উগ্র ছেলের হঠাৎ নরম ছোঁয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন। ক্যাম্পাসে চারিদিকে নতুন মুখের ভিড়, হইচই আর এক ধরনের উত্তেজনা। সবুজ চত্বরজুড়ে হেঁটে চলেছে তৃষা। তৃষা খুব ফর্সা মেয়ে নয়, একটু শ্যামলা রঙের। তবে তার চোখের মধ্যে অদ্ভুত এক মায়াবী ভাব আছে। যে কেউ প্রথমবার তার চোখের দিকে তাকালে এক ধরনের অদ্ভুত শান্ততা অনুভব করে। কাঁধে একটা সাধারণ কাপড়ের ব্যাগ ঝুড়িয়ে, একদম সাধারণ একটি সালোয়ার-কামিজ পরে হাঁটছিল সে। শহর কিংবা ক্যাম্পাসের এই ঝলমলে জাঁকজমক ভাবটার সাথে তৃষা যেন ঠিক মেলে না, সে নিজস্ব এক মায়া জড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়।

কিন্তু প্রথম দিনেই তার এই শান্ত জীবনটাতে ঝড় তোলার জন্য তৈরি ছিল আদনান।

আদনান এই ক্যাম্পাসের এক নামকরা চরিত্র। রূপ-চেহারায় যেমন লম্বা-চওড়া আর আকর্ষণীয়, স্বভাবের দিক থেকে তেমনই এক নম্বর উফ-তোলা মাস্তান। ডিপার্টমেন্টের ছোট-বড় সবাই তাকে এক নামে চেনে। পড়াশোনায় মন যতটা না আছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ আগ্রহ ক্যাম্পাসে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে আর মানুষকে জ্বালাতন করতে। আদনানের সাথে তিন-চারজনের একটা গ্যাং সব সময় ছায়ার মতো থাকে। তারা যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়ে ট্রোল করে, জ্যাঙ্ক করে।

আজ সকালে কলা ভবনের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আদনানের চোখ গিয়ে পড়ে তৃষার ওপর। তৃষা তখন হাতে একটা মোটা বই নিয়ে নোটিশ বোর্ডের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছিল।

আদনান বাঁকা হেসে তার বন্ধুদের দিকে তাকাল।
"দোস্ত, দেখ। নতুন শিকার। মুখখানা দেখেছিস? একদম মায়াবী টাইপ। তবে বেশ লাজুক মনে হচ্ছে।"

বন্ধুরা হেসে উঠল, "আদনান ভাই, নতুন মেয়ে। প্রথম দিনেই পেছনে লাগবি?"

"আরে না, লাগব না মানে? প্রথম দিনের বোরিং ক্লাস কাটানোর জন্য এর চেয়ে ভালো অপশন আর কি হতে পারে?" বলতে বলতেই আদনান পকেটে হাত দিয়ে হেঁটে তৃষার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

তৃষা নোটিশ বোর্ড থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই আদনানের বিশাল শরীরটা তার দৃষ্টি আটকে দেয়। আদনান গায়ের ওপর প্রায় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, "হ্যালো মিস মায়াবতী! প্রথম দিনেই তো নোটিশ বোর্ডে হারিয়ে গেলে? কি খুঁজছ এত মনোযোগ দিয়ে? আমাকে খুঁজতে পারতে, এক সেকেন্ডে খুঁজে দিতাম।"

তৃষা একটু চমকে গিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। আদনানের এমন সরাসরি আর উগ্র আচরণে সে বেশ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। নরম গলায় বলল, "আমি আমার ক্লাসরুমের নোটিশটা দেখছিলাম। প্লিজ একটু পাশে দাঁড়াবেন?"

"আহা! গলার আওয়াজ তো বেশ মিষ্টি," আদনান তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল। তারপর তৃষার একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, "পাশে দাঁড়াব কেন? সাথে সাথে হাঁটলে কেমন হয়? চল, তোমাকে ক্লাসরুমে আমি নিজে ড্রপ করে দিয়ে আসি।"

"আমার দরকার নেই," তৃষা বেশ গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল। সে আদনানকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু আদনান চট করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে তৃষার যাওয়ার পথ আটকে দিল।

"আরে এত তাড়া কিসের? নামটা তো বললে না? নাকি প্রথম দিনেই জুনিয়র হিসেবে সিনিয়রকে ভাব দেখাচ্ছ?" আদনানের চোখে স্পষ্ট দুষ্টুমি আর জেদ।

তৃষা বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে ফেলল। সে বুঝতে পারছে এই ছেলেটি ভালো উদ্দেশ্যে কথা বলছে না। ক্যাম্পাসের গুন্ডা টাইপ ছেলেদের স্বভাব সে ভালো করেই জানে। সে কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তাই আর কোনো কথা না বলে উল্টো ঘুরে অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করল।

আদনান অবশ্য এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। সে পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, "পালাচ্ছ কেন শ্যামলা সুন্দরী? কাল কিন্তু আবার দেখা হবে!"

তৃষা দ্রুত পায়ে নিজের ক্লাসের দিকে হেঁটে গেল, কিন্তু তার মনের ভেতরের শান্ত ভাবটা ততক্ষণে বিষিয়ে গেছে। প্রথম দিনেই এমন একটা অসভ্য ছেলের মুখে পড়তে হবে সে ভাবেনি। সে মনে মনে প্রার্থনা করল, যেন এই ছেলের সাথে আর কোনোদিন দেখা না হয়।

কিন্তু আদনান নামের ওই ঝঞ্ঝাট যে এত সহজে তার পিছু ছাড়বে না, তা তৃষা তখনও পুরোপুরি টের পায়নি।

প্রথম দিনের পর তৃষা ভেবেছিল আদনান হয়তো নতুনত্বের ঝোঁকে তাকে জ্বালাতন করেছিল, দিনশেষে সব ভুলে যাবে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণ করে আদনান প্রতিদিন নিয়ম করে তৃষার সামনে এসে দাঁড়াতে লাগল। কখনো লাইব্রেরির সামনে, কখনো ক্যান্টিনের করিডোরে—তৃষাকে দেখলেই আদনান তার গ্যাং নিয়ে হাজির হতো। অদ্ভুত সব মন্তব্য করা, খাতা টেনে নেওয়া কিংবা হাঁটার পথে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়ে পথ আটকে দেওয়ার মতো কান্ড সে হরহামেশাই করতে লাগল।

তৃষা যতটা সম্ভব ওকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত। কিন্তু আদনানের এই একঘেয়ে দুষ্টুমি আর উত্যক্ত করা দিন দিন তৃষার সহ্যশক্তির বাইরে চলে যাচ্ছিল।

সেদিন দুপুরের কড়া রোদ। লাইব্রেরি থেকে দুটো মোটা বই ইস্যু করে বের হয়েছিল তৃষা। ক্লাস শেষ, এখন সোজা হলের দিকে যাবে। অপরাজিতা গার্ডেনের ছায়াময় পথ ধরে হাঁটার সময় হঠাৎ কোণ থেকে বের হয়ে এল আদনান। তার পরনে কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো।

তৃষার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আদনান একদম হালকা চালে বলল, "কি রে মায়াবতী? প্রতিদিন অত ভারী বই টেনে টেনে হাঁটতে কষ্ট হয় না? দে, তোর বইগুলো আমাকে দে। আজ তোকে হলে পৌঁছে দেওয়ার ডিউটি আমার।"

তৃষা থামল। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ আর বিরক্তি আজ আর চেপে রাখতে পারল না সে। বই দুটো শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে এক পা পিছিয়ে গেল। তার শ্যামলা গাল দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছিল, চোখে আগুন।

"আপনার সমস্যাটা কি বলুন তো?" তৃষা কঠিন গলায় বলল। "প্রথম দিন থেকেই দেখছি আপনি আমাকে অকারণে জ্বালাতন করছেন। আপনার কি আর কোনো কাজ নেই ক্যাম্পাসে? নাকি মানুষকে হেনস্তা করাই আপনার একমাত্র কাজ?"

আদনান একটু অবাক হওয়ার ভান করে বুকে হাত দিয়ে বলল, "বা রে! হেল্প করতে চাইছি, আর তুই আমাকেই ঝারি দিচ্ছিস? এত রাগ তো তোর শ্যামলা মুখে মানায় না রে মায়াবতী!"

"আমাকে মায়াবতী বলবেন না!" তৃষা এবার বেশ চেঁচিয়ে উঠল। "আর আমার পেছনে লাগা বন্ধ করুন। গুন্ডামি নিজের বন্ধুদের সাথে গিয়ে করুন, আমার সামনে একদম আসবেন না। অসভ্য একটা ছেলে!"

তৃষার মুখের ওপর সরাসরি 'অসভ্য' শব্দটা শুনে আদনানের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তে বদলে গেল। ঠোঁটের কোণের দুষ্টু হাসিটা গায়েব হয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত জেদ। বন্ধুদের সামনে কিংবা ক্যাম্পাসে তাকে এভাবে কেউ মুখের ওপর শোনানোর সাহস দেখায়নি কখনো।

তৃষা রাগে গজগজ করতে করতে আদনানকে পাশ কাটিয়ে এক পা বাড়াতেই ঘটল ঘটনাটা।

আদনান চট করে তৃষার হাত ধরে তাকে টেনে নিজের একদম কাছে নিয়ে এল। তৃষা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আদনান নিচু হয়ে তৃষার নরম গালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াাল। একটা আলতো, অথচ স্পষ্ট চুমু।

মুহূর্তের জন্য যেন পুরো পৃথিবীটা থমকে গেল। চত্বরের বাতাস, গাছের পাতার খসখস শব্দ—সব যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তৃষার হাত থেকে বই দুটো খসে ঘাসের ওপর পড়ে গেল। তার চোখ দুটো ভয়ে আর বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে, কপালে জমে উঠেছে ঘাম।

আদনান এক সেকেন্ডের জন্য তৃষার ওই মায়াবী চোখের গভীরে তাকাল। তারপর এক গাল হেসে, তৃষার হাত ছেড়ে দিয়ে পকেটে হাত গুঁজে দিল।

"রাগটা একটু বেশিই ছিল, তাই ঠান্ডা করে দিলাম," শান্ত গলায় বলল আদনান। তারপর হালকা চালে এক সিটি বাজিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে সেখান থেকে হেঁটে চলে গেল।

তৃষা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গাল দুটো তখনও আদনানের ছোঁয়ায় যেন জ্বলছে। হাত দিয়ে গালটা চেপে ধরে সে সেখানে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল, চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সেই রোববারের ঘটনার পর থেকে তৃষা আরও চুপচাপ হয়ে গেল। আদনানের ওপর তার রাগ যেমন পাহাড়সম হয়েছিল, তেমনি এক অদ্ভুত ভয়ও তার মনকে আঁকড়ে ধরেছিল। আদনান ছেলেটা সত্যিই কোনো নিয়মনীতি মানে না। তবে সেই দিনের পর থেকে অদ্ভুতভাবে আদনান আর আগের মতো তৃষাকে খোঁচা মারতে আসছিল না। কেবল দূর থেকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকত, যা তৃষার মনকে আরও গুলিয়ে দিত।

এদিকে আদনানের জীবনে তৃষা একমাত্র চরিত্র ছিল না। ক্যাম্পাসের অত্যন্ত মডার্ন, ফ্যাশনেবল এবং উগ্র স্বভাবের মেয়ে রিয়া আদনানের পেছনে আঠার মতো লেগে থাকত। রিয়া দেখতে সুশ্রী হলেও তার চলাফেরা ছিল বেশ বেপরোয়া। একই সাথে চার-পাঁচটা ছেলের সাথে রিলেশনশিপে থাকা রিয়ার কাছে ছিল এক ধরণের খেলা। কিন্তু ক্যাম্পাসের এত ছেলের মধ্যে কেবল আদনানকেই সে কোনোভাবেই কাবু করতে পারছিল না। আদনান তাকে কখনোই পাত্তা দিত না, যা রিয়ার অহংকারে তীব্র আঘাত হানত।

সেদিন বিকেলে ক্যাফেটেরিয়ার পেছনের নিরিবিলি গলিতে একা দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল আদনান। রিয়া দূর থেকে তাকে দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার পরনে ছোট রিভিলিং পোশাক, মুখে গাঢ় মেকআপ।

"কি ব্যাপার আদনান? একা একা কি ভাবছ?" রিয়া খুব ঘনিষ্ট হয়ে আদনানের একদম কাছে এসে দাঁড়াল।

আদনান ধোঁয়া ছেড়ে আড়চোখে তাকাল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।

রিয়া আদনানের অবহেলা গায়ে না মেখে আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। আদনানের বুকের ওপর হাত রেখে তার একদম কাছে মুখ এনে বেশ রোমান্টিক গলায় বলল, "তুমি আজকাল বড্ড ইগনোর করছ আমাকে। জানো তো, তোমাকে আমার কতটা ভালো লাগে? এত ভাব নেওয়ার কি আছে বলো তো?"

কথাটা শেষ করেই রিয়া আদনানের ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই যা ঘটল, তার জন্য রিয়া মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

'ঠাস!'

একটি প্রচণ্ড চড়ের শব্দে পেছনের নির্জন গলিটা কেঁপে উঠল।

আদনানের হাতটা রিয়ার গাল থেকে সরে এল। চড়ের চোটে রিয়া কয়েক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি গোল গোল হয়ে গেছে বিশ্বাসহীনতায়।

"সীমানা পার করার চেষ্টা করবি না, রিয়া," আদনানের কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠান্ডা আর ধারালো। "তুই কার কার সাথে শুয়ে বেড়াস বা প্রেম করিস, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস যেন দ্বিতীয়বার না হয়। গেট আউট!"

রিয়া অপমানে রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে গাল চেপে ধরে কড়া চোখে আদনানের দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তার মনে জ্বলতে থাকা হিংসার আগুন দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে ভালো করেই খেয়াল করেছে, আদনান আজকাল ওই শ্যামলা মেয়েটার দিকে কেমন করে যেন তাকায়। যে আদনান তাকে চড় মারল, সে ওই সাধারণ মেয়েটার ওপর নজর রাখছে—এটা রিয়ার সহ্য হচ্ছিল না।

কয়েক দিন পর। টিএসসি-র মোড় দিয়ে হেঁটে আসছিল তৃষা। হাতে কয়েকটা ফটোকপি করা নোটস। হঠাৎ পাশ থেকে রিয়া হেঁটে এসে একদম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিজের পা-টা তৃষার পায়ের সামনে বাড়িয়ে দিল।

হুট করে ল্যাং খেয়ে তৃষা সামলাতে না পেরে কাঁচা রাস্তায় আছড়ে পড়ল। তার হাতের সব কাগজপত্র মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে গেল, কনুইয়ে বেশ চোট পেল সে।

রিয়া ওপর থেকে তৃষার দিকে এক ধরনের বিষাক্ত হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই দূর থেকে দৌড়ে এল আদনান। তৃষাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তার বুকটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল। দ্রুত এসে তৃষার হাত ধরে তাকে সাবধানে টেনে তুলল।

"কোথাও লেগেছে? বেশি ব্যথা পেয়েছিস?" আদনানের গলায় চরম উৎকণ্ঠা।

তৃষা ব্যাথায় চোখ বুজে মাথা নাড়ল, "না... ঠিক আছি।"

আদনান ঘুরে রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়া একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়েছিল। আদনান কিন্তু রিয়াকে একটা শব্দও বলল না, কোনো চিৎকার করল না। শুধু রিয়ার চোখের দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকাল, যাতে স্পষ্ট লেখা ছিল—'তোর হিসাব আমি পরে নিচ্ছি।'

তৃষা চোখ তুলে আদনানের উদ্বিগ্ন মুখটার দিকে তাকাল। যে ছেলেটা তাকে এত জ্বালাতন করত, তার চোখে আজ এত যত্ন কেন? তৃষার মনের গহীনে জমে থাকা ক্ষোভের বরফটা যেন ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল।

ক্যাম্পাসের বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসব উপলক্ষে রাত থেকেই টিএসসি আর কলা ভবন প্রাঙ্গণ চমৎকার আলোয় সেজে উঠেছে। গান-বাজনা, স্টল আর শিক্ষার্থীদের কলরবে চারপাশ মুখরিত। তৃষা অন্য দিনের চেয়ে আজ কিছুটা ভিন্ন। নীল রঙের একটা সুতির শাড়ি পরেছে সে, কপালে ছোট একটি কালো টিপ। তার শ্যামলা মায়াবী রূপ যেন শাড়ির ভাঁজে আরও বেশি ফুটে উঠেছে।

উৎসবে ভিড় এড়াতে তৃষা ভবনের এক নির্জন করিডোরের দিকে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সুখ তার কপালে বেশিক্ষণ সয় না। সুযোগের অপেক্ষায় থাকা রিয়া সেখানে হাজির হলো। তার সাথে ছিল আরও দুটো মেয়ে।

রিয়া তৃষার সামনে এসে হাত দুটো বুকে বেঁধে এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "কিরে শ্যামলা! শাড়ি পরে একদম পরী সাজা হচ্ছে? ভাবছিস এভাবে ঘুরলে আদনান তোর প্রেমে পড়ে যাবে?"

তৃষা শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল, "আমি কারোর জন্য কিছু সাজিনি। আপনি দয়া করে এখান থেকে যান।"

"যাব মানে? তুই নিজেকে ভাবিস কি শুনি?" রিয়ার চোখ মুখ হিংসায় বিষিয়ে উঠল। সে তৃষাকে ধাক্কা মেরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। "একটা বাজে গ্রামের মেয়ে হয়ে তুই আদনানের নজর কাড়তে চাস? ওর পেছনে ঘুরঘুর করছিস কোন সাহসে? আদনান তোকে রাস্তার কুকুরের মতো ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলবে, বুঝলি? তোর তো কোনো যোগ্যতাও নেই ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড হওয়ার!"

রিয়া আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিশ্রি ভাষায় একের পর এক গালি দিতে লাগল। তৃষার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সে কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না, কারণ অপমানটা তার আত্মসম্মানে বড্ড বেশি আঘাত করেছিল। মাথা নিচু করে নীরবে কাঁদতে লাগল মেয়েটি।

"বলা শেষ হয়েছে তোর, রিয়া?"

একটা গম্ভীর, থমথমে কণ্ঠস্বর পুরো খালি করিডোরে প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়ল।

সবাই ঘুরে তাকাল। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে আদনান। তার পরনে কালো পাঞ্জাবি, চোখের দৃষ্টিতে প্রলয়ের আভাস। রিয়া কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও চট করে নিজের কণ্ঠ সামলে নিয়ে বলল, "আদনান! ভালোই হলো তুমি এসেছ। দেখো এই মেয়েটা কীভাবে তোমার নাম ভাঙিয়ে ভাব মারছে! আমি তো ওকে সঠিক শিক্ষাটাই দিচ্ছিলাম। ও তোর কে হয় শুনি?"

আদনান জবাব দিল না। সে রিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে সোজা তৃষার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তৃষার মায়াবী চোখে পানি দেখে আদনানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে আলতো হাতে তৃষার গাল থেকে জলটুকু মুছে দিল।

তারপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আদনান এক হাত দিয়ে তৃষার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে ফেলল। অন্য হাত দিয়ে তৃষার মুখটা ওপরের দিকে তুলে সরাসরি তার ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

এটা আগের মতো গালের কোনো আলতো চুমু ছিল না—ছিল এক গভীর, তীব্র আর ভালোবাসায় ভরা অধিকারবোধের প্রকাশ।

রিয়া আর তার সঙ্গীরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিয়ার চোখ দুটো প্রায় কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম। পুরো করিডোরজুড়ে কেবল এক নীরব নিস্তব্ধতা।

কয়েক মুহূর্ত পর আদনান ধীরেসুস্থে তৃষাকে ছেড়ে দিল। তৃষা হাঁপাচ্ছে, তার গাল লাল হয়ে গেছে, বুক দড়ফড় করছে। কিন্তু তার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে অদ্ভুত এক বিস্ময়।

আদনান রিয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক বিষাক্ত হাসি দিয়ে বলল, "জিজ্ঞেস করছিলিনা ও আমার কে হয়? দেখলি তো? ও আমার ভালোবাসা, আমার হবু বউ। এবার যদি ওর গায়ে তোর একটা আঁচড়ও পড়ে, তাহলে তোকে ক্যাম্পাসে তো দূরের কথা, এই শহরে থাকার অযোগ্য করে দেব। গেট আউট!"

রিয়া অপমানে, ক্ষোভে আর হিংসেয় পায়ের ছাপ ফেলে সেখান থেকে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেল।

আদনান এবার তৃষার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই গুন্ডামি আর উগ্রতা হাওয়া হয়ে গেছে, সেখানে এখন শুধুই এক গভীর অনুশোচনা আর ভালোবাসার টান। তৃষা এক অজানা টানে আদনানের বুকের ওপর মাথা রাখল। সব দ্বিধা আর সংশয় ভেঙে দুটো হৃদয় যেন এক হয়ে গেল সেদিন।

সাংস্কৃতিক উৎসবের সেই রাতের পর থেকে আদনান আর তৃষার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে গেল। ক্যাম্পাসের গুন্ডা হিসেবে পরিচিত ছেলেটা যে কোনো মেয়ের প্রেমে এমন ব্যাকুল হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। আদনান এখন একদম বদলে গেছে। অযথা মারামারি, জুনিয়রদের ওপর দাদাগিরি কিংবা বন্ধুদের সাথে বেপরোয়া আড্ডা—সবই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সে।

এখন আদনানের দিনের শুরু হয় তৃষার ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে, আর দিন শেষ হয় তৃষাকে নিরাপদে হলে পৌঁছে দিয়ে।

তৃষাও ধীরে ধীরে আদনানের প্রেমে গভীরভাবে ডুবে যেতে লাগল। প্রথম দিকে আদনানকে দেখে তার ভেতরে যে ভয় আর ঘৃণা জন্ম নিয়েছিল, তা এখন চরম ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে। আদনানের এই বাহ্যিক রাগী আর উগ্র চেহারার পেছনে যে একটা ভীষণ যত্নশীল আর নরম হৃদয় লুকিয়ে ছিল, তা কেবল তৃষাই দেখতে পেয়েছে।

বিকেলের দিকে টিএসসি-র পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দুজন মুখোমুখি বসে ছিল।

তৃষা আদনানের চা-এর কাপের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "জানেন, আপনাকে আগে আমার ভীষণ ভয় হতো? মনে হতো আপনি এক নম্বর রাক্ষস!"

আদনান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তৃষার মায়াবী চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি। "রাক্ষস ছিলাম বলেই তো তোর মতো পরীকে ধরে কাবু করতে পেরেছি, মায়াবতী। তা না হলে কি তুই আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতিস?"

"তাই বলে ওভাবে সবার সামনে..." তৃষা লজ্জায় চোখ নিচু করে ফেলল। সেই রাতের ঠোঁটে ঠোঁট মেলানোর স্মৃতি মনে পড়তেই তার গাল দুটো আবার লাল হয়ে উঠল।

আদনান তৃষার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। "সবার সামনে না করলে ওই ডাইনিটা আর সবাই বুঝত কীভাবে যে তুই শুধুই আমার? তোকে ছাড়া আমি আর কিছু চিন্তা করতে পারি না তৃষা। তোকে আমার সারাজীবনের জন্য চাই।"

তৃষা আদনানের মুখের দিকে তাকাল। সে অনুভব করতে পারল এই কথার পেছনে কোনো মিথ্যা নেই, কোনো ছলনা নেই। আছে এক পরম সততা।

কিন্তু এই মিষ্টি আর রঙিন দিনগুলোর আড়ালে অন্ধকারের কালো মেঘ জমছিল।

রিয়া এই অপমান আর পরাজয় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। আদনানের চড় আর সবার সামনে তৃষাকে আপন করে নেওয়ার দৃশ্যটা তার মাথায় বিষাক্ত সাপের মতো কামড়াচ্ছিল। সে প্রতিদিন দূর থেকে ওদের হাসিখুশি মুখগুলো দেখত আর ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলেপুড়ে ছারখার হতো।

একদিন রিয়া ক্যাম্পাসের বাইরের এক পরিচিত মাস্তান গ্যাংয়ের প্রধান, আকাশের সাথে দেখা করল। আকাশ আদনানের পুরোনো শত্রু। অতীতে ক্যাম্পাসের আধিপত্য নিয়ে আদনানের কাছে কয়েকবার মার খেয়ে সে এখন প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছিল।

একটি অন্ধকার রেস্তোরাঁর কোণে বসে রিয়া আর আকাশ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল।

"তুই শুধু আদনানকে ধাক্কা দিতে পারবি না আকাশ," রিয়া চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বিষাক্ত গলায় বলল। "ওর আসল দুর্বলতা এখন ওই শ্যামলা মেয়েটা। নাম তৃষা। ওই মেয়েটাকে যদি ধ্বংস করে দিতে পারিস, আদনান এমনিতেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।"

আকাশ বাঁকা হেসে বলল, "মেয়েটাকে তুলে নিয়ে আসব? নাকি অন্য কোনো প্ল্যান?"

"যেভাবেই হোক ওর ক্ষতি চাই আমি," রিয়ার চোখে চরম হিংসা। "এমন কিছু করবি যেন আদনান সারাজীবন আফসোস করে, আর ওই মেয়েটার মুখ দেখানোর মতো ক্ষমতা না থাকে।"

আদনান আর তৃষা যখন তাদের নতুন প্রেমের মিষ্টি অনুভূতিতে ভেসে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের অজান্তে একটা বড় বিপদের জাল বুনছিল রিয়া।

প্রেমের ভেজা হাওয়ায় দিনগুলো ডানা মেলে উড়ছিল। আদনান আর তৃষার বিয়ের কথা দুই পরিবার পর্যন্ত গড়িয়েছে। আদনানের বাবা-মা প্রথমে একটু দ্বিধায় থাকলেও তৃষার অমায়িক ব্যবহার আর শান্ত মায়াবী রূপ দেখে এক বাক্যে রাজি হয়ে যান। ঠিক হয়, আগামী মাসেই ঘরোয়া আয়োজনে তাদের আকদ সম্পন্ন হবে।

বিয়ের কেনাকাটা আর পড়াশোনা—সব মিলিয়ে সময়টা যেন স্বপ্নের মতো কাটছিল তৃষার। কিন্তু স্বপ্ন যত সুন্দর হয়, তার পেছনের আঁধার ততটাই গভীর হতে থাকে।

পরীক্ষা শেষের এক বিষণ্ন বিকেল। তৃষা ডিপার্টমেন্টের সেমিনার লাইব্রেরিতে বসে কাজ করছিল। আদনান তখন ক্যাম্পাসের বাইরে, বন্ধুদের সাথে বিয়ের কিছু কেনাকাটার কাজে ব্যাস্ত।

এমন সময় তৃষার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল।

তৃষা ফোনটা ধরে বলল, "হ্যালো?"

ওপাশ থেকে এক অপরিচিত লোক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আপনি কি তৃষা ম্যাডাম? আদনান ভাইয়ের হবু বউ?"

তৃষা একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, "হ্যাঁ, বলছি। আপনি কে? কি হয়েছে?"

"ম্যাডাম, সর্বনাশ হয়ে গেছে! কার্জন হলের পেছনের মাঠে আদনান ভাইকে আকাশের গ্যাং ঘিরে ধরেছে। আড়াআড়ি মারামারি চলছে, আদনান ভাই ভীষণ আহত হয়েছেন! উনি আপনাকে একা আসতে বলছেন, পুলিশকে জানালে ওরা ভাইকে মেরে ফেলবে!"

কথাটা শোনামাত্রই তৃষার মাথার ওপর যেন বাজ ভেঙে পড়ল। আদনানের কোনো বিপদ হয়েছে ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা শিউরে উঠল। চিন্তাভাবনা করার কোনো ক্ষমতা তখন আর তার অবশিষ্ট ছিল না। আদনানকে বাঁচানোর এক ব্যাকুল টানে সে দৌড়ে লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে গেল।

কার্জন হলের পেছনের ঝোপঝাড় আর পুরোনো বিল্ডিংয়ের চারপাশটা সবসময়ই একটু নির্জন থাকে। সাঁঝের আবছা আলোয় তৃষা হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে গিয়ে পৌঁছাল।

"আদনান! আদনান, তুমি কোথায়?" তৃষা চিৎকার করে ডাকতে লাগল।

কিন্তু সেখানে কোনো আদনান ছিল না। নীরব নিস্তব্ধ চারপাশ।

হঠাৎ পেছনের ভাঙা দেয়ালের আড়াল থেকে বের হয়ে এল আকাশ আর তার চার-পাঁচজন সশস্ত্র লোক। তাদের পেছনে হাত দুটো বুকে বেঁধে ধীর পায়ে হেঁটে এল রিয়া। রিয়ার ঠোঁটে এক চরম হিংস্র আর কুটিল হাসি।

তৃষা থমকে দাঁড়াল। পরিস্থিতি বুঝতে তার এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। সে ফাঁদে পা দিয়েছে!

"আদনান কোথায়?" তৃষা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল।

রিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল। "আদনান তো তার মিষ্টি বউয়ের জন্য মার্কেটিং করছে রে বোকা মেয়ে! তোকে এখানে আনার জন্য ওই নাটকটা বানাতে হলো। কেমন লাগল সারপ্রাইজটা?"

তৃষা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আকাশের দুইজন লোক তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তৃষা আকুতি-মিনতি করে বলল, "রিয়া, প্লিজ এসব বন্ধ করো! আমার সাথে তোমার কি শত্রুতা?"

"তোর সাথে কোনো শত্রুতা নেই," রিয়া তৃষার গালের কাছে মুখ এনে বিষাক্ত গলায় বলল। "শত্রুতা হলো আদনানের ওই অহংকারের সাথে! যে আদনান আমাকে চড় মেরেছিল, তোকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়েছিল—আজ সেই আদনানকে আমি জ্যান্ত লাশ বানাব। তোকে যখন আকাশ আর ওর ছেলেরা মিলে শেষ করে দেবে, তখন তোর ওই মায়াবী মুখটা আদনান কীভাবে দেখবে বল তো?"

আকাশ বাঁকা হেসে তৃষার দিকে এগিয়ে এল, "মেয়েটার মুখটা সত্যি মায়াবী। আজ বেশ মজা হবে!"

তৃষা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, "ছেড়ে দাও আমাকে! সাহায্য করুন! কেউ বাঁচান!"

রিয়া চোখ টিপে বলল, "চেঁচিয়ে লাভ নেই শ্যামলা সুন্দরী। এখানে তোর চিৎকার শোনার মতো কেউ নেই।"

আকাশ তৃষার ওড়না ধরে টান দিতেই তৃষা নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল—"আদনান!"

তৃষার সেই আর্তচিৎকার যেন বাতাসের ডানা ভর করে কার্জন হলের চারপাশের নীরবতাকে চুরমার করে দিল। আকাশ বিকট হেসে তৃষার দিকে আরেক ধাপ এগোতেই হঠাৎ বিকট শব্দে পুরোনো বিল্ডিংয়ের কাঠের দরজা ভেঙে ছিটকে পড়ল।

ধুলো আর অন্ধকারের বুক চিরে ঝড়ো গতিতে ভেতরে প্রবেশ করল আদনান।

তার চোখের মনি দুটো লাল রক্তের মতো জ্বলছে, কপালের রগ ফুলে উঠেছে। আদনানকে এই রূপ রুদ্রমূর্তিতে দেখে আকাশের সঙ্গীরা এক মুহূর্তের জন্য ভয়ে জমে গেল।

আসলে তৃষা লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার সময়ই আদনানের এক জুনিয়র বন্ধু তাকে দৌড়ে কার্জনের দিকে যেতে দেখে সন্দেহবশত আদনানকে ফোন দিয়ে জানিয়েছিল। আদনান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বাইক উড়িয়ে এখানে এসে পৌঁছায়।

"তৃষা!" আদনানের কণ্ঠস্বরে এক ভয়ঙ্কর গর্জন ফুটে উঠল।

তৃষাকে ওভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে অপমান করার দৃশ্যটা দেখার পর আদনানের ভেতরের গুন্ডা সত্তা আর মানুষ রইল না, তা হিংস্র এক পশুতে পরিণত হলো।

আকাশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদনান সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথম ধাক্কাতেই সে আকাশের এক সঙ্গীকে দেয়ালের সাথে আছড়ে ফেলল। ছেলেটি এক আঘাতেই সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অন্য আরেকজন রামদা বের করে কোপ দিতে এলে আদনান শূন্যে পা তুলে তার বুকে এক লাথি বসিয়ে দিল। ভাঙা পাঁজরের শব্দে পেছনের ঝোপঝাড় কেঁপে উঠল।

আকাশ নিজের পিস্তল বের করার চেষ্টা করতেই আদনান তার হাত ধরে মোচড় দিয়ে এক হাত দিয়ে লোকটার গলা চেপে ধরে শূন্যে তুলে ফেলল।

"আমার তৃষার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস কীভাবে হলো তোর, আকাশ?" আদনানের গলা দিয়ে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছিল। সে আকাশকে সজোরে মাটিতে আছড়ে ফেলে একের পর এক কিল-ঘুষি মারতে লাগল। আকাশের নাক-মুখ ফেটে রক্তে ভেসে যেতে লাগল, সে প্রাণভিক্ষা চেয়ে কেঁদে উঠল। কিন্তু আদনানের কোনো হুঁশ ছিল না, সে যেন আজ মেরেই ফেলবে।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে দেখে তৃষা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আদনানের কাছে দৌড়ে এল। সে পেছন থেকে আদনানের রক্তাক্ত হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।

"আদনান, ছেড়ে দাও! প্লিজ ছেড়ে দাও, ও মরে যাবে! আমাকে দেখো, আমি ঠিক আছি!" তৃষার অঝোর কান্নার স্পর্শে আদনান ধীরে ধীরে শান্ত হলো। সে হাপাচ্ছিল।

আদনান ঘুরে দাঁড়িয়ে তৃষাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন একটু আলগা হলেই তৃষা হারিয়ে যাবে। তৃষাও আদনানের শার্ট শক্ত করে চেপে ধরে ভয়ে কাঁপতে লাগল।

ঠিক তখনই আড়ালে লুকিয়ে থাকা রিয়া চুপিচুপি সটকে পড়ার চেষ্টা করছিল।

"এক পা-ও বাড়াবি না, রিয়া!" আদনানের গর্জন তাকে বরফের মতো জমিয়ে দিল।

আদনান তৃষার হাত ধরে ধীরে ধীরে রিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রিয়ার শরীর তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আদনানের চোখে যে খুনের নেশা ফুটে উঠেছে, তা রিয়া আগে কখনো দেখেনি।

"তোকে আমি মেয়ে মানুষ বলে বারবার ছাড় দিয়েছি," আদনানের কণ্ঠস্বর একদম থমথমে, ভীতিকর। "কিন্তু তুই আমার জীবনের ওপর হাত দিতে চেয়েছিস। তোকে আমি পুলিশে দেব না রিয়া, পুলিশ তোর মতো মানসিক রোগীকে শিক্ষা দিতে পারবে না।"

আদনান ফোন বের করে সোজাসুজি ক্যাম্পাসের প্রক্টর এবং রিয়ার প্রভাবশালী বাবার কাছে একটা ভিডিও ডায়াল করল। রিয়া তৃষাকে যে গালিগালাজ করেছিল আর ফাঁদে ফেলে ডেকে এনেছিল, তার সমস্ত অডিও রেকর্ড আদনানের কাছে আগেই চলে এসেছিল এক জুনিয়রের মাধ্যমে।

আদনান বরফশীতল গলায় বলল, "রিয়া, তোর বাপ আর ভার্সিটি অথরিটি এখন জানে তুই কত বড় অপরাধী। আর শোন, আজ থেকে তোর মতো কুৎসিত মনের মেয়ে এই ক্যাম্পাসে পা রাখার যোগ্যতাও হারালি। এরপর যদি কোনোদিন তোকে তৃষার ১০০ মিটারের মধ্যে দেখি, তবে তোকে গায়েব করে দিতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না।"

রিয়া হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়ল। তার বিষাক্ত হিংসা আজ তাকে নিঃস্ব, অপমানিত আর একাকী করে দিয়েছে।

আদনান রিয়াকে ওই অবস্থায় ফেলে রেখে তৃষাকে কোলে তুলে নিল। তৃষা তার গলা জড়িয়ে ধরে আদনানের বুকের ভেতর মুখ লুকাল। সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আজ তারা নিরাপদ।

সব কালবৈশাখী ঝড়ের পর যেমন স্নিগ্ধ সকাল আসে, আদনান আর তৃষার জীবনেও তেমনি এক মিষ্টি আলো ফুটে উঠল। কার্জন হলের সেই ভয়াল রাতের পর রিয়াকে চিরতরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরিবারের অপমানে আর অপরাধবোধে সে শহর ছেড়ে বহুদূরে চলে যেতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, আকাশের দলবলকে পুলিশ গ্রেফতার করে গরাদের পেছনে পাঠায়।

ক্যাম্পাসের বাতাসে এখন আর কোনো হিংসার গন্ধ নেই, আছে শুধুই এক নতুন শুরুর মিষ্টি সৌরভ।

মে মাসের এক বৃষ্টিভেজা রাতে বসেছিল তাদের বিয়ের আসর। আলো ঝলমলে জাঁকজমক অনুষ্ঠান নয়, বরং তৃষার পছন্দের মতো করেই ঘরোয়া আর স্নিগ্ধ আয়োজনে দুজন এক সুতোয় বাঁধা পড়ল। লাল বেনারসি শাড়িতে তৃষাকে দেখতে অবিকল কোনো রাজকন্যার মতো লাগছিল। শ্যামলা গায়ের রঙে সোনালী অলংকার আর কপালে বড় লাল টিপ—তৃষার চোখ দুটোর মায়াবী ভাব যেন হাজার ওয়াটের আলোকেও হার মানাচ্ছিল।

বিয়ের সব আচার-অনুষ্ঠান শেষে যখন আদনান ঘরের দরজা ভিজিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখন রাত প্রায় নিঝুম।

তৃষা বিছানার এক পাশে চুপচাপ বসে ছিল। নতুন বউয়ের সাজে তার বুক ধড়ফড় করছিল। ঘরে প্রবেশ করতেই আদনানের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ আর উপস্থিতি তৃষার হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল।

আদনান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তৃষার পাশে বসল। পরনের শোরোয়ানিটা একটু আলগা করে সে অপলক চোখে তৃষার দিকে তাকিয়ে রইল।

"কি দেখছ অত?" তৃষা না তাকিয়েও লজ্জা মেখে ফিসফিস করে বলল।

আদনান এক হাত দিয়ে তৃষার চিবুক ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলল। তারপর তৃষার চোখে চোখ রেখে এক মায়াবী হেসে বলল, "দেখছি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাকে। যে মায়াবতী এক এক করে আমার সব উগ্রতা, গুন্ডামি হরণ করে আমাকে আস্ত একটা মানুষ বানিয়ে দিল।"

তৃষা আদনানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। সে আলতো হাতে আদনানের হাতটা ধরে নিজের গালের সাথে ছুঁইয়ে দিল। "আর আমি দেখছি সেই অসভ্য ছেলেটাকে, যে প্রথম দিনেই টিএসসিতে আমাকে মিছিমিছি কত জ্বালিয়েছিল!"

"মিছিমিছি নয় রে মায়াবতী, ওটা তোকে নিজের করে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ ছিল," আদনান মুচকি হেসে বলল। "যদিও প্রথম চুমুটার জন্য একটা চড় পাওয়াই উচিত ছিল আমার।"

"চড় দিনি বলেই তো আজ আমি আপনার বউ," তৃষা আদনানের বুকের ওপর মাথা রেখে চোখ বুজল।

আদনান তৃষাকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তৃষার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াাল পরম আদরে। ঘরজুড়ে তখন ভালোবাসার এক মিষ্টি উত্তাপ। তৃষার চুল থেকে ভেসে আসা বেলী ফুলের সুবাস আর বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দে রাতটা যেন থমকে গিয়েছিল।

যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল রাগ, বিরক্তি আর একগুঁয়েমি দিয়ে—আজ তা পরিণতি পেল এক গভীর, পবিত্র ভালোবাসায়। সমস্ত ঝড়-ঝাপটা, হিংসা আর ষড়যন্ত্র পেরিয়ে তৃষা আর আদনানের জীবন সাজল এক চিরন্তন ভালোবাসার গল্পে।

....
👁 81