শালি সাহেবের প্রতিশোধ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে বকুল তলায় যখন লাল-নীল শাড়ির মেলা বসে, তখন অন্তু এক কোণে একটা সস্তা ডায়েরি হাতে বসে থাকত। তার পরনে থাকত সাধারণ ঢোলা শার্ট আর একটু পুরোনো প্যান্ট। চশমার কাঁচটা মাঝেমধ্যেই নাকের ডগা থেকে পিছলে নিচে নেমে যেত, আর সে বারবার আঙুল দিয়ে সেটা ওপরে তুলত। অন্তু ছেলেটা ভীষণ ভোলাভালা, একদম মাটির মানুষ। অতিরিক্ত সোজা কথা আর গোবাচারা স্বভাবের কারণে ক্যাম্পাসের অনেকেই তাকে নিয়ে আড়ালে-আবডাংশে হাসাহাসি করত। তবে অন্তুর নজর থাকত কেবল একজনের দিকেই—রিয়া।

রিয়া ছিল ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে আধুনিক আর স্মার্ট মেয়েদের একজন। ব্র্যান্ডেড পোশাক, নিখুঁত মেকআপ আর আভিজাত্যের এক অদ্ভুত তেজ ছিল তার মধ্যে। বন্ধুদের আড্ডায় রিয়ার উপস্থিত থাকা মানেই ছিল হাসির ঝরনাধারা। আর সেই হাসির মূল খোরাক অনেক সময়ই হতো বেচারা অন্তু।

"ওরে তোরা দেখ, আমাদের প্রফেসর সাহেবের প্রিয় পাত্র কীভাবে হাঁটছে! যেন প্যান্টের নিচে স্প্রিং লাগানো," রিয়ার ক্যানটিনে বসে বলা এমন একটা কথায় টেবিলজুড়ে একরাশ হাসির রোল উঠত। অন্তু সেসব দূর থেকে শুনত, চশমাটা আর একবার ঠিক করে নিয়ে একটু বোকা বোকা হাসি উপহার দিত। তার মনে কোনো রাগ বা ক্ষোভ জমে থাকত না। কারণ, রিয়ার ওই চঞ্চল চোখ আর খিলখিল হাসির প্রেমে সে তখন হাবুডুবু খাচ্ছে।

ডিপার্টমেন্টের যেকোনো সেমিনারে বা নোট আদান-প্রদানে অন্তু এগিয়ে যেত রিয়াকে সাহায্য করতে। রিয়া হয়তো মুখ বাঁকিয়ে বলত, "তোমার এই হাতের লেখা পড়তে গিয়ে তো আমার চশমার পাওয়ার বেড়ে যাবে অন্তু!" অন্তু তবু বিন্দুমাত্র কিছু মনে না করে বাধ্য ছেলের মতো বলত, "তাহলে আমি কি পরিষ্কার করে আরেকবার লিখে দেব রিয়া?" রিয়ার বন্ধুরা আবার হেসে উঠত, কিন্তু অন্তুর মনে ছিল এক গভীর অনুরাগের জন্ম। অন্তু জানত সে রিয়ার মতো ঝলমলে রূপসী নয়, তবুও মন তো আর হিসেব-নিকেশ মেনে চলে না।

এমএসসির শেষ বর্ষের শেষের দিকের ঘটনা। ডিপার্টমেন্টাল ফেয়ার শেষ হওয়ার পর টিএসসির পেছনে তখন ভিড় বেশ পাতলা হয়ে এসেছে। আবছা আলো-ছায়ার মাঝে অন্তু বুকভরা ভয় আর গলায় একরাশ তোতলানো নিয়ে রিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

"রিয়া, তোমার সাথে একটু কথা ছিল," অন্তুর গলার আওয়াজ কাঁপছিল।

রিয়া পাশে দাঁড়ানো বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হেসে বলল, "কী ব্যাপার অন্তু? নতুন কোনো স্পেশাল ক্লাসের নোট এনেছ নাকি?"

অন্তু হাত দুটো পেছনে লুকিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর নিজের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বলল, "না... নোট না। আমি আসলে অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলতে চাইছিলাম। আমি জানি আমি তোমার যোগ্য নই, কিন্তু... কিন্তু আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রিয়া। তুমি কি আমার সাথে জীবনটা কাটাবে?"

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা যেন থমকে গেল। রিয়ার বান্ধবীদের মুখের হাসি হাওয়া হয়ে গেল, আর রিয়ার মুখটা অপমানে আর রাগে লাল হয়ে উঠল। এতগুলো মানুষের সামনে এই গোবাচারা, ক্ষ্যাত টাইপের ছেলেটা তাকে প্রস্তাব দেওয়ার দুঃসাহস দেখাল!

"তোমার এত বড় সাহস কীভাবে হলো অন্তু?" চিৎকার করে উঠল রিয়া। আর কিছু বোঝার আগেই সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল অন্তুর গালে।

চড়ের শব্দটা যেন ফাঁকা প্রাঙ্গণে প্রতিধ্বনি তৈরি করল। অন্তু গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিয়া কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, "নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছ কখনো? আমার ধারেকাছে আসার যোগ্যতাও তোমার নেই। আজকের পর থেকে আর কখনো আমার সামনে আসবে না, মনে থাকবে?"

রিয়া সগর্বে পা চালিয়ে তার বন্ধুদের নিয়ে সেখান থেকে হেঁটে চলে গেল। আর অন্তু নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল টিএসসির সেই ফাঁকা মাঠে, চোখে একফোঁটা নোনা জল নিয়ে।

টিএসসির মাঠের সেই অপমানের রাতটির পর থেকে অন্তু যেন একপ্রকার উধাও হয়ে গেল। ক্লাস বা ল্যাবে দু-একদিন দূর থেকে তাকে দেখা গেলেও সে কখনোই আর রিয়ার ছায়া মাড়ায়নি। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতেই যার যার পথ আলাদা হয়ে গেল।

দেখতে দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে কেটে গেল তিন-তিনটি বছর।

এই তিন বছরে রিয়ার জীবন অনেকটাই একইরকম কেটেছে। একটা ভালো প্রাইভেট কোম্পানিতে মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরি, ব্র্যান্ডের জামাকাপড়, আর সপ্তাহান্তের ঝকঝকে পার্টি—সব মিলিয়ে রিয়া তার সেই আগের আধুনিক ও অহংকারী রূপেই বিদ্যমান। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুদের দলটাও আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে আসছিল। সবাই যে যার জীবনে ব্যস্ত, অনেকেই বিয়েথা করে সংসার গোছাচ্ছে।

রিয়ার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিল তানিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তাদের গলায় গলায় ভাব। একদিন বিকেলে অফিসে বসে কাজ করার সময় তানিয়ার ফোন এল রিয়ার মোবাইলে।

"হ্যালো রিয়া! কোথায় তুই? জলদি বল, একটা বিরাট সুখবর আছে!" তানিয়ার গলায় একরাশ উত্তেজনা।

রিয়া কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে হালকা হেসে বলল, "কী সুখবর রে? তোর প্রমোশন হলো নাকি?"

"আরে না রে গাধা! প্রমোশন নয়, তার চেয়েও বড় খবর। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!" তানিয়া একনিশ্বাসে বলে উঠল।

রিয়া ফোনটা কানের কাছে আরও শক্ত করে ধরে খুশিতে চিৎকার করে উঠল, "বলিস কী! সত্যি? তা বরটি কে? নাম কী, করে কী? আমরা চিনি তাকে?"

তানিয়া ওপাশ থেকে কিছুটা রহস্যময় হেসে বলল, "তুই চিনিস কিনা তা সারপ্রাইজ! ছেলে অত্যন্ত সাকসেসফুল। কয়েক বছর আগে বিদেশে গিয়ে পিএইচডি আর বিজনেসে বেশ নাম করে দেশে ফিরেছে। এখন ঢাকাতেই নিজের মেইন ব্রাঞ্চ খুলছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, ও কিন্তু দেখতে জাস্ট ড্যাম হ্যান্ডসাম! তুই সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাস করবি না।"

"বাহ! তোর তো কপাল খুলে গেল দেখছি। কবে দেখা করাচ্ছিস তোর সেই রাজকুমারের সাথে?" রিয়া কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।

"সেইজন্যই তো তোকে ফোন করা!" তানিয়া উৎসাহ নিয়ে বলল, "কাল বিকেলে তোর ছুটি আছে না? আমরা বিয়ের কেনাকাটার জন্য বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে যাচ্ছি। ও-ই আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে। আমি ওকে বলেছি যেন আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকেও সাথে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। তুই কাল ৩টের মধ্যে রেডি থাকবি, ও আমাদের গাড়ি নিয়ে পিক করবে।"

রিয়া একপায়ে রাজি হয়ে গেল। বান্ধবীর হবু বরকে দেখার একটা কৌতূহল তো ছিলই, তার ওপর শপিংয়ের কথা শুনলে রিয়া এমনিতেও না করতে পারে না।

পরদিন বিকেল সাড়ে তিনটা। বসুন্ধরা সিটির সামনের পার্কিং এলাকাটায় দাঁড়িয়ে ছিল রিয়া আর তানিয়া। রিয়ার পরনে ছিল জলপাই রঙের একটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস, চোখে দামি রোদচশমা। তানিয়া বারবার ঘড়ি দেখছিল আর অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল।

"তোর হবু বর কিন্তু বেশ লেট করাচ্ছে তানিয়া," রিয়া চশমাটা মাথার ওপর তুলে একটু বিরক্তির সুরে বলল।

"আরে এই তো চলে এসেছে!" তানিয়া সামনের দিকে হাত উঁচিয়ে ইশারা করল।

একটা চকচকে কালো রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ এসে ঠিক তাদের সামনে এসে থামল। গাড়ির গ্লাসগুলো এতই ডার্ক ছিল যে ভেতর থেকে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। ড্রাইভারের পাশের দরজা খুলে একজন ছিপছিপে গড়নের, সুট-টাই পরা সুপুরুষ ড্রাইভার নেমে পেছনের দরজাটা খুলে দিল।

গাড়ি থেকে নেমে এলেন এক তরুণ। পরনে ফিটেড নেভি ব্লু ব্লেজার, নিখুঁত ছাঁটের চুল, চোখে দামি ব্র্যান্ডের রোদচশমা আর মুখে এক আত্মবিশ্বাসী, মৃদু হাসি। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই যেন এক রাজকীয় ভাব ফুটে উঠছিল। তার হাতের দামি ঘড়িটা বিকালের রোদে ঝিলমিক করে উঠল।

রিয়া কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটিকে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠল। অত্যন্ত পরিচিত, অথচ একদম অচেনা এক অনুভূতি।

তরুণটি রোদচশমাটা খুলে ব্লেজারের পকেটে গুঁজে রাখল। আর তখনই রিয়ার চোখ দুটো চড়কগাছে ওঠার জোগাড় হলো!

চশমা ছাড়া সেই তীক্ষ্ণ চোখ, সুন্দর চোয়াল আর পরিচিত আদল—এ তো অন্য কেউ নয়! এ তো সেই টিএসসির মাঠে অপমানিত হওয়া, গোবাচারা, ক্ষ্যাত মার্কা ছেলেটা!

'অন্তু?!' রিয়ার মনে মনে যেন কয়েকশো ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল।

অন্তু বদলে গেছে, এতটাই বদলে গেছে যে তাকে এখন যেকোনো ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভার মডেল মনে হচ্ছে। সেই লাজুক, কাঁপা কাঁপা গলার ছেলেটির জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে এক চরম ব্যক্তিত্ববান, আকর্ষণীয় পুরুষ।

অন্তু তানিয়ার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিল। তারপর চোখ দুটি ঘুরিয়ে আনল রিয়ার স্থবির হয়ে যাওয়া মুখের ওপর। রিয়া তখনো হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

অন্তু ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে সরাসরি রিয়ার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। তারপর একহাত পকেটে পুরে অত্যন্ত সাবলীল গলায় বলল, "আরে! ইনিই তাহলে তানিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড? হ্যালো শালি সাহেব! কেমন আছো?"

কথাটা শুনে রিয়ার মাথার রগ যেন জ্বলে উঠল। 'শালি সাহেব?!' এত বড় সাহস!

"শালি সাহেব?!"

কথাটা যেন রিয়ার কানে বিষের মতো বিধল। তার ইচ্ছে করছিল এখনই তেড়ে গিয়ে অন্তুর শার্টের কলারটা চেপে ধরতে। তিন বছর আগে যে ছেলেটি তার এক ধমকে কেঁপে উঠত, আজ সে কি না এত মানুষের সামনে তাকে ‘শালি’ বলে সম্বোধন করছে! তাও আবার এমন একটা তাচ্ছিল্যভরা মিষ্টি হেসে!

রিয়া নিজের রাগ সংবরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কারণ পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী তানিয়া, যার চোখে এখন হাজার ওয়াটের আলো জ্বলছে।

রিয়া কৃত্রিম একটা হাসি মুখে ঝুলিয়ে কড়া গলায় বলল, "অন্তু, তুমি? তুমি এখানে কী করছ? আর আমাকে এসব কী বলছ?"

অন্তু খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ভ্রু জোড়া একটু উঁচিয়ে বলল, "কেন শালি সাহেব? ভুল কী বললাম? তানিয়া আমার হবু স্ত্রী, সেই সূত্রে তুমি তো আমার শালিই হও, তাই না? নাকি অন্য কিছু ডাকতে হবে?"

তানিয়া মাঝখান থেকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, "আরে রিয়া, তোরা কি একে অপরকে আগে থেকেই চিনিস নাকি? ওয়াও! এ তো দারুণ ব্যাপার! ও তো আমার ফুপাতো ভাই হয় রে। ছোটবেলা থেকেই বিদেশে ছিল, মাঝে কিছুদিন কেবল ঢাবিতে পড়েছিল। তোদের ডিপার্টমেন্টেই নাকি ছিল? ও তো আমাকে আগেই বলেছিল তোর কথা, কিন্তু আমি ভাবিনি তোরা একে অপরকে এত ভালো করে চিনিস!"

ফুপাতো ভাই?! রিয়ার মাথার ভেতরে যেন বোমা ফাটল। তানিয়া কোনোদিন অন্তুর কথা এভাবে বলেনি, কারণ অন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এতটাই আড়ালে থাকত যে কেউ জানতই না সে এত প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে। পুরো বিষয়টা যেন রিয়ার সাজানো গুছানো মানসিক দুনিয়াটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিল।

"ওহ... ফুপাতো ভাই!" রিয়া শুকনো একটা ঢোক গিলে বলল, "হ্যাঁ, আমরা একই ব্যাচে ছিলাম।"

অন্তু এবার ড্রাইভারকে ইশারা করে পেছনের দরজাট খুলে দিল। তানিয়ার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম আর মোলায়েম গলায় বলল, "চল তানিয়া, গাড়িতে ওঠো। শপিংয়ে গিয়ে তো আবার দেরি করা যাবে না। তোমার জন্য অনেকগুলো ব্র্যান্ডের শোরুম বুক করে রেখেছি।"

তানিয়া আনন্দে গলে গিয়ে অন্তুর বাহু জড়িয়ে ধরে গাড়িতে উঠে পড়ল। অন্তু গাড়ি চড়ার আগে রিয়ার দিকে ফিরে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ঝুলছিল। সে অত্যন্ত ভদ্রতার নাটক করে বলল, "শালি সাহেব, দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এসো। পেছনের সিটে তো যথেষ্ট জায়গা আছে।"

রিয়া কোনো কথা না বলে রাগে গজগজ করতে করতে পেছনের সিটে গিয়ে বসল। পুরো পথজুড়ে অন্তু আর তানিয়ার কাণ্ডকারখানা দেখে রিয়ার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল।

অন্তু গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার লুকিং গ্লাসে রিয়ার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিল। সে তানিয়ার হাত নিজের এক হাতে তুলে নিয়ে বলল, "জানু, কালকের শাড়িটা তোমার পছন্দ হয়নি তো? আজ আমরা যে ডিজাইনারের কাছে যাচ্ছি, ওখান থেকে তোমার বিয়ের সব লেহেঙ্গা আর শাড়ি পছন্দ করবে। টাকার কোনো চিন্তা করবে না, আমার সবকিছুই তো এখন তোমার।"

তানিয়া লাজুক হেসে অন্তুর কাঁধে মাথা রাখল, "তুমি এত সুইট কেন অন্তু? আমি সত্যিই ভাগ্যবতী!"

গাড়ির পেছনের সিটে বসে রিয়া যেন নখ দিয়ে নিজের হাত আঁচড়াচ্ছিল। তার বুকটা অজানা এক যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। এই ছেলেটি একসময় তার একটা মুচকি হাসির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করত, আর আজ তার চোখের সামনে অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে রঙিন স্বপ্ন বুনছে!

কিন্তু সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার জায়গাটা ছিল অন্যখানে—অন্তু এখন আর সেই আগের গোবাচারা ছেলেটা নেই। তার প্রতিটা পদক্ষেপে এখন এক অদ্ভুত পুরুষালী আকর্ষণ, যা রিয়াকে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ডভাবে টেনেই যাচ্ছিল। রিয়া কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, তার এই অদ্ভুত জ্বলনটা কিসের—অহংকারের নাকি কোনো সুপ্ত ঈর্ষার?

বসুন্ধরা সিটিতে পৌঁছানোর পর অন্তু গাড়ি পার্ক করে নিজেই নেমে তানিয়ার জন্য দরজা খুলে দিল। রিয়া নিজ থেকেই নেমে হাত দুটো শক্ত করে বাঁধল।

অন্তু রিয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে বলল, "শালি সাহেব, এসো। তোমার বান্ধবীর বিয়ের কেনাকাটা, তোমার মতামত কিন্তু খুব জরুরি!"

রিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "ধন্যবাদ, আমি একাই আসতে পারব।"

অন্তু পেছন ফিরে তানিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে শোরুমের দিকে হেঁটে যেতে লাগল। আর রিয়া পেছনে দাঁড়িয়ে আগ্নেয়গিরির মতো ফুটতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল না, এই তিন বছরে অন্তু বদলে গেছে, নাকি অন্তু তাকে বদলাতে বাধ্য করছে!

বসুন্ধরা সিটির অভিজাত শপিং মলটার মেঝের চকচকে মার্বেলে রিয়ার হাই হিলের খটখট শব্দ হচ্ছিল। তবে সেই শব্দের চেয়েও বেশি শব্দ হচ্ছিল তার বুকের ভেতরের তোলপাড়ে।

প্রতিটি শোরুমে ঢোকার পর অন্তু যেভাবে তানিয়ার খেয়াল রাখছিল, তা দেখে রিয়ার মাথা ঘুরছিল। ডিজাইনার শাড়ির দোকানের লাল-গোলাপি রেশমি কাপড়ের স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে অন্তু একটা গাঢ় লাল রঙের কাতান শাড়ি তুলে ধরল। তানিয়ার গালে শাড়িটা ছোঁয়ায়ে অত্যন্ত নিচু ও মায়াবী গলায় বলল, "তানিয়া, এই লাল রঙটায় তোমাকে যা লাগবে না! আমার চোখই হয়তো সরবে না তোমার ওপর থেকে।"

তানিয়া আনন্দে লাল হয়ে গিয়ে বলল, "সত্যি বলছ অন্তু? আমার কিন্তু গোলাপিটা বেশি পছন্দ হচ্ছিল।"

"তোমার পছন্দই আমার পছন্দ, জানু। তবে আমার ইচ্ছে তুমি গাঢ় লালেই সাজো," অন্তু তানিয়ার থুতনি ধরে হালকা একটু নাড়িয়ে দিল।

একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়ার মনে হলো কেউ যেন তার বুকে একটা বিষাক্ত তীর ফুটিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এই অন্তুই তো রিয়ার পরা প্রতিটি শাড়ির রঙের প্রশংসা করত আড়ালে দাঁড়িয়ে। আজ সেই চোখ, সেই কণ্ঠস্বর তানিয়ার জন্য বরাদ্দ! রিয়ার ভেতরে ঈর্ষার আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে কিছুটা রুক্ষ স্বরেই বলে উঠল, "তানিয়া, গোলাপিটা অনেক বেশি আধুনিক আর তোর স্কিন টোনের সাথে মানাচ্ছে। লাল রঙটা একদম ব্যাকডেটেড আর ক্ষ্যাত!"

'ক্ষ্যাত' শব্দটা রিয়া ইচ্ছে করেই উচ্চারণ করল, অন্তুকে ইঙ্গিত করে।

অন্তু একটুও বিচলিত হলো না। উল্টো রিয়ার দিকে একপা এগিয়ে এসে চশমা ছাড়া তার তীক্ষ্ণ নজর রিয়ার চোখের ওপর রাখল। তারপর ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, "ক্ষ্যাত? হতে পারে শালি সাহেব। কিন্তু কখনো কখনো এই 'ক্ষ্যাত' জিনিসগুলোর ভেতরেই সবচেয়ে বেশি খাঁটি ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। যেটা চকচকে আধুনিকতার পেছনে সহজে পাওয়া যায় না, তা-ই না?"

অন্তুর চোখের সেই গভীর চাউনি আর প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ রিয়াকে একদম বাকরুদ্ধ করে দিল। রিয়া চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। কেনাকাটা শেষে তারা একটা লাক্সারি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল। ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের হালকা আলোয় অন্তুর পুরুষালী ফেসকাটিং যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল। অন্তু সার্ভিস বয়কে ডেকে সুস্বাদু সব খাবারের অর্ডার দিল।

খাবার আসার পর অন্তু নিজে হাতে তানিয়ার প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগল। শুধু তাই নয়, একপর্যায়ে অন্তু কাটা চামচে এক টুকরো চিকেন তুলে তানিয়ার মুখের সামনে ধরল, "নাও জানু, একটু টেস্ট করে দেখো তো, ঝাল ঠিক আছে কি না।"

তানিয়া লাজুক হেসে অন্তুর হাত থেকে সেটা খেয়ে নিল।

পুরো দৃশ্যটা দেখে রিয়ার গলার কাছে যেন বিষাক্ত কিছু একটা আটকে গেল। সে গ্লাসের সমস্ত পানি এক চুমুকে শেষ করে ফেলল। হাত দুটো টেবিলের নিচে সজোরে চেপে ধরে রাখা ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না।

অন্তু এবার চোখ তুলে রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়ার এই নীরব যন্ত্রণা, তার গালের রক্তিম আভা আর ছটফটানি—প্রতিটা জিনিস অন্তু দারুণ উপভোগ করছিল। অন্তু একটা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে অত্যন্ত মায়াবী হেসে রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, "শালি সাহেব, তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না? নাকি হবু দুলাভাইয়ের হাতে না খেলে খাবে না?"

রিয়া টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো রাগে ও কান্নায় ছলছল করছিল। "আমার ক্ষুধা নেই। তানিয়া, আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।"

রিয়া দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে হেঁটে গেল। বেসিনের আয়নায় নিজেকে দেখে রিয়ার নিজের ওপরই তীব্র ঘৃণা হতে লাগল। সে কেন এত ঈর্ষান্বিত হচ্ছে? কেন অন্তুর ওই সামান্য স্পর্শ, ওই রোমান্টিক কথাগুলো রিয়ার বুকের মধ্যে এতটা তোলপাড় সৃষ্টি করছে? তবে কি তিন বছর আগে টিএসসির মাঠে সে যে ছেলেটিকে চড় মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ সেই ছেলেটির প্রতিই সে ব্যাকুল হয়ে উঠছে?

রিয়া চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। কিন্তু ভেতরের আগুনটা যে আর নেভানো যাচ্ছিল না। অন্তু তাকে নিয়ে একটা খেলা খেলছে, আর সেই খেলায় রিয়া প্রতি মুহূর্তে হেরে যাচ্ছে।

কেনাকাটার দিনটার পর থেকে রিয়ার জীবনটা যেন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হলো। বিয়ের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। তানিয়ার জেদ—তার বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠানে রিয়াকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। আর অন্তু? অন্তু যেন সুযোগের নিখুঁত ব্যবহার করছিল। প্রতিদিন কোনো না কোনো বাহানায় সে তানিয়াদের বাড়ি চলে আসত, আর রিয়ার উপস্থিতিতেই তানিয়ার সাথে চূড়ান্ত রোমান্স করে যেত।

কখনো তানিয়ার চুলে ফুল গুঁজে দিয়ে মিষ্টি সুরে কবিতা শোনানো, আবার কখনো তানিয়ার হাত নিজের বুকের ওপর ধরে রাখা—অন্তুর প্রতিটি আচরণ রিয়ার বুকে তপ্ত ছ্যাঁকা দিত। সবচেয়ে কষ্টকর ছিল অন্তুর সেই বাঁকা নজর। সুযোগ পেলেই সে রিয়ার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসত, যেন সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে রিয়া ভেতরে ভেতরে কীভাবে দগ্ধ হচ্ছে।

রিয়া রাতে ঘুমাতে পারত না। বালিশে মুখ গুঁজে সে ভাবত, একসময় যে ছেলেটা তার একটুখানি মনোযোগের জন্য আকুতি জানাত, আজ সেই ছেলেটার একটা ছোঁয়া, একটা মিষ্টি কথার জন্য তার নিজের মন কেন এত ব্যাকুল হয়ে উঠছে? কেন অন্তুর এই পরিবর্তন তাকে এতটা পাগল করে দিচ্ছে? রিয়া বুঝতে পারছিল, এটা কেবল অহংকারে আঘাত লাগার ঈর্ষা নয়—এ এক গভীর, তীব্র অনুশোচনা আর ভালোবাসার জন্ম, যা তিন বছর আগে সে চিনতে ভুল করেছিল।

অবশেষে এল গায়ে হলুদের দিন।

তানিয়াদের সুসজ্জিত ছাদবাগান আলোয় আলোকময় হয়ে উঠেছে। চারদিকে সানাইয়ের সুর আর কাঁচা হলুদের ম ম গন্ধ। রিয়ার পরনে ছিল একটা সাধারণ হলুদ রঙের শাড়ি, চোখে-মুখে বিষাদের ছায়া। অন্য মেয়েরা যখন নাচগানে ব্যস্ত, রিয়া তখন ভিড় থেকে দূরে ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে মেহেন্দির আলপনা আঁকা হাত দুটোকে অপলক দেখছিল।

ঠিক তখনই পেছনে জুতো খটখট শব্দ হলো।

রিয়া ঘুরে তাকাতেই তার নিশ্বাস আটকে গেল। অন্তু দাঁড়িয়ে আছে। পরনে হলুদ কাফতান কুর্তা, গায়ে জ্যাকেটের মতো একটা কোটি, চুলগুলো হালকা অগোছালো। আজকের আলোয় অন্তুকে যেন রূপকথার কোনো রাজপুত্রের মতো লাগছে।

অন্তু রিয়ার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। চারপাশে কেউ নেই। সে রিয়ার দিকে ঝুকে এসে ফিসফিস করে বলল, "কী ব্যাপার শালি সাহেব? আজ তোমার বান্ধবীর গায়ে হলুদ, আর তুমি এভাবে এক কোণে মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছ? কনের পাশে গিয়ে নাচবে না?"

রিয়া আর নিজের ভেতর জমানো কষ্ট আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "অন্তু, তুমি এসব কেন করছ? কেন আমাকে প্রতিদিন এভাবে তিলে তিলে মারছ? তুমি তো তানিয়াকে ভালোবাসো না, তুমি শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এই নাটকটা করছ, তাই না?"

অন্তু এক মুহূর্ত নীরব রইল। তার চোখ দুটি থমকে গেল, তবে পরক্ষণেই সে মুখ থেকে সব হাসি মুছে ফেলে অত্যন্ত ঠান্ডা ও কঠিন গলায় বলল, "নাটক? রিয়া, তুমি নিজেকে কী ভাবো বলতো? পৃথিবীটা কি এখনো তোমার আঙুলের ইশারায় ঘোরে? তিন বছর আগে টিএসসির মাঠে তুমি আমাকে কী হিসেবে দেখেছিলে? একটা 'ক্ষ্যাত', 'গোবাচারা' ছেলে, যাকে সবার সামনে চড় মেরে অপমান করা যায়? আজ আমি সেই জায়গায় নেই রিয়া। আমি যাকে ইচ্ছা ভালোবাসব, যাকে ইচ্ছা নিজের করব। তোমার মতো অহংকারী মেয়ের কান্না দেখার সময় আমার নেই।"

কথাগুলো রিয়ার বুকে ছুরি চালানোর মতো বিঁধল। রিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। অন্তুর সামনে নিজের বাকি সম্মানটুকুও বিকিয়ে দিতে তার ইচ্ছে হলো না।

সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, "আই অ্যাম সরি অন্তু... আই অ্যাম রিয়েলি সরি। আমি ৩ বছর আগে যা করেছি, তার জন্য আমি সত্যিই অনুতপ্ত। আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছিলাম। তোমার এই ভালোবাসার যোগ্য আমি সত্যিই ছিলাম না।"

কথাটা বলেই রিয়া নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে কনের ঘর থেকে বের হয়ে এল। তার চোখে তখন জল আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না। সে আর কোনো অনুষ্ঠানের তোয়াক্কা না করে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। হলুদের মেলা, গানবাজনা—সবকিছু পেছনে ফেলে সে রাস্তায় গিয়ে হাঁটা দিল।

রাতের ফাঁকা রাস্তায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামতে শুরু করেছিল। রিয়া শাড়ি ভিজিয়ে একা একা অন্ধকারের দিকে হেঁটে যেতে লাগল। তার বুকের ভেতরের অপরাধবোধ আর অন্তুকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

রিয়া প্রায় অর্ধেক রাস্তা হেঁটে চলে এসেছে। চারপাশটা নীরব, নির্জন। ঠিক তখনই পেছনের অন্ধকার চিড়ে একটা পরিচিত কণ্ঠের তীব্র ডাক শুনতে পেল রিয়া।

"রিয়া! থামো!"

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখন আরও ঘন হয়ে নামছিল। ফাঁকা পিচঢালা রাস্তায় রিয়ার চোখের জল আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে গিয়েছিল। পেছন থেকে সেই চেনা, গম্ভীর গলার ডাকটা শুনে রিয়া থমকে দাঁড়াল। কিন্তু সে পেছনে ফিরে তাকানোর সাহস পাচ্ছিল না। সে ভয় পাচ্ছিল, এ হয়তো তার মনের ভুল, হয়তো তীব্র অপরাধবোধ থেকে তৈরি হওয়া কোনো অলীক স্বপ্ন।

পর মুহূর্তেই জুতোর দ্রুত শব্দের সাথে সাথে একটি শক্ত হাত রিয়ার কবজি ধরে টান দিল। রিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় গিয়ে আছড়ে পড়ল একটি শক্ত, চওড়া বুকের ওপর। অন্তু তাকে দু-হাতে ভীষণ শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরেছে।

অন্তুর ভেজা ব্লেজারের সুবাস আর বুকের ধুকপুকানি রিয়ার কান ছুঁয়ে গেল। অন্তুর এই তীব্র বাঁধন যেন রিয়াকে এক নিমেষে পৃথিবীর সব ভয় আর অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করে দিল। রিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে অন্তুর কাফতান কুর্তাটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

"তুমি পাগল রিয়া? এই মাঝরাতে এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে এভাবে হেঁটে কোথায় যাচ্ছ?" অন্তুর গলায় আর সেই কটু তাচ্ছিল্য বা রাগ ছিল না, সেখানে ছিল এক উপচে পড়া ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা।

রিয়া অন্তুর বুকের ভেতর থেকেই কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "আমাকে যেতে দাও অন্তু! আমি আর নিতে পারছি না। তুমি তানিয়ার কাছে ফিরে যাও। আমি জানি আমি তোমার যোগ্য নই, কিন্তু তোমাকে অন্য কারো সাথে রোমান্স করতে দেখা আমার পক্ষে আর সম্ভব না... আমি সত্যি মরে যাব অন্তু!"

অন্তু রিয়ার থুতনি ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। রিয়ার জলছলছল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে অন্তুর ঠোঁটে ফুটে উঠল সেই পুরোনো, নিষ্পাপ আর মায়াবী হাসিটি—যাতে কোনো অহংকার বা কৃত্রিমতা ছিল না।

অন্তু নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে রিয়ার গালের ভেজা জলটুকু মুছে দিয়ে খুব সাবল্যে বলল, "আরে বোকা মেয়ে! তানিয়াকে বিয়ে করতে যাব কেন? তানিয়া তো আমার নিজের ফুপাতো বোন! আর ওর বিয়েও সত্যি ঠিক হয়েছে, তবে আমার সাথে নয়—আমার এক ফ্রেন্ডের সাথে। সে কাল বিকেলেই বিদেশ থেকে ল্যান্ড করবে।"

কথাটা শুনে রিয়ার কান্না এক নিমেষে থেমে গেল। সে বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় করে তাকাল, "কী... কী বললে? তানিয়া তোমার বোন? আর বিয়ে..."

অন্তু হালকা হেসে রিয়ার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু আঁকল। তারপর রিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে নিয়ে বলল, "হ্যাঁ, বোকা! পুরোটাই একটা সাজানো নাটক ছিল। তিন বছর আগে তুমি আমাকে চড় মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিলে, কিন্তু আমার এই পাগল মনটা তো অন্য কাউকে ভালোবাসতে শেখেনি। আমি চেয়েছিলাম তুমি নিজের ভুলটা বুঝতে পারো। তুমি যে সাজানো রূপ আর অহংকারকে ভালোবাসা মনে করতে, আমি তোমাকে দেখাতে চেয়েছিলাম খাঁটি ভালোবাসা কাকে বলে। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, এই বদলে যাওয়া অন্তুর পেছনে তুমি সেই পুরোনো অন্তুকে খুঁজে পাও কি না, আর তোমার মনে আমার জন্য কোনো অনুভূতি জন্মায় কি না।"

রিয়ার মাথার ওপর যেন সব মেঘ কেটে একরাশ আলো ফুটে উঠল। সে এতক্ষণে পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল। অন্তু তাকে কোনোদিন ঘৃণা করেনি, সে শুধু রিয়ার ভেতরের সত্যিকারের ভালোবাসাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিল।

"তুমি বড্ড খারাপ অন্তু! এত বড় একটা নাটক করলে আমার সাথে? আমাকে এত কষ্ট দিলে?" রিয়া অভিমান করে অন্তুর বুকে ছোট ছোট কিল মারতে লাগল।

অন্তু রিয়ার দুটো হাতই আটকে দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে আনল। বৃষ্টির ধারায় দুজনের শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। অন্তু রিয়ার চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল, "কষ্ট না দিলে কি আর রিয়া ম্যাডাম বুঝতে পারতেন যে তিনি এই গোবাচারা অন্তুটার প্রেমে কতটা হাবুডুবু খাচ্ছেন?"

রিয়া এবার লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। অন্তু রিয়ার থুতনি ধরে আবার তার মুখটা উঁচিয়ে বলল, "তাহলে শালি সাহেব থেকে কি এবার সত্যি সত্যি নিজের বেগম করে নিতে পারি তোমাকে? বলো, এখনো কি আমার সাহসের অভাব আছে?"

রিয়া মিষ্টি হেসে অন্তুর গলায় দু-হাত জড়িয়ে ধরে বলল, "তোমার সাহস একটু বেশিই অন্তু। আর এই সাহসের কাছে আমি আজ সারাজীবনের জন্য হেরে গেলাম।"

ঝুম বৃষ্টির মাঝে, ফাঁকা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অন্তু রিয়াকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। তিন বছর আগের অপমানের সেই রাতটি আজ এক ভালোবাসার পূর্ণতায় গিয়ে মিশে গেল।

....
👁 90