বিশাল তিনতলা বাড়িটার চারপাশ ঘিরে থাকা আম-কাঁঠালের বাগানটায় যখন বিকেলের নরম রোদ এসে পড়ত, তখন এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি হতো। এই বাড়ির কর্তা শারাফাত চৌধুরী ঢাকার নামকরা ব্যবসায়ী। কিন্তু তার বিশাল গাড়ি, হাঁকডাক আর ব্যবসার ব্যস্ততার মাঝে বাড়িটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে থাকত।
সেই শান্ত নিঝুম বাড়িতে রূপা এসেছিল সাত বছর বয়সে। একটা সড়ক দুর্ঘটনায় তার মা-বাবা দুজনকেই কেড়ে নিয়েছিল নিমিষে। দূর সম্পর্কের কোনো এক আত্মীয়ের মারফতে খবর পেয়ে শারাফাত চৌধুরী নিজেই গিয়ে ছোট মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিলেন নিজের বাড়িতে। পৈতৃক ভিটেয় রূপার কোনো আপনজন ছিল না, অনাথ মেয়েটির থাকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গাও ছিল না।
শারাফাত চৌধুরীর একমাত্র ছেলে রামিম। রামিমের বয়স তখন আট। নতুন একটি মেয়েকে বাড়িতে এনে বাবা যখন বললেন, "আজ থেকে রূপা এই বাড়িতেই থাকবে রামিম, ও তোর ছোট বোনের মতো," তখন রামিম ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে ছিল রূপার দিকে। রূপার পরনে ছিল একটা মলিন সুতির জামা, চোখ দুটো কান্নায় ফুলানো আর চুলগুলো ছিল উস্কোখুস্কো।
প্রথম প্রথম রূপা কারও সাথে কথা বলত না। ঘরের এক কোণে কিংবা বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। রামিম এসে তার সামনে দাঁড়াত, নিজের খেলনা গাড়ি বা বল এগিয়ে দিয়ে বলত, "এই, তুই কি সারা জীবন এভাবে দাঁড়িয়েই থাকবি? খেলবি না আমার সাথে?"
রূপা ধীরস্বরে বলত, "আমি খেলতে জানি না।"
"ধুর! খেলতে আবার জানা লাগে নাকি? যা বলি তা করবি, ব্যস!" রামিমের এই গায়ের জোরি স্বভাবই রূপার বুক থেকে সব ভয় দূর করে দিয়েছিল।
ধীরে ধীরে রামিম আর রূপার মধ্যে গড়ে উঠল গভীর এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সারা বাড়ি জুড়ে দুজন একসাথে দৌড়ে বেড়াত। রামিমের মা রুকসানা বেগম ছিলেন ভীষণ দয়ালু মানুষ। তিনি রূপাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তাকে নতুন জামাকাপড় কিনে দেওয়া, মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেওয়া আর রামিমের পাশাপাশি তাকেও পড়ালেখায় বসানো—সব দায়িত্ব তিনি নিজ হাতে তুলে নিয়েছিলেন। রূপা রামিমের মাকে নিজের মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করত আর ভালোবাসত। ফুফু কিংবা খালা নয়, মন থেকেই তাকে ‘আম্মা’ বলে ডাকত রূপা।
বাড়ির একদম ওপরের তলায় ছিল একটা ছোট চিলেকোঠার ঘর। ঘরটা বেশিরভাগ সময় বন্ধই থাকত। পুরোনো কিছু কাঠের সিন্দুক, ভাঙা চেয়ার আর কিছু বাতিল জিনিসপত্র রাখা ছিল সেখানে। চিলেকোঠার একদম পাশেই খোলা বিশাল ছাদ। ছাদের এক কোণে একটা পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের ডাল এসে নুয়ে পড়েছিল।
রামিম আর রূপার আসল আস্তানা হয়ে উঠেছিল ওই চিলেকোঠার ঘর আর তার পাশের খোলা ছাদটা। স্কুলের ছুটি থাকলে কিংবা বিকেলে পড়া শেষ হলেই দুজন ছুটে চলে যেত ওপরে।
এক দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে লুকিয়ে দুজন চিলেকোঠায় গিয়ে হাজির হলো। রূপার হাতে ছিল নিজের হাতে বানানো কয়েকটা কাগজের নৌকা আর রামিমের হাতে এক বালতি পানি।
"রূপা, দেখ! আজ আমি ঘরের ভেতরেই নদী বানিয়ে ফেলব," বালতির পানি মেঝেময় ঢালতে ঢালতে বলল রামিম।
রূপা হেসেই কূল পাচ্ছিল না। সে মুখ চেপে ধরে বলল, "ভাইয়া, আম্মা যদি দেখতে পায়, তবে কিন্তু দুজনকেই কানে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে!"
"আরে না, আম্মা এখন ঘুমাচ্ছে। তুই তোর নৌকাগুলো ছাড়ে তো দেখি, কার নৌকা আগে যায়!" রামিম উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল।
দুজনে মেঝের জমে থাকা পানিতে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠল। রোদের আলো চিলেকোঠার জং ধরা জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছিল রূপার হাস্যোজ্জ্বল মুখে। রূপার সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে রামিম হঠাৎ খেলা থামিয়ে দেয়।
"কী হলো, থমকে গেলি কেন?" রূপা জিজ্ঞেস করল।
"তুই হাসলে তোকে ভালো দেখায় রূপা। সবসময় এভাবে হাসবি, বুঝলি? কখনো কাঁদবি না," রামিম গম্ভীর গলায় বলল।
রূপা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। ছোট হলেও সে বুঝত, এই সংসারে তার নিজস্ব বলতে কিছু নেই, কেবল রামিম আর তার মায়ের এই ভালোবাসাটাই তার একমাত্র আশ্রয়। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, "হুম, আমি কাঁদব না। তুই সাথে থাকলে আমার কান্নাই আসে না।"
চিলেকোঠার ঘরটা যেন তাদের নিজস্ব এক জগত হয়ে উঠেছিল। সেখানে ছিল না কোনো পড়াশোনা বা নিয়মের কড়াকড়ি। কখনো তারা লুকোচুরি খেলত, কখনো কাঠের পুরোনো সিন্দুকের ওপর বসে কাল্পনিক রাজরাজড়ার গল্প বানাত। ছাদটায় যখন বৃষ্টি নামত, দুজন হাত ধরাধরি করে বৃষ্টিতে ভিজত।
এক রাতে বেশ ঝড় উঠেছিল। মেঘের বিকট গর্জনে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠছিল। রূপা ভয়ে নিজের ছোট ঘরটায় একা শুয়ে কাঁপছিল। হঠাৎ দরজা খুলে রামিম ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটা ছোট টর্চলাইট।
"ভয় পাচ্ছিস নাকি?" রামিম জিজ্ঞেস করল।
রূপা কাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে মাথা নাড়ল, "খুব ভয় করছে ভাইয়া। বাজ পড়ার শব্দ শুনলে মনে হয় ছাদটা ভেঙে পড়বে।"
রামিম সোজা এসে রূপার খাটের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসল। টর্চের আলোটা সিলিংয়ের দিকে ধরে বলল, "ভয়ের কিচ্ছু নেই। আমি তো আছি। আর তাছাড়া এই বাড়িটা অনেক শক্ত, এত সহজে ভাঙবে না।"
"তুই এখানে বসবি?" রূপা ক্ষীণ গলায় বলল।
"হুম, যতক্ষণ না ঝড় থামে আর তুই ঘুমিয়ে পড়িস, আমি এখানেই আছি," রামিম দৃঢ়ভাবে বলল।
সেদিন রাতে রামিম যতক্ষণ রূপার মাথার পাশে বসে ছিল, রূপার মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব ভয় বুঝি অনেক দূরে সরে গেছে।
এভাবেই দিনগুলো আপন গতিতে পেরিয়ে যেতে লাগল। শৈশবের দিনগুলো দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল। রামিম আর রূপা দুজনেই আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। রামিম হয়ে উঠল এক চঞ্চল, তেজী আর চটপটে কিশোর, আর রূপা হয়ে উঠল শান্ত, নম্র ও মিষ্টি এক কিশোরী।
রামিম আর রূপার বন্ধুত্বের বন্ধন দিন দিন যেন আরও শক্ত হচ্ছিল। কিন্তু তারা তখনও জানত না, তাদের এই হাসিখুশি, নিশ্চিন্ত কৈশরের ওপর কত বড় এক কালবৈশাখীর কালো মেঘ ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে। যে ঝড় তাদের সহজ-সরল জীবনটাকে এক মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দেবে, তা ছিল তাদের কল্পনারও বাইরে।
কৈশোরের গণ্ডি পেরিয়ে রামিমের বয়স তখন ষোলো, আর রূপার চৌদ্দ। বয়সের সাথে সাথে রূপা যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠছিল। তার শান্ত চোখের নজর আর মিষ্টি স্বভাবের কারণে বাড়ির সবাই তাকে ভালোবাসত। শারাফাত চৌধুরী কাজের চাপে বাড়িতে কম সময় দিলেও মেয়ের মতো রূপার সব দিক খেয়াল রাখতেন। তবে শারাফাত চৌধুরীর ছোট ভাই—অর্থাৎ রামিমের ছোট চাচা জহির চৌধুরী ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের লোক।
জহির চৌধুরী কোনো কাজকর্ম করতেন না। ভাইয়ের দয়ায় এই বড় বাড়িতেই পড়ে থাকতেন আর নেশা-পানিতে মেতে থাকতেন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন চরম চরিত্রহীন ও ধান্দাবাজ। শারাফাত চৌধুরী ব্যবসায়িক কাজে শহরের বাইরে গেলে জহির চৌধুরীর উৎপাত আরও বেড়ে যেত।
এক বিকেলে শারাফাত চৌধুরী চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন বিশেষ এক ব্যবসায়িক কাজে। বাড়িতে কেবল রামিমের মা রুকসানা বেগম, রামিম, রূপা আর দু-একজন কাজের লোক। মেঘলা আকাশে সকাল থেকেই গুড়গুড় শব্দ হচ্ছিল, বিকেলে কালবৈশাখীর মতো কড়া ঝড় ধেয়ে এলো।
রামিম আর রূপা ছাদের চিলেকোঠায় বসে আড্ডা দিচ্ছিল। বৃষ্টি নামতেই তারা ছাদে গিয়ে ভিজে একাকার হলো। কিন্তু হঠাৎ তীব্র ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করায় রূপা হাঁচতে শুরু করল।
"রূপা, তুই নিচে যা। তোর আবার ঠাণ্ডার ধাত আছে, জ্বর এসে যাবে," রামিম চিন্তিত গলায় বলল।
"তুই আসবি না?" রূপা চুল নিংড়াতে নিংড়াতে বলল।
"আমি চিলেকোঠার জানালার ঝাপটা আটকে দিয়ে আসছি। তুই যা, আম্মাকে বল চা করতে," রামিম বলল।
রূপা মাথা নেড়ে নিচে নেমে গেল।
নিচে এসে রূপা সোজা রামিমের মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু ঘরের দরজার কাছে পৌঁছাতেই সে থমকে গেল। ভেতর থেকে আম্মার আর্তচিৎকার আর রোনাজারি ভেসে আসছিল।
"জহির, তুমি কী বলছ এসব! তোমার মাথায় কি একদম বুদ্ধি-শুদ্ধি নেই? আমি তোমার বড় ভাইয়ের বউ, তোমার মায়ের সমতুল্য! সরো সামনে থেকে, আমাকে যেতে দাও!" রুকসানা বেগমের কণ্ঠে তীব্র ভয় ও ক্ষোভ।
"আহা ভাবি, ভাই তো অর্ধেকের বেশি সময় শহরের বাইরেই থাকে। এত বড় বাড়িতে একা একা তোমার মন খারাপ করে না? বড় ভাই জানতেই পারবে না, তুমি এত চিল্লাচ্ছ কেন?" জহির চৌধুরীর মাতাল কণ্ঠের পশুপাখির মতো গর্জন ভেসে এলো।
রূপা দরজার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যটা দেখে ভয়ে শিউরে উঠল। জহির চৌধুরী জোর করে রুকসানা বেগমের হাত চেপে ধরেছেন, আর রুকসানা বেগম তাকে ধাক্কা দিয়ে সরানোর জন্য আকুতি-মিনতি করছেন, কান্নাকাটি করছেন। রুকসানা বেগমের পরনের শাড়ির আঁচল টেনে খুলতে চাইছে সেই নরপশু।
রূপার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে আর্ত চিৎকার দিতে গিয়েও ভয়ে গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারল না। সে উল্টো ঘুরে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল চিলেকোঠার দিকে, যেখানে রামিম ছিল।
চিলেকোঠায় গিয়ে রূপা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "ভাইয়া... ভাইয়া শিগগির নিচে চল! ছোট চাচা... আম্মার সাথে..." রূপা আর কথা শেষ করতে পারল না, কান্নায় ভেঙে পড়ল।
রামিমের মুখ মূহূর্তের মধ্যে থমথমে আর কালো হয়ে গেল। সে রূপাকে কোনো প্রশ্ন না করে তড়িৎ গতিতে নিচে নেমে এলো। রূপাও তার পিছু পিছু দৌড় দিল।
রামিম সোজা তার বাবা শারাফাত চৌধুরীর স্টাডি রুমে ঢুকে গেল। সে জানত, বাবা টেবিলের নিচের ড্রয়ারে একটা লাইসেন্স করা রিভলবার তালা বন্ধ করে রাখেন, কিন্তু চাবিটা ড্রয়ারের পাশেই লুকানো থাকে। চোখের পলকে রামিম সেই রিভলবারটা বের করে নিল।
রামিমের চোখে তখন রক্তের নেশা, মাথায় চরম রাগ। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের এই অপমান আর আকুতি সে কোনোদিন সহ্য করতে পারে না।
রিভলবার হাতে রামিম ঝড়ের বেগে মায়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। রূপা দরজার কোণে দাঁড়িয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল।
ভেতরে তখন জহির চৌধুরী রুকসানা বেগমকে বিছানায় ঠেলে ফেলে দিয়ে গায়ের জোর খাটাচ্ছিল। রুকসানা বেগম কাঁপা কণ্ঠে আকুতি করছিলেন, "আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দাও জহির, আমাকে ধ্বংস কোরো না!"
"ছোট চাচা!" রামিমের গর্জন ঘরে বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল।
জহির চৌধুরী চামড়ার বেল্ট খোলার চেষ্টা করতে করতে পেছনে ফিরল। রামিমের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে তার মাতাল চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "কী রে রামিম, বাপের বন্দুক নিয়ে খেলছিস? সর সামনে থেকে, বড়দের বিষয়ে ছোটদের নাক গলাতে নেই!"
জহির চৌধুরী আবার রুকসানা বেগমের দিকে পা বাড়াতেই রামিম আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ট্রিগারে চাপ দিয়ে দিল সে।
'ঠাঁই!'
বিকট শব্দে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। জহির চৌধুরীর বুকের ঠিক মাঝখানটা ভেদ করে চলে গেল বুলেট। রক্ত ছিটে এসে পড়ল ঘরের দেয়ালে আর রামিমের মুখে। জহির চৌধুরী চোখ দুটো বড় বড় করে মেঝেতে আছড়ে পড়ল, কয়েক সেকেন্ড খিঁচুনি দিয়ে একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রুকসানা বেগম বিকট এক চিৎকার দিয়ে উঠে বসলেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর। রূপা দরজার পাশে দুই কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
রামিমের হাত থেকে রিভলবারটা ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
রুকসানা বেগম পাগলের মতো ছুটে এসে রামিমকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, "এটা tui কী করলি বাবা! ও আল্লাহ, এ তুই কী করলি! তোর পুরো জীবনটা যে নষ্ট হয়ে গেল বাবা!"
"আম্মা... ও তোমার গায়ে হাত দিচ্ছিল... আমি সহ্য করতে পারিনি," রামিম ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠে অনুশোচনা নেই, কেবল এক অদ্ভুত শূন্যতা।
বাইরে ততক্ষণে পুলিশের সাইরেনের শব্দ আর শারাফাত চৌধুরীর গাড়ির হর্ন শোনা গেল। খারাপ আবহাওয়া আর জহির চৌধুরীর সন্দেহজনক চলাফেরার কারণে শারাফাত চৌধুরী মাঝপথ থেকেই গাড়ি ঘুরিয়ে চলে এসেছিলেন।
বাড়ির কাজের লোকেরা ভয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পুলিশ আর শারাফাত চৌধুরীকে নিয়ে সোজা সেই রুমে গিয়ে ঢুকল।
মেঝেতে ভাই জহিরের রক্তভেজা লাশ, আর সামনে রিভলবার হাতে দাঁড়ানো নিজ সন্তানকে দেখে শারাফাত চৌধুরী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।
"রামিম! তুই... তুই তোর আপন চাচাকে খুন করলি?!" শারাফাত চৌধুরী চিত্কার করে উঠলেন।
পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে বন্দুকটা বাজেয়াপ্ত করে রামিমকে গ্রেপ্তার করতে গেল। রুকসানা বেগম পাগলের মতো পুলিশের পায়ে গিয়ে পড়লেন, "না! অফিসার, ওকে ধরবেন না! ও খুন করেনি! জহিরকে আমি মেরেছি! ও আমার সাথে খারাপ কাজ করতে এসেছিল, আমি নিজ হাতে ওকে গুলি করেছি! রামিম নির্দোষ!"
পুলিশ ইতস্তত করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রামিম মায়ের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে সরিয়ে দিল। পুলিশের দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, "না অফিসার। আম্মা মিথ্যা বলছে। আমি নিজের হাতে ছোট চাচাকে গুলি করেছি। কারণ উনি আমার মায়ের শ্লীলতাহানি করছিলেন।"
শারাফাত চৌধুরী রাগে অন্ধ হয়ে রামিমের গালে কষে এক চড় মারলেন, "চুপ কর তুই খুনি! নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য এখন মৃত চাচা আর মায়ের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছিস? অফিসার, ওকে নিয়ে যান! ও একটা খুনি, ওর কোনো ক্ষমা নেই!"
রুকসানা বেগম কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেলেন। রূপা দূর থেকে অশ্রুসজল চোখে রামিমের দিকে তাকিয়ে রইল।
পুলিশ যখন রামিমের হাতে হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছিল, রামিম একবার রূপার দিকে তাকাল। রূপার চোখে ছিল সীমাহীন আতঙ্ক আর কান্না। রামিম শুধু একঝলক হেসে মনে মনে বলল, 'ভালো থাকিস রূপা, আম্মাকে দেখিস।'
ষোলো বছরের রামিমকে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো অন্ধকারের দিকে, আর পেছনে পড়ে রইল এক ভাঙা সংসার আর রক্তভেজা কৈশোর।
সময় তার নিজস্ব নিয়মে বইতে থাকে। দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর পার হলো। একে একে বারোটি বছর অতিক্রম হয়ে গেছে সেই অভিশপ্ত কালবৈশাখীর রাতের পর।
বারো বছরে শারাফাত চৌধুরীর পরিবারে অনেক পরিবর্তন এসেছে। রামিম জেলখানায় কিশোর অপরাধী থেকে পূর্ণাঙ্গ এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, রুকসানা বেগম ছেলের শোকে আর স্বামীর ভুল বোঝাবুঝির কষ্টে দিনে দিনে পঙ্গু ও প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। রূপা এখন চব্বিশ বছরের এক সুন্দরী, শান্ত ও গম্ভীর তরুণী। সে রামিমের আম্মাকে নিজের মায়ের মতো সেবা-শুশ্রূষা করে আগলে রেখেছে। রামিম চলে যাওয়ার পর থেকে সে খুব কম কথা বলে, কিন্তু তার হৃদয়ে রামিমের স্মৃতি একটুও মুছে যায়নি।
অবশেষে সেই দিনটি এলো। জেলখানা থেকে জামিনে মুক্তি পেল রামিম। ২৮ বছরের রামিমের চেহারায় এখন কৈশোরের সেই চপলতা নেই। তার মুখে দাড়ি, চোখে এক গভীর কাঠিন্য আর গাঢ় কষ্টের ছাপ।
জেল থেকে বের হয়ে রামিমের প্রথম গন্তব্য ছিল নিজের পৈতৃক বাড়ি। কিন্তু সে জানত, বাবা শারাফাত চৌধুরী তাকে এখনো ‘খুনি’ ভাবেন এবং বাড়িতে প্রবেশ করতে দেবেন না। রামিম তার মায়ের হাল জানতে চায়, রূপাকে দেখতে চায়। তাই সে নিজের পরিচয় লুকিয়ে কাজের লোক বা নতুন এক চাকরের ছদ্মবেশ নেওয়ার পরিকল্পনা করল। মাথার চুল খানিকটা উস্কোখুস্কো করে, পুরোনো মলিন জামাকাপড় পরে আর বড় গোঁফ-দাড়িতে চেহারা বদলে সে এসে দাঁড়াল চৌধুরীদের সেই পরিচিত বিশাল গেটের সামনে।
বাড়ির প্রধান গেটটা একটু খোলাই ছিল। রামিম ভেতরে পা রাখতেই থমকে গেল।
বাগানের সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে আছে একটি মেয়ে। পরনে একদম সাধারণ হালকা নীল রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ। খোলা চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে আছে। হাতে একটা মোটা বই, আর সে একমনে মনোযোগ দিয়ে পড়ে চলেছে। রোদের নরম আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
রামিম চিনতে এক মুহূর্তও ভুল করল না—এ তার ছোটবেলার খেলার সঙ্গী, সেই অনাথ রূপা!
বারো বছর পর রূপাকে দেখে রামিমের বুকের ভেতর যেন তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। রূপা এখন কত বড় আর রূপবতী হয়ে উঠেছে! তার নিষ্পাপ মুখের আদল ঠিক আগের মতোই আছে, কিন্তু চোখে কেমন যেন এক গভীর বিষাদ জমে আছে। রামিম গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পরম মুগ্ধতায় রূপাকে দেখতে লাগল। কত বছর সে এই মুখটা দেখার জন্য জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন গুনেছে!
হঠাৎ রূপা বই থেকে চোখ তুলে বাতাসে উড়ে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুলের দিকে তাকাল। রামিম চট করে নিজেকে সংবরণ করে নিল।
ঠিক সেই সময় বাড়ির প্রবীণ দারোয়ান ও পুরোনো ম্যানেজার রহিম চাচা বাগান দিয়ে যাচ্ছিলেন। রামিম এগিয়ে গিয়ে খুব নিচু ও ভারী গলায় বলল, "রহিম চাচা... মানে, ম্যানেজার সাহেব, এই বাড়িতে কি কোনো চাকুরের দরকার আছে? আমি সব কাজ করতে পারি—বাগানের কাজ, ড্রাইভিং, ঘরের কাজ।"
রহিম চাচা চশমার ওপর দিয়ে রামিমকে দেখলেন। চেনার কোনো উপায় ছিল না, কারণ রামিমের চেহারায় তখন ছদ্মবেশের নিখুঁত ছাপ।
রহিম চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "এমনিতে তো লোক আছে, তবে ম্যাডাম—মানে রুকসানা বেগম অসুস্থ। আর বড় সাহেব তো বাইরেই থাকেন। রূপা মা একাই সব সামলায়। দাঁড়া, আমি রূপা মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি।"
রহিম চাচা ডেকে বললেন, "রূপা মা! ও রূপা!"
রূপা বইটা বন্ধ করে উঠে এলো। তার শান্ত গলা ভেসে এলো, "কী হয়েছে রহিম চাচা?"
"মা, এই লোকটা কাজের খোঁজে এসেছে। দেখতে তো বেশ শক্তপোক্ত মনে হয়। রাখব একে?"
রূপা রামিমের দিকে তাকাল। রূপার সেই গভীর দু-চোখের চাহনি সরাসরি রামিমের চোখের ওপর পড়ল। রামিমের বুকের স্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠছিল। রূপা কি তাকে চিনে ফেলবে?
কিন্তু না, রূপা চিনতে পারল না। সে কেবল মলিন হেসে বলল, "তোমার নাম কী?"
রামিম গলা খাঁকারি দিয়ে নাম বদল করে বলল, "আমার নাম... রহমান, খালাম্মা।"
'খালাম্মা' শুনে রূপার ঠোঁটে ক্ষীণ একটু হাসি ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। সে বলল, "ঠিক আছে, তুমি থাকতে পারো। আম্মার ঘরে পানির বোতল পৌঁছে দেওয়া আর বাগানের যত্ন নেওয়ার কাজগুলো করবে। রহিম চাচা ওকে কাজের আউটহাউসের ঘরটা দেখিয়ে দিন।"
"আচ্ছা মা," রহিম চাচা বললেন।
রূপা আবার বইটা হাতে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। রামিম অপলক দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। সে এই বাড়িতে ঢুকতে পেরেছে, তার আম্মা আর রূপার কাছে থাকতে পারছে—এটাই এখন তার জীবনের বড় স্বস্তি।
কিন্তু কতদিন সে এই ছদ্মবেশ ধরে রাখতে পারবে? কীভাবে রূপাকে বলবে যে, কাজের লোক 'রহমান' আসলে আর কেউ নয়—তার শৈশবের সেই প্রিয় রামিম?
বাড়িতে ‘রহমান’ নাম নিয়ে কাজ শুরু করার পর রামিম খুব কাছ থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। রুকসানা বেগম প্রায় সময় ঘরেই শুয়ে থাকেন, অসুস্থতায় শয্যাশায়ী। একদিন গোপনে আম্মার ঘরের দরজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রামিম দেখল, রুকসানা বেগম রামিমের একটি ছোটবেলার ছবি বুকে জড়িয়ে ফিসফিস করে কাঁদছেন। রামিমের খুব ইচ্ছে হয়েছিল দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে—'আম্মা, আমি এসেছি, তোমার রামিম ফিরে এসেছে!' কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সময় এখনো আসেনি।
রূপার দিনকাল কাটে খুব ব্যস্ততায়। সকালে উঠেই সে আম্মার ওষুধ, খাবার সামলায়, তারপর বাড়ির কাজকর্ম তদারকি করে। তবে রামিম লক্ষ করল, রূপা প্রায় প্রতিদিনই বিকেলের দিকে নিঃশব্দে একলা ছাদে চলে যায়।
একদিন বিকেলে আসমানের মুখটা মেঘলা হয়ে এসেছিল। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়া শুরু হতেই রূপা সোজা ওপরে উঠে গেল। রামিম ও ছাদের দিকে পা বাড়াল।
চিলেকোঠার সেই পুরোনো ঘরটার দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রূপা। জানালা দিয়ে আসা বাতাসের ঝাপটায় তার চুলগুলো উড়ছিল। চোখ দুটো বন্ধ করে সে বুঝি পুরোনো কোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিল।
রামিম হাত ধুয়ে একটি ট্রেতে গরম চা নিয়ে নিঃশব্দে চিলেকোঠার দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
"খালাম্মা, আপনার চা," রামিম নিচু গলায় বলল।
রূপা চমকে উঠে চোখ খুলল। রহমানকে দেখে সে একটু সামলে নিয়ে বলল, "তুমি এখানে চা নিয়ে এলে কেন রহমান? আমি তো চাইনি।"
"আকাশ মেঘলা দেখে ভাবলাম গরম চা খেলে ভালো লাগবে," রামিম সাবধানে বলল।
রূপা চা-এর কাপটা হাতে নিল। কাপে চুমুক দিয়ে সে এক মুহূর্ত থমকে গেল। চায়ের স্বাদটা বড্ড পরিচিত! এলাচ আর সামান্য আদা দিয়ে তৈরি এই খাস চা-টা ঠিক সেভাবেই বানানো, যেভাবে ছোটবেলায় রামিম বানাত।
রূপা অদ্ভুত নজরে রহমানের দিকে তাকাল। "তুমি চা-টা এভাবে বানাতে কোথায় শিখলে?"
রামিম চোখ নামিয়ে বলল, "আমার এক বন্ধু ছিল... সে এভাবে চা খেতে ভালোবাসত।"
রূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিলেকোঠার মেঝের দিকে তাকাল। "জান রহমান, এই ঘরটা আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল। এখানে একসময় আমার এক বন্ধু ছিল... আমার শৈশবের বন্ধু। সে আমাকে খুব আগলে রাখত। কিন্তু এক অভিশপ্ত রাতে সব শেষ হয়ে গেল।"
রামিমের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সে বলল, "আপনার সেই বন্ধু... সে এখন কোথায় খালাম্মা?"
"জানিনা," রূপার চোখে পানি টলমল করে উঠল। "সে একটা অপরাধের সাজা খাটছে। কিন্তু আমি মনে মনে জানি, সে কখনো অপরাধী ছিল না। সে যা করেছিল, তার মা আর আমাকে রক্ষা করতেই করেছিল। কিন্তু তার বাবা তাকে বুঝতে চায়নি।"
রামিম আর সহ্য করতে পারল না। রূপার চোখে জল আর নিজের জন্য এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে তার ছদ্মবেশের মুখোশ খসে পড়ল।
সে ট্রে-টা পাশে কাঠের সিন্দুকের ওপর রাখল। তারপর ধীরে ধীরে রূপার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
রূপা খানিকটা অবাক হয়ে পিছাতে গেল, "কী করছ রহমান?"
রামিম নিজের মাথার থুথনিতে হাত দিয়ে কৃত্রিম দাড়ি-গোঁফটা একটু আলগা করল এবং সোজা কণ্ঠে বলল, "আমাকে রহমান বলে ডাকবি না রূপা... আমি তোর রামিম ভাইয়া।"
শব্দ দুটো চিলেকোঠার বাতাসে যেন থমকে গেল। রূপার হাতের চায়ের কাপটা নিচে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে বড় বড় চোখে রহমান নামধারী লোকটার দিকে তাকাল।
রামিম তার চোখের ওপর থেকে কৃত্রিম ছদ্মবেশের ধুলো সরিয়ে সোজা রূপার দিকে তাকাল। সেই গভীর চেনা চোখ, সেই চোখের কোণের ছোট দাগটা—যা শৈশবে গাছ থেকে পড়ে হয়েছিল!
"রামিম... ভাইয়া?!" রূপার গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বের হচ্ছিল না।
"হুম, রূপা। আমি ফিরে এসেছি। তবে কারও সামনে বলতে পারবি না। বাবা যদি জানতে পারে, তবে আমাকে আবার পুলিশের হাতে তুলে দেবে," রামিম আবেগঘন কণ্ঠে বলল।
রূপা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বারো বছরের জমে থাকা কষ্ট, একাকীত্ব আর বিরহের বাঁধ ভেঙে গেল এক মুহূর্তে। সে দু-হাতে রামিমের বুক জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
"তুই কোথায় ছিলি এত বছর? কত কেঁদেছি আমি तुझ्या জন্য! তুই একবারও খবর নিসনি কেন?" রূপা রামিমের বুকে কিল মারতে মারতে কাঁদতে লাগল।
রামিম শক্ত করে রূপাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। তার চোখ দিয়েও নোনা জল গড়িয়ে পড়ছিল। রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দে রূপা। আমি বাধ্য ছিলাম। কিন্তু দেখ, আমি আবার তোদের কাছেই ফিরে এসেছি।"
চিলেকোঠার নির্জনতায়, টিপটিপ বৃষ্টির শব্দে বারো বছর পর দুটো প্রাণ আবার একসাথে মিলিত হলো। রূপা রামিমের বুকে মুখ লুকিয়ে যেন জীবনের সব নিরাপত্তা খুঁজে পেল, আর রামিম অনুভব করল—এত বছরের জেলখানার অন্ধকারের পর রূপাই তার জীবনের একমাত্র আলো।
রামিমের আসল পরিচয় জানার পর থেকে রূপার জীবনের গতিপথ যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল। যে গৃহপরিচারিকা হিসেবে দিন কাটাত, তার মনের ভেতরে এখন কেবল রামিমকে হারানোর ভয় আর তাকে কাছে পাওয়ার এক প্রগাঢ় ব্যাকুলতা। দুজনে সিদ্ধান্ত নিল, শারাফাত চৌধুরীর অগোচরেই এই সত্য চেপে রাখতে হবে। অন্তত যত দিন না রামিমের ওপর থেকে ‘খুনি’ অপবাদ মোছা যায়।
দিনের আলোয় রামিম সেই অনুগত কাজের লোক ‘রহমান’ হিসেবেই বাড়ির কাজ করত। কিন্তু তাদের চোখের ভাষাই বলে দিত মনের গহীনের হাজারো না-বলা কথা। শারাফাত চৌধুরী যখন কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকেন, আর পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন ছাদের চিলেকোঠাই হয়ে ওঠে তাদের গোপন মিলনমেলা।
একদিন গভীর রাতে পুরো বাড়ি যখন ঘুমে মগ্ন, রূপা পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এলো। চিলেকোঠার পুরোনো লণ্ঠনটার টিমটিমে আলোয় বসে ছিল রামিম। দরজার শব্দে রামিম পেছনে ফিরে তাকাল।
রূপার পরনে ছিল একটি সাধারণ হালকা বেগুনি সুতির শাড়ি, ভেজা চুল পিঠে ছড়ানো। রাতের আঁধারে তাকে এক রূপকথার পরীর মতো দেখাচ্ছিল।
"তুই এত রাতে নিচে থেকে উঠে এলি কেন রূপা? কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে," রামিম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল।
রূপা আস্তে আস্তে রামিমের কাছে এসে দাঁড়াল। রামিমের দু-হাতে নিজের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "কেউ দেখবে না। আর দেখলে দেখুক, আমার আর ভয় করে না। বারো বছর তোকে ছাড়া কাটিয়েছি রামিম, আর এক মুহূর্তও আমি তোর থেকে দূরে থাকতে পারছি না।"
রামিম কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে রইল। রূপার চোখে-মুখে শুধুই তার প্রতি নিঃশর্ত সমর্পণ। রামিমের শক্ত পুরুষালি হাত রূপার গাল স্পর্শ করল। রূপা চোখ বন্ধ করে সেই পরিচিত ছোঁয়া উপভোগ করতে লাগল।
"তুই তো ছোট ছিলি রূপা... কত বদলে গেছিস," রামিম ফিসফিস করে বলল।
"বদলাইনি রামিম। কেবল তোর ভালোবাসার প্রতীক্ষায় বড় হয়েছি," রূপা অনুচ্চ স্বরে বলল, তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
চিলেকোঠায় রাতের বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে হু-হু করে ঢুকে পড়ছিল। বাইরে হালকা বৃষ্টির ফোটা পড়ার টু পট শব্দ। বহু বছরের জমানো বিরহ আর একাকীত্ব যেন এক নিমেষে ধুয়ে-মুছে গেল। রামিম রূপাকে নিজের বুকের একদম কাছে টেনে নিল। রূপাও দুই বাহু দিয়ে রামিমের গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা গুঁজল।
রামিমের তপ্ত নিঃশ্বাস রূপার ঘাড়ে আর মুখে এসে পড়ছিল। রূপার হৃদস্পন্দন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল। রামিম আলতো করে রূপার থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলে ধরল। দুটি জোড়া চোখ মাঝের সব দূরত্ব মিটিয়ে দিল। ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতেই এক অদ্ভুত আবেশে রূপা শিহরিত হয়ে উঠল।
সেই নিঝুম রাতে, চিলেকোঠার ধূলিমলিন ঘরে তাদের শৈশবের নিছক বন্ধুত্ব এক গভীর, অনাবিল ও ব্যাকুল ভালোবাসায় রূপ নিল। এতদিন দুজন দুজনকে যেভাবে আড়াল করে রেখেছিল, আজ তারা একে অপরের কাছে একদম সমর্পিত হলো। রামিমের আলিঙ্গনে রূপা যেন খুঁজে পেল তার জীবনের পূর্ণতা, আর রামিম পেল বেঁচে থাকার নতুন এক অর্থ।
ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে রূপা যখন রামিমের বুক থেকে মাথা তুলে নিচে নামার উদ্যোগ নিচ্ছিল, রামিম তার হাত ধরে বলল, "একদিন আমি তোকে সবার সামনে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেব রূপা। এই ছদ্মবেশ বেশিদিন থাকবে না।"
রূপা মিষ্টি হেসে রামিমের কপালে একটা নরম চুমু এঁকে দিয়ে বলল, "আমি সেই দিনের অপেক্ষাতেই থাকব রামিম। তুই শুধু আমার সাথে থাকিস।"
কিন্তু সুখের এই গোপন দিনগুলো যে বেশিদিন স্থায়ী হবে না, তা তারা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। বাড়ির আকাশে তখন বড় এক বিপর্যয়ের কালো ছায়া নেমে আসছিল।'
দিনগুলো যেন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে কাটছিল। রাতে চিলেকোঠার গোপন ভালোবাসা আর দিনে প্রভুর ছদ্মবেশী অনুগত ভৃত্য—এই দুই রূপ সামলাতে রামিমকে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছিল। তবে রূপার মুখে ফুটে ওঠা প্রশান্তির হাসিই ছিল রামিমের একমাত্র শক্তি।
কিন্তু সেই শান্ত দিনগুলো হঠাৎ করেই এক চরম বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল।
শারাফাত চৌধুরীর ব্যবসার পুরোনো শত্রু ছিল হাসেম খন্দকার। অতীতে অবৈধ ব্যবসার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় এবং বাজারে একক আধিপত্য কায়েম করতে না পেরে শারাফাত চৌধুরীর ওপর হাসেমের চরম আক্রোশ ছিল। তাছাড়া, জহির চৌধুরীর মৃত্যুর পর হাসেমই শারাফাত চৌধুরীকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য নানারকম ষোলোআনা চক্রান্ত করে আসছিল।
একদিন গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে এসেছে, তখন আচমকা একদল সশস্ত্র ডাকাত আর হাসেম খন্দকারের ভাড়াটে গুণ্ডারা জোর করে বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
বাড়ির কাজের লোকরা ভয়ে যে যার ঘরে পালিয়ে গেল। হাসেম খন্দকার সোজা গিয়ে শারাফাত চৌধুরীর বেডরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। শারাফাত চৌধুরী তখন ঘুমিয়ে ছিলেন, হট্টগোলে ঘুম ভাঙতেই তিনি পিস্তল বের করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার আগেই হাসেমের লোকজন তাঁকে ধরে ফেলল এবং পিস্তলটি কেড়ে নিল।
"হাসেম! তুই এই রাতে আমার বাড়িতে ঢুকেছিস মানে কি?" শারাফাত চৌধুরী রাগে ও বিস্ময়ে গর্জে উঠলেন।
হাসেম খন্দকার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "অনেকদিন ধরে তোকে শেষ করার সুযোগ খুঁজছিলাম শারাফাত। তোর বড় ছেলেকে তুই নিজে হাতে জেলে পাঠিয়েছিস, ভাইটা তো মরেই গেল, আর তোর পঙ্গু বউ তো এমনিতেই মরার পথে। আজ তোকে শেষ করে তোর পুরো সম্পত্তি আমি নিজের নামে লিখিয়ে নেব।"
সোফায় বসে থাকা শারাফাত চৌধুরীকে টানতে টানতে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসা হলো। রূপা আর অসুস্থ রুকসানা বেগম আর্ত চিৎকার করে উঠলেন। রূপা শারাফাত চৌধুরীকে বাঁচাতে ছুটে গেলে হাসেমের এক গুণ্ডা রূপার চুল ধরে কষে এক ধাক্কা মারল। রূপা মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।
"রূপা!"
ঠিক সেই মুহূর্তে সিংহের মতো গর্জন করে ড্রয়িংরুমে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাজের লোক ‘রহমান’ ছদ্মবেশী রামিম। রূপার গায়ে আঘাত করা গুণ্ডাটাকে এক লাথিতে উড়িয়ে দিয়ে মেঝের ওপর ফেলে দিল সে।
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। হাসেম খন্দকার চিৎকার করে বলল, "কে রে এই চ্যাকার? মার একে!"
পাঁচ-ছয়জন সশস্ত্র লোক একসাথে রামিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু বারো বছর জেলখানায় থেকে আর কষ্টের জীবন সহ্য করে রামিম এখন সাধারণ কোনো যুবক নয়। তার ভেতরে জমা থাকা ক্ষোভ আর প্রতি হিংসার আগুন আজ জ্বলে উঠল। সে খালি হাতেই গুণ্ডাদের ওপর চড়াও হলো। কাঠ বা রড যা হাতে পেল, তা দিয়েই একে একে সবাইকে ঘায়েল করতে লাগল।
মারামারির এক পর্যায়ে রামিমের মুখের কৃত্রিম দাড়ি-গোঁফ আর মাথার পরচুল খুলে নিচে পড়ে গেল।
ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় রক্তে ভেজা চেহারার সেই যুবকটির দিকে তাকিয়ে শারাফাত চৌধুরী শিউরে উঠলেন। তার চোখ দুটো বিশ্বাস করতে পারছিল না যা তিনি দেখছেন।
"রামিম?!" শারাফাত চৌধুরীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
রুকসানা বেগম কেঁদে উঠে বললেন, "আমার রামিম! আমার বাবা ফিরে এসেছে!"
হাসেম খন্দকার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লুকিয়ে রাখা রিভলবার বের করে শারাফাত চৌধুরীর দিকে তাক করল, "তোর ছেলে ফিরে এসেছে তো কী হয়েছে? আগে তোকে শেষ করব!"
ট্রিগারে চাপ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে রামিম চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে পড়ে হাসেমের কব্জি ধরে ফেলল। দুই জোরদার প্যাঁচে হাসেমের হাত ভেঙে রিভলবারটি কেড়ে নিল রামিম। তারপর রিভলবারের বাঁট দিয়ে হাসেমের মাথায় কষে এক আঘাত করতেই সে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে গলে পড়ল।
বাকি গুণ্ডারা নিজেদের সর্দারের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমে তখন নিস্তব্ধতা। মেঝেতে পড়ে থাকা অস্ত্রটি হাতে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে আছে রামিম। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন তার জন্মদাতা বাবা শারাফাত চৌধুরী।
শারাফাত চৌধুরী অপলক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে ছেলেকে তিনি এতদিন ‘খুনি’ ও ‘পশু’ বলে ঘৃণা করেছেন, আজ সেই ছেলে ছদ্মবেশে থেকে নিজের জীবন বাজি রেখে পুরো পরিবারকে রক্ষা করল!
"রামিম... তুই... তুই রহমান সেজে এই বাড়িতে ছিলি?" শারাফাত চৌধুরীর কণ্ঠ দিয়ে কথা ফুটছিল না।
রামিম আস্তে করে অস্ত্রটা পাশে রেখে দিল। তার চোখে আজ আর ভয় নেই, কেবল বারো বছরের জমে থাকা কষ্ট আর অভিমানের পাহাড়ে আগ্নেয়গিরি।
সে বাবার সামনে এসে শান্ত অথচ এক গভীর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিল।
ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশে রুকসানা বেগম ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। শারাফাত চৌধুরী এখনো বাকরুদ্ধ হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিজের আপন সন্তান, যাকে তিনি এতদিন খুনি ভেবে পশুর মতো ঘৃণা করেছেন, সে-ই আজ তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনল!
রামিম শান্ত পায়ে এগিয়ে এসে বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল। তার চোখে জল আর বারো বছরের জমে থাকা অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ।
"বাবা, আজ পর্যন্ত তুমি আমাকে শুধু জহির চৌধুরীর খুনি বলেই জেনে এসেছ," রামিমের কণ্ঠ ছিল ভীষণ ভারী। "কিন্তু কখনো কি জানতে চেয়েছিলে, ষোলো বছরের একটা ছেলে কেন নিজের আপন চাচাকে গুলি করতে বাধ্য হয়েছিল?"
শারাফাত চৌধুরী ধীরেনজরে ছেলের দিকে তাকালেন, তার চোখে প্রশ্ন আর ভয়।
রুকসানা বেগম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, "না রামিম, আজ আর চুপ থাকবি না বাবা! আজ সব সত্যি কথা তোর বাবার সামনে বল! এতদিন তোর সুখে-শান্তির কথা ভেবে আমি মুখ বুজে সহ্য করেছি, কিন্তু আজ সব বলবি!"
রুকসানা বেগম শারাফাত চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, "তোমার যে ভাইকে তুমি মাথায় তুলে রেখেছিলে, সেই জহির ছিল একটা পশু! তুমি যখন ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে, তখন সে আমাকে কুপ্রস্তাব দিত। সেদিন ঝড়ের রাতে জহির আমার ঘরে ঢুকে জোরজবর্দস্তি করছিল, আমার পরনের শাড়ি টেনে আমার শ্লীলতাহানি করতে চেয়েছিল! আমি আকুতি-মিনতি করছিলাম, কান্না করছিলাম... ঠিক সেই মুহূর্তে রামিম আর রূপা এসে সব দেখে ফেলে।"
কথাগুলো শুনে শারাফাত চৌধুরীর মাথার ওপর যেন বজ্রপাত হলো। তিনি চোখ দুটো বড় বড় করে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
রুকসানা বেগম আরও বললেন, "রামিম নিজের মায়ের ইজ্জত বাঁচাতে তোমার বন্দুক তুলে নিয়েছিল। জহিরকে সে শখ করে মারেনি! ও যদি সেদিন গুলি না করত, তবে তোমার এই পশুর মতো ভাই আমাকে জীবিত রাখত না! আর তুমি? ঘটনার সত্যতা না জেনে নিজ সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে! আর রামিম... ও শুধু মায়ের সম্মান বাঁচাতে পুলিশের কাছে নিজের ঘাড়ে সব দোষ তুলে নিয়েছিল!"
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই শারাফাত চৌধুরীর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। তিনি শিউরে উঠলেন। যে ভাইকে তিনি পরম স্নেহে আগলে রেখেছিলেন, সে ছিল এমন এক নরাধম? আর যে সন্তান তার মায়ের সম্ভ্রম রক্ষা করতে নিজের সোনার মতো ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিল, তাকেই তিনি এতদিন ধরে ঘেন্না করে এলেন?
শারাফাত চৌধুরী থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতেই দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রুর বন্যা বয়ে যেতে লাগল।
"রামিম... বাবা আমার... আমাকে ক্ষমা করে দে বাবা!" শারাফাত চৌধুরী দু-হাতে মুখ ঢেকে বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। "আমি কত বড় পাপ করেছি! নিজের সন্তানকে না চিনে এক পশুর জন্য তোর জীবনটা ধ্বংস করে দিলাম! ও রামিম, আমাকে শাস্তি দে বাবা, আমাকে অভিশাপ দে!"
রামিমের কঠোর চোখ দুটো এক মুহূর্তেই গলে পানি হয়ে গেল। বাবার এই দশা সে সহ্য করতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে বসে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"বাবা, কেঁদো না! আমি তোমার ওপর কখনো রাগ করিনি," রামিম ফিসফিস করে বলল। "আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি সত্যটা জানো। আমি কোনো অপরাধী নই বাবা, আমি শুধু আমার আম্মাকে বাঁচিয়েছিলাম।"
রূপা একপাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছিল। বহু বছর পর একটা পরিবার আবার এক হতে চলেছে। শারাফাত চৌধুরী রামিমের মুখটা দু-হাতে ধরে কপালে চুমু খেলেন।
"তোর কোনো অপরাধ নেই বাবা। আজ থেকে তুই এই বাড়ির মালিক, তুই আমার গর্ব!" শারাফাত চৌধুরী রূপার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আর রূপা মা... তুই সব জানতিস, তাও মুখ ফুটে বলিসনি? সত্যি, তোরা দুজন না থাকলে আজ এই সংসারটাই থাকত না।"
ঘরের অন্ধকার দূর হয়ে যেন এক নতুন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। সত্যের জয় হলো, আর মিটে গেল বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝি।
সেই ঝড়ের রাতের ঘটনার পর চৌধুরীদের বিশাল বাড়িটায় যেন বহু বছর পর আবার প্রাণের সঞ্চার হলো। ঘরের কালো মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে নেমে এলো অনাবিল শান্তি।
পরদিন সকালেই শারাফাত চৌধুরী থানায় গিয়ে হাসেম খন্দকার আর তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলেন। পুলিশ এসে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গেল এবং রামিমের পুরোনো মামলাটির বিষয়ে পুনরায় তদন্ত করে তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করার আশ্বাস দিল। রামিমের ওপর থেকে ‘খুনি’ অপবাদের যে দীর্ঘ ও ভারী বোঝা ছিল, তা অবশেষে নেমে গেল।
বাড়ির বাতাসটা এখন একেবারে অন্যরকম। সকালের সোনালী রোদ যখন উঠোনে এসে পড়ে, রুকসানা বেগমকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বারান্দায় এনে রাখা হয়। রুকসানা বেগমের মুখে এখন আর কষ্টের ছাপ নেই, বরং এক পরম শান্তির হাসি ফুটে উঠেছে।
শারাফাত চৌধুরী সেদিন সকালে সবাইকে নিয়ে খাবার টেবিলে বসলেন। রামিম এতদিন ছদ্মবেশে থাকার পর আজ প্রথমবারের মতো বাবার পাশে এসে সহজভাবে বসল। রূপা ট্রে-তে করে গরম পরোটা আর চা নিয়ে এলো।
"রূপা মা, তুই টেবিলে বোস। আজ থেকে তোকে আর রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত হতে হবে না," শারাফাত চৌধুরী অত্যন্ত স্নেহের সাথে বললেন।
রূপা লজ্জা পেয়ে মৃদু হাসল, "না চাচাজান, নিজ হাতে আপনাদের বানিয়ে খাওয়াতে আমার ভালোবাসাই লাগে।"
শারাফাত চৌধুরী রূপার দিকে তাকিয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি রামিম আর রূপা—দুজনকেই দীর্ঘক্ষণ নীরবে পর্যবেক্ষণ করলেন। এতদিন তিনি ব্যবসার পেছনে অন্ধ হয়ে পরিবারের ভেতরের এত বড় সত্যগুলো দেখতে পাননি। কিন্তু এবার তিনি আর কোনো ভুল করতে চান না।
"রামিম," শারাফাত চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলেন।
"জি বাবা?" রামিম চোখ তুলে তাকাল।
"তুই জেল থেকে ফেরার পর রূপাই তোকে প্রথম চিনতে পেরেছিল, তাই না?" শারাফাত চৌধুরী জানতে চাইলেন।
রামিম আর রূপা দুজনই এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল। রূপার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, আর সে চোখ নিচু করে ফেলল।
রামিম ধীরস্বরে বলল, "জি বাবা। রূপা কখনোই আমাকে পর ভাবেনি। আমার বিপদে, আমার অনুপস্থিতিতে ও-ই আম্মাকে আগলে রেখেছিল।"
রুকসানা বেগম হুইলচেয়ারে বসে মৃদু হেসে বললেন, "ওরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে কতটা ভালোবাসে, তা কি আর আমি বুঝি না? জহির মারা যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত রূপা এই বাড়িতে কেবল রামিমের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনেছে। অন্য কোনো সম্পর্কের কথা ও কখনো ভাবেইনি।"
শারাফাত চৌধুরী টেবিলে হাত রেখে মৃদু হাসলেন। "আমি অনেক অন্যায় করেছি। কিন্তু এবার আমি এই বাড়ির সমস্ত অধর্ম দূর করে নতুন এক অধ্যায় শুরু করতে চাই। রামিম, তুই এতদিন যা সহ্য করেছিস, তার মূল্য আমি দিতে পারব না। তবে রূপাকে তোর হাতে তুলে দিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।"
বাবা-মায়ের এমন সিদ্ধান্তে রামিম আর রূপার বুক যেন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। চিলেকোঠার গোপন ভালোবাসার যে বন্ধন তারা এতদিন বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ তা সামাজিক ও পারিবারিক স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে!
রূপা লজ্জায় আর ঘরে দাঁড়াতে না পেরে দ্রুত পায়ে ছাদে চলে গেল। রামিম বাবার দিকে তাকিয়ে এক কৃতজ্ঞতার হাসি দিল।
"বাবা, তুমি যে এত বড় মন দেখাবে, আমি কখনো ভাবতে পারিনি," রামিম বলল।
"তোর খুশির চেয়ে বড় তো আমার কাছে আর কিছুই নেই বাবা," শারাফাত চৌধুরী রামিমের কাঁধে হাত রেখে বললেন।
বিকেলে রামিম সোজা ছাদে চলে গেল। চিলেকোঠার ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে রূপা কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে তাকিয়ে ছিল। রামিম গিয়ে নিঃশব্দে রূপার পেছনে দাঁড়াল।
বাতাসে রূপার চুলগুলো উড়ছিল। রামিম আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখল।
রূপা পেছনে ফিরে তাকাল। তার চোখের কোণে আনন্দের জল টলমল করছিল।
"শুনলি তো বাবা কী বলল?" রামিম আলতো হেসে বলল।
"হুম," রূপা মাথা নিচু করে জবাব দিল।
"এখনও কি ভয় পাচ্ছিস?" রামিম রূপার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলে জিজ্ঞেস করল।
"না রামিম ভাইয়া... আমার আর কোনো ভয় নেই। এতদিন পর মনে হচ্ছে, সত্যিই মেঘ কেটে নতুন সকাল এসেছে," রূপা পরম আবেগে বলল।
চিলেকোঠার নির্জনতায় দুজনের ভালোবাসা আজ যেন আরও বেশি রঙিন ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। সামনের দিনগুলো এখন কেবলই তাদের একসাথে পথচলার, নতুন জীবনের সুর বাঁধার।
বাড়িময় ছড়িয়ে পড়ল এক উৎসবের আমেজ। বহু বছর ধরে যে বাড়িতে শোক আর নীরবতার ছায়া জমে ছিল, সেখানে এখন শুধুই হাসি আর আনন্দের কলতান। শারাফাত চৌধুরী নিজের হাতে সব আয়োজন তদারকি করতে শুরু করলেন। শহরের নামকরা আলোকসজ্জার দল এসে বিশাল চৌধুরী ভবনের আনাচ-কানাচ রঙিন আলোয় সাজিয়ে তুলল।
বিয়ের শুভ দিন স্থির হলো এক মনোরম শুক্রবারের বিকেলে।
পুরো বাড়ি ঝলমল করছে। আত্মীয়স্বজন খুব বেশি ডাকা হয়নি, কারণ শারাফাত চৌধুরী চেয়েছিলেন কেবল আপন মানুষদের নিয়েই এই পবিত্র বন্ধন সম্পন্ন করতে। রুকসানা বেগম শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও বেশ প্রফুল্ল। তিনি হুইলচেয়ারে বসে থেকেই রামিমের গায়েহলুদের সব তদারকি করলেন।
বিকেলের দিকে রূপাকে কনের সাজে সাজানো হলো। পরনে তার রক্তলাল বেনারসি শাড়ি, গায়ে জমকালো স্বর্ণালংকার, আর মাথায় লাল ওড়না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে রূপার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। যে অনাথ মেয়েটি সাত বছর বয়সে এক মলিন সুতির জামা পরে এই বাড়িতে প্রথম পা রেখেছিল, আজ সে এই চৌধুরীদের গৃহবধূ হতে চলেছে!
রামিমও পরল সাদা রঙের রেশমি শেরওয়ানি আর নাগরা জুতো। আয়নায় নিজের সুঠাম শরীর আর পরিণত চেহারা দেখে তার নিজেরই এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো। ষোলো বছর বয়সে যে জীবনটা অন্ধকারের কবলে পড়েছিল, আঠাশ বছরে এসে তা যেন এক নতুন আলোর দিশা পেল।
কাজী সাহেব এলেন। ড্রয়িংরুমে শুভ বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হলো।
একপাশে বসে আছেন আবেগপ্লুত শারাফাত চৌধুরী ও অশ্রুসজল রুকসানা বেগম। অন্যপাশে বসে আছে কনে রূপা আর বর রামিম।
"কবুল..."
প্রথমে রামিম গম্ভীর অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করল শব্দটি। এরপর রূপা কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে মৃদু স্বরে উচ্চারণ করল, "কবুল।"
বিয়ের আইনি ও সামাজিক সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই ঘরে এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। শারাফাত চৌধুরী এগিয়ে এসে ছেলের মাথায় আর বৌমার মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহ ও ভালোবাসায় দোয়া করে দিলেন। রুকসানা বেগম রূপাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন—এবার আর কষ্টের কান্না নয়, এ যে পরম সুখের কান্না!
"আমার মা... আজ থেকে তুই সত্যি সত্যি এই বাড়ির মূল কাণ্ডারী হলি," রুকসানা বেগম রূপার কপালে চুমু এঁকে বললেন।
রামিম রূপার দিকে তাকাল। লাজে রাঙা রূপার মুখটা লাল ওড়নার ফাঁক দিয়ে যেন এক টুকরো পূর্নিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করছিল। রামিমের চোখ দুটোতে ছিল শুধুই ভালোবাসা আর এক অপার অনুরাগের ছাপ।
সব মেহমান ও কাজের লোকজনের খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে রাত বেশ গড়িয়ে গেল। শারাফাত চৌধুরী রুকসানা বেগমকে নিয়ে নিজের ঘরে বিশ্রামে গেলেন। পুরো বাড়িতে আবার নেমে এলো এক গভীর, স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা।
রামিম ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তবে সে সোজা তার মূল বেডরুমে না গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ওপরের চিলেকোঠার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
চিলেকোঠার ঘরটি আজ সুন্দর করে ফুল আর প্রদীপ দিয়ে সাজানো হয়েছে। সেই ধূলিমলিন ভাঙা ঘরটি আজ যেন এক পবিত্র বাসরঘর। রূপা খাটের এক কোণে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে ছিল।
রামিম ঘরের দরজায় এসে একটু থামল। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল। এতদিন তারা কত ভয় আর ছদ্মবেশে এই ঘরে এসে দেখা করেছে, কিন্তু আজ? আজ রূপা তার আইনসম্মত ও সামাজিক অর্ধাঙ্গিনী!
রামিম ভেতরের দরজাটা নিঃশব্দে ভিড়িয়ে দিয়ে ঘরের প্রদীপের আলোয় রূপার দিকে এগিয়ে এলো।
চিলেকোঠার বাতাস যেন আবার থমকে গেল, তবে এবার কোনো ভয়ের মেঘ নিয়ে নয়—বরং দুই তৃষ্ণার্ত আত্মার পূর্ণাঙ্গ মিলনের এক সুগভীর আহ্বান নিয়ে।
চিলেকোঠার ঘরজুড়ে কামিনী আর রজনীগন্ধার সুবাস। জানালার ফাঁক দিয়ে রাতের ঠাণ্ডা বাতাস আর চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে রূপার বেনারসির লাল আঁচলে। থরথর করে কাঁপতে থাকা রূপার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল রামিম।
রামিম হাঁটু গেড়ে খাটের পাশে বসল। ধীরহাতে সে রূপার থুতনিটা স্পর্শ করে মুখটা ওপরে তুলল। প্রদীপের সোনালী আলোয় রূপার লাজুক, অশ্রুসজল ও রূপবতী চেহারা দেখে রামিমের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
"কতটা পথ পেরিয়ে আজ আমরা এখানে, বল রূপা?" রামিম ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠ আবেগে থমথমে।
রূপা রামিমের গভীর চোখ দুটোর দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ আর জেলের অন্ধকার নেই, নেই কোনো অপবাদের ক্ষোভ—আছে শুধু অপার প্রেম আর সমর্পণ। রূপা আলতো করে রামিমের হাত দুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরল।
"সব বাধা, সব কষ্ট ধুয়ে-মুছে গেছে রামিম। আজ আমার আর কোনো অতীত নেই, আমার সবটা জুড়ে শুধু তুই," রূপার চোখে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল।
রামিম রূপার চোখের জল নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। তারপর এক টানে রূপাকে নিজের বুকের একদম গভীরে জড়িয়ে ধরল। রূপাও তার দু-বাহু দিয়ে রামিমের গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। বারো বছরের দীর্ঘ বিরহ, গোপনে ছদ্মবেশে লুকিয়ে দেখা করা আর সমাজের সব রক্তচক্ষু পেরিয়ে আজ তাদের এই এক হওয়া।
রামিমের তপ্ত ঠোঁট রূপার কপাল, গাল আর ঘাড় স্পর্শ করে চলল। রূপা এক অদ্ভুত আবেশে চোখ বন্ধ করে রামিমের বুকে নিজেকে সঁপে দিল। ঘরের হালকা আলো-আঁধারিতে দুটি হৃদয় যেন এক সুরে স্পন্দিত হতে লাগল। রামিম রূপার মাথার ওড়নাটা সরিয়ে দিল, আর খোলা চুলে আঙুল চালিয়ে তার প্রগাঢ় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাল।
চিলেকোঠার যে ধূলিমলিন ঘরে তাদের শৈশবের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল, আজ সেই ঘরটাই সাক্ষী হয়ে রইল তাদের গভীর ও ব্যাকুল এক মধুর বাসরের। সারা রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর স্নিগ্ধ বাতাসের মাঝে তারা হারিয়ে গেল এক অনন্ত ভালোবাসার জগতে, যেখানে কোনো ভয় নেই, কোনো বিচ্ছেদ নেই।
ভোরের প্রথম সোনালী আলো যখন চিলেকোঠার জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ল, তখন রূপা রামিমের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমোচ্ছিল। রামিম জেগে উঠে রূপার পরম পবিত্র মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, জীবনের সমস্ত ঝড়ঝাপটার পর এই সুশান্তিই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
রামিম আলতো করে রূপার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল। রূপা ঘুম ভেঙে চোখ মেলে তাকাল। রামিমের দিকে তাকিয়ে এক স্বর্গীয় মিষ্টি হাসিতে ভরে উঠল তার মুখ।
"শুভ সকাল, আমার জামাই," রূপা লজ্জামাখা গলায় ফিসফিস করল।
"শুভ সকাল, চৌধুরী বাড়ির ছোট বউ," রামিম হেসে রূপাকে আরও কাছে টেনে নিল।
নিচে তখন পাখিদের কলকাকলিতে নতুন ভোরের সূচনা হচ্ছে। ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ সরে গিয়ে শারাফাত চৌধুরীর পরিবারে ফিরে এসেছে চিরস্থায়ী আলো ও শান্তি।
....