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল তৃষা। খাটের ওপর বসে কাঁপতে থাকা আঙুলে খামটা খুলল সে। আরিয়ানের দেওয়া চার নম্বর চিঠি। ঘরের ডিম লাইটের আবছা আলোয় চিঠির পাতায় চোখ রাখতেই তৃষার দম আটকে আসার উপক্রম হলো।

চিঠিতে লেখা ছিল:

    "তুমি কি সত্যি বিশ্বাস করো তোমার মা কেবল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন? তোমার বাবা তোমাকে যে সত্যিটা থেকে সারা জীবন আড়াল করে রেখেছেন, তা কি তুমি কখনো টের পাওনি? বারো বছর আগের সেই কালরাতে তোমার মা মারা যাননি তৃষা, তাকে মারা হয়েছিল। আর যে মানুষটার পিস্তলের গুলিতে তোমার মায়ের বুকঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল, সেই নামটাই খামের ওপর লেখা থাকে—'আহমেদ পারভেজ'।"

চিঠির পরের অংশটুকু পড়তে গিয়ে তৃষার হাত থেকে কাগজটা খসে পড়ল। সে বিছানায় এলিয়ে পড়ল, চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।

তার মা, যাকে সে মনে করত এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে শান্তভাবে চলে গেছেন, তাকে নাকি খুন করা হয়েছিল! আর সেই খুনি আহমেদ পারভেজ? কিন্তু পারভেজের ঠিকানায় আরিয়ান কেন তাকে চিঠি পাঠাচ্ছে? আরিয়ান কি পারভেজের কেউ? নাকি আরিয়ান নিজেই এক ভয়ংকর চক্রান্তের জাল বুনছে তার চারপাশে?

পরদিন সকালে তৃষা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা চলে গেল তার বাবার পড়ার ঘরে। তার বাবা, একসময়ের নামকরা সরকারি কর্মকর্তা, এখন বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। ধুলো জমে থাকা পুরোনো ড্রয়ারগুলো তৃষা পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করল। ড্রয়ারের এক কোণে একটা কাঠের পুরনো বাক্স আটকে ছিল। জোর করে সেটা ভাঙতেই ভেতরে পাওয়া গেল বারো বছর আগের একগুচ্ছ সংবাদপত্র আর একটা পুরনো ডায়েরি।

সংবাদপত্রের পাতায় বড় বড় হরফে লেখা:
‘ধানমন্ডির আবাসন এলাকায় ব্যবসায়ী পারভেজের রহস্যময় খুন এবং তার স্ত্রী ও গৃহকর্ত্রীর মৃত্যু।’

তৃষার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে উঠল। তার মা শুধু সাধারণ কোনো রোগে মারা যাননি, তিনি জড়িয়ে ছিলেন এমন এক অন্ধকার ঘটনার সাথে, যা এতদিন তৃষার কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এলো ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা একটা নাম দেখে—‘আহমেদ পারভেজ’। ডায়েরিতে তার বাবার নিজের হাতে লেখা ছিল, পারভেজ ছিল তার বাবার সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার, যার সাথে কোনো এক মারাত্মক শত্রুতার জেরে ধ্বংস হয়ে যায় দুটি পরিবার।

কিন্তু এর সাথে আরিয়ানের সম্পর্ক কী? আরিয়ান কেন তৃষাকে এই পুরোনো ক্ষতগুলোর সামনে টেনে দাঁড় করাচ্ছে?

দুপুর গড়াতেই তৃষা আবার ছুটল লালবাগের সেই বইয়ের দোকানে। বৃষ্টি আজ নেই, কিন্তু আকাশ থমথমে মেঘে ঢাকা। 'জ্ঞানকানন' দোকানের সামনে গিয়ে তৃষা দেখল দরজায় ঝুলছে একটা বড় তালা। দোকান বন্ধ!

তৃষার ভেতরে এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল। সে কি তবে আরিয়ান নামের সেই ছায়াটার হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেল? কিন্তু রেহাই পাওয়ার স্বস্তির চেয়ে তাকে হারানোর এক তীব্র যন্ত্রণা কেন তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে? সে কেন ওই বিষাক্ত চোখদুটো, ওই দাম্ভিক অধিকারবোধ আবার দেখতে চাইছে?

"কাউকে খুঁজছ?"

হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো সেই অতি পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

তৃষা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। গলির এক অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। তার পরনে আজ একটা গীতি কালো রঙের সুতির কুর্তা। চোখে সেই একই চশমা, কিন্তু চাহনিতে তীব্র এক আকর্ষণ আর চরম বিষাক্ত উন্মাদনা।

তৃষা হুট করে এগিয়ে গিয়ে আরিয়ানের বুকের জামা চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। "কে তুমি? আমার পরিবারের সাথে তোমার কী সম্পর্ক? আরিয়ান, তুমি আমার সাথে এই খেলা কেন খেলছ? কেন তুমি আমার মাকে নিয়ে ওসব কথা লিখলে?"

আরিয়ান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। তৃষা তার জামা চেপে ধরে রাখা সত্ত্বেও সে ধীর শান্ত পায়ে একপা এগিয়ে এলো, যার ফলে তৃষার শরীর তার বুকের সাথে মিশে গেল। আরিয়ান নিজের হাত দুটি তৃষার কোমরের দুপাশে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। এমন এক বাঁধন, যা থেকে তৃষার পক্ষে ছাড়া পাওয়া অসম্ভব।

"এটা কোনো খেলা নয়, তৃষা," আরিয়ান তার ঠোঁট দুটো তৃষার কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বলল। তার প্রতিটা নিঃশ্বাস তৃষার ঘাড়ে উষ্ণ উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। "তোমার বাবা যা ঢেকে রেখেছিল, আমি শুধু সেই পর্দাটা সরিয়ে দিচ্ছি। তোমার মা নির্দোষ ছিলেন না, আর আমার বাবা আহমেদ পারভেজও কোনো ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না।"

তৃষা চমকে উঠে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "তুমি... তুমি পারভেজের ছেলে?"

"হ্যাঁ," আরিয়ানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য ভয়ংকর এক হিংস্রতা ফুটে উঠেই পরক্ষণে শান্ত হয়ে গেল। "তোমার বাবা আর আমার বাবা একসাথে এক নোংরা খেলায় মেতেছিলেন। কিন্তু সেই খেলায় আমার বাবা প্রাণ হারান, আর তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে সুখে সংসার সাজালেন। কিন্তু আমার কী হলো তৃষা? আমি ছোটবেলা থেকে একা, অন্ধকারে বড় হয়েছি। কেবল একটা প্রতিশোধের আগুন বুকে জ্বালিয়ে।"

তৃষা আতঙ্কে ছিটকে সরে যেতে চাইল, কিন্তু আরিয়ানের হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো। সে তৃষার পিঠে হাত চেপে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের মধ্যে এখন এক ইঞ্চিরও দূরত্ব নেই।

"তুমি আমাকে মারতে চাও?" তৃষার গলা দিয়ে কাঁপানো স্বর বের হলো। "বাবার অপরাধের শাস্তি তুমি আমাকে দেবে?"

আরিয়ান তার এক হাত দিয়ে তৃষার গালটা ভীষণ শক্ত করে চেপে ধরল। স্পর্শটা এতই জোরালো ছিল যে তৃষার ব্যথা লাগছিল, কিন্তু সেই ব্যথার মধ্যেও এক অদ্ভুত মাদকতা ছিল।

"তোমাকে মারব?" আরিয়ান এক ভয়ংকর সুন্দর শব্দ করে হেসে উঠল। "তোমাকে মেরে ফেললে তো আমার প্রতিশোধ সহজ হয়ে গেল, তৃষা। আমি তোমাকে মারব না। আমি তোমাকে এমনভাবে আমার প্রেমে ফেলব, এমনভাবে নিজের জালে বন্দি করব যে তুমি চাইলেও আমার কাছ থেকে পালাতে পারবে না। আমি তোমার জীবনের আলো কাড়তে এসেছি, তৃষা। কিন্তু দুর্ভাগ্য দেখো... এই অন্ধকারের প্রেমে তুমি ইতিমধ্যেই পড়ে গেছ।"

তৃষা চুপ হয়ে গেল। সে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে প্রতিশোধের আগুন আছে, বিষ আছে, কিন্তু একই সাথে আছে এক তীব্র ভালোবাসা—এমন এক ভালোবাসা যা ধ্বংস করে দেয়, জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।

"তুমি পিশাচ, আরিয়ান..." তৃষা বুকচেরা নিঃশ্বাস ফেলে বলল।

"আমি জানি," আরিয়ান তার পকেট থেকে পাঁচ নম্বর চিঠিটা বের করে তৃষার চাদরের ভাঁজে গুঁজে দিল। তারপর তৃষার ঠোঁটের একদম কাছাকাছি মুখ এনে অতি নিচু স্বরে বলল, "তুমি এই পিশাচটাকেই ভালোবেসে ফেলেছ, তৃষা। আজকের চিঠিটা পড়ে দেখো। কাল সকালে তুমি নিজেই আমার কাছে ফিরে আসবে, কোনো জোর ছাড়াই।"

আরিয়ান হাত ছেড়ে দিল। তৃষা হাঁপাতে হাঁপাতে পিছিয়ে গেল। কিন্তু তার মন বলছিল, আরিয়ান ভুল কিছু বলেনি। তার বিষাক্ত ভালোবাসার এই অন্ধকারে তৃষা সত্যিই তিলে তিলে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসার পথ নেই।

পাঁচ নম্বর চিঠিটা হাতে নিয়ে তৃষা যখন নিজের ঘরে ফিরল, তখন তার পুরো শরীর কান্নায় আর এক অজানা শিহরণে কাঁপছিল। ঘরের চেনা দেয়ালগুলোকে আজ যেন বড্ড অচেনা আর খাঁচার মতো মনে হচ্ছে। টেবিলের ওপর রাখা ডিম লাইটের লালচে আলোয় সে খামটা ছিঁড়ে চিঠিটা বের করল।

আরিয়ানের গোটানো হাতের অক্ষরে লেখা ছিল:

    "আজ থেকে বারো বছর আগে যে রাতে আমার বাবা আহমেদ পারভেজের লাশ উদ্ধার হয়, সেই রাতে রক্তে ভেসে যাওয়া সেই ঘরে তুমিও ছিলে, তৃষা। তোমার বয়স তখন মাত্র দশ। তুমি হয়তো ভয়ের চোটে সব স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলেছ। কিন্তু তোমার বাবার নির্দেশে সেই রাতে যে সত্যিটা ঢাকা পড়েছিল, তার একমাত্র জীবিত সাক্ষী তুমি নিজে। তুমি কি জানতে চাও, তোমার মা সেদিন কাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের বুকে পারভেজের গুলি গ্রহণ করেছিলেন? তিনি তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে নয়, তৃষা... তিনি বেঁচে থাকা অন্য একটি সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছিলেন।"

চিঠির এই কথাগুলো তৃষার মাথায় যেন এক ভয়ংকর বজ্রপাত ঘটাল। অন্য একটি সন্তান? তার তো কোনো ভাই বা বোন ছিল না! তবে কি তার মা তার ছাড়াও অন্য কাউকে ভালোবাসতেন? নাকি কোনো গোপন অতীত ঢেকে রাখা হয়েছে তার কাছ থেকে?

মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো তৃষার। সে চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে উঠল। ঘরের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে সে নিজের ভেজা চেহারার দিকে তাকাল। আয়নায় সে যেন নিজের পেছনে আরিয়ানের সেই লম্বা, অন্ধকার ছায়াটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল। লোকটা তাকে একটু একটু করে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে। সে তার অতীতকে চুরমার করে দিচ্ছে, আবার একই সাথে তার প্রতিটা নিঃশ্বাসে নিজের অধিকার বসিয়ে দিচ্ছে। এই বিষাক্ত মানসিক যন্ত্রণা আর নিতে পারছিল না তৃষা।

রাত ৩টা। ঝুম বৃষ্টি নামল পুরো ঢাকায়। তৃষা আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। ছাতা ছাড়াই সে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। রাস্তা একদম খাঁ খাঁ করছে, শুধু ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো ভেজা পিচঢালা রাস্তায় প্রতিফলিত হচ্ছে। তৃষার পা দুটো তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেনে নিয়ে গেল লালবাগের সেই বন্ধ বইয়ের দোকানের গলিতে।

সে জানত না আরিয়ান সেখানে থাকবে কি না। কিন্তু সেখানে না গিয়ে তার আর কোনো উপায় ছিল না। আরিয়ান তার জীবনের এমন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে ছেড়ে সে বাঁচতেও পারছে না, আবার সহ্যও করতে পারছে না।

গলির মোড়ে পৌঁছাতেই তৃষা থমকে দাঁড়াল।

বন্ধ বইয়ের দোকানের সামনে, কাঠের সিঁড়িতে বসে আছে আরিয়ান। পরনে ভিজে যাওয়া কালো জামা, হাতে এক জ্বলন্ত সিগারেট। বৃষ্টির পানিতে তার মাথার চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। তৃষাকে ওই বৃষ্টিতে ভিজে অপলক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান ধীরগতিতে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পায়ে পিষে দিল।

সে হেঁটে তৃষার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো বিস্ময় ছিল না, যেন সে আগে থেকেই জানত তৃষা এই গভীর রাতে ছুটে আসবে।

"আমি বলেছিলাম না, তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার কাছে ফিরে আসবে?" আরিয়ানের গলাটা আজকের বৃষ্টি ভেজা রাতে আরও বেশি গম্ভীর আর ভারী শোনালো।

তৃষা আরিয়ানের বুকের ওপর দুহাত দিয়ে আঘাত করল। "কেন করছ এসব? কেন আমার জীবনটা বিষাক্ত করে দিচ্ছ? আমি কী দোষ করেছি, আরিয়ান? আমার বাবা-মায়ের পাপের বোঝা আমি কেন বইব?"

আরিয়ান তৃষার আক্রমণ প্রতিহত করল না। সে চুপচাপ তৃষার মার সহ্য করল। তারপর হঠাৎ করেই তৃষার দুটো হাত এক করে নিজের এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। টান মেরে তৃষাকে নিজের বুকের সাথে একদম পিষে ফেলল।

"কারণ তুমি ওদের রক্তের অংশ!" আরিয়ানের গলার ভেতরের রগগুলো ফুলে উঠল, চোখে এক ভয়ংকর, বিধ্বংসী উন্মাদনা। "তোমার ওই নিষ্পাপ চেহারা, ওই নরম শরীর, ওই মায়াবী চোখ—এগুলো আমাকে প্রতিদিন পোড়ায়, তৃষা! আমি তোমাকে ঘৃণা করতে চাই, কিন্তু যতবার তোমাকে দেখি, ততবার তোমাকেই নিজের করে পাওয়ার আগুনে আমি নিজে জ্বলে ছাই হয়ে যাই!"

আরিয়ান তার অন্য হাতটা তৃষার ভেজা চুলে ডুবিয়ে দিয়ে তার মাথাটা পেছনে টেনে ধরল। তৃষা ব্যথায় উফ করে উঠল, কিন্তু আরিয়ানের চোখ দুটো তখন তার ঠোঁটের ওপর স্থির।

"তুমি আমার ওপর তোমার কোনো অধিকার ফলাতে পারো না, আরিয়ান!" তৃষা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, যদিও তার শরীর আরিয়ানের এই হিংস্র টানে অবশ হয়ে আসছিল।

"আমি পারি," আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তার ঠোঁট দুটো তৃষার গালের ভেজা চামড়া স্পর্শ করল। স্পর্শটা আগুনের মতো গরম ছিল। "তুমি আমার অতীত, তুমি আমার বর্তমান। আমি তোমাকে ভালোবেসে শান্তিতে থাকতে দেব না, তৃষা। তোমাকে আমি আমার এই নরকে টেনেই আনব। তুমি পালাতে পারবে না।"

আরিয়ানের এই ভয়ংকর, বিষাক্ত রূপ তৃষাকে চরম আতঙ্কে ফেলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তৃষার চোখ দিয়ে জল ঝরলেও সে নিজেকে আরিয়ানের ওই শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে বুঝতে পারল, এই নরকটাই এখন তার গন্তব্য। আরিয়ানের এই উন্মাদ ভালোবাসাই তার একমাত্র আশ্রয়।

আরিয়ান তার পকেট থেকে ভেজা একটা ছয় নম্বর চিঠি বের করল। চিঠিটা তৃষার হাত মুঠো করে তার ভেতরে জোর করে গুঁজে দিল।

"আজকের চিঠিতে ঠিকানা লেখা আছে সেই ঘরটার, যেখানে বারো বছর আগে রক্ত ঝরেছিল। কাল রাতে তুমি আমার সাথে সেখানে যাবে," আরিয়ান তৃষার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "যদি সত্যিটা জানার সাহস থাকে, তবে আসবে। আর যদি না আসো... তবে জেনে রেখো, আমি তোমাকে টেনে নিয়ে যাব। কারণ আমার ধ্বংসের খেলায় তোমার উপস্থিত থাকা বাধ্য।"

আরিয়ান তৃষার হাত ছেড়ে দিয়ে একপা পিছিয়ে গেল। অন্ধকার বৃষ্টিতে আরিয়ানের সেই অবয়বটা এক ভয়ংকর সুন্দরের রূপ নিল। তৃষা চিঠির কাগজটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল, আর অনুভব করল—আরিয়ানের এই বিষাক্ত টান তাকে খুব দ্রুত এমন এক সত্যের মুখোমুখি করতে চলেছে, যা হয়তো তার জীবনকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে।

ছয় নম্বর চিঠির পাতায় লেখা ঠিকানাটা ছিল পুরান ঢাকার এক পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির। বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা সেই বাড়িটি যেন এক অভিশপ্ত ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরদিন রাত ঠিক দশটায় তৃষা থমথমে মুখে সেই বাড়িটার সামনে গিয়ে পৌঁছাল। আকাশে আজ ঘন মেঘ, মাঝে মাঝেই বিজলির আলোয় পুরো এলাকাটা হঠাৎ শিউরে উঠছিল।

তৃষার পরনে ছিল একটি সাধারণ সুতির শাড়ি, বাতাসে তার আঁচল উড়ছিল। ভয়ে তার বুক দুরুদুরু কাঁপছিল, কিন্তু আরিয়ানের দেওয়া সেই বিষাক্ত মোহ তাকে এক অদৃশ্য সুতোয় টেনে নিয়ে এসেছে এখানে। বাড়ির জং ধরা বিশাল লোহার গেটটা সামান্য ধাক্কা দিতেই বিকট শব্দে খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের স্যাঁতসেঁতে ধুলো আর পুরোনো কাঠের তীব্র গন্ধ তৃষাকে ঘিরে ধরল। উঠোন পেরিয়ে বিশাল অন্দরমহলে ঢুকতেই সে দেখতে পেল দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। অন্ধকারে তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের লাল আলোটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

"আমি জানতাম তুমি আসবে," ওপর থেকে আরিয়ানের ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

তৃষা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপে সিঁড়িগুলো মড়মড় করে উঠছিল, যেন কোনো এক পুরোনো কান্নার আওয়াজ। দোতলার একটা বিশাল ঘরের সামনে এসে আরিয়ান থামল। ঘরের দরজায় কোনো মেঝের কপাট ছিল না, ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল মেঝের ওপর ধূসর ধুলোর আস্তরণ, আর এক কোণে ছিটকে পড়া রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া দাগ—বারো বছর আগের সেই অভিশপ্ত স্মৃতির ছাপ।

তৃষা ঘরে ঢুকেই শিউরে উঠে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরিয়ান দ্রুত ঘুরে এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল। এক হাতে তৃষার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে ঘরের মেঝেটার দিকে আঙুল তুলল।

"হাঁটো না, ভেতরে যাও," আরিয়ান তার থুতনিটা তৃষার কাঁধে রেখে ফিসফিস করে বলল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস তৃষার ঘাড়ে বিঁধছিল। "এই সেই ঘর তৃষা, যেখানে আমার বাবা আহমেদ পারভেজের বুকের রক্তে মেঝে ভেসে গিয়েছিল। আর দেখো, সেই রক্তের ওপর তোমার মায়ের পায়ের ছাপও হয়তো এখনও রয়ে গেছে।"

"আরিয়ান, দয়া করে বন্ধ করো এসব!" তৃষা ডুকরে কেঁদে উঠল। আরিয়ানের শক্ত বুকের সাথে পিঠ ঠেকে থাকায় সে অনুভব করতে পারছিল লোকটার হৃদস্পন্দন কতটা দ্রুত আর তীব্র। "আমাকে কেন শাস্তি দিচ্ছ? আমি তো তখন ছোট ছিলাম! আমি তো কিছু জানতাম না!"

আরিয়ান তৃষাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। দেওয়ালে তৃষার পিঠ ঠেকিয়ে দিয়ে সে নিজের দুই হাত তৃষার মাথার দুপাশে রেখে তাকে সম্পূর্ণ ঘেরাও করে ফেলল। তাদের মধ্যে কোনো ব্যবধান ছিল না। আরিয়ানের চোখ দুটো লাল হয়ে ছিল, তাতে তীব্র ক্ষোভের পাশাপাশি এক ভয়ংকর ব্যাকুলতা প্রকাশ পাচ্ছিল।

"তুমি জানতে না, কিন্তু তোমার রক্ত জানে!" আরিয়ান একহাত দিয়ে তৃষার থুতনিটা এমনভাবে চেপে ধরল যে তৃষা ব্যথায় কেঁপে উঠল। "তোমার বাবা আর আমার বাবা এই বাড়িটাতেই বেআইনি ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি করত। কিন্তু তোমার মা যখন জানতে পারেন, তিনি পারভেজকে হুমকি দেন পুলিশের কাছে যাওয়ার। আর আমার বাবা উন্মাদ হয়ে তোমার মায়ের দিকে পিস্তল তাক করে।"

তৃষা চোখ বড় বড় করে তাকাল, "তারপর?"

"তারপর তোমার বাবা পিস্তল কেড়ে নিতে যান," আরিয়ানের গলায় এক ধরনের নির্মম নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠল। "কিন্তু সেই ধস্তাধস্তিতে গুলিটা গিয়ে লাগে তোমার মায়ের বুকে। তোমার বাবা নিজের অপরাধ ঢাকতে পারভেজকে পিছন থেকে আঘাত করে মেরে ফেলে। আর সেই অন্য সন্তানটির কথা জানতে চাও? তোমার মা যাকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? সে আর কেউ নয়... আমি, তৃষা!"

কথাটা শুনে তৃষার মাথার ভেতরে যেন সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

"তুমি...?" তৃষার কণ্ঠ জড়িয়ে এলো।

"হ্যাঁ!" আরিয়ান এক ভয়ংকর বিষাদময় হাসি হাসল। "তোমার মা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার বাবা আহমেদ পারভেজ এতটাই পিশাচ ছিল যে সে নিজের ছেলেকেও মারতে দ্বিধা করেনি। তোমার মা আমাকে বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু তোমার বাবা আমাকে অনাথ করে সেই রাতে পালিয়ে যান। তুমি সুখে-শান্তিতে বাবার আদরে বড় হয়েছ, আর আমি বড় হয়েছি রাজরাস্তায়, অনাথ আশ্রমে, কেবল প্রতিশোধের বিষ বুকে নিয়ে!"

তৃষা আরিয়ানের এই চিরচেনা বিষাক্ত রূপটার আড়ালে থাকা এক পরম অসহায় শিশুকে দেখতে পেল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। সে আরিয়ানের হিংস্র চেপে রাখা হাত দুটো নিজের দুহাত দিয়ে স্পর্শ করল।

"তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না, আরিয়ান?" তৃষা চোখ ভরা পানি নিয়ে আরিয়ানের বিষাক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল। "এই চিঠিগুলো, এই অধিকারবোধ, এই আমাকে আগলে রাখা... সব কি শুধুই নাটক? শুধুই প্রতিশোধ?"

আরিয়ান এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে তৃষার গালে নিজের ভেজা হাতটা বুলিয়ে আনল। স্পর্শটা কঠোর ছিল, কিন্তু তার ভেতরে এক তীব্র আকুলতা লুকিয়ে ছিল।

"তোমাকে ঘৃণা করাটাই আমার কথা ছিল, তৃষা," আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট দুটো প্রায় তৃষার কানের কাছে। "আমি তোমাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে যতবার দেখেছি, যতবার তোমার নিঃশ্বাসের সুবাস পেয়েছি, আমি ততবার নিজের তৈরি করা ফঁাঁদেই আটকে গেছি। আমি তোমাকে ধ্বংস করতে এসে নিজেই তোমার প্রেমে নিঃশেষ হয়ে গেছি। এই ভালোবাসা বিষের মতো, তৃষা। এই ভালোবাসা তোমাকে কষ্ট দেবে, আমাকে পোড়াবে... তবুও আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে এই অধিকার দেব না।"

আরিয়ান তৃষার কোমর ধরে তাকে নিজের দিকে টানল, যেন সে তৃষাকে তার নিজের অস্তিত্বের ভেতরে বিলীন করে নিতে চায়। তৃষা চোখ বন্ধ করে আরিয়ানের বুকের তীব্র উত্তাপ অনুভব করল।

"তোমার বাবাকে জেলে যেতে হবে, তৃষা," আরিয়ান চরম এক শীতল গলায় চূড়ান্ত কথাটি বলল। "আর তোমাকে... তোমাকে সারাজীবনের জন্য আমার এই নরকে আমার বন্দি হয়ে থাকতে হবে। তুমি কি পারবে এই বিষাক্ত ভালোবাসাকে বরণ করে নিতে?"

তৃষা কোনো জবাব দিতে পারল না। আরিয়ানের বিষাক্ত টানের আড়ালে থাকা সেই সত্য আর গভীর ভালোবাসা তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে সে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে থেকে ভারী বুটের শব্দ আর পিস্তল লোড করার এক ভয়ংকর ধাতব শব্দ ভেসে এলো।

দরজার বাইরে পিস্তল লোডের ধাতব শব্দ হতেই আরিয়ানের মুখের শান্ত ভাবটা এক নিমিষে বদলে গেল। তার চোখে খেলে গেল এক হিংস্র শিকারির দৃষ্টি। তৃষাকে এক টানে নিজের আড়ালে ঠেলে দিয়ে সে বুক পকেট থেকে একটি ছোট পিস্তল বের করল। তৃষা ভয়ে আরিয়ানের সুতির কুর্তা শক্ত করে চেপে ধরল।

"আরিয়ান... কারা এরা?" তৃষার গলা দিয়ে কাঁপানো স্বর বের হলো।

"যাদের আসার কথা ছিল," আরিয়ান ঠান্ডা গলায় জবাব দিল। তার চোখ জোড়া ঘরের একমাত্র কাঠের ভাঙা দরজার দিকে স্থির।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো চার-পাঁচজন সশস্ত্র লোক। তাদের মাঝখান থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন তৃষার বৃদ্ধ বাবা—পারভেজ আহমেদ। তার পরনে দামী স্যুট, হাতে একটি ওয়াকিং স্টিক, কিন্তু চোখে কোনো অসুস্থতার ছাপ নেই। বরং সেই চোখে রয়েছে এক চরম নিষ্ঠুরতা। তৃষা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বাবা, যাকে সে এতদিন অসহায়, রোগাক্রান্ত একজন বৃদ্ধ ভেবে এসেছে, তিনি এই মাঝরাতে একদল সশস্ত্র গুন্ডা নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন!

"বাবা...?" তৃষার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল।

পারভেজ আহমেদ এক নিষ্ঠুর হাসি হেসে তৃষার দিকে তাকালেন। "তৃষা, তুই ভুল মানুষের সাথে জড়িয়ে পড়েছিস। আমি তোকে এত বছর রাজরানীর মতো আগলে রেখেছি কেবল এই দিনটার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। আর তুই এই অনাথ ছেলেটার প্রেমে পড়ে আমার সামনেই দাঁড়িয়ে গেলি?"

আরিয়ান তৃষাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোনায় এক বিষাক্ত ও অহংকারী হাসি ফুটে উঠল। "আপনার পাপের দিন শেষ, পারভেজ সাহেব। আপনি ভেবেছিলেন বারো বছর আগে আহমেদ পারভেজকে মেরে, তার সম্পত্তি আত্মসাৎ করে আর নিজের স্ত্রীকে খুন করে আপনি চিরকাল সুখে থাকবেন? আর এই মেয়েটিকে মিথ্যা গল্প শুনিয়ে বড় করবেন?"

"চুপ কর!" পারভেজ চিৎকার করে উঠলেন। "তৃষাকে আমি সত্য জানতে দেব না বলেই তোকে এত বছর খুঁজেছি, যাতে তোর মুখটা চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারি। তৃষা, এদিকে আয়! ওই সাপের কাছ থেকে সরে আয়!"

তৃষা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে তার গোটা জীবনটা একটা বিশাল মিথ্যা বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তার মা কোনো রোগে মারা যাননি, তাকে খুন করেছেন তার নিজের বাবা! আর যাকে সে শয়তান ভেবেছিল, সেই আরিয়ান আসলে তার মায়ের দেওয়া জীবনের উপহার।

"না, বাবা," তৃষা শিউরে উঠে বলল। "আমি আরিয়ানের কাছ থেকে যাব না।"

পারভেজ আহমেদের চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল। "তাহলে তোকে সহই শেষ করতে হবে। ছেলেরা, ওদের দুজনকেই..."

কথা শেষ করার আগেই আরিয়ান এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে গুলি চালাল। পারভেজের এক লোক সাথে সাথে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। শুরু হলো অন্ধকার ঘরে এক ভয়ংকর গুলির লড়াই। আরিয়ান তৃষার কোমর ধরে এক ঝটকায় তাকে ঘরের কোণার একটা বিশাল কাঠের আলমারির পেছনে ঠেলে দিল।

"এখানেই থাকো! একদম বের হবে না!" আরিয়ানের গলায় ছিল এক তীব্র শাসন আর আদেশ।

অন্ধকার ঘরে গুলির তীব্র শব্দ আর বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তৃষা দুই কানে হাত দিয়ে আলমারির পেছনে বসে কাঁদছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল আরিয়ান কীভাবে একাই পারভেজের লোকদের সাথে লড়াই করছে। কিন্তু আচমকা এক বিকট শব্দ হলো, আর তারপর সব নিস্তব্ধ।

তৃষা কাঁপা কাঁপা পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।

মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পারভেজের লোকজন পালিয়ে গেছে, আর তার বাবা মাটিতে বসে হাঁপাচ্ছেন, কারণ তার পায়ে গুলি লেগেছে। কিন্তু তৃষার চোখ স্থির হয়ে গেল ঘরের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা আরিয়ানের দিকে।

আরিয়ানের সাদা কুর্তার বুকের দিকটা ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে।

"আরিয়ান!" তৃষা পাাগলের মতো ছুটে গিয়ে আরিয়ানের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। সে হাত দিয়ে আরিয়ানের বুকের ক্ষতটা চেপে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু রক্ত থামছিল না।

আরিয়ান ব্যথায় কোঁকাচ্ছিল না, বরং তার সেই চেনা গভীর চোখে এক ভয়ংকর তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল। সে নিজের রক্তে ভেজা হাতটা দিয়ে তৃষার গাল স্পর্শ করল। সেই বিষাক্ত, ভালোবাসার স্পর্শ।

"কেঁদো না, তৃষা..." আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার গলা জড়িয়ে আসছিল। "আমি বলেছিলাম না, এই খেলায় আমি তোমাকেও ধ্বংস করব, আর নিজেকেও... আমি তোমাকে কখনো সুখে থাকতে দিইনি, কিন্তু আমি তোমাকে এমনভাবে আমার ভেতরে বন্দি করে রেখেছি যে তুমি আর কারো হতে পারবে না।"

"তুমি কিচ্ছু বলবে না, আরিয়ান! আমি তোমাকে কিচ্ছু হতে দেব না!" তৃষা কেঁদে কেটে আরিয়ানের মুখটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সে বুঝতে পারছিল, এই রক্তে ভেজা মানুষটাই তার সমস্ত অস্তিত্ব। সে যদি পিশাচও হয়, তবুও তৃষা এই পিশাচটাকেই ভালোবেসেছে।

আরিয়ান তার পকেট থেকে শেষ চিঠিটি—পর্ব সাতের চিঠি বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার শক্তি ফুরিয়ে আসছিল।

"সাত নম্বর চিঠি..." আরিয়ান তৃষার ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এনে শেষবারের মতো ফিসফিস করে বলল, "ওতে লেখা আছে... আমি যদি আজ রাতে না বাঁচি, তবে তুমি কোথায় আমার শেষ উত্তরটা পাবে। কিন্তু তৃষা... তুমি পালিয়ে গিয়েও লাভ নেই, আমার আত্মা চিরকাল তোমার ছায়া হয়ে থাকবে..."

আরিয়ানের হাতটা তৃষার গাল থেকে খসে মেঝের রক্তে পড়ে গেল। তার চোখ দুটো আধবোজা হয়ে এলো।

"আরিয়ান! আরিয়ান! চোখ খোলো!" তৃষার চিৎকার পুরান ঢাকার সেই অভিশপ্ত জমিদার বাড়ির প্রতিটি কোনায় প্রতিধ্বনি হতে লাগল।

বাইরে থেকে তখন পুলিশের গাড়ির সাইরেনের বিকট শব্দ ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। তৃষা রক্তাক্ত আরিয়ানকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে ভালোবাসার বিষ আর সত্যের আলো একসাথে মিশে গেছে।

পুলিশের সাইরেনের তীব্র আওয়াজে পুরান ঢাকার থমথমে গলিগুলো কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডজনখানেক পুলিশ অফিসার রক্তে ভেসে যাওয়া সেই ঘরে ঢুকল। রক্তে ভেজা আরিয়ানের নিথর শরীরটা জড়িয়ে ধরে তৃষা তখনো পাথরের মতো বসে ছিল। তার চোখ দুটো ছিল একদম শুকনো, কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছিল।

পুলিশ পারভেজ আহমেদকে গ্রেপ্তার করল। পারভেজের পায়ে গুলি লেগেছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় আঘাত লেগেছিল তার অহংকারে। পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে সে তৃষার দিকে তাকিয়ে এক নিষ্ঠুর হাসি হেসে বলল, "তোর ওই প্রেমিক শেষ তৃষা! ও আর বাঁচবে না!"

তৃষা কোনো জবাব দেয়নি। সে কেবল আরিয়ানের রক্তাক্ত শরীরটাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার দৃশ্যটা অপলক চোখে দেখেছিল।

পরের তিনটে দিন তৃষার জন্য ছিল নরক যন্ত্রণার মতো। আরিয়ানকে রাখা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU)। তার বুকে লাগা গুলিটা ফুসফুসের খুব কাছাকাছি ছিদ্র করে দিয়েছিল। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তৃষা দিন-রাত আইসিইউর বাইরে কাঁচের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। তার পরনে ছিল সেই একই শাড়ি, যেটিতে আরিয়ানের রক্তের ছোপ লেগে শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। সে ধুলো-বালি, খাওয়া-দাওয়া সব ভুলে গিয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল, আরিয়ান যদি মারা যায়, তবে তার নিজেরও বেঁচে থাকার আর কোনো অর্থ থাকে না। আরিয়ানের বিষাক্ত ভালোবাসা তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে মিশে গেছে যে, সে সুস্থ সাধারণ জীবনে আর ফিরে যেতে পারবে না।

চতুর্থ দিনের মাথায়, মধ্যরাতে তৃষা যখন আইসিইউর বাইরে বেঞ্চে বসে ঝিমোচ্ছিল, তখন একজন নার্স এসে তাকে ডাকল।
"রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। সে কেবল আপনার নামটাই বারবার উচ্চারণ করছে।"

তৃষা এক মুহূর্ত দেরি না করে কাঁচের দরজার ভেতর ঢুকে গেল।

বিছানায় শুয়ে থাকা আরিয়ানকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। যন্ত্রের ভিড়ে ঢাকা তার ফ্যাকাশে মুখ। কিন্তু তৃষা ঘরে ঢুকতেই আরিয়ানের সেই আধবোজা চোখ দুটো খুলে গেল। সেই তীব্র, গভীর আর বিষাক্ত নজর—যা তৃষাকে চিরকাল বন্দি করে রেখেছে।

তৃষা ধীর পায়ে গিয়ে আরিয়ানের বিছানার পাশে বসল। সে সাবধানে আরিয়ানের একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। হাতটা ভীষণ ঠান্ডা, কিন্তু তৃষার স্পর্শ পেয়ে আরিয়ানের আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল।

"তুমি... তুমি এখনও বেঁচে আছ..." তৃষার চোখ দিয়ে অবশেষে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল।

আরিয়ান অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়েই এক হালকা, কষ্টকর হাসি হাসল। সে মাস্কটা সরাতে চাইল, কিন্তু তৃষা তাকে বারণ করল। আরিয়ান চোখ দিয়ে ইশারা করল তার পকেটের দিকে। তৃষা তার সুতির জামার পকেটে হাত দিয়ে একটা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া হলুদ খাম বের করে আনল।

সাত নম্বর চিঠি। যা জমিদার বাড়িতে আরিয়ান তাকে দিতে চেয়েছিল।

তৃষা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল। ডিম লাইটের আবছা আলোয় সে পড়তে শুরু করল:

    "তৃষা, তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে, হয়তো আমি তোমার কাছে থাকব না। কিন্তু জেনে রেখো, আমার ভালোবাসায় কোনো করুণা ছিল না। আমি তোমাকে আলো দিতে আসিনি, আমি তোমাকে আমার অন্ধকারের অংশ বানাতে এসেছিলাম। তুমি ভেবেছিলে তোমার বাবা আহমেদ পারভেজকে মেরেছিল? না তৃষা। আসল সত্যিটা অন্য জায়গায়। বারো বছর আগে তোমার বাবা ও আমার বাবা পারভেজ আসলে একই মানুষ ছিলেন না... তারা ছিলেন দুই যমজ ভাই। তোমার বাবা পারভেজ আহমেদের আসল নাম ছিল আহমেদ পারভেজ, আর আমার বাবার নাম ছিল মাহমুদ পারভেজ। তোমার বাবা আমার বাবার পরিচয় চুরি করে বেঁচে আছেন। অর্থাৎ, তুমি আর আমি অচেনা কেউ নই... আমরা একই বংশের অভিশাপ বহন করছি। কিন্তু বিধাতা আমাদের রক্তে এমন এক বিষ ঢেলে দিয়েছেন, যা একে অপরকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত থামবে না।"

চিঠির এই অংশটা পড়ে তৃষা হাহাকার করে উঠল। সে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আরিয়ান মাস্কটা টেনে সামান্য নিচে নামিয়ে অতি নিচু, ফিসফিসানি স্বরে বলল, "তুমি... তুমি আমার নিজের রক্ত নও তৃষা... তোমার মা তোমাকে দত্তক নিয়েছিলেন... কিন্তু তোমার বাবা সেই সত্য ঢাকতেই আমার পরিবারকে শেষ করেছিলেন। আমি... আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাইনি, তৃষা... কিন্তু তোমার ওই চোখ দুটো আমাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল..."

তৃষা আরিয়ানের ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল রাখল। "আর কিছু বলতে হবে না, আরিয়ান। আমি জানি তুমি কে। তুমি আমার ধ্বংস, তুমিই আমার একমাত্র আশ্রয়।"

আরিয়ান তৃষার হাতটা টান মেরে নিজের বুকের ওপর রাখল, যেখানে তার হৃদস্পন্দন ধুকধুক করে চলেছে। তার চোখে আবার সেই ভয়ংকর, দাম্ভিক অধিকারবোধ ফিরে এলো।

"তুমি আমার থেকে পালাতে পারবে না, তৃষা," আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার চোখের দৃষ্টিতে এক মরণপণ উন্মাদনা। "সুস্থ হয়ে আমি আবার তোমাকে আমার খাঁচায় বন্দি করব। তোমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তুমি শুধুই আমার হয়ে থাকবে।"

তৃষা ভয় পেল না, বরং সে আরিয়ানের কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। "আমি কোনোদিন পালাব না, আরিয়ান। তোমার দেওয়া এই বিষেই আমি সারা জীবন বেঁচে থাকব।"

ঠিক সেই মুহূর্তে আইসিইউর দরজায় আবার বুটের শব্দ শোনা গেল। দুজন পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকলেন।

"আরিয়ান পারভেজ, বারো বছর আগের এক হত্যা মামলা এবং বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো। সুস্থ হলেই আপনাকে জেলহাজতে নিয়ে যাওয়া হবে।"

আরিয়ানের ঠোঁটে এক শীতল, কুটিল হাসি ফুটে উঠল। সে তৃষার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "৮ নম্বর চিঠিটা এখনও বাকি আছে তৃষা... কাল রাতে তোমার ঠিকানায় শেষ চিঠিটা পৌঁছে যাবে।"

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তৃষা হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এল। সকালের সূর্যটা উঠে লালবাগের গলিগুলোকে এক অদ্ভুত তপ্ত আলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তৃষার মনের ভেতরে চলছে এক হিমশীতল ঝড়। আরিয়ান চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। তাকে যে জেলে যেতে হবে, তা নিশ্চিত। কিন্তু তৃষাকে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি দগ্ধ করছিল, তা হলো আরিয়ানের সেই কথা—‘৮ নম্বর চিঠিটা এখনও বাকি আছে।’

নিজের পুরোনো, নির্জন ঘরে ফিরে এসে তৃষা খাটে বসে রইল। চারপাশের নীরবতা যেন তাকে গিলে খেতে চাইছে। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের চোখের নিচে জমে থাকা কালি আর ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকিয়ে অনুভব করল, সে আর আগের তৃষা নেই। আরিয়ান তার জীবনের সমস্ত সরলতা কেড়ে নিয়ে সেখানে এমন এক বিষাক্ত আবেশ তৈরি করেছে, যা থেকে মুক্ত হওয়ার ইচ্ছা তার নিজেরও নেই।

ঠিক দুপুর আড়াইটায়, পরিচিত সেই কাঠের দরজায় দুটো হালকা টোকা পড়ল।

তৃষা দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল। দরজার সামনে কেউ নেই, কিন্তু নীল রঙের সেই পুরোনো ডাকবাক্সটার ভেতরে একটা হলুদ খাম রাখা আছে। খামের ওপর রক্ত দিয়ে যেন লেখা—‘আহমেদ পারভেজ’।

তৃষা কাঁপতে থাকা হাতে খামটা তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে এলো। খামটা খুলতেই তার নাসারন্ধ্রে নেমে এলো আরিয়ানের সুতির কুর্তার সেই চেনা ধূপ আর সিগারেটের তীব্র ঘ্রাণ।

আট নম্বর এবং শেষ চিঠিতে লেখা ছিল:

    *"তৃষা, তুমি হয়তো ভাবছো পুলিশ আমাকে লোহার খাঁচায় বন্দি করে রাখবে, আর তুমি সুখে-শান্তিতে আবার সাধারণ জীবনে ফিরে যাবে? কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ, আমি আরিয়ান। আমি যে ফঁাঁদ বুনেছি, তার থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ আমি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছি।

    তোমার বাবা আহমেদ পারভেজের সমস্ত অপরাধের প্রমাণ, তার বেআইনি সম্পত্তির দলিল এবং বারো বছর আগের হত্যাকাণ্ডের আসল নথিপত্র আমি ইতিমধ্যেই আদালতের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তাঁর সারাজীবনের জন্য ফাঁসি কিংবা আমৃত্যু কারাদণ্ড হতে চলেছে। তিনি যে পাপ করেছিলেন, তার খেসারত তাঁকে দিতেই হবে।

    কিন্তু তোমার কী হবে, তৃষা? তুমি কি ভেবেছ তুমি মুক্ত?

    তোমার ঘরের দক্ষিণ দিকের আলমারির একদম নিচের গোপন কবাটটা খোলো। সেখানে একটা চাবি রাখা আছে। চাবিটি নিয়ে পুরান ঢাকার সেই অভিশপ্ত জমিদার বাড়ির পেছনের গোপন সিন্দুকটা খোলো। ওখানেই জমা আছে আমার জীবনের শেষ আমানত, যা শুধু তোমার জন্য।"*

চিঠির পরের অংশটুকু পড়তে গিয়ে তৃষার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো।

    "আজ রাতে পুলিশ আমাকে জেলহাজতে স্থানান্তরিত করবে। কিন্তু তারা জানে না, যে পাখি একবার মুক্ত আকাশের বিষ চিনে ফেলে, সে আর কোনো খাঁচায় বন্দি থাকে না। আমি তোমাকে বলেছিলাম না তৃষা, এই গল্পে আমরা দুজন একসাথে ধ্বংস হব? আজ রাতে তুমি জমিদার বাড়িতে আসবে। আর যদি না আসো, তবে মনে রেখো... আমার এই বিষাক্ত ছায়া চিরকাল তোমাকে তাড়া করে বেড়াবে, তোমাকে পাগল করে দেবে।"

তৃষা এক মুহূর্তও দেরি করল না। চিঠির নির্দেশমতো সে তার ঘরের আলমারির নিচ থেকে একটা পুরোনো পেতলের চাবি খুঁজে বের করল। তার হৃদস্পন্দন তখন এত দ্রুত চলছিল যে নিজের বুকের ধুকধুক শব্দ সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। আরিয়ানের রূপটা যতটা ভয়ংকর, তার এই টান ততটাই অপ্রতিরোধ্য।

রাত এগোরোটা। পুরান ঢাকার সেই ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়িটি আজ রাতে আরও বেশি অন্ধকার আর ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। ঝড়ের পূর্ব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে আকাশে, মেঘের ঘন ঘন গর্জন পুরো এলাকাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

তৃষা হাতে একটি ছোট টর্চ নিয়ে জমিদার বাড়ির পেছনের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। স্যাঁতসেঁতে একটা গোপন অন্ধকার ঘরে সে পেতলের সিন্দুকটা দেখতে পেল। চাবি ঘুরিয়ে সিন্দুকটা খুলতেই তৃষার চোখ স্থির হয়ে গেল।

সিন্দুকের ভেতরে রাখা আছে প্রকাণ্ড অঙ্কের টাকার দলিল, যা পারভেজ আহমেদ হাতিয়ে নিয়েছিলেন। আর তার পাশে রাখা আছে একটি লাল রঙের রেশমি শাড়ি এবং একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স।

বাক্সটা খুলতেই দেখা গেল তার ভেতরে রয়েছে একটি সোনার পার্পল কালারের আংটি, আর তার নিচে লেখা একটি বার্তা:
"শাড়িটা পরো তৃষা। কারণ আজ রাতে আমাদের ভালোবাসার চূড়ান্ত পরিণতি হতে চলেছে।"

তৃষার হাত-পা কাঁপছিল। সে কি সত্যি এই পিশাচটার জালে নিজেকে সঁপে দেবে? সে কি তার নিজের সর্বনাশ জেনেও এই বিষাক্ত ভালোবাসাকে বরণ করবে?

হঠাৎ ওপরের তলা থেকে এক তীব্র বিকট শব্দ ভেসে এলো। যেন লোহার কোনো ভারি দরজা ভেঙে ফেলার শব্দ, আর সাথে কতগুলো বুটের দ্রুত আওয়াজ!

তৃষা শাড়িটা বুকের সাথে চেপে ধরে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলো।

দোতলার সেই রক্তভেজা ঘরটার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল একটা অবয়ব। ঝড়ের বিদ্যুতের তীব্র আলোয় তার চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

পায়ের কড়া বেড়ি আর হাতের হাতকড়া ভেঙে, জামায় রক্তের দাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। সে পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে এসেছে! তার চোখে সেই একই তীব্র, ভয়ংকর এবং অধিপত্যপূর্ণ দৃষ্টি।

"আমি বলেছিলাম না তৃষা," আরিয়ান একপা একপা করে তৃষার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, তার গলার আওয়াজটা এই ঝড়ের রাতে কোনো এক পিশাচের আহ্বানের মতো শোনালো, "তুমি আমার হাত থেকে কোনোদিন পালাতে পারবে না।"

তৃষা পিছিয়ে না গিয়ে রেশমি শাড়িটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে আর কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল এক বিধ্বংসী আত্মসমর্পণ।

"আমি পালাতে চাইও না, আরিয়ান," তৃষা কাঁপা গলায় বলল।

আরিয়ান তৃষার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। হাতকড়াসমেত নিজের দুটো হাত তৃষার ঘাড়ে জড়িয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে পিষে ফেলল।

ঠিক সেই মুহূর্তে নিচে একের পর এক পুলিশের গাড়ির তীব্র সাইরেন বাজতে শুরু করল। তারা পুরো জমিদার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। লাউডস্পিকারে পুলিশের আওয়াজ ভেসে এলো—"আরিয়ান, নিজেকে সমর্পণ করো! তোমার পালানোর কোনো পথ নেই!"

আরিয়ান সেই আওয়াজ শুনে এক নির্মম, ভয়ংকর সুন্দর হাসি হাসল। সে তৃষার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "ওরা ভুল বলছে তৃষা... আমাদের পালানোর পথ আছে। কিন্তু সেই পথ এই দুনিয়ায় নয়।"

আরিয়ান তার পকেট থেকে শেষ আট নম্বর পর্বের বাকি টুকরো কাগজটা বের করে তৃষার হাতে দিল। এবার পর্ব ৮-এর চূড়ান্ত সমাপ্তির সময়।

আরিয়ানের হাতে থাকা রক্তমাখা হাতকড়া আর তার বুকের ক্ষত থেকে ঝরতে থাকা তাজা রক্ত তৃষার রেশমি শাড়িতে লেগে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। নিচে পুলিশের সাইরেন আর মাইকের কড়াকড়ি নির্দেশ—"আরিয়ান, সমর্পণ করো! চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে!"

কিন্তু আরিয়ানের চোখেমুখে ধরা পড়ল না সামান্যতম ভয় বা অস্থিরতা। বরং সে অতি শান্ত আর এক ভয়ংকর সুন্দর তৃপ্তি নিয়ে তৃষার ভেজা চোখে চোখ রাখল।

তৃষা কাঁপানো হাতে আটের চিঠির শেষ টুকরো কাগজটা মেলে ধরল। ধূপ আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে থাকা সেই কাগজে আরিয়ানের শেষ কটি বাক্য লেখা ছিল:

    "দুনিয়া আমাদের মতো দুটো বিষাক্ত আত্মাকে কখনো একসাথে শান্তিতে থাকতে দেবে না, তৃষা। তোমার বাবা জেলখানার অন্ধকারেই পচে মরবে, তার কৃতকর্মের খেসারত সে দেবে। কিন্তু তুমি আর আমি? আমরা কোনো আদালতের রায়ে আলাদা হব না। এই অন্ধকারের মায়াজাল আমি শুরু করেছিলাম, আর এর শেষও আমিই করব। তুমি কি আমার সাথে সেই চিরন্তন অন্ধকারে তলিয়ে যেতে প্রস্তুত?"

তৃষা চিঠি থেকে চোখ তুলে আরিয়ানের দিকে তাকাল। বাইরে তখন প্রচণ্ড বেগে কালবৈশাখীর ঝড় বইছে, বিজলির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে তাদের চারপাশ। নিচে পুলিশ অফিসারদের ভারী বুটের শব্দ এখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে।

"আমি তৈরি, আরিয়ান," তৃষার গলায় আর কোনো দ্বিধা বা ভয় ছিল না। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জল আরিয়ানের রক্তাক্ত গাল ছুঁয়ে গেল। "তুমি আমাকে যে বিষাক্ত ভালোবাসায় বন্দি করেছ, সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ আমি চাই না। তোমার নরকটাই আমার একমাত্র স্বর্গ।"

আরিয়ান তৃষার থুতনিটা শক্ত করে ধরে তার কপালে এক দীর্ঘ, গভীর আর তীব্র স্পর্শ আঁকল। সেই স্পর্শে ছিল পরম অধিকার আর আজীবনের বন্ধন।

"তাহলে চলো..." আরিয়ান হাতকড়াসমেত নিজের হাত দিয়ে তৃষার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। এমন এক বাঁধন, যা কোনো শক্তি ছুটাতে পারবে না।

পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পিস্তল উঁচিয়ে যখন ঘরটার কাঠের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

ঘরটি খালি। কিন্তু ওপারের খোলা বিশালাকার বারান্দার জং ধরা রেলিং ভাঙা।

প্রচণ্ড ঝড়ের মেঘলা রাতে, জমিদার বাড়ির পেছনের গভীর ও উত্তাল নদীর বুকে দুটো শরীর একসাথে বিলীন হয়ে গেছে। বিজলির আলোয় কেবল দেখা গেল লাল শাড়ির আঁচলটা নদীর কালো জলে শেষবারের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।

ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর।

পারভেজ আহমেদকে আদালতে তোলা হয়েছিল। বারো বছর আগের জোড়া খুন এবং সম্পত্তি দখলের চরম অপরাধে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। হুইলচেয়ারে বসে সাজা শোনার সময় পারভেজের চোখে ছিল চরম পরাজয় আর শূন্যতা। তার সারাজীবনের তৈরি করা সাম্রাজ্য আজ ধুলোয় মিশে গেছে।

লালবাগের সেই পুরোনো বইয়ের দোকান 'জ্ঞানকানন' আজও বন্ধ। কিন্তু আশেপাশের বাসিন্দারা বলে, মাঝে মাঝেই নাকি বৃষ্টিভেজা দুপুরে বা গভীর রাতে সেই বন্ধ দোকানের সামনে নীল রঙের একটা পুরোনো ডাকবাক্স ভেসে ওঠে।

তৃষার সেই চারতলা পুরোনো বাড়ির ফাঁকা ঘরের বারান্দায় এখনো মাঝে মাঝেই ভেজা বাতাসের টানে উড়ে এসে পড়ে অচেনা এক ঠিকানার হলুদ খাম। খামের ওপর আহমেদ পারভেজের নাম লেখা থাকলেও ভেতরে কোনো লেখা থাকে না। শুধু থাকে ধূপ আর সুতির কুর্তার ওপর শুকিয়ে যাওয়া চেনা পারফিউমের সুবাস।

তৃষা আর আরিয়ানকে পুলিশ বা ডুবুরিরা নদী থেকে আর কোনোদিন খুঁজে পায়নি। তারা কি সত্যিই নদীর তলদেশের কালচে স্রোতে হারিয়ে গেছে? নাকি দুনিয়ার সমস্ত চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্য কোনো চেনা শহরে, নিজেদের তৈরি সেই বিষাক্ত অন্ধকারের খাঁচায় ভালোবাসাকে চিরদিনের জন্য অমলিন করে বেঁচে আছে?

সেই রহস্যের উত্তর পুরান ঢাকার অভিশপ্ত বৃষ্টি আর হাওয়ায় চিরদিনের মতো গোপনই রয়ে গেল।

....
👁 18