শিক্ষকের নিষিদ্ধ সম্পর্ক

 মেসটার দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালেই একটা বেশ বড় অশ্বত্থ গাছ চোখে পড়ে। সকালের মিষ্টি রোদে সেই গাছের পাতাগুলো যখন বাতাসে দোলে, প্রিয়ার মনে হয় দুনিয়ার সব কাজ থামিয়ে দিয়ে শুধু এই খেলাটা দেখা উচিত। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। পলিটিক্যাল সায়েন্সের জটিল তত্ত্বগুলো তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরে পড়তে আসার পর থেকে এই এক মেসজীবন আর পড়ালেখার পাহাড় তাকে চেপে ধরেছে।

বগুড়ার সোনাতলা গ্রামের খোলা বাতাস, মেঠো পথ আর নদীর ঢেউ ছেড়ে যখন প্রিয়া প্রথম ঢাকায় এলো, তখন মেসের ছোট্ট রুমটা তাকে দম আটকে মারতে চেয়েছিল। একা থাকার অভ্যাস ছিল না তার। মেসের অন্য মেয়েরা যার যার মতো ব্যস্ত। তবে প্রিয়ার স্বভাবটা একটু অন্যরকম—খুব চঞ্চল, কিছুটা দুষ্টু আর ভীষণ অবাধ্য। যা মনে আসে, মুখেও তা-ই। বানিয়ে কথা বলা বা মেকি গাম্ভীর্য দেখানো তার স্বভাবে নেই।

তবে আজকের দিনটা একটু অন্যরকম। আজ মেসে একজন নতুন প্রাইভেট টিউটর আসার কথা। টিউটর যিনি আসছেন, তিনি শুধু প্রাইভেট শিক্ষক নন, প্রিয়াদের বিভাগেরও একজন জুনিয়র লেকচারার। নাম রৌশন। ক্যাম্পাসে রৌশন স্যারের সুনাম আর গাম্ভীর্যের কথা সবাই জানে। দেখতে যেমন সুপুরুষ, ব্যক্তিত্বেও তেমনই ব্যক্তিত্ববান। ক্লাসে এলে মেয়েরা একটু বাড়তি মনোযোগ দিয়ে তার লেকচার শোনে। তবে প্রিয়ার কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব ছিল না। তার কাছে স্যার মানেই আরেকটা বিরক্তির কারণ, যে এসে তার ছুটির সময়টা নষ্ট করবে।

বিকেল ঠিক চারটায় মেসে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মেসের খালা এসে দরজা খুলে দিলে রৌশন ভেতরে প্রবেশ করলো। পরনে হালকা নীল রঙের ফুল হাতা শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে কিছু বই আর ফাইলের ফোল্ডার। চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো বেশ তীক্ষ্ণ।

প্রিয়া তখন মেসের ড্রয়িংরুমে বসেই পড়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য একটা গল্পের বইয়ের ভেতরে টেক্সট বই লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিল। রৌশন এসে সামনের সোফায় বসতেই প্রিয়া চট করে বইটা সোফার কুশনের নিচে গুঁজে দিল।

রৌশন চশমাটা ঠিক করে নিয়ে প্রিয়ার দিকে তাকাল। প্রিয়ার মুখে তখন এক অদ্ভুত নিষ্পাপ ভাব, যেন সে দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো ছাত্রী।

"তুমিই তো প্রিয়া, তাই না?" রৌশনের গলাটা বেশ গম্ভীর কিন্তু স্পষ্ট।

"জি স্যার, আমিই প্রিয়া। আসসালামু আলাইকুম," প্রিয়া একটু নিচু গলায় বলল, যদিও তার চোখের কোণে একধরনের দুষ্টুমির হাসি স্পষ্ট লুকিয়ে ছিল।

"ওয়ালাইকুমুস সালাম। তোমার ডিপার্টমেন্টের রেজাল্ট আর মিডটার্মের খাতাগুলো আমি দেখেছি। সিজিপিএ বেশ নিচের দিকে নামছে। পলিটিক্যাল থট নিয়ে এত সমস্যা কেন?" রৌশন সোজা কাজের কথায় চলে এলো।

প্রিয়া গাল ফুলিয়ে বলল, "স্যার, সক্রেটিস আর প্লেটো হাজার বছর আগে কী বলে গেছেন, তা নিয়ে এখন আমার ঘুম হারাম করার কোনো মানে হয়? উনারা তো মরে বেঁচে গেছেন, আমাদের কেন ফ্যাদে ফেললেন!"

রৌশন থমকে গেল। সাধারণ কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষকের সামনে প্রথম দিনে এমন কথা বলার সাহস পায় না। কিন্তু এই মেয়েটি একদম আলাদা। তার কথাবার্তায় কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে একধরনের চঞ্চল সারল্য। রৌশনের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, "পরীক্ষার খাতায় এসব লজিক দিলে জিরো ছাড়া কিছু পাবে না। বই বের করো।"

পড়াশোনা শুরু হলো। রৌশন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু প্রিয়ার মন সেখানে নেই। সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, না হয় জানালার বাইরের পাখির দিকে।

একপর্যায়ে রৌশন টেবিল চাপড়ে বলল, "মন কোথায় তোমার? আমি প্লেটোর রিপাবলিক বোঝাচ্ছি, আর তুমি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছ!"

প্রিয়া হুট করে বলে উঠল, "স্যার, আপনার শার্টের দ্বিতীয় বোতামটা কিন্তু আলগা হয়ে আছে। যেকোনো সময় খুলে পড়ে যেতে পারে। আমি ভাবছিলাম ওটা পড়ে গেলে আপনি কীভাবে ক্লাসে যাবেন!"

রৌশন চমকে উঠে নিজের শার্টের দিকে তাকাল। আসলেই বোতামটা কিছুটা ঢিলে হয়ে ঝুলছে। প্রিয়ার এই আকস্মিক পর্যবেক্ষণে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। প্রিয়া তখন নিজের মুখে হাত দিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সেই হাসিতে কোনো বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা ছিল না, ছিল এক নিষ্পাপ দুষ্টুমি।

রৌশন চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। এক মুহূর্তের জন্য সে প্রিয়ার চোখের দিকে তাকাল। ডাগর ডাগর দুটো চোখ, তাতে যেন এক রাশ আলো খেলা করছে। গ্রাম থেকে আসা এই মেয়েটির ভেতরের সরলতা আর চঞ্চলতা রৌশনের খুব চেনা শহুরে জীবনের ছকবাঁধা পরিবেশের চেয়ে একদম আলাদা।

"পড়াশোনায় মন দাও, প্রিয়া। এসব বাজে খেয়াল বাদ দাও," রৌশন একটু নরম সুরেই বলল।

"আচ্ছা স্যার, রাগ করছেন কেন? পড়াচ্ছি তো," বলে প্রিয়া বইয়ের পাতায় মনোযোগ দেওয়ার নাটক করতে লাগল।

প্রথম দিনের পড়া শেষে রৌশন যখন উঠে দাঁড়াল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। রৌশন তার ব্যাগটা গুছিয়ে নিতে নিতে বলল, "আগামীকাল ঠিক এই সময়ে আসব। আর কাল যেন প্লেটোর পুরো চ্যাপ্টারটা পড়া থাকে।"

"ঠিক আছে স্যার। কিন্তু একটা শর্ত আছে," প্রিয়া সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল।

রৌশন ভ্রু কুঁচকে তাকাল, "শিক্ষকের সাথে শর্ত?"

"হাঁ স্যার। কাল যদি আমি সব পড়া পারি, তবে আপনাকে আমাকে মেসের সামনের মামার দোকান থেকে এক ভাঁড় চা খাওয়াতে হবে। এই শহরের চা আমার একদম ভালো লাগে না, তবে ওই মামার চা-টা তাও খাওয়া যায়।"

রৌশন প্রিয়ার দিকে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখে কোনো ভয় নেই, দ্বিধা নেই—আছে শুধু অবাধ অধিকার প্রকাশের এক সহজ ইচ্ছা। রৌশন মনে মনে একটা অদ্ভুত টান অনুভব করল, যা তার মতো একজন সংযমী মানুষের জন্য একদমই নতুন।

"আগে পড়া পারো, তারপর দেখা যাবে," রৌশন সংক্ষেপে বলল।

রৌশন বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রিয়া বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাস্তায় রৌশন হেঁটে যাচ্ছে। প্রিয়ার মনে হলো, এই স্যারটা একটু বেশিই গম্ভীর, কিন্তু মানুষটা একদমই খারাপ নয়।

অন্যদিকে, মেস থেকে বেরিয়ে হেঁটে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে যেতে যেতে রৌশনের মাথার ভেতরে বারবার প্রিয়ার সেই মিষ্টি দুষ্টুমি ভরা হাসিটা ভেসে উঠছিল। সে মনে মনে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছিল। কারণ সে জানে, তার জীবনটা এত সহজ নয়।

বাসায় পৌঁছাতেই রৌশনের মা তার ঘরে এলেন। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট আর কিছু ছবি।

"রৌশন, তোর খালু ফোন করেছিলেন। ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর তানিয়ার বাবার সাথে কথা সব পাকা। তানিয়া খুব ভালো মেয়ে, তোর সহকর্মীও বটে। তোদের দুজনের জুটিটা খুব মানাবে। আগামী মাসেই আংটি পরানোর দিন ঠিক করছি।"

মা কথাগুলো বলে ছবিটা রৌশনের পড়ার টেবিলে রেখে দিলেন।

রৌশন টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার দিকে তাকাল। তানিয়া—শিক্ষিত, অভিজাত এবং তাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষিকা। পরিবার থেকে এই বিয়েটা অনেক আগে থেকেই একপ্রকার ঠিক হয়ে আছে। রৌশনও এতে কখনো আপত্তি করেনি, কারণ তার কাছে জীবনটা একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে চলাই স্বাভাবিক মনে হতো।

কিন্তু আজ তানিয়ার ছবির দিকে তাকাতেই রৌশনের মনে ভেসে উঠল একজোড়া চঞ্চল চোখ আর একটা নিষ্পাপ চঞ্চল মুখ, যে তাকে শার্টের বোতামের কথা মনে করিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হেসেছিল।

রৌশন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, প্রিয়া কেবল তার এক অবাধ্য ছাত্রী, আর সে একজন শিক্ষক। কিন্তু বুকের এক কোণে কোথাও একটা অচেনা অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে, যা এই শান্ত সন্ধ্যার বাতাসকে এক লহমায় এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

বিকেলের হালকা বৃষ্টির ফোঁটা তখন ধানমন্ডির রাস্তায় ঝরতে শুরু করেছে। 

পরদিন ঠিক বিকেল চারটায় রৌশন যখন প্রিয়াদের মেসে পৌঁছাল, বাইরে তখন কড়া রোদ। কিন্তু মেসের ভেতর ঢুকতেই রৌশনের মনটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। কাল রাত থেকে তানিয়ার সাথে বিয়ের আলাপ আর পরিবারের চাপ নিয়ে যে একটা মানসিক টানাপোড়েন চলছিল, প্রিয়ার হাসিমুখটা দেখার সাথে সাথেই যেন তা উধাও হয়ে গেল।

প্রিয়া আজকে একটি সুতি সবুজ রঙের সালোয়ার-কামিজ পরে বসেছিল। চুলে কাঁচা বেলি ফুলের একটা মালা জড়ানো। রৌশন ঘরে ঢুকতেই প্রিয়া একগাল হেসে বলল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার! আজ কিন্তু আমি একদম তৈরি। প্লেটোর রিপাবলিকের পুরো রস কষ গুলে খেয়ে ফেলেছি। এবার বলুন, আমার চা পাওয়া নিশ্চিত তো?"

রৌশন চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে গম্ভীর হওয়ার ভান করল। "আগে পড়া শুনি, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।"

পরবর্তী এক ঘণ্টা পড়াশোনা বেশ চমৎকার চলল। প্রিয়া সত্যিই পড়াটা খুব সুন্দর করে তৈরি করেছিল। গ্রাম থেকে আসা হলেও মেয়েটার মেধা অসাধারণ, শুধু একটু মনোযোগের অভাব ছিল। রৌশন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পরাণোর ব্যাখ্যা শুনছিল। কিন্তু পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে প্রিয়ার এই যে চোখের চঞ্চলতা, চুলে হাত বোলানো আর মাঝে মাঝে ঠোঁট উল্টে স্যারের ভুল ধরা—এসব রৌশনের শান্ত মনে এক অচেনা ঝড়ের সৃষ্টি করছিল।

পড়া শেষে রৌশন খাতা বন্ধ করে বলল, "হুম, ভালো হয়েছে। তুমি পরীক্ষায় বেশ ভালো করবে বোঝা যাচ্ছে।"

"তাহলে আমার চা?" প্রিয়া দু হাত তুলে বাচ্চাদের মতো দাবি জানাল।

রৌশন মুচকি হেসে বলল, "চলো।"

মেসের বাইরে এসে গলি পার হয়ে বড় রাস্তার মোড়ের চা দোকানে দুজন গিয়ে দাঁড়াল। রৌশন দুটো ভাঁড় চায়ের অর্ডার দিল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার অভিজ্ঞতা রৌশনের বহু বছর ধরে নেই। সে এক সুশৃঙ্খল আর পরিমিত জীবনযাপন করে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রিয়ার সাথে এই এক কাপ চা খাওয়ার মুহূর্তটা তাকে এক অন্যরকম আনন্দ দিচ্ছিল।

"স্যার, আপনার এত গম্ভীর থাকার রহস্যটা কী বলুন তো?" চায়ে চুমুক দিয়ে প্রিয়া শুধাল। "বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাকে দেখলে মনে হয় আপনি কোনো কথা বলতেই ভালোবাসেন না। অথচ দেখুন, চা খেতে কিন্তু আপনার বেশ ভালোই লাগছে!"

রৌশন প্রিয়ার দিকে তাকাল। বাতাসে প্রিয়ার কানের পাশের একগুচ্ছ চুল উড়ে এসে গালে পড়ছিল। না চাইতেও রৌশনের ডান হাতটা একটু এগিয়ে গেল সেই চুলটুকু সরিয়ে দেওয়ার জন্য, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের আত্মসংবরণ করে হাতটা গুটিয়ে নিল।

"জীবনটা তো আর সব সময় উদযাপনের জায়গা নয় প্রিয়া। অনেক দায়িত্ব থাকে, নিয়ম থাকে," রৌশন একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

"ধুর স্যার! জীবনকে এত নিয়ম দিয়ে বাঁধলে জীবন তার রস হারিয়ে ফেলে। মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙতেও হয়," প্রিয়া খুব সহজ গলায় কথাটা বলে দিল।

কথাটা রৌশনের বুকে গিয়ে বিঁধল। নিয়ম ভাঙা? সে কি পারবে তার পরিবারের ঠিক করা বিয়ে, তানিয়ার সাথে তার সাজানো ভবিষ্যৎ আর সমাজের নিয়ম ভেঙে এই অবাধ্য মেয়েটার দিকে হাত বাড়াতে?

ঠিক সেই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে একটি রিকশা এসে থামল। রিকশায় বসা তানিয়া। তানিয়া শপিং সেরে ফিরছিল। রৌশনকে রাস্তার মোড়ে এক সাধারণ ছাত্রীর সাথে চা খেতে দেখে সে রিকশা থামিয়ে নেমে এলো।

"রৌশন? তুমি এখানে?" তানিয়ার গলায় খানিকটা বিস্ময় আর বিরক্তি।

রৌশন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "তানিয়া? তুমি হঠাৎ এখানে?"

"আমি তো এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছ? অ্যান্ড হু ইজ শি?" তানিয়া প্রিয়ার দিকে আপাদমস্তক চোখ বুলাল। প্রিয়ার সাধারণ পোশাক আর সহজ ভাবভঙ্গি তানিয়ার অভিজাত চোখের কাছে বেশ তুচ্ছ মনে হলো।

"ও প্রিয়া। আমার ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট, মেসটা এখানেই। আমি ওকে প্রাইভেট পড়াই," রৌশন পরিচয় করিয়ে দিল।

তানিয়া হালকা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "ওহ! তা টিউটরিং শেষে স্টুডেন্টকে নিয়ে রাস্তায় চা খাওয়া কি খুব জরুরি ছিল? যাই হোক, আন্টি কিন্তু বিকেলে আমাদের বাসায় আসতে বলেছেন। আমাদের এনগেজমেন্টের ডেটটা ফাইনাল করা দরকার। তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিও।"

কথাগুলো বলেই তানিয়া রৌশনের দিকে একধরনের পূর্ণ অধিকারের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার রিকশায় গিয়ে বসল।

তানিয়া চলে যাওয়ার পর চারপাশটা এক মুহূর্তের জন্য যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। প্রিয়া এতক্ষণ চুপ করে সব দেখছিল। তার চঞ্চল মুখটা এক লহমায় গম্ভীর হয়ে গেল।

"উনি কি আপনার হবু স্ত্রী, স্যার?" প্রিয়ার কণ্ঠে আর আগের সেই অবাধ্য দুষ্টুমি ছিল না, ছিল এক অজানা অভিমানের সুর।

রৌশন প্রিয়ার চোখের দিকে তাকাতে পারল না। সে শুধু নিচু গলায় বলল, "পরিবার থেকে ওর সাথে কথা চলছে। এখনো সব চূড়ান্ত হয়নি।"

"ওহ," প্রিয়া আর কিছু বলল না। চা শেষ না করেই চায়ের ভাঁড়টা একপাশে রেখে দিল। "স্যার, আমার মেসের ভেতর যেতে হবে। কাল আবার পড়াবেন।"

প্রিয়া আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহন করে মেসের দিকে হেঁটে চলে গেল।

রৌশন সেখানে দাঁড়িয়ে প্রিয়ার চলে যাওয়া দেখতে লাগল। প্রিয়ার ওই অভিমানী মুখ আর নিভে যাওয়া চোখ দুটো দেখে রৌশনের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। সে বুঝতে পারল, প্রিয়া কেবল তার ছাত্রী নয়—প্রিয়া এখন তার হৃদয়ের এক গভীর অনুভূতির নাম। কিন্তু একদিকে তানিয়া আর পরিবারের চাপ, অন্যদিকে নিজের সামাজিক অবস্থান।

মেসের রুমে ফিরে প্রিয়া দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে না চাইতেও দুটো ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে শহরকে ভয় পেত, কিন্তু শহর থেকে আসা এই মানুষটাকে যে সে কখন ভালোবেসে ফেলেছে, তা সে নিজেও জানত না। তানিয়াকে রৌশনের পাশে দেখে তার বুকের ভেতরটা ভীষণভাবে মুচড়ে উঠেছে।

সেই রাতে রৌশনও ঘুমাতে পারল না। তানিয়ার অভিজাত অহংকার আর প্রিয়ার সরল ভালোবাসা—দুটো বিপরীত মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে রৌশন অনুধাবন করল, সে আর তানিয়াকে বিয়ে করতে পারবে না। তার মন ইতোমধ্যেই প্রিয়ার নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে।

পরদিন দুপুরে প্রিয়ার কাছে রৌশনের একটা ফোন এলো। রৌশনের গলাটা খুব অস্থির শোনাচ্ছিল।

"প্রিয়া, আজ বিকেলে আমি পড়াতে যাব না। তুমি কি একটু কার্জন হলের পেছনের বাগানটায় আসতে পারবে? আমার তোমার সাথে খুব জরুরি কথা আছে।"

প্রিয়া একটু চুপ থেকে জবাব দিল, "ঠিক আছে স্যার, আমি আসব।"

কার্জন হলের লাল ইটের লালচে আবহে বিকেলবেলা যখন দুজন সামনাসামনি দাঁড়াল, তখন চারপাশ নীরব। রৌশন আর কোনো দ্বিধা রাখল না। সে প্রিয়ার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। বাতাসে প্রিয়ার ওড়না উড়ছিল। রৌশন প্রিয়ার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।

"স্যার, এসব কী করছেন?" প্রিয়া চমকে উঠে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।

"আজ কোনো স্যার নয় প্রিয়া," রৌশনের কণ্ঠে আকুলতা। "কাল তানিয়া আসার পর থেকে তুমি যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ, আমি সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি। আমি বুঝে গেছি, আমার জীবনের নিয়মগুলো ভাঙার সময় এসেছে।"

"কিন্তু ওই ম্যামের সাথে আপনার এনগেজমেন্ট..." প্রিয়ার চোখ জলে ভরে এলো।

"আমি কোনো এনগেজমেন্ট করছি না," রৌশন প্রিয়ার ফ্যাকাশে গাল দুটো আলতো করে ছুয়ে দিল। চোখের জলটুকু নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে দিয়ে বলল, "আমি শুধু তোমাকেই চাই, প্রিয়া। তোমার এই অবাধ্যতা, তোমার এই চঞ্চলতা ছাড়া আমার বাঁচা সম্ভব নয়। তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?"

প্রিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রৌশনের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলল। রৌশন তাকে শক্ত করে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল। কার্জন হলের সেই মিষ্টি বিকেলে দুটো হৃদয় এক হয়ে গেল।

কিন্তু রৌশন জানত, তাদের এই ভালোবাসার পথ সহজ নয়। পরিবার আর সমাজের চোখ এড়িয়ে প্রিয়াকে নিজের করে পাওয়ার একটাই উপায় আছে।

রৌশন প্রিয়ার কপালে এক গভীর চুমু একে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমরা কালই কাজি অফিসে গিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করব, প্রিয়া। তুমি রাজি?"

প্রিয়া রৌশনের চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে মাথা নাড়ল।

কাজি অফিসের ছোট ঘরটায় যখন রৌশন আর প্রিয়া সামনাসামনি বসল, তখন প্রিয়ার হাত দুটো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে ছিল। লাল একটা সাধারণ সুতি শাড়িতে প্রিয়াকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল—কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো অলংকার নেই, শুধু কপালে একটা ছোট টিপ আর চোখে অচেনা এক দুশ্চিন্তা। রৌশন প্রিয়ার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে চেপে ধরল। সেই স্পর্শে ছিল এক পরম বিশ্বাসের উষ্ণতা।

সহি-সাবুদ শেষ হতেই কাজি সাহেব যখন তাদের দাম্পত্য জীবনের জন্য হাত তুলে দোয়া করলেন, প্রিয়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এই জলটা শুধুই ভয়ের নয়, এক অপার্থিব আনন্দেরও। শহর ঢাকার বুকে এক পরম গোপনীয়তায় তারা এখন একে অপরের স্বামী-স্ত্রী।

কাজি অফিস থেকে বেরিয়ে রৌশন প্রিয়াকে নিয়ে সোজা চলে এলো শহরের এক নামী হোটেলে। ধানমন্ডির সেই মেসের ঘিঞ্জি পরিবেশ কিংবা পরিবারের চোখের আড়ালে তাদের এই নতুন সম্পর্কের সূচনা হওয়ার জন্য একটি নিরাপদ আর নিভৃত আশ্রয় বড্ড প্রয়োজন ছিল।

হোটেল রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হতেই বাইরের পৃথিবীর সব শোরগোল যেন এক লহমায় থেমে গেল। এসি-র হালকা ঠান্ডা আর ঘরের মৃদু আলোয় এক আবেশময় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। প্রিয়া ঘরের মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, লজ্জায় আর সংকোচে সে রৌশনের দিকে তাকাতেও পারছিল না।

রৌশন পেছন থেকে এসে প্রিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। নিজের বুকের সাথে প্রিয়ার পিঠ শক্ত করে চেপে ধরে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "এখন আর কোনো স্যার বা স্টুডেন্ট নই আমরা, প্রিয়া। তুমি এখন শুধু আমার বউ।"

রৌশনের গরম নিশ্বাস প্রিয়ার ঘাড়ে লাগতেই প্রিয়া শিউরে উঠল। সে হালকা ঘুরতে চাইলে রৌশন তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। চশমাটা খুলে রৌশন দূরে রেখে দিল। প্রিয়ার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটোর ওপর নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল রৌশন। এক গভীর, গাঢ় ভালোবাসার চুমুতে প্রিয়ার সব দ্বিধা আর শঙ্কা উবে গেল। প্রিয়া রৌশনের শার্টের কলার চেপে ধরে নিজেকে সঁপে দিল রৌশনের বুকে।

বিছানার নরম চাদরে দুজনের শরীর মিলেমিশে এক হয়ে গেল। এতদিনের চেপে রাখা সব আবেগ, ভালোবাসা আর আকর্ষণ বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো আছড়ে পড়ল সেই বন্ধ ঘরে। প্রিয়ার চঞ্চলতা রূপ নিল এক মিষ্টি ব্যাকুলতায়, আর রৌশনের গাম্ভীর্য গলে গিয়ে তৈরি হলো এক অধীর প্রেমিকের রূপ। ভালোবাসার সেই মাদকতাময় রাতে রৌশন প্রিয়াকে ভালোবাসার সাগরে ভাসিয়ে দিল। প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি চুমু আর প্রতিটি আলিঙ্গনে তারা একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে নিল।

রাত পোহাতেই অবশ্য সেই রাজকীয় স্বপ্নের রাত শেষ হয়ে গেল। বাস্তব আবার তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। রৌশনকে ফিরতে হলো তার নিজের বাসায়, আর প্রিয়াকে তার মেসের রুমে।

বিয়েটা তো হয়ে গেল, কিন্তু তা জানাল না কাউকেই। প্রিয়া মেসে আগের মতোই সাধারণ ছাত্রী হয়েই রইল। কিন্তু এখন তার জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। সপ্তাহে দু-তিন দিন গভীর রাতে যখন পুরো মেস ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত, রৌশন গোপনে প্রিয়ার মেসের পেছনের ছোট গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকত। প্রিয়ার সেই ছোট্ট ঘরটায় তারা কাটাত রূপকথার মতো কিছু ঘণ্টার রাত।

প্রতিটি গোপন রাতে প্রিয়ার মেসের ছোট খাটটায় রৌশন তাকে নিজের বাহুডোরে বেঁধে রাখত। প্রিয়ার গালে গাল ঘষে রৌশন বলত, "এই লুকোচুরি আর ভালো লাগে না, প্রিয়া। মন চায় তোমায় সোজা নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে সবাইকে চিৎকার করে বলি—তুমি আমার।"

প্রিয়া রৌশনের বুকে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে হাসত, "একটু ধৈর্য ধরুন না, স্যার। আগে আমার অনার্সটা শেষ হোক, নাকি এখনই বউ করে ঘরে তুলে অপমানিত হবেন?"

রৌশন তখন প্রিয়ার ঠোঁটে ছোট এক কামড় বসিয়ে বলত, "আবার স্যার? ক্লাসের বাইরে আমি তোমার বর, মনে থাকবে?"

এভাবেই ভালোবাসার মোড়কে দিনগুলো গড়াচ্ছিল। কিন্তু মেঘহীন আকাশে ঝড়ের সঙ্কেত দেখা দিতে বেশি সময় লাগে না।

ব বিয়ের পর প্রায় তিন মাস কেটে গেছে। হঠাৎ করেই কয়েকদিন ধরে প্রিয়ার শরীরটা খুব খারাপ করতে শুরু করল। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই তীব্র গা গোলানো আর মাথা ঘোরানো। মেসের খাবার দেখলেই তার বমি আসছে। কোনো কিছুতেই প্রিয়া মন দিতে পারছিল না।

একদিন মেসের এক বয়স্ক খালা প্রিয়ার অবস্থা দেখে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। খালা প্রিয়াকে গোপনে একটা টেস্ট কিট এনে দিলেন।

মেসের বাথরুমের বন্ধ দরজার ওপাশে প্রিয়া যখন টেস্ট কিটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার বুক দড়ফড় করছিল। পজিটিভ দুটি লাল দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠল প্লাস্টিকের গায়ে।

প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে বাথরুমের মেঝেই বসে পড়ল। সে গর্ভবতী!

একদিকে এক পরম আনন্দের অনুভূতি, অন্যদিকে এক তীব্র আতঙ্ক। সে এখনো শিক্ষার্থী, মেসজীবনে থাকে, গ্রাম থেকে আসা একটা সাধারণ মেয়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের বিয়ের কথা সমাজ তো দূরের কথা, রৌশনের পরিবারও জানে না! রৌশনের মাথায় তো এমনিতেই তানিয়ার সাথে বিয়ের চাপ ঝুলছে।

কাঁপা কাঁপা হাতে প্রিয়া রৌশনের নম্বরে ফোন দিল।

"হ্যালো রৌশন... তুমি কি এখনই একটু আসতে পারবে? খুব জরুরি..." প্রিয়ার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না, কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

ওপাশ থেকে রৌশন ভীষণ শঙ্কিত হয়ে উঠল, "কী হয়েছে প্রিয়া? তুমি কাঁদছ কেন? আমি আসছি, তুমি শান্ত হও!"

মেসের পেছনের ছোট্ট গলিটায় রৌশন যখন গাড়ি পার্ক করে নামল, তখন তার বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠছিল। প্রিয়ার ফোনে কান্নার সুর সে আগে কখনো শোনেনি। প্রিয়া চঞ্চল, দুষ্টু, কিন্তু এত সহজে ভেঙে পড়ার মেয়ে সে নয়।

গোপনে প্রিয়ার ঘরে ঢুকে রৌশন দেখল, প্রিয়া খাটের এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। ঘরের লাইট নেভানো, জানালার ফাঁক গলে বিকেলের কিছু মরমে মরা আলো এসে পড়েছে প্রিয়ার উসকোখুসকো চুলে।

"প্রিয়া! কী হয়েছে তোমার?" রৌশন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে প্রিয়ার পাশে বসল। প্রিয়াকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে যেতেই প্রিয়া একঝাঁকে রৌশনের বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।

রৌশন প্রিয়ার মুখটা আলতো করে ওপরে তুলল। প্রিয়ার চোখের কোল লাল হয়ে ফুলে আছে। প্রিয়া কোনো কথা না বলে কাঁপতে থাকা ডান হাতটা রৌশনের দিকে বাড়িয়ে দিল। প্রিয়ার তালুতে রাখা প্লাস্টিকের সেই ছোট স্ট্রিপটা—যার গায়ে দুটি স্পষ্ট লাল দাগ।

রৌশন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে এলো। চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল।

"প্রিয়া... এটা...?" রৌশনের গলা দিয়ে যেন শব্দ বের হতে চাইছিল না।

"আমি গর্ভবতী, রৌশন," প্রিয়া বিলাপের সুর কেঁদে উঠল। "আমরা এখন কী করব? আমি একা এই মেসে থাকি, গ্রামের বাড়ি থেকে আব্বা-আম্মা জানলে আমায় জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে! আর আপনার পরিবার... আপনার মা তো তানিয়া ম্যামের সাথে বিয়ের সব আয়োজন করে ফেলেছেন। আমি এখন কোথায় যাব?"

রৌশন শক্ত করে প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় কপালে চুমু দিতে লাগল। নিজের ভেতরেও এক বিশাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রিয়ার এই মুহূর্তে ভেঙে পড়া দেখে তাকে শক্ত হতে হবে। সে জানে, এই সন্তান তাদের পরম ভালোবাসার সৃষ্টি, কোনো পাপ নয়।

"প্রিয়া, শান্ত হও। প্লিজ কেঁদো না," রৌশন প্রিয়ার গাল দুটো দুহাতে চেপে ধরে বলল। "এটা আমাদের বাচ্চা, আমাদের ভালোবাসার ফল। তুমি কোনো অন্যায় করোনি। আমি থাকতে তোমার বা আমাদের সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।"

"কিন্তু আপনার পরিবার?" প্রিয়া রৌশনের চোখের দিকে তাকাল। "আপনি কি পারবেন ওদের সামনে আমাকে বউ বলে স্বীকার করতে? নাকি তানিয়া ম্যামকেই..."

"চুপ!" রৌশন প্রিয়ার ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল। "তানিয়া আমার জীবনে কেউ নয়। আমি মা-বাবাকে সব বলে দেব। কালই বলব।"

তবে মুখ দিয়ে কথাটা বললেও রৌশন খুব ভালো করেই জানত, কাজটা কতটা কঠিন। তার বাবা একজন প্রাক্তন মেজিস্ট্রেট, অত্যন্ত কড়া স্বভাবের মানুষ। আর মা তানিয়ার পরিবারকে কথা দিয়ে বসে আছেন। এত বড় সত্যটা হুট করে সামনে আনলে পরিবারে যে ভূমিকম্প শুরু হবে, তা সামলানো সহজ নয়।

সেদিন রাতে রৌশন নিজ ঘরে ফিরে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার মা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

"রৌশন, ভালোই হলো তুই এসেছিস। শোন, আগামী শুক্রবার তোর আর তানিয়ার এনগেজমেন্টের দিন একদম পাকা করা হয়েছে। তানিয়ার বাবা রাজউক ব্লকে ব্যাংকুয়েট হল বুক করে ফেলেছেন। কাল তোকে আর তানিয়াকে শপিংয়ে যেতে হবে।"

রৌশনের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। আগামী শুক্রবার? মাত্র তিন দিন পর!

"মা, আমি তোমার সাথে একটু একা কথা বলতে চাই," রৌশন থমথমে গলায় বলল।

পড়ার ঘরে গিয়ে রৌশন কতবার চেষ্টা করল সত্যটা বলে দিতে। কিন্তু মায়ের মুখে তানিয়া আর এই বিয়ে নিয়ে আনন্দ দেখে তার মুখ আটকে গেল। মা এমনিতেই প্রেসারের রোগী। রৌশন সিদ্ধান্ত নিল, আগে সে বাবা আর মায়ের সাথে ঠাণ্ডা মাথায় আলাদাভাবে কথা বলবে, কিন্তু আজ রাতে নয়।

পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয়া আর রৌশনের দেখা হলো ডিপার্টমেন্টের করিডোরে। প্রিয়ার শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছিল। ক্লাসের ফাঁকে তানিয়ার সাথে প্রিয়ার সামনাসামনি দেখা হয়ে গেল।

তানিয়া প্রিয়াকে দেখে এক বক্র হাসি দিয়ে বলল, "কী ব্যাপার প্রিয়া? শরীর খারাপ নাকি? আজকাল ক্লাসেও মনোযোগ নেই। আর হ্যাঁ, আগামী শুক্রবার আমার আর তোমাদের রৌশন স্যারের এনগেজমেন্ট। ডিপার্টমেন্টের সবাইকে দাওয়াত করব, তুমিও এসো কিন্তু।"

কথাগুলো প্রিয়ার কানে যেন বিষের মতো বিধল। তানিয়া প্রিয়াকে এড়িয়ে হেঁটে চলে গেল। প্রিয়া করিডোরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাত দিয়ে নিজের পেট চেপে ধরল। তার ভেতরে জন্ম নেওয়া নতুন প্রাণটার কথা ভেবে তার চোখ ফেটে জল এলো। রৌশন কি সত্যিই পারবে এই সমাজ আর পরিবারের সাথে লড়াই করে তাদের আপন করে নিতে? নাকি সে স্রেফ এক গোপন অতীতে পরিণত হবে?

বিকালে মেসের রুমে ফিরে প্রিয়া দেখল তার মোবাইলে রৌশনের ফোন।

"প্রিয়া, আমি আজ রাতে মেসে আসতে পারব না। বাড়িতে এনগেজমেন্টের প্রস্তুতি নিয়ে খুব ঝামেলা চলছে। তুমি নিজের খেয়াল রাখছ তো? ওষুধ খেয়েছ?" রৌশনের গলায় ভীষণ ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।

প্রিয়া কিছু ক্ষণ চুপ থেকে বলল, "রৌশন, আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?"

"কিসের ভয় প্রিয়া?"

"আমায় আর এই বাচ্চাটাকে স্বীকার করতে? আপনার পরিবার আর তানিয়া ম্যামের ক্ষমতা তো অনেক। আমি তো গ্রামের এক সামান্য মেসের মেয়ে..." প্রিয়ার কণ্ঠে অভিমানের ঝরনা বয়ে গেল।

"প্রিয়া! তুমি আমাকে এতটা ভুল বুঝছ?" রৌশন একটু রেগে উঠে বলল। "আমি পরিস্থিতির সাথে লড়াই করছি। আমাকে একটু সময় দাও। আমি সব ঠিক করে দেব।"

"সময় আর নেই রৌশন। শুক্রবার আপনার এনগেজমেন্ট। আর আমার পেটে আপনার সন্তান বড় হচ্ছে। আপনি যদি শুক্রবারের আগে আপনার পরিবারকে সত্যিটা না বলেন, তবে আমি চিরতরে ঢাকা ছেড়ে সোনাতলায় ফিরে যাব। আর কখনো আমার মুখ দেখতে পাবেন না।"

কথাটা বলেই প্রিয়া ফোনটা কেটে দিল।

রৌশন ফোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মাথার রগগুলো যেন ফেটে যাচ্ছিল। একদিকে গর্ভবতী প্রিয়া আর তার চরম অভিমান, অন্যদিকে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলা এনগেজমেন্টের তারিখ। রৌশন বুঝল, পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এবার তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই হবে—নয়তো সে হারিয়ে ফেলবে তার ভালোবাসাকে, তার নিজের সন্তানকে।

প্রিয়ার আলটিমেটাম রৌশনের রাতের ঘুম একবারে কেড়ে নিল। ডেস্কে বসে সে প্রিয়ার কথাগুলোই বারবার ভাবছিল। প্রিয়া কোনো আবেগি নাটক করছে না, তার চোখের জল আর নিঃসঙ্গতার কষ্ট রৌশন খুব ভালো করেই বোঝে। কাল শুক্রবার, আর আজ বৃহস্পতিবারের রাত। সময় আর এক মুহূর্তও নেই।

রাত বারোটা বাজে। ড্রয়িংরুমের লাইট নিভে গেছে। রৌশন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বাবার পড়ার ঘরের দিকে পা বাড়াল। অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট রফিক সাহেবের ঘরে এখনো আলো জ্বলছে। রৌশন দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

"বাবা, তোমার সাথে খুব জরুরি একটা কথা ছিল," রৌশনের কণ্ঠে অভূতপূর্ব এক কাঠিন্য।

রফিক সাহেব চশমাটা নিচে নামিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন, "এত রাতে? কী বিষয়? তানিয়ার সাথে কালকের এনগেজমেন্টের কোনো আয়োজন নিয়ে কথা?"

"না বাবা। তানিয়ার সাথে কাল আমার কোনো এনগেজমেন্ট হচ্ছে না।"

ঘরের ভেতরের শান্ত আবহাওয়া যেন এক মুহূর্তেই জমাত বেঁধে গেল। রফিক সাহেব ভ্রু কুঁচকে দাঁড়ালেন, "মানে কী? তুমি কী বলছ এসব রৌশন? সব কার্ড बांटा শেষ, তানিয়াদের পরিবার সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে!"

ঠিক সেই মুহূর্তে রৌশনের মা-ও ঘরে প্রবেশ করলেন। ছেলের কথা শুনে তার চোখ ছানাবড়া, "রৌশন, তুই এসব কী আবোলতাবোল বলছিস? তানিয়ার মতো এত ভালো ঘরের মেয়েকে ছেড়ে তুই কীসের ঝামেলা শুরু করলি?"

রৌশন বুক ভরে একটা বড় শ্বাস নিল। তারপর নিজের পকেট থেকে সেই পজিটিভ প্রেগন্যান্সি টেস্টের স্ট্রিপ আর তাদের কাজিনামার একটা ফটোকপি বের করে বাবার টেবিলের ওপর রাখল।

"আমি বিবাহিত। চার মাস আগে আমি প্রিয়াকে বিয়ে করেছি। প্রিয়া আমার ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী, আর ও এখন আমার সন্তানের মা হতে চলেছে।"

রৌশনের মা চিৎকার দিয়ে উঠলেন, "কী বললি তুই? একটা গ্রামের মেসের মেয়েকে গোপনে বিয়ে করেছিস? আর ও গর্ভবতী? তুই আমাদের বংশের মুখে চুনকালি মাখলি রৌশন!"

রফিক সাহেবের মুখ লাল হয়ে উঠল। তিনি টেবিল চাপড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, "চুপ করো রৌশন! তুমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে এমন একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করলে? ওই মেয়ে তোমাকে ফাঁদে ফেলেছে! আমি কালই তানিয়াদের বাসায় কথা বলব, আর এই বেআইনি বিয়ের কোনো দাম আমাদের কাছে নেই!"

"না বাবা!" রৌশনও এই প্রথম বাবার চোখের দিকে চোখ রেখে শক্ত গলায় বলল, "প্রিয়া আমাকে ফাঁদে ফেলেনি, আমি ওকে ভালোবেসে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছি। ও আমার বৈধ স্ত্রী, আর ওর গর্ভের সন্তান আমার। তানিয়াকে আমি কোনোদিন ভালোবাসিনি। তোমরা যদি প্রিয়াকে মেনে না নাও, তবে আমি আজই এই ঘর ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু আমার স্ত্রী আর সন্তানকে আমি অস্বীকার করব না।"

ছেলের এই অবাধ্য রূপ রফিক সাহেব বা তার মা আগে কখনো দেখেননি। মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, আর বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "বেশ! তবে এই ঘর থেকে এখনই বের হয়ে যাও! তানিয়ার পরিবারের সামনে কাল আমাদের মাথা নিচু হলে, তোমার সাথে আমাদের সব সম্পর্ক শেষ!"

রৌশন আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। নিজের ব্যাগ গুছিয়ে আলমারি থেকে দরকারি কাগজপত্র নিয়ে সে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামছে। রৌশন গাড়ি চালিয়ে সোজা চলে এলো ধানমন্ডির সেই মেসের গলিতে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে প্রিয়ার মেসের পেছনের গেটে কড়া নাড়ল।

প্রিয়া তখন ঘরে জেগে বসে কাঁদছিল। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল আর ভাবছিল রৌশন হয়তো তাকে ছেড়ে দিয়েছে। হঠাৎ দরজায় শব্দ পেয়ে প্রিয়া দরজা খুলতেই দেখল, ভিজে একাকার হয়ে রৌশন দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা ছোট ট্রলি ব্যাগ।

প্রিয়া অবাক হয়ে বলল, "রৌশন? আপনি এত রাতে? পুরো ভিজে গেছেন যে!"

রৌশন প্রিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে এক তীব্র আকুলতায় তাকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টির জল আর রৌশনের চোখের জল এক হয়ে গেল।

"আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি, প্রিয়া," রৌশন প্রিয়ার কানে ফিসফিস করে বলল, "মা-বাবা, সংসার, সমাজের চাপ—সব বাদ দিয়ে আমি শুধু তোমার কাছে চলে এসেছি। আমি ওদের সব সত্যি বলে দিয়েছি।"

প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। "আপনি মা-বাবাকে ছেড়ে এসেছেন? কিন্তু কাল আপনার এনগেজমেন্ট..."

"কোনো এনগেজমেন্ট হবে না। আমার একমাত্র ঠিকানা তুমি আর আমাদের এই সন্তান," রৌশন প্রিয়ার ফ্যাকাশে গালে হাত রেখে ভিজে যাওয়া চুলে চুমু দিল। "আমি কাল সকালেই ধানমন্ডিতে একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিচ্ছি। আমরা সেখানেই আমাদের সংসার সাজাব। তুমি আর এই মেসে থাকবে না।"

প্রিয়ার বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস আর আনন্দের কান্না একসাথে বেরিয়ে এলো। সে রৌশনের শার্ট চেপে ধরে তার বুকের উষ্ণতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলল। শহরের এই বৃষ্টিভেজা রাতে তারা বুঝল, ঝড়ের পূর্বাভাস কেবল শুরু হয়েছে, কিন্তু একে অপরের হাত ধরে তারা এই ঝড়ে ভেসে যাবে না।

ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের ছাদের ওপরের ছোট ফ্ল্যাটটায় যখন প্রিয়া আর রৌশন পা রাখল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দুই কামরার ছোট্ট বাসা, সাজানো-গোছানো কিছুই নেই। কিন্তু প্রিয়ার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এটাই। রৌশন কাল রাতেই মেস থেকে প্রিয়াকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। প্রিয়ার লাগেজগুলো একপাশে রেখে রৌশন ক্লান্ত শরীরে প্রিয়াকে টেনে নিয়ে বিছানায় বসল।

"একটু কষ্ট হবে প্রিয়া," রৌশন প্রিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল। "বাসায় সব ছেড়ে চলে এসেছি। আপাতত আমার জমানো কিছু টাকা দিয়ে এই ফ্ল্যাটটা আর সংসারের খরচ চালাতে হবে। তবে আমি তোমায় কোনো অভাব বুঝতে দেব না।"

প্রিয়া রৌশনের কাঁধে মাথা রেখে হালকা হেসে বলল, "আপনার পাশে একটা খড়ের কুঁড়েঘরে থাকতে হলেও আমার কোনো কষ্ট হবে না, রৌশন। শুধু আপনি আমার পাশে থাকবেন, তাতেই আমার সব পাওয়া হয়ে গেছে।"

কিন্তু শান্ত পরিবেশ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। দুপুর গড়াতেই ঝড়ের প্রথম আঘাতটা এলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয়ার আর রৌশনের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। রৌশন তানিয়াদের সাথে এনগেজমেন্ট ভেঙে দিয়েছে এবং ডিপার্টমেন্টের এক জুনিয়র ছাত্রীকে গোপনে বিয়ে করেছে—এই খবর শুনে বিশ্ববিদ্যালয়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। তানিয়ার বাবা, যিনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, তিনি সোজা ভিসি স্যারের কাছে গিয়ে রৌশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেন। শিক্ষকের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রৌশনকে সাময়িক বরখাস্ত করার দাবি তোলা হলো।

বিকেলেই রৌশনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জরুরি তলব এলো। ভিসি স্যার রৌশনকে তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন।

প্রিয়া ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, "রৌশন, আপনি যাবেন না! উনারা যদি আপনার চাকরিটা কেড়ে নেন?"

রৌশন প্রিয়ার গালে হাত রেখে সান্ত্বনা দিল, "আমি কোনো অপরাধ করিনি, প্রিয়া। বিয়ে করা কোনো অন্যায় নয়। আমি মুখোমুখি হব। তুমি ঘরে থেকে একদম বের হবে না, নিজের খেয়াল রাখবে।"

বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রৌশন দেখল ভিসি স্যারের রুমে তানিয়া আর তার বাবাও উপস্থিত। রৌশনের বাবা রফিক সাহেবও সেখানে বসে আছেন। রৌশনকে দেখে তানিয়া বিষাক্ত এক দৃষ্টিতে তাকাল।

ভিসি স্যার কড়া গলায় বললেন, "রৌশন সাহেব, আপনার মতো একজন দায়িত্বশীল শিক্ষকের থেকে এমন আচরণ আশা করা যায় না। আপনি নিজের ছাত্রীকে ফাঁদে ফেলে গোপনে বিয়ে করেছেন, তানিয়া ম্যাডামের সাথে অনৈতিক আচরণ করেছেন—এসবের স্পষ্টীকরণ কী?"

রৌশন মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে কোনো অপরাধবোধ ছিল না। "স্যার, আমি প্রিয়াকে কোনো ফাঁদে ফেলিনি। আমরা প্রাপ্তবয়স্ক দুই নাগরিক, স্বেচ্ছায় এবং সামাজিকভাবে কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে করেছি। এটি কোনো অনৈতিক কাজ নয়। আর তানিয়া ম্যাডামের সাথে আমার পরিবারের কথা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমি কখনো তাকে প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি এবং তাকে নিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে চাই। এর জন্য যদি আমাকে শিক্ষাগুরু পদ হারাতে হয়, আমি তাও মেনে নিতে রাজি।"

রৌশনের বাবা রফিক সাহেব রাগ সামলাতে না পেরে দাঁড়িয়ে উঠলেন, "রৌশন! তুমি এখনো ওই মেয়ের পক্ষে সাফাই গাইছ? ও তোমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিল!"

"ও আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করেনি বাবা, ও আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছে," রৌশন স্পষ্ট ভাষায় জবাব দিল।

তানিয়া আর তার বাবা রাগে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ভিসি স্যার পরিস্থিতি বিবেচনা করে রৌশনকে কিছুদিনের জন্য ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বললেন এবং বিষয়টি তদন্ত কমিটির হাতে সমর্পণ করলেন।

চাকরিটা অনিশ্চয়তায় ঝুলে গেল। রৌশন ভারাক্রান্ত মনে ফ্ল্যাটে ফিরে এলো। কিন্তু প্রিয়ার সামনে এসে সে নিজের কষ্টটা একদম ঘুনাক্ষরেও বুঝতে দিল না।

রাত নামতেই প্রিয়ার আবার গা গোলানো শুরু হলো। গর্ভধারণের প্রথমদিকের এই কষ্টগুলো প্রিয়াকে খুব কাবু করে ফেলছিল। প্রিয়া বাথরুম থেকে বের হতেই রৌশন তাকে কোলে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। প্রিয়ার কপালে আলতো করে জলপট্টি দিতে লাগল।

"খুব কষ্ট হচ্ছে, না?" রৌশন মায়ামাখা গলায় শুধাল।

প্রিয়া রৌশনের শার্টের একটা বোতাম ধরে টানতে টানতে বলল, "আপনার ওপর দিয়ে এত ঝড় যাচ্ছে, আর আপনি আমার সেবা করছেন? চাকরিটার কী হলো রৌশন?"

"ওসব নিয়ে তোমাকে একদম ভাবতে হবে না," রৌশন প্রিয়ার কপালে এক গভীর চুমু আঁকল। "আমাদের সন্তান আর তুমি ভালো থাকলেই আমার সব ঠিক থাকবে।"

প্রিয়া রৌশনের গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিল। রাতের নীরবতায় রৌশনের হাতের নরম স্পর্শ আর প্রিয়ার গায়ের মিষ্টি গন্ধ সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। রৌশন প্রিয়ার ওপরে ঝুঁকে এসে তার ফ্যাকাশে ঠোঁটে নরম করে ঠোঁট মেলালো। ভালোবাসা আর আকুলতায় ভরে উঠল সেই ছাদঘেরা ছোট ঘরটি।

কিন্তু তারা জানত না, এই ঝড়ের শেষ এখানেই নয়। পরদিন সকালে ধানমন্ডির সেই ফ্ল্যাটের দরজায় ধুমধাম কড়া নাড়ার শব্দ হলো। দরজা খুলতেই রৌশন স্তব্ধ হয়ে গেল—দরজায় দাঁড়িয়ে প্রিয়ার গ্রামের বাড়ির আব্বা আর তার বড় ভাই! প্রিয়ার মেসের মেয়েরা ফোন করে গ্রামে খবর দিয়ে দিয়েছে যে প্রিয়া কোনো এক শিক্ষকের সাথে পালিয়ে গেছে!

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিজের বাবাকে দেখে প্রিয়ার হাতের চায়ের কাপটা মেঝেই পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেল। বগুড়ার প্রভাবশালী মাতব্বর আর অসম্ভব রাশভারী মানুষ জহিরুল ইসলাম প্রিয়াকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন পড়াশোনা করে মুখ উজ্জ্বল করতে। সেই বাবা আজ ঢাকা শহরের এক অচেনা ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে।

"প্রিয়া! তুই এই কাজ করলি?" জহিরুল ইসলামের গলার আওয়াজে যেন ছোট্ট ঘরটা কেঁপে উঠল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়ার বড় ভাই শফিক একপা এগিয়ে এসে রৌশনের জামার কলার চেপে ধরতে গেল।

রৌশন চট করে শফিকের হাতটা আটকে দিল। তার চোখ-মুখে ভয় না থাকলেও এক পরম গাম্ভীর্য ফুটে উঠল।

"হাত নামিয়ে কথা বলুন," রৌশন শক্ত গলায় বলল। "আমি প্রিয়ার স্বামী, আর এটা আমার ঘর। সম্মানের সাথে কথা বলুন।"

"কীসের স্বামী?" জহিরুল ইসলাম এগিয়ে এলেন। "তুই আমার সরল মেয়েটারে ভুলভাল বুঝিয়ে মেস থেকে তুলে এনেছিস! তোর নামে আমি কেস দেব, তলে তলে কী জালিয়াতি করেছিস সব বের করব!"

প্রিয়া ছুটে এসে রৌশনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের বাবাকে উদ্দেশ্য করে হাত জোড় করে বলল, "আব্বা, রৌশন কোনো অন্যায় করেনি! ও আমাকে জোর করেনি, আমি নিজের ইচ্ছায় ওকে বিয়ে করেছি। আমরা কাজি অফিসে গিয়ে নিয়ম মেনে বিয়ে করেছি।"

জহিরুল ইসলাম মেয়ের দিকে তাকাতেই তার চোখে আগুন জ্বলে উঠল, "তুই মুখ সামলে কথা বল! যে মেয়ে মা-বাবার মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে এক স্যারের সাথে মেলামেশা করে, সে আমার মেয়ে হতে পারে না! শফিক, ওরে ধর, এখনই বাড়ি নিয়ে চল।"

শফিক প্রিয়ার হাত ধরে টান দিতেই রৌশন প্রিয়াকে নিজের পেছনে টেনে নিয়ে আগলে দাঁড়াল।

"প্রিয়া কোথাও যাবে না," রৌশন স্পষ্ট আর দৃঢ় কণ্ঠে বলল। "ও এখন আর শুধু আপনার মেয়ে নয়, ও আমার স্ত্রী। আর ও এখন অন্তঃসত্ত্বা! এই অবস্থায় ওর কোনো মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি হলে আমি কিন্তু আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।"

গর্ভবতী! শব্দটা শোনার পর ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। জহিরুল ইসলাম যেন বজ্রাহত হলেন। শফিকও থমকে গেল।

জহিরুল ইসলাম কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রিয়া কান্না ভেজা চোখে নিজের পেট চেপে ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামীণ সমাজের সংস্কার আর পারিবারিক সম্মানের যে পাহাড় এতক্ষণ জহিরুল ইসলামের মাথায় চাপানো ছিল, তা যেন এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল।

"তুই আমার বংশের মুখে চুনকালি দিলি প্রিয়া..." জহিরুল ইসলামের কণ্ঠ ভেঙে এলো। "আজ থেকে তোর সাথে আমাদের পরিবারের সব সম্পর্ক শেষ। আমার মরা মুখও তুই দেখতে পাবি না।"

কথাটা বলেই জহিরুল ইসলাম আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। শফিকও বাবার পিছু পিছু ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দরজাটা বন্ধ হতেই প্রিয়া মেঝেতে বসে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সব হারিয়ে ফেলার এই যন্ত্রণা সে সহ্য করতে পারছিল না। রৌশন সাথে সাথে নিচে বসে প্রিয়াকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

"কেঁদো না প্রিয়া, আমি তো আছি," রৌশন প্রিয়ার কপালে ও গালে ঘন ঘন চুমু দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। "আজ তোমার আব্বা রাগে কথাগুলো বলেছেন। সময় সব ঠিক করে দেবে। আমাদের বাচ্চা যখন পৃথিবীতে আসবে, তখন কেউ আর দূরে থাকতে পারবে না।"

প্রিয়া রৌশনের শার্ট চেপে ধরে কেঁদে কেঁদে শান্ত হলো। রৌশন প্রিয়াকে কোলে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। প্রিয়ার কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে আলতো করে হাত বোলাতে লাগল। রৌশনের এই পরম মমতা আর দায়িত্বশীলতা প্রিয়ার ভেতরের সব ভয় দূর করে দিল।

পরের কয়েকটা দিন রৌশনের ভীষণ ব্যস্ততায় কাটল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু রৌশন সমস্ত আইনি নথি, কাজিনামা এবং প্রিয়ার সম্মতিপত্র তদন্ত কমিটির সামনে জমা দিল। প্রিয়া নিজেও তদন্ত কমিটির সামনে গিয়ে নিজের ইচ্ছায় বিয়ের কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে এলো। সত্যের জয় হলো—বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তানিয়াদের কোনো চক্রান্তই টিকতে দিল না। রৌশন তার চাকরিতে সসম্মানে পুনর্বাহাল হলো।

তবে আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল রৌশনের নিজস্ব পরিবারে।

একদিন বিকেলে ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেজে উঠল। প্রিয়া দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে রৌশনের মা!

মায়ের মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে জল। রৌশনের বাবা সাথে আসেননি, কিন্তু রৌশনের মা আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। এতদিন নিজের অহংকার ধরে রাখলেও রৌশনের সাথে প্রিয়ার এই আইনি লড়াই আর গর্ভধারণের খবর শুনে মায়ের মন আর মানেনি।

"মা... আপনি?" প্রিয়া থমকে দাঁড়িয়ে বলল।

রৌশনের মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। প্রিয়ার মাথায় হাত রেখে দরজায় দাঁড়িয়েই কেঁদে ফেললেন। "আমাকে মা বললি রে মা? আমি তোর সাথে কত অন্যায় করেছি! রৌশন তোকে কত ভালোবাসে আর তুই ওর জন্য কতটা সহ্য করছিস, তা না বুঝে আমি শুধু সমাজের কথা ভেবেছি।"

রৌশন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।

মা রৌশনের হাত ধরে প্রিয়ার হাত দুটোর সাথে মিলিয়ে দিয়ে বললেন, "আমায় মাপ করে দে বাবা। তোর বাবাকেও আমি বুঝিয়েছি। সে মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তোকে ক্ষমা করে দিয়েছে। এই খালি ছাদঘেরা ফ্ল্যাটে আমার নাতি বা নাতনি বড় হতে পারে না। তোরা ঘরে ফিরে চল।"

প্রিয়া আর রৌশন একে অপরের দিকে তাকাল। যে কালো মেঘ তাদের মাথার ওপর জমেছিল, তা যেন অবশেষে কাটতে শুরু করেছে। ভালোবাসার চূড়ান্ত জয়ের আর একটি ধাপ কেবল বাকি রইল।

রৌশনের মায়ের সেই আকুল আহ্বানের পর ধানমন্ডির ছোট ফ্ল্যাট ছেড়ে প্রিয়া ও রৌশন ফিরে এলো রৌশনের পৈতৃক বাড়িতে। শুরুর দিকে রৌশনের বাবা রফিক সাহেবের মধ্যে সামান্য গম্ভীরভাব থাকলেও, প্রিয়ার সহজ-সরল আচরণ আর সেবাপরায়ণতায় সেই বরফ গলতে বেশি সময় লাগেনি। প্রিয়া এখন আর শুধু এই ঘরের বউ নয়, পুরো বাড়ির চোখের মণি। তানিয়ার সেই অহংকারী অধ্যায় এখন অতীত, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীরাও রৌশন ও প্রিয়ার এই সুন্দর বন্ধন মেনে নিয়েছে।

দিন গড়িয়ে মাস এলো। প্রিয়ার গর্ভধারণের আট মাস চলছে। প্রিয়ার চঞ্চলতা কিছুটা কমলেও তার দুষ্টুমি এখনো আগের মতোই আছে। বিশাল বড় পেটে হাত দিয়ে সে সারাদিন ঘরে হেঁটে বেড়ায়, আর রৌশন বাসায় ফিরলেই হুকুমের তালিকা নিয়ে হাজির হয়।

প্রতি রাতে রৌশন পরম আদরে প্রিয়ার পেটে কান রেখে অনাগত সন্তানের ধুকপুকুনি শোনে। পরম ভালোবাসায় প্রিয়ার কপালে, ঠোঁটে আর পেটে চুমু এঁকে দিয়ে বলে, "জানেন ম্যাডাম, আমার সন্তান কিন্তু আপনার মতোই অবাধ্য আর দুষ্টু হবে!"

প্রিয়া খিলখিল করে হেসে রৌশনের শার্টের বোতাম টেনে ধরে বলে, "হলে হবে, আপনার মতো এত গম্ভীর তো হবে না অন্তত!"

কিন্তু একটি অসম্পূর্ণতা প্রিয়ার মনে সব সময় একটা কাঁটার মতো বিধত—তার বাবার বাড়ি। জহিরুল ইসলাম সেই ঘটনার পর আর একটিবারও প্রিয়ার খোঁজ নেননি। প্রিয়া রাতে গোপনে কাঁদত, যা রৌশনের নজর এড়াত না। রৌশন মনে মনে এক বিরাট চমকের পরিকল্পনা করে রেখেছিল।

অক্টোবরের এক বৃষ্টির রাতে প্রিয়ার তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হলো। রৌশন আর দেরি না করে তাকে শহরের একটি নামী প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেল। লেবার রুমের বাইরে রৌশন আর তার মা-বাবা অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। রৌশনের বুকের ভেতরটা অজানা ভয়ে তোলপাড় করছিল।

ঠিক ঘণ্টাখানেক পর ডাক্তার চওড়া হাসি নিয়ে বের হয়ে এলেন।

"অভিনন্দন রৌশন সাহেব! আপনার স্ত্রী একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। মা ও শিশু দুজনেই একদম সুস্থ আছেন।"

কথাটা শুনে রৌশনের চোখে আনন্দের জল চলে এলো। ক্যাবিনে প্রিয়াকে স্থানান্তর করার পর রৌশন ভেতরে ঢুকলো। প্রিয়া শান্ত হয়ে শুয়ে আছে, আর তার পাশে তোয়ালেতে মোড়ানো এক তুলতুলে রাজকন্যা। রৌশন প্রিয়ার পাশে বসে তার কপালে এক দীর্ঘ ও গভীর চুমু একে দিল।

"ধন্যবাদ প্রিয়া, আমার জীবনটা এতটা ভালোবাসায় পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য," রৌশন নিচু গলায় বলল।

প্রিয়া হেসে সন্তানকে দেখছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাবিনের দরজাটা হালকা করে খুলে গেল।

দরজায় দাঁড়িয়ে প্রিয়ার আব্বা জহিরুল ইসলাম আর বড় ভাই শফিক! পাশে দাঁড়ানো রৌশনের বাবা রফিক সাহেব মুচকি হাসছেন। রৌশন নিজেই প্রিয়ার বাবাকে গোপনে ফোন করে সব ঘটনা জানিয়ে ঢাকায় আনিয়েছে।

বাবাকে দেখে প্রিয়ার চোখ দিয়ে জলের জোয়ার বয়ে গেল। জহিরুল ইসলাম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে মেয়ের পাশে এসে বসলেন। মেয়ের মাথায় হাত রেখে কেঁদে ফেললেন।

"আমায় মাপ করে দিস রে মা," জহিরুল ইসলাম চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন। "অহংকারের কারণে আমি এত বড় ভুল করতে যাচ্ছিলাম। তোর জামাই রৌশন আমাকে সব বুঝিয়ে চোখ খুলে দিয়েছে। ও না থাকলে আমি আজ এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতাম।"

প্রিয়া তার বাবার হাত জড়িয়ে ধরল। জহিরুল ইসলাম পরম আদরে তার নাতনিকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ঘরের মধ্যে তখন এক অপার্থিব আনন্দের হাওয়া বইছিল। ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো জোড়া লেগে তৈরি হয়েছে এক অনাবিল সুখের সংসার।

কয়েক দিন পর, ধানমন্ডির বাড়িতে প্রিয়া ও রৌশনের নতুন জীবনের মিষ্টি একটা দুপুর।

বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে। রৌশন তার ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে। প্রিয়া এক কাপ গরম চা হাতে নিয়ে রৌশনের পাশে এসে দাঁড়াল।

"চা নিন স্যার," প্রিয়া চোখে দুষ্টুমির আলো জ্বালিয়ে বলল।

রৌশন প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। মেয়েকে এক হাতে ধরে অন্য হাতে প্রিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আনল। প্রিয়ার গালে আলতো করে নিজের মুখ ঘষে বলল, "চা তো খাব, কিন্তু চা পানের সেই পুরনো শর্তটার কথা মনে আছে?"

"কোন শর্ত?" প্রিয়া অবাক হওয়ার ভান করল।

"ওই যে... আমি ক্লাসে বা পড়ালেখায় ভালো করলে বরকে একটা বিশেষ মিষ্টি উপহার দিতে হয়," কথাটি বলেই রৌশন প্রিয়ার গোলাপী ঠোঁটে এক পরম তৃপ্তির গাঢ় চুমু বসিয়ে দিল।

প্রিয়া লজ্জায় রৌশনের বুকের মধ্যে মুখ লুকালো। বারান্দার বাইরে অশ্বত্থ গাছের পাতাগুলো বাতাসে মৃদু দোলা দিচ্ছে, আর নীল আকাশে তখন মুক্ত ডানায় উড়ে চলেছে একঝাঁক পাখি। সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা পার করে তাদের ভালোবাসার গল্পটি পেল এক চিরন্তন, সুখের আর ভালোবাসায় ভরা সমাপ্তি।

....
👁 71