রাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে পুরান ঢাকার জরাজীর্ণ কিন্তু আভিজাত্যে ভরা সেই পুরনো হাভেলিকে। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, আর ঘরের ভেতরে ছড়াচ্ছে এক দমবন্ধ করা নীরবতা। আয়নার সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে রাফা। তার পরনে টকটকে লাল বেনারসি শাড়ি, গা ভর্তি ভারী সোনার গহনা। কিন্তু তার মুখশ্রীতে কোনো কনের চেনা লজ্জা বা আনন্দ নেই—সেখানে জমে আছে তীব্র আতঙ্ক, ক্ষোভ আর এক বুক অপমান। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার নিজের চাচাতো ভাই, সাইয়েদ, তাকে জোর করে আজ রাতে এই বিছানায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
ঘরের দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দে রাফা শিউরে উঠল। আয়নার প্রতিফলনে ধরা পড়ল সাইয়েদের দীর্ঘ, দীর্ঘায়িত ছায়া। সুপুরুষ হিসেবে সাইয়েদের সুখ্যাতি পরিবারজুড়ে, কিন্তু রাফার কাছে এই মুহূর্তে সে একজন নিষ্ঠুর রক্ষস ছাড়া আর কিছুই নয়। সাইয়েদের পরনে কালো পাঞ্জাবি, কাঁচা-পাকা চুলগুলো কপালে সামান্য লেপ্টে আছে, আর চোখে ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি। সে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে রাফার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। আয়নার দিকে তাকিয়ে রাফার কাঁধে চাপাল তার ভারী, শক্ত হাত দুটি।
"তুমি ভেবেছিলে আমার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ফাহাদের সাথে ওই নতুন জীবনটা শুরু করতে পারবে, তাই না রাফা?" সাইয়েদের গলার স্বর নিচু, কিন্তু তাতে ছিল ধারালো এক হুকুম।
রাফা ঝটকা মেরে তার হাত সরিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু কণ্ঠস্বর শক্ত করার চেষ্টা করে বলল, "তুমি আমাকে বিয়ে করোনি সাইয়েদ ভাই! এটা একটা অপরাধ, একটা জবরদস্তি! চাচাজান আর আব্বাকে ব্ল্যাকমেইল করে, আমাকে ঘরে আটকে রেখে এই কাজী ডেকে কাবিননামায় সই করানোকে বিয়ে বলে না!"
সাইয়েদ শান্ত পায়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনার চিহ্ন নেই, বরং ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত হাসি। সে রাফার কাছাকাছি এসে তার চিবুক শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে রাফার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল।
"আব্বা আর কাকা তাদের পরিবারের সম্মান বাঁচাতে তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, রাফা," সাইয়েদ নিচু স্বরে, রাফার ঠোঁটের খুব কাছে এসে বলল, "আর ভালোবাসার কথা বলছ? এই শব্দের সংজ্ঞা তুমি ভুল জানো। তোমাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি। তুমি অন্য কারো দিকে তাকাবে, অন্য কারো ঘরের গৃহিনী হবে—এই চিন্তাটা আমার মাথায় আসা মানেই পুরো ঢাকা শহর পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া। তুমি শুধু আমার। ভালোবেসে চাও, কিংবা ঘৃণা করে—তুমি আমারই থাকবে।"
"আমি তোমাকে ঘৃণা করি! আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে আমি ঘৃণা করে যাব!" রাফা চিৎকার করে উঠল, কিন্তু সাইয়েদের ইস্পাতদৃঢ় মুঠো থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারল না।
সাইয়েদের চোখ দুটো মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে এল। সে এক হ্যাঁচকা টানে রাফাকে নিজের বুকের কাছে টেনে আনল। বেনারসির ভারী আঁচল খসে পড়ল মেঝেবোধে। দুটি শরীরের মধ্যে তৈরি হলো এক তীব্র, শ্বাসরুদ্ধকর দূরত্বহীনতা। রাফা হাত দিয়ে সাইয়েদের বুকে ধাক্কা দিতে চাইল, কিন্তু সাইয়েদের এক হাত তার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, আর অন্য হাত চলে গেল তার ঘাড়ের পেছনে।
"তোমার এই ঘৃণাই আমার সবচেয়ে প্রিয়, ময়না," সাইয়েদ ফিসফিস করে বলল। তার তপ্ত শ্বাস রাফার ঘাড়ে পড়তে লাগল, যা রাফার পুরো শরীরে এক তীব্র শিহরণ আর ভয়ের লহরী তুলে দিল। "তোমার এই জেদ, তোমার এই তেজ—আমি ধাপে ধাপে সব ভাঙব। প্রতিদিন, প্রতি রাতে।"
সাইয়েদের ঠোঁট কোনো অনুমতি না নিয়েই নেমে এল রাফার কোমল ঘাড়ে, তার স্পর্শে যেমন ছিল ভালোবাসার তীব্রতা, তেমনি ছিল জবরদস্তির এক জ্বলন্ত অধিকার। রাফা যন্ত্রণায় ও তীব্র এক অচেনা অনুভূতিতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে নিজেকে ছাড়ানোর সব শক্তি হারিয়ে ফেলছিল। সাইয়েদের হিংস্র কিন্তু মোহময় স্পর্শ তার সচেতন মনকে অসাড় করে দিচ্ছিল। এটা কোনো সাধারণ প্রেম নয়, এটা একটা খেলা—যেখানে রাফা বন্দী, আর সাইয়েদ এক নিষ্ঠুর জয়ী।
"ছেড়ে দাও... দয়া করে ছেড়ে দাও আমাকে..." রাফার গলা দিয়ে কোনোমতে আকুতি বের হলো।
সাইয়েদ তার ঠোঁট সামান্য সরিয়ে রাফার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার ক্ষুধা। সে রাফাকে বাহুডোরে আরো শক্ত করে চেপে ধরে তাকে এক লহমায় নিয়ে এল খাটের দিকে।
"ছাড়া পাওয়ার জন্য তোমায় আমি বুকে জড়াইনি, রাফা," সাইয়েদ খাটের ওপর রাফাকে নামিয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল, "আজকের রাতটা শুধুই আমাদের। তোমার এই অহংকার আর তোমার এই ঘৃণা—সব আজ আমার কাছে আত্মসমর্পণ করবে।"
বিছানার ওপর ছড়ানো গোলাপের পাপড়িগুলো তাদের দুজনের এই বিষাক্ত ভালোবাসার তাপে শুকিয়ে আসছিল। রাফা বুঝতে পারছিল, এই নরক থেকে তার আর কোনো মুক্তি নেই। সাইয়েদের দেওয়া এই বাঁধন যেমন যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি এক দমবন্ধ করা আকর্ষণে ভরা—যা তাকে তিল তিল করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
পুরনো ঢাকার হাভেলির সেই বন্ধ ঘরের বাতাস তখনো জমে আছে এক গভীর, দমবন্ধ করা উত্তাপে। খাটজুড়ে ছড়ানো শাড়ির ভাঁজ আর গোলাপের পাপড়িগুলো যেন এক নিঃশব্দ সংগ্রামের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সাইয়েদের বুকের ওপর মাথা রেখে স্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে রাফা। তার শরীরজুড়ে কালকের রাতের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের তীব্র দাগ, মনে লেগে আছে এক গভীর ক্ষত। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু রাফার জীবনের ওপর চেপে বসেছে এক অমাবস্যার অন্ধকার।
সাইয়েদের শক্ত বাহু তখনো রাফার কোমর পেঁচিয়ে ধরে রেখেছিল, যেন ঘুমের মধ্যেও সে তার শিকারকে হাতছাড়া করতে চায় না। সাইয়েদের শান্ত ও স্বস্তিময় নিঃশ্বাসের ছন্দ রাফার পিঠে এসে লাগছিল। রাফা সাবধানে, শরীরটা বাঁচিয়ে সাইয়েদের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই সাইয়েদের হাতের মুঠো আরো শক্ত হয়ে এল।
"এত সকালে কোথায় যাওয়ার চেষ্টা করছ, ময়না?" সাইয়েদের চোখ এখনো বন্ধ, কিন্তু তার গলার স্বর পূর্ণ জাগ্রত ও গম্ভীর।
"আমাকে ছাড়ো সাইয়েদ ভাই! আমি একটু নিঃশ্বাস নিতে চাই," রাফার গলায় স্পষ্ট ক্ষোভ আর ক্লান্তি।
সাইয়েদ ধীর ধীরে চোখ খুলল। তার চোখ দুটো যেন রাফার দিকে এক অদ্ভুত মায়ায় অথচ এক অপ্রতিরোধ্য দাবিতে তাকিয়ে রইল। সে এক ধাক্কায় রাফাকে আবার নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল। রাফার উস্কোখুস্কো চুলগুলো সরিয়ে তার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সাইয়েদ। স্পর্শটা শান্ত হলেও তার পেছনের অধিপত্যের তেজ রাফাকে শিউরে তুলল।
"তুমি এখন আমার বেগম, রাফা। এই ঘর, এই বিছানা আর এই বুক—তোমার নিঃশ্বাস নেওয়ার একমাত্র জায়গা এখন এটাই," সাইয়েদ তার বুড়ো আঙুল দিয়ে রাফার নিচের ঠোঁট আলতো করে ঘষে দিয়ে বলল, "কাল রাতের পর কি এখনো মনে হয় তুমি আমার থেকে দূরে যেতে পারবে?"
রাফা তার মুখ ফিরিয়ে নিল, "কাল রাতে যা হয়েছে তা ছিল তোমার অন্যায়, তোমার জবরদস্তি। আমি তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না।"
সাইয়েদ একটা শীতল হাসি হাসল। সে খাটে উঠে বসে রাফাকে এক টানে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। রাফা আঁতকে উঠে তার শাড়ির আঁচলটা বুকে চেপে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু সাইয়েদ তার দুই হাত একসাথে ধরে রাফার পিঠের পেছনে আটকে ফেলল। তাদের দুজনের মুখমণ্ডল এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে।
"ক্ষমা?" সাইয়েদ রাফার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "তোমার ক্ষমার ওপর আমার কোনো লোভ নেই রাফা। আমি তোমার ভালোবাসা যেমন আদায় করে নিতে পারি, তোমার এই ঘৃণাটাকেও সমান শক্তিতে উপভোগ করতে পারি। তুমি যত আমায় ঘৃণা করবে, তত বেশি আমি তোমার কাছে আসব।"
সাইয়েদের অন্য হাতটি রাফার চিবুক বেয়ে নেমে গেল তার উন্মুক্ত ঘাড়ে, তারপর কাঁধের ওপর। স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, কিন্তু ছিল এক প্রবল বিষাক্ত মাদকতা। রাফা ভেতর থেকে কাঁপছিল। সে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য লড়াই করতে চাইছিল, কিন্তু সাইয়েদের চোখের মাদকতা আর শরীরের উষ্ণতা যেন তার প্রতিরোধ শক্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল।
"তুমি এক দিন পস্তাবে সাইয়েদ ভাই... এভাবে জোর করে কাউকে আপন করা যায় না," রাফার গলা জড়িয়ে আসছিল, কারণ সাইয়েদের ঠোঁট ততক্ষণে তার কানের নিচে উষ্ণ ছোঁয়া দিতে শুরু করেছে।
"আমি তোমাকে আপন করতে চাইনি রাফা, আমি তোমাকে জয় করতে চেয়েছি," সাইয়েদ তার কথা শেষ করেই রাফার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
সেই চুমুতে কোনো নরম অনুভূতি ছিল না, সেখানে ছিল তীব্রতা, অধিকার আর এক দমবন্ধ করা প্যাসন। রাফা প্রথমে হাত-পা ছাড়ে নিজেকে ছাড়াতে চাইল, কিন্তু সাইয়েদের সুগঠিত শরীরের শক্তির কাছে তার ক্ষমতা ছিল নগণ্য। সাইয়েদের ভালোবাসার এই বিষাক্ত স্টাইল রাফাকে এক অচেনা ঘোরের দিকে ঠেলে দিল। এক অদ্ভুত অনুভূতিতে রাফার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল, তার আঙুলগুলো অজান্তেই খামচে ধরল সাইয়েদের পিঠের পাঞ্জাবি।
নিজের এই দুর্বলতা বুঝতে পেরে রাফা মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিল। সাইয়েদ তাকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, সামাজিকভাবে এবং মানসিকভাবেও পুরোপুরি নিজের দখলে নিয়ে নিচ্ছিল।
সকালের নাশতার টেবিলে যখন রাফা নিচে নামল, তখন বড় চাচা আর আব্বা চুপচাপ বসে আছেন। পুরো পরিবার জানে সাইয়েদ যা সিদ্ধান্ত নেয়, তা বদলানোর সাধ্য কারো নেই। রাফা এসে শান্তভাবে দাঁড়াতেই সাইয়েদ ঘরের ভেতর ঢুকল। তার পরনে সাদা ফতুয়া আর ট্রাউজার, চোখে সেই আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি।
সাইয়েদ সোজা এসে রাফার পাশাপাশি বসল এবং সবার সামনেই রাফার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। রাফা হাত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই সাইয়েদ আঙুলের চাপ বাড়িয়ে দিল, যেন নীরব এক হুমকি দিল—সবাই দেখছে, বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না।
"আব্বা," সাইয়েদ তার বাবার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, "আমরা আজ বিকেলেই আমাদের গাজীপুরের বাগানবাড়িতে যাচ্ছি। রাফাকে নিয়ে কয়েক দিন ওখানে একান্তে থাকতে চাই।"
রাফা চমকে উঠে সাইয়েদের দিকে তাকাল, "আমি কোথাও যাব না! আমার শরীর ভালো নেই।"
সাইয়েদ খাবারের প্লেটটা রাফার দিকে এগিয়ে দিয়ে এক মিষ্টি অথচ হাড়হিম করা হাসি দিল, "শরীরের যত্ন নেওয়ার জন্যই তো নিয়ে যাচ্ছি, ময়না। ওখানে কেউ থাকবে না... শুধু তুমি আর আমি।"
রাফা বুঝতে পারল, ঢাকার এই বাড়িতে তাও পরিবারের মানুষজন ছিল, কিন্তু বাগানবাড়িতে নিয়ে গেলে সাইয়েদ তাকে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ করে ফেলবে। তার স্বাধীনতা, তার শেষ প্রতিরোধটুকুও সেখানে গিয়ে গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু সাইয়েদের সেই গভীর, কালচে চোখের দিকে তাকিয়ে রাফা বুঝতে পারল—এই নরকের খেলায় সে ইতিমধ্যেই জড়িয়ে পড়েছে, এবং সেখান থেকে বের হওয়ার সমস্ত দরজা বন্ধ।
গাজীপুরের গভীর জঙ্গলে ঘেরা বাগানবাড়িটার সামনে যখন গাড়ি থামল, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশে ঝিঁঝি পোকার তীব্র ডাক আর পাইন গাছের খসখসে শব্দ এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। গাড়ি থেকে নেমে রাফা চারিদিকে তাকাল—উঁচু প্রাচীর আর লোহার বিশাল ফটক দিয়ে ঘেরা এই বাড়িটা যেন আস্ত একটা খোলা কারাগার।
সাইয়েদ গাড়ি থেকে নেমে রাফার হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরল। তার হাতের উষ্ণতা এই কনকনে ঠাণ্ডা সন্ধ্যায় রাফার শরীরে এক অজানা ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিল। রাফা টান মেরে হাত ছাড়াতে চাইল, কিন্তু সাইয়েদ আরো শক্ত করে ধরে তাকে ভেতরের দিকে টেনে নিয়ে চলল।
"হাত ছাড়ো সাইয়েদ ভাই! আমি একা হাঁটতে পারি," রাফা তিক্ত গলায় বলল।
সাইয়েদ থামল না, বরং চলতে চলতেই এক আড়চোখে রাফার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত বিষাক্ত হাসি, "একা হাঁটার দিন শেষ রাফা। এখন থেকে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ হবে আমার সাথে, আমার মর্জিতে।"
দোতলার প্রধান শোবার ঘরে ঢুকতেই কাঠের সুবাস আর মোমের আলোয় পুরো ঘরটা এক অদ্ভুত মাদকতায় ছেয়ে গেল। ঘরের বিশাল রাজা-বাদশাহি খাটটার দিকে তাকিয়ে রাফার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ঢাকা শহরের হাভেলিতে তাও কোনোমতে দিন কেটেছে, কিন্তু এই নির্জন বাগানবাড়িতে সাইয়েদের সাথে একা থাকার চিন্তাটাই তার নিঃশ্বাস আটকে আনছিল।
সাইয়েদ তার কলারের বোতাম খুলতে খুলতে রাফার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার চোখ দুটোতে ছিল এক ক্ষুধার্ত চিল-এর চাহনি। রাফা পিছাতে পিছাতে একসময় দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেল।
"এখানে কেন নিয়ে এসেছ আমাকে?" রাফা বুক ফুলিয়ে কাঁপতে থাকা গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি ভেবেছ আমাকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে আমি তোমার গোলাম হয়ে যাব?"
সাইয়েদ দেয়ালে হাত রেখে রাফাকে পুরোপুরি ঘিরে দাঁড়াল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস রাফার কপালে এসে আছড়ে পড়ছিল। "গোলাম?" সাইয়েদ একটু হেসে রাফার লাল টকটকে ঠোঁটটার দিকে তাকাল, "না রাফা, তুমি আমার গোলাম নও। তুমি আমার রানি... তবে এই রাজত্বে হুকুম চলবে শুধু আমার। ঢাকার বাড়িতে অনেকের নজর ছিল তোমার ওপর, অনেকেই তোমার চোখে আমার প্রতি ঘৃণা দেখে করুণা করছিল। কিন্তু এখানে? এই বিশাল বাড়িতে তোমার চিৎকার শোনার মতোও কেউ নেই।"
সাইয়েদ এক ঝটকায় রাফাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। রাফা প্রতিবাদে হাত ছুঁড়তে চাইল, কিন্তু সাইয়েদ তার দুটি হাত ধরে মাথার ওপরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
"সাইয়েদ ভাই, ছাড়ো আমাকে!" রাফা চিল চিৎকার করে উঠল।
"উফ, এই 'ভাই' ডাকটা বন্ধ করো রাফা," সাইয়েদ তার চিবুক দিয়ে রাফার ঘাড় আর কানের কাছে ঘষতে ঘষতে নিচু স্বরে বলল, "আমি তোমার ভাই নই, আমি তোমার জামাই। তোমার ওপর আমার ষোলআনা হক আছে।"
সাইয়েদের হিংস্র ভালোবাসার ছোঁয়া নামতে শুরু করল রাফার কাঁধ আর কলারবোনের ওপর। বেনারসির কাপড়টা কাঁধ থেকে সরে যেতেই সাইয়েদের কামাতুর ঠোঁটের স্পর্শে রাফার পুরো শরীর বিদ্যুতায়িত হয়ে উঠল। একদিকে তীব্র অপমান আর ক্ষোভ, অন্যদিকে সাইয়েদের সেই অপ্রতিরোধ্য শারীরিক সামর্থ্য—এই দুইয়ের যাঁতাকলে রাফা নিজেকে হারাল। তার বুক গভীরভাবে ওঠানামা করছিল, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জলের ধারা।
"তুমি একটা পশু..." রাফা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, যদিও তার কণ্ঠের জোড় কমে আসছিল।
সাইয়েদ রাফার ঠোঁটে এক তীব্র, গভীর চুমু বসিয়ে দিল। সেই চুমু রাফার সব প্রতিবাদকে এক নিমিষে স্তব্ধ করে দিল। রাফা নিজের অজান্তেই শিউরে উঠে সাইয়েদের পিঠে হাত রাখল। সাইয়েদ তা বুঝতে পেরে চুমুটা আরো গভীরে নিয়ে গেল, আর রাফাকে এক লহমায় পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে চলল বিছানার দিকে।
বিছানায় ফেলার পর রাফা একটু শোধরানোর চেষ্টা করতেই সাইয়েদ তার ওপর চেপে বসল। তার চোখ দুটোতে তখন শুধুই অধিকার আর কামনা। সে রাফার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল, "তুমি যতই লড়বে রাফা, এই বিষের অতলে ততই ডুববে। আমার স্পর্শ থেকে তুমি কোনোদিন পালাতে পারবে না।"
রাফা ছটফট করতে লাগল, কিন্তু সাইয়েদের ভালোবাসার দাবানলে তার সব শৃঙ্খল পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। বাইরে ঝড়ো হাওয়ায় গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার শব্দ হচ্ছিল, আর ভেতরে চলছিল এক চরম বিষাক্ত, উন্মাদ প্রেমানুভূতির খেলা—যেখানে রাফা বন্দী এক পাখি, আর সাইয়েদ তার একমাত্র শিকারী।
গাজীপুরের বাগানবাড়িতে রাতের ঝড়ের পর সকালের সূর্য উঠলেও রাফার মনের ভেতরের ঝড়টা একটুও থামেনি। জানালার ভারী পর্দা পেরিয়ে ঘরের ভেতরে আসা ভোরের নরম আলোয় খাটজুড়ে এলোমেলো হয়ে থাকা চাদর স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাফা বিছানায় উঠে বসল। তার শরীর জুড়ে অমানুষিক ক্লান্তি, কিন্তু মনের ভেতরের জমানো ক্ষোভ তাকে আরো হিংস্র করে তুলছিল। পাশে সাইয়েদ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তার সুগঠিত হাতটি তখনো অধিকারের ভঙ্গিতে রাফার কোমরের ওপর পড়ে আছে।
রাফা আস্তে করে সাইয়েদের হাতটা সরিয়ে দিয়ে খাট থেকে নামল। তার পুরো শরীর বিষিয়ে উঠছিল নিজের এই অবশের মতো সমর্পণের জন্য। সে কাল রাতে বারবার বাধা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সাইয়েদের সেই উন্মাদের মতো স্পর্শ আর তীব্র শারীরিক আকর্ষণ তাকে বারবার নিজের কাছে পরাস্ত করেছে।
গোসল সেরে একটা নীল রঙের সুতি শাড়ি পরে রাফা বাইরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। বাগানবাড়ির ঠান্ডা হাওয়া তার ভেজা চুলে দোলা দিয়ে গেল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল নিচে, উঠানের এক কোণে সাইয়েদের কাজের লোক জসিম দাঁড়িয়ে আছে। রাফার মাথায় এক মুহূর্তের জন্য মুক্তির চিন্তা খেলে গেল। এই বিশাল বাড়ি থেকে বের হতে পারলে সে সোজা শহরে গিয়ে আব্বার কাছে সাহায্য চাইতে পারবে, কিংবা ফাহাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে।
সে চুপিচুপি নিচে নেমে এল। সাইয়েদ তখনো ঘুমে। জসিমকে রান্নাঘরের দিকে কাজ করতে দেখে রাফা পেছনের গেটের দিকে এগোতে লাগল। গেটটা সামান্য ফাঁকা ছিল। রাফার বুক ধড়ফড় করে উঠল, সে দ্রুত পায়ে এক পা বাইরে বাড়াল—
"কোথায় যাওয়া হচ্ছে, বেগম সাহেবা?"
একটি অত্যন্ত চেনা, হিমশীতল কণ্ঠস্বর ঠিক রাফার পিঠের পেছন থেকে ভেসে এল। রাফা চমকে উঠে পেছনে ঘুরল। সাইয়েদ খালি গায়ে, পরনে শুধুই ট্রাউজার, দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো ঘুম নেই, বরং সেখানে জমা হয়ে আছে মারাত্মক এক প্রলয়ঙ্করি রাগ।
রাফা নিজের ভয়কে লুকিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল, "আমি বাড়ি ফিরছি। তোমার এই জেলে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না!"
সাইয়েদ ধীর পায়ে রাফার দিকে হেঁটে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক ক্ষুধার্ত চিতাবাঘের শিকারের দিকে এগিয়ে আসার হিংস্রতা ছিল। সে রাফার খুব কাছে এসে এক লহমায় তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। রাফা সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল সাইয়েদের খালি বুকে।
"আমি তোমাকে কাল রাতে কী বলেছিলাম, রাফা?" সাইয়েদের গলার স্বর নিচু কিন্তু অত্যন্ত ভয়াল। তার আঙুল রাফার ভেজা চুল খামচে ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। "আমার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এক পা ফেলার ক্ষমতাও তোমার নেই।"
"তুমি আমাকে এভাবে আটকে রাখতে পারো না সাইয়েদ!" রাফা চেঁচিয়ে উঠল, "তুমি একটা জল্লাদ! আমি ফাহাদকে ভালোবাসি, তোমায় নয়! তুমি জোর করে শরীর পেতে পারো, কিন্তু আমার মন কোনোদিন পাবে না!"
'ফাহাদ' নামটি শুনতেই সাইয়েদের চোখের মনি দুটো যেন রগে ফুটে উঠল। এক তীব্র হিংসায় তার ভেতরের পশুটা জেগে উঠল। সে রাফাকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে আবার শোবার ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
"সাইয়েদ! ছাড়ো আমাকে! জসিম! কেউ বাঁচাও!" রাফা হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু এই নির্জন বাগানবাড়িতে তার সেই আকুতি শোনোর মতো কেউ ছিল না।
সাইয়েদ ঘরে ঢুকে রাফাকে সজোরে বিছানায় ফেলে দিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর ভেতরের চাবি ঘুরিয়ে লক করে দিল। সে রাফার ওপর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার দুই হাত রাফার মাথার দু-পাশে চেপে ধরে সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "কার নাম নিলে তুমি? ওই ফাহাদের? আজ তোমার শরীর আর মন থেকে ওই নামটা আমি চিরতরে মুছে দেব, রাফা!"
"না... সাইয়েদ ভাই, না!" রাফা কাকুতি-মিনতি করতে লাগল, কিন্তু সাইয়েদের চোখে তখন অন্ধ অনুরাগের সাথে মিশেছে এক বীভৎস অধিকারবোধ।
সাইয়েদের ঠোঁট কোনো সুযোগ না দিয়েই রাফার গলায় আর বুকে নেমে এল। তার স্পর্শে এবার কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল শুধুই হিংস্র দাবি আর শাস্তির মাত্রা। শাড়ির আঁচল টান মেরে সরিয়ে দিয়ে সাইয়েদ তার উন্মাদের মতো ভালোবাসার বিষ ঢালতে শুরু করল রাফার শরীরে। রাফা হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সাইয়েদের শক্ত ঠোঁট আর ভারী শরীরের চাপে তার সব প্রতিরোধ দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
যন্ত্রণায় রাফার চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল, কিন্তু এক অদ্ভুত বিষাক্ত আমেজে তার নিজের শরীরটাও সাইয়েদের এই অন্যায্য আহ্বানে সাড়া দিতে শুরু করল। সাইয়েদের ভালোবাসার এই বিষ কত গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে, তা ভেবে রাফা মনে মনে নিজের ওপর বিষিয়ে উঠল। সে যন্ত্রণায় সাইয়েদের পিঠে নখ বসিয়ে দিল, আর সাইয়েদ এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে রাফার কানে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধুই সাইয়েদের, রাফা... মরে গেলেও তুমি আমারই থাকবে।"
সাইয়েদের দেওয়া আঘাত আর ভালোবাসার বিষাক্ত দাহে রাফার শরীর ও মন তখন এক গভীর সুনসান শান্তিতে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঘরের আলো আধারিতে সাইয়েদ শুয়ে ছিল রাফাকে নিজের বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে। তার আঙুলগুলো রাফার পিঠের খোলা অংশে আলতো করে আঁকিঝুঁকি কাটছিল। সাইয়েদের মুখশ্রীর সেই হিংস্রতা এখন উধাও, সেখানে ফুটে উঠেছে এক পরম আত্মতৃপ্তির ছাপ। যেন সে তার কাঙ্ক্ষিত সাম্রাজ্য পুরোপুরি জয় করে নিয়েছে।
কিন্তু রাফার চোখ জোড়া ছিল একদম শুকনো, অপলকভাবে সে তাকিয়ে ছিল ছাদের কাঠের কড়িকাঠগুলোর দিকে। তার মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের আগ্নেয়গিরিটা এবার নিঃশব্দে লাভা উগরাতে শুরু করেছে। সে বুঝতে পেরেছে, শুধু শারীরিক প্রতিরোধ বা চিৎকার করে এই লোকটির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। সাইয়েদকে হারাতে হলে তার এই অন্ধ অধিকারবোধকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
"কী ভাবছ, ময়না?" সাইয়েদ রাফার গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করল।
রাফা নিজের ভেতরের সব ঘৃণা লুকিয়ে এক ঠান্ডা, স্থির দৃষ্টিতে সাইয়েদের দিকে তাকাল। সে এবার পিছু হটল না, বরং নিজের হাতটা তুলে সাইয়েদের বুকে রাখল। রাফার এই অপ্রত্যাশিত শান্ত আচরণে সাইয়েদের চোখে সামান্য চমক খেলে গেল।
"ভাবছি আমার ভাগ্যের কথা," রাফা খুব নিচু স্বরে বলল, যার মধ্যে কোনো কাঁপুনি ছিল না। "তুমি তো আমাকে জয় করে নিলে সাইয়েদ। কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতর আমাকে আটকে রেখে তুমি কি সত্যিই শান্তিতে থাকবে? আমার ভেতরের এই নীরবতা তোমাকে এক দিন পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।"
সাইয়েদ একটু হেসে রাফার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল, "তোমার এই নীরবতাও আমার প্রিয় রাফা। তুমি লড়লে আমি তোমায় ভাঙি, আর তুমি শান্ত থাকলে আমি তোমায় উপভোগ করি। তোমার কোন রূপটাই বা আমার অমূল্য নয়?"
সাইয়েদ আবার ঝুঁকে এল রাফার দিকে, তার ঠোঁট নেমে এল রাফার উন্মুক্ত কলারবোনে। রাফা এবার আর নিজেকে সরিয়ে নিল না, বরং নিঃশব্দে সাইয়েদের পিঠে হাত রেখে সেই বিষাক্ত স্পর্শ সয়ে গেল। তবে তার মনে ফুটতে লাগল এক নতুন চক্রান্তের বীজ।
পরদিন সকালে সাইয়েদ যখন বাগানে জসিমের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত, রাফা সাইয়েদের স্টাডি রুমে ঢুকল। সেখানে সাইয়েদের ব্যক্তিগত রিভলভার আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র ড্রয়ারে রাখা থাকে। রাফা ড্রয়ারের লকটা দেখার চেষ্টা করতেই পেছনের দরজায় ছায়া পড়ল।
সাইয়েদ পকেটে হাত দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার ঠোঁটে সেই হাড়হিম করা পরিচিত হাসি।
"কী খুঁজছ রাফা? আমার বন্দুক, নাকি এই ঘর থেকে বের হওয়ার চাবি?" সাইয়েদ ধীর পায়ে রাফার দিকে এগিয়ে এল।
রাফা একটুও বিচলিত না হয়ে ঘুরে দাঁড়াল, "দুটোর কোনোটাই নয়। আমি শুধু দেখছিলাম আমার জল্লাদ তার শিকারকে কত বন্দোবস্তে আটকে রেখেছে।"
সাইয়েদ রাফার একদম মুখোমুখি এসে তার কোমরটা চেপে ধরল। সে রাফার চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল, "আমার রিভলভারের গুলিও তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না রাফা। তোমার মৃত্যু হলেও আমার আত্মা তোমার পিছু ছাড়বে না।"
সাইয়েদ রাফাকে এক টানে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। টেবিলের ওপর রাখা ফাইলপত্রগুলো হুড়মুড় করে নিচে পড়ে গেল। সাইয়েদের নেশাচ্ছন্ন চোখ দুটো রাফার ওপর কামনার নতুন দাবানল জ্বেলে দিল। সে রাফার পরনের শাড়িটা এক ঝটকায় আলগা করে দিল।
"সাইয়েদ... এখানে নয়..." রাফা মৃদু আপত্তির ভান করল, যা সাইয়েদের উন্মাদের মতো জেদকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
"আজ এখানেই, এখনই," সাইয়েদ গর্জে উঠে রাফার ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নিল।
রাফা নিজের অজান্তেই সাইয়েদের চুলগুলো খামচে ধরল। এই বিষাক্ত মিলনের আড়ালে রাফা নিজের মনকে শক্ত করছিল—সে সাইয়েদকে এমন এক অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে সাইয়েদের এই অহংকার আর হিংস্র ভালোবাসা দুটোই এক দিন ধ্বংস হয়ে যাবে।
স্টাডি রুমের মেঝেবোঝাই কাগজের ওপর ছড়িয়ে থাকা সেই উন্মাদনার পর সাইয়েদের বিশ্বাস আরো গাঢ় হলো—রাফা হয়তো শেষ পর্যন্ত তার কাছে নতি স্বীকার করে নিয়েছে। বাগানবাড়ির পরিবেশে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা। সাইয়েদের ভালোবাসা দিনে দিনে আরো বেশি তীব্র, অন্ধকার আর দমবন্ধ করা হয়ে উঠছিল। সে রাফাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের চোখের আড়াল হতে দিতে চায় না।
দুপুরের প্রখর রোদে সুইমিং পুলের পাড়ে বসে ছিল রাফা। সে পায়ের পাতা পানিতে ডুবিয়ে একমনে তাকিয়ে আছে নীলাকাশের দিকে। তার মনজুড়ে এখন শুধুই এক শীতল প্রতিশোধের ছক। সাইয়েদ ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে রাফার পেছনে দাঁড়াল। তার পরনে হালকা সুতির কুর্তা, হাতে দুটি শরবতের গ্লাস।
"কী এত ভাবছ, ময়না?" সাইয়েদ গ্লাস দুটো টেবিলে রেখে রাফার পাশে বসে তার ভেজা হাঁটুতে হাত রাখল।
রাফা মুখ ফিরিয়ে সাইয়েদের দিকে তাকাল। তার চোখে আগের মতো ক্ষোভের আগুন নেই, বরং সেখানে জমে আছে এক গভীর শূনতা—যা সাইয়েদের মতো তীক্ষ্ণ মনের মানুষকেও বিভ্রান্ত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
"ভাবছি তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো সাইয়েদ ভাই," রাফার গলায় এক অদ্ভুত মায়াবী সুর।
সাইয়েদ একটু চমকে উঠল। রাফা এতদিন পর তাকে 'সাইয়েদ ভাই' বলে ডাকল, কিন্তু তাতে কোনো তীব্রতা বা ঘৃণা ছিল না। সাইয়েদ রাফার গালে হাত রেখে তার বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁট ঘষে দিল।
"আমার ভালোবাসার কোনো সীমা নেই রাফা," সাইয়েদ নিচু স্বরে বলল। "তুমি যদি এই আকাশ বা এই জঙ্গল চাও, আমি তোমার পায়ে এনে দেব। কিন্তু যদি ছেড়ে যাওয়ার কথা বলো, তবে তোমাকে মেরে আমি নিজেও মরে যাব।"
রাফা একটু মিটিমিটি হাসল—এক বিষাক্ত হাসি। সে সাইয়েদের হাতটা ধরে নিজের বুকের ওপর রাখল, যেখানে তার হৃদপিণ্ড দ্রুত গতিতে ধুকপুক করছে।
"তাহলে আমাকে পরীক্ষা করে দেখো না কেন?" রাফা সাইয়েদের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে ফিসফিস করল, "আমাকে শহরের হাভেলিতে ফিরিয়ে নিয়ে চলো। দেখা যাক, মানুষের ভিড়েও আমি তোমার কাছে থাকি নাকি পালিয়ে যাই।"
সাইয়েদের কালচে চোখ দুটো সংকুচিত হয়ে এল। সে রাফার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিজের একদম কাছাকাছি নিয়ে এল। তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছিল।
"তুমি আমার সাথে খেলা করছ রাফা?" সাইয়েদের গলার স্বর হঠাৎ হিমশীতল হয়ে উঠল। "তুমি ভাবছ ঢাকায় গিয়ে কাকা বা আব্বার আশ্রয় নেবে? কিংবা ওই ফাহাদের কাছে বার্তা পাঠাবে?"
"আমি যদি পালানোর চেষ্টাই করি, তবে তো তোমার কাছে আমায় চিরতরে শেষ করে দেওয়ার অজুহাত তৈরি হবে," রাফা সাইয়েদের ঠোঁটের খুব কাছে মুখ এনে বলল। তার চোখে ছিল এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। "ভয় পাচ্ছ সাইয়েদ? তুমি কি নিজের ভালোবাসার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছ না?"
সাইয়েদের ভেতরে থাকা পুরুষালি অহংকার আর অন্ধ অধিকারবোধ এই চ্যালেঞ্জে এক মুহূর্তে জ্বলে উঠল। সে রাফার ঠোঁটে এক হিংস্র, দীর্ঘ চুমু বসিয়ে দিল। সেই চুমুতে ছিল রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা আর কামনার তীব্র ছোঁয়া।
"ভয়?" সাইয়েদ হাঁপাতে হাঁপাতে মুখ সরিয়ে নিয়ে গর্জে উঠল, "সাইয়েদ কাউকে ভয় পায় না রাফা! ঠিক আছে, কাল সকালেই আমরা ঢাকায় ফিরব। কিন্তু মনে রেখো, যদি তুমি কোনো চালাকি করার চেষ্টা করো, তবে শুধু ফাহাদ নয়—তোমার চারপাশের প্রতিটা মানুষকে আমি নিজের হাতে জবাই করব।"
সাইয়েদ এক ঝটকায় রাফাকে কোল তুলে নিল। পানি থেকে ওঠা রাফার ভেজা শাড়ি সাইয়েদের কুর্তাকে ভিজিয়ে দিল। সাইয়েদ রাফাকে নিয়ে দ্রুত পায়ে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই সাইয়েদের সেই পুরোনো হিংস্রতা ডানা মেলল। সে রাফাকে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার ওপর হিংস্র চিলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাফা এবার কোনো বাধা দিল না, বরং সাইয়েদের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরে তার এই বিষাক্ত সমর্পণকে আরো তীব্র করে তুলল।
গাজীপুরের নির্জন বাগানবাড়ি ছেড়ে সাইয়েদের কালো গাড়িটি যখন পুরান ঢাকার সেই শতবর্ষী হাভেলিতে এসে থামল, তখন চারপাশ গোধূলির আলোয় রক্তিম রূপ ধারণ করেছে। বাড়িতে পা রাখতেই ঘরের পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল। বড় চাচা আর আব্বা লিভিং রুমে বসে ছিলেন, কিন্তু সাইয়েদের প্রবেশের সাথে সাথেই তারা কথা থামিয়ে দিলেন। সাইয়েদের চোখের সেই রাশভারী ও ভয়াল চাহনি পরিবারের কাউকেই তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেয় না।
সাইয়েদ রাফার হাত ধরে রেখেছিল ইস্পাতের শিকলের মতো শক্ত মুঠোয়। সে সোজা রাফাকে নিয়ে তিনতলার তাদের বিশাল ঘরে চলে এল। দরজায় পা রাখতেই রাফা এক মুহূর্ত থামল। এই সেই ঘর, যেখানে প্রথম রাতে তার জীবনটা ছারখার হয়ে গিয়েছিল।
সাইয়েদ ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে রাফাকে নিজের দিকে ঘোরালো। তার চোখে সন্দেহ আর কামনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
"ঢাকার হাভেলিতে ফিরে কেমন লাগছে, বেগম সাহেবা?" সাইয়েদ ধীর পায়ে রাফার দিকে এগিয়ে এসে তার ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। "তোমার এই শান্ত রূপটা কিন্তু আমার মনকে একটুও স্বস্তি দিচ্ছে না। তোমার মাথায় নিশ্চয়ই নতুন কোনো বিষাক্ত চাল ঘুরছে?"
রাফা কোনো উত্তর না দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে আয়নার প্রতিফলনে সাইয়েদের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল, "তুমি তো আমার মন পড়ার দাবি করতে সাইয়েদ। আজ তবে ভয় পাচ্ছ কেন?"
সাইয়েদ রাফার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে তার দুই কাঁধে হাত রাখল। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে সে রাফার ঘাড়ের খোলা অংশে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল। যন্ত্রণায় রাফা চোখ বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু কোনো চিৎকার করল না। সে জানে, এই যন্ত্রণাই সাইয়েদকে অন্ধ করে রাখছে।
"ভয় আমি পাই না রাফা, আমি শুধু আমার শিকারকে নিখুঁতভাবে দখলে রাখতে চাই," সাইয়েদ তার উন্মাদের মতো স্পর্শ দিয়ে রাফার শরীরজুড়ে নিজের অধিকার পুনপ্রতিষ্ঠা করতে লাগল। সে রাফাকে বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে বিছানার দিকে নিয়ে গেল। ঢাকার এই পরিচিত ঘরে সাইয়েদের ভালোবাসা আরো বেশি দাম্ভিক ও হিংস্র হয়ে উঠল, আর রাফা নীরব শিকার হয়ে সেই বিষ নিজের ভেতরে গ্রহণ করতে লাগল—এক চরম সময়ের অপেক্ষায়।
পরদিন বিকেলে সুযোগ এল। সাইয়েদ ব্যবসার এক জরুরি কাজে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিচে নেমেছিল। রাফা চুপিচুপি সাইয়েদের ড্রয়ার থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি আর তার গোপনীয় ফোনটা বের করে নিল। সে জানত, সাইয়েদ আব্বাকে আর চাচাজানকে কী দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেছিল। ডায়েরির পাতা উল্টাতেই রাফার চোখ আটকে গেল—সাইয়েদ পরিবারের পুরো সম্পত্তি এবং আব্বার পুরোনো ব্যবসার এক মারাত্মক গোপন তথ্য নিজের নামে কবজা করে রেখেছিল, যার ওপর ভিত্তি করেই সবাই তার সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল।
রাফা দ্রুত ফোনের ক্যামেরায় সেই কাগজগুলোর ছবি তুলে নিল এবং এক গোপন নম্বরে একটি বার্তা পাঠিয়ে দিল—যা ছিল ফাহাদের কাছে নয়, বরং শহরের এক প্রভাবশালী পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে, যিনি সাইয়েদের পুরানো শত্রু।
কাজের শেষে রাফা ফোনটা যথাস্থানে রেখে ঘরে ফিরে আসতেই দেখে সাইয়েদ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে কালো শার্ট, হাতা দুটো গুটানো। সাইয়েদের চোখে তখন মারাত্মক প্রলয়ের চিহ্ন।
"আমার ফোন ছোঁয়া মানে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা, রাফা," সাইয়েদ হিমশীতল স্বরে বলল।
সে ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে রাফার দিকে এগোতে লাগল। রাফা পিছাল না, বরং টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের পানির জগটা শক্ত করে ধরল।
"তুমি আমাকে ধ্বংস করেছ সাইয়েদ, এবার তোমার পালা," রাফা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
সাইয়েদ এক ঝটকায় রাফাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার বিশাল হাত রাফার গলার শ্বাসনালীতে চেপে বসল। "তোমার এত বড় সাহস? তুমি ভেবেছ ওই এক চাল দিয়ে সাইয়েদকে শেষ করে দেবে?"
সাইয়েদের উন্মাদের মতো স্পর্শ আর চেপে ধরা মুঠোয় রাফার দম আটকে আসছিল। কিন্তু রাফার চোখে এবার কোনো ভীতি ছিল না, ছিল এক ভয়ংকর জয়ের তৃপ্তি। সাইয়েদ রাফার ঠোঁটে এক রক্তক্ষয়ী, তীব্র চুমু বসিয়ে দিয়ে তার জামা এক টানে ছিঁড়ে ফেলল।
"যদি ধ্বংস হতে হয়, তবে দুজনে একসাথে ধ্বংস হব রাফা!" সাইয়েদ গর্জে উঠে রাফাকে বিছানায় ফেলে দিল। ঢাকার এই হাভেলিতে শুরু হলো তাদের জীবনের সবচেয়ে হিংস্র, বিষাক্ত আর অন্তিম মিলন—যেখানে ভালোবাসা আর প্রতিশোধের সীমান্ত পুরোপুরি মুছে গেছে।
পুরান ঢাকার সেই প্রাচীন হাভেলির শোবার ঘরের বাতাসে তখনো ছড়ান ভালোবাসার তীব্র গন্ধ আর প্রতিশোধের রক্তিম ধোঁয়া। খাটের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা চাদরের ওপর সাইয়েদের বাহুডোরে বন্দী হয়ে শুয়ে আছে রাফা। কাল রাতের সেই হিংস্রতা আর উন্মাদনার পর সাইয়েদ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের থেকে দূরে সরতে দেয়নি। কিন্তু সাইয়েদ জানত না, এই পরম সমর্পণের আড়ালে রাফা তার রাজত্বের অন্তিম ঘণ্টি বাজিয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ নিচে বিকট শব্দে বাড়ির প্রধান ফটক ভেঙে পড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। ভারী বুটের শব্দ আর পুলিশের বাঁশির সাইরেনে কেঁপে উঠল পুরো হাভেলি।
সাইয়েদ মুহূর্তে চোখ খুলে বিছানায় উঠে বসল। তার সুগঠিত শরীরজুড়ে কাল রাতের আঁচড় আর কামড়ের দাগ। সে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে এক ঝটকায় ড্রয়ার থেকে রিভলভার বের করে নিল। কিন্তু সে যখন ঘুরে দাঁড়াল, তখন দেখতে পেল রাফা খুব শান্তভাবে একটা রক্তলাল শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল বাঁধছে। তার চোখে কোনো আতঙ্ক নেই, আছে এক হিংস্র ও তৃপ্তিদায়ক বিজয়।
"তুমি..." সাইয়েদের গলার স্বর কেঁপে উঠল, তার কালচে চোখ দুটোতে বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র যন্ত্রণা ফুটে উঠল। "তুমি পুলিশ ডেকেছ?"
রাফা ধীরে ধীরে ঘুরে সাইয়েদের মুখোমুখি দাঁড়াল। সে সাইয়েদের খুব কাছে এসে দাঁড়াল, বন্দুকে লোড করা সাইয়েদের তপ্ত নলের ঠিক সামনে নিজের বুকটা বাড়িয়ে দিল।
"তুমি তো চেয়েছিলে আমি তোমার হই, তাই না সাইয়েদ ভাই?" রাফার গলার স্বর মিহি কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। "আজ আমি পুরোপুরি তোমার হলাম। তবে এই স্বাধীন দুনিয়ায় নয়—তোমার এই নরকের সাম্রাজ্যেই।"
বাইরে তখন পুলিশের ঘোষণা শোনা যাচ্ছে, "সাইয়েদ আহমেদ, ঘর থেকে বেরিয়ে এসো! তোমার বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইল, অবৈধ অস্ত্র ও অর্থ পাচারের নিশ্চিত প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে!"
সাইয়েদ রিভলভারটি রাফার কপালে চেপে ধরল। তার চোখ থেকে রক্তবর্ণ ক্ষোভ আর অপার্থিব ভালোবাসার এক মিশ্র জল গড়িয়ে পড়ল। "তোমাকে শেষ করে আমি নিজেকেও শেষ করে দেব রাফা! আমি অন্য কাউকে তোমাকে ছুঁতেও দেব না!"
রাফা সামান্যতম বিচলিত হলো না। সে নিজের হাত দুটো তুলে সাইয়েদের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল এবং সাইয়েদের ঠোঁটের খুব কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে মারবে? মেরে ফেলো! কারণ মৃত্যুর চেয়ে বড় মুক্তি আমার জন্য আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু যদি বেঁচে থাকো, তবে এই চার দেয়ালের জেলখানায় সারাজীবন আমার দেওয়া এই বিষাক্ত স্মৃতির যন্ত্রণায় ছটফট করবে।"
সাইয়েদের হাতের মুঠো শিথিল হয়ে এল। জীবনের প্রথমবার এই নিষ্ঠুর, অধিপতি পুরুষটি হেরে গেল—তার নিজেরই অন্ধ, বিষাক্ত অনুরাগের কাছে। সে রিভলভারটা নিচে ফেলে দিল। রাফাকে এক শেষবারের মতো প্রচণ্ড আকুলতায় নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সাইয়েদের তপ্ত নিঃশ্বাস রাফার ঘাড়ে এসে পড়ল, আর সে এক দীর্ঘ, গভীর চুমু বসিয়ে দিল রাফার ঠোঁটে—যে চুমুতে ছিল পরাজয়, ধ্বংস আর এক চিরন্তন কামনার দাগ।
দরজা ভেঙে পুলিশ আর সোয়াত টিম ঘরে প্রবেশ করল।
সাইয়েদ রাফাকে নিজের বুক থেকে আলাদা করল, কিন্তু তার চোখে কোনো ভয় ছিল না। সে রাফার দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময়, ভয়ংকর হাসি দিল, "খেলা এখনো শেষ হয়নি, ময়না। এই হাতকড়া আমাকে বেশি দিন আটকে রাখতে পারবে না। আমি আবার ফিরব... শুধুই তোমার জন্য।"
পুলিশ সাইয়েদকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ও সাইয়েদ পেছন ফিরে রাফার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাফা ঘরে একা দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে এখন সকালের তীব্র আলো ফুটছে। রাফা আয়নার দিকে তাকাল—তার ঘাড়ে, বুকে সাইয়েদের দেওয়া সেই পরিচিত হিংস্র ভালোবাসার দাগগুলো এখনো জ্বলজ্বল করছে। সাইয়েদ জেলে চলে গেছে সত্যি, কিন্তু সাইয়েদের বোনা এই বিষাক্ত অনুভূতির জালে রাফা সারাজীবনের জন্য বন্দী হয়ে গেছে। এই বন্ধন থেকে তার আর কোনোদিন মুক্তি নেই।
....