খালাতো ভাইয়ের সাথে পলায়ন

গ্রামের নাম রূপপুর। নদীঘেঁষা ছোট্ট এক সুবজ গ্রাম, যেখানে সকাল শুরু হয় পাখির ডাকে আর সন্ধ্যা নামে নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হিমেল বাতাসে। সেই গ্রামেরই এক পরিচিত মধ্যবিত্ত পরিবারে কেটেছে জিশানের শৈশব আর কৈশোর। জিশানের বয়স যখন চব্বিশ, তখন সে লেখাপড়া শেষ করে সবে শহরের এক ছোট সংস্থায় চাকরিতে ঢুকেছে। শান্ত, গম্ভীর আর পরিচ্ছন্ন স্বভাবের ছেলে জিশান। পরিবারে সবাই তাকে বেশ সমীহ করে চলে। তিন খালার মধ্যমজন, অর্থাৎ মেজো খালার বড় ছেলে জিশান। পরিবারে সবার সাথেই তার সম্পর্ক চমৎকার, তবে একজনের প্রতি তার টানটা একটু অন্যরকম, একটু গভীর।

সে আর কেউ নয়, তার ছোট খালার একমাত্র মেয়ে বৃষ্টি। বৃষ্টি জিশানের চেয়ে পুরো নয় বছরের ছোট। যখন জিশানের বয়স চব্বিশ, বৃষ্টির বয়স তখন মাত্র পনেরো। ক্লাস নাইনে পড়ে। চঞ্চল, দুরন্ত আর বেপরোয়া স্বভাবের এক মেয়ে। পড়ালেখার চেয়ে তার মনোযোগ বেশি থাকে গ্রামের মাঠে ঘুরে বেড়ানোয়, গাছে উঠে আম কুড়ানোয় আর সবাইকে জ্বালাতন করায়। নিজের মিষ্টি হাসি আর দুষ্টুমি দিয়ে সে পুরো বাড়ির মানুষকে হাতের মুঠোয় পুরে রাখে।

ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টিকে খুব ভালোবাসত জিশান। তবে বৃষ্টি যখন আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করল, শৈশবের কোণ পেরিয়ে কৈশোরে পা দিল, জিশানের মনের ভেতরের সেই ভালোবাসার রূপটা যেন একটু একটু করে বদলাতে লাগল। যে বৃষ্টিকে সে কোলে পিঠে করে মানুষ হতে দেখেছে, সেই বৃষ্টির মিষ্টি মুখটা এখন তার চোখে এক অন্যরকম অনুভূতির আলো ছড়িয়ে দেয়। বৃষ্টির চোখের চঞ্চলতা, তার মিষ্টি বকবকানি আর ছোট ছোট অভিমানগুলো জিশানের বুকজুড়ে অদ্ভুত এক ভালোলাগার সৃষ্টি করত।

বৃষ্টিদের বাড়ি শহর ঘেঁষা এক এলাকায় হলেও, ছুটির দিন পেলেই বৃষ্টির মা, অর্থাৎ ছোট খালা, জিশানদের গ্রামে বেড়াতে চলে আসতেন। আর বৃষ্টি এলে জিশানের পুরো পৃথিবীটাই যেন নতুন করে সেজে উঠত। সারাদিন বৃষ্টির পিছু পিছু থাকা, তার খেয়াল রাখা—এটাই যেন হয়ে উঠত জিশানের মূল কাজ।

প্রতিবার বৃষ্টি এলে জিশান তাকে নিয়ে বের হতো ঘুরতে। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে রূপসা নদী। বিকেলের রোদ যখন মিষ্টি হয়ে নদীর পানিতে সোনার মতো ঝিকমিক করত, ঠিক তখন জিশান তার পুরোনো সাইকেলটা বের করত।

"বৃষ্টি, চল নদীর পাড়ে যাবি? ফুচকা খাবি?" জিশানের ডাক শুনেই বৃষ্টির মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

"হ্যাঁ, জিশান ভাইয়া! চল, চল!" বলে এক দৌড়ে এসে সাইকেলের পেছনে বসে পড়ত বৃষ্টি।

সাইকেলের পেছনে বসে বৃষ্টির ছোট দুটো হাত চেপে ধরে রাখত জিশানের জামা। কখনো কখনো হাওয়ায় বৃষ্টির এলোমেলো চুল এসে লাগত জিশানের পিঠে আর গালে। জিশানের হৃদস্পন্দন তখন যেন একটু দ্রুত হতে শুরু করত। কিন্তু পনেরো বছরের নিষ্পাপ বৃষ্টি সেসবের কিছুই বুঝত না। সে নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সাদা বকের দল দেখে হাত তালি দিত, গান গাইত।

নদীর ধারের ছোট্ট টং দোকানে বসে যখন তারা ফুচকা খেত, জিশান শুধু চুপচাপ বৃষ্টির খাওয়া দেখত। বৃষ্টির মুখে ঝাল লাগলে চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠত, আর সে হুট করে জিশানের দিকে তাকিয়ে বলত, "উফ ভাইয়া, অনেক ঝাল! পানি দাও, পানি!"

জিশান ব্যস্ত হয়ে পানি এগিয়ে দিত, পরম মমতায় রুমালে করে বৃষ্টির গালের ফুচকার টক পানি মুছে দিত।

"এত তাড়াহুড়ো করে খাস কেন? আস্তে খা," মৃদু হেসে বলত জিশান।

"তুমি বুঝতে পারবে না ভাইয়া! এত স্বাদের ফুচকা আস্তে খাওয়া যায় নাকি?" বৃষ্টির উত্তর শুনে জিশান শুধু একগাল হাসত। সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর মায়া বোঝার মতো বয়স বা পরিপক্বতা তখনো বৃষ্টির হয়নি। বৃষ্টি ভাবত, বড় ভাইয়া তাকে ছোট বোন হিসেবেই বুঝি এত আদর করে, এত ভালোবাসে।

নদীর পাড়ে বসে মিষ্টি বাতাসে বৃষ্টি যখন দুই পা পানিতে ডুবিয়ে খেলা করত, জিশান একটু দূরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত তার দিকে। বৃষ্টির এই চঞ্চলতা, এই নিষ্পাপ রূপটাই দিন দিন জিশানকে ব্যাকুল করে তুলছিল। সে জানত, বৃষ্টি এখনো অনেক ছোট। এই অনুভূতির কথা এখন প্রকাশ করা মানেই সবকিছু এলোমেলো করে দেওয়া। তাই জিশান নিজের মনের সব আবেগ, সব অনুরাগকে নিজের বুকের গহীনে আগলে রেখেছিল চুপচাপ।

সাঁঝের আলো নিভে যখন গ্রামে আঁধার নেমে আসত, তখন জিশান বৃষ্টিকে নিয়ে বাড়ি ফিরত। ফিরতি পথে সাইকেলের পেছনে বসে বৃষ্টি গল্প করত তার স্কুলের বন্ধুদের, তার শিক্ষকদের আর তার ছোট ছোট স্বপ্নের। জিশান হু-হা করে সায় দিত, আর মনে মনে ভাবত—এই মিষ্টি মেয়েটাকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা কি খুব বড় ভুল?

বাড়িতে ফেরার পর মেজো খালা আর ছোট খালা যখন একসাথে বসে রাতের রান্নার আয়োজন করতেন, জিশান উঠোনে বসে বৃষ্টির দিকে নজর রাখত। বৃষ্টি তখন ছোট খালার পাশে বসে টুকটাক কাজ করার ভান করত আর বকবক করত। ছোট খালা হেসে জিশানকে বলতেন, "দেখিস জিশান, তোর এই বোনটাকে নিয়ে আমি আর পারি না! সারাটা দিন তোকে জ্বালিয়ে মারল, তাই না?"

জিশান নরম গলায় উত্তর দিত, "না খালা, বৃষ্টি তো কোনো কষ্ট দেয় না। ও থাকলে ঘরটা জীবন্ত লাগে।"

মেজো খালাও হেসে বলতেন, "তা ঠিক। বৃষ্টি না থাকলে তো আমাদের জিশান কথাই বলে না। ও এলেই ছেলেটার মুখে হাসি ফোটে।"

বড়দের এসব স্বাভাবিক কথাবাত্রার মাঝে জিশান আর বৃষ্টির সম্পর্কের এই নীরব সুরটা অলক্ষ্যেই বেজে চলত। বৃষ্টি তখনো খেয়ালি, সে বুঝতেই পারেনি যে তার এই 'জিশান ভাইয়া'র চোখের প্রতিটি চাউনিতে তার জন্য কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। এভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো, এক মিষ্টি অনুভূতির চাদরে ঢাকা পড়েছিল তাদের যৌথ স্মৃতিগুলো, যা সামনে আসা দিনগুলোতে আরও অনেক গভীর আর জটিল রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় ছিল।

সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলে। এক বছর কেটে গেল। বৃষ্টির বয়স এখন ষোলো, সে স্কুলের পাট চুকিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। জিশানের বয়স পঁচিশ, শহরের কোম্পানিতে চাকরিটা স্থায়ী হয়েছে। এই এক বছরে বৃষ্টির মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যেতে লাগল। সেই চঞ্চল, ধুলোবালি মেখে ঘুরে বেড়ানো ছোট মেয়েটি যেন হঠাৎ করেই একটু গম্ভীর হতে শুরু করল। তার চোখের দুষ্টুমির জায়গায় এখন স্থান নিয়েছে এক অজানা লজ্জা আর আড়ষ্টতা।

এবার ঈদের ছুটিতে বৃষ্টিদের পরিবার আবার জিশানদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এল। মেজো খালা আর ছোট খালা দুই বোন মিলে কত আয়োজন! তবে আগের মতো বৃষ্টি আর হুটহাট করে জিশানের সামনে ছুটে আসে না। জিশানের চোখের দিকে তাকালে এখন বৃষ্টির বুকটা কেমন যেন ছাঁৎ করে ওঠে।

বিকেলের দিকে জিশান বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখল, বৃষ্টি বারান্দার কোণে একা দাঁড়িয়ে ওড়নার খুঁট আঙুলে পেঁচাচ্ছে। পরনে তার হালকা নীল রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ, এলোমেলো চুলগুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে।

জিশান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, "কী রে বৃষ্টি, একা একা দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস? আজ নদীর পাড়ে যাবি না? ফুচকা খাবি না?"

বৃষ্টি হঠাৎ চমকে উঠে জিশানের দিকে তাকাল। জিশানের চওড়া বুক, ডাগর দুটি চোখ আর গম্ভীর মিষ্টি কণ্ঠস্বর যেন আজ বৃষ্টির মনে অন্যরকম দোলা দিল। বৃষ্টি চোখ নামিয়ে নিচু গলায় বলল, "না ভাইয়া... আজ আর বাইরে যাব না।"

জিশান অবাক হলো। যে মেয়ে নদীর পাড়ে যাওয়ার কথা শুনলেই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকত, সে আজ না করছে! জিশান বৃষ্টির আরও একটু কাছে এগিয়ে এল।

"কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ? নাকি আমার ওপর কোনো কারণে অভিমান করে আছিস?" জিশানের কণ্ঠে ঝরে পড়ল গভীর মায়া আর ব্যাকুলতা।

বৃষ্টি একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল, "না না, অভিমান করব কেন? তুমি... তুমি একটু দূরে গিয়ে কথা বলো তো জিশান ভাইয়া!"

"দূরে গিয়ে কথা বলব মানে? আগে তো তুই আমার এত কাছে এসে কথা বলতিস, আজ আবার কী হলো?" জিশান মুচকি হেসে বৃষ্টির মুখোমুখি দাঁড়াল।

বৃষ্টির হৃৎপিণ্ড তখন হাতুড়ি পেটার মতো লাফাচ্ছিল। জিশানের উপস্থিতিতে তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সত্যি বলতে, বৃষ্টি কিছুদিন ধরে একটা বিষয় খেয়াল করছিল। জিশান যখন তার দিকে তাকায়, সেই চাহনি আর দশটা ভাইয়ের মতো সাধারণ নয়। সেই চোখে থাকে এক গভীর তৃষ্ণা, অগাধ ভালোবাসা আর অদ্ভুত এক অধিকারবোধ। বৃষ্টি এখন আর ছোট নেই, সে বুঝতে শিখছে। নিজের রক্তের সম্পর্কের চেয়েও এই খালাতো ভাইয়ের ভালোবাসা যে সম্পূর্ণ অন্য রূপ নিয়েছে, তা বুঝতে বৃষ্টির আর বাকি রইল না।

বৃষ্টির মনেও যেন এক অজানা সুর বাজতে শুরু করেছিল। সেও কি জিশানকে একটু একটু পছন্দ করতে শুরু করেছে? কিন্তু এই ভাবনার পরপরই তার মনে এসে চেপে বসত তীব্র এক ভয়। জিশান তার বড় খালাতো ভাই, পুরো নয় বছরের বড়! পরিবারে সবাই জিশানকে কতটা শ্রদ্ধা করে। এই কথা জানতে পারলে সমাজ আর পরিবার কী বলবে? বাবার কড়া শাসন আর পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে বৃষ্টির হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসত।

সেই সন্ধ্যায় জিশান আবার চেষ্টা করল বৃষ্টির সাথে একা কথা বলার। বৃষ্টি তখন রান্নাঘরের পেছনে টিউবওয়েলে হাত-মুখ ধুতে গিয়েছিল। সাঁঝের আবছা আলোয় চারপাশটা নিঃশব্দ। জিশান আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।

"বৃষ্টি," জিশান নরম গলায় ডাকল।

বৃষ্টি চমকে উঠে বলল, "তুমি এখানে? কেউ দেখে ফেলবে তো ভাইয়া!"

"দেখুক। তুই ইদানীং আমাকে এড়িয়ে চলছিস কেন বৃষ্টি? আমার দিকে তাকাচ্ছিস না কেন?" জিশানের গলার আওয়াজটা এক অদ্ভুত আক্ষেপে ভারী হয়ে উঠল।

বৃষ্টি নিচু মুখে দাঁড়িয়ে রইল, নিজের ওড়নাটা শক্ত করে চেপে ধরে।

জিশান আরও একধাপ এগিয়ে এসে বৃষ্টির খুব কাছাকাছি দাঁড়াল। বৃষ্টির সুবাস পাচ্ছিল সে। জিশান আর নিজেকে সামলাতে না পেরে খুব সাবধানে বৃষ্টির ডান হাতটা নিজের মুঠোয় নিল।

জিশানের উষ্ণ হাতের ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই বৃষ্টির পুরো শরীরে যেন এক বিজলি তরঙ্গ খেলে গেল। সে শিরশির করে উঠল।

"ভাইয়া... ছেড়ে দাও, প্লিজ..." বৃষ্টির গলা দিয়ে কাঁপা কাঁপা আওয়াজ বের হলো।

"ছাড়ব না," জিশান ফিসফিস করে বলল, তার চোখ বৃষ্টির চোখে আবদ্ধ। "তুই কি সত্যিই বুঝতে পারিস না বৃষ্টি? আমি তোকে কতটা ভালোবাসি? শুধু ভাই হিসেবে নয়... অন্যভাবে। অনেক বছর ধরে এই কষ্টটা বুকে চেপে রেখেছি।"

জিশানের মুখ থেকে সরাসরি এই স্বীকারোক্তি শুনে বৃষ্টির নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। তার হৃদস্পন্দন এত জোরে হচ্ছিল যে জিশানও হয়তো তা শুনতে পাচ্ছিল। বৃষ্টির নিজের মনও বলছিল জিশানের এই ভালোবাসা মেনে নিতে, তার বুকে মাথা গুঁজতে। কিন্তু একই সাথে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয় তাকে চেপে ধরল। বড় ভাইয়ের প্রতি এই অনুভূতি প্রকাশ করা যে কত বড় ঝুঁকি, তা ভেবে সে কেঁপে উঠল।

"না ভাইয়া... এসব তুমি কী বলছ! এসব কথা আর কখনো বলবে না। মা বা বাবা শুনলে আমাদের মেরে ফেলবে। তুমি আমার বড় ভাইয়া..." বৃষ্টি হাতটা ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে বলল।

কিন্তু বৃষ্টির চোখে ফুটে ওঠা লজ্জার আভা আর থরথর করে কাঁপা দেখে জিশান বুঝে গেল—বৃষ্টি কিন্তু তাকে অস্বীকার করছে না, সে শুধু ভয় পাচ্ছে। জিশানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিজয়ের হাসি।

জিশান বৃষ্টির হাতটা ছেড়ে দিয়ে তার খুব কাছে ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল, "ভাইয়া বলতে হয় বল, কিন্তু তোর এই চোখ দুটো কখনো মিথ্যা বলতে পারে না বৃষ্টি। তুইও আমাকে ভালোবাসিস, শুধু স্বীকার করার সাহস পাচ্ছিস না। তবে মনে রাখিস, জিশান অন্য কাউকে তোর জীবনে আসতে দেবে না।"

কথাটি বলেই জিশান ধীর পায়ে সেখান থেকে সরে গেল। আর বৃষ্টি রূপসার হিমেল বাতাসে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে টিউবওয়েলের পাড়েই বসে পড়ল। তার বুকের ভেতর তখন ভালোবাসার নতুন জোয়ার আর একরাশ আশঙ্কার ঝড় একসাথে তোলপাড় করছিল।

দিনগুলো নিজের গতিতে বয়ে যেতে লাগল। জিশানের সেই সন্ধ্যার মিষ্টি আর গম্ভীর স্বীকারোক্তির পর থেকে বৃষ্টির জীবন যেন এক রূপকথার গোলকধাঁধায় পড়ে গেল। নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন সে নিজেকে দেখত, তার মনে হতো সে আর সেই আগের ছোট বৃষ্টি নেই। জিশানের ভালোবাসার স্পর্শ আর সেই রহস্যময় চাহনি তার পুরো অস্তিত্বজুড়ে মিশে গেছে।

সে জিশানকে ভালোবাসে, মনে মনে বহুবার এই সত্যটা সে স্বীকার করেছে। কিন্তু মুখে বলতে গেলেই এক অদৃশ্য দেয়াল এসে দাঁড়ায়। একে তো জিশান তার বড় খালাতো ভাই, তার ওপর পুরো নয় বছরের বড়! আর সবচেয়ে বড় কথা হলো বৃষ্টির বাবা। অত্যন্ত কড়া আর নীতিবান মানুষ তিনি। পরিবারের মধ্যে কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক কিছু তিনি বিন্দুমাত্র সহ্য করেন না। এই ভয়েই বৃষ্টি জিশানের সামনে নিজেকে গুটিয়ে রাখত।

এমনই এক সময়ে পরিবারে এল এক বড় উৎসবের উপলক্ষ। মেজো খালা আর ছোট খালার বড় ভাই, অর্থাৎ জিশান আর বৃষ্টির বড় খালার ছেলের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বড় মামার বাড়ি শহরের অন্য মাথায়, বিশাল এক দোতলা পুরোনো বাড়ি। বিয়ের উপলক্ষে পরিবারের সব আত্মীয়স্বজন সেখানে এসে হাজির হতে লাগল।

মেজো খালা, ছোট খালা, তাদের ছেলেমেয়েরা—সবাই একসাথে বড় খালার বাড়িতে গিয়ে উঠল। জিশান তার অফিসের কাজ গুছিয়ে দু-একদিন পরেই সেখানে যোগ দিল। বৃষ্টি যখন দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে রঙিন লাইটের সাজসজ্জা দেখছিল, ঠিক তখনই নিচে গাড়ি থামল আর গাড়ি থেকে নামল জিশান।

সাদা পাজামা আর নীল পাঞ্জাবিতে জিশানকে অসাধারণ দেখাচ্ছিল। জিশান গাড়ি থেকে নেমেই সোজা ওপরের দিকে তাকাল। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টিকে দেখেই তার মুখে ফুটে উঠল এক অপরূপ হাসি। বৃষ্টি থমকে গেল, তার বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় করে উঠল। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে ঘরের ভেতরে চলে এল।

বিয়ের বাড়ির উৎসব আর আনন্দে ঘর গমগম করছে। চারদিকে হইচই, মেহমানদের আনাগোনা, রান্নাবান্নার হাঁকডাক আর গান-বাজনা। এত মানুষের ভিড়েও জিশানের চোখ সব সময় খুঁজে বেড়াত কেবল বৃষ্টিকেই।

হলুদের দিন সন্ধ্যায় পুরো বাড়ি যখন আলোয় ঝলমল করছিল, সব মেয়েরা হলুদ রঙের শাড়ি পড়ে সাজছিল। বৃষ্টিও একটা কাঁচা হলুদ রঙের সুতি শাড়ি পরেছিল, চুলে গাজরার মালা জড়ানো। সাধারণ সজ্জাতেও তাকে অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল। জিশান এক ফাঁকে ভিড় এড়িয়ে এসে দাঁড়াল দোতলার সিঁড়ির গোড়ায়, যেখান দিয়ে বৃষ্টি নিচে নামছিল।

বৃষ্টি নামতেই জিশান তার পথ আগলে দাঁড়াল।

"সরো জিশান ভাইয়া, নিচে সবাই অপেক্ষা করছে," বৃষ্টি নিচু গলায় বলল, চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিতে চাইল কেউ দেখছে কি না।

জিশান কোনো কথা না বলে বৃষ্টির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেট থেকে একটা লাল গোলাপ বের করে বৃষ্টির দিকে বাড়িয়ে দিল।

"আজ তোকে অনেক সুন্দর লাগছে বৃষ্টি। সত্যি বলছি, আমার চোখ ফেরানো যাচ্ছে না," জিশানের কণ্ঠস্বর ছিল গভীর আর অনুভবে ভরা।

বৃষ্টির বুকের ভেতর আবার সেই পরিচিত তোলপাড়। সে হাত বাড়িয়ে গোলাপটা নিল না, বরং কাঁপা গলায় বলল, "তুমি পাগল হয়ে গেছ ভাইয়া! বড় মামা বা বাবা দেখলে কী হবে বোঝো?"

"দেখুক। আমি কাউকে ভয় পাই না বৃষ্টি," জিশান ধীর পায়ে বৃষ্টির আরও একধাপ কাছে এল। "আমি শুধু তোর ওই ভীরু মনটাকে ভয় পাই। বল না, তুইও কি আমায় ভাবিস না? তোর ওই চোখের পানে তাকালেই আমি উত্তর পেয়ে যাই।"

বৃষ্টি কোনোমতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু তার হাত-পা তখনো কাঁপছিল। পকেটে রাখা গোলাপটি সে নিতে না পারলেও, জিশানের ভালোবাসার গন্ধটা যেন তার চুলে জড়ানো গাজরার সুবাসের সাথে মিশে গিয়েছিল।

পরদিন বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। সারাদিন ধরে নানা ধকল আর আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত যখন গভীর হলো, তখন মেহমানে গিজগিজ করা বাড়িতে এক নতুন বিপত্তি দেখা দিল। এত মানুষের শোয়ার জায়গা হবে কোথায়?

বড় খালা সিদ্ধান্ত নিলেন, দোতলার বড় যে ড্রয়িংরুমটা আছে, সেখানে ঢালাও বিছানা পেতে সব তরুণ-তরুণী আর ছোটদের এক সাথে শুতে দেওয়া হবে। বিশাল সেই ঘরের মেঝেতে সারি সারি তোশক আর তোশক পেতে বালিশ সাজিয়ে দেওয়া হলো।

বৃষ্টি তার এক মামাতো বোনের সাথে তোশকের একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিনের খাটাখাটুনিতে সবাই ভীষণ ক্লান্ত ছিল, তাই আলো নেভানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সবাই গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। ঘরের ভেতরে শুধু জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলো আর বাইরের নিভু নিভু বাতির আবছা নীল আলো খেলা করছিল।

রাত তখন প্রায় দুটো। ঘরের নীরবতা ভাঙছিল কেবল অনেকের সুষম নিঃশ্বাসের শব্দে। বৃষ্টি আধো ঘুমে ছিল, হঠাৎ অনুভব করল তার ঠিক পাশের খালি জায়গাটাতে কেউ একজন এসে সাবধানে শুয়ে পড়েছে।

গন্ধটা খুবই চেনা—সেই রজনীগন্ধা সেন্ট আর পুরুষের শরীরের নিজস্ব সুবাস। জিশান!

বৃষ্টির পুরো শরীর এক লহমায় শক্ত হয়ে গেল। জিশান তার ঠিক পাশে শুয়ে আছে, তাদের মাঝে হাতখানেক দূরত্বও নেই! বৃষ্টি ভয়ে আর লজ্জায় চোখ বন্ধ করে শ্বাস চেপে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পরিবারের কেউ জেগে যাবে, এই বুঝি সব জানাজানি হয়ে যাবে! কিন্তু সেই ভয়ের নিচেই যেন এক তীব্র, অদম্য আকর্ষণ অলক্ষ্যে তার হৃদয়কে তোলপাড় করে দিচ্ছিল।

রাত যত গভীর হতে লাগল, ঘরের নীরবতা যেন ততটাই ভারী হয়ে উঠল। আলো-আঁধারির সেই নীরবতায় পাশাপাশি শুয়ে থাকা দুজন মানুষের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। বৃষ্টির নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। সে একপাশে কাত হয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রইল, যেন ঘুমিয়ে থাকার ভান করছে। কিন্তু তার থরথর করে কাঁপা শরীর গোপন রাখতে পারছিল না তার ভেতরের তোলপাড়।

জিশান জানত বৃষ্টি জেগে আছে। আধো চাঁদের আলো জানলা দিয়ে এসে বৃষ্টির মুখে পড়েছে। জিশানের আর ধৈর্য রইল না। এত বছর ধরে আগলে রাখা ভালোবাসার বাঁধ যেন এই গভীর রাতে এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। জিশান ধীরে ধীরে বৃষ্টির আরও কাছে সরে এল। তাদের শরীরের মাঝের সামান্য দূরত্বটুকু মিটে গেল।

জিশানের উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে লাগল বৃষ্টির ঘাড়ে আর কানে। বৃষ্টি শিউরে উঠল। সে শক্ত হয়ে শুয়ে রইল, কিন্তু সরতেও পারল না।

জিশান খুব সাবধানে তার একটি হাত বাড়িয়ে দিল বৃষ্টির কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। বৃষ্টির পিঠ এসে ঠেকল জিশানের চওড়া বুকে। জিশানের স্পর্শে রক্তের ছন্দ যেন বদলে গেল। বৃষ্টির হাত দুটো নিজের বুকের কাছে শক্ত করে চেপে রাখা।

"বৃষ্টি..." জিশান খুব নিচু, অদ্ভুত এক মোহাচ্ছন্ন স্বরে চিস্কার না করে ফিসফিস করে ডাকল।

বৃষ্টির মুখে কোনো ভাষা এল না। সে শুধু ছোট একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল।

জিশান তার মুখটা বৃষ্টির ঘাড়ের কাছে নামিয়ে আনল। বৃষ্টির খোলা চুলে মুখ গুঁজে গভীরভাবে শ্বাস নিল। তারপর পরম মায়ায় আর গভীর ভালোবাসায় বৃষ্টির নরম গালে আর ঘাড়ে নিজের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া দিল।

এক অদ্ভুত অনুভূতিতে বৃষ্টির শরীর যেন অবশ হয়ে এল। কোনো প্রতিবাদ সে করতে পারল না। জিশানের ঠোঁটের সেই অনুতপ্ত অথচ তীব্র স্পর্শ বৃষ্টির মনের সব দ্বিধা, সব ভয়কে এক নিমেষে উধাও করে দিল। বৃষ্টি বুঝতে পারল, এই পুরুষটিকেই সে তার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে।

জিশান সাবধানে বৃষ্টিকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করল। চাঁদের আলোয় বৃষ্টির ভেজা, লজ্জাতুর চোখ দুটো জিশানের চোখে গিয়ে পড়ল। বৃষ্টি আর চোখ সরাতে পারল না। জিশান তার এক হাত দিয়ে বৃষ্টির গাল স্পর্শ করে চোখের কোণের একবিন্দু অশ্রু মুছে দিল।

"আমায় ভয় পাস না বৃষ্টি," জিশান ফিসফিস করে বলল, "আমি তোকে কখনো কষ্ট দেব না। তুই শুধু বল, তুই আমার?"

বৃষ্টি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আলতো করে জিশানের বুকের ওপর নিজের হাত দুটি রাখল। মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তারপর লজ্জা আর পরম আশ্রয়ের ব্যাকুলতায় মুখ গুঁজে দিল জিশানের চওড়া বুকে। জিশান দুই বাহু দিয়ে বৃষ্টিকে আগলে নিল, ঠিক যেমন করে কোনো মহামূল্যবান ধনকে আগলে রাখে মানুষ।

সারারাত দুজন পাশাপাশি শুয়ে রইল। কথা না হলেও, সেই নিরবতার মাঝেই তাদের হৃদয়ের সব কথা বলা হয়ে গিয়েছিল। জিশানের প্রতিটি স্পর্শ, তার বুকের উষ্ণতা আর ভালবাসার গভীরতা বৃষ্টিকে এক নতুন জগতে নিয়ে গেল। যে বৃষ্টি কিছুদিন আগেও জিশানকে শুধু বড় ভাই ভেবে ভয় পেত, সেই বৃষ্টি আজ জিশানের ভালোবাসার সাগরে নিজেকে সঁপে দিল।

ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে জিশান খুব সাবধানে বৃষ্টিকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে বৃষ্টির কপালে এক দীর্ঘ মিষ্টি চুমু এঁকে দিয়ে গেল।

সকালে যখন সবাই ঘুম থেকে উঠল, বৃষ্টির চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল এক নতুন আলো। সেই লাজুক চাউনি আর ঠোঁটের কোণের মৃদু হাসি দেখে জিশানের বুঝতে বাকি রইল না যে, তাদের মাঝের সেই পুরোনো 'ভাই-বোনের' দূরত্ব আজ চিরতরে মুছে গেছে। তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক গভীর, নিবিড় আর ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।

বিয়ের উৎসব শেষ করে সবাই যার যার বাড়িতে ফিরে এল। কিন্তু জিশান আর বৃষ্টির জীবন আর আগের মতো রইল না। সেই রাতের পর থেকে তাদের ভালোবাসার রঙ আরও গভীর, আরও গাঢ় রূপ নিল। গ্রামে ফিরলেও জিশানের মন পড়ে থাকত শহরে বৃষ্টির কাছে, আর বৃষ্টিও সারাদিন জিশানের ফোনের অপেক্ষায় প্রহর গুনত।

এখন আর তাদের মাঝে কোনো লজ্জা বা দ্বিধার দেয়াল ছিল না। জিশান নিয়মিত ফোন করত, কাজের ফাঁকে ভিডিয়ো কলে বৃষ্টির মিষ্টি মুখটা দেখে নিত। বৃষ্টিও তার পড়াশোনা, প্রতিদিনের ছোটখাটো ঘটনা আর মনের জমানো সব কথা জিশানের কাছে উজাড় করে দিত। জিশান যখনই ছুটি পেত, কোনো না কোনো বাহানায় বৃষ্টিদের বাড়িতে হাজির হতো। লুকিয়ে দেখা করা, হাত ধরে অল্প কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যাওয়া আর চুপিচুপি ভালোবাসার কথা বিনিময়—এভাবেই কাটছিল তাদের মিষ্টি দিনগুলো।

কিন্তু সুখের দিন যেন বেশি স্থায়ী হতে চাইল না।

বৃষ্টির বাবা ছিলেন অত্যন্ত কড়া স্বভাবের মানুষ। তার নীতি আর শাসনের কাছে পুরো পরিবার থরথর করে কাঁপত। তিনি হঠাৎ করেই খেয়াল করলেন, মেয়েটি ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছে। আগের মতো পড়ালেখায় মন নেই, সারাদিন ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকে, একা একা হাসি-খুশি থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, জিশান এলেই বৃষ্টির মধ্যে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা আর লজ্জা দেখা যায়।

একদিন দুপুরে বৃষ্টি তার ঘরের দরজা বন্ধ করে জিশানের সাথে ফোনে কথা বলছিল। জিশান বলছিল, "বৃষ্টি, সামনের মাসে তোকে নিয়ে আবার রূপসা নদীর পাড়ে যাব। এবার কিন্তু তোকে আমার ভালোবাসার সবটুকু হিসাব বুঝিয়ে দিতে হবে।"

বৃষ্টি হেসে উঠে বলল, "হ্যাঁ জিশান, তুমি শুধু এসো... আমি তো তোমারই অপেক্ষায়—"

কথাটা পুরো শেষও করতে পারল না বৃষ্টি। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘরের দরজা খুলে গেল! দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন বৃষ্টির বাবা, তার মুখ রক্তবর্ণ, চোখে আগুনের স্ফুলিঙ্গ।

বৃষ্টি ভয়ে এক লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, হাতের ফোনটা থরথর করে কাঁপতে লাগল।

"কার সাথে কথা বলছিলি তুই এতক্ষণ?" বাবা গর্জে উঠলেন।

"বাবা... এমনি... এক বান্ধবীর সাথে—" বৃষ্টি মিথ্যা বলার চেষ্টা করল।

কিন্তু বাবা কোনো কথা না শুনে এক ঝটকায় বৃষ্টির হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলেন। কল হিস্ট্রি আর কল রেকর্ডিং দেখতেই তার চোখ কপালে উঠল। জিশানের নাম আর তাদের গভীর প্রেমালাপ দেখে বাবার রাগ সপ্তমে চড়ল।

তিনি এক ঠাস করে বৃষ্টির গালে চড় বসিয়ে দিলেন। "নির্লজ্জ মেয়ে! নিজের খালাতো ভাইয়ের সাথে এসব করার সাহস তোর হলো কীভাবে? জিশান তোর বড় ভাই লাগে, ছিঃ! পরিবারে মুখ দেখানোর আর জায়গা রাখলি না!"

বৃষ্টি গাল চেপে ধরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।

বৃষ্টির বাবা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বৃষ্টির ফোনটা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিলেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন। ঘোষণা দিলেন, "আজ থেকে এই মেয়ের বাইরে বের হওয়া বন্ধ! পড়ালেখা বন্ধ! কোনো ফোনের ছোঁয়াও পাবে না সে।"

বাড়ির বাকিরা—এমনকি বৃষ্টির মা-ও স্বামীর এই রূপ দেখে টু শব্দ করার সাহস পেলেন না। ছোট খালা কাঁদছিলেন, কিন্তু কড়া স্বামীর শাসনের সামনে তিনিও ছিলেন সম্পূর্ণ অসহায়।

এদিকে হঠাৎ করে বৃষ্টির ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জিশান উৎকণ্ঠায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। বার বার চেষ্টা করেও কোনো যোগাযোগ করতে পারছিল না সে। তার বুকের ভেতর কু ডেকে উঠল—তবে কি তাদের গোপন ভালোবাসার কথা জেনে গেছে সবাই? বৃষ্টি কি কোনো বিপদে পড়ল? ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয় আর অস্থিরতা জিশানের মনকে এক মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড করে দিল।

দিনগুলো কেটে যেতে লাগল একেকটি দীর্ঘ অভিশাপের মতো। প্রায় এক মাস পার হয়ে গেছে, কিন্তু জিশান আর বৃষ্টির মাঝে কোনো যোগাযোগ নেই। জিশান যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিল। না পারছে কাজে মন দিতে, না পারছে রাতে ঘুমাতে। অসীম দুশ্চিন্তা আর না-দেখার তীব্র যন্ত্রণায় জিশানের শরীর ভেঙে পড়েছিল। অন্যদিকে, ঘরের চারদেয়ালে বন্দি বৃষ্টি কেঁদে কেঁদে নিজের চোখের জল শুকিয়ে ফেলেছে। তার একমাত্র সঙ্গী ছিল ঘরের জানলা, যেখান দিয়ে সে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে জিশানের মুখটা কল্পনা করত।

অবশেষে আর কোনো উপায় না দেখে জিশান এক মারাত্মক ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে সরাসরি বৃষ্টির বাড়িতে যাওয়ার সাহস করল। সে জানত বৃষ্টির বাবা কড়া স্বভাবের মানুষ, কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেওয়ার চেয়ে যেকোনো পরিণতি মেনে নেওয়া জিশানের কাছে শ্রেয় মনে হলো।

সেদিন ছিল শুক্রবার। ভাগ্যবশত বৃষ্টির বাবা কোনো এক কাজের সূত্রে ঢাকার বাইরে গিয়েছিলেন। সেই সুবর্ণ সুযোগটা কাজে লাগাল জিশান। সে সোজা বৃষ্টির বাড়িতে এসে হাজির হলো।

দরজা খুললেন জিশানের ছোট খালা, অর্থাৎ বৃষ্টির মা। জিশানের শুকিয়ে যাওয়া মুখ আর চোখের নিচের কালি দেখে ছোট খালা চমকে উঠলেন। জিশান কোনো কথা না বলে সোজাসুজি ছোট খালার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার মতো নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

"এ কী করছিস জিশান! ভিতরে আয়!" ছোট খালা আকুল হয়ে তাকে ঘরের ভেতর টেনে নিলেন।

জিশান ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল এবং ছোট খালার দুটো হাত শক্ত করে ধরে আকুতিভরা গলায় বলল, "খালা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। কিন্তু আমি আজ কোনো লুকোচুরি করতে আসিনি। আমি সোজাসুজি একটা কথা বলতে এসেছি—আমি বৃষ্টিকে ভালোবাসি। ও ছাড়া আমার এই জীবনে আর কোনো অর্থ নেই। আমি বৃষ্টিকে আমার স্ত্রী করে ঘরে তুলতে চাই খালা।"

জিশানের মুখ থেকে এমন স্পষ্ট ও সাহসী কথা শুনে ছোট খালা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।

"তুই এসব কী বলছিস জিশান? তোর খালু সব জেনে গেছে! ওনার রাগের কথা তো তুই জানিস। উনি তোর নাম শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। এই সম্পর্ক কখনোই মেনে নেবেন না উনি," ছোট খালা কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

"খালা, আমি জানি খালু কড়া মানুষ। কিন্তু আমার আর বৃষ্টির ভালোবাসা তো কোনো অপরাধ নয়! আমি তো বৃষ্টিকে সারাজীবন সম্মান আর সুখে রাখতে চাই," জিশান ব্যাকুল হয়ে বলল। "তুমি আমাকে সাহায্য করো খালা। তুমি না বললে খালু কোনোদিন আমাদের মেনে নেবেন না, আর ততোদিনে হয়তো বৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে।"

ছোট খালা জিশানের চোখের সত্যি ভালোবাসা দেখতে পেলেন। তিনি জানতেন জিশান কত ভালো ছেলে, তার ওপর কতটা ভরসা করা যায়। নিজের মেয়ের কান্না আর জিশানের এই কাতর বিনতি দেখে মায়ের হৃদয় গলে জল হয়ে গেল। তিনি বুঝলেন, স্বামীর একগুয়েমির কারণে দুটো জীবনের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

ঠিক এমন সময় ঘরের দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বৃষ্টি। এক মাস পর জিশানকে দেখে তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল। জিশান এক লাফে উঠে গিয়ে বৃষ্টির সামনে দাঁড়াল। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে, ভালোবাসার তীব্র আবেগে।

ছোট খালা চোখের জল মুছে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। জিশানের দিকে তাকিয়ে আবেগভরা গলায় বললেন, "জিশান, তোর খালু ফিরলে বৃষ্টির বিয়ে অন্য কোথাও জোর করে দিয়ে দেবে। তোদের এই ভালোবাসা বাঁচানোর একটা পথই খোলা আছে। তোরা পালিয়ে যা।"

জিশান আর বৃষ্টি যেন নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

ছোট খালা বৃষ্টির আলমারি থেকে কিছু জামাকাপড় আর তার জমানো কিছু গয়না একটা ব্যাগে গুছিয়ে জিশানের হাতে তুলে দিলেন। "তোর খালু ফেরার আগেই তোরা শহর ছেড়ে চলে যা জিশান। ও আমার মেয়েটাকে তোদের ভালোবাসার হাত থেকে কেড়ে নিতে দেবে না। তুই ওকে আগলে রাখিস বাবা, কখনো কষ্ট দিস না।"

বৃষ্টি তার মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ছোট খালা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে জিশানের হাত বৃষ্টির হাতে তুলে দিলেন। পরম মমতায় জিশান বৃষ্টির শক্ত করে হাত চেপে ধরল। পিছনের সব ভয়, বাধা আর সংসারের নিয়মকে পেছনে ফেলে, মায়ের দোয়ায় তারা একসাথে পা বাড়াল এক নতুন ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে—যেখানে শুধু তাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকবে।

ছোট খালার দেওয়া ব্যাগে সামান্য কিছু জামাকাপড় আর মায়ের আশীর্বাদ সম্বল করে তারা দ্রুত বের হয়ে এল বাড়ি থেকে। জিশান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। বৃষ্টির হাত শক্ত করে ধরে সোজা চলে এল বাসস্ট্যান্ডে। গন্তব্য চট্টগ্রাম—যেখানে জিশানের এক বিশ্বস্ত বন্ধু রাশেদ আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল।

বাসের পেছনের সিটে পাশাপাশি বসেছিল দুজন। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা আর মানসিক যন্ত্রণা শেষে জিশানের পাশাপাশি বসতে পেরে বৃষ্টির বুক থেকে যেন এক বিশাল পাথর নেমে গেল। জিশান আলতো করে বৃষ্টির হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে রাখল। বাসের জানলা দিয়ে আসা রাতের হিমেল বাতাসে বৃষ্টি ক্লান্তিতে জিশানের কাঁধে মাথা রাখল। জিশান পরম মায়ায় তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে পাওয়ার এই সুখানুভূতি তাদের সব কষ্ট এক নিমেষে ভুলিয়ে দিল।

ভোরবেলা বাস চট্টগ্রাম পৌঁছাল। জিশানের বন্ধু রাশেদ তাদের স্বাগত জানিয়ে নিজের এক নিভৃত ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। সব শুনে রাশেদ এক মুহূর্তও দেরি না করে একজন কাজী সাহেবকে ডেকে আনল।

সেই বিকেলেই খুব সাদামাটা কিন্তু পবিত্র এক আয়োজনে তাদের কাজি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলো। ছোট খালার দেওয়া সোনালি শাড়িতে বৃষ্টিকে এক অপূর্ব বধূবেশে লাগছিল। কাজীর দেওয়া কবুলনামায় স্বাক্ষর করার পর জিশান যখন বৃষ্টির কপালে সিঁদুরের মতো পবিত্রতার ছোঁয়া দিল, তখন বৃষ্টির চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের অশ্রু। এত বাধা-বিপত্তি, বাবার রক্তচক্ষু আর দীর্ঘ বিরহের পর তারা এখন আইনত ও ধর্মীয়ভাবে স্বামী-স্ত্রী।

রাশেদ তাদের ফ্ল্যাটটি তাদের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজের অন্য কাজে চলে গেল। নীরব, শান্ত সেই ফ্ল্যাটে তখন তারা দুজনেই কেবল বন্দি—এক নতুন জীবনের সূচনা পর্বে।

রাত ঘনিয়ে এল। ড্রয়িংরুমের আবছা বাতির আলোয় বধূবেশে খাটের কোণে বসে ছিল বৃষ্টি। তার পরনে লাল-সোনালি শাড়ি, মুখে লজ্জার মিষ্টি লাল আভা। জিশান ঘরের দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে ভেতরে এল। ঘরের নীরবতা ভেঙে জিশানের ধীর পায়ের শব্দে বৃষ্টির বুকের ভেতরটা আবার সেই চেনা ছন্দে হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল।

জিশান এসে বৃষ্টির পাশে বসল। খুব সাবধানে বৃষ্টির ঘোমটাটা সরিয়ে দিল সে। ভালোবাসার মানুষটিকে আজ পূর্ণাঙ্গ স্ত্রীরূপে দেখে জিশানের চোখ দুটো নেশাতুর আর মুগ্ধতায় ভরে উঠল।

"অবশেষে তুই আমার, বৃষ্টি," জিশান খুব নিচু, কাঁপানো গলায় ফিসফিস করে বলল।

বৃষ্টি লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। জিশান আলতো করে বৃষ্টির থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল বৃষ্টির ঠোঁটে।

সেই স্পর্শে বৃষ্টির পুরো শরীরে যেন ভালোবাসার এক উত্তপ্ত ঢেউ খেলে গেল। জিশান তার দুই বাহুতে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে একদম নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। দীর্ঘ এক মাসের বিরহ, যন্ত্রণা আর পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাদের সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্তে এক চরম রোমান্টিক আবেগের রূপ নিল। জিশানের উগ্র অথচ গভীর ভালোবাসার স্পর্শে বৃষ্টি নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল তার স্বামীর বুকে। সেই গভীর রাতে সব ভয়, লজ্জা আর সামাজিক বাধা বাষ্প হয়ে উবে গেল—রয়ে গেল কেবল দুজন মানুষের এক হওয়ার পবিত্র আর পরম সুখানুভূতি।

সেদিনের চরম ভালোবাসার রাতের পর সকালে যখন সূর্যের আলো ঘরের জানলা দিয়ে এসে পড়ল, জিশানের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল বৃষ্টি। জিশান চোখ খুলে তার কোলে ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রীর দিকে তাকাল। বৃষ্টির মুখে এক অদ্ভুত শান্তি আর তৃপ্তির ছাপ। জিশান আলতো করে বৃষ্টির কপালে চুমু খেয়ে তাকে ঘুম থেকে জাগাল। বৃষ্টি চোখ মেলেই জিশানের বুকে মুখ লুকাল একরাশ মিষ্টি লজ্জায়।

কিন্তু তাদের এই ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়ার আনন্দে একটা সূক্ষ্ম বিষাদের ছায়াও ছিল—পরিবারের বাকিদের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে বৃষ্টির বাবার রাগ এবং মায়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা তাদের মনে কিছুটা শঙ্কা জাগিয়েছিল।

বিয়ের দুই দিন পর জিশান সাহস করে ছোট খালাকে ফোন করল। ফোন ধরেই ছোট খালা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "তোরা কোথায় আছিস জিশান? তোরা ভালো আছিস তো?"

জিশান শান্ত গলায় বলল, "খালা, আমরা বিয়ে করেছি। বৃষ্টি এখন আমার স্ত্রী। তুমি কেঁদো না খালা, ও খুব ভালো আছে।"

ছোট খালা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি জানালেন, বৃষ্টির বাবা প্রথমে ভীষণ রেগে গিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, কিন্তু জিশানের মেজো খালা আর পরিবারের অন্য মুরুব্বিরা যখন সব শুনলেন, তখন তারা বৃষ্টির বাবার ভুল ভাঙাতে শুরু করলেন। জিশান কত ভালো ছেলে, পরিবারে তার সুনাম এবং বৃষ্টির প্রতি তার সত্য ভালোবাসার কথা চিন্তা করে মেজো খালা নিজেই ছোট বোনের স্বামীর সাথে কথা বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, জিশান আর বৃষ্টির এই সম্পর্ক কোনো ভুল কিছু নয়, বরং দুই পরিবারের বন্ধন আরও দৃঢ় হলো।

ধীরে ধীরে বৃষ্টির বাবার মনের বরফ গলতে শুরু করল। তিনি বুঝতে পারলেন, জোড়জবরদস্তি করে ভালোবাসাকে থামানো যায় না। তার একমাত্র মেয়ের সুখের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।

এর কিছুদিন পর, পরিবারের সবার সম্মতিতে জিশান আর বৃষ্টিকে বড় করে বরণ করে নিতে জিশানের গ্রামের বাড়িতে এক বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো। জিশান আর বৃষ্টি যখন গ্রামের বাড়িতে এসে নামল, তখন মেজো খালা আর ছোট খালা দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বরণডালা নিয়ে তাদের স্বাগত জানালেন। বৃষ্টির বাবাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জিশানের সামনে এসে দাঁড়াতেই জিশান ও বৃষ্টি এক সাথে তার পা ছুঁয়ে সালাম করল।

বৃষ্টির বাবা বৃষ্টির মাথায় হাত রেখে চোখের জল মুছে বললেন, "আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। তোর বাবার ভুল হয়েছিল। তোদের এই ভালোবাসা এত গভীর তা আমি বুঝতে পারিনি।"

জিশানকে জড়িয়ে ধরে তিনি বললেন, "আমার মেয়েটাকে তোর হাতেই সঁপে দিলাম জিশান, ওকেই সবসময় সুখে রাখিস।"

পরিবারের সবার মুখে তখন বিজয়ের আনন্দ আর খুশির হাসি। যে রূপসা নদীর পাড়ে জিশান আর বৃষ্টির শৈশব-কৈশোর কেটেছিল, সেই নদীর পাড়ে বৈকালের লাল রোদে আবার তারা দুজন গিয়ে দাঁড়াল। তবে আজ আর কোনো লুকোচুরি নেই, নেই কোনো ভীতি বা দ্বিধা। জিশান বৃষ্টির কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আনল, আর বৃষ্টিও জিশানের বুকে মাথা রেখে সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে লাগল।

ছোটবেলার সেই চঞ্চল মিষ্টি মেয়েটি আজ জিশানের জীবনের চিরদিনের অর্ধাঙ্গিনী।

....
👁 30