শয়তান সিনিয়রের দায়িত্ববোধ

ঢাকা শহরের চেনা যানজট আর কোলাহল পেরিয়ে যখন ক্যাম্পাসে পা রাখল সামিরা, তখন সকাল আটটা। নতুন জীবনের সূচনা, নতুন পথচলা। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে পরা একটা সুতির থ্রি-পিস, কাঁধে হালকা ঝুলন্ত ব্যাগ আর চোখে একবুক স্বপ্ন। তবে সামিরার চোখের সেই স্বপ্নে কোমলতার চেয়ে তেজটা ছিল একটু বেশি। সে একটুতেই রেগে যায়, আর আত্মসম্মানে আঘাত লাগলে তো কথাই নেই—ঝড় তুলে ফেলে মুহূর্তেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ পেরিয়ে প্রশাসনিক ভবনের দিকে এগোতেই সামিরার কানে এলো কিছু তরুণের অট্টহাসি। কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে একটা বেশ বড়সড় ছেলেদের দল গ্যাং বানিয়ে বসে আছে। তাদের ঠিক মাঝখানে বসে যে ছেলেটি সবচেয়ে উচ্চস্বরে হাসাহাসি করছিল, তার পরনে নীল শার্ট আর চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের দুরন্ত বাঁজখাঁই চঞ্চলতা। তার নাম প্রীতম। কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হলেও পুরো ক্যাম্পাসে প্রীতমের উপদ্রব আর দৌরাত্ম্য কারোর অজানা নয়। নতুন জুনিয়র দেখলেই একটু চিমটি কাটা, একটু মজা করা—এটাই যেন তার দৈনন্দিন কাজ।

সামিরা নিজের মতো হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ প্রীতম দলবল নিয়ে সামিরার হাঁটার পথের সামনে এসে দাঁড়াল।

"আহা! নতুন অতিথি মনে হচ্ছে? তা জুনিয়র, জ্যেষ্ঠদের একটু সালাম-কালাম দিয়ে সম্মান জানিয়ে যাওয়া উচিত না?"—প্রীতমের গলায় উপহাসের স্পষ্ট সুর।

সামিরা থমকে দাঁড়াল। চোখ দুটো একটু ছোট করে প্রীতমের দিকে তাকাল সে। নিজের আত্মসম্মানে এমন আচমকা আঘাত সামিরা একদম সহ্য করতে পারে না। সে শক্ত গলায় বলল, "রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ান। আমি কারও খামখেয়ালির উত্তর দিতে আসি নাই। ক্লাসে যাচ্ছি, যেতে দিন।"

প্রীতমের সাথে থাকা তার বন্ধু শফিক আর তানভীর হো-হো করে হেসে উঠল। শফিক বলল, "রেগে গেলে তো নতুন ফুফু দারুণ দেখা যায় রে প্রীতম! তোদের ডিপার্টমেন্টের নতুন রত্ন মনে হচ্ছে!"

প্রীতম পকেটে হাত গুঁজে সামিরার আরো এক ধাপ কাছে এগিয়ে এলো। হালকা একগাল হেসে বলল, "আরে রাগছো কেন? এত রাগ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না গো মিস। নামটা তো অন্তত বলে যাও, নাকি নাম জানতে হলেও আবেদনপত্র জমা দিতে হবে?"

"আমার নাম জানার আপনার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। আর আপনি যেভাবে পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন, এটা সম্পূর্ণ অভদ্রতা। দ্বিতীয়বার যদি আমার সামনে এভাবে এসে দাঁড়ান, তবে আমি কিন্তু সোজা প্রক্টরের রুমে যাব!"—সামিরা সোজা প্রীতমের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ছুড়ে মারল।

প্রীতম যেন এই উত্তরে দমে যাওয়ার পাত্রই নয়। সে আরো একধাপ এগিয়ে এসে নাটুকে ভঙ্গিতে হাত জোর করে বলল, "ওরে বাবা! প্রথম দিনেই প্রক্টর সাহেবের ভয়? আমরা তো ভয়ে একদম কাঁপছি! তা ম্যাডাম, রাগের চোটে গাল দুটো যে লাল হয়ে গেল, ওতে তো আগুন ধরে যাবে!"

চারপাশের সব বন্ধুরা একসাথে তালি দিয়ে হেসে উঠল। সামিরার মাথা গরম হয়ে গেল মুহূর্তেই। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা প্রীতমকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে গেল। কিন্তু পেছন থেকে প্রীতমের চিল চিৎকার আর হাসির শব্দ তখনও তার পিছু ছাড়ছিল না। প্রীতম চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে বলল, "আবার দেখা হবে, চটপটি মিস!"

সামিরার মেজাজ পুরো দিনের জন্য খারাপ হয়ে গেল। ক্লাসে গিয়ে নিজের বান্ধবী রিয়ার পাশে যখন সে বসল, তখনও তার হাত-পা রাগে কাঁপছিল।

রিয়া সামিরার অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে সামিরা? মুখটা অত লাল কেন রে?"

"আর বলিস না! দরজার সামনেই একটা অসভ্য, বেয়াদব ছেলের পাল্লায় পড়েছিলাম। নিজেকে কি ভাবেন উনি? প্রথম দিনেই একদম মেজাজটা বিগড়ে দিল!"—সামিরা গজ গজ করতে করতে বলল।

রিয়া একটু ভেবে বলল, "ছেলেটার গায়ে কি নীল শার্ট ছিল? প্রীতম ভাই নাকি?"

"হ্যাঁ! প্রীতম নাম বলছিল ওর বন্ধুরা। ও কে?"

"ওরে বাবা! ও তো আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই এক বছর সিনিয়র প্রীতম ভাই! পড়াশোনায় ভীষণ তুখোড়, কিন্তু পুরো ক্যাম্পাসের বড় শয়তান। জুনিয়রদের পেছনে লাগা ছাড়া ওর যেন কোনো কাজই নেই। তুই একটু সামলে চলিস সামিরা, ও কিন্তু কাউকে সহজে ছাড়ে না।"

"ছাড়ার মালিক উনি কে? আমিও দেখি ও কত বড় শয়তান!"—সামিরা শক্ত মুখে জবাব দিল।

কিন্তু সামিরা ভাবতেও পারেনি, প্রীতমের এই জ্বালাতন কেবল শুরু ছিল। প্রথম দিন থেকেই প্রীতম যেন সামিরাকে রাগানোর জন্য ওত পেতে থাকত। লাইব্রেরিতে বসে সামিরা যখন মনোযোগ দিয়ে বই পড়ত, প্রীতম পেছন থেকে এসে টেবিল ঠুকে শব্দ করে চলে যেত। সামিরা হঠাৎ চমকে উঠে তাকালে দেখত প্রীতম দূর থেকে চোখ টিপ মেরে হাসছে।

ক্যান্টিনে চা খেতে বসলে প্রীতম আর তার বন্ধুরা সামিরার পাশের টেবিলে গিয়ে বসত। প্রীতম খুব উচ্চস্বরে বলতে শুরু করত, "আজকের চা-টা বড্ড তেতো ভাই, ঠিক মানুষের মেজাজের মতো! মিষ্টি একটু দেওয়া যায় না?"

সামিরা চায়ের কাপ রেখে তড়িৎ গতিতে দাঁড়িয়ে পড়ত। প্রীতমের দিকে একরাশ ঘৃণা আর বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে সোজা হেঁটে বেরিয়ে যেত। আর পেছন থেকে প্রীতম গান ধরে গাইত, "ও তন্বী, একটু তো হাসো!"

এমনভাবে কাটতে লাগল দিনগুলো। সামিরার রাগের মাত্রা যত বাড়ত, প্রীতমের তাকে নিয়ে মজা করার আগ্রহ যেন শতগুণ বেড়ে যেত। প্রীতম যেন সামিরার এই চঞ্চল, রাগী রূপটা দেখতেই বেশ পছন্দ করত। সামিরাও প্রীতমকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে অন্য রাস্তায় হাঁটা শুরু করত। বন্ধুদের কাছে প্রীতম মানেই সামিরার জন্য এক আতঙ্কের আর চরম বিরক্তির নাম।

একদিন বিকেলে ডিপার্টমেন্টের নোটিশ বোর্ডে একটা বড় বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হলো। সামিরা আর রিয়া সেখানে গিয়ে দেখল, আগামী সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বান্দরবানের দূরবর্তী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এক বার্ষিক পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে। তিন দিন দুই রাতের এই সফরে ডিপার্টমেন্টের সব বছরের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নেবে।

রিয়া আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, "সামিরা! আমরা যাব তো? পাহাড়ে যাওয়ার সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না!"

সামিরা নোটিশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটু রোমাঞ্চ বোধ করল। সবুজ পাহাড়, ঝরনা আর দুর্গম প্রকৃতি তাকে সবসময়ই টানে। সে বলল, "হ্যাঁ, যাব। পাহাড় আমার খুব প্রিয়।"

ঠিক তখনই পেছন থেকে চেনা একটা বিশ্রী কণ্ঠ ভেসে এলো, "পাহাড়ে যাবে নাকি চটপটি মিস? সাবধান কিন্তু! পাহাড়ের জঙ্গলে কিন্তু বুনো ভালুক থাকে, তোমার রাগের সামনে তারা টিকতে পারবে তো?"

সামিরা পিছনে ঘুরে দেখল প্রীতম গা হেলিয়ে দেয়ালের সাথে দাঁড়িয়ে একগাল দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

সামিরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "ভালুক তো জঙ্গলে থাকে, কিন্তু ক্যাম্পাসের বুনো প্রাণীটা তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে! তার চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে?"

প্রীতম হাহা করে হেসে উঠল। সে সামিরার একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, "পাহাড়ে গিয়ে কিন্তু হারিয়ে যেও না জুনিয়র। তখন কিন্তু ছাড়ানোর জন্য এই প্রীতম ছাড়া আর কেউ থাকবে না!"

"আপনার সাহায্য চাওয়ার চেয়ে পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো!"—সামিরা রাগে গজগজ করতে করতে প্রীতমের পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

প্রীতম সামিরার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে তখনও সেই পরিচিত বাঁকা হাসি, তবে চোখের কোণে ছিল এক অজানা আকর্ষণের ছায়া। সে মনে মনে বলল, "পাহাড়ে খেলাটা আরও জমবে, চটপটি!"

পিকনিকের দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল, সামিরার মনের ভেতরে পাহাড়ে যাওয়ার আনন্দ যেমন বাড়ছিল, ঠিক তেমনি প্রীতমের সাথে একই বাস আর একই টিমে যাওয়ার চিন্তায় একটা অদ্ভুত অস্বস্তিও তৈরি হচ্ছিল।

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসটি বান্দরবানের দূরবর্তী ক্যাম্পের দিকে এগোচ্ছিল, তখন বিকালের লালচে আলো সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় সোনালি রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে। বাসের ভেতরে গান-বাজনা, হুল্লোড় আর আনন্দের জোয়ার। কিন্তু সামিরা চুপচাপ জানালার ধারে বসে ছিল। পাহাড়ি হাওয়ায় তার চুলগুলো উড়ছিল।

তার ঠিক তিন সিট পেছনে প্রীতম আর তার বন্ধুদের আড্ডা বসেছিল। প্রীতমের গলায় গিটার, আর মুখে সুর। বন্ধুদের সাথে সুর মিলিয়ে গান গাইলেও প্রীতমের চুরি করা দৃষ্টি বারবার গিয়ে পড়ছিল জানালার ধারে বসে থাকা ওই রাগী মেয়েটার ওপর। প্রীতম মনে মনে হাসে—মেয়েটা রাগলে যেমন অগ্নিশর্মা হয়, আবার এই শান্ত বিকেলে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা তার রূপটা ঠিক ততটাই মায়াবী।

সন্ধ্যার দিকে বাস গিয়ে পৌঁছাল পাহাড়ি উপত্যকার কাছে বানানো বিশেষ রির্সোট বা ক্যাম্পে। চারপাশটা যেন এক গভীর, রহস্যময় অরণ্যে ঘেরা। একটু দূরেই ঘন জঙ্গল, বিশাল সব গাছপালা আর ঝরনার শব্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গাইড সবাইকে কড়া নির্দেশ দিলেন, "কেউ সন্ধ্যার পর ক্যাম্প ছেড়ে একা কিংবা গাইড ছাড়া জঙ্গলের দিকে যাবে না। এই অঞ্চলটি বেশ দুর্গম ও গভীর।"

সবাই নিজের নিজের তাঁবু আর ঘরে ব্যাগপত্র রেখে কিছুটা সতেজ হয়ে নিল। রাত বাড়ার সাথে সাথে ক্যাম্পাসের সবাই মিলে একটা বিশাল ক্যাম্পফায়ার বা আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করল। গান, নাচ আর বার্বিকিউ পার্টি শুরু হলো।

সামিরা তার দুই বান্ধবী রিয়া আর নিশার সাথে আগুনের পাশে বসে গল্প করছিল। কিন্তু অতিরিক্ত কোলাহল আর চেঁচামেচি সামিরার খুব একটা পছন্দ নয়। প্রীতম যখন গিটার হাতে আগুনের মাঝখানে এসে সবাইকে নাচাতে শুরু করল, তখন সামিরা একটু একা থাকার জন্য বন্ধুদের বলল, " তোরা বস, আমি একটু ঠাণ্ডা বাতাসে হেঁটে আসি।"

রিয়া বলল, "সামিরা বেশি দূরে যাস না কিন্তু! গাইড স্যার কিন্তু নিষেধ করেছেন।"

"আরে না, কাছেই আছি,"—বলে সামিরা ক্যাম্পফয়ারের আলো পেছনে ফেলে একটু নির্জন এলাকার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

হাঁটতে হাঁটতে সামিরার মনে একটা অদ্ভুত কৌতূহল জাগল। রাতের জঙ্গলটা কেমন দেখতে হয়? জ্যোৎস্নার আলোয় ঘন পাহাড়ি গাছের পাতাগুলো কী দারুণ দেখাচ্ছে! কৌতূহলের বশে সামিরা একটু একটু করে ক্যাম্পের মূল সীমানা পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতরের মেঠো পথে পা রাখল। জোনাকি পোকার আলো আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তাকে যেন আরো গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

কিছু দূর যাওয়ার পর সামিরা খেয়াল করল তার বান্ধবীরাও হয়তো তাকে খুঁজতে পেছনে আসছে। সামিরা ভাবল ওদের সাথে একটু লুকোচুরি খেলবে। তাই সে ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে আরো একটু ভেতরে ঢুকে গেল।

কিন্তু দশ-পনেরো মিনিট যাওয়ার পরই সামিরার ভুল ভাঙল। সে পেছনে ফিরে দেখে চারপাশে শুধু অন্ধকার আর বিশালাকার গাছের সারি। ক্যাম্পের সেই আলোর রেখা বা আগুনের ধোঁয়া আর দেখা যাচ্ছে না। কোনো দিক থেকে কোনো মানুষের গলার শব্দও আসছে না। চারপাশের জঙ্গল হঠাৎ করেই ভীষণ নিশ্চুপ আর রহস্যময় হয়ে উঠল।

সামিরার বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল, "রিয়া? নিশা? তোরা কোথায়?"

কোনো উত্তর নেই। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর রাতের পাখির ডাক। সামিরা বুঝতে পারল সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। যে পথ দিয়ে সে এসেছিল, অন্ধকারের কারণে সব পথ এখন একই রকম লাগছে। চারপাশ থেকে রাতের অন্ধকার নামার সাথে সাথে জঙ্গলটা যেন বিষাক্ত আর থমথমে হয়ে উঠল।

সামিরা একটু ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরের অহংকার আর রগচটা স্বভাব সহজে ভাঙার নয়। সে মনে মনে নিজেকে সাহস জুগিয়ে ফিসফিস করে বলল, "না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সোজা হাঁটলেই আমি ক্যাম্পে পৌঁছে যাব। আমি কোনো ভিতু মেয়ে নই।"

কিন্তু যত সময় গড়াচ্ছিল, জঙ্গল ততটাই দুর্গম হচ্ছিল। পায়ের নিচে শুকনো পাতার শব্দে সামিরা বারবার চমকে উঠছিল। হঠাৎ করে সামিরার মনে হলো, তার আশেপাশের ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে কোনো একটা শব্দ আসছে।

মট করে একটা শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলো ঠিক তার পেছনে!

সামিরা চমকে উঠে দাঁড়াল। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল।

"কে... কে ওখানে?"—সামিরার গলায় এবার ভয়ের স্পষ্ট ছাপ।

আশেপাশের ঝোপঝাড়ের শব্দটা আরও বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে কোনো একটা ছায়ামূর্তি খুব দ্রুত তার দিকে এগোচ্ছে। সামিরার শক্ত মনটা এবার ভেঙে পড়ার উপক্রম। কৌতূহল যে তাকে এমন বিপদে ফেলবে সে ভাবতেও পারেনি। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে কয়েক পা পেছনে হটল।

ঠিক তখনই, অতি আচমকা একটা প্রকাণ্ড ছায়ামূর্তি ঝোপের ভেতর থেকে এক লাফে সামিরার একেবারে চোখের সামনে এসে দাঁড়াল এবং বিকট এক গর্জন দিয়ে উঠল, "হাআআআ!"

সামিরা এমন আচমকা বিভীষিকার জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। সে এক বিকট চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই ভয়ে, আতঙ্কে আর মানসিক ধাক্কায় তার মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল এবং সে জ্ঞান হারিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।

যে ছায়ামূর্তিটি লাফ দিয়েছিল, সে আর কেউ নয়—প্রীতম!

আসলে প্রীতম দূর থেকেই দেখেছিল সামিরা ক্যাম্প ছেড়ে একা একা জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। সামিরার কোনো বিপদ হতে পারে ভেবে এবং তাকে একটু ভয় দেখিয়ে মজা করার লোভে প্রীতমও লুকিয়ে লুকিয়ে তার পিছু নিয়েছিল। সে ভেবেছিল সামিরা ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলবে আর তখন সে বীরের মতো সামনে এসে তাকে ক্ষ্যাপাবে।

কিন্তু সামিরা যে এভাবে একেবারে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাবে, তা প্রীতম স্বপ্নেও ভাবেনি!

"সামিরা!"—প্রীতমের গলার মজা করার সুর এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা চেপে বসল তার কণ্ঠে।

প্রীতম দ্রুত হাঁটু গেড়ে সামিরার পাশে বসল। চটপটি আর তেজস্বী সামিরা এখন সম্পূর্ণ নিথর হয়ে শুকনো পাতার ওপর পড়ে আছে। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। প্রীতম সামিরার মুখে-চোখে হালকা চাপড় দিল, "সামিরা, শোনো! উঠো! আমি প্রীতম... আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম! প্লিজ চোখ খোলো!"

কিন্তু সামিরার কোনো সাড়াশব্দ নেই। প্রীতমের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো। সে সামিরার নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখল, শ্বাসপ্রশ্বাস ভীষণ ধীর ও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ভীতি আর আতঙ্কে মেয়েটার হৃদস্পন্দন যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

প্রীতম ভীষণ ঘাবড়ে গেল। এই দুর্গম জঙ্গলে কোনো ডাক্তার নেই, জল নেই। সামিরাকে এখনই বাঁচানো দরকার, তার ফুসফুসে বাতাস পৌঁছানো দরকার।

প্রীতমের মনে আর কোনো দ্বিধা রইল না। সে কোনো কিছু না ভেবে সামিরার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে গেল। সামিরার নরম দুই ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরে সে সজোরে নিঃশ্বাস সরবরাহ করতে শুরু করল—কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা (CPR)। একবার, দু-বার, তিনবার... প্রীতম নিজের সমস্ত আকুলতা দিয়ে সামিরাকে সতেজ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।

কিছুক্ষণ এই আপ্রাণ চেষ্টার পর সামিরার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। প্রীতম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সামিরার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে আনল। কিন্তু সামিরা পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পাওয়ার আগেই আবারও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

রাত আরও গভীর হচ্ছে। জঙ্গলে থাকাটা আর নিরাপদ নয়। প্রীতম আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে সামিরার অচৈতন্য, কোমর পর্যন্ত ঝুলন্ত চুল আর সুতির জামা পরা হালকা শরীরটাকে এক টানে নিজের দুই কোল তুলে নিল।

সামিরার মাথাটা প্রীতমের শক্ত চওড়া বুকের ওপর এসে পড়ল। প্রীতম পরম যত্নে, শক্ত বাহুতে সামিরাকে জড়িয়ে ধরে অন্ধকারের পথ চিনে চিনে নিজের সেই বিশেষ পাহাড়ি কটেজ বা ক্যাম্পের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

প্রীতমের বুকের ভেতরের ধুকপুকানি তখন সামিরার গালে স্পন্দিত হচ্ছিল। যে মেয়েটাকে সারাদিন রাগানো প্রীতমের নেশা ছিল, আজ সেই মেয়েটার নিথর দেহ বুকে নিয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রীতমের মনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম হচ্ছিল—যা কেবল মজার নয়, যা এক গভীর অপত্য টানের।

ক্যাম্পের মূল হট্টগোল আর হইচই থেকে কিছুটা দূরে পাহাড়ের ঢালে প্রীতমদের কাঠের কটেজটা। বন্ধুদের কেউ তখনও জঙ্গল থেকে ফেরেনি, সবাই আগুনে বার্বিকিউ করতে ব্যস্ত। প্রীতম নিঃশব্দে কটেজের কাঠের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। ঘরটাতে একটা পুরনো হেরিকেন আর হালকা টিমটিমে বাতির মেটে আলো জ্বলছিল।

প্রীতম পরম সতর্কতায় সামিরাকে নিয়ে বিছানায় শায়িত করল। নরম তোশকের ওপর মাথাটা নামিয়ে দেওয়ার পরও সামিরার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল প্রীতমের শার্টের কলার। হয়তো অচেনা ভয়ের ঘোরটা তখনও সামিরার অবচেতন মনে তাড়া করে ফিরছিল।

প্রীতম আলতো করে সামিরার হাতটা নিজের শার্ট থেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামিরার মুখের দিকে। যে মেয়েটির চোখে সারাক্ষণ এক রাশ তেজ আর চঞ্চল রাগের স্ফুলিঙ্গ দেখা যেত, সেই সামিরা এখন কতটা অসহায় আর নরম হয়ে শুয়ে আছে। ভিজে আসা কিছু কোঁকড়ানো চুল সামিরার কপালে আর গালে লেপটে ছিল। প্রীতম নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে খুব যত্ন করে সেই চুলগুলো সরিয়ে কান পিছে গুঁজে দিল।

টেবিল থেকে একটি ভেজা তোয়ালে নিয়ে প্রীতম সামিরার কপাল আর মুখ হালকা করে মুছে দিল। ঘরের কাঠের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। পাহাড়ি এলাকার রাতের বৃষ্টি মানেই কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। খোলা জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকতেই সামিরা কাঁপতে শুরু করল।

প্রীতম চটপট গিয়ে কাঠের জানালাটা বন্ধ করে দিল। এরপর আলমারি থেকে একটা মোটা কম্বল এনে সামিরার গায়ের ওপর ভালোভাবে জড়িয়ে দিল। কিন্তু ঠাণ্ডার তীব্রতা আর আতঙ্কের ধাক্কায় সামিরার শরীরের কাঁপুনি থামছিল না। তার ঠোঁট দুটো নীলচে হয়ে আসছিল।

সামিরা অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, "ভয়... খুব ঠাণ্ডা... মা..."

প্রীতম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সামিরার এই কষ্ট সে সহ্য করতে পারছিল না। কোনো রকম দ্বিধা বা অন্য কোনো মানসিক হিসেব-নিকেশ না করে, প্রীতম জুতো খুলে বিছানায় উঠে এলো। কম্বলের ভেতরে ঢুকে সে সামিরাকে নিজের বুকের খুব কাছে টেনে নিল। প্রীতমের সুগঠিত, উষ্ণ শরীর সামিরার বরফের মতো ঠাণ্ডা শরীরকে জড়িয়ে ধরতেই এক অদ্ভুত উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল দুজনের মাঝে।

প্রীতমের বুকের ওম পেতে পেয়ে সামিরাও অবচেতন মনে আরও কিছুটা আঁকড়ে ধরল প্রীতমকে। প্রীতমের ডান হাত সামিরার পিঠের ওপর শক্ত জড়িয়ে রইল, আর বাঁ হাত দিয়ে সে সামিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির একঘেয়ে সুর। আর ঘরের ভেতর নিঝুম নিস্তব্ধতা। হালকা আলোয় প্রীতম অনুধাবন করল, সামিরার এই স্পর্শ তার হৃদয়ে ঝড়ের পূর্বাভাস এনে দিয়েছে। সামিরাকে সারাদিন ক্ষ্যাপানো, তার ওপর রাগ জমানো—এসবের নেপথ্যে যে আসলে ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল, তা প্রীতম আজ এই নির্জন রাতে তীব্রভাবে উপলব্ধি করল।

প্রীতম মুখ নামিয়ে সামিরার কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াাল। একটা দীর্ঘ, ভালোবাসাময় চুমু দিল তার কপালে।

সামিরার গায়ের সুবাস প্রীতমের মস্তিষ্কে এক মাতাল আবহের সৃষ্টি করল। সে আস্তে আস্তে সামিরার গালে, চোখের পাতায় নিজের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া দিতে লাগল। প্রীতমের নিবিড় স্পর্শে সামিরার বন্ধ চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল। সে পুরোপুরি সজ্ঞান না হলেও, প্রীতমের এই উষ্ণতা আর সুরক্ষাবেষ্টনী তাকে এক মায়াবী অনুভূতির সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

সামিরা আস্তে আস্তে চোখ মেলল। আবছা আলোয় তার চোখের সামনে প্রীতমের মুখ। সেই দুষ্টু প্রীতম, যে সারাদিন তাকে জ্বালাতন করে। কিন্তু আজকের প্রীতমের চোখে কোনো দুষ্টুমি নেই; সেখানে আছে কেবল এক সমুদ্র আকুলতা, যত্ন আর গভীর প্রেম।

সামিরা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু প্রীতম তার ডান হাতের তর্জনী সামিরার ঠোঁটের ওপর রেখে মৃদুস্বরে বলল, "একদম কথা নয়। তুমি নিরাপদ।"

সামিরা প্রীতমের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনের সমস্ত রাগ, বিরক্তি আর অভিমান যেন বৃষ্টির জলের মতো ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। সামিরা নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে প্রীতমের গলা জড়িয়ে ধরল। প্রীতমও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সামিরার মুখের আরও কাছে গিয়ে তার ঠোঁটে ঠোঁট মেলালো।

এবার তা কোনো কৃত্রিম শ্বাস বা সিপিআর ছিল না—তা ছিল গভীর, আবেগঘন এক প্রথম ভালোবাসা। বাহ্যিক পৃথিবীর সমস্ত ভয়, উদ্বেগ আর ঝড়ের হিসেব ভুলে দুজন তরুণ-তরুণী হারিয়ে গেল এক অনন্য ভালোবাসার মোহময় গভীরে।

বান্দরবানের সেই পাহাড়ি রাতের পর দেখতে দেখতে দুটো মাস পেরিয়ে গেছে। চেনা ঢাকা শহর, চেনা ক্যাম্পাস, আর ক্লাসরুমের চিরচেনা জীবন আবার নিজের ছন্দে ফিরে এসেছে। তবে বাহ্যিক সবকিছু আগের মতো থাকলেও, সামিরা আর প্রীতমের মাঝের পৃথিবীটা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

ক্যাম্পাসে এখন আর প্রীতম আগের মতো উচ্চস্বরে সামিরাকে ক্ষ্যাপায় না। বন্ধুদের মাঝখান থেকে সামিরাকে ডেকে নিয়ে আর চটপটি মিস বলে চেঁচামেচি করে না। বরং এখন প্রীতমের চোখের দৃষ্টিতে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর প্রচ্ছন্ন অধিকারবোধ। সামিরা পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে প্রীতম হালকা মুচকি হাসে, যা কেবল সামিরাই বুঝতে পারে। আর সামিরা? সেও এখন প্রীতমকে দেখলে আর আগের মতো রেগে আগুন হয়ে যায় না। প্রীতমের চোখের দিকে তাকালে তার বুকের ভেতর এক অজানা দোলা লাগে, গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। বান্দরবানের সেই ঝুম বৃষ্টির রাতের রোমান্স আর প্রীতমের স্পর্শ আজও তার প্রতিটা অনুভূতিতে সজীব।

তবে এই মধুর অনুভূতির পেছনে ইদানীং এক ঘন কালো মেঘ জমা হতে শুরু করেছে। গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে সামিরা নিজের শরীরের মধ্যে এক চরম পরিবর্তন অনুভব করছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তার ভীষণ বমি বমি ভাব হয়। সারা শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসে, কোনো কাজে মন বসে না। ক্লাসে বসে থাকার সময় মাথা ঘুরে ওঠে, খাবারের সুবাস পেলেই কেমন যেন গুলিয়ে আসে।

সামিরা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো সাধারণ আবহাওয়া পরিবর্তন বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। কিন্তু দিন দিন লক্ষণগুলো আরও স্পষ্ট হতে লাগল। তার মাসিকও নির্দিষ্ট সময়ে হয়নি। মনে এক অচিন্তনীয় সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল।

আজ সকালে নিজের বাথরুমের দরজা বন্ধ করে যখন সামিরা প্রেগন্যান্সি টেস্ট স্ট্রিপের দিকে তাকাল, তখন তার পায়ের নিচ থেকে যেন পৃথিবীটা সরে গেল। স্ট্রিপে পরিষ্কার দুটো লাল দাগ ভেসে উঠেছে!

সামিরা ধপাস করে বাথরুমের মেঝেই বসে পড়ল। তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল। হাত-পা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে।

"আমি... আমি মা হতে চলেছি?"—নিজের মনেই বিশ্বাস করতে পারছিল না সামিরা।

আমাদের সমাজ, আমাদের পরিবেশ, আর এখনও ভার্সিটির পড়াশোনা শেষ না হওয়া—সবকিছু মিলিয়ে সামিরার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে প্রীতমকে বড্ড ভালোবাসে, প্রীতমের প্রতি তার মনে কোনো দ্বিধা নেই, কিন্তু এখন সে মারাত্মক ভয় পেয়ে গেছে। প্রীতম বিষয়টাকে কীভাবে নেবে? যদি প্রীতম তাকে ভুল বোঝে? যদি ভাবে সে ইচ্ছা করে প্রীতমকে ফাঁসাচ্ছে? কিংবা যদি প্রীতমের পরিবার এই বয়সে এমন একটা ঘটনা মেনে না নেয়?

ভয়, লজ্জা আর এক অজানা শঙ্কা সামিরাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। সিদ্ধান্ত নিল, সে এখন কাউকেই কিছু জানাবে না—এমনকি প্রীতমকেও নয়।

ক্যাম্পাসে গিয়েও সামিরা প্রীতমকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। প্রীতম কয়েকবার এসে কথা বলার চেষ্টা করেছে, "কী হয়েছে সামিরা? তোমার শরীর খারাপ? মুখটা এত ফ্যাকাসে কেন?"

সামিরা জোর করে নিজের কান্না চেপে রেখে বলত, "না, কিছু হয়নি। ভার্সিটির পড়ার একটু চাপ, তাই। আমি বাসায় যাচ্ছি।"

প্রীতম বুঝে পাচ্ছিল না সামিরার কী হয়েছে। মেয়েটা হঠাৎ এত চুপচাপ আর থমথমে হয়ে গেল কেন? প্রীতম যতবার কাছে আসার চেষ্টা করত, সামিরা ততবারই এক অজানা ভয়ে গুটিয়ে যেত।

দিন দিন সামিরার মন মানসিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে যেতে লাগল। একা ঘরে বসে সে কেবল কান্নাকাটি করত। পেটের ভেতর বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটার কথা ভেবে একদিকে যেমন এক অদ্ভুত মাতৃত্বের টান অনুভব করত, অন্যদিকে সমাজের ভয়ে তার জীবনটা এক ছাইচাপা আগুনে রূপ নিয়েছিল।

একদিন বিকেলে প্রীতম ফোন করল, "সামিরা, লেকের ধারে এসো। তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। তুমি আমায় এড়িয়ে চলছ কেন বলতো?"

ফোনটা রেখে সামিরা আয়নায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখের নিচে বিষাদের কালি, ফ্যাকাসে মুখ। তার মনে হলো, এভাবে লুকিয়ে থাকা আর সম্ভব নয়। কিন্তু প্রীতমকে মুখ ফুটে এই কথাগুলো বলার সাহসও তার নেই। এক চরম হতাশা আর মানসিক অবসাদ সামিরাকে গ্রাস করে ফেলল। সে ভাবল, তার এই অস্তিত্বই বুঝি সবার জন্য একটা বোঝা হতে চলেছে!

বিকেলের রোদ তখন পড়ন্ত। ভার্সিটির লেকের চারপাশটা সাধারণত এই সময়ে বেশ নীরব থাকে। শান্ত জলের বুকে গাছের ছায়া দুলছে। কিন্তু আজকের বিকেলটা সামিরার কাছে এক চরম অন্ধকার ট্র্যাজেডির মতো মনে হচ্ছিল। সে লেকের এক নির্জন পাড়ে গাছের গুঁড়ির ওপর বসে ছিল। তার চোখে জলের ধারা থামছেই না।

হাতে শক্ত করে ধরা একটি কাঁচের শিশি—পোকা মারার কড়া বিষ।

সামিরার মানসিক ভারসাম্য যেন ভেঙে পড়েছে। সমাজের ভয়, পরিবারের অপমানের চিন্তা আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের ভয় তাকে এক অন্ধ গলিতে ঠেলে দিয়েছে। সে ভেবে নিয়েছে, এই পৃথিবী থেকে নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়াই তার সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। শিশির মুখটা খুলে সামিরা কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা ঠোঁটের কাছে তুলে নেওয়ার উপক্রম করল।

ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে ছুটতে ছুটতে সেখানে এসে পৌঁছাল প্রীতম। সারাদিন ধরে সামিরাকে কোথাও না পেয়ে সে পুরো ক্যাম্পাস খুঁজে একাকার করেছে। শেষমেশ লেকের পাড়ে সামিরাকে একাকী বসে থাকতে দেখে প্রীতম স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু সামিরার হাতের বিষের বোতল আর তার আত্মহত্যা করার উদ্যোগ চোখে পড়তেই প্রীতমের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল!

"সামিরা!"—এক বিকট ও প্রকাণ্ড গর্জন দিয়ে প্রীতম এক লহমায় সামিরার কাছে পৌঁছে গেল।

সামিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রীতম সজোরে থাবা মেরে সামিরার হাত থেকে বিষের বোতলটি কেড়ে নিয়ে দূরে লেকের জলে ছুড়ে ফেলল। কাঁচের বোতলটি জলে ডুবে গেল।

প্রীতমের হাত-পা তখন রাগে, আতঙ্কে আর ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছিল। স্বকীয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রীতম সোজা সামিরার গালে এক কড়া চড় বসিয়ে দিল—ঠাস!

"তোর সাহস হয় কীভাবে এমন একটা কাজ করার?!"—প্রীতম চিৎকারের তোড়ে গর্জে উঠল, "কী ভাবছিলি তুই? নিজেকে শেষ করে দিবি আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখব? সমস্যা কী তোর? বল আমায়! কোন কষ্টের জন্য তুই এত বড় পাগলামি করতে যাচ্ছিলি?"

প্রীতমের চড় খেয়ে সামিরা মাটির ওপর পড়ে গেল। গালটা লাল হয়ে উঠেছে, কিন্তু মনের ভেতরের জমে থাকা কষ্টটা সেই চড়ের ব্যথার চেয়েও শতগুণ বেশি ছিল। সামিরা দুহাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দে যেন পুরো লেকের পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল।

প্রীতম হাঁটু গেড়ে সামিরার সামনে বসল। তার নিজের চোখ দুটোও জলে ছলছল করছিল। চড়টা মারার পর প্রীতমের নিজের বুকটাই যেন ফেটে যাচ্ছিল। সে সামিরার দুটো কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, "বল সামিরা, কথা বল! আমার চোখ দুটো দেখে বল, কী অপরাধ করেছিলাম আমি যে তুই আমাকে না জানিয়ে একাই এভাবে চলে যেতে চাইছিলি?"

সামিরা কাঁদতে কাঁদতেই প্রীতমের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। হেঁচকি তুলতে তুলতে সে বলল, "আমি আর নিতে পারছি না প্রীতম... আমি ভয় পাচ্ছি! আমি অনেক ভয় পাচ্ছি!"

"কিসের ভয়? কিসের এত কষ্ট? আমাকে বলবি না?"—প্রীতমের গলায় এবার আকুল মিনতি।

সামিরা চোখ তুলে প্রীতমের দিকে তাকাল। তার কান্নাভেজা গলার আওয়াজ কাঁপছিল, "আমি... আমি মা হতে চলেছি, প্রীতম! আমাদের বান্দরবানের সেই রাতের স্মৃতি... আমার ভেতরে তোমার রক্ত বেড়ে উঠছে। আমি গর্ভবতী!"

প্রীতম যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল। সামিরার মুখের এই কথাটা শোনার জন্য সে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। চারপাশের বাতাস যেন থমকে গেল। প্রীতমের হাত দুটো সামিরার কাঁধ থেকে খসে পড়ল। সে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে সামিরার দিকে তাকিয়ে রইল।

সামিরা আরও জোরে কেঁদে উঠে বলল, "তুমি আমায় ভুল বুঝবে ভেবে আমি মুখ ফুটতে পারিনি। আমাদের পড়াশোনা শেষ হয়নি, সমাজ এটা মানবে না, আমাদের পরিবার মানবে না... আমি নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম কারণ আমি জানতাম না আমি কী করব!"

সামিরার কথা শেষ হতেই প্রীতমের চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু তার চেহারার থমথমে ভাবটা নিমেষেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক অসীম ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের দৃঢ়তা।

প্রীতম আর এক মুহূর্তও ভাবল না। সে সজোরে সামিরাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। এত শক্ত করে সামিরাকে বুকে চেপে ধরল যে সামিরার বুকের হাঁসফাঁস অবস্থা।

প্রীতম সামিরার মাথায়, গালে আর কপালে একের পর এক চুমু খেতে খেতে কেঁদে ফেলে বলল, "তুই একটা আস্ত পাগল! একদম বোকা একটা মেয়ে! এত বড় খবরটা বুকে চেপে তুই নিজেকে শেষ করতে যাচ্ছিলি?"

সামিরা প্রীতমের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল।

প্রীতম সামিরার মুখটা নিজের দুহাতে তুলে ধরে খুব শক্ত ও গম্ভীর গলায় বলল, "শোন সামিরা, এই প্রীতম কোনো দায়িত্ব ছেড়ে পালানোর লোক নয়। আমার ভেতরে যে তোর আর আমার ভালোবাসার অংশটা বেড়ে উঠছে, সে আমাদের আলো। কোনো সমাজ, কোনো পরিবার, কোনো বাধার সাধ্য নেই তোকে আমার কাছ থেকে আলাদা করার। তুই আমার, শুধু আমার! আর কোথাও যাবি না তুই, আমায় ছেড়ে তো কখনোই না!"

প্রীতমের এই শক্ত আর সাহসী আশ্বাসে সামিরার মনের সব ভয় এক লহমায় উবে গেল। সে অনুধাবন করল, এই মানুষটার বুকের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এই পুরো পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।

লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রীতমের দৃঢ় চোখের আলো দেখে সামিরার বুকের ভেতরে চেপে থাকা সমস্ত ভয় আর দুশ্চিন্তা যেন এক নিমেষে দূর হয়ে গেল। সে প্রীতমের বুকের গভীর উষ্ণতায় মুখ গুঁজে রইল। প্রীতম তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, "আর এক ফোঁটাও জল নয় সামিরা। যা হয়েছে, সেটা কোনো অন্যায় বা পাপ নয়। ওটা আমাদের ভালোবাসা। এবার বাকি সবটা সামলানোর দায়িত্ব আমার।"

প্রীতম সামিরার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে সোজা পথ চলতে শুরু করল। কিন্তু বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথটা এত সহজ ছিল না। তাদের পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি, আর দুজনই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনের কঠিন ময়দানে নামার সময় এখনই এসে গেছে।

পরদিন প্রীতম সামিরাকে নিয়ে এক নির্জন ক্যাফেতে গিয়ে বসল। প্রীতমের চোখে-মুখে এখন আর সেই পুরোনো চঞ্চলতার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। সেখানে ফুট উঠেছে এক দায়িত্বশীল, পরিণত পুরুষের প্রতিচ্ছবি।

প্রীতম শান্ত গলায় বলল, "সামিরা, আমাদের প্রথমে নিজেদের সামলাতে হবে। আমি আমার বন্ধুদের কাছে বিষয়টার জটিলতা না বললেও, শফিক আর তানভীরকে বলে রেখেছি। ওরা আমাদের পাশে থাকবে। তবে আমাদের পরিবারকে সব জানাতে হবে। আমি আজই আমার বাবার সাথে কথা বলব।"

সামিরা একটু চমকে উঠে বলল, "কিন্তু প্রীতম... উনারা যদি মেনে না নেন? যদি আমাদের ওপর রেগে যান?"

প্রীতম সামিরার কাঁপা হাত দুটো নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে বলল, "যদি উনারা প্রথমে রাগও করেন, আমি উনাদের বোঝাব। আর যদি কেউ নাও বোঝে, তবুও আমি তোকে ছেড়ে যাব না। আমার টিউশন আর পার্ট-টাইম প্রজেক্টের কাজ থেকে যা আয় হয়, তাতে ছোট একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আমরা অন্তত পথচলা শুরু করতে পারব। কিন্তু আমি তোকে আর ওই অনাগত সন্তানকে কোনোদিন অসম্মানিত হতে দেব না।"

প্রীতমের এই স্পষ্ট আর সাহসী কথাগুলো সামিরার মনে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস এনে দিল।

বিকেলে প্রীতম সোজা চলে গেল নিজের বাড়িতে। বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোনো লুকোচুরি না করে খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে সব কথা খুলে বলল। প্রীতমের বাবা প্রথমে প্রচণ্ড রেগে গেলেন, পরিবারের সম্মান আর প্রীতমের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্চবাচ্য করলেন। কিন্তু প্রীতমের চোখের অনন্য অনমনীয়তা আর সন্তানের প্রতি তার দায়িত্ববোধ দেখে একপর্যায়ে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। প্রীতম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, সামিরাকে সে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে নিজের ঘরে আনবেই, তাতে যদি তাকে এক কাপড়ে ঘর ছাড়তেও হয়, সে রাজী।

অন্যদিকে সামিরাও তার মাকে ধীরে ধীরে নিজের পরিস্থিতির কথা জানাল। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মা কেঁদে উঠলেও, প্রীতমের এগিয়ে আসা এবং দায়বদ্ধতার কথা শুনে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।

সামিরা আর প্রীতম বুঝতে পারছিল, ক্যাম্পাসে গুঞ্জন ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু এবার তারা দুজনেই যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। ক্লাসে প্রীতম যখনই সামিরার পাশে গিয়ে দাঁড়াত, তার চোখে ফুটে উঠত এক প্রতিরক্ষার প্রাচীর—যে প্রাচীর ভেদ করে সামিরাকে আর কোনো ভয় ছুঁতে পারবে না।

ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে বিকেলে প্রীতম সামিরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "মনে আছে চটপটি মিস? প্রথম দিন কীভাবে ধাক্কা মেরে আমায় সরিয়ে দিয়েছিলে?"

সামিরা হালকা হেসে প্রীতমের শার্টের হাতা চেপে ধরে বলল, "তখন জানতাম না যে এই বেয়াদব ছেলেটাই একদিন আমার পুরো পৃথিবীর রক্ষক হয়ে দাঁড়াবে।"

প্রীতম সামিরার দিকে ভালোবাসাময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "আগামীকাল আমাদের নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে সামিরা। একদম তৈরি থেকো।"

পরদিন সকালের সূর্যটা যেন এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে এলো। চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত আলোড়ন। প্রীতম তার দেওয়া কথা থেকে একচুলও সরে আসেনি। দুই পরিবারের প্রাথমিক ইতস্তত ভাব আর সাময়িক ক্ষোভকে অতিক্রম করে সে সবাইকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করল।

ক্যাম্পাসের বন্ধু শফিক, তানভীর আর রিয়া—সবাই মিলে কাজী অফিসে পৌঁছাল। সামিরার পরনে ছিল হালকা লাল রঙের এক সাধারণ শাড়ি, আর প্রীতমের পরনে সাদা সুতির পাঞ্জাবি। চোখে-মুখে কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জা না থাকলেও, তাদের দুজনের চোখে জ্বলজ্বল করছিল এক অকৃত্রিম আত্মবিশ্বাস আর ভালোবাসার দ্যুতি।

কাজী সাহেবের সামনে বসে যখন প্রীতম আর সামিরা পরপর তিনবার "কবুল" বলল, তখন পুরো ঘরে এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। মিষ্টির কৌটা খুলে বন্ধুরা আনন্দে হইচই শুরু করে দিল।

স্বাক্ষর পর্ব শেষ হতেই প্রীতম সামিরার দিকে তাকাল। সামিরার চোখ দুটো খুশিতে ছলছল করছিল। এতদিন ধরে বুক চেপে রাখা সেই অদৃশ্য ভয়ের মেঘটা এখন সম্পূর্ণ কেটে গেছে। প্রীতম পকেট থেকে লাল সিঁদুর বা অন্য কোনো ধর্মীয় রীতির বদলে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে একটা ছোট সোনার আংটি বের করল, যা সে নিজের জমানো টাকায় কিনেছিল। সে খুব যত্নে সামিরার অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে দিল।

প্রীতম আলতো করে সামিরার কানকাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "অভিনন্দন, নতুন মিসেস প্রীতম! আজ থেকে তুমি আইনত আর হৃদয় থেকে—সবদিক দিয়ে কেবলই আমার।"

সামিরা প্রীতমের পাঞ্জাবির হাতা শক্ত করে ধরে মৃদু হেসে বলল, "আর তুমিও আমার এই জীবনের চিরকালের আশ্রয়।"

বিকেলে দুই পরিবারের বড়রা কাজী অফিসে এসে পৌঁছালেন। প্রীতমের বাবা এগিয়ে এসে সামিরার মাথায় হাত রেখে বললেন, "প্রীতমের জেদ আর দায়িত্ববোধ আজ আমাকে হার মানিয়েছে মা। তোদের এই সম্পর্কের পরিণতি যেন আজীবন অটুট থাকে।"

সামিরার মা প্রীতমকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেললেন। যে প্রীতমকে তিনি একদিন না চিনে ভয় পেয়েছিলেন, আজ সেই ছেলেটিই তার মেয়ের জীবনকে চরম অপমানের হাত থেকে রক্ষা করে নিজের ভালোবাসার দুর্গে স্থান দিয়েছে।

কাজী অফিসের পাঠ চুকিয়ে প্রীতম সামিরাকে নিয়ে সোজা চলে এলো শহরের এক শান্ত, পরিচ্ছন্ন আবাসিক এলাকায় নেওয়া ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে। প্রীতম নিজের টিউশন আর পার্ট-টাইম ফ্রিল্যান্সিং প্রজেক্টের টাকা দিয়ে ঘরটা ভাড়া নিয়েছে। খুব বেশি দামি আসবাবপত্র নেই, কিন্তু দুটো মানুষের ভালোবাসায় ঘরটা ফুলেল হয়ে উঠেছে।

দরজা খুলে প্রীতম সামিরাকে নিয়ে ঘরে ঢুকল। ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই বিকেলের সোনালি রোদ এসে পড়ল বিছানায়। প্রীতম সামিরার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। সামিরার কোমর পেঁচিয়ে তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে প্রীতম পরম ভালোবাসায় সামিরার কপালে এক দীর্ঘ স্পর্শ এঁকে দিল।

সামিরা প্রীতমের বুকের ওপর মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল, "প্রীতম, যদি সেদিন তুমি লেকের পাড়ে না আসতে? যদি আমায় ভালো না বাসতে?"

প্রীতম সামিরার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল। প্রীতমের চোখে এখন শুধুই গভীর ভালোবাসা। সে বলল, "তোকে ভালোবাসাই তো আমার জীবনের সেরা সত্যি সামিরা। তোকে বাঁচানো আর তোর সাথে এই জীবন সাজানো—এটাই আমার নিয়তি ছিল।"

সামিরা তার হাতটা নিজের পেটের ওপর রাখল। প্রীতমও আলতো করে নিজের হাতটা সামিরার হাতের ওপর এনে রাখল। ছোট অনাগত প্রাণটি যেন তাদের দুজনের এই উষ্ণ স্পর্শের অনুভূতি পাচ্ছিল। রাত নামার সাথে সাথে সেই ছোট্ট ঘরে ভেসে এলো এক পরম শান্তির সুবাস—যা ছিল দুটি অন্তরের মিলন আর একটি নতুন জীবনের পথচলার সুসংবাদ।

কাজী অফিসে বিয়ের পর দেখতে দেখতে কয়েকটা মাস কেটে গেছে। ঝড়ের মেঘগুলো যেমন কেটে যায়, তেমনি প্রীতম আর সামিরার জীবনে নেমে এসেছে এক পরম প্রশান্তি। ছোট্ট মিষ্টি ফ্ল্যাটটা এখন ভালোবাসার সুবাসে ভরপুর। প্রীতম ভার্সিটি সামলানোর পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ আর প্রজেক্টের পেছনে আপ্রাণ খাটুনি খাটছে, যাতে তার নতুন সংসারের কোনো অভাব না হয়। আর সামিরাও নিজের শরীর ও পড়াশোনা দুই-ই খুব যত্ন করে সামলে চলেছে।

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত শুভ দিনটি এলো। হাসপাতালের করিডোরে তখন ধীরপায়ে পায়চারি করছিল প্রীতম। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, হাত দুটি কাঁপছিল ভয়ে আর উত্তেজনায়। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল দুই পরিবারের স্বজন ও কাছের বন্ধুরা।

কিছুক্ষণ পর কেবিন থেকে নার্স এক ফুটফুটে কনকনে মিষ্টি শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে বাইরে এলেন।

প্রীতম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পরম মমতায় নিজের পুচকে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। নরম তুলোর মতো ছোট্ট সেই প্রাণের দিকে তাকাতেই প্রীতমের দুচোখ বেয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। এই সেই ছোট্ট প্রাণ, যার অস্তিত্ব একদিন সামিরাকে ভয়ের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল, আর আজ সেই প্রাণটি তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় আলো হয়ে প্রাকৃতিতে রূপ নিয়েছে।

প্রীতম কেবিনে ঢুকে দেখল সামিরা ক্লান্ত হলেও তার মুখে ফুটে আছে এক স্বর্গীয় হাসি। প্রীতম ধীরপায়ে সামিরার পাশে গিয়ে বসল। মেয়েকে সামিরার কোলে দিয়ে সে সামিরার কপালে পরম ভালোবাসায় এক দীর্ঘ স্পর্শ এঁকে দিল।

"ধন্যবাদ সামিরা... আমাকে এভাবে পূর্ণ করার জন্য,"—প্রীতমের গলায় এক পরম তৃপ্তির সুর।

সামিরা প্রীতমের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "ধন্যবাদ তো তোমায় প্রীতম। সেদিন যদি তুমি আমাকে আগলে না রাখতে, তবে আজকের এই শুভ দিনটা আমি কোনোদিন দেখতে পেতাম না।"

কয়েক বছর পর, ক্যাম্পাসের সেই চেনা কেন্দ্রীয় মাঠের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আবার দেখা গেল তাদের। তবে এবার দৃশ্যটা অন্যরকম। প্রীতম ও সামিরা দুজনই আজ সমাবর্তনের বিশেষ গাউন ও টুপি পরে দাঁড়িয়ে আছে—সফলভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে। আর তাদের মাঝখানে হাত ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে তাদের ছোট্ট মেয়ে 'প্রীতি'।

প্রীতি তার মিষ্টি গলায় বলল, "বাবা, মা শোনো না! ওই যে চটপটির দোকান, আমাকে চটপটি কিনে দেবে না?"

প্রীতম আর সামিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল। প্রীতম সামিরার কাঁধে হাত রেখে মিষ্টি করে বলল, "দেখেছো সামিরা? তোমার মেয়েও ঠিক তোমার মতোই চটপটি ভালোবাসে!"

সামিরা চোখ ছোট করে ভান করে রাগার নাটক করে বলল, "হ্যাঁ, আর সে তার বাবার মতোই দুরন্ত আর বেয়াদব হয়েছে!"

সবাই হেসে উঠল একসাথে। বিকেলের লালচে রোদ এসে পড়ল তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখে। সেই চিরচেনা জ্বালাতন, ভয় আর ঝড়ের নদী পেরিয়ে আজ তারা এক সুন্দর, সুখী ও পূর্ণাঙ্গ পরিবার।

....
👁 24