ধানমন্ডি চার নম্বর রোডের পুরনো দোতলা বাড়িটার বাতাস যেন সবসময় একটা অদৃশ্য ভারে চেপে থাকত। বাইরের দুনিয়ায় যখন ভোরের আলো ফোটে, তখন এই বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর নেমে আসে এক অজানা আতঙ্ক। চিত্রা তার ঘরের জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছে দু-একটা শালিক ডাকছে। মুক্ত বাতাস, খোলা আকাশ আর ইচ্ছেমতো একটু উড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা—চিত্রার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল এটাই। কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবীটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
তার বাবা রিফাইত আহমেদ ছিলেন অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের একজন মানুষ। অনুশাসনের নামে পরিবারের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াই ছিল তার অভ্যাস। ছোটবেলা থেকেই চিত্রা দেখে এসেছে, সামান্য একটু ভুলত্রুটি হলেই বাড়িতে যুদ্ধের আবহ তৈরি হতো। চিত্রার মা সাজেদা বেগম স্বামীর অহেতুক চিল্লাচিল্লি আর ধমক সহ্য করতে করতে একসময় একদম চুপচাপ হয়ে গেছেন। বাবার এই মেজাজ আর অকারণ শাসনের প্রধান শিকার ছিল চিত্রা নিজেই।
"চিত্রা! এখনো পড়াঘরের আলো জ্বলছে না কেন? সকালে উঠে আবার কিসের বাহানা শুরু হলো?"
নিচতলা থেকে বাবার সেই পরিচিত, কর্কশ কণ্ঠের হাঁক শুনে চিত্রার বুকটা দমে গেল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। জানালার পাশ থেকে সরে গিয়ে দ্রুত পড়ার টেবিলে এসে বসল সে। পরনের সুতির সাধারণ জামাটার হাতায় নিজের চোখের কোণের একবিন্দু পানি মুছে নিল। এই কান্না চিত্রার নিত্যদিনের সঙ্গী। শান্ত স্বভাবের, কোমল মনের মেয়েটি নিজের দুঃখ কখনো উচ্চস্বরে প্রকাশ করতে পারে না। তার প্রতিবাদ মানে শুধু চুপ হয়ে যাওয়া আর নিঃশব্দে ফোঁটানো চোখের জল।
চিত্রার মনে অনেক বড় বড় স্বপ্ন ছিল। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর তার ভীষণ ইচ্ছে ছিল কোনো একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে নিজে চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। স্বাবলম্বী হওয়ার আনন্দ আর আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল সে। কিন্তু তার বাবা সেই স্বপ্ন শুরুতেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। রিফাইত সাহেবের স্পষ্ট কথা, "মেয়েমানুষের অত পড়াশোনা আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বাহানা করতে হবে না। উপযুক্ত বয়সে বিয়ে দেব, স্বামী সংসার সামলাবি।"
নিজের বলতে चित्रার কিছুই ছিল না, এমনকি ঘুরতে যাওয়ার মতো সাধারণ আনন্দটুকুও না। মেয়েটার ঘুরতে যাওয়ার খুব শখ ছিল। নতুন নতুন জায়গা দেখা, প্রকৃতির কাছে যাওয়া, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়া—এই ইচ্ছেগুলো তার ভেতরে কুঁকড়ে মরে যেত। বাবা যে কখনো পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতেন না, তা নয়। বছরে দু-একবার কক্সবাজার কিংবা সিলেট নিয়ে যেতেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে গিয়েও পরিবেশ হালকা হতো না। সামান্য হোটেলের খাবার পছন্দ না হলে কিংবা যাতায়াতের পথে একটু দেরি হলেই বাবার মেজাজ সপ্তমে উঠত। ঘুরতে গিয়েও গাড়ির ভেতরে কিংবা রিসোর্টের কামরায় চলত অবিরাম ঝগড়া আর চিৎকার। ঘুরতে যাওয়ার সেই আনন্দের স্মৃতিগুলোর জায়গায় চিত্রার মনে জমা হতো শুধুই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা।
সেদিন দুপুরের খাবার টেবিলেও পরিবেশ ছিল থমথমে। চিত্রা চুপচাপ প্লেটে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল।
রিফাইত সাহেব ভাতের থালা ঠেলে দিয়ে একগাল বিরক্তি নিয়ে বললেন, "তরকারিতে ঝাল কম হয়েছে কেন, সাজেদা? এত বছর সংসার করার পরও একটা তরকারি ঠিকমতো রান্না করতে পারো না? সারাদিন বাড়িতে করোটা কী?"
সাজেদা বেগম নিচু গলায় বললেন, "আজকে তো প্রেসারের ভয়ে ঝাল একটু কমই দিয়েছিলাম..."
"আমার সাথে তর্ক করবে না!" রিফাইত সাহেব টেবিল চাপড়ে উঠলেন। "বাড়ির কোনো নিয়মকানুন নেই! সব কয়টা আলসে আর অকেজো হয়ে বসে আছ।"
চিত্রা কোনো কথা না বলে প্লেট রেখে উঠে পড়তে চাইল।
বাবা তার দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই সে আবার দমে গেল। চিত্রা মনে মনে ভাবল, এই নরক থেকে কি কখনো তার মুক্তি হবে না? সে কি কোনোদিন শান্তিতে একটু ঘুমাতে পারবে না? কোনোদিন কি এমন একজন মানুষকে পাবে না, যে তাকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে?
বিকেলের দিকে চিত্রার মা তার ঘরে এলেন। মায়ের মুখটাও বেশ গম্ভীর। চিত্রা জানালার পাশে বসে একটা ডায়েরিতে হাবিজাবি আঁকছিল। মা এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।
"চিত্রা, তোর বাবার এক দূর সম্পর্কের বন্ধুর ছেলের সাথে তোর বিয়ের কথা পাকা হচ্ছে," মা খুব নরম গলায় বললেন।
চিত্রা চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকাল। "বিয়া? মা, আমি তো আরও পড়তে চেয়েছিলাম..."
"তোর বাবার সিদ্ধান্ত তুই তো জানিস, মা। ওনার কথার ওপর কথা বলার সাধ্য আমার নেই। তবে ছেলে ভালো। বংশ অভিজাত, ছেলেও নিজের ব্যবসা সামলায়। নাম জিহান।"
চিত্রা চুপ করে রইল। তার চোখে আবার জল জমল। নিজের স্বপ্নগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে দেখেও সে কিছুই বলতে পারল না। তবে মনের এক কোণে সামান্য আশার আলো ফুটে উঠল—হয়তো এই ঘর ছাড়লে সে একটু মুক্তি পাবে। হয়তো নতুন মানুষটা তার জীবনের মেঘগুলোকে দূরে সরিয়ে দেবে। কিন্তু সে কি জানত, এই জিহান মানুষটি ঠিক কেমন? কেমন হবে তার নতুন জীবন?
নিজের ভাগ্যকে বিধাতার হাতে সঁপে দিয়ে চিত্রা আবার বারান্দার গ্রিল ধরে বিষণ্ণ চোখে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
বিয়ের দিনটি চিত্রার জীবনে এসেছিল এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। বেনারসি শাড়ি আর ভারী গহনার নিচে ঢাকা পড়েছিল একরাশ ভয় আর অনিশ্চয়তা। বাবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় চিত্রা কেঁদেছিল, তবে সেই কান্নায় বাবার প্রতি অভিমানের চেয়ে নিজের ভবিষ্যতের অজানা ভয়ই ছিল বেশি। ঢাকা শহরেরই এক অভিজাত কনভেনশন সেন্টারে ধুমধাম করে আয়োজন করা হয়েছিল বিয়ের।
বাসর ঘরে ঢোকার পর চিত্রার বুকের ভেতর যেন ড্রাম বাজছিল। বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে ছিল সে। শান্ত, লাজুক স্বভাবের চিত্রা বারবার মনে মনে শুধু একটা প্রার্থনাই করছিল—নতুন মানুষটা যেন তার বাবার মতো কঠোর আর মেজাজী না হয়। সে শুধু একটু মানসিক শান্তি চায়।
হঠাৎ দরজার শব্দ হলো। ঘরে প্রবেশ করল জিহান। সুঠাম দেহ, ফর্সা গায়ের রং, ঘন কালো চুল আর তীক্ষ্ণ চাহনি। দূর থেকে দেখে চিত্রা যতটা চিনেছিল, কাছে এসে লোকটাকে দেখে তার বুক আরও একটু দমে গেল। জিহানের চেহারার মধ্যে একটা তীব্র ব্যক্তিত্ব আর অহংবোধ স্পষ্ট।
জিহান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বিছানায় চিত্রার মুখোমুখি বসল। চিত্রা শাড়ির আঁচল চেপে ধরে মাথা আরও নিচু করে ফেলল।
"মাথা উঁচু করো," জিহানের গলা অত্যন্ত গম্ভীর ও ভারী।
চিত্রা ভয়ে ভয়ে আস্তে আস্তে মাথা তুলল। জিহানের চোখের দিকে তাকাতেই তার গা শিউরে উঠল। সেই চোখে যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণ আর একই সাথে এক ধরণের একগুয়েমি ঢাকা রয়েছে।
জিহান চিত্রার থুতনি ধরে নিজের দিকে আরেকটু টেনে আনল। চিত্রার চোখে জল দেখে জিহানের গলার স্বরে সামান্য পরিবর্তন এল, তবে তা নরম হলো না।
"কাঁদছ কেন? বাবার বাড়ি ছেড়ে আসার কষ্ট, নাকি আমাকে পছন্দ হয়নি?" জিহান প্রশ্ন করল।
চিত্রা কাঁপানো গলায় বলল, "না... তেমন কিছু না।"
জিহান হঠাৎ করেই চিত্রাকে খুব কাছে টেনে নিল। এত কাছাকাছি আসায় চিত্রা চমকে উঠে জিহানের বুকে হাত দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু জিহানের শক্ত বাঁধন থেকে বের হওয়া অসম্ভব।
"শোনো চিত্রা," জিহান একেবারে চিত্রার ঠোঁটের কাছে এসে নিচু গলায় বলল, "আমি একটু মেজাজী লোক। আমার রাগ খুব বেশি। আমার যা পছন্দ, তা আমার চাই-ই চাই। আর এই মুহূর্তে তুমি আমার সবচেয়ে বড় পছন্দ। আমার জিনিস অন্য কারো সাথে ভাগ করা তো দূরের কথা, সেখানে অন্য কারো ছায়াও সহ্য করি না।"
কথাগুলো বলেই জিহান চিত্রার কপালে আর গালে অধিকারবোধের তীব্র চুমু আঁকল। জিহানের স্পর্শে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু তার সাথে মিশে ছিল এক অবিশ্বাস্য তীব্রতা। শান্ত প্রকৃতির চিত্রা জিহানের এই অধীর আর উন্মত্ত ভালোবাসায় একেবারে থমকে গেল। সে কোনোদিন ভাবেনি কোনো মানুষ এতটা তীব্রভাবে কাউকে ভালোবাসতে বা নিজের করে নিতে পারে।
পরের কয়েকটা দিন চিত্রার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হতে লাগল। জিহানের মেজাজ সামলানো সহজ ছিল না। সামান্য কিছু এদিক-ওদিক হলেই সে চটে যেত, কিন্তু পরক্ষণেই চিত্রার প্রতি তার সোহাগ আর ভালোবাসার বন্যায় সব ধুয়ে-মুছে যেত। জিহান যেন চিত্রাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে আলাদা করতে চাইত না।
সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকলেও সুযোগ পেলেই জিহান ফোন করত। আর রাতে বাড়ি ফিরে চিত্রাকে নিজের বুকে জড়িয়ে না ধরা পর্যন্ত তার যেন স্বস্তি হতো না। জিহানের ওভার-রোমান্টিক স্বভাব আর গভীর ভালোবাসা আস্তে আস্তে চিত্রার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা বরফ গোলাতে শুরু করল। চিত্রা বুঝতে পারল, এই লোকটা রাগী হতে পারে, কিন্তু সে চিত্রাকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
এক সন্ধ্যায় জিহান বাড়ি ফিরে চিত্রাকে ঘরে ঢুকে হঠাৎ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। চিত্রার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে গভীর শ্বাস নিল।
"কী করছ, ছাড়ো! কেউ দেখে ফেলবে," চিত্রা লজ্জায় লাল হয়ে বলল।
"দেখুক। আমার বউকে আমি জড়িয়ে ধরেছি, কার কী?" জিহান চিত্রাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করল। তার চোখে সেই চেনা আকুলতা। "রেডি হয়ে নাও। বাইরে যাচ্ছি আমরা।"
"বাইরে? এই সন্ধ্যায়?" চিত্রা অবাক হয়ে শুধাল।
জিহান চিত্রার গালে আলতো করে একটা কামড় দিয়ে বলল, "হ্যাঁ। তোমার না ঘুরতে যাওয়ার খুব শখ? আমি জানি তোমার বাবা তোমাকে কোথাও নিয়ে যেত না, আর নিয়ে গেলেও পরিবেশ নষ্ট করত। কিন্তু আমার সাথে তুমি যেখানে যাবে, শুধু আনন্দ থাকবে। চলো, আজ রাতের ঢাকা শহর ঘুরব।"
চিত্রার চোখ দুটো খুশিতে চমকে উঠল। এই প্রথম কেউ তার মনের গোপন স্বাদের খবর রেখেছে।
সেদিন রাতে জিহান চিত্রাকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরে বেড়াল। রিকশায় পাশাপাশি বসে হুড ফেলে দিয়ে রাতের হাওয়া গায়ে মাখা, ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে আইসক্রিম খাওয়া, আর মধ্যরাতে ক্যাফেতে বসে গরম কফিতে চুমুক দেওয়া—চিত্রার কাছে এই অনুভূতিগুলো একেবারেই নতুন।
জিহান চিত্রার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। চিত্রার চোখের পানে তাকিয়ে জিহান বলল, "তোমার মুখে হাসি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে, চিত্রা। তুমি শুধু হেসে যাবে, বাকি সব দায়িত্ব আমার।"
চিত্রা মনে মনে ভাবল, অবশেষে হয়তো বিধাতা তার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। বাবার বাড়ির সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে সে যেন এক রাজপুত্রের দেখা পেয়েছে, যে তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু চিত্রা তখনো জানত না, এই রঙিন স্বপ্নের আড়ালে একটা অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে, যা খুব শীঘ্রই তার জীবনে নতুন এক ঝড় নিয়ে আসতে চলেছে।
দিনগুলো ডানা মেলে উধাও হচ্ছিল। জিহানের ছায়ায় এসে চিত্রা যেন নতুন করে বাঁচতে শিখেছিল। ছোটবেলা থেকে যে মুক্ত জীবনের স্বপ্ন সে দেখে এসেছে, জিহান তাকে সেই জীবনের স্বাদ দিতে শুরু করল।
ব বিয়ের এক মাস পরেই জিহান চিত্রাকে নিয়ে পাড়ি জমাল কক্সবাজার। সমুদ্র দেখার প্রবল ইচ্ছে ছিল চিত্রার, কিন্তু বাবার সাথে যখনই এসেছে, ঝগড়া আর চেঁচামেচির ভিড়ে সমুদ্রের গর্জন ঢাকা পড়ে যেত। এবার ছবিটা পুরো আলাদা।
লাবণী পয়েন্টের বালুকাবেলায় হেঁটে চলার সময় জিহান চিত্রার হাত এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়েনি। সমুদ্রের নোনা বাতাস চিত্রার খোলা চুলে দোল খাচ্ছিল। দূর দিগন্তে সূর্য তখন লাল আবীর ছড়িয়ে পাটে নামছে।
চিত্রা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "এত সুন্দর! সত্যি, আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আমি এত শান্তিতে সমুদ্র দেখছি।"
জিহান পেছন থেকে চিত্রার কোমর জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে চিবুক রাখল। চিত্রা সামান্য চমকে উঠলেও জিহানের এই বাহুডোরের ওমে নিজেকে সঁপে দিল।
"তোমার জীবন থেকে সব অশান্তি মুছে দেওয়া আমার কাজ, চিত্রা," জিহান তার কানে নিচু গলায় বলল, তারপর আলতো করে তার কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়াল। "এই সমুদ্র, এই আকাশ—সবকিছু আজ শুধু তোমার জন্য।"
কক্সবাজারের তিনটে দিন কেটেছিল এক মাতাল করা ভালোবাসায়। রাতে হোটেলের প্রাইভেট বারান্দায় বসে হাওয়ার শব্দে জিহান চিত্রাকে আক্ষরিক অর্থেই বুকের ভেতর আগলে রাখত। তার ভালোবাসার গাঢ়তা এত বেশি ছিল যে, শান্ত চিত্রা মাঝে মাঝে দ্বিধায় পড়ে যেত। জিহান যেন চিত্রাকে নিজের নিঃশ্বাসের সাথে মিশিয়ে নিতে চায়। চিত্রার যা কিছু পছন্দ—ভালো পোশাক, ভালো খাবার, ঘুরে বেড়ানো—সব কিছু জিহান এক নিমেষে তার পায়ের কাছে এনে হাজির করত। চিত্রার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব সুখ বুঝি বিধাতা তার ঝুলিতে ঢেলে দিয়েছেন।
কিন্তু স্বপ্নের এই রঙিন ক্যানভাসে কালি পড়তে বেশি সময় লাগল না।
কক্সবাজার থেকে ফেরার কয়েকদিন পরের কথা। সেদিন রাতে জিহান বাড়ি ফিরল বেশ দেরিতে। চিত্রা বসার ঘরের সোফায় বসে অপেক্ষা করছিল। রাত প্রায় বারোটা বাজতে চলল।
দরজা খোলার শব্দ হতে চিত্রা এগিয়ে গেল। জিহান দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, তবে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারছে না। দেয়াল ধরে শরীরটা সোজা রাখার চেষ্টা করছে।
চিত্রা কাছে যেতেই এক তীব্র, কটু গন্ধে তার নাক কুঁচকে গেল। তামাক আর কড়া অ্যালকোহলের মিশ্র গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে ঘর। চিত্রার বুকটা ধক করে উঠল। জিহান ড্রিঙ্কস করেছে!
"জিহান? তুমি এ কী অবস্থায় বাড়ি ফিরেছ?" চিত্রা শংকিত গলায় বলল।
জিহান একটু তোতলাতে তোতলাতে বলল, "কী… কী অবস্থা? স্বাভাবিক অবস্থা। একটু বিজনেস ক্লায়েন্টদের সাথে… এঞ্জয় করছিলাম।"
"তুমি মদ খেয়েছ?" চিত্রার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
জিহান হঠাৎ চিত্রার কব্জি ধরে সজোরে টান দিল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, মেজাজটাও কেমন হিংস্র দেখাচ্ছে।
"সো হোয়াট? আমি মদ খেয়েছি তাতে তোমার কী সমস্যা? আমি আমার টাকায় খাই! ঘরের বউ ঘরে আছ, শান্তিতে থাকো। আমার কাজে নাক গলাতে আসবে না!" জিহান চেঁচিয়ে উঠল।
জিহানের শক্ত মুঠিতে চিত্রার নরম কব্জিতে ব্যথা পাচ্ছিল। জিহানের এই উগ্র রূপ চিত্রার কাছে সম্পূর্ণ অজানা। যে মানুষটা একটু আগেই অতি-রোমান্টিকতায় তাকে ভরিয়ে দিত, মদ গিলে সে-ই কেমন এক অচেনা রাক্ষস হয়ে উঠেছে!
চিত্রা চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। "ছাড়ো জিহান, আমার লাগছে! আমি তো শুধু…"
জিহান এক ঝটকায় চিত্রাকে ছেড়ে দিল। "কাঁদবে না আমার সামনে! একদম সহ্য হয় না আমার এই মেয়েলি কান্না!" কথাটি বলেই জিহান ধুপধাপ পা ফেলে শোবার ঘরে গিয়ে ধড়াম করে দরজা আটকে দিল।
চিত্রা হাঁটু গেড়ে বসার ঘরের ঠাণ্ডা মেঝেতে বসে পড়ল। বাবার বাড়িতে সারাজীবন চেঁচামেচি আর অশান্তি দেখে এসেছে সে। ভেবেছিল বিয়ে করে সেই নরক থেকে নিস্তার পেয়েছে। কিন্তু এ কেমন নতুন পরীক্ষা? জিহানের অতি-ভালোবাসা আর এই মদ খেয়ে হিংস্র হয়ে ওঠার মাঝে চিত্রা নিজেকে হারিয়ে ফেলতে লাগল।
পরদিন সকালে জিহানের ঘোর কাটলে সে চিত্রার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। চিত্রার দু হাত ধরে আকুল হয়ে ক্ষমা চাইল, "চিত্রা, প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। কাল রাতে বেশি হয়ে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পারিনি। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আর কোনোদিন এমন হবে না।"
জিহানের অনুশোচনা দেখে কোমল মনের চিত্রা তাকে ক্ষমা করে দিল। কিন্তু সেই ক্ষমা যে স্থায়ী সমাধান নয়, তা চিত্রা তখনও বোঝেনি। মদের প্রতি জিহানের এই বদঅভ্যাস আস্তে আস্তে এক ভয়ানক রূপ নিতে শুরু করল, যা তাদের ভালোবাসার সংসারকে এক বিষাক্ত মোড়ে এনে দাঁড় করাবে।
প্রথমবার ক্ষমা চাওয়ার পর জিহান কয়েকটা দিন খুব ভালো হয়ে রইল। চিত্রাকে নিয়ে আবার রেস্তোরাঁয় যাওয়া, উপহার এনে চমকে দেওয়া আর গভীর রাতে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়া—সবই চলছিল আগের মতো। জিহান যেন মুহূর্তের মধ্যে দুটো আলাদা মানুষে রূপ নিতে পারত। যখন ভালো থাকত, তখন চিত্রাকে মাথায় তুলে রাখত; কিন্তু মদের বোতল হাতে পেলেই সে রূপ নিত এক হিংস্র দানবে।
ধীরে ধীরে মদের প্রতি জিহানের টান আরও বেড়ে গেল। সপ্তাহে একদিনের জায়গায় এখন প্রায় প্রতিদিনই জিহান বাড়ি ফেরে মদের গন্ধ গায়ে মেখে।
এক শুক্রবারের রাতে চিত্রা খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছিল। রাত প্রায় একটা বেজে গেছে। শহরের কোলাহল থমে এসেছে, কিন্তু চিত্রার বুকের ভেতরের ঝড় থামছিল না। অবশেষে দরজার লক খোলার শব্দ হলো।
জিহান ভেতরে ঢুকল, তার পা টলছে। চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। সুটের কোটটা কোনোমতে এক হাতে ধরে রেখে সে সোজা বসার ঘরে এসে সোফায় গড়িয়ে পড়ল।
চিত্রা ধীরপায়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে জল আর কণ্ঠে তীব্র অভিমান।
"জিহান, তুমি আবার মদ খেয়েছ? তুমি না কথা দিয়েছিলে আর স্পর্শ করবে না?" চিত্রার গলার স্বর কাঁপছিল।
জিহান সোফা থেকে কোনোমতে মাথা তুলে তাকাাল। মদ তার মস্তিষ্ককে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। চিত্রার এই শান্ত প্রশ্নটা তার কাছে অগ্নিকুণ্ডের মতো লাগল।
"আমার সাথে তর্ক করতে আসছ, চিত্রা?" জিহান ধমকে উঠল। "তোমাকে কতবার বলেছি, আমার জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ চালানোর চেষ্টা করবে না! আমি কী করব, না করব—তা বলার অধিকার তোমার নেই!"
"নিয়ন্ত্রণ করছি না, জিহান!" চিত্রা এবার আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। "তুমি প্রতি রাতে এই বিষ গিলে বাড়ি ফিরবে, আর আমি চুপ করে দেখব? তুমি জানো এতে আমাদের সংসারটার কী হাল হচ্ছে? আমি শান্তি চেয়েছিলাম জিহান, তোমার কাছে একটু শান্তিতে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমিও আমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিচ্ছ!"
'নরক' শব্দটা শুনতেই জিহান সোফা থেকে ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়াল। চিত্রার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে দেয়ালে চেপে ধরল। জিহানের এই হিংস্র আকস্মিকতায় চিত্রা ভয়ে শিউরে উঠল।
"কী বললে তুমি? আমি তোমার জীবন নরক বানিয়ে দিচ্ছি?" জিহান চিত্রার একদম মুখের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল। তার মুখ থেকে আসা উগ্র মদের গন্ধে চিত্রার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। "আমি তোমাকে যা দিচ্ছি, তা অনেক মেয়ে কল্পনাবোঝেও করতে পারে না! গাড়ি, বাড়ি, ভালোবাসা, ঘোরাঘুরি—সব কিছু পায়ের কাছে এনে দিয়েছি! আর তুমি বলছ আমি নরক বানিয়েছি?"
"আমার এই টাকা-পয়সা আর ঘোরাঘুরি চাই না, জিহান! আমি শুধু সুস্থ একটা মানুষ চাই!" চিত্রা জিহানকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। "তুমি মদ ছেড়ে দাও, প্লিজ! নয়তো এই সম্পর্ক রাখা সম্ভব না!"
চিত্রার মুখ থেকে 'সম্পর্ক রাখা সম্ভব না' শুনে জিহানের মাথার রগ ফুলে উঠল। রাগের মাথায় সে টেবিলের ওপর থাকা কাঁচের পানির জগটা তুলে সজোরে মেঝেতে আছড়ে ভাঙল। ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
"সবাই ছেড়ে যাওয়ার ভয় দেখায়, চিত্রা! তুমিও তাই করছ?" জিহান চিৎকার করে উঠল। তারপর হঠাৎ করেই চিত্রাকে টেনে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সেই বাঁধনে ভালোবাসা ছিল না, ছিল এক ভয়ংকর জবরদস্তি আর অধিকারবোধ। "তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না! বুঝেছ? মরে গেলেও না!"
জিহান চিত্রার তোয়াক্কা না করে তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। চিত্রার অশ্রুসিক্ত চোখ, আকুতি আর অমত—কোনো কিছুই মদের নেশায় মত্ত জিহানকে থামাতে পারল না। সেই রাতে চিত্রার ওপর চলল ভালোবাসার নামে এক উন্মাদ অত্যাচার। জিহান তার নিজের মতো করে চিত্রাকে ভালোবাসল ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরতা চিত্রার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিল।
পরদিন সকালে সূর্য উঠলে জিহান যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, চিত্রা তখন আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের গলার আর হাতে জিহানের দেওয়া শক্ত বাঁধনের দাগগুলো দেখে তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল।
বাবার বাড়ির মানসিক অত্যাচার থেকে বাঁচতে এসে সে আজ এক নতুন শারীরিক ও মানসিক বন্দিশালায় এসে আটকে গেছে। চিত্রার শান্ত প্রকৃতি আর সহ্য করতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, এবার যদি সে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই বিষাক্ত বৃত্তে পড়ে তার অস্তিত্বই একদিন বিলীন হয়ে যাবে।
সেই রাতের পর থেকে ঘরটার বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। জিহান সকালে ঘুম থেকে উঠে চিত্রার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল, কিন্তু তার সেই অনুশোচনা চিত্রার ভাঙা মনকে জোড়া লাগাতে পারল না। চিত্রা বুঝে গিয়েছিল, জিহানের এই ক্ষমা চাওয়াটা একটা চক্রের মতো—রাতে মদ খেয়ে তাণ্ডব চালানো, আর সকালে এসে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে মাফ চাওয়া।
পরের দুটো সপ্তাহ চিত্রা একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল। সে আর জিহানের সাথে তর্ক করত না, মদের বোতল দেখেও কোনো প্রতিবাদ জানাত না। জিহানের দেয়া রোমান্স, উপহার কিংবা কাছে আসার চেষ্টা—সবকিছুই চিত্রা সহ্য করত এক জীবন্ত লাশের মতো। তার শান্ত প্রকৃতির ভেতরে জমা হচ্ছিল এক আগ্নেয়গিরি, যা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল।
অবশেষে সেই রাতটি এলো, যা চিত্রার সহ্যের শেষ সীমা পার করে দিল।
সেদিন ছিল মঙ্গলবার। বৃষ্টি পড়ছিল মুষলধারে। জিহান রাত প্রায় দুটোয় বাড়ি ফিরল। তবে এবার সে একা ছিল না, সাথে তার এক মাতাল বন্ধুকেও নিয়ে এসেছিল। জিহান এতটাই নেশাগ্রস্ত ছিল যে, নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারছিল না।
দরজা খুলে চিত্রা যখন এই দৃশ্য দেখল, তার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। ঘরে এভাবে গভীর রাতে মাতাল বন্ধুকে নিয়ে আসার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ জিহান করতে পারে, তা চিত্রার কল্পনারও বাইরে ছিল।
চিত্রা কিছু বলার আগেই জিহান টলতে টলতে ভেতরে ঢুকে চেঁচিয়ে বলল, "চিত্রা! ড্রাই ফ্রুটস আর দুটো গ্লাস নিয়ে এসো তো! আমরা আর একটু বসব।"
চিত্রা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। শান্ত কন্ঠের মেয়েটির ভেতর থেকে এক তীব্র গর্জন বেরিয়ে এলো, "জিহান! তোমার কি একটুও লজ্জা নেই? রাত দুটোয় মাতাল বন্ধু নিয়ে ঘরে ঢুকছ? তুমি কী ভেবেছ আমাকে?"
জিহানের বন্ধু পরিস্থিতি সুবিধার নয় দেখে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে গেল। কিন্তু জিহান রেগে আগুন হয়ে উঠল। ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে সে চিত্রার দিকে তেড়ে এলো।
"আমার বন্ধুকে তুমি অপমান করে বের করে দিলে?" জিহান চিত্রার চুল চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল। "এই বাড়িতে আমার হুকুম চলবে! তোমার সাহস কত বড় তুমি আমার অতিথিকে তাড়িয়ে দাও?"
"তোমার এই মাতলামি আমি আর একদিনও সহ্য করব না, জিহান!" চিত্রা জিহানকে সজোরে ঠেলে সরিয়ে দিল। জিহানের মদের গন্ধে তার বমি আসছিল। "আমি তোমার খেলনা নই! যখন ইচ্ছে ভালোবাসবে আর যখন ইচ্ছে অত্যাচার করবে—এভাবে সংসার হয় না!"
"তাহলে কী করতে চাও তুমি?" জিহান দাঁতে দাঁত চেপে চিত্রার মুখোমুখি দাঁড়াল।
"আমি চলে যাচ্ছি," চিত্রা সোজা জিহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "তোমার এই বিষাক্ত জীবন থেকে আমি মুক্ত হতে চাই।"
"কোথায় যাবে তুমি?" জিহান বিকট হেসে উঠল। "তোমার বাবার বাড়ি? যে বাবা তোমাকে সারাজীবন নির্যাতন করেছে? তুমি কোথাও যেতে পারবে না!"
জিহান চিত্রাকে ঘরে আটকে রাখার জন্য দরজার দিকে এগোতেই চিত্রা পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি জিহানের মুখে ছুঁড়ে মারল। জিহান চমকে উঠে চোখ মোছার ফাঁকে চিত্রা দ্রুত ড্রেসিং টেবিল থেকে তার ছোট হ্যান্ডব্যাগটা তুলে নিল। নিজের কিছু জরুরি কাগজপত্র আর মোবাইল আগে থেকেই ব্যাগে রাখা ছিল।
চিত্রা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। জিহান তাকে সামলে নিয়ে গায়ের জোরে আটকানোর আগেই চিত্রা ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা মেইন ডোর দিয়ে বাইরের বৃষ্টিতে নেমে এলো।
"চিত্রা! দাঁড়াও! চিত্রা, তুমি যেতে পারো না!" জিহান পেছন থেকে চিৎকার করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো, কিন্তু মদ খেয়ে ঢুলতে থাকা জিহান দরজার কাছে এসে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল।
বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি। নিঝুম রাতে রাজপথে কোনো গাড়ি ছিল না। ভিজতে ভিজতে চিত্রা মেইন রোডের দিকে হাঁটতে লাগল। চোখের জল আর বৃষ্টির পানি এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল। চিত্রার মনে হচ্ছিল, জীবনের মোড় বদলানোর সময় এসে গেছে। বাবার বাড়ির অত্যাচার আর স্বামীর মদের নেশা—দুটোর মাঝে পড়ে সে তার নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে পারে না।
একটা খালি সিএনজি পেয়ে চিত্রা উঠে বসল। গন্তব্য—বাবার বাড়ি। যে বাড়িতে তার শৈশব কেটেছে যন্ত্রণায়, আজ বাধ্য হয়ে সে সেখানেই ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু এবার সে আর সেই আগের দুর্বল, শান্ত চিত্রা নয়। সে এখন নিজের সীমানা চিনতে শিখেছে।
সিএনজির জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছিল। চিত্রা চুপচাপ বসে বাইরে তাকাচ্ছিল। গভীর রাতে নির্জন শহরের রাজপথের মতো তার নিজের জীবনটাও এখন বড় নিঃসঙ্গ। ভিজে যাওয়া শাড়ি আর এলোমেলো চুল নিয়ে যখন সে বাবার বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল, তখন রাত প্রায় তিনটা।
কয়েকবার বেল বাজানোর পর দরজা খুললেন তার মা, সাজেদা বেগম। দরজায় মেয়েকে এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি চমকে উঠলেন।
"চিত্রা! এ কী অবস্থা তোর? এই অসময়ে ভিজে একাকার হয়ে..."
মা কথা শেষ করার আগেই চিত্রা জড়িয়ে ধরল তাকে। মায়ের বুকে মাথা রেখে এতদিনের চেপে রাখা সব কান্না একসাথে বাঁধ ভাঙল। সাজেদা বেগম মেয়েকে ভেতরে এনে দ্রুত দরজা আটকে দিলেন। কিন্তু সেই কান্নার শব্দে নিচতলার ঘোর ভেঙে ঘুম থেকে উঠে এলেন রিফাইত সাহেব।
বসার ঘরে এসে চিত্রাকে দেখে রিফাইত সাহেবের মুখ আগের মতোই গম্ভীর আর কঠোর হয়ে উঠল। "রাত দুপুরে জামাইকে ছেড়ে এখানে কী করছিস? কী তামাশা শুরু করেছিস তুই?"
চিত্রা চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। "আমি আর ওই বাড়িতে ফিরে যাব না, বাবা। জিহান প্রতিদিন মদ খেয়ে এসে আমার ওপর মানসিক আর শারীরিক অত্যাচার করে। আজ তো মদ্যপ বন্ধুকে নিয়ে রাত দুপুরে ঘরে ঢুকেছে।"
রিফাইত সাহেব কোনো সহানুভূতি দেখানো তো দূরের কথা, উল্টো ধমকে উঠলেন, "সংসার করতে গেলে পুরুষ মানুষের একটু-আধটু ভুলত্রুটি থাকেই! সামান্য মদ খাওয়ার বাহানা করে রাতদুপুরে শ্বশুরবাড়ি চলে এলি? লোকে শুনলে কী বলবে? কাল সকালেই তুই জিহানকে ফোন করে ক্ষমা চেয়ে ফিরে যাবি!"
চিত্রা স্তব্ধ হয়ে বাবার দিকে তাকাল। যে বাপের বাড়ির যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে সে একসময় পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল, সেই বাপের বাড়িতে আজও তার যন্ত্রণার কোনো মূল্য নেই। কিন্তু এবার চিত্রা নতি স্বীকার করল না।
"না, বাবা। আমি আর ফিরব না," চিত্রা অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল। "তোমাদের সমাজের ভয়ে আমি নিজের জীবনটা ধ্বংস করতে পারব না। তুমি না চাইলেও আমি এই বাড়িতেই থাকব, অন্তত নিজের একটা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত।"
রিফাইত সাহেব মেয়ের এই স্পষ্ট উত্তর শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। শান্ত, ভীতু চিত্রার এই রূপ তিনি আগে কখনো দেখেননি।
পরদিন সকালে চিত্রা ঘুম থেকে উঠল এক অন্য মানসিকতা নিয়ে। সে নিজের মোবাইলটা সুইচ অফ করে রাখল। সিদ্ধান্ত নিল, জিহানের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবে না। সে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য পড়াশোনা আর চাকরির চেষ্টা নতুন করে শুরু করবে।
অন্যদিকে, সকালে ঘুম থেকে উঠে জিহানের মদের ঘোর কাটার পর সে পুরো বাড়ি খুঁজে চিত্রাকে পেল না। খালি ঘর, অগোছালো বিছানা আর ড্রেসিং টেবিলে পড়ে থাকা চিত্রার বিয়ের গহনাগুলো দেখে জিহানের বুকটা খালি হয়ে গেল।
মদের নেশায় সে কী কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা মনে পড়তেই জিহানের নিজের ওপর তীব্র ঘৃণা হতে লাগল। সে দ্রুত চিত্রার নম্বরে ফোন দিল, কিন্তু ফোন বন্ধ।
জিহান ছটফট করতে লাগল। যে চিত্রাকে সে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হতে দিত না, যে চিত্রার হাসির জন্য সে পুরো পৃথিবী এনে দিতে পারত, সেই চিত্রাই আজ তার এই বদঅভ্যাসের কারণে তাকে ছেড়ে চলে গেছে! মদের নেশা জিহানের মস্তিষ্ককে কতটা হিংস্র করে তুলেছিল, তা আজ চিত্রার শূন্যতা তাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে।
জিহান বারবার নিজের চুল টানতে লাগল। তার ভেতরের রাগী আর একগুয়ে পুরুষটি আজ পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে নিজের ভালোবাসার কাছে।
পরের তিন দিন জিহান এক ফোঁটা মদ স্পর্শ করল না। তবে মদের বদলে তার শরীরে বাসা বাঁধল এক প্রচণ্ড ছটফটানি আর চিত্রাকে ফিরে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা। সে চিত্রার মোবাইলে অনবরত কল করতে লাগল, বার্তা পাঠাতে লাগল। কিন্তু চিত্রার দিক থেকে কোনো সাড়া নেই।
চিত্রা বাপের বাড়ির একটা ছোট ঘরে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে। মা তাকে গিয়ে খাবার দিয়ে আসেন, আর বাবা এখনো অহেতুক কটু কথা শোনান। কিন্তু চিত্রার মন জুড়েই এখন এক বিষাদময় নীরবতা।
চারদিনের মাথায় বিকেলে চিত্রা নিজের ফোনটা অন করল। ভাবল, দেখাই যাক জিহান কী করছে।
ফোন অন করতেই কয়েকশো মিসড কল আর বার্তার নোটিফিকেশন এসে জমা হলো। চিত্রা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তেই জিহানের ফোনটা আবার বেজে উঠল।
চিত্রা কিছুক্ষণ রিং হতে দিল। তারপর ধীরহাতে রিসিভ করে কানে তুলল।
ওপাশ থেকে জিহানের ব্যাকুল, ভাঙা কণ্ঠ ভেসে এলো, "চিত্রা... তুমি কোথায়? প্লিজ কথা বলো আমার সাথে..."
চিত্রা চুপ করে রইল।
"চিত্রা, আমি ক্ষমা চাচ্ছি," জিহান আকুতি করে বলল। "আমি আর কোনোদিন ড্রিঙ্কস করব না, বিশ্বাস করো! আমার ভুল হয়ে গেছে। প্লিজ বাড়িতে ফিরে এসো, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারছি না..."
চিত্রার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। জিহানের প্রতি তার ভালোবাসা এখনো মরে যায়নি, কিন্তু সেই পুরনো ভীতি তাকে আটকে দিল।
"আমি আর তোমার কোনো কথায় বিশ্বাস করি না, জিহান," চিত্রা বরফশীতল গলায় বলল। "প্রতিবার ক্ষমা চেয়ে তুমি আবার একই কাজ করো। আমি এই বিষাক্ত জীবন আর চাই না। আমি ফিরব না।"
"চিত্রা, শোনো—"
জিহানের কথা শেষ হতে না দিয়েই চিত্রা কলটা কেটে দিল।
কিন্তু জিহান যে এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়, তা চিত্রা ভুলে গিয়েছিল। চিত্রার এই প্রত্যাখ্যান জিহানের ভেতরে এক অদ্ভুত আর বিপজ্জনক একগুয়েমি তৈরি করল। জিহান বুঝে গেল, সাধারণ আকুতিতে চিত্রা ফিরবে না। আর তাই, সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক চালটা চালতে যাচ্ছে।
চিত্রা ফোন কেটে দেওয়ার পর ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। জিহানের আকুল কণ্ঠটা বারবার তার কানে বাজছিল। চিত্রার মন বলছিল জিহান হয়তো সত্যিই অনুতপ্ত, কিন্তু তার বিবেক বাধা দিচ্ছিল। মদের নেশায় মত্ত জিহানের সেই হিংস্র রূপ, কাঁচের জগ ভাঙার বিকট শব্দ আর তার গায়ের উগ্র গন্ধ চিত্রার স্মৃতিতে এখনো তাজা।
মা সাজেদা বেগম ঘরে ঢুকে চিত্রার পাশে বসলেন। চিত্রার বিষণ্ণ মুখ দেখে মায়ের কষ্ট হচ্ছিল।
"কে ফোন করেছিল, মা? জিহান?" মা নিচু গলায় শুধালেন।
চিত্রা শুধু একটু মাথা নাড়ল।
"মা হিসেবে একটা কথা বলি, চিত্রা," সাজেদা বেগম চিত্রার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন। "তোর বাবার শাসন আর অত্যাচার আমি সারাজীবন নীরব মেনে নিয়েছি, কারণ আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল না। তুই তা করবি না, সেটা তোর অধিকার। কিন্তু জামাই তোকে সত্যিই ভালোবাসে রে। মদের অভ্যাসটা মারাত্মক খারাপ, কিন্তু মানুষটা তোর জন্য পাগল। ভেবে দেখ, আর একটা সুযোগ কি দেওয়া যায় না?"
চিত্রা মায়ের হাঁটুর ওপর মাথা রাখল। "আমি তাকে ভালোবাসি, মা। কিন্তু ওর ওই রূপটাকে আমি ভয় পাই। আমি শান্তিতে বাঁচতে চাই।"
হঠাৎ করেই চিত্রার হাতের মোবাইল ফোনটা আবার তীব্র শব্দে বেজে উঠল।
চিত্রা ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল জিহানের নাম ভাসছে। চিত্রা প্রথমে ফোনটা ধরতে চায়নি, কিন্তু নাছোড়বান্দা রিং বেজেই যাচ্ছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিত্রা সোয়াইপ করে ফোনটা কানে ধরল।
"জিহান, আমি তো তোমাকে একবার বললাম—"
"চুপ করো, চিত্রা!" ওপাশ থেকে জিহানের কণ্ঠ ভেসে এলো। তবে এবার তার গলায় সেই মিনতি বা ব্যাকুলতা নেই, বরং রয়েছে এক শিউরে ওঠার মতো হিমশীতল ও স্থির উচ্চারণ।
চিত্রা চমকে উঠল। "জিহান? তোমার কী হয়েছে?"
"আমার কী হয়েছে তা দেখার মতো ধৈর্য তোমার ছিল না, চিত্রা," জিহান খুব শান্ত কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলল। "তুমি ভেবেছ তুমি আমাকে ছেড়ে গিয়ে নিজের মতো বাঁচবে? আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচতে পারি না, আর তুমি আমাকে এই নরকে একা ফেলে রেখে চলে গেলে?"
"জিহান, আজেবাজে কথা বোলো না—"
"আমি আজেবাজে কথা বলছি না," জিহান কথা কেড়ে নিয়ে বলল। "ঘড়ির দিকে তাকাও, চিত্রা। এখন বিকেল চারটে বাজে। আমি তোমাকে ঠিক এক ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। বিকেল পাঁচটার মধ্যে যদি তুমি এই বাড়িতে না ফেরো, তবে তুমি আর কোনোদিন জিহানকে দেখতে পাবে না।"
চিত্রার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। গা ছমছম করে উঠল তার। "মানে? তুমি কী বলতে চাইছ?"
"মানে খুব সহজ," জিহান ওপাশ থেকে এক বিষাদময় হাসি হাসল। "তুমি না থাকলে এই জীবনের কোনো মূল্য আমার কাছে নেই। যদি তুমি পাঁচটার মধ্যে আমার সামনে না দাঁড়াও, তবে আমি নিজেকে শেষ করে দেব। আমার রক্তের দায় তখন তোমার।"
"জিহান! পাগলামি কোরো না! জিহান!" চিত্রা চিৎকার করে উঠল।
"সময় শুরু হয়ে গেছে, চিত্রা। ঠিক এক ঘণ্টা।"
কথাটা বলেই জিহান খট করে ফোনটা কেটে দিল। চিত্রা সাথে সাথে ব্যাক কল করল, কিন্তু জিহানের ফোন সুইচ অফ দেখাচ্ছে।
চিত্রা ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল। জিহান কি সত্যিই এমন কিছু করতে পারে? লোকটা প্রচণ্ড একগুয়ে আর রাগী। মদের ঘোর না থাকলেও নিজের জেদ বজায় রাখতে সে যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে পারে—এ কথা চিত্রা ভালো করেই জানে।
"কী হয়েছে, চিত্রা? কে কী বলল?" মা শংকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"মা... জিহান নিজেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ও ফোন অফ করে দিয়েছে!" চিত্রার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছিল না।
চিত্রার মন দোলাচালে পড়ে গেল। একদিকে তার আত্মসম্মান আর পুরনো ক্ষোভ, অন্যদিকে জিহানের জীবন। যদি সত্যি জিহান নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেলে, তবে সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না। ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই, আর আজ সেই ভালোবাসাই চিত্রাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।
চিত্রা আর এক মুহূর্তও চিন্তা করল না। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে ঘরের বাইরে দৌড় দিল।
"চিত্রা! কোথায় যাচ্ছিস?" নিচতলা থেকে বাবার হাঁক ভেসে এলো।
কিন্তু চিত্রা আজ বাবার ডাক শুনল না। কোনো বাধা, কোনো দ্বিধা আর তাকে থামাতে পারল না। রাস্তা থেকে একটা ট্যাক্সি ডেকে সে উঠে বসল।
"ড্রাইভার ভাই, দ্রুত চলুন! ধানমন্ডি চলুন, প্লিজ!" চিত্রা হাত জোর করে চালককে আকুতি জানাল।
রাস্তায় তখন বিকালের জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা যেন দ্রুত গতিতে ঘুরছিল। চারটে কুড়ি... চারটে পঁয়ত্রিশ... চারটে ৫০! চিত্রার বুকের ভেতর যেন শত শত হাতুড়ির ঘা পড়ছিল। সে চোখ বন্ধ করে মনে মনে সৃষ্টি কর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা করছিল—জিহান যেন কোনো ভুল পদক্ষেপ না নেয়।
অবশেষে চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে ট্যাক্সিটা জিহানের বাড়ির সামনে এসে থামল। চিত্রা ভাড়া মিটিয়ে একছুটে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকে লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
জিহানের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দেখে দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে, লক করা নেই।
চিত্রার বুক কেঁপে উঠল। ভয়ে ভয়ে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে সে ভেতরে পা রাখল। সারা ঘরে এক শ্মশানের নীরবতা ছড়ানো। চিত্রা কম্পিত গলায় ডাকল, "জিহান...?"
ফ্ল্যাটের থমথমে বাতাস যেন চিত্রার গলার আওয়াজটাকেও শুষে নিচ্ছিল। কোনো সাড়া না পেয়ে তার পা দুটো ভয়ে অবশ হয়ে আসছিল। বসার ঘর পার হয়ে সে দ্রুত শোবার ঘরের দিকে ছুটে গেল।
ঘরের দরজায় পা রাখতেই চিত্রার চোখ দুটো ভয়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। দৃশ্যটা দেখে তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
ঘরের এক কোণে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে জিহান। তার ডান হাতে ধরে রাখা একটা ধোলাই করা ধারালো ছুরি, যা সে সোজা নিজের বাঁ হাতের কব্জির ওপর চেপে ধরেছে। ছুরিটা চামড়া কেটে ভেতের ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্ত! জিহানের মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে এক অদ্ভুত উন্মাদের মতো দৃষ্টি।
"জিহান! না!"
চিত্রা চিৎকার করে উঠে এক সেকেন্ডের ফ্র্যাকশনে দৌড়ে গিয়ে জিহানের হাতে সজোরে ধাক্কা দিল। হাত থেকে ছিটকে গিয়ে ছুরিটা ঘরের অন্য প্রান্তে ঝনঝন শব্দে গিয়ে পড়ল।
পর মুহূর্তেই চিত্রা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মেঝেতে বসে পড়ে জিহানকে দুই বাহু দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে জিহানকে আকড়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল। চিত্রার কাঁপুনি আর চোখের জলে জিহানের বুকের সুতি শার্টটা ভিজে যেতে লাগল।
"তুমি পাগল হয়ে গেছ, জিহান? তুমি এ কী করতে যাচ্ছিলে? সামান্য একটা ভুলের জন্য তুমি নিজের প্রাণটা দিয়ে দিতে চাইলে?" চিত্রা কান্নায় ভেঙে পড়ে জিহানের বুকে আঘাত করতে করতে বলতে লাগল। "তুমি জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি? তুমি মরে গেলে আমি কীভাবে বাঁচতাম?"
জিহানের হাত থেকে যেন সব জোর খসে পড়েছিল। সে চিত্রার এই আকুল কান্না আর জড়িয়ে ধরা দেখে থমকে গেল। আস্তে আস্তে সে-ও নিজের দুটো শক্ত বাহু দিয়ে চিত্রাকে বুকের গভ্যে চেপে ধরল। জিহানের চোখ দিয়েও অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এক রাগী, একগুয়ে পুরুষের চোখে ভালোবাসার এই কান্না চিত্রা আগে কখনো দেখেনি।
"তুমি তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, চিত্রা," জিহান ভাঙা গলায় ফুঁপিয়ে উঠল। "আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছিলাম না। এই ঘর, এই বাতাস—সব কিছু আমাকে গিলে খাচ্ছিল। ড্রিঙ্কস করার সেই অভিশপ্ত রাতটার জন্য আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল তুমি না থাকলে এই জীবন রেখে আমার কী লাভ?"
চিত্রা মুখ তুলে জিহানের চোখের দিকে তাকাল। দুই আঙুলে জিহানের চোখের জল মুছে দিয়ে খুব নরম কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, "আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি, জিহান। আমি শুধু চাইতাম তুমি সুস্থ হও। তোমার ওই মদের নেশা আর হিংস্র রূপ আমাকে তিলে তিলে মেরে ফেলছিল। আমি শুধু আমাদের ভালোবাসার সংসারটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।"
জিহান চিত্রার দুই হাত নিজের গালের সাথে চেপে ধরে আকুল হয়ে বলল, "আমি কথা দিচ্ছি, চিত্রা! আজ, এই মুহূর্তে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা করছি—আমি আর কোনোদিন এক ফোঁটা মদ স্পর্শ করব না। যদি কোনোদিন করি, তুমি আমাকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যেও, আমি আর কখনো তোমাকে আটকাব না। প্লিজ আমাকে আর একটা সুযোগ দাও!"
জিহানের চোখের ব্যাকুলতা আর খাঁটি অনুশোচনা দেখে চিত্রার মনের সব অভিমান এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, জিহান সত্যি তার ভালোবাসার বদলে নিজেকে শুধরে নিতে তৈরি।
"আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, জিহান। কিন্তু এবার তোমার কথা তোমাকে রাখতে হবে," চিত্রা মৃদু হেসে বলল।
জিহান চিত্রার কপালে গভীর এক ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিল। তারপর চিত্রার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসাল।
কয়েকটা মাস কেটে গেল এক নতুন ভোরে।
জিহান তার কথা রেখেছিল। সে পুরোপুরি নিজেকে বদলে ফেলেছে। মদের বোতল আর কোনোদিন তাদের সংসারে ঠাঁই পায়নি। জিহানের মেজাজও এখন আগের চেয়ে অনেক শান্ত, তবে চিত্রার প্রতি তার সেই রোমান্টিকতা আর পাগলামি একটুও কমেনি—বরং তা বেড়ে গেছে বহুগুণ।
আর চিত্রা? সে এখন আর সেই লাজুক, দমে থাকা মেয়েটি নয়। জিহানের পূর্ণ সমর্থনে সে আবার পড়াশোনা শুরু করেছে, পাশাপাশি নিজের একটা অনলাইন বুটিকের ব্যবসা চালু করেছে। জিহান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে চিত্রার সেই ছোটবেলার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা পূরণ করে দিয়েছে।
এক বিকেলে, বান্দরবানের এক মেঘে ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল চিত্রা আর জিহান। পরন্ত বিকেলের মিষ্টি হাওয়া চিত্রার চুলে খেলা করছিল। জিহান পেছন থেকে এসে চিত্রার কোমর জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে চিবুক রাখল।
চিত্রা হাসিমুখে জিহানের বাহুডোরে নিজের মাথাটা হেলিয়ে দিল। সমুদ্র দেখা থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা—চিত্রার ঘরাঘুরির সব শখ এখন জিহান একে একে পূরণ করছে।
"কী ভাবছ, চিত্রা?" জিহান তার কানে কানে নিচু গলায় শুধাল।
চিত্রা ঘুরে দাঁড়িয়ে জিহানের গলায় হাত রেখে মিষ্টি হেসে বলল, "ভাবছি, ঝড়ের পর মেঘ কেটে গেলে আকাশটা কতটা সুন্দর দেখায়!"
জিহান একগাল হেসে চিত্রার ঠোঁটে নিজের অধিকারের এক গাঢ় চুমু আঁকল। দূর দিগন্তে সূর্য তখন পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল, আর চিত্রা-জিহানের ভালোবাসার গল্পটা এক নতুন, সুখী আর শান্তিময় দিগন্তের দিকে নতুন করে ডানা মেলছিল।
....