পাহাড় আর সাগরের মাঝখানের পিচঢালা আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে ছুটে চলছে একটি খোলা জিপ। বিকেলের আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। আকাশে সাঁঝের কালো ছায়া নামার ঠিক আগের মুহূর্তে বাতাসে যেমন এক ধরণের ভেজা আর বুনো সুবাস থাকে, চারপাশের পরিবেশে ঠিক সেই রোমাঞ্চ উপচে পড়ছে। জিপের স্টিয়ারিং ধরে আছে শুভ্র। শক্ত চোয়াল, চওড়া কাঁধ আর গভীর দুটি চোখ—যাতে অসীম দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি এক অচেনা সাহসের আভাস। সে পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় জরুরি একটি সেতু পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে সে। কাজের চাপ থাকলেও প্রকৃতির এমন মাতাল করা রূপে তার মন কিছুটা হালকা।
গাড়িটি যখন একটি পুরনো কাঠের ব্রিজের কাছে এসে থামল, ঠিক তখনই নামল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। শুভ্র গাড়ি থামিয়ে নেমে দাঁড়াল। পাহাড়ি নদীটার পানি হু হু করে বাড়ছে। হঠাৎই কিছু দূরে এক পুরনো রিসোর্টের বারান্দায় নজর গেল তার। সেখানে একা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে হাত বাড়াচ্ছিল। শুভ্র একটু সামনে এগোতেই যেন দৃশ্যটা থমকে গেল।
মেয়েটির পরনে সাধারণ অথচ চমৎকার এক রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। দীর্ঘ কালচে চুলগুলো পিঠ ঘেঁষে নেমে গেছে, আর তার চেহারায় এক আভিজাত্যের ছাপ। সে তন্নি। মধ্যপ্রাচ্যের এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবংশীয় পরিবারের মেয়ে, যে নিজের পড়াশোনা আর কিছুটা মানসিক প্রশান্তির খোঁজে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছে। তবে তার চারপাশে সবসময়ই পরিবারের দেওয়া একটা অদৃশ্য প্রাচীর থাকে, যা তাকে সাধারণ জীবন থেকে আলাদা রাখে। কিন্তু এই মুহূর্তে বৃষ্টি স্পর্শ করার সময় তার চোখে যে শিশুসুলভ সরলতা ছিল, তা শুভ্রর বুকে এক অজানা কম্পন তৈরি করল।
শুভ্র যখন রিসোর্টের শেডের নিচে এসে দাঁড়াল, তন্নি চমকে উঠে পিছু হটল। অপরিচিত পুরুষ দেখে তার চোখে কিছুটা দ্বিধা আর সম্ভ্রান্ত পরিবারের সেই চিরাচরিত দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা।
"ভয় পাবেন না," শুভ্রর কণ্ঠটা ছিল ভীষণ ভারী আর আশ্বস্ত করার মতো। "এই বৃষ্টিতে পাহাড়ি রাস্তা এখন কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। গাড়ি চালানো ঠিক হবে না বলেই এখানে একটু থামলাম।"
তন্নি শুভ্রর চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই, কেবল এক গভীর দায়িত্বশীল আর স্থির মানুষের প্রতিচ্ছবি। তন্নি মৃদু হেসে নিচু কণ্ঠে বলল, "ভয় পাইনি। তবে এখানকার বৃষ্টিটা বেশ অদ্ভুত... এত মেঘ, এত শব্দ।"
"আমাদের দেশের বৃষ্টি একটু এমনই, আগল ভাঙা," শুভ্রর ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
পরের দু-তিন দিন যেন কোনো রূপকথার মতো কেটে গেল। জরুরি কাজের ফাঁকেও শুভ্র সময় বের করে নিত, আর তন্নিও কেমন এক অদৃশ্য টানে বারবার রিসোর্টের বারান্দায় বা কাছের নদীর তীরে এসে দাঁড়াত। তন্নির পরিবারের কঠোর নিয়মকানুনের বাইরে এসে শুভ্রর মতো একজন স্পষ্টভাষী, নির্ভীক আর কেয়ারিং মানুষের সঙ্গে কথা বলা তার জীবনে নতুন আলো নিয়ে এলো।
শুভ্র লক্ষ্য করল, তন্নির কথা বলার ভঙ্গি, তার চোখের প্রতিটি চাহনি আর তার হাসিতে যেন এক তীব্র আকর্ষণ রয়েছে। অন্যদিকে, তন্নি মুগ্ধ হলো শুভ্রর সাহসিকতায়—একদিন পাহাড়ি এক স্থানীয় শিশুকে বিপজ্জনক এক খাদ থেকে এক হাতে তুলে এনেছিল শুভ্র। সেই দৃশ্য দেখে তন্নির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠেছিল। সেই রাতে যখন তারা নদীর তীরে নির্জন এক ঘাটে বসেছিল, আকাশে তখন মেঘ কেটে এক চিলতে চাঁদ উঠেছিল।
বাতাসে তন্নির চুলের সুবাস শুভ্রর মুখে এসে লাগছিল। শুভ্র আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে আস্তে করে তন্নির নরম হাতটি নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। তন্নি চমকে উঠেছিল, কিন্তু হাতটি সরিয়ে নেয়নি।
"তন্নি..." শুভ্র তন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গভীর কণ্ঠে বলল, "আমি জানি না এই কয়েক দিনের চেনা মানুষকে কীভাবে এভাবে বুকের গভীরে বসিয়ে ফেললাম। কিন্তু তোমার চোখের এই ভয়, এই রূপ—সবকিছু আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।"
তন্নির নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সে শুভ্রর এত কাছে এর আগে কখনো আসেনি। পুরুষালি এক বুনো গন্ধে আর শুভ্রর উষ্ণ স্পর্শে তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে শুভ্রর বুকের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিল।
"শুভ্র..." তন্নির কণ্ঠ কাঁপছিল, "আমি তো অন্য এক জগতের মেয়ে। আমার চারপাশে অনেক নিয়ম, অনেক শৃঙ্খল। তুমি কি পারবে আমাকে এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে?"
শুভ্র তন্নির চিবুক ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলল। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট দুটো তন্নির কপালে আর গালে চেপে ধরল। সে এক গভীর, ব্যাকুল আর আবেগঘন স্পর্শ। তন্নি শুভ্রর জামা শক্ত করে চেপে ধরে সেই উষ্ণতা নিজের ভেতর শুষে নিতে লাগল। শুভ্র ফিসফিস করে বলল, "পৃথিবীর সব বাধা পার করে হলেও আমি তোমাকে আমার করে নেব, তন্নি। এটা শুভ্রর কথা।"
তন্নি শুভ্রর শক্ত বুকে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলল। সেই পানি কষ্টের ছিল না, ছিল এক পরম পাওয়ার আনন্দে পূর্ণ। তারা দুজনেই জানত, এই অনুভূতি কতখানি গভীর আর সত্যি। কিন্তু তারা জানত না, তন্নির পরিবার ইতোমধ্যেই তার খোঁজে লোক পাঠিয়েছে এবং তাদের এই হঠাৎ গড়ে ওঠা ভালোবাসার পেছনে অপেক্ষা করছে এক বিশাল ঝড়।
রাতের অন্ধকারে যখন পাহাড়ি বাতাস বইছিল, তখন শুভ্রর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তন্নি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ নারী মনে করছিল। কিন্তু পরদিনই যে স্বপ্নের আকাশে কালো মেঘ নেমে আসবে, তা তাদের কল্পনার বাইরেই থেকে গিয়েছিল।
পাহাড়ের সেই মিষ্টি রাত পার হতেই পরের দিন ভোরটা নিয়ে এলো এক বিষাদময় সুর। ঘন কুয়াশা আর কালো মেঘে ছেয়ে আছে চারপাশ। রিসোর্টের ছোট্ট বারান্দায় শুভ্রর মুখোমুখি বসে ছিল তন্নি। শুভ্রর হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল তন্নি, যেন একটু আলগা হলেই শুভ্র হারিয়ে যাবে কোনো দূর অজানায়। তন্নির চোখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। সে শুভ্রকে তার পরিবারের কঠোর নিয়ম আর তাদের বংশের প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা জানাচ্ছিল।
"শুভ্র, আমার বাবা ও পরিবারের মানুষজন অত্যন্ত শক্ত মনের। তারা নিজেদের পছন্দের বাইরে একচুলও নড়েন না। আমাদের বংশের বাইরে বা কোনো সাধারণ জায়গায় বিয়ে দেওয়া তাদের কাছে নিজেদের আভিজাত্য নষ্ট হওয়ার মতো," তন্নির কণ্ঠে ছিল গভীর আকুলতা।
শুভ্র তন্নির থুতনি স্পর্শ করে নিজের দিকে ফেরাল। তার চোখে তখন এক ফোঁটাও দ্বিধা ছিল না, ছিল কেবল এক নির্ভীক পুরুষের ভালোবাসা আর দৃঢ়তা। সে তন্নির ঠোঁটে হালকা একটা পরশ দিয়ে নিচু ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "তন্নি, তোমার আভিজাত্য বা বংশের গৌরব দিয়ে আমি তোমাকে মাপিনি। আমি ভালোবেসেছি এই চোখে থাকা রূপ আর এই অবুঝ মনটাকে। তোমার পরিবার যা-ই বলুক না কেন, আমি নিজে গিয়ে তোমার বাবার সামনে দাঁড়াব। নিজের যোগ্যতা আর তোমাকে আগলে রাখার ক্ষমতা প্রমাণের সবটুকু দায়িত্ব আমার।"
শুভ্রর এই দৃঢ়তা তন্নির বুকের ভেতর এক তীব্র ভালোবাসার দোলা দিল। শুভ্রর চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে তন্নি এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পেল। শুভ্রও তার বাহু দুটো দিয়ে তন্নিকে আরও নিবিড় করে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল। পাহাড়ি চাটগাঁর বাতাস তখন তাদের ভালোবাসায় এক মাতাল করা হাওয়া বয়ে আনছিল। তন্নির চুলের সুবাস আর শরীরের মেঠো ও মিষ্টি গন্ধে শুভ্র নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল বারবার। শুভ্রর উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ তন্নির ঘাড় থেকে নেমে চিবুকে এসে থামতেই তন্নি এক পরম আবেগে শুভ্রর পিঠ চেপে ধরল। সে মুহূর্তটা ছিল সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব, যা কোনো বাধা মানতে রাজি ছিল না।
কিন্তু সেই সুখের মুহূর্ত স্থায়ী হলো না বেশি সময়।
হঠাৎই রিসোর্টের সামনে এসে থামল দুটি কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এলো তন্নির পরিবারের কিছু লোক এবং তাদের সঙ্গে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। খবর পেয়ে তন্নির পরিবার চটজলদি তাকে ফিরিয়ে নিতে লোক পাঠিয়েছে। রিসোর্টের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই তন্নির বড় ভাই মেহরাব তন্নিকে শুভ্রর এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধে ফেটে পড়ল।
"তন্নি! তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি! এই সাধারণ একটা ছেলের সঙ্গে তুমি এভাবে মেলামেশা করছ?" মেহরাব তন্নির হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল।
তন্নি যন্ত্রণায় কোঁকড়ে উঠল, "ভাইয়া, ছাড়ো আমাকে! তুমি শুভ্রকে চেনো না, ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলো না!"
শুভ্র এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে মেহরাবের হাত চেপে ধরল। শুভ্রর শক্ত চোয়াল আর চোখে জ্বলে উঠল আগ্নেয়গিরির আগুন। সে তন্নির হাত মেহরাবের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে এনে তন্নিকে নিজের পেছনে টেনে নিল।
"কাউকে জোর করার অধিকার আপনার নেই, তা সে যত বড় সম্ভ্রান্ত পরিবারেরই লোক হোক না কেন," শুভ্রর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল এক প্রদীপ্ত সাহসে। "তন্নিকে আঘাত করার চেষ্টা করবেন না।"
মেহরাব উপহাসের হাসি হেসে বলল, "তুমি জানো না তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ। তোমার মতো একটা ছেলেকে শেষ করে দিতে আমাদের এক মুহূর্তও লাগবে না।"
নিরাপত্তারক্ষীরা শুভ্রকে ঘিরে ধরল। কিন্তু শুভ্র এতটুকু বিচলিত হলো না। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বুঝে তন্নি শুভ্রর জামার হাতা চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, "শুভ্র, প্লিজ... তুমি কিছু কোরো না। এরা তোমার ক্ষতি করে দেবে। আমি যাচ্ছি, কিন্তু আমি তোমাকে ভুলে যাব না।"
মেহরাব আর তার লোকেরা জোর করে তন্নিকে গাড়িতে তুলল। গাড়ি চলতে শুরু করলে তন্নি পেছনের কাচ দিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠল। শুভ্র গাড়ির পেছনে কিছুক্ষণ দৌড়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সে তন্নির চোখের পানি আর আকুতি দেখতে পাচ্ছিল। হাত মুঠো করে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যেভাবেই হোক, সে ঢাকা গিয়ে তন্নির বাবার সামনে দাঁড়াবে এবং তন্নিকে নিজের করে ফিরিয়ে আনবে।
তন্নিকে তার নিজ বাড়িতে এক প্রকার বন্দি করে রাখা হলো। বাইরের জগতের সাথে তার সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেড়ে নেওয়া হলো ফোন। তার ওপর নামল মানসিক নির্যাতনের পাহাড়। তন্নির বাবা সরাসরি তাকে জানিয়ে দিলেন, পরিবারের পুরনো বন্ধুর ছেলে এবং ধনী এক ব্যবসায়ীর সাথে খুব শিগগিরই তার বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। তন্নির কান্না, আকুতি বা কোনো তর্কই কাজ করল না।
তন্নি নিজের ঘরের কোণে বসে শুভ্রর সেই গভীর স্পর্শ আর প্রতিশ্রুতির কথা মনে করে রাত কাটাতে লাগল। শুভ্রর গায়ের বুনো গন্ধ যেন এখনো তন্নির গায়ে জড়িয়ে আছে। সে মনে মনে জপতে লাগল—"শুভ্র, তুমি এসো... আমাকে এই খাঁচা থেকে মুক্ত করো।"
অন্যদিকে, শুভ্র ঢাকায় ফিরে এসে নিজের সমস্ত শক্তি ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তন্নির বাড়ির ঠিকানা বের করল। সে সিদ্ধান্ত নিল, সরাসরি তন্নির বাবার মুখোমুখি হবে। কিন্তু সে জানত না, তন্নির পরিবার আর তাদের আভিজাত্যের অহংকার তার সামনে এমন এক ষড়যন্তের জাল বিছিয়ে রাখছে, যা তাকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
ঢাকার আলোঝলমলে শহরের বুকে তখন এক পশলা বৃষ্টির পর ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। তবে সেই বাতাসের স্নিগ্ধতা পৌঁছাতে পারছিল না শুভ্রর উত্তপ্ত হৃদয়ে। তন্নির খবরের আশায় সে এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারছিল না। তার সব প্রচেষ্টা, সব যোগাযোগ সে কাজে লাগাচ্ছিল শুধু তন্নির কাছে পৌঁছানোর জন্য। তন্নির পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ উপায়ে তাদের প্রাসাদোপম বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তবুও শুভ্র সাহসে ভর করে একদিন সন্ধ্যায় সরাসরি তন্নির বাবার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাদের গুলশানের বাসভবনে গিয়ে উপস্থিত হলো।
বিশাল ফটকের সামনে শুভ্রকে থামিয়ে দিল সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীরা। খবর পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো তন্নির বড় ভাই মেহরাব। তার মুখে ছিল এক কঠিন, কুটিল উপহাসের হাসি।
"তুমি সত্যিই নাছোড়বান্দা," মেহরাব শুভ্রর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল। "তোমাকে পাহাড়ে সতর্ক করা হয়েছিল, তবুও তুমি নিজের সীমা অতিক্রম করার দুঃসাহস দেখাচ্ছ।"
শুভ্র তার মাথা উঁচু রেখে ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, "আমি কোনো অন্যায় করতে আসিনি। আমি তন্নির বাবার সাথে কথা বলতে চাই। তন্নি আর আমি একে অপরকে ভালোবাসি। আমি কোনো ধনী রাজপুত্র নই, কিন্তু তন্নিকে সারাজীবন সম্মান ও ভালোবাসায় মুড়ে রাখার ক্ষমতা আমার আছে।"
মেহরাব উচ্চস্বরে হেসে উঠল, যা শুভ্রর পুরুষালি অপমানে এক তীব্র আগুনের ফুলকি জ্বালিয়ে দিল। "আমাদের বোন তোমার মতো এক সাধারণ ইঞ্জিনিয়ারের হাত ধরে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কুঁড়েঘরে যাবে না। আর শোনো, তন্নির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহেই ওর আকদ। তুমি যদি আর কখনো এই বাড়ির আশেপাশে দেখা দাও, তবে তার পরিণতি তোমার পরিবারের জন্যও ভালো হবে না।"
শুভ্রর মেজাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। সে এক পা এগিয়ে মেহরাবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তন্নির সম্মতি ছাড়া এই বিয়ে হতে পারে না। আমি তন্নির মুখ থেকে শুনতে চাই।"
ঠিক তখনই মেহরাবের ইঙ্গিতে পেছন থেকে চার-পাঁচজন শক্তিশালী লোক এসে শুভ্রকে ঘিরে ধরল। শুভ্র সাহসের সাথে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল, কিন্তু অতর্কিত আক্রমণে সে আহত হলো। তাকে চড়-থাপ্পড় ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে রাস্তার একপাশে ফেলে দেওয়া হলো। তারা শুভ্রর ফোন ও মানিব্যাগ কেড়ে নিয়ে এক অন্ধকার গলিতে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে চলে গেল।
শুভ্র যখন অর্ধচেতন অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছিল, তখন তার মনের গভীরে কেবল ভেসে উঠছিল তন্নির সেই অশ্রুসজল চোখ দুটো। তন্নির স্পর্শ, তার নরম নিঃশ্বাসের তোড় আর পাহাড়ি নদীর ধারে কাটানো সেই ব্যাকুল রাতগুলোর স্মৃতি শুভ্রর বুকে এক হাহাকার তৈরি করছিল। সে উঠতে চাইল, কিন্তু শরীরের প্রচণ্ড কষ্টে আবার নেতিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে যখন শুভ্রর চেতনা ফিরল, সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক অচেনা জায়গায়। কিন্তু বিপদের এখানেই শেষ ছিল না। মেহরাব ও তার পরিবার কেবল মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি, শুভ্রকে পুরোপুরি পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে এক মিথ্যা ও গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। শুভ্র যে সরকারি সেতু পুনর্নির্মাণের কাজ করছিল, সেই প্রজেক্টের নথিপত্র জাল করে তাকে এক বিশাল জালিয়াতির জালে জড়িয়ে দেওয়া হলো।
পুলিশ শুভ্রকে সেই হাসপাতাল সদৃশ ঘর থেকেই গ্রেপ্তার করল। শুভ্রর জন্য এটি ছিল এক বিশাল ধাক্কা। সে বুঝে উঠতে পারছিল না কীভাবে নিজের নির্দোষ প্রমাণ করবে, আর অন্যদিকে তন্নির বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছিল। শুভ্র কারারুদ্ধ হয়ে পড়ল, বাইরের জগতের সাথে তার সমস্ত যোগাযোগ এক লহমায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
এদিকে তন্নি তার ঘরে বন্দিনী। তার কাছ থেকে সব খবর গোপনে রাখা হচ্ছিল। মেহরাব অত্যন্ত চালাকির সাথে তন্নির সামনে এক জাল পরিবেশ তৈরি করল। সে তন্নিকে গিয়ে জানাল, "তোমার সেই প্রিয় শুভ্রকে আমি নিজে টাকা দিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলাম তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। জানো সে কী করেছে? সে মোটা অঙ্কের টাকা আর একটা নতুন প্রজেক্টের চুক্তি সই করে কাল রাতেই শহর ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে। তোমার ভালোবাসা তার কাছে কয়েকটা টাকার সমান ছিল।"
তন্নি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পায়ের নিচের মাটি যেন ধসে গেল। "না, এটা হতে পারে না! শুভ্র আমাকে ভালোবাসে, সে এমন করতে পারে না!" তন্নি চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
"টাকার কাছে ভালোবাসার কোনো দাম নেই, তন্নি," মেহরাব ঠাণ্ডা কণ্ঠে মিথ্যা বলে গেল। "যে ছেলে তোমার বিপদে তোমাকে ফেলে টাকাকে বেছে নিতে পারে, তার জন্য চোখের পানি ফেলা বোকামি।"
তন্নির বুকের ভেতরের বিশ্বাসটা এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে মানুষটার বুকে মাথা রেখে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত অনুভব করেছিল, যে ঠোঁটের স্পর্শে সে নিজেকে সমর্পণ করেছিল, সেই মানুষটা তাকে টাকার জন্য বিক্রি করে দিল? তন্নির ভেতরের সব আলো এক মুহূর্তে নিভে গেল। অতিরিক্ত মানসিক যন্ত্রণায় তন্নি আর কোনো প্রতিবাদ করার শক্তি পেল না।
পরিবারের চাপ আর শুভ্রর প্রতি জন্মানো তীব্র অভিমান ও ক্ষোভে তন্নি অবশেষে বিয়ের নথিতে সই করতে বাধ্য হলো। কিন্তু সে জানত না, তার ভালোবাসার মানুষটি তখন এক অন্ধকার কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে তন্নির নাম জপছিল আর তার কাছে পৌঁছানোর এক মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। দুটি হৃদয় এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আলাদা হয়ে গেল, আর পেছনে ফেলে গেল এক দীর্ঘ নিঃশব্দ বিচ্ছেদ।
জেলখানার স্যাঁতসেঁতে কালকুঠুরিতে দিন আর রাতের হিসাব হারিয়ে যাচ্ছিল শুভ্রর। লোহার গরাদের ওপারে আকাশের এক চিলতে আলো যখন মেঝেতে এসে পড়ত, শুভ্র সেই আলোটার দিকে তাকিয়ে কেবল তন্নির কথা ভাবত। তার পিঠে ও শরীরে মেহরাবের লোকেদের দেওয়া আঘাতের দাগগুলো শুকিয়ে এলেও, বুকের ভেতরের ক্ষতটা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছিল। সে জানত না তন্নি এখন কোথায়, কেমন আছে, কিংবা তার আকদ সত্যিই হয়ে গেছে কিনা।
শুভ্রর জন্য মামলাটি লড়ার মতো কেউ ছিল না, কারণ মেহরাব ও তার বাবার প্রভাবে শহরের কোনো নামজাদা আইনজীবী এই কেস হাতে নিতে রাজি হয়নি। উপরন্তু, তার বিরুদ্ধে যে সরকারি প্রজেক্টের অর্থ আত্মসাতের ভুয়া নথিপত্র দাঁড় করানো হয়েছিল, তা এতই নিখুঁত ছিল যে শুভ্র নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না।
কখনো কখনো গভীর রাতে যখন পুরো কারাগার নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন শুভ্রর মন উথাল-পাথাল করে উঠত। পাহাড়ি নদীর ঘাটে তন্নির গা ঘেঁষে বসে থাকার সেই স্মৃতি, তন্নির রেশমি চুলের সুবাস আর তার ঠোঁটের সেই মৃদু কাঁপুনি শুভ্রকে কুরে কুরে খেত।
"তন্নি..." শুভ্র দেয়ালের গায়ে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলত, "তুমি অন্তত আমায় ভুল বোঝো না। আমি তোমার কাছে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি যে বন্দী। আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।"
অন্যদিকে, তন্নির জীবনে তখন এক গভীর শূন্যতা। পরিবারের পছন্দের পুরুষ, এক সফল ব্যবসায়ী ফাইয়াজের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই সংসার ছিল কেবল নামমাত্র। ফাইয়াজ লোক হিসেবে খারাপ ছিল না, কিন্তু আভিজাত্য আর ব্যবসার হিসেবনিকেশের বাইরে ভালোবাসার মতো গভীর আবেগ তার ভেতরে ছিল না। তন্নি তার স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিল এক যান্ত্রিক পুতুলের মতো। তার হাসি, তার চঞ্চলতা, বৃষ্টি দেখে হাত বাড়ানোর সেই শিশুসুলভ আনন্দ—সব যেন এক নিমেষে উবে গিয়েছিল।
ব বিয়ের রাতে যখন ফাইয়াজ তার কাছাকাছি আসতে চেয়েছিল, তন্নি থরথর করে কেঁপে উঠেছিল। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল শুভ্রর সেই বুনো অথচ ভীষণ যত্নশীল ভালোবাসার স্পর্শ। শুভ্রর দেওয়া সেই তীব্র আবেগঘন পরশ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের উপস্থিতি তন্নির কাছে এক প্রকার যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তন্নি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, সে এই সম্পর্কের জন্য মানসিকভা বা শারীরিকভাবে প্রস্তুত নয়। ফাইয়াজও নিজের অহংকার বজায় রাখতে তন্নির ওপর জোর করেনি, তবে তাদের মধ্যকার দূরত্ব দিন দিন দেয়ালের মতো উঁচু হতে শুরু করল।
তন্নি মনে মনে শুভ্রকে ঘৃণা করার চেষ্টা করত। সে নিজেকে বোঝাত, যে পুরুষ টাকার লোভে তাকে ছেড়ে যেতে পারে, তার জন্য স্মৃতি ধরে রাখা বোকামি। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলে শুভ্রর সেই গভীর ও বিশ্বাসী চোখ দুটি তার চোখের সামনে ভেসে উঠত। তন্নির মন বারবার প্রশ্ন করত—সত্যিই কি শুভ্র তাকে ভালোবাসেনি? নাকি সবটাই অভিনয় ছিল? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।
দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ পাঁচটি বছর।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেল। ফাইয়াজ ব্যবসায়িক কাজে বেশির ভাগ সময় দেশের বাইরে কাটাতে শুরু করল, আর তন্নি নিজেকে গুটিয়ে নিল এক নিঃসঙ্গ জীবনের আড়ালে। সে ঢাকার এক সমাজসেবামূলক সংস্থায় কাজ শুরু করল, যেখানে অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনা করানো হয়। সেই শিশুদের হাসির মাঝে তন্নি নিজের হারিয়ে যাওয়া সুখ খোঁজার চেষ্টা করত।
অন্যদিকে, পাঁচ বছর ধরে আইনি লড়াই আর অন্ধকারের মধ্যে বন্দি থাকার পর, শুভ্রর জীবনে এক অলৌকিক পরিবর্তন এলো। কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হতে চলল এবং শুভ্র মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পেল, তবে এক অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে। সে যখন কারাগারের ভারী লোহাড় ফটক পেরিয়ে বাইরের মুক্ত আকাশে এসে দাঁড়াল, তখন সে আর সেই আগের চঞ্চল, প্রাণবন্ত শুভ্র ছিল না। তার চেহারায় এক রুক্ষ গম্ভীরতা, চোখে অসীম বিষাদ আর শক্ত চোয়ালে এক প্রতিশোধের নয়, বরং নিজের সত্য প্রমাণের চরম জেদ।
শুভ্র মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করল। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির হর্ন—সবকিছু তার কাছে অচেনা লাগছিল। তার কাছে কোনো টাকা ছিল না, কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। কেবল ছিল এক বুক অভিমান আর তন্নির প্রতি থাকা সেই চিরন্তন ব্যাকুলতা। সে জানত না তন্নি এখন কোথায়, সে হয়তো এখন অন্য কারো সংসারে সুখে আছে। তবুও শুভ্রর মন তাকে বলছিল, তন্নির সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত একবার সত্যটা প্রকাশ করা দরকার—সে প্রতারক ছিল না।
কারাগার থেকে বেরিয়ে শুভ্রর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কেবল এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ। গায়ে জীর্ণ পোশাক, হাতে কোনো অর্থ নেই, আর মাথায় এক মিথ্যা অপবাদের মারাত্মক বোঝা। সমাজ তাকে এক দুর্নীতিগ্রস্ত আসামি হিসেবে দেখেছে। কিন্তু শুভ্র ভেঙে পড়ার পাত্র ছিল না। সে জানত, ভেঙে পড়লে মেহরাব আর তন্নির পরিবারের সেই কুটিল ষড়যন্তেরই জয় হবে। নিজের হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনা আর তন্নির কাছে পৌঁছানোর জন্য তাকে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।
প্রথম কিছুদিন শুভ্রকে এক ছোট মেসবাড়িতে থাকতে হলো। দিনমজুরের মতো কাজ করে আর ছোটখাটো কনস্ট্রাকশনের সাইটে সাধারণ তদারকি করে সে নিজের খাবারের খরচ জোগাড় করত। তবে তার চোখ থাকত সবসময় আইনের বই আর পুরনো নথিপত্রের ওপর। মেহরাব কীভাবে প্রজেক্টের নথিপত্র জাল করে তাকে ফাঁসিয়েছিল, সেগুলোর প্রমাণ যোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাজ। তবুও শুভ্র হার মানেনি। প্রতিটা রাতের অন্ধকারে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, শুভ্র তখন তার ছেঁড়া ডায়েরিতে ঘটনার প্রতিটা মুহূর্তের বিবরণ লিখে রাখত।
অন্যদিকে, তন্নির জীবনও বয়ে চলছিল এক বিষণ্ণ মোহনায়। ফাইয়াজের সাথে তার সংসার জীবনের দূরত্ব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তারা কেবল একই ছাদের নিচে থাকা দুই অচেনা ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ফাইয়াজ নিজের ব্যবসা আর আভিজাত্য নিয়ে ব্যস্ত থাকত, তন্নির মনের খবরের তোয়াক্কা সে করত না। তন্নিও নিজের মতো করে সময় কাটাত সমাজসেবামূলক সংস্থায়।
এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে, তন্নি তার চ্যারিটি ট্রাস্টের কাজে এক আইনি সহায়তা কেন্দ্রে গিয়েছিল। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু আইনি কাগজপত্র তৈরি করার প্রয়োজন ছিল। সেই আইনি সহায়তা কেন্দ্রে নতুন যোগ দিয়েছে এক তরুণ ও অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন আইনজীবী, নাম আয়ান। আয়ান কেবল পেশাদার আইনজীবী ছিল না, সে ছিল অসম্ভব ন্যায়পরায়ণ এক মানুষ, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এক চুলও পিছুপা হয় না।
আইনি কাজের সূত্র ধরে তন্নির সাথে আয়ানের এক সখ্যতা গড়ে উঠল। কাজের ফাঁকে একদিন কথা বলতে বলতে আয়ান তন্নির বিষণ্ণ চোখের পেছনের কষ্টটা আঁচ করতে পারল।
"তন্নি আপা," আয়ান খুব যত্ন নিয়ে বলল, "আপনার চোখে আমি এক বিরাট বোঝার ছায়া দেখতে পাই। আপনি মুখে হাঁসেন, কিন্তু আপনার মন যেন এক কঠিন অতীতে আটকে আছে।"
তন্নি মৃদু হেসে চোখ ফিরিয়ে নিল। "কিছু কিছু অতীত চিরকাল বুকের ভেতর আটকে থাকে, আয়ান। যা কখনো বদলানো যায় না।"
ঠিক তার কয়েক দিন পর, এক অলৌকিক কাকতালীয় ঘটনায় আয়ানের চেম্বারে এসে হাজির হলো শুভ্র। শুভ্র কোনো কেস লড়ার উদ্দেশ্যে আসেনি, সে এসেছিল আয়ানের ছোট সংস্থায় এক সাধারণ তদারককারীর কাজ চেয়ে। আয়ান শুভ্রর রুক্ষ চেহারার পেছনে এক উচ্চশিক্ষিত, স্পষ্টভাষী আর অসীম সৎ মানুষের আত্মমর্যাদা দেখতে পেল। শুভ্র নিজের অতীতের কথা গোপন রাখলেও আয়ান বুঝতে পারল এই লোকটির পেছনে কোনো বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে।
শুভ্রকে নিজের সংস্থায় কাজ দিল আয়ান। আস্তে আস্তে আয়ানের সাথে শুভ্রর এক গভীর বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হলো। শুভ্র আয়ানের আইনি কাজে ছোটখাটো সাহায্য করতে শুরু করল।
একদিন রাতে আয়ানের চেম্বারে কাজ করার সময় শুভ্রর ব্যাগ থেকে ভুলবশত একটি পুরনো ছবি মেঝেতে পড়ে গেল। ছবিটি ছিল সেই পাহাড়ি রিসোর্টের বারান্দায় তোলা—বৃষ্টির পানিতে হাত বাড়ানো তন্নির এক আবছা ছবি, যা শুভ্র তার ক্যামেরায় বন্দি করেছিল এবং এখনো বুকে আগলে রেখেছে।
আয়ান ছবিটি কুড়িয়ে নিয়ে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ কপালে উঠল।
"শুভ্র ভাই... এই ছবিটা..." আয়ান অবাক হয়ে শুভ্রর দিকে তাকাল। "এই মেয়েটিকে তো আমি চিনি! ইনি তো তন্নি আপা!"
শুভ্রর শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। তন্নির নাম শুনতেই তার চোখ দুটি বড় হয়ে উঠল, বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল।
"তুমি... তুমি তন্নিকে চেনো?" শুভ্র আয়ানের জামার কলার প্রায় চেপে ধরার মতো করে আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। "কোথায় সে? কেমন আছে সে? বলো আয়ান!"
আয়ান শুভ্রর এই তীব্র আকুলতা আর ব্যাকুলতা দেখে ভীষণ অবাক হলো। সে শান্ত স্বরে বলল, "শুভ্র ভাই, আপনি শান্ত হন। তন্নি আপা ঢাকায় আছেন। কিন্তু আপনি কীভাবে তাকে চেনেন? আর আপনার এই অবস্থা কেন?"
শুভ্র তখন নিজের সামর্থ্য হারিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। তার চোখ বেয়ে নেমে এলো দীর্ঘ পাঁচ বছরের জমানো অশ্রু। সে রুদ্ধ কণ্ঠে আয়ানের কাছে নিজের জীবনের সমস্ত সত্য প্রকাশ করতে শুরু করল—সেই পাহাড়ি রাতের ভালোবাসা, তন্নির পরিবারের বাধা, মেহরাবের আঘাত, ভুয়া মামলা দিয়ে তাকে জেলে পাঠানো আর তন্নির মিথ্যা বিদায়ের সব সত্য কাহিনী।
শুভ্রর কথা শুনতে শুনতে আয়ানের শক্ত চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, তন্নি যে মানুষটির বিরুদ্ধে প্রতারণার অপবাদ নিয়ে বেঁচে আছে, সেই মানুষটি আসলে এক বিশাল চক্রান্তের শিকার! আর শুভ্র যাকে ভেবেছিল সে ছেড়ে চলে গেছে, সেই তন্নিও এক মিথ্যা বিশ্বাসের আগুনে আজীবন পুড়ছে।
আয়ান শুভ্রর হাত চেপে ধরে বলল, "শুভ্র ভাই, আমি এই অন্যায় মেনে নেব না। তন্নি আপাকে সত্য জানতেই হবে। আর যে শত্রুরা আপনার জীবন তছনছ করেছে, তাদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর দায়িত্ব এখন আমার!"
পাঁচ বছর পর শুভ্রর অন্ধকার জগতে এক নতুন আলোর রশ্মি দেখা দিল। তন্নি আর শুভ্রর চিরতরে আলাদা হয়ে যাওয়া পথ দুটি আবার এক অদৃশ্যবিন্দুর দিকে এগোতে শুরু করল।
আয়ানের চেম্বারে তখন পিনপতন নীরবতা। শুভ্রর মুখে পুরো সত্য শোনার পর আয়ান এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করেনি। একজন তরুণ ও আদর্শবাদী আইনজীবী হিসেবে সে জানত, এই সত্য কেবল শুভ্র আর তন্নির জীবনকেই নতুন মোড় দেবে না, বরং মেহরাবের মতো ক্ষমতাধর মানুষের আড়ালে থাকা অপরাধ সাম্রাজ্যের মুখোশ টেনে খুলবে। তবে লড়াইটা সহজ ছিল না; মেহরাবের বিরুদ্ধে ভুয়া মামলার চক্রান্ত প্রমাণ করা আর তন্নির সামনে এত বছরের জমানো মিথ্যার প্রাচীর ভাঙা—দুটোই ছিল অসম্ভব কঠিন চ্যালেঞ্জ।
আয়ান প্রথমে শুভ্রর পুরোনো মামলার নথিগুলো নতুন করে পরীক্ষা করতে শুরু করল। সে গোপন সূত্রে জানতে পারল, মেহরাব যে সরকারি সেতুর দুর্নীতির নথিপত্র তৈরি করেছিল, তাতে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের এক অসাধু কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছিল। আয়ান শুভ্রকে আড়ালে রেখে সেই কর্মকর্তার পেছনে নিজের এক বিশ্বস্ত লোক লাগাল, যাতে উপযুক্ত প্রমাণ ও স্বীকারোক্তি যোগাড় করা যায়।
অন্যদিকে, আয়ান সিদ্ধান্ত নিল তন্নির মুখোমুখি হওয়ার। তবে হুট করে কিছু বললে তন্নি হয়তো বিশ্বাস নাও করতে পারে, কারণ মেহরাব তার মনে শুভ্রর বিরুদ্ধে চরম বিষ ঢেলে রেখেছিল।
পরদিন বিকেলে আয়ান তন্নিকে তার চ্যারিটি ট্রাস্টের কাজের বাহানায় নিজের অফিসে ডেকে পাঠাল।
তন্নি যখন আয়ানের চেম্বারে এসে বসল, তার পরনে ছিল এক সাধারণ নীল রঙের শাড়ি। চেহারায় সেই চিরাচরিত রূপ থাকলেও চোখ দুটোতে ছিল এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার ছায়া। আয়ান শান্ত ভঙ্গিতে তন্নির সামনে কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বসল।
"তন্নি আপা," আয়ান খুব মেপে মেপে কথা বলতে শুরু করল, "আজ আমি কোনো আইনি কাজের জন্য আপনাকে ডাকিনি। আজ আমি আপনাকে এমন একটি সত্য বলতে চাই, যা জানার অধিকার আপনার অনেক আগেই ছিল।"
তন্নি একটু অবাক হয়ে আয়ানের দিকে তাকাল। "কীসের সত্য, আয়ান? তুমি তো জানো আমার জীবনে রহস্য বা নতুন কিছু জানার আর কিছু বাকি নেই।"
আয়ান টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ডায়েরি আর পাহাড়ি নদীর ধারে তোলা সেই ঝাপসা ছবির কপিটি রাখল। তন্নির চোখ সেই ছবিটার ওপর পড়তেই তার সমস্ত শরীর রেশমি সুতোর মতো কেঁপে উঠল। সেই ছবি, সেই পাহাড়ি ব্যাকগ্রাউন্ড, আর সেই নদীর হাওয়া—সব যেন এক নিমেষে তন্নিকে পাঁচ বছর পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
"এ... এই ছবি তোমার কাছে কীভাবে এলো?" তন্নির কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, চোখে জমে উঠছিল এক অজানা আতঙ্ক আর বিস্ময়।
আয়ান গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, "যাকে আপনি প্রতারক মনে করে গত পাঁচটা বছর হৃদয়ে ঘৃণা আর কষ্ট পুষে রেখেছেন, এই ছবিটা তার বুকের ভেতরে আগলে রাখা শেষ স্মৃতি।"
তন্নি একঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। "আয়ান! তুমি কার কথা বলছ? শুভ্র? যে টাকার জন্য আমাকে বিক্রি করে পালিয়ে গিয়েছিল? সেই বিশ্বাসঘাতকের নাম আমার সামনে নিও না!"
"শুভ্র ভাই পালিয়ে যাননি, তন্নি আপা!" আয়ানের গলায় এক প্রদীপ্ত প্রখরতা ফুটে উঠল। "তাকে টাকার লোভ দেখিয়ে বিদায় দেওয়া হয়নি। তাকে আপনার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আপনার ভাই মেহরাব আর তার লোকেরা শুভ্র ভাইকে মেরে রক্তাক্ত করে এক গলিতে ফেলে দিয়েছিল। আর শুধু তা-ই নয়, তাকে আপনার পথ থেকে চিরতরে সরাতে এক মিথ্যা দুর্নীতির মামলায় ফাঁসিয়ে পাঁচ বছরের জন্য জেলে পাঠানো হয়েছিল!"
তন্নির মাথার ভেতর যেন এক বিশাল বজ্রপাত হলো। তার চারপাশের পৃথিবীটা এক নিমেষে দোলে উঠল। সে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল।
"না... না, এ হতে পারে না! ভাইয়া আমাকে বলেছিল শুভ্র টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেছে..." তন্নির দুই চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
আয়ান শুভ্রর কারাদণ্ডের নথি, ভুয়া কেসের কপি আর শুভ্রর হাতে লেখা সেই ডায়েরির পাতাগুলো তন্নির সামনে মেলে ধরল। "প্রতিটা রাত যখন আপনি শুভ্র ভাইকে ঘৃণা করেছেন, সেই প্রতিটা রাত শুভ্র ভাই জেলের স্যাঁতসেঁতে কালকুঠুরিতে বসে আপনার নাম জপেছেন। তিনি এখনো কোনো অপরাধী নন, কেবল এক ষড়যন্ত্রের শিকার।"
তন্নি ডায়েরির পাতাগুলো স্পর্শ করল। সেখানে শুভ্রর হাতে লেখা প্রতিটি শব্দে তন্নির প্রতি থাকা আকুল ভালোবাসা, যন্ত্রণা আর অসমাপ্ত আবেগের কথা লেখা রয়েছে। তন্নি আর নিজের কান্নার বেগ সামলাতে পারল না। সে দু-হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার পাঁচ বছরের জমাকৃত রাগ, ঘৃণা আর অভিমান এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল, আর তার জায়গায় ফিরে এলো শুভ্রর জন্য থাকা সেই তীব্র ও গভীর ভালোবাসা।
"শুভ্র..." তন্নি রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, "আমার শুভ্র কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি! আমি কী ভুল ভেবেছিলাম... আমি কী অন্যায় করেছি তার সাথে!"
তন্নি আকুল হয়ে আয়ানের হাত চেপে ধরল। "আয়ান, শুভ্র কোথায়? ও কোথায় আছে? আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো, প্লিজ! আমি আর এক মুহূর্তও তাকে ছাড়া থাকতে পারছি না।"
আয়ান একটু থামল। সে বলল, "শুভ্র ভাই পাশেই আছেন। কিন্তু তন্নি আপা, কেবল সত্য জানলেই হবে না। আপনাকে মেহরাবের অন্যায় আর অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াাতে হবে। শুভ্র ভাইয়ের হারানো সম্মান আমাদের ফিরিয়ে দিতেই হবে।"
তন্নির চোখে তখন কান্নার পানির মাঝেই এক চরম প্রতিশোধ আর ভালোবাসার আগুন জ্বলে উঠল। সে শুভ্রকে ফিরে পাওয়ার জন্য আর শুভ্রর ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে যে কোনো সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত হয়ে গেল।
আয়ানের চেম্বারের ভেতরের ছোট ঘরটির দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল শুভ্র। পাঁচ বছরের রোদ-বৃষ্টি, জেলখানার অন্ধকার আর চরম কষ্টের ছাপ তার চেহারায় স্পষ্ট, কিন্তু তার চোখ দুটি ছিল সেই আগের মতোই গভীর আর প্রদীপ্ত।
তন্নি পেছনে ফিরে তাকাল। তার চোখের সামনে আজ কোনো কাল্পনিক প্রতারক নেই, দাঁড়িয়ে আছে তার সেই চিরচেনা শুভ্র—যার শক্ত চওড়া বুকে একসময় সে পৃথিবীর সমস্ত সুরক্ষা খুঁজে পেয়েছিল।
তন্নির পা দুটো যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল। সে কয়েক পা এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পাঁচ বছরের ভুল বোঝাবুঝি আর নিজের প্রতি জন্মানো তীব্র অপরাধবোধ তাকে থমকে দিল। তন্নির দুই চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
"শুভ্র..." তন্নির মেঠো কণ্ঠস্বর কাঁপছিল এক তীব্র যন্ত্রণায়। "তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও... আমি কীভাবে পারলাম তোমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করতে? কীভাবে ভাবলাম তুমি টাকার জন্য আমাকে ছেড়ে গেছ?"
শুভ্র এক মুহূর্ত চুপ করে তন্নির দিকে তাকিয়ে রইল। তন্নির এই রূপ, তার চোখের প্রতিটি পানির ফোঁটা শুভ্রর বুকের ভেতর এক তীব্র হাহাকার তৈরি করল। শুভ্র ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে কোনো কথা না বলে তন্নির মুখোমুখি দাঁড়াল। পাঁচ বছরের দীর্ঘ ব্যবধান, মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকগুলো দুঃখের দেয়াল—সব যেন এক নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
শুভ্র তার শক্ত কিন্তু পরম যত্নশীল হাত দুটো দিয়ে তন্নির জলভেজা মুখখানা তুলে ধরল। তার হাতের ছোঁয়া পেতেই তন্নি শিউরে উঠল। শুভ্রর আঙুলের উষ্ণতা তন্নির সমস্ত শরীর ও মনের ক্ষতগুলোতে যেন মলম লাগিয়ে দিল।
"তন্নি," শুভ্রর কণ্ঠটা ছিল ভীষণ ভারী আর আবেগে রুদ্ধ। "আমি তোমাকে কখনো দোষ দিইনি। আমি জানতাম পরিস্থিতি আমাদের আলাদা করেছে। যে স্পর্শ আমি তোমাকে দিয়েছিলাম, যে প্রতিজ্ঞা আমি পাহাড়ি নদীর ঘাটে করেছিলাম—তা কোনো টাকার অঙ্কে বিক্রি হওয়ার ছিল না।"
শুভ্রর এই কথায় তন্নি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আছড়ে পড়ল শুভ্রর বুকের ওপর। দুই হাতে শুভ্রর জামা শক্ত করে চেপে ধরে সে তার বুকের মাঝখানে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। শুভ্র তার বাহু দুটো দিয়ে তন্নিকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন আর কখনোই তাকে নিজের বুক থেকে আলাদা হতে দেবে না।
শুভ্র তন্নির চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিল। তন্নির রেশমি চুলের সেই পরিচিত মেঠো সুবাস শুভ্রকে মাতাল করে তুলল। সে তন্নির কপালে আর চিবুকে নিবিড় ভালোবাসায় ঠোঁট চেপে ধরল। তন্নি শুভ্রর ঘাড় চেপে ধরে তার ঠোঁটের সেই তীব্র, আকুল স্পর্শ নিজের মধ্যে শুষে নিতে লাগল। পাঁচ বছরের তৃষ্ণার্ত দুটি হৃদয় যেন অবশেষে এক নতুন জীবনের সন্ধান পেল। সেই স্পর্শে ছিল না কোনো দ্বিধা, কেবল ছিল একে অপরকে সমর্পণ করার চরম আকুলতা।
কয়েক মুহূর্ত পর, যখন তাদের আবেগের প্রাবল্য কিছুটা কমাল, আয়ান কাশি দিয়ে তাদের অনুভূতির জগতে ফেরাল।
"শুভ্র ভাই, তন্নি আপা," আয়ান খুব দায়িত্বশীল কণ্ঠে বলল, "আপনাদের এই ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন শুভ্র ভাইয়ের ওপর থাকা মিথ্যা অপবাদের দাগ পুরোপুরি মুছে যাবে। আর তার জন্য আমাদের এখন কঠোর হতে হবে।"
তন্নি শুভ্রর হাত শক্ত করে ধরে আয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে এখন কান্নার জল নেই, আছে মেহরাব আর নিজের পরিবারের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চরম দৃঢ়তা।
"আয়ান, তুমি বলো আমাকে কী করতে হবে," তন্নির কণ্ঠে ছিল এক নতুন তেজ। "যে ভাইয়া আমার জীবন তছনছ করেছে, যে শুভ্রকে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও জেলে পাঠিয়েছে—আমি তার আর কোনো অন্যায় সহ্য করব না।"
আয়ান তার পরিকল্পনা খুলে বলল। মেহরাবের বিরুদ্ধে সেই দুর্নীতির নথিপত্র জাল করার মূল সাক্ষী এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের সেই অসাধু কর্মকর্তা এখন আয়ানের নিয়ন্ত্রণে। আগামী কালই হাইকোর্টে শুভ্রর পুনর্বিচারের রিট আবেদন জমা দেওয়া হবে। তবে মেহরাব যাতে কোনোভাবে সুযোগ পেয়ে আবার কোনো চক্রান্ত করতে না পারে, তার জন্য তন্নিকে সাময়িকভাবে ফাইয়াজ ও তার পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে এক গোপন তথ্য উদ্ধার করতে হবে।
ফাইয়াজের কোম্পানির গোপন ভল্টেই রাখা ছিল মেহরাবের আসল নথিপত্রের কিছু প্রতিলিপি, যা দিয়ে মেহরাব ও ফাইয়াজের বাবা যৌথভাবে ব্যবসায়ের অবৈধ লেনদেন চালাত। তন্নি জানত, ফাইয়াজ তাকে স্ত্রী হিসেবে কোনোদিন অধিকার দিতে পারেনি, তাই সেই ঘরে তার জন্য কিছু তথ্য যোগাড় করা কঠিন হবে না।
শুভ্র তন্নির হাত চেপে ধরে বলল, "তন্নি, আবার কি তোমাকে কোনো বিপদের মুখে যেতে হবে? আমি তোমাকে আর হারাতে পারব না।"
তন্নি শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে এক অনাবিল শক্তিতে হেসে বলল, "এবার আমি তোমার জন্য লড়ব, শুভ্র। যে শৃঙ্খল এতদিন আমাকে আটকে রেখেছিল, আজ আমি নিজের হাতে সেই শৃঙ্খল ভাঙব। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো।"
রাতের অন্ধকারে শুভ্র আর তন্নি আবার বিদায় নিল, কিন্তু এবারের বিদায় কোনো বিচ্ছেদের কান্না ছিল না—এ ছিল এক নতুন ভোর আর নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনার প্রতিশ্রুতির সূচনা।
ফাইয়াজের বিশাল আলিশান বাড়িতে যখন তন্নি ফিরে এলো, তার মনে আর কোনো ভয় বা সংশয় ছিল না। তার চোখে এখন শুভ্রর প্রতি থাকা প্রগাঢ় ভালোবাসা আর নিজের জীবনের ওপর অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার দৃঢ়তা। ফাইয়াজ ব্যবসার কাজে বাইরে যাওয়ার সুযোগে তন্নি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে মেহরাব ও ফাইয়াজের বাবার যৌথ অবৈধ ব্যবসার নথিপত্র এবং শুভ্রকে ফাঁসানোর ষড়যন্তের আসল ফাইলটি উদ্ধার করল।
পরদিন সকালে ঢাকার উচ্চ আদালতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। তরুণ আইনজীবী আয়ান তন্নির দেওয়া সেই দুর্নীতিনিরোধী প্রমাণপত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের অসাধু কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি বিচারকের সামনে তুলে ধরল। আদালাতে মেহরাব ও তার বাবার আইনজীবীরা কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারল না। প্রমাণ হয়ে গেল, শুভ্র সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং তাকে এক গভীর চক্রান্তের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
বিচারক মেহরাব ও তার সহযোগীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন এবং শুভ্রকে যাবতীয় অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে তার ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার সম্মান সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়ার রায় ঘোষণা করলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মেহরাব যখন হাতকড়া পরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তন্নি তার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ প্রদীপ্ত কণ্ঠে বলল, "অভিজাত্যের অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়, ভাইয়া। তোমরা আমার জীবন কাড়তে চেয়েছিলে, কিন্তু ভালোবাসা আর সত্যকে কখনোই বন্দি করে রাখা যায় না।"
আদালতের চত্বর থেকে বেরিয়ে এলো শুভ্র আর তন্নি। ফাইয়াজ নিজের পরিবারের অপরাধ ও তন্নির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তন্নিকে সম্মানের সাথে মুক্তি দিয়ে আইনি বিচ্ছেদে সই করেছিল। তন্নি এখন পুরোপুরি স্বাধীন—কোনো পারিবারিক শৃঙ্খল বা মিথ্যা সম্পর্কের বাঁধন আর তাকে আটকে রাখার ক্ষমতা রাখে না।
বিকেলের সোনাঝরা আলোয় শুভ্র আর তন্নি এসে দাঁড়াল ঢাকার বাইরে এক শান্ত নদীর মোহনায়। বাতাসের দোলায় তন্নির কালচে চুলগুলো উড়ছিল। শুভ্র তন্নির সামনাসামনি এসে দাঁড়াল। শুভ্রর চোখে আজ কোনো অপবাদের বোঝা নেই, নেই কারারুদ্ধ থাকার বিষাদ। সেখানে কেবল ফুটে উঠেছে এক বিজয়ীর আলো আর তন্নির প্রতি থাকা চিরন্তন সোহাগ।
শুভ্র ধীরে ধীরে তন্নির হাত দুটি নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। "তন্নি, বহু বছর আগে পাহাড়ি বৃষ্টিতে তোমাকে দেখেছিলাম। সেদিন যে ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল, ঝড়-ঝাপটা কিংবা জেলের অন্ধকার—কোনো কিছুই তাকে মুছে দিতে পারেনি।"
তন্নি শুভ্রর বুকে মাথা রাখল। সে শুভ্রর শক্ত বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল, যা তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি দিচ্ছিল।
"শুভ্র," তন্নি নিচু আর মিষ্টি কণ্ঠে বলল, "আমার এই জীবনটা এখন শুধুই তোমার। পৃথিবীর সব আভিজাত্য, সব রাজপ্রাসাদ তোমার এই বুকের উষ্ণতার কাছে তুচ্ছ।"
শুভ্র তন্নির চিবুক ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলল। তারপর ধীরে ধীরে সে তন্নির ঠোঁটে ঠোঁট রেখে এক গভীর, ব্যাকুল আর অন্তহীন ভালোবাসার সিলমোহর এঁকে দিল। নদীর জল ছুঁয়ে আসা বাতাস তাদের এই পুনর্মিলনকে যেন এক অদ্ভুত মিষ্টি আবহে মুড়ে দিল। বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝি, বিচ্ছেদ আর যন্ত্রণার মেঘ কেটে গিয়ে তাদের জীবনে নেমে এলো এক নতুন ভোরের পরম স্নিগ্ধ আলো।
....