রাতের আঁধারে নিঃশ্বাসের মিলন

পুরান ঢাকার জীর্ণ অলিগলিতে যখন বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়ত, বুড়িগঙ্গার হিমেল হাওয়া ছাদ স্পর্শ করত অদ্ভুত এক নীরবতায়। সেই ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল রূপা। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, কাজলকালো দুটি চোখে অসীম অভিমান। রূপার জীবনটা ছিল খুব ছক-বাঁধা, কিন্তু রোহানের উপস্থিতি সেই ছকে এনে দিয়েছিল তীব্র তোলপাড়।

রোহান আর রূপার প্রেমটা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। একই পাড়ায় বড় হওয়া, কিন্তু দুজনের আকাশ ছিল ভিন্ন। রোহান ছিল গম্ভীর, নিজের স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে লড়াই করা এক শান্ত যুবক। অন্যদিকে রূপা ছিল প্রাণবন্ত, আবেগ দিয়ে পৃথিবী মাপা এক মেয়ে। কিন্তু ভালোবাসার বাঁধনে যখন তারা আবদ্ধ হলো, তখন সেই আবেগ হয়ে উঠল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো গভীর ও উন্মত্ত।

আজ রোহানের আসার কথা ছিল বিকেল পাঁচটায়। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা এখন সন্ধ্যা সাতটা ছুঁইছুঁই। রূপার অভিমান ডানা মেলতে শুরু করেছে বহুদূর। লাল হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবছিল, রোহানের জীবনে তার স্থান ঠিক কতটা?

রেলিঙে পায়ের শব্দ হতেই রূপা ঘুরে তাকাল না। সে জানে ওটা রোহান।

রোহান আস্তে আস্তে এসে পাশে দাঁড়াল। তার চেহারায় ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ, কিন্তু রূপার দিকে তাকাতেই তার চোখে ফুটে উঠল গভীর এক আকুলতা।

"রূপা..." মৃদু গলায় ডাকল রোহান।

রূপা নীরব। বুড়িগঙ্গার বাতাস তার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিয়ে গেল।

"আমি জানি আমার দেড়ি হয়ে গেছে। রাস্তায় তীব্র যানজট ছিল, আর অফিসের কাজটাও..." রোহানের কথা শেষ হওয়ার আগেই রূপা ঘুরে দাঁড়াল।

"সবসময় অজুহাত, রোহান। তুমি কি জানো আমি কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি? যদি ভালোবাসায় অবহেলাই জমা হয়, তবে কেন প্রতিদিন এভাবে ডেকে এনে দাঁড় করিয়ে রাখো?" রূপার কণ্ঠস্বরে তীব্র রাগ আর কাঁপন।

রোহান কিছু সময় চুপ করে থেকে রূপার দুটি হাত চেপে ধরল। রোহানের হাতের তপ্ত স্পর্শে রূপার ভেতরের জমাট বাঁধা বরফ এক মুহূর্তে গলতে শুরু করল, কিন্তু সে হাত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

"হাত ছাড়ো, রোহান।"

"ছাড়ব না," রোহান আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার চোখের দিকে তাকাল। "তুমি রাগ করছ করো, বকো, কিন্তু হাত ছাড়তে বোলো না। এই শহরের তীব্র কোলাহলে আমার একমাত্র শান্তির জায়গা তুমি। আমি ছাড়া আর কে বোঝে তোমার এই মিষ্টি অভিমান?"

রূপার চোখে জল জমে উঠল। রোহানের এই গভীর দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে বারবার নিঃস্ব করে দেয়। রোহান হঠাৎ করেই রূপার খুব কাছাকাছি চলে এল। দুজনের নিশ্বাসের দূরত্ব তখন শূন্যের কোঠায়। রোহানের ঠোঁট স্পর্শ করল রূপার কপাল, তারপর চোখের পাতা। তীব্র এক ভালোবাসার স্রোত বয়ে গেল দুজনের মধ্য দিয়ে।

"আমি তোমাকে কখনো হারাতে দেব না, রূপা," রোহানের গলার স্বর ভারী শোনালো। "এমনকি যদি বাস্তবতার ঝড় আমাদের আলাদা করতে চায়, আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করব।"

রূপা কিছু না বলে রোহানের বুকে মাথা রাখল। রোহানের হৃদস্পন্দনের শব্দে সে যেন তার সমস্ত অভিমানের উত্তর খুঁজে পেল।

কিন্তু তারা জানত না, এই গভীর ভালোবাসার ঠিক পেছনেই ঘনীভূত হচ্ছে এক কালো ছায়া। এই ছাদেই ঠিক কিছু দূর দূরে ফেলে রাখা রোহানের ফোনে হঠাৎ ফুটে উঠল একটা অচেনা নম্বরের দীর্ঘ মেসেজ, যা তাদের ভালোবাসার ভবিষ্যৎকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়ের দিকে ঠেলে দেবে।

রোহানের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকা রূপার কানে মেসেজের বিপ্রতীপ শব্দ পৌঁছাল না। কিন্তু রোহানের শরীর এক মুহূর্তের জন্য যেন শক্ত হয়ে গেল। পকেট থেকে মোবাইলটি বের না করলেও তার মনে একটা অজানা শঙ্কা কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল।

বুড়িগঙ্গার ওপর তখন রাতের আঁধার পুরোপুরি নেমে এসেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কার্গো জাহাজের হর্ন আর শহরের অস্পষ্ট গর্জন। রূপা মাথা তুলে রোহানের মুখের দিকে তাকাল। রোহানের চোখের সেই গভীর, মোহময় চাহনির পেছনে আজ যেন এক টুকরো মেঘ জমা হয়েছে।

"কী হয়েছে, রোহান? তুমি হঠাৎ এত চিন্তিত হয়ে উঠলে কেন?" রূপার অভিমানী গলা এখন ভালোবাসায় নরম।

রোহান রূপার গালে মৃদু হাত বুলিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। "কিছু না, রূপা। অফিসের একটা জরুরি মেইল হয়তো। তুমি কি জানো, এই মুহূর্তে তোমাকে ঠিক কতটা সুন্দর লাগছে? এই রাতের আলোয় তোমার চোখের কাজল যেন আমাকে কোনো এক অচেনা জগতে টেনে নিয়ে যায়।"

রূপার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে রোহানের শার্টের বোতাম ধরে আলতো টানে নিজের কাছে টেনে আনল। "কথা ঘোরাচ্ছ, রোহান। আমি তোমায় চিনি। তোমার চোখের এই গভীরতা শুধু ভালোবাসা প্রকাশ করে না, মাঝে মাঝে অনেক কিছু লুকিয়েও ফেলে। আমার কাছে তোমার কোনো গোপন সত্য আছে?"

রোহান কিছুক্ষণ নিঃশব্দে চেয়ে রইল রূপার কাজলকালো চোখের দিকে। তারপর আস্তে করে রূপার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। দুজনের হৃদস্পন্দন যেন এক তালে বাজতে লাগল।

"যদি বলি আমার অতীত বা ভবিষ্যতে এমন কিছু আছে যা তোমাকে কেড়ে নিতে পারে, তুমি কি আমার ওপর বিশ্বাস রাখবে, রূপা?" রোহানের কণ্ঠে ছিল ব্যাকুল আকুলতা।

রূপা রোহানের ঠোঁটে নিজের আঙুল চেপে ধরল। "বিশ্বাস শব্দটা আমাদের সম্পর্কের সামনে খুব ছোট, রোহান। তোমাকে ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। তুমি শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে থেকো।"

রোহান রূপার কপালে দীর্ঘ এক চুমু এঁকে দিল। সেই স্পর্শে ছিল এক তীব্র হাহাকার, আবার একই সাথে পাওয়ার এক অসীম তৃপ্তি। ভালোবাসার এই প্রগাঢ় অনুভূতির মাঝে রূপা সব অভিমান ভুলে রোহানের বাহুডোরে হারিয়ে গেল।

রাত বাড়ার সাথে সাথে রোহান রূপাকে তার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দিল। রূপা ভেতরে চলে যাওয়ার পর, গলির মোড়ে এসে রোহান পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ফুটে থাকা অচেনা নম্বরের সেই মেসেজটি সে আবার পড়ল:

"পুরোনো অতীত এত সহজে মুছে যায় না, রোহান। তুমি রূপাকে নিয়ে সুখী হতে চাও? কিন্তু তুমি যে ওর পুরো জীবনটাকে একটা মস্ত বড় মিথ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছ, তা কি ও জানে? আগামী পরশু যদি সত্যিটা ওকে না বলো, তবে আমি নিজেই সব প্রকাশ করে দেব।"

মেসেজটা পড়ে রোহানের হাত কেঁপে উঠল। তার কপিল ভিজে উঠল ঠাণ্ডা ঘামে। যে অতীতকে সে বহু দূরে ফেলে এসেছিল, তা কি তবে আবার তার ভালোবাসার সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে?

রূপা যদি সব জেনে যায়, তবে সে কি এই গভীর প্রেমকে ভুল বুঝে রোহানকে চিরতরে ঘৃণা করবে? অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে রোহান নিজের মুঠো শক্ত করল। রূপাকে পাওয়ার জন্য সে যেকোনো সীমানা ডিঙাতে প্রস্তুত, কিন্তু এই ছায়া যে তাদের জীবনকে তছনছ করে দিতে এসেছে, তার পরিচয় কী?

পরদিনের সকালটা পুরান ঢাকার জন্য স্বাভাবিক হলেও, রূপার জন্য তা ছিল এক অদ্ভুত অস্বস্তির সূচনা। গতকাল রাতের সেই প্রগাঢ় অনুভূতির পর রোহানের চোখের সেই অচেনা ব্যাকুলতা রূপাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্ত হতে দিচ্ছিল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রূপা এক কাপ চা হাতে নিয়ে ভাবছিল—ভালোবাসা কি কেবলই দু’জন মানুষের এক হয়ে যাওয়া, নাকি একে অপরের ভেতরের গোপন ক্ষতগুলোকে আগলে রাখা?

ঠিক তখনই রূপার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল এক ভরাট, কিন্তু শীতল কণ্ঠস্বর।

"রূপা? তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো রোহান তোমাকে যতটা ভালোবাসে, ঠিক ততটাই স্বচ্ছ ওর জীবন?"

রূপার হাত থেকে চায়ের কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে শক্ত গলায় বলল, "কে আপনি? আর এসব আবর্জনা কথার মানেই বা কী?"

"আমি কে, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, তোমার পাশের মানুষটা যে হাসির আড়ালে বিশাল এক মিথ্যা লুকিয়ে রেখেছে, তুমি তার সামান্যতম অংশও জানো না। যদি সত্য জানতে চাও, আজ বিকেলে ধানমন্ডি লেকের জাহাজবাড়ির ঘাটে একা এসো। রোহানকে কিছু জানালে সত্যটা চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে।"

ফোনটা কেটে গেল। রূপার বুকটা ধক করে উঠল। রোহানের ওপর তার অসীম আস্থা, কিন্তু বুকের ভেতরে জমে থাকা ভালোবাসার গভীরতা থেকেই জন্ম নিল তীব্র এক দ্বিধা আর অভিমান। সে কি রোহানকে জিজ্ঞেস করবে? নাকি নিজে গিয়ে দেখে আসবে এই আড়ালের খেলাটা কী?

বিকেলবেলা ধানমন্ডি লেকের নির্জন এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল রূপা। লেকের জলে বিকেলের ম্লান রোদ ঠিকরে পড়ছে। হঠাৎ পেছন থেকে একজন এসে দাঁড়াল। লোকটির পরনে কালো কোট, চোখে গাম্ভীর্য।

"তুমি এসেছ, রূপা। রোহানের প্রতি তোমার ভালোবাসা সত্যিই গভীর," লোকটি বলল।

"সোজা কথায় আসুন। রোহান আমার সাথে কী মিথ্যা বলেছে?" রূপার কণ্ঠে রাগের সাথে কান্নার আভাস।

লোকটি একটা খাম রূপার দিকে বাড়িয়ে দিল। "তিন বছর আগে রোহানের জীবনে এক বড় ঝড় এসেছিল। একটি দুর্ঘটনা, যার সাথে তোমার পরিবারের এক গভীর অতীত জড়িয়ে আছে। রোহান তোমাকে ভালোবেসে নিজের অপরাধবোধ ঢাকতে চাইছে, নাকি সত্যি ভালোবেসে কাছে টেনেছে—এই ছবি আর কাগজপত্রগুলো দেখলেই বুঝবে।"

খামটা হাতে নিয়ে রূপার হাত কাঁপতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে লেকের বাঁক ঘুরে দৌড়ে এল রোহান! তার চোখ দুটো লাল, চেহারায় আতঙ্কের ছাপ।

"রূপা! খামটা খুলো না, প্লিজ!" রোহান চিৎকার করে উঠল।

রূপা চমকে উঠে রোহানের দিকে তাকাল। "তুমি এখানে কীভাবে এলে, রোহান? আর ও কীসের কথা বলছে? তোমার চোখে এই ভয় কেন?"

রোহান রূপার খুব কাছে চলে এল। সে লোকটির দিকে এক ঝলক তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে রূপার দুটি হাত চেপে ধরল। রোহানের স্পর্শে আজ কোনো সান্ত্বনা ছিল না, ছিল হারানোর এক তীব্র আকুতি।

"রূপা, আমার দিকে তাকাও," রোহান হাপাচ্ছিল। "ও যা বলছে তা অর্ধেক সত্য, কিন্তু পুরো সত্য নয়। আমি তোমাকে কোনো ছলনা করিনি। এই পৃথিবীতে যদি কিছু খাঁটি হয়ে থাকে, তবে তা তোমার প্রতি আমার এই নিঃশ্বার্থ ভালোবাসা।"

"তাহলে খামে কী আছে, রোহান?" রূপা হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। "তোমার এই নীরবতা আমাকে মেরে ফেলছে! যদি তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাকো, তবে কেন এই গোপনীয়তা? কেন আমায় জড়িয়ে ধরে বলতে পারছ না যে সব মিথ্যা?"

রোহান রূপার ভেজা চোখ দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে আগলে নিল। তাদের নিশ্বাসে নিশ্বাস মিশে গেল আবার। রোহানের চোখে ফুটে উঠল অসীম কষ্ট আর ভাঙন।

"কারণ আমি ভয় পাই, রূপা," রোহান বিড়বিড় করে বলল, তার ঠোঁট কাঁপছিল। "সত্যিটা জানলে তুমি হয়তো আমাকে ক্ষমা করবে, কিন্তু এই অভিমানী মনটা আমাকে আর স্পর্শ করতে দেবে না। আমি তোমাকে হারানোর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো মনে করি।"

রূপা রোহানের বুকে এক চড় বসিয়ে দিল, কিন্তু পর মুহূর্তেই রোহানের শার্ট শক্ত করে চেপে ধরে কেঁদে ফেলল। "তুমি কত বড় স্বার্থপর, রোহান! আমাকে ভালোবেসে আবার আমাকেই অন্ধকারে ফেলে রাখছ?"

রোহান রূপাকে জড়িয়ে ধরে তার চুলে মুখ গুঁজল। বিকেলের ম্লান আলোয় তাদের এই জড়িয়ে থাকা যেন এক চরম হাহাকারের রূপ নিল। কিন্তু রূপার হাতে তখনও রয়ে গেছে সেই রহস্যময় খামটি।

হঠাৎ খামটা খুলে সেখান থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং নিচে পড়ে গেল। বাতাসে উ্ড়ে গিয়ে পড়া সেই কাগজের শিরোনামে রূপার চোখ পড়তেই তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল!

বাতাসে উড়ে যাওয়া কাগজের টুকরোটি লেকের ভেজা ঘাসের ওপর গিয়ে পড়ল। ঝাপসা চোখে রূপা সেই খবরের কাগজের শিরোনামটার দিকে তাকাল। মোটা হরফে লেখা—"পাঁচ বছর আগের সেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা: চালকের আসনে থাকা তরুণ কি নির্দোষ?"

শিরোনামের ঠিক নিচেই একটি ছবি—এক তরুণ রোহানের, যার চোখমুখে তীব্র বিভীষিকা। আর খবরের বিস্তারিত অংশে লেখা নামটা দেখে রূপার হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। যে মানুষটি সেই দুর্ঘটনায় চিরতরে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন—রূপার নিজের বাবা!

রূপার মাথার ভেতরে শত শত বজ্রপাত হতে লাগল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল তার। সে ঘুরে দাঁড়াল রোহানের দিকে। রোহানের চোখ দিয়ে তখন অঝোরে জল ঝরছে। সে কোনো কথা বলতে পারছে না, শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে অপরাধীর মতো।

"রোহান...?" রূপার কণ্ঠস্বর ভেঙে একদম অস্পষ্ট হয়ে এল। "আমার বাবা... আমার বাবার জীবনটা যে লোকটা তছনছ করে দিয়েছিল, যে লোকটার জন্য আজ আমার বাবা হুইলচেয়ারে বন্দি... সে তুমি?"

রোহান হাঁটু গেড়ে রূপার সামনে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। রূপার দুটি পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

"আমাকে ক্ষমা করে দাও, রূপা! আমাকে মেরে ফেলো, কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি!" রোহানের গলায় তীব্র আকুতি আর হাহাকার। "সেদিন কালবৈশাখীর তীব্র ঝড় ছিল। রাস্তায় কিচ্ছু দেখা যাচ্ছিল না। হুট করে তোমার বাবা বাইকের সামনে চলে এসেছিলেন। আমি ব্রেক কষেছিলাম, কিন্তু গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল..."

রূপা সজোরে নিজের পা ছাড়িয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখে ভালোবাসার জায়গায় এখন শুধুই তীব্র ঘৃণা আর বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা। "তুমি জানতে? তুমি প্রথম দিন থেকেই জানতে আমি কার মেয়ে? তাই তুমি আমার কাছে এসেছিলে? অপরাধবোধ ঢাকতে? করুণা করতে?"

"না, রূপা! আল্লাহর দোহাই লাগে, অমন কথা বোলো না!" রোহান এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে রূপার দু হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ দুটি লাল হয়ে উঠেছে তীব্র আবেগে। "আমি যখন তোমাকে প্রথম দেখি, আমি জানতাম না তুমি ওনার মেয়ে। কিন্তু যখন জানলাম, ততদিনে আমি তোমার প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খাচ্ছি! আমি তোমাকে করুণা করিনি, রূপা। আমি তোমাকে আমার আত্মা দিয়ে ভালোবেসেছি! তোমাকে ভালোবেসে আমি নিজের পাপাচারের খেসারত দিতে চেয়েছিলাম।"

"ভালোবাসা?" রূপা তিক্ত হেসে উঠল, তার চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল শাড়ির আঁচলে। "এটাকে ভালোবাসা বলে না, রোহান! এটাকে বলে প্রতারণা! যে মানুষটা প্রতিদিন রাতে বাবার যন্ত্রণার কোঁকানি শুনে বড় হয়েছে, সে আজ সেই মানুষটার ঘাতকের বুকে মাথা রেখে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখেছে? ধিক্কার আমার এই মনকে! ধিক্কার তোমার এই ভালোবাসাকে!"

রোহান রূপাকে নিজের বুকে টেনে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। রূপাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে তার কপালে, গালে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। "তুমি আমায় ছেড়ে যেতে পারো না, রূপা! তুমি ছাড়া আমার এই জীবনে আর কিছু নেই। আমাকে শাস্তি দাও, পুলিশে দাও, জ্বেলে পাঠাও! কিন্তু আমায় ছেড়ে যেও না, আমি মরে যাব!"

রোহানের এই তীব্র স্পর্ধা, এই উগ্র ভালোবাসা রূপাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। রোহানের গায়ের সুবাস, তার ধুকপুক করতে থাকা বুকের শব্দ রূপার ভেতরে এক তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করল। একপাশে বাবার করুণ মুখ, আর অন্যপাশে এই মানুষটার প্রতি তার অন্ধ ভালোবাসা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রূপা নিজেকে আর সামলাতে পারল না।

সে সজোরে রোহানকে এক ধাক্কা দিল। "আমাকে আর কখনো স্পর্শ করবে না, রোহান! আজ থেকে তুমি আমার কাছে মৃত। আমাদের সব সম্পর্ক শেষ!"

রূপা পেছন ফিরে দৌড় দিল। লেকের অন্ধকার রাস্তায় তার শাড়ির আঁচল উড়তে লাগল। রোহান পেছনে চিৎকার করে ডাকতে লাগল—"রূপা! রূপা, ফিরে এসো!" কিন্তু রূপা থামল না।

রোহান ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ল। বিকেলের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নেমে এল লেকের ওপর। কিন্তু এই ঝড়ের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো কোট পরিহিত লোকটি তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে এক নিষ্ঠুর হাসি হাসছিল। কারণ, যে সত্য রূপা জেনে গেছে, তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল আরও এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র, যা রোহান নিজেও পুরোপুরি জানে না!

রোহানকে ধানমন্ডি লেকের নির্জনতায় ফেলে রেখে রূপা যখন বাড়ি ফিরল, তখন তার চারপাশটা নিঃশব্দে ভেঙে পড়েছিল। নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে মেঝেকে আঁকড়ে বসে রইল সে। যে মানুষটার বুকে মাথা রেখে সে পৃথিবীর সমস্ত নিরাফত্তা খুঁজে পেত, সেই মানুষটাই তার বাবার জীবনের করুণ দশার কারণ? এই সত্যটা রূপার ভেতরের আবেগ আর অভিমানকে এক বিষাক্ত তোলপাড়ের মুখে ঠেলে দিল।

পরের দুটো দিন রূপা ঘর থেকে বের হয়নি। রোহান শত শত বার কল করেছে, মেসেজ পাঠিয়েছে, এমনকি রূপাদের বাড়ির গলির মোড়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছে। রূপা বারান্দার পর্দা সামান্য সরিয়ে দেখেছে রোহানের সেই বিধ্বস্ত চেহারা—উস্কোখুস্কো চুল, চোখে ঘুমহীন রাত জাগার ক্লান্তি আর অসীম হাহাকার। কিন্তু রূপার ভেতরের জমাট অভিমান আর বাবার প্রতি অপরাধবোধ তাকে নিচে নামতে দেয়নি।

তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় রূপা যখন নিজের ছাদটিতে এসে দাঁড়াল, বাতাসে তখন বৃষ্টির মৃদু সুবাস। অন্ধকার নেমে আসছে পুরান ঢাকার আকাশে। হঠাৎ রূপা পেছনের আড়াল থেকে রোহানের গায়ের সেই সুপরিচিত সুবাস পেল।

ঘুরে দাঁড়াতেই দেখাল, রোহান দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ জুড়ে দাড়ি গজিয়েছে, চোখ দুটি কোটরাগত।

"তুমি কীভাবে এলে এখানে?" রূপার গলায় পাথরচাপা রাগ। "আমি তোমাকে বারণ করেছিলাম না আমার সামনে না আসতে?"

রোহান কোনো উত্তর দিল না। সে নিঃশব্দে এগিয়ে এল। রূপা পিছিয়ে যেতে চাইলে রোহান এক হেঁচকা টানে রূপাকে নিজের খুব কাছে নিয়ে এল। রূপার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে রোহান তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক উগ্র, গভীর এবং বেপরোয়া ভালোবাসা।

"তুমি আমাকে যত ইচ্ছা ঘৃণা করো, রূপা," রোহান ফিসফিস করে বলল, তার তপ্ত নিশ্বাস রূপার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। "কিন্তু আমার থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।"

"ছাড়ো আমায়, রোহান!" রূপা রোহানের বুকে হাত দিয়ে ঠেলতে লাগল, কিন্তু রোহানের বাঁধন ছিল লোহার মতো শক্ত। "তুমি আমার বাবার অপরাধী! তোমাকে দেখলে আমার নিজের ওপর ঘৃণা হয়!"

"আমি অপরাধী ছিলাম, কিন্তু প্রতারক নই!" রোহানের গলার স্বর কেঁপে উঠল। "সেদিন লেকে যে লোকটা তোমাকে ওই খাম দিয়েছিল, তার নাম সাজ্জাদ। ও আমার সৎ ভাই। পাঁচ বছর আগের ওই দুর্ঘটনা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না, রূপা। ব্রেক ফেল আমি করিনি, গাড়ির ব্রেক কেটে দেওয়া হয়েছিল!"

রূপা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো রোহানের বুকে স্থির হয়ে রইল। "কী বলছ এসব?"

"আমার বাবার সমস্ত সম্পত্তি একা পাওয়ার জন্য সাজ্জাদ আমার গাড়ির ব্রেক কাট কেটে রেখেছিল। সে চেয়েছিল আমি যেন মারা যাই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমি বেঁচে যাই, আর মাঝখান থেকে তোমার বাবা সেই দুর্ঘটনার শিকার হন। আমি বছরের পর বছর নিজেকে অপরাধী ভেবে এসেছি। আর সাজ্জাদ আজ তোমাকে সত্যের অর্ধেকটা দেখিয়ে আমাদের আলাদা করতে চাইছে!"

রোহানের চোখ দিয়ে দুটো ফোঁটা জল গড়িয়ে রূপার গালে পড়ল। সেই তপ্ত অশ্রুর স্পর্শ রূপার হৃদয়ের গভীরতম কোণে আবার এক তীব্র ভালোবাসার দোলা দিল।

"তুমি... তুমি আমায় আগে বলোনি কেন?" রূপার গলার অভিমানী সুর এবার ভাঙা কান্নায় রূপ নিল।

"কারণ আমি জানতাম তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না," রোহান রূপার ঠোঁটে আলতো করে আঙুল ছোঁয়াল, তারপর তীব্র এক টানে রূপার অধরে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

সেই চুম্বনে ছিল এতদিন ধরে জমে থাকা সমস্ত ব্যাকুলতা, যন্ত্রণা আর ভালোবাসার বিস্ফোরণ। রূপার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে রোহানের শার্ট চেপে ধরে সেই গভীর অনুভূতির সাগরে নিজেকে সঁপে দিল। চারপাশের পুরো পৃথিবী যেন সেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পর, রোহান মাথা সরিয়ে এনে রূপার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। দুজনের নিশ্বাস তখন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে।

"আমি সাজ্জাদের সমস্ত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ জোগাড় করেছি, রূপা," রোহান হালকা হেসে বলল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল তীব্র এক শঙ্কা। "আজ রাতেই আমি সব পুলিশকে দেব। তারপর তোমার বাবার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইব।"

রূপা রোহানের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। "আমিও তোমার সাথে যাব, রোহান। আমি আর তোমাকে হারাতে পারব না।"

কিন্তু তারা জানত না, সাজ্জাদ তাদের এত সহজে জিততে দেবে না। রূপার ছাদ থেকে একটু দূরে, অন্ধকার রাস্তায় একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, আর সেই গাড়ির ভেতর থেকে লাল লেজারের আলো এসে পড়ল ঠিক রোহানের বুকের মাঝখানে!

ছাদের রেলিং ঘেঁষে থাকা অন্ধকারে হঠাৎ ফুটে ওঠা রক্তলাল লেজারের আলোটা রূপার নজর এড়াতে পারল না। রোহানের বুকের ঠিক মাঝখানে সেই লাল বিন্দুটা নাচানাচি করছে। রূপার ভেতরের সমস্ত আতঙ্ক এক মুহূর্তেই যেন জেগে উঠল।

"রোহান, সরো!" রূপা চিৎকার করে উঠে রোহানকে সজোরে এক ধাক্কা দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই এক কানের পাশ দিয়ে ধাতব শব্দে একটি ছররা গুলি এসে বিঁধল ছাদের পেছনের ইটের দেওয়ালে। দেওয়াল থেকে খসে পড়ল প্লাস্টার। রোহান আর রূপা দুজনই ছাদের মেঝেতে আছড়ে পড়ল।

"রূপা! তুমি ঠিক আছ?" রোহান রূপাকে নিজের দেহের নিচে আগলে নিল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। রূপার প্রতি তার এই নিঃশ্বার্থ প্রতিরক্ষামূলক ভালোবাসা রূপার চোখ কান্নায় ভাসিয়ে দিল।

"আমি ঠিক আছি, কিন্তু তোমাকে ওরা মেরে ফেলবে, রোহান! তুমি পালাও!" রূপা আকুল হয়ে রোহানের গাল দুটো চেপে ধরল।

"তোমাকে ফেলে আমি কোথাও যাব না," রোহানের কণ্ঠে ছিল ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা।

ততক্ষণে নিচে গাড়ির দরজা খোলার তীব্র শব্দ আর ধাওয়া করার পায়ের শব্দ শোনা গেল। সাজ্জাদ আর তার লোকজনেরা যে অত সহজে ছাড়বে না, তা পরিষ্কার। রোহান রূপার হাত শক্ত করে চেপে ধরে ছাদের পেছনের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করল। পুরান ঢাকার পেঁচানো নির্জন অলিগলি তাদের রক্ষা করার একমাত্র পথ।

বৃষ্টি তখন নামতে শুরু করেছে। মুষলধারে বৃষ্টির জলে ভেসে যাচ্ছে পিচঢালা পথ। অন্ধকার গলির ভেতরে রূপার পা পিছলে যেতেই রোহান তাকে এক টানে কোলে তুলে নিল।

"রোহান! আমায় নামাও, তুমি পারবে না!" রূপা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল।

"চুপ থাকো, রূপা," রোহান এক মুহূর্তের জন্য থেমে রূপার চোখে চোখ রাখল। তার বৃষ্টিতে ভেজা চুলে, কাজল লেপা চোখে তীব্র এক ভালোবাসার আগুন। "যদি আজ আমাদের শেষ রাতও হয়, তবে তোমার এই মুখটা বুকে নিয়েই আমি শেষ হয়ে যেতে চাই।"

রোহানের ঠোঁট বৃষ্টিভেজা রূপার গালে আর ঠোঁটে গভীর এক ছোঁয়া দিয়ে গেল। রূপা আর কোনো কথা বলতে পারল না, সে রোহানের গলায় হাত পেঁচিয়ে তার বুকে মাথা গুঁজে দিল। ভালোবাসার এই প্রগাঢ় অনুভূতির সামনে মৃত্যুর ভয়ও যেন তুচ্ছ হয়ে গেল।

গলির এক অন্ধকার কোণে এসে রোহান রূপাকে একটা পুরানো গুদামের আড়ালে নামিয়ে দিল। বৃষ্টির তোড়ে চারপাশ ঝাপসা।

"রূপা, আমার পকেটে ড্রাইভটা আছে," রোহান পকেট থেকে একটা ছোট ইউএসবি ড্রাইভ বের করে রূপার হাতে দিল। "এটার ভেতরেই সাজ্জাদের ব্রেক কাটার ভিডিও ফুটেজ আর কল রেকর্ড আছে। যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তুমি এটা নিয়ে সোজা ডিবি অফিসে চলে যাবে।"

"না! আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না!" রূপার গলার স্বর কান্নায় বুজে এল। সে রোহানের জামা চেপে ধরল। "তুমি আমায় কথা দিয়েছিলে রোহান, আমরা একসাথে বাবার কাছে যাব! তুমি আমাকে এভাবে ফেলে রেখে যেতে পারো না!"

রোহান রূপার দু গালে হাত রেখে তার অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল। "আমি ফিরে আসব, রূপা। তোমার এই অভিমানী চোখ দুটোর কসম, আমি ফিরে আসব। আমি সাজ্জাদকে এদিক থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, তুমি উল্টো দিকের গলি দিয়ে বের হয়ে যাও।"

"রোহান, প্লিজ!" রূপার আকুতি শেষ হওয়ার আগেই রোহান আবার তার ঠোঁটে এক তীব্র, ব্যাকুল চুমু আঁকল। তারপর রূপাকে আড়ালে ধাক্কা দিয়ে নিজে খোলা রাস্তায় বেরিয়ে এল।

"সাজ্জাদ!" রোহান চিৎকার করে উঠল বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে। "তুই আমাকে চাস তো? আমি এখানে!"

অন্ধকার গলির ওপাশ থেকে ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল। রূপা দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। কিন্তু সাজ্জাদের সেই ক্রূর হাসি আর রোহানের গলার আওয়াজ রূপার ভেতরে থাকা ভীতু মেয়েটাকে এক মুহূর্তে বদলে দিল।

সে কি নিজের ভালোবাসাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে যাবে? না! রূপা মুঠো শক্ত করল। ড্রাইভটা শাড়ির ভাঁজে গুঁজে সে আড়াল থেকে একটা ভাঙা ইটের টুকরো হাতে তুলে নিল। আজ রোহানকে বাঁচাতে সেও যেকোনো সীমানা ডিঙাতে প্রস্তুত!

মুষলধারে বৃষ্টিতে পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলিটা তখন এক বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছে। জলের তোড় আর বিদ্যুতের চমকানি চারপাশকে ক্ষণে ক্ষণে আলোকিত করে তুলছিল। গলির মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে থাকা রোহানের মুখোমুখি সাজ্জাদ এবং তার দুই সশস্ত্র গুন্ডা।

"খুব তো ভালোবাসার নাটক হচ্ছিল, না রে রোহান?" সাজ্জাদ রিভলভারের নোলটা রোহানের দিকে উঁচিয়ে ক্রূর হেসে বলল। "পাঁচ বছর আগে বেঁচে গিয়েছিলি, কিন্তু আজকের রাতটা তোর জীবনের শেষ রাত। ওই ড্রাইভটা কোথায়?"

রোহান নিজের রক্তাক্ত ঠোঁট মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে সামান্যতম ভয়ের ছাপ নেই, বরং ফুটে উঠেছে এক হিংস্র প্রতিবাদ। "ড্রাইভ এখন ডিবি পুলিশের হাতে যাওয়ার পথে, সাজ্জাদ! তোর সব নোংরা চক্রান্তের শেষ আজ হতে চলেছে।"

"তবে তুইও শেষ!" সাজ্জাদ গর্জে উঠে ট্রিগারে আঙুল চাপ দিতে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে আড়াল থেকে রূপা সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতের ভারী ইটটা ছুঁড়ে মারল সাজ্জাদের মাথা লক্ষ্য করে!

বিকট এক আর্তনাদ করে সাজ্জাদ পিছিয়ে গেল, তার হাতের নিশানা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলিটা গিয়ে লাগল পাশের দেওয়ালে।

"রোহান!" চিৎকার করে উঠল রূপা।

এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না রোহান। সে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সাজ্জাদের ওপর। সঙ্গে থাকা দুই গুন্ডা রূপার দিকে তেড়ে আসতে চাইলে, রোহান সাজ্জাদের হাত থেকে পিস্তলটা ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াইতে মত্ত থেকেও এক গুন্ডাকে সজোরে লাথি মেরে দূরে ফেলে দিল।

"রূপা, পালাও!" রোহানের চিৎকার বৃষ্টির গর্জনে মিশে গেল।

কিন্তু রূপা পালাল না। রূপার ভেতরের ভীতি আজ রোহানের ভালোবাসার আগুনে ছাই হয়ে গেছে। সে পাশেই পড়ে থাকা একটা কাঠের তক্তা তুলে নিয়ে অন্য গুন্ডার গায়ে সজোরে আঘাত করল। রূপার এই মারমুখী রূপ দেখে গুন্ডাটা সাময়িকভাবে ভড়কে গেল।

এদিকে রোহান আর সাজ্জাদের মধ্যে কাদা আর জলের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি চলছিল। সাজ্জাদ নিচে পড়ে গিয়ে রোহানের গলা চেপে ধরল। রোহানের শ্বাস আটকে আসতে লাগল, তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। কিন্তু রূপার সুরক্ষার চিন্তা তার ভেতরে আনল এক অসীম পশুর মতো শক্তি। রোহান সাজ্জাদের মুখে সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল, তারপর তাকে কাচানো কাদায় আছড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল।

হঠাৎ বিকট সাইরেনের শব্দে পুরো গলিটা কেঁপে উঠল! ডাবল টোনের লাল-নীল আলো বৃষ্টির জল ভেদ করে গলির মুখে এসে পড়ল। একাধিক পুলিশের গাড়ি গলিটা ঘিরে ফেলেছে।

সাজ্জাদ ও তার গুন্ডারা পালাবার চেষ্টা করার আগেই ডিবি পুলিশের চৌকস দল তাদের ঘিরে ফেলল। অস্ত্রসহ সাজ্জাদকে মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হলো।

সব নীরব হয়ে গেল এক মুহূর্তে। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো আওয়াজ রইল না।

রোহান হাঁপাচ্ছিল। তার শার্ট ছিঁড়ে গেছে, গালে রক্তের দাগ। সে আস্তে আস্তে ঘুরে তাকাল রূপার দিকে। রূপা দাঁড়িয়ে আছে সামান্য দূরে, ভেজা শাড়িতে জড়িয়ে, হাতে সেই ড্রাইভটি শক্ত করে ধরা। তার কাজল ধুয়ে গাল বেয়ে নেমে এসেছে, কিন্তু চোখে ফুটে আছে অসীম এক রূপকথা।

রোহান কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। রূপা ড্রাইভটা ফেলে দিয়ে এক লাফে রোহানের বুকে গিয়ে আছড়ে পড়ল।

রোহান রূপাকে দুই বাহুতে আঁকড়ে ধরে শূন্যে তুলে নিল। তারপর রূপার ভেজা মুখে, চোখে, কপালে আর ঠোঁটে গভীর ব্যাকুলতায় চুমু খেতে লাগল। রূপা রোহানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সমস্ত কান্না আর অভিমান উজার করে দিল রোহানের বুকে।

"তুমি ঠিক আছ তো?" রোহান ফিসফিস করে বলল, রূপার চোখের জল মুছে দিতে দিতে।

"তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ, রোহান," রূপা রোহানের কপালে নিজের কপাল ছুঁইয়ে বলল। "আজকের পর আমাদের মাঝে আর কোনো আড়াল নেই।"

বৃষ্টির ধারার মাঝে, পুলিশের সাইরেনের আলোর আলোড়নে দুজনে দাঁড়িয়ে রইল এক হয়ে। কিন্তু তখনও একটি শেষ হিসেব বাকি—রূপার বাবার মুখোমুখি হওয়া। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রূপার পরিবার কি পারবে এই ঘাতক-সদৃশ কিন্তু নিষ্পাপ প্রেমিককে মেনে নিতে?

পুলিশের গাড়িগুলো যখন সাজ্জাদ আর তার লোকজনকে নিয়ে চলে গেল, রাত তখন শেষ প্রহরে। মুষলধারে বৃষ্টি থামলেও শহরের বাতাসে থেকে গেছে এক শীতল ভেজা সুবাস। রোহান আর রূপা পাশাপাশি হেঁটে চলেছে রূপাদের পুরান ঢাকার সেই চেনা গলি ধরে।

রোহানের হাতে এখনও জড়িয়ে রয়েছে রূপার আঙুল। যে সত্য তাদের সম্পর্কের মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা আজ ভেঙে চুরমার। কিন্তু রূপার বাবার মুখোমুখি হওয়ার যে ভয় রোহানের ভেতরে দানা বাঁধছিল, তা রূপার হাতের উষ্ণ স্পর্শেও পুরোপুরি মিটছিল না।

বাড়ির মূল ফটকে এসে রোহান থমকে দাঁড়াল। "রূপা, আমি কি সত্যিই ওনার সামনে যাওয়ার যোগ্য?"

রূপা ঘুরে দাঁড়িয়ে রোহানের দু গালে হাত রাখল। বৃষ্টির জলে ভেজা রোহানের মুখটা আজ বড্ড নিষ্পাপ লাগছে। রূপা আলতো করে রোহানের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। "তুমি কোনো অন্যায় করোনি, রোহান। সত্যকে আড়াল করার ভুল করেছিলে, কিন্তু ভালোবাসার জন্য নিজের প্রাণ বাজি রেখেছো। আমার বিশ্বাস, বাবা তোমার চোখের এই সত্যতা দেখতে পাবেন।"

দরজার বেল বাজাতেই রূপার মা দরজা খুলে দিলেন। মেয়েকে এভাবে ভেজা অবস্থায় এক যুবকের সাথে দেখে তিনি অবাক হলেন। কিন্তু রূপা কোনো কথা না বলে রোহানের হাত ধরে সোজা নিয়ে গেল ভেতরের ঘরে, যেখানে হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন তার বাবা।

পাঁচ বছর পর রোহান আবার সেই মানুষটার মুখোমুখি। রোহানের বুকটা চুরমার হয়ে যেতে লাগল। সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে রূপার বাবার পায়ের কাছে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

"আমাকে ক্ষমা করে দিন, আঙ্কেল," রোহানের কণ্ঠ কান্নায় বুজে এল। সে রূপার বাবার হুইলচেয়ারের হাতল চেপে ধরে মাথা নিচু করল। "পাঁচ বছর আগে যে দুর্ঘটনায় আপনার জীবনটা বদলে গিয়েছিল, সেই গাড়ির ড্রাইভিং সিটে আমি ছিলাম। যদিও ব্রেক কাটা হয়েছিল, কিন্তু আমিই ছিলাম সেই চালক। আপনার এই যন্ত্রণার জন্য আমি দায়ী। কিন্তু আমি রূপাকে কোনো ছলে ভালোবাসিনি... আমি ওকে নিজের আত্মার চেয়েও বেশি ভালোবেসেছি।"

ঘরে নেমে এল এক থমথমে নীরবতা। রূপার মায়ের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কিন্তু রূপার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন হাঁটু গেড়ে বসে থাকা রোহানের দিকে।

তিনি হাত বাড়িয়ে রোহানের মাথাটা আলতো করে স্পর্শ করলেন।

"আমি জানি, বাবা," রূপার বাবার গলার স্বর ধরে এল। "সাজ্জাদের ষড়যন্ত্রের কথা পুলিশ আমাকে আধঘণ্টা আগেই ফোনে জানিয়েছে। ড্রাইভার হিসেবে তুমি দায়ী ছিলে না, তা আমি আজ জেনেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, গত পাঁচ বছর ধরে যে অজ্ঞাত পরিচয়ের মানুষটা প্রতি মাসে গোপনে আমার চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করত, সে যে তুমি—তা আমি আগেই বুঝেছিলাম, রোহান।"

রোহান চমকে উঠে মাথা তুলল। রূপাও অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল তার বাবার দিকে।

"তুমি অনুশোচনার আগুনে নিজেকে জ্বালিয়েছ," রূপার বাবা মৃদু হেসে বললেন। "আর আজ নিজের জীবন বাজি রেখে আমার মেয়েকে রক্ষা করেছ। এর চেয়ে বড় ভালোবাসা আর কী হতে পারে? ওঠো, বাবা।"

রোহানের চোখে তখন অশ্রুর বন্যা। সে রূপার বাবার পা ছুঁয়ে সালাম করল। রূপা দৌড়ে এসে রোহানের পাশে বসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

পরদিন বিকেলে আবার সেই ছাদ। বুড়িগঙ্গার হিমেল বাতাস রূপার সুতির শাড়ির আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আজকের বিকেলটা অন্যরকম। আজ কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো শঙ্কা নেই, নেই কোনো বিষাক্ত অভিমান।

রোহান পিছন থেকে এসে রূপাকে জড়িয়ে ধরল। রূপা নিজের পিঠ ঠেকিয়ে দিল রোহানের চওড়া বুকে। রোহান তার থুতনি রাখল রূপার কাঁধে, তার তপ্ত নিশ্বাস রূপার ঘাড়ে আলতো দোলা দিয়ে গেল।

"এখনও কি কোনো অভিমান বাকি আছে, রূপা?" রোহান রূপার কানে ফিসফিস করে বলল।

রূপা ঘুরে দাঁড়িয়ে রোহানের শার্টের কলার ধরে তাকে নিজের খুব কাছে টেনে আনল। রোহানের গভীর কাজল-কালো চোখের দিকে তাকিয়ে সে এক পরম তৃপ্তির হাসি হাসল।

"অভিমান তো ভালোবাসারই অংশ, রোহান," রূপা রোহানের ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তবে আজ থেকে আমার সব রাগ, সব অভিমান আর সমস্ত ভালোবাসা—সবটাই শুধু তোমার।"

রাতের পুরান ঢাকার আকাশে তখন তারার মেলা। বুড়িগঙ্গার জল ছুঁয়ে আসা বাতাস সাক্ষী হয়ে রইল তাদের এই প্রগাঢ়, গভীর আর অবিনশ্বর ভালোবাসার গল্পের।

....
👁 57