বান্দরবানের বনে দুই ফটোগ্রাফার

বান্দরবানের রেমাক্রি মুখ তখনও সকালের মিহি কুয়াশার চাদরে ঢাকা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা সাঙ্গু নদীর শান্ত জলের ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই যেন রূপোলি ঝিলিক খেলে গেল। চারপাশে শুধুই পাহাড়ি বনভূমির গাঢ় সবুজ, বুনো ফুলের তীব্র সুবাস আর নাম না জানা পাখির ডাক। এই নির্জনতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেই দেশের এক প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছে ঝর্ণা।

ঝর্ণার জীবনের সবচেয়ে বড় উন্মাদনা হলো ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে দূর-দূরান্তে হারিয়ে যাওয়া। পেশায় সে একজন আলোকচিত্রী ও ভ্রমণপিপাসু। শহরের ইট-কাঠের খাঁচা থেকে মুক্তি পেতে সে প্রায়ই ক্যানন ক্যামেরাটা গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে। প্রকৃতির অচেনা রূপ লেন্সবন্দি করাই তার নেশা।

সেদিন সকালে রেমাক্রির গভীর জঙ্গলের এক ছায়াসুনিবিড় পথ ধরে হাঁটছিল ঝর্ণা। বনের আলো-ছায়ার খেলায় এক অদ্ভুত বিচিত্র দৃশ্য তার চোখ কাড়ল। একটি বেশ বড় ও রঙিন বুনো প্রজাপতি একটি ফোটা বুনো পাহাড়ি ফুলের ওপর এসে বসেছে। চোখের সামনে এমন অপার্থিব দৃশ্য দেখে ঝর্ণার ক্যামেরা যেন কেঁপে উঠল। অতি সাবধানে, পায়ের ছাঁপ না ফেলে আস্তে আস্তে পা বাড়িয়ে সে প্রজাপতিটার দিকে এগোতে লাগল। লেন্স জুম করে ফোকাস মেলাচ্ছিল সে, নিশ্বাস বন্ধ করে যেন এক অনন্য মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করার প্রতীক্ষায়।

ঠিক তখনই ডানপাশের এক বিশাল ঘন ঝোপের ভেতরে প্রবল শব্দে কড়মড় করে ডালপালা ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ হলো! ঝোপঝাড় এমনভাবে দুলতে শুরু করল যেন ভেতর থেকে কোনো হিংস্র পাহাড়ি পশু এক লাফে বাইরে বেরিয়ে আসছে।

একদম নির্জন জঙ্গল, আশেপাশে কেউ নেই। হুট করে ঝোপের এই মাতামাতি দেখে ঝর্ণার বুক এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। আতঙ্কে তার হাতের ক্যামেরা প্রায় হাত থেকে খুলেই যাচ্ছিল। চিৎকার করে এক পা পিছিয়ে গিয়ে সে বনের কুড়ুল মারার মতো গলার জোর এনে চেঁচিয়ে উঠল, "কে? কে ওখানে? ভালুক নাকি চিতাবাঘ? একদম সামনে আসবেন না বলছি, আমার কাছে কিন্তু আত্মরক্ষার স্প্রে আছে!"

ঝর্ণা যখন ভয়ে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে লাঠি খোঁজার মতো করে আশেপাশে হাতড়াচ্ছে, ঠিক তখনই ঝোপের মধ্য থেকে একটা হা-হা হা-হা করে গমগমে হাসির শব্দ ভেসে এল।

ডালপালা সরিয়ে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক লম্বা, চওড়া কাঁধের তরুণ। পরনে তার ট্রেকিং ট্রাউজার্স আর গায়ে ফোটোগ্রাফারদের বহু পকেটওয়ালা জ্যাকেট। কপালে সামান্য ঘাম জমে থাকলেও চোখেমুখে একরাশ চঞ্চলতা আর দুষ্টুমির হাসি। সে আর কেউ নয়, আকাশ। আকাশও ঝর্ণার মতোই এক বাউন্ডুলে যাযাবর, তবে তার স্বভাবটা একটু বেশিই চ্যাটারবক্স ধরনের।

আকাশ নিজের গলার এসএলআর ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, "আরে শান্ত হন আপামণি! আমি কোনো ভালুক বা বাঘ নই, স্রেফ মানুষ! একটা দুর্লভ নীল ডানার পাহাড়ি পাখির ছবি তোলার জন্য গত বিশ মিনিট ধরে এই কাঁটাঝোপের ভেতর গুঁড়ি মেরে বসে ছিলাম। আর আপনি কিনা আমার ফোকাসটাই নষ্ট করে দিলেন এত চেঁচামেচি করে!"

ঝর্ণা চোখ খুলে থমকে দাঁড়াল। ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখটা মুহূর্তের মধ্যে রাগে লাল হয়ে উঠল। সে নিজের টি-শার্টের হাতা গুটিয়ে আকাশের দিকে এক পা এগিয়ে গেল।

"কী বললেন? আমি আপনার ফোকাস নষ্ট করেছি?" ঝর্ণার গলার স্বর রাগে সপ্তমে চড়ল। "আপনি এমনভাবে ঝোপের ভেতর লুকিয়ে ঝোপঝাড় নাড়াচ্ছিলেন, যেকোনো স্বাভাবিক মানুষ ভাববে কোনো বুনো জানোয়ার আক্রমণ করতে আসছে! আর আপনার নীল ডানার পাখির চক্করে আমার ওই রঙিন প্রজাপতির পারফেক্ট শটটা হাতছাড়া হয়ে গেল, তার কী হবে? অসভ্য লোক একটা!"

আকাশ ভুরু কুঁচকে একটু বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, "অসভ্য? বাহ্, চমৎকার! একে তো অচেনা বনাঞ্চলে একা একা চিল্লাচিল্লি করছেন, তায় আবার উল্টো আমাকেই গালি দিচ্ছেন? আপনার ওই প্রজাপতির ছবি তো আর উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু আমার ওই পাখিটা বিরল প্রজাতির ছিল! বান্দরবানের এই গভীর জঙ্গলে আপনার মতো কড়া মেজাজের শহরের মেয়ে ফোটোগ্রাফার দেখব ভাবিনি!"

"মুখ সামলে কথা বলবেন!", ঝর্ণা আঙুল উঁচিয়ে হুমকি দিল। "নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা নেই, আবার বড় বড় কথা! বুনো মানুষের মতো ঝোপের ভেতর না লুকিয়ে সোজা হয়ে হাঁটলেও তো পারতেন? আপনাকে ফোটোগ্রাফার তো দূরে থাক, সভ্য মানুষ বলেই মনে হচ্ছে না!"

"ওরে বাবা! রাগের বহর কত!", আকাশ বুক পকেটে ক্যামেরাটা সামলে রেখে বেশ একটা ডোন্ট-কেয়ার ভাব নিয়ে বলল, "জঙ্গলে কীভাবে ছবি তুলতে হয়, সেটা অন্তত আপনার কাছ থেকে শিখতে হবে না। যান যান, নিজের প্রজাপতি খুঁজুন গে। আমার পথ আটকাবেন না।"

"আপনার পথ আটকানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই!", ঝর্ণা ঝাঁজালো গলায় উত্তর দিয়ে একঝটকায় নিজের পিঠের ব্যাগটা সোজা করল।

দুজন দুজনের দিকে একরাশ বিরক্তি আর ক্ষোভের দৃষ্টিতে তাকাল। প্রথম দেখাতেই দুজনের মাঝে যে তপ্ত বচসা আর ঝগড়ার আগুন জ্বলে উঠল, তা যেন বনের শান্ত পরিবেশকেও খানিকটা উত্তপ্ত করে তুলল। ঝর্ণা পা চালিয়ে অন্যদিকে হাঁটা দিল, আর আকাশ উল্টোদিকে গিয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া পাখির খোঁজে আবার ক্যানোপির দিকে চোখ লাগাল।

উভয়েই ভেবেছিল, বনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎ হয়তো এখানেই শেষ।

সূর্য তখন পাহাড়ের আড়ালে ঢলে পড়েছে। গোধূলির লালচে আলো মুছে গিয়ে রেমাক্রির তাঁবু প্রাঙ্গণে নেমে এসেছে গাঢ় অন্ধকার। পাহাড়ি ঝিঁঝি পোকার কনকনে ডাক আর সাঙ্গু নদীর স্রোতের কলতান ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই।

ঝর্ণা বনের মধ্য থেকে বিকেলেই ট্রেকিং শেষ করে নিজেদের ক্যাম্পসাইটে ফিরেছিল। পাহাড়ের বরফশীতল জলে মুখ ধুয়ে সে যখন নিজের বড় সবুজ তাঁবুটির সামনে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটা কাঠের গুঁড়িতে বসল, ঠিক তখনই আবার সেই অপ্রিয় হাসির শব্দ!

সামনে তাকাতেই ঝর্ণার চোখ কপালে উঠল। খানিকটা দূরে কাঠের দণ্ড পুঁতে নতুন একটি তাঁবু খাঁটাতে ব্যস্ত সেই বিকেলের বেয়াদব ছেলেটি! আকাশের পরনে এখন হালকা হুডি, হাতে টর্চলাইট আর ক্যাম্পিং গিয়ার।

আকাশও হঠাৎ আলো ফেলে সামনে তাকাতেই ঝর্ণাকে দেখতে পেল। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই চেনা শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।

আকাশ টর্চের আলোটা একটু নামিয়ে বলল, "আরে! প্রজাপতি ফোটোগ্রাফার যে! শেষমেশ আমার ক্যাম্পের পাশেই ডেরা বাঁধলেন? পিছু পিছু আসেননি তো?"

ঝর্ণা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর একঝটকায় দাঁড়িয়ে উঠে কড়া গলায় বলল, "আপনার মাথা খারাপ নাকি? আমি আগে এসেছি! আপনি আমার ক্যাম্পের পাশে তাঁবু খাটাচ্ছেন কেন? জঙ্গলের অভাব পড়েছে নাকি যে একদম নাকের ডগায় এসে আস্তানা বানাতে হবে?"

আকাশ তাঁবুর রশি শক্ত করে টানতে টানতে উত্তর দিল, "শুনুন মিস রাগী, এটা কোনো ব্যক্তিগত রিসোর্ট নয়। এটা গাইড অনুমোদিত সেফ ক্যাম্পিং জোন। আপনি যেখানে বসে আছেন, সেখান থেকে দশ হাত দূরে নদী, আর সব এলাকা ট্রেকারদের জন্য উন্মুক্ত। এখন প্রকৃতি যদি আপনাকে আমার মুখোমুখি এনে ফেলে, তাতে আমার কী দোষ?"

"একদম অজুহাত দেবেন না!", ঝর্ণা দু'হাত কোমরে রেখে গজগজ করে উঠল। "আপনার ওই অসভ্য আচরণ আর কড়া মেজাজ সহ্য করার মতো সহ্যশক্তি আমার নেই। দয়া করে আপনার তাঁবুটা অন্য কোথাও সরিয়ে নিন।"

ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশের সাথে আসা তার তিন বন্ধুর দল—সাজিদ, রিয়াদ আর তানিয়া—একগাদা শুকনো কাঠ কুড়িয়ে আগুনের তদারকি করতে করতে সেখানে হাজির হলো। পরিস্থিতি থমথমে দেখে তানিয়া এগিয়ে এসে বলল, "কী হয়েছে আকাশ? ইনি কে?"

আকাশ হেসে উঠে বলল, "আরে কিছু না, ইনি হচ্ছেন আমাদের বিকালের সেই বিখ্যাত ঝোপ-কাঁপানো ফোটোগ্রাফার আপা! এখনো আমার ওপর চটে আছেন।"

ঝর্ণা কটমট করে তাকাতেই গাইড এসে হস্তক্ষেপে বলল, "আহা আপা, আপনি রাগ নিয়েন না। ভাইরা খুব ভালো ছেলে। আর এই জায়গা ছাড়া নদীর তীরে তাঁবু ফেলার নিরাপদ সমতল জায়গা আর নাই। আপনারা একটু মিলেমিশে থাকেন।"

ঝর্ণা আর কথা বাড়াল না। কিন্তু বিরক্তির এক তীব্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের তাঁবুর জিপার এক সশব্দে আটকে ভেতের ঢুকে গেল।

রাতের দিকে ক্যাম্প ফায়ারের আগুন জ্বলে উঠল। পাহাড়ি ঠান্ডার মধ্যে আগুনের উত্তাপ নিতে সবাই গোল হয়ে বসল। ঝর্ণাও ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও একা তাঁবুতে বসে না থেকে বাধ্য হয়ে একটু দূরে কাঠের ওপর এসে বসল। আকাশের বন্ধুরা খুব মিশুক। তারা নদীর তাজা রুই মাছ দিয়ে বার্বিকিউ করছিল আর একে একে গল্প বলছিল।

আকাশ হুট করেই তার গিটারটা বের করল। টুংটাং সুর তুলে সে পাহাড়ি লোকসংগীতের গাইতে শুরু করল। তার গলার স্বর অদ্ভুত রকমের মিষ্টি আর গম্ভীর, যা বনের রাতের থমথমে পরিবেশকে এক নিমিষে জাদুকরী করে তুলল।

ঝর্ণা আড়চোখে তাকাল। ছেলেটার আচরণ যতটাই বিরক্তিকর হোক না কেন, তার গান গাওয়ার হাত আর সুরের টান অস্বীকার করার উপায় নেই। আকাশের গানে যেন পাহাড়ের নীরবতা আর নদীর স্রোত এক হয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ এক ঝলক হিমেল হাওয়া এসে ক্যাম্পসাইট কাঁপিয়ে দিল। আকাশ গান থামিয়ে সবার জন্য ট্রাভেল মগ ভরা গরম চা এগিয়ে দিল। ঝর্ণার কথা চিন্তা করে সে নিজে থেকেই এক মগ চা ঝর্ণার দিকে বাড়িয়ে দিল।

"নিন, মেজাজ ঠান্ডা করার জন্য চা দরকার। বিষ মেশাইনি, ভরসা রাখতে পারেন," আকাশ মিটিমিটি হেসে বলল।

ঝর্ণা প্রথমে নিতে না চাইলেও আগুনের পাশে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের সুবাস উপেক্ষা করতে পারল না। মগটা হাতে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "ধন্যবাদ। তবে ভাববেন না চা খেয়ে আপনার বিকালের বেয়াদবি ভুলে গেছি।"

আকাশ নিজের মগে চুমুক দিয়ে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে বলল, "ভুলতে কে বলেছে? ঝগড়া করার মানুষ তো আজকাল সহজে পাওয়া যায় না। শহরের যান্ত্রিক জীবনে সবাই তো কৃত্রিম হাসি হাসে, আপনার অন্তত রাগটাও একদম আসল!"

আকাশের এই সোজা ও হালকা রসিকতায় ঝর্ণার ঠোঁটের কোণে না চাইতেও একচিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। রাতের নক্ষত্রখচিত আকাশের নিচে বসে আগুনের উষ্ণতায় তারা দুজন মুখোমুখি চেয়ে রইল। বিকেলের তিক্ততার বরফটা যেন ধীরে ধীরে অলক্ষ্যেই গলতে শুরু করেছে।

রেমাক্রির সকালটা শুরু হলো এক মায়াবী কুয়াশায়। ঝর্ণা সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে নিজের ফোটোগ্রাফি কিট গুছিয়ে নিল। আজকের গন্তব্য আরও ওপরের দিকে—অমিয়াখুমের দুর্গম পথ। পাহাড়ি পথটা যেমন খাঁড়া, তেমনই পিচ্ছিল আর ঝুঁকিপূর্ণ। গাইডের পরামর্শ ছিল দলবেঁধে যাওয়ার, কিন্তু ঝর্ণা একা চলতেই ভালোবাসে। তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে ভোরবেলাই সে ক্যামেরার ব্যাকপ্যাক পিঠে চাপিয়ে রওনা হয়ে গেল।

পথের প্রথম এক ঘণ্টা পথচলা বেশ রোমাঞ্চকরই ছিল। চারপাশের পাহাড়ি ঝরনা আর বাঁশঝাড়ের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে থাকা বুনো সৌন্দর্য তাকে মোহিত করছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ি মেঘ নেমে এল নিচের দিকে। ঘন কুয়াশায় পথের দিশা ঝাপসা হয়ে এল।

ঝর্ণা যখন একটা খাঁড়া পাহাড়ি ঢাল পার হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বিপত্তিটা ঘটল। পায়ের নিচের ভেজা পাথর আর কাদা থলথল করে ধসে গেল। সামলাতে না পেরে তীব্র আর্তনাদ করে ঝর্ণা গড়িয়ে পড়ে গেল প্রায় পনেরো ফুট নিচের এক নিচু খাদে!

"আহ্!" তীব্র যন্ত্রণায় ঝর্ণার মুখ দিয়ে শব্দ বের হয়ে এল। ডান গোড়ালিটা মুচড়ে গেছে ভীষণভাবে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই তীব্র ব্যথায় চোখে জল এসে গেল। নির্জন পাহাড়ি ঢালে সে একা, আশেপাশে কেউ নেই। মোবাইলে কোনো নেটওয়ার্কও নেই। এক অজানা ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল।

এমন সময় ওপর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। ডালপালা ঠেলে কেউ একজন হন্তদন্ত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসছে।

"ঝর্ণা! ঝর্ণা! আপনি ঠিক আছেন?" আকাশের চিন্তিত ও উৎকণ্ঠিত কণ্ঠস্বর পাহাড়ি বাতাসে ভেসে এল।

ঝর্ণা অবাক হয়ে ওপরে তাকাল। দেখে আকাশ হাপাচ্ছে, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। আকাশ কোনো কিছু না ভেবেই এক লাফে ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এল। ঝর্ণার পাশে বসে পড়ে বলল, "আরে এত পাগলামি করার কী দরকার ছিল? একলা একলা এমন বিপজ্জনক পথে কে আসতে বলেছে আপনাকে?"

ঝর্ণা যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে জবাব দিল, "আপনি... আপনি এখানে কীভাবে?"

"ক্যাম্পে আপনাকে না দেখে আর ট্রেকিং ট্রেইলে আপনার জুতার ছাপ দেখেই বুঝেছিলাম আপনি অমিয়াখুমের দিকে গেছেন। গাইড বলছিল পথটা খারাপ, তাই পিছু পিছু এলাম," আকাশ দ্রুত নিজের ব্যাগ থেকে ফার্স্ট এইড কিট বের করতে করতে বলল। "দেখি, কোথায় লেগেছে?"

আকাশ আলতো করে ঝর্ণার আঘাত পাওয়া পায়ের গোড়ালিটা হাত দিয়ে স্পর্শ করল। ঝর্ণা যন্ত্রণায় শিউরে উঠে আকাশের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।

"একটু সহ্য করুন, হাড় ভাঙেনি, মচকাজে গেছে মাত্র," আকাশ একদম শান্ত ও গম্ভীর গলায় বলল। সে নিজের ব্যাগ থেকে ব্যথানাশক স্প্রে আর ক্রেপ ব্যান্ডেজ বের করে খুব দক্ষ হাতে ঝর্ণার পায়ে পেঁচিয়ে দিল। আকাশের ছোঁয়ায় কেমন যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা আর আশ্বাস ছিল, যা ঝর্ণার ভেতরের ভয়টাকে নিমিষেই ভুলিয়ে দিল।

ব্যান্ডেজ বাঁধার পর আকাশ নিজের পিঠটা ঝর্ণার দিকে ঘুরিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। "উঠুন, আমার পিঠে উঠুন। এখান থেকে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়।"

ঝর্ণা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলল, "না না, এত ভারী ব্যাকপ্যাক আর আমাকে নিয়ে আপনি এই পাহাড়ি পথ উঠবেন কীভাবে? সম্ভব না!"

"তর্ক করার সময় এটা নয়," আকাশ একটু ধমকের সুরে বলল। "আপনার অহংকার সরিয়ে রেখে চুপচাপ উঠুন তো! নয়তো সারা রাত এই খাদেই পড়ে থাকতে হবে।"

ঝর্ণা আর কথা বাড়াতে পারল না। বাধ্য হয়ে সে আকাশের চওড়া পিঠে ভর দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল। আকাশ পরম যত্নে ঝর্ণাকে পিঠে তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে খাঁড়া পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠতে লাগল।

পাহাড়ের খাঁড়া চড়াই পার হওয়ার সময় আকাশের ঘন নিশ্বাসের শব্দ ঝর্ণার কানে আসছিল। ঝর্ণা খেয়াল করল, আগের দিনের সেই চঞ্চল, ফাজিল ছেলেটি এখন কতটা দায়িত্বশীল ও মমতাময়। আকাশের ওপর তার জমানো সব রাগ আর ক্ষোভ যেন পাহাড়ি কুয়াশার মতোই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।

পিঠে ঝর্ণার হালকা উপস্থিতি আর তার মৃদু নিশ্বাসের পরশ আকাশের ভেতরেও এক অজানা শিহরণ তৈরি করছিল। পাহাড়ের কুয়াশাচ্ছন্ন নীরবতায় দুজন দুটো মানুষের হৃদস্পন্দন যেন এক অন্যরকম বন্ধুত্বের সুর বাজাতে শুরু করল।

পাহাড়ি খাদের সেই দুর্ঘটনার পর থেকে ঝর্ণার প্রতি আকাশের যত্ন আর দায়িত্বশীলতা দেখে পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল। ক্যাম্পসাইটে ফেরার পর আকাশের বন্ধুদের উষ্ণ আপ্যায়ন আর সেবা ঝর্ণাকে এক নতুন অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করাল। বিশেষ করে আকাশ—যে ছেলেটিকে প্রথম দিন তার চরম বিশৃঙ্খলা আর বেয়াদব মনে হয়েছিল, সেই এখন ঝর্ণার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা।

দুদিন কাটল ক্যাম্পেই। ঝর্ণার পায়ের ব্যথা অনেকটাই কমে এসেছে, এখন সে আস্তে আস্তে হাঁটতে পারে। সাজিদ, রিয়াদ আর তানিয়া যখন নদীর ওপারে ঝরনার জলে গোসল করতে গেল, তখন ক্যাম্পের আমগাছটার ছায়ায় বসেছিল ঝর্ণা আর আকাশ।

বিকেলের সোনাঝরা রোদ পাহাড়ি নদীর জলের ওপর জমে থাকা নরম ফেনায় মায়াবী এক রূপ তৈরি করেছে। আকাশ তার ক্যানন ক্যামেরাটা নিয়ে ঝর্ণার অজান্তেই বেশ কয়েকটি ক্যান্ডিড ছবি তুলে ফেলল।

ক্যামেরার সাটার খট করে ওঠার শব্দে ঝর্ণা চমকে তাকাতেই আকাশ হেসে বলল, "আরে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই! এবার আর ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে তুলিনি, একদম সামনাসামনিই তুললাম।"

ঝর্ণা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, "অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা একদম বেআইনি! দেখি কেমন ছবি তুললেন?"

আকাশ এগিয়ে এসে ঝর্ণার পাশে বসল। ক্যামেরার ডিসপ্লে স্ক্রিনটা ঝর্ণার দিকে ঘুরিয়ে দিল। স্ক্রিনে নিজেকে দেখে ঝর্ণা সত্যি অবাক হয়ে গেল। পাহাড়ি আলো-ছায়ার পটভূমিতে তার মুখের সেই স্বাভাবিক সরলতা আর উদাস দৃষ্টিকে আকাশ এত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, যা ঝর্ণা নিজে আলোকচিত্রী হয়েও নিজের ছবিতে কখনো পায়নি।

"অসাধারণ হয়েছে...", ঝর্ণা বিড়বিড় করে বলল। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে যোগ করল, "তবে ভাববেন না আমি আপনার প্রশংসায় গলে যাচ্ছি!"

আকাশ হো-হো করে হেসে উঠল। "আপনাকে গলানো যে সাধ্যের অতীত, তা তো প্রথম দিনই বুঝেছি! কিন্তু জানেন ঝর্ণা, এই যে আপনি কোনো কৃত্রিমতা ছাড়া সোজা ব্যাটে-বলে কথা বলেন, এটাই আপনার সবচেয়ে সুন্দর দিক।"

আকাশের এই হঠাৎ করা আন্তরিক প্রশংসায় ঝর্ণার গালে একচিলতে লাজুক লালচে আভা খেলে গেল। সে দৃষ্টি সরিয়ে নদীর স্রোতের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছে।

ঝর্ণা কথা ঘোরানোর জন্য বলল, "আপনি এত ঘুরে বেড়ান কেন? শহরে কি আপনার মন টিকে না?"

আকাশ নদীর জলে ছোট একটা পাথর কুড়িয়ে ফেলে দিয়ে বলল, "শহরের চারদেওয়াল আর ইট-কাঠের ইট-পাথরের জীবন আমাকে দমবন্ধ এনে দেয়। প্রকৃতির মাঝে এলেই মনে হয় আমি সত্যি সত্যি বেঁচে আছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই যে পথের বাঁকে বাঁকে অচেনা মানুষদের সাথে পরিচয়, কিছু নতুন অনুভূতি... এই যেমন আপনার মতো একজন জেদি আর কড়া মেজাজের ফোটোগ্রাফারকে পাওয়া—এগুলোই তো জীবনের আসল সঞ্চয়।"

কথাটা বলেই আকাশ ঝর্ণার দিকে এক অদ্ভুত মায়ামাখা চোখে তাকাল। ঝর্ণাও চোখ মেলাতেই দুজন দুজনের দৃষ্টিতে হারিয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য। বনের নীরবতা, পাহাড়ি হাওয়ার মৃদু গুঞ্জন আর ভেজা মাটির সুবাস যেন তাদের দুজনকে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধতে শুরু করেছে।

ঝর্ণা মনে মনে অনুভব করল, আকাশের প্রতি তার এই অনুভূতি আর স্রেফ সাধারণ কোনো সহযাত্রীর নয়। এটা রাগের মেঘ কেটে গিয়ে উদয় হওয়া এক শান্ত, গভীর ভালোলাগা। প্রকাশ না করলেও, দুজন মানুষের নীরব চোখের ভাষায় ভালোবাসার প্রথম বীজটি যেন অলক্ষ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে গেল।

রেমাক্রির দিনগুলো যেন ডানা মেলে উড়ছিল। আকাশের সাথে ঝর্ণার সম্পর্ক এখন আর কেবল হাইকিং পার্টনার বা সহযাত্রীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে রাতে নক্ষত্র চেনার খেলা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতেই যেন তারা দুজন। আকাশের উপস্থিতি ছাড়া ঝর্ণার একটা মুহূর্তও আর ভাবতে ইচ্ছে করছিল না। মনে মনে সে স্বীকার করে নিয়েছে, এই চঞ্চল বাউন্ডুলে ছেলেটি তার মনের এক বিশাল অংশ জুড়ে জায়গা করে নিয়েছে।

দিনটি ছিল বান্দরবান ক্যাম্পের শেষ দিন। পরদিনই সবাইকে নিজ নিজ শহরে ফিরে যেতে হবে। বিকেলবেলা তাঁবু গুছানোর কাজ চলছিল। ঝর্ণা নদীর পাড়ে পাথরের ওপর বসে শেষ বারের মতো পাহাড়ের সৌন্দর্য ক্যানভাসে বন্দী করছিল। তার মনে এক অদ্ভুত মিষ্টি অনুভূতি আর সামান্য বিষাদ জমা হয়ে ছিল—আজ রাতে কি আকাশ তাকে মনের কথাটি বলবে? সে নিজেও কি পারবে নিজের ভালোলাগার কথা স্বীকার করতে?

এমন সময় ক্যাম্পের দিক থেকে একদল নতুন ট্রাভেলার এসে হাজির হলো। তারা আকাশের পূর্বপরিচিত বন্ধু। সেই দলে ছিল তিশা নামের একটি অত্যন্ত চঞ্চল ও চাটুকার স্বভাবের মেয়ে। তিশা এসেই আকাশের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল, "আরে আকাশ! তুই এখানে?"

আকাশ ব্যাকপ্যাক গোছানো ছেড়ে তাকাতেই তিশা দৌড়ে এসে ঝর্ণার একদম চোখের সামনে কোনো কিছু না ভেবেই আকাশকে জড়িয়ে ধরে ডান গালে একটা চুমু এঁকে দিল!

"কতদিন পর তোকে দেখলাম বল তো! তুই তো একদম গায়েব হয়ে গিয়েছিলি!", তিশা হাসতে হাসতে আকাশের হাত ধরে ঝুলতে লাগল।

আকাশ হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ল। সে তাড়াতাড়ি তিশাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, "আরে তিশা, শান্ত হ! তুই হুট করে কোত্থেকে?"

কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। নদীপাড়ে বসে দৃশ্যটি দেখে ঝর্ণার মাথার ভেতরে যেন এক নিমেষে বজ্রপাত হলো! তার বুকের ভেতরের এতদিনের মিষ্টি স্বপ্নগুলো কাচের মতো চুরমার হয়ে গেল। তার মনে হলো, আকাশ হয়তো সবার সাথেই এমন হালকা মেজাজে মেশে, আর সে বোকার মতো আকাশের নরম কথাগুলোকে নিজের জন্য বিশেষ কিছু ভেবে বসেছিল! আকাশ নিশ্চয়ই তার সাথে কেবল একটা খেলা খেলছিল!

তীব্র অভিমানে আর অপমানে ঝর্ণার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সে এক সেকেন্ডও আর সেখানে দাঁড়াল না। নিজের আঁকা স্কেচবুক আর ক্যামেরা ব্যাগটা একঝটকায় তুলে নিয়ে দৌড়ে ক্যাম্পের দিকে গেল।

আকাশ দূরে ঝর্ণাকে দ্রুত হেঁটে চলে যেতে দেখে তিশার হাত ছাড়িয়ে চ্যাঁচাল, "ঝর্ণা! শোনো, শোনো এক মিনিট!"

কিন্তু ঝর্ণা ততক্ষণে নিজের গাইডকে ডেকে জিনিসপত্র গাড়িতে তোলার নির্দেশ দিয়েছে। সে আকাশের কোনো ডাক বা ব্যাখ্যার অপেক্ষা করতে রাজি ছিল না।

আকাশ ছুটে এসে ঝর্ণার পথ আটকে দাঁড়াল, "ঝর্ণা, তুমি ভুল বুঝছ! তিশা স্রেফ আমার পুরনো ফ্রেন্ড, ও একটু চ্যাটারবক্স আর বেশি ফ্র্যাংক, ও স্রেফ মজা করছিল..."

ঝর্ণা আকাশের দিকে এমন এক বরফশীতল দৃষ্টিতে তাকাল, যা আকাশের মুখের কথা আটকে দিল। ঝর্ণার চোখে ছিল তীব্র ঘৃণা আর কষ্টের ছাপ।

"আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাকে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হবে না, মি. আকাশ," ঝর্ণা অত্যন্ত হিমশীতল ও কঠোর গলায় বলল। "আমি কাল সকালের জন্য অপেক্ষা করছি না। আমি এখনই চাটগাঁর শেষ বাসে ঢাকা ফিরে যাচ্ছি। আর দয়া করে আমার পিছু নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।"

"ঝর্ণা, প্লিজ কথাটা শোনো..." আকাশ হাত বাড়িয়ে আকুতি জানাল।

কিন্তু ঝর্ণা একঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়িটি পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে ধুলো উড়িয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।

ঝর্ণার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইল আকাশ। পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস যেন তাদের সব হাসি-আনন্দকে এক নিমিষে উড়িয়ে নিয়ে গেল, আর পেছনে ফেলে রেখে গেল এক বিশাল মেঘ ভাঙা বিষাদ।

ধোঁয়া ওঠা ঢাকার যান্ত্রিক শহরে ফেরত এসে ঝর্ণার দিনগুলো যেন এক বিষাদময় রুটিনে আটকে গেল। বান্দরবানের সেই সবুজ পাহাড়, সাঙ্গু নদীর কলতান আর পাইন বনের সুবাস এখন অতীত। তবে সবকিছুর চেয়েও বড় হয়ে বাজছিল আকাশের স্মৃতি। শহরের প্রতিটি কোলাহলে ঝর্ণা যেন আকাশের সেই হা-হা হাসির শব্দ শুনতে পেত।

ঝর্ণা নিজেকে কাজ নিয়ে ব্যস্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু ক্যানন ক্যামেরার গ্যালারি খুললেই যখন আকাশের না-বলা হাসির ছবিগুলো সামনে ভেসে উঠত, তার বুকের ভেতর এক অজানা হাহাকার জেগে উঠত। ঝর্ণা মনে মনে নিজেকেই গালি দিত—কেন সে ওই চঞ্চল ছেলেটির প্রেমে পড়তে গেল? কেন নিজের আবেগকে সামলে রাখল না? রাগের মাথায় বান্দরবান থেকে চলে আসলেও, প্রতিদিন বিকেলে জানালায় দাঁড়িয়ে সে অবচেতনভাবেই আকাশের কথা ভাবত। অভিমান আর ভালোবাসার এই দ্বন্দ্ব তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।

অন্যদিকে, ঢাকার অন্য প্রান্তে আকাশের অবস্থাও সুবিধাজনক ছিল না। ঝর্ণার না বলে এভাবে চলে যাওয়া আকাশের বুকে তীরের মতো বিঁধেছিল। তিশার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মজা যে তাদের মধ্যে এত বড় প্রাচীর তৈরি করে দেবে, তা আকাশ স্বপ্নেও ভাবেনি। ঝর্ণা চলে যাওয়ার পর আকাশ বান্দরবানের ক্যাম্পসাইটে আর এক মুহূর্তও টেকেনি।

আকাশের কাছে ঝর্ণার ফোন নম্বর ছিল না, এমনকি তার ঢাকার ঠিকানাও জানা ছিল না। শুধু এটুকু জানত, ঝর্ণা ধানমন্ডির দিকে থাকে আর সে পেশায় একজন স্বাধীন আলোকচিত্রী।

আকাশ ঝর্ণার খোঁজে একপ্রকার উন্মাদ হয়ে উঠল। ধানমন্ডি আর টিএসসি এলাকার প্রতিটি আর্ট গ্যালারি, ফোটোগ্রাফি এক্সিবিশন আর ভ্রমণপিপাসুদের আড্ডাস্থলে আকাশ চষে বেড়াতে লাগল। হাতের মুঠোয় ঝর্ণার তোলা সেই প্রজাপতির অসম্পূর্ণ ছবিটা নিয়ে সে শহরের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াল। বন্ধু রিয়াদ আর সাজিদ তাকে কত বোঝাল, "আরে ভাই, যার কোনো ঠিকানা নেই তাকে এভাবে খুঁজে পাবি?"

আকাশ গম্ভীর মুখে জবাব দিত, "যে মানুষটা পাহাড়ের ঢালে পিঠে ভর দিয়ে আমার নিশ্বাস গুনেছে, তার ঠিকানা আমার হৃদয় জানে। আমি ওকে ছাড়া আমার ট্রাভেল লাইফ ভাবতেই পারি না।"

টানা দুই সপ্তাহ ধরে শত খোঁজাখুঁজির পর, আকাশ হঠাৎ এক দিন এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারল ধানমন্ডির এক নামী আর্ট গ্যালারিতে "প্রকৃতি ও নারী" শিরোনামে এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছে। আর সেই প্রদর্শনীর অন্যতম আয়োজক আর আলোকচিত্রী হলেন—ঝর্ণা!

সংবাদটা শোনামাত্রই আকাশের মনে যেন আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল। সে নিজের ট্রেকিং জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে, হাতে একগুচ্ছ বুনো ফুল নিয়ে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ধানমন্ডির সেই গ্যালারির উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। হারানো সুরকে আবার খুঁজে পাওয়ার এক চরম ব্যাকুলতা তখন আকাশের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

ধানমন্ডির আলো-আঁধারিতে ঘেরা গ্যালারিটিতে ধীরলয়ে বেজে চলছিল মৃদু ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিক। দেয়ালজুড়ে টাঙানো চমৎকার সব আলোকচিত্র, যার বেশিরভাগই পাহাড়, নদী আর নির্জন পথের গল্প বলছিল। প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে নীরব হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল ঝর্ণা। পরনে তার সাধারণ একটি সুতির শাড়ি, চোখেমায়াবী কিন্তু একরাশ ক্লান্তির ছাপ।

হঠাৎ গ্যালারির দরজায় একটা শোরগোল পড়ে গেল। বৃষ্টির পানিতে অর্ধেক ভেজা অবস্থায় হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল আকাশ। তার পরনে সেই চেনা ট্রেকিং জ্যাকেট, হাতে একগুচ্ছ বুনো পাহাড়ি ফুল।

ঝর্ণা চোখ তুলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সে! ধানমন্ডির এত বড় শহরে, অসংখ্য মানুষের ভিড়ে আকাশ তাকে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলেছে?

আকাশের দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল ঝর্ণার ওপর। কোনো দর্শনার্থী বা আয়োজকদের দিকে খেয়াল না করে আকাশ সোজা পা বাড়াল ঝর্ণার দিকে। ঝর্ণা নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া ভাব ধরার চেষ্টা করল। পা বাড়িয়ে অন্য ঘরে চলে যেতে চাইল সে।

কিন্তু আকাশ এক চটুল পদক্ষেপে ঝর্ণার পথ আটকে দাঁড়াল।

"আবারও পালিয়ে যাচ্ছেন? বান্দরবান থেকে পালিয়েছেন, এখন গ্যালারি থেকেও পালাবেন?" আকাশের গলায় ছিল না আগের সেই ফাজিল মেজাজ, সেখানে ভর করেছিল এক চরম আকুলতা আর ক্লান্তি।

ঝর্ণা নিজেকে শক্ত রেখে চোখ তুলে তাকাল। "আপনি এখানে কী করছেন? কীভাবে এলেন?"

"আপনাকে খুঁজতে এসেছি। গত চৌদ্দ দিন ধরে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি আপনার একটু দেখা পাওয়ার জন্য," আকাশ ঝর্ণার চোখে চোখ রেখে বলল।

ঝর্ণা ঠোঁট বাঁকিয়ে বিষাদের হাসি হেসে বলল, "আমার মতো রাগী, কড়া মেজাজের ফোটোগ্রাফারকে খোঁজার কোনো দরকার ছিল না মি. আকাশ। আপনার চারপাশে তো কত চঞ্চল, ফ্র্যাংক বন্ধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিশার কাছে যানগে, আমার কাছে কী কাজ?"

আকাশ এক পা এগিয়ে এসে পরম মমতায় ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দুটি বাড়িয়ে দিল। "তিশার সেই আচরণ স্রেফ একটা বোকামি ছিল ঝর্ণা। ও আমার ছোটবেলার ফ্যামিলি ফ্রেন্ড, ওরকম চঞ্চল স্বভাবের বলেই ও হুট করে অমন মজা করে বসেছিল। কিন্তু আমার মনে তিশার জন্য কোনো জায়গা নেই। আমি বান্দরবানের সেই ঝোপের ভেতর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শুধু একজন ফোটোগ্রাফারকেই আমার মনে জায়গা দিয়েছি।"

আকাশ নিজের পকেট থেকে সেই প্রিন্ট করা ছবিটা বের করল—বান্দরবানের পাহাড়ি রোদে ঝর্ণার তোলা সেই স্নিগ্ধ ক্যান্ডিড ফোটো।

"তিশা চলে যাওয়ার পর আমি কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম, তা যদি আপনি জানতেন! আপনি না বলে চলে আসার পর আমার মনে হয়েছিল পাহাড়ি নদীর সব স্রোত শুকিয়ে গেছে। আমি কোনো খেলা খেলিনি ঝর্ণা। আপনাকে না দেখে এই দুই সপ্তাহ আমার জীবনের সবচেয়ে বিষাদময় দিন ছিল," আকাশের গলা ধরে এল।

ঝর্ণার ভেতরের জমানো সব মান-অভিমানের বরফ এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। সে দেখতে পেল আকাশের চোখে কোনো ছলনা নেই, আছে কেবল এক সত্য ও খাঁটি আকুলতা। এতদিনের জমানো কষ্ট আর চোখ আটকে রাখা জল এবার ঝর্ণার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।

আকাশ বুনো ফুলের তোড়াটা ঝর্ণার হাতে তুলে দিল। গ্যালারির এক কোণে দাঁড়িয়ে, বাইরের ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে দুজন মানুষের চোখের জল আর নীরব অনুভূতিগুলো যেন অবশেষে এক অচেনা ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা পড়ল।

গ্যালারির বাইরে তখনও ঝুম বৃষ্টি ঝরছিল। কিন্তু ঝর্ণার বুকের ভেতরে জমে থাকা কালবৈশাখীর মেঘগুলো ততক্ষণে পুরোপুরি কেটে গেছে। আকাশের চোখের আকুলতা আর সত্যতা তার সব অভিমান ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়েছে।

ঝর্ণা হাতের বুনো ফুলের তোড়াটির সুবাস নিল। তারপর আকাশের ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আপনার এই অদ্ভুত পাগলামির কোনো মানে হয়? সারা শহর ঘুরে বেড়ানোর কী দরকার ছিল? সোজা একটা ফোন করলেই তো পারতেন!"

আকাশ ভুরু কুঁচকে একটু আগের সেই চেনা শয়তানি হাসি হেসে বলল, "ফোন করব কীভাবে বলুন? আপনার ফোন নম্বর তো দূর, নাম ছাড়া কিছুই তো জানা ছিল না আমার! কিন্তু হৃদয়ের টান যদি সত্যি হয়, তবে বান্দরবানের জঙ্গল হোক আর ঢাকার ইট-কাঠের শহর—পথ কিন্তু ঠিকই চিনে নেয়।"

ঝর্ণা মিষ্টি করে হেসে আকাশের চোখে চোখ রাখল। সে অনুভব করল, এই মানুষটি ছাড়া তার সামনের দিনগুলোর ভ্রমণ একদম অসম্পূর্ণ।

গ্যালারির শেষ দর্শনার্থী চলে যাওয়ার পর, দুজন মিলে ধানমন্ডির লেকের ধারের ছায়াতলে এসে বসল। লেকের জলে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে রিং তৈরি করছিল। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও জায়গাটি যেন এক অলৌকিক শান্তিতে ভরে ছিল।

আকাশ ঝর্ণার হাতের ওপর আলতো করে নিজের হাত রাখল। এবার আর কোনো দ্বিধা বা সংকোচ ছিল না। আকাশ সোজা ঝর্ণার চোখে চোখ রেখে খুব গম্ভীর ও ভালোবাসামাখা স্বরে বলল, "ঝর্ণা, আমি তো বাউন্ডুলে মানুষ, সারা জীবন ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে পথ থেকে পথে ঘুরে বেড়ানোই আমার কাজ। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, আমার এই যাযাবর জীবনের আসল গন্তব্য আপনি। আমার সাথে সারাটা জীবন পৃথিবীর সব পাহাড়, নদী আর জঙ্গল চষে বেড়াবেন? আমার ক্যামেরার সব ফোকাস কি চিরকালের জন্য আপনার ওপরই থাকবে?"

ঝর্ণা চোখের কোণে জমা আনন্দের জল মুছে আকাশের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক স্বর্গীয় হাসি।

"আমি ভেবেছিলাম আপনি শুধুই ফাজিল এক ফোটোগ্রাফার, যে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ভুলফোকাস করে," ঝর্ণা হেসে বলল। "কিন্তু এখন দেখছি, আমার জীবনের সবচেয়ে সঠিক ফোকাসটাই আপনি করেছেন। আপনি ছাড়া আর কারো সাথে আমার ভ্রমণ করার কোনো ইচ্ছে নেই, আকাশ। ভালোবাসি আপনাকে।"

আকাশের মুখে যেন হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল। সে এক অপার শান্তিতে ঝর্ণার কপালে নিজের মাথা ছোঁয়াল।

তাদের গল্পের সূচনাটা হয়েছিল ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি আর পাহাড়ি খাদের বিরূপতায়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস কাটিয়ে সেই অশান্ত নদী আজ এসে মিশল শান্ত এক সুগভীর মোহনায়।

কয়েক মাস পর, বান্দরবানের সেই একই রেমাক্রির নদীর পাড়ে দুটি নতুন তাঁবু পাশাপাশি খাটানো হলো। এবার আর কোনো ঝগড়া নেই, নেই কোনো দূরত্ব। সাঁঝের বেলায় সাঙ্গু নদীর তীরে বসে আকাশ গিটারের তারে সুর তুলল, আর ঝর্ণা তার পাশটিতে বসে আকাশের কাঁধে মাথা রেখে সূর্যাস্তের ছবি তুলতে লাগল। দুটি বাউন্ডুলে প্রাণ এবার চিরতরে এক হয়ে খুঁজে পেল তাদের নিজস্ব ঠিকানা।

....
👁 80