শ্রাবণ মাসের এক বৃষ্টিভেজা সকালে ঢাকা শহরের যানজট যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির কাচের ওপর রিমঝিম শব্দে ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে। পেছনের আসনে বসে আড়মোড়া ভেঙে হাতের দামি ঘড়িটার দিকে তাকাল আরহাম। সকাল নয়টা বেজে চল্লিশ। গুলশানের করপোরেট হেডকোয়ার্টারে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং শুরু হতে আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি। তবে আরহামের মুখে কোনো তাড়াহুড়ো বা দুশ্চিন্তার ছাপ নেই। আট বছর আগের সেই সাধারণ, অসহায় ছেলেটি আজ আর নেই। আজকের আরহাম চৌধুরী ‘চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর একক কর্ণধার, যার এক ইশারায় বাজারের শেয়ার ওঠানামা করে।
গাড়ির জানালাটা সামান্য নামিয়ে দিতেই স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ আর শিউলি ফুলের একটা পরিচিত সুবাস যেন ভেসে এল। এই গন্ধটা তাকে এক লহমায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল বারো বছর আগের সেই পুরোনো দিনগুলোয়—পুরোনো ঢাকার সেই কাঠালবাগানের গলিটায়।
পুরোনো ঢাকা তখন আরহামের জন্য ছিল এক মায়াময় জগৎ। আরহামের বাবা ছিলেন সরকারি হাইস্কুলের একজন সাধারণ কেরানি। টানাটানির সংসার হলেও অভাবের মধ্যে একরকম অদ্ভুত শান্তি ছিল। আর সেই শান্তিময় জীবনে ঝড়ের মতো আগমন ঘটেছিল অরিনের।
অরিন ছিল পুরান ঢাকার নামকরা ব্যবসায়ী আকরাম চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে। রাজকীয় তাদের জীবনযাত্রা, বিশাল লাল ইটের বাড়ি, আর উঠোনে দাঁড় করানো দুটো চকচকে গাড়ি। কিন্তু অরিনের মধ্যে ধনের কোনো অহংকার ছিল না। আরহামের সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিল মহল্লার এক মেলায়। আইসক্রিমের দোকানে টাকা কম পড়ে যাওয়ায় ছোট্ট অরিন যখন থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন নিজের টিফিনের জমিয়ে রাখা দশটা টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিল আরহাম।
সেই থেকে শুরু। তারপর আরহাম আর অরিন—দুটো নাম যেন একসাথে উচ্চারিত হতে লাগল।
বিকালের আলো পড়ে এলে তারা মহল্লার ছাদগুলোয় ঘুড়ি ওড়াত। অরিন যখন লাটাই ধরে রাখত, আরহামের চোখ থাকত আকাশের ঘুড়ির চেয়েও বেশি অরিনের মুখের ওপর। অরিনের খোলা চুলের সুবাস, মিষ্টি হাসি আর কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দে আরহামের কিশোর মন এক অদ্ভুত অনুভূতির সাগরে ভেসে যেত।
হাইস্কুলের গণ্ডি পার হতে হতে সেই ছোটবেলার নিছক মৈত্রী গভীর এক ভালোবাসায় রূপ নিল। অরিন তখন আঠারোর এক ডানাভাঙা পরী, যার চোখে উপচে পড়ত স্বপ্ন। আর আরহাম ছিল তার সেই স্বপ্নের একক রাজপুত্র।
বৃষ্টির এক বিকেলে, পুরান ঢাকার তাদের পুরোনো বাড়ির ছাদে হঠাৎ নামল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। সবাই যখন নিচে চলে গেছে, অরিন আর আরহাম দাঁড়িয়ে ছিল ছাদের এক কোনায়, পুরোনো এক আমগাছের ছায়ায়।
বৃষ্টির জল অরিনের মুখ বেয়ে গড়িয়ে নামছিল তার শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে। শাড়িটা শরীরের সাথে পেঁচিয়ে গিয়ে তার তরুণী রূপের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট করে তুলেছিল। আরহাম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
"এভাবে তাকিয়ে আছ কেন, আরহাম?" লজ্জা পেয়ে অরিন মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল। তার ঠোঁট দুটো ঠাণ্ডায় সামান্য কাঁপছিল।
আরহাম অরিনের একধাপ কাছে এগিয়ে এলো। অরিনের ভিজে যাওয়া একটা চুল আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ল অরিনের ঘাড়ের নরম চামড়ায়। অরিন চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল, এক অজানা শিহরণ খেলে গেল তার পুরো শরীরে।
"তোমাকে আজ খুব অন্যরকম লাগছে, অরিন," আরহাম গভীর গলায় বলল।
সে অরিনের কোমর পেঁচিয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। অরিনের বুকের ধুকপুকানি তখন আরহামের বুকের সাথে মিশে একাকার। আরহাম নিজের ঠোঁট দুটো অরিনের ভেজা কপালে স্পর্শ করল, তারপর আস্তে আস্তে নেমে এলো তার ভিজে যাওয়া গালে। অরিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, আরহামের শার্টের কলার শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
আরহাম যখন অরিনের লাল হয়ে ওঠা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল, তখন চারপাশের বৃষ্টির শব্দ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সেই প্রথম চুম্বন, সেই প্রথম শারীরিক স্পর্শ—দুজনকেই এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল। অরিনের হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে গিয়েছিল আরহামের চুলে, আর আরহাম অরিনের পিঠের খোলা অংশে নিজের আঙুলের পরশ দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরেছিল এক তীব্র তৃষ্ণায়। মিষ্টি, ব্যাকুল আর উদগ্র সেই ভালোবাসার মুহূর্তে তারা ভুলেই গিয়েছিল তাদের মাঝের অদৃশ্য দেয়ালটার কথা।
কিন্তু সেই দেয়ালটা একদিন সত্যি সত্যিই সামনে এসে দাঁড়াল। আরহামের বয়স তখন একুশ, অরিনের বিশ। তাদের এই গভীর সম্পর্কের কথা আর গোপন রইল না।
একদিন সন্ধ্যায় আরহামকে ডেকে পাঠানো হলো আকরাম চৌধুরীর বিশাল ড্রয়িংরুমে। আরহাম ভেবেছিল হয়তো তার যোগ্যতার কথা শুনে অরিনের বাবা তাদের মেনে নেবেন। কিন্তু বাস্তব ছিল ভীষণ নির্মম।
ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করা সেই রাজকীয় ড্রয়িংরুমে আকরাম চৌধুরী চুরুট টানছিলেন। আরহাম সালাম জানিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আকরাম চৌধুরী তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক অপমানজনক দৃষ্টিতে মেপে নিলেন।
"তোমার সাহস তো কম নয়, আরহাম!" শান্ত কিন্তু বিষাক্ত কণ্ঠে বললেন আকরাম চৌধুরী। "আমার চালের গোডাউনের এক বস্তা চালের দামও তোমার বাবার পুরো মাসের বেতনের চেয়ে বেশি। আর তুমি এসেছ আমার রাজকন্যাকে নিজের করতে?"
"চৌধুরী সাহেব, আমি অরিনকে ভালোবাসি। আমি নিজে কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করছি, আমি তাকে সুখে রাখব—"
"থামো!" গর্জে উঠলেন আকরাম চৌধুরী। "চাকরের ছেলে ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে রাজকন্যার সাথে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখে! তোমার যোগ্যতা কী? একটা ছেঁড়া জামা আর খালি পকেট ছাড়া তোমার আছে কী?"
আরহাম অরিনের দিকে তাকাল। অরিন ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল। সে কিছু বলতে চাইল, "আব্বু, প্লিজ—"
কিন্তু আকরাম চৌধুরী হাত তুলে অরিনকে থামিয়ে দিলেন। তারপর সোফা থেকে উঠে এসে আরহামের সোজা সামনে দাঁড়ালেন। টেবিল থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি তুলে নিয়ে সোজা আরহামের মুখে ছুঁড়ে মারলেন।
"এই পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে আয়নায় নিজের চেহারাটা ভালো করে দেখ, আরহাম চৌধুরী। তারপর ভেবে দেখ আমার বাড়ির পিয়নের কাজের যোগ্য তাও তুমি নও। আজ যদি আর কখনো আমার মেয়ের ধারেকাছে তোকে দেখি, তবে তোর বাবাকে রাস্তায় বসিয়ে দেব।"
সেই অপমান আর লজ্জায় আরহামের ভেতরের সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে উঠল আগ্নেয়গিরির মতো ক্ষোভ। সে মুখ মুছে অরিনের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। অরিনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সে বাবার বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।
আরহাম কোনো কথা বলল না। ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে বের হয়ে এল সেই চৌধুরী ভবন থেকে। বৃষ্টির জল আর মুখের অপমান মেশা জল এক হয়ে গড়িয়ে পড়ল তার চিবুক বেয়ে। সে সেদিন নিজের কাছে নিজের রক্তের শপথ করেছিল—এই শহরের বুকে সে এমন এক পরিচিতি তৈরি করবে, যার সামনে দাঁড়িয়ে ওই আকরাম চৌধুরীকেও মাথা নোয়াতে হবে।
সেই রাতের পরই আরহাম ঢাকা ছেড়ে চলে যায়। অরিন অনেক খুঁজেছিল, কিন্তু আরহামের পরিবার ততদিনে বাসা বদলে অন্য শহরে চলে গেছে। আরহাম নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল এক কঠিন খোলসে। দিনরাত এক করে পড়াশোনা, পার্টটাইম চাকরি, আর একের পর এক আইডিয়া নিয়ে কাজ করা—নিজের ঘুম, আরাম, অনুভূতির সবকিছুকে বিসর্জন দিয়েছিল সে।
আটটা বছর যেন কোনো রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে নয়, এক যন্ত্রের মতো কেটেছে আরহামের। তার ভেতরের কষ্টগুলোকে সে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিল। বহু রাতের ব্যর্থতা, ক্ষুধা আর একাকীত্ব তাকে দুমড়ে-মুচড়ে নতুন করে গড়েছে।
আর আজ, আট বছর পর, আরহাম চৌধুরী ঢাকার সবচেয়ে সফল তরুণ উদ্যোক্তা। যে আকরাম চৌধুরী তাকে অপমান করেছিলেন, আজ তাঁর ব্যবসার সিংহভাগ শেয়ারই কোনো না কোনোভাবে আরহামের পরোক্ষ অর্থায়নে চলে।
হঠাৎ ড্রাইভারের কথায় আরহামের ভাবনায় ছেদ পড়ল।
"স্যার, আমরা চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের সামনে চলে এসেছি। মিটিংয়ের সময় হয়ে গেছে।"
আরহাম নিজের দামি ব্লেজারটা ঠিক করে নিল। চোখে সেই পুরোনো ক্ষোভের বদলে এখন এক ঠান্ডা, ধারালো আত্মবিশ্বাস। সে গাড়ি থেকে নামল। আজ তাদের সাথে একটা বড় চুক্তির মিটিং, যেখানে তাদের মূল ক্লায়েন্ট হিসেবে হাজির থাকার কথা আকরাম চৌধুরীর প্রতিনিধির।
সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করতেই ঘরের সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল। কিন্তু আরহামের দৃষ্টি আটকে গেল মিটিং টেবিলের একদম শেষ প্রান্তে বসে থাকা এক নারীর ওপর।
হালকা নীল রঙের শাড়িতে মোড়া, হালকা মেকআপ আর বিষণ্ণ দুটি চোখ। আট বছরে একটুও বদলায়নি তার মুখের আদল, কেবল চোখের কোণে জম জমে থাকা গাম্ভীর্য ছাড়া।
অরিন।
অরিনও মুখ তুলে তাকাল। তাদের চার চোখ এক হতেই যেন ঘরের বাতাস থমকে গেল। অরিনের হাত থেকে ফাইলটা হাত গলে নিচে পড়ে গেল। অরিনের চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, অবিশ্বাস আর গভীর এক ব্যাকুলতা।
আরহাম ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কঠিন হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। মনে মনে বলল, ‘স্বাগতম অরিন। খেলা তো আজ মাত্র শুরু হলো।’
সম্মেলন কক্ষের শীতল বাতাসে তখন এক থমথমে নীরবতা। অরিনের হাতের ফাইলটা মেঝೆಗೆ পড়ে গিয়ে বেশ কিছু কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। সে দ্রুত নিচু হয়ে কাগজগুলো গোছানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার থরথর করে কাঁপা হাত দুটো তার ভেতরের ঝড়টাকে কোনোভাবেই লুকাতে পারছিল না।
আটটা বছর! দীর্ঘ আটটি বছর ধরে যে মানুষকে সে প্রতিটি প্রার্থনায় খুঁজেছে, যার চলে যাওয়ার পর তার নিজের জীবনটাও এক নিষ্প্রাণ পুতুলে রূপ নিয়েছিল, সেই আরহাম আজ তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এ কোন আরহাম? সেই মেসের সাধারণ শার্ট পরা, মায়াবী চোখের শান্ত ছেলেটি কোথায়?
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির পরনে রাজকীয় স্যুট, চোখে একধরনের শীতল, ধারালো দৃষ্টি—যা দিয়ে যেন চারপাশের সবকিছুকে মেপে নিচ্ছেন তিনি।
আরহাম এক মুহূর্তের জন্যও নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল না। সে অত্যন্ত শান্ত পায়ে হেঁটে গিয়ে মিটিং টেবিলের প্রধান চেয়ারটিতে গিয়ে বসল।
"সবাই বসুন," আরহামের গম্ভীর কণ্ঠস্বর পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল।
অরিন কোনোমতে নিজের জায়গায় এসে বসল। তার হাত দুটো শাড়ির আঁচলের আড়ালে শক্ত করে বাঁধা। তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। আরহাম কি তাকে চিনতে পেরেও অচেনার ভান করছে? নাকি এই আট বছরে তার মন থেকে অরিন নামের অধ্যায়টাই মুছে গেছে?
উপস্থাপনা শুরু হলো। অরিনের বাবা আকরাম চৌধুরীর কোম্পানি 'চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ' আজ দেউলিয়া হওয়ার পথে। ব্যাংকের দেনা আর বাজারের বিশাল অঙ্কের ঋণে জর্জরিত হয়ে তারা আজ আরহামের কোম্পানির কাছ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাশী। অরিন আজ এখানে এসেছে তাদের কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে—নিজের বাবার সম্মান বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে।
পুরো উপস্থাপনা চলাকালীন আরহাম একবারের জন্যও অরিনের দিকে সরাসরি তাকাল না। সে মনোযোগ দিয়ে ফাইল দেখছিল আর মাঝে মাঝে ধারালো কিছু প্রশ্ন করছিল। অরিন কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিচ্ছিল। আরহামের প্রতিটা যুক্তির সামনে অরিন যেন ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছিল।
মিটিং শেষে সবাই যখন একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, অরিনও ফাইল গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল।
"মিস অরিন চৌধুরী, আপনি একটু থাকুন। চুক্তির কিছু ব্যক্তিগত শর্ত নিয়ে কথা আছে।" আরহামের কণ্ঠ শুনে অরিনের পা দুটো মেঝেই আটকে গেল।
অন্য সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই দরজাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। বিশাল ঘরে এখন শুধু তারা দুজন।
আরহাম নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাত দিয়ে ধীর পায়ে অরিনের দিকে এগিয়ে এল। প্রতিটা পদক্ষেপে যেন অরিনের বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছিল। আরহাম অরিনের একদম কাছাকাছি এসে থামল।
"কেমন আছ, অরিন?" আরহামের গলায় কোনো রাগ বা ক্ষোভের তীব্রতা ছিল না, কেবল ছিল এক শীতল উপহাস।
অরিন মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে জল টলমল করছিল। "আরহাম... তুমি... তুমি এত বছর কোথায় ছিলে? একবারে এভাবে হারিয়ে গেলে কেন?"
আরহাম এক চিলতে হাসল। "হারিয়ে যাওয়া? না তো, আমি তো হারিয়ে যাইনি। আমি তো নিজেকে তৈরি করছিলাম। তোমার বাবা যে যোগ্যতা দেখতে চেয়েছিল, সেই যোগ্যতা অর্জন করার লড়াইয়ে ছিলাম। এখন বলো, তোমার কেমন লাগছে? চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের হবু মালিক আজ আমার সামনে করুণার পাত্রী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দৃশ্যটা বেশ সুন্দর, তাই না?"
অরিনের বুকটা শেলের মতো বিঁধল। সে জানত আরহামের কষ্ট পাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু তার এই কঠোর রূপ অরিনের সহ্য হচ্ছিল না।
"তুমি আমার ওপর রাগ করতে পারো আরহাম, আমাকে যা খুশি শাস্তি দিতে পারো। কিন্তু আমার আব্বুকে দোষ দিয়ো না। উনি যা করেছিলেন, একজন ধনী বাবা হিসেবে—"
"থামো!" আরহামের কন্ঠে চাবুকের মতো শব্দ হলো। সে এক পা এগিয়ে অরিনের আরও কাছে চলে এলো। তাদের মাঝে এখন ইঞ্চিখানেকের ব্যবধান। "বাবার দোহাই দেবে না অরিন। সেই রাতে উনি আমাকে অপমান করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তুমি? তুমি তো নীরব ছিলে। তুমি একটা বারও হাত ধরে বলতে পারোনি যে তুমি আমার পাশে দাঁড়াবে। তোমার ওই নিরবতাই আমাকে সেদিন ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।"
অরিন মাথা নিচু করে ডুকরে কেঁদে উঠল। "তুমি জানো না আরহাম, সেই রাতে কী ঘটেছিল... আমি কতটা অসহায় ছিলাম..."
"আমি কোনো অজুহাত শুনতে চাই না," আরহাম অরিনের থুতনি আলতো কিন্তু শক্তভাবে চেপে ধরে তার মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরল।
হঠাৎ করে এত কাছাকাছি আসায় অরিনের শ্বাস আটকে এল। আরহামের উষ্ণ নিঃশ্বাস অরিনের ঠোঁটে আছড়ে পড়ছিল। অরিনের বিষণ্ণ চোখের জল চিবুক বেয়ে গড়িয়ে নামল আরহামের আঙুলে। সেই স্পর্শে আরহামের কঠিন হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্য মোচড় দিয়ে উঠল।
অরিনের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। সেই পুরোনো পরিচিত সুবাস, সেই স্পর্শ। আরহামের আঙুল আস্তে আস্তে অরিনের থুতনি ছেড়ে তার গালের ওপর গড়িয়ে যাওয়া জলের ধারা মুছে দিল।
"এখনো তোমার কান্নায় আগের মতোই মায়া ঝরে পড়ে, তাই না?" আরহামের গলা খানিকটা নিচু হয়ে এল। সে অরিনের কানের কাছে নিজের মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "কিন্তু আরহাম চৌধুরী এখন আর মায়ায় ভোলে না।"
আরহাম হাত বাড়িয়ে অরিনের কোমরের শাড়ির ভাঁজ আলতো করে স্পর্শ করল। সেই স্পর্শে অরিনের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আট বছর পর এই প্রথম পুরুষের পরশ, তাও সেই মানুষের—যাকে সে নিজের আত্মার চেয়েও বেশি ভালোবেসেছে। অরিন নিজেকে সামলাতে না পেরে আরহামের কাঁধে হাত রাখল।
"আরহাম... প্লিজ..." অরিনের গলা জড়িয়ে এল এক তীব্র আকুলতায়।
আরহাম অরিনের দিকে তাকাল। অরিনের লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁট, ভেজা চোখ আর ব্যাকুল নিঃশ্বাস তাকে ব্যাকুল করে তুলছিল। সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। অরিনকে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। অরিনের স্ফীত বুক আরহামের শক্ত চওড়া বুকের সাথে পিষে গেল।
আরহাম তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল অরিনের ঘাড়ের নরম খাঁজে। অরিন তীব্র এক কামনায় চোখ বন্ধ করে আরহামের পিঠের শার্ট আঁকড়ে ধরল। আট বছরের জমে থাকা ক্ষুধা, যন্ত্রণা আর ভালোবাসা যেন এক নিমেষে বাঁধ ভাঙল। আরহাম অরিনের ঘাড় থেকে আস্তে আস্তে কানের লতিতে নিজের ঠোঁটের ছোঁয়া দিল, তারপর নেমে এলো তার কাঁপে থাকা ঠোঁটে।
উষ্ণ, তীব্র আর ব্যাকুল এক চুম্বনে দুজন হারিয়ে গেল। এটা কেবল ভালোবাসা ছিল না, এতে ছিল ক্ষোভ, অধিকার আর তীব্র তৃষ্ণা। অরিনও নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সাড়া দিল। সে আরহামের চুলে হাত বুলিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।
কয়েক মুহূর্ত পর, আরহাম হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে নিল। অরিনের শ্বাস তখন দ্রুত বইছিল, চোখ দুটো ঝাপসা।
আরহাম নিজের শার্টের কলার ঠিক করে একধাপ পিছিয়ে গেল। তার চোখে আবার সেই শীতলতা ফিরে এল।
"এই চুক্তিটা সই হবে," আরহাম গম্ভীর গলায় বলল। "তবে একটা শর্তে। আগামী কাল থেকে তুমি আমার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে এই অফিসে যোগ দেবে। তোমার বাবার কোম্পানির প্রতিটা ফাইলের হিসাব আমি তোমার হাত দিয়ে নেব। যদি রাজি থাকো, তবেই তোমার বাবার কোম্পানি বাঁচবে।"
অরিন হতবাক হয়ে তাকাল। আরহাম তাকে করুণা করছে না, তাকে নিজের কাছে টেনেও নিচ্ছে না—সে কেবল তাকে শাস্তি দিতে চাইছে।
"তুমি আমাকে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানাচ্ছ, আরহাম?" অরিন ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল।
"যা ইচ্ছা ধরে নিতে পারো," আরহাম দরজার দিকে হেঁটে গেল। "কাল সকাল নয়টায় আমি টেবিলে কফি দেখতে চাই, মিস চৌধুরী।"
আরহাম ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অরিন সেই খালি ঘরে একা দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁল। সেখানে এখনো আরহামের ঠোঁটের উত্তাপ লেগে আছে। চোখের জল মুছে অরিন মনে মনে ভাবল—যদি এই সজাগ শাস্তিই আরহামের ক্ষোভ মেটাতে পারে, তবে সে এই আগুনে পুড়তেও রাজি।
পরদিন সকাল আটটা পঁচিশ। আরহাম চৌধুরীর আলিশান কেবিনের বাইরে নিজস্ব ডেস্কে নিঃশব্দে বসে আছে অরিন। পরনে সাধারণ একখানা সুতির সালোয়ার-কামিজ, চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। কাল সারা রাত তার চোখের পাতা এক হয়নি। একপাশে বাবার করুণ মুখ আর কোম্পানির দেউলিয়া হওয়ার আতঙ্ক, অন্যদিকে আরহামের সেই নির্মম শর্ত আর আকস্মিক স্পর্শের শিহরণ—সব মিলে অরিনের ভেতরে তোলপাড় চলছে।
ঠিক কাঁটায় কাঁটায় নয়টায় লিফটের দরজা খুলে গেল। ধীর ও আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে করিডোর পেরিয়ে হেঁটে এলো আরহাম। নেভি ব্লু থ্রি-পিস স্যুট, নিখুঁতভাবে আঁচড়ানো চুল। অরিনের ডেস্কে চোখ পড়তেই তার হাঁটার গতি সামান্য কমলো, তবে পরক্ষণেই মুখে সেই চেনা শীতল গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনলো।
"আমার কফি কোথায়, মিস চৌধুরী?" আরহাম থামেনি, কথা বলতে বলতেই কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।
অরিন তড়িঘড়ি করে হাত বাড়ালো পাশে রাখা ট্রে-টার দিকে। ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফির কাপটা হাতে নিয়ে সে সাবধানে কেবিনে প্রবেশ করলো।
আরহাম ততক্ষণে বিশাল রিভলভিং চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে একটা ফাইলের ওপর চোখ বুলাচ্ছে। অরিন ট্রে থেকে কফির কাপটা নিয়ে ধীর পায়ে টেবিলের ওপর রাখল।
"আপনার কফি, স্যার।"
আরহাম ফাইল থেকে চোখ না তুলেই কফির কাপে চুমুক দিল। কিন্তু প্রথম চুমুক দেওয়ার সাথে সাথেই তার কপাল কুঁচকে গেল। সে কাপটা সশব্দে টেবিলে নামিয়ে রাখল।
"চিনি নেই কেন? আর কফি এতটা ঠাণ্ডা কেন?" আরহামের গলায় চাবুকের মতো কঠোরতা।
অরিন খানিকটা চমকে উঠে বলল, "আমি... আমি তো ফুটন্ত গরম পানি দিয়েই বানিয়েছি, স্যার। আর চিনি ছাড়া ব্লাক কফিই তো আপনি—"
কথা শেষ করার আগেই আরহাম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে অরিনের একদম মুখোমুখি এসে থামল।
"আমি আট বছর আগে কী খেতাম, তা মনে রাখার দরকার নেই মিস চৌধুরী। আট বছরে মানুষের স্বাদ, রুচি আর মন—সব বদলে যায়। আমার সহকারী হিসেবে কাজ করতে হলে আমার বর্তমান পছন্দ জানতে হবে।"
অরিন মাথা নিচু করে রইল। তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। সে জানত আরহাম ইচ্ছে করেই তাকে অহেতুক কড়া কথা শোনাচ্ছে, কেবল পুরোনো রাগ মেটানোর জন্য।
"আমি দুঃখিত, স্যার। আমি অন্য একটা বানিয়ে আনছি," অরিন কাপটা তুলতে গেল।
কিন্তু আরহাম হুট করেই অরিনের কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। হাতের সেই পরিচিত উষ্ণ ছোঁয়ায় অরিনের শরীর কেঁপে উঠল।
"এত সহজেই ভেঙে পড়ছ?" আরহামের গলার স্বর হঠাৎ নিচু হয়ে এলো, বিপজ্জনকভাবে নরম। "অথচ আট বছর আগে তো তোমাকে খুব শক্ত মনের মেয়ে বলে মনে হতো। বাবার এত বড় বড় কথা শুনেও যার মুখে একটা টু-শব্দ বের হয়নি।"
অরিন আরহামের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে রাগ, ক্ষোভ আর এক তীব্র যন্ত্রণা মিশে আছে।
"আরহাম... তুমি আমাকে এভাবে রোজ অপমান করতে পারো," অরিন ফিসফিস করে বলল, তার কন্ঠ জমে যাওয়া কান্নায় ভারী। "কিন্তু দয়া করে ভাবো না যে আমি কাঁদছি বলে আমি অপরাধী। আমি সেদিন বাধ্য ছিলাম..."
"বাধ্য?" আরহাম এক ঝটকায় অরিনকে নিজের কাছে টেনে আনল। অরিনের শরীর গিয়ে আছড়ে পড়ল আরহামের শক্ত বুকের ওপর। কফির কাপটা উল্টে গিয়ে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেদিকে কারও খেয়াল ছিল না।
আরহামের এক হাত অরিনের কোমর পেঁচিয়ে ধরল, আর অন্য হাতের আঙুলগুলো অরিনের চুলে জড়িয়ে গেল। অরিনের বুক উঠানামা করছিল তীব্র প্যানিকে আর এক অজানা ভালোবাসার টানে।
"কোন বাধ্যবাধকতা তোমাকে আটকে রেখেছিল, অরিন?" আরহাম অরিনের চোখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে গর্জে উঠল, অথচ গলার আওয়াজ রইল একদম নিচু। "একবার... শুধু একটা বার যদি তুমি আমার হাত ধরে বলতে, 'আরহাম তুমি যেয়ো না', তবে আমি পুরো দুনিয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও তোমাকে নিজের করে রাখতাম। কিন্তু তুমি চুপ ছিলে। তুমি তোমার বাবার সেই অঢেল টাকার কাছে আমার ভালোবাসাকে বিক্রি করে দিয়েছিলে!"
"না! ভুল... সব ভুল!" অরিন ডুকরে কেঁদে উঠে আরহামের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল। "তুমি যা ভাবছ তা সত্যি নয়! আব্বু আমাকে হুমকি দিয়েছিল আরহাম... উনি বলেছিলেন তুমি যদি সেদিন ঢাকা ছেড়ে না যাও, তবে উনি তোমার বাবাকে মিথ্যা কেসে ফাঁসিয়ে জেলে পাঠাবেন! তোমার বাবার সরকারি চাকরিটা কেড়ে নেবেন! আমি কী করতাম বলো? তোমার আর তোমার বাবার ভবিষ্যৎ বাঁচাতে আমাকে চুপ থাকতে হয়েছিল!"
অরিনের মুখ থেকে বের হওয়া এই কথাটা যেন কেবিনের নীরবতায় এক অদৃশ্য বোমা ফাটালো।
আরহাম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত অরিনের কোমরে সামান্য শিথিল হয়ে এলো। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো তীব্র অবিশ্বাস।
"কী বললে তুমি...?" আরহামের গলা কাঁপল।
অরিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। "আমি সত্যি বলছি আরহাম। সেই রাতে তুমি চলে যাওয়ার পর আব্বু আমাকে ঘরে আটকে রেখেছিল। তোমার ফোন বন্ধ ছিল। আমি তোমার মেসে গিয়েছিলাম, কিন্তু ততদিনে তোমরা বাসা খালি করে চলে গেছ। আমি প্রতিদিন কেঁদেছি আরহাম... প্রতিদিন..."
আরহাম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথায় তখন ঝড়ের মতো চিন্তা ঘুরছে। আকরাম চৌধুরী এতদূর নিচে নেমেছিলেন? কিন্তু পরক্ষণেই আরহামের ভেতরের সেই কঠিন খোলসটা আবার সজাগ হয়ে উঠল। সে আট বছর ধরে যে ঘৃণা আর ক্ষোভকে জ্বালানি বানিয়ে নিজেকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, সেই ভিত্তিটা এভাবে এক নিমেষে ধসে যেতে দিতে পারে না।
আরহাম অরিনের দিকে তাকাল। অরিনের গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট দুটো কামনায় আর যন্ত্রণায় কাঁপছে। তার ভিজে যাওয়া চোখের পাতা আর ব্যাকুল নিঃশ্বাস আরহামের ভেতরের সমস্ত সংযম ভেঙে চুরমার করে দিল। সত্যি হোক বা মিথ্যা, এই মুহূর্তে অরিন তার একদম কাছে, তার বাহুডোরে।
আরহাম কথা না বাড়িয়ে অরিনের চিবুক ধরে নিজের দিকে তুলল। তারপর অরিনের কোনো জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
এবারের চুম্বন আগের মতো কেবল রাগের ছিল না। এতে ছিল এক তীব্র ব্যাকুলতা, তৃষ্ণা আর আট বছরের না-বলা হাহাকার। অরিন এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলেও পরক্ষণেই আরহামের গলায় দু-হাত পেঁচিয়ে ধরল। সে নিজেকে সঁপে দিল আরহামের এই উত্তপ্ত ভালোবাসার কাছে।
আরহাম অরিনের শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত পিঠে হাত রাখল। অরিনের শিউরে ওঠা শরীরটাকে সে আরও নিবিড় করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। আরহামের ঠোঁট অরিনের ঠোঁট থেকে সরে এসে তার গালে, থুতনিতে এবং তারপর ঘাড়ের স্পর্শকাতর জায়গায় নেমে এলো। অরিনের মুখ থেকে এক চিলতে সোফিস্টিকেটেড সুবাস আর হালকা সিউড়ির শব্দ বের হয়ে এলো, যা আরহামকে আরও মাতাল করে তুলল।
"আরহাম..." অরিন ফিসফিসিয়ে উঠল, তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
আরহাম থামল। অরিনের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে সে দ্রুত শ্বাস নিতে লাগল। দুজনের চোখেই তখন এক উত্তপ্ত অনুভূতির খেলা।
হঠাৎ আরহাম অরিনকে ছেড়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে আবার সেই সংশয় আর কঠিন ভাবটা ফিরে এসেছে। সে নিজের হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল, যেন কিছুই হয়নি।
"তুমি এখন যেতে পারো, মিস চৌধুরী," আরহাম শীতল গলায় বলল, যদিও তার বুকের দ্রুত ধুকপুকানি তার ভেতরের ঝড়টাকে গোপন রাখতে পারছিল না। "মেঝেতে পড়ে থাকা কফিটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করো। আর হ্যাঁ, তোমার এই বানিয়ে বলা গল্পের সত্যতা আমি যাচাই করব। আকরাম চৌধুরী যদি সত্যিই এমন কিছু করে থাকেন, তবে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।"
অরিন কিছু বলল না। সে ভেজা চোখে আরহামের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।
আরহাম কাচের দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঢাকা শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার মনের ভেতরে এখন কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরাফেরা করছে—অরিন কি সত্যিই নির্দোষ ছিল? আর যদি তাই হয়, তবে এই আটটি বছর সে কার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার আগুনে পুড়েছে?
বিকেলের দিকে অফিসের পরিবেশ বেশ থমথমে হয়ে এলো। কেবিনের ভেতরে কাচের টেবিলটায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল আরহাম। অরিনের বলা কথাটা তার মাথার ভেতর একটা বিষাক্ত কাঁটার মতো ফুটছিল। যদি অরিনের কথাই সত্যি হয়, যদি আকরাম চৌধুরী সত্যিই তার বাবাকে হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে থাকেন?
আরহাম তার ব্যক্তিগত ট্রাস্টেড ইনভেস্টিগেটর রফিককে ফোনে ডেকে পাঠাল।
দশ মিনিটের মধ্যে রফিক কেবিনে প্রবেশ করল। "বলুন স্যার, কী করতে হবে?"
আরহাম জানালার বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "আট বছর আগের একটা ঘটনা। পুরান ঢাকার কেস। আকরাম চৌধুরী আমার বাবার বিরুদ্ধে কোনো ভুয়া পুলিশ ফাইল বা সরকারি দপ্তরে অভিযোগ তৈরি করেছিলেন কি না, কিংবা তার কোনো গোপন ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন কি না—আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমার স্পষ্ট তথ্য চাই। কোনো ভুল যেন না হয়, রফিক।"
"ঠিক আছে স্যার, আমি আজ রাতের মধ্যেই খোঁজ নিচ্ছি," রফিক সালাম জানিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল।
অফিস ছুটি হওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে। স্টাফরা প্রায় সবাই চলে গেছে, কিন্তু অরিন তখনও তার ডেস্কে বসে ফাইলের হিসাব মেলাচ্ছিল। আজ সারাদিন সে না খেয়ে কাজ করছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, চোখের কোনায় হালকা জ্বালাপোড়া।
আরহাম কেবিন থেকে বের হয়ে অরিনের ডেস্কেল সামনে এসে দাঁড়াল। অরিনের ফ্যাকাশে মুখ আর ক্লান্ত শরীর দেখে আরহামের শক্ত মনটায় আবার এক চিলতে দোলা লাগল।
"ফাইলগুলো কাল সকালে দেখলেও চলবে। এখন বাড়ি যাও," আরহাম সোজাসুজি বলল।
অরিন মুখ তুলে তাকাল। তার কন্ঠ খুব দুর্বল, "আরেকটু বাকি আছে স্যার... শেষ করেই যাব।"
"আমি হুকুম দিয়েছি, মিস চৌধুরী," আরহামের গলায় কৃত্রিম কড়াকড়ি। "আমার অফিসে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ুক, তা আমি চাই না।"
অরিন আর তর্ক করল না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু দাঁড়াতেই তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো এবং সে সোজা গড়িয়ে পড়ে যেতে লাগল।
"অরিন!"
আরহাম এক নিমেষে এগিয়ে গিয়ে অরিনের কটি জড়িয়ে তাকে মেঝেতে পড়ার আগেই কোলে তুলে নিল। অরিনের চোখ দুটো বন্ধ, নিঃশ্বাস খুব ক্ষীণ।
আরহামের বুকের ভেতরটা আচমকা এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। আট বছরের জমে থাকা রাগ, ক্ষোভ, প্রতিশোধের ইচ্ছা—সব যেন এই মুহূর্তে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। সে অরিনকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কেবিনের ভেতরের প্রাইভেট রেস্টরুমে নিয়ে গেল।
সেখানে থাকা নরম সোফায় অরিনকে সাবধানে শুইয়ে দিল সে। ফ্যানের গতি বাড়িয়ে দিয়ে গ্লাসে পানি নিয়ে এলো। অরিনের মুখের ওপর আলতো করে পানির ঝাপটা দিল।
"অরিন... চোখ খোলো, অরিন!" আরহামের গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।
অরিন আস্তে আস্তে চোখের পাতা খুলল। তার ঝাপসা চোখে প্রথমেই ভেসে উঠল আরহামের ব্যাকুল মুখটা। আরহাম তার হাত ধরে আছে, তার চোখে ফুটে উঠেছে এমন এক ভালোবাসা—যা আট বছর আগে সে শেষ দেখেছিল।
"তুমি... তুমি এত চিন্তা করছ কেন?" অরিন খুব ক্ষীণ স্বরে ফিসফিস করে বলল। "আমি তো তোমার শুধুই এক পাওনাদার... এক শত্রু, তাই না?"
আরহামের ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে এলো। সে কোনো উত্তর দিল না। সোফায় অরিনের পাশে বসে সে অরিনের মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। অরিনের চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে তার কপালে হাত রাখল।
"চুপ থাকো," আরহাম নিচু স্বরে বলল। "সারা দিন কিছু খাওনি কেন?"
অরিন আরহামের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আরহামের এই যত্ন, এই উষ্ণতা তাকে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। সে নিজের দুর্বল হাতটা বাড়িয়ে আরহামের গালে রাখল।
"তুমি যতই মুখ ফিরিয়ে রাখার ভান করো না কেন আরহাম... আমি জানি তোমার ভেতরে সেই পুরোনো আরহাম আজও বেঁচে আছে। সে আমাকে ভালোবাসে..."
আরহাম অরিনের দিকে তাকাল। অরিনের নরম ছোঁয়া তার গাল বেয়ে ঘাড়ের দিকে নেমে এল। রেস্টরুমের ডিম লাইটের আলোয় অরিনের ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো এক মায়াবী আকর্ষণে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। আরহামের আর নিজেকে সামলানো সম্ভব হলো না। সে অরিনের ওপর সামান্য ঝুঁকে পড়ল।
"তুমি আমাকে পাগল করে দেবে, অরিন," আরহাম ফিসফিস করে বলল।
সে অরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এবারের মেলামেশা কোনো ক্ষোভের ছিল না, এতে ছিল ব্যাকুল সেবা আর উপশমের এক গভীর অনুভূতি। অরিন আরহামের ঘাড় পেঁচিয়ে তাকে আরও নিজের দিকে টেনে নিল। আরহামের হাতের আঙুলগুলো অরিনের পেটের কামিজের ভাঁজে আলতো করে চেপে বসল, অরিন এক হালকা শিহরণে কেঁপে উঠে আরহামের চুলে হাত বুলাতে লাগল।
খোলামেলা নিঃশ্বাস আর উষ্ণ ভালোবাসার পরশে ঘরের থমথমে ভাবটা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। আরহাম অরিনের গলায় নিজের মুখ রেখে শান্ত হতে লাগল, আর অরিন তার চুলে হাত জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে রইল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই আরহামের কোটের পকেটে থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল।
মুহূর্তেই ছন্দপতন। আরহাম ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল—রফিক ফোন করেছে।
আরহাম রেস্টরুম থেকে বের হয়ে কেবিনে গিয়ে ফোনটা কান দিয়ে ধরল। "বলো রফিক, কী খবর?"
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে রফিকের গম্ভীর গলা ভেসে এলো, "স্যার, আপনি যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। আট বছর আগে আকরাম চৌধুরী সত্যি আপনার বাবার বিরুদ্ধে এক বিশাল সরকারি তসরুফের ভুয়া চার্জশিট বানিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি তৎকালীন এক শীর্ষ পুলিশ অফিসারকে টাকা দিয়ে প্রস্তুত রেখেছিলেন, যাতে আপনার বাবা পরদিনই গ্রেফতার হন। কেবল মিস অরিন উনার বাবার পায়ে ধরে কাঁদার পর উনি সেই ফাইল চেপে যান—এই শর্তে যে আপনি শহর ছাড়বেন।"
রফিক আরও বলল, "তবে স্যার... ঘটনা শুধু এটুকুই নয়। আকরাম চৌধুরীর অতীত ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে আরও বড় একটা গোপন খবর পেয়েছি। যেটার সাথে আপনার নিজের পরিবারেরও এক অদ্ভুত সম্পর্ক আছে..."
কথাটা শুনে আরহামের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। তার চোখ দুটো শক্ত হয়ে এলো, বুকের ভেতরটা জমে বরফ হয়ে গেল।
অরিন সত্য বলেছিল। সে নির্দোষ! সে আট বছর ধরে আরহামকে এবং আরহামের পরিবারকে বাঁচানোর জন্যই এই অমানুষিক নীরবতা সহ্য করেছে!
আরহাম ফোনের দিকে তাকিয়ে রফিককে জিজ্ঞেস করল, "দ্বিতীয় গোপন অতীতটা কী, রফিক?"
"স্যার, সেটা ফোনে বলা সম্ভব নয়। ডকুমেন্টসগুলো আপনার টেবিলে পাঠাচ্ছি। তবে এটুকু বলতে পারি... আকরাম চৌধুরী আপনার বাবার সাধারণ এক শত্রু নন, উনি অতীতের এক বিরাট অপরাধ গোপন করে আছেন।"
ফোনটা কেটে গেল। আরহাম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল রেস্টরুমের দরজার দিকে, যেখানে তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা, তার অরিন শুয়ে আছে। কিন্তু সেই ভালোবাসার ওপর এখন নেমে এসেছে এক নতুন কালছায়া—এক গোপন অতীতের কালছায়া, যা তাদের সম্পর্ককে এক নতুন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
কেবিনের ভেতরে নীরবতা এখন আরও ভারী হয়ে চেপে বসেছে। রফিকের পাঠানো গোপনীয় কভারের ফাইলটা আরহামের টেবিলের ওপর পড়ে আছে। আরহাম কাঁপানো হাতে খামটা খুলল। ভেতরে থাকা হলুদ হয়ে যাওয়া কিছু পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং, কয়েকটা ব্যাংকের স্টেটমেন্ট আর একটা হাত লেখা চুক্তিপত্র।
কাগজগুলোতে চোখ বোলাতেই আরহামের মাথার ভেতরে যেন তীব্র একটা বিস্ফোরণ ঘটল।
আট বছর আগের সেই অপমানের গল্প তো কেবল একটা মুখোশ ছিল! মূল সত্য লুকিয়ে ছিল আরও ত্রিশ বছর গভীরে। আরহামের বাবা আর আকরাম চৌধুরী তরুণ বয়সে ছিলেন যৌথ ব্যবসায়ী। আরহামের বাবা ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান মানুষ, আর আকরাম চৌধুরী ছিলেন চতুর ও লোভী। আরহামের বাবার সরলতার সুযোগ নিয়ে আকরাম চৌধুরী পুরো ব্যবসার তহবিল তছরুপ করেন এবং সমস্ত দায়ভার আরহামের বাবার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাঁকে পথে বসিয়ে দেন। সেই টাকাই ছিল আজকের বিশাল 'চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ'-এর মূল ভিত্তি!
শুধু তা-ই নয়, অপমানের ভয়ে আরহামের বাবা যখন প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন, তখন আকরাম চৌধুরী তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আরহামের বাবা নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে এক সাধারণ স্কুলে কেরানির চাকরি নেন। আর বহু বছর পর, যখন আরহাম আর অরিনের ভালোবাসার কথা জানাজানি হয়, আকরাম চৌধুরী আবার পুরোনো অপরাধ ফাঁস হওয়ার ভয়েই আরহামকে নির্মমভাবে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন!
আরহামের মুঠো শক্ত হয়ে এলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল ক্ষোভে। যে মানুষের ওপর সে আট বছর ধরে ঘৃণা পুষে রেখেছে, সে আসলে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ ছিল! অরিন সব জানত... অরিন জানত তার বাবা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারেন, আর তাই সে আরহামের জীবন আর তার বাবার মান-সম্মান বাঁচাতে নিজেকে বলির পাঁঠা বানিয়েছিল।
আরহাম ধীর পায়ে রেস্টরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল অরিন সোফায় উঠে বসেছে। তার চেহারায় এখনও কিছুটা দুর্বলতা, তবে চোখ দুটি আরহামের ফেরার প্রতীক্ষায় অধীর।
আরহামকে ভেতরে ঢুকতে দেখে অরিন ধীর গলায় বলল, "আরহাম... তোমার শরীর কি খারাপ লাগছে? চেহারা এমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে কেন?"
আরহাম কোনো কথা বলল না। সে সোজা এগিয়ে এসে সোফার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। পরম মমতায় অরিনের দুটো হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল। আরহামের চোখের কোণে টলমল করে উঠল জল। যে কঠিন আরহাম চৌধুরীকে দুনিয়া চেনে, আজ সে সম্পূর্ণ নিঃশ্বাসহীন এক অপরাধীর মতো অরিনের সামনে নতজানু।
অরিন চমকে উঠল। "আরহাম! কী হয়েছে? তুমি এভাবে বসছ কেন?"
"আমাকে ক্ষমা করে দাও, অরিন..." আরহামের রুদ্ধ হয়ে আসা গলার স্বর খাঁ খাঁ করে উঠল। "আমি অন্ধ ছিলাম। আটটা বছর ধরে তোমাকে অপরাধী ভেবে আমি নিজের ভেতর ঘৃণার পাহাড় বানিয়েছিলাম। কিন্তু আসল অপরাধী তো আমি... আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি।"
অরিনের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে আরহামের চোখের জলের ধারা দেখে বুঝে গেল—সত্য উন্মোচিত হয়েছে।
"তুমি... তুমি সব জেনে গেছ?" অরিন ফিসফিস করে বলল।
"রফিক সব বের করেছে," আরহাম অরিনের হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরল। "তোমার বাবা কী করেছিলেন, কীভাবে আমার পরিবারকে ধ্বংস করেছিলেন, আর তুমি কীভাবে সেই নরক থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিলে—সব। তুমি এত বড় একটা বোঝা একাকী কীভাবে বইলে, অরিন? কেন আমাকে একবারও বললে না?"
অরিন মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ল আরহামের হাতে।
"আমি কীভাবে বলতাম, আরহাম?" অরিন ভাঙা গলায় বলল। "তুমি জানতে পারলে তোমার ভেতরের সৎ মানুষটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যেত। আব্বুর অপরাধের সাজা তুমি আর তোমার নির্দোষ বাবা পেতেন। আমি চাইনি আমার বাবার পাপের ছায়া তোমার জীবনে পড়ুক। তাই আমি নিজেকে ধ্বংস হতে দিয়েছি, কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়েছি।"
আরহাম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় অরিনকে জড়িয়ে ধরে সোফায় টেনে আনল। অরিনকে নিজের বুকের গভীরে শক্ত করে পিষে ধরে সে তার চুলে মুখ গুঁজে দিল।
"আর কখনো না, অরিন... আর কখনো তোমাকে একা কষ্ট পেতে দেব না," আরহামের কণ্ঠ ব্যাকুল হয়ে উঠল।
অরিনও নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আরহামের কোমর জড়িয়ে ধরল। আট বছরের দীর্ঘ বিরহ, যন্ত্রণা আর না-বলা কান্নার বাঁধ এক নিমেষে ভেঙে গেল। অরিনের মুখ থেকে বের হয়ে আসছিল হালকা সোফিস্টিকেটেড আর ব্যাকুল কান্নার আওয়াজ।
আরহাম আলতো করে অরিনের মুখটা তুলে ধরল। অরিনের গালজুড়ে জমে থাকা অশ্রু সে নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে দিতে লাগল। তার চুমু গড়িয়ে এলো অরিনের ভেজা চোখের পাতায়, গালে এবং শেষমেশ তার তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে।
এবারের মিলন ছিল এক গভীর অপরাধবোধ আর পুনর্মিলনের আকুলতায় ভরা। অরিন নিজের ঠোঁট দুটো পুরোপুরি সঁপে দিল আরহামের উত্তপ্ত ছোঁয়ায়। আরহামের হাতের আঙুলগুলো অরিনের কোমর থেকে উঠে তার পিঠের বাঁধন শিথিল করে দিল। অরিন এক দীর্ঘ শিহরণে আরহামের কাঁধ আঁকড়ে ধরল।
রেস্টরুমের নরম আলোয় তাদের দুজনের শরীর একাকার হয়ে গেল। অরিনের প্রতিটি নিঃশ্বাস আরহামের বুকের স্পন্দনের সাথে মিশে এক নতুন সুর তুলছিল। আট বছর আগে পুরান ঢাকার সেই বৃষ্টির রাতে যে ভালোবাসার গল্প থমকে গিয়েছিল, আজ তা আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই আরহামের মনে এক চরম সংকটের মেঘ ঘনিয়ে এলো। সে অরিনের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাবল—সত্য তো সে জেনেছে, কিন্তু এখন কী হবে?
একদিকে তার বাবার ওপর হওয়া চরম অন্যায় এবং আকরাম চৌধুরীর অতীত অপরাধের প্রতিশোধ, অন্যদিকে সেই অপরাধীরই একমাত্র মেয়ে—যাকে সে নিজের আত্মার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। আকরাম চৌধুরীকে আইনি সাজার মুখোমুখি দাঁড় করানো মানে অরিনের পরিবারকে পথে বসানো।
আরহাম যখন অরিনের শান্ত, ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাল, তার বুকের ভেতরটা এক কঠিন দ্বন্দ্বে মোচড় দিয়ে উঠল। প্রেম নাকি বিচার—কোন পথ বেছে নেবে সে?
পরদিন ভোরে কেবিনের ভেতর হালকা আলোর রেখা ফুটতেই আরহামের ঘুম ভাঙল। রেস্টরুমের সোফায় তখনও অরিন মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। দীর্ঘ আটটি বছর পর তার চেহারায় একপ্রকার পরম শান্তির ছাপ। আরহাম ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে অরিনের গায়ে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে দিল। তারপর অরিনের ভিজে থাকা কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বাইরে বের হয়ে এল।
বাইরে আসতেই আরহামের মুখোমুখি দাঁড়াল এক কঠিন বাস্তবতা। টেবিলে রাখা সেই লাল রঙের ফাইলের কাগজপত্রগুলো যেন তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল তার বাবার প্রতি হওয়া চরম অন্যায়ের কথা। আকরাম চৌধুরী কেবল আরহামের জীবন ধ্বংস করেননি, তার বাবার সমস্ত সঞ্চয়, সম্মান আর স্বপ্ন এক নিমেষে কেড়ে নিয়েছিলেন।
হঠাৎ আরহামের ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আকরাম চৌধুরীর নাম।
আরহাম ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল। তার গলা আবার সেই আগের মতো বরফের মতো ঠান্ডা।
"বলুন, আকরাম চৌধুরী সাহেব।"
ফোনের ওপাশ থেকে আকরাম চৌধুরীর অহংকারী অথচ খানিকটা উৎকণ্ঠিত গলা ভেসে এল। "আরহাম চৌধুরী, আমার মেয়ে অরিন গতকাল তোমার অফিসে গিয়ে আর ফেরেনি। তুমি কি মনে করছ তুমি বিশাল বড় ব্যবসায়ী হয়ে গেছ বলে চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের সাথে যা ইচ্ছা তাই করবে? অরিন কোথায়?"
আরহাম এক চিলতে কঠিন হাসল। "আপনার মেয়ে ভালো আছে, চৌধুরী সাহেব। তবে আপনার কোম্পানি আর আপনার ভবিষ্যৎ—কোনোটাই ভালো নেই। আপনার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কোম্পানির সারের ফাইল এখন আমার হাতে। আর সাথে আপনার অতীতের সেই তছরুপের ফাইলটাও।"
কথাটা শুনেই ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের এক থমথমে নীরবতা নেমে এল। আকরাম চৌধুরীর নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট দ্রুত হয়ে উঠল।
"তুমি... তুমি কিসের কথা বলছ?" আকরাম চৌধুরীর গলায় কেঁপে ওঠা আতঙ্ক স্পষ্ট।
"ত্রিশ বছর আগের সেই যৌথ ব্যবসা, আরহামের বাবার সরলতার সুযোগ নিয়ে সব টাকা আত্মসাৎ করা, আর আট বছর আগে জাল পুলিশ কেসের ভয় দেখানো—সব। আজ বেলা বারোটার মধ্যে আমি আপনাকে আমার অফিসে দেখতে চাই। যদি না আসেন, তবে চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের দেনা মেটাতে পুলিশ আর মিডিয়া আজই আপনার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়বে।"
আরহাম কলটা কেটে দিল। তার চোখে এখন প্রতিশোধ আর অন্যায়ের বিচারের তীব্র আগুন।
ঠিক সেই মুহূর্তে রেস্টরুমের দরজা খুলে অরিন বাইরে এল। সে আরহামের শেষ কথাগুলো শুনে ফেলেছিল। তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, চোখে আবার সেই পুরোনো আতঙ্কের ছায়া।
"আরহাম... তুমি আব্বুকে কী বললে?" অরিন কাঁপা কাঁপা গলায় এগিয়ে এলো।
আরহাম অরিনের দিকে ফিরল। তার চোখে ভালোবাসার গভীরতা থাকলেও চেহারায় ছিল কঠোর সিদ্ধান্ত। "আমি তোমার আব্বুকে ডেকেছি, অরিন। যে পাপ উনি ত্রিশ বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছেন, আজ তার হিসাব হবে।"
অরিন ডুকরে কেঁদে উঠে আরহামের দুটি হাত আঁকড়ে ধরল। "প্লিজ আরহাম, এমন কোরো না! আব্বু যা করেছেন তা চরম অন্যায়, কিন্তু উনি বুড়ো হয়ে গেছেন। এই বয়সে উনি জেল-পুলিশ সহ্য করতে পারবেন না। আমি জানি উনি দোষী, কিন্তু আমার কথা একবার ভাবো... উনি আমার বাবা!"
আরহাম অরিনের হাত দুটো ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। অরিনের কান্নায় আরহামের বুক ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু তার নীতি আর ক্ষোভ আজ আর পিছপা হতে তৈরি নয়।
"অরিন, আমার দিকে তাকাও," আরহাম অরিনের চিবুক ধরে নিজের দিকে তুলল। "তোমার বাবা আমার পরিবারকে পথে বসিয়েছিলেন। আমার বাবার সারাজীবনের সততাকে উনি অপমান করেছিলেন। আমি যদি আজ উনাকে ছেড়ে দিই, তবে আমি আমার বাবার সাথে অন্যায় করব। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি—তোমার ওপর এর কোনো আঁচ আসতে দেব না।"
"তোমার আঁচ না আসা মানেই আমার শান্তি নয় আরহাম!" অরিন তীব্র যন্ত্রণায় গর্জে উঠল। সে আরহামের কোট শক্ত করে চেপে ধরে তার বুকের সাথে নিজের কপাল ঠেকাল। "যদি আমার পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়, তবে আমাদের এই ভালোবাসার ওপর রক্তের দাগ লেগে থাকবে। আমরা কি পারব সেই পাপের ওপর নতুন কোনো সুখের সংসার গড়তে?"
অরিনের ফিসফিস করে বলা এই করুণ আকুতি আরহামের বুকের কলিজায় গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। অরিনের ভেজা ঠোঁটের উত্তাপ আর ব্যাকুল নিঃশ্বাস আরহামের জামার বোতাম পেরিয়ে তার বুকে আছড়ে পড়ছিল। আরহাম অরিনকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে পিষে ধরে তার ঘাড়ে ও গালে তৃষ্ণার্ত এক চুম্বন আঁকল।
"তুমি আমাকে দুটো আগুনের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিলে, অরিন," আরহাম অরিনের চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল।
ঠিক বেলা বারোটায় কেবিনের ভারী কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন আকরাম চৌধুরী। আট বছর আগের সেই দাম্ভিক, অহংকারী মানুষটির শরীরে আজ বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট। চোখে-মুখে চরম হতাশা আর ভয়ের ছায়া।
ঘরের এক কোণে অরিনকে ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরহামের পাশে, আকরাম চৌধুরীর চোখ দুটো কেঁপে উঠল।
আরহাম রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। টেবিলে সাজানো সেই ত্রিশ বছর আগের গোপন ফাইলটা এগিয়ে দিল আকরাম চৌধুরীর দিকে।
"পড়ে দেখুন, চৌধুরী সাহেব," আরহামের কণ্ঠ যেন তরবারির ধার। "আপনার সাম্রাজ্যের আসল ভিত্তি। আজ এক কলমের খোঁচায় আমি আপনাকে আবার সেই পুরোনো শূন্যতায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি, যে শূন্যতায় আপনি আমার বাবাকে ঠেলে দিয়েছিলেন।"
আকরাম চৌধুরী ফাইলটা খুলে কাগজগুলো দেখতে লাগলেন। তার হাত থরথর করে কাঁপছিল। পনেরো মিনিটের মধ্যে তার অহংকারের সমস্ত স্তম্ভ যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।
"তুমি... তুমি কী চাও, আরহাম?" আকরাম চৌধুরী ভেঙে পড়া গলায় বললেন।
আরহাম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক মহা-সংকটের মেঘ। একদিকে অরিনের জলভরা চোখ, অন্যদিকে বাবার অপমানের প্রতিশোধ।
"আমি চাই আপনি আমার বাবার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইবেন," আরহাম সোজাসুজি বলল। "আর আপনার কোম্পানির সমস্ত শেয়ার অরিনের নামে ট্রান্সফার করবেন। আপনি আর কোনো দিন এই ব্যবসার দায়িত্বে থাকতে পারবেন না।"
আকরাম চৌধুরী মাথা নিচু করে নীরব রইলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কেবিনের দরজায় সশব্দে কড়া নাড়ল কেউ। আরহামের ব্যক্তিগত সহকারী রফিক দ্রুত ভেতরে ঢুকে এল, তার হাতে আরও একটি অতি-গোপনীয় ফাইল।
"স্যার, চরম একটা খবর আছে," রফিক দ্রুত বলল। "আকরাম চৌধুরীর অতীতে যে তছরুপের কথা আমরা ভেবেছিলাম... ঘটনা আসলে কেবল উনি একা করেননি। এই ফাইলের ভেতরে যে গোপন দলিলটি পাওয়া গেছে, তাতে আরও বড় একটি নাম জড়িয়ে আছে—যা আপনার নিজের পরিবারের ইতিহাসকেও একদম উল্টে দেবে!"
অরিন, আরহাম এবং আকরাম চৌধুরী—তিনজনেই স্তব্ধ হয়ে রফিকের দিকে তাকাল। বাতাসে আবার এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস নেমে এল।
সম্মেলন কক্ষের বাতাসে যেন ভারী সীসা জমে গেল। রফিকের কথা শেষ হতেই ঘরের ভেতরে নেমে এল এক পরম নীরবতা। অরিন ভীতিমাখা চোখে রফিকের হাতের হলুদ হয়ে যাওয়া দলিলটির দিকে তাকিয়ে রইল, আর আকরাম চৌধুরী এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে নিজের মাথা নিচু করে নিলেন।
আরহাম এক পা এগিয়ে গিয়ে রফিকের হাত থেকে ফাইলটা ছাঁ মেরে নিল। "কীসের কথা বলছ রফিক? স্পষ্ট করে বলো!"
রফিক অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলল, "স্যার, ত্রিশ বছর আগের সেই যৌথ ব্যবসার আসল চুক্তিপত্র এটি। এতে লেখা আছে... আকরাম চৌধুরী একাই তহবিল তছরুপ করেননি। আপনার বাবা জহির চৌধুরী সাহেবও সেই টাকা আত্মসাতের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন!"
"বাজে কথা বন্ধ করো!" আরহামের গর্জন পুরো কেবিনে প্রতিধ্বনি তুলল। সে রফিকের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। "আমার বাবা সরকারি কেরানি ছিলেন, উনি সৎ মানুষ! উনি সারা জীবন অভাব সহ্য করেছেন কিন্তু নীতি বিক্রি করেননি!"
"আরহাম, শান্ত হও," আকরাম চৌধুরীর ভেঙে পড়া করুণ কণ্ঠ ভেসে এল।
আরহাম রফিককে ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় আকরাম চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। "বলুন! এই দলিলের মানে কী? আপনি জাল দলিল বানিয়ে আমার বাবাকে আবার ফাসানোর চেষ্টা করছেন?"
আকরাম চৌধুরী বিষণ্ণ এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল বার্ধক্যের জল। "না আরহাম... এটি আসল দলিল। তোমার বাবা জহির আর আমি একসাথে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। কিন্তু ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হওয়ার পর আমরা দেউলিয়া হওয়ার পথে বসেছিলাম। তখন তোমার বাবাই ব্যাংক জালিয়াতি আর তহবিল সরানোর মূল পরিকল্পনা করেছিলেন। আমি লোভ সামলাতে পারিনি, আমি তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলাম।"
আরহাম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পায়ের তলার মাটি যেন এক নিমেষে ধসে গেল।
আকরাম চৌধুরী বলতে থাকলেন, "কিন্তু টাকাটা সরানোর পর তোমার বাবার হঠাৎ অপরাধবোধ জাগে। উনি নিজের সমস্ত শেয়ার আর টাকা আমাকে দিয়ে দেন এবং বলেন, 'আমি এই পাপের টাকা ঘরে নেব না। আমি সাধারণ জীবন কাটাব।' কিন্তু ততদিনে ব্যাংক ও পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল। তোমার বাবাকে জেল থেকে বাঁচাতেই আমি সমস্ত দোষ আর ঋণের দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিই। সেই প্রতিদানে তোমার বাবা আমাকে কথা দিয়েছিলেন—উনি সারা জীবন ছায়াশূন্য হয়ে বেঁচে থাকবেন আর আমি এই ব্যবসার মূল মালিক হিসেবে প্রকাশ্যে থাকব।"
অরিন হতবাক হয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনছিল। তার আব্বু—যাকে সে সারা জীবন একজন স্বৈরাচারী ধনী লোক হিসেবে জেনে এসেছে, সে আসলে তার বন্ধুর পরিবারকে বাঁচানোর জন্য নিজের ঘাড়ে অপরাধের বোঝা নিয়েছিল!
আরহাম থরথর করে কাঁপছিল। তার সারা জীবনের বিশ্বাস, তার বাবার সততার গর্ব, তার আট বছরের ঘৃণার পাহাড়—সব এক নিমেষে বালুর ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। যে প্রতিশোধের আগুনে সে এত দিন জ্বলেছে, সেই আগুন আসলে এক বিশাল ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল!
"তা-ই যদি হয়..." আরহামের রুদ্ধ হয়ে আসা গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না, "তবে আট বছর আগে আপনি আমাকে ওইভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন কেন?"
আকরাম চৌধুরী মাথা তুলে আরহামের দিকে তাকালেন। "কারণ আমি জানতাম তুমি অত্যন্ত অদম্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তুমি যদি পুরান ঢাকার সেই সাধারণ গলিতে অরিনের সাথে জড়িয়ে পড়তে, তবে তুমি কোনো দিন নিজের চরম সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারতে না। আর সবচেয়ে বড় কথা—তোমার বাবা জহির আমাকে কসম দিয়েছিলেন, যেন কোনো দিন তাঁর অতীত পাপের কথা তোমার সামনে না আসে। তোমাকে তাড়িয়ে দেওয়ার সেই নিষ্ঠুর নাটকটা না করলে তুমি কোনো দিন চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করতে পারতে না, আরহাম।"
ঘটনার এই চরম সত্য যেন কেবিনে থাকা সবাইকে তাসের ঘরের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিল। অরিনের চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরছিল। সে ধীর পায়ে আরহামের দিকে এগিয়ে গেল।
আরহাম দরজার কাচের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল, তার দুই হাত টেবিলে চেপে রাখা, শরীরটা ক্ষোভে আর অনুশোচনায় কাঁপছে। সে যে ভালোবাসাকে অস্বীকার করেছে, যে অরিনকে দিনের পর দিন অপরাধী ভেবে অপমান করেছে—সেই অরিনের পরিবারই ছিল তার বাবার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।
অরিন পিছন থেকে এসে আরহামের পিঠে নিজের মুখ গুঁজে দিল। তার দুটো হাত আরহামের চওড়া বুক পেঁচিয়ে ধরল।
"আরহাম..." অরিন ডুকরে কেঁদে উঠল।
আরহাম এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে অরিনকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল। তার শক্ত খোলসটা ভেঙে গিয়ে আজ চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ল। সে অরিনের চুলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আটটি বছর ধরে যে কঠোর মানুষটি সে সেজেছিল, আজ সে সম্পূর্ণ পরাজিত।
"আমাকে ক্ষমা করে দাও অরিন..." আরহামের ব্যাকুল কণ্ঠ অরিনের ঘাড়ে আছড়ে পড়ল। "আমি নিজের বাবাকে সৎ ভেবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অন্যায়ের সাজা তোমাকে দিয়েছি। আমি তোমার নিষ্পাপ ভালোবাসা আর ত্যাগকে অপমান করেছি..."
অরিন নিজের মুখ তুলে আরহামের চোখের জল আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল কেবল এক অপরিসীম করুণা ও ভালোবাসা।
"তুমি জানতে না আরহাম..." অরিন ফিসফিস করে বলল। "আজ তো সব সত্য সামনে এল। আমাদের মাঝের সব দেয়াল তো আজ ভেঙে গেল..."
আরহাম অরিনের দিকে তাকাল। অরিনের ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো কামনায় আর আবেগে থরথর করে কাঁপছিল। আরহাম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে পরম ব্যাকুলতায় অরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
এবারের চুম্বন কোনো প্রতিশোধের ছিল না, কোনো অহংকারের ছিল না। এতে ছিল নিঃশর্ত ক্ষমা, চিরন্তন মিলন আর আট বছরের হাহাকারের নিঃশেষ রূপ। অরিন আরহামের ঘাড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার সমস্ত শরীর আরহামের সঁপে দিল। আরহামের হাতের উত্তপ্ত পরশ অরিনের পিঠ ও কোমর পেঁচিয়ে তাকে আরও নিজের মাঝে বিলীন করে নিল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আকরাম চৌধুরী নিঃশব্দে চোখ মুছে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন। বহু বছরের চেপে রাখা গোপন পাপ আর মিথ্যার বোঝা আজ নেমে গেছে।
কিন্তু সম্পর্কের এই চরম সত্য উদঘাটনের পর, এখন শেষ একটি পরীক্ষা বাকি। আরহামের সেই বৃদ্ধ বাবা জহির চৌধুরী—যিনি আজ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই নতুন সত্যকে তারা কীভাবে বরণ করে নেবে? আর অরিন কি পারবে অতীত ভুলে আরহামের সাথে এক নতুন ভোরের সূচনা করতে?
ঢাকার আকাশ ভেঙে যেন স্বস্তির এক অঝোর ধারা ঝরছিল। পুরান ঢাকার সেই পুরোনো ইটের তৈরি দোতলা বাড়িটার সামনে যখন আরহামের চকচকে কালো গাড়িটা এসে থামল, তখন বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে। গাড়ির কাচ নামিয়ে আরহাম অনেকক্ষণ ধরে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। বারো বছর আগে এই গলির ছাদেই অরিনের সাথে তার ভালোবাসার প্রথম প্রস্ফুটন ঘটেছিল, আর আজ সব সত্য উন্মোচনের পর তারা আবার এখানেই ফিরে এসেছে।
গাড়ির পেছনের সিট থেকে নামল অরিন আর আকরাম চৌধুরী। আকরাম চৌধুরীর চেহারায় আজ আর কোনো অহংকার নেই, কেবল আছে পরম আত্মগ্লানি ও শান্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
আরহাম অরিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। অরিন আরহামের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটু হাসল—সেই পরিচিত, মায়াবী হাসি, যা আটটা বছর আগে আরহামকে মাতাল করত।
সবাই মিলে ওপরের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল আরহামের বাবা জহির চৌধুরী একটি পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসে তসবিহ গুনছেন। বার্ধক্যে তাঁর শরীর বেশ নুয়ে পড়েছে, চুলে সাদার পাহাড়।
হঠাৎ দরজায় এতগুলো মানুষকে দেখে তিনি চমকে উঠলেন। কিন্তু যখন তিনি আকরাম চৌধুরী আর অরিনের হাত ধরে থাকা আরহামকে একসাথে দেখলেন, তাঁর হাত থেকে তসবিহটা নিচে পড়ে গেল।
"আকরাম...? আরহাম...?" জহির চৌধুরীর গলায় চরম বিস্ময়।
আকরাম চৌধুরী এক মুহূর্তও দেরি না করে জহির চৌধুরীর সামনে গিয়ে সোজা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
"আমাকে ক্ষমা করে দাও, জহির," আকরাম চৌধুরীর গলা বুজে এলো কান্নায়। "ত্রিশ বছর ধরে যে পাপের বোঝা আমি বইছিলাম, আজ তা শেষ হলো। তোমার ছেলে আজ সব সত্য জেনে গেছে। সে তার বাবার কোনো ভুলকে আর ঘৃণা করে না, বরং তোমার আত্মত্যাগ আর আমার পাপের সমস্ত হিসাব সে মিটিয়ে দিয়েছে।"
জহির চৌধুরী আরহামের দিকে তাকালেন। আরহামের চোখে তখন জলের ধারা। সে ধীর পায়ে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বাবার দুটি হাত জড়িয়ে ধরল।
"তুমি কেন আমায় বলোনি, আব্বু?" আরহামের কণ্ঠ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এল। "তুমি একা একা এত বড় অপরাধের বোঝা আর অপমানের দাগ কেন বয়ে বেড়ালে? আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম আব্বু..."
জহির চৌধুরী স্নেহে আরহামের মাথায় হাত বুলালেন। "কোনো বাবা চায় না তার সন্তান তার অতীতের কালো ছায়ায় বড় হোক, আরহাম। আমি চেয়েছিলাম আমার ভুল যেন তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে নষ্ট না করে। আর আজ... আজ তুমি যে জায়গায় দাঁড়িয়েছ, আমার সারাজীবনের সব কষ্ট স্বার্থক হয়ে গেছে।"
তিনি অরিনের দিকে তাকালেন। অরিন এগিয়ে এসে জহির চৌধুরীর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। জহির চৌধুরী অরিনের মাথায় হাত রেখে পরম মমতায় বললেন, "মাগো, তুই আমার ছেলেকে এত বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছিস। তুই না থাকলে আমার আরহাম আজ আরহাম চৌধুরী হতে পারত না।"
ঘরের থমথমে আর বিষণ্ণ পরিবেশটা নিমেষেই এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠল। অতীতের সব ভুল, অপমান আর গোপন সত্যের কালো মেঘ কেটে গিয়ে এক নতুন ভোরের সূর্য উদিত হলো।
কয়েক সপ্তাহ পর।
কক্সবাজারের নিরিবিলি এক রিসোর্টের বিশাল বেলকনি থেকে সাগরের বিশাল ঢেউগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলো সাগরের বুকে পড়ে যেন এক রুপালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
আজ অরিন আর আরহামের আকদ সম্পন্ন হয়েছে। কোনো বিশাল জাকজমক ছাড়া, কেবল দুই পরিবারের ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়েছে দুটি প্রাণ।
ঘরের ভেতরে হালকা আলো জ্বলছিল। পরনে টুকটুকে লাল রঙের রাজকীয় জামদানি শাড়ি, চোখে কাজল আর কপালে ছোট টিকলি—অরিন বেলকনির গ্রিল ধরে সাগরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চুলে গুঁজে রাখা বেলি ফুলের মালাটার সুবাস মেখে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।
আরহাম ঘরের ভেতর থেকে ধীর পায়ে হেঁটে বাইরে এল। পরনে সাদা সুতির কুর্তা। সে পিছন থেকে গিয়ে অরিনের কোমর পেঁচিয়ে নিজেকে জড়িয়ে নিল। অরিনের কাঁধে নিজের থুতনি রেখে সে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অরিন শিউরে উঠে আরহামের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। "কী ভাবছ, আরহাম?"
"ভাবছি, আট বছর ধরে যে রাতগুলোর স্বপ্ন আমি দেখেছি, সেই রাতটা আজ সত্যি আমার সামনে," আরহামের কণ্ঠ নিচু, ব্যাকুল আর মাতাল করা।
সে অরিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। চাঁদের আলোয় অরিনের লজ্জায় লাল হয়ে ওঠা মুখটা দেখে আরহামের ভেতরের সমস্ত সংযম এক নিমেষে ভেঙে গেল। সে অরিনের চিবুক ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল।
"তোমাকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী পরী লাগছে, অরিন," আরহাম ফিসফিস করে বলল।
অরিন চোখ নামিয়ে নিল। "আর তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একগুঁয়ে মানুষ..."
আরহাম এক চিলতে হাসল। সে অরিনের কোমর ধরে তাকে এক ঝটকায় নিজের সাথে পিষে নিল। তাদের দুজনের স্ফীত বুকের স্পন্দন এক হয়ে মিশে গেল। আরহাম তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল অরিনের কপালে, গালে, আর তারপর তার কাঁপতে থাকা লাল ঠোঁটে।
এবারের চুম্বন কোনো প্রতিশোধের ছিল না, কোনো দীর্ঘশ্বাসেরও ছিল না। এতে ছিল পরম অধিকার, অসীম ভালোবাসা আর চিরতরে এক হয়ে যাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা। অরিন আরহামের কলার শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব সঁপে দিল আরহামের কাছে।
আরহাম অরিনকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরের নরম বিছানায় শুইয়ে দিল। সাগরের গর্জন আর ঘরের ভেতরের দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার ব্যাকুল নিঃশ্বাস একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। অরিনের শাড়ির আঁচল ধীর গতিতে খসে পড়ল, আর আরহামের আঙুলের প্রতিটা ছোঁয়ায় অরিনের শরীরে খেলে গেল নতুন জীবনের এক অনাবিল শিহরণ।
বহু ঝড়-ঝাপটা, অপমান আর সংকটের পথ পেরিয়ে ছোটবেলার সেই নিষ্পাপ ভালোবাসা আজ এক পূর্ণাঙ্গ, সুখী ও অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার গল্পে পরিণত হলো।
....