ভাঙা মনের নতুন বাঁধন

মেডিকেল কলেজের করিডোরগুলোতে শেষ বিকেলের হালকা লালচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। চারপাশের চেনা হাঁকডাক আর ব্যস্ততার মাঝে অর্ণব একা এক টেবিলে বসে প্রফেশনাল পরীক্ষার অ্যানাটমি নোটস দেখছিল। সেন্ট্রাল লাইব্রেরির কোণের এই নিরিবিলি টেবিলটা বলতে গেলে অর্ণবেরই। সবাই জানে, পড়ার টেবিলে কিংবা সিদ্ধান্তের জায়গায় অর্ণব চৌধুরী কোনো ছাড় দেয় না। ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটির মেধা নিয়ে যেমন কারও দ্বিমত নেই, তেমনই তার রূঢ় স্বভাব আর অতিরিক্ত রাগ নিয়েও সবাই সচেতন। অর্ণব যা ভাবে, সেটাই শেষ কথা—এই একগুঁয়েমির জন্য পরিচিত মহল তাকে একটু এড়িয়েই চলে।

তবে মেহরিন বোধহয় সেই চেনা বৃত্তের বাইরের মানুষ ছিল।

বাইরে তখন হঠাৎ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অর্ণব বিরক্তি নিয়ে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল। ঠিক তখনই টেবিলের উল্টো পাশে নিঃশব্দে এসে বসল মেহরিন। পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো হালকা ভিজে কপালে লেপটে আছে। মেহরিনের চোখেমুখে সব সময়ই এক অদ্ভুত শান্ত ভাব থাকে—যে শান্ত ভাব অর্ণবের ভেতরের যেকোনো ঝড়কে এক নিমেষে থমকে দিতে পারে।

"অর্ণব, তুমি আবার দুপুরের খাবার খাওনি, তাই না?" মেহরিন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠে কোনো শাসনের সুর ছিল না, ছিল নিখাদ যত্ন।

অর্ণব ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। তার রাগ ওঠার কথা ছিল, কারণ সে পছন্দ করে না কেউ তার ব্যক্তিগত অভ্যাসে নজর রাখুক। কিন্তু মেহরিনের হরিণচোখের দিকে তাকাতেই অর্ণবের জেদি চাউল শান্ত হয়ে এলো। সে গম্ভীর গলায় বলল, "সময় পাইনি। অ্যানাটমির এই চ্যাপ্টারটা শেষ না করে উঠতে ইচ্ছা করছিল না।"

মেহরিন ব্যাগ থেকে একটা ছোট টিফিন বক্স বের করে অর্ণবের দিকে এগিয়ে দিল। "সময় না পেলেও খেতে হবে। নাও, এটা শেষ করো।"

অর্ণব কিছুক্ষণ মেহরিনের নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। ক্যাম্পাসের প্রথম বর্ষের সেই সাধারণ পরিচয় কীভাবে যেন ধীরে ধীরে গভীর এক মায়ায় রূপ নিয়েছে। মেহরিন অর্ণবের প্রতিটি মেজাজ সহ্য করতে পারে, যা অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারত না।

"তুমি আমার জন্য এত ঝামেলা কেন করো, মেহরিন?" অর্ণবের গলায় মেকি বিরক্তি, কিন্তু চোখের কোণে ফুটে উঠল গভীর এক টান।

মেহরিন মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। সে অর্ণবের হাতের ওপর হাত রাখল। মেহরিনের আঙুলগুলোর উষ্ণ স্পর্শ অর্ণবের রক্তে এক মিষ্টি দোলা দিয়ে গেল। অর্ণবের শক্ত মনের বরফ গলতে শুরু করল সেই পরশে। মেহরিনের নরম হাতের ছোঁয়া পেতেই অর্ণব নিজের রাগ আর জেদ ভুলে এক অজানা অনুভূতির সাগরে ডুব দিতে লাগল।

"ঝামেলা করি, কারণ তোমার এই কঠিন রূপটার পেছনের মানুষটাকে আমি জানি," মেহরিন মিষ্টি কণ্ঠে বলল। "যে মানুষটা সবাইকে দূরে রাখে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভালোবাসার একটা আশ্রয় খোঁজে।"

অর্ণব মেহরিনের হাতটা আরও শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরল। লাইব্রেরির আবছা আলোয় মেহরিনের লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখে অর্ণবের বুকের ভেতর গভীর ভালোবাসার দোলাচুল শান্ত জলপ্রপাতের মতো বইতে শুরু করল। অর্ণব সোজা মেহরিনের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে শুধুই বিশ্বাস আর ভালোবাসা।

"মেহরিন, তুমি জানো তো, আমি যা একবার নিজের বলে ভাবি, তা কাউকে সহজে ছেড়ে দিই না?" অর্ণবের কথায় আচ্ছন্ন এক অধিকারবোধের সুর ফুটে উঠল।

মেহরিন চোখ নিচু করে বলল, "জানি। কিন্তু অধিকারের সাথে তো বিশ্বাস আর ভালোবাসাও থাকতে হয়, অর্ণব।"

সেই মুহূর্তে অর্ণব বুঝতে পারেনি, এই তীব্র অধিকারবোধই একদিন তাদের মাঝখানে এক বিশাল দেয়াল তুলে দাঁড় করাবে। বৃষ্টি আরও ঘন হয়ে এল, আর ক্যাম্পাসের সেই নির্জন কোণে অর্ণব ও মেহরিনের অনুভূতির প্রথম অধ্যায়টা খুব নিঃশব্দে, কিন্তু দারুণ এক গভীরতায় রূপ নিতে শুরু করল।

বর্ষার দিনে মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসটা যেন অন্য রূপ ধারণ করে। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দ, কদম গাছের শাখা বেয়ে নেমে আসা জলের ধারা, আর পিচঢালা রাস্তায় জমে থাকা জল রাশি—সব মিলিয়ে এক রোমান্টিক আবহ। তবে অর্ণবের মনের ভেতরের আবহাওয়া সবসময় স্থির থাকে না। পড়াশোনায় সেরা হলেও মেহরিনের প্রতি তার অধিকারবোধ আর সন্দেহ দিন দিন যেন এক তীব্র নেশায় পরিণত হচ্ছিল।

ক্লাসের পর ল্যাবরেটরির করিডোরে মেহরিনকে এক ব্যাচমেটের সঙ্গে কথা বলতে দেখে অর্ণবের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মেহরিন হেসে হেসে কথা বলছিল, যা অর্ণবের সহ্য সীমা পার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ছেলেটি চলে যেতেই অর্ণব দ্রুত পায়ে মেহরিনের কাছে গিয়ে হাত ধরে টান দিয়ে পাশের খালি হিস্টোলজি ল্যাবে নিয়ে গেল।

দরজাটা খট করে বন্ধ করে অর্ণব মেহরিনকে দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে দাঁড় করাল। অর্ণবের ঘন শ্বাস মেহরিনের কপালে আছড়ে পড়ছিল। মেহরিনের চোখে চমক আর ভয় মিশ্রিত এক আবেগ ফুটে উঠল।

"অর্ণব! কি করছ এসব? কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?" মেহরিন নিচু কিন্তু তীব্র কণ্ঠে বলল।

"কাউকে দেখার দরকার নেই!" অর্ণবের কণ্ঠে এক তীব্র আবেশ ও নিয়ন্ত্রণহীন রাগ। সে মেহরিনের কাছাকাছি চলে এল, এতটাই কাছে যে মেহরিনের বুকের দ্রুত ওঠানামা অর্ণব স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছিল। অর্ণব মেহরিনের থুতনি ধরে নিজের দিকে মুখ তুলে আনল।

"অর্ণব, তুমি আবার অকারণে রাগ করছ..." মেহরিন চোখ বন্ধ করে ফেলল, অর্ণবের নিঃশ্বাসের তীব্র উষ্ণতা তার ঠোঁটের খুব কাছে এসে থমকে গেছে।

"আমি তোমাকে কতবার বলেছি, মেহরিন? তুমি শুধু আমার। অন্য কারও সাথে তোমার এত কিসের হাসি-ঠাট্টা?" অর্ণবের গলায় জেদ আর এক তীব্র ব্যাকুলতা জড়িয়ে রইল। সে মেহরিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তোমার এই নরম হাসি, তোমার এই মিষ্টি চোখ—এসবের ওপর শুধু অর্ণবের অধিকার।"

মেহরিন অর্ণবের বুকে হাত রেখে তাকে একটু সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অর্ণবের আলিঙ্গন ছিল বাঁধভাঙা নদীর মতো শক্তিশালী। মেহরিন অর্ণবের এই রূপটাকে ভয় পায়, আবার এই মানুষটার ভালোবাসার গভীরতায় হারিয়েও যায়। অর্ণব তার ঠোঁট দুটো মেহরিনের কপালে ও গালে গভীরভাবে চেপে ধরল। মেহরিনের শরীরে একটা শিউরে ওঠা কাঁপন বয়ে গেল। অর্ণবের ভালোবাসায় যেমন তীব্রতা ছিল, তেমনি ছিল এক দমবন্ধ করা অধিকারের চাপ।

"অর্ণব... ছাড়ো প্লিজ। এভাবে ভয় দেখিয়ো না আমাকে," মেহরিনের চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

অর্ণব মেহরিনের চোখের জল দেখে চমকে উঠল। তার কঠিন মনটা মেহরিনের এই একফোঁটা জলের স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যে গলে গেল। সে নিজের বাঁধন শিথিল করল এবং মেহরিনের গাল দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে পরম মমতায় চোখের জল মুছে দিল।

"দুঃখিত, মেহরিন... আমি সহ্য করতে পারি না তোমাকে অন্য কারও দিকে তাকাতে দেখলে," অর্ণব মেহরিনের কপালে নিজের মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করল। "তুমি ছাড়া আমার আর কিছু নেই, বুঝেছ?"

মেহরিন অর্ণবের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্ণবের এই সীমাহীন ভালোবাসা আর চরম অধিকারবোধ তাকে একই সাথে এক স্বর্গীয় সুখে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার ভেতরে ভেতরে এক অনিশ্চয়তার ভয় জাগিয়ে তোলে। অর্ণব মেহরিনকে নিজের বাহুডোরে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ল্যাবের জানলা দিয়ে বৃষ্টির জলের ঝাঁপটা এসে তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু অর্ণবের বুক জুড়ে তখন কেবলই এক উথালপাথাল অনুভূতির ঝড়।

পড়াশোনার চাপ আর অর্ণবের ভালোবাসার তীব্র টান—দুইয়ের মাঝে মেহরিন এক অদ্ভুত দোলাচালে দিন কাটাচ্ছিল। অর্ণবের অনুভূতির গভীরতা তাকে মুগ্ধ করলেও, তার অতিরিক্ত অবিশ্বাস ও সন্দেহ দিন দিন তাদের সম্পর্কের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। মেহরিনের স্বাধীনচেতা মন সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে বারবার হাঁপিয়ে উঠছিল।

এক বিকেলে অর্ণব মেহরিনকে লাইব্রেরির ছাদে ডেকে পাঠাল। আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে, যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। অর্ণবের চোখ দুটো লাল, চেহারায় চরম উত্তেজনার ছাপ। সে মেহরিনকে দেখা মাত্রই তার হাতটা ধরে এক টানে কাছে টেনে নিয়ে এলো।

"অর্ণব, কী হয়েছে তোমার? এভাবে হাত চেপে ধরছ কেন?" মেহরিন ব্যথায় উফ করে উঠল।

অর্ণব পকেট থেকে মেহরিনের ফোনের একটা স্ক্রিনশট বের করল, যেখানে মেহরিনের এক সহপাঠী তাকে ক্লাসের নোট সংক্রান্ত বার্তা পাঠিয়েছিল। অর্ণবের গলায় এক তীব্র বিষাক্ত সন্দেহ, "এই ছেলে তোমাকে রাতে কেন বার্তা পাঠাবে, মেহরিন? কী চলছে তোমাদের মধ্যে?"

মেহরিন হতবাক হয়ে অর্ণবের দিকে তাকাল। তার চোখে বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট ফুটে উঠল। "ওটা শুধুই পরীক্ষার নোটের ব্যাপারে ছিল, অর্ণব! তুমি আমার সততাকে এভাবে সন্দেহ করতে পারলে? এতদিন পর তুমি আমাকে এইটুকু চিনলে?"

"আমি কিছু শুনতে চাই না!" অর্ণব গর্জে উঠল। তার অতিরিক্ত একগুঁয়েমি আর রাগ তখন সমস্ত যুক্তিকে গ্রাস করে ফেলেছে। সে মেহরিনের কাধ ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে বলল, "আমি বলেছি না, তোমার প্রতিটা মুহূর্ত, তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস শুধু আমার! অন্য কোনো পুরুষ তোমার ধারের কাছে আসবে না।"

মেহরিন অর্ণবের এই অন্ধ ভালোবাসার বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। অর্ণব মেহরিনের ঘাড় আর গালে গভীরভাবে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে নিজের উগ্র অধিকার জাহির করতে চাইল। সেই স্পর্শে আজ আর কোনো মিষ্টি প্রেম ছিল না, ছিল কেবল অর্ণবের দখল নেওয়ার জেদ।

মেহরিন সমস্ত শক্তি দিয়ে অর্ণবকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল।

"থামো, অর্ণব! থামো!" মেহরিন কেঁদে উঠে বলল। "ভালোবাসা মানে বন্দিশালা নয়। যেখানে শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস নেই, সেখানে কোনো সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না। তোমার এই অসুস্থ সন্দেহ আমাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।"

ঠিক তখনই নিচে মেহরিনের বাবার ফোন বেজে উঠল। বাবার হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতা আর মেহরিনের পারিবারিক পরিস্থিতির খবর শুনে মেহরিন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে একছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।

অর্ণব ছাদে একা দাঁড়িয়ে রইল। ঝুম বৃষ্টিতে সে পুরোপুরি ভিজে যেতে লাগল, কিন্তু তার মনের ভেতরের ক্ষোভ আর রাগ তখনও কমেনি। অর্ণব ভেবেছিল মেহরিন তার অভিমান ভেঙে আবার ফিরে আসবে, কিন্তু সে জানত না—এই দিনটিই ছিল তাদের ভালোবাসার শেষ শান্ত বিকেল। মেহরিনের পরিবার ইতিমধ্যে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে, আর অর্ণবের এমন আচরণ মেহরিনের মনেও ধীরে ধীরে এক বিষাদময় দূরত্বের জন্ম দিচ্ছিল।

ছাদের সেই বিষাদময় বিকেলের পর থেকে অর্ণব ও মেহরিনের মধ্যে এক অদৃশ্য কিন্তু বিশাল দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অর্ণব ভেবেছিল মেহরিনের রাগ কয়েক দিনে ভেঙে যাবে, সে আবার আগের মতো মিষ্টি হেসে তার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্য রূপ নিল। মেহরিনের বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন, আর ঠিক সেই সুযোগেই মেহরিনের পরিবার তার ওপর পারিবারিক বিয়ের চাপ সৃষ্টি করল।

মেহরিনের বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনো উগ্র আর অনিশ্চিত স্বভাবের ছেলের হাতে তিনি নিজের একমাত্র মেয়েকে তুলে দেবেন না। বাবার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে মেহরিন আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না। তার নিজের ভেতরের আলোটাও যেন অর্ণবের তীব্র সন্দেহ আর বিষাক্ত ব্যবহারে নিভে গিয়েছিল।

ক্যাম্পাসের বাইরে একটা নির্জন ক্যাফেতে শেষবারের মতো দেখা হলো ওদের। অর্ণব মেহরিনের মুখোমুখি এসে বসল। তার চোখ দুটো লাল, চেহারায় ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। কিন্তু তার অহংকার আর জেদ তখনও পুরোপুরি মেটেনি।

"মেহরিন, এসব কী শুনছি আমি?" অর্ণব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল। "তোমার বিয়ের কথা চলছে? তুমি কীভাবে এটা মেনে নিচ্ছ?"

মেহরিন অর্ণবের দিকে তাকাল। তার চোখে জল ছিল না, ছিল কেবল এক শূন্যতা। "অর্ণব, আমি ক্লান্ত। আমি তোমার ভালোবাসা পেয়েছিলাম, কিন্তু শান্তি পাইনি। তোমার অতিরিক্ত সন্দেহ আর এই উগ্র অধিকারবোধ আমার বিশ্বাসকে শেষ করে দিয়েছে। তার ওপর আমার বাবার শরীরের এই অবস্থা..."

অর্ণব টেবিল টপকে মেহরিনের দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করে ফেলল। মেহরিনকে হারানোর ভয় মুহূর্তের মধ্যে অর্ণবের সব অহংকার চুরমার করে দিল। সে মেহরিনের হাতের তালুতে নিজের মুখ গুঁজে দিল, তার উষ্ণ নিঃশ্বাস মেহরিনের আঙুলগুলোকে ভিজিয়ে দিতে লাগল।

"না, মেহরিন, না!" অর্ণবের গলায় এক আকুল আর করুণ ব্যাকুলতা। "তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না। আমি বদলে যাব, মেহরিন! আমি আর কোনো দিন তোমার ওপর রাগ করব না, কোনো দিন সন্দেহ করব না। প্লিজ, মেহরিন..."

অর্ণব মেহরিনের আঙুলে নিবিড়ভাবে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সে পরম আকুলতায় মেহরিনের হাত দুটো নিজের বুকে চেপে রাখল, যেখানে তার হৃদস্পন্দন তীব্র বেগে চলছিল। সেই নিবিড় স্পর্শে মেহরিনের বুকটাও হু হু করে উঠল, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুরতার কাছে সে আজ বড্ড অসহায়।

মেহরিন খুব কষ্টে নিজের হাত দুটো অর্ণবের উষ্ণ বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে অর্ণবের দিকে শেষবারের মতো তাকাল।

"অনেক দেরি হয়ে গেছে, অর্ণব। কিছু ভুল শুধরানোর সময় নিয়তি মানুষকে দেয় না," মেহরিন কেঁদে ফেলে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল।

অর্ণব স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখের সামনে দিয়ে মেহরিন হারিয়ে গেল এক অন্য ঠিকানায়। সেই রাতে অর্ণবের অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, কিন্তু তার জীবনে নেমে এল এক ঘোর অমাবস্যা।

মেহরিন চলে যাওয়ার পর অর্ণবের জগতটা এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেল। যে ছেলেটি একসময় মেডিকেল কলেজের ক্লাসে প্রথম সারিতে থাকত, যার মেধা আর প্রখর বুদ্ধিমত্তা সবাইকে চমকে দিত, সে ছেলেটিই এখন নিঃসঙ্গতার এক অন্ধকার কুঠুরিতে নিজেকে বন্দি করে ফেলেছে। মেহরিনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার খবরটা যখন অর্ণবের কানে পৌঁছায়, তখন তার ভেতরের শেষ আলোটুকুও এক লহমায় নিভে গিয়েছিল।

পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ—সবকিছু থেকে অর্ণব নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিল। চূড়ান্ত প্রফেশনাল পরীক্ষার আর মাত্র কয়েক মাস বাকি, কিন্তু অর্ণবের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। দিনরাত সে নিজের ঘরের চার দেয়ালের মাঝে মেহরিনের পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকে।

বৃষ্টির রাতে ঘরের জানলাটা খোলা রেখে অর্ণব টেবিলের ওপর মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেহরিনের সেই শান্ত মুখ, তার মিষ্টি হাসি আর শেষ ক্যাফেতে কাটানো সেই তীব্র ভালোবাসার মুহূর্তগুলো। অর্ণব তার হাতের তালু দুটোর দিকে তাকায়—যেখানে একসময় মেহরিনের নরম ছোঁয়া লেগে থাকত। এখন সেখানে কেবলই শূন্যতা আর হাহাকার।

"কেন মেহরিন? কেন তুমি আমাকে এভাবে ছেড়ে চলে গেলে?" অর্ণব শূন্যতার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে। তার কণ্ঠে রাগ আর ভালোবাসার এক করুণ মিশ্রণ।

অর্ণবের এই ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে তার বন্ধু ও শিক্ষকরা বারবার তাকে বোঝাতে এলেন। কিন্তু অর্ণব কারও কথা শোনার পাত্র নয়। তার একগুঁয়েমি আর আত্মদহন তাকে দিন দিন আরও বেশি নিঃশেষ করে দিতে লাগল। সে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিল, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করল। যে অর্ণব চৌধুরী মেডিকেল দুনিয়ায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হতে চেয়েছিল, সে এখন নিজের ক্ষতের আগুনে নিজেই জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে।

একদিন গভীর রাতে অর্ণব ডায়েরির পাতা খুলে মেহরিনের একটা পুরোনো চিঠি বের করল। চিঠিটার ওপর হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। অর্ণবের শক্ত মনের যে অহংকার ছিল, তা মেহরিনের অনুপস্থিতির কাছে চরমভাবে হেরে গেছে।

সে উপলব্ধি করতে শুরু করল, তার অতিরিক্ত জেদ, উগ্র রাগ আর অন্ধ অধিকারবোধই মেহরিনকে তার জীবন থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নিজের ভুল অনুশোচনার আগুনে তাকে প্রতি মুহূর্তে পোড়াতে লাগল, আর অর্ণব ধীরে ধীরে এক জীবন্ত লাশে পরিণত হতে লাগল।

বছর চারেক কেটে গেছে। সময়ের চাকা অনেক দূর গড়িয়েছে, কিন্তু অর্ণবের জীবনের গতি যেন সেই এক জায়গায় থমকে ছিল। অনেক ঝড়ের পর অর্ণব কষ্টেসৃষ্টে তার ডাক্তারের ডিগ্রিটা শেষ করেছিল সত্যি, কিন্তু জীবনের সেই পুরোনো তেজ আর উজ্জ্বলতা হারিয়ে গিয়েছিল। সে এখন শহরের এক প্রান্তিক সরকারি হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার—চুপচাপ, গম্ভীর আর নিজের কাজে চরম আত্মনিবেদিত। কারও সাথে অহেতুক কথা বলে না, মেজাজ দেখায় না। তার ভেতরের সেই উগ্রতা আর একগুঁয়েমি এখন শান্ত এক বিষাদে রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে, মেহরিনের জীবনটাও সহজ ছিল না। পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ে হলেও সেই সম্পর্কের বয়স বেশিদিন হয়নি। প্রাক্তন স্বামীর সীমাহীন উদাসীনতা আর মানসিক নির্যাতনের কারণে মেহরিন সেই বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছিল। সে এখন এক স্বনামধন্য এনজিও-র চাইল্ড ওয়েলফেয়ার প্রজেক্টের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। জীবনের কঠিন লড়াই তাকে আরও বেশি পরিপক্ব আর আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে, তবে তার চোখের কোণে রয়ে গেছে গভীর এক ট্র্যাজেডির ছায়া।

এক মেঘলা দিনে অর্ণবের হাসপাতালেই একটা চ্যারিটি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। সেই ক্যাম্পের তদারকির দায়িত্বে ছিল মেহরিনের সংস্থা।

হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোর ধরে অর্ণব একটা ফাইলের দিকে চোখ রেখে হাঁটছিল। হঠাৎ বাঁকের মুখে এসে কারও সাথে তার ধাক্কা লাগল। অর্ণবের হাত থেকে ফাইলপত্রগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

"আই অ্যাম সো সরি..." অপর প্রান্তের পরিচিত কিন্তু বদলে যাওয়া মিষ্টি কণ্ঠটা শুনে অর্ণব থমকে গেল।

মেহরিন ফাইল তুলতে গিয়ে নিচে ঝুঁকেছিল। অর্ণব ধীর পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। মেহরিন মুখ তুলে তাকাতেই দুজন মানুষের চারটে চোখ দীর্ঘ চার বছর পর আবার মুখোমুখি হলো।

বৃষ্টির আমেজ ছড়ানো সেই বিকেলের বাতাসে যেন এক তীব্র ইলেকট্রিক তরঙ্গ খেলে গেল। মেহরিনের মুখের ওপর অর্ণবের দৃষ্টি আটকে রইল। মেহরিনও যেন নিজের চোখের ভুল বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রোগা, গম্ভীর, চোখের নিচে কালি পড়া মানুষটাই কি সেই প্রতাপশালী অর্ণব চৌধুরী?

অর্ণব হাঁট মুড়ে মেহরিনের ঠিক সামনে বসল। তার হাত দুটো কেঁপে উঠল। মেহরিনের সুতির শাড়ির আঁচলটা অর্ণবের হাতের ওপর এসে পড়েছে—সেই চেনা সুবাস, সেই শান্ত চাহনি। অর্ণবের বুকের ভেতর এক নিদারুণ হাহাকার জেগে উঠল।

"মেহরিন..." অর্ণব খুব নিচু, কাঁপানো গলায় নামটা উচ্চারণ করল। সেই এক শব্দের মধ্যে জমে ছিল চার বছরের হাজারো নির্ঘুম রাত আর অপূরণীয় অনুশোচনা।

মেহরিন অর্ণবের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আবার এতটা কাছাকাছি অনুভব করতেই শিউরে উঠল। চার বছর আগের সেই নিবিড় স্পর্শের স্মৃতি মুহূর্তের মধ্যে তার মনের ভেতর আলোড়ন তুলে দিল। কিন্তু দুজনেই আজ বয়সের আর পরিস্থিতির ভারে অনেক বদলে গেছে।

মেডিকেল ক্যাম্পের সেই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতের পর অর্ণব আর মেহরিনের জীবন আবার এক অদ্ভুত মোহনায় এসে দাঁড়াল। ক্যাম্পের কাজে পরের কয়েক দিন প্রতিদিন তাদের দেখা হতে লাগল। তবে চার বছর আগের সেই উগ্র, সন্দেহপ্রবণ অর্ণব আর আজকের গম্ভীর, পরিণত ডক্টর অর্ণব চৌধুরীর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। অর্ণব এখন মেহরিনের দিকে তাকাতেও একধরনের অপরাধবোধে ভোগে।

ক্যাম্পের শেষ দিনে কাজের চাপ কমতেই মেহরিন হাসপাতালের পেছনের নির্জন বাগানটায় গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে একটা কাঠের বেঞ্চ। বিকেলের নরম রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মেহরিনের মুখে এসে পড়ছিল।

অর্ণব ধীর পায়ে মেহরিনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে দুটো কফির কাপ। সে নিঃশব্দে একটা কাপ মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।

"ধন্যবাদ," মেহরিন কফির কাপটা নিয়ে মৃদু গলায় বলল।

অর্ণব পাশে বসল, তবে মেহরিনের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। তার এই সচেতন দূরত্ব বজায় রাখা দেখে মেহরিনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠল। যে অর্ণব একসময় মেহরিনকে এক মুহূর্তের জন্য নিজের থেকে দূরে সরতে দিত না, সে আজ এতটা সাবধানী!

"তুমি বদলে গেছ, অর্ণব," মেহরিন কফিতে এক চুমুক দিয়ে নিচু গলায় বলল।

অর্ণব এক তেতো হাসি হাসল। সে কফির কাপটা পাশে রেখে মেহরিনের দিকে ঘুরল। অর্ণবের চোখে তখন অনুশোচনার অশ্রু টলমল করছে।

"আমি বাধ্য হয়েছি বদলে যেতে, মেহরিন," অর্ণব করুণ কণ্ঠে বলল। "তোমাকে হারানোর পর আমি বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসার মানে তাকে নিজের শৃঙ্খলে বন্দি করা নয়। বিশ্বাস আর সম্মান না থাকলে সেই ভালোবাসা বিষ হয়ে যায়। আমি তোমাকে আমার উগ্রতা দিয়ে বিষাক্ত করে তুলেছিলাম, মেহরিন। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছি।"

অর্ণবের এই নিঃশর্ত আকুতি আর নিজের ভুল স্বীকার করার আকুলতা মেহরিনের মনের ভেতরের জমাট বাঁধা বরফ এক লহমায় গলিয়ে দিল। মেহরিন বুঝতে পারল, অর্ণব সত্যিই নিজের ভুল বুঝতে পেরে সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষে পরিণত হয়েছে।

অর্ণব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে মেহরিনের ঠিক সামনে নিচে বসল। মেহরিনের দুটো হাত নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। অর্ণবের কাঁপানো হাত আর চোখের জল মেহরিনের হাতের উষ্ণ ছোঁয়ায় মিশে যেতে লাগল।

"মেহরিন, আমি আর কিছুই চাই না," অর্ণব মেহরিনের হাতের তালুতে গভীরভাবে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সে পরম নিবিড়তায় মেহরিনের হাতের প্রতিটি আঙুলে নিজের অনুশোচনার চুমু আঁকতে লাগল। "আমি শুধু জানতে চাই, তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ?"

অর্ণবের ঠোঁটের সেই পরিচিত, তীব্র কিন্তু এবার পরম শ্রদ্ধাপূর্ণ স্পর্শে মেহরিনের শরীরে এক আগুনের শিহরণ খেলে গেল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল অর্ণবের চুলে। মেহরিন অনুভব করল, চার বছর ধরে তার মনের কোণেও যে অর্ণবের প্রতি একটা গভীর সুপ্ত ভালোবাসা আর টান লুকিয়ে ছিল, তা আবার নতুন করে জেগে উঠেছে।

মেহরিন অর্ণবের মুখটা হাত দিয়ে ওপরে তুলল। অর্ণবের চোখের জল নিজের নরম আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে বলল, "আমি তোমাকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি, অর্ণব। কিন্তু এই ভাঙা মন কি আর নতুন করে জোড়া সম্ভব?"

অর্ণব মেহরিনের কোলে নিজের মাথা রেখে শক্ত করে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। মেহরিনও আর নিজেকে সামলাতে না পেরে অর্ণবের মাথায় হাত বোলাতে লাগল। দুজনেই অনুভবের সেই গভীরতায় আবার হারিয়ে যেতে লাগল, যেখানে হারানোর ভয় আর অনুশোচনা এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল।

মেডিকেল ক্যাম্প শেষ হওয়ার পরও অর্ণব ও মেহরিনের অনুভূতির সেই আবেশ ফিকে হয়ে যায়নি। বিগত কটা দিনে তাদের নীরব চাহনি, অনুশোচনার অশ্রু আর ভাঙা স্মৃতির জোড়াতালি যেন স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল—পুরোনো সেই গভীর ক্ষত শুধরে নেওয়ার সময় এখন সমাগত। অর্ণবের পরিবর্তন কেবল মুখের কথায় ছিল না; তার প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি ব্যবহারে ফুটে উঠছিল এক পরিণত, শ্রদ্ধাশীল ও স্থির পুরুষত্ব।

বর্ষার শেষ বিকেলের এক স্নিগ্ধ আলোয় অর্ণব মেহরিনকে ধানমন্ডি লেকের নির্জন কোণে ডেকে পাঠাল। যেখানে একসময় শেষ দেখা হয়েছিল এক বিষাদময় ক্যাফেতে, আজ সেখানে আবার দুজনে মুখোমুখি। তবে আজকের বাতাস ভারী ছিল না; তাতে ছিল শিউলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ আর বৃষ্টির পর তাজা মাটির সোঁদা গন্ধ।

লেকের কাঠের সাঁকোর ওপর মেহরিন এসে দাঁড়াতেই অর্ণব তার দিকে তাকাল। মেহরিনের পরনে নীল রঙের শাড়ি, বাতাসে তার চুলগুলো মৃদুভাবে উড়ছে। অর্ণব ধীর পায়ে মেহরিনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে আর আগের মতো ক্ষোভ বা উগ্র অধিকারের তেজ ছিল না; সেখানে ছিল গভীর এক পূর্ণতা ও ব্যাকুল অপেক্ষা।

"মেহরিন..." অর্ণব শান্ত গলায় ডাকল।

মেহরিন অর্ণবের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো ভয় কিংবা সংশয় ছিল না, ছিল নিখাদ আশ্রয় খোঁজার টান।

অর্ণব পকেট থেকে একটি ছোট লাল মখমলের বক্স বের করল। ভেতরে কোনো হিরের আংটি ছিল না, ছিল তাদের সেই কলেজ জীবনের মেহরিনের হাত থেকে পড়ে যাওয়া এক জোড়া সাধারণ রুপোর রূপোলি নুপূর, যা অর্ণব এতদিন ধরে নিজের বুকের কাছে যত্ন করে আগলে রেখেছিল।

"তুমি একবার বলেছিলে, মেহরিন, যেখানে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার মেলবন্ধন ঘটে, সেখানেই সত্যিকারের বন্ধন তৈরি হয়," অর্ণব খুব নিচু, কাঁপানো কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল। "আমি আজ কোনো জেদ বা অধিকার নিয়ে আসিনি। আমি এসেছি তোমার সামনে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে। আমার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস, আমার সমস্ত ভুল আর অনুশোচনা দিয়ে আমি তোমাকে নতুন করে ভালোবাসতে চাই। তুমি কি আমার ভাঙা জীবনটাকে আবার ভালোবাসায় সাজিয়ে নেবে?"

মেহরিনের চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের অশ্রু। সে বুঝতে পারল, দীর্ঘ বিরহ আর আত্মদহনের আগুনে পুড়ে অর্ণব আজ এক খাঁটি সোনা হয়ে উঠেছে। মেহরিন আর নিজের অনুভূতিকে চেপে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে অর্ণবের বুকে নিজের মাথাটা গুঁজে দিল।

অর্ণব মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর পরম আকুলতায় মেহরিনকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল। এত বছর পর মেহরিনের সেই চেনা সুবাস, তার শরীরের ওম আর হৃদস্পন্দনের উষ্ণতা অর্ণবকে এক স্বর্গীয় সুখে ভাসিয়ে দিল। অর্ণব মেহরিনের পিঠে নিজের হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে লেপ্টে নিল।

"আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাইনি, অর্ণব," মেহরিন অর্ণবের বুকে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল। "আমি শুধু অপেক্ষা করেছিলাম আমার সত্যিকারের অর্ণবকে ফিরে পাওয়ার জন্য।"

অর্ণব মেহরিনের থুতনি ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব কমে এল এক আঙুলে। বৃষ্টির ছোট এক পশলা ঝাঁপটা এসে তাদের শরীর ভিজিয়ে দিয়ে গেল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণব পরম ভালোবাসায় ও নিবিড় গভীরতায় মেহরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সেই মিষ্টি, দীর্ঘ ও অনুভবের চুম্বনে মুছে গেল চার বছরের বিরহ, সন্দেহ আর দূরত্বের সব যন্ত্রণা।

লেকের জলে তখন বিকেলের শেষ আলোর প্রতিফলন। অর্ণব মেহরিনের হাতটা নিজের হাতের আঙুলের ভাঁজে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। ভুল শুধরে নেওয়ার এই নতুন সকালে তারা দুজনে আবার এক অন্য যাত্রায় পা বাড়াল—যেখানে সন্দেহের স্থান নেই, কেবলই আছে অসীম বিশ্বাস, পরম শ্রদ্ধা আর এক চিরন্তন ভালোবাসা।

....
👁 15