৬ বছর ধরে যাকে ভালোবেসে এসেছি তারই বাসরঘর নিজ হাতে সাজাতে হচ্ছে আমাকে। চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সারাঘর ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে।
বাসরঘর সাজিয়ে বের হতে নিয়ে শক্ত পুরুষালি বুকে ধাক্কা খেয়ে মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।
মাথায় হাত দিয়ে তাকিয়ে দেখি সাফিন ভাই দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে ভয়ে কুঁকড়ে উঠলাম। আমার জীবনেএই মানুষটিকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই।
- খেয়েছিস?
তার গম্ভীর কন্ঠে চুপসে খেলাম।
- ছ্যাকা খেয়েই তো কুল পাই না আবার কি খাবো
মিনমিনে কন্ঠে বলতে সাফিন ভাই ধমকে উঠে।
- কিছু বললি?
- ককই না তো। হিহি
তুতলিয়ে মেকি হেঁসে চলে যেতে নিলে সে খপ করে আমার হাতদুটো ধরে বলে
-কোথায় যাচ্ছিস? আমার কথা শেষ হয়েছে?
- হ্যা বলো
আচানক সে আমার হাতদুটো টান দিতেই আমি তার বুকে আঁচড়ে পড়লাম।
সাফিন ভাই কপাল কুচকে বলল
-কেঁদেছিস কেনো?
তার প্রশ্নে বুক কেঁপে উঠলো। সে যদি সব জানতে পারে আমাকে তো জেন্ত কবর দিবে। আমি ঢোক গিলে বললাম
কই না তো কাঁদব কেনো?
সত্যি কাদছিস না?
আমি মাথা দু'দিকে দুলাতেই সে আমায় ছেড়ে দিলো।
আমি একদৌড়ে সেখান থেকে চলে গেলাম। সেখানে থাকলে যে আমারই বিপদ।
আমার পুরো নাম অবন্তিকা আহমেদ অরীন। আমাদের যৌথ পরিবার। দাদা দাদি গত হয়েছেন অনেক বছর হলো। আমার বাবারা দুই ভাই। সে ছোট।
আমার বড় চাচা মোহাম্মদ নাসিম। সে পুলিশ। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে সায়মন আহমেদ ও ছোট ছেলে সাফিন আহমেদ। সায়মন ভাই আমার বাবার সাথে ব্যবসায় সাহায্য করে। কিন্তু সাফিন ভাইয়ের ঢাকাতে নিজের আলাদা ব্যবসায় আছে। উনি সেখানেই থাকে তবে মাঝে মধ্যে আসেন এক দুদিন থেকে আবার চলে যান।
আর আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। সবে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি।
বাড়িতে হট্টগোল শুরু হয়েছে। বউ এসেছে বউ এসেছে। বউকে নিয়ে বসানো হয়েছে সায়মন ভাইয়ের বরাদ্দকৃত রুমে। বউয়ের নাম রিয়া দেখতে মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর। এজন্যই বুঝি সায়মন ভাই আমায় ভুলে গেলেন। কান্নায় সেখান থেকে চলে আসতে নিলেই দেখা হয় হাসিখুশি সায়মন ভাইয়ের সাথে। সে আমায় দেখে মিইয়ে গেল। এগিয়ে আমার কাছে এসে গালেহাত ছুঁইয়ে বলে
তুই আমায় ভুলে যা অরী। দেখিস তুই অনেক ভালো ছেলে পাবি। আমি তোকে সত্যিই ভালোবাসতাম কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে তোকে কষ্ট দিতে হলো।
আমি তার হাতদুটো ঝাড়া দিয়ে বললাম
- মিথ্যে।
তুমি আমায় ঠকিয়েছো সায়মন ভাই। শুধু শুধু পরিস্থিতির দোহায় দিয়ে নিজের করা অন্যায় ঢেকে দিও না। আমি তোমায় ঘৃণা করি বুঝলে খুব ঘৃণা করি।
বলে সেখন থেকে চলে গেলাম।
সত্যিই তো সায়মন ভাই আমায় ঠকিয়েছে। আমাদের ৫ বছরের সম্পর্ক ছিল। তাকে আমি ভালোবেসেছি ৭ বছর ধরে। সে আমায় কথা দিয়েছিল আমাকেই বিয়ে করবে তার বউ বানাবে। কিন্তু শেষমেশ আমাকে ঠকালো। চাচীর সাথে যখন মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা তখন কত আকুতি মিনতি করেছি সবাইকে সব বলে দেও তুমি যেও না। তখন সে বলল
ধির বোকা দেখতে গেলেই বিয়ে হয়ে যায় নাকি।
তখন আমাকে আশ্বাস দিয়ে মেয়ে দেখতে গেলো। আমার চেয়ে দ্বিগুন রূপবতী মেয়ে দেখে সব ভুলে বসলো।
.
.
.
বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে কাঁদছে অরীন। ঘন্টাখানিক পর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ২ টা ১৫।
ছাঁদে গেলে হয়তো একটু ভালো লাগবে ভেবে রুম থেকে বের হয়ে পা বাড়াল।
দুতলায় ৪ টা রুম। একটা রুম সাফিন ভাইয়ের বরাদ্দকৃত। মাঝমধ্যে এসে সেই রুমেই থাকে। একটা তার ও আরেকটা সায়মন ভাইয়ের। বাকি একটা রুম খালিই পড়ে থাকে।
আর নিচতলায় বড় চাচা -চাচি ও অরীনের বাবা - মা থাকে।
অরীনের পাশের রুমটি খালি তারপরের রুমটা সায়মন ভাইয়ের।
সে রুন থেকে বের হয়ে ছাঁদে যেতে নিবে ঠিক তখনি কান্নার শব্দ শুনতে পায়। উল্টো ঘুরতেই চোখ যায় সায়মন ভাইয়ের রুমের দিকে। সে কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে যায় রুমের সামনে। শুনতে পায় মেয়েলি কান্না ও পুরুষালি সীৎকার।
সায়মন তার নব বধূর দেহে নিজের সুখ খুঁজতে মরিয়া।
অরীনের বুক ধ্বক করে উঠলো। চোখের পানি মুছে চলে গেল ছাঁদে।
উম্ম উমম - শব্দটি জোড়ালো হলো। পুরো রুম অন্ধকারে ঘেরা। দুটো নর-নারীর নিশ্বাসের শব্দ ব্যতীত আর কোনো শব্দ নেই।
অরীন ঘেমে একাকার। সামনে অচেনা লোকটির বুকে নিজের সব শক্তি ব্যয় করে ধাক্কা দিচ্ছে তবে লোকটি টলল না। একইভাবে অরীনের মুখ চেপে আছে।
লোকটি এবার অরীনের আরও কাছে আসলো। লোকটির গরম নিশ্বাস অরীনের ঘাড়ে আঁচড়ে পড়ছে।
অরীন ভয় পেয়ে গেল। হাত কাপছে ধাক্কা দেওয়ার শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। বুক থেকে হাত সরিয়ে আশেপাশে কিছু খুজতে লাগলো।
ততক্ষনে শয়তান লোকটা তার উড়না টেনে খুলে ফেললো।
অরীনের হাতে মাঝারি সাইজের ফুলের টব। উপরওয়ালার নিকট শুকরিয়া আদায় করলো।
লোকটা এবার তার পিঠের চেনে হাত দিতেই সে প্রচন্ড শক্তিতে ফুলের টব দিয়ে লোকটার মাথায় বারি দেয়।
আহহহহ
লোকটা চিৎকার দিয়ে সরে আসলো অরীনের কাছ থেকে।
ঠিক সেই সময় রুমের পাশ কেটে যাচ্ছিল সায়মনের শালি মিতা। মিতা তার ভাইয়ের চিৎকার শুনে দরজা ধাক্কাতে থাকে।
- ভাইয়া আছো? কি হয়েছে তোমার? এই ভাইয়া তুমি কি ভিতরে??
ভাবির বোনের কন্ঠে সময় ব্যয় না করে অরীন দরজা খুলে দেয়। একটু আশা খুজে পায়।
মিতা তার ভাইয়ের পরিবর্তে আপুর ননদকে দেখে চমকে যায়। পরে তার থেকেও বেশি চমকায় অরীনের বিধস্ত অবস্থা দেখে। অরীন তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
.
.
.
.
.
.
.
সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। অরীনও তার ভালোবাসার মানুষটাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো।
পড়ালেখা ও বান্ধবীদের সাথে সময় কাটিয়ে মন হালকা করেছে এখন আর তার খারাপ লাগে না।
এমনকি সায়মন ভাইকে দেখলেও আগের মতো ভালোবাসা কাজ করে না। সে এখন বিবাহিত। তাকে এখন ভালোবাসার নজরে দেখাও পাপ।
সায়মনের বউ রিয়ার সাথে অরীনের বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। রিয়া ভাবী খুবই মিশুক ও ভালো মনের।
সময় পেরিয়ে কিভাবে যে চারমাস কেটে গেলো। বুঝতেই পারলাম না। সাফিন ভাইয়া বিয়ের পরেরদিন চলে গেল। যাওয়ার আগে আমাকে নতুন মোবাইল দিয়ে গেছে। খুব অবাক হয়েছি বটে। তবে আমি খুশিও হয়েছিলাম।
চারমাস পর আবারও সাফিন ভাই এসেছে এবং ভাবীর বাপের বাড়িতে আমাদের পুরো পরিবারকে দাওয়াত দিয়েছে। তাই আজ ভাবীর বাড়ি গিয়েছি।
ভাবীর এক বোন মিতা ও এক ভাই লাবিব। আসার পর থেকেই কেমন বাজে চোখে দেখছিলো।
বারবার আমার জামার দিকে চেয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বাজে বাজে অঙ্গভঙ্গি করছিলো।
আমি খুবই অসস্তি পড়ে অদেখা করার চেষ্টা করলাম।
দুপুরের খাবার খেয়ে ভাবীর বোন মিতার রুমে বসে ছিলাম। তখন মিতা গোসল করছিলো। রুমে বসে থাকতে বোরিং লাগছিল। নিচে মা ও চাচিরা গল্প করছে ভাবলাম তাদের সাথে বসে থাকবো।
এই ভেবে বের হয়ে আসলাম। ঠিক তখনি কেউ আমায় পিছন থেকে মুখ চেপে ধাক্কা দিয়ে রুমের ভিতর ফেলে দিলো।
কিছু বুঝে উঠা আগেই লোকটা দরজা আটকিয়ে দিলো। লোকটাকে দেখার সুযোগও পেলাম না। কিন্তু সন্দেহ করলাম ভাবীর ওই বদমায়েশ ভাই ই হবে।
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
.
বর্তমানে
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। মা আমাকে একহাতে জড়িয়ে অন্য হাত দিয়ে সাফিন ভাইকে কল দিচ্ছে। সাফিন ও সায়মন ভাই বাইরে।
ভাবী একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারায় কালো মেঘে ঢাকা। আমার বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে বসে আছে।
পরিবেশ গুমোট। ভাবীর বাকি কয়েকজন আত্মীয় স্বজন যারা এসেছিলে তাদের মাঝে কানাঘুঁষা হচ্ছে। বাবা লাবিবকে খুব মেরেছে। ভাবীর বাবা মা খুব কষ্টে আটকিয়েছে। চাচাও খুব ক্ষিপ্ত।
ভাবীর মা আমার উপর খুব রেগে আছে। তার বাবা আমার চাচা ও বাবাকে এইসেই বুঝিয়ে ক্ষমা চাইছে বারবার।
ভাবীর মায়ের যেন তা সহ্য হলে না। তার ছেলেকে সবার সামনে মারা হয়েছে এখন স্বামী ক্ষমা চাইছে।
সে রেগে বলে,
আপনারা বারবার আমার ছেলের দোষারোপ করছেন। এক হাতে কখনো তালি বাজে? তারা সেই রুমে গেলো কি করে। নিশ্চয়ই আপনার মেয়েকে আমার ছেলে ধরে বেধে আনেনি। জিজ্ঞেস করেন আপনার মেয়েকে
সে নিজ ইচ্ছেতেই এসেছে। নিজের চরিত্রের কোনো ঠিক নেই এখন আমার ছেলের চরিত্রের দাগ কাটতে চাইছে। চরিত্রহীন মেয়ে কোথাকার।
তার কথাতে আত্মীয় স্বজনরা সাই দিলো।
- আপনার স্পর্ধা কিভাবে হলো এসব বলার?
সাফিনের হুংকারে সবাই ভয় পেয়ে গেলো। সায়মন ও সাফিন বাড়ি ঢুকতেই উনার এমন কথা শুনে রেগে গেলো।
- উচিত কথা বললে গায়ে তো লাগবেই।
ভাবীর ফুপু ব্যঙ্গ করে বলে উঠতেই ভাবী বলল
- প্লিজ ফুপি, মা তোমরা চুপ করো।
সাফিন ভাই তার মায়ের কাছ থেকে সব শুনে কিছুক্ষন নিশ্চুপ থাকলো। আমি তখনো মায়ের বুকে লেপ্টে আছি। নিজেকে কতটা অসহায় লাগছে বলার মত না।
সাফিন ভাই আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে লাবিবের কাছে এসে উড়াধুরা মারতে লাগলো।
সবাই এসে তাকে আটকাতে চেষ্টা করছে কিন্তু কেউ তার শক্তির সাথে পেরে উঠলো না।
রক্তে তার শাট ভিজে গেছে। লাবিবকে আরো মারলে বোধহয় মরেই যাবে।
-কু"ত্তা"রবাচ্চা তোর সাহস কিভাবে হলো ওর গায়ে হাত দেওয়া? শু"য়োরের বাচ্চা আজ তোকে মেরেই ফেলবো।
এবার ভাবীর মা সাফিন ভাইয়ের পা ধরে আহাজারি করতে লাগলো তার ছেলেকে ছাড়তে। আরও দু ঘুষি মেরে সাফিন ভাই ছেড়ে দেয় লাবিবকে। চাচা তাকে ধরে শান্ত হতে বলে। সে ঝারা দিয়ে হাত সরিয়ে ফেলে তারপর আমার কাছে এসে খপ করে আমার হাতদুটো ধরে সেইই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
তিনদিন পর,,,
বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক। তবে আমি এখনো কিছু ভুলতে পারছি না। দুদিন মা আমার সাথে ঘুমিয়েছে তবুও ভয় দূর হচ্ছে না। নানান দূর স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়।
ভাবী তার বাবার বাড়ির মানুষে তরফ৷ থেকে অনেকবার মাফ চেয়েছে তবে প্রতিউত্তরে কেউ কিছু বলেনি।
সেদিনের পর সাফিন ভাই আর যায়নি।
আজ রাতে সবাই একসাথে খাবার খাচ্ছি। মা ও ভাবী সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।
খাবারের মাঝে সাফিন ভাই বললো
- আমার কিছু কথা বলার ছিলো তোমাদের
সবাই প্রশ্নাতীত চোখে চায় সাফিন ভাইয়ের দিকে।
বাবা বলল
- কি বলো
- আমি বিয়ে করতে চাই।
শান্ত ভাবে বলে আবারও খওয়ায় মনোযোগ দিলো। সবাই অবাক হয়ে তার কথা শুনলো। আমি মনে মনে বললাম
একটা মানিষ কতোটা অসভ্য হলে এত সহজে নিজের বিয়ের কথা বলে।
চাচা বলল
তা বেশ তো, কোনো মেয়ে পছন্দ?
চাচী বললো
- তোমার কোনো মেয়ে পছন্দ হলে আমাদের কারোর কোনো আপত্তি নেই।
সাফিন ভাই বলল
-হুম আছে।
সায়মন ভাই খুশি হয়ে বললো।
- কে রে একটু ছবিও দেখা।
সাফিন ভাই বলে
- ছবি দেখানোর প্রয়োজন নেই সে এখানেই আছে।
তার কথায় সবাই অবাক হলো। আমি তো শক খেলাম।
সবাইকে অবাক হতে দেখে সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো
- আমি অরীনকে বিয়ে করতে চাই।
বাহারি ফুলের গন্ধে বাসরঘর মৌ মৌ করছে। আমি চুপটি করে বসে আছি বিছানায় কেমন অসস্তি ও ভয় করছে। সাফিন ভাই এখনো আসেনি। তার মুখোমুখি কিভাবে হবো। এখনি জড়তায় নুইয়ে পড়ছি। তার সাথে কখনো হাসি -ঠাট্টার সম্পর্কও ছিল না। ছোট থেকে তাকে এড়িয়ে গেছি। বাড়ন্ত বয়সে সায়মন ভাইকে চোখের সামনে বেশি পাওয়ায় তার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় এতটাই দূর্বল হয়ে পরি যে কখনো সাফিন ভাইকে নিয়ে ভাবিনিই। আর আজ তারই ঘরে তারই বউ হয়ে বসে আছি।
সাফিন ভাই যখন বললো সে আমায় বিয়ে করতে চায় তখন কেউ আপত্তি করেনি। মা আর চাচি একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে বিস্তার হেঁসেছিল।
সাফিন আহমেদ। লম্বাটে সুদর্শন ব্যক্তিক্ত্ববান পুরুষ। নিজ পরিশ্রমে নিজের ব্যবসায় দাড় করিয়েছে। নারী কেলেঙ্কারীও নেই। তার মধ্যে নিজের বাড়ির ছেলে।
তাই বাবা-মায়ের কোনো আপত্তি নেই। আমাকে চাচি নিজ হাতে পেলে পুষে বড় করেছেন। ছোটবেলা থেকে চোখের সামনে দেখে এসেছেন, নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে।
দেখতেও আমি খারাপ না। দুধ ফর্সা না হলেও উজ্জ্বল শ্যামলা। উচ্চতা ৫ ফুট ২। তাই তাদেরও কোনো আপত্তি নেই।
রাতে খাবারের পর বাবা - মা যখন আমার কাছে আসলো তখন বাবা জিজ্ঞেস করলো
- আম্মু তোমার কি কোনো পছন্দ আছে? থাকলে বলো তোমার অমতে কখনোই তোমার বিয়ে দিবো না।
আমি বললাম
না বাবা আমার পছন্দের কেউ নেই।
তখন মা আমাকে টানা আধঘন্টা ধরে সাফিন ভাইয়েট গুনগান গাইলেন। আমি এতে বিরক্ত হলেও চুপ করে রইলাম। আসলেই সাফিন ভাই খুবই ভালো ছেলে।
যেহেতু আমার জীবনে কেউ নেই তাই আপত্তি করার কোনো প্রশ্ন আসেনা। আর সবার সামনে সাফিন ভাই আমাকে বিয়ে করতে চাইছে
বলে জানিয়ে দিয়েছে । এখন যদি আমি আপত্তি করি তাহলে সাফিন ভাই ও বড় চাচা চাচি অপমানিত হবে, যা আমি চাই না। তাই কি আর করার রাজী হয়ে গেলাম।
এসব ভাবতে ভাবতে অরীন ঘুমিয়ে গেলো।
রাত ১২.৩০। সাফিন ঘরে ঢুকে দেখে অরীন ঘুমিয়েছে। সে ধীরে ধীরে কাভার্ড থেকে নিজের টি শার্ট ও প্যান্ট নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো। ঠান্ডা শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে আয়নার সামনে চুল মুছতে থাকে।
টাওয়াল রেখে বিছানায় নিজের নব বধূর দিকে তাকাতেই গলা শুকিয়ে আসলো সাফিনে। শুকনো ঢুক গিলে এগিয়ে গেলো অরীনের দিকে।
অরীনের ঘুম ভালো না, হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে আছে। শাড়িও এলোমেলো হয়ে আছে। পা থেকে শাড়িটা উপরে উঠায় হাটু পর্যন্ত পা দুটো উন্মুক্ত হয়ে আছে। নিশ্বাসের গতির সাথে আকর্ষণীয় বুকও উঠানামা করছে। সাফিন বিছানা এসে অরীনে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দেয়। অরীনের মায়াবী চেহারায় তাকাতেই মন প্রশান্তিতে ভরে উঠে।
এই মেয়েকে সে নিজের জীবনে চাইতেও বেশি ভালোবাসে। কবে এই মেয়ে তাকে পাগল করলো কে জানে।
তার হঠাৎ চোখ যায় অরীনের বক্ষ বিভাজনের মাঝে কালো তিলটায়। তার চোখে নেশা জেগে উঠলো। অরীনকে পাওয়ার। তবে সে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করলো। তবে এতেও যেন ব্যর্থ হলো। আাচানক
অরীনের বুকের মাঝখানের নিজের ঠোট ছোয়ালো। চুমুতে ভরে দিলো অরীনের পুরো বক্ষ বিভাজন।
শীতল স্পর্শে অরীনের ঘুম ছুটে গেলো।
চোখ মেলতেই সাফিনের কামুক চাহনি দেখে শরীর কেঁপে উঠলো। তার সাথে নিশ্বাস আরও জোরালো হলো। সাফিন তার কামুল চাহনি আবারও বুকের দিকে তাক করলো। এখন আর তার কিছু সইলো না সে মুখ ডুবিয়ে দিলো অরীনের বুকে। চুমু দিতেই অরীন এক হাতে খামচে ধরলে সাফিনের চুল। আরেকহাত সাফিনের পিঠে। অরীনের গলা ধরে আসছে কিছু বলতে পারছে না।
সাফিন চুমু দিতে দিতে হঠাৎ কামড়ে বসলো। "আহ্" শব্দ করে উঠতেই সাফিন চাইলো অরীনের দিকে। তা দেখে অরীন লজ্জায় চোখ বন্ধ করে নিলো। সাফিন এগিয়ে এসে অরীনের ঠোটে শক্ত চুমু গেলো। ফের অরীনের কানের কাছে এসে নেশালো কন্ঠে বলল
I can't control myself love. I badly need you.
সাফিনের নেশালো কন্ঠে " love " শব্দটা অরীনের কানের ঝংকার তুলে।
সাফিন আবারও নিজের উন্মাদনায় মেতে উঠে। অরীনের সারা শরীর চুমুতে ভরিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে নিচে নামতেই অরীনের টনক নড়ে। তার পিরিয়ড। সে কাপা হাতে সাফিনের হাতদুটো ধরে নিচু স্বরে বলে
-আমার পিরিয়ড।
সাফিনের সকল উন্মাদনা নিমিষেই গায়েব হয়ে গেলো। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল অরীনের দিকে। অরীনের খারাপ লাগলো তবে কিছু করার নেই। তবে তার আরও আগে বলা উচিত ছিল কিন্তু সে নিজেও কাবু হয়ে গিয়েছিল সাফিনের ছোয়ায়।
সাফিন উঠে বসে নিজের চুল খিচে ধরে বিরবির করতে থাকে।
অরীন তার কথা বুঝলো না। সেও বুকে আঁচল জড়িয়ে উঠে বসে।
সাফিন অরীনের চুলে হাত দিয়ে বলে
- please baby please. Don't do this. I can't control.
অরীন লজ্জায় জড়তায় নুইয়ে যায়। এরকম ভাবে কেউ বলে তার নব বধূকে?
হঠাৎ সাফিন হিংস্র হয়ে উঠলো। চোয়াল শক্ত করে দাত কিড়মিড় করে অরীনের চুলের মুঠি ধরে বলে,
তোর পিরিয়ড আসার আর কোনো সময় হলো না?
এখনই পিরিয়ড হতে হলো। হ্যাঁ। আমায় কষ্ট দিয়ে ভালো লাগছে?
সাফিনের দিকে অরীন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই সাফিন ভিন্ন কেউ তাকে তো অরীন চিনে না। সাফিনের প্রত্যেক কথায় অরীন খুব অপমানিত হয়। রাগে ক্ষোভে নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে শুয়ে নিজের আঁচল ফেলে নিজেকে উন্মুক্ত করে। আর চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
অরঈনের চোখে অশ্রু দেখে সাফিনের ধ্যান ফিরে আসলো। সকল কামুকতা গায়েব হয়ে গেলো। বিরবির করে মুখ কুচকে বলল,
শীট । এ আমি কি করলাম?
সে অরীনকে জড়িয়ে ধরে তার গলায় মুখ গুজে বললো,
খুব সরি জান আর হবে না। আমার হুশ ছিলো। তুমি এবারের জন্য মাফ করে দেও।
অরীন নিশ্চুপ। তবে এরকম মায়াবী কন্ঠে এত আকুতি করলে কেইবা রাগ করে থাকতে পারেনা। অরীনও পারলো না। কিন্তু সাফিনের এত তাড়াতাড়ি একদিনেই এত স্বামীর মতো আচরণ করতে দেখে অবাক হলো বটে লজ্জাও লাগছে সাফিনের এরুপ কথাবার্তায়।
অরীনের থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সাফিন আবারও ডাকলো
"জান"
হুম
সরি
ইটস ওকে।
আজ এভাবেই ঘুমালে কেমন হয়?
সাফিনের দুষ্ট কথার মানে বুঝলো অরীন। অরীনের উপর সকল ভর ছেড়ে শুয়ে আছে সাফিন। অরীনের একটু কষ্ট হচ্ছে তবে সে সয়ে নিলে। সাফিন ভাই এখন তার স্বামী তার জায়েজ আছে। বাধা দেওয়াও নিষেধ। সাফিন অরীনের গলায় একটু পরপর ঠোট ছুইয়ে দেয়।
অরূন কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে নেয়। কিছু ক্ষন পর ঘুমিয়ে গেলো।
সাফিন টের পেলো অরীন ঘুমিয়ে গেছে তবে তার চোখে ঘুম নেই। সে কত স্বপ্ন দেখেছিল এই রাতটার জন্য । সাফিন ও অরীনের রাত। এক মধুর রাত। তবে তা হলো কই।
সে এবার অরীনের উপর থেকে নেমে তাকে ডানদিকে ফিরিয়ে অরীনের বুকের মাঝে নিজের মুখ ডুবিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
এভাবেই কেটে গেলো তাদের বাসররাত।
সকালে পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো অরীনের। পাশ ফিরে বিছানা খালি দেখে উঠে বসে। চারপাশে নজড় বুলিয়ে সাফিন ভাইকে খুজতে থাকে। তবে পুরো রুমে সাফিন ভাই কোথাও নেই। সে উঠে জামা বদলিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে দেখে সবাই খাচ্ছে। সবার সামনে যেতে কেনো জানি লজ্জা লাগছে তার।
তবুও গেল সবািকে সালাম দিয়ে টেবিলে বসতেই লক্ষ্য করে সাফিন ভাই নেই। অরীনের মন বিচলিত হলো। রিয়া বুঝলো অরীনের নজর সে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে
- কিগো ননদিনী + জা কাকে খুজছো?
অরীন লজ্জায় মিইয়ে গেলো।
বাকি সবাই সবসময়ের মতো স্বাভাবিক ব্যবহার করলো তাই অরীনের জড়তা গায়েব হয়ে গেলো।
খাবার শেষে রান্নাঘরে প্লেট রাখতে নিলে অরীনের মা এসে চুলে হাত দিয়ে বলে,
ছিহ অরী তুই গোসল করিস নি কেনো?
তার কথায় চাচি, রিয়া ও কাজের মহিলাটি মিটিমিটি হাসতে থাকে।
চাচি বলে,
এটা কিন্তু ঠিক না মা। প্রথম তো তাই হয়তো জানো না এখন যাও গোসল করে এসো।
আমি অতোও অবুঝ না। তবুও লজ্জা ঘিরে ধরল কিভাবে বলি আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি।
রিয়া বলল
ননদিনী লজ্জা পাচ্ছে।
আমি বললাম, আমার পিরিয়ড চলছে।
অতঃপর সবাই যা বুঝার বুঝল। আমি আর সেখানে থাকলাম না চলে আসলাম নিজের রুমে।
সাফিন আসলো একঘন্টা পর। রুমে অরীনকে না পেয়ে নিচে এসে ভাবীকে জিজ্ঞেস করলো,
অরী কোথায় ভাবী।
রিয়ার সাথে সাফিনের ঠাড্ডার সম্পর্ক থাকলেও রিয়া কখনোই সাফিনের সাথে ঠা্ড্ডা মশকরা করেনি। বয়সে তার একবছরের বড় হলেও সম্মানের সাথে কথা বলে।
রিয়া বলল
ও তো উপরেই আছে নাস্তা করে তো আর নিচে নামতে দেখিনি।
সাফিন আচ্ছা বলে আবারও উপরে যায়। কি মনে করে অরীনের রুমে ঢুকলো।
সে অরীনকে এখানেই পেলো। অরীন শুয়ে মোবাইল টিপছে।
- তুমি এখানে কি করছো?
হঠাৎ সাফিনের কথায় লাফ দিয়ে উঠে বসে।
- আপনি কখন এলেন সাফিন ভাই?
সাফিন রামধমক দিয়ে বলে
কে তোমার ভাই? থাপড়িয়ে দাত ভেঙে দিবো।
অরীন ওর বোকামি বুঝল। তবে কি নামে ডাকবে তাকে সাফিন বরমশাই? নাকি ওই বাংলা সিনেমার মতো
বড়বাবু
শহরের বাবু
উকিলবাবু
তবে সাফিন ভাই তো ব্যবসায়ী তাহলে কি তাকে
ব্যবসায়ীবাবু বলে ডাকবে??
ছিহ কিসব আজগুবি ছেহ।
রুমে আসো
সাফিন বলেই চলে যেতে নিলে অরীন বলে।
ওগো শুনছেন বরমশাই। আমি এই রুমেই থাকবো আপনার রুম আমার পছন্দ নয়।
অরীনের অদ্ভুত ডাকে কপাল কুচকে আসে সাফিনের।
তবে তার রুম অরীনের পছন্দ নয় শুনে কারন জিজ্ঞেস করে
কেন কি সমস্যা আমার রুমের?
জানি না কেনো যেন ভালো লাগে না।
সাফিন তার কথা শুনে একদম অরীনের নিকট এসে বসে। কেমন অদ্ভুত চোখে চেয়ে বলে
এখন আমার রুম তোমার পছন্দ নয় আর কিছুদিন পর তো আমাকেও পছন্দ হবে না তাই না?
অরীন তার কথায় বলে
এ আমি কখন বললাম?
- তুমি তো তাই বুঝাতে চাইলে
আপনি ভুল বুঝছেন আমি এমন কিছুই বুঝাইনি আমি বুঝাতে চেয়ে
চুপ
সাফিনের ধমকে কেঁপে উঠলো অরীন।
চলো আমার সাথে
কোথায়
চলো
বলে জোড় করে অরীনকে সাফিন তার রুমে নিয়ে আসে।
ওয়ারড্রব থেকে এক চিঠি বের করে বলে,
এসব কি?
অরীন চিঠ খুলতেই ভয়ে চুপসে গেলো।
সায়মনকে নিয়ে তার বিরহের চিঠি লিখা।
এটা সায়মনের বিয়ের সময় লিখেছিল। কিন্তু অরীনের মনে আছে সে তার পড়ার টেবিলের ডায়েরীর মাঝে রেখেছিল। সাফিন ভাই কিভাবে পেলো।
সে ভয়ে ঢোক গিলে সাফিনের দিকে তাকায়। সাফিনের চোখ লাল বর্ন ধারন করেছে। কি ভয়ংকর লাগছে।
অরীনের নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো।
কি করবে এখন? কিভাবে বুঝাবে সায়মন ভাইয়ের সাথে এখন আর তার কোনো সম্পর্ক নেই। তার মন থেকেও অনেক আগেই সায়মন ভাই মুছে গেছে।
- এটা শুধু অতীত সাফিন ভাই। উনার বিয়ের পরপরই সব শেষ হয়ে গেছে। আমি আর উনাকে ভালবাসি
কথা শেষ করার আগেই সাফিন চড় মারলো অরীনকে। সাফিনের মাথা দাউদাউ করে জ্বলছে যখন অরীনের মুখে ভালোবাসি শব্দটা শুনলো। কিন্তু তার জন্য না সায়মনের জন্য। অন্য কাউকে অরীন ভালোবেসেছে এটা কোনো ভাবেই মানতে পারছে না সাফিন।
অরীনের উপর খুব রাগ লাগছে তবুও ওকে কিছু বলতে পারছে না, সে অরীনকে খুব ভালোবাসে, ওর গাউএ হাত তুলে সে নিজে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে।
সারা রুমে হাঁটতে থাকে সাফিন ইচ্ছে করছে তার সবকিছু তছনছ করে দিতে। কিন্তু পরিবারের মানুষদের মনে পড়ে তাও করতে পারছে না। সে তাদের সামনে কোনোভাবেই অরীনকে ছোট হতে দিবে না।
রাগে ক্ষোভে বিছানায় বসে নিজের চুল খামচে ধরে। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। এসির মধ্যেও ঘেমে উঠেছে। চেহারা লাল হয়ে আছে।
এই সাফিনকে দেখে অরীনের খুব ভয় লাগছে কিন্তু সত্যিই তো একদিন না একদিন সবার সামনে আসতোই তাই না। এখন না হয় খুব তাড়াতাড়ি চলে এলো।
সাফিনের চড়ে অরীন মেঝেতে হিঁচড়ে পড়েছিলো তবুও সাফিন তাকে উঠালো না। তার গাল জ্বলছে দূরের আয়না তাকিয়ে দেখলো লাল হয়ে গেছে।
কিন্তু অরীনের মাথায় এখন একটাই চিন্তা। সাফিন ভাইকে সব বুঝাতে হবে। সাফিন ভাই যদি তাকে অবিশ্বাস করে তাকে ডিভোর্স দেয়?
ডিভোর্স এর কথা মাথায় আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়লো অরীন। সাফিন এখনো চুল খামচে ঝোঁকে আছে।
অরীন এগিয়ে এসে সাফিনের পা দুটো জড়িয়ে ধরে হাঁটুর উপর মাথা রাখে। সাফিন টের পেলেও কিছু বললো না। আর না অরীনকে সরালো।
- আমার কথা একবার শুনবে সাফিন ভাই।
বলেই সাথে সাথে জ্বীভ কাটে অরীন। এই ডাকে যদি আবারো রেগে যায়? এমনিতেই কত রেগে আছে পরে বিস্ফোরণ ঘটলে কে সামলাবে? জ্বীভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে মধুর স্বরে বলে,
- শুনো না গো স্বামী মশাই। তুমি একদম ভুল ভাবছো। আমার জীবনে এখন তুমি যারা আর কেউ নেই। বিশ্বাস করো যেদিন তোমার সাথে তিন কবুলে বিয়ে হলো সেদিন থেকেই আমি তোমায় পুরো রুপে মেনে নিয়েছি। তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করছিি।
সাফিন সব শুনছে। অরীনের কথা শুনে মাথার যন্ত্রণা কমেছে। তার ভালোও লাগছে এসব শুনে অরীনের মুখে "স্বামী মশাই " ডাকটা শুনে এখন তার হাসি পাচ্ছে কিন্তু তবুও চুপ করে আছে। সে অরীনের আরও কথা শুনতে চায়।
- আমার জীবনে যদি কোনো পুরুষ থেকে তাকে সেটা হলো আমার প্রানপ্রিয় স্বামী মশাই আমার ব্যবসায়ীবাবু। শুনছো??
এবার অরীনের ব্যবসায়ীবাবু ডাকে তড়িত করে তাকালো অরীনের দিকে।
- কি আওল ফাওল নামে ডাকছো আমায় এই ব্যবসায়ী বাবু আবার কি?
ওমা জানো না? ওইযে বাবাংলা সিনেমায় বউরা তার জামাইকে শহরের বাবু, ডাক্তারবাবু, বড়বাবু, উকিলবাবু হেনতেন এসব নামে ডাকে। জানো না?
তুমি তো আর এসবের মাঝে কিছুই না। তুমি করো হচ্ছে ব্যবসায় তাই তোমায় আমি ব্যবসায়ীবাবু বলে ডেকেছি।
তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? এসব উদ্ভট নামে ডাকবে না একদম নাহলে একটু আগে যেভাবে চড়িয়ে গাল লাল করে দিয়েছি এবার চড় মেরে দাঁত ভেঙে ফেলবো।
অরীনের হঠাৎ রাগ উঠলো। কিছুক্ষন আগে যেই ভুলবুঝা বুঝি হলো সেটা যেন দুজনের মাথা থেকেই গায়েব হয়ে গেলো। যে অরীন আগে সাফিন দেখেি ভয়ে চুপসে যেতে সেই অরীন এখন কোমড়ে হাত রেখে রেগে সাফিনের সাথে উঁচু গলায় কথা বলে,
কি বড় সাহস? এই একটু মধু মিশিয়ে কথা বলেছি বলে কি আমার সাথে যা খুশি তাই করবে? হুম? আসলে কি তোমার সাথে মিষ্টি করে কথা বলাই উচিত না। এখন থেকে তোমার সাথে কথা বলার সময় নিমপাতা খেয়ে কথা বলবো।
এই এলাকা ঘুরে তুই নিমপাতা পাবি কই তোর বাপ এনে দেবে?
তুমি আমায় আবারও তুই করে বলছো? ভাবলাম বিয়ের পর এবার বোধহয় তোমার কাজ থেকে ভালো ব্যবহার পাবো। তা না তুমি আমার আগের রুপ ধারন করছো?
তোর মতো গিরগিটি নাকি যে আগের রুপ পরের রুপ ধারন করবো। আমি আগে যেমন ছিলাম এখনও তেমনি আছি। শুধু মাঝেমধ্যে তোকে দয়া দেখিয়ে একটু ভালোবেসে তুমি করে ডাকি।
অরীনের চোখ দুটো বড়সড় হয়ে গেলো। কি সাংঘাতিক ভাবা যায়? এবার অরীন এক অবুঝের মত কান্ড করে বসলো। বিছানায় বসে থাকা সাফিনকে ধাক্কা মারে এতে আচানক ধাক্কায় সাফিন টাল সামলাতে না পেরে শুয়ে পড়ে। অরীন বিছানায় উঠে সাফিনের দু দিকে পা ফেলে তার পেটে বসে পড়ে। জোরে বসায় সাফিন ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। অরীন এবার সাফিন চুল খামচে ধরে বলে
কি বলছিলে আবার বলো।
আহ্ ব্যাাথা পাচ্ছি ছাড়
নাহ ছারবো না বলো কি বলছিলে?
অরীনের বাচ্চা ছাড় তোর সাহস খুব বেড়ে গেছে?
আমার বাচ্চা এখনো আসেনি যখন আসবে তখন বলো অরীনের বাচ্চা। এখন তো আমি তোমায় ছাড়ছি না।
সাফিন ব্যাথা ভুলে তাকিয়ে রয় অরীনের দিকে। সাফিনকে এভাবে তাকাতে দেখে অরীন ভ্যাাবাচেকা খায়। সাফিন ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে।
অরীনের ধ্যান ভাঙে কিছু সনয় পর। একবার নিজের দিকে তাকিয়ে আরেকবার সাফিনের দিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থান দেখে উঠে যেতে নিলে সাফিন তার কোমড়ে হাত দিয়ে আটকিয়ে হেসে বলে,
উঠছো কেন ভালো লাগছে তো।
অরীন মিইয়ে যায়।
ছাড়ো
কেন? আসো বাচ্চা ডাউনলোড করার ব্যবস্থা করি।
অরীনের পুরো মুখ লাল হয়ে উঠে। সাফিন অরীনের লজ্জা দেখে ওকে উল্টিয়ে বিছানায় ফেলে নিজের তার উপরে উঠে যায়। শয়তানি হাসি দিয়ে বলে
অরীন জান তোমাকে আমার হাত থেকে কেউ বাচাতে পারবে না।
অরীন দুষ্টুমি করে বলে,
ছাড় শয়তান ছেড়ে দে আমায়।
পরপর দুজনেই উচ্চস্বরে হেসে উঠে। অরীন সাফিনের খিলখিলে হাসির দিকে তাকিয়ে থাকে। এ প্রথম সাফিন ভাইকে এত হাসতে দেখছে অরীন। অরীনকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাফিনের হাসি কমে আসে। সাফিন তাকায় অরীনের ঠোটের দিকে। হঠাৎ অরীনের অধর নিজের অধরের মাঝে নিয়ে নেয়। অরীন সাফিনের শার্ট আকড়ে ধরে নিজেও সাফিনের সুধা পান করতে থাকে। সাফিন এবার আক্রমণ বসায় অরীনের নরম ঠোঁটের উপর।
সাফিনের কামড়ে অরীন ব্যাথায় আহ্ করে উঠে।
কোনোরকম বলে,
ব্যাথা পাচ্ছি।
কিন্তু সাফিন তা শুনলো কই? সে আধাঘন্টা তার মনমরঝি করে ছেড়ে দেয় অরীনকে। তারপর তার বুকের মাঝে নিজের মুখ গুঁজে দুয়ে বলি,
ভালোবাসি।
অরীনের ঠোঁট জ্বলছে। ঠোটে হাত দিয়ে বলে,
রক্ত।
সাফিন তাকিয়ে দেখে আসলেই রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অরীন রেগে নিজেও সাফিনের ঠোঁট কামড়ে বসে। সাফিন হেসে অরীনের আরও কাছে আসে। ছাড়া পাওয়ার কোনো চিন্তা নেই।
বারান্দায় চেয়ারে বসে আছে সাফিন। হাতের সিগারেট কিছুক্ষণ পরপর টেনে ধোঁয়া ছাড়ছে। অরীন এসে বারান্দার শুধু মাথা বের করে উঁকি দিলো। সাফিনের চেহারা গম্ভীর ও শক্ত। অরীন মাথা সরিয়ে চিন্তা করে সাফিনের কাছে যাবে কি না।
গোটি গোটি পায়ে এসে সাফিনের সামনে দাঁড়ায়। সাফিন তাকে দেখে কিছু বলল না। অরীন কপাল কুচকে আরো এগিয়ে ঘা ঘেঁষে দাড়াতেই সাফিন সিগারেট ফেলে দিয়ে অন্যপাশে ধোঁয়া উড়ায়।
অরীন সুযোগ বুঝে খপ করে সাফিনের কোলে বসে পড়লো। মনে মনে একটু ভয় পাচ্ছে যদি সাফিন রেগে তাকে তুলে আছাড় মারে? হাট্টি ভেঙে যাবে না?
অরীনের মনে একটা প্রশ্ন জাগলো।
সাফিনের মতো শক্তপোক্ত শরীরের মানুষ যদি তাকে আছাড় মারে তাহলে তার কয়টা হাট্টি ভাঙবে? সে নিজের শরীরের দিকে পরখ করতে থাকে। এর মাঝে সাফিন তার কোমড় জড়িয়ে আরও কাছে টেনে নেয়।
সাফিনের হাত অরীনের জামা ভেদ করে মসৃণ উদরে বিচরন করে। অরীনের কেমন সুরসুরি লাগছে।
সাফিনের হাত সরাতে চাইলে এবার সাফিন ঘামচে ধরে তার উদর। ব্যাথায় চেহারা কুচকে ফেলে অরীন।
লাগছে।
লাগুক দূরে সরাতে চাইছো কেন? ভালো লাগছে না আমার ছোঁয়া?
অরীন পিছন ফিরে অসহায় দৃষ্টি ফেলে ঠোট উল্টে বলে,
ভালো লাগবে না কেন আলবাদ লাগছে কিন্তু
সাফিন রেগে বলে,
কিন্তু কি?
কেমন সুরসুরি লাগে।
সাফিন নাক সিটিয়ে বলে,
কি লাগে?
অরীন চ কারান্ত শব্দ করে বলে,
আরেহ সুরসুরি লাগে ওইযে কাতুকুতু...
সাফিন তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বলে,
এসব শব্দ কোথা থেকে শিখেছো?
এগুলা আবার কোথাও থেকে শিখার লাগে নাকি... এই আপনি ঢং করবেন না তো যেন কিছুই বুঝেন, শহরে থেকে ভাব বেড়ে গেছে যেন।
অরীন ভেংচি কাটতেই সাফিন বলে,
মুখ এরকম করলে মার খাবি...
অরীন এবার সাফিনের দু দিকে পা মেলে গলা জড়িয়ে বলে,
মার খাওয়ার ইচ্ছে করছে না এখন আবাতত ভালোবাসা খাবো।
সাফিন চোখ সরু করে বলে,
তোর লজ্জা নেই?
আপনার সাথে থেকে লজ্জা উড়ে গেছে।
মাত্র দুদিনেই লজ্জা উড়ে গেলো? বাকি দিন কি করবি?
অরীন সাফিনের নাকে নাক ঘষে বলে,
দেখা যাবে।
বলে খিলখিল করে হেসে উঠে। সাফিন বিমোহিত হয়ে দেখে অরীনের হাসি।
হঠাৎ গাড়ির শব্দ হলো। সাফিন ডানদিকে ফিরে নিচে তাকিয়ে দেখে সায়মন গাড়ি থেকে নামছে। তা দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো।
সায়মন নেমেই বাড়িতে ঢোকে পড়ে। অরীন ভয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। সাফিন চোখ ফিরিয়ে তাকায় অরীনের দিকে। অরীন মাথা নিচু করে তার বুকে আঁকিবুঁকি করছে।
আজ অরীন তাকে সব বলেছে। সব শুনে অরীনের উপর আর রাগ উঠেনি। কিন্তু সায়মনের প্রতি অনেক ক্ষোভ জমেছে। কিভাবে পারলো এত বড় ছলনা করতে? তার ভাইয়ের থেকে এসব আশা করেনি। হঠাৎ ভাবে যদি সায়মন ছলনা না করতো তাহলে অরীন অন্য.... না ভাবতে পারছে না এসব। সে কোনোভাবেই অরীনকে অন্যকারোর হতে দিতো না।
অরীনে এলোমেলো চুলগুলো কানের গুজে দেয় সাফিন। এই মেয়ে খুব বোকা। তার বোকাবউ। বোকাবউয়ের উপর কি রাগ করে বেশিক্ষন থাকা যায়?
অরীনের ঘাড়ে মুখ গুজে ছোট ছোট চুমু দিয়ে মাঝেমধ্যে কামড় দিতে থাকে। অরীন সাফিনের বুকে মাথা রেখে সাফিনের ছোট ছোট ভালোবাসাগুলো অনুভব করতে থাকে।
সত্যিকারের ভালোবাসা কি জানো বোকাবউ?
সাফিনের কথায় মুখ তুলে তাকায় অরীন। প্রশ্নাত্মক মুখে তাকিয়ে থাকে। সাফিন তার ঠোঁটে শক্ত চুমু একে বলে,
যে সত্যিকারের ভালোবাসে সে কখনো তার ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে দিতে পারে না। আর না তার ছেড়ে যাওয়া সহ্য করতে পারে। সত্যিকারের ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষকে এত সহজে ভুলাও যায় না বউ।
অরীনের টনক নড়লো। মস্তিষ্ক কিছু হিসেব মিলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সাফিন অরীনের মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরলো। কিছুসময় তাদের এভাবেই গেলো। অরীন বলল
সাফিন ভাই?
কিহ্হ বললি??
অরীন জ্বীভ কাটলো।
না মানে স্বামী মশাই উরফে ব্যবসায়ীবাবু?
সাফিন চ কারান্ত শব্দ করে কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকে অরীনের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই অরীন একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে,
- ভালোবাসো আমায়?
অরীনের প্রশ্নে সাফিন নজড় সরিয়ে খোলা আকাশে তাকিয়ে বলে, কি জানি?
এতে অরীন সাফিনের বুকে কামড় দিয়ে বলে,
জানি আমায় খুব ভালোবাসো।
বলে সাফিনের বুকে মুখ লুকায়। সাফিন কিছু না বলে ঠোঁট কামড়ে নিশব্দে হাঁসে।
উহুম বাসি না।
অরীন সাফিনের দিকে রেগে তাকায় কিন্তু সাফিন অরীনের চোখে রাগের চেয়ে অভিমান দেখতে পাচ্ছে। অরীনের চোখ টলমল করছে। সাফিন নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে দেখে অরীন তার বুকে চিমটি কাটছে। চিমটিগুলো পিপড়ের কামড়ের মতো।
অরীনের বাচ্চামোতে সাফিন মনে মনে হাসছে। তার খুব মজা লাগছে অরীনের কান্ডকারখানা। সে দুষ্ট কন্ঠে বলে
এবার আমি দেই তোমাকে? ঠিক যেই জায়গায় তুমি আমাকে দিয়েছো।
বলেই চোখ মারে সাফিন।
অরীন চোখবড় করে দুদিকে নাথা নাড়ায়। সাফিন হেসে অরীনের দু গাল ধরে চুমু দেয় অরীনের ঠোঁটে ধীরে ধীরে চুমু গভীর হতেই অরীন তার মুখ সরিয়ে নাক সিটকিয়ে বলে,
ছিহ সিগারেটের গন্ধ...
সাফিন অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে অরীনকে সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
সর যাহ... যাহ তুই আমার চোখের সামনে থেকে না গেলে এখন তোকে আমি খুন করবো অরীনের বাচ্চা।
অরীন কোনোমতে দাঁড়িয়ে মুখ ফুলিয়ে বলে,
কি এমন বলেছি আমি?
সাফিন আঙুল উঁচিয়ে শাসানোর কন্ঠে বলে,
কি এমন বলেছি মানে সবসময় আমার রোমান্সের বারোটা বাজাস। যেই একটু রোমান্স টা করতেই নেই তার মাঝে বাম হাত ঢুকাস।
সাফিন বারান্দা থেকে চলে যেতে যেতে বলে,
রোমান্সের সতীনকে বিয়ে করেছি উফফ।
_________________________________________
সন্ধ্যায় রিয়া গরম গরম পাকোড়া নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসেছে। সবাই একসাথে বসে খুশগল্প করছে। সাফিন বাহিরে বের হয়েছে অনেক আগে। অরীন একেরপর এক পকোড়া চিবোতে চিবোতে সবার কথা শুনছে। সায়মন এসে বসতেই তার অস্বস্তি শুরু হলো। অরীনের সামনে থেকে বাটিটা নিয়ে পকোড়া নিয়ে সবার কথার মাঝে সেও কথা বলতে থাকে।
অরীন পানি খেয়ে উঠে যাবে সে উদ্দেশ্যে পানি নিতে যাবে তখনই সায়মন তার সামনে বাটি দিয়ে খেতে বলে।
অরীন বাটির দিকে তাকিয়ে আছে যেটা সায়মন এখনো ধরে আছে। এমনসময় সাফিন বাড়ি ঢুকেই তাদের দেখে দাঁড়িয়ে যায়। একবার সায়মনের দিকে তাকয় তো একবার অরীনের দিকে। অরীন সাফিনকে খেয়াল করেনি। সে কিছু না বলে উঠে উপরে চলে যায়। সায়মন এতে মিইয়ে গিয়ে বাটিটা রেখে দেয়।
সাফিনের মা জাহানারা বেগম তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, পানি খেয়ে যা অরী,,,
রিয়া বলল
ও এভাবে চলে গেলো কেনো বলে বামে তাকাতেই দেখে সাফিন দাড়িয়ে আছে। তা দেখে হেসে বলে,
ওহ সাফিন ভাই এসেছে বলে অরীন চলে গেলো।
সায়মন তার কথায় তাকায় সাফিনের দিকে। সাফিন কঠোর চোখে সায়মনের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়মন সাফিনের দৃষ্টিতে কিছু আন্দাজ করে ঢোক গিললো। সে ভয়ে ভয়ে একবার রিয়ার দিকে তাকালো। রিয়া হাসিখুশি সবার সাথে কথা বলছে।
অরীন ঘরে এসে পানি খেয়ে বড়বড় শ্বাস ফেলে। তার শরীর কেমন চিটচিটে লাগছে বলে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে গোসল করতে ঢুকে গেলো।
সাফিন ঘরে এসে কোথাও অরীনকে পায় না। ওয়াশরুমে পানির শব্দ পেয়ে বুঝলো অরীন গোসল করছে। অসময়ে গোসল করতে দেখে রাগ আরও বেড়ে গেলো। এই মেয়ে কি এখন জ্বর বাঁধাতে চায় নাকি?
অরীন ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে সাফিন বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। সে আয়নার সামনে চুলগুলো শুকানোর সাথে সাথে আড়চোখে সাফিনকে পরখ করছে। সাফিন শকৃত মুকে কাজ করে যাচ্ছে। দুপুরের সময়ের কথা ভাবতেই তার লজ্জা লাগলো। সে এবার বিছানায় সাফিনের পাশে বসতেই সাফিন ল্যাপটপ রেখে তার কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো। অরীনকে গোসলের পর কি যে স্নিগ্ধ লাগছে সাফিন ঘোরলাগা চোখে চেয়ে অরীনের ঠোঁটের কাছে এগিয়ে এসেও থেমে যায়। অরীন চোখ বন্ধ করে রেখে অপেক্ষা করছে সাফিনের চুমু পাওয়ার। তবে কোনো চুমু না পেয়ে তাকিয়ে দেখে সাফিন তার দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে ভ্রু নাড়িয়ে বলে,
কি?
অরীন নিজ থেকে সাফিনের ঠোঁটের দিকে এগিয়ে চুমু খেতে নিলে সাফিন ওর কপালে আঙুল দিয়ে সরিয়ে বলে,
সর বেশরম।
অরীন বোকার মতো তাকিয়ে থাকে সাফিনের দিকে।
আসলেই গিরগিটি একটা।
তুই
তুমি নিজে।
এবার সাফিন সিরিয়াস হয়ে বলে কালকে ঢাকা যাবো অনেক বন্ধ দিয়েছি। এবার যেতে হবে।
সাফিনের কথায় অরীনের মুখে আধার নামে।
ব্যাগ গুছিয়ে নিস।
মানে।
মানে তুই ও আমার সাথে যাবি।
অরীন চমকে উঠে সাফিনের কথায়। অরীনকে চমকাতে দেখে সাফিন ভ্রু কুঁচকে বলে,
নাকি এখানে থাকার...
সাথে সাথে অরীন সাফিনের মুখ চেপে মাথা দু'দিকে নাড়ায়।
একদমই না। আমার বর যেখানে আমিও সেখানে।
সাফিন মুচকি হেসে অরীনকে জড়িয়ে ধরে বলে,
তুমি কবে ঠিক হবে বোকাবউ?
উহ্ শুধু নিজের রোমান্সের সময়ই "তুমি" তুমি উহহ
সাফিন হেসে আবারও অরীনের গলায় মুখ গুজে দেয়।
বললে না?
অরীন লাজুক হেসে বলে
হুম হয়েছি।
সাফিন তড়িৎ তাকায় অরীনের দিকে।
ফের লাফ দিয়ে উঠে বলে,
আজ আমার বোকা বউয়ের রক্ষা নেই।
অরীন হতভম্ব হয়ে যায়। সাফিন লাইট নিভিয়ে এসে অরীনকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঠোঁট নিজের মাঝে নিয়ে নেয়। অরীনও সম্মতি দিয়ে নিজেও সাফিনের সাথে সাড়া দেয়। অরীনের সাড়া পেয়ে সাফিন অস্থির হয়ে উঠে। এবার ঠোঁট ছেড়ে গলায় ঘাড়ে চুমু কামড়ে ভরিয়ে দেয়। অরীন চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে থাকে। অরীন বড়বড় শ্বাস নেওয়ায় ওর বুক উঠানামা করতে থাকে যা দেখে সাফিন উন্মাদনা আরও বেড়ে গেলো। সে অরীনকে পুরোপুরি বিবস্ত্র করলো, সে নিজেও বিবস্ত্র হলো। অরীনের বক্ষে মুখ গুজে সেখানকার ঘ্রান নিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অরীনের বক্ষে চুমু দিতে দিতে কামড়ে উঠে। অরীন সাফিনের চুল ঘামচে ধরে গোঙানো শব্দ করে। এই শব্দ সুখে, মধুর ভালোবাসার। পুরো রুমে তাদের নিশ্বাসের শব্দ জোড়ালো হলো।
সাফিন ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। নাভিতে চুমু দিতেই অরীন না পেরে বলে,
প্লিজ এমন করো না।
এবার সাফিন অরীনকে জড়িয়ে ধরলো। অরীনও সাফিনকে জড়িয়ে ধরে। সাফিন বলে
ভালোবাসি বোকাবউ।
সাফিন কথাটা বলতেই অরীন চিৎকার দিয়ে উঠে। অরীনে সীৎকার যেন সাফিনের উন্মাদনা ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। অরীন এবার কান্না করতেই সাফিন তার কানের কাছে এসে বলে,
থেমে যাবো?
তা শুনে অরীন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে আরও গভীরভাবে সাফিনকে জড়িয়ে ধরে। সাফিন যা বোঝার বুঝল।
দুটি হৃদয় দুটি দেহ যেন মিলে ভালোবাসার নতুন রঙ ছড়িয়ে দেয়। তাদের মিলনের মুহূর্ত দেখে চাঁদও লজ্জা মেঘের আড়ালে ঢেকে যায়।
৮ তলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরীন। সাফিন অরীনের ভারী সুটকেস গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকায় অরীনের দিকে। চোখের জল শুঁকিয়ে চেহারায় ছাপ ফুটে আছে। মেয়েটা বিদায়ের সময় ভীষণ কেঁদেছে। একহাতে সুটকেস অপরহাতে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর হাত ধরে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে।
লিফটে মাঝবয়সী লোকটি সাফিনকে দেখে চমৎকার হাসলো। পরপর তার দৃষ্টি যায় নীলরাঙা শাড়ি পড়া রমনীর দিকে।
- কিরে সাফিন এ আমার বউমা নাকি?
সাফিন হেঁসে মাথা নাড়াতেই লোকটি বলে,
- তুই বিয়ে করেছিস শুনে আমার কি যে আনন্দ লাগছে। শেষমেশ একটা উত্তম কাজ করেছিস।
অরীন এগিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে চাইলে তার আগেই লোকটি তাকে উঠিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলে,
- পা ধরে সালাম করতে নেই বউমা। দোয়া করি তোমরা খুব সুখে থাকো। আমাকে চাচা বলে ডাকবে বুঝলে? ৬ তলায় থাকি মাঝেমধ্যে এসে গল্প করো।
- জ্বী
______________________________
রুমটা বেশ একটা বড় নয় বরং সাদামাটা। দুটো রুম, একটা ড্রয়িংরুম একটা রান্নাঘর একটা বাথরুম। আর রুমের ভিতর ছোট্ট একটা বারান্দা।
একটা রুম মাঝারি সাইজের আরেকটা খুব ছোট।
রান্নাঘরটা মাঝারি তবে গুছানো পরিপাটি। অরীন ছোট রুমটায় ঢুকে দেয়ালে দুটো গিটার টাঙানো দেখতে পায়। অরীন খুব অবাক হলো সাফিন ভাই গিটার বাজাতে পারে? আর একটা টেবিলের উপর কিছু বই খাতা। এটা সাফিন ভািয়ের পড়ার রুম। সে চলে যেতে নিলেও চোখ আটকায় একটা ছবির দিকে। ছবিতে এক মেয়ের পা দেখা যাচ্ছে।
আলতা রাঙা পায়ে কি সুন্দর নূপুর। শাড়ির পাড়টাও লাল। ছবিটা কি সুন্দর। কিন্তু হঠাৎ টনক নড়ে অরীনের। সাফিন ভাইয়ের রুমে মেয়ের ছবি।
কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো। নিষিদ্ধ ভাবনা জেঁকে ধরলো। সাফিন কি কোনো মেয়েকে ভালোবাসতো? অরীন দুদিকে মাথ ঝাড়া দিয়ে নিজেকে বুঝায়,
- ভালোবাসলে বাসতেই পারে। তখন তো আমি তার জীবনে ছিলাম না। মানুষর অতীত থাকতেই পারে। আমারো ছিল।
কিন্তু আবারও ছবিটির দিকে তাকিয়ে বুক ধ্বক করে উঠে।
ছবিটি দেখে মনে হচ্ছে কি যত্নসহকারে টাঙানো হয়েছে। তাহলে কি সাফিন ভাই এখনো সেই মেয়েকে ভালোবাসে তাহলে তাকে বিয়ে করলো কেনো।
- অরীন!
সাফিনের ডাক অরীনের কানে পৌঁছালো না। সাফিন এগিয়ে এসে অরীনের নজড় খেয়াল করে ছবিটির দিকে তাকাতেই তার দুটে হাসি ফুটে উঠে। চোখে আলাদাই মুগ্ধতা। জ্বলজ্বল চোখে অরীনের দিকে তাকাতেই তাদের দৃষ্টি মিলে যায়।
অরীন সাফিনের মুগ্ধতা উপলব্ধি করে তবে এই ছবিতে থাকা মেয়েটার প্রতি।
সাফিন মনে মনে ভাবলো অরীন কি ছবিটা চিনলো? অরীনের নজড় দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।
- কি মেডাম বুঝলেন কিছু?
সাফিনের প্রশ্নে অরীন হাসার চেষ্টা করে বলে,
- হ্যাঁ বুঝলাম।
সাফিন উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
- কি বুঝলে?
অরীন আর কথা বলতে পারছে না। কেমন কান্না আসছে। সে কিছু না বলেই রুম থেকে বের হয়ে যায়। সাফিন তার যাওয়ার দিকে কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটা বেশি আবেগপ্রবণ। সে পুনরায় ছবির দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
- আমার বউপাখি।
________________________________
অরীনের মন খারাপ হলে সে খুব ঘুমায়। বিকালবেলা অরীনকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সাফিনের মন আনচান করছে। অরীন তার সাথে ঠিকমতো কথা বলছে না। প্রথমদিন নতুন পরিবেশে একটু খারাপ তো লাগবেই তাই বলে তার সাথে ঠিকমতো কথা বলবে না? আজব সে কি জোড় করে ধরে বেঁধে এনেছে নাকি? সাফিনের এখন খুব রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে উঠিয়ে গালে ঠাস ঠাস চড় বসাতে। কিন্তু অরীনের ঘুমন্ত মায়াবী মুখটা দেখে তাও পারছে না।
সাফিনের ফোনে কল আসে। তার বন্ধু মাহিন কল দিয়েছে। মাহিনের সাথে কথা বলে ফোন রেখে অরীনের কপালে ও ঠোঁটে চুমু একে চলে যায়।
অরীনের ঘুম ভাঙে তার একঘন্টা পর। পাশ ফিরতেই একটা চিরকুট পায়।
- একটু বাহিরে গেলাম। টেবিলে নাস্তা রেখেছি খিদে লাগলে খেয়ে নিয়ো। রান্নাঘরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তাড়াতাড়ি এসে পড়বো। অপরিচিত কেউ কলিংবেল বাজালে দরজা খুলবে না।
অরীন ভেংচি কেটে বলে, ঢং।
নাস্তা করে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে থাকলো অরীন। আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে। অরীনের মতো আকাশেরও কি মন খারাপ?
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। অরীন উঠে বিছানা থেকে ফোন নিয়ে সাফিনকে কল করে। ফোন ধরছে না। আরও একবার দুবার তিনবার কল দিলো, ধরলো না সাফিন। অরীনের মন খারাপের পাল্লা ভারী হলো। কল না ধরার কারন কি? অরীনের হঠাৎ ছবিটার কথা মনে পড়লো। সাফিন কি সেই মেয়েটার কাছে আছে?
বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। সন্ধ্যার আজান হালকা শোনা যাচ্ছে। পুরো বাড়িতে অরীন একা। কখনো সে একা থাকেনি তার মধ্যে নতুন জায়গা। অভিমানের পাশাপাশি খুব ভয়ও হচ্ছে। মনে মনে খুব করে চাইছে সাফিন আসুক।
কারেন্ট চলে গেলো এবার অরীন ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। বৃষ্টির শু শু শব্দে গায়ের লোমকূপ দাড়িয়ে গেলো। কলিংবেলের শব্দ হচ্ছে। উঠে গিয়ে দরজা খোলার সাহস পাচ্ছে না অরীন। রুমটায় অরীনের ফোনের আলো ছড়ানো৷ অরীন উঠে দাঁড়ালো পা কাঁপছে আবারও কলিংবেলের শব্দে ভয় পেয়ে গেলো। যদি অন্য কেউ হয়। অরীন ফোন হাতে নিয়ে দরজার নিকট এগিয়ে গেলো। শুনতে পেলো পরিচিত কন্ঠস্বর
- অরীন দরজা খোলো ভয় পেয়ো না আমি সাফিন।
অরীন দরজা খুলে দিলো। সাফিন ভিজে একাকার।
সে দরজা আটকিয়ে দেখতে পেলো অরীনের ভয়ার্ত চেহারা।
- ভয় পেয়েছিলে? খুব সরি
আচানক অরীন সাফিনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলে,
- কেনো এসেছেন? কি দরকার ছিল আসার। যার কাছে এতক্ষন ছিলেন তার কাছেই থেকে যেতেন। আমার চিন্তা আপনার করার প্রয়োজন নেই। আমি বেচে রইলাম না মরে গেলাম সেটা আপনার না ভাবলেও চলবে।
- অরীন!
অরীনের শেষ কথাটি সাফিনের বুকে এসে লাগলো। অরীন এখনো কাদছে। খুব ভয় পেয়েছিল মেয়েটি।
অরীনের দু বাহু চেপে বলে,
- বললাম তো খুব সরি জান। আর হবে না। আমি তাড়াতাড়ি আসার খুব চেষ্টা করেছি বাহিরে বৃষ্টি তারমধ্যে জ্যাম। আমার বের হওয়াই উচিত হয়নি। খুব সরি।
অরীনের হাত নিজের গাল ছুঁইয়ে বলে,
- আমাকে বকো, মারো তবে এসব কথা বলো না। তোমার মৃত্যুর আগে যেন আমার মৃত্যু হয়।
অরীন ডুকরে কেঁদে উঠলো।
- জানেন আমি কত ভয় পেয়েছিলাম। আমার কত খারাপ লেগেছে।
কান্না করতে করতে অরীন সাফিনের বুকে মাথা রাখে। সাফিন মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চায়।
___________________________________
সাফিন মোমবাতি জ্বালিয়ে পিছন ফিরে অরীনের দিকে তাকায়। বিছানার এককোণে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে৷ সে এসে পিছন থেকে অরীনকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে অরীন ছিটকে সরিয়ে ফেলে সাফিনের হাতদুটো। এতে সাফিন আরো জোরালো করে ধরে।
অরীন কোনো কথা বলছে না।
- এখনো রাগ করে আছ?
এবার মুখ খুলল অরীন।
- আপনি আমায় ভালোইবাসেন না। ভালোবাসলে আমার ফোন একবার হলেও ধরতেন আপনি তো...
অরীনের কথা শেষ হওয়ার আগে বলে
- তুমি ফোন দিয়েছিলে?
পাশ ফিরে সাফিন মোবাইল নিয়ে চেক করে দেখে আসলেই অনেকবার অরীন তাকে কল দিয়েছে। মাহিনের উপর খুব রাগ হচ্ছে। অনেকদিন পর মাহিন কানাডা থেকে এসেছে। সব বন্ধুরা একসাথে হয়েছে। একটু আড্ডা দিবে কেউ যাতে আড্ডা ভঙ্গ করতে না পারে তাই সবার ফোন সাইলেন্ট করেছে।
সাফিন তো ভেবেই নিয়েছে সন্ধ্যাবেলা সে চলে আসবে। তার আগে অরীনের ঘুম ভাঙবে বুঝতে পারেনি।
সে অরীনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
- প্লিজ রাগ করো না। আমি জানি আমার খুব বড় ভুল হয়েছে আর হবে না।
বিপরীতে অরীনের নাক টানার শব্দ আসছে। সে অরীনকে ঘুরিয়ে দেখে অরীন কাঁদছে চেহারা কান্না করায় লাল হয়ে আছে।
- জান প্লিজ কান্না করো না। আমি..
- আপনি ওই মেয়েকে এখনো ভালোবাসেন তাই না?
অরীনের কথায় সাফিন কপালে গাঢ় ভাজ পড়ে।
- কোন মেয়ে?
- ওইযে ওই ছবির মেয়েটা।
সাফিন অরীনের কথা বুঝতে পারছে না।
- কি বলছো তুমি?
অরীন রেগে উঠে বসে বলে,
- কি বলছি বুঝতে পারছেন না? ছোট বাচ্চা আপনি? হ্যাঁ আপনার পড়ার রুমে ভালোবেসে যে মেয়ের পায়ের ছবি টাঙিয়েছেন সে মেয়ের কথা বলছি।
সাফিনের কাছে এবার সব ক্লিয়ার হলো। এরমানে তখন "বুঝেছি" বলতে অরীন এটা বুঝেছে? আর সাফিন কত কি না ভেবে বসলো৷
আপনি যদি ওই মেয়েকেই ভালোবেসে থাকেন তাহলে আমায় বিয়ে করলেন কেনো? আমি বলেছি আমায় বিয়ে করুন? আর...আর এখন তো আমাদের বিয়ে হয়েছে তাহলে একন কেনো ওই মেয়ের কাছে গিয়েছিলেন?
শেষ কথাটি সাফিনের খুব গায়ে লাগলো। সে কটমট করে বলে,
- এই এই বলদি তুই আমার চরিত্রে লাল দাগ বসাতে চাইছিস কেন? থাপড়িয়ে দাত ভেঙে দিবো একদম!
অরীন নাক টেনে বলে,
হ্যাঁ এখন তো তাই করবেন। মেরে দাঁত ভেঙে বলবেন।
এই মেয়ের দাঁত নেই এর সাথে আমি আর সংসার করবো না। পরে আমায় ছেড়ে ওই মেয়েকে বিয়ে করবেন তাই না?
সাফিন তাজ্জব বনে গেলো। কি মেয়েরে বাবা! কোন কথা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেলো। এতদূর চিন্তাভাবনা তো সাফিনের মাথায়ও আসেনি। সাফিন কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছে এখন ঢের বুঝতে পারছে।
সাফিন চারপাশে নজড় বুলিয়ে পুনরায় অরীনের দিকে তাকায়। সে এখনো কাদছে।
- আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি ভেবে কষ্ট হচ্ছে?
অরীন সাথে সাথে মাথা নাড়ায়। মানে হ্যাঁ কষ্ট হচ্ছে।
- কেনো?
অরীন কান্না থামিয়ে বলে,
- কষ্ট পাবো না? সব মেয়েরাই পায়। কেউ তার স্বামীর ভাগ দিতে চায়? আমি কেনো দিবো? আপনাকে মেরে ফেলবো একদম। তারপর নিজেও ম
সাফিন অরীনের ঠোঁট শক্ত চুমু খেয়ে ছেড়ে দেয়।
- যদি বলি ওই মেয়েটা তুমি?
-কিহহ।
সাফিন অরীনের কানের লতিতে চুমু একে ফোন ঘেটে একটা ছবি বের করে অরীনের সামনে রাখে। ছবিতে অরীন সোনালি শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অরীনের চোখ যায় তার পায়ের দিকে। হ্যাঁ পুরো সেই ছবির মতো নূপুর, আলতা মাখা পা টাও সেই ছবির অবিকল। সে অবাক হয়ে দেখতে থাকে ছবিটা।
সে যখন নতুন কলেজে উঠেছিল তখনকার ছবি। সেদিন নবীন বরন ছিল।
- তার মানে?
অরীনের কথায় হু হু করে হেঁসে শুয়ে পড়ে সাফিন।
- আপনি শুলেন কেনো? আমাকে সব বুঝিয়ে বলুন।
- এখনো সব বুঝাতে হবে?
- এরমানে আপনি আমায় আগে থেকেই ভালোবাসতেন?
সাফিন কিছু না বলে একটানে অরীনকে নিজের বুকে আছড়ে ফেলে।
- বোকাবউ আমার! সব বুঝিয়ে দিতে হয়? কিছু তো নিজে থেকেই বুঝে নিতে পারো।
আমি এটা কখনোই বলবো না যে আমার কোনো মেয়েদের প্রতি ইন্টারেস্ট ছিল না। আর না আমি বলবো আমার জীবনে কখনো কোনো মেয়ে আসেনি। এসেছিলো এক মিষ্টি মেয়ে। আমার মন কেড়ে নিয়েছিলো ১০ বছরের এক পুচকি। আমি ভাবতেও পারিনি যে কখনো আমি একটা পুচকি মেয়ের প্রেমে পড়বো। কিন্তু পড়ে গেলাম সেই পুচকি মেয়ের প্রেমে। সেদিন মেয়েটির ১০তম জন্মদিন ছিল। প্রিন্সেস সেজে এসে আমার কাছে আবদার করছিলো,
আমাকে গিফট দিবে না ভাইয়া? আমি কিন্তু বিশাল বড় লাগেজ চাই যেটা চকলেট দিয়ে ভরা থাকবে দিবে?
আমি বললাম এত চকলেট দিয়ে কি করবি? আমি দেখেছি সুমি আপুর জন্মদিনে তাকে লাবিব দুলাভাই লাগেজ ভরে চকলেট দিয়েছে।
সুমি তো লাবিবের বউ হয় তাই এত চকলেট দিয়েছে তুই কি আমার বউ হোস যে তোকে আমি এত চকলেট দিবো?
এতে ওর মুখ কালো করে বলে, তাইলে দিবে না আমায়?
আমি সেদিন হেসে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললাম,
ঠিক আছে দিবোনে।
সে খুশি হয়ে লাফিয়ে বলে,
সত্যিই কবে দিবে?
আজই দিবো।
সেদিন প্রিন্সেস ড্রেসে তাকে সত্যি প্রিন্সেস লাগছিল। সিড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ঠাস করে পড়ে গিয়েছিল। মাত্র আর দুইটা সিড়ি বাকি ছিল। পায়ে একটু ব্যাথা পেয়েছিল। তবে ওই ব্যাথাটা আমার কাছে কত বিরাট লেগেছিল। আমায় টেনশন করতে দেখে সে আরও পেয়ে বসলো। ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ভাসিয়ে দিলো। চোখের কাজল লেপ্টে পুরো সাজ নষ্ট করে দিয়েছিলো। কত কথা বলে কান্না থামিয়ে সেই নষ্ট সাজেই কেক কাটিয়েছিলাম। তখন সাজের কথা সে খেয়ালই করেনি। কিন্তু কেক কাটার পর খেয়াল করেছে। কেক কাটার ছবিগুলোয় নিজেকে দেখে আরেকদফা কেঁদেছে। আমি আগেভাগে পালিয়ে গিয়েছিলাম সেখান থেকে।
আমার ভাবতেই কি যে হাসি আসে, সাফিন আহমেদ কিনা এই পুচকি মেয়ের প্রেমে পড়েছে।
ধীরে ধীরে ও আমার চোখের সামনে বড় হতে লাগলো আমি ততই বেসামাল হতে লাগলাম। অনেকসময় মনে হতো আমি ভুল করছি। ও অনেক ছোট। একমন বলত এটা প্রেমে নয়, আমি ওর প্রেমে পড়িনি ও শুধুই মোহ। আর কিছু না। আরেকমন বলতো মোহ হলেও হোক। যাইহোক ওর প্রতি আমি কিছু অনুভব করি। জানিস তখন আমি ভেবেও নিয়েছিলাম, বিয়ে করলে ওকেই করবো। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর প্রতি অধিকার ফলাতে লাগলাম এরপর থেকে খেয়াল করলাম ও আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার সাথে কারণ ছাড়া কথাও বলতো না কিন্তু সায়মনের সাথে ঠিকই হেসে হেসে কথা বলতো। আমি তখন বুঝতেই পারিনি ওর মনে তখন আমার ভাইয়ের রাজত্ব। ওর উপর আমার রাগ বাড়লো, মনে হলো স্কুলে কোনো ছেলের সাথে হয়তো সম্পর্কে জড়িয়েছে। আমি চালাকি করে স্কুল বদলিয়ে গার্লস স্কুলে ভর্তি করালাম, ছেলে টিউটর বদলে ফেললাম। আমায় কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। ভড়দের ভাবনা ছিল,
আমি যা করবো ওর ভালোর জন্যই করবো।
আমি চেষ্টা করতাম ওকে সবসময় শাসনে রাখার এতে হয়তো ওর জীবনে কোনো ছেলে আসতে পারবে না, একসময় দেখলাম ও আমায় কেমন ভয় পেতে লাগলো। কেমন প্রত্যেক কথায় ভাই ভাই করতো। তবুও মেনে নিতাম।
আমি সবসনয় চাইতাম নিজের পায়ে দাঁড়াতে। আমি চাইলেই সেখানেই ব্যবসায় করতে পারতাম কিন্তু নিজের মনকে আরও প্রশ্রয় না দিতে ঢাকায় চলে গেলাম। তিল তিল করে সেখানে নিজের ব্যবসায় দাঁড় করালাম। ভাবলাম অরীন প্রাপ্তবয়স্ক ও একটু ম্যাচিউর হলে চাচা -চাকিকে বিয়ের প্রস্তাব দিবো। মা অনেক আগে থেকেই জানতো। সেও সাই দিয়েছিলো এতে।
বছরের পর বছর এভাবেই চলতে লাগলো। আমি আমার কিছু ছেলে দিয়ে খোঁজ রাখতাম। ওরা বলতো ও কোনো ছেলের সাথে কথা বলতো না মিশতো না। ওকে সবসময় আমার ভাইয়ের সাথেই দেখতো। এতে আমি নিশ্চিত থাকতাম। আমি কতটা বোকা তাই না? আমার প্রেয়সী আমার সামনেই আমার ভাইয়ের সাথে….
থাক আর না বলি….
সাফিন গ্লাসের পানি খেয়ে উঠে বসে। অরীন চোখের জল মুছে নিজের উন্মুক্ত গায়ে চাদর জড়িয়ে নিজেও উঠে বসে।
সাফিন অন্যদিকে চেয়ে আছে। অরীনের আফসোস হচ্ছে তার অজান্তেই কেউ তাকে এত ভালোবেসে গেলো আর সে তা টেরও পেলো না। সে কেনো সায়মন ভাইকে ভালোবাসতে গেলো? সে কেনো সাফিনকে নিয়ে ভাবলো না।
অরীন কাঁদছে টের পেয়ে সাফিন তাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু একে বলে,
কাঁদে না বউ৷ তবুও যদি কাঁদতে ইচ্ছে করে তাহলে অন্য টেকনিকে কাঁদাতে পারি।
অরীন শুনলো না তার কথা। সে কেঁদে বলে,
আপনি আমার জীবনে আগে এলেন না কেনো?
তোমার জীবনে আমি আগে থেকেই ছিলাম তুমি উপলব্ধি করতে পারোনি।
আমি খুব বোকা তাই না?
অবশেষে স্বীকার করলে?
হ্যাঁ এখন আমার তাই মনে হচ্ছে।
আচ্ছা ঘুমাও নাহলে আমার মুড চেঞ্জ হলে ঘুমাতে পারবে না।
তুমি এত অসভ্য কেন?
সভ্য হতে বলছো?
হুম
সভ্য হলে তো সমস্যা পরে তুমি আমার সিস্টেমের দিকে আঙুল তুলবে।
ছিহ তুমি আসলেই অসভ্য। ঘুমাও।
উহুম তোমার কথায় আমার সিস্টেমে সবুজ বাতি জ্বলেছে এতে মুডও চেঞ্জ হয়ে গেছে। এখন ঘুমানো যাবে না।
অরীন ঢোক গিলে অপরপাশ ফিরে ঘুমানোর ভান করে জোরে নাক টানতে থাকে। সাফিন অরীনের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উন্মুক্ত দেহে অবাধ্য হাত বিচরণ করে। অরীন কেপে উঠে বেহায়া ছোয়ায়। না পেরে পিছন ফিরে সাফিনকে জড়িয়ে ধরে। সাফিন হেসে আবারও মত্ত হয়ে যায় তার বোকাবউয়ের মাঝে।
ঢাকা আসার একমাস পূর্ণ হলো অরীনের। সাফিন তাকে ট্রান্সফার করে এখানেই ভার্সিটিতে ভর্তি করে দিয়েছে। সাফিনের সাথে অরীন খুব সুখে আছে। সে এখন পুরোদমে সংসারী হয়ে উঠেছে। সংসার ও পড়াশোনা সুন্দরভাবে সামলাচ্ছে। বাবা মা চাচির সাথে রোজ কথা হয়। রিয়া ভাবীর সাথেও মাঝমধ্যে কথা হয় অরীনের।
চাচির থেকে শুনেছে ভাবী আগের তুলনায় কেমন মনমরা হয়ে গেছে। কেমন চুপচাপ থাকে। অনেক শুকিয়েও গেছে। কিন্তু অরীনের সাথে যখন কথা বলে তখন কত স্বাভাবিক ব্যবহার করে।
বিকেল ৫ টা। অরীন রাতের জন্য রান্না করছে। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে চুলোর আঁচ কমিয়ে দরজা খুলতে যায়। পাশের ফ্লাটে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে৷ মহিলাটিকে দেখেই অরীন হেসে ভিতরে আসতে বলে। মহিলাটি ভিতরে এসে বলে
স্বামী -স্ত্রী একাই থাকো?
অরীন হেসে বলে, জ্বী আন্টি।আপনি বসুন আমি আপনার জন্য চা বানিয়ে আনি।
আরে না না মা কষ্ট করতে হবে না। এমনি দেখা করতে এসেছি। নতুন তো তেমন কাউকে চিনি না। শুধু পরিচিত হতে এলাম।
তবুও আপনি বসুন আমি চা বানিয়ে আনি। পাঁচ মিনিট লাগবে শুধু।
দরজা না লাগিয়ে অরীন ছুটে যায় রান্নাঘরে চা বানাতে।
তরকারি হয়ে গেছে। সে চুলা বন্ধ করে দুই কাপে চা ঢেলে ড্রয়িং রুমে এসে দেখে মহিলাটির পাশে একটা ছেলে বুকে হাত ভাজ করে সারা বাড়িতে নজড় বুলাচ্ছে।
অরীন আসতেই ছেলেটা ঠিকঠাক দাঁড়ায়। মহিলা হেসে বলে,
আমার ছেলে নাহিদ। আমার খুঁজতে খুজতে এসেছে।
অরীন হেসে বলে, আপনি বসুন না দাঁড়িয়ে আছেন কেনো বসুন।
ছেলেটা হাসার চেষ্টা করে বসে বলে,
আপনাকে কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে।
কিন্তু আপনাকে আমি প্রথম দেখলাম।
আচ্ছা।
অরীন নিজের জন্য বানানো চায়ের কাপ নাহিদকে দিয়ে দেয়।
অরীন মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে,
আপনারা তো আজই এলেন, আমি আজকের রাতের খাবারটা আপনাদের দিয়ে যাবো আপনি না বলবেন না।
আরেহ না মা তোমার এতো কষ্ট করতে হবে না। আমরা বাহির থেকে খবার অর্ডার করে নিবো।
এখানে কষ্টের কিছু নেই আন্টি। আমরা আপনার প্রতিবেশী, এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে৷
নাহিদ মুগ্ধ হয়ে দেখছে অরীনকে। সে এবার প্রশ্ন করলো।
আপনি পড়ালেখা করেন?
জ্বী
কিসে পড়েন
অনার্স প্রথম বর্ষে।
আমিও অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি। তা কোন ভার্সিটিতে পড়েন আর ডিপার্টমেন্ট ?
অরীন ভার্সিটির নাম ও ডিপার্টমেন্টের নাম বলতেই বলতেই নাহিদ চমকে বলে, এজন্যই বলছিলাম আপনাকে পরিচিত মনে হচ্ছে। আমিও তো একই ভার্সিটিতে পড়ি৷ আর আমাদের ডিপার্টমেন্টও সেম। কি আশ্চর্য তাই না।
অরীন ইতস্তত ভঙ্গিতে হাসে। মহিলাটি উঠে তাদের ঘরগুলো দেখছে। আর লোকটি যেভাবে অবাক হয়ে কথা বলছে অরীনের কাছে এটা অতিরিক্ত বই কিছু লাগছে না । এতে অবাক হওয়ার কি আছে? তবুও তার বাসায় এসেছে কি আর করার। তার ঘরের আরও অনেক কাজ আছে মহিলাটির সাথে কথা বলতে তার কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু ছেলেটির সাথে কথা বলতে তার মোটেও ইচ্ছে করছে না।
ছেলেটা বাঁচাল। একেরপর এক কথা বলেই যাচ্ছে। মহিলাটি বোধহয় রান্নাঘরে গিয়েছে।
সাফিন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে ড্রয়িংরুমে অপরিচিত ছেলেকে দেখে কপাল কুচকায়। ড্রয়িংরুমে আপাতত অরীন আর ছেলেটি বসা। ছেলেটি হেসে হেসে কথা বলছে। অরীনও মাথা দুলাচ্ছে উল্টো দিক হওয়ায় চেহারার ভঙ্গিমা দেখা যায়না। সাফিনের চোখ লালবর্ণ ধারণ করেছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করা। হাতের ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে মেঝেতে।
কিছু পরার শব্দে অরীন পিছু ফিরে সাফিনকে দেখে চমকে যায়।
সাফিনের রাগার কারণ অরীন বুঝতে পারছে না। সাফিন এগিয়ে এসে অরীনের দিকে তাকিয়ে আরেকবার নাহিদের দিকে তাকায়। অরীন সাফিনের নজড় লক্ষ্য করে নাহিদের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো সাফিন তাকে ভুল বুঝছে।
তারা আমাদের পাশের ফ্লাটে নতুন এসেছে। আমাদের সাথে পরিচিত হতে এসেছিল। ভিতরেই উনার মা মানে আন্টি আছেন আমাদের বাড়িটা ঘুরে ঘুরো দেখছে।
সাফিন নির্বাক। সে একদৃষ্টিতে মেঝেতে তাকিয়ে আছে।
নাহিদ হেঁসে বলে,
হাই ভাইয়া আমি নাহিদ।
সাফিন তার কথার উত্তর দিলো না। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই অরীন আন্টি আন্টি বলে তাকতেই মহিলাটি সেখানে এসে কিছু বলতে নেয় তার আগেই অরীন বলে,
আসুন আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। উনি আমার হাসবেন্ড।
নাহিদ চমকে তাকায় সাফিনের দিকে। সে বলে
আমি তো উনাকে তোমার ভাই ভেবেছিলাম।
প্রথমত ভাই এরপর অরীনকে “তুমি” করে ডাকা। সাফিনের রাগ দ্বিগুণ করতে নাহিদের এই কথাটাই যথেষ্ট ছিল।
" আমার রুমে অচেনা কারোর ঢুকা পছন্দ করিনা। আর না পছন্দ করি আমার বাড়িতে আসা বিশেষ করে ছেলে মানুষদের। "
বলেই একপলক নাহিদের দিকে তাকিয়ে নিজের রুমের ঢুকে পড়ে।
অরীন তাদের সামনে খুব লজ্জায় পরে এভাবে কেউ প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে আন্তরিকতাও দেখালো না লোকটা। অরীন তাদের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল
- আমার স্বামী একটু রাগী আবার কাজ করে বাড়ি ফিরেছে তো মাথাটা একটু গরম। আপনারা কিছু মনে করবেন না।
- আরেহ সমস্যা নেই মা। আজ আসি কেমন?
অরীন হেঁসে তাদের বিদায় দিয়ে জোড়ে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে তাদের বেডরুমের দিকে তাকায়।
সে সাফিনকে প্রশ্ন করবে তারা বলতে গেলে আমাদের মেহমানই। তাদের সাথে এমন ব্যবহারের মানে কি? কথায় কথায় এত রাগ কেনো থাকবে।
অরীন বিছানায় বসে সাফিনের জন্য অপেক্ষা করে বারবার ঘড়ি দেখে আর ভাবে কখন বের হবে।
সাফিন বের হয়েছে একদম খালি গায়ে, কোমড়ের নিচে তোয়ালে দিয়ে বাধা যা হাটু পর্যন্ত ঢাকা হয়েছে। পায়ে লোম ভেজা৷ খালি লোমহীন ঘা পানির ফোঁটা জ্বলজ্বল করছে। আয়নায় অরীনকে পিঠ করে দাড়ালো সাফিন। তার চওড়া পিঠ থেকে চোখ সরিয়ে মেঝেতে তাকিয়ে ঢোক গিলে অরীন। এ লোকের সাথে এতসময় ধরে ঝগড়া করার উদ্দেশ্যে বসে ছিলো। এখন কেমন গলা শুকিয়ে আসছে, ঝগড়া করার ইচ্ছেও চলে যাচ্ছে। অরীন আবারও মোহগ্রস্ত চোখে সাফিনকে দেখে। সাফিনের মুখ লাল চোখদুটোও লাল হয়ে আছে যেনো পারলে এখনি তাকে গিলে খাবে। লোকটাকে এখন একটুও ভয় করছে না।
অরীন এগিয়ে সাফিনের ঘা ঘেঁষে দাড়িয়ে পিঠে হাত রাখে। সাফিন অরীনের চোখের ভাষা বুঝেও না বুঝার মতো এড়িয়ে যেতে নিলে অরীন তার তোয়ালে খামচে ধরে। এমনভাবে খমচে ধরেছে এখন ছাড়লেই সাফিন বিপাকে পড়ে যাবে। যদিও বউয়ের সামনে এই বিপাকে পড়া আহামরি কিছু না। বউ তো তার সব দেখেছেই কিন্তু এখন সময় ও পরিস্থিতি দুটোই আলাদা। সে ধমকে বলে
- এটা কি ধরনের অসভ্যতামো? তোয়ালে ছাড়।
শেষের কথাটা আরও জোড়ে ধমকিয়ে বলায় অরীন ছেড়ে দেয়। সাফিনের থেকে এমন ব্যবহার আশা করেনি সাফিন তাকে এভাবে ধমকাতে পারলো? সে এবার ইচ্ছে করে সাফিনের তোয়ালে টান দিয়ে খুলে ফেলে বলে,
- অসভ্যতামীর কি দেখেছো আমার সাথে ধমকিয়ে কথা বললে আরও দেখাবো।
বলে হনহন করে সেখান থেকে চলে যায়।
সাফিন তাড়াহুড়ো করে তোয়ালে উঠিয়ে পেচিয়ে নেয়।
কিছুসময় পর হাফপ্যান্ট পড়ে বের হয়ে দেখে অরীন সোফায় বসে ছাঁদ থেকে আনা শুকানো জামাকাপড় ভাজ করছে। সাফিন তার হাতে থাকা জামাটা টান দিয়ে নিয়ে নেয়৷ অরীন আরেকটা নেয় এটাও সাফিন নিয়ে নিলে চেচিয়ে বলে,
- কি সমস্যা?
- জানিস না কি সমস্যা?
- নাহ জানি না।
সাফিন অরীনকে টেনে উঠিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
- ফারদার যদি কাউকে বাসায় ঢুকতে দিয়েছিস তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।
- ঘরে আপনার কি এমন মূর্ল্যবান সম্পত্তি আছে যে কাউকে ঢুকতে দেওয়া যাবে না?
- আছে। আমি অনেক বড় মূল্যবান জিনিস রেখে যাই তুই বুঝবি না।
- আপনার আজাইরা কথা বুঝার ইচ্ছেও নেই।
- অরীন তুই কিন্তু অনেক বাড়াবাড়ি করছিস?
- আর আপনি? আপনি বাড়াবাড়ি করছেন না?? কি দরকার ছিলো তাদের সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করার হ্যাঁ এটা আপনার কি একটু বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে না? মানলাম আপনার তাদের বাসায় আসা পছন্দ হয়নি আপনি তো চুপ করে রুমে চলে যেতেও পারতেন।
- অরীন
-একদম ধমকাবেন না আমায়। ম্যানালেস লোক, আপনি আন্তরিকতা বুঝেন? বুঝেন শুধু ধমকাতে আর রাগতে।
- আহ্
সাফিন অরীনকে থাপ্পড় মারতেই সোফায় আচড়ে পড়ে অরীন। গালে হাত দিয়ে হুহু করে কেঁদে দেয়।সাফিন অরীনের পিছনের চুল শক্ত করে ধরে নিচের মুখের কাছে এনে দাঁত কটমট করে বলে,
- তুই আমায় আন্তরিকতা শিখাস? হ্যাঁ আমায়? আমি বুঝি না? তুই কতদিন ধরে দুনিয়া দেখেছিস? কি জানিস এই নিষ্ঠুর দুনিয়ার? এই কোথাকার না কোথাকার মানুষের জন্য আমার সাথে ঝগড়া করছিস? আমি তোকে এমনি এমনিই ধমকাই হুম?
- ব্যাথা পাচ্ছি।
কথা বলার সময় সাফিন এতটা রেগে কথা বলছিলো অরীন যে ব্যাথা পাচ্ছে তার কোনো হিশ নেই। সাফিন তাকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। তারপর বলে,
- তুই জানিস এখন কি পরিস্থিতি চলছে? মেয়েরা তো নিজের বাসাতেও নিরাপদ না। জানোয়ার রা বড় ছোট আপন পরের লেহাজ মানছে না তুই কি না অপরিচিত দুটো মানুষকে বাড়িতে ঢুকতে দিলি? এত সাহস? ওই তুই খবর দেখিস না? মোবাইলে ধ’*ণের খবর আসে না চোখের সামনে?
সাফিন আবারও রাগ নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পেরে অরীনের চোয়াল শক্ত হাতে চেপে ধরে বলে। অরীনের মনে হচ্ছে তার দাঁত ভেঙে যাবে। ব্যাথায় মুখ লাল হয়ে উঠে। সাফিন কিছুতেই রাগ সামলাতে না পেরে কাচের গ্লাস মেঝেতে ছুড়ে মারে।
- আর কোনোদিন কোনো অপরিচিত কাউকে রুমে কি বাড়িতে ঢুকতে দিবি না, তোর কোনো প্রয়োজন নেই প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ার। বাসায় যদি একা একা এতোই বোরিং লাগে তুই আমায় কল দিবি ্আমাকে একশ বার কল দিলে আমি একশবার তোর কল উঠাবো। একফোঁটাও বিরক্ত হবো না। আর নয়লে বাড়িতে কল দিবি মা আছে বাবা আছে চাচি, চাচা, ভাবি সবাই আছে তাদের সাথে কথা বলবি। বান্ধবী থাকলে তাদের সাথে ফোনে কথা বলবি। সেক্ষেত্রে আমার কোনো আপত্তি নেই। বুঝতে পারছিস??
অরীন মুখে হাত চেপে কেঁদেই চলছে। সাফিন রেগে আবারও ধমকে বলে
- বুঝতে পেরেছিস??
অরীন ভয়ে সাথে সাথে মাথা নাড়ায়। সাফিন আবারও অরীনের চোয়াল চেপে বলে,
- মুখ নেই তোর কথা বলতে পারিস না?
অরীন এবার জোড়ে কেঁদে দেয়। এতে অরীনের চোয়াল আরও শক্ত করে ধরে বলে, কি সমস্যা তোর?
-হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি।
কাদতে কাঁদতে অরীন মুখ চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। সাফিনের কাছে ওকে আস্ত একটা স্ট্রবেরি মনে হচ্ছে। সাফিন ঢোক গিলল। এই না একটু আগে দুজন যুদ্ধ করছিলো।
সাফিন অন্যদিকে চেয়ে নিজেকে ধাতস্ত করতে চাইলো কিন্তু হলো না। সে ঝটপট করে অরীনকে কোলে তুলে নিলো। অরীন কেঁদেই চলছিলো হঠাৎ সাফিন কোলে নেওয়ায় কান্না থামিয়ে সাফিনের কাজ দেখতে থাকে। অরীনকে রুমে এনে বিছানায় শুয়িয়ে মোহগ্রস্ত চোখে তাকিয়ে অরীনের ঠোঁটের দিকে এগিয়ে আসে।
অরীন মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে বলে
- ভালো লাগছে না ছাড়ুন।
- রাগ করেছিস? আমি তো ভুল কিছু বলিনি তুই একবার ভেবে দেখ…
- ভাল্লাগছে না ছাড়ুন।
সাফিন কপাল কুচকে আরও শক্ত করে অরীনকে ধরতেই অরীন চেচিয়ে বলে,
- বললাম তো ভালো লাগছে না তবুও ছাড়ছেন না কেনো সবসময় এসব ভালো লাগে না।
- রাগ দেখাচ্ছিস কার সাথে?
রাগ দেখাবো কেনো? সেটা তো আপনার কাজ।
- তা ঠিক। আয় কাছে আয়।
- নাহ ছাড়ুন।
- “ভালো লাগছে না “ “ছাড়ুন “ “ছাড়ুন”
আরেকবার এসব গাইগুই করলে থাপড়িয়ে দাত ভেঙে দেবো।
- আপনি তো তাই পারবেন।
বলে কা্ন্না করে দেয় অরীন।
সাফিন কিছুসময় অরীনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,
- কাঁদছিস কেনো? আমার ছোঁয়া খারাপ লাগছে?
সাফিন রেগে বলতেই অরীন কান্না থামিয়ে তার দিকে তাকালো। এখন অরীনের ইচ্ছে করছে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে টপকিয়ে যেতে। তারছিড়া পাগল লোক কোথাকার।
- ঠিক আছে তোর পারমিশন ছাড়া আর তোকে ছুবো না।
বলে অন্য দিকে ফিরে শুয়ে পড়ে। অরীন কিছুসময় সাফিনের দিকে কটমট করে চেয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে। তার আর কথা বাড়াতে ভালো লাগছে না। একটু পর পরিবেশ ঠান্ডা হলে এমনি সব ঠিক হয়ে যাবে।
সাফিন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। সে ভেবেছিলো অরীন তাকে এসে বোঝাবে বলবে
সে ভুল ভাবছে কিন্তু অরীন এসব কিচ্ছু করলো না। সাফিনের মনে হলো এরমানে সত্যিই সাফিনের ছোঁয়া অরীনের খারাপ লাগে। সে তো ভাবতো তার ছোঁয়া অরীন উপভোগ করে। সাফিন এভাবে চুপচাপ কিছুক্ষন শুয়ে থাকে।
অরীনের মন আনচান করতে থাকে। সবসময় সাফিন অফিস থেকে এসে তার সাথে সময় কাটায়,গল্প করে, একসাথে মুভি দেখে তখন সাফিন অরীনের সংস্পর্শেই থাকে।
এটা এখন অরীনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সে উল্টোঘুরে সাফিনের বাহুতে হাত রাখতেই সাফিন সাথে সাথে সরিয়ে ফেলে। এমন ছাড়া মেরে সরিয়েছে যে দ্বিতীয়বার ছোঁয়ার সাহস পেলো না অরীন।
সাফিন আর শুয় নি। উঠে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ে। অরীনও উঠে বের হলো রুম থেকে। ড্রয়িংরুমের ভাঙা গ্লাসগুলো উঠিয়ে জায়গা টা পরিষ্কার করলো। তারপর সাফিনের জন্য ব্লাক কফি নিয়ে রুমে ঢুকলো।
অরীন রুমে ঢুকেছে খেয়াল করেও সাফিন সেদিকে তাকায় না। অরীন সাফিনের সামনে কফির কাপটা বাড়াতেই সে মুখ গুমড়ো করে বলে,
- নিচে রাখেন।
- আবার “আপনি” বলে ডাকছেন কেনো?
- আমার তুমি ডাক তো আপনার ভালো নাও লাগতে পারে তাই আগে থেকে সতর্ক হলাম।
অরীন বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সায়মন অফিস থেকে ফিরে রুমে এসে শার্ট খুলে বিছানায় ছুঁড়ে মেরে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। রিয়া সায়মনকে বাড়ি আসতে দেখে সাথে সাথে রুমে আসে কিন্তু সায়মনকে পায়না। বিছানায় পড়ে থাকা শার্টটা ধোঁয়ার জন্য নিতেই মেয়েলি পারফিউম এর গন্ধ পেলো। সে নিজের জামায় ঘ্রাণ নিয়ে সেই পারফিউমের গন্ধটা পেলো না। তার চোখ যখন ঘেমে ভিজে যাওয়া শার্ট টার উপর যায় সে না চাইতেও শার্টটা নিজের নাকের কাছে এনে ঘ্রাণ নেয়। পারফিউমের গন্ধ এখান থেকে আসছে। কিছুক্ষন শার্টের দিকে তাকিয়ে থাকে রিয়া। শার্টটা পুরোপুরি মেলতেই বুকের পাশে কড়া গাঢ় লাল লিপস্টিকের দাগ দেখতে পায়। ঠোঁটের ছোঁয়া পড়ায় ঠোঁটের আকৃতির ছাপ বয়ে গেছে। রিয়া কান্না আটকানোর চেষ্টা করে ওয়াশরুমে তাকিয়ে থাকে সেখান থেকে পানির শব্দের পাশাপাশি সায়মনের গলার স্বর শুনতে পাচ্ছে। সায়মন গোসলের সাথে গানও গাইছে। কন্ঠ শুনে বুঝা গেল আজ তার মন ফুরফুরে।
বিগত দিনগুলোতে রিয়া সায়মনের পরিবর্তন খেয়াল করেছে। আগের মতো প্রাণখুলে তার সাথে কথা বলে না,কাছের আসে না। আগের মতো ভালোবাসে না। যখন কাছে আসে তখন চেহারায় শুধু কামুকতা থাকে, ভালোবাসা নয়। ঠিকমতো বাড়িও ফিরে না। অন্যদিনের তুলনায় আজ তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে খুশি হয়েছিল রিয়া সেই খুশিটুকুও কেড়ে নিলো এই দৃশ্যটি। সে আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগলো। আগের তুলনায় অনেক শুকিয়ে গেছে। চাপাও ভেঙেছে। আগের মতো তেমন খেতে পারে না, কেমন বমি বমি লাগে। এটা কাউকে বলেনি রিয়া। চাচি ও মা(সায়মনের মা) কতবার জিজ্ঞেস করেছে তার কিছু হয়েছে কি না ঠিকমতো খাচ্ছে না কেনো সায়মনের সাথে কিছু হলো কি না। সে তাদের কিছুই বলেনি। এসব বলা যায় না বড়দের লজ্জার বিষয়।
সে জায়গা থেকে নড়ছে না। একইভাবে হাতে শার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সায়মন বের হয়ে রিয়াকে তার শার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল
কি হয়েছে।
রিয়া এবার জোড়ে কান্না করে দিলো।
সায়মন থমকে বলল
কান্না করছো কেন? কি হয়েছে?
কান্না করতে করতে বিছানায় বসে পড়ে রিয়া। সায়মন এসে আবারও বলল
বলবে কি হয়েছে? অফিস থেকে ফিরে এই প্যাচ প্যাচ ভালো লাগছে না।
রিয়া শার্ট দেখিয়ে বলল
এগুলো কি? আপনি আমাকে ধোঁকা দিচ্ছেন?
শার্টের লিপস্টিক টা সায়মনের চোখে পড়তেই সে অন্যদিকে তাকিয়ে কপাল চুলকাতে থাকে। রিয়া তার মুখে শার্ট ছুড়ে মেরে বলল,
আপনি একটা কাপুরুষ। এবার বুঝতে পেরেছি আপনার বদলানোর কারন। নতুন
লজ্জা করে না আপনার ছিহ আপনি আমার স্বামী ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে আমার।
সায়মন ওর বাহু ধরে বসাতে চাইলে রিয়া দূরে সরে যায়।
তোমার ভুল বুঝছো আমায় ওয়েট আমি তোমায় সবকিছু এক্সপ্লেন করছি।
কি এক্সপ্লেন করবেন? আমি বোকা নাকি আপনি আমায় যা বোঝাবেন আমি তাই বুঝবো? আপনার কুকর্মের কথা আমি সবাইকে জানিয়ে না দিয়েছি তো আমার নাম ও রিয়া না।
সায়মন রিয়ার গালে চড় বসিয়ে বলল
সবাইকে জানাবি? যা জানা দেখি কত কলিজা বেড়েছে তোর।
রিয়া চোখ মুছে বলল,
আমি আপনাকে কখনো মাফ করবো না।
বলে চলে যেতে নিলে সায়মন হাত ধরে টান দিয়ে আবারও থাপ্পড় মারে।
শু**য়ো****** বেশি মাথায় উঠিয়ে ফেলেছি দেখে লাই বেড়ে গেছে? আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করবো তোর যদি এতে এতোই সমস্যা হয় তাইলে যাহ বাপের বাড়ি চলে যাবি আর কাউকে কিছু বললে তোর কি হাল করবো ভাবতেও পারবি না।
ভয় পাই না আপনাকে।
ভয় পাস না?
নাহ
সায়মন কাবার্ড থেকে বেল নিয়ে হাতে পেঁচাতে পেচাতে বলল,
এখন থেকে তোর বাপও ভয় পাবে আমায়।
রিয়া চিৎকার করে ডাকতে চাইলে ওর মুখ চেপে ধরে বুক থেকে ওড়না নিয়ে মুখে পেঁচাতে নেয়। দুজনের মধ্যে প্রচুর হাতাহাতি হতে থাকে কিন্তু সায়মনের সাথে রিয়া পেরে উঠে না। বিছানায় রিয়াকে ফেলে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। মেরে ক্লান্ত হওয়ার পর যৌ"ন চাহিদা মিটাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে।
আপনি কি ঘাড়ত্যাড়ামি করার পণ করেছেন?
অরীনের কথায় সাফিন স্বাভাবিক ভাবে বলল
কিছু বললেন? আসলে শুনতে পাইনি।
অরীনের এবার রাগ লাগছে। কতক্ষন ধরে এই লোকটার পিছু ঘুরছে লোকটা যেন তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না উল্টো পাল্টা কথা বলছে। এসব কাজ তো মেয়েদের ছেলেদের থেকে এসব আশা করা যায়?
আমার কিন্তু এখন খুব রাগ হচ্ছে সাফিন ভাই৷
অরীন ইচ্ছে করে সাফিন ভাই বলল এতে যদি লোকটা তার সাথে ঝগড়া করে তা কম কি?
আমি কিছু করেছি?
এইযে কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করছেন।
দুঃখীত।
অরীন এবার সাফিনের কোলে বসতে নিলে সাফিন সরে যায় এতে টাল সামলাতে না পেরে অরীন মেঝেতে পড়ে গেল। সে ব্যাথা পায়নি কিন্তু ব্যাথাজনক শব্দ করে বলল
আপনি আমায় ফেলে দিলেন?
আমি আপনাকে কোথায় ফেললাম আপনি তো নিজেই পড়ে গেলেন।
তো আপনি সরে গেলেন কেন?
আমি না সরলে তো আপনি আমার কুলে বসতেন। কুলে বসলে তো আমি না চাইতেও আপনাকে ছুবো তখন আমার ছোঁয়া তো আপনার ভালো লাগবে না।
ওই ঘুরে ফিরে লোকটা সেই জায়গায় গিয়ে আটকে আছে। এত সামান্য বিষয়টা সে এত বড় করে নিবে কে জানতো? কিন্তু অরীন তো বলেনি তার ছোঁয়া ওর ভালো লাগে না।
দেখুন আপনি ভুল বুঝছেন।
সাফিন নিরুত্তর। অরীন এবার তার পাশে বসে আচানক সাফিনের গালে চুমু খেল। সাফিন কিছু বলল না। অরীন বুঝতে পারলো সাফিন মন নরম হয়েছে। এসে পুনরায় সাফিনের ঠোঁটের কোনে চুমু গেল।
আপনার ছোঁয়ায় এক আলাদারকমের মোহনীয়তা থাকে, টান থাকে। আপনার ছোঁয়ায় আমার প্রতি আপনার গভীর ভালোবাসা টের পাই বুঝলেন?
তখনকার কথার মানে আপনি উল্টো ধরেছেন। আমি তখন বলতে চেয়েছি আমার রোমান্স করতে ইচ্ছে করছে না। ওইটা ভালো লাগছে মা কিন্তু আপনি কত দূর ভেবে ফেলেছেন৷
হুম।
কথা বলবেন না?
সাফিন আচানক অরীনের ঠোঁটদুটো দখল করে নিলো। চুমুর মাঝেও অরীন হেসে ফেলে সাফিনের বাচ্চামো দেখে। মধুসুধা পান করে সাফিন অরীনকে ছেড়ে দিতেই দুজন হাপাতে থাকে। এরমাঝে কলিং বেল বেজে উঠে।
অরীনের পিছু পিছু সাফিনও আসে দরজার কাছে। লুকিং মিররে উঁকি মেরে নাহিদকে দেখে অরীন পিছু ফিরে সাফিনকে দেখে।
সাফিন ভ্রু নাড়াতেই অরীন মাথা দুলায় কিছু না। সে দরজা খুলে দিলো।
নাহিদ সাফিনকে খেয়াল করেনি। সে হেসে বলল
হাই তোমার নামটা ভুলে গেছি।
অরীন।
হ্যাঁ অরীন তো তুমি
আপনি করে ডাকুন। এটাকে ভদ্রতা বলে।
অরীনের পিছন থেকে সাফিন বের হয়ে এসে কথাটি বলে।
জ্বী।
আর নাম ধরে না ডেকে ভাবী বললে ডাকবেন কেমন?
জ্বী ভাই।
তো কিছু বলতে এসেছেন?
হুম, অর..সরি ভাবী বলেছিলো রাতের খাবারটা দিবেন। তার জন্যই এসেছিলাম।
অরীন মনে মনে নিজেকে একশটা গালি দিলো। এত বড় একটা দায়িত্ব নিয়ে সে কিভাবে ভুলে বসলো। আর সাফিন তাদের সাথে যে ব্যবহার করেছে এরপর খাবার নিতে আসবে তা ভাবতেই পারছে না। অরীন খুব লজ্জায় পরে গেলো। অরীন বলল
হ্যাঁ মানে আপনার ফ্যামিলিতে কয়জন তা তো জানা হলো না।
দুজন।
শুধু দুজন?
হ্যাঁ আমি আর আমার মা।
সাফিন কপাল কুচকে ফেলল। অরীন বলল
আচ্ছা আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি কষ্ট করে একটু অপেক্ষা করুন।
হ্যাঁ কোনো সমস্যা নেই। অরীন ভিতরে চলে যেতেই সাফিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। নাহিদ ভেবেছিল ভিতরে বসতে দেবে কিন্তু সাফিনকে সং সেজে দাঁড়িয়ে থাকতে থেকে বুঝলো তার এখানেই অপেক্ষা করতে হবে। সাফিন তাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। সেও হাসার চেষ্টা করে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে পালটা প্রশ্ন সেও জিজ্ঞেস করছে।
অরীন নিজেদের জন্য বানানো রান্নাগুলো বক্সে ভরে দিলো। নিজেদের জন্য আবারো বানানো যাবে। দুজন মানুষ থাকে শুনে অরীনের একদিক দিয়ে সুবিধাই হয়েছে।
সে খাবার নিয়ে এসে সাফিনের পাশ কেটে যে না নাহিদকে দিতে যাবে তার আগেই সাফিন তার থেকে বক্সগুলো নিয়ে নিলো। তারপর তাকে বলল,
ভিতরে যাও আমি আসছি।
অরীন সাফিনের মতিগতি বুঝার চেষ্টা করলো। সে পিছিয়ে যেতেই সাফিন সেই বক্সগুলো নাহিদকে নিজ হাতে দিলো।
নাহিদ ধন্যবাদ জানাতেই সাফিন প্রতিউত্তরে মুচকি হেসে দরজা বন্ধ করে দিলো।
তারপর অরীনের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল
হয়েছে আমার আন্তরিকতা দেখানো?
অরীন বোকাদের মত চেয়ে থাকলো।
এটাই যেন প্রথম ও শেষবার হয়। এরপর তো কোনো আন্তরিকতার র টুকুও দেখানো দরকার নেই। আর না কোন কথা বলার দরকার আছে। বুঝেছো?
হুম।
বলে অরীন চলে যায় রান্নাঘরে। এ ব্যাপার নিয়ে কথা বাড়াবে না সে৷ তার পিছু পিছু সাফিনও রান্নাঘরে এসে বলল
আজ আমি রান্না করবো। সরো।
আমি থাকতে আপনি কেনো রাঁধবেন?
কোন জায়গায় লিখা আছে বউ থাকতে স্বামীর রান্না করা নিষেধ?
আপনার সাথে তর্ক করতে পারবো না সরুন রাঁধতে দিন।
অরীনের থেকে ছুরিটা নিয়ে ধমকে বলল
চুপ করে দাড়িয়ে থাকো এখানে। আমি রান্না করনো তুমি আমার সাথে গল্প করবে বুঝলে?
আচ্ছা আমি কেটে কুটে দেই আপনি রাধুন।
আচ্ছা।
সাফিন মনো্যোগসহ রাধছে। রান্নার খুশবু অরীনের নাকে আসতেই খিদে পেট চু চু করে উঠে। অরীন রান্না করলেও সে জানে তার রান্না বেশ ভালো হয় না। কিন্তু সাফিনের রান্নার ঘ্রাণ নাকে আসতেই আচঁ করে ফেললো রান্নাটা কত মজা হবে।
সাফিন মুরগী ভুনা করেছে। খাবার মুখে তুলতেই অরীন চোখ বন্ধ করে ফেললো। সাফিন জিজ্ঞেস করলো
কেমন হয়েছে?
অসাধারণ, আপনি এত ভালো রান্না কোথা থেকে শিখেছেন?
ভুলে গেলে এখানে আমি একা থাকতাম? তখন নিজের রান্না নিজের করতে হতো।
একা থাকতে খুব কষ্ট হতো তাই না?
খুবব কিন্তু এখন হয় না। আগে বাড়ি ফিরার কোনো তাড়া থাকতো না আর এখন কখন বাড়ি ফিরবো তাই ভাবতে থাকি। বাড়িতে তো একটা বোকাবউ ফেলে গেছি, সেই বোকা বউয়ের জন্য মন আনচান করতে থাকে।
অরীন লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
রাতে অরীন হাত পায়ে বডিলোশন মাখছে। সাফিন বাবা মায়ের সাথে ফোনে কথা বলছে। কিছুক্ষন পর সেও তাদের সাথে যোগ দেয়। অরীনের মা বাবাও এসে যোগ দিল। সবাই হাসি মজায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হঠাৎ অরীনের ফোনে কল আসে। অরীন ফোনে "ভাবী " নামটা দেখে খুশি হয়ে বলে,
এই দেখো ভাবীও কল দিয়েছে আমায়। দাড়াও ভাবীকে ড্রয়িং রুমে যেতে বলি।
বলে কল রিসিভ করে কিছু বলতে নিবে তার আগেই ওপাশ থেকে কিছু কথা শুনে হাসিমাখা মুখে আঁধার নেমে এলো।
ঝুম বৃষ্টি রুম ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরে সোড়গোল ভেসে আসছে রুমের দরজা সবাই ধাক্কাচ্ছে। রিয়া তাদের সোরগোল শুনতে পাচ্ছে কিন্তু উঠার শক্তি পাচ্ছে না। সারা শরীরে বেল্টের অসংখ্য করাঘাত তারমধ্যে জোরজবরদস্তি যৌ” নির্যাতন রিয়ার সারা শরীর বিষিয়ে উঠে। দুধে আলতা ভরসা শরীর ব্যাথা নীল হয়ে যাচ্ছে। সে খুব কষ্টে জামা পড়েছে জামা দিয়ে ঢাকা শরীর টুকু ছাড়া বাকও সব জায়গা দাগ পড়ে গেছে। ফরসা শরীরে দাগগুলো ভয়ংকর কালো হয়ে আছে৷ সায়মনের ঘুমের সু্যোগে রিয়া অরীনকে কল দিয়ে সবখুলে বলে। এর ফল কি হবে তা জেনেও সে অরীনকে কল দিয়েছে চাইলেই বাবার বাড়ির মানুষদের বলতে পারতো কিন্তু অরীনের সেই ঘটনার পর তারাও বদলে গিয়েছে। তাদের রিয়ার সাথে সম্পর্কেও ফাটল ধরেছে।
সবাই তখনো দরজা ধাক্কিয়েই যাচ্ছে। সে শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। সায়মনের ঘুম ভাঙতে দেখে চোখ বুঝলো রিয়া। সায়মন ঘুম থেকে উঠে বাইরে শব্দ শুনে দরজা খুলে দেয়৷ সায়মন ভুলে বসেছিলো সে রিয়ার সাথে কি করেছে।
হয়েছে টা কি?
সায়মনের কথা শেষ হওয়ার আগেই মোহাম্মদ নাসিম ছেলের গালে চড় বসিয়ে কলার ধরে টেনে আবারও চড় বসায়।
অমানুষ জন্ম দিয়েছি আমি তোর সাহস কি করে হয় ঘরের বউয়ের গায়ে হাত তোলা?
*** তোকে আজ মেরেই ফেলবো।
বলে সায়মনকে একের পর এক আঘাত করতেই থাকে। অরীনের বাবা ভাইকে প্রথম না আটকালেও এখন আটকায় কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। অরীনের মা ও চাচি রিয়ার কাছে আসতেই চমকে যায়। রিয়ার অবস্থা ভালো না। সে অরীনের মায়ের বুকে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
অরীনের মা ও চাচি দুজনেও কাঁদছেন।তাদের খুব গর্ব ছিল এই নিয়ে যে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পেরেছেন। কিন্তু তাদের ধারণা ভেঙে দিলো তাদের বাড়ির বড় ছেলে। তাদের ছেলে পরনারীতে আসক্ত তা কোনোভাবেই তারা মানতে পারতো না যদি না রিয়া সব প্রমাণ দেখাতো। সায়মনের মোবাইল চেক করলে আরও অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে রিয়ার ধারণা নাহ ধারণা নয় এটা রিয়ার বিশ্বাস।
অরীনের বাবা ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। ডাক্তার রিয়ার নাজুক অবস্থা দেখে অনেক প্রশ্ন করলেও তারা এড়িয়ে গেছেন। ডাক্তার রিয়াকে চেক আপ করে বলল,
আপনার লাস্ট পিরিয়ড কবে হয়েছিলো?
ডাক্তারের প্রশ্নে অবাক হয় সবাই। এই অবস্থা তিনি মেয়েলী ব্যাপারে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন কেনো৷ রুমে রিয়ার সাথে অরীনের চাচি ও মা ছিলো।
রিয়ার হটাৎ মনে হলো তার দু মাস ধরে পিরিয়ড হচ্ছে না। সে অবাক হয়ে শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে বলে, দু মাস ধরে হচ্ছে না।
সুখবর আপনি মা হতে যাচ্ছেন। তারপরেও একটা প্রেগ্ন্যাসির কিট এনে সিউর হয়ে দেখবেন।
ডাক্তারের কথায় সবাই হতভম্ব।
অন্য রুমে সায়মনকে আটকে রাখা হয়েছে। মোহাম্মদ নাসিম তো চেয়েছেন জেলে ঢুকিয়ে উত্তমমাত্থম দিয়ে মাথা থেকে পরকিয়ার ভূত নামাবে। ছেলে বলে ওকে ছাড় দিবে না নাসিম। সে নিজের পুলিশের দায়িত্বকে বড় করে দেখে কিন্তু সাফিনের কথায় সেটা করতে পারলো না। সাফিন বলেছে সে আসা পর্যন্ত এমন কিছু না করতে তার কিছু কথা আছে সায়মনের সাথে।
অরীন দৌড়ে বাড়িতে ঢুকলো তার পিছু পিছু সাফিন। অরীন কারোর দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেলো সায়মনের রুমে। রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অরীনের মা। অন্যদিকে অরীনের চাচি এখনো মুখে উরনা চেপে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছেন। রিয়ার চেহারা দেখে অরীন নিজেও ফুপিয়ে উঠলো। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরতেই ব্যাথা আহ শব্দ করতেই অরীন সাথে সাথে সরে গেলো।
সরি সরি ভাবী। বেশি ব্যাথা করছে?
রিয়া কান্না দমে রেখে উপর নিচ মাথা নাড়ায়। এরপর আবারও কান্নার রুল পড়ে গেলো।
সোফায় মাথায় হাত রেখে বসে আছে অরীনের বাবা। সম্পর্কে সাফিনের শশুর। তার পাশে একইভাবে বসে আছে সাফিনের বাবা।
ভাই কোথায়?
অরীনের বাবা রুম দেখিয়ে দিতে সে সায়মনের রুমে চলে যেতে পা বাড়ায়। সে নিচ থেকে উপরের অরীন ও রিয়ার কান্নার শব্দ শুনতে পায়।
দরজা খুলেই দেখে দু হাটুতে হাত ভাজ করে হাতের উপর মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে সায়মন৷ কেউ ঢুকেছে বুঝতে পেরে মাথা তুলতেই ছোট ভাইকে দেখে লজ্জায় নুইয়ে যায় সায়মন।
সাফিন সায়মনের মুখোমুখি নিচে ধুলোবালির মধ্যেই বসে পড়ে।
ভাই?
মাথা উঠায় না সায়মন। কি করে তাকাবে সেই মুখ তো নিজেই রাখল না। সায়মন ভয় পাচ্ছে তাকাতে যদি সাফিনের চোখে বড় ভাই হিসেবে পাওয়া শ্রদ্ধাটুকুর বদলে ঘৃণা দেখে সেই ভয়ে মাথা নামিয়ে রেখেছে।
আমি সবসময় ভাবতাম তুমি খুব ভাগ্যবান ভাই।
সাফিনের কথা মাথা তুলে তাকায় সায়মন।
ছোট থেকে এখন পর্যন্ত তুমি না চাইতেও অনেক কিছু খুব সহজেই পেয়ে গেছো। ছোট থেকে তুমি খুব দুরন্ত স্বভাবের ছিলে আমি ছিলাম একঘেয়ে। তোমার যা প্রয়োজন হতো এমনকি প্রয়োজনের বাইরেও তুমি বাবার থেকে যা চাইতে বাবা সব তোমার মুখে সামনে এনে দিতো। আমি চাইতে পারতাম না বলতেও পারতাম না। মুখ ফুটে চাওয়ার মতো স্বভাবটা আমার ছিলো না। সবাই বলতো আমি খুব ভদ্র, শান্তশিষ্ট, কোনো কিছুর জন্য কাউকে বিরক্ত করতাম না। বাবা - চাচা যদি নিজ থেকে এনে দিতো সেটাই নিতাম। বা যদি বলতো ওমুক জিনিস লাগবে? আমি হ্যাঁ বললে এনে দিতো। এতে আমি তাদের দোষ মোটেও দিবো না। আমি জানি এটা আমার বাজে স্বভাব। আমি সবার থেকে মানসিকভাবে এক দুরত্ব নিয়ে চলেছি। ছাত্রজীবনেও তোমার কতশত বন্ধু ছিলো। তোমার সাথে রাস্তায় বের হলে দেখতাম সবাই তোমায় চিনে সবার সাথে কেমন সহজে মিশে যেতে। কতকত জায়গায় ঘুরতে আড্ডা দিতে। তখন আমি একা থাকতাম, আমার কোনো বন্ধু ছিলো, কারোর সাথে মিশতে পারতাম না। সবাই দেখতাম গ্রুপ হয়ে আড্ডা দিতো আমি দূরে এক জায়গায় একা বসে থাকতাম। আমি আবারও বলছি এখানে কারোর দোষ নেই এটা আমার নিজের ব্যর্থটা। আমার কেনো যেনো কথাগুলো তোমায় বলতে ইচ্ছে করছে তাই বলছি । আমার বন্ধু নেই বললে ভুল হবে ছাত্রজীবনের শেষের দিকে ৩ জনের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে কিন্তু ওই মাঝেমধ্যে দেখা হওয়া কিছুসময় আড্ডা দেওয়া ওতটুকুই। ক্যারিয়ারেও তুমি চাচার সাথে জয়েন হয়ে গেলে। তখন আমার মন মানসিকতায় একটু বদল ঘটলো আমি চেয়েছিলাম নিজের পরিশ্রমে কিছু করতে। যেটা আমার নিজের হবে৷ সবাই জানবে আমায় চিনবে। নিজের সফলতায় সবাই প্রশংসা করবে। আমি সফল হয়েছি। কিন্তু খুব কাঠগড় পুড়িয়ে এতদূর এসেছি। কম বেশি সবাই চিনেছে, জেনেছে কিন্তু বাবা - মায়ের থেকে গুরুত্ব পাই নি। আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি বাবা - মা কে আমায় নিয়ে কোনো গর্ব করেছে কিন্তু তোমায় নিয়ে করেছিলো। মা সবসময় বলতো সায়মন খুব মেধাবী, পরিশ্রমী। তুমি যখন কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে দেখতাম মা তোমার পিছু অস্থির হয়ে পড়তো তোমার কি লাগবে কি খাবে। তোমার ঘামান্ত চেহারা নিজে মুছে দিয়ে সবসময় বলতো তুমি শুকিয়ে গেছো। তখন আমি নতুন ব্যবসায় দাড় করিয়েছি সবে। আমার পরিশ্রম হয়তো তাদের চোখে পড়তো না। আমি বাড়ি ফিরলে মা এত ছটফট করতো না।
শেষের কথাটি বলেই হেসে দেয় সাফিন। সায়মন মনোযোগ দিয়ে শুনলো। সে এতকিছু কখনো খেয়াল করে দেখেনি, সাফিনের মনের কথাগুলো কখনো বুঝতেও পারেনি।
তোমার সবচেয়ে বড় পাওয়া কি জানো?
সাফিন উত্তরের আশা না করেই বলল
ভালোবাসা।
তুমি ভালোবাসার দিক দিয়েও এগিয়ে গেলে। আমার ভালোবাসার মানুষটিও তোমায় ভালোবেসেছে, আমি তার প্রথম ভালোবাসা হতে পারিনি৷ কিন্তু তুমি অনায়াসে হয়ে গেলে। অরীনের প্রথম সব নতুন নতুন অনুভূতিগুলো তোমায় ঘিরে ছিলো৷ অথচ আমি প্রথম ওকে মন থেকে ভালোবেসেছিলাম।
তুমি তো কখনো ওকে ভালোই বাসোনি। তোমার কাছে অরীন টাইম পাস ছিল আর আমার কাছে অরীন আমার সবকিছু ছিল।
রিয়া ভাবী সব দিক দিয়ে অনন্য
এটা কি তুমি কখনো অস্বীকার করতে পারবে? বলো?
সায়মন আস্তেধীরে বলল,
না।
কি নেই রিয়া ভাবীর মাঝে, গুনে রুপে আচরনে সব দিক দিয়ে অসামান্য তোমার প্রতি কত লয়াল জানো? এমন মেয়ে সবার কপালে থাকে না অথচ তুমি তাকে পেয়েও এত অবহেলা কি করে করতে পারলে? আমার ভাবতেও খুব অবাক লাগছে।
কিসের টানে তুমি অন্য নারীতে আসক্ত হলে? রুপের?
ওই মেয়েটি কি রিয়া ভাবীর চেয়েও সুন্দর? বলো?
শেষের কথাটা সাফিন জোড়ে বলতেই সায়মন না বলে।
সুন্দর হলেও তা কতদিন থাকে? এই সৌন্দর্যই কি আসল? তাহলে পতি”তার মেয়েরাও যদি সুন্দর হয় তুমি তাদের সাথেও সম্পর্কে জড়াবে? এতো কাপুরুষদের কাজ।
নাকি শারীরিক চাহিদা?
সায়মন মাথা নিচু করে ফেললো। সে অনুতপ্ত সে এখন বুঝতে পারছে সে কত বড় ভুলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সে কিভাবে দাড়াবে রিয়ার সামনে ।
সুপুরুষ কাদের বলে জানো? যারা এক নারীতে আবদ্ধ থাকে, যারা এক নারীর মাঝেই তাদের সকল সুখ, চাহিদা খুঁজে নেয়। জীবনে সবচেয়ে বড় অহংকার নিজেকে সুপুরুষ হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিন্তু পরিচয় দিতে হলে সুপুরুষদের মতো হতেও হবে।
পরকিয়া শুধু দুটি মানুষ না বরং এর সাথে সম্পর্কিত সকল সম্পর্কেও ভাটল ধরায়।
সাফিন উঠে দাড়িয়ে বলে,
তুমি কিছু বলতে চাও?
সায়মন কিছুসময় চুপ থেকে বলে
আমি জঘন্য পাপ করেছি, আমি পাপি আমি ক্ষমার যোগ্য না তবুও সবার থেকে মাফ চাইছি।
আমাদের থেকে মাফ না চেয়ে রিয়া ভাবীর থেকে চাও। ভুক্তভোগী সে, আমরা না।
রিয়া ভাবী প্রেগন্যান্ট শুনে খুশিতে বুক কাপছে। কিন্তু এই খুশির খবরটা এই পরিস্থিতিতে শুনতে হবে ভাবতে পারেনি অরীন।
সাফিন, তার বাবা ও চাচাকে নিয়ে নক করে রুমে আসলো। অরীনের মা তাদের সুখবর দিলে তারাও খুব খুশি হয় কিন্তু সেই খুশিটা মনখুলে প্রকাশ করতে পারলো না।
রিয়া ঘুমিয়ে গেছে। মেয়েটা খুব ক্লান্ত। সাফিনের মা স্বামীকে বলল
সায়মন কোথায়?
এতে মোহাম্মদ নাসিম রেগে বলল
জাহান্নামে।
শুনে রাখো সবাই ওকে আমি জেলে ঢুকাবো কেউ এতে বাধা দিলে তাকেও সাথে ভরে রাখবো। রিয়া আমার মেয়ে। আমার মেয়ের সাথে হওয়া অন্যায় আমি মানবো না আর অন্যায়কারীকেও ছাড়বো না।
এই বাড়ির ছেলেরা কখনো বউদের গায়ে হাত তুলে নাই।
শেষের কথাটা শুনে অরীন চোখ ছোট ছোট করে সাফিনের দিকে তাকায়। ঠিক একই সময় সাফিনের চোখ যায় অরীনের দিকে। চোখে চোখ মিলতে সাফিন
বলে চলে গেলো। মায়ের মন ছেলে খারাপ হলেও ছেলের জন্য বুক কাদে। সে ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে।
পুলিশ এলো একঘন্টা পর। রিয়ার রুমে শুয়ে আছে। নিচে কান্নার আহাজারি। সায়মনকে জড়িয়ে তার মা কেদে বলছে
কেনো এমন করতে গেলি? কেনো সুখের সংসারটা তছনছ করে দিলো জানো”” তোর জন্য সব শেষ হয়ে গেলো।
অরীনের মাও কাঁদছে। সাফিন মাকে সরিয়ে নিতে পুলিশ সায়মনকে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় সায়মন একবার তাকায় অরীনের দিকে। অরীন ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে ফেলে।
২ দিন হয়ে গেছে। রিয়া এখন সুস্থ। সাফিন অরীনকে রেখেই ঢাকা চলে গেছে। আজ বিকেলে আবার আসবে। অরীন পাক্কা ঘরণীর মতো বাড়িটা সামলিয়েছে। সাফিনের মা এখন সয্যাশায়ী। জ্বর বাঁধিয়েছে সাথে প্রেশার বেড় গেছে। কারোর মন ভালো নেই। রিয়া মানসিকভাবে এখন আগের তুলনায় ভালো আছে৷
বিকেলে রিয়াকে নিয়ে ছাদে এসেছে অরীন। শুকানো জামাকাপড়গুলো একে একে নিতে থাকে পাশাপাশি টুকটাক রিয়ার সাথে কথা বলে৷ রিয়া চুপচাপ বসে থাকে। অরীন জানে রিয়া শুনছে না তার কথা তবুও সে অযথা বকবক করেই যায়। তখনি পাশের বিল্ডিং এর ছাদ থেকে ব্যাডমিন্টনের ফ্লায়োর এসে পড়ে রিয়ার পায়ের কাছে। দুটি ছেলের মাঝে একটা ছেলে তাদের দিকে ফিরে “ভাবী“ বলে ডাক দেয়। অরীন সেদিকে ডাকায়। ছেলেটা ছিপছিপে গড়নের রোগা পাতলা কিন্তু অনেক লম্বা। ছেলেটাকে আগে দেখেনি।
কি?
ভাবী আমাদের ফ্লায়োয়ার টা ওই ভাবীর পায়ের কাছে পড়েছে একটু দিবেন।
অরীন রিয়ার পায়ের কাছ থেকে সেটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে
ছাদে এগুলো খেলে?
আর জায়গা তো নেই ভাবী।
আসলেই সেই বাড়িটা খুব ছোট। নিচে কোনো আঙিনাও নেই এছাড়া ডাদের এই এরিয়ায় কোনো খালি মাঠ নেই।
নতুন এসেছেন?
জ্বী ভাবী। আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন আমি আপনার খুব ছোট।
কিসে পড়ো।
সিক্সে।
অরীন খুব অবাক হলো শুনে। এই ছেলেকে দেখে সিক্সের মনে হয় না। আজকাল অল্পবয়সেই ছেলেরা এত লম্বা কেনো হয়ে যায়।
তুমি তো নতুন তাহলে আমাকে যে ভাবী বলে ডাকছো তুমি আমায় চিনো?
হ্যাঁ এই বাড়িতে নতুন আসলেও এই এলাকায় থাকতাম। আমি সায়মন ভাইকে চিনি আপনি তার ভাইয়ের বউ আর উনি সায়মন ভাইয়ের বউ।
ছেলেটা হেসে বলতেই অরীন পিছন ফিরে রিয়ার দিকে তাকায়। রিয়া ছেলেটাকে দেখছে কিন্তু কিছু বললো না।
সাফিন অনেক আগেই বাড়ি এসেছে কিন্তু ঢুকেনি। বাড়ির গেট পেরিয়ে ঢুকতে গেলে অরীনকে ছাদে এক ছেলের সাথে হেসে কথা বলতে দেখে। অরীন যতক্ষন পর্যন্ত কথা বলছিলো সাফিন ততক্ষণ পর্যন্তই তাকিয়ে থাকে।
তুই ছাদে কেনো গিয়েছিলি?
সাফিন রুমে এসে হঠাৎ আক্রমণে অরীন চমকে যায়। সাফিন অরীনের হাত শক্ত করে ধরেছে।
হাতে ব্যাথা পাচ্ছি।
তুই আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছিস।
ছাদে মানুষ কেনো যায়?
অরীন
সমস্যা কি আপনার? আবার কি শুরু করেছেন?
তুই আর ছাদে যাবি না। ওহ হ্যাঁ ছাদে যাওয়ার সু্যোগ নেই তোর কাল সকালেই আমরা চলে যাবো৷।
নাহ আমি আরও কিছুদিন থাকবো।
সাফিনের রাগ তরতর করে বেড়ে গেলো। রাগে বেফাসে মুখ ফসকে বলে ফেললো
কেনো থাকবি নতুন না”গর জুটিয়েছিস?
কথাটা বলার সাথে সাথে গালে চড় বসলো। অরীন চড় মেরেছে সাফিনকে। অরীনের চোখে পানি গড়িয়ে পড়লো। সাফিন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অরীনের দিকে।
আপনি কি জানেন আপনি একটা সাইকো, পাগল একটা লোক। আপনার আমার প্রতি কোনো বিশ্বাসই নেই।
অরীন চোখ মুছে বলল
আপনার এই অবিশ্বাস আর এই অতিরিক্ত রাগ একদিন আমাদের সম্পর্কও ভেঙে ফেলবে লিখে নিয়েন।
বলে অরীন চলে গেলো রুম থেকে।
আপনার এই অবিশ্বাস আর এই অতিরিক্ত রাগ একদিন আমাদের সম্পর্কও ভেঙে ফেলবে লিখে নিয়েন।
অরীনের কথাটা এখনও সাফিনের কানে বাজছে। সাফিনের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে বুকে হাত চেপে বিছানায় বসে পরলো। এই কথাটা সে কখনও ভাবতেও পারেনা আর অরীন সেই কথাটা কেমন অনায়াসে বলে দিলো। ওর মাথায় কথাটা আসতে পারলো কিভাবে। সে তো অরীনের ব্যাপারে একটু বেশিই প্রসেসিভ। নাহয় সে না চাইতেও রাগ দেখিয়ে ফেলেছে তাই বলে অরীন এ কথা বলতে পারলো?
সাফিন রাগে মাথার চুল ঘামচে ধরে। তিনবছর ধরে সাফিন খেয়াল করছে সে অল্পতে রেগে যায় রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না৷
সবসময় আমার সাথেই কেনো এমন হয়। না চাইতেও সবকিছু দায়ভার আমার উপরই কেনও পড়ে।
রান্নাঘরে অরীন ডুকরে কেঁদে উঠে। তার নিজের বলা কথাগুলো তার স্মরণ হয়।
আপনার এই অবিশ্বাস আর এই অতিরিক্ত রাগ একদিন আমাদের সম্পর্কও ভেঙে ফেলবে লিখে নিয়েন।
অরীন নিচে বসে কাঁদতে থাকে। রিয়া তাকে কাঁদতে দেখে ছুটে আসে।
কি হয়েছে অরী তুমি কাঁদছ কেনো। সাফিন ভাইয়ের সাথে ঝামেলা হয়েছে?
অরীন কিছু না বলে কান্না করতে থাকে। কিছু বলতে যেয়েও গলায় কান্না দলা পেকে যাওয়া বলতে পারছে না।
অরীন কি হয়েছে খুলে বলো।
অরীন রিয়াকে সব খুলে বলতেই রিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
আমার কিছু কথা শুনবে?
বলো
সাফিন ভাই তোমাকে অনেক ভালোবাসে অরীন৷ তার চোখের চাহনি বলে দেয় তোমার প্রতি তার ভালোবাসার গভীরতা। সে ভয় পায় তোমাকে হারাতে। এই ভয়টা কয়টা পুরুষ পায় বলে? সে তোমাকে নিয়ে একটু বেশীই সচেতন তাই রাগের মাথায় এসব বলে দিয়েছে৷
তাই বলে সবসময় অবিশ্বাস করবে? একটা সম্পর্কে বিশ্বাস থাকাটা কতটা জরুরি জানো। আমি আমাদের সম্পর্ক বেস্ট ইফোর্ট দেওয়া চেষ্টা করছি। আমি তাকে বিশ্বাস করি সম্মান করি কিন্তু সে সবসময় আমায় অবিশ্বাস করে যায়। সম্পর্কে জিলাসি ভালো কিন্তু অবিশ্বাস? অবিশ্বাস ভালো না।
অবিশ্বাস একটা সম্পর্ক কে ধ্বংস করে দিতে পারে।
কষ্ট পেয়ো না অরী। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এমন ঝামেলা হয়ে থাকে। তুমি সাফিন ভাইয়ের সাথে এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলো।
ওই লোকটার সাথে আমি কথাই বলবো না খুব বার বেড়ে গেছে তার। দেখো আমি লোকটাকে শায়েস্তা করতে কি কি করি।
বলে চলে গেলো অরীন। সিড়ি দিয়ে উঠতে নিলে কেমন মাথা ঘুরতে লাগলো। সে পড়ে যেতে নিলে সাফিন তাকে ধরে বুকে টেনে নেয়।
অরীন সাফিনের বুকে ঢলে পড়ে। সাফিন অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে
অরীন অরীন এই অরীন তুই ঠিক আছিস?
অরীনের মাথা ঝিমঝিম করছে। শরীরটাও অনেক দূর্বল ঠিকমতো চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। রিয়া সাফিনের ডাকে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখে আর অরীনের এই অবস্থা দেখে কিছুক্ষন আগের কথা মনে পড়ে গেলো। অরীন বলেছিলো
দেখো আমি লোকটাকে শায়েস্তা করতে কি কি করি।
রিয়া ভাবলো হয়তো ইচ্ছে করে শায়েস্তা করতে মাথা ঘুরানোর নাটক করছে।
সে আর সেদিকে গেলো না।
সাফিন অরীনকে কোলে করে রুমে নিয়ে গেলো। মুখে জল ছিটা দিতেই ধীরে ধীরে চোখ খুলল অরীন।
পানি খাবো।
সাফিন সাথে সাথে অরীনকে নিজ হাতে পানি খাওয়ায়।
ঠিক আছো?
হুম।
কি হয়েছিল তোমার।
কিছু না।
অরীন!
সাফিন ধমকে উঠতেই অরীন রেগে তাকায় সাফিনের দিকে। রাগ কমাতে সাফিন নিজেও চোখ বন্ধ করে নিজেকে কন্ট্রোল করতে চায়। পরে অরীনে গালে হাত রেখে নরম কন্ঠে বলল
কি হয়েছে হঠাৎ মাথা ঘুরালো কেনো তুমি সকালের আর দুপুরের খাবার খেয়েছো তো?
খেয়েছি।
চলো রেডি হও আমরা হাস্পাতালের যাবো।
এতে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
আলবাদ আছে।
আমি যাবো না
বলে আবারও শুয়ে পড়ে অরীন।
সাফিন তাকে দেখে বাথরুমের দরজা জোরে আটকিয়ে ঢুকে গেলো।
রাতে খাবারের সময়। অরীন ও রিয়া সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলো। অরীন সাফিনের প্লেটে খাবার বাড়তে এসেও ফিরে গেলো। রিয়াকে ইশারা করতেই রিয়া গাইগুই করে অরীন তাকে অনেক রিকুয়েষ্ট করতেই সে সাফিনকে খাবার বেড়ে দিতে লাগলো।
সবকিছুই সাফিনের চোখে পড়লো। সে রেগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আছে। অরীন নিজের আপন মনেই দাঁড়িয়ে আছে তার যেন কোনো ভাবাবেগ নেই। সাফিন শক্ত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো।
আপনাদের সাথে কিছু কথা বলার ছিলো।
সাফিনের বাবা বলল
অবশ্যই বলো।
আপনারা সায়মনকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসুন।
সবাই খাবার খাওয়া বন্ধ করে রিয়ার দিকে তাকালো।
।সাফিনের বাবা বললো
ভেবে চিনতে বলছো তো?
হুম।
তারপরের কথা ভেবেছো? আমি কি বুঝাতে চাইছি নিশ্চয়ই বুঝেছো?
জ্বী বাবা। আমি সব ঝামেলা মিটমাট করে নিতে চাই। সে যদি একটা সুযোগ চায় আমি দিবো।
তোমার কথাই রইলো৷
আর যাইহোক সে একজন বাবা। সন্তান শত খারাপ হলেও সন্তানের জন্য বুক পুড়ে। সায়মন জেলে যাওয়ার পর থেকে তারা ভালো থেকেছে এমনও নয়। তাদেরও ভীষন কষ্ট হয়েছে।
অরীনের কেমন গা গুলিয়ে আসছে৷ খেতে ইচ্ছে করছে না। হঠাৎ রিয়া খাবার ছেড়ে উঠে দ্রুত চলে গেলো। হয়তো বমি বমি লাগছে। তার পিছু পিছু অরীনের মাও ছুটল। সে সেদিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন।
রাতে অরীন নিজের কোলবালিশ নিয়ে বের হতে নিলে সাফিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায় যাতে অরীন যেতে না পারে।
কোথায় যাচ্ছো
জাহান্নামে যাবেন?
আমার সুখে থাকতে ভূতে কেলায় না।
তাহলে রাস্তা ছাড়ুন।
ছাড়বো না কি করবে।
অরীন রেগে চিৎকার করে বলল
আপনার সাথে কিছু করার ইচ্ছেও নেই।
যদিও অরীন নিজেও জানে না সে কি বলেছে। রেগে মুখে যা এসেছে তা বলে দিয়েছে।
সাফিন মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো। তা দেখে অরীন কপাল কুচকে বলল
বাদরের মতো দাত কেলাচ্ছেন কেনো?
তুমি কি বললে খেয়াল করেছো?
অরীনের খেয়াল হলে সে কি বলবো। কথা ঘুরাতে বলে।
রাস্তা ছাড়ুন।
আহা কথা ঘুরালে তো হবে না। আর তুমি যা করার তো করেই ফেলেছো বউ। আমার ইজ্জতের কিছু বাকি রেখেছো?
অরীন নিজেকে কন্ট্রোল করলো যাতে কোনো ভাবেই লজ্জা না পায়। তার মাথায় হঠাৎ বুদ্ধি খেলে গেলো।
উফফ
বলে নিজের কপালে হাত দিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে অরীন। সাফিন চিন্তায় অরীনের কাছে এসে বলে
দেখি দেখি
সেই সুযোগে অরীন চলে যায় রুম থেকে। রুম থেকেও অরীনের হাসির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সাফিন।
আমাকে বোকা বানানো? তাই না দাড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা।
ভাবী আসবো?
রিয়া খাতায় কি যেন লিখছিলো অরীনের কন্ঠ শুনে সাথে সাথে লুকিয়ে ফেললো।
সে হেসে বলল
আসো অরী
অরীন তার কাছে বসে বলে
আমি যদি তোমার সাথে শুতে চাই তুমি কি বারণ করবে?
একদমই না। কিন্তু যদি সাফিন ভাইকে শায়েস্তা করতে এমন করো তাহলে বলবো এটা মোটেও ঠিক না। তোমার উচিত তার সাথে মাথা ঠান্ডা করে কথা বলা। তার কথাগুলো শুনা, পরিস্থিতি বোঝা আর নিজেরও মনের কথাগুলো তাকে বলা। এতে তোমাদের মধ্যে ঝামেলা ৯৮% কমে যাবে৷
তা তো করবোই কিন্তু তোমার দেবরের অনেক বার বেড়েছে। আমি যে খুব কষ্ট পেয়েছি তার শাস্তি দিয়েই ছাড়বো।
রিয়া দুদিকে মাথা দুলিয়ে বলে।।
তুমিও না মেয়ে।
তারা আরও গল্প করলো। রিয়ার ফোনে হঠাৎ ফোন আসাই রিসিভ করে কথা বলে অরীনকে বললো
তুমি বসো অরীন আমি একটু নিচের থেকে কাচা আম নিয়ে আসি।
অরীন সাথে সাথে বললো
তুমি কেনো যাবে? আমি যাচ্ছি তুমি বসো
আরে নাহ তোমার যেতে হবে না। আর এছাড়াও আমার কিছু কাজ আছে তুমি বসো।
অরীন কিছু বলতে চাইলে সে চোখ রাঙায়। এতে অরীনের হার মানতে হলো।
সে চলে যেতেই অরীন মোবাইল ঘাটতে লাগলো। হঠাৎ লাইট নিভে গেলো৷ অরীন কিছু বোঝার আগেই সে শূন্যে ভাসতে লাগলো। পরিচিত সুভাস নাকে আসতেই বুঝতে পেলো সে সাফিনের জিম্মিতে আছে৷
আপনি
কথা বলতে দিলো না সাফিন। নিজের ঠোঁট দ্বারা অরীনের মুখ বন্ধ করে নিলো। দরজা বাইরে আসতেই সাফিন ঠোট ছেড়ে দিলে অরীন হাপাতে থাকে৷।
আপনি একটা বেয়াদব।
অরীন নামার জন্য ছুটাছুটি করতে থাকে। সাফিন অরীনকে রুমে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো৷ আরও সতর্ক হতে একদম উপর থেকেও বন্ধ করে দিলো।
আপনি একটা জাহিল।
তোমারই।
আপনি আস্ত একটা অসভ্য
সেটাও তোমারই৷
পাগল
তোমারই।
বাইরে ধুমসে বৃষ্টি হচ্ছে। অরীন সেদিকে একপলক তাকিয়ে বারান্দায় চলে যায়। তার পিছু পিছু সাফিনও আসে। বৃষ্টির ছিটায় অরীন ভিজে যাচ্ছে সাথে সাফিনও দুজনেই চুপ।
হঠাৎ অরীন বললো
আপনার উচিত একটু ডাক্তার দেখানোর।
সাফিন ছোট করে বলল।
হুম
এই রাগটা ভালো নয় সাফিন। রাগ জিনিসটা খুব ভয়ংকর।
সাফিন মাথা নিচু করে রইলো। ফের অরীনের দিকে তাকিয়ে বলল
আমি তোমাকে কখনোই অবিশ্বাস করি না অরী। আমি একটু বেশি পসেসিভ তোকে নিয়ে। কেনো যেনো তোকে কোনো ছেলের সামনে এখন সহ্য হয়না। মনে হয় তোকে হারিয়ে ফেলবো৷ জীবনে সব হারাতে পারলেও আমি তোকে হারাতে দিতে চাই না। তুই আমার অস্তিত্ব, আমার ভালোবাসা।
অরীন সাফিনকে জড়িয়ে ধরলো। সাপিন আবারও বলল
শুধু মাঝেমধ্যে খুব এগ্রেসিভ হয়ে যাই তার জন্য খুব সরি বউ।
আমিও খুব সরি।
সাফিন ও অরীন বৃষ্টির পানির ছিটায় প্রায় ভিজে যাচ্ছে। সাফিন অরীনের ঘাড়ে মুখ গুঁজে চুমু খেতে থাকে৷ অরীন আবেশে সাফিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
সাফিন অরীনকে কোলে নিয়ে রুমে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ঠোটে শক্ত চুমু খেয়ে অরীনের কপালে কপাল ছুয়ে বলল
ভালোবাসি।
অরীন বিপরীতে চুপ থাকলো৷ সাফিন ধীরে ধীরে অরীনের মাঝে ডুব দিলো। ভালোবাসার মধুর মুহুর্তে দুজন হারিয়ে গেলো অজানা স্বর্গের জগতে।
অরীন সাফিনের পিঠ খামচে ধরে সুখের মুহূর্তে বলে
ভালোবাসি।
সাফিন অবাক হলো খুব। আজ পর্যন্ত অরীন তাকে ভালোবাসি বলে নি। আজ প্রথম অরীনের মুখ থেকে ভালবাসার কথা শুনে আরও অস্থির লাগামছাড়া হয়ে যায়।
সায়মন রিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। রিয়া অন্যদিকে তাকিয়ে আছে যেন সে সায়মনকে দেখেও দেখতে পারছে না। সায়মনের সব কথাই সে শুনেছে,সুযোগ দিয়েছে। সে বলল
তোমার সাথে আগের মতো সংসার করতে পারলেও আগের মতো ভালোবাসতে পারবো না।
কথাটা সায়মনের বুকে তীরের মত বিঁধল। রিয়া উঠে চলে যেতে নিলে সায়মন হাত আকড়ে ধরে বলল
মাফ করে দাও রিয়া। প্লিজ সব ভুলে যাও আমি অনুত।
ঠিক আছে মাফ করে দিলাম। কিন্তু ভুলতে পারবো না।
রিয়া?
রিয়া শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সায়মন তার পা জড়িয়ে বসে আছে। পরিবেশ শান্ত। এই শান্ত পরিবেশ আরো ভয়ংকর করে তুলছে যেনো। এক সুন্দর পরিবার কিভাবে মিইয়ে গেলো। শুধুমাত্র একটা ভুল। এই একটা ভুল মানুষকে মেরেও ফেলতে পারে। কিছু মানুষ ত বেচে থেকেও মরে যায়। রিয়া কি আধও ভুলতে পারবে? তার স্বামী কারোর সংস্পর্শে গিয়েছে ভাবতেই এখনো বুক কেপে উঠে।
কিন্তু নারী জাতি সয়ে যায়। এরা জীবন্ত লাশ হয়েও খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে নেয়। সংসার করে৷ আর সেই সংসার থেকে সে কি পায়?
রিয়া সায়মনের সাথে সংসার তো করতে পারবে কিন্তু আগের মত কি আর ভালোবাসতে পারবে? কিন্তু রিয়া চেষ্টা করবে। খুব চেষ্টা করবে।
সে তার অনাগত বাচ্চার মুখের দিকে চেয়ে চেষ্টা করে যাবে।
অরীনের ঠান্ডা লেগেছে। নাস্তা করে এসে আবারও শুয়ে পড়ল। সারা শরীরের ব্যাথা পুরোপুরি যায়নি। সাফিন রুমে এসে অরীনের পাশে শুয়ে অরীনকে জড়িয়ে ধরে।
অরীনের নাক পিটপিট করছে। সাফিনের মুখ তার মুখের কাছাকাছি। সাফিনের নিশ্বাস তার নাকে ঠেকতেই অরীন জোড়ে হাচি দিয়ে উঠে। তখন সাফিন তাকে চুমু খেতে সামনে এসেছিলো। ব্যাস।
সাফিন নাক মুখ কুচকে সরে আসে অরীনের থেকে।
বজ্জাত মেয়ে। তের মাথার ঘিলু একেবারেই চলে গেছে ফাজিল।
অরীন কিছু না বুঝে বলে
আমি আবার কি করলাম।
সাফিন মুখ মুছে চিৎকার দিয়ে বলে,
অরীনের বাচ্চা!
অরীন বললো, কি হয়েছে।
সাফিন কটমট করে তাকিয়ে বলল
হাচি দেওয়ার সময় মুখে হাত দিতে হয় জানিস না। এত বড় হয়েও ম্যানাস শিখলি না।
শিখেছিলাম কিন্তু এক পাগলের সাথে থাকতে থাকতে সব ভুলে গেছি।
খুব সাহস বেড়ে গেছে তোর।
অরীন বিরক্ত হয়ে বলল
আপনি তো বহুত খারাপ একটা লোক। দিন হলে হুদাই রাগারাগি চেঁচামেচি করে আর রাত হলে যেন মুখ দিয়ে মধু বের হয়। ফাজিল স্বার্থপর লোক৷
বলে অরীন উঠে যেতে নিলে সাফিন হাত ধরে বলে
কোথায় যাচ্ছিস? আয় আমি এখন ঘুমাব।
আপনার ঘুমানোর সাথে আমার আসার কি সম্পর্ক?
তোকে ছাড়া ঘুম আসে না। যদিও কাল তোর জন্য সারারাত ঘুমাতে পারি নাই।
অরীন অবাক হয়ে বলল,
আমার জন্য? বাটপার লোক৷ উল্টো আপনার জন্য আমি ঘুমাতে পারি নাই। এখনো সারা শরীর ব্যাথা করছে।
দেখা কোন কোন যায়গায় ব্যাথা করছে, আমি চুমু দিয়ে ব্যাথা দূর করে দেই।
অসভ্য লোক।
সাফিন হেঁচকা টানে অরীনকে তার বুকে ফেলে চুমু দিতে সাফিনের মুখে সিগারেটের গন্ধ পায় অরীন।
অরীন খুব অবাক হলো এই ভেবে যে তার এই সিগারেটের গন্ধ ভালো লাগছে। যেখানে আগে এই সিগারেটের গন্ধ সে সহ্যই করতে পারতো না।
সাফিনের মনে পড়লো সে একটু আগে সিগারেট খেয়ে এসেছিলো৷ অরীন তো সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে না।
তাই সে বলল
সরি সরি দাড়া আমি মুখ ধোয়ে আসছি।
সাফিন চলে যেতে নিলে অরীন তাকে আটকিয়ে বলল
থাক লাগবে না। আমার ভালে লাগছে।
কি??
হুম।
বলেই সাফিনের ঠোঁটে ঠোট মিলিয়ে দেয় অরীন।
প্রথমে সাফিন একটু অবাক হলেও পড়ে বেশি না ভেবে অরীনের সাথে তাল মিলাতে থাকে। সাফিনের চুমু অরীনের ঠোঁট ছেড়ে গলায় যায়। গলা থেকে বুকে। দু'জনে পুনরায় উন্মাদনায় মেতে উঠে। এর মাঝে হঠাৎ বিঘ্ন ঘটায় অরীন। তার হঠাৎ খারাপ লাগছে। বমি বমি লাগতেই সে সাফিনকে সরিয়ে উঠতে নিলে সাফিন বাঁধা দেয়।
আমার খারাপ লাগছে।
এর বেশি বলতে পারলো না। কোনো রকম সাফিনের থেকে ছাড়া পেয়ে বাথরুমে ঢুকে গলগল করে বমি করে দিলো।
সাফিনও তার পিছু এসে চুলগুলো মুঠে নিয়ে কপালে হাত চেপে ধরে। হঠাৎ অরীনের অবস্থা দেখে সাফিন অস্থির হয়ে উঠলো।
বমি করে অরীন পুরো দূর্বল হয়ে গেছে। সাফিন ওর মুখে পানি ছিটা দিয়ে মুখ ধুয়ে দিলো। ফের পাজাকোলে করে বিছানায় এনে জামা পড়িয়ে দেয়।
ঠিক আছিস? কি হয়েছে তোর? চল এখনি ডাক্তার দেখাবো।
অরীন দূর্বলতায় কথা বলতে পারলো না।
অরীনকে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসলো সাফিন। সারা রাস্তা অরীনের চিন্তায় ছটফট করেছে।
ডাক্তার অরীনকে কিছু প্রশ্ন করলো। তার প্রশ্নগুলো শুনে দুজনেই সব আন্দাজ করে ফেললো। অরীনের কিছু পরিক্ষা দিতে হয়েছে। কাল বিকেলে রিপোর্ট আসবে। অরীনকে নিয়ে বাড়ি ফিরার সময় সাফিন রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চুপচাপ বসে রইলো। অরীন তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অরীনের কেমন যেন লাগছে। তার পেটে একটা বাবু আসলে মন্দ হয় না। একটা ছোট্ট সাফিন হবে তার। যখন বড় সাফিন তাকে ধমকাবে চেচামেচি করবে তখন তারা খুন্তি নিয়ে বড় সাফিনকে ধাওয়া করবে। উচিত শিক্ষা দিতে শক্তি দ্বিগুন হয়ে যাবে। আর ভয় পাবে না এই সাফিনকে।
সাফিন রাগ দেখালে ছেলে নিয়ে বাড়ি এসে পড়বে। থাকবে না এই বদলোকের কাছে।
অরীন কতকিছু ভেবে ফেলেছে। সাফিনও কি তার মতোই ভাবছে? সে কি খুশি না?
এতক্ষন চুপচাপ বসে ছিল সাফিন৷ ঘাড় ঘুরিয়ে একবার অরীনকে দেখে আবারও গাড়ি চালাতে থাকে।
বাড়ি আসতেই সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কি হয়েছ না হয়েছে। অরীন কোনো মতে সবাইকে সামলে নেয়। পুরোপুরি সিউর না হয়ে কিছু বলবে না।
সেদিন পেরিয়ে গেলো। সাফিন কেমন চুপ হয়ে গেছে। শুধু অরীন না বরং কারোর সাথে ঠিক মতো কথা বলে নি।
পরদিন বিকেলে সাফিন একা গিয়েছে রিপোর্ট আনতে। রিপোর্ট পজিটিভ। তারা নতুন বাবা মা হবে৷
বাড়ি ফিরে দেখে অরীন সবার সাথে হাসিখুশি কথা বলছে। তাকে দেখেই অরীন ছুটে এলো।
কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো
কি এসেছে?
পজিটিভ।
অরীনের মা বললো
কি পজিটিভ?
অরীন খুশিতে চিৎকার করে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বললো
মা আমি মা হতে চলেছি।
সবাই শুনতেই বাড়িতে হইহট্টগোল ছেয়ে গেলো। অরীনের মা ও চাচি ফোন দিয়ে বাড়ির কর্তাদের জানিয়ে দিলো।
রিয়ার খুশিতে যে মিষ্টি আনবে তা যেন দ্বিগুন করে দেয়। বাড়িতে দ্বিগুন খুশি ছেয়ে গেছে।
আহমেদ ভিলায় একটা আহমেদ না আরও আরেকটা আহমেদ আসতে চলেছে৷ রিয়া খুশিতে জড়িয়ে ধরে আছে অরীনকে। অরীনের শরীরের কাপনি টের পাচ্ছে সে। মা হওয়ার খুশির চেয়ে পৃথিবীতে বড় কোনো খুশি নেই।
অরীন সাফিনের দিকে চেয়ে দেখলো সাফিনের চেহারা স্বাভাবিকের চেয়ে কেমন গুমোট। অরীনের মনে আজেবাজে ভাবনা ঘুরঘুর করে৷
অরীনের সাথে চোখাচোখি হতেই সাফিন চলে যায় উপরে। তার সাথে সাথে অরীনও যায়।
সাফিন বিছানায় শুয়ে পড়লো।
অরীন তার পাশে এসে বললো
আপনি কি খুশি না?
সাফিন চুপ।
বলুন না আপনি কি খুশি না আমাদের সন্তান আসবে? আমাদের
অরীনকে কিছু বলতে না দিয়ে সাফিন ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। অরীনের মনে হলো সে শ্বাস আটকে মরে যাবে।
সাফিন।
সাফিন অরীনের বুকে মুখ গুঁজে রইল।অরীন পুনরায় ডাকলো।
সাফিন।
সাফিন হুহু করে কেদে উঠলো। ধীরে ধীরে কান্না জোড়ালে হলো। অরীন আতকে উঠলো সাফিনকে কান্না করতে দেখে। সাফিন কাদছে এ অবিশ্বাস্য।
আমি তোকে বুঝাতে পারবো না আমার মনে কি চলছে। অরী আমি বাবা হবো? কেউ আমায় বাবা বলে ডাকবে। অরীন আমি খুশিতে পাগল হয়ে যাবো। আমার বুক কেমন ধ্বক ধ্বক করছে অরীন। একটু ছুয়ে দেখ।
মাঝরাতে হঠাৎ সায়মনের ঘুম ভেঙে যায়। পাশ ফিরে দেখে রিয়া বসে আছে। রাত তখন ৩ টা ১২ মিনিট৷ সে উঠে বসে রিয়ার কাঁধে হাত রাখতেই রিয়া চমকে উঠে। রিয়ার চমকানোতে সায়মন ঘাবড়ে তার শিউরে বসে জিজ্ঞেস করে,
তুমি না ঘুমিয়ে বসে আছো কেনো? খারাপ লাগছে?
নাহ এমনি
এমনি কেউ মাঝরাতে বসে থাকে?
আমি বসে থাকি।
সায়মন বাড়ি আসার পর কারোর সাথেই মন খুলে কথা বলতে পারে না। নিজের কাছে কেমন লজ্জা লাগে। এই কৃতকর্মের শাস্তি খুব অসহনীয়।
আপনি ঘুমান।
নাহ আমিও বসে থাকবো।
কেনো?
কারণ তুমি বসে আছো।
রিয়া সায়মনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। সায়মনও তার নজড় সরালো না।
তাদের আগের মতো একসাথে হাসা হয় না। হাতে হাত ধরে কোথাও ঘুরা হয় না। মন খুলে কথা হয়না। কাছে আসা হয় না। দূরত্বটা কেন দিনদিন বেড়েই চলছে? খারাপ মুহুর্তগুলো কি কোনোভাবে ভ্যানিশ করা যায় না?
হঠাৎ রিয়া পেটে হাত দিয়েই সায়মন বলে,
পেট ব্যাথা করছে? নাকি বাবু লাথি পারছে?
৫ মাসের বাবু লাথি মারে না।
কয়মাসে মারে?
সায়মনের বেকুব প্রশ্নে রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
বাবু আমাকে লাথি মারলে আপনি খুব খুশি হবেন তাই না?
সায়মন সাথে সাথে বলে,
আরেহ না না৷ খুশি হবো কেনো?
তাহলে এমন বেকুব প্রশ্ন করছেন কেন?
না ওইযে পেটে হাত দিলে তাই মনে হলো।
আমার খিদে পেয়েছে।
সেটা আগে না বলবে বোকা। আমি নিয়ে আসছি। ওয়েট।
সায়মন চলে যেতেই পাশে থাকা ডায়েরীটা রিয়া তার ডয়ারে রেখে দিলো।
সকালে হতেই অরীন সাফিনের তুমুল যুদ্ধ লেগেছে। বড়রা কিছুক্ষন আগে ধমকিয়ে গেছে তবুও এরা থামছে না।
অরীনের মাত্র ৩ মাস। এর মাঝেই সাফিন ওকে নিষেধের বেড়াজালে আটকে রেখেছে।
বেশি হাটা যাবে না, অরীন আর বাবু দুজনেরই কষ্ট হবে। বেশি কথা বলা যাবে না এতে অরীন হাপিয়ে যাবে আর পেটে চাপ সৃষ্টি হবে এতে বাবুও কষ্ট পাবে। কোনো কাজ করা যাবে না। ঝাল খাওয়া যাবে না, বাবুর ঝাল লাগবে। মোবাইল ধরা যাবে না এতে বাবু মোবাইল আসক্ত হবে। বাহিরে ঘুরতে যাওয়া তো আরও আগে যাবে না। সে অরীনকে নিয়ে কোনো রিক্স নিবে না। হোক না ৩ মাস ৪ মাস৷ যে মাসই হোক না কেন সাফিন তার বাচ্চা ও তার বউকে নিয়ে সর্বদা সচেতন থাকতে চায়।
কিন্তু অরীন এসবে চরম বিরক্ত। এসব আজগুবি কথা বললে কেই বা বিরক্ত না হবে। সে কি দুনিয়ায় একাই বাবা হচ্ছে আর কেউ কি হয়নি।
আমি আজ বের হবোই হবো।
তোমার পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো।
তোমার পা বুঝি আমি আস্ত রাখবো?
কি বললে?
যা শুনলে।
তোমার এত বড় সাহস তুই আমার পা ভাঙার কথা বললি?
তা তোমার এত বড় সাহস কেনো আমার পা ভাঙার কথা বললে।
তুমি দিন দিন চরম বেয়াদব হচ্ছো। আর এখন আমার বাচ্চাটাকেও বেয়াদব বানানোর পায়তারা করছো।
বাচ্চা কি তোমার একার?
তোমার সাথে তর্ক করা মানে ছাগলের সাথে তর্ক করার।
তোমাকে তর্ক করতে বলেছে কে? আর আমি ছাগল হলে তুমি ছাগলের বর।
সাফিন কটমট করে চেয়ে বলে,
বেয়াদব।
সকালে ঝগড়ার পরও সাফিন বিন্দুমাত্র কমতি রাখেনি অরীনের। সাফিন আজ ঢাকা চলে যাবে। বেচারার এখন প্রেশার বেড়েছে। ব্যবসায় সাথে অরীন দুটোকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।
ঢাকা গেলেও তার মন পড়ে তাকে তার অরীনের নিকট। কিন্তু ৯ মাস কষ্ট করতে হবে।
অরীন অভিমান করে দুপুরে খেলো না। তা শুনে খাবার নিয়ে সাফিন রুমে এসেছে।
খাও নাই কেনো? এখন তুমি একা নও আমাদের বাচ্চাও আছে। একটু নিজের খেয়াল রাখতে পারো না? বাচ্চামি কবে যাবে।
অরীন সাফিনের কথার কোনো উত্তর দিলো না। সাফিন আরও অনেক কথা বলতে বলতে ভাত মাখালো। অরীন নিরুত্তর। আগের সাফিন হলে বোধহয় খুব রেগে অরীনকে দু টো চড় অথবা থমকাতো কিন্তু এখনকার সাফিন ভিন্ন। নিজের সন্তানের জন্য সে খুবই সচেতন, সে চায় না তার রাগ তার সন্তান দেখুক, তা শিখুক। ভালো ডাক্তার দেখিয়েছে। এখন আর অল্পতে হাইপার হয়না। আর ধৈর্যও যেন এই বাচ্চার জন্য দিনদিন বাড়ছে।
হা করো।
উহুম
আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যাবো ঘুরতে।
সত্যিই?
৩ সত্যিই। এবার হা করো।
এবার খুশিতে অরীন আপন মনে খেয়ে নিচ্ছে। তা দেখে সাফিন মুচকি মুচকি হাসছে। সাথে টুকটাক কথাও বলছে।
অরীনের মা এসেছিলো কিছু লাগবে কি না জিজ্ঞেস করতে। তবে এত সুন্দর মুহুর্ত দেখে আর রুমে ঢুকতে ইচ্ছে করলো না।
সাফিন অরীনকে বাচ্চাদের পার্কে নিয়ে এসেছে। অরীনে হাতে ফুচকার প্লেট। একের পর এক খেয়েই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এটা ফুচকা নয় অমৃত।
আর খেয়ো না পেট খারাপ হবো।
কিছু হবে না।
অরী
অরীন শুনলো না। সে আপন মনে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল।
পার্কের কিছুটা নির্জন জায়গায় দুজন হাত ধরে হাটছে আর প্রাণ খুলে কথা বলছে।
আপনার ছেলে না মেয়ে পছন্দ?
দুটোই পছন্দ। তবে আমি মেয়ে বাবু চাই।
ছেলে হলে?
ছেলে হলেও খুব খুশি হবো। মেয়ে হতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই তাই না?
আমি ছেলে বাবু চাই।
একটা ছোট্ট সাফিন পেলে মন্দ হয়না।
বলেই দুজনে হেসে উঠে৷
সময় পেরোতে পেরোতেই আজ ৪ মাস পেরিয়ে গেলো। কাল রিয়ার ডেলিভারি ডেট। সাধারণত গ্রাম অঞ্চলের অনেক জায়গায় দেখা যায়৷ বাড়ির বউদের প্রেগনেন্সির সময় তাদের বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রিয়ার বাবা মা ও এসেছিলো রিয়াকে নিয়ে যেতে তবে রিয়াকএ যেতে দিতে চায়নি বাড়ির কর্তীরা। তারা চায় নিজ হাতে তাদের বাড়ির বউদের সেবাযত্ন করতে। আর তারা করেছেও।
এই ৯ মাস তারা অরীন ও রিয়াকে একই নজড়ে দেখেছে৷ অরীন এই বাড়ির মেয়ে বলে তাকে বেশি আদর যত্ন করবে এমন মন মানসিকতা তাদের কখনো ছিল না।
রাতের দিকে রিয়া শুয়ে ছিলো। এত ভারী শরীরে আজকাল নড়চড় করতে ভীষণ কষ্ট হয়৷ সায়মনও ৮ মাসের সময় থেকে অফিসে যায় না। সারাদিন বাসায় রিয়ার কাছেই তাকে৷ নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে রিয়াকে ভালো রাখার।
গ্লাসে দুধ নিয়ে এসে আলতো স্বরে রিয়াকে ডাক দেয় সায়মন। রিয়া উঠলো না। একবার দুবার তিনবার ডাক দিতেই সায়মন অস্থির হয়ে উঠলে না। উচ্চস্বরে কয়েকবার ডাক দিতেই রিয়া চোখ মেলে ধীর কন্ঠে বলে
কি হয়েছে?
সায়মনের কলিজায় পানি এলো।
উঠছিলে না কেনো?
ভয় পেয়েছিলেন?
সায়মন আমতাআমতা করে। সে আসলেই ভয় পেয়ে ছিলো। এই সময়টা সায়মনের কাছে কত আতংক লাগে সে বুঝাতে পারবে না।
দুধটুকু খেয়ে নাও।
অরীনের পা ভীষণ ফুলে গেছে৷ সে যতবার দেখে ততবার কাদে। পেটও বেড়েছে। মোটাও হয়েছে ভীষণ। সবাই বলে আহমেদ বাড়িতে দুটো ছেলে আসবে।
আমার পা ঠিক করে দিন।
আমি কিভাবে ঠিক করবো?
এই সব আপনার বাচ্চার জন্য হয়েছে৷ আপনি আপনার বাচ্চা নিজের পেটে নিয়ে নেন।
সাফিন বেকুবের মত তাকিয়ে থাকে অরীনের দিকে।
এখন শুধু আমার বাচ্চা?
হ্যাঁ আপনার একারই বাচ্চা নিয়ে নিন। আহ।
কি হয়েছে?
কিক মারছে ফাজিলটায়৷
ও কষ্ট পেয়েছে ওকে শুধু আমার বাচ্চা বলায়। ওটা আমাদের হবে।
হয়েছে সব নাটক৷ মাথা ব্যাথা করছে।
সাফিন এসে এক হাতে অরীনকে আগলিয়ে অপরহাত দিয়ে মাথায় ম্যাসাজ করে দিতে থাকে।
আপনি ম্যাসাজ করলে এত শান্তি লাগে। পুরো ঘুম এসে যায়।
আমার খুব ভয় করছে।
কেনো?
কাল ভাবীর ডেলিভারি। তোমারও ডেলিভারির সময় কেমন তাড়াতাড়ি এসে পড়ছে।
সাফিন আরও কিছু বলতে চেয়েছিলো এর আগেই বাইরে থেকে চিৎকার শুনা গেলো।
রিয়া চিৎকার করছে, সায়মনেরও চিৎকারের আওয়াজ আসছে।
অরীন ও সাফিন দুজনেই আতকে উঠলো। অরীন তাড়াতাড়ি উঠতে নিলে সাফিন তাকে আটকিয়ে দেয়।
তুমি থাকো। আমি দেখছি তোমার উঠার লাগবে না।
বলে তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো রুম থেকে।
হাসপাতালে সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছে। অরীনের মা দুয়া দুরুদ পড়ছে মা সন্তান দুজন যেন সুস্থ হয়ে যায়। অরীনের বাবা ও চাচা এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। সায়মন দুশ্চিন্তায় ছটফট করছে। সাফিন ভাইয়ের কাঁধ ধরে আশ্বাস দিচ্ছে।
রিয়া বাবা মা ও এসে পড়লো। মিতার নতুন বিয়ে হয়েছে স্বামীর সাথে নিউজিল্যান্ডে থাকে। আরেকদিকে রিয়ার এ সময়ও রিয়ার ভাই এলোনা।
রিয়ার মা কাঁদছে। মা যেমনই হোক মেয়ের দুঃসময় মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে না। রিয়ার বাবা টুকটাক সবার সাথে কথা বলল।
.
.
.
বাড়িতে অরীন আর অরীনের চাচি সে এমনিতেও অসুস্থ তার মধ্যে অরীনকেও বাড়িতে একা ছাড়া যাবে না। অরীনের চাচি নফল নামাজ পড়ছে। তার বউমা আর নাতি তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে পড়ুক। সাফিন কল দিয়েছিলো অরীনকে। কোনো টেনশন নিতে নিষেধ করেছে।
কিন্তু অরীনের দুশ্চিন্তা যাচ্ছে না উল্টো ভয় বেরেই চলছে। রিয়ার চিৎকারের সময়টা মনে পড়তে গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। কতটা ব্যাথা পেলে মানুষ এভাবে চিৎকার করতে পারে? অরীন এবার ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে উঠলো।
এই ফ্যাচ ফ্যাচ কান্না ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে। অরীনের চাচি তখন মোনাজাতে ছিল। তাড়াতাড়ি মোনাজাত শেষ করে তাড়াতাড়ি অরীনের কাছে এসে বলল
কাদছিস কেনো??
ও চাঁচি তুমি আমার পেট থেকে বাচ্চাটা তোমার পেটে নিয়ে নাও গো৷ আমি ডেলিভারি করাবো না।
চুপ পাগল। এসব কি বলছিস পাগল হয়ে গেছিস?
ভাবী খুব ব্যাথা পাচ্ছে কিভাবে চিৎকার করলো। ভাবীর জায়গায় আমি হলে তো মরেই যাবো।
ছিহ এসব কথা বলতে হয়না মা। এই ব্যাথা সব মায়েদের সহ্য করতে হয়।
আমি ওসব পারব না তুমি তোমার নাতনি বা নাতিকে নিয়ে যাও৷ দুনিয়ায় আসার পর আবার ফেরত দিয়ো।
অরীন ভয়ে কি বলছে না বলছে নিজেও বুঝতে পারছে না।
অরীনের চাচি মাথায় হাত রেখে বসে আছে। কোন পাগলের মেলে তাকে সবাই রেখে গেলো।
সাফিনের বাবার আর্জেন্ট কল এসেছে। খুবই জরুরি কাজ। তাই সাফিন বাবাকে যেতে বলল। এদিকটা চাচার সাথে সে সামলে নিবে। অরীনের বাবাও আশ্বাস দিলো বলে সে চলে যায়।
ডাক্তার বের হয়ে বলে
পেশেন্টের অবস্থা অনেক নাজুক। পেগনেন্সির এই সময়টায় মায়েদের উচিত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি থাকা। কিন্তু পেশেন্ট শারীরিক ও মানসিক দু দিক থেকেই প্রচুর দূর্বল।
একজন নার্স একটা পেপার এনে বলে,
মায়ের লিগেল গার্জিয়ান কে?
সায়মন এগিয়ে এসে বলে
আমি।
এখানে সাইন করুন৷
সায়মন তাড়াহুড়ো করে সাইন দিতে যাবে সাফিন বাঁধা দিয়ে বলে এটা কিসের পেপার।
না-দাবীর।
নার্সের কথায় চমকে উঠলো সবাই। ডাক্তার বলল
আমরা সবোর্চ্চো চেষ্টা করি যাতে মা এবং বাচ্চা দুজনেই সুস্থ স্বাভাবিক রাখতে তবে এখানে ভীষণ কমপ্লিকেশন দেখা দিয়েছে৷ মায়ের খুব রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এমন মুহুর্তও আসতে পারে যে
মা এবং বাচ্চার মধ্যে যেকোনো একজনকে বাঁচানো যাবে। তো সেক্ষেত্রে আপনারা কাকে প্রাধান্য দিবেন? কাকে বাচাতে চান?
চমকের উপর আরো এক চমক। কিন্তু এই চমক খুব বিশ্রী, কুৎসিত। সবাই কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলছে। রিয়ার মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। রিয়ার বাবা তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আরীনের মাও নিজের হুশজ্ঞান হারিয়ে বিলাপ করছে।
সাফিন বলল
আপনাদের মাথা ঠিক আছে? বাচ্চার মার কিসের কমপ্লিকেশন দেখা দিয়েছে? সুস্থ স্বাভাবিক ত ছিল। আর দুজনের একজন কে বাচাতে হবে মানে কি আমরা বাচ্চার মাকেই বাচা…
সাফিনের কথা শেষ করতে না দিয়ে সায়মন বলে উঠলো
আমার বাচ্চা আমি আমার বাচ্চাকে চাই। আমার বাচ্চাকে আগে বাচান। ও ঠিক আছে তো?
সাফিন ধমকে সায়মনকে বললো
ভাই আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড?
হ্যাঁ আমার বাচ্চা আমি আমার বাচ্চাকে চাই।
সায়মন পাগলের মতো তাড়াতাড়ি সাইন করে চারপাশে মাথা দুলিয়ে একই কথা বারবার বলতে থাকে।
ডাক্তার বললো,
আমাদের হাতে সময় কম দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন।
সাফিন বলল
আমি বলেছি তো মাকে বাচান। মা বেচে থাকলে বাচ্চা পাবেই। আসলে আমার ভাই হোশ জ্ঞান এ নেই।
সাফিনের কথায় অরীনের বাবা মা রিয়ার বাবা দুজনেই সাই দেয়। ডাক্তার চলে যায়।
সায়মন চিৎকার করে সাফিনকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
তোরা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাচ্ছিস কেন? তুই তোর বউ বাচ্চা নিয়ে ভাব। আমারটায় মাদবর গিরি দেখাতে বলেছি তোকে?
অরীনের বাবা ধমকে সায়মনকে বলে,
সায়মন এ কেমন ব্যবহার?
সাফিন অবাকে চরম সীমানায় চলে গেছে। তাদের আরও অবাক করে দিয়ে সায়মন সাফিনের কলার চেপে বলে,
তুই তো চাসই আমার বাচ্চা মরে যাক।
ভাই
কে তোর ভাই হ্যাঁ? তুই ই তো বলেছিস তোর আমাকে নিয়ে হিংসা হয়। আসলে ঠিকই বলেছিস আমার খুশি তোর সহ্যই হয়না। আমার এই খুশিতেও তোর হিংসা হয়েছে যখনই শুনেছিস আমার সন্তান আসতে চলেছে তখনই মাথায় এলো ওর সন্তান হলে তো তোকে আর তোর বউকে কেও গণনায়ও ধরবে না এজন্য ইচ্ছে করে নিজেও বাচ্চা নিয়ে নিলি। এখন যেহেতুআমার বাচ্চা দুনিয়ায়তে না আসার সু্যোগটাও পেয়েছিস এই সু্যোগও খাবলে ধরেছিস।
ভাই
সাফিনের গলা দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। কেমন শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো কেমন টলমল করছে। সায়মনের প্রত্যেকটা কথা বুকে ছুরির মতো ঢুকলো। সে তার ভাইয়ের বাচ্চাকে নিজের বাচ্চার মতোই আপন ভাবে। নিজের ভাইকে সে কত ভালোবাসে সে নিজেও জানে না। কিভাবে সায়মন তাকে নিয়ে এত ঘৃণ্য কথা ভাবতে পাড়লো?
রিয়ার বাবা এসে সায়মনকে চড় মেরে বলে
আমার জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল তোর মতো জানোয়ারের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়া।
সায়মন তার শ্বশুরকেও ছাড়লো না। তার বুকে ধাক্কা দিতেও রিয়ার বাবা টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলো।
এই বুড়ো তোর সাহস কিভাবে হলো আমাকে চড় মারার?
সাফিন রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হামলে পড়লো সায়মনের উপর। দুজনের হাতাহাতি লেগে গেলো৷ মানুষজনের ভীড় বেড়ে গেলো।
অরীনের বাবা কাউকে থামাতে পারছে না। কয়েকজন এসেও কোনো লাভ হচ্ছে না। কয়েকজন ডাক্তার এসে ওয়ার্নিং দিলেও এরা থামলো না।
অরীনের বাবা সায়মনকে আর রিয়ার বাবা সাফিনকে খুব কষ্টে সরিয়ে আনে। অরীনের মা হুহু করে কেদেই চলছে। সাফিনের বাবা তারমধ্যেই এসে পড়লো। তাকে অরীনের বাবা সব জানিয়েছে।
করিডরে বিশৃজ্ঞলা সৃষ্টি হবে বলে শান্ত রইলো। অরীনের বাবা দুজন নার্স ডেকে আনলো দুজনেই মারামারি করে আঘাত পেয়েছে। নার্স সাফিনের কাছে আসলে সে বাঁধা দিয়ে বলে
প্রয়োজন নেই।
এরপর সে আর এক মুহুর্তও সেখানে থাকলো না। এখনে এখন তার বাবা এসে পড়েছে তার আর কোনো কাজ নেই।
.
.
.
.
.
বাড়ি ফিরেই সাফিন নিজের রুমে নক করলো। সে জানে ভিতরে তার মাও অরীনের সাথে আছে।
সাফিন রুমে ঢুকতেই সাফিনের মা আঁতকে ওঠে এসে জিজ্ঞেস করে,
কি হয়েছে?
সাফিন তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে
কিছু হয়নি।
অরীন সবে মাত্র ঘুমিয়েছে তাই টের পেলো না সাফিনের আাসাটা। সাফিন অরীনকে ঘুমাতে দেখে একটু শান্তি পেলো। সাফিনের মা এবার জিজ্ঞেস করলো,
ওদিকে কি খবর৷
বেশি ভালো না। ভাবীর অবস্থা নাজুক। তুমি দোয়া করো৷ আর রুমে গিয়ে নাহয় শুয়ে থাকো নাহলে তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে।
বলেই সাফিন ওয়াশরুমে চলে গেলো।
বের হয়ে মাকে পেলো না।
সে বিছানায় এসে অরীনের ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে অপলক চেয়ে রইল। তারপর নিচে নেমে অরীনের জামা উঠিয়ে তলপেটে চুমু খায়।
ঘুমের মাঝে পেটে ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে কেপে উঠে অরীন। সাফিন তার জামা ভেদ করে তার সারা শরীরে হাত বুলায়। অরীন শিহরিতহয়ে চোখ মেলতেই সাফিনকে দেখতে পায়।
আপনি এসেছেন ওদিকে কি খবর?
সাফিন কিছু না বলে অরীনের গলায় মুখ গুজে দেয়।
আমিও বাচ্চাকে চাই কিন্তু তার আগে চাই বাচ্চার মাকে।
সাফিন! সাফিন!
হাসপাতালের সবকিছু অরীনকে বলতে বলতে সাফিনের চোখ লেগে এসেছিলো। অরীনের ঘাড়ে মুখ গুছে কখন ঘুমিয়ে গেছে টের পায়নি। অরীনও এখন আগের চেয়ে ঘুমকাতুরে হয়েছে।
সাফিন!
আবারও নিচ থেকে চিৎকার শুনে দুজন ধরফরিয়ে উঠে বসে।কি হয়েছে জানতে দুজন দুজনের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে। সাফিন উঠে দরজা খুলে নিচে তাকাতেই দেখে সায়মন সব ভাঙচুর করে তাকে চেঁচিয়ে ডাকছে। সাফিনের পিছনে দাঁড়ানো অরীন ভয়ে সাফিনের হাত খামচে ধরে। সাফিন ঘুরে অরীনকে বলে
রুমে যাও কিছক্ষন পর আসছি।
অরীন ভয়ে দুদিকে মাথা নাড়ায়।
সাফিন বলে, “যতক্ষণ পর্যন্ত না বলবো রুম থেকে বের হবে না।”
অরীন নিচে তাকাতেই দেখে সায়মন লাঠি দিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাচটা ভেঙে ফেল্লো। সায়মন এখন খুব রেগে আছে তার মধ্যে হুংকার দিয়ে সাফিনকে ডাকছে। সে সাফিনকে মারবে না তো? হাস্পাতালের কথা স্মরণ হতেই আরো ভয় ঝেকে ধরলো। সে হুহু করে কান্না করে বলে
দয়া করে আপনি যাবেন না। দয়া করে রুমে চলুন সায়মন ভাই খুব রেগে আছে আপনাকে আঘাত করতে পারে।
সাফিন এক হাতে অরীনকে আগলে ধরে আশস্ত করতে বলে,
ভাই আমায় কিছু করবে না তুমি ভয় পেও না। রুমে যাও।
অরীন আরো শক্ত করে তার হাত ধরে জোরে কান্না করে দিলো।
সায়মন উপরে তাদেরকে দেখে বিশ্রী অকথ্য ভাষায় গালি ছুড়লো। তখন সবে সাফিনের মা বের হয়েছে রুম থেকে।
সাফিনের মাথার রক্ত গরম হয়ে গেলো। অরীনকে এবার জোড় করে ঘরে ঢুকিয়ে বাহির থেকে দরজা আটকিয়ে দিয়ে নেমে আসে নিচে।
সায়মন তার মাকে দেখেও মুখ সংযত করলো না। সাফিনের বাবা ও চলে আসলো বাসায়। সায়মন কাউকে পরুয়া না করে আবারও বিশ্রী গালি ছুড়ে সাফিনকে ঘুষি মারে।
তোর জন্য আমি আমার বাচ্চা হারিয়েছি শু*****। শুধুমাত্র তোর জন্য আমার ছেলে মরেছে তোকে তো আমি
বলে আমাকে এক ঘুষি মারতে নিলে সাফিন তার হাত ধরে উল্টো ঘুরিয়ে বলে,
তুই আমার বড় ভাই বলে সবসময় চুপ থাকবো তা ভাবিস না।
সাফিনের মা তাদের মাঝে এসে সায়মনকে ছাড়িয়ে বলে
কি হয়েছে বাবা শান্ত হো। কি বলছিস তুই বাচ্চা হারিয়েছিস এসব মন্দ কথা…
সায়মন চিৎকার করে বলে,
হ্যাঁ আমি আমার বাচ্চা হারিয়েছি আমার ফুটফুটে ছেলেকে হারিয়েছি শুধুমাত্র ওর জন্য।
শেষ কথাটা ক্ষুব্ধ হয়ে সাফিনের দিকে আঙুল তুলে বলে।
সাফিনের মা কান্না করতে করতে বলে, ও কি করেছে?
ওই ডাক্তারকে বলেছে আমার সন্তানকে মেরে ফেলতে।
পিছন থেকে সাফিনের বাবা এসে চড় মেরে বলে,
খুব দেখি নিজের বাচ্চা বাচ্চা করছিস? তুই তোর বাচ্চাকেই দেখছিস নয়মাস যে পেটে নিলো তাকে চোখে দেখছিস না? যে কতশত নির্ঘুম রাত জাগলো, কতশত যন্ত্রণা সহ্য করলো, এমনকি মৃত্যুর সাথে লড়াইও করেছে এখনো করছে তার কথা মাথায় আসছে না? তুই মা ও বাচ্চার মধ্যে বাচ্চাকে বাঁচাতে বললি এত বিবেকহীন কিভাবে হলি?
সায়মন বলে,
আমার কাছে আমার বাচ্চা আগে
বলতেই পুনরায় ঘুষি পরে মুখে। তবে একবার নয় দু দু বার।
কুলাঙ্গার জন্ম দিয়েছি আমি। ভেবেছিলাম কিছুদিন জেল খেটে শিক্ষা হয়ে গেছে কিন্তু ভুল ছিলাম কুত্তার লেজ কখনো সোজা হয় না।
কি করবে আমায় আবার জেলে পাঠাবে? হুম তাই তো পারবে। আমার বাচ্চা মরে গেছে কারোর দুঃখ নেই উল্টো আমাকে কথা শুনাচ্ছো।
সাফিনের বাবা হুংকার ছেড়ে বলে,
এই বাচ্চা কি আমাদের কিছু হয়না? সবকিছু আল্লাহর হাতে তিনি চাননি তাই ও আসেনি পৃথিবীতে। এখানে কারোর দোষ নেই। বার বার বাচ্চা বাচ্চা না করে বাচ্চার মায়ের কথা ভাব ও সুস্থ হলো তুই আবারও বাবা হতে পারবি। রিয়া তোর সহধর্মিণী, বাচ্চার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ও।
সাফিনের মা হাউমাউ করে কেঁদে বলে, রিয়া কেমন আছে?
ভালো নেই জীবন -মৃত্যুর মাঝামাঝিতে পাঞ্জা লড়ছে।
শুনে ভেঙে পড়ে সাফিনের মা। অরীন রুমে দরজায় সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো সেও এতক্ষন সব শুনতে পেরেছে। রিয়ার কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে।
সায়মন মেঝেতে তাকিয়ে জুড়ে শ্বাস নিয়ে আঙুল উঁচিয়ে সাফিনকে বললো,
তখন আমি বলেছি আমার বাচ্চাকে বাঁচাতে কিন্তু তুই….. তুই উল্টো বলেছিস বাচ্চার মায়ের কথা। তোর জন্য আজ আমার বাচ্চা নেই।
সাফিন রেগে বলে,
আবারও একই কথা বলছিস। এই তুই কি চেয়েছিস ভাবী মরে যাক? বল
শেষের কথাটা হুংকার দিয়ে বলে সাফিন। সায়মন শুনলো না কিছু সে বলে,
তোকে আমি বদদোয়া দিলাম, আজ যেমন আমার বাচ্চাকে আমি হারিয়েছি তুই তোর বাচ্চাকে হারাবি। তুই সব হারাবি সব। তোর কাছে কেউ থাকবে না।আজ আমার পাশে যেমন কেউ নেই। তোর পাশেও কেউ থাকবে না।
সাফিন হুংকার ছেড়ে বলে, ভাইইইই।
সাফিনের মা এসে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে বলে,
জানোয়”ার শু”””” বাচ্চা জন্ম দিয়েছি আমি। তোকে জন্মের সময় আমার গলা টিপে মেরে ফেলা উচিত ছিলো। নিজের ভাইকে বদদোয়া দিচ্ছিস জানো””” কুলাঙ্গার।
সায়মন একমুহূর্তও সেখানে রইলো না। চলে গেলো বাড়ি ছেড়ে। সাফিনের বাবা মেঝেতেই বসে পড়লো মাথায় হাত দিয়ে। সাফিনের মা ও বসে পড়লো ভাঙা কাচের উপর। হাউমাউ করে কাঁদছে।
আমাদের বাড়িতে কার নজড় পড়লো উপরওয়ালা। কি থেকে কি হয়ে যাচ্ছে।
সাফিন নিষ্পলক চোখে মেঝেতে তাকিয়ে আছে। পাথরের মতো। বারবার তাকে দেয়া বদদোয়াটা কানে আসছে।
তোকে আমি বদদোয়া দিলাম, আজ যেমন আমার বাচ্চাকে আমি হারিয়েছি তুই তোর বাচ্চাকে হারাবি। তুই সব হারাবি সব। তোর কাছে কেউ থাকবে না। আজ আমার পাশে যেমন কেউ নেই। তোর পাশেও কেউ থাকবে না।
সাফিন ধীরেধীরে পিছু যেতে যেতে সিঁড়ি কাছে এসে থমকে গেলো। ধপ করে বসে পড়লো। গোটা ডাইনিং রুম ধ্বংসস্তুপের মতো হয়ে আছে৷ চারপাশ শান্ত। ভয়ানক শান্ত।
.
.
.
করিডোরে রিয়ার বাবা মা বসে আছে তাদের সামনে অরীনের মা ও বাবা বসে আছে। ডাক্তার এসে বললো।
পেশেন্টের অবস্থা আগে থেকে অনেকটা ভালো। আপনারা তার জন্য দোয়া করুন।
রিয়ার মা বাবা মেয়ের সুস্থতার খবর শুনে এবার খুশিতে উচ্চস্বরে কেঁদে দেন। অরীনের মা দু হাত তুলে বলে,
“আলহামদুলিল্লাহ”
.
.
.
.
.
সাফিনের বাবার ফোনে কল এলো। অরীনের বাবা কল দিয়ে জানিয়েছে রিয়া আগের চেয়ে সুস্থ। সাফিনের মা উঠতে নিয়ে ব্যাথায় চিৎকার দিলো। সাফিন ও সাফিনের বাবা এগিয়ে এসে রক্ত দেখতে পায়। এতক্ষন কান্নার তোপে হাজারো টেনশনে হুশই ছিল না সে কাচের উপর বসেছে। ব্যাথাও যেন ভুলে বসেছিলো।
রক্ত ঝড়ছে খুব। সাফিনের বাবা তার মাকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হলো। সাফিনকে সাথে বের হতে দেখে সাফিনের বাবা বলে,
তুই কেন যাচ্ছিস অরীন একা বাড়িতে ওর কাছে যা।এ পরিস্থিতিতে ওকে হাসিখুশি রাখর চেষ্টা কর। পারলে কাল সকালে ওকে সাথে করে ঢাকা নিয়ে যাস।
সাফিনের হাটা থেমে গেলো। তার হঠাৎ টনক নড়লো। অরীনের কথা যেন ভুলেই বসেছিলো।
অরীন!
অরীনকে সে একা জোড় করে রুমে রেখে এসেছিলো। সে দ্রুত উল্টো ঘুরে দৌড় লাগায় নিজেদের রুমের উদ্দেশ্যে।
সাফিন দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখে মেঝেতে পরে থাকা অরীনের অচেতন দেহ। তার মাথাটা কেমন ঘুরতে লাগলো। শরীরের শক্তি ফুরিয়ে আসছে। ফুরিয়ে আসছে কথা বলার শক্তি। তার বুক ধক করে কি করবে। কাছে যেতে ভয় হচ্ছে মাথা কাজ করছে না।
অরী
সাফিন ছুটে যায় অরীনের কাছে। দুহাতে ধরে তোলে তাকে অরীনের কপাল ঘামে ভিজে গেছে, নিঃশ্বাস ধীর।
হায় আল্লাহ, প্লিজ কিছু যেন না হয়
ভয়ার্ত কাপা হাতে অরীনের গাল স্পর্শ করতে ভয় আরও বেড়ে গেলো। গ্লাস থেকে পানি ছিটিয়ে দেয় অরীনের মুখে, অরীনের জ্ঞান ফিরে না। সে এবার পাগলের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে অরীনকে দ্রুত কোলে তোলে নিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে।
.
.
.
.
গাড়ির পথে যেতে যেতে বারবার অরীনের কপালে হাত রাখে, ধীরে ধীরে ডাকে
অরী, উঠো অরী প্লিজ। আমাদের ছোট্ট বাচ্চাটার জন্য হলেও চোখ মেলো।
হাসপাতালে পৌঁছে ডাক্তাররা দ্রুত অরীনকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। সাফিন বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু একটাই প্রার্থনা করে "ওদের যেন কিছু না হয়। অরীন যেন সুস্থ থাকে"
সাফিনের নিজেকে সবচেয়ে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। ও কিভাবে অরীনকে এ অবস্থা একা রেখে আসলো তাও দরজা বন্ধ করে৷ অরীনের যখন খারাপ লেগে ছিলো সে অবশ্যই সাফিনকে ডেকেছিলো? দরজা খুলার জন্য আকুতি করেছে। কিন্তু সাফিন কি করলো? এত দায়িত্বজ্ঞানহীন কিভাবে হলো। তার মনে পরলো সায়মনের দেওয়া অভিশাপ
তোকে আমি বদদোয়া দিলাম, আজ যেমন আমি আমার বাচ্চা হারিয়েছি তুই তোর বাচ্চাকে হারাবি। তুই সব হারাবি তোর কাছে কেউ থাকবে না। আজ আমার পাশে যেমন কেউ নেই, তোর পাশেও কেউ থাকবে না।
কথাটা মনে পরতে কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখের সামনে অরীনের মিষ্টি চেহারাটা ভেসে উঠলো, ভেসে উঠলো তাদের অহরহ কত শত ভালোবাসার মুহুর্ত, একে অপরকে ঘিরে কতশত প্রেমময় বাক্য। তাদের ঘনিষ্ঠ মুহুর্তে অরীনের ভালোবাসার সীকারোক্তী। অরীনের মাঝে নিজের সকল সুখ খুজে পাওয়া, তাদের প্রথম বাবা মা হবে শুনার মুহুর্ত, ঢাকায় গিয়ে অরীনের শুূন্যতা অনুভব করা, ভিডিও কলে তাদের মিষ্টি খুনসুটি কান্নাকাটি।
সাফিন দুদিকে মাথা নাড়ায়, তার হঠাৎ এসব মনে পড়ছে কেন? দুর অরীনের কিছু হবে না কিছু না, অরীনের কিছু হতেই পারে না। আর না তার বাচ্চার কিছু হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কুল সাফিন কুল কুল!!!
ডাক্তার এসে জিজ্ঞেস করলো,
জ্ঞান হারিয়েছে কতক্ষন হলো?
সাফিন জানে না অরীন কখন জ্ঞান হারিয়েছে। নিজেকে অপদার্থ ছাড়া কিছু মনে হলো না। তবুও সায়মনের সাথে কথা কাটাকাটির মুহুর্ত হিসেব করে বলে
ঘন্টাখানেক হবে।
এ তাও বহুত সময়। এত দেরী করে নিয়ে আসলেন কেন?
সাফিন সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করে বলে,
আমার অরীন ঠিক আছে? আর বাচ্চার কিছু হবে না তো?
আপাতত আল্ট্রাসাউন্ড না করে কিছু বলতে পারছি না। তবে কোনো রক্তপাত হয়নি তাই অতটা বিপদজনক পরিস্থিতি নেই। তবুও আপনি দোয়া করুন যাতে দুজনের কোনো সমস্যা না দেখা যায়।
.
.
.
.
একই হাসপাতালে নিয়ে এসেছে সাফিন। অরীনের মা মেয়ের এমন সংবাদ শুনে ছুটে আসে অরীনের কাছে। সাথে তার বাবাও। রিয়ার বাবা মায়ের কষ্ট তারা খুব করে এখন অনুভব করছে। সব বিপদ একই সঙ্গে আসলে শক্ত থাকা যায় না। সাফিন করিডোরের মেঝেতে বসে মুখে হাত চেপে ফুপিয়ে কেদে যাচ্ছে তার পাশে কেউ নেই। ছেলে মানুষের নাকি কাঁদা নিষেধ? ছেলেরা নাকি শত কষৃটেও কাদেঁ না? সাফিন কাঁদছে। তার স্ত্রীর জন্য কাদঁছে, সে কাদঁছে তার ভালোবাসার কারণে, ভালোবাসার অংশ তার সন্তানের কারণে।
মুখায়ব লাল হয়ে গেছে কান্না করার কারণে।
সে তার বউকে রক্ষা করতে পারেনি এর থেকে ব্যর্থতা তার জন্য কি হতে পারে। তারা এসে সাফিনকে হাজারো প্রশ্ন জিজিজ্ঞেস করছে সাফিন কিছু বলতে পারছে না। গলা দিয়ে কথা যেন বের হচ্ছে না।
ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে সাফিনের জন্য। হাসপাতালের করিডোরে পেছন-পেছন পায়চারি করছে সাফিনের বাবা। তারা সবে এসেছে। সাফিনের মা হাউমাউ করে কাদছে। তাদের সুখে কার নজড় লাগলো বলে বিলাপ করে করে বড় ছেলের কান্ডকারখানা তাদের শুনালে, অভিশাপের কথা শুনতেই অরীনের মা আতঁকে উঠলো৷ যে ছেলেকে সে ছোট থেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে আগলে রেখেছে সেই ছেলেই তার মেয়েকে এত বড় অভিশাপ দিলো। সাফিনের স্ত্রী অরীন৷ সাফিনের সব জুড়েই এখন অরীন।সাফিনকে অভিশাপ দেয়া মানেই তো অরীনকে দেয়া। সবার চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ, ঠোঁটে প্রার্থনার ফিসফাস। সাফিনের কান্না থেমে গেছে। সে একই জায়গায় পাথরের ন্যায় বসে আছে। একই ভঙ্গিতে এক মৃত লাশের ন্যায়।
হঠাৎ একজন নার্স এসে জানাল,
অভিনন্দন, আপনার স্ত্রী ও বাচ্চা দুজনই এখন নিরাপদ। কিন্তু তাদের আজ রাতটা অবজারভেশনে রাখা হবে।
সাফিন কোনো প্রতিক্রিয়া দিলোনা। ঠায় বসে রইল। সবাই উপরওয়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যেন শান্তির নিঃশ্বাস নিলে। অরীনের মায়ের বুকের ওপর চেপে থাকা একটা বিশাল পাথর যেন সরে গেল। সাফিনের মা শান্ত হলো সে ভেবেই নিয়েছিল সায়মনের অভিশাপ বোধহয় ফলে যাবে।
সাফিন উঠে এসে শুধু একটা কথাই আওড়ালো
আমি আমার স্ত্রীকে দেখতে চাই।
.
.
.
.
কেবিনে ঢুকে সে দেখে বিছানায় ঘুমন্ত অরীনকে। কপালে স্যালাইনের ছায়া পড়ছে। ক্লান্ত মুখ, তবু একরকম প্রশান্তি।
অরীন
সে আস্তে ডাকল অরীনকে।
অরীন ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়, কণ্ঠ মৃদু,
আমি পড়ে গেছিলাম... বাচ্চাটা...?
সাফিন হাত ধরে বলে,
ও ঠিক আছে।
তারপর ঢোক গিলে বলে, তুমিও ঠিক আছো, এটাই সবচেয়ে বড় শান্তি।
বলে অরীনের শুষ্ক ঠোটে শক্ত চুমু খায় সাফিন। কিন্তু সরে যায় না। ঠোট ছুঁয়ে রাখে কিছুক্ষণ। তারপর কপাল ঠেকায় অরীনের কপালে। নিজেকে শান্ত করার প্রয়াস চালায়।
অরীন চোখে জল নিয়ে বলে,
রিয়া ভাবী?
সাফিন সরে না গিয়ে একইভাবে থেকে বলে,
সে আগের চেয়ে সুস্থ আছে।
আর বাচ্চা?
অরীনের কথায় কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।
অরীন নিশব্দে কান্না করতে থাকে। তার কান্না থেমে যায় হঠাৎ শীতল কিছুর স্পর্শ পেতে। সে কপালে হাত ছুতেই পানি দেখতে পায়। সে মাথা উঁচিয়ে সাফিনের দিকে তাকাতেই সাফিন নিজের দূর্বলতা ঢাকার চেষ্টা করে।
আপনি কাদঁছেন?
কই না তো।
আমি দেখেছি আপনাকে কাঁদতে।
সাফিন অরীনে কপালে চুমু খেয়ে বলে,
তুমি আমার অস্তিত্বে মিশে আছো অরী, যদি তোমার কিছু হয়ে যায় আমিও মরে যাবো।
অরীন সাফিনের মুখে হাত চেপে বলে,
এ কথা আর কোনোদিন বলবেন না। আপনার কিচ্ছু হবে না।
তারা কিছুক্ষণ দুজনকে জড়িয়ে ধরে রইলো।
দরজায় কড়া নাড়ে অরীনের মা। মেয়েকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে।
সাফিন সরে যায়। তাদের ভেতরে আসতে বললে যেন সবাই হুড়মুড়িয়ে ভিতরে ঢুকে।
.
.
.
পরেরদিন অরীনকে সাফিন সরাসরি ঢাকা নিয়ে যায়। তাদের সাথে অরীনের মাও আসে মেয়ের দেখাশুনার জন্য। রিয়াকে তার বাবা মা তাদের সাথে নিয়ে যায়। মানসিক অবস্থা খুবই নাজুক রিয়ার। অরীন দেখা করেছিলো রিয়ার সাথে। রিয়া খুবই ভেঙে পড়েছে৷ সায়মনের কৃতকর্মের কথা কিছুই বলেনি রিয়াকে। এমনিতেই বাচ্চা হারানোর শোকে মানসিক ভাবে অসুস্থ তারমধ্যে স্বামীর ঘৃণ্য মানসিকতা কাজকর্ম শুনে ঠিক থাকতে পারবে না রিয়া।
আহমেদ ভিলা এখন শান্ত। সেদিনের পর ১ সপ্তাহ হলো। এই এক সপ্তাহে প্রতিরাতে সায়মন মদ খেয়ে ফিরে। কখনে ৩ টা কখনো ৪ আবার কখনো বাড়িতে আসেও না। আজও নিত্যদিনের মতো মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ টায়। বলতে গেলে তাড়াতাড়ি এসেছে। খুব মহত কাজ করে আসলে যেমন গৌরব করা উচিত তেমনভাবে সাফিনের বাবা তিরস্কার করে গেলো সায়মন কে। এসে শুয়ে পড়েছিলো বিছানায়। পায়ের জুতোটাও খুলেনি। সুদর্শন চেহারা এখন শুকিয়ে রোগীদের মতো হয়ে আছে। চেহারা বির্বণ, দাড়ি মোছ দুটোই বড় হয়ে গেছে।
ভোরের আজানের সাথে সাথে ঘুম ভাঙলো সায়মনের। অসময় ঘুম ভেঙে যাওয়ায় চরম বিরক্ত এত তাড়াতাড়ি তো সে উঠে না। আবারও ঘুমাতে চেষ্টা করলো কিন্তু ঘুম আসলো না বলে জামা কাপড় বলতে ফ্রেশ হয়ে আসে। জানালা খোলা ছিলো তীব্র বাতাসে পর্দা উড়ছে। জানালার পাশেই বুকশেলফ থেকে একটা ডায়েরি পড়ে গেলো। সায়মনের তা চোখে পড়তেই এগিয়ে আসলো সেটা তুলতে।
হাতে নিয়ে পৃষ্ঠার উল্টাতেই একটা লেখা তার চোখে বাজলো৷ দৃষ্টিতে বিষ্ময় খেলে যায়।
“আমার মনের কিছু খুচরো কথা শুধু তোমাকে শুনাবো ডায়েরি। তোমাকে আমার অনেক আপন লাগে। কারণ তোমাকে আমি আমার মনের সব কথা বলতে পারি। তোমাকেও অনেক ভালোবাসি ডায়েরী।”
প্রথম পৃষ্ঠায় এতটুকুই ছিল। সায়মন পৃষ্ঠার উল্টালো।
“আমি আজ উনাকে নিয়ে লিখবো। ইশশ এত লজ্জা লাগছে কেনো হাসিই থামছে না। জানো ডায়েরী “উনি” না চোখ ধাঁধানো সুন্দর। কি সুন্দর চোখ নাক মুখ আস্ত “উনি” টাই সুন্দর। তুমি কি উনার কথা শুনতে চাও বলবো?”
এতটুকু সায়মনের কপালে ভাজ পড়লো। রিয়া কি বিয়ের আগে কাউকে ভালেবাসত? বুক ব্যাথা করে উঠলো তার। সে বিছানায় বসে পড়তে শুরু করলো।
“আচ্ছা আচ্ছা বলছি। উনি টার নাম জানি না বুঝলে। বারবার তো উনি উনি করা যায় না তাই তার নাম রাখলাম “মনোহর”। নামটা কেমন দারুণ না? এটা কেন রাখলাম জানো
কারণ মনোহর অর্থ মন হরন করেছে এমন কেউ।
সেও প্রথম দেখায় আমার মন হরণ করেছে তাই সে আমার মনোহর।
তাকে আমি প্রথম দেখেছি আমার প্রাপ্তন কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। কলেজের টিচারের সাথে সেদিন দেখা করতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ গেটের সামনে তাকে দেখে চোখ ফিরাতে পারিনি। জানো ক্লাস ৮ থেকে আমি শত শত প্রপোজাল পেয়েছি কিন্তু কাউকে আমার মনে ধরে নি কিন্তু সে তাকে দেখেই মন ধ্বক ধ্বক করলো৷ এই প্রেমের বাতাস গায়ে লাগতেই আমার কি হলো কে জানে। বাড়ি এসেও এই লোকটা মাথায় এঁটে আছে। তারপর কি হলো জানো? লোকটার জন্য বিনা কারণে আবারও কলেজে গেলাম একটু দেরী হয়ে গেলো৷ জানো মনটা ভেঙে গেছে আমার ওর সাথে একটা মেয়েকে দেখে৷ ওর পেছনে ওই কলেজের একটা মেয়ে বসে ছিলো। বাইকটা একদম আমার সামনে দিয়ে যখন গেলো মনে হলো ছুরি এসে বুকে ক্যাচ করে ঢুকে ওপর পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। এখন না আমার খুব খারাপ লাগছে। পেছনের মেয়েটাও দেখতে সুন্দর। মেয়েটা কি মনোহরের গালফ্রেন্ড? উহুম প্লিজ এমন যেন না হয়।”
“ আজকে বাবার কাছে ধরা খেয়েছি। কোনো কারণ ছাড়া বারবার কলেজে যাওয়াটা চোখে বিঁধেছে যে কলেজে আমি পড়িই না সে কলেজে যাচ্ছি কেন বারবার? কিন্তু আমি কোনো শান্তি পাচ্ছি না, বারবার মনে হচ্ছে ওই মেয়েটা মনোহরের গালফ্রেন্ড।”
“বান্ধবী সবাইকে পাগল বানিয়ে দিয়েছি মনোহরকে খুঁজে দিতে। বেচারী গুলোর ও কি দোষ বলো ওরাও চেষ্টা করছে কিন্তু আমি তো তার নাম টাম কিছুই জানি না তাহলে কিভাবে খুজবো?”
তারপরের পৃষ্ঠা গুলো আজাইরা আঁকিবুঁকি দিয়ে ভরা। চার পাঁচটে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আবারও কিছু লিখা পেল,
“ওগো মনোহর, আমার হৃদয়ে তান্ডব চালিয়ে শান্তি ঘুম দিচ্ছো? জানো কত ভালোবাসি তোমায় এত ভালো কেউ বাসতে পারবে? ওই মেয়েটা যদি তোমার প্রেমিকা হয়েও থাকে সে কি আমার মতোন তোমার জন্য ছটফট করছে? তোমাকে দেখার জন্য মন আনচান করছে? তোমাকে খোঁজার জন্য যে কষ্ট করছি তার মর্ম বুঝো মনোহর?”
তারপর পেজ আবারও খালি। সায়মনের খুব রাগ লাগছে সাথে কষ্টও। তার এমন লাগার কারণ বুঝতে পারছে না।
“ ২ বছর হয়ে গেলো। মনোহরকে আর দেখতে পেলাম না। কতবার গেলাম আগের মতো একই সময়। একটু তাকে দেখার জন্য কিন্তু পেলাম না। উপরওয়ালার কাছে অনেক অনেক প্রার্থনা করেছি মনোহরের সাথে আবার দেখা করিয়ে দাও। আমার কপালে তাকে জুটিয়ে দাও।”
“আজ আমায় পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে। আমি কিছুই তেই বিয়ে করতে চাইনা। কোনোভাবে যদি বিয়ে ভাঙা যায় কেমন হবে?”
“ওরে আমার আল্লাহ!!! জানো ডায়েরী আমাকে আজ কে দেখতে এসেছে?
মনোহর৷
বিশ্বাস হয়না না? আমারও বিশ্বাস হচ্ছে না। উফফ কি যে আনন্দ হচ্ছে। লিখতে নিয়ে হাত কাপছে৷ উনার নাম ও জানতে পেরেছি।
সায়মন আহমেদ
উফফ নামটাও এত সুন্দর। প্রিয় মানুষের সব কিছুই বোধহয় এত সুন্দর মনে হয় তাইনা। জানো সে যেভাবে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলো লজ্জায় আমি মরি হারি। আমি বলিনি যে তাকে আমি এর আগেও চিনি আর উনিই আমার জীবনের প্রথম ভালোলাগা হবে। কিন্তু জিজ্ঞেস করেছি উনার কারোর সাথে সম্পর্ক আছে কি না। সে কি বলেছে জানো? তার কারোর সাথে কখনো কোনো সম্পর্ক ছিল না আর নেই ও তার নাকি মেয়েদের নামেও এলার্জি, মেয়েদের থেকে দূরে থাকে আর কথাও বলেনা। এটা শুনে আমি তো অবাক জিজ্ঞেস করলাম, কোনো মেয়ের সাথেই আপনার কথা বলেন না? পরে বললো হ্যাঁ বলি শুধু একজন আর সে আমার বোন অরীন।
তখন আরও কথা জিজ্ঞেস করে জানলাম যে মেয়েটাকে মনোহরের প্রেমিকা ভেবেছিলাম সে মেয়েটাই তার বোন। জানো ডায়েরী মনোহর না আমাকে পছন্দ করেছে, সেটা তার চোখ দেখেই বুঝে গেছি।”
সায়মন পড়ে থমকে যায়। বিষ্ময়কর চোখে আবারও একই কথাগুলো পড়তে থাকে। নিজের নাম দেখে একটু সস্তি মিললেও বিষ্ময় কাটছে না।
সে খুঁজে খুঁজে আরও লাইন পড়তে থাকে। প্রতিটা লাইন তাকে চরমভাবে অবাক করছে যার বলার ভাষা নেই। রিয়া তাকে বিয়ের আগে থেকেই ভালোবাসতো। রিয়ার প্রতিটা কথায় সে তার প্রতি রিয়ার ভালোবাসা অনুভব করতে পারছে।
বিয়ের পরের সকল ভালো মুহুর্ত গুলো রিয়া ডায়েরীতে লিখে রেখেছে তার মনে সকল ভালোলাগা ডায়েরীকে বলে কয়ে শুনাচ্ছে৷ পড়তে পড়তে সায়মন একজায়গায় গিয়ে থেমে যায়।
“মনোহর বিয়ের আগে এত বড় মিথ্যে কথা কিভানে বলতে পারলো? অরীনের সাথে তার ৬ বছরের সম্পর্কের কথা লুকিয়েছে তাও মানা যায়, মানুষের অতীত থাকতে পারে কিন্তু সে অরীনকে ধোঁকা দিয়েছে এটা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে। নিজের প্রিয় মানুষের সাথে অন্য কোনো মেয়েকে মানা কষ্টের কিন্তু নিজের প্রিয় মানুষটির ঘৃণ্য কাজ মানাটা আরও শতগুণ কষ্টের। হঠাৎ মাথায় একটা প্রশ্ন আসলো বলবো ডায়েরী?
আমি যদি কোনোদিন কুৎসিত বা চেহারার লাবণ্য হারিয়ে ফেলি তাহলে কি মনোহর আমাকেও ধোঁকা দিবে?”
“এমন না হোক প্লিজ আমি সহ্য করতে পারবো না।এ কথাটা আমি কাউকে শেয়ার করি নাই। আমি যে সব জেনে গিয়েছি তাও অরীনকে বলিনি বলবও না। আমি চাইনা ও কোনো বিব্রতবোধ করুক ওর ত কোনো দোষ নেই৷”
আরও কিছু লাইন পড়লো দু পৃষ্ঠার শেষে আরও কিছু লেখা পেল যা সায়মনের অনুশোচনা বাড়িয়ে দিলো।
এ লেখাটা সায়মন যখন জেলে ছিলো তখন রিয়া লিখেছিলো।
“সায়মন আমার মনোহর, আমার প্রাণ,আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ,
জানি এটা তুৃমি পড়বে না। কোনোদিন দেখবেও না তবুও বলছি, এত দিনে কি আমার প্রতি একটু মায়া জন্মায় নি? এত কাছে এত পাশে একই ছাদের নিচে থেকে আমার ভালেবাসা বুঝতে পারলে না। আমি তোমাকে এত ভালোবাসলাম এর পরিণাম আমাকে এভাবে দিতে পারলে। আমি মা হতে চলেছি অথচ আমার অনুভূতি কাজ করছে না। বারবার তোমার শার্টের ঠোঁটের ছাপ দেখতে পারছি পারফিউমের গন্ধ নাকে বিধঁছে। চোখে তোমার সাথে পর নারীর… না চাইতেও ভাসছে ছিহ আমি পারছি না দম বন্ধ হয়ে আসছে ইচ্ছে করছে মরে যেতে কতবার ছুরি হাতে নিয়েছি মরে যাওয়ার জন্য কিন্তু বাচ্চাটা এই বাচ্চাটার জন্য পারছি না। সায়মন তোমার আমার কথা একটুও মনে পড়লো না। আমি তোমাকে ছাড়া কোনো পরপুরুষের কথা ভাবতে পারি না তুমি কিভাবে ভাবলে তার সংস্পর্শে আসার সময় বুক কাপেনি? আমার কথা কি একটুও মনে পড়েনি। ইচ্ছে করছে মরে যেতে আমি মরে যেতে চাই। “
“তোমাকে এখনও ভালে বাসি কিন্তু আগের মতো বিশ্বাস করতে পারবো না। আগের মতো তোমাকে অনুভব করতে পারবো না। আগের মতো তোমার যত্ন ও চেহারা দেখলে প্রশান্তি আসবে না৷ তবুও আমি চাই না আমার জন্য মায়ের কষ্ট হোক। প্রতিটা রাত মা তোমার জন্য কাদে বাবারও বুক পুড়ে তোমার জন্য আমি জানি। আর যাইহোক তাদের ছেলে তুমি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাকে ছাড়িয়ে আনবো।”
সায়মনের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। পৃষ্ঠার উল্টালো।
“তোমার এত যত্ন আত্তি আমার গলায় কাটার মতো বিধছে কেনো জানো কারণ তুমি আমায় ভালোবেসে করছো না তুমি সব যত্ন বাচ্চার জন্য করছো। তোমার এতসব যত্ন আমার জন্য না বাচ্চার জন্য। আমি কি এত বছরের সংসারেও তোমার মনে জায়গা করতে পারলাম না, হতে পারলাম না তোমার প্রিয়। তাই আমি খুব করে চাই ডেলিভারিতে আমি মরে গেলে হলেও আমার বাচ্চা সুস্থ থাকুক৷ যেন তুমি ভালো থাকো তার সবোচ্চ মঙ্গল কামনা করি।”
আহ
অরীনের চিৎকারে ঘুম ছুটে গেলো সাফিনের।
কি হয়েছে, বেশি ব্যাথা করছে?
অরীন মাথা দুলিয়ে ধীরে ধীরে বলে
লাথি মারছে।
সাফিন সাথে সাথে অরীনের পেটে হাত রাখতেই অনুভব করে তাদের পিচ্চিসোনা আসলেই লাথি মারছে।
সে পেটে কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে,
আমার লক্ষী সোনা মাকে কিক মারছো ভেরি বেড হা? মা কষ্ট পাচ্ছে তো।
অরীন আবারও চিৎকার করে বলে,
এবার জুড়ে লাথি মেরেছে। ও একবার দুনিয়ায় আসুক চড়িয়ে গাল লাল করে দিবো।
সাফিন অসহায় নজড়ে একবার অরীনকে দেখে আরেকবার অরীনের পেটে থাকা বাবুকে দেখে।
আমার পিচ্চি সোনাকে মারলে তোমায় আমি..
অরীন কটমট করে বলে,
কি করবেন কি হ্যাঁ মারবেন?
সাফিন বলে, নাহ জান তোমাকে মারতে পারি? আমি তো আবারও তোমাকে মা বানাবো।
আপনি একটা অসভ্য।
তোমারই।
অরীন ভেংচি কেটে হাত এগিয়ে পানির গ্লাসটা নিতে নিলে সাফিন বাদ শেধে বলে,
আমি নিচ্ছি।
সাফিন উঠে পানির গ্লাস অরীনের মুখের কাছে এনে নিজেই খাইয়ে দেয়।
খিদে লেগেছে কিছু খাবে?
অরীন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
মাথা প্রচন্ড ব্যাথা করছে।
বলে ধীরেসুস্থে শুয়ে পড়ে। সাফিন তার পাশ ঘেষে চুপটি করে শুয়ে অরীনের মাথা টিপে দিতে থাকে।
অরীন তাকে বলেও নি আমার মাথা টিপে দাও। সাফিনের এতো ছোট ছোট যত্ন আত্তিগুলোকে অরীন ভীষণ ভালোবাসে।
আরাম লাগছে।
ঘুমাও।
হঠাৎ অরীনের মাথায় ভাবনা এলো,
তুমি নাম ঠিক করেছো?
সাফিন না বুঝতে পেরে বলে,
কিসের?
আমাদের বাচ্চার।
ভালো কথা বলেছো তো তুমি কিছু ভেবেছো?
নাহ, এজন্য তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম।
সাফিন কিছুক্ষন ভাবতে থাকে। কি নাম রাখা যায়। অরীনও ভাবছে হঠাৎ তাড়া একসাথে বলে উঠল,
সাফওয়ান?
দুজনেই বেশ অবাক হলো ফের হেসে উঠলো। সাফিন অরীনের ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলে,
তাহলে এবার মেয়ের নামটা তুমিই রাখো।
সাইফানা? নামটা কেমন?
সুন্দর।
তো ছেলে হলে রাখবো সাফওয়ান আহমেদ আয়ান।
আর মেয়ে হলে রাখবো সাইফানা আহমেদ অহি।
অরীন হেসে বলে,
পারফেক্ট ?
সাফিন অরীনকে বুকে জড়িয়ে বলে,
এখন শুধু তাদের আসার পালা।
.
.
.
.
সকালে বারান্দায় বসে সিগারেটের ফুঁকছে সায়মন। নিচে আট নয়টার মতো সিগারেট পড়ে আছে। নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হলেও সেই কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়াটা তার ইগোতে লাগবে বলে তাও চাইবে না। কিন্তু তার বারবার রিয়ার কথা স্মরণ হচ্ছে।
সাব আসবো?
আসো
কাজের মহিলা খাবার বিছানায় রেখে বারান্দায় উঁকি মেরে বিরবির করে বলে,
সকালে মানুষ নাস্তা করে আর এরা দেখি ছাই মাটি খায়।
কিছু বললে?
কাজপর মহিলা মাথা নাড়িয়ে বলে, না না কিছু বলি নাই।
আগের রান্নার দিকটা রিয়াই সামলাতো। এখন কেউ নেই বলে সাফিনের বাবা নতুন কাজের লোক দুটো ঠিক করেছে।
রিয়া আর অরীন যেন বাড়ির প্রাণ ছিল৷ সেই প্রান দুটোই এখন বাড়িতে নেই।
.
.
.
সাফিন অফিসে যাবে। অরীনের মা মোহনা ইসলাম খাবার গুলো টেবিলি সাজাচ্ছে। সাফিন হাত ঘড়ি পরেই রান্নাঘর থেকে দুধ গ্লাসে ভরে এনে রুমে টেবিলে রাখে।
অরী অরী উঠো!
অরীনের মাথায় ধীরেসুস্থে হাত বুলিয়ে ডাকে সাফিন। ঘুম ছুটতেই পাশে দুধের গ্লাস দেখে সাথে সাথে চোখ বুজে ফেলে অরীন। সে কিছু তেই দুধ খাবে না। অরীনের চাওয়াটা সাফিন খেয়াল করেনি। সে আরও কয়েকবার ডাকে।
অরী?
এই অরী উঠো। আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে।
মোহনা ইসলাম দরজায় কড়া নেড়ে বলে,
বাবা আসবো?
জ্বী চাচি আসো।
মোহনা বেগমের দিকে এক চোখ খুলে তাকায় অরীন আবার সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে কিন্তু সাফিনের তা ধরে ফেলে।
মোহনা বেগম বলে
তোমার বাবা দেরী হয়ে যাচ্ছে ওকে উঠিয়ে আমি খাইয়ে দিবো
না চাচি দেরী হোক সমস্যা নেই ওকে খায়িয়েই যাবো।
বলে আবারও একটু জোড়ে অবাকের কন্ঠে বলে,
অরীনের কানের পাশে তেলাপোকা আসলো কোথা থেকে।
এতেই হলো! অরীন চিৎকার করে উঠতে নিলে পেটে চাপ পড়ে সাফিন তাড়াতাড়ি করে সাবধানে ধরে আগলে নেয়।
অরীন সাফিনের কাধে দু হাত রেখে জোড়ে চিৎকার করে বলে,
আআআআআআ তেলাপোকা সরান সাফিন। মাাাাাাাাাাা তেলাপোকাাাাাা এএএএহহহহ।
সাফিন হেসে বলে
আরে নেই তেলাপোকা।
অরীন চিৎকার করে বলে,
না আছে তাড়াতাড়ি সরান ওমাাাাা।
মোহনা ইসলাম এদিক সেদিক নজড় বুলিয়ে বলে,
কোথায় তেলাপোকা? আমি তো কোথাও দেখছি না। কই নেই তো৷
সাফিন জোড়ে হেসে বলে
আরে কোনো তেলাপোকা নেই ওকে উঠাতে বলেছি।
অরীন বোকার মত তাকিয়ে বলে,
কি বললেন?
সাফিন বাচ্চাদের মতো ঠোট উল্টিয়ে বলে,
তুমি উঠছিলে না বলে, মজা করেছি।
অরীনের নাকের পাঠা ফুলে উঠে। সে আঙুল উঁচিয়ে বলে,
একবার শুধু বাচ্চাটা হোক শুধু একবার হোক। সেই বাচ্চা দিয়ে যদি আপনার চুল না ছিঁড়েছি আমার নামও অরীন না।
চুল সাথে তাহলে তোমারও ছিঁড়বে। এখন দুধটুকু খেয়ে নাও।
অরীন অনেক গাইগুই করলো সাফিন জোড় করে তাকে দুধ খায়িয়ে দেয়৷ মোহনা বেগম বারবার বিরবির করে বলে,
মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ কারোর নজড় না লাগুক।
বলে চলে যায়।
এটা নতুন না। সাফিন জানে সে না থাকলে অরীন খাবার নিয়ে অবহেলা করে। আবার কোনওসময় খিদের চোটে ৪ বেলা খায়। এটাএটা তার একেক সময় একেক রকম। যেমন এখন প্রচুর খাবার নিয়ে অবহেলা করে। দুধ তো খেতেই চায়না।তাই প্রতিদিন অরীনকে সকালে দুধ খায়িয়ে তারপরই অফিসে যায়।
অরীনকে দুধ খায়িয়ে মুখ মুছে দেয়৷
একটু পর নাস্তা করে নিবে বুঝেছো?
অরীন ভেংচি কেটে বলে,
বুঝেছি।
ব্যাগ নিয়ে সাফিন এগিয়ে এসে অরীনের ঠোঁটে কিছুক্ষন চুমু খেয়ে কপালে চুমু খায়। অরীনও তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
তাড়াতাড়ি এসে পড়বেন কিন্তু খুব মিস করবো।
সাফিন হেসে বলে,
ঠিক আছে। আসি।
সাফিন বাড়ি থেকে বের হতে নিলেই দেখে নীচ তলা থেকে সোড়গোল শুনা যাচ্ছে। সাফিনের পিছনে মোহনা ইসলাম ও এসেছে দরজা লাগাতে।
সাফিন কপাল কুচকে সিড়ির মাঝ বরাবর তাকিয়ে দেখে মানুষের ভীড়। তার পিছনে মোহনা ইসলাম ও এসে দাড়ালো। সাফিন তাকে বললো
আপনি ঘরে যান চাচি আর ভালো করে দরজা আটকাবেন আমি ছাড়া কেউ পরিচিত বা অপরিচিত কেউ ডাকলেও খোলার দরকার নেই। আর আমি আসার আগে কল দিয়ে বলেই আসবো। বুঝেছেন?
নীচ থেকে কান্নার শব্দও আসছে৷ মোহনা ইসলাম মাথা নাড়িয়ে সাই দিয়ে বলে,
কেউ কি মারা গেছে?
আমি দেখছি চাচি, আপনি যান।
মোহনা ইসলাম ঘরের দরজা ভালোমতো আটকাতেই সাফিন নিচে নামে।
নিচের ফ্লাটের এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। পারিবারিক লোকজন কান্নাকাটি সোরগোল শুনা যাচ্ছে। সাফিন তার পরিচিত আঙ্কেলকে দেখতেই তার কাছে এগিয়ে যায়৷
সাফিনের উৎসুক দৃষ্টি দেখে প্রশ্ন করার আগেই তিনি পুরো ঘটনা বলতে শুরু করেন,
তোমাদের ফ্লাটের পাশের ফ্লাটের নতুন ভাড়াটিয়া উঠেছিলো না? মা ছেলে থাকতো। তাদের সাথে এদের ভালোই সখ্যতা গড়েছিলো। রোজ আসতো যেতো। এ ফ্লাটে স্বামী স্ত্রী ও ১৭ বছরের মেয়ে থাকে। মেয়েটাকে বাসায় একা রেখে তারা স্বামী স্ত্রী জরুরি কাজে গ্রামে গিয়েছিলো। ভালো সম্পর্ক বলে তাদের বলে গেছে যাওয়ার আগে মেয়েটাকে একটু খেয়াল রাখতে সে সুযোগে
সেই ছেলেটা মেয়েটাকে ধ”র্ষ* করেছে শুধু তাই নয়, মা ছেলে মিলে ঘরের কত ভরী যেনো গহনা ছিল তা,ল্যাপটপ,মোবাইল মেয়েটার কানের সর্ণের দুল, আরও লাখখানেক টাকা নিয়ে ভেগে গেছে।
স্বামী স্ত্রী এসে মেয়েটার নাজুক অবস্থা দেখেছে পুলিশকে কল দিয়েছিলো, আর স্বামী গিয়েছিল সেই ছেলেটাকে ধরতে কিন্তু বাড়িতে তালা মারা ছিল এসে। মেয়েটা হয়তো লজ্জায় দরজা লাগিয়ে ফ্যানের উরনা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
এজন্য সকালে কিছু ভাঙার শব্দ পাচ্ছিলাম।
হ্যাঁ তালা ভেঙেছিল তবে ওই খাট ছোটখাটো জিনিসপত্র ছাড়া কোনো কিছু পায়নি। তারা আগেই পালিয়েছে।
সাফিনের মাথা ভনভন করছে৷ সে ছুটে উপরে চলে যায়। বারবার কলিংবেল বাজায়। একের পর এক কলিংবেল বাজানোর শব্দে মিররে উঁকি দিয়ে মোহনা ইসলাম সাপিনকে দেখে দরজা খুলে দেয়। সাফিন হাপাচ্ছে।
কি হলো এসে পড়লি যে?
ভালো লাগছে না, যাবো না অফিসে একটু ঘুমাবো।
বলে রুমে এসে অরীনের ঘুমন্ত মুখশ্রী দেখে সস্তির নিশ্বাস ফেললো। কোনোরকম টাই খুলে শার্ট টাও খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় নিচে৷
তাড়াতাড়ি করে বিছানায় এসে অরীনকে সর্বশক্তিতে জড়িয়ে ধরে। তার জানটাই বেড়িয়ে যাবে যাবে লাগছিল এতক্ষন। এখনও শান্তি পাচ্ছে না। অরীনের ঘুম ভেঙে যায়, সে সাফিনকে দেখে কিছু বলবে তার আগে আরো জোড়ে জড়িয়ে ধরে বলে,
আল্লাহ তোকে সকল বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমার জানের বদলেও যেন তুই সুস্থ থাকিস। ভালোবাসি তোকে। নিজের জীবনের চেয়েও বেশি।
সময় পেরিয়ে চলে এলো অরীনের ডেলিভারির তারিখ। সাফিনের বাবা -মা একদিন আগেই চলে এসেছে। মোহনা বেগম দরকারী সবকিছু আগে থেকে ব্যাগে ভরে রেখেছে, আচানক যদি ব্যাথা উঠে যায় তাহলে আর তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ গুছাতে হবে না।
সায়মনের এখন ব্যবসায় মনোযোগ নেই, সব দায়িত্ব এসে পড়েছে অরীনের বাবার উপর। এ নিয়ে বিরাট ঝামেলা বেঁধেছিলে সায়মন ও অরীনের বাবার মধ্যে। সায়মন রাগ করে সে একমাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলো আর আসেনি, কল দিলে কেটে দেয়, কারোর সাথে যোগাযোগ নেই। অতঃপর সাফিনের বাবা সায়মনের বন্ধুর থেকে খোঁজ নেয়, সায়মন তাদের বাড়িতেই আছে।
অরীনকে নিয়ে সাফিনের মা এবং মোহনা ইসলাম ছাঁদে এসেছে। অরীন পেটে হাত রেখে ধীরে ধীরে চারপাশ হাঁটছে। একসময় হেঁটে ছাঁদের কিনারায় এসে নিচে তাকাতেই দেখলো পাশের বিল্ডিংয়ের আঙিনায় কিছু বাচ্চারা খেলাধুলা করছে। বয়স ৯ অথবা ১০ হবে। অরীন মনোযোগ দিয়ে তাদের খেলাধুলা দেখে যাচ্ছে। তার মনে হঠাৎ মাতৃত্বের স্বাদ পুরো দমে ছেয়ে উঠলো। নিজের পেটে হাত রেখে তাকিয়ে বলে,
তোমার অপেক্ষায় আছি মাম্মা, সু সাটাং চলে এসো মায়ের কোলে। মাম্মা লাভস ইউ সো মাচ।
বাট পাপা অলসো লাভ ইউ বোদ
অরীন পিছনে তাকিয়ে দেখে সাফিন দাঁড়িয়ে আছে।
অরীন হেঁসে বলে,
কখন এলে
এলাম তো মাত্র। নাও পানি খেয়ে নাও।
সাফিন ছাঁদে ঠান্ডা বোতল সাথে নিয়ে এসেছে অরীনের জন্য।
পানি খেয়ে অরীন সাফিনের হাত ধরে কিছুক্ষন হাটলো।
সন্ধ্যার আজান দেয়ার আগেই সাফিন অরীনকে নিয়ে নিচে চলে আসলো, মোহনা ইসলাম ও সাফিনের মা আগেই চলে এসেছিলো।
.
.
.
.
সাফিন ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই দেখে অরীন হাতে ফোন নিয়ে একমনে তাকিয়ে আছে। অরীনপর মনোভাব বুঝে সাফিন তার পাশে এসে বলে,
বৃথা চেষ্টা করছো,ভাবী ফোন ধরবে না।
যদি ধরে
ধরার হলে আরও অনেক আগেই ধরতো। সে মুভ অন করতে চাইছে, আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখলে বারবার ভাইয়ের কথা মনে পড়বে, তাদের সন্তানের কথা মনে পড়বে।
জানি,ভাবীর দিক দিয়ে সে ঠিক আছে।কিন্তু তবুও তার সাথে কথা বলার জন্য মন ছটফট করে।
রিয়ার সাথে তাদের যোগাযোগ সেদিনের পরেই বন্ধ হয়ে গেছে। তাকে ফোন দিলে পাওয়া যায়না,সাফিনের ও অরীনের বাবা একবার গিয়েছিলো রিয়ার বাসায় তবে তারা জানিয়েছে রিয়া বাড়ি নেই, এখন সত্যি টা তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে মাসখানেক আগে রিয়ার বাবা ডিভোর্সের পেপার পাঠিয়েছিলো আহমেদ বাড়ি। সেই পেপার এখনো সায়মনের রুমে পড়ে আছে। সায়মন সেই পেপারে এখনো সাইন করেনি।
এরপর থেকে আহমেদ ভিলার কারো নাম্বার থেকে রিয়াকে পাওয়া যায়নি। অরীন অনেকবার কল দিয়েছে। কিন্তু তাদের নাম্বার তো রিয়ার ফোন থেকে ব্লকলিস্টে রাখা। আজ আবারও অরীন কল মিলালো রিয়ার নাম্বারে আশ্চর্যজনকভাবে কল রিসিভ হলো। অরীন কানে নিয়ে বলে
রিয়া ভাবি
অরীনের কথায় সাফিন অবাক হয়ে উঠে বসলো। অরীন ভলিউম বাড়াতে শুনা যায়,
হ্যালো অরীন। কেমন আছো?
ভালো আছি ভাবী তুমি কেমন আছো?
ভালো,তুমি আমায় আপু বলে ডেকো কেমন?
অরীন লজ্জিত হলো।
তোমায় এতদিন কল দিয়ে পাই নি, তোমাকে খুব মনে পড়ছিলো।
আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম।
অরীন ও সাফিন জানে রিয়া মিথ্যা বলছে। তবে রিয়ার স্বাভাবিক কন্ঠ শুনে অবাক হয়েছে।
বাবা মা, চাচা - চাচি তাদের সাথে কথা বলবে? তারা তোমার কথা খুব বলে। তুমি যদি একটু কথা বলতে তাহলে খুশি হতো।
রিয়া কিছু বলছে না দেখে অরীন বলে,
শুনছো?
দাও।
অরীনকে নিয়ে সাফিন ড্রয়িং রুমে এসে সবাইকে ডাকলো। রিয়া তাদের ভিডিও কল দিলো। অরীনের মা রিয়ার কথা শুনেই খুশিতে কেঁদে কেঁদে কথা বলতে থাকে,ঠিকমতো খাওয়া ধাওয়া করে কি না,নিজের খেয়াল রাখে কি না, ঔষধ খায় কি না ইত্যাদি ইত্যাদি।
অরীনের মায়ের পাশাপাশি সবাই খুব চতুরতার সাথে রিয়াকে এইসেই জিজ্ঞেস করলো।
হঠাৎ রিয়া বললো,
সায়মন কোথাও, আর তোমরা কোথায় এসেছো।
সাফিনের মা ইতস্ততভাবে অরীনের কথা বলে, যদি রিয়ার মন খারাপ হয়ে এবং সায়মনের পুরো বিষয় এড়িয়ে গেলে রিয়া আবারও তার কথা জিজ্ঞেস করতেই সাফিনের মা বলে, বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছে।
রিয়া বলল,
ও থাকলে ভালো হতো,আমি তোমাদের কিছু কথা বলতে নিজেই কল দিতাম তবে আজ অরীন দিয়ে দিলো।
অরীনের পাশেই সাফিন বসেছিলো। সে সহ সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনে।সাফিনের মা বলল,
কি কথা?
আমার পরশুদিন নিউজিল্যান্ডের ফ্লাইট। মিতার দেওয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, কাল ঘরোয়াভাবে কাবিন করবে, যদিও বাবা মা বলেছিলো তোমাদের না জানাতে তবে আমার বিশ্বাস আছে তোমাদের উপর,তোমরা অবশ্যই আমার ভালো চাইবে।
সাফিনের মা মুখ ফসকে বলল,
সায়মন…
রিয়া স্বাভাবিক স্বরে বললো,
আমি তো ডিভোর্স পেপারে সাইন করে বাবাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর হ্যাঁ অরীন শুনছো??
সবাই রিয়ার কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অরীন সাফিনের পাশে ছিল, সাফিন মায়ের হাত থেকে ফোন নিয়ে অরীনের সামনে ধরতেই রিয়া হেসে বলে,
আল্লাহ তোমাকে, তোমার বেবিকে সুস্থ রাখুক,আমি চাই তোমার ফুটফুটে একটা ছেলে হোক। তোমার আর সাফিন ভাইয়ের দাম্পত্য জীবন সবসময় অটুট থাকুক, রাখি কেমন?
অরীন হাসার চেষ্টা করে তবে চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। সে বলে, তুমিও ভালো থেকো রিয়া ভা..রিয়া আপু৷ মাঝেমধ্যে যোগাযোগ রেখো ভুলে যেয়ো না।
ভুলবো না।
রিয়া ফোন কাটতেই সবাই কিছুক্ষন থম মেরে বসে থাকে। তবে সাফিনের মা নিজের ছেলের জীবন নিয়ে হাহাকার করতে থাকে।
অরীনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে সাফিব। কাল অরীনের ডেলিভারি ডেট তবে এখন আর ভয় করছে না অরীনের । সাফিন চোখ পিটপিট করছে, হালকা নড়াচড়া করায় অরীন বলে,
কি হলো ঘুম আসছে না?
সাফিন অরীনের হাত টেনে নিজের বুকের বা পাশে রাখতেই অরীন চমকে যায়৷ সাফিনের হৃৎস্পন্দন তীব্র গতিতে ধুকপুক করছে।
অরীন কিছু না বলে সাফিনকে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়ে শান্ত করতে বলে,
ভয়ের কিচ্ছু নেই,ভয় পাবেন না।দেখবেন কাল আমাদের ছোট্ট সোনা সুস্থ হয়ে আমাদের কোলে আসবে। আমারও কিচ্ছু হবে না।
আরও নানান কথা বলে সাফিনকে সান্ত্বনা দিয়ে মনে মনে বলে,
যেখানে সান্ত্বনা পাওয়ার কথা আমার সেখানে উল্টো তাকে সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে।
.
.
.
.
২৫ জুন ২০২৪
সকাল ১১ টা ৩০ মিনিটে
ভূমিষ্ঠ হয় অবন্তিকা আহমেদ অরীন ও সাফিন আহমেদের ছেলে সাফওয়ান আহমেদ আয়ান। তার কান্না যেন ছুঁয়ে যায় আশপাশের প্রতিটি হৃদয়। তার চিৎকারে ভরে ওঠে হাসপাতালের কক্ষ। সবাই খুশিতে আটখানা। নার্স বাচ্চা নিয়ে বের হয়ে সাফিনের হাতে বাচ্চাটি দিতে সাফিনের সর্বাঙ্গ কেপে উঠে। বিষ্ময়কর চোখে তাকিয়ে থাকে ছোট্ট তুলতুলে নরম শরীরটার দিকে। এই ছোট্ট প্রানটা তার বউয়ের পেটে বউটাকে জ্বালিয়েছে ভাবা যায় কি। সে অপলক চেয়ে থাকলো বাচ্চার দিকে।
ধীরে ধীরে সবাই নিলো। সাফিন কেবিনে ঢুকে
অরীনের কপালে গাঢ় চুমু খেলো এরপর ঠোঁটে।
অনেক ধন্যবাদ অরী আমাকে এত সুন্দর উপহার দেয়ার জন্য।
অরীন তখন অচেতন। সাফিনের বাবা ডাকলো সাফিনকে বাচ্চার কানে আজান দিতে কিন্তু সাফিন নাকচ করে বলল, অরীনের জ্ঞান আসলে সে তার সামনে সাফওয়ানের কানে আজান দিবে।
অরীনের জ্ঞান ফিরার পর সাফিন তার সামনে সাফওয়ানের কানে আজান দিয়েছে। অরীন তার দুজন প্রিয় মানুষের দিকে নিষ্পলক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখেছে শুধু।
দুপুরের দিকে সায়মন হাসপাতালে এলো। তাকে দেখে সবাই অবাক হলেও কিছু বলল না। সায়মন সাফওয়ানকে কোলে নিতে চায় তখন সাফওয়ান অরীনের মায়ের কোলে।
মোহনা ইসলাম দ্বিধায় পড়ে যায়। তার দ্বিধা দেখে সায়মন হেসে বলে,
চিন্তা করো না চাচি ওর কোনো ক্ষতি করবো না, অত পাষাণ নই আমি।
অরীনের মা তবুও তাকালো সাফিনের দিকে, সাফিন ইশারা করতেই সে সায়মনের কোলে সাফওয়ানকে দিয়ে দিলো। তখন সাফওয়ান গভীর ঘুমে। মাঝমধ্যে ঘুমের মাঝে ঠোট নাড়িয়ে হাসছে। সায়মন তার দিকে চেয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলে,
তোর ভাইয়ের নাম রায়মন রেখেছিলাম কিন্তু ওতো এসেও এলো না। তাই আজ থেকে তোকেই রায়মন বলে ডাকবো।
সাফিনের মা বলল,
রিয়ার আজ বিয়ে।
সায়মন প্রথমে ভুল শুনলো ভেবে বলে, কি বললে??
রিয়ার বিয়ে আজ।
সায়মন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সাফিন খেয়াল করে সায়মনের শরীর কাপছে, সে তাড়াহুড়ো করে এসে সাফওয়ানকে কোল থেকে নিয়ে নেয়। সাফিনের বাবা সবে মাত্র ঢুকলো সায়মন চেচিয়ে বলে,
এ কি শুনছি বাবা, রিয়ার বিয়ে মানে আমি ওকে এখনও ডিভোর্স দেইনি।
সাফিন নার্স ডাকে। নার্স সহ অরীনের মা সাফওয়ানকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। সাফিনের বাবা স্বাভাবিক স্বরে বলে
তোমাকে পেপার দেয়া হয়েছে তো তুমি সাইন করলেই তোমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে। তুমি কি ভেবেছো তোমার জন্য মেয়েটা কেঁদেকুটে ভাসাবে,তোমার মত জানোয়ারের জন্য সে এখনও অপেক্ষা করবে?
ও বিয়ে করতে পারে না।
সাফিনের বাবা এবার রেগে বললো
কেন পারবে না? তুমি আপত্তি করার কে? এতদিন খোঁজ নিয়েছো? একবারও রিয়ার কাছে গিয়েছো ক্ষমা চাইতে?
এত প্রশ্নের উত্তর নেই সায়মনের কাছে। সে জানে সে ভুল। তবুও রিয়ার বিয়ে সে মানতে পারছে না মন কেমন আনচান করছে তা বলে বুঝাতে পারবে না। সে কিছুতেই রিয়ার বিয়ে মানবে না কিছুতেই না।
সাফিন বলে,
আমি জানি তুমি অনুতপ্ত আর সেই অনুতপ্ততা তোমার ইগোর নিচে চাপা পড়ে গেছে। তুমি ছেলে হয়ে কেন ক্ষমা চাইবে,ভাবী কেন নিজ থেকে আহমেদ ভিলায় আসলো না।
তোমার এই ইগোস্টিক প্রশ্নের কারণে আজ তোমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে।
কোনো সম্পর্ক শেষ হয়নি। ডিভোর্স হয়নি আমাদের।এই বিয়ে আমি মানি না। আমি এখনো ওর স্বামী, আমি ওকে ডিভোর্স দেইনি।
সাফিনের বাবা বলল,
এত বড় দুর্ঘটনার পর স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে একবারের জন্য মেয়েটাকে দেখতে যাওনি,মেয়েটার নিকট ভরসা হাত বাড়াও নি, এরপরও নিজেকে স্বামীর পরিচয় দিতে লজ্জা করে না?
সায়মন ছুটে এসে সাফিনের বাবার পা জড়িয়ে ধরে বলে,
বাবা এ বিয়ে আটকাও, চলো আমার সাথে দয়া করো, এ বিয়ে হতে দিওনা।
সাফিনের মা বলে,
যা হওয়ার হয়ে গেছে কিচ্ছু ঠিক হবেনা। ওইখানে গেলে রিয়া অসম্মানিত হবে৷ ঝামেলা পাকিয়ো না।
সাফিনের বাবা বলে,
রিয়ার বিয়ে আটকিয়ে কি করবে তুমি?
মাফ চাইবো, দরকার হলে ওর পা ধরবো। ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।
তোমার কি মনে হয় ও আসবে?
হ্যাঁ বাবা ও আসবে৷ ও আমায় ভালোবাসে। আমি বললে ও আসতে বাধ্য।
অরীনের বাবা বলল,
রিয়া আমাদের ভরসা করে জানিয়েছিলো। এখন সেখানে মিতার শশুরবাড়ির লোকজন এসে পড়েছে । বিয়ে আটকালে মিতা ও রিয়া দু'জনেই ঝামেলায় পড়বে আমার মনে হয়না, রিয়া সায়মনের কথা শুনবে আর রিয়ার পরিবারের তো প্রশ্নই আসেনা।
কাউকে কিছু করতে না দেখে সায়মন দাঁড়িয়ে বলল,
তোমরা কেউ আমায় সাহায্য করবে না তাইতো,আমি নিজে একাই যাচ্ছি কারোর প্রয়োজন নেই বলে ছুট লাগালো।
সাফিন তার পিছনে যেতে নিলে সাফিনের বাবা আটকে দিয়ে ইশারায় না বলে।
বাবু কাঁদছে প্রচুর। গলা ফাটিয়ে কাঁদতে দেখে সাফিন অস্থির হয়ে উঠলো। বাবুর খিদে পেয়েছে, সাফিনের বাবা ও চাচা বের হয়ে গেলো। তাদের বের হতে দেখে সাফিন নিজেও বের হলো।
অরীন বাবুকে খায়িয়ে শান্ত করলো। সাফিন আসতেই সাফিনের মা ও চাচি বেরিয়ে গেলো।
রিয়াদের বাড়ির সামনে এসে বড়বড় শ্বাস ফেলে সায়মন। তাকে দেখে দাড়োয়ান চিনে ফেলে।সে ঢুকতে চাইলে বলে,
বাড়িতে কেউ নেই সাব।
নেই মানে রিয়া কোথায়?
তার তো বিয়ে হয়ে গেছে। এখন সে শশুর বাড়িতে আছে।
সায়মনের মাথা যেন বজ্র নিক্ষেপ হলো। সে দেরী করে ফেলেছে। খুব দেরী করে ফেলেছে। হারিয়ে ফেল্লো রিয়াকে। নিজেকে নিজের দোষী মনে হচ্ছে, সে আগে কেন বুঝলো না, আগে কেন সব ঠিক করলো না মাফ চাইলো না কেন। তবুও সে রিয়ার সাথে দেখা করবে। শেষবারের মতো।
ঠিকানা বলো।
দাড়োয়ান বেফাঁসে ফেসে যায়। ঠিকানা বললে সেখানে গিয়ে যদি ঝামেলা পাকায়। সায়মন সেখানে গেলে ঝামেলা হবে নিশ্চিত। সে বলল না। সায়মন বারবার বুঝাতে চাইলো, রিকুয়েষ্ট করলো, টাকার লোভ দেখালো কিন্তু দাড়য়ান সিদ্ধান্তে অটুট। সে বলবে না।
সায়মন রেগে মারতে আসলে দাড়োয়ান পাল্টা তেড়ে আসে, আশেপাশের লোক জড়ো করার হুমকি দেয়। সেখানে দাপট দেখিয়ে লাভ নেই সায়মনের।
সায়মনের শক্তি ফুরিয়ে এলো। সে টলছে একপ্রকার। নিজেকে আজ সবচেয়ে অসহায় লাগছে৷ সে একাকি রাস্তায় হাঁটতে লাগলো। গন্তব্যহীন পথে সে আজ একা। তার নিজেকে বড্ড একা লাগছে, তার পাশে কেউ নেই। তার কেউ নেই।
টালমাটাল হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রাস্তার মাঝে এসে পড়লো, আশে পাশে কিছু মানুষ চেচাচ্ছে, সে শুনতে পাচ্ছে কিন্তু তাদের দিকে তাকানোর বল নেই,আর না সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কিছু সে নিজের আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে, হাঁটতে হাঁটতে পিছন থেকে আচানক এক ধাক্কা, সে ধাক্কায় ভেসে উঠে ধপ করে রাস্তায় পড়ে গেলো,চোখ অন্ধকার হয়ে আসার পূর্বে দু হাত ও পা পিষে যাওয়ার যন্ত্রণা অনুভব করতে পারলো।তারপর সব শেষ। গোটা জাহান অন্ধকার হয়ে গেলো।
সাফওয়ান ঘুমের মাঝে হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে দিলো। অরীন সাফিনের বুকে মাথা রেখে গল্প করছিলো হঠাৎ কান্না সরে আসলো। অরীন তাকে ফিডিং করাতে চাইলেও সে খেলো না, কান্না যেন বেড়েই চলছে। সাফিন তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে থাকলো। তবুও কান্না কমছে না, হাঁটতে হাঁটতে জানালার কাছে এসে দাঁড়াতেই দেখে তুমুল বৃষ্টি।
অরীন সাফিনকে ডেকে বললো,
নিয়ে আসুন দেখি আবারও চেষ্টা করি খায় কি না।
সাফিন নিয়ে আসলো সাফওয়ানকে। এবারও কান্না থামায় না সাফওয়ান। সাফিনের মন খচখচ করতে থাকে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই কান্না কেমন অদ্ভুত ভীত অনুভূতি দিচ্ছে তাদের।
রিয়া ভারী লেহেঙ্গা দুহাতে আগলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো চেহারায় এখনো মেকাপ ও অলংকার।
সে বৃষ্টিতে নিজের হাত ছুঁয়ে বলে,
আমার বিয়ের কথা শুনেও একবারও আসলে না সায়মন। আমি কাল নির্ঘুম রাত জেগেছি শেষবারের মতো তোমার অপেক্ষায়, ভেবেছি তুমি আমার মেসেজ দেখে ছুটে আসবে বমার কাছে, হয়তো মাফ চেয়ে আমায় ফিরিয়ে নিবে। তুমি তবুও এলে না। কবুল বলার আগ মুহুর্ত সদরদরজায় তাকিয়ে ছিলাম তোমার আসার অপেক্ষায় এই বুঝি তুমি এসে বললে
এই বিয়ে হবে না।
এরপর সব শেষ করে দিলে। ডিভোর্স পেপারেও ত সই করে দিয়েছো। করবে নাইবা কেন ভালোই তো বাসো না আমায়।
যে লোকটিকে বিয়ে করেছি সেও ঠিক আমার মতোই হতভাগা। তোমাকে তো আমি একবার হলেও পেয়েছি। লোকটা তার ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার আগেই হারিয়ে ফেললো। সেই মেয়েটির মৃত্যুর পর আর বিয়ে করতে চায়নি,তবুও পারিবারিক চাপে ৫ বছর পর আবারও বিয়ে করলো।
আমার আর কোনো অনুভূতি নেই। জানিনা তার সাথে আবারও সংসার নামক জীবনে সুখে থাকবো কি না। তবে আমার একটা আফসোস থেকে যাবে
আমি এক ভুল মানুষকে ভালোবেসে বেঁচেও মরে গেলাম।
রিয়া হাত বাড়াতেই বৃষ্টির পানি টুপটুপ করে তার হাতে এসে পড়ছে। অপরদিকে সায়মনের হাতে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
....