জোরপূর্বক বিয়ের পরের রাত

বিকেলের হালকা সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে ড্রয়িংরুমের কাঠের সোফাটার ওপর। ড্রয়িংরুমের এক কোণে একটা ছোট টেবিল, সেখানে বই-খাতা ছড়িয়ে বসে আছে তুলি। ওর সামনে এইচএসসি পরীক্ষার বেশ কিছু গাইড বই খোলা। কিন্তু তুলির মন বইয়ের পাতায় একদমই নেই। সে বার বার আড়চোখে তাকাচ্ছে দরজার দিকে। তার বুকের ভিতর এক অদ্ভুত ধুকপুকানি কাজ করছে। কারণ, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাফসান বাড়ি ফিরবে।

রাফসান তুলির আপন চাচাতো ভাই। কিন্তু তুলির কাছে সে কেবল একজন ভাই বা পরিবারের সদস্যের চেয়েও অনেক বেশি কিছু—এক আতঙ্কের নাম। রাফসান বয়স এবং ব্যক্তিত্বে তুলির চেয়ে অনেক বড়, পুরো আট বছরের ব্যবধান। রাফসানের বয়স এখন ছাব্বিশ, আর তুলি সবে আঠারোয় পা দিয়েছে। পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ার কারণে রাফসানের সিদ্ধান্তই যেন এই বাড়ির শেষ কথা। বড় চাচা আর চাচি রাফসানকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার যেকোনো বায়না, যেকোনো আবদার মুহূর্তের মধ্যে পূরণ হয়ে যায়। রাফসানের চলাফেরা, মেজাজ আর গ গম্ভীর উপস্থিতি পুরো পরিবারকে একধরনের শৃঙ্খলায় বেঁধে রাখে। আর এই গাম্ভীর্যই তুলির মনে জন্ম দিয়েছে এক গভীর ভয়ের।

তুলির বয়স যখন মাত্র দশ-এগারো, তখন থেকেই রাফসানের নজর ছিল তুলির ওপর। তবে তখন সেটা তুলির কাছে ছিল সাধারণ বড় ভাইয়ের কেয়ার বা খেয়াল রাখা। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে রাফসানের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি আর আচরণের পরিবর্তন তুলি খুব ছোট বয়সে না বুঝলেও, এখন যত বড় হচ্ছে, তত যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব করে। রাফসান কখনো তুলির দিকে তায়কোলে সেই চোখে থাকত এক তীব্র আকর্ষণ, এক অনাকাঙ্ক্ষিত অধিকারবোধ। তুলি যখন ছোট ছিল, ফ্রক পরে উঠোনে দৌড়াদৌড়ি করত, রাফসান তখন থেকেই দূর থেকে চুপচাপ তাকে লক্ষ্য করত। তুলির যেকোনো প্রয়োজন, যা সে নিজে মুখে কখনো বলেনি, তা-ও কীভাবে যেন রাফসানের কাছে পৌঁছে যেত এবং রাফসান তা অলৌকিকভাবে এনে হাজির করত।

বাইরে থেকে মনে হতে পারে রাফসান একজন খুবই যত্নশীল বড় ভাই। কিন্তু তুলির জন্য এই যত্নটাই হয়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য শিকল। রাফসান যখনই তুলির আশেপাশে থাকত, তুলি অতিরিক্ত গুটিয়ে যেত। সে রাফসানের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারত না। রাফসানের চোখ দুটো ছিল বড্ড তীক্ষ্ণ। যেন এক নজরেই সে তুলির মনের সব কথা পড়ে ফেলতে পারে।

হঠাৎই বাড়ির প্রধান ফটক খোলার শব্দ হলো। ভারী বুটের আওয়াজটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। তুলি চমকে উঠে বইয়ের পাতায় চোখ ফিরিয়ে নিল। সে গায়ের ওড়নাটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিল নিজের শরীরে, যেন নিজের ভয়টাকে ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চায়।

ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল রাফসান। লম্বা চওড়া শরীর, ধারালো চোয়াল আর ফর্সা মুখে হালকা দাড়ি। তার পরনে অফিসিয়াল শার্ট আর ট্রাউজার। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই সে এক পলক চোখ বোলাল পুরো ঘরে, তারপর তার দৃষ্টি আটকে গেল টেবিল গেড়ে বসে থাকা ছোট তুলির ওপর।

রাফসান ধীর পায়ে এগোলো তুলির দিকে। ঘরের মধ্যকার বাতাস যেন একমুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। তুলি নিশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল। সে অনুভব করতে পারছিল, রাফসান তার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। রাফসানের শরীরের পরিচ্ছন্ন পারফিউমের সুবাস তুলির নাকে এসে ধাক্কা দিল।

"আজকে পড়া কতটুকু হলো?" রাফসানের গলাটা বেশ নিচু, কিন্তু ভারী।

তুলি তোতলাতে তোতলাতে বলল, "অংক... অংক চ্যাপ্টারটা শেষ করার চেষ্টা করছি।"

রাফসান নিচু হয়ে তুলির হাতের কাছে রাখা খাতাটার দিকে তাকাল। তার হাতের একটা আঙুল ছুঁয়ে গেল টেবিলটা, তুলির হাতের খুব কাছাকাছি। তুলি অজান্তেই নিজের হাতটা সামান্য সরিয়ে নিল। রাফসানের দৃষ্টি এড়িয়ে গেল না এই ছোট নড়াচড়াটুকু। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষণ্ণ আর রহস্যময় হাসি।

"ভয় পাচ্ছিস কেন আমাকে? আমি কি তোকে গিলে খাব?" রাফসান তুলির খুব কাছাকাছি এসে শান্ত স্বরে বলল।

তুলি মাথা নিচু করেই রইল, "না... ভয় পাব কেন। আপনি তো বড় ভাই..."

'ভাই' শব্দটা শুনতেই রাফসানের চোখের আলো যেন একমুহূর্তের জন্য নিভে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তবে সে নিজেকে সামলে নিল। তুলির মাথার চুলে আলতো করে হাত রাখল রাফসান। সেই স্পর্শে তুলির সারা শরীরে এক অজানা শিহরণ খেলে গেল—ভয়ের শিহরণ।

"তুই পড়া শেষ কর। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। আজ রাতে তোর সাথে একটা কথা আছে," রাফসান ধীর শান্ত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

রাফসান চলে যেতেই তুলি লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলল। তার হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। সে বুঝতে পারছে না রাফসান কিসের কথা বলছে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে, এই শান্ত পরিস্থিতির পেছনে বড় কোনো ঝড় অপেক্ষা করছে।

রাফসান তার নিজের ঘরে গিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর একটা তীব্র উথাল-পাথাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আঠারো বছর! তুলির বয়স আজ আঠারো পূর্ণ হয়েছে। কতগুলো বছর সে নিজেকে সামলে রেখেছে, কতগুলো রাত সে শুধু তুলির হাসিমুখটা মনে করে পার করে দিয়েছে। রাফসানের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল এই মেয়েটি। ছোটবেলা থেকে যখনই তুলি একটু একটু করে বড় হচ্ছিল, রাফসানের বুকের ভেতরের ভালোবাসার দাবানল ততটাই তীব্র হচ্ছিল।

রাফসান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। এই দূরত্ব, ভাই-বোনের এই কৃত্রিম সম্পর্ক সে আর সহ্য করতে পারছে না। আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তার মা-বাবার কাছে গিয়ে আজই সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আবদারটা রাখবে। যেভাবেই হোক, তুলিকে তার নিজের করতেই হবে। জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা হিসেবে তুলিকে নিজের ছায়ায় বেঁধে ফেলার সময় এসে গেছে।

সন্ধ্যার পর পুরো পরিবার যখন ড্রয়িংরুমের চা-চক্রের জন্য জড়ো হলো, রাফসান সোজা গিয়ে দাঁড়াল তার মা-বাবার সামনে। ঘরে বড় চাচা, বড় চাচি এবং তুলির বাবা- মা-ও উপস্থিত ছিলেন। তুলি দূরে দাঁড়িয়ে সবাইকে চা পরিবেশন করছিল।

রাফসান অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আম্মা, আব্বা... আমি আপনাদের কাছে আজকে কিছু চাইতে এসেছি।"

বড় চাচা হেসে বললেন, "বল রাফসান, তোর আবার চাওয়া কী? তুই যা চাস তাই তো পাস।"

রাফসান তুলির দিকে একপলক তাকাল। তুলি তখন চায়ের কাপ হাতে একদম জমে দাঁড়িয়ে আছে। রাফসান মা-বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, "আমি তুলিকে বিয়ে করতে চাই। আজই ওর বয়স আঠারো হয়েছে। আমি আর দেরি করতে চাই না।"

কথাটা যেন ঘরে এক বিশাল বোমা ফাটিয়ে দিল। পরিবেশটা এক মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল।

রাফসানের মুখের কথাটা শোনার পর ড্রয়িংরুমে যেন এক মহাশূন্যের নীরবতা নেমে এলো। চা ছাঁকতে থাকা তুলির হাতটা কেঁপে উঠল, হাতের চায়ের কাপটা ট্রে-র ওপর পড়ে একটা সশব্দ টুং শব্দ তৈরি করল। তুলি অপলক চোখে রাফসানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কান দুটো ভোঁ ভোঁ করে বাজছে, বুকের ভেতরে কে যেন একটানা হাতুড়ি পিটিয়ে চলেছে। রাফসান কী বলছে এসব? বিয়ে? সে তো রাফসানকে সারাজীবন শুধু নিজের বড় ভাই এবং এক পরম আতঙ্কের নাম বলেই জেনে এসেছে।

বড় চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে রাফসানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, "রাফসান, তুই কী বলছিস জানিস? তুলি তোর ছোট বোন, ও সবেমাত্র আঠারোয় পা দিল। আর তুই তো ওর চেয়ে অনেক বড়। হুট করে এসব কথার মানে কী?"

রাফসান তার জায়গায় একদম অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চেহারায় একবিন্দু দ্বিধা নেই। সে অত্যন্ত শান্ত অথচ বরফের মতো কঠোর গলায় বলল, "আমি খুব ভেবেচিন্তেই বলছি, আব্বা। আমি তুলিকে ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করি। ওকে ছাড়া আমি অন্য কোনো মেয়ের কথা ভাবতেও পারি না। তুলি আমার চাচাতো বোন, আমাদের পরিবারেই তো সব কথা পাকা হতে পারে। আমি আজকে কোনো অনুরোধ করতে আসিনি, আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাতে এসেছি।"

রাফসানের মা অর্থাৎ বড় চাচি ছেলের দিকে তাকালেন। রাফসান তাদের একমাত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই রাফসান যা চেয়েছে, কোনো না কোনোভাবে তা আদায় করেই ছেড়েছে। তার মেজাজ আর একগুঁয়েমির কথা পরিবারের সবাই জানে। চাচি তুলির মা-বাবার দিকে তাকালেন। তুলির বাবা কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু রাফসানের বাবার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলেন না। রাফসান যে কতটা জেদী এবং একই সাথে পুরো পরিবারের দায়িত্ব কীভাবে এক হাতে সামলায়, তা তাদের অজানা নয়।

তুলির মা ধীরস্বরে বললেন, "কিন্তু রাফসান, তুলির তো সবে এইচএসসি পরীক্ষা সামনে... ও তো এখনো অনেক ছোট, বিয়ে বোঝার মতো বয়স কি ওর হয়েছে?"

"ওকে কিছু বুঝতে হবে না," রাফসান একদম স্পষ্ট গলায় কেটে কেটে বলল, "ওর খেয়াল রাখার জন্য আমি আছি। পড়ালেখা ও বিয়ের পরেও করতে পারবে, আমি কোনো বাধা দেব না। কিন্তু ওকে আমি আমার স্ত্রী হিসেবে চাই, আর সেটা খুব জলদি।"

তুলির আর সহ্য হলো না। তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে আর একমুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে চলে গেল। ঘরে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে সে বিছানায় মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করল। ভীতি আর আতঙ্কে তার পুরো শরীর রি রি করে কাঁপছে। রাফসান মানুষটাকে সে এমনিতেই বাঘের মতো ভয় পায়। সেই মানুষটার সাথে একই ঘরে, এক বিছানায় থাকার কল্পনা করতেই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে কীভাবে এই মানুষটাকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নেবে?

পরের কয়েকটা দিন তুলির জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর মতো কাটল। পরিবারে রাফসানের জেদের কাছে সবাই শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করল। বড় চাচা তুলির বাবাকে বুঝিয়ে বললেন, "রাফসান ছেলে খারাপ না। একটু জেদী হতে পারে, কিন্তু তুলিকে ও রাজরানীর মতো রাখবে। বাইরের কোথাও না দিয়ে নিজেদের মেজ ছেলের হাতেই মেয়েকে তুলে দেওয়া ভালো।" তুলির বাবা-মাও রাফসানের প্রতিপত্তি, ব্যক্তিত্ব আর খেয়াল রাখার ক্ষমতা দেখে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন। তুলির কান্নাকাটি বা কোনো আকুতি পরিবারের কারোর কান পর্যন্ত পৌঁছাল না। একটা ছোট মেয়ের আবেগ পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।

বিয়ের দিনটি দেখতে দেখতে চলে এলো। কোনো জাঁকজমক ছাড়াই খুব ঘরোয়া আয়োজনে কাজি ডেকে বিয়ের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলো।

তুলির গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটা গাঢ় লাল রঙের বেনারসি শাড়ি। ভারী অলংকার আর মেকআপের আড়ালে তুলির মুখটা পাণ্ডুর দেখাচ্ছে। কাজির সামনে বসে যখন তাকে 'কবুল' বলতে বলা হলো, তুলির গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল গলার কাছে বড় একটা পাথর আটকে গেছে। কিন্তু পাশে বসে থাকা রাফসানের সেই তীক্ষ্ণ, স্থির দৃষ্টি সে অনুভব করতে পারছিল। রাফসান যেন নিঃশব্দে তাকে চেপে ধরে আছে। শেষ পর্যন্ত অতি কষ্টে, কান্নাভেজা গলায় তুলি তিনবার বলল, "কবুল।"

বিয়ে শেষ হতেই তুলিকে রাফসানের আলো ঝলমলে বড় রুমটাতে নিয়ে আসা হলো। ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে খাটটা। কিন্তু তুলির কাছে এই সুসজ্জিত ঘরটাকে একটা বড় খাঁচার মতো মনে হচ্ছে।

সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তুলি খাটের এক কোণে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। তার চোখের জল থামছেই না। মেকআপ ধুয়েমুছে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তার ছোট বুকটা হাঁসের মতো ওঠানামা করছে। ভয়, অজানা আতঙ্ক আর এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সে বাচ্চাদের মতো হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে এনে তাতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

রাত তখন অনেক। দরজার নক করার শব্দ হলো এবং ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করল রাফসান। তার পরনে হালকা রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি। দরজাটা পেছন থেকে লক করার শব্দ হতেই তুলির শরীর শক্ত হয়ে গেল।

রাফসান ধীর পায়ে হেঁটে খাটের দিকে এগিয়ে এলো। লাল বেনারসিতে মোড়ানো, কুঁকড়ে বসে থাকা ছোট তুলির দিকে তাকাতেই রাফসানের বুকে ভালোবাসার এক উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ল। কিন্তু একই সাথে তুলির এই অবুঝ কান্নাকাটি আর দূরে সরে থাকার প্রবণতা তাকে ভেতর থেকে প্রচণ্ড অধৈর্য করে তুলছিল।

রাফসান খাটের একদম কিনারায় এসে দাঁড়াল। তুলির দিকে তাকিয়ে বেশ নিচু গলায় বলল, "তুলি, কেঁদো না। এবার কান্নাটা থামাও।"

কিন্তু তুলি রাফসানের কথা শোনাই দূরে থাক, রাফসানের কণ্ঠ শুনে ভয়ে আরও জোরে ফুঁপিয়ে উঠল। সে হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে অবুঝ বাচ্চার মতো হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদতে লাগল। যেন তার সামনে কোনো ভালোবাসার মানুষ নয়, কোনো হিংস্র শিকারি দাঁড়িয়ে আছে।

"তুলি, আমি তোকে শান্ত হতে বলছি!" রাফসানের গলার স্বরে এবার সামান্য ধমকের সুর ফুটে উঠল। সে চেয়েছিল আজ অন্তত শান্তভাবে তুলির কাছাকাছি আসতে, কিন্তু তুলির এই কান্না তার ভেতরের সমস্ত ধৈর্যকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিচ্ছে।

ধমক শুনে তুলির কান্না থামল তো না-ই, বরং সে আরও বিকট শব্দে কেঁদে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, "আমাকে আমার মার কাছে যেতে দাও... আমি এখানে থাকব না... আমি তোমাকে ভয় পাই!"

রাফসানের মেজাজ আর নিয়ন্ত্রণে রইল না। আঠারো বছর ধরে চেপে রাখা আবেগ, ভালোবাসা আর এই অবহেলার ধাক্কা এক হয়ে তার রক্ত গরম করে দিল। তার চোখের রঙ লাল হয়ে উঠল।

রাফসান এক ঝটকায় খাটে উঠে বসল। তুলির দু হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিজের দিকে টানল।

"তোকে থামতে বলেছি না আমি?!"

কথাটা শেষ করেই রাফসান আর কোনো সুযোগ দিল না। সে ঝুঁকে পড়ে তুলির গোলাপের মতো নরম, কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের মধ্যে পিষে ফেলল। সে এক অতৃপ্ত, হিংস্র আর অনিয়ন্ত্রিত চুম্বন। রাফসান এত জোরে তুলির ঠোঁট চেপে ধরল যে, মনে হলো সে এখনই তুলির ঠোঁটের ভেতরের কোমল চামড়া ছিঁড়ে তুলে ফেলবে। তুলি ছটফট করে উঠল, সে রাফসানের শক্ত বুকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু রাফসানের বিশাল শরীরের সামনে তার সেই চেষ্টা ছিল একেবারে খড়কুটোর মতো অর্থহীন।

রাফসানের সেই হিংস্র স্পর্শে তুলির দম যেন আটকে এল। ঠোঁটের তীব্র জ্বালা আর ব্যথায় তার চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। রাফসান যখন অবশেষে তার ঠোঁট ছাড়ল, তখন তুলির ঠোঁট কেটে হালকা রক্তের স্বাদ ছড়িয়ে পড়েছে। তুলি ব্যথায় দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে খাটের এক কোণে সরে যেতে চাইল।

"কেঁদো না বলতে পারছি না তোকে?" রাফসান তুলির দিকে এগিয়ে এসে আবার কঠিন সুরে বলল।

কিন্তু তুলি বাচ্চার মতো হাত-পা সংকুচিত করে হাঁপাতে হাঁপাতে কেঁদেই চলল। সে কোনোভাবেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না। রাফসানের এই রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। এই কঠোরতা আর আধিপত্য তাকে আতঙ্কের চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছিল।

তুলির কান্না না থামায় রাফসানের ভেতরের অধৈর্য এবার আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে তুলির চিবুক শক্ত করে চেপে ধরল। আবার ঝুঁকে পড়ে আগের চেয়েও গভীর, কিন্তু এবার খানিকটা ধীর ও শক্তভাবে তুলির কেটে যাওয়া ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল। ক্ষণিকের তীব্র কামড়ে তুলি আঁতকে উঠল, শব্দ করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলল।

রাফসান তুলির ঠোঁট ছেড়ে তার খুব কাছাকাছি নিজের মুখ এনে থামল। তাদের দুজনের উত্তপ্ত নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে।

রাফসান একদম ফিসফিস করে, কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল, "এবার যদি আর একটা ছোট শব্দও করেছিস, তোকে আমি একদম কাঁচা খেয়ে ফেলব! তুই জানিস না আমি তোকে পাওয়ার জন্য কত বছর অপেক্ষা করেছি? কত রাত তোকে না পাওয়ার যন্ত্রনায় ছটফট করেছি? কত হাজার বার তোকে একটু কাছে পেতে চেয়েছি! আজ সেই দিন এসেছে, আর তুই বাচ্চার মতো কাঁদছিস?"

তুলি কাঁপা কাঁপা গলায়, ভীতিভরা চোখে রাফসানের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বলল, "কিন্তু... আমি তো আপনাকে কোনোদিন ওভাবে দেখিনি... আপনি তো আমার বড় ভাই... আমি আপনাকে অনেক ভয় পাই..."

রাফসানের চোখে এক অদ্ভুত উন্মাদনা ভেসে উঠল। সে তুলির কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল, "তুই দেখিসনি, কিন্তু আমি দেখেছি। তুই যখন একদম ছোট ছিলি, পুতুল নিয়ে খেলতি, তখন থেকেই তুই শুধু আমার। তোকে দেখে আমার ভেতরে কী হতো, তা বোঝার মতো ক্ষমতা তোর কখনোই ছিল না। আর ভাই? ওই সম্পর্ক আমি কোনোদিন মানিনি, তুলি। তুই আমার বউ, আমার আমৃত্যু অধিকার।"

কথাগুলো বলতে বলতে রাফসান তুলির কপালে একটা দীর্ঘ ও গভীর চুম্বন আঁকল। তুলি আর প্রতিবাদ করার মতো শক্তি পাচ্ছিল না। সারাদিনের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, ভীতি আর রাফসানের এই অপ্রতিরোধ্য তীব্রতার সামনে সে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল।

রাফসান খাটে শুয়ে পড়ে তুলির ছোট শরীরটাকে একহাতে নিজের শক্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তুলি ভয়ের চোটে শক্ত হয়ে রইল, কিন্তু রাফসানের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পেল। মানুষটার ভেতরের ভালোবাসার তীব্রতা আজ যেন ওকে ভেতর থেকে ভেঙে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

তুলি কাঁদতে কাঁদতেই একসময় ক্লান্ত হয়ে রাফসানের বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

রাফসান কিন্তু ঘুমাল না। সে অন্ধকারের মধ্যে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তুলির নিষ্পাপ, মায়াবী মুখটার দিকে। কান্নার কারণে তুলির চোখের পাতা দুটো ফুলে গেছে, ঠোঁটটা লাল হয়ে ফুলে আছে। রাফসান আলতো করে আঙুল দিয়ে তুলির ঠোঁটের কোণের রক্তটুকু মুছে দিল।

তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল। সে মনে মনে বলল, "তোর কি একটুও অনুভূতি নেই, তুলি? তুই কবে বুঝবি আমি তোকে কতটা ভালোবাসি? তোর এই ভয়টা আমি কীভাবে কাটাব?"

রাফসান তুলির গায়ে কাঁথাটা ভালোভাবে টেনে দিয়ে ওকে আরও আঁকড়ে ধরে চোখ বন্ধ করল।

পরের কয়েকটা দিন তুলির দিনকাল কাটল এক অদ্ভুত নিয়মের মধ্য দিয়ে। সে বাড়ির সব কাজ ঠিকঠাক করত, কিন্তু রাফসানের সামনে এলেই কেমন যেন জড়সড় হয়ে যেত। রাফসান যা বলত, তুলি একদম বাধ্য মেয়ের মতো তা মেনে নিত। রাফসান কোথায় যেতে বলছে, কী পরতে বলছে—সবকিছুতেই তুলির অনুগত সায় ছিল। কিন্তু সেই সায়ের পেছনে ভালোবাসার চেয়ে ভয়ের পাল্লাটাই ভারী ছিল।

রাফসান প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে তুলির জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসত। কখনো দামি শাড়ি, কখনো তুলির পছন্দের চকোলেট, আবার কখনো গয়না। তুলি সেগুলো চুপচাপ হাত পেতে নিত, কিন্তু তার চোখে কোনো আনন্দের ঝলক দেখা যেত না। রাফসান খুব খেয়াল রাখত তুলির—সে সময়মতো খাচ্ছে কিনা, তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। কিন্তু তুলির এই শীতল নীরবতা আর দূর থেকে ভয় পাওয়াটা রাফসানের বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধত।

একদিন রাতের ঘটনা। রাত তখন প্রায় একটা বাজে। পুরো বাড়ি নিঝুম হয়ে গেছে। তুলি বিছানায় বসে রাফসানের জন্য অপেক্ষা করছিল। ইদানীং রাফসানের ফিরতে দেরি হলে তুলি না ঘুমিয়ে জেগে থাকে, কারণ রাফসান এসে তাকে না দেখলে রেগে যায়।

হঠাৎই দরজার লক খোলার শব্দ হলো। তুলি চমকে উঠে দাঁড়াল।

রাফসান ঘরে ঢুকতেই তুলির নজর গেল তার মুখের দিকে। রাফসানের পরনের শার্টের ওপরের বোতাম দুটো খোলা, চুলগুলো উসকোখুসকো। আর সবচেয়ে বড় কথা—তার কপালে একটা জায়গায় বেশ খানিকটা কেটে গেছে, সেখান থেকে শুকনো রক্তের দাগ গাল বেয়ে নিচে নেমে এসেছে।

রাফসানের ওই অবস্থা দেখে তুলির বুকের ভেতরটা একমুহূর্তে মোচর দিয়ে উঠল। এতদিনের জমাট বাঁধা ভয়টা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। তুলি একপ্রকার পাগলের মতো দৌড়ে রাফসানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

"কী হয়েছে আপনার?!" তুলির গলায় তীব্র আকুলতা আর ভয় ফুটে উঠল, "কপালে ওভাবে আঘাত লাগল কীভাবে? এত রক্ত কেন আপনার মুখে?!"

তুলি অধৈর্য হয়ে রাফসানের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ দুটি আবার পানিতে ভরে উঠল, তবে এবার ভয়ের জল নয়—এ যেন এক অজানা ব্যাকুলতা।

রাফসান ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়ে বলল, "কিছু হয়নি। গাড়িটা একটু ফাস্ট ড্রাইভ করছিলাম, নিচু আইল্যান্ডের সাথে লেগে গেছে।"

"কিছু হয়নি মানে?!" তুলি প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, "আপনি নিজের খেয়াল রাখতে পারেন না? এতটা খামখেয়ালী কেউ হয়?!"

তুলি আর একমুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এল। সে রাফসানের খুব কাছাকাছি বসে তুলো আর অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে রাফসানের কপালের রক্ত সাবধানে মুছতে শুরু করল। তুলির হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল। সে খুব আলতো করে মলম লাগিয়ে দিয়ে কপালে একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিল।

পুরোটা সময় রাফসান একপলক না ফেলে শুধু তুলির দিকে তাকিয়ে রইল। তুলির মুখের ওই ব্যাকুলতা, তার চোখের জল আর তার কোমল হাতের স্পর্শ—রাফসানের বুকের ভেতরের সব যন্ত্রণা যেন এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ করে দিল। রাফসান বুঝতে পারল, ভয়ের আড়ালে কোথাও হয়তো অনুভূতির একটা ছোট বীজ বুনতে শুরু করেছে।

পরদিন সকাল থেকেই একটা পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠল। তুলি যখন রাফসানের কপালের ব্যান্ডেজটার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল, তখন রাফসানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। রাফসান খেয়াল করল, তুলি এখন আর আগের মতো সারাক্ষণ চোখ নামিয়ে রাখে না। তুলির সেই ভীতিভরা দৃষ্টির মাঝে এখন যেন একধরনের সূক্ষ্ম কৌতূহল আর উদ্বেগের ছায়া খেলা করে।

খাবারের টেবিলে বসার পর তুলি নিজে থেকেই রাফসানের প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। রাফসান যখন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তুলি দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু পর্যবেক্ষণ করছিল রাফসানের হাঁটাচলা। কপালটা কি এখনো ব্যথা করছে? ওষুধ কি ঠিকমতো খেয়েছে? এই প্রশ্নগুলো তুলির মনে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু মুখে ফুটিয়ে তোলার সাহস পাচ্ছিল না।

রাফসান অফিসে চলে যাওয়ার পরও তুলির মন শান্ত হলো না। সে সারাটা দিন ঘরের কাজে মন দিতে পারল না। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতে তাকাতে তার দিন কাটল। রাফসান প্রতিদিনের মতোই সন্ধ্যায় ফিরে এলো। কিন্তু আজ আর তুলি আগের মতো চমকে উঠে এক কোণে লুকিয়ে পড়ল না। সে দূর থেকেই রাফসানের কপালের ব্যান্ডেজটার দিকে একবার চোখ বোলাল।

দিন কয়েক এভাবেই কেটে গেল। রাফসানের কপালের ক্ষতটা আস্তে আস্তে শুকাতে শুরু করেছিল।

রাত তখন সাড়ে বারোটা। চারপাশ একদম থমথমে নীরব। রাফসান ঘরের কোণে পড়ার টেবিলে বসে ল্যাপটপে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অফিশিয়াল কাজ করছিল। ল্যাপটপের নীলচে আলো এসে পড়েছে তার ধারালো মুখে। তার কপালে এখনো হালকা কাটা দাগ স্পষ্ট।

তুলি অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল। তার ঘুম আসছে না। সে চোখ তুলে তাকাল রাফসানের দিকে। কাজের ঘোরে রাফসান হয়তো খেয়ালই করছে না যে তার ক্ষতটা কেমন আছে।

তুলি আস্তে করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পায়ে পায়ে অতি সাবধানে হেঁটে রাফসানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। রাফসান ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটানা টাইপ করে যাচ্ছিল। তুলি আস্তে করে হাত বাড়াল। তার ইচ্ছা ছিল রাফসানের কপালটা আলতো করে ছুঁয়ে দেখা—কাটা জায়গাটা ঠিকমতো শুকিয়েছে তো?

তুলির আঙুল যখন রাফসানের কপালের একদম কাছাকাছি, ঠিক তখনই রাফসান চট করে তুলির হাতের কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তুলি চমকে উঠে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু রাফসানের দখল ছিল বেশ মজবুত।

রাফসান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তুলির দিকে তাকাল। তার চোখে এক গভীর, প্রশ্নাতুর দৃষ্টি।

"কী দেখছিস?" রাফসান বেশ নিচু অথচ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।

তুলি থতোমতো খেয়ে গেল। তার বুকের ভেতর আবার সেই পরিচিত ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে। সে মুখ নিচু করে বলল, "কচ্ছপ... আই মানে, কিছু না। এমনি..."

তুলি হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই রাফসান আলতো করে ছেড়ে দিল। তুলি দ্রুত দু-পা পিছিয়ে গেল এবং ঘরে থাকা ড্রেসিং টেবিলের দিকে চলে গেল। সে দর্পণ বা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া কান জোড়া ঢাকার চেষ্টা করছিল।

রাফসান মুহূর্তের মধ্যে ল্যাপটপের কভারটা সশব্দে বন্ধ করে দিল। ঘর জুড়ে একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।

রাফসান চেয়ার ছেড়ে উঠল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তুলির দিকে। তুলি পেছনে থেকে পদশব্দ পেয়ে আয়নার দিকে তাকিয়েই জমে গেল। রাফসান এসে ঠিক তুলির পেছনে দাঁড়াল। তার বিশাল চওড়া শরীরটা দিয়ে সে যেন পুরো আয়নাটাকে ঢেকে ফেলেছে।

পরের মুহূর্তেই রাফসান দুই হাত বাড়িয়ে তুলির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। তুলির পিঠ এসে ধাক্কা খেল রাফসানের চওড়া বুকে।

তুলির নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে রাফসানের হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠল, কিন্তু এবার সে রাফসানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল না।

রাফসান তার মুখটা তুলির ঘাড়ে গুঁজে দিল। উত্তপ্ত নিশ্বাস এসে আছড়ে পড়ছে তুলির সেনসিটিভ ত্বকে।

"তুই আমায় ভালোবাসিস, তুলি?" রাফসানের কণ্ঠটা আজ আর কোনো আদেশের মতো শোনাল না, শোনাল এক আকুল প্রার্থনার মতো। "আমায় কি তুই মন থেকে মেনে নিয়েছিস?"

তুলি কোনো উত্তর দিল না। সে নিচ ঠোঁট চেপে ধরে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল।

রাফসান তুলিকে নিজের দিকে ঘোরাল। এখন দুজন দুজনের মুখোমুখি। রাফসানের চোখের কোণে আজ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা, আঠারো বছর ধরে জমিয়ে রাখা চাওয়ার অপূর্ণতা যেন সেখানে ভেসে উঠছে।

"আর আমায় কষ্ট দিস না, প্লিজ," রাফসান একদম ভেঙে পড়া গলায় বলল। "বল আমায়। আমি আর পারছি না, কলিজা। বিয়ের পর একই ঘরে থেকে, তোকে এভাবে নিজের পাশে পেয়েও এত দূরত্বে রাখা আমার জন্য অনেক কষ্টের হয়ে যাচ্ছে। আজ তোকে বলতেই হবে... তোর মনে আমার জন্য কী আছে?"

তুলির চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। এতদিন ধরে বুকের ভেতরের ভীতি, বিভ্রান্তি আর ইদানীং জন্মানো অনুভূতির যে লড়াই চলছিল, তা একমুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটাকে সে আর শুধু ভয় পায় না—তার খেয়াল রাখা, তার প্রতি ব্যাকুলতা সবই ছিল ভালোবাসারই এক নামহীন প্রকাশ।

তুলি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সামনে এগিয়ে গিয়ে রাফসানের গলার কাছে দুই হাত জড়িয়ে ধরে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের পুরো শরীরটা সে সঁপে দিল রাফসানের বুকে।

রাফসান একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপরই তার ঠোঁটে ফুটে উঠল জীবনের সবচেয়ে নিখাদ, আনন্দময় হাসি। সে বুঝে গেল তুলির নীরব উত্তর। সে তুলির এই আত্মসমর্পণকে খুব আপন করে গ্রহণ করল।

রাফসান তুলিকে কোলপাঁজা করে তুলে খাটের দিকে নিয়ে গেল। আলতো করে তাকে ফুলছড়ানো বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল।

"আজ আমায় একটু সুযোগ দে, তুলি," রাফসান পরম সোহাগে তুলির গাল দুটো ধরে বলল, "তোকে এত ভালোবাসা দেব আমি যে তুই পাগল হয়ে যাবি, আমার কলিজা..."

তুলি লাজুক চোখে শুধু রাফসানের দিকে তাকিয়ে রইল। রাফসান ঝুঁকে পড়ে তুলির কপালে, গালে এবং শেষে ঠোঁটে একে দিল এক অতল, প্রেমময় চুম্বন। কিন্তু এবারের চুম্বনে কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল না কোনো জোরজবরদস্তি—ছিল শুধুই বছরের পর বছর ধরে জমা রাখা ভালোবাসার অম্লান মাধুর্য। সেই রাতে দুটো মন অবশেষে এক সুতোয় বাঁধা পড়ল।

সেই রাতের পর থেকে তুলি আর রাফসানের সম্পর্কের সমীকরণটা পুরোপুরি বদলে গেল। এতদিন যে ঘরটাতে তুলির জন্য ভয়ের পাহাড় জমে থাকত, এখন সেই ঘরটাই তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। রাফসান এখন আর আগের মতো সেই শক্ত, গাম্ভীর্যপূর্ণ রাফসান নেই; অন্তত তুলির সামনে এসে সে যেন এক অন্য মানুষ।

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলেই তুলি দেখে, রাফসান একপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তুলির কপালে আলতো করে চুমু খাওয়াটা এখন রাফসানের এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর তুলিও আর সেই ভয় পাওয়া ছোট মেয়েটি নেই। সে পরম স্নেহে আর আদরে সংসারটা গুছিয়ে নিচ্ছে, রাফসানের প্রতিটা ছোটখাটো বিষয়ের খেয়াল রাখছে। তাদের মধ্যের ভালোবাসার বন্ধনটা দিনে দিনে আরও গাঢ় হয়ে উঠছিল।

সকাল সাড়ে এগারোটা। আজ রাফসানের পছন্দের কিছু পদ রান্না করার পরিকল্পনা করেছে তুলি। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে সে দেখল, রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটা বিশেষ মশলা আর কিছু তাজা সবজি ঘরে নেই।

তুলি ভাবল, বাজার তো আর বেশি দূরে নয়। হেঁটে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। রাফসানকে ফোন করে ডিস্টার্ব না করে সে নিজেই টুক করে বাজার থেকে ঘুরে আসতে পারে। তুলি গায়ে একটা সুতির চাদর জড়িয়ে নরমাল পায়ে হেঁটে স্থানীয় বাজারটার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষ করে তুলি যখন ফিরতি পথ ধরল, তখন দুপুর হয়ে এসেছে। গলিটা বেশ নির্জন ছিল। চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতায় ডুবে আছে।

হঠাৎই তুলির পেছনে একটা কালো রঙের মাইক্রোবাস এসে থমকে দাঁড়াল। গাড়ির দরজা খোলার বিকট শব্দ শুনে তুলি পেছনে তাকাতেই তার চোখ দুটো আতঙ্কে বড় হয়ে গেল। গাড়ি থেকে ৩-৪ জন বখাটে যুবক নেমে এল। তাদের চোখে-মুখে অসভ্য হাসি আর হিংস্রতা স্পষ্ট।

"আরে বাহ্! এই নির্জন রাস্তায় এমন সুন্দরী রূপসী কোত্থেকে এল?" এক বখাটে এগিয়ে এসে নোংরা ভঙ্গিতে বলল।

তুলি ভয়ে পিছাতে পিছাতে বলল, "আপনারা কে? আমার সামনে থেকে সরুন, নইলে আমি চিৎকার করব!"

"চিৎকার করে লাভ নেই সুন্দরী, এখানে তোকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই," অন্য একজন বখাটে হেসে উঠে এক ঝটকায় তুলির হাত শক্ত করে চেপে ধরল।

তুলি ব্যাকুল হয়ে হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, "ছেড়ে দিন আমাকে! রাফসান... রাফসান!"

কিন্তু বখাটেরা কোনো সুযোগ দিল না। তারা তুলির মুখে একটা ক্লোরোফর্ম ভেজানো রুমাল চেপে ধরল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল তুলির। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই লোকগুলো তাকে একপ্রকার চাদরচাপা দিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে দ্রুত চম্পট দিল।

দুপুরের পর থেকে রাফসানের মনটা কেমন যেন আনচান করছিল। অফিসে বসে কোনো কাজেই সে মনোযোগ দিতে পারছিল না। কোনো এক অজানা শঙ্কায় তার বুকের ভিতরটা তোলপাড় করছিল।

অবশেষে আর থাকতে না পেরে সে তুলির ফোনে কল দিল। কিন্তু ওপাশ থেকে রিং হয়ে কেটে গেল, কেউ ফোন তুলল না। রাফসান আরও দু-তিনবার চেষ্টা করল, কিন্তু ফলাফল একই। রাফসানের বুকের ভেতর ভয়ের সূক্ষ্ম কাঁটা বিঁধে উঠল। সে আর একমুহূর্ত দেরি না করে অফিসের সব মিটিং বাতিল করে সোজা গাড়ির চাবি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল দরজা খোলা, কিন্তু তুলি ঘরে নেই। শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, "তুলি তো একটু বাজারে গেল কিছু জিনিস কিনতে, কিন্তু এখনো তো ফিরল না!"

কথাটা শুনতেই রাফসানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তুলি একা বাজারে গেছে? আর এতক্ষণ ধরে ফিরছে না?

রাফসান পাগলের মতো বাজারে দৌড়ে গেল। আশেপাশের দোকানদারদের জিজ্ঞেস করতে করতে এক পান বিক্রেতা জানাল, সে একটু আগে একটা কালো গাড়িতে কয়েকজন ছেলেকে জোর করে একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছে।

রাফসানের মাথার রগ দুটো ফুলে উঠল। তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠল প্রচণ্ড রাগে। তার ভেতরের সুপ্ত হিংস্র বাঘটা যেন জেগে উঠল। যে তুলিকে সে বুকের ভেতর আগলে রেখেছে, তার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস কার হলো?

রাফসান তার পরিচিত কিছু লোক আর সোর্স ব্যবহার করে দ্রুত খবরাখবর নেওয়া শুরু করল। আধা ঘণ্টার মধ্যে সে জানতে পারল, শহরের অদূরে একটা পরিত্যক্ত পুরোনো গুদামে ওই লোকগুলোর আড্ডা।

রাফসান কোনো পুলিশের জন্য অপেক্ষা করল না। তার একটাই চিন্তা—তুলিকে বাঁচানো।

রাফসান একাই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে সেই অন্ধকার গুদামের সামনে এসে পৌঁছাল। গুদামের বিশাল কাঠের দরজাটা সে এক লাথিতে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল।

ভেতরে ঢুকেই তার চোখে পড়ল ভয়াবহ এক দৃশ্য।

ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে তুলি শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। তার জ্ঞান ফিরেছে, সে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে আর অঝোরে কাঁদছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চার-পাঁচজন বদমাইশ ছেলে।

রাফসানকে ঢুকতে দেখেই বখাটেদের সর্দার হেঁসে উঠল, "আরে! হিরো এসে গেছে! তোকেই তো খুঁজছিলাম।"

কিন্তু রাফসান কোনো কথা না বলে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। সে অন্ধের মতো দু-তিনজনকে পেটাতে শুরু করল। রাফসানের মারের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে দুজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু হঠাৎই পেছন থেকে একজন ভারী লোহার রড দিয়ে রাফসানের মাথার পেছনে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল।

রাফসান মাথা চেপে ধরে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তা দেখে বাকি শয়তানগুলো দল বেঁধে রাফসানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অতিরিক্ত আঘাত আর রক্তক্ষরণের কারণে রাফসান দুর্বল হয়ে পড়ল। বখাটেরা তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে একটি খুঁটির সাথে শক্ত লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলল।

"রাফসান! রাফসান!" তুলি চিৎকার করে কেঁদে উঠল, তার চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে।

রাফসান কোনোমতে মাথা তুলে রক্তমাখা চোখে তুলির দিকে তাকাল।

বখাটেদের সর্দারটা নোংরা হাসি হেসে তুলির খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। সে হাত বাড়িয়ে তুলির ওড়নাটা ধরে টান দেওয়ার উপক্রম করল।

তারপর রাফসানের দিকে তাকিয়ে বিকৃত কণ্ঠে বলল, "তোর খুব জোর, তাই না? আজ তোর চোখের সামনে, তোর হিরোগিরি চুলোয় পাঠিয়ে তোর এই সুন্দর বউটাকে নিয়ে আমরা সবাই মিলে মজা করব! দেখবি তুই, আর কিচ্ছু করতে পারবি না!"

"সুয়োরের বাচ্চারা! তোদের আমি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব! হাত সরা ওর ওপর থেকে!" রাফসান জানপ্রাণ দিয়ে চিৎকার করে উঠল, শিকল ছেঁড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। তার হাতের চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বের হতে শুরু করল, কিন্তু শিকল খুলল না।

সর্দারটা তুলির মুখের কাছে নিজের নোংরা হাতটা নিয়ে গেল। তুলি আতঙ্কে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।

তুলি আকুল হয়ে কান্নাজড়ানো গলায় চিৎকার করে উঠল, "নাااااা!"

ঠিক সেই মুহূর্তে—বিকট শব্দে গুদামের পেছনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল একদল সশস্ত্র পুলিশ।

"হ্যান্ডস আপ! সবাই নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে যাও, নইলে সোজা গুলি চালানো হবে!" সাইরেনের বিকট শব্দ আর পুলিশের কড়া আদেশে পুরো গুদাম থমকে গেল।

পুলিশ মুহূর্তের মধ্যে বদমাইশগুলোকে ঘিরে ফেলল এবং পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে বন্দুক ধরে সবাইকে গ্রেপ্তার করল।

একজন পুলিশ অফিসার দ্রুত এগিয়ে এসে রাফসানের গায়ের শিকল খুলে দিলেন। শিকল মুক্ত হতেই রাফসান নিজের ব্যথার কথা ভুলে গিয়ে দৌড়ে গেল তুলির দিকে। সে দ্রুত তুলির হাতের ও পায়ের দড়িগুলো খুলে দিল।

দড়ি খুলতেই তুলি একমুহূর্ত দেরি না করে লাফিয়ে গিয়ে রাফসানের শক্ত বুকে আছড়ে পড়ল। সে রাফসানের গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, "আমাকে ছেড়ে কোনোদিন যেও না... আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না!"

রাফসান রক্তাক্ত হাত দিয়েই তুলিকে নিজের বুকের ভেতর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুলির কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে সে ফিসফিস করে বলল, "আর কেউ কোনোদিন তোকে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে পারবে না, কলিজা। তুই শুধু আমার..."

....
👁 117