গ্রামের মেঠোপথ ধরে যখন সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে, ঠিক তখনই রূপসা নদীর ধারের পুরানো বটতলার দিকে হেঁটে যাচ্ছিল দিয়া। গায়ে একটা হালকা বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি, আঁচলটা কাঁধে আলতো করে জড়ানো। চুলে তাজা বেলি ফুলের গজরা। দিয়ার চেহারাটা যেন ভোরের শান্ত আলো—চোখে একরাশ সরলতা, ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি, আর চলনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে পরিবারের ছোট মেয়ে, বাবার খুব আদরের, ভাইবোনদের ভালোবাসার ছায়ায় বড় হওয়া এক লক্ষ্মী মেয়ে। পুরো গ্রাম তাকে চেনে তার শান্ত স্বভাব আর নম্র ব্যবহারের জন্য।
কিন্তু নদীর ওপারের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। সেখানে চালতে গাছের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল অরণ্য। দীর্ঘদেহী, চওড়া কাঁধ, তীক্ষ্ণ চোখ আর গম্ভীর মুখাবয়ব। অরণ্যকে পুরো এলাকার মানুষ চেনে একজন জেদী, রাগী আর একাকী স্বভাবের মানুষ হিসেবে। কারো সাথে যেচে কথা বলা তার স্বভাব নয়, আর অরণ্য রেগে গেলে পুরো হাটের মানুষ ভয়ে চুপ হয়ে যায়। শহরের এক বড় ঝামেলার পর নিজেকে গুটিয়ে নিতে সে এই নিঝুম গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছে। কারো প্রতি তার কোনো মায়া নেই, ভালোবাসা শব্দটার প্রতি তার চরম অরুচি।
ঘটনাটা ঘটল ঠিক সূর্য ডোবার মুহূর্তে। দিয়া মেঠোপথ দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ খেয়াল করল কালচে মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে, কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হতে আর দেরি নেই। বাতাসে ধুলো উড়ছে, গাছের ডালপালারা একে অপরের গায়ে আছড়ে পড়ছে। দিয়ার কাঠের স্যান্ডেলের ফিতেটা ঠিক তখনই হুট করে ছিঁড়ে গেল।
"ও আল্লাহ, এখন আমি কী করব!" নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল দিয়া।
বাতাসের বেগ বাড়তে লাগল, প্রথম ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ল দিয়ার কপালে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সে পাশের একটা পুরোনো পরিত্যক্ত নীলকুঠির দিকে দৌড়ে গেল। কুঠির বারান্দায় উঠতেই প্রবল বেগে বৃষ্টি নামল। দিয়া জামাকাপড় খানিকটা ভিজিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, হাঁপাচ্ছে আর শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথার ভিজে যাওয়া চুল মুছছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে একটা ভারী, কড়া কণ্ঠ ভেসে এল।
"কে ওখানে?"
চমকে উঠে পেছনে তাকাল দিয়া। অন্ধকারের আড়াল থেকে হেঁটে সামনে এল অরণ্য। তার পরনে কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, বুকে কয়েকটা বোতাম খোলা। চোখের দৃষ্টি এতটাই প্রখর যে দিয়া মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অরণ্যের মেজাজ তখনো চড়া, একাকী কাটানো সময় নষ্ট হওয়ায় সে রীতিমতো বিরক্ত।
"আমি... আমি দিয়া। বৃষ্টিতে আটকে গিয়ে..." তোতলাতে তোতলাতে বলল দিয়া। তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
অরণ্য দিয়ার দিকে একপা এগিয়ে এল। তার দীর্ঘ ছায়া দিয়ার ওপর গিয়ে পড়ল। "এটা কোনো আশ্রমে ঢোকার জায়গা না। বৃষ্টি নামলেই না বুঝে মানুষের ব্যক্তিগত জায়গায় ঢুকে পড়তে হয়?"
অরণ্যের এই কঠিন আর অহেতুক রুক্ষ ব্যবহারে দিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার চোখে পানি চলে এল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। মেজাজ সামলাতে না পেরে দিয়া শক্ত কণ্ঠে বলল, "আমি ইচ্ছা করে আপনার জায়গায় আসি নাই। বাইরে তুফান হচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন না? মানুষ হিসেবে একটু দয়া-মায়াও কি আপনার মধ্যে নাই?"
"দয়া?" অরণ্য এক বাঁকা হাসি হাসল। "দয়া দেখানোর কাজ আমার না। সোজা নিজের পথ দেখো।"
অরণ্য তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য দিয়ার একটা হাত শক্ত করে ধরে টান দিল। কিন্তু অরণ্যের সেই অমার্জিত স্পর্শেই প্রথমবার দুজনের শরীরে যেন একটা অজানা শিহরণ খেলে গেল। দিয়ার নরম, কোমল কবজি অরণ্যের শক্ত, খসখসে হাতের মুঠোয় মিশে গেল। দিয়া যন্ত্রণায় আর আবেগে চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার নিঃশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। অরণ্যও থামল। এত কাছে দিয়াকে দেখে তার মেজাজের রাগটা যেন এক অদ্ভুত তীব্র আকর্ষণে রূপ নিতে চাইল। দিয়ার গা থেকে ভেসে আসা বেলি ফুল আর ভেজা মাটির সুবাস অরণ্যের মাথা ঝিমঝিম করে তুলল।
দিয়া হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল, "ছাড়ুন আমাকে! এত অসভ্য কেন আপনি?"
অরণ্য দিয়ার দিকে আরও চেপে এল, দেয়ালের সাথে দিয়াকে একপ্রকার পিষে ধরে অরণ্য তার চোখে চোখ রাখল। ঘরের ভেতর তখন কেবল ঝুম বৃষ্টির শব্দ আর দুজনের দ্রুত চলা নিঃশ্বাসের শব্দ। অরণ্যের গরম শ্বাস দিয়ার গলায় এসে লাগছিল। দিয়ার ঠোঁট দুটো ভয়ে আর এক অচেনা শিহরণে কাঁপছিল। অরণ্য দিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, "আমাকে চেনো না তুমি। আমার ধারেকাছে আসার ভুল আর কখনো করবে না।"
অরণ্যের চোখের সেই অদ্ভুত তীব্রতা আর শরীর থেকে আসা পৌরুষালী গন্ধে দিয়া এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর ঢোল বাজছিল। অরণ্যের এই অসভ্যতা তাকে রাগিয়ে দিলেও, কেমন যেন একটা আবেশে তার শরীর অবশ হয়ে আসছিল।
ঠিক তখনই বাইরে এক বিকট শব্দে বিজলি চমকে উঠল। আলোয় ভরে উঠল চারপাশ। দিয়া ভয়ে হালকা চিৎকার দিয়ে অরণ্যের বুক শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অরণ্য প্রস্তুত ছিল না। দিয়ার এই নরম স্পর্শ, তার বুকের সাথে মিশে থাকা শরীর অরণ্যের ভেতরের সব রাগ এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিল। অরণ্য অজান্তেই দিয়ার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।
ঝুম বৃষ্টির রাত, নির্জন পুরোনো ঘর, আর দুই বিপরীত মেরুর মানুষের প্রথম স্পর্শে জমে উঠল এক অজানা, তপ্ত উন্মাদনা। ভুল বোঝাবুঝির অন্তরালে শুরু হলো এক কঠিন ভালোবাসার প্রথম অধ্যায়।
বিজলি চমকানোর সেই আলোয় অরণ্যের বুকের ওপর দিয়ার থরথর করে কাঁপা শরীরটা এক অদ্ভুত ঝাপসা আবেশ তৈরি করল। অরণ্য চাইলে মুহূর্তে দিয়াকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারত, কিন্তু তার হাত দুটো যেন নিজের অজান্তেই দিয়ার সরু কোমরে শক্ত বাঁধন তৈরি করল। দিয়ার শাড়ির ভিজে যাওয়া সুতি কাপড় পার হয়ে অরণ্যের হাতের গরম ছোঁয়া দিয়ার ত্বকে গিয়ে বিঁধল। দিয়ার বুকের উঠানামা আর দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল অরণ্য।
"এত ভয় পাও?" অরণ্যের গলার স্বর হঠাৎ করেই গম্ভীর থেকে গভীর হয়ে এল। তার ঠোঁট দিয়ার কানের খুব কাছে।
দিয়া চমকে উঠে অরণ্যের দিকে তাকাল। দুজনের চোখের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। দিয়ার কপাল থেকে একফোঁটা বৃষ্টির পানি গড়িয়ে তার ঠোঁটের কোণে গিয়ে থামল। অরণ্যের দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল দিয়ার কাঁপতে থাকা ভেজা ঠোঁটে। এক অচেনা আদিম নেশা চেপে বসল অরণ্যের মাথায়। সে দিয়ার কোমর আরও কাছে টেনে নিল, দুজনের শরীরের মধ্যে আর কোনো ফাঁক রইল না।
"ছাড়ুন... প্লিজ," দিয়ার গলার কণ্ঠস্বর বের হচ্ছিল না বললেই চলে। অরণ্যের এই আগুনের মতো গরম স্পর্শ তার শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিল এক অজানা শিহরণে। তার নরম দুটো হাত অরণ্যের শক্ত চওড়া বুকে আটকে ছিল সরানোর চেষ্টা না করে যেন আঁকড়ে ধরার জন্য।
অরণ্য দিয়ার কথা শুনল না। তার ডান হাতের আঙুলগুলো দিয়ার পিঠের খোলা অংশে ধীরে ধীরে উঠে এল। দিয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বিদ্যুতের প্রবাহ বয়ে গেল। অরণ্য তার বুড়ো আঙুল দিয়ে দিয়ার নিচের ঠোঁটের ভিজে থাকা পানির ফোঁটাটা আলতো করে মুছে দিল। তারপর দিয়ার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার নরম গালে নিজের শক্ত ঠোঁট দুটো চেপে ধরল। দিয়া চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, তার হাত অরণ্যের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল। অরণ্যের ঠোঁটের উত্তাপ দিয়ার পুরো শরীরে এক তপ্ত আবেশ ছড়িয়ে দিল।
কিন্তু পর মুহূর্তেই বিজলির আলো নিভে গিয়ে পুরো ঘর আবার ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল। বাইরের ঝোড়ো বাতাসের সাথে দিয়ার খেয়াল হলো—সে কী করছে! এক অজানা পুরুষের বুকের মধ্যে এভাবে হারিয়ে যাওয়া তার শান্ত, লক্ষ্মী মেয়ে হিসেবে গড়ে ওঠা নীতিবোধে তীব্র নাড়া দিল। দিয়া শক্তি প্রয়োগ করে অরণ্যের বুক ঠেলে পেছনে সরিয়ে দিল।
"আপনি খুব খারাপ! অসভ্য একটা লোক!" কেঁদে ফেলল দিয়া। তার কণ্ঠস্বরে রাগের চেয়ে বেশি ছিল এক চরম আত্মগ্লানি। শাড়ির আঁচলটা টেনে নিয়ে সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে বৃষ্টিভেজা রাতের অন্ধকারের মধ্যেই দৌড়ে নীলকুঠি থেকে বেরিয়ে গেল।
অরণ্য অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো তখনো দিয়ার শরীরের উত্তাপ বহন করছিল। নিজের এমন অনিয়ন্ত্রিত আচরণের ওপর তার প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল। "একটা গ্রাম্য মেয়ের জন্য আমি নিজেকে এভাবে হারালাম?" বিড়বিড় করে বলল অরণ্য, তারপর দেয়ালে প্রচণ্ড জোরে একটা ঘুষি মারল।
পরদিন সকালে বৃষ্টি থেমে গিয়ে মিষ্টি রোদ উঠেছে। কিন্তু দিয়ার মনের ভেতর চলছিল ঝড়। সারা রাত সে ঘুমাতে পারেনি। অরণ্যের স্পর্শ, তার বুকের উত্তাপ আর ঠোঁটের ছোঁয়া বারবার দিয়ার মনে ভেসে উঠছিল। একদিকে তীব্র রাগ, অন্যদিকে এক অদ্ভুত টান—দিয়া নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
দিয়ার বাবা কাজেম আলী গ্রামের মুরুব্বি মানুষ। সকালে নাস্তার টেবিলে বসে তিনি দিয়াকে বললেন, "দিয়া মা, নদীর ওপারে যে নতুন শহরের লোকটা আইসা নীলকুঠিতে উঠছে, শুনলাম লোকটা নাকি গ্যাংস্টার টাইপের। এলাকার কুদ্দুস মিঞার সাথে সকালে হাতাহাতি হইছে। তুই ওদিকে একদম যাবি না।"
দিয়া চুপ করে রুটিতে কামড় দিল। তার বুকটা ধক করে উঠল। অরণ্য আবার কার সাথে ঝামেলা করল?
দুপুরের দিকে দিয়া গ্রামের পুকুরপাড় দিয়ে ফিরছিল। তখনই মেঠোপথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল অরণ্যের সাথে। অরণ্যের পরনে সাদা টি-শার্ট আর জিন্স, চোখের নিচে কালি, হাত জোড় করা। তার কপালে সামান্য কেটে গেছে—হয়তো কুদ্দুস মিঞার দলের সাথে ঝামেলার ফল।
দিয়া অরণ্যকে দেখে চোখ ঘুরিয়ে অন্য পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যেতে চাইল। কিন্তু অরণ্য লম্বা পা ফেলে দিয়ার একদম সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল।
"সরুন আমার পথ থেকে," দিয়া রুক্ষ স্বরে বলল, কিন্তু তার চোখে চোখ রাখার সাহস পাচ্ছিল না।
অরণ্য একপা এগিয়ে এল। "গতকাল রাতের জন্য..." অরণ্য থামল, তার গলা কিছুটা নিচু। "দুঃখিত হতে বলছ না তো?"
দিয়া অবাক হয়ে অরণ্যের দিকে তাকাল। অরণ্যের চোখে সেই আগের মতো জেদ আর অহংকার, কিন্তু সেখানে কিছুটা অপরাধবোধও যেন লুকিয়ে আছে।
"আপনার মুখ থেকে দুঃখিত শব্দ আশা করাটাই ভুল," দিয়া তপ্ত কণ্ঠে বলল। "আপনি রুক্ষ, অহংকারী আর নির্দয়। আপনার মতো মানুষের কাছে অন্য কারো অনুভূতির কোনো দাম নেই।"
অরণ্য হালকা হাসল, যে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। "ঠিক ধরেছ। আমি এমনই। কিন্তু কাল রাতে তুমিও আমাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার মতো চেষ্টা করোনি, দিয়া।"
অরণ্যের মুখে নিজের নাম শুনে দিয়া থমকে গেল। অরণ্য তার এত কাছে দাঁড়িয়েছিল যে তার শরীরের গন্ধ দিয়াকে আবার কালকের রাতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। দিয়া রাগ সামলাতে না পেরে অরণ্যের বুকে এক হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে চাইল। কিন্তু অরণ্য চট করে দিয়ার কবজিটা ধরে ফেলল।
"হাত ছাড়ুন! গ্রামে কেউ দেখে ফেললে কাল হয়ে যাবে!" দিয়া ভয়ে চারপাশে তাকাল।
"দেখুক," অরণ্য এক চুলও সরলো না। দিয়ার ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে অরণ্যের গলার স্বর আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। "তুমি আমাকে রুক্ষ ভাবো, ভাবো। কিন্তু আমাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো না। কারণ আমি ভুলতে পারছি না।"
অরণ্য দিয়ার হাত ছেড়ে দিল এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা হেঁটে চলে গেল। দিয়া পুকুরপাড়ের গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার শক্ত হয়ে থাকা বুকের ভেতরটা দ্রুত কাঁপছিল। সে অরণ্যকে ঘৃণা করতে চায়, কিন্তু যতবার অরণ্য তার কাছে আসে, দিয়ার ভেতরের পুরো বিশ্বটা যেন তছনছ হয়ে যায়। ভুল বোঝাবুঝির দেয়ালটা আরও উঁচু হতে লাগল, কিন্তু সেই সাথে তাদের অদৃশ্য বাধনটাও তলে তলে শক্ত হতে শুরু করল।
বিকেলের দিকে গ্রামের আকাশটা আবার কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে এল। নীলকুঠির পুরানো বারান্দায় কাঠের বেঞ্চে বসে ছিল অরণ্য। হাতের সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মাথার ভেতর চলতে থাকা বিষাক্ত চিন্তাগুলো কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। দিয়ার ভেজা চোখ, তার ক্ষোভ আর সেই রাতের উষ্ণ ছোঁয়া অরণ্যের অহংকারে প্রতিনিয়ত আঘাত করছিল। অরণ্য নিজেকে বোঝাতে চাইছিল—ঐ গ্রাম্য মেয়েটা তার জীবনের কেউ নয়। তবুও অরণ্যের মন বারবার দিয়ার নামেই তোলপাড় হচ্ছিল।
ওদিকে দিয়ার বাড়িতে তখন তুমুল হাঁকডাক। দিয়ার বড় ভাই সাজ্জাদ শহর থেকে ফিরেছে। সাজ্জাদ লোকটা ধূর্ত আর লোভী। সে গ্রামের সুদের কারবারি আজমল মিঞার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ধার নিয়েছিল, যা শোধ করতে না পেরে সে আজমল মিঞার ছেলের সাথে দিয়ার বিয়ের কথা পাকা করার পাঁয়তারা করছে। দিয়া যখন এই খবর জানতে পারল, তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।
"বাবা! তুমি এই কাজ করতে পারবা না!" কান্নায় ভেঙে পড়ল দিয়া। "আজমলের পোলা একটা মদ্যপ, লম্পট! তোমরা জেনেশুনে আমাকে বিষের মুখে ঠেলে দিচ্ছ?"
কাজেম আলী অসহায় চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। সাজ্জাদ কড়া গলায় বলল, "চুপ থাকবি দিয়া! ভাইয়ের সম্মান বাঁচানো তোর কাজ। এই পরিবার তোকে বড় করেছে, এখন না বলার অধিকার তোর নাই!"
দিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। যে পরিবারকে সে এত ভালোবাসত, সেই পরিবারই আজ তাকে নিজের স্বার্থের জন্য বিকিয়ে দিচ্ছে। অভিমানে, যন্ত্রণায় আর ক্ষোভে দিয়ার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে এল। সে আর এক মুহূর্তও বাড়িতে দাঁড়াতে পারল না। শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা দৌড় দিল মেঠোপথ ধরে।
রাতের অন্ধকার তখন ডালপালা মেলছে। গ্রামে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। দিয়া হাঁটতে হাঁটতে কখন যে নদীর ওপারে নীলকুঠির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা সে নিজেও টের পায়নি। কুঠির ঘরের ভেতর একটা মিটিমিটি হ্যারিকেনের আলো জ্বলছিল।
দিয়া কোনো কিছু না ভেবেই একপ্রকার ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে পড়ল।
অরণ্য তখন খালি গায়ে সোফায় বসে ছিল, হাতে একটা মদের বোতল। হুট করে দরজায় দিয়াকে এলোমেলো চুল আর জলছলছল চোখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চমকে উঠল। বোতলটা পাশে রেখে অরণ্য দাঁড়িয়ে পড়ল।
"তুমি? এই রাতে এখানে কী করছ?" অরণ্যের গলার স্বর কিছুটা কঠিন হলেও তাতে উদ্বেগের ছাপ ছিল।
দিয়া অরণ্যের কাছে এগিয়ে এল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল। "আপনি বলছিলেন না আপনি রুক্ষ, আপনি খারাপ? আপনি যা খুশি ভাবুন আমাকে, কিন্তু আজ আমি আর কোথাও যেতে পারছি না..."
দিয়ার এই অসহায় রূপ দেখে অরণ্যের ভেতরের সব কাঠিন্য এক নিমেষে গলে গেল। সে দিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিয়ার বাহু দুটো চেপে ধরল। "কী হয়েছে বলো আমাকে? কেউ কিছু বলেছে?"
"আমার পরিবার... তারা আমাকে বিক্রি করে দিচ্ছে অরণ্য!" দিয়া প্রথমবারের মতো অরণ্যের নাম ধরে ডাকল। "এক পশুর হাতে তুলে দিচ্ছে আমাকে। আমি পারব না... আমি মরে যাব!"
'অরণ্য' ডাকটা অরণ্যের বুকের ভেতর এক প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করল। দিয়ার এই কান্না, তার অসহায়তা অরণ্যের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা এক হিংস্র পশুকে জাগিয়ে তুলল। দিয়ার গায়ে কেউ হাত দেবে—এই চিন্তাটাই অরণ্যের মাথায় রক্ত চড়িয়ে দিল।
"কার এত বড় সাহস?" অরণ্যের গলার স্বর হিংস্র শোনালো। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল।
দিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে অরণ্যের শক্ত বুকে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। অরণ্য এক মুহূর্ত ইতস্তত করল, তারপর নিজের দীর্ঘ দুটো হাত দিয়ে দিয়াকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। দিয়ার কান্নার তোড়ে অরণ্যের বুক ভিজে যাচ্ছিল। অরণ্য এক হাত দিয়ে দিয়ার পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে লাগল, অন্য হাত দিয়ে দিয়ার মাথাটা নিজের থুতনির নিচে চেপে ধরে রাখল।
"কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। আমি বেঁচে থাকতে তো নয়ই," অরণ্য দিয়ার কানে কানে ফিসফিস করে বলল।
দিয়া মুখ তুলে অরণ্যের দিকে তাকাল। হ্যারিকেনের হালকা আলোয় অরণ্যের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে দিয়ার জন্য এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর ভালোবাসার আলো। দিয়ার ভেতরের জমাট বাঁধা ভয়টা এক নিমেষে উবে গেল। তার মনে হলো, এই হিংস্র, রাগী লোকটার বুকের ভেতরই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
দিয়ার চোখের পানির ফোঁটা অরণ্যের আঙুলে গিয়ে লাগল। অরণ্য নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে দিয়ার গাল দুটো মুছে দিল। তারপর আর সহ্য করতে না পেরে দিয়ার চিবুকটা ধরে মুখটা কিছুটা ওপরে তুলল। অরণ্যের চোখ গিয়ে আটকালো দিয়ার লাল হয়ে থাকা ঠোঁটে।
দিয়া এবার চোখ বন্ধ করল না। সে অরণ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। অরণ্য ঝুকে এসে দিয়ার ঠোঁটে নিজের তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এবারের ছোঁয়াটা আগের মতো আকস্মিক ছিল না, এতে ছিল গভীর আবেগ, প্রতিশ্রুতি আর এক তপ্ত তৃষ্ণা। অরণ্যের শক্ত হাত দিয়ার কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও ওপরে তুলে নিল, আর দিয়া দুই হাতে অরণ্যের ঘাড়ে জড়িয়ে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল।
ঘরের নীরবতা ভেদ করে কেবল তাদের তপ্ত নিঃশ্বাস আর বাইরে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছিল। বাঁধ ভাঙা স্রোতের মতো দুজন দুজনের আগুনে পুড়তে শুরু করল, সব ভুল বোঝাবুঝি ছাই হয়ে উবে গেল সেই কামনাময় রাতে।
সেই গভীর রাতে নীলকুঠির নিঝুম ঘরে অরণ্যের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিল দিয়া। হ্যারিকেনের আলোটা নিভে গিয়ে এখন কেবল জানলা দিয়ে আসা জোছনার আলো ঘরের মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। অরণ্যের এক হাত দিয়ার মাথার নিচে, অন্য হাতটা দিয়ার অনাবৃত পিঠে আলতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দিয়ার ভেজা চুলগুলো অরণ্যের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটু আগের সেই উগ্র, তীব্র স্পর্শের পর দুজনের শরীরেই এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, কিন্তু দিয়ার মনের কোণে ভয়ের কালো মেঘ সরেনি।
"যদি ওরা আমাকে খুঁজে পায়?" দিয়া অরণ্যের বুকের লোমে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে ফিসফিস করে বলল। তার গলার স্বর কাঁপা।
অরণ্য দিয়ার থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলল। জোছনার আলোয় দিয়ার চোখ দুটো তারার মতো জ্বলজ্বল করছিল। অরণ্য দিয়ার কপালে দীর্ঘ এক চুমু এঁকে দিল, যা দিয়ার ভেতরের সব সংশয় দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
"ওদের ক্ষমতা নেই আমার কাছ থেকে তোমাকে ছিনিয়ে নেওয়ার," অরণ্যের কণ্ঠস্বরে ছিল ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। "তুমি এখন আমার দিয়া। এই সত্যটা পুরো গ্রামকে আমি বুঝিয়ে দেব।"
কিন্তু সুখের সময়গুলো কখনোই দীর্ঘ হয় না। সকালের প্রথম আলো ফুটতেই নীলকুঠির বাইরে থেকে ভেসে এল হিংস্র চিৎকার আর গালাগালির শব্দ।
"অরণ্য! বের হয়ে আয় কুত্তার বাচ্চা! অন্যের বোনকে কুঠিতে বন্দি করে রাখিস, তোর এত বড় সাহস!" সাজ্জাদের হিংস্র গলায় পুরো নীলকুঠি কেঁপে উঠল। সাথে ছিল আজমল মিঞার গুণ্ডাবাহিনী। লাঠিসোঁটা আর ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা নীলকুঠি ঘিরে ফেলেছে।
ঘরের ভেতরে দিয়া ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে দ্রুত নিজের শাড়িটা গুছিয়ে নিয়ে অরণ্যের হাত শক্ত করে ধরে বলল, "অরণ্য, তুমি বাইরে যেও না! ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে!"
অরণ্য একদম শান্ত। সে শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে দিয়ার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি হাসল। "আমাকে মারার মতো পুরুষ এই গ্রামে জন্মায়নি, দিয়া।"
অরণ্য দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল, পেছনে ভয়ে কাঁপতে থাকা দিয়া। সাজ্জাদ আর তার সাথে থাকা পাঁচ-ছয়জন গুণ্ডা অরণ্যকে দেখে আরও ক্ষেপে গেল।
আজমল মিঞার ব্যাটা রফিক একটা রামদা উঁচিয়ে অরণ্যের দিকে তেড়ে এল, "শালা শহরের গুণ্ডা! আজ তোকে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেব!"
রফিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই অরণ্য চিতা বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে রফিকের হাতটা এক মোচড়ে ভেঙে দিয়ে রামদাটা কেড়ে নিল। অরণ্যের ভেতরের হিংস্র রূপটা আজ পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে। সে একের পর এক গুণ্ডাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে লাগল। অরণ্যের মারের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারছিল না। সাজ্জাদ ভয়ে কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই পিছন থেকে একজন লোক বাঁশের লাঠি দিয়ে অরণ্যের মাথায় প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল।
"অরণ্য!" দিয়া চিৎকার করে উঠল।
অরণ্যের মাথা কেটে রক্তের ধারা নেমে এল তার মুখে। কিন্তু সে পড়ল না। রক্তমাখা মুখে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে লোকটার বুকে এক লাথি মারল। লোকটা ছিটকে গিয়ে পড়ল গাছের ওপর। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো এলাকা অরণ্যের রক্ত আর গুণ্ডাদের চিৎকারে বিষাক্ত হয়ে উঠল। অরণ্য একাই চার-পাঁচজনকে রক্তাক্ত করে মাটিতে ফেলে দিল।
সাজ্জাদ এবার বুক পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে দিয়ার দিকে ছুটে গেল। "তুই আমাদের বংশের মুখ পুড়িয়েছিস! তোকে আজ শেষ করে দেব!"
"না!" অরণ্যের গর্জন ভেসে এল। সে কোনো কিছু না ভেবেই সাজ্জাদ আর দিয়ার মাঝখানে এসে দাঁড়াল। সাজ্জাদের হাতের ছুরিটা সোজা গিয়ে বিধল অরণ্যের পেটের ডান পাশে।
সময় যেন থমকে গেল।
দিয়ার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "অরণ্য!" দিয়া চিৎকার দিয়ে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরল।
অরণ্য রক্তাক্ত হাতে ছুরিটা নিজের পেট থেকে টেনে বের করে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর রক্তমাখা চোখে সাজ্জাদের শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, "এর পর যদি দিয়ার দিকে এক কদম এগিয়েছিস, তোদের পুরো বংশ মুছে দেব।"
অরণ্যের এই দানবীয় রূপ আর রক্তমাখা চেহারা দেখে সাজ্জাদ আর আজমলের লোকেরা ভয়ে প্রাণ নিয়ে পাললাল।
অরণ্য মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার পেটের ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, কপাল থেকেও রক্ত গড়িয়ে শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে। দিয়া অরণ্যের পাশে মাটিতে বসে পড়ল, তার চোখের পানিতে ভেসে যাচ্ছে মুখ।
"তুমি কেন এলে মাঝখানে? কেন নিজেকে শেষ করছ আমার জন্য?" দিয়া কেঁদে কেটে নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে অরণ্যের পেটের ক্ষতে চেপে ধরল।
অরণ্য হাত বাড়িয়ে দিয়ার ভেজা গালটা স্পর্শ করল। তার হাত রক্তে লাল, সেই রক্ত দিয়ার গালেও লেগে গেল। অরণ্য দুর্বল হেসে বলল, "তোমার গায়ে একটা আঁচড় লাগতে দেওয়ার চেয়ে... মরে যাওয়া অনেক ভালো, দিয়া।"
"চুপ করো! একদম মরার কথা বলবে না!" দিয়া অরণ্যের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। "তোমার কিছু হতে দেব না আমি। দরকার হলে পুরো পৃথিবীর সাথে লড়ব, তাও তোমাকে বাঁচাব।"
রক্তের ভেজা ছোপে আর ভালোবাসার কঠিন পরীক্ষায় বাঁধল তাদের দুই জীবন। একদিকে অরণ্যের শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্ত, আর অন্যদিকে দিয়ার চোখে ভালোবাসা বাঁচানোর এক চরম জেদ—শুরু হলো এক রক্তাক্ত সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।
অরণ্যের শরীরটা কাঠের মেঝের ওপর এলিয়ে পড়েছে। পেটের ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসা রক্তে দিয়ার পরনের শাড়ি ভিজে লাল হয়ে গেছে। দিয়ার হাত দুটো কাঁপছিল, কিন্তু তার মনের কোণে জমা হওয়া ভয়টা আজ এক জেদী সাহসে রূপ নিয়েছে। যে মেয়েটা কোনোদিন ঘরের চৌকাঠ ডিঙাতে ভয় পেত, সে আজ রক্তভেজা শক্ত শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে ঘরে নিয়ে এল।
"তোমাকে আমি কিচ্ছু হতে দেব না অরণ্য... তুমি চোখ বন্ধ কোরো না, প্লিজ!" দিয়ার কপালে ঘেমে ওঠা বিন্দু আর চোখের পানি একাকার হয়ে গিয়েছিল।
দিয়া দ্রুত ঘরের ভেতরে থাকা পুরানো সুতি কাপড় দিয়ে অরণ্যের পেটের ক্ষতটা শক্ত করে বেঁধে দিল। নদীর ধারের নীলকুঠিতে কোন ডাক্তার আসবে না, আর গ্রামে নিয়ে গেলে সাজ্জাদের লোকেরা অরণ্যকে জ্যান্ত কবর দেবে। দিয়া জানত, অরণ্যকে বাঁচাতে হলে ওষুধ নিজেকেই বানাতে হবে। সে ছুটে বের হয়ে গেল পেছনের ঝোপঝাড়ের দিকে। ছোটবেলায় বাবার কাছে শেখা গাদাগাদা পাতা আর বিষকাটালির লতা ছিঁড়ে এনে পাটায় বেটে মলম তৈরি করল।
অরণ্যের শরীরে তখন প্রচণ্ড জ্বর। সে প্রলাপ বকছে, বারবার দিয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরছে, "দিয়া... দূরে যেও না... ওরা তোমাকে নিয়ে যাবে..."
দিয়া অরণ্যের কপালে ভেজা শাড়ির টুকরো দিয়ে জলপট্টি দিতে দিতে তার রক্তমাখা কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। "আমি কোথাও যাব না। তোমার পাশেই আছি।"
পুরোটা দিন আর রাত কেটে গেল এক চরম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। দিয়া এক মুহূর্তের জন্যও অরণ্যের কাছ থেকে সরেনি। কখনো অরণ্যের ক্ষতস্থানে ভেষজ রস লাগিয়ে দিয়েছে, কখনো নিজের ভেজা আঁচল দিয়ে তার দগ্ধ শরীরটা মুছে দিয়েছে। ভোরের আলো যখন জানলা দিয়ে ঘরে এসে পড়ল, তখন অরণ্যের শরীরের তাপ কিছুটা কমল।
অরণ্য ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখের সামনে ধোঁয়াটে আলোয় সে দেখতে পেল দিয়াকে। দিয়া সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার চোখ দুটো ফুলে লাল, গালে এখনো শুকনো রক্তের দাগ লেগে আছে। অরণ্যের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। শহরের নামকরা গুন্ডা, যার এক ডাকে পুরো এলাকা কাঁপত, আজ সে এই শান্ত মেয়েটার নিখাদ ভালোবাসার কাছে পুরোপুরি পরাজিত।
অরণ্য কষ্ট করে হাত বাড়িয়ে দিয়ার আলগা হয়ে থাকা গালে হাত রাখল। স্পর্শ পেয়েই দিয়া চমকে জেগে উঠল।
"অরণ্য! তুমি ঠিক আছো? ব্যথা করছে খুব?" দিয়া আতিপাতি করে অরণ্যের মুখ, কপাল ছুঁয়ে দেখতে লাগল।
অরণ্য একহাত দিয়ে দিয়ার ঘাড় ধরে তাকে একদম নিজের বুকের ওপর টেনে আনল। অরণ্যের এই আকস্মিক টানে দিয়া আলতো করে অরণ্যের ক্ষতের কথা ভেবে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু অরণ্য তাকে ছাড়ল না। অরণ্যের গরম শ্বাস দিয়ার ঠোঁটে এসে বিঁধল।
"এত ভালোবাসা কোথায় পেলে তুমি?" অরণ্যের গলার স্বর ভাঙা, গভীর। "আমার মতো একটা বিষাক্ত মানুষের জন্য নিজের সব কিছু বাজি ধরলে?"
দিয়া অরণ্যের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর অহংকার নেই, কেবল দিয়ার জন্য এক আকুল আবেদন। দিয়া অরণ্যের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, "তুমি বিষাক্ত নও। তুমি আমার আশ্রয়। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না অরণ্য।"
অরণ্য আর কোনো কথা বলল না। সে দিয়ার কোমর ধরে তাকে টেনে এনে নিজের ঠোঁট দুটো দিয়ার গলার নিচে, খোলা কাঁধে চেপে ধরল। জ্বরের উত্তাপ আর ভেতরের তীব্র আকুলতায় অরণ্যের স্পর্শগুলো আরও তপ্ত হয়ে উঠল। দিয়ার শাড়ির আঁচলটা খসে পড়ল মেঝেতে। অরণ্য দিয়ার ভেজা কামড় আর ছোঁয়ায় নিজের সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলে যেতে চাইল। দিয়াও কোনো বাধা দিল না, অরণ্যের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিয়ে সে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল এই রক্তাক্ত ভালোবাসার আগুনে।
কিন্তু সুখের সেই মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। দুপুর গড়াতেই নীলকুঠির বাইরে আবার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। তবে এবার কোনো গুন্ডাবাহিনী নয়, এল দিয়ার বাবা কাজেম আলী।
বৃদ্ধ মানুষটার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে অপমানের করুণ ছাপ। তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে কেঁদে ফেললেন।
"দিয়া... তুই এই অসামাজিক লোকটার জন্য নিজের কুল-মান সব শেষ করলি?" কাজেম আলীর গলা কাঁপছিল। "পুরো গ্রামে কথা উঠে গেছে। সাজ্জাদ আর আজমল তোকে এলাকা ছাড়ার ফতোয়া দিয়েছে। তুই যদি এখনই ঘরে না ফিরিস, আমি গলায় দড়ি দেব মা।"
দিয়া বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইল। একপাশে তার প্রাণপ্রিয় বাবা, যে তাকে ভালোবেসে বড় করেছে, আর অন্যপাশে অরণ্য—যে তার জন্য নিজের বুকে ছুরি সহ্য করেছে।
অরণ্য সোফা থেকে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু ক্ষতস্থানে টান লেগে সে কষ্টে কুকড়ে উঠল। "দিয়া, যেও না..." অরণ্য হাত বাড়াল।
দিয়া অরণ্যের রক্তের ফোঁটা আর বাবার চোখের পানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন নিঃশ্বাস হারিয়ে ফেলল। বাবার এই আত্মহত্যার হুমকি দিয়ার বুকটা গুঁড়িয়ে দিল।
দিয়া অরণ্যের দিকে তাকাল। তার চোখে অঝোর ধারা। সে অরণ্যের হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে যেতে হবে অরণ্য... বাবার জীবনের বিনিময়ে আমি তোমাকে পেতে পারি না।"
"দিয়া! আমি তোকে যেতে দেব না!" অরণ্য চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু তার শরীর সায় দিল না।
দিয়া অরণ্যের রক্তমাখা ঠোঁটে নিজের শেষ এক তপ্ত চুমু একে দিয়ে বাবার দিকে হেঁটে গেল। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে শেষবার ঘুরে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের শরীর আলাদা হতে পারে অরণ্য, কিন্তু আমার আত্মা তোমার নীলকুঠিতেই রয়ে গেল।"
বাবার সাথে দিয়া হেঁটে চলে গেল ধুলোবালি উড়ানো পথ ধরে। অরণ্য একাকী নীলকুঠির মেঝেতে পড়ে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু তার সেই আর্তনাদ নদীর বাতাসে মিলিয়ে গেল। ভালোবাসার বাঁধন ভাঙেনি, কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় দুজন আবার দুই মেরুতে ছিটকে পড়ল।
দিয়া ফিরে আসার পর কাজেম আলীর ঘরে যেন শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। সাজ্জাদ দিয়ার ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দিল; তাকে ঘরের বাইরে পা রাখার অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হলো না। তবে দিয়ার মন, প্রাণ আর শরীর পড়ে রইল নীলকুঠির সেই নিঝুম বারান্দায়, অরণ্যের বুকের কাছে।
দিনকয়েক পর থেকে দিয়ার শরীরে অদ্ভুত সব পরিবর্তন দেখা দিতে লাগল। সকাল হলেই তার প্রচণ্ড বমি ভাব হতো, মাথা ঘুরে উঠত, আর চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে যেত। দিয়া বুঝতে পারছিল তার ভেতরে কিছু একটা ঘটছে, কিন্তু সে কাউকে কিছু বলতে পারছিল না।
অবশেষে একদিন দুপুরে রান্নাঘরে কাজ করার সময় দিয়া হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাজেম আলী আর তার বোন দ্রুত ডেকে আনলেন গ্রামের একমাত্র পুরানো ধাত্রী পারভীন খালাকে।
সোফায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে থাকা দিয়াকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর পারভীন খালার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে ঘর থেকে বের হয়ে কাজেম আলীর মুখোমুখি দাঁড়াল।
"কী হইছে খালা? দিয়ার শরীর এত খারাপ ক্যা?" কাজেম আলী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধালেন।
পারভীন খালা নিচু স্বরে বললেন, "কাজেম ভাই, কথাডা কেমনে বলি... দিয়ার পেটে সন্তান আসছে। তিন-চার সপ্তাহের পোয়াতি মেয়েটা।"
কথাটা শুনতেই কাজেম আলীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সাজ্জাদ ঘর থেকে বের হয়ে এসে চোখ লাল করে গর্জে উঠল, "ওই কুত্তার বাচ্চার রক্ত আমার বোনের পেটে! আমি ওকে আজই মেরে ফেলব!"
দিয়ার ঠিক তখনই জ্ঞান ফিরেছিল। ধাত্রীর কথাগুলো তার কানে যেতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার গর্ভে অরণ্যের সন্তান! নীলকুঠির সেই তপ্ত, কামনামায় রাতে অরণ্যের স্পর্শের চিহ্ন এখন তার ভেতরে স্পন্দিত হচ্ছে। দিয়ার চোখে অশ্রুর বদলে এক অদ্ভুত আনন্দের আলো খেলে গেল, কিন্তু পর মুহূর্তেই পরিবারের হিংস্র রূপ দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।
"না সাজ্জাদ!" কাজেম আলী চিৎকার করে উঠলেন। "আর কোনো রক্তারক্তি না! গ্রামবাসী জানতে পারলে আমরা মুখ দেখাতে পারব না। কাল সকালেই ওকে শহরের ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাটা নষ্ট করাবি, আর তারপর আজমলের লম্পট পোলার সাথেই দিয়ার নিকাহ হবে!"
কথাটা শুনে দিয়ার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সে কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে বাবার পা দুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, "বাবা! আমাকে মেরে ফেলো, কিন্তু আমার পেটের সন্তানকে কিছু কোরো না! এটা অরণ্যের আমানত... আমি অরণ্যকে ছাড়া আর কাউকে জানি না!"
সাজ্জাদ দিয়াকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল, "চুপ কর নষ্ট মেয়ে! কাল সকালেই তোর সব শখ মেটাব।"
দিয়াকে তারা ঘরে আটকে বাইরে থেকে তালা মেরে দিল। দিয়া অন্ধকার ঘরের মেঝেতে বসে নিজের পেটে হাত রাখল। অরণ্যের ভালোবাসার আলো তার ভেতরে বড় হচ্ছে, আর এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে রক্ষা করতেই হবে।
ওদিকে নীলকুঠিতে অরণ্য তখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। কিন্তু দিয়ার বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। সে খবর পেয়েছিল দিয়াকে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। অরণ্য নিজের ক্ষতস্থানে হাত চেপে ধরে পিস্তলটা পকেটে পুরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে আজ দিয়ার পুরো পরিবারকে উড়িয়ে দিয়ে হলেও দিয়াকে ছিনিয়ে আনবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দিয়ার ছোট বোন রুকসানা চুপিচুপি নীলকুঠিতে এসে হাজির হলো। রুকসানা ছোট হলেও তার মনটা দিয়ার জন্য কাঁদছিল।
"অরণ্য ভাই!" রুকসানা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
অরণ্য তার কলার চেপে ধরল, "দিয়া কেমন আছে? বল আমাকে!"
রুকসানা ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আপাকে বাঁচান অরণ্য ভাই! আপার পেটে আপনার বাচ্চা এসেছে... কাল সকালে সাজ্জাদ ভাই আপাকে শহরে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাটা মেরে ফেলবে, আর তারপর অন্য জায়গায় বিয়ে দেবে! আপা আপনাকে খুব ভালোবাসে... আপাকে বাঁচান!"
রুকসানার কথাটা শোনামাত্রই অরণ্যের মাথায় যেন বাজ পড়ল। 'সন্তান!'—দিয়ার গর্ভাবস্থার খবর অরণ্যের পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছড়িয়ে দিল। তার আর দিয়ার ভালোবাসার ফল এখন দিয়ার পেটে বেড়ে উঠছে!
অরণ্যের চোখের হিংস্রতা এক মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে গেল। রক্তে তার আগুন জ্বলে উঠল। অরণ্য পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে লোড করল।
"দিয়া আমার স্ত্রী, আর ওর পেটের সন্তান আমার রক্ত," অরণ্যের দাঁতে দাঁত চেপে বলা গলার স্বর শুনে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠল। "আজ যদি কেউ ওদের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে, পুরো গ্রাম আমি পুড়িয়ে ছাই করে দেব।"
রাত বাড়তে লাগল। একপাশে বন্দি দিয়ার আকুল প্রার্থনা, আর অন্যপাশে অরণ্যের প্রলয়ংকরী রূপ—ভালোবাসা আর সন্তানের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য শুরু হলো এক মরণপণ যুদ্ধের শেষ অধ্যায়।
রাতের অন্ধকার গভীর হতেই আকাশে মেঘের গর্জন শুরু হলো। যেন প্রকৃতি নিজেই এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলার সাক্ষী হতে চাইছে। অরণ্যের চোখ দুটো রক্তবর্ণ, পরনে কালো শার্ট, হাতে ক্ষোভ আর হিংস্রতায় ভরা আগ্নেয়াস্ত্র। পেটের ক্ষতের ব্যথা এখন তার কাছে তুচ্ছ; দিয়ার গর্ভে বেড়ে ওঠা নিজের সন্তানের অস্তিত্ব তাকে এক পশুর মতো শক্তি এনে দিয়েছে।
ওদিকে ঘরের ভেতরে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসা দিয়া আঁকড়ে ধরেছিল নিজের পেটটা। "তুই ভয় পাস না সোনা... তোর বাবা আসবে," সে নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা প্রাণটাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।
ঠিক রাত বারোটা নাগাদ কাজেম আলীর বাড়ির কাঠের বিশাল দরজাটা এক বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অরণ্য এক লাথিতে দরজা উড়িয়ে ভেতরে ঢুকল। তার চোখমুখের হিংস্রতা দেখে ঘরের বাতাসে যেন থমথমে ভয় ছড়িয়ে পড়ল।
সাজ্জাদ রামদা হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল, "কুত্তার বাচ্চা, তুই আবার আসছিস মরতে?"
অরণ্য এক চুল সময় নষ্ট করল না। সে আগ্নেয়াস্ত্রের বাঁট দিয়ে সোজা সাজ্জাদের চোয়ালে সজোরে আঘাত করল। দাঁত ভেঙে রক্ত গড়িয়ে সাজ্জাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাজেম আলী ভয়ে দেয়ালের সাথে সেঁটে গেলেন।
"দিয়া কোথায়?" অরণ্যের গলার গর্জন যেন মেঘের আওয়াজকেও ছাপিয়ে গেল।
বন্ধ ঘরের ভেতরের শিকল ভেঙে অরণ্য যখন ভেতরে ঢুকল, দিয়া তখন ভয়ে আর আশায় একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অরণ্যকে রক্তাক্ত, ক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখে দিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দৌড়ে গিয়ে অরণ্যের বুকে আছড়ে পড়ল।
অরণ্য দিয়ার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কপালে, গালে, ঠোঁটে হিংস্র পরমমতায় আকুল চুম্বন এঁকে দিল। "কেউ আমাদের সন্তানকে ছুতে পারবে না, দিয়া! কেউ না!" অরণ্যের হাত দিয়ার পেটের ওপর আলতো করে চেপে বসল, যা দিয়াকে এক পরম নিরাপত্তার আমেজ দিল।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না। আজমল মিঞা আর তার ছেলে রফিক প্রায় দশ-বারো জন সশস্ত্র লোক নিয়ে পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলল।
"ওদের দুজনকে জ্যান্ত বের হতে দিবি না!" আজমলের নির্দেশে চারপাশ থেকে লাঠিসোঁটা আর ধারালো অস্ত্রের আক্রমণ শুরু হলো।
অরণ্য দিয়াকে আড়াল করে এক হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের ফাঁকা ফায়ার করে তাদের ভয় দেখাল, কিন্তু লোকগুলো অন্ধের মতো ধেয়ে এল। শুরু হলো এক অসম লড়াই। অরণ্য নিজের রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে একের পর এক লোককে মাটিতে ফেলে দিতে লাগল। রফিক পেছন থেকে অরণ্যের পিঠে একটা চ্যালা কাঠ দিয়ে আঘাত করতেই অরণ্য ঘুরে দাঁড়িয়ে রফিকের কলার চেপে ধরে সোজা তাকে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল।
"আমার রক্ত আর আমার ভালোবাসার দিকে নজর দেওয়ার শাস্তি জানিস?" অরণ্য রফিকের পেটে প্রচণ্ড এক লাথি মারল। রফিক রক্তের বমি করে মাটিতে এলিয়ে পড়ল।
সাজ্জাদ ততক্ষণে মাটি থেকে উঠে একটা ধারালো ছুরি নিয়ে দিয়ার দিকে তেড়ে এল। "তুই আমাদের বংশের কলঙ্ক! তোকে শেষ না করলে এই ঝামেলা মিটবে না!"
দিয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অরণ্য ছোঁ মেরে সাজ্জাদের হাতটা ধরে এক মোচড়ে ভেঙে দিল। সাজ্জাদের গগনবিদারী চিৎকার পুরো গ্রামে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।
অরণ্য সাজ্জাদের বুকে পা দিয়ে পিস্তলটা সোজা তার কপালে ঠেকিয়ে ধরল। "তোর বোন বলে তোকে ছেড়ে দিচ্ছিলাম, কিন্তু তুই আমার সন্তানের ওপর হাত তোলার চেষ্টা করেছিস!"
"অরণ্য, না!" দিয়া কেঁদে উঠে অরণ্যের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। "ও আমার ভাই! ওকে মেরো না... আমরা রক্তে আর রক্ত যোগ করতে চাই না!"
দিয়ার কান কান্না আর চোখের পানিতে অরণ্যের ট্রিগারে থাকা আঙুলটা থমকে গেল। অরণ্য জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল, তার কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত দিয়ার ভেজা গালে মিশে যাচ্ছিল। দিয়া অরণ্যের রক্তমাখা মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে বলল, "চল এখান থেকে দূরে চলে যাই... যেখানে শুধু তুমি, আমি আর আমাদের সন্তান থাকব।"
অরণ্য সাজ্জাদকে এক লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে দিয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। "আজ থেকে এই গ্রামের সাথে তোদের সব সম্পর্ক শেষ।"
অরণ্য দিয়াকে নিজের পাজা কোলে তুলে নিল। রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত অরণ্য তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসাকে বুকে আঁকড়ে ধরে অন্ধকারের ঝোড়ো রাতের মধ্যে হেঁটে বের হয়ে গেল। কাজেম আলী আর সাজ্জাদ রক্তাক্ত মাটিতে পড়ে কেবল অসহায় চোখে চেয়ে রইল।
ঝড়-বৃষ্টির রাতের সেই অন্ধকার চিরে অরণ্য আর দিয়া পা বাড়াল এক অজানা গন্তব্যে—যেখানে অপেক্ষা করছে তাদের ভালোবাসার শেষ পরীক্ষা আর এক নতুন ভোরের সূর্য।
কালবৈশাখীর সেই ভয়াল রাত পার হয়ে সকালের সোনাঝরা রোদ এসে পড়ল এক নীরব, শান্ত নদীর পাড়ে। গ্রাম থেকে বহু দূরে শহরের এক কোণে গড়ে ওঠা ছোট কাঠ-টিনের দোতলা বাড়িটার বারান্দায় বসে ছিল দিয়া। চারপাশের কোলাহলহীন এই শান্ত পরিবেশ যেন এতদিনের সব ঝড়-ঝাপটার ক্ষত ভুলিয়ে দেওয়ার এক আশ্চর্য ওষুধ।
আজ পুরো আট মাস পার হয়ে গেছে সেই রক্তাক্ত রাতের পর। আজমলের গুণ্ডাবাহিনী আর সাজ্জাদের চোখরাঙানি পেরিয়ে অরণ্য তার দিয়াকে নিয়ে এক নতুন জীবন গড়ে তুলেছে। পুরোনো অরণ্য—যে ছিল রাগী, একাকী আর রূঢ়—সে আজ ভালোবাসার টানে পুরোপুরি বদলে গেছে।
ঘরের ভেতর থেকে অরণ্য বেরিয়ে এল, হাতে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ। তার পরনে সাধারণ সুতির কুর্তা, কপালে এখনো সেই রাতের পুরানো কাটার হালকা দাগ। অরণ্য এসে দিয়ার পাশে বসে গ্লাসটা দিয়ার হাতে দিল।
"আবার ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছিলে?" অরণ্যের গলার স্বর এখন অত গম্ভীর নয়, তাতে জড়িয়ে আছে এক অপরিসীম মমতা।
দিয়া মিষ্টি হেসে গ্লাসটা হাতে নিল। তার পেট এখন বেশ দৃশ্যমান, অন্তঃসত্ত্বা রূপের এক অপরূপ আলো ঠিকরে বের হচ্ছে তার পুরো শরীর থেকে। দিয়া অরণ্যের কাঁধে মাথা রাখল।
"তুমি অত নজর রাখলে ফাঁকি দেব কীভাবে?" দিয়া ফিসফিস করে বলল।
অরণ্য দিয়ার কোমর পেঁচিয়ে ধরে নিজের হাতটা আলতো করে দিয়ার ফুলে থাকা পেটের ওপর রাখল। ঠিক তখনই ভেতরের ছোট্ট প্রাণটা হালকা নড়ে উঠল। অরণ্যের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে আর আবেগে বড় বড় হয়ে গেল। যে হাত একসময় রক্ত আর অস্ত্র ছুঁয়েছিল, সেই হাত আজ নিজের সন্তানের প্রথম স্পন্দন অনুভব করছে।
"ও নড়ছে দিয়া..." অরণ্যের গলার স্বর ধরে এল, তার চোখে জলছলছল এক অচেনা আনন্দ।
অরণ্য দিয়ার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার ঠোঁট দুটো দিয়ার ভেজা কপালে, গালে আর তারপর গলার নিচে নেমে এসে এক তপ্ত স্পর্শ এঁকে দিল। দিয়ার নরম দুটো হাত অরণ্যের চুলের ভেতর হারিয়ে গেল। পুরোনো সেই ভুল বোঝাবুঝি, পরিবারের ঘৃণা আর রক্তের দাগগুলো পেরিয়ে তারা আজ এমন এক ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়েছে, যাকে আলাদা করার সাধ্য কারো নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির উঠোনে একটা চেনা মেঠো কাশির শব্দ পাওয়া গেল।
দিয়া আর অরণ্য দুজনেই সোজা হয়ে বসল। নিচে গিয়ে তারা দেখতে পেল দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন দিয়ার বাবা কাজেম আলী। বৃদ্ধ মানুষটার চুল আরও পেকে গেছে, চোখে একরাশ অপরাধবোধ আর লজ্জা। সাজ্জাদ আর আজমল মিঞার দল গ্রামে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর কাজেম আলী নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন।
দিয়া বাবাকে দেখে আর স্থির থাকতে পারল না। "বাবা!" বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
কাজেম আলী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। "আমাকে মাফ করে দে মা... তোকে আমি চিনতে পারি নাই। আর এই জোয়ান ছেলেটা তোকে যে কতটা ভালোবাসে, তা বুঝতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে।"
অরণ্য শান্ত পদক্ষেপে কাজেম আলীর সামনে এসে দাঁড়াল। অরণ্যের চোখে আর সেই বিষাক্ত রাগ নেই। সে কাজেম আলীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "অতীত ভুলে যান। দিয়া আপনার মেয়ে ছিল, কিন্তু এখন সে আমার পুরো পৃথিবী। আর ওর এই হাসির জন্য আমি পুরো পৃথিবীর সাথে আবার লড়তে পারি।"
কাজেম আলী অরণ্যের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন। দিয়ার মন থেকে আজ জীবনের শেষ বোঝাটাও নেমে গেল।
বিকেলের দিকে কাজেম আলী বিদায় নিলে, অরণ্য দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে দোতলার শয়নকক্ষে এল। জানলা দিয়ে বিকেলের লাল আলো এসে পড়ছিল তাদের বিছানায়। অরণ্য দিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে পাশে শুয়ে পড়ল। সে দিয়ার শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে তার পেটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
দিয়া অরণ্যের মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে শান্তিতে চোখ বন্ধ করল।
"ভালোবাসি অরণ্য..."
"ভালোবাসি দিয়া... মরণের পরও ভালোবেসে যাব," অরণ্য দিয়ার ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল এক নিবিড়, তপ্ত ভালোবাসার আবেশে।
....