দুই হৃদয়ের কাকতালীয় মিলন

একটানা বৃষ্টির পর ঢাকা শহরটার রূপ যেন বদলে যায়। সিআরবি ভবন থেকে বের হওয়ার মুখে গাড়িটা ট্রাফিকে আটকে পড়তেই সানান হাতঘড়ির দিকে তাকাল। প্রতিদিনের একই রুটিন—অফিস, মিটিং আর ফাইলের পর ফাইল। ২৪ বছর বয়সী তরুণ সানান তার বাবার কনস্ট্রাকশন ফার্মের কাজের দায়িত্ব অনেকটাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। দেখতে সুপুরুষ, কিছুটা গম্ভীর স্বভাবের হলেও পরিচিতদের মহলে তার একটা চমৎকার ব্যক্তিত্বের প্রশংসা সবাই করে। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল, বৃষ্টিতে ধোয়া রাস্তার পাশে নিয়ন আলোগুলো জ্বলছে-নিভছে।

সানানের বাবা সাইফ সাহেব ঘরের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। সানান বাড়ি ফিরে ড্রয়িংরুমে ব্যাগটা রাখতেই সাইফ সাহেব ডেকে বললেন, "সানান, তুই আর কতদিন এভাবে দিনরাত কাজ করবি বল তো? দিনরাত মেটেরিয়াল, সাইট আর ক্লায়েন্ট ছাড়া কি তোর জীবনে আর কিছু নেই?"

সানান হেসে বলল, "আব্বু, কাজ না করলে তো প্রজেক্ট সময়মতো শেষ হবে না। তুমিই তো শেখালে কাজের চেয়ে বড় কিছু নেই।"

"সবকিছুই ঠিক আছে, কিন্তু জীবনের একটা বিরতিও দরকার," সাইফ সাহেব এক চুমুক চা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। "অনেকদিন ধরে মনটা কেমন যেন অচেনা এক ক্লান্তিতে ভরে আছে। আমার সেই পুরানো বন্ধুদের কথা খুব মনে পড়ে। বিশেষ করে রফিকের কথা। কত বছর দেখিনা ওকে! ছোটবেলায় আমরা একসাথে কত কি করেছি, অথচ জীবনের টানে কে কোথায় হারিয়ে গেলাম।"

সানান জানে তার বাবার এই বন্ধুপ্রীতির কথা। সাইফ সাহেব প্রায়ই ছোটবেলার কথা বলতেন। রফিক সাহেব ছিলেন তাঁর স্কুলের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। হাইস্কুলের পর রফিক সাহেবের বাবা বদলি হয়ে অন্য শহরে চলে যান, সেই থেকে ধীরে ধীরে যোগাযোগের সুতোটা ছিঁড়ে যায়। তখনকার দিনে তো আর আজকের মতো মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। ফলে হারিয়ে যাওয়া মানে সত্যি সত্যিই হারিয়ে যাওয়া।

সাইফ সাহেব হঠাৎ বললেন, "আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী সপ্তাহে আমরা সিলেটে একটা রিসোর্টে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে যাব। তুই কোনো অজুহাত দিবি না। সব কাজ স্থগিত রাখ।"

সানান মুচকি হেসে রাজি হয়ে গেল। বাবার মুখের এই আকুলতা সে ফেলতে পারে না। তাছাড়া সত্যি বলতে, সানানের নিজেরও একটু বিশ্রামের দরকার ছিল।

অন্যদিকে ঢাকার অন্য এক প্রান্তে লিপির ঘর থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। লিপি—২০ বছরের এক চঞ্চল, প্রাণবন্ত মেয়ে। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বাড়ির ছোট মেয়ে হওয়ায় সবার আদরের। চোখ দুটো তার চঞ্চলতায় ভরা, যেন সবসময় কিছু না কিছু দুষ্টুমি করার ফন্দি আঁটছে।

লিপির বাবা রফিক সাহেব ড্রয়িংরুমে বসে চশমাটা ঠিক করতে করতে লিপিকে বললেন, "লিপি, মা আমার, তোর এই হইচই একটু কমা তো! ইউনিভার্সিটির পড়ার পাশাপাশি আর কিছু চিন্তা করিস না নাকি?"

লিপি দৌড়ে এসে বাবার পাশে বসে জড়িয়ে ধরে বলল, "আব্বু! পড়ার কথা এখন একদম বলবে না। তুমিই তো বলেছিলে পরীক্ষা শেষ হলে আমাকে ঘুরাতে নিয়ে যাবে। তোমার সেই ওয়াদার কী হলো?"

লিপি চটপটে, কিন্তু মনটা ভীষণ বড়। পরিবারের সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। লিপির মা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বললেন, "হ্যাঁ, তুমি তো ওকে মাথায় তুলেছ। এখন নিয়ে যাও কোথাও। মেয়েটা দিনরাত ঘরে আটকে থেকে হাপিয়ে উঠেছে।"

রফিক সাহেব হেসে ফেললেন। "ঠিক আছে, ঠিক আছে! আগামী সপ্তাহেই আমরা শ্রীমঙ্গলের একটা সুন্দর রিসোর্টে যাচ্ছি। সব বুকিং হয়ে গেছে।"

লিপি খুশিতে চিৎকার করে উঠল, "সত্যি আব্বু? অশেষ ধন্যবাদ তোমাকে! আমি আজই আমার ব্যাগ গোছানো শুরু করে দেব।"

লিপির পরিবার বলতে তার আব্বু আর আম্মু। ছোট পরিবার হলেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অভাব নেই। রফিক সাহেব মাঝেমধ্যে উদাস হয়ে যেতেন। তিনিও ভাবতেন তাঁর সেই চেনা মানুষগুলোর কথা, সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। শৈশবের সেই প্রিয় বন্ধু সাইফের কথা মনে পড়লে তিনি প্রায়ই ভাবতেন, এত বড় দেশে সাইফ এখন কোথায় কেমন আছে? তারা কি আর কোনোদিন সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বলতে পারবে—"কিরে বন্ধু, কেমন আছিস?"

সপ্তাহের শেষ দিকে দুটো পরিবারই আলাদা আলাদা দিনে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হলো। সানান আর তার বাবা-মা নিজেদের গাড়িতে করে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে সবুজ পাহাড় আর চা বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে সানানের মনটাও ভালো হয়ে গেল। ঢাকার ধুলোবালি আর ব্যস্ত জীবন থেকে বহু দূরে এই স্নিগ্ধ পরিবেশ যেন মনের ভেতরের সব জমাট বাঁধা ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছিল।

সানানদের গাড়ি যখন শ্রীমঙ্গলের 'গ্রীন ভ্যালি রিসোর্ট'-এ পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশ নীরব, পাহাড়ি বাতাসের এক অদ্ভুত মাদকতা। সানান ফ্রেশ হয়ে রিসোর্টের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দূরে ঘন জঙ্গল আর তার মাথার ওপর বিশাল আকাশ।

একই দিন সকালে লিপিরাও সেই একই রিসোর্টে এসে উঠেছিল। কাকতালীয়ভাবে রিসোর্টের ম্যানেজার তাদের দু'টি পরিবারকে পাশাপাশি দুটো কটেজে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম দিনেই কারও সাথে কারও দেখা বা পরিচয় হয়নি, কারণ লিপিরা তখন বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর সানানরা জার্নির ক্লান্তিতে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল।

পরদিন সকালটা শুরু হলো এক নতুন সতেজতা নিয়ে। সকালের মিষ্টি রোদ পড়েছে রিসোর্টের বাগানটার ওপর। সবুজ ঘাসের ওপর শিশিরবিন্দু জ্বলজ্বল করছে। সাইফ সাহেব সকালে হাঁটার অভ্যাসমতো ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃভ্রমণে বের হলেন। রিসোর্টের বড় বাগানটার মাঝখানের হাঁটার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন।

একই সময়ে রফিক সাহেবও বের হয়েছেন সকালে হাঁটার জন্য। হাতে একটা ছোট ছড়ি, মুখে হালকা হাসি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রাস্তার এক মোড়ে দু'জন মানুষের চোখাচোখি হলো।

সাইফ সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। রফিক সাহেবও থমকে গেলেন।

বয়সের ছাপ পড়েছে দুজনের মুখেই। চুল কিছুটা পেকেছে, চেহারার গঠনে এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু চোখ তো মিথ্যা বলে না! সেই শৈশবের চেনা চাহনি কি এত সহজে হারিয়ে যায়?

সাইফ সাহেব চোখ সরু করে তাকালেন, তারপর অনিশ্চিত গলায় বললেন, "রফিক? রফিক না তুই?"

রফিক সাহেব চমকে উঠলেন। গলার আওয়াজ শুনে তাঁর বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা আলোড়ণ সৃষ্টি হলো। তিনি একপা এগিয়ে এসে খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। "সাইফ? সত্যি তুই সাইফ?"

"আরে রফিক! ওরে আমার বন্ধু!" সাইফ সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। জড়িয়ে ধরলেন রফিক সাহেবকে।

দুই প্রবীণ বন্ধু মাঝবয়সের সীমা পেরিয়ে যেন মুহূর্তে সেই তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোর হয়ে গেলেন। এতদিন পর একে অপরকে এভাবে হুট করে, একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে এক রিসোর্টে খুঁজে পাবেন—তা তারা স্বপ্নেও ভাবেননি। নিয়তি যেন গোপনে এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল।

"তুই এখানে? কত বছর পর দেখা বল তো!" রফিক সাহেবের চোখে তখন আনন্দের জল।

সাইফ সাহেব আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, "পুরো পঁচিশ-ত্রিশ বছর হবে রে বন্ধু! আমি তো ভেবেছিলাম আর কোনোদিন তোকে দেখতে পাব না। এই বিশাল জগতে তুই কোথায় হারিয়ে গেলি বল তো?"

"জীবনের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কত দূরে চলে এলাম রে সাইফ! কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর কথা আমি মাঝেমধ্যেই ভাবতাম," রফিক সাহেব বললেন।

দুজনে বাগানের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলেন। শুরু হলো স্মৃতির ঝাপি খোলা। শৈশবের সেই খেলাধুলা, লুকিয়ে ফল চুরি করা, একসাথে নদীর জলে সাঁতার কাটা, পড়া ফাঁকি দিয়ে মার খাওয়া—সব গল্প একে একে ফিরে আসতে লাগল। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল সেই দুই পুরনো বন্ধুর কাছে।

ঠিক তখনই সানান বাবার খোঁজ করতে করতে বাগানের দিকে হেঁটে এলো। আব্বু সকালে একা বের হয়েছেন, এতক্ষণ হয়ে গেল ফিরছেন না দেখে সানান একটু চিন্তা করছিল। দূরে বেঞ্চে বাবাকে অন্য এক বয়স্ক মানুষের সাথে গভীর আলোচনায় মগ্ন দেখে সানানের কৌতুহল হলো।

সানান হেঁটে তাদের কাছে গিয়ে বলল, "আব্বু, তুমি এখানে? তোমার তো ফেরা এত দেরি হচ্ছে দেখে ভাবছিলাম..."

সাইফ সাহেব একগাল হেসে দাঁড়িয়ে উঠলেন। সানানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "সানান, দেখ কে এসেছে! এ হলো আমার সেই রফিক। তোকে কতবার ওঁর কথা বলেছি না? আমার ছোটবেলার সবচেয়ে কাছের বন্ধু!"

সানান ভদ্রভাবে মুচকি হেসে রফিক সাহেবকে সালাম দিল, "আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।"

রফিক সাহেব সানানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দ পেলেন। "ওয়ালাইকুমুস সালাম, বাবা। সাইফ, তোর ছেলে তো মাশাল্লাহ বেশ বড় আর হ্যান্ডসাম হয়েছে রে! দেখলেই বোঝা যায় খুব ভদ্র।"

সাইফ সাহেব গর্বিত গলায় বললেন, "হ্যাঁ, সানান আমার সব কাজ সামলায় এখন।"

ঠিক সেই সময়েই পেছন থেকে একটা চঞ্চল ও মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এলো, "আব্বু! তুমি এখানে বসে বসে গল্প করছ আর আমি তোমাকে পুরো রিসোর্ট খুঁজে মরছি!"

সানান পেছনে ফিরল। রিসোর্টের বাগানের রঙিন ফুলগুলোর মাঝে হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে, আর মুখে এক অদ্ভুত সতেজ রাগ-অভিমানের অভিব্যক্তি।

মেয়েটি আর কেউ নয়, লিপি।

রফিক সাহেব হেসে উঠে বললেন, "আয় লিপি, এদিকে আয় মা। দেখ কার সাথে দেখা হয়ে গেল আজ!"

লিপি একটু অবাক হয়ে কাছে এলো। রফিক সাহেব সাইফ সাহেবের সাথে লিপিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, "সাইফ, এ হলো আমার মেয়ে—লিপি। আর লিপি, উনি হলেন তোর সাইফ আঙ্কেল, আমার ছোটবেলার বন্ধু। যার গল্প তোকে কত শুনিয়েছি!"

লিপি অমনি তার চঞ্চল স্বভাব ছেড়ে সাইফ সাহেবকে বিনীতভাবে সালাম দিল, "আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।"

"ওয়ালাইকুমুস সালাম, মা। মাশাল্লাহ, খুব মিষ্টি মেয়ে তো তোর রফিক!" সাইফ সাহেব আশীর্বাদের ভঙ্গিতে লিপির মাথায় হাত রাখলেন।

তারপর সাইফ সাহেব সানানের দিকে ইশারা করে বললেন, "আর লিপি, এ হলো আমার ছেলে সানান।"

লিপি আর সানানের চোখাচোখি হলো প্রথমবার। সানান তার চিরাচরিত গম্ভীর কিন্তু মার্জিত দৃষ্টিতে তাকাল, আর লিপি তার চঞ্চল চোখে কৌতূহল নিয়ে সানানকে একপলক দেখে নিল। সানান হালকা মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালে লিপিও একটা ছোট মুচকি হাসি দিল।

সকালের সূর্যটা শ্রীমঙ্গলের চা বাগানগুলোর ওপর সোনালি আলো ছ ছড়িয়ে দিয়েছে। রিসোর্টের বাগান থেকে চারজনে একসাথে ফিরে এলো ডাইনিং হলে। প্রাতঃরাশের টেবিলে দুই বন্ধুর আড্ডা আর থামে না। শৈশবের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তারা একে অপরের পুরোনো দিনগুলো নতুন করে রূপ রূপায়িত করছেন।

সাইফ সাহেব সানানকে দেখিয়ে বললেন, "রফিক, সানান তো কাজের মধ্যে ডুবে থাকে দিনরাত। ওকে একটু রিফ্রেশমেন্টে নিয়ে আসাই আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল।"

রফিক সাহেব হেসে উঠে বললেন, "একদম ঠিক করেছিস। লিপিও তো ইউনিভার্সিটির পড়া আর বন্ধুদের আড্ডা নিয়ে থাকে, কিন্তু ঘুরতে যাওয়া মানে ওর কাছে সব কাজ একপাশে রাখা।"

লিপি তখন নিজের পাউরুটিতে জ্যাম মাখছিল। বাবার কথা শুনে একটু চোখ গোল গোল করে বলল, "আব্বু! তুমি কিন্তু আমাকে বানিয়ে বানিয়ে বলছ। আমি তো পড়ালেখা ঠিকভাবেই করি!"

সানান পাশে বসে এক চুমুক কফিতে মুখ ভিজিয়ে হালকা হাসল। সেই হাসিতে একধরণের প্রচ্ছন্ন মজা ছিল, যা লিপির চোখ এড়ালো না। লিপি মনে মনে ভাবল—"হুঁ, লোকটা তো বেশ গম্ভীর! একটু হেসে ভাব দেখাচ্ছে নাকি?"

সাইফ সাহেব বললেন, "যাই হোক, দুই বন্ধুকে এত বছর পর নিয়তি এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সানান আর লিপি, তোমরা দুজনও একটু পরিচিত হও। এই কদিন আমরা তো আমাদের মতো পুরোনো দিনের গল্পে ব্যস্ত থাকব, তোমরা নিজেদের মতো ঘোরাঘুরি করতে পারো।"

সানান ভদ্রতার খাতিরে বলল, "জি আঙ্কেল, অবশ্যই। লিপির যদি কোনো সাহায্য লাগে, আমি আছি।"

লিপি চোখ ঘুরিয়ে মনে মনে বলল—"সাহায্য? আমি আবার কার সাহায্য নেব!" তবে মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল, "ধন্যবাদ সানান ভাই।"

'সানান ভাই' ডাকটা শুনে সানানের মনের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো। এতদিন ধরে অফিসে বা ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে 'স্যার' বা 'সানান সাহেব' শুনে এসে লিপির এই চঞ্চল কণ্ঠের 'ভাই' ডাকটা একদমই আলাদা শোনালো।

দুপুরের পর বড়রা রিসোর্টের রেস্ট রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সানান তার ল্যাপটপ নিয়ে কটেজের বাইরের কাঠের বারান্দায় বসে ছোট একটা প্রজেক্টের মেইল চেক করছিল। ছুটি কাটাতে এলেও কাজের অভ্যাসটা হুট করে ছাড়তে পারছিল না সে।

এমন সময় লিপি তার কটেজ থেকে বের হয়ে এলো। পরনে তার হালকা নীল রঙের ট্র্যাডিশনাল সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো খোলা। সে রিসোর্টের বড় সুইমিং পুলের চারপাশের বাগান ধরে হাঁটছিল। সানানকে বারান্দায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকতে দেখে সে পা বাড়িয়ে এগিয়ে এলো।

"এমন সুন্দর একটা জায়গায় এসেও কেউ ল্যাপটপ খুলে কাজ করে?" লিপির কণ্ঠের চঞ্চলতা সানানের মনোযোগ ভেঙে দিল।

সানান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল। "কাজের কোনো নির্ধারিত স্থান বা সময় থাকে না লিপি। একটা আর্জেন্ট মেইল আসছিল, তাই পাঠাচ্ছি।"

লিপি বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। "আপনার জীবনটা কি এতই বোরিং সানান ভাই? চারপাশের এই পাহাড়, চা বাগান, ঠাণ্ডা বাতাস—এসব রেখে আপনি বাইনারি কোড আর ডেটা ম্যাপ নিয়ে বসে আছেন?"

সানান একটু চমকে গেল। মেয়েটার কথা বলার ধরণ যেমন চঞ্চল, তেমনই স্পষ্ট। সানান ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, "জীবন বোরিং নয়, দায়িত্বশীল। আর উপভোগ করার জন্য তো পুরো সন্ধ্যা আর কালকের দিনটা পড়ে আছে।"

"উপভোগ করতে জানতে হয়!" লিপি একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "আচ্ছা, চলুন আপনাকে রিসোর্টের পেছনের লেকটা দেখিয়ে আনি। ওখানে বিকেলে ভীষণ সুন্দর বাতাস বয়।"

সানান প্রথমে একটু দ্বিধায় পড়ল, কিন্তু লিপির চোখের সেই আকুলতা আর আগ্রহ দেখে না বলতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল, "ঠিক আছে, চলুন।"

দুজন একসাথে লেকের ধারের সরু পথ ধরে হাঁটতে লাগল। প্রথম দিকে তাদের মধ্যে এক ধরণের হালকা আড়ষ্টতা ছিল। কিন্তু চঞ্চল স্বভাবের লিপি বেশিক্ষণ চুপ করে থাকার পাত্রী নয়। সে ইউনিভার্সিটির গল্প, তার বন্ধুদের দুষ্টুমি আর নানা মজার ঘটনা একে একে বলতে লাগল। সানান মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সাধারণত সে গম্ভীর থাকলেও লিপির সাবলীল কথাবার্তা আর নিখাদ চপলতা তাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছিল। মাঝেমধ্যে সানানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠছিল।

লিপি হঠাৎ সানানের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি এত অল্প কথা বলেন কেন বলুন তো? নাকি আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছেন?"

সানান একটু হেসে বলল, "আমি প্রয়োজন ছাড়া বেশি কথা বলি না। আর ভয়? তোমাকে কেন ভয় পাব?"

"ভয় না পাওয়ার মতো কিছু নেই, আমি কিন্তু ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলাম! ক্লাসের ছেলেদের পেন্সিল চুরি করে লুকিয়ে রাখতাম," লিপি গর্বের সাথে বলল।

সানান হো হো করে হেসে উঠল। সেই প্রথমবার সানানকে মুক্তমনে হাসতে দেখল লিপি। লিপির মনে হলো, সানান যখন হাসে, তখন তাকে আর আগের মতো গম্ভীর বা শক্ত দেখায় না; বরং ভীষণ মার্জিত আর আপন মনে হয়।

দেখতে দেখতে দুটো দিন কেটে গেল। দুই পরিবারের সম্পর্কটা যেন আগের চেয়েও বেশি গাঢ় হয়ে উঠল। সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব নিজেদের স্মৃতিচারণেই মেতে থাকতেন, আর ওদিকে সানান ও লিপির সম্পর্কটাও ধীরে ধীরে সহজের দিকে মোড় নিল। আড়ষ্টতা কেটে গিয়ে তাদের মধ্যে গড়ে উঠল চমৎকার এক বন্ধুত্বের বন্ধন। সানানও লিপির সাথে কথা বলতে পছন্দ করতে লাগল, আর লিপি সানানের গম্ভীর স্বভাবের সুযোগ নিয়ে নানা রকম ছোটখাটো দুষ্টুমি করা শুরু করল।

একদিন রাতে রিসোর্টের পুরো পরিবেশটা যেন বদলে গেল। হঠাৎ করেই সিলেটের আকাশে কালবোশেখী মেঘের আনাগোনা শুরু হলো। ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল কড়কড় শব্দে। পাহাড়ি অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস মানেই এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর এবং কিছুটা ভীতিজনক পরিবেশ।

রিসোর্টের বিদ্যুৎ চলে গেল ঝড়ের শুরুতেই। জেনারেটর চালু হলেও কটেজগুলোর করিডোর আর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আলো জ্বলছিল, কিন্তু চারপাশটা বেশ অন্ধকার আর ভৌতিক ঠেকছিল।

লিপির কটেজের রুমটা ছিল একদম শেষ প্রান্তে, বাগানের ঘেঁষে। বিশাল এক কাঁচের জানালা ছিল সেই ঘরে, যেখান থেকে বাইরের ঘন জঙ্গল আর বাগান পরিষ্কার দেখা যেত। রাতে লিপির বাবা-মা তাদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছেন। লিপি একা তার ঘরে শুয়ে বই পড়ছিল। চার্জার লাইটের আবছা আলোতে চারপাশটা বেশ রহস্যময় লাগছিল।

অন্যদিকে সানানের ঘরে আলো থাকলেও তার মাথায় হঠাৎ এক দুষ্টুমি চেপে বসল। সবসময় গম্ভীর থাকা সানানের মনে হলো, লিপির চঞ্চলতা আর 'কাউকে ভয় না পাওয়া'র বড়াই পরীক্ষা করা যাক। সানান একজোড়া কালো চাদর জোগাড় করল আর নিজের ফোনের আলোটা বন্ধ করে নিঃশব্দে লিপির কটেজের দিকে পা বাড়াল।

ঝড়ের মাতম বাইরে বেড়ে চলেছে। ঝোড়ো বাতাসে গাছের ডালপালাগুলো কটেজের চালের ওপর আঁচড় কাটছিল। বিদ্যুৎ চমকালে পুরো ঘর এক মুহূর্তের জন্য তীব্র আলোয় ভেসে উঠছিল, আর পরমুহূর্তেই আবার গভীর অন্ধকার।

লিপি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্য দেখতে তার বেশ লাগছিল। কিন্তু একই সাথে ঝোড়ো বাতাসের বিকট শব্দ আর গাছের ছায়াসমূহ তার মনে অজানা এক শঙ্কার জন্ম দিচ্ছিল।

ঠিক তখনই সানান সাপের মতো নিঃশব্দে লিপির ঘরের দরজার লকটা (যা ভুলবশত লিপি খোলা রেখেছিল) ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের কোণে অন্ধকারের সাথে মিশে গিয়ে সানান নিজের গায়ে কালো চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিল।

বিদ্যুৎ চমকে উঠল এক বিকট শব্দে। লিপি জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সানান অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে লিপির একদম পেছনের কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে এসে দাঁড়াল। সানান গলার আওয়াজ একদম ভারী আর গম্ভীর করে লিপির ঠিক ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, "লিপি... পেছনে তাকাও..."

লিপি চমকে উঠল! এক মুহূর্তে তার গায়ের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে কোনোদিন ভাবেনি তার পেছনের ঘরে কেউ থাকতে পারে। চঞ্চল আর সাহসী মেয়েটার বুকের ভেতরটা মুহূর্তে ধক করে উঠল।

লিপি ধীরগতিতে পেছনে ঘুরল। ঠিক সেই সময়ে আকাশে আবার তীব্র বিদ্যুৎ চমকে উঠল!

সেই এক সেকেন্ডের বিদ্যুতের আলোয় লিপি দেখল—একটি সুবিশাল কালো ছায়ামূর্তি তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে! অন্ধকারের মাঝে কেবল দুটি গভীর চোখ জ্বলজ্বল করছে!

"আআআআআ!" লিপির গলা দিয়ে এক তীব্র চিৎকার বের হয়ে এলো। ভয়ে তার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। অতিরিক্ত আতঙ্কে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে লিপি নিজের এক পা পেছনে পিছিয়ে জানালার কাঠের ফ্রেমে গিয়ে ধাক্কা খেল।

সানান বুঝতে পারল লিপি সত্যি সত্যিই অনেক বেশি ভয় পেয়ে গেছে। সে কৌতুকটা থামানোর জন্য হাত বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই লিপি ভয়ে চোখ বন্ধ করে সানানের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সানানকে দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল!

লিপির দুটো হাত সানানের পিঠটা আঁকড়ে ধরল তীব্র আতঙ্কে। লিপির পুরো শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে, আর তার হূৎপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন সানান নিজের বুকের ওপর স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। লিপি সানানের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলতে লাগল, "কে... কে তুমি? প্লিজ আমাকে মেরো না! আব্বু! আব্বু বাঁচাও!"

সানান একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। সে তো কেবল একটু হালকা মজা করতে এসেছিল, কিন্তু লিপিকে এভাবে ভয়ে কাঁপতে দেখে তার নিজের মনটা অনুশোচনায় ভরে উঠল। সানান চাদরটা গা থেকে খুলে ফেলে হাত দুটো দিয়ে লিপিকে আলতো করে সামলে ধরল।

"লিপি! লিপি, শান্ত হও! আমি সানান... ভয় পেও না, লিপি!" সানান খুব নরম ও শান্ত গলায় বলল।

সানানের পরিচিত কণ্ঠটা শুনে লিপি ধীরে ধীরে কাঁপুনির গতি কমাল। কিন্তু সানানের বুক থেকে নিজের মুখটা না সরিয়েই চোখ মেলে তাকাল। আলো কম থাকায় সানানের মুখটা দেখার জন্য লিপি একটু মাথা তুলল।

সানান তখন খুব কাছে। সানানের হাত দুটি শক্ত করে লিপির পিঠে ধরা, যাতে সে পড়ে না যায়। দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস তখন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। লিপির ভেজা, চঞ্চল চোখ দুটিতে তখনো ভীতির ছাপ, কিন্তু সানানের এত কাছাকাছি আসার পর এক অজানা আড়ষ্টতা আর শিহরণ তাদের দুজনকে ঘিরে ধরল।

কয়েক সেকেন্ড পুরো ঘরটা যেন একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু বাইরে বৃষ্টির টাপুরটুপুর শব্দ আর তাদের দুজনের হৃদস্পন্দন ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।

লিপি বুঝতে পারল সে সানানকে কতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। সচেতন হতেই লিপির গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে সানানের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে একপা পিছিয়ে গেল।

"আপনি?!" লিপির কণ্ঠে ভয়ের জায়গাটা মুহূর্তে একরাশি রাগে পরিণত হলো। "আপনি আমাকে এভাবে ভয় দেখালেন? সানান ভাই, আপনি এত খারাপ?!"

সানান অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলল, "আই অ্যাম রিয়েলি সরি, লিপি। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি তুমি এতটা ভয় পেয়ে যাবে। আমি ভেবেছিলাম তুমি একটু চমকে যাবে মাত্র..."

"আপনি ভেবেছিলেন?!" লিপির চোখ দিয়ে রাগে জল চলে এলো। সে হাত দিয়ে নিজের জল মুছে বলল, "আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত প্রায়! আর আপনি মজা করছিলেন? আপনি কত দায়িত্বশীল মানুষ বলে ভাব নেন, আর এখন ছোটদের মতো এরকম বাজে দুষ্টুমি করছেন?"

সানান লজ্জিত হয়ে বলল, "লিপি, সত্যি বলছি আমি অনুতপ্ত। প্লিজ রাগ কোরো না।"

"যান আমার ঘর থেকে! এখনই বের হন!" লিপি রাগে সানানের দিকে হাত উঁচিয়ে কটেজের দরজার দিকে ইশারা করল। "আপনার সাথে আমি আর কোনো কথা বলব না!"

সানান আর কোনো কথা বাড়াল না। লিপির রাগ হওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক তা সে বুঝতে পেরেছিল। সে নতমুখে বলল, "শুভরাত্রি, লিপি। সরি এগেইন।"

সানান ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই লিপি ধপ করে গিয়ে বিছানায় বসল। তার বুকের ভেতরটা তখনো ঢিপঢিপ করছে। তবে এবার শুধু ভয়ের কারণে নয়... সানানের সেই শক্ত কায়ায় জড়িয়ে থাকার অনুভূতি আর সানানের অনুতপ্ত চোখের চাহনি লিপির মনের গভীরে এক অচেনা আলোড়ন সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে, যা লিপি নিজে বুঝতে পারলেও মানতে পারছিল না।

রিসোর্টের সেই রাতের ঘটনার পর থেকে লিপির আচরণে বেশ খানিকটা পরিবর্তন এলো। পরদিন সকালে প্রাতঃরাশের টেবিলে লিপি যখন নামল, সানান তার দিকে তাকাতেই সে চট করে চোখ সরিয়ে নিল। সানান তাকে সাধারণ ভঙ্গিতে "শুভ সকাল" জানালেও লিপি খুব ঠান্ডা গলায় কেবল মাথা নেড়ে জবাব দিল। সবসময় যে মেয়েটা চঞ্চলতায় পুরো পরিবেশ মাতিয়ে রাখত, সে হঠাৎ করেই যেন কেমন এক গম্ভীর খোলসে ঢুকে পড়ল।

সানান মনে মনে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে বুঝেছিল কাল রাতের ভূতের ভয় দেখানোর দুষ্টুমিটা অতিরিক্ত হয়ে গেছে। লিপির মতো চঞ্চল একটা মেয়ে এভাবে রাগ করে চুপ হয়ে থাকবে, তা সানানের সহ্য হচ্ছিল না।

দুপুরের দিকে সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব রিসোর্টের লাইব্রেরিতে দাবা খেলায় মগ্ন ছিলেন। সুযোগ বুঝে সানান বাগানের দোলনায় বসে থাকা লিপির কাছে এগিয়ে গেল। লিপির হাতে একটা বই ছিল, কিন্তু তার ধ্যান-জ্ঞান যে বইয়ের পাতায় নেই, তা সানান দেখেই বুঝতে পারল।

"এখনো রাগ কমেনি?" সানান আলতো গলায় পাশে এসে দাঁড়াল।

লিপি বইয়ের পাতা উল্টে না তাকিয়ে বলল, "রাগ করার মতো কোনো সম্পর্ক কি আমাদের আছে? আপনি আপনার কাজ করুন সানান ভাই, আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।"

সানান লিপির পাশের দোলনায় বসে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "লিপি, আমি সত্যি মন থেকে দুঃখিত। কাল রাতে আমি কেবল তোমার সাথে একটু হালকা হতে চেয়েছিলাম। সবসময় তো কাজের মাঝে থাকি, তোমার চঞ্চলতা দেখে আমারও ইচ্ছে হয়েছিল একটু খুনসুটি করি। কিন্তু সেটা যে তোমাকে এতটা কষ্ট দেবে, আমি বুঝতে পারিনি।"

সানানের গলার সেই নিখাদ অনুশোচনা আর সরলতা লিপির শক্ত বরফ গলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। লিপি বইটা বন্ধ করে সানানের দিকে তাকাল। সানানের চোখে কোনো ছলচনা ছিল না, কেবল ছিল এক গভীর অনুতাপ।

লিপি মুখ বাঁকিয়ে বলল, "আপনি জানেন কাল আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম? আমার তো মনে হচ্ছিল আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে!"

"জানি, আর তাই আমি নিজের ওপরই রাগ করছি," সানান লিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল। "আচ্ছা, এই ভুল শুধরাতে আমি তোমাকে শ্রীমঙ্গলের সেরা চা বাগানে নিয়ে যেতে চাই আর সাথে স্পেশাল সাত রঙের চা খাওয়াব। রাগ ভাঙবে তাহলে?"

লিপি সানানের গম্ভীর মুখের মিষ্টি হাসিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। আসলে লিপির রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, বিশেষ করে সানানের মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ যখন এভাবে নরম হয়ে ক্ষমা চায়।

"ঠিক আছে! কিন্তু শর্ত একটাই—চা আর নাস্তার বিল পুরোটাই আপনার!" লিপি চোখ ছোট ছোট করে বলল।

সানান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হেসে ফেলল। "কবুল! তোমার সব শর্ত মঞ্জুর।"

সেই বিকেলে দুজনে মিলে রিসোর্টের বাইরের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে ঘুরে বেড়াল। সবুজ চায়ের পাতার চাদরে ঢাকা পাহাড়গুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাদের মান-অভিমানের মেঘ কেটে গেল। আবার ফিরে এলো সেই আড্ডা, চঞ্চলতা আর মিষ্টি দুষ্টুমি। তবে এই আড্ডার মাঝে এবার যোগ হয়েছিল এক সূক্ষ্ম আকর্ষণ। সানান খেয়াল করল সে লিপির প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, আর লিপিও খেয়াল করল সানানের গম্ভীর ব্যক্তিত্বের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত কেয়ারিং মানুষটিকে।

দেখতে দেখতে ছুটি শেষ হয়ে এলো। সিলেটের সুন্দর দিনগুলো পেছনে ফেলে দুই পরিবার আবার ঢাকায় ফিরে এলো। তবে এবার তারা আর বিচ্ছিন্ন ছিল না। সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব সপ্তাহে অন্তত দু-তিন দিন একে অপরের বাসায় যাতায়াত শুরু করলেন। দুই পরিবারের মধ্যে যাতায়াত বাড়ায় সানান আর লিপির দেখাসাক্ষাৎ ও ফোনে কথা বলাটাও একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হলো।

মাস ছয়েক পরের কথা।

একদিন সন্ধ্যায় সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব ড্রয়িংরুমে চা খাচ্ছিলেন। সাইফ সাহেব হঠাৎ চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে গম্ভীর গলায় বললেন, "রফিক, তোকে একটা কথা বলব ভেবেছি। অনেকদিন ধরে মনে মনে পরিকল্পনা করছি।"

রফিক সাহেব হাসলেন। "বল না, তুই আবার কী ভাবছিস?"

"তুই আর আমি তো ছোটবেলার বন্ধনটাকে আবার ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আমি চাই এই বন্ধনটা যেন আমাদের মৃত্যুর পরও থেকে যায়। আমি চাই আমার সানানের সাথে তোর লিপির বিয়ে দিতে। তুই কী বলিস?" সাইফ সাহেবের গলায় ছিল আকুলতা।

রফিক সাহেব মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন, তারপর ওঁর মুখে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল। "সাইফ, তুই বিশ্বাস করবি না, আমি নিজে মনে মনে এই স্বপ্নটাই দেখছিলাম! সানানের মতো ছেলে আজকালকার দিনে সত্যি বিরল। মার্জিত, দায়িত্বশীল আর রুচিশীল। লিপিকে ওর হাতে তুলে দিতে পারলে আমার চেয়ে সুখী বাবা আর কেউ হবে না।"

দুই বন্ধুর আনন্দের সীমা রইল না। তারা তখনই বিষয় নিয়ে সানান আর লিপির সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সানানের জন্য প্রস্তাবটা ছিল একদম অপ্রত্যাশিত। বাবা যখন ঘরে এসে সানানকে লিপির সাথে বিয়ের কথা বললেন, সানান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সানানের জীবনে কাজের বাইরে অন্য কোনো মেয়ের উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু লিপি? সেই চঞ্চল, মিষ্টি মেয়েটা যে হঠাৎ করেই তার একঘেয়ে জীবনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে এসেছে! সানানের মনের গহীনে লিপিকে নিয়ে এক অদ্ভুত ভালোবাসার জন্ম ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছিল, যদিও সে কখনো মুখে তা প্রকাশ করেনি। সানান মাথা নিচু করে বাবার প্রস্তাবে সম্মতি জানাল।

অন্যদিকে লিপির মা-বাবা যখন লিপিকে এই খবর দিলেন, লিপি প্রথমে একটু লজ্জা পেল। সানান ভাই? যিনি এত গম্ভীর, আবার হঠাৎ ভূতের ভয় দেখিয়ে অনুতপ্ত হন? কিন্তু লিপির ভেতরের মনটা জানত, সানানের ওপর ভরসা করা যায় পুরোপুরি। সানানের সেই শান্ত চোখ আর আগলে রাখার ভঙ্গি লিপিকে এক অজানা ভালোলাগায় ভরিয়ে দিত। লিপিও নীরব সম্মতি দিল।

অত্যন্ত জমকালো এবং সুন্দর আয়োজনের মধ্য দিয়ে সানান ও লিপির বিয়ে সম্পন্ন হলো। দুই পরিবারের আনন্দের কোনো সীমা ছিল না। দুই পুরোনো বন্ধুর এত বছর পর পুনর্মিলন যে এভাবে একটি নতুন পারিবারিক বন্ধনে রূপ নেবে, তা যেন কোনো এক সুন্দর গল্পের মতো লাগছিল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। লাল বেনারসি, সোনার গয়না আর চন্দনের ফোঁটায় লিপিকে সেদিন অপূর্ব সুন্দরী লাগছিল। নতুন কনে হয়ে লিপি সানানদের বাসায় এলো।

বিয়ের প্রথম রাতে সানান যখন ঘরের দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকল, লিপি তখন বিছানার একপাশে হাত ধরে বসে ছিল। তার চঞ্চল স্বভাবটা কেমন যেন অনুভূতির ভারে কিছুটা থমকে গেছে।

সানান ঘরের আলোটা কিছুটা কমিয়ে দিয়ে লিপির সামনে এসে দাঁড়াল। লিপির গায়ের ভারী গয়না আর ওড়নার সাজ দেখে সানান বুঝতে পারল লিপি কতটা ক্লান্ত।

সানান লিপির পাশে ধীরগতিতে বসল। সানানের উপস্থিতি টের পেয়ে লিপি বুক চেপে এক নজর সানানের দিকে তাকাল।

সানান খুব নরম আর কোমল গলায় বলল, "লিপি..."

"জি?" লিপির কণ্ঠস্বর ছিল একদম নিচু।

সানান লিপির সাজানো মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "তুমি খুব ক্লান্ত, তাই না? পুরোটা দিন ধরে এত নিয়মকানুন আর মানুষের আনাগোনা গেছে... তোমার নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে?"

লিপি একটু অবাক হলো। বিয়ের প্রথম রাতে সানান তাকে এসব কথা বলছে? লিপি সত্যি বলতে খুব নার্ভাস ছিল, কিন্তু সানানের এই কথায় তার মনের সব আড়ষ্টতা মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল।

সানান লিপির মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল, "শোনো লিপি, আমাদের বিয়েটা হুট করেই হয়েছে। যদিও আমরা একে অপরকে চিনি, কিন্তু বিয়ের সম্পর্কটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব। আমি চাই না তুমি কোনো চাপ অনুভব করো। আজ থেকে এই ঘরটা যতটা আমার, ততটাই তোমার। তুমি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, ঠিক সেভাবেই থাকবে।"

লিপি সানানের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কেবলই সম্মান, শ্রদ্ধা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা।

লিপি হালকা হেসে বলল, "ধন্যবাদ সানান ভাই... আই মিন, সানান।"

সানান হেসে বলল, "তোমার গয়না আর ভারী কাপড়গুলো বদলে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি বারান্দায় আছি।"

সানান বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাতের আকাশে তারা জ্বলজ্বল করছে। সানান জানত, লিপিকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার জন্য তাকে সময় দিতে হবে। হুট করে জোর করে কোনো সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে ভালোবাসার ফুলকে ধীরে ধীরে ফুটতে দেওয়াই শ্রেয়।

সেই রাতটা এক অদ্ভুত শুভ্রতা আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে পার হলো। কোনো তাড়াহুড়ো নয়, কোনো অধিকারের আস্ফালন নয়—কেবল দুজন মানুষের মধ্যে এক গভীর মানসিক শ্রদ্ধার সূচনা হলো।

বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন যেন দেখতে দেখতে কেটে গেল। সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব নিজেদের দুই সন্তানের এই নতুন জীবন নিয়ে বেশ উল্লাস করছিলেন। তবে জীবনের বাস্তবতা তো আর এক জায়গায় থেমে থাকে না। বিয়ের ছুটির আমেজ শেষ হতেই সানান ও লিপির জীবনে ফিরে এলো প্রতিদিনের ব্যস্ততা ও কাজের চাপ।

সানানের প্রজেক্টের কাজ এক ধাক্কায় যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। নতুন একটি বহুতল ভবনের ডিজাইন এবং কনস্ট্রাকশনের দায়িত্ব একাই সানানের কাঁধে এসে পড়ল। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে অফিসে যাওয়া, সাইট পরিদর্শন করা, ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং আর রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরা—এটাই হয়ে উঠল সানানের দৈনন্দিন রুটিন।

অন্যদিকে লিপির জীবনও থেমে ছিল না। তার ইউনিভার্সিটির সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা একদম দরজায় কড়া নাড়ছিল। লিপিকে দিনরাত পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট আর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের পেছনে সময় দিতে হচ্ছিল।

বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই দুই নবদম্পতির জীবনযাত্রায় এক অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হলো। তারা দুজন একই ছাদের নিচে থাকে, একই ঘরে ঘুমায়, কিন্তু দুজনের মধ্যে যেন এক অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠল।

সকালে সানান যখন ঘুম থেকে উঠে বের হওয়ার জন্য তৈরি হয়, লিপি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। আবার রাতে লিপি যখন পড়ার টেবিল গুটিয়ে শুতে যায়, সানান তখন ল্যাপটপ খুলে ড্রয়িংরুমে বা পড়ার ঘরে কাজের ফাইলের মধ্যে ডুবে থাকে।

সানান রাত ১২টা বা ১টার দিকে ঘরে ফিরে দেখত লিপি বিছানায় একপাশে ঘুমিয়ে আছে। সানান খুব নিঃশব্দে পাশে শুয়ে পড়ত, যাতে লিপির ঘুমে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। সকালে লিপি ওঠার আগেই আবার সানানের বের হওয়ার সময় হয়ে যেত।

একদিন রাতে সানান কাজ শেষ করে রাত দেড়টায় রুমে ঢুকল। লিপি তখনো লাইট জ্বালিয়ে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল, সামনে তার পরীক্ষার বই খোলা।

সানান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে লিপির মাথার চুলে হাত বুলাল। মেয়েটার চোখের নিচে কালচে ছাপ পড়েছে পড়াশোনার চাপে। সানান খুব সাবধানে লিপিকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। লিপির বইগুলো গুছিয়ে টেবিলে রাখল।

লিপি ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠে সানানের হাতটা ধরে ফিসফিস করে বলল, "সানান... চলে এলে?"

সানান লিপির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, "হ্যাঁ লিপি, আমি এসে গেছি। তুমি ঘুমাও, অনেক রাত হয়েছে।"

"তোমার কি রাতের খাবার খাওয়া হয়েছে?" লিপি চোখ না মেলেই ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

"হ্যাঁ, সাইটে খেয়ে নিয়েছিলাম। তুমি চিন্তা কোরো না, ঘুমাও," সানান নরম গলায় বলল।

পরদিন সকালে লিপি ঘুম থেকে উঠে দেখল সানান ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। সানান তার টাইটা ঠিক করতে করতে বলল, "লিপি, আজ সাইটে আমার একটা ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে। ফিরতে রাত হতে পারে। তুমি সময়মতো খেয়ে নিও।"

লিপি বিছানায় বসে সানানের দিকে তাকাল। সানানের মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ, কিন্তু তবুও সে কাজের কথা ভেবেই চলেছে।

লিপি একটু হালকা অভিমানের সুরে বলল, "তুমি কি এই পুরো সপ্তাহেই রাতে দেরি করে ফিরবে? আমরা তো একসাথে বসে দুটো কথা বলার সময়ও পাচ্ছি না।"

সানান একটু থেমে লিপির দিকে তাকাল। সে এগিয়ে এসে লিপির পাশাপাশি বসল। "লিপি, আমি বুঝতে পারছি তোমার খারাপ লাগছে। কিন্তু বিল্ডার্সদের সাথে এই চুক্তিটা আমার কোম্পানির জন্য ভীষণ জরুরি। কিছুদিন কষ্ট করো, প্রজেক্টটা একটু গুছিয়ে নিই, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।"

লিপি একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আমি বুঝি সানান। কিন্তু আমরা বিয়ে করেছি কয়েকমাস হলো, অথচ আমাদের দেখে মনে হয় দুজন রুমমেট একসাথে এক ঘরে থাকছি! কেউ কারো খবর রাখার সময় পাই না।"

সানান লিপির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। "আমি সত্যি দুঃখিত লিপি। তোমাকে আমি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছি না। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি চেষ্টা করি।"

কথাগুলো বললেও কাজের টান সানানকে আটকে রাখত। তারা দুজন ভালোবাসত একে অপরকে, কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে সেই উষ্ণতা, কাছাকাছি আসা বা রোমান্সের জায়গাটা যেন কাজের ভিড়ে একদম হারিয়ে যাচ্ছিল। লিপি ভাবত, সানান হয়তো কেবল বন্ধু হিসেবেই তাকে দেখে, স্বামী হিসেবে সম্পর্কের গভীরতায় যেতে সানানের কোনো আগ্রহ নেই। আর সানান ভাবত, লিপির পড়াশোনার ক্ষতি না করে তাকে নিজের মতো থাকতে দেওয়াটাই এখন তার দায়িত্ব।

এইভাবেই কাটতে লাগল মাসগুলো। তাদের সম্পর্কটা ছিল ভীষণ মার্জিত, শ্রদ্ধাপূর্ণ কিন্তু দূরত্বে ভরা। সেখানে ছিল না কোনো শারীরিক কন্টাক্ট, ছিল না কোনো গভীর ভালোবাসার প্রকাশ। যেন দুজন খুব ভালো বন্ধু একই বাসায় বাস করছে, কিন্তু দুজনের পথ আলাদা।

একদিন বিকেলে সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব সানানদের বাসায় এলেন। দুই বাবা লিভিংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন। লিপি ট্রেতে করে তাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এলো।

সাইফ সাহেব লিপির দিকে তাকিয়ে বললেন, "মা লিপি, তোদের দুজনকেই তো ইদানীং খুব ক্লান্ত দেখায়। সানান দিনরাত কাজ নিয়ে ব্যস্ত, আর তুইও নাকি পড়ালেখা নিয়ে ঘরবন্দি হয়ে থাকিস?"

লিপি একটু কৃত্রিম হেসে বলল, "না আঙ্কেল... আই মিন, আব্বু, ওরকম কিছু না। পরীক্ষা ছিল তো, তাই।"

রফিক সাহেব লিপির মুখের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর সত্যি উপলব্ধি করলেন। বাবা তো, মেয়ের মনের খবর চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারেন।

রফিক সাহেব চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে সাইফ সাহেবকে বললেন, "সাইফ, দেখছিস তো? এই তরুণ বয়সেও এরা নিজেদের কেবল কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। জীবনের আসল আনন্দটাই তো উপভোগ করছে না।"

সাইফ সাহেব মাথা নাড়লেন। "একদম ঠিক বলেছিস। সানানকে আমি কত বলি একটু কম কাজ করতে, কিন্তু ছেলেটা একদম আমার মতো একগুঁয়ে হয়েছে।"

ঠিক তখনই সানান ঘর ঢুকলো। কোটটা খুলে সোফায় রাখতে রাখতে বলল, "কার কথা হচ্ছে আব্বু?"

সাইফ সাহেব সানানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হওয়ার নাটক করে বললেন, "তোর কথাই হচ্ছে! তুই আর লিপি শেষ কবে কোথাও ঘুরতে গেছিস বল তো? বিয়ের পর থেকে তোদের কোনো ছুটি নেই, ঘুরতে যাওয়া নেই। এভাবে সংসার চলে?"

সানান একটু লজ্জিত হয়ে বলল, "আব্বু, কাজের চাপটা একটু বেশি ছিল তো..."

রফিক সাহেব হেসে উঠে বললেন, "কোনো অজুহাত শুনব না! তোদের দুজনেরই এখন একটা বিরতি দরকার। আর তাই আমরা দুই বাবা মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"

লিপি আর সানান একে অপরের দিকে তাকাল। সানান বলল, "কী সিদ্ধান্ত আঙ্কেল?"

সাইফ সাহেব ড্রয়িংরুমের টেবিলের ওপর দুটো এয়ারলাইন্সের আর রিসোর্টের কনফার্মেশন পেপার রাখলেন।

"আগামী পরশু তোরা দুজন আবার শ্রীমঙ্গলের সেই 'গ্রীন ভ্যালি রিসোর্ট'-এ যাচ্ছিস! পুরো এক সপ্তাহের জন্য। কোনো কাজ নয়, কোনো ল্যাপটপ নয়, কোনো বই নয়। কেবল তোরা দুজন," সাইফ সাহেব হাসিমুখে বললেন।

লিপি চমকে উঠে বলল, "সেই রিসোর্টে? যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল?"

"হ্যাঁ মা," রফিক সাহেব বললেন। "তোদের সম্পর্কের শুরুটা যেখানে হয়েছিল, সেখানে গিয়ে তোরা আবার নতুন করে নিজেদের সময় দে। আমরা সব বুকিং করে ফেলেছি, তোদের খালি ব্যাগ গুছিয়ে নেওয়া বাকি।"

সানান কাগজগুলোর দিকে তাকাল। শ্রীমঙ্গলের সেই রিসোর্ট, সেই পাহাড়, সেই কালবোশেখী ঝড়ের রাত আর লিপির সেই চঞ্চল মুখটা মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

সানান লিপির দিকে তাকাল। লিপিও সানানের দিকে তাকাচ্ছিল। দুজনের চোখের দৃষ্টিতেই এক অদ্ভুত কৌতূহল আর দ্বিধা।

সকালের কুয়াশাচ্ছন্ন পথ ধরে সানানের গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে শ্রীমঙ্গলের দিকে। গাড়ির পেছনের সিটে দুটো ট্রলি ব্যাগ। সানান ড্রাইভিং সিটে বসে মন দিয়ে ড্রাইভ করছে, আর পাশের সিটে চুপচাপ বসে আছে লিপি। জানালার কাঁচ নামানো, বাইরে ঠান্ডা মিষ্টি বাতাস লিপির চুলের গোছা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ কয়েক মাস পর তারা দুজন শহরের সেই ইট-কাঠের খাঁচা আর কাজের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, গাড়ির ভেতরের নীরবতাটা ছিল বেশ ভারী। সানান কয়েকবার চেষ্টা করল কথা শুরু করার, কিন্তু স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে কেবল দু-একবার লিপির দিকে তাকানো ছাড়া বেশি কিছু বলতে পারল না। লিপিও জানালার বাইরের সবুজ চা বাগানগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

দুপুরের পর গাড়ি এসে পৌঁছাল 'গ্রীন ভ্যালি রিসোর্ট'-এ। সেই একই রিসোর্ট! প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সানান আর লিপির মনের ভেতর স্মৃতিগুলো একসাথে জট পাকাতে লাগল। রিসোর্টের গাছপালা, সেই সবুজ বাগান, হাঁটার পথ—সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে। কেবল বদলে গেছে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের পরিচয়। এক বছর আগে তারা এখানে এসেছিল কেবল দুজন অপরিচিত পর্যটক হিসেবে, আর আজ তারা বিবাহিত দম্পতি।

রিসোর্টের ম্যানেজার সানানকে দেখে চিনে ফেলল। হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, "সানান সাহেব! কতদিন পর এলেন! রফিক সাহেব আর সাইফ সাহেব আগেই ফোন করে সব ব্যবস্থা করে রাখতে বলেছিলেন। আপনাদের জন্য স্পেশাল কটেজ রেডি।"

ম্যানেজার সানানদের নিয়ে গেল রিসোর্টের একদম পেছনের দিকের কটেজটিতে। কাকতালীয়ভাবে, এটি ছিল সেই একই কটেজ, যেখানে এক বছর আগে ঝড়ের রাতে সানান লিপিকে ভূতের ভয় দেখিয়েছিল!

রুমে ঢুকেই লিপি চারপাশটা একপলক দেখে নিল। ঘরের কাঠের আসবাবপত্র, সেই বিশাল কাঁচের জানালা, যার বাইরে ঘন জঙ্গল আর বাগান দেখা যায়—সবকিছু একদম হুবহু এক।

সানান বেলকনির দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, "জায়গাটা একদম বদলায়নি, তাই না লিপি?"

লিপি ব্যাগ থেকে নিজের কিছু জামাকাপড় বের করতে করতে বলল, "জায়গা বদলায়নি সানান, কিন্তু মানুষ আর সময় তো অনেক বদলে যায়।"

লিপির কথার মধ্যকার অর্থ সানানের বুঝতে বাকি রইল না। সে বুঝতে পারল লিপি তাদের সম্পর্কের এই দূরত্ব আর নিষ্প্রাণতা নিয়ে কতটা অভিমান বুকে চেপে রেখেছে। সানান ধীরপায়ে লিপির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

"লিপি... আমি জানি ঢাকাতে আমি তোমাকে একদম সময় দিতে পারিনি। আমাদের মাঝে কেমন যেন একটা দেওয়াল উঠে গিয়েছিল। কিন্তু বিলিভ মি, এই এক সপ্তাহে আমি সেই দেওয়ালটা একদম ভেঙে ফেলতে চাই," সানান খুব নরম আর আকুল কণ্ঠে বলল।

লিপি সানানের চোখের দিকে তাকাল। সানানের চোখে কোনো মিথ্যা বা ছলাকলা নেই, কেবল আছে এক গভীর অনুশোচনা আর ভালোবাসার বার্তা।

লিপি হালকা হেসে বলল, "দেওয়াল ভাঙা এত সহজ নয় সানান। দেখা যাক আপনি কতটা পারেন।"

বিকেলের দিকে সূর্য যখন পাহাড়ের আড়ালে ঢলে পড়তে শুরু করল, তখন তারা দুজনে বের হলো রিসোর্টের ভেতরের লেকের পাড়ে ঘুরতে। ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাস বইছিল। লিপি একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিল।

সানান লিপির পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বলে উঠল, "মনে আছে? প্রথমবার যখন এখানে এসেছিলাম, তুমি আমাকে বলেছিলে আমার জীবনটা নাকি ভীষণ বোরিং?"

লিপি হালকা হেসে বলল, "মিথ্যা তো বলিনি! আপনি তো এখনো তেমনই আছেন। ল্যাপটপ আর সাইট ছাড়া আপনার দুনিয়ায় আর কিছু আছে নাকি?"

"আজ কিন্তু আমার সাথে কোনো ল্যাপটপ নেই," সানান নিজের পকেটে হাত দিয়ে হেসে বলল। "আজ আমি পুরোপুরি ফ্রি। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে, যা বলবে, আমি তা-ই করব।"

লিপি সানানের দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকাল। "তাই? সত্যি তো? তাহলে চলুন, ওই লেকের কাঠের সাঁকোটার শেষ মাথায় গিয়ে বসি।"

সাঁকোর ওপর দুজনে গিয়ে বসল। নিচে শান্ত জল, আর চারপাশে ঘন গাছে ঢাকা পাহাড়। তারা অনেকদিন পর এভাবে খোলামেলা আড্ডা দিল। লিপি তার ইউনিভার্সিটির গল্প বলল, আর সানানও সাইটের নানা মজার ঘটনা শেয়ার করল। দীর্ঘদিন পর সানানের গম্ভীর মুখের সেই মুক্ত হাসিটুকুর দেখা পেয়ে লিপির মনটাও ভেতরে ভেতরে শান্ত হয়ে এলো।

সানান হঠাৎ লিপির হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। লিপির শরীরটা সামান্য শিউরে উঠল। দীর্ঘদিনের দূরত্বের পর এই স্পর্শটা তাদের দুজনের মনেই এক নতুন রোমাঞ্চের দোলা দিল।

সানান ফিসফিস করে বলল, "লিপি... আমরা কি পারি না আমাদের সম্পর্কের মধ্যে সেই পুরানো খুনসুটি আর সতেজতা ফিরিয়ে আনতে? আমরা বিবাহিত হতে পারি, কিন্তু আমি চাই আমরা সারা জীবন সেই প্রথম দিনের বন্ধুদের মতো থাকি।"

লিপি সানানের হাতের দিকে তাকাল, তারপর সানানের চোখের দিকে। লিপির হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হতে লাগল। "বন্ধুত্ব তো এমনিতেই আছে সানান... কিন্তু সম্পর্কের অন্য নামটাও তো সত্যি।"

সানান মৃদু হেসে লিপির হাতটা একটু শক্ত করে ধরে বলল, "আমি জানি। আর তাই এই সফরটা কেবল ছুটির সফর নয়, আমাদের নতুন করে কাছে আসার সফর।"

সন্ধ্যা নেমে আসতেই তারা কটেজে ফিরে এলো। রিসোর্টের রেস্তোরাঁ থেকে রাতের খাবার ঘরের বারান্দায় আনিয়ে দুজনে একসাথে রাতের খাবার খেল। পুরো আবহাওয়াটাই যেন এক অদ্ভুত রোমান্টিক রূপ ধারণ করেছিল।

খাবার শেষে সানান কফি হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিল। লিপি ঘরে নিজের পোশাক বদলে হালকা সুতির একটা সালোয়ার পরে বের হলো।

সানান ভেতরে এসে লিপির দিকে তাকাল। আলো-আঁধারির মাঝে লিপিকে যেন অন্যরকম এক মায়াবী রূপবতী লাগছিল।

সানান কফির কাপটা টেবিলে রেখে লিপির দিকে একপা এগিয়ে এলো। সানানের ভেতরের সেই কৌতুকপ্রিয় সানানটা যেন অনেকদিন পর আবার জেগে উঠল।

সানান একটু মুখে রহস্যময় হাসি এনে বলল, "লিপি, আজকের রাতটা কিন্তু বেশ ভৌতিক লাগছে, তাই না? একদম সেই এক বছর আগের রাতটার মতো!"

লিপি বুঝতে পারল সানান আবার সেই পুরানো স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। লিপি এক হাত কোমরে দিয়ে গর্বের সাথে বলল, "হুঁ! আপনি ভেবেছেন আমি আগের মতোই ভয় পাব? একদম না! এবার কিন্তু আপনার সেই ভূতের ভয় দেখানোর চাল আর খাটবে না। আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি, আর আপনাকেও ভালো করে চিনে ফেলেছি!"

সানান ভুরু নাচিয়ে বলল, "তাই নাকি? সত্যিই ভয় পাবে না?"

"একদমই না!" লিপি বেশ সাহসের সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল।

কিন্তু নিয়তি আর প্রকৃতি যেন আবার এক নতুন নাটকের রূপরেখা তৈরি করছিল।

বাইরে ঝোড়ো বাতাসের দাপট ক্রমশ বাড়ছিল। জানালার কাঁচগুলোতে বাতাসের ধাক্কায় এক অদ্ভুত শব্দের সৃষ্টি হচ্ছিল। রিসোর্টের বাগানের বিশাল বিশাল গাছগুলো তীব্র বাতাসে হেলেদুলে উঠছিল। সানান জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঘন অন্ধকার, কেবল মাঝেমধ্যে মেঘের আড়ালে আলো জ্বলে উঠছে।

লিপি খাটের ওপর বসে সানানের দিকে তাকিয়ে একটু মেকি গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, "কী হলো সানান সাহেব? ভয় পেলেন নাকি? বাতাস দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার ভূতের নাটক এবার বাতাসের ধাক্কাতেই উড়ে যাবে!"

সানান পেছনে ঘুরে লিপির দিকে তাকাল। লিপির মুখে সেই চেনা চঞ্চল হাসি। সানান মনে মনে ভাবল, লিপি সত্যিই আগের চেয়ে অনেক সতেজ আর সাহসী হয়েছে। কিন্তু সানানের ভেতরের সেই কৌতুকপ্রিয় মনটা এত সহজে হার মানতে রাজি ছিল না।

সানান ঘরের লাইটের সুইচটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "তুমি সত্যিই ভয় পাচ্ছ না তো লিপি?"

"বিন্দুমাত্র না!" লিপি হাত দিয়ে না সূচক ইশারা করল।

সানান মুচকি হেসে ঘরের মেইন লাইটের সুইচটা বন্ধ করে দিল। মুহূর্তে পুরো ঘর গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল। কেবল বারান্দার আবছা আলো আর জানালার বাইরে মেঘের ঘনঘটা ঘরের ভেতর এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করল।

ঠিক সেই মুহূর্তে, পুরো রিসোর্টের বিদ্যুৎ চলে গেল। কটেজের ব্যাকআপ জেনারেটর চালু হতে কিছুটা সময় নিচ্ছিল। সানান সাপের মতো নিঃশব্দে অন্ধকারে পা ফেলে লিপির বিছানার দিকে এগোতে লাগল।

লিপি অন্ধকার হতেই একটু সচেতন হয়ে বসেছিল। সে সানানকে দেখার জন্য অন্ধকারে চোখ সইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সানানের কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছিল না।

"সানান? কোথায় আপনি? আবার সেই ফালতু লাইট বন্ধ করার খেলা শুরু করেছেন?" লিপি গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল।

কোনো উত্তর এলো না। পুরো ঘর নিস্তব্ধ। বাইরে কেবল বাতাসের গর্জন।

লিপি খাটের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াতে গেল। সে পা বাড়াতেই হঠাৎ অনুভব করল অন্ধকার ঘরের বাতাসটা যেন ভারী হয়ে এসেছে। সানান একদম নিঃশব্দে লিপির ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সানান ঝুঁকে লিপির ঠিক কানের কাছে গিয়ে খুব নিচু, ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল, "সাহসী মেয়েদেরই কিন্তু ভূতেরা বেশি পছন্দ করে, লিপি..."

লিপি চমকে উঠলেও এবার চিৎকার করল না। সে পেছনে ঘুরে অন্ধকারের মধ্যেই সানানের বুকের ওপর দু-হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে গেল। "আমি জানি এটা আপনি! আপনার এই ট্রিক আর কাজ করবে না সানান!"

সানান লিপির দুটো হাত আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে ফেলল। লিপির একদম কাছাকাছি এসে সানান হালকা হেসে বলল, "ধরে ফেলেছ তাহলে? কিন্তু লিপি, আমি তো তোমাকে ভয় দেখাতে আসিনি... আমি তো কেবল তোমার কাছাকাছি আসতে চেয়েছিলাম।"

সানানের কথা শেষ হতে না হতেই প্রকৃতি তার নিজের খেলা শুরু করল।

হঠাৎ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই পুরো শ্রীমঙ্গলের আকাশ চিরে এক বিকট, কানফাটা শব্দে বজ্রপাত হলো!

কড়কড় শব্দে যে আলোটা জ্বলে উঠল, তা যেন পুরো ঘরের অন্ধকার এক সেকেন্ডের জন্য চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। বিদ্যুতের সেই আলো আর বিকট আওয়াজে লিপির সমস্ত সাহস আর অহংকার মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

"আআআআ!"

লিপি তীব্র ভয়ে চোখ বন্ধ করে সানানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সানান সামলাতে না পেরে একধাপ পেছনে পিছিয়ে গেল, কিন্তু লিপিকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

লিপি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সানানের গলায় দু-হাত জড়িয়ে ধরে নিজের পুরো শরীরটা সানানের সাথে মিশিয়ে দিল। লিপির সমস্ত চঞ্চলতা, সমস্ত অভিমান এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের ভীতিতে।

"সানান! শক্ত করে ধরো আমাকে! আমার খুব ভয় করছে!" লিপির কণ্ঠ তখন কান্নায় জড়ানো, তোতলাচ্ছে সে।

সানানের পিঠ কটেজের কাঠের দেয়ালের সাথে গিয়ে ঠেকেছিল। সানান লিপিকে দুই বাহু দিয়ে এমনভাবে আগলে ধরল, যেন পৃথিবীর কোনো ঝড় তাকে স্পর্শ করতে না পারে।

"লিপি... শান্ত হও। কিছু হয়নি, আমি আছি তো," সানান লিপির ভেজা কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।

কিন্তু লিপি সানানকে ছাড়ল না। বরং সানানের শার্টের কাপড়টা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল। লিপির তপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাস সানানের ঘাড়ে ও বুকে এসে লাগছিল।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি নামল। টিনের চালে আর জানালার কাঁচে বৃষ্টির মাতম শুরু হলো। ঘরের ভেতরের পরিবেশটা ততক্ষণে আর কেবল ভয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না।

লিপির নরম শরীরের স্পর্শ, তার গায়ের এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস আর এই চরম ঘনিষ্ঠতা সানানের ভেতরের এতদিন ধরে ঘুমিয়ে থাকা তীব্র অনুভতিগুলোকে জাগিয়ে তুলল। সানানের এতদিনের জমানো ভালোবাসা, আকুলতা আর তৃষ্ণা যেন এক মুহূর্তে বাঁধ ভাঙা নদীর মতো আছড়ে পড়ল।

সানান ধীরগতিতে লিপির পিঠে হাত বুলাতে লাগল। সানানের হাতের উষ্ণ স্পর্শে লিপির থরথর কাঁপুনি ধীরে ধীরে কমে এলো, কিন্তু এক অজানা শিহরণ লিপির পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

লিপি সানানের বুক থেকে ধীরে ধীরে মুখ তুলল। ঘরের অন্ধকারের মধ্যেও বাইরে বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় সানানের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। সেখানে ভয়ের কোনো ছাপ ছিল না, ছিল কেবল অগাধ ভালোবাসা আর গভীর এক টান।

সানানের দৃষ্টি লিপির ঠোঁটের ওপর গিয়ে থামল। লিপির নিঃশ্বাস তখন ভারী হয়ে আসছিল। লিপি সানানের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আজ আর কোনো দূরত্ব নেই, আজ আর কোনো মান-অভিমান নেই।

সানান খুব কোমলভাবে লিপির চিবুকটা নিজের হাতে তুলে নিল। সানানের আঙুলের ছোঁয়া পেয়ে লিপি চোখ দুটো বুজে ফেলল। সানান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝড়ের সেই মাতাল রাতে, টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে সানান তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল লিপির ঠোঁটে।

ঝড়ের রাত শেষে যখন সকালের প্রথম আলো কটেজের জানালার কাঁচ চুইয়ে ঘরে এলো, তখন পুরো শ্রীমঙ্গল যেন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। পিসলা রোদ পড়েছে ভিজে যাওয়া চা পাতার ওপর।

সানানের আগে ঘুম ভাঙল। বিছানায় তার বুকের ওপর লিপি মাথা রেখে শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছিল। লিপির একটা হাত সানানের শক্ত বুকের ওপর রাখা, আর তার চুলগুলো সানানের কাঁধে ছড়ানো। সানান কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে লিপির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতের সেই গভীর রোমান্স, কাছাকাছি আসা আর গভীর ভালোবাসার মুহূর্তগুলো সানানের মনে এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের যে দূরত্ব আর দ্বিধা তাদের মাঝে ছিল, কাল রাতের এক পশলা বৃষ্টি আর ঝড়ের মাতমে তা যেন একবারে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে।

সানান খুব সাবধানে লিপির চুলগুলো সরিয়ে তার কপালে আলতো করে চুমু দিল।

সেই মিষ্টি স্পর্শে লিপির ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলেই দেখল সানানের গভীর আর গভীর ভালোবাসায় ভরা চোখ দুটি তার ওপর নিবদ্ধ। কাল রাতের স্মৃতিগুলো মুহূর্তে লিপির মনে ভেসে উঠতেই সে প্রচণ্ড লজ্জা পেয়ে গেল। লিপির গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠল।

লিপি তড়িঘড়ি করে সানানের বুক থেকে মাথা সরিয়ে একপাশে সরে যেতে চাইল, কিন্তু সানান তাকে ছাড়ল না। সানান এক হাতে লিপির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে আনল।

"কোথায় যাওয়া হচ্ছে কনে বউ?" সানান মুখে এক অদ্ভুত দুষ্টুমি মাখানো হাসি নিয়ে বলল।

লিপি চাদরটা নিজের বুকের কাছে শক্ত করে ধরে চোখ না তুলে বলল, "ছাড়ুন তো! সকাল হয়ে গেছে। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?"

সানান লিপির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল, "কেউ আবার কী ভাববে? আমরা বিবাহিত, আর আমি আমার স্ত্রীর সাথে আছি। তাছাড়া আজ কোনো তাড়া নেই লিপি। কোনো প্রজেক্ট নেই, কোনো সাইট মিটিং নেই। আজকের পুরো দিনটা শুধু আমার আর তোমার।"

লিপি সানানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো গম্ভীরতা ছিল না, কেবল ছিল এক মার্জিত ভালোবাসার গভীরতা। লিপি মুখ লুকিয়ে সানানের বুকে আবার মাথা রাখল।

"আপনি সত্যি খুব খারাপ সানান," লিপি ফিসফিস করে বলল। "আমাকে ভূতের ভয় দেখিয়ে এমন মায়ায় ফেলে দিলে!"

সানান হো হো করে হেসে উঠল। সে লিপির মাথায় হাত বুলে দিতে দিতে বলল, "ভূতের ভয় না দেখালে কি আমার চঞ্চল লিপি রানীকে এভাবে কাছে পেতাম? বলো?"

সেই দিনটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা দিন। দুপুরে তারা দুজনে রিসোর্টের বাইরে পাহাড়ি লেকের ধরে ঘুরে বেড়াল। এবার আর তাদের মাঝে কোনো নীরবতা বা দূরত্ব ছিল না। লিপি সানানের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিল, আর সানান লিপির প্রতিটা মিষ্টি কথা আর চঞ্চলতাকে উপভোগ করছিল।

এক জায়গায় গিয়ে সানান লিপির জন্য একটা পাহাড়ি বুনো ফুলের তোড়া কিনে আনল। লিপি ফুলগুলো হাতে নিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দে সানানকে জড়িয়ে ধরল।

"ধন্যবাদ সানান," লিপি সানানের চোখে চোখ রেখে বলল। "ঢাকাতে আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে হয়তো কেবল একজন বন্ধু হিসেবেই ভাবেন। আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো উষ্ণতা ছিল না।"

সানান লিপির দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব গম্ভীর আর স্পষ্ট গলায় বলল, "লিপি, আমি কাজের চাপে হয়তো প্রকাশ করতে পারিনি, কিন্তু তুমি আমার জীবনে আসার পর থেকে আমার পুরো পৃথিবীটা বদলে গেছে। আমি হয়তো সবসময় খুব রোমান্টিক আচরণ করতে পারি না, কিন্তু আমার হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন কেবল তোমার জন্যই। তোমাকে ছাড়া আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ।"

সানানের এই সরাসরি ভালোবাসার স্বীকারোক্তি লিপির চোখে আনন্দের জল এনে দিল। লিপি সানানের বুকে মাথা রেখে বলল, "আর আমি তোমাকে ভালোবাসতে ভালোবাসতে নিজের পুরো মনটা হারিয়ে ফেলেছি সানান।"

এক সপ্তাহের সিলেট সফর শেষ করে তারা যখন ঢাকায় ফিরে এলো, তখন তাদের মধ্যকার সমীকরণটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ঢাকা শহরে ফিরে এলেও তাদের জীবন আর আগের মতো নিষ্প্রাণ ছিল না।

সানান তার কাজের পাশাপাশি এখন লিপিকে পর্যাপ্ত সময় দিতে শুরু করল। লিপি ইউনিভার্সিটিতে গেলে সানান নিজে তাকে ড্রপ করে দিত, আবার বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে লিপির পছন্দের খাবার নিয়ে বাড়ি ফিরত। লিপিও সানানের কাজের জায়গায় তাকে মানসিক সাপোর্ট দিত।

ড্রয়িংরুমে দুই বাবা—সাইফ সাহেব আর রফিক সাহেব—একদিন যখন বিকেলে তাদের একসাথে হেসে কথা বলতে আর খুনসুটি করতে দেখলেন, তখন তাদের মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল।

সাইফ সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রফিক সাহেবকে ফিসফিস করে বললেন, "দেখলি বন্ধু? আমাদের সেই প্ল্যানটা একদম ষোলো আনা সফল হলো!"

রফিক সাহেব হেসে উঠে বললেন, "হ্যাঁ রে সাইফ। আমাদের ছোটবেলার সেই বন্ধুত্ব আজ আমাদের সন্তানদের ভালোবাসায় নতুন করে জীবন পেল।"

শ্রীমঙ্গলের সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর সানান ও লিপির সংসারে যেন এক বসন্তের আগমন ঘটেছিল। ঢাকার ফ্ল্যাটটিতে এখন আর কোনো নীরবতা নেই, বরঞ্চ প্রতিদিনের কাজের মাঝেও তারা খুঁজে নিত নিজেদের মতো করে এক চিলতে সুখ। সানান অফিস শেষ করে আগের মতো আর রাত করত না, আর লিপিও পড়াশোনার ফাঁকে সানানের পছন্দের পদগুলো রান্না করতে শুরু করেছিল।

মাস তিনেক পরের কথা।

এক সকালে লিপি ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল তার। সানান তখন ড্রয়িংরুমে তৈরি হচ্ছিল অফিসে যাওয়ার জন্য। লিপির শরীর খারাপের কথা শুনে সে দৌড়ে রুমে এলো।

"কী হয়েছে লিপি? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?" সানান উদ্বিগ্ন হয়ে লিপির পাশে বসল।

লিপি নিচু গলায় বলল, "না সানান, কাল রাত থেকেই কেমন যেন গা গোলাচ্ছে আর মাথা ঝিমঝিম করছে। মনে হয় প্রেশার একটু কমে গেছে।"

সানান আর কোনো ঝুঁকি নিল না। সে নিজের সব মিটিং বাতিল করে লিপিকে নিয়ে শহরের এক নামী ডাক্তারের চেম্বারে গেল। ডাক্তার লিপিকে পরীক্ষা করে কিছু টেস্ট দিলেন।

ঘণ্টাখানেক পর টেস্টের রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার সানান ও লিপিকে নিজের রুমে ডাকলেন। ডাক্তারের মুখে এক উজ্জ্বল হাসি।

"অভিনন্দন সানান সাহেব! আপনি বাবা হতে চলেছেন। লিপি মা হতে চলেছে," ডাক্তার মিষ্টি হেসে বললেন।

খবরটা শোনার সাথে সাথে সানান ও লিপি দুজনই কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সানানের বুকের ভেতরটা আনন্দের এক তীব্র আলোড়নে কেঁপে উঠল। সে অবিশ্বাস্য চোখে লিপির দিকে তাকাল। লিপির চোখ দিয়ে তখন আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ছে। সানান পরম মমতায় লিপির হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সানান প্রথম ফোনটা করল তার বাবাকে। সাইফ সাহেব খবরটা শুনে ফোনেই কেঁদে ফেললেন। তারপর ফোন দেওয়া হলো রফিক সাহেবকে। দুই প্রবীণ বন্ধু খবরটা পেয়ে নিজেদের সামলাতে পারলেন না। বিকেলে সাইফ সাহেব ও রফিক সাহেব নিজেদের স্ত্রীদের নিয়ে ছুটে এলেন সানানদের বাসায়।

ড্রয়িংরুমে আনন্দের মেলা বসে গেল।

সাইফ সাহেব রফিক সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "কিরে বন্ধু! তুই নানা হতে চলি আর আমি দাদা! আমাদের ছোটবেলার সেই বাঁধনটা দেখ, কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে!"

রফিক সাহেব চোখের পানি মুছে হেসে বললেন, "হ্যাঁ রে সাইফ। আজ মনে হচ্ছে আমাদের জীবনটা সত্যিই সার্থক। তুই আর আমি একসাথে বেড়ে উঠেছি, আর আজ আমাদের নাতনি বা নাতি একসাথে আমাদের কোলে বেড়ে উঠবে।"

লিপি সোফায় বসেছিল। তার আম্মু আর শাশুড়ি মা তাকে পরম যত্নে আগলে রাখছিলেন। সানান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে লিপির দিকে তাকাচ্ছিল। লিপি চোখ তুলে সানানের দিকে তাকাতেই সানান চোখের ভাষায় এক অগাধ ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।

কয়েক মাস কেটে গেল। লিপির শরীরের যত্ন নেওয়ার জন্য সানান তার অফিসের কাজের সিংহভাগ ভার কোম্পানির অন্য ডিরেক্টরের ওপর ছেড়ে দিল। সানানের দিনের বেশিরভাগ সময় কাটত লিপিকে ঘিরে।

বিকেলে দুজনে মিলে ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসত। ঢাকার পড়ন্ত বিকেলের বাতাসে সানান লিপির পাশে বসে পেটে হাত রেখে অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলত।

"শোনো লিপি," সানান একদিন বিকেলে লিপির চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, "আমাদের সন্তান যখন একটু বড় হবে, তাকে আমরা আবার সেই শ্রীমঙ্গলের গ্রীন ভ্যালি রিসোর্টে নিয়ে যাব।"

লিপি সানানের বুকে মাথা রেখে মুচকি হেসে বলল, "আর সেখানে গিয়েও কি তুমি তাকে ঝড়ের রাতে ভূতের ভয় দেখাবে?"

সানান হো হো করে হেসে উঠল। "না, তাকে বলব কীভাবে দুই পুরনো বন্ধুর রূপকথা আর এক ঝড়ের রাত তার বাবা আর মাকে চিরদিনের জন্য এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল।"

লিপি সানানের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। চঞ্চল সেই মেয়েটা আজ এক পরম ভালোবাসার আশ্রয়ে এসে পৌঁছাল, আর গম্ভীর সানান খুঁজে পেল তার জীবনের আসল অর্থ।

 

....
👁 24