কাজী অফিসের এক কোনায় কাঠের পুরনো চেয়ারটায় বসে ইমনের মনে হচ্ছিল, তার মাথার ভেতর কেউ একটা আস্ত কামারশালা বসিয়ে দিয়েছে। ঘামের ফোঁটা কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার মুখেই সে ঝটকা মেরে সেটা মুছে ফেলল। তার সামনে বসে আছে ঝুমা। পরনে টুকটুকে লাল বেনারসি, কিন্তু মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে নয়, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ঝুমার টানা দুটো চোখের দৃষ্টি দিয়ে যেন সত্যি সত্যি বুলেট বের হচ্ছে।
ইমন আর ঝুমার পারিবারিক পরিচয়টা পুরনো, কিন্তু দুজন দুজনকে চেনে পরম শত্রু হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই যেখানে দেখা, সেখানেই কুরুক্ষেত্র। ইমন যদি বলে ‘দিন’, ঝুমা তক্ষণি বাজি ধরে প্রমাণ করে ছাড়বে সেটা ‘রাত’। ইমন পেশায় একজন জেদি আর্কিটেক্ট, আর ঝুমা নামকরা এক প্রাইভেট কলেজের লেকচারার—যার মুখের ধার সব ছাত্রছাত্রীর জানা।
"কাজিন হয় বলে যে সারা জীবন গায়ের ওপর খবরদারি করতে আসবে, তা সহ্য করা হবে না।" ঝুমা ওড়নাটা শক্ত করে ধরে বিড়বিড় করে বলল, কিন্তু তার গলার আওয়াজ স্পষ্ট পৌঁছে গেল ইমনের কান পর্যন্ত।
ইমন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একগাল তেতো হাসি হেসে বলল, "আহা! যেন আমার মহাদেব মতো শখ হয়েছে তোমার মতো একখানা আগ্নেয়গিরিকে ঘরে তোলার! আম্মা-আব্বার প্রেসার হাই হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল বলেই আজ এই কাঠের চেয়ারে এসে বসতে হয়েছে, নইলে..."
"নইলে কি? ঢোল বাজিয়ে মিছিল বের করতে?" ঝুমা চট করে ফোঁড়ন কাটল। "বেশি বাহাদুরি দেখাবে না ইমন! বিয়ের রেজিস্ট্রি খাতায় সই করা মানে এই নয় যে আমি তোমার হুকুম মেনে চলব।"
"হুকুম দেওয়ার মতো অত বাজে পছন্দ আমার না," ইমন গায়ে মাখল না কথাটা।
কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ওপর একটু নামিয়ে দুজনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। বয়সের ভারে কাজীর পিঠ কিছুটা বাঁকা, কিন্তু অভিজ্ঞতা প্রচুর। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, "বাবা-মা দুই পক্ষই তো বাইরের ঘরে দস্তখত করে পাঠাইছেন। তোমরা দুইজনে কি সইটা করবা, নাকি আমি খাতা বন্ধ করব?"
ঝুমা একবার দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। তার আম্মা আর ইমনের আব্বা বাইরে বেশ চিন্তিত মুখে পায়চারি করছেন। দুজনের পরিবারই এই দুই ক্ষ্যাপাটে ছেলেমেয়েকে নিয়ে অতিষ্ঠ। শেষে বহু কষ্টে দুই বাড়ির মুরুব্বিরা এক হয়ে এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে অন্তত দুজনের জেদ আর ত্যাড়ামি কিছুটা কমে।
ঝুমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সই করার কলমটা তুলে নিল। যেন ডেথ ওয়ারেন্টে সই করছে—এমন ভঙ্গিতে খসখস করে নিজের নাম ‘ঝুমা রহমান’ লিখে দিল। কলমটা প্রায় টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে সে ইমনের দিকে তাকাল।
ইমনও দমার পাত্র নয়। সে আরও একধাপ এগিয়ে ভাবলেশহীন মুখে কলমটা তুলে নিয়ে দ্রুত সই শেষ করল—‘ইমন চৌধুরী’।
বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেল। গাড়ি যখন ইমনের নতুন ফ্ল্যাটের সামনে এসে থামল, চারপাশ তখন বেশ শান্ত। ইমন আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল, বিয়ের পর সে ফ্যামিলি বাসায় থাকবে না, নিজস্ব কেনা নতুন ফ্ল্যাটেই উঠবে। পরিবারও এতে রাজি হয়েছিল এই ভেবে যে, অন্তত একা থাকলে দুজন দুজনকে বোঝার সময় পাবে।
গাড়ি থেকে নেমে ঝুমা নিজের ভারী লেহেঙ্গা আর বেনারসির ভাঁজ সামলাতে সামলাতে লিফটের দিকে এগোচ্ছিল। ইমন পেছন থেকে এসে তার হাতের বড় ট্রলি ব্যাগটা টেনে নিতে চাইল।
"ছাড়ো! আমার ব্যাগ আমি নিতে পারি," ঝুমা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল।
"শোন ঝুমা," ইমন ঠান্ডা চোখে তাকাল, "বাইরে হাজারটা ডেকোরেশন আর লোকজনের সামনে তোমার এই নাটক আমি সহ্য করেছি। এখন আমরা একা। এই পাঁচ কেজির ট্রলি ব্যাগ নিয়ে তিন তলার লিফটে ওঠার মহড়া না দিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়াও।"
"আমার ব্যাগ আমি বহন করব, নাকি ফেলে দেব—সেটা আমার ব্যাপার। তুমি তোমার পকেটে হাত দিয়ে রাজাদের মতো হাঁটো, সেটাই তোমাকে মানায়," ঝুমা ভেংচি কেটে ব্যাগটা টেনে ভেতরে ঢুকল।
লিফটের বন্ধ দরজায় দুজনের আবছা প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল। লাল বেনারসিতে ঝুমাকে অপূর্ব সুন্দরী লাগছিল, আর কাঁচা-পাকা আলোয় ইমনের শেরওয়ানি পরা শক্ত চিবুক স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু দুজনের মাঝখানে যেন চীনের প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার পর ইমন লাইট জ্বালল। পুরো ঘরটা বেশ পরিপাটি, আধুনিক ছোঁয়ায় সাজানো। কিন্তু মাস্টার বেডরুমে ঢুকতেই ঝুমার চোখ আটকে গেল। একটাই বিশাল খাটের ওপর ফুল আর গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে সাজানো হয়েছে।
ঝুমা চোখ বড় বড় করে ঘুরে দাঁড়াল, "এসবের মানে কি? এসব ড্রামা কে করেছে?"
ইমন ঘাড় মলে শান্ত গলায় বলল, "ভাবীর কাজ। বিকেলে এসে এসব ছাইপাশ সাজিয়ে রেখে গেছে। তোমার ভালো না লাগলে ফেলে দাও, আমার কোনো আগ্রহ নেই।"
"ফেলে দেব মানে? তুমি হাত দিয়ে পরিষ্কার করবে!" ঝুমা গলার স্বর চড়াতে লাগল। "আর পরিষ্কার শুনে রাখো ইমন চৌধুরী, এই খাটে শুধু আমি থাকব। তুমি ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ো।"
ইমন নিজের শেরওয়ানির বোতাম খুলতে খুলতে হালকা হাসল। সেই হাসিতে কোনো ভালোবাসা ছিল না, ছিল চরম বিষাদ আর ক্ষোভ। সে একটু এগিয়ে এসে ঝুমার খুব কাছাকাছি দাঁড়াল।
ঝুমা একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ইমন তার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, "নিজের কেনা ফ্ল্যাট, নিজের খাট। আম্মা-আব্বার খাতিরে তোমাকে ঘরে এনেছি বলে এই ভেবে বসো না যে তুমি আমাকে হুকুম করবে। অর্ধেক খাট তোমার, অর্ধেক খাট আমার। পোষালে থাকো, না হলে মেঝেতে সোফা পাতা আছে।"
ঝুমার রাগ তখন সপ্তম স্বর্গে। সে হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে কঠিন চোখে তাকাল, "আমি মেঝেতে শোব? এত বড় সাহস তোমার!"
"সাহসের পরীক্ষা নেবে না ঝুমা, আজ রাতে আমি খুব ক্লান্ত," ইমন তোয়ালেটা কাঁধে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
বাথরুমের দরজা বন্ধ হতেই ঝুমা রাগে গজগজ করতে করতে খাটের ওপর রাখা গোলাপের পাপড়িগুলো এক ঝটকায় নিচে ফেলে দিল। তার মেজাজ এখন তুঙ্গে। বিয়েটা যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত হতে চলেছে, সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু বুকটার ভেতরে কোথাও যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর অচেনা অনুভূতির উঁকিঝুঁকি, যা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
সকালের আলো যখন শোবার ঘরের জানালার পর্দা টপকে ঝুমার চোখে পড়ল, তার ঘুম ভেঙে গেল। হালকা একটু নড়তেই সে টের পেল শরীরের সব কটি জয়েন্ট যেন ব্যথায় জমে আছে। ভারী বেনারসি আর গয়নার তোড়জোড় কাল রাতে কত দেরিতে খুলেছে, তা ভাবতেই মাথাটা আবার চনমন করে উঠল।
বিছানার পাশে তাকাতেই ঝুমার চোখ ছানাবড়া। খাটটা মাঝখান দিয়ে সমান দুই ভাগে ভাগ করা! ইমনের নীল রঙের একটা লম্বা স্কেল আর তার সাথে দুটো মোটা কোলের বালিশ একদম মাঝখানে সোজা করে রাখা। যেন আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে!
ঝুমা এক ঝটকায় উঠে বসল। "অসভ্য, ত্যাড়ামেড়ো লোক একটা! ঘরেও সীমানা প্রাচীর তৈরি করেছে!"
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে বের হলো ইমন। পরনে ট্রাউজার আর ধূসর রঙের টি-শার্ট, চুলগুলো তখনও ভেজা। গা মোছার তোয়ালেটা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে ঝুমার দিকে এক নজর তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "সীমানা পার হওয়ার চেষ্টা করো না। এটা আমার এলাকা, আর ওটা তোমার। সীমান্ত লঙ্ঘন করলে মাশুল দিতে হবে।"
ঝুমা বিছানা থেকে নেমে দুহাতে চুলগুলো বাঁধতে বাঁধতে ইমনের একদম সামনে এসে দাঁড়াল। ইমনের ভেজা চুলের দু-এক ফোঁটা পানি ঝুমার কপালে এসে পড়ল। ঝুমা সেটা খেয়ালও করল না, বরং চোখের আগুনে ইমনকে ভস্ম করে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, "মাশুল? কিসের মাশুল শুনি? তোমার এই বালিশের দেওয়াল টপকে তোমার ওই ছাইপাশ চেহারার এলাকায় যাওয়ার কোনো শখ আমার নেই, বুঝলে চৌধুরী সাহেব?"
"খুব ভালো। তাহলে এই নিয়মটা যেন আজীবন মনে থাকে," ইমন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে শুরু করল।
ঝুমা বাথরুমে ঢুকে সজোরে দরজা আটকে দিল। দরজার শব্দে ইমন আয়নার ভেতরেই একবার তাকাল, তারপর তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটেই পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল। মেয়েটার রাগটা একটু বেশিই চড়া, কিন্তু এই রেগে যাওয়া মুখটার মধ্যে কেন যেন একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে—যা ইমন মুখে স্বীকার তো দূরের কথা, নিজের মনেও জায়গা দিতে চায় না।
সকাল দশটার দিকে ইমনের আম্মা আর ঝুমার আম্মা এসে হাজির হলেন নতুন কনে আর বরকে দেখতে। দুই বাড়ির মুরুব্বিরা এক ঝাঁক নাস্তা আর মিষ্টি নিয়ে এসেছেন।
ঝুমা ততক্ষণে একটা সাধারণ সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে চুল বেঁধে গুছিয়ে নিয়েছে। শাশুড়িকে দেখে সে হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে সালাম করল, "খালাম্মা, আপনারা এত সকালে কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন?"
ইমনের আম্মা ঝুমার গালে হাত দিয়ে আদর করে বললেন, "এখনো খালাম্মা বলছিস মা? এখন তো আমি তোর আম্মা। কাল রাতটা কেমন কাটল রে? ইমন তোকে কষ্ট দেয়নি তো?"
ঝুমা মিষ্টি একটা হাসি হেসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইমনের দিকে তাকাল। সেই হাসির পেছনে কতখানি বিষ ছড়িয়ে আছে, তা শুধু ইমনই টের পাচ্ছিল। ঝুমা বলল, "না আম্মা, আপনার ছেলে তো ভীষণ যত্নশীল! কাল রাতে আমাকে পুরো খাটের আধখানায় জায়গা দিয়ে নিজে একদম সোজা হয়ে শুয়েছিল। এত নিয়মকানুন মেনে চলে যে, বালিশ দিয়ে বর্ডার বানিয়ে রেখেছে!"
আম্মা অবাক হয়ে ইমনের দিকে তাকালেন, "ইমন! এসব কী শুনছি?"
ইমন মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করল, কিন্তু মুখে একগাল চওড়া হাসি টেনে বলল, "আহা আম্মা! ঝুমা তো একটু বানিয়ে বানিয়ে বলতে ভালোবাসে। ও আসলে বলতে চাচ্ছে যে আমি ওর ঘুমে যেন ব্যাঘাত না ঘটে, তাই সাবধানে দূরে ছিলাম। তাই না বউ?"
'বউ' শব্দটা ইমনের মুখে শুনে ঝুমার বুকটা কেমন যেন হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠল। কিন্তু সামলে নিয়ে সে চোখ টিপে বলল, "তা তো বটেই! কত চিন্তা আমার জন্য!"
মুরুব্বিরা নাস্তা খেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় ইমনের আব্বা বললেন, "তোরা দুজন আজ একটু বাইরে ঘুরে আয়। ঘরে বসে থাকলে মন ভার হয়ে থাকবে।"
মুরুব্বিরা চলে যেতেই ড্রয়িং রুমের আবহাওয়া নিমেষে বদলে গেল। ইমন দরজায় লক লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ঝুমা তখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল পানির গ্লাস নিতে।
"নাটক ভালোই করতে পারো," ইমন হাত দুটো পকেটে পুরে ঝুমার পিছু পিছু রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াল।
"তোমার থেকে শিখেছি," ঝুমা গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে জবাব দিল। "আম্মার সামনে অত 'বউ বউ' করার কী দরকার ছিল? গায়ে জ্বর এসে যাচ্ছিল আমার।"
"আমারও খুব শখ হয়নি তোমাকে বউ বলতে," ইমন একটু এগিয়ে এসে ঝুমার হাতের পানির গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে এক চুমুক খেল।
ঝুমা চোখ বড় বড় করে তাকাল, "এটা আমার জুঠা পানি!"
"সো হোয়াট? আমার ফ্রিজের পানি, আমার গ্লাস," ইমন বাঁকা হেসে গ্লাসটা কাউন্টারে রাখল। কিন্তু নামিয়ে রাখার সময় ঝুমার একদম কাছে চলে এলো সে।
উভয়ের নিঃশ্বাস তখন খুব কাছাকাছি। ইমনের শরীরের মৃদু পুরুষালী পারফিউমের গন্ধ ঝুমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। ঝুমার বুকের ভেতর হঠাৎ এক অজানা তোলপাড় শুরু হলো। সে চট করে একপা পিছিয়ে গেল। কিন্তু মেঝের ওপর পড়ে থাকা একটু পানিতে ঝুমার পা পিছলে গেল!
"আহ্!" ঝুমা চোখ বন্ধ করে পড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই একটা শক্ত হাত তার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।
ইমন তাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে এক টানে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। ঝুমার বন্ধ চোখ দুটো আস্তে আস্তে খুলল। ইমনের বুকের স্পন্দন তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে—দ্রুত এবং গভীর। ইমন গভীরভাবে ঝুমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঝুমারও সমস্ত চ্যাঁচামেচি, রাগ যেন কোথায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো রান্নাঘরে এক জমাট নীরবতা নেমে এলো। দুটো ত্যাড়ামেড়ো মনের মাঝে অচেনা এক ভালোবাসার হাওয়া যেন এই প্রথম এসে স্পর্শ করে দিয়ে গেল, কিন্তু দুজনের কেউই সেই অনুভূতির কাছে হার মানতে প্রস্তুত নয়।
ঝুমার কোমর পেঁচিয়ে রাখা ইমনের হাতটা যেন একটু বেশিই শক্ত হয়ে এসেছিল। দুজনের চোখাচোখি হওয়ার পর সেই কয়েক মুহূর্তের নীরবতায় ঘরের আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি হলো। ঝুমার বুকের ধুকপুকানি যেন ইমনের বুকের চামড়া ভেদ করে ভেতরে পৌঁছাচ্ছিল। কিন্তু ঝুমা তো ঝুমাই—সেই আবেশ ভাঙতে তার বেশি সময় লাগল না।
ঝুমা নিজেকে চট করে সামলে নিয়ে ইমনের বুক থেকে একধাক্কায় সরে গেল। চোখমুখ লাল করে গলার রগ ফুলিয়ে বলল, "হাত সরাও! গায়ের ওপর পড়ার অভ্যাস নাকি তোমার?"
ইমন একটু থমকে গেলেও পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে নিজের শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে হাসল, "পড়ার অভ্যাস আমার নয় ম্যাডাম, পড়ে যাওয়ার অভ্যাস আপনার। বাঁচালাম বলেই মেঝেতে আছাড় খেয়ে কোমরটা ভাঙেনি। কৃতজ্ঞতা জানানো দূরে থাক, উল্টো চ্যাঁচাচ্ছ?"
"আমি তোমাকে বাঁচাতে বলেছি? দরকার হলে একশো বার আছাড় খাব, তাও তোমার মতো লোকের দয়া নেব না!" ঝুমা গজগজ করতে করতে রান্নাঘর থেকে একপ্রকার পালিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
ইমন রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে রয়ে গেল। সে নিজের ডান হাতের দিকে তাকাল, যে হাতটা দিয়ে ঝুমার কোমর ধরেছিল। মেয়েটার শরীরটা এত নরম আর হালকা, অথচ মুখের বিষ যেন তক্ষকের মতো! ইমনের অবচেতন মন স্বীকার করল—মেয়েটার ছোঁয়া পাওয়ার পর তার নিজের বুকের ভেতরের স্পন্দনও সাধারণ ছিল না।
দুপুরের দিকে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। শ্রাবণের ঘন কালো মেঘে চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে ঝুমার খুব পছন্দ। সে একটা সাদা সুতির শাড়ি জড়িয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়াল। বৃষ্টির ছিটে এসে তার মুখ আর চুলে লাগতেই সে চোখ বন্ধ করে এক অজানা ভালোলাগায় ডুবে গেল।
ইমন তখন ড্রয়িং রুমে বসে ল্যাপটপে তার নতুন আর্কিটেকচারাল প্রজেক্টের নকশা আঁকছিল। কাজের ফাঁকে কফি নিতে গিয়ে তার চোখ পড়ল বারান্দার দিকে।
বৃষ্টির ছাঁটে ঝুমার ভেজা চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে আছে। সাদা শাড়িতে তাকে কোনো রূপকথার পরী ছাড়া অন্য কিছু মনে হচ্ছিল না। ইমনের হাতের কফির কাপটা মাঝপথেই থেমে গেল। ঝুমার এই শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। সবসময় ঝগড়া আর চিৎকার করা মেয়েটার ভেতরে যে এতটা মাধুর্য লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না।
ইমন পা বাড়াল বারান্দার দিকে। দরজার কাছে গিয়ে সে পকেটে হাত দিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
ঝুমা হঠাৎ বুঝতে পারল পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ খুলেই ইমনকে দেখতে পেয়ে সে কিছুটা চমকে গেল। নিজের পরনের ভিজে যাওয়া শাড়িটা এক হাতে একটু টেনে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "এখানে কী চায়? আমার নিজের একটু শান্তি নেওয়ার অধিকারও কেড়েই নেবে নাকি?"
ইমন জবাব দিল না। সে বারান্দায় ঢুকে ঝুমার একদম পাশে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে একটু বৃষ্টি ছুঁয়ে বলল, "তোমার কি সব কিছুতেই সমস্যা ঝুমা? বৃষ্টির দিকে তাকালেও সমস্যা?"
"তোমার ওপর সমস্যা," ঝুমা সোজা বলল। "কাজের অজুহাতে ড্রয়িং রুমে বসে থাকা যায় না? এখানে ঘাড়ের ওপর এসে দাঁড়াতে হবে?"
ইমন ঝুমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, "এটা আমারও ঘর। আমি যেখানে খুশি দাঁড়াব। আর সত্যি বলতে, রাগলে তোমাকে কতটা বাজে দেখায়, তা তুমি যদি আয়নায় দেখতে!"
"বাজে দেখায়? আমাকে বাজে দেখায়?" ঝুমা গর্জে উঠল। "তোমার ওই ব্যাঙের মতো চেহারা নিয়ে আমার সৌন্দর্য বিচার করতে এসো না!"
"ওহ সত্যি? ব্যাঙের মতো চেহারা?" ইমন একপা এগিয়ে গেল। ঝুমা পিছু হটতে গিয়ে বারান্দার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল।
ইমন ঝুমার দুই পাশে দেয়ালের ওপর হাত রেখে তাকে আটকে দিল। তাদের মাঝে ব্যবধান এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। ইমনের চোখ দুটো সোজা ঝুমার চোখের ওপর স্থির। ঝুমার বুকটা আবার দ্রুত উঠানামা করতে লাগল। সে ইমনের বুকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ইমনের শক্ত শরীর সামান্যও নড়ল না।
"তুমি কি জানো ঝুমা, তোমার এই রাগটাই তোমাকে একটু বেশি সুন্দর করে তোলে?" ইমনের গলা এবার গভীর আর নিচু।
ঝুমা থমকে গেল। ইমনের এই অচেনা কণ্ঠস্বর, চোখের গভীর দৃষ্টি আর শরীরের ওম যেন তার সব তর্ক থামিয়ে দিল। ঝুমার গলার স্বর হঠাৎ করেই নেমে এলো, "কী... কী বলছ এসব? ছাড়ো আমাকে..."
"ছাড়ব না," ইমন আরও একটু ঝুঁকি নিয়ে ঝুমার কানের কাছে এসে বিড়বিড় করে বলল, "যদি না ছাড়ি, কী করবে?"
ঝুমার নিঃশ্বাস আটকে এলো। ইমনের ঠোঁট দুটো তার কানের পাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রায়। ঝুমার চোখ দুটো মেলতে কষ্ট হচ্ছিল। এক অজানা ভালোলাগায় তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু এত বছরের জেদ আর ত্যাড়ামি যে তাকে থামিয়ে দিচ্ছে!
হঠাৎ করেই ড্রয়িং রুমের টেবিল থেকে ইমনের ফোনের রিংটোন বেজে উঠল।
শব্দ হতেই দুজনই যেন বাস্তব জগতে ফিরে এলো। ঝুমা চট করে ইমনকে সজোরে ধাক্কা দিল। এবার ইমন পিছিয়ে গেল। ঝুমা এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত হেঁটে শোবার ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
দরজায় হেলান দিয়ে ঝুমা হাত দিয়ে নিজের বুকটা শক্ত করে চেপে ধরল। হৃদয়টা ধড়ফড় করছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। "এ কী হচ্ছে আমার? কেন আমি লোকটার এত কাছে চলে যাচ্ছি?" ঝুমা নিজেকেই প্রশ্ন করল।
অন্যদেহে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইমন নিজের চুলে হাত বোলাল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ফোনটার দিকে এগোল। মুখে গাম্ভীর্যের মুখোশ থাকলেও, তার মনে তখন ঝুমার ভেজা মুখের প্রতিচ্ছবি বারবার ভেসে উঠছিল। লড়াইটা আর শুধু জেদের রইল না, জল গড়াচ্ছে অন্যদিকে।
পরদিন সকালের আবহাওয়াটাও যেন তাদের সম্পর্কের মতোই অদ্ভুত গম্ভীর হয়ে রইল। গতকালের সেই বারান্দার ঘটনার পর থেকে দুজন দুজনের সাথে একদম কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। ঝুমা সকালে উঠে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে নিজের জন্য চা বানিয়ে নিয়েছিল, আর ইমন তৈরি হয়ে একটা কথাও না বলে নিজের অফিসের কাজে বেরিয়ে গিয়েছিল।
বিকেলের দিকে ইমনের জ্বর এলো। হুট করে আবহাওয়া বদল আর কালকে বারান্দায় বৃষ্টির ছাঁট লাগার ফলেই হয়তো শরীরটা কাবু হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সে কাজ ফেলে বাসায় ফিরে এলো।
ঝুমা তখন ড্রয়িং রুমে বসে ল্যাপটপে তার কলেজের অ্যাসাইনমেন্টের নম্বর জমা করছিল। দরজা খোলার শব্দে সে একবার তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার ল্যাপটপের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। ইমন কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে সোজা শোবার ঘরে ঢুকে গেল।
ঘণ্টাখানেক পার হয়ে গেলেও ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঝুমার খটকা লাগল। ইমন বাড়ি ফিরলেই তো হয় টিভির সাউন্ড বাড়াবে, নয়তো কফি বানানোর জন্য রান্নাঘরে এসে খটখট শব্দ করবে। এত শান্ত কেন লোকটা?
ঝুমা ল্যাপটপ বন্ধ করে আস্তে করে শোবার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের ভেতর লাইট নেভানো, শুধু জানালার বাইরে থেকে আসা আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে ইমন বিছানায় গা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। তার গায়ে একখানা মোটা কাঁথা।
ঝুমা দরজার ফ্রেম ধরে একটু ইতস্তত করল। তারপর খুটখুট করে ঘরের ভেতরে ঢুকল। খাটের কাছে গিয়ে সে নিচু হয়ে দেখল, ইমনের চোখ দুটো বন্ধ, কপালে আর মুখে ঘামের বিন্দু। নিঃশ্বাস পড়ছে খুব দ্রুত।
"ইমন?" ঝুমা ডাকল।
কোনো জবাব নেই। ঝুমা ইতস্তত করে নিজের ডান হাতটা আস্তে করে ইমনের কপালে রাখল। স্পর্শ করতেই ঝুমা চমকে হাত সরিয়ে নিল—শরীরের উত্তাপ যেন আগুনের মতো জ্বলছে!
"এত তেজ জ্বর!" ঝুমা বিড়বিড় করে উঠল। তার মনের ভেতর হুট করেই একটা অজানা ভীতি আর ব্যাকুলতা কাজ করতে শুরু করল। সব রাগ, সব ঝগড়া যেন সেই মুহূর্তেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।
ঝুমা দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে এক বাটি ঠান্ডা পানি আর একটা পরিষ্কার সুতির রুমাল নিয়ে এলো। খাটের একপাশে বসে সে রুমালটা পানিতে ভিজিয়ে ইমনের কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল।
ইমন জ্বরের ঘোরে একটু চোখ পিটপিট করে তাকাল। আবছা আলোয় ঝুমার চিন্তিত মুখটা দেখে সে বিড়বিড় করে বলল, "তুমি... তুমি এখানে কী করছ? সরো... আমার কাছে আসতে হবে না..."
"চুপচাপ শুয়ে থাকো তো!" ঝুমা কড়া গলায় কিন্তু অতি যত্নে বলল, "বেশি কথা বলবে না। গায়ে একশো তিন জ্বর তুলে বসে আছ, আবার ধমকানো হচ্ছে!"
ইমন আর প্রতিবাদ করার শক্তি পেল না। সে চুপচাপ চোখ বন্ধ করল। ঝুমা একটানা এক ঘণ্টা ধরে পরম যত্নে ইমনের মাথায় জলপট্টি দিয়ে গেল। প্রতিটি মুহূর্তে সে ইমনের কপাল থেকে ঘাম মুছে দিল, ভিজা রুমাল বদলে দিল। ইমনের চুলে ঝুমার হাতের আঙুলগুলো যখন বিলি কেটে দিচ্ছিল, ইমনের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। সে চোখ বন্ধ রেখেই অনুভব করছিল—এই ত্যাড়ামেড়ো, ঝগড়ুটে মেয়েটার হাত দুটো কতটা নরম আর তার ছোঁয়ায় কতটা মায়া লুকিয়ে আছে।
রাত সাড়ে দশটার দিকে ইমনের শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমল। সে চোখ মেলে দেখল, ঝুমা খাটের পাশে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে, তার মাথাটা ইমনের হাতের কাছে বিছানার ওপর ঢলে পড়েছে। মেয়েটা সেবা করতে করতে নিজেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ইমন আস্তে করে নিজের হাতটা বাড়াল। তার আঙুলগুলো স্পর্শ করল ঝুমার গালের একপাশে ছড়ানো চুলগুলোকে। ইমন খুব সাবধানে চুলগুলো ঝুমার কানের পেছনে গুঁজে দিল। ঝুমার ঘুমান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ইমনের বুকের ভেতর এক অবাধ্য ভালোবাসার ঢেউ খেলে গেল।
"এত অহংকার তোমার ঝুমা, অথচ ভেতরে এত মায়া রাখো কোথায়?" ইমন মনে মনে বলল।
ইমন সাবধানে বিছানা থেকে নেমে ঝুমাকে কোলে তুলে নিতে গেল। কিন্তু হাত ছোঁয়াতেই ঝুমার ঘুম ভেঙে গেল।
চোখ মেলেই ইমনের এত কাছে নিজের মুখ দেখে ঝুমা ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে চট করে নিজের পোশাক গুছিয়ে নিয়ে গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, "তোমার... তোমার জ্বর নেমেছে? এখন কেমন লাগছে?"
ইমন একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে ঝুমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আগের সেই ঔদ্ধত্য নেই, আছে এক অচেনা গভীরতা। সে হালকা গলায় বলল, "জ্বর কমেছে। তুমি... সারা রাত জেগে এসব করার দরকার ছিল না।"
ঝুমা আবার নিজের আগের রাগী রূপটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল, "আমি কোনো শখে করিনি! কালকে তোমার কিছু হয়ে গেলে তোমার বাড়ির লোক এসে আমাকে দায়ী করত। বলত আমি জামাইয়ের যত্ন নিইনি। তাই করেছি!"
ইমন একধাপ এগিয়ে এসে ঝুমার খুব কাছে দাঁড়াল। ঝুমার চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, "তাই? শুধু লোকদেখানো যত্ন? নাকি ভেতরে ভেতরে বরটার জন্য একটু কষ্ট হচ্ছিল ম্যাডাম?"
ঝুমার মুখ লাল হয়ে উঠল। সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে বলল, "কিসের কষ্ট? তোমার মতো ত্যাড়ামেড়ো লোক এক মাস হাসপাতালে থাকলেও আমার কিছু যায় আসে না! মুখ সামলে কথা বলবে ইমন চৌধুরী!"
"তাই নাকি?" ইমন আরও একটু কাছে এলো, ঝুমার থুতনিটা এক আঙুলে ধরে নিজের দিকে ফেরাল। "তাহলে আমার কপালে হাত রাখার সময় তোমার হাত দুটো কাঁপছিল কেন ঝুমা?"
ঝুমা ইমনের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল। তার বুকটা তখন দড়াম দড়াম করে পিটছে। মিথ্যা ঢাকতে সে আবার চিৎকার করে উঠল, "বাজে কথা বন্ধ করো! কাল সকালের মধ্যে সুস্থ হয়ে নিজের কাজ নিজে করবে, আমাকে কাজের লোক মনে করবে না!"
ঝুমা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে সে একবার পেছনে ফিরে তাকাল। ইমন তখনও তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসছে। সেই হাসিতে কোনো ঠাট্টা ছিল না, ছিল এক বিজয়ের আনন্দ—যে বিজয়ে ঝুমার লুকিয়ে রাখা অনুভূতির পর্দা একটু হলেও সরে গেছে।
ইমনের জ্বর কমে গেলেও ঘরের ভেতরের আবহাওয়া স্বাভাবিক হলো না। বরং দুজনের অহংকার আর অনুভূতির লড়াইটা আরও তীব্র হয়ে উঠল। সেই রাতে কপালে জলপট্টি দেওয়ার কথা মনে উঠলেই ঝুমার গাল লাল হয়ে যেত, আর সেটা ঢাকতেই সে ইমনের সাথে আরও বেশি ত্যাড়ামি শুরু করত। ইমনও কম যায় না; সে ঝুমার এই ছটফটানি বেশ উপভোগ করছিল, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
শুক্রবার বিকেলে ইমনের কয়েকজন বন্ধু হঠাৎ করেই তাদের ফ্ল্যাটে এসে হাজির। ইমন আগে থেকে ঝুমাকে কিছু জানায়নি।
রান্নাঘরে কাজের বুয়া না থাকায় ঝুমাকে একাই পাঁচজনের জন্য চা আর নাস্তা বানাতে হলো। ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই ইমনের বন্ধু তানভীর হেসে উঠে বলল, "ভাবী! আপনার কথা ইমনের মুখে অনেক শুনেছি। কিন্তু ও যে এত বড় একখানা রত্ন লুকিয়ে রেখেছে, তা তো জানতাম না!"
ঝুমা মুখে বানানো হাসি ফুটিয়ে ট্রেইটা টেবিলে রাখল, "তাই নাকি? ও বুঝি আমার কথা বলে?"
"বলবে না মানে?" তানভীরের পাশে বসা সিয়াম ফোঁড়ন কাটল, "ইমন তো বলে আপনি নাকি ভীষণ শান্ত আর চুপচাপ স্বভাবের। একদম ঘরোয়া লক্ষ্মী মেয়ে!"
কথাটা শোনামাত্র ঝুমার হাসির আড়ালে চোখের মনি দুটো যেন বিষাক্ত হয়ে উঠল। সে চট করে ইমনের দিকে তাকাল। ইমন তখন কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, বন্ধুদের কথা শুনে তার গলায় প্রায় কফি আটকে যাওয়ার দশা!
ঝুমা ট্রেটা রেখে ইমনের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার কাঁধে এক হাত রেখে মিষ্টি কিন্তু অতি ভীতিজনক গলায় বলল, "ওহ, সত্যি? ইমন তোমাকে বলেছে আমি খুব শান্ত? আসলে ও তো আমাকে একদম চেনে না। তুমি জানো তানভীর, ও নিজেই এত বড় মিষ্টি ছেলে যে আমি ওর সামনে কথা বলার সুযোগই পাই না!"
ইমন শুকনো এক ঢোক গিলে ঝুমার হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, "ঝুমা, তুমি চা-টা দেখে এসো তো..."
"আহা, এত তাড়া কিসের জামাই?" ঝুমা এবার আরও একধাপ এগিয়ে ইমনের পাশে সোফায় বসে তার হাতে হাত রাখল। "বন্ধুরা এসেছে, একটু গল্প করি। তোমার সেই গুণগুলোর কথা বলি? যেমন ধরো, কাল রাতে আমার বরটা জ্বরের ঘোরে কীভাবে বাচ্চা ছেলের মতো আমার হাত ধরে কাঁদছিল?"
সব কটা বন্ধু একসাথে হেসে উঠল। ইমনের মুখ মুহূর্তে লাল হয়ে গেল রাগে আর লজ্জায়। সে দাঁতে দাঁত চেপে ঝুমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, "ঝুমা, বাড়াবাড়ি করছ।"
"কই না তো!" ঝুমা নিষ্পাপ চোখে তাকাল।
বন্ধুরা ঘণ্টাখানেক থেকে আড্ডা দিয়ে বিদায় নিল। তারা দরজা দিয়ে বের হতে না হতেই ইমন সজোরে দরজাটা আটকে দিল। খিল লাগানোর শব্দটা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল।
ইমন ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝুমার দিকে এগোতে লাগল। ইমনের চোখের দৃষ্টিতে তখন চরম রাগ আর জেদ জ্বলজ্বল করছে।
"বন্ধুদের সামনে এসব ফাজিলমির মানে কী ছিল?" ইমনের গলা অস্বাভাবিক নিচু আর গম্ভীর।
ঝুমা হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে সোফায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল, "তুমি বন্ধুদের কাছে আমাকে 'শান্ত-সৃষ্ট লক্ষ্মী মেয়ে' বলে বানিয়ে বানিয়ে বানিয়ে প্রচার করছ কেন? আমি যা, আমি তাই! তোমার এই মিথ্যে ড্রামা আমি সহ্য করব না।"
"আমি তোমাকে নিয়ে কোনো ড্রামা করিনি," ইমন ঝুমার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গলার স্বর চড়াল। "ওরা জানতে চেয়েছিল তুমি কেমন, আমি ঝামেলা এড়াতে শুধু একটা সাধারণ কথা বলেছি। কিন্তু তোমার তো অভ্যাসই হয়ে গেছে সব জায়গায় আমাকে ছোট করা, আমাকে অপমান করা!"
"আমি তোমাকে ছোট করেছি?" ঝুমা চ্যাঁচিয়ে উঠল। "তুমি আমাকে পছন্দ করো না, আমি জানি! এই বিয়েটা তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা-ও জানি! তাহলে সবার সামনে কেন ভালো বরের অভিনয় করতে যাও? কেন কাল রাতে আমার সাথে ড্রায়িং রুমে অসভ্যতামি করছিলে?"
"অসভ্যতামি?" ইমনের সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে এক ঝটকায় ঝুমার দুটো হাত শক্ত করে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
"হাত ছাড়ো ইমন!" ঝুমা ছাড়ানোর জন্য হাত মোচড়াতে লাগল, কিন্তু ইমনের হাতের গ্রিপ লোহাকঠিন।
"তুমি সত্যি একটা হিংসুটে, অহংকারী মেয়ে ঝুমা!" ইমনের নিঃশ্বাস ঝুমার কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। "তুমি ভাবো শুধু তোমারই জেদ আছে? শুধু তোমারই অনুভূতি আছে? তুমি আমার যত্ন নাও, আবার বন্ধুদের সামনে আমাকে অপমান করো। তুমি কী চাও ঝুমা? কী পাও আমাকে এত কষ্ট দিয়ে?"
"আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই! কারণ আমি তোমাকে ঘৃণা করি!" ঝুমা চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল, যদিও তার নিজের চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। "ছাড়ো আমাকে! আমি তোমার এক মুহূর্তের ছোঁয়াও সহ্য করতে পারছি না!"
"ঘৃণা করো আমাকে?" ইমনের চোখের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটা যেন এবার ফেটে পড়ল।
"হ্যাঁ! ঘৃণা করি, ঘৃণা করি—"
ঝুমার মুখের বাকি কথাগুলো আর বের হতে পারল না। অতিরিক্ত রাগে, জেদে আর জমে থাকা একরাশ অবাধ্য ভালোলাগার চরম বিস্ফোরণে ইমন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝুঁকে এসে সজোরে, তীব্র আবেগে ঝুমার নরম ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের মধ্যে চেপে ধরল।
ঝুমা মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের পাতা দুটো বড় বড় হয়ে স্থির হয়ে গেল। সে হাত দিয়ে ইমনের বুক ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ইমনের দখল ছিল বাঁধনহারা। সেই চুমুতে কোনো করুণা ছিল না, ছিল না কোনো তোষামোদ—ছিল কেবল দুজন ত্যাড়ামেড়ো মানুষের ভেতরের লুকিয়ে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা, অহংকার আর এক তীব্র ভালোবাসার অধিকার দখলের লড়াই।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেল। ঝুমার হাত দুটো ইমনের শার্টের কাপড়ে আঁকড়ে ধরে রইল। তার সমস্ত শক্তি যেন চুরমার হয়ে গেল ইমনের সেই এক উত্তপ্ত স্পর্শে।
ইমন যখন আস্তে করে মুখ সরিয়ে নিল, দুজনেরই বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। ইমনের ঠোঁটে তখনও ঝুমার ভেজা অনুভূতির ছোঁয়া, আর ঝুমার ঠোঁট দুটো ভয়ে ও ভালোবাসার কাঁপুনিতে থরথর করে কাঁপছে।
ইমন ঝুমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাঁপাচ্ছিল। সে কোনো কথা বলল না। ঝুমাকে ছেড়ে দিয়ে সে এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির চাবিটা নিয়ে সজোরে দরজা আটকে বেরিয়ে গেল।
ঝুমা দেয়াল ধরে ধসে বসে পড়ল মেঝের ওপর। তার হাত দুটো নিজের ঠোঁটের ওপর চলে গেল। ঠোঁটে তখনও ইমনের স্পর্শের তীব্র উত্তাপ। সে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। এটা কি রাগ, নাকি জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটাকে মেনে নেওয়ার ভয়—ঝুমা তা বুঝতে পারল না।
সেই উত্তাল রাতের পর দুটো দিন কেটে গেল। ইমন সে রাতে আর ঘরে ফেরেনি; বন্ধুদের ফার্মহাউসে কাটিয়ে পরদিন সোজা অফিসে চলে গিয়েছিল। অন্যদিকে, ফ্ল্যাটের বন্ধ ঘরে ঝুমা একা একা নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করেছে। তার ঠোঁটে এখনও ইমনের সেই তীব্র, অবাধ্য স্পর্শের উত্তাপ লেগে আছে। আয়নায় নিজের চেহারা দেখলে ঝুমার মনে হতো—যে ঝুমাকে সে সারা জীবন চিনে এসেছে, সেই জেদি মেয়েটা যেন ওই এক চুমুতেই চুরমার হয়ে গেছে।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় ইমন ঘরে ফিরল। তার পরনে অফিসিয়াল শার্ট, টাইটা খানিকটা আলগা করা। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, আর চোখে সেই আগের রাগের বদলে ফুটে উঠেছে এক গভীর ইতস্তত ভাব।
ঝুমা তখন ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে বই পড়ছিল। ইমনের দরজার লক খোলার শব্দে সে শিউরে উঠল, কিন্তু বই থেকে মুখ তুলল না। ইমন ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকল। দুজনের মাঝখানে নীরবতার এমন এক দেয়াল তৈরি হলো, যা আগের যেকোনো ঝগড়ার চেয়েও অনেক বেশি ভারী, অনেক বেশি দমবন্ধ করা।
ইমন ব্রিফকেসটা টেবিলে রেখে ঝুমার দিকে তাকাল। ঝুমার শান্ত, বিষণ্ন মুখটা দেখে ইমনের বুকের ভেতর অপরাধবোধের একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। সে তো রাগ সামলাতে না পেরে নিজের অধিকার চাপিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু মেয়েটার মন কি সে জয় করতে পেরেছে?
ইমন একটু ইতস্তত করে সোফার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল, "ঝুমা... খেয়েছ?"
ঝুমা বইয়ের পাতা উল্টাল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
ইমন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু মাঝপথে থেমে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল। "ঝুমা, পরশু রাতের ঘটনাটার জন্য আমি... আমি দুঃখিত। আমার ওরকম করা উচিত হয়নি। আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম।"
ঝুমা বইটা বন্ধ করে কোলের ওপর রাখল। সে আস্তে করে মাথা তুলে ইমনের দিকে তাকাল। তার চোখে আগের সেই বিষাক্ত রাগ ছিল না, বরং সেখানে থিকথিক করছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা আর আক্ষেপ।
"তুমি কি সত্যিই দুঃখিত ইমন?" ঝুমা শান্ত কিন্তু কাঁপানো গলায় বলল। "নাকি তোমার মনে হয়েছে কাজিন বলে, বর বলে তুমি আমার ওপর নিজের সব জোর খাঁটাতে পারো?"
ইমন চট করে এগিয়ে এলো। ঝুমার একদম সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সে। ঝুমার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, "না ঝুমা! খোদার কসম, আমি কোনো জোর খাঁটাইনি! আমি শুধু... আমি শুধু নিতে পারছিলাম না যে তুমি আমাকে অতটা ঘৃণা করো! তোমার ওই 'ঘৃণা করি' শব্দটা আমার সহ্য হয়নি!"
ইমনের এই রূপটা ঝুমার কাছে একদম অচেনা। সবসময় ত্যাড়ামি করা, অহংকারী ইমনের চোখে আজ পরিষ্কার কাকুতি-মিনতি। ঝুমা নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না। সে এক দৃষ্টিতে ইমনের দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি কি সত্যি ভাবো আমি তোমাকে ঘৃণা করি?" ঝুমা বিড়বিড় করে বলল, তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। "যদি ঘৃণা করতাম, তবে তোমার জ্বরের রাতে সারা রাত জেগে জলপট্টি দিতাম না। যদি ঘৃণা করতাম, তবে তোমার ওই অবাধ্য চুমুর পর আমি এই ঘর ছেড়ে নিজের বাপের বাড়ি পালিয়ে যেতাম।"
কথাগুলো শুনে ইমনের বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে ঝুমার চোখের জলের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঝুমা চোখটা মুছে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল, "তুমি আমাকে কোনো দিন বুঝতে চাওনি ইমন। তুমি ভেবেছ আমি শুধু ঝগড়া করতেই ভালোবাসি। অথচ আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি আমাকে একটু সম্মান দাও, একটু ভালোবাসা দাও... কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়া।"
ইমন ঝুমার মুখটা নিজের দুহাতে তুলে ধরল। তার কাঁচা-পাকা ছাঁটের দাড়ি ঝুমার গালে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। ইমনের চোখের দৃষ্টিতে তখন শত সহস্র অনুভূতির দোলাচল।
"আমি বোকা ঝুমা, আমি বড্ড বড় বোকা," ইমন ঝুমার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব আলতো গলায় বলল। "তাকাও আমার দিকে। আজ আর কোনো ত্যাড়ামি নয়, কোনো জেদ নয়। আমি তোমাকে বলছি... আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। প্রথম দিন যখন তুমি কাজী অফিসে রাগ করে বসেছিলে, সেই দিন থেকেই এই রাগটা আমার বুকে বাসা বেঁধেছে।"
ঝুমার বুকের ভেতর এতদিনের জমে থাকা সব বরফ এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে ইমনের মুখে সে এই কথাটা শুনছে।
"তুমি সত্যি বলছ?" ঝুমার কণ্ঠস্বর বুজে এলো।
"একদম সত্যি," ইমন ঝুমার চোখের জল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে পরম মমতায় মুছে দিল। তারপর খুব মিষ্টি করে একটু হেসে বলল, "তবে ম্যাডাম, আপনার রাগের যা বহর, তাতে ভালোবাসা স্বীকার করতে গিয়ে আমার প্রাণ যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল!"
ঝুমা কেঁদে ফেলেও হেসে ফেলল। সে ইমনের বুকে একটা মৃদু কিল মেরে বলল, "ত্যাড়ামেড়ো লোক একটা! সবসময় আমার ওপর সব দোষ চাপানো!"
ইমন আর কোনো কথা না বলে ঝুমাকে টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ঝুমাও এবার আর পিছু হটল না। সে ইমনের শার্টের কাপড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার চওড়া বুকে মুখ লুকাল। এতদিনের সব ঝগড়া, সব জেদ আর অহংকার যেন এক নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল। দুটো ক্ষ্যাপাটে মনের মাঝে নামল প্রশান্তির দখিন হাওয়া।
ইমনের বুকের উষ্ণতায় মুখ লুকিয়ে ঝুমা যখন কেঁদে ফেলল, তখন তার ভেতরের সব অভিমান যেন গলে জল হয়ে ভেসে যাচ্ছিল। ইমনের শক্ত দুটো হাত ঝুমার পিঠ পেঁচিয়ে তাকে আরও নিবিড় করে টেনে নিল। এতদিন যে অহংকার আর জেদের দেয়াল দুজনকে আলাদা করে রেখেছিল, এক মুহূর্তে তা চুরমার হয়ে গেল।
ইমন ঝুমার চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিল। ঝুমার শ্যাম্পুর সুবাস আর তার গায়ের আলতো গন্ধ ইমনের স্নায়ুগুলোকে এক অদ্ভুত নেশায় আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। ইমন আস্তে করে ঝুমাকে একটু সরিয়ে দাঁড় করাল, তারপর তার দুগালে হাত রেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটাল।
"এখনও কাঁদছ?" ইমন নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঝুমার চোখের কোণ মুছে দিয়ে বলল, "তোমার এই চোখে কেবল রাগই মানায় ম্যাডাম, পানি মানায় না।"
ঝুমা ভেজা চোখেই ইমনের দিকে তাকিয়ে একটু ভেংচি কাটল, "কাঁদছি না তো! চোখ দিয়ে অমূল্য রত্ন ঝরছে, তুমি তা বোঝার মতো অত বুদ্ধিমান নাও।"
"তাই নাকি?" ইমন মুচকি হেসে ঝুমার একদম কাছাকাছি চলে এলো। ইমনের চোখের সেই গভীর দৃষ্টিতে এখন কেবল তীব্র ভালোবাসা আর এক অবাধ্য অধিকারবোধ। "তোমার এই অমূল্য রত্ন সামলানোর দায়িত্ব যদি আমাকে সারাজীবনের জন্য দেওয়া হয়, তবে আমি মোটেও মানা করব না।"
ঝুমার বুকের ভেতরটা আবার দ্রুত দড়াম দড়াম করে পিটতে লাগল। কিন্তু এবার সেই স্পন্দনে কোনো ভয় বা রাগ ছিল না, ছিল কেবল এক তীব্র মিষ্টি রোমাঞ্চ। ইমন ঝুমার হাত ধরে তাকে টেনে দাঁড় করাল। তারপর এক ঝটকায় ঝুমাকে কোলে তুলে নিল।
"ইমন! কী করছ? নামাও আমাকে!" ঝুমা মৃদু চিৎকার করে ইমনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"না, আজ আর কোনো কথা নয়। আজ আর কোনো সীমানা প্রাচীর থাকবে না," ইমন গম্ভীর গলায় কিন্তু গভীর মমতায় বলল।
ইমন ধীরপায়ে ঝুমাকে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে গেল। ঘরের লাইটের আবছা আলোয় পরিবেশটা এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ নিয়েছে। ইমন খাটের মাঝখানে রাখা সেই নীল রঙের স্কেল আর বালিশের সীমানা প্রাচীর এক টানে মেঝেতে ফেলে দিল। ঝুমাকে পরম যত্নে খাটের নরম বিছানায় শুইয়ে দিল সে।
ঝুমা খাটের ওপর শায়িত অবস্থায় ইমনের দিকে তাকিয়ে রইল। ইমনের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, তার বুকের দ্রুত ওঠানামা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ইমন বিছানায় ঝুমার পাশে কুনোয়ের ওপর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। তার এক হাত দিয়ে ঝুমার কপালে ছড়িয়ে থাকা উস্কোখুস্কো চুলগুলো সরিয়ে দিল।
"আজ আর পালিয়ে যাবে না তো ঝুমা?" ইমনের গলাটা এবার ভারী আর তীব্র অনুরাগে ভরা।
ঝুমা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নিজের হাতটা বাড়িয়ে ইমনের শক্ত চিবুক ছুঁয়ে দিল। তার আঙুলের ছোঁয়া পেয়ে ইমনের চোখ দুটো বুজে এলো এক অচেনা সুখে। ঝুমা আলতো গলায় বলল, "তুমি যদি এভাবে আমাকে ধরে রাখো, তবে আমি পালাব কী করে?"
কথাটা শেষ হতেই ইমন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝুমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ইমনের ঠোঁট দুটো পরম তৃষ্ণায় ঝুমার কপালে, দুচোখের পাতায় আর গালে নেমে এলো। প্রতিটি স্পর্শে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ভালোবাসার আকুলতা।
ঝুমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সে নিজের চোখ বন্ধ করে ইমনের চওড়া কাঁধ আঁকড়ে ধরল। ইমনের ঠোঁট যখন ঝুমার ভেজা ঠোঁট দুটোকে আবার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিল, এবার সেই চুমুতে কোনো ক্ষোভ বা জেদ ছিল না—ছিল কেবল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আর গভীর এক সুরের মেলবন্ধন।
কামরার ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেন থেমে গেছে। জানালার বাইরে বইতে থাকা হালকা হাওয়া পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে তাদের স্পর্শ করে যাচ্ছিল। দুজন মানুষ, যারা এতদিন একে অপরকে বিষ মনে করত, তারা আজ ভালোবাসার পরম অমৃতে ডুবে গেল। ইমনের ভালোবাসার গভীরতায় ঝুমা নিজেকে হারিয়ে ফেলল সম্পূর্ণভাবে। ইমনের বাহুডোরে ঝুমা খুঁজে পেল তার জীবনের আসল আশ্রয়স্থল, আর ইমনের কাছে ঝুমা হয়ে উঠল তার অস্তিত্বের পুরোটা জুড়ে থাকা এক একমাত্র নারী।
রাতটা গড়িয়ে চলল নিঃশব্দে, আর সেই নীরবতায় রচিত হলো তাদের দুজনের ভালোবাসার প্রথম গভীরতম অধ্যায়।
ভোরের নরম আলো যখন জানালার পর্দা টপকে বিছানায় এসে পড়ল, ইমনের ঘুম ভাঙল আগে। তার বাহুর ওপর মাথা রেখে ঝুমা তখনও শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। শান্ত সুন্দর ঘুমন্ত মুখটা দেখে ইমনের বুকে এক অপার্থিব তৃপ্তি নেমে এলো। সে আলতো করে ঝুমার কপালে একটি চুমু এঁকে দিল।
ঝুমা চোখ মেলে তাকাল। সামনে ইমনের সেই মিষ্টি হাসিমাখা মুখ দেখে সে লজ্জা পেয়ে চাদরটা নিজের গাল পর্যন্ত টেনে নিল। ইমনের বুকের সুবাস, গত রাতের সেই গভীর ভালোবাসার রেশ—সবকিছুই তাকে এক অচেনা লজ্জায় রাঙিয়ে দিচ্ছিল।
"এখন আর চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে লাভ নেই ম্যাডাম," ইমন ঝুমার দিকে ঝুঁকে চাদরটা একটু সরিয়ে দিল, "গত রাতে তো খুব সাহস দেখাচ্ছিলে, এখন এত লজ্জা কিসের?"
"ইমন! চুপ করো তো!" ঝুমা ইমনের বুকে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে উঠে বসতে চাইল। কিন্তু ইমন তাকে এক টানে আবার নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল।
"আজ কোথাও যাওয়া হবে না, কোনো কাজ নেই। আজ সারাটা দিন শুধু আমার বউয়ের সাথে কাটাব," ইমন ঝুমার কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল।
ঝুমা ইমনের বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "হ্যাঁ, আর সারাজীবন এভাবেই ত্যাড়ামি করে কাটাব, তাই না?"
"না," ইমন ঝুমার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল, "এখন থেকে ত্যাড়ামি শুধু ভালোবাসায় হবে। ঝগড়া হবে, আবার ভালোবাসাও হবে।"
দুপুরের দিকে ইমনের আম্মা আর ঝুমার আম্মা হঠাৎ এসে হাজির হলেন। তারা দরজায় বেল বাজাতেই ইমন আর ঝুমা তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হলো।
দরজা খুলতেই শাশুড়ি ইমনের আম্মা ঝুমার হাত ধরে মিষ্টি হেসে বললেন, "কী রে তোরা দুজন আবার ঝগড়া বাঁধিয়ে বসে আছিস নাকি? চেহারা এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কেন?"
ঝুমা আর ইমন দুজন দুজনের দিকে তাকাল। এবার আর তাদের হাসির আড়ালে কোনো বিষ ছিল না, ছিল না কোনো মিথ্যে অভিনয়।
ইমন এগিয়ে গিয়ে ঝুমার কাঁধে এক হাত রাখল। পরম ভালোবাসায় ঝুমাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "আম্মা, আপনার মেয়ে তো আর আগের মতো ঝগড়ুটে নেই। ও এখন একদম লক্ষ্মী বউ হয়ে গেছে!"
ঝুমা এবার রেগে যাওয়ার বদলে ইমনের কোমর চেপে ধরে একটু চিমটি কেটে মিষ্টি হেসে বলল, "আর আপনার ছেলেও কিন্তু একদম সোজা হয়ে গেছে আম্মা! এখন আর স্কেল দিয়ে বালিশের বর্ডার বানায় না।"
দুই বাড়ির মুরুব্বিরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন। তারা বুঝতে পারলেন, তাদের দেওয়া এই সিদ্ধান্ত আর দুই ক্ষ্যাপাটে মনের জোর করে করিয়ে দেওয়া বিয়েটা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়নি।
বিকেলের সূর্য যখন রক্তিম আলো ছড়িয়ে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছিল, ইমন আর ঝুমা তাদের ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হাতে দুটো ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। হালকা হাওয়া এসে ঝুমার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছিল, আর ইমন এক হাতে ঝুমার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে সাঁটিয়ে রেখেছিল।
"ঝুমা," ইমন কফিতে চুমুক দিয়ে বলল।
"হুম?"
"তুমিও কি ভেবেছিলে আমাদের এই বিয়েটা একদিন এত সুন্দর একটা ভালোবাসায় পরিণত হবে?"
ঝুমা ইমনের কাঁধে মাথা রেখে দূরের লালচে আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "না, ভাবিনি। আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়। কিন্তু এখন বুঝি, তুমি আমার জীবনের সেই বৃষ্টি—যা আমার সব অভিমান ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছে।"
ইমন ঝুমার কপালে আবার নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। ত্যাড়ামি, রাগ আর অহংকারের মোড়কে শুরু হওয়া একটা ভালোবাসার গল্প আজ পূর্ণতা পেল। তাদের জীবনের ক্যানভাসে আঁকা হলো এক নতুন সূর্যোদয়—যেখানে আর কোনো সীমানা নেই, আছে শুধু দুজন মানুষের একে অপরের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আর এক চিরন্তন রূপকথা।
....