অহংকার ভাঙার নীরব রাত

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা। ড্রয়িংরুমে কাচের গ্লাসে টুংটাং চামচ নাড়ার শব্দ ছাড়া পুরো বাড়ি নিঝুম। নতুন বাড়িতে আজ অর্ণবের তৃতীয় দিন, কিংবা বলা ভালো, অনীকার জীবনের সবচেয়ে অচেনা একটা অধ্যায়ের তৃতীয় দিন।

বাড়ির বড়দের জোড়াজোড়িতেই বিয়েটা হয়েছে। পরিবারের সম্মান আর ব্যবসার সম্পর্ক রাখতে গিয়ে দুই অচেনা মানুষ এখন এক ছাদের নিচে। বিয়ের পরদিনই অর্ণব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, "আমি কোনো নাটক পছন্দ করি না অনীকা। এই বিয়েটা পরিবারের ইচ্ছেতেই হয়েছে, তুমিও জানো আমিও জানি। তাই আমার থেকে স্ত্রীর অধিকারের মতো বড় কিছু আশা না করলেই ভালো করবে।"

অনীকা সেদিন কোনো কথা বলেনি। শুধু ধীরপায়ে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে আলমারিতে তুলে রেখেছিল। গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে হলেও অনীকার মধ্যে একটা অদ্ভুত আত্মসম্মানবোধ আছে। সে বুঝে নিয়েছিল, এই সম্পর্কটা একটা চুক্তির মতো, যেখানে কোনো জোর নেই, ভালোবাসা তো দূরের কথা।

আজ সকালে অর্ণব যখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল, অনীকা নীরবে তার সামনে নাশতার প্লেট এগিয়ে দিল। গরম পরোটা আর ডিম ভাজি। অর্ণব একবার চোখ তুলে অনীকাকে দেখল। সুতি শাড়িতে পরিপাটি একটা মেয়ে, যার চোখে মুখে একরাশ ক্লান্তি আর নীরবতা।

"চা দেব?" অনীকা প্রথম কথা বলল। কণ্ঠস্বর একদম খাঁটি, যেন শান্ত নদীর ঢাল।

"না, সময় নেই," সংক্ষেপে উত্তর দিল অর্ণব। হাতঘড়িটা পরতে পরতে ল্যাপটপের ব্যাগটা তুলে নিল সে।

অর্ণব বেরিয়ে যেতেই অনীকা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের বাসাটা ধানমন্ডির এক শান্ত গলিতে। বারান্দায় টবে কয়েকটা বেলী আর গোলাপের চারা ঝুলে আছে, ফুফু শাশুড়ি খুব যত্ন করে লাগাতেন। অনীকা হাত দিয়ে বেলী ফুলের কুঁড়িটা স্পর্শ করল। তার ফুফু সবসময় বলতেন, 'সংসার আলো দিয়ে গড়তে হয়, জোর দিয়ে নয়।' কিন্তু অর্ণবের সেই বরফশীতল চাহনি আর গম্ভীর গলা কি কোনোদিন আলো চিনবে?

বিকেলের দিকে ঝুম বৃষ্টি নামল ঢাকায়। রাস্তার মোড়ে পানি জমে যাওয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। অনীকা রান্নাঘরে গিয়ে অর্ণবের পছন্দের খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা তৈরি করতে লাগল। কাজের মেয়ে মরিয়ম তাকে সাহায্য করতে চাইলে সে বলল, "না মরিয়ম খালা, আমিই করছি। তোমার কাজ শেষ হলে তুমি যেতে পারো, বৃষ্টি বাড়ছে।"

মরিয়ম খালা চলে যাওয়ার পর পুরো ফ্ল্যাটটায় কেমন একটা নির্জনতা নেমে এল। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত আটটা বাজল, কিন্তু অর্ণবের আসার কোনো লক্ষণ নেই। ফোনে চেষ্টা করার কথা ভাবল অনীকা, কিন্তু আবার থমকে গেল। যার সাথে কোনো স্বাভাবিক সম্পর্কই নেই, তাকে ফোন করে কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার কি তার আছে?

রাত সাড়ে নয়টায় দরজার বেল বাজল। অনীকা গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে অর্ণব একদম একাকারে ভিজে একসা। অফিসের ছাতাটা বাতাসে উল্টে ভেঙে গেছে বোধহয়। জামাকাপড় থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে।

"তুমি এভাবে ভিজেছ?" অনীকা আর নিজেকে সামলাতে না পেরে তোয়ালেটা নিয়ে এগিয়ে এল।

অর্ণব তোয়ালেটা অনীকার হাত থেকে নিয়ে নিজের চুল মুছতে মুছতে একটু অবাক হয়ে তাকাল। সে ভেবেছিল অনীকা হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে বা নিজের মতো ব্যস্ত। কিন্তু অনীকা এখনো তার জন্যই অপেক্ষা করছিল?

"রাস্তায় ভীষণ জ্যাম ছিল, আর বাসও পাচ্ছিলাম না," অর্ণবের গলায় কেমন যেন একটা ক্লান্তির সুর। সে প্রতিদিনের মতো কঠিন হতে পারছে না আজ।

"তুমি হাত-মুখ ধুয়ে এসো, খাবার দিচ্ছি," অনীকা নরম সুরে বলল।

কয়েক মিনিট পর অর্ণব ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর বেগুন ভাজার ঘ্রাণে পুরো ঘর ভরে গেছে। অর্ণবের ভীষণ খিদে পেয়েছিল। এক লোকমা মুখে দিতেই তার মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে গেল।

"রান্নাটা বেশ ভালো হয়েছে," অর্ণব না চেয়েও বলে ফেলল।

অনীকা টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কথাটি শুনে তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু সে সেটা আড়াল করতে মুখ ফিরিয়ে নিল। "আরও একটু দেব?"

"না, চলবে," অর্ণব চট করে নিজের গম্ভীর ভাবটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা অদ্ভুত আলোড় সৃষ্টি হলো। এই শান্ত, নীরব মেয়েটা তাকে না চিনেও, ভালোবাসা না পেয়েও এত যত্ন করছে কেন?

রাতে ঘুমানোর সময় অর্ণব বিছানার একপাশে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। পাশের সোফায় অনীকা শুয়েছে, বরাবরের মতোই।

"অনীকা?" অর্ণব ডাকল।

অনীকা অন্ধকারে চোখের পাতা খুলল, "কিছু বলবে?"

"তুমি সোফায় কষ্ট পাচ্ছ। বিছানাটা তো যথেষ্ট বড়," অর্ণবের কণ্ঠস্বরে আজ কোনো আদেশ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত দ্বিধা।

অনীকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "না, আমি এখানেই ঠিক আছি। আপনার অসুবিধা হবে।"

অর্ণব আর কিছু বলল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে ফিরে শুল। ঘরের মধ্যে শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ আর বাইরে ঝরঝর বৃষ্টির আওয়াজ।

অর্ণব বুঝতে পারছিল না, কেন যেন অনীকার এই দূরত্বটা তার মনে একধরনের সূক্ষ্ম যন্ত্রণার জন্ম দিচ্ছে। আর সোফায় শুয়ে অনীকা ভাবছিল, অর্ণবের ওই ভেজা চোখের ক্লান্ত চাহনিটা কেন তার বুকের মধ্যে এত মায়া তৈরি করল?

দুজন মানুষ এক ঘরে শুয়ে, তাদের মাঝে কোনো ভালোবাসার প্রকাশ নেই, কোনো স্বীকারোক্তি নেই। কিন্তু এক অদৃশ্য সুতোয় যেন বাঁধন পড়তে শুরু করেছে, যা তারা দুজনের কেউই এখনও বুঝতে পারছে না—কিংবা বুঝতে চাইছে না।

ভোরের হালকা আলোয় অনীকার ঘুম ভাঙল। বৃষ্টি থেমে গেছে, তবে জানালার কাঁচে এখনও পানির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো আটকে আছে। সে সোফা থেকে উঠে আলতো পায়ে অর্ণবের দিকে তাকাল। গায়ে চাদরটা অগোছালো হয়ে জড়িয়ে আছে, কপালে হালকা ভাঁজ। ঘুমের মধ্যেও লোকটার মুখে কেমন যেন একটা গাম্ভীর্য লেগে থাকে। অনীকা নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে অর্ণবের গায়ের চাদরটা বুক পর্যন্ত টেনে দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণব একটু নড়েচড়ে চোখ খুলল। হঠাৎ অনীকাকে এত কাছাকাছি দেখে সে থমকে গেল। দুজন মানুষের চোখাচোখি হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। অনীকা যেন কোনো অপরাধ করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে, এমন ভঙ্গিতে দ্রুত হাত গুটিয়ে নিল।

"আমি... চাদরটা ঠিক করে দিচ্ছিলাম," অনীকা চোখ নিচু করে বলল। তার গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল।

অর্ণব কিছু বলল না। শুধু সোজা হয়ে বসল। প্রতিদিন সকালে তার মনটা একধরনের তিক্ততায় ভরে থাকে—অপ্রত্যাশিত এক জীবনের বোঝা টানার তিক্ততা। কিন্তু আজ সকালে এই অনাহূত যত্নটা তার বুকের ভেতর কোনো এক অচেনা জায়গায় একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। সে হাত বাড়িয়ে অনীকার দিকে না তাকিয়েই বলল, "ধন্যবাদ।"

অনীকা আর না দাঁড়িয়ে দ্রুত ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল। একটা মানুষের সাধারণ ধন্যবাদ শব্দটাই কেন তার মনে এত আলোড়ন তুলবে? অনীকা নিজেকে নিজে শাসাল—এই লোকটা তাকে ভালোবাসে না, এই সংসারটা শুধু একটা সামাজিক বাধ্যবাধকতা। বেশি আশা করা মানেই তো নিজেকে কষ্ট দেওয়া।

বিকেলের দিকে আকাশে আবার কালো মেঘ জমে উঠল। ঢাকা শহরের বর্ষা যেমন সুন্দর, তেমনি একাকীত্বের অনুভূতিটাও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনীকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেলী ফুলের চারাগুলোতে হাত বোলাচ্ছিল। তার আম্মা সবসময় বলতেন, 'সংসারটা একটা গাছের মতো, প্রতিদিন একটু একটু করে জল দিতে হয়, ভালোবাসা দিতে হয়, তবেই ফুল ফোটে।' কিন্তু অনীকার তো ভালোবাসার জল দেওয়ার কোনো অধিকারই নেই।

ঠিক তখন ঘরের ফোনটা বেজে উঠল। কাজের মেয়ে মরিয়ম এসে বলল, "অনিকা আপা, ভাইজান ফোন করছে।"

অনীকা একটু অবাক হলো। অর্ণব কখনো তাকে ফোন করে না। কোনো দরকার হলে মরিয়মকেই ফোন দেয়। সে ধীর পায়ে গিয়ে রিসিভারটা কানে তুলল। "হ্যাঁ, বলুন?"

ওপাশ থেকে অর্ণবের কণ্ঠ ভেসে এল, কিন্তু গলাটা কেমন যেন জড়ানো আর দুর্বল। "অনীকা... আমার কেমন যেন খুব খারাপ লাগছে। মাথাটা অসম্ভব ঘুরছে।"

"কী হয়েছে আপনার? আপনি কোথায় এখন?" অনীকার মনটা এক নিমেষে উদ্বেগে ভরে উঠল। তার কন্ঠে লুকানো ভয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

"আমি অফিসে... গাড়ির ড্রাইভ করার মতো অবস্থা নেই। আমি একটা সিএনজি নিয়ে বাড়ি ফিরছি।"

অর্ণব আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দিল। অনীকার হাত থেকে রিসিভারটা প্রায় খসে পড়ছিল। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে রান্নাঘরে গিয়ে পানি গরম দিল, ঘরে লেবু আর আদা আছে কিনা দেখে নিল। তার নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল—সকালে লোকটার চেহারা দেখেও কেন সে খেয়াল করল না যে তার শরীর ভালো নেই?

আধঘণ্টার মধ্যে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হলো। অনীকা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল অর্ণব দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখখানা একবারে ফ্যাকাশে, কপালে ঘামের ফোঁটা।

"অর্ণব!" অনীকা আগপাছ না ভেবে অর্ণবের একটা হাত নিজের কাঁধে টেনে নিল।

অর্ণব নিজেকে সামলাতে না পেরে অনীকার ওপর কিছুটা ভর দিল। মেয়েটার সামান্য শরীরে এত গায়ের জোর কোত্থেকে এল, তা অর্ণব জানে না; কিন্তু অনীকা খুব সাবধানে তাকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।

অর্ণবের কপালে হাত দিয়ে অনীকা চমকে উঠল। গা যেন আগুনে পুড়ছে! ভীষণ জ্বর।

"আপনি এত ধকল সয়ে অফিসে গেলেন কেন?" অনীকার গলায় এবার অনুযোগের সুর, যা এতদিন ছিল না।

অর্ণব চোখ বন্ধ করেই একটা হালকা হাসি হাসল, "কাজ তো করতেই হবে অনীকা..."

অনীকা কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত বাটিতে ঠান্ডা পানি আর পরিষ্কার সুতি কাপড় নিয়ে এল। সারারাত ধরে অনীকা বিছানার পাশে বসে রইল। প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর সে অর্ণবের কপালে ঠান্ডা জলপট্টি দিতে লাগল। অর্ণব জ্বরের ঘোরে কয়েকবার অনীকার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল, বিড়বিড় করে বলল, "আমার খুব ঠান্ডা লাগছে..."

অনীকা তার নিজের হাতের উষ্ণতা দিয়ে অর্ণবের হাতটা চেপে রাখল। সারা রাতে সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করেনি।

পরদিন ভোরে অর্ণবের জ্বরটা নামল। চোখ খুলে সে দেখল, জানালার হালকা আলো এসে পড়েছে অনীকার মুখে। অনীকা তার বিছানার পাশে কাঠের চেয়ারটায় বসে আছে, মাথাটা বিছানার এক কোণে রাখা, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার একটা হাত এখনও অর্ণবের হাতের তালুর নিচে চাপা পড়ে আছে।

অর্ণব নিঃশব্দে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো মেকআপ নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই। শুধু একরাতের সেবার চিহ্ন ফুটে আছে তার ক্লান্তিভরা মুখে। অর্ণব খুব সাবধানে তার অন্য হাতটা বাড়িয়ে অনীকার মাথায় হাত রাখল। অনীকার চুলগুলো ভীষণ নরম।

হঠাৎ অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে এল। যে মেয়েটাকে সে নিজের জীবনে কোনো স্থান দিতে চায়নি, সে মেয়েটাই সারারাত জেগে তার সেবা করেছে। কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়া, কোনো অধিকারের দাবি না তুলে।

'অনিকা কি আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে?'—এই চিন্তাটা অর্ণবের মাথায় আসতেই তার নিজের হৃদয়টাই যেন জোরে স্পন্দিত হয়ে উঠল। আর সে নিজে? সে কি শুধুই কৃতজ্ঞতা অনুভব করছে, নাকি অন্য কিছু?

অর্ণব হাতটা সরিয়ে নিতেই অনীকার ঘুম ভেঙে গেল। সে চট করে সোজা হয়ে বসে বলল, "জ্বর কমেছে? এখন কেমন লাগছে আপনার?"

"অনেকটা ভালো," অর্ণব নিচু গলায় বলল। "তুমি সারারাত ঘুমাওনি, তাই না?"

অনীকা একটু অস্বস্তিতে পড়ে চোখ সরাতে চেষ্টা করল। "ও কিছু না। ডাক্তার ডেকে দেব?"

"না, ডাক্তার লাগবে না। তোমার কালকের সেবাই ডাক্তারদের চেয়ে বেশি কাজ করেছে," অর্ণব সহজভাবেই বলল, কিন্তু কথাটা শুনে অনীকার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মিষ্টি ঢেউ খেলে গেল। সে মুখ লুকিয়ে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল, যাতে অর্ণব তার লাল হয়ে যাওয়া গাল দুটো দেখতে না পায়।

দুই অচেনা মানুষের মধ্যে জমে থাকা বরফটা গলতে শুরু করেছে। কিন্তু বরফ গলার সেই নদীটা ভালোবাসার সাগরে গিয়ে মিলবে তো? নাকি মনের কথা মনেই থেকে যাবে সংকোচের দেয়াল ডিঙাতে না পেরে?

অর্ণবের শরীরটা এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবে ডাক্তার আরও দু'দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে অর্ণব এখন সারাদিন ঘরেই থাকে। এই দু'দিনে তাদের চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন বদলে গেছে। আগের সেই থমথমে নীরবতা আর নেই, বরং তার জায়গায় এসেছে একধরনের নরম, মিষ্টি আড়ষ্টতা।

সকালে অর্ণব লিভিং রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। অনীকা ট্রেতে করে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ নিয়ে এল।

"আপনার চা," মৃদু গলায় বলল অনীকা।

অর্ণব চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে অনীকার দিকে তাকাল। "তুমি খাবে না?"

"আমি রান্নাঘরে খেয়ে এসেছি," অনীকা চলে যেতে চাইল, কিন্তু অর্ণব থামাল।

"অনীকা, বসো একটু। প্রতিদিন তো একা একাই চা খাই, আজ না হয় দুজনে একসাথে খেলাম।"

অর্ণবের এই সাধারণ অনুরোধটা অনীকার বুকে বড় মৃদু হয়ে বাজল। সে বারান্দার ছোট কাঠের চেয়ারটায় বসল। অনীকার হালকা গোলাপি সুতি শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে। বারান্দার টবের বেলী ফুলগুলো আজ ফুটেছে, মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে চারপাশে।

অর্ণব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, "তুমি সেদিন সারারাত জেগে না থাকলে হয়তো আমার জ্বরটা এত সহজে কমত না। আমি আসলে বুঝতে পারিনি তুমি..."

অর্ণব কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে দিল। অনীকাও চোখ তুলে তাকাল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের শাড়ির পার মোচড়াতে মোচড়াতে বলল, "ওটা তো আমার দায়িত্ব ছিল। এতে ধন্যবাদ বা অপরাধবোধের কিছু নেই।"

'দায়িত্ব'—শব্দটা শুনে অর্ণবের মনটা কেন যেন একটু দমে গেল। সে কি শুধুই দায়িত্ব থেকে এসব করেছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো আবেগ লুকিয়ে আছে, যা অনীকা মুখ ফুটে বলতে পারছে না?

অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে স্বীকার করুক আর না-ই করুক, এই কয়েকদিনে অনীকা তার অভ্যাসে পরিণত হতে শুরু করেছে। সকালে ঘুম ভাঙলে অনীকার মুখটা দেখার ইচ্ছা, অনীকার হাতের চায়ের স্বাদ, আর তার এই শান্ত উপস্থিতি—সবকিছুই অর্ণবের কঠিন মনটাকে নরম করে দিচ্ছে।

দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। মুষলধারে বৃষ্টি। অনীকা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল খিচুড়ি আর মাছ ভাজার তদারকিতে। এমন সময় ড্রয়িংরুম থেকে পানির ছাট আসার শব্দ শুনে সে সেদিকে দৌড়ে গেল।

বারান্দার দরজা খোলা থাকায় বৃষ্টির পানি ভেতরে চলে আসছে। অনীকা দ্রুত জানালার কাঁচ টানতে গেল, কিন্তু তখনই অর্ণবও এল পর্দাগুলো বাঁচাতে। দুজনে একসাথে জানালার হাতল ধরতে গিয়ে অর্ণবের হাতটা অনীকার হাতের ওপর গিয়ে পড়ল।

অনীকার স্পর্শে অর্ণবের শরীরে যেন এক বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। অনীকাও থমকে দাঁড়াল। বৃষ্টি ভেজা ঝোড়ো বাতাসে পর্দাগুলো উড়ছিল, আর তারা দুজন দুজনার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। অনীকার চোখের আয়নায় অর্ণব নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। সেই চোখে ভয় নেই, কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক গভীর, অব্যক্ত অনুভূতি।

অর্ণব হাতটা সরাল না। বরঞ্চ আরও একধাপ এগিয়ে এসে অনীকার মুখের দিকে তাকাল। অনীকার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করেছে। অর্ণবের খুব ইচ্ছা করছিল অনীকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে—'আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি অনীকা।'

কিন্তু তার ভিতরের অহংকার আর পুরনো সংকোচ তাকে আটকে দিল। বিয়ের প্রথম দিন সে নিজে মুখে যা বলেছিল, সেই কথাগুলোই এখন তার গলার কাঁটা হয়ে বিধছে। অনীকা যদি তাকে ফিরিয়ে দেয়? অনীকা যদি এটাকে শুধুই ‘চুক্তি’ বা ‘দায়িত্ব’ মনে করে?

অনীকাও অর্ণবের চোখের অতল চাহনিতে হারিয়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই মানুষটার প্রতি তার ভালোলাগা কেবল আর মায়ায় সীমাবদ্ধ নেই, তা গভীর ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। কিন্তু সে কীভাবে বলবে? যে লোকটা তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে দ্বিধা করেছিল, তার সামনে নিজের হৃদয়টা তুলে ধরে অনীকা নতুন করে অপমানিত হতে চায় না।

"বৃষ্টি আসছে... জানালাটা আটকে দিই," অনীকা ধীরগায়ে হাতটা সরিয়ে নিয়ে একদম সোজা হয়ে দাঁড়াল।

অর্ণব নিজেকে সামলে নিয়ে একটু পিছিয়ে এল। "হ্যাঁ, আটকে দাও।"

দুজনেই জানালা আটকে দিল, কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা অনুভূতির জানালাগুলো যে আর বন্ধ করা যাচ্ছিল না।

টেবিলে খাবার বাড়ার সময় অর্ণব অনীকাকে খেয়াল করছিল। অনীকার হাতের চঞ্চলতা, খাবার বেড়ে দেওয়ার ঢং—সবকিছুর মধ্যেই যেন এক অদৃশ্য বন্ধন জড়িয়ে আছে। অর্ণব নিজের প্লেটে এক টুকরো মাছ তুলে নিয়ে বলল, "কাল থেকে আবার অফিসে যাব। অনেক কাজ জমে গেছে।"

অনীকা থমকে দাঁড়াল। সে মৃদু কণ্ঠে বলল, "শরীরটা তো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। আরও একদিন থাকলে হতো না?"

অর্ণব অনীকার দিকে তাকাল। অনীকার কন্ঠের এই আকুলতাটুকু অর্ণবের মনকে এক স্বর্গীয় সুখে ভরিয়ে দিল। কিন্তু সে মুখে বলল, "না, অফিসে যাওয়া দরকার। তবে... বিকেলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।"

'তাড়াতাড়ি ফিরে আসব'—এই সামান্য কথাটা অনীকার মনে যেন এক চিলতে রোদ এনে দিল। সে মনে মনে ভাবল, অর্ণব কি সত্যিই তার টানেই তাড়াতাড়ি ফিরতে চায়? নাকি এটাও শুধু কথার কথা?

সন্ধ্যাবেলা অনীকা ড্রয়িংরুমে একা বসেছিল। বই পড়ার চেষ্টা করছিল সে, কিন্তু বইয়ের পাতায় শুধু অর্ণবের সেই চোখের দৃষ্টি ভেসে উঠছিল।

দুজনেই এখন ভালোবাসার এক গভীর সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পাড়ে ওঠার ক্ষমতা বা সাহস কারও নেই। সংকোচ আর ভয়ের এক শক্ত দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে তাদের মাঝখানে। কে প্রথম সেই দেয়াল ভাঙবে? নাকি এই নীরব প্রেম আজীবন অধরাই থেকে যাবে?

অর্ণব অফিসে ফিরেছে আজ তিন দিন হলো। কিন্তু আগের মতো কাজের মধ্যে ডুবে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না। ফাইল দেখতে গিয়ে অনীকার ফর্সা মুখের শান্ত হাসিটা ভেসে ওঠে, ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে পড়ে তার সেই ভয়ার্ত, মায়াবী চোখের কথা।

অর্ণব নিজের স্বভাবের এই পরিবর্তন দেখে নিজেই অবাক হয়। যে মানুষটা কোনোদিন আবেগকে মূল্য দেয়নি, সে এখন প্রতি মুহূর্তে একটা মেয়ের উপস্থিতির জন্য ছটফট করছে। দুপুর তিনটে বাজতেই সে নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল। মন বলছে, এখনই বাড়ি ফিরে যায়।

অফিসের সহকর্মী ফারহান এসে অর্ণবের টেবিলে কফির কাপ রেখে বলল, "কী ব্যাপার অর্ণব? আজকাল তোকে খুব অন্যমনস্ক দেখায়। গায়ে জ্বর নেই তো আবার?"

অর্ণব হালকা হেসে বলল, "না, শরীর ঠিকই আছে।"

"তাহলে মনে হচ্ছে মনের জ্বর হয়েছে!" ফারহান রসিকতা করে বলল, "বিয়ের পর মানুষের চেহারায় যে একটা বদল আসে, তোর মধ্যে সেটা স্পষ্ট। ভাবীকে নিয়ে কবে আমাদের খাওয়াচ্ছিস বল?"

অর্ণব কফির কাপে চুমুক দিয়ে চুপ করে রইল। 'ভাবী' শব্দটা শুনে তার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত গর্ব অনুভব হলো। অনীকা তার স্ত্রী, শুধুই কি কাগজে-কলমে? না, এখন যে সে অর্ণবের সমস্ত ভাবনা জুড়ে রাজত্ব করছে। কিন্তু অনীকা কি তাকে স্বামী হিসেবে সত্যি মন থেকে মেনে নিয়েছে? নাকি এখনো শুধু ফুফু-ফুফাতো ভাইদের কথা ভেবে বাধ্য হয়ে এই সংসারে টিকে আছে?

অন্যদিতে অনীকা তখন ঘরে একা। অর্ণব অফিসে যাওয়ার পর থেকে পুরো বাড়িটা যেন খাঁ খাঁ করে। কাজের মেয়ে মরিয়ম এসে ঘর মুছে চলে গেছে। অনীকা আলমারি গুছানোর বাহানায় অর্ণবের শার্টগুলো সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখছিল। শার্টের কাপড়ে অর্ণবের ব্যবহৃত সুগন্ধির চেনা ঘ্রাণ।

অনীকা শার্টটা বুকের কাছে চেপে ধরে চোখ দুটো বন্ধ করল। এক গভীর ভালোবাসার অনুভূতি তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। "আমি কেন এত বোকা?" সে বিড়বিড় করে নিজেকে বলল, "যে লোকটা আমাকে ভালোবাসে না, তাকে নিয়ে কেন এত স্বপ্ন দেখছি?"

ঠিক তখনই অনীকার চোখ পড়ল ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ারের দিকে। সেখান থেকে একটা ছোট ডায়রি বের হয়ে আছে। অনীকা আগে কখনো অর্ণবের ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেয়নি। কিন্তু আজ কৌতুহল সামলাতে পারল না।

ডায়রিটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে গিয়ে অনীকার বুকটা কেঁপে উঠল। ডায়রির একদম শেষের পাতায়, যেখানে অর্ণব নিজের দরকারি নোট রাখে, সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—

'অনিকা একটা খুব সাধারণ মেয়ে। আমি জানি না এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী। তবে আমি চাই না সে আমার জীবনে কোনো আশা নিয়ে আসুক। ভালোবাসা আমার জন্য নয়, আর অনীকার জন্যও না।'

লেখাটা বেশ কিছুদিন আগের, হয়তো তাদের বিয়ের পরের দিনই লেখা। কিন্তু লেখাটা পড়া মাত্রই অনীকার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

"আমি সত্যি কত বোকা!" অনীকা ডায়রিটা সযত্নে আবার জায়গায় রেখে দিল। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, সে আর কখনো অর্ণবের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করবে না। নিজের অনুভূতিগুলোকে মনের একদম গভীরে কবর দিয়ে দেবে। যে মানুষটা শুরুতেই ভালোবাসা প্রত্যাখান করেছে, তার কাছে মায়ার হাত বাড়ানো আত্মসম্মানের পরিপন্থী।

বিকেল পাঁচটায় অর্ণব কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এল। বাজারে গিয়ে অনীকার পছন্দের কিছু তাজা ফল আর একটা বেলী ফুলের মালা কিনে এনেছিল সে। অর্ণব ভেবেছিল আজ অনীকার হাতে মালাটা তুলে দিয়ে সব সংকোচ ভেঙে দেবে।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই অর্ণব দেখল অনীকা ড্রয়িংরুমে বসে আছে। কিন্তু অনীকার মুখ থমথমে, চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে।

"অনীকা?" অর্ণব উৎসুক গলায় ডাকল, "শরীর খারাপ নাকি? তোমার চোখ দুটো এমন লাল কেন?"

অনীকা ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। "না, কিছু হয়নি। ধুলো পড়েছিল চোখে। আপনি হাত-মুখ ধুয়ে নিন, চা দিচ্ছি।"

অর্ণব একটু অবাক হলো। অনীকার গলার আওয়াজটা এত বরফশীতল কেন? কালকের সেই নরম ভাবটা কোথায় গেল?

অর্ণব টেবিলের ওপর বেলী ফুলের মালাটা রেখে বলল, "তোমার জন্য এনেছিলাম..."

অনীকা ফুলগুলোর দিকে একবার তাকাল। তারপর খুব শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় বলল, "এসবের দরকার ছিল না। আপনি লোক দেখানো যত্ন না করলেও পারেন। আমি আমার সীমা জানি অর্ণব সাহেব, আপনারও নিজের সীমাটা মনে রাখা উচিত।"

কথাটা বলেই অনীকা সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিল।

অর্ণব টেবিলে দাঁড়িয়ে রটে গেল। 'অর্ণব সাহেব?' অনীকা তাকে আজ এই প্রথম এই নামে ডাকল! আর লোক দেখানো যত্ন?

অর্ণবের হাতের ফুলগুলো টেবিলে পড়ে রইল। তার মনের ভেতর এক তীব্র অভিমান আর যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। সে তো আজ নিজের সব সংকোচ ভুলে অনীকার দিকে হাত বাড়িয়েছিল, তবে অনীকা কেন তাকে এভাবে ছুড়ে ফেলে দিল?

দুজন মানুষের মনের দূরত্ব কমার বদলে যেন এক নিমেষে শতযোজন বেড়ে গেল। অনুভূতির ভুল বোঝাবুঝি তাদের ভালোবাসা প্রকাশের পথটাকে আরও কঠিন করে তুলল।

অর্ণবের হাত থেকে বেলী ফুলের মালাটা মেঝেই গড়িয়ে পড়েছিল। সেই সুবাসিত ফুলগুলো যেন এখন তাদের মধ্যে জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝির এক নিরব সাক্ষী। অর্ণব কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল না, হুট করে কী এমন ঘটল যে অনীকা আবার সেই শুরুর দিনের দেয়ালটা তুলে দিল?

রাতের খাবার টেবিলে এক অদ্ভুত নীরবতা। অনীকা খাবার বেড়ে দিয়েই নিজের ঘরে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু অর্ণব হাত ধরে থামাল। না, জোড় করে নয়, তার স্পর্শে ছিল এক ব্যাকুল আকুতি।

"অনিকা, একটু বসো," অর্ণব খুব নিচু স্বরে বলল, "আমার মুখোমুখি বসে দুটো কথা বলা কি খুব বেশি অন্যায় হবে?"

অনীকা থমকে দাঁড়াল। অর্ণবের কন্ঠের সেই অসহায়তা তার মনকে স্পর্শ করল ঠিকই, কিন্তু সকালে ডায়রিতে পড়া সেই শব্দগুলো—'ভালোবাসা অনীকার জন্য নয়'—তার বুকের ভেতরের আগুনটাকে আবার উসকে দিল। সে শান্তভাবে অর্ণবের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মুখোমুখি চেয়ারটায় বসল।

"বলুন, কী বলবেন?" অনীকার চোখ দুটো শীতল, নিষ্পলক।

অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আমি বুঝতে পারছি না আমি কী ভুল করেছি। আমি তো শুধু তোমার কাছে আসতে চেয়েছিলাম অনীকা। এই ফুল, এই পরিবর্তন... এগুলো কি লোক দেখানো মনে হলো তোমার?"

অনীকা একটু বাঁকা হাসল, যা তার স্বভাবের সাথে একদমই মেলে না। সে বলল, "অর্ণব সাহেব, মিথ্যা আশা দেওয়ার চেয়ে শুরুতেই সত্যিটা বলে দেওয়া ভালো। আপনি তো নিজেই লিখেছিলেন—আমি একটা সাধারণ মেয়ে, আর এই সম্পর্কে আপনার কোনো আশা নেই। ভালোবাসা আপনার বা আমার জন্য নয়। তাহলে আজ হঠাৎ এই যত্ন, এই ফুলের মালা কেন? নিজের লেখা কথাটা কি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?"

কথাগুলো শুনে অর্ণব যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর তার মনে পড়ল সেই ডায়রির কথা!

"তুমি... তুমি আমার ডায়রি পড়েছ?" অর্ণব সবিস্ময়ে শুধাল।

"হ্যাঁ, ভুল করেই পড়ে ফেলেছি," অনীকার গলায় অভিমান স্পষ্ট, "আর পড়ে ভালোই হয়েছে। অন্তত নিজের স্থানটা বুঝতে পেরেছি। দয়া করে আমার প্রতি এই কৃত্রিম মায়াটুকু দেখানো বন্ধ করুন। আমি আপনার কাছে স্ত্রীর অধিকার বা ভালোবাসা কোনোটাই দাবি করব না, কিন্তু দয়া করে আমায় করুণা করবেন না।"

অনিকা উঠে দাঁড়াল চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এবার অর্ণব চট করে উঠে এসে অনীকার দুটি হাত চেপে ধরল। তার চোখে আজ কোনো অহংকার নেই, কোনো সংকোচ নেই—আছে শুধু এক তীব্র ব্যাকুলতা আর সত্যি প্রকাশের আকুলতা।

"তুমি ভুল বুঝেছ অনীকা!" অর্ণবের গলা কেঁপে উঠল। "ওই ডায়রির লেখাটা আমাদের বিয়ের দ্বিতীয় দিনের! যখন আমি তোমাকে চিনতাম না, যখন আমার ধারণা ছিল এই বিয়েটা একটা মস্ত বড় ভুল। কিন্তু তুমি কি জানো তার পর থেকে এই ঘরে কী ঘটেছে?"

অনীকা চোখ তুলে তাকাল। অর্ণবের চোখের কোণে টলমল করছে জল। এই কঠিন, গম্ভীর লোকটার চোখে পানি দেখে অনীকার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

অর্ণব অনীকার হাত দুটি নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে বলল, "তোমার সেই রাতে না ঘুমিয়ে আমার সেবা করা, ঝড়ের দিনে ওই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, তোমার হাতের চায়ের কাপ, তোমার এই নিঃশব্দ উপস্থিতি—সবকিছু আমার সেই পুরনো অহংকার আর ভাবনাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে অনীকা! আমি বদলাতে শুরু করেছি, শুধুই তোমার জন্য। ডায়রির ওই পাতাটা ছিল আমার অতীতের ভুল ধারণা, আর আজকের এই আমিটা... এই আমিটা তোমাকে ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না।"

কথাগুলো যেন ঝড়ের বেগে এসে অনীকার মনে আছড়ে পড়ল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। অর্ণবের বুকের ধুকপুকানি সে নিজের হাতের তালুতে অনুভব করতে পারছে। প্রতিটা স্পন্দন যেন অনীকার নামটাই জপছে।

"তুমি সত্যিই বলছ?" অনীকার কণ্ঠস্বর একবারে ক্ষীণ হয়ে এল, চোখ দুটো নোনা জলে ভরে গেল।

"হ্যাঁ অনীকা," অর্ণব অনীকার এক ফোঁটা জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। "আমি কোনো দিন কাউকে ভালোবাসতে পারব না ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছ। কিন্তু... কিন্তু তুমি কি আমাকে কোনোদিন আপন করে নিতে পারবে? নাকি এই ভুল বোঝাবুঝিটাই আমাদের শেষ কথা?"

অনীকা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলা কান্নায় বুজে আসছিল। এতদিনের জমানো অভিমান, কষ্ট আর গোপন ভালোবাসা সব বাঁধ ভেঙে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে মাথা নিচু করে অর্ণবের বুকে নিজের মুখটা লুকাল।

অর্ণব অনীকাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বারান্দার বেলী ফুলের সুবাস যেন ঘরের বাতাসে মিশে গেল। দুজন মানুষ অবশেষে একে অপরের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছে, যেখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো অভিমান নেই—আছে শুধু ভালোবাসার এক গোপন, সুন্দর স্বীকারোক্তি।

কিন্তু প্রেম কি এত সহজেই শান্ত হয়ে যায়? জীবনের পাতায় নতুন ভোর এলে কি পুরোনো ঝড়ের মেঘ আর কভু ফিরে আসে না?

অর্ণবের বুকের উষ্ণতায় অনীকা নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল। এতদিনের জমানো ভয়, সংকোচ আর কান্নার নোনা জল অর্ণবের শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু অর্ণব অনীকাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল, যেন একমুহূর্ত শিথিল হলেই এই মায়াবী রূপকথাটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

"আমাকে ক্ষমা করে দাও অনীকা," অর্ণব নিচু গলায় বলল, তার ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছিল অনীকার সুবাসিত চুল। "তোমাকে বুঝতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল।"

অনীকা কান্নার মাঝেই হালকা মাথা নাড়ল। অর্ণবের বুক থেকে মুখ তুলে সে চোখের জল মুছল। দুজন দুজনের দিকে তাকাতেই ঘরের থমথমে ভাবটা যেন এক লহমায় মুছে গেল। সেদিনের ভুল বোঝাবুঝিটা কেটে যেতেই যেন পুরো পৃথিবীটা বদলে গেল তাদের কাছে।

পরদিন সকালের সূর্যটা যেন নতুন এক আলো নিয়ে এল।

অনীকা যখন ড্রয়িংরুমে এল, তখন অর্ণব সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। অনীকাকে দেখে সে কাজ বন্ধ করে এক অদ্ভুত মায়াবী চোখে তাকাল।

"আজও কি রান্নাঘরের চা একা একাই খাবে?" অর্ণবের গলায় হালকা দুষ্টুমির সুর।

অনীকা লাজুক হেসে চা আর নাশতার ট্রে নিয়ে এগিয়ে এল। অনীকার গালে মিষ্টি একটা টোল পড়েছিল, যা অর্ণব আগে কখনো খেয়াল করেনি। অনীকা চায়ের কাপটা দিতে গেলে অর্ণব শুধু চায়ের কাপ নয়, অনীকার নরম হাত দুটোও নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল।

"অর্ণব... ছাড়ুন, কাজ আছে," অনীকা মুখ নিচু করে বলল, গাল দুটো রাঙা হয়ে উঠেছে।

"থাকুক কাজ," অর্ণব চট করে অনীকার হাত দুটোতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। "আজ আমি কোথাও যাচ্ছি না। আজ পুরো দিনটা শুধু তোমার।"

অনিকার বুকের ভেতর ভালোবাসার সুখে একটা দোলা দিয়ে উঠল। যে মানুষটা একদিন তার দিকে ফিরেও তাকাত না, আজ তার সামান্য স্পর্শ পাওয়ার জন্য এত আকুল!

বিকেলের দিকে ঢাকা শহরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। অনীকা বারান্দায় গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল বৃষ্টির পানির দিকে। অর্ণব পেছন থেকে এসে অনীকার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। অনীকা চমকে উঠলেও সরলো না, বরঞ্চ অর্ণবের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।

"তোমার সাথে এই বৃষ্টি দেখতে আমার সারাজীবন কেটে যেতে পারে অনীকা," অর্ণব ফিসফিস করে বলল।

"আপনি এত মিষ্টি করে কথা বলতে পারেন, আগে তো বুঝিনি," অনীকা মৃদু হেসে বলল।

"কারণ আগে আমি অন্ধ ছিলাম," অর্ণব অনীকার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তাদের মুখ এখন সামান্য দূরত্বে। অর্ণবের চোখের অতল ভালোবাসায় অনীকা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমের ল্যান্ডফোনটা তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল।

মায়াবী পরিবেশটা মুহূর্তেই ভেঙে গেল। অনীকা নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে ফোনটা ধরতে গেল। ওপাশ থেকে ভেসে এল ফুফু শাশুড়ির আবেগঘন গলা।

"অনীকা মা? কেমন আছিস তোরা?"

"ভাল আছি ফুফু। আপনি কেমন আছেন?" অনীকা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল।

"মা রে, একটা দরকারী কথা বলতে ফোন করলাম। অর্ণবের বাবা তোদের বিয়ের খবরটা উনার এক পুরনো বন্ধুকে দেননি। উনি আজ হঠাৎ বিদেশ থেকে ফিরেছেন আর তোদের ওপর খুব রেগে আছেন। উনি অর্ণবের বাবার বড় উপকার করেছিলেন একসময়, আর উনার ইচ্ছে ছিল নিজের মেয়ে মেহজাবিনের সাথে অর্ণবের বিয়ে দেওয়ার।"

ফুফুর কথাটা শুনে অনীকার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠল।

ফুফু আবার বললেন, "মেহজাবিন আমেরিকা থেকে ফিরেছে আজ। ওরা কাল তোদের বাসায় আসছে তোদের দেখতে। তুই একটু সামলে চলিস মা, মেয়েটা একটু জেদী আর অর্ণবকে ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করে..."

ফোনটা রেখে অনীকা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অর্ণব এগিয়ে এসে অনীকার ফ্যাকাশে মুখ দেখে চিন্তিত গলায় বলল, "কী হয়েছে অনীকা? কে ফোন করেছিল?"

অনীকা অর্ণবের দিকে তাকাল। যে ভালোবাসার আলোটা মাত্র তাদের জীবনে ফুটতে শুরু করেছে, সেখানে কি আবার কোনো নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস আসছে? অনীকার মনটা এক অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে উঠল।

ফুফুর ফোনের পর থেকেই অনীকার মনে এক অজানা ভয়ের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছিল। ভালোবাসার যে নতুন আলোটা তারা দুজন দেখতে শুরু করেছে, তা কি এতই ভঙ্গুর?

পরদিন বিকেলে ঠিক কথা মতোই অর্ণবদের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে হাজির হলেন অর্ণবের বাবার সেই পুরনো বন্ধু আর তাঁর মেয়ে মেহজাবিন।

মেহজাবিন আধুনিক, চটপটে আর অসম্ভব সুন্দরী। ঘরে ঢুকেই সে অনীকাকে একপ্রকার উপেক্ষা করে সোজা অর্ণবের দিকে এগিয়ে গেল। "অর্ণব! আই ক্যান নট বিলিভ দিস! তুমি আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললে? তাও আবার এত জলদি?"

অর্ণব একটু দূরত্ব বজায় রেখে হেসে বলল, "আরে মেহজাবিন, কেমন আছ? বসো।"

অনীকা ট্রেতে করে স্ন্যাকস আর চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে এল। মেহজাবিন অনীকাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একঝলক দেখে নিয়ে একটু ঠাট্টার সুরে বলল, "সো, দিস ইজ ইউর ওয়াইফ? বেশ ট্র্যাডিশনাল আর সিম্পল। অর্ণব, আমি তো ভেবেছিলাম তুমি কোনো কর্পোরেট বা বোল্ড মেয়েকে বিয়ে করবে। এনিওয়ে, চয়েস চেঞ্জ হয়েছে মনে হচ্ছে!"

মেহজাবিনের কথার পেছনের সূক্ষ্ম খোঁচাটা অনীকার বুকে তীরের মতো বিঁধল। অনীকা চুপচাপ চা পরিবেশন করতে লাগল। কিন্তু অর্ণব কিন্তু মেহজাবিনের এই ব্যবহার মোটেও পছন্দ করল না।

অর্ণব অনীকার পাশে গিয়ে সোফায় বসল এবং সবাই সামনে খুব স্বাভাবিকভাবেই অনীকার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "অনিকা সাধারণ বলেই ও আমার কাছে অসাধারণ মেহজাবিন। আর আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্ত ছিল অনীকাকে বিয়ে করা।"

অর্ণবের এই প্রকাশ্য সাপোর্ট আর চোখের দৃঢ়তা দেখে মেহজাবিনের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। আর অনীকার বুকটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠল। তার মন বলছিল, যে মানুষটা সবার সামনে এভাবে তার হাত ধরতে পারে, তার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই।

সন্ধ্যায় অতিথিরা চলে যাওয়ার পর ঘর জুড়ে এক থমথমে নীরবতা নেমে এল। অনীকা রান্নাঘরে কাটাকুটি করছিল। অর্ণব রান্নাঘরে ঢুকে অনীকার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

"অনিকা?"

অনীকা ঘুরে তাকাল না, "বলুন।"

"তুমি কি মেহজাবিনের কথায় কষ্ট পেয়েছ?" অর্ণবের গলায় একরাশ দুশ্চিন্তা।

অনীকা এবার কাজ থামিয়ে অর্ণবের দিকে ফিরল। তার চোখে আজ আর কোনো দ্বিধা বা সংশয় ছিল না। সে মৃদু হেসে বলল, "একটু পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি যখন আমার হাতটা ধরলেন, তখন সব কষ্ট ধুয়েমুছে গেছে।"

অর্ণব অনীকার কাছাকাছি এসে তার গাল দুটো দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। "আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি অনীকা, পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের মাঝখানে আসতে পারবে না। আমি অনেক দেরিতে তোমাকে চিনেছি, কিন্তু এখন তুমিই আমার পুরো অস্তিত্ব।"

অনিকা অর্ণবের বুকে মাথা রাখল। বাইরে আবার হালকা টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তবে আজকের এই বর্ষা অনীকার মনে কোনো একাকীত্ব এনে দিচ্ছে না, আনছে এক গভীর পূর্ণতার অনুভূতি।

অর্ণব অনীকার কপালে এক দীর্ঘ, উষ্ণ পরশ আঁকে। ভালোবাসার এই নীরব কাব্য যেন সব বাধা পেরিয়ে এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু তাদের এই ভালোবাসার চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে? আগামী কালই কি শেষ হবে এই না বলা প্রেমের গল্প?

মেহজাবিনের চলে যাওয়ার পর দিনগুলো যেন এক অন্য রূপ ধারণ করল। কোনো বড় ধাক্কা কিংবা তৃতীয় কারো উপস্থিতি ছাড়াই অর্ণব আর অনীকার জীবনের রূপকথাটা নিজস্ব গতিতে এগোতে লাগল। তবে সেই গতির পেছনে ছিল এক নতুন ব্যাকুলতা। দুজনের মনই জেনে গেছে তারা একে অপরকে কতটা ভালোবাসে, কিন্তু মুখ ফুটে সেই তিনটি প্রিয় শব্দ আজ অব্দি বলা হয়ে ওঠেনি।

আজ অনীকার জন্মদিন। কথাটা অর্ণব জানতে পেরেছিল অনীকার এনআইডি কার্ডের কপিটা একটা কাগজের ফাইলের ভেতর দেখতে পেয়ে। অনীকা নিজেই হয়তো ভুলে গেছে, কিংবা এই পরিবারে এসে নিজের বিশেষ দিনটার কথা কাউকে বলার প্রয়োজন মনে করেনি।

অর্ণব আজ অফিস থেকে একটু সকাল সকাল বের হলো। ধানমন্ডির বাসাটায় ঢোকার আগে সে শহরের সেরা ফুলের দোকান থেকে লাল গোলাপের একটা বিশালাকার তোড়া আর অনীকার পছন্দের একজোড়া রেশমি চুড়ি কিনল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পুরো ফ্ল্যাটের বাতিগুলো নেভানো। অনীকা সোফায় বসে ভাবছিল অর্ণব এখনো বাড়ি ফেরেনি কেন। হঠাৎ ড্রয়িংরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। অনীকা উঠে দাঁড়াতেই পুরো ঘরটা হালকা মোমবাতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

অর্ণব দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার এক হাতে লাল গোলাপের তোড়া, অন্য হাতে একটা ছোট্ট কেক।

অনীকা বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো বিশ্বাস করতে পারছিল না। "এসব... এসব কিসের জন্য?"

অর্ণব ধীরপায়ে অনীকার সামনে এসে দাঁড়াল। মোমবাতির মিষ্টি আলো অনীকার সুতি শাড়ির আঁচলে আর ভেজা চুলে অদ্ভুত এক মায়া তৈরি করেছে। অর্ণব গোলাপের তোড়াটা অনীকার হাতে তুলে দিয়ে বলল, "শুভ জন্মদিন, আমার অর্ধাঙ্গিনী।"

অনীকার চোখের কোণ দিয়ে দুটো নোনা জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল। এই জীবনে কেউ তাকে এভাবে সারপ্রাইজ দেয়নি, কেউ এত যত্ন করে তার জন্মদিন মনে রাখেনি।

"আপনি... আপনি মনে রেখেছেন?" অনীকার গলা কান্নায় বুজে এল।

"যে মানুষটা আমার প্রতিটা মুহূর্ত সুন্দর করে তুলেছে, তার জন্মদিন আমি কী করে ভুলি অনীকা?" অর্ণব পকেট থেকে মখমলের বাক্সটা বের করে অনীকার হাতে রেশমি চুড়িগুলো পরিয়ে দিল। চুড়ির টুংটাং শব্দে ঘরের নিরবতা যেন সুরময় হয়ে উঠল।

অর্ণব কেকটা টেবিলের ওপর রেখে অনীকার দুটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার চোখের অতল গভীরে আজ কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো সংকোচ নেই। আছে শুধু এক আকুল সমর্পণ।

"অনিকা," অর্ণবের কণ্ঠস্বর গভীর ও নরম হয়ে এল, "বিয়ের প্রথম দিনে তোমাকে যা যা বলেছিলাম, তার প্রতিটা শব্দের জন্য আমি আজ আজীবন অনুতপ্ত। আমি ভাবতাম সংসার মানেই একটা সামাজিক চুক্তি। কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছ সংসার মানে শুধুই ভালোবাসা, মায়া আর আত্মত্যাগ।"

অনিকা নিঃশব্দে অর্ণবের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা এক স্বর্গীয় সুখে তোলপাড় হচ্ছিল।

অর্ণব অনীকার আরও কাছাকাছি এসে খুব নিচু স্বরে বলল, "আমি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারছি না অনীকা। তোমাকে না দেখে আমার একটা মুহূর্ত চলে না। তোমার হাসিতে আমার দিন শুরু হয়, আর তোমার উপস্থিতিতে আমার শান্তি। আমি তোমাকে ভালোবাসি অনীকা। খুব বেশি ভালোবাসিয়া ফেলেছি।"

অবশেষে বহু কাঙ্ক্ষিত সেই শব্দগুলো ঘরের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো।

অনিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে অর্ণবের বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলল। এই কান্না কষ্টের নয়, এই কান্না দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজের ভালোবাসাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার পরম আনন্দের।

"আমিও..." অনীকা অর্ণবের শার্ট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে বলল, "আমিও আপনাকে প্রথম দিন থেকেই ভালোবেসে ফেলেছি। বলতে পারিনি অপমানিত হওয়ার ভয়ে..."

অর্ণব অনীকার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তারপর অনীকার কপালে ও ঠোঁটে একে দিল এক গভীর, ভালোবাসার সিলমোহর।

বাইরে শ্রাবণের শেষ বৃষ্টি ঝরছিল অঝোর ধারায়। কিন্তু আজ সেই বৃষ্টির শব্দে কোনো একাকীত্ব ছিল না। দুজন অচেনা মানুষের ভালোবাসার গল্পটা ভুল বোঝাবুঝি আর সংকোচের মেঘ কাটিয়ে আজ পূর্ণতার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। তারা বুঝল, কিছু ভালোবাসা শুরুতেই ফোটে না, তা আস্তে আস্তে হৃদয়ের গভীরে শিকড় চালায়—আর যখন ফোটে, তখন তা সারাজীবনের জন্য অমর হয়ে যায়।

....
👁 76