প্রতিশোধের সেই ঠান্ডা রাত

রোডসাইডের ক্যাফেতে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল রোহান। বাড়ির ছোট ছেলে হওয়ায় তাকে নিয়ে সবার আবদার আর আদরের শেষ নেই। চঞ্চল, দুষ্টু আর হাসিখুশি স্বভাবের জন্য পরিবারের ছোট-বড় সবাই তাকে মাথায় তুলে রাখে। তবে আজকের দিনটা অন্যরকম। আজ রোহানের বড় ভাই রিফাতের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা। বিয়ের কেনাকাটা আর কনে দেখার তোড়জোড়ে পুরো বাড়ি গমগম করছে। রোহানের মা সকাল থেকেই একশোবার হুকুম দিয়েছেন, "রোহান, সময়মতো গাড়ি নিয়ে রেডি থাকবি! একদম দেরি করবি না।"

নির্ধারিত সময়ে রোহানরা গিয়ে পৌঁছাল পাত্রীর বাড়িতে। পাত্রী অর্থাৎ শায়লার বাড়িটা বেশ সাজানো-গোছানো। বসার ঘরে মিষ্টি আর নাস্তার পসরা সাজিয়ে বসেছেন শায়লার অভিভাবকরা। রোহান সোফায় বসে স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় চারপাশটা দেখতে লাগল। রিফাত ভাইয়া কিছুটা লাজুক মুখে বসে আছে। এমন সময় ঘরজুড়ে একটা নীরবতা নেমে এলো, যখন শায়লা ঘরে প্রবেশ করল। কিন্তু রোহানের চোখ শায়লার দিকে গেল না, তার চোখ আটকে গেল শায়লার ঠিক পেছনে ট্রলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির ওপর।

মেয়েটির নাম শাইমা—শায়লার ছোট বোন।

শাইমাকে প্রথম দেখেই রোহানের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা দোলা লাগল। লালচে রঙের একটা সাধারণ সালোয়ার-কামিজে মেয়েটিকে অসম্ভব রূপসী লাগছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি বেশ কঠিন, মুখে কোনো হাসির চিহ্ন নেই। একধরনের প্রচ্ছন্ন অহংকার আর রাগ তার পুরো অবয়বে স্পষ্ট। শায়লা এসে সবার সামনে বসতেই রোহান একটু দুষ্টুমির ছলে ফিসফিস করে রিফাতকে বলল, "ভাইয়া, কনে তো পছন্দ হয়েছে, কিন্তু পাশের বিষবৃক্ষটা কে?"

রিফাত কনুই দিয়ে রোহানকে একটা গুঁতো দিল, কিন্তু ততক্ষণে শাইমা রোহানের দিকে তাকিয়েছে। শাইমার তীক্ষ্ণ চাহনি যেন রোহানকে এক নিমেষে ভস্ম করে দিতে চায়। শাইমা হয়তো কথাটা শুনে ফেলেছে। সে ট্রে-টা টেবিলে রাখার সময় বেশ জোরেই শব্দ করল।

নাস্তার পর্ব চলাকালীন রোহান জানबूझেই শাইমাকে বিরক্ত করার সিদ্ধান্ত নিল। সে শাইমার দিকে তাকিয়ে বেশ মিষ্টি হেসে বলল, "এই যে শাইমা আপু, চায়ে চিনিটা কি একটু কম হয়েছে? নাকি আপনার মুখের মিষ্টতা একটু মিশিয়ে দেবেন বলে চিনি বাঁচালেন?"

শাইমা রোহানের দিকে একধরনের অপলক, রাগী চোখে তাকাল। তার ভ্রূ কুঁচকে গেল। অত্যন্ত ঠাণ্ডা অথচ ঝাঁঝালো গলায় সে বলল, "যাদের চাটুকারিতা করার অভ্যাস, তাদের বেশি মিষ্টি না খাওয়াটাই ভালো। আর আমি আপনার আপু নই।"

কথাটা শুনে ঘরের সবাই একটু থমকে গেল। রোহানের মা পরিবেশ সামাল দিতে হেসে বললেন, "আরে শাইমা তো দেখি বেশ স্পষ্টবাদী! রোহান একটু বেশিই দুষ্টু, তুমি কিছু মনে কোরো না বাছা।"

কিন্তু রোহান ছাড়ার পাত্র নয়। সে মনে মনে বলল, "ওহ! অহংকারের পাহাড়ে বসে আছ? দাঁড়াও, নামাচ্ছি।"

পুরো কনে দেখার অনুষ্ঠানজুড়ে রোহান সুযোগ পেলেই শাইমাকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করল, আর শাইমা প্রতিবারই চাবুকের মতো উত্তর দিল। শাইমার চোখ-মুখে যে রাগ আর অহংকার ফুটছিল, রোহানের কাছে সেটা যেন এক অদ্ভুত খেলা মনে হতে লাগল। সে যত রাগছে, রোহানের তাকে রাগাতে তত বেশি ভালো লাগছে।

পছন্দপর্ব শেষ হলো অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে। রিফাত আর শায়লার বিয়ে পাকা হয়ে গেল। বিয়ের কেনাকাটা থেকে শুরু করে কার্ড ছাপা—সব কাজ এক মাসের মধ্যে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এই এক মাসে দুই পরিবারের যাতায়াত বহু গুণে বেড়ে গেল। আর যতবার যাতায়াত বাড়ল, ততবারই রোহান আর শাইমার মুখোমুখি লড়াই চলতে লাগল।

একদিন শায়লাদের বাড়িতে বিয়ের গহনা মাপার কাজ চলছিল। রোহান সেখানে গিয়েছিল তার মায়ের সঙ্গে কিছু জরুরি জিনিস পৌঁছে দিতে। শাইমা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। রোহান পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ জোরে একটা হাঁচি দেওয়ার ভান করল। শাইমা চমকে উঠে হাতের ফোনটা প্রায় ফেলে দিচ্ছিল।

সামলে নিয়ে শাইমা গর্জনে ফেটে পড়ল, "আপনার কি কোনো সভ্যতার জ্ঞান নেই? এভাবে মানুযকে চমকে দেয় কেউ? বানরের মতো স্বভাব আপনার!"

রোহান পকেটে হাত দিয়ে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল, "বানর? বাহ্, সুন্দর উপাধি! তা রাগলে যে আপনাকে একদম লাল মরিচের মতো দেখায়, সেটা কি কেউ বলেছে আগে? এত অহংকার কিসের আপনার, বলুন তো? একটু হাসলে কি রূপ কমে যাবে?"

"আমার রূপ নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?" শাইমা তর্জনী উঁচিয়ে বলল, "নিজের সীমারেখায় থাকুন রোহান সাহেব। আপনার এই সস্তা দুষ্টুমি আমার একদম সহ্য হয় না।"

"যেটা সহ্য হয় না, সেটাই তো বারবার করাবো," রোহান চোখ টিপ মেরে শাইমাকে এড়িয়ে ঘরে ঢুকে গেল। শাইমা রাগে পায়ের ছাপ ফেলে অন্যদিকে চলে গেল।

ধীরে ধীরে বিয়ের দিন এগিয়ে এলো। পুরো বাড়ি আলোয় সেজে উঠেছে। শায়লা আর রিফাতের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজিত হলো এক বিশাল কমিউনিটি সেন্টারে। বিয়ের নানা আচার-অনুষ্ঠান শেষে রাত যখন গভীর হলো, তখন দুই পরিবারের তরুণ-তরুণীরা বাড়ির ছাদে আড্ডা জমাতে গেল। শায়লা আর রিফাতকে মাঝখানে বসিয়ে হাসাহাসি, গান আর দুষ্টুমির আসর বসেছে। শাইমাও সেখানে ছিল, তবে সে বরাবরের মতোই সবার থেকে একটু দূরে, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নীরব রাত উপভোগ করছিল।

রাত তিনটা নাগাদ সবাই ক্লান্ত হয়ে ছাদ থেকে একে একে নেমে যেতে লাগল। শাইমা ভাবল সে-ও নেমে যাবে। সবাই চলে যাওয়ার পর সে যখন দরজার দিকে পা বাড়াল, ঠিক তখনই রোহান আড়াল থেকে বেরিয়ে তার পথ আগলে দাঁড়াল।

"সরুন আমার পথ থেকে," শাইমা রুক্ষ গলায় বলল।

রোহান সরলো না। সে একপা এগিয়ে এসে বলল, "আজ সারাটা দিন আমার দিকে একবারও তাকালে না যে? এত এড়িয়ে চলছ কেন?"

"আপনাকে দেখার কোনো আগ্রহ আমার নেই। পথ ছাড়ুন বলছি," শাইমা ধমকে উঠল।

"না ছাড়লে কি করবে?" রোহান বেশ রহস্যময় হেসে বলল।

শাইমা কিছু বোঝার আগেই রোহান এক ঝটকায় শাইমার হাত ধরে নিজের দিকে টান দিল। শাইমা আচমকা এই টানে সোজা এসে পড়ল রোহানের বুকের ওপর। দূরত্ব একদম শূন্যে নেমে এলো। শাইমা চমকে উঠে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রোহান তার মুখের কাছে ঝুকে এলো। রোহানের চোখ দুটি তখন এক অদ্ভুত নেশায় মত্ত। কোনো কথা না বলে, গভীর এক আবেগে সে শাইমার ঠোঁট বরাবর নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে গেল।

কিন্তু রোহানের ঠোঁট শাইমার ঠোঁট স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তেই—'ঠাস!'

একটি প্রচণ্ড চড়ের শব্দে রাতের নীরবতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

শাইমা রোহানের গালে সজোরে চড় মেরেছে। তার শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছিল। চোখের দৃষ্টিতে চরম ঘৃণা ফুটিয়ে শাইমা বলল, "লজ্জাহীন! আপনার সাহস হয় কি করে আমাকে স্পর্শ করার? নিজের সীমা কোনোদিন ভুলবেন না!"

চড় খেয়ে রোহান কয়েক মুহূর্ত স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের বাম গালে হাত দিল। সেখানে তীব্র জ্বালা অনুভব হচ্ছে। কিন্তু গালে জ্বালার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল রোহানের পুরুষালি অহংকারে চরম আঘাত। বাড়ির আদুরে, সবার প্রিয় রোহান আজ পর্যন্ত কারও কাছে ছোট হয়নি, আর সেখানে একটা মেয়ে তাকে এভাবে চড় মারল?

রোহানের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তেই বদলে গেল। চঞ্চল, দুষ্টু রোহান যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় ফুটে উঠল এক হিংস্র, জঘন্য গম্ভীর রূপ। সে শাইমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে মিষ্টি ভাব তো দূর, কোনো দয়াও ছিল না।

শাইমা রোহানের ওই রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে একটু ভয় পেয়ে গেল, তবে মুখে অহংকার বজায় রেখে সে হনহন করে ছাদ থেকে নেমে চলে গেল।

রোহান গালটা স্পর্শ করে এক রক্তহিম করা হাসি হাসল। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক কঠিন প্রতিজ্ঞা করল, "খুব অহংকার না তোমার? এই চড়ের মূল্য তোমাকে দিতেই হবে শাইমা। এই অহংকার আমি গুঁড়িয়ে দেব। তোমাকে আমি আমার এই বাড়িতেই আনব, বিয়ে আমি তোমাকেই করব—আর সেটা খুব জলদি।"

বিয়ের হট্টগোল মিটে যাওয়ার পর দিনকয়েক কেটে গেছে। রিফাত আর শায়লার নতুন সংসার বেশ গুছিয়ে উঠেছে। বড় বউ হিসেবে শায়লার সাবলীল আচরণ আর নম্রতা খুব অল্প দিনেই এ বাড়ির সবার মন জয় করে নিয়েছে। কিন্তু সেই বাড়িতে রোহানের ভেতরের ঝড়টা কেউ দেখতে পাচ্ছিল না। বিয়ের রাতের সেই চড়ের দাগ হয়তো গাল থেকে মুছে গেছে, কিন্তু রোহানের অহংকারে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা দিন দিন এক কঠিন প্রতিজ্ঞায় রূপ নিচ্ছিল।

সেই রাতের পর থেকে রোহানের চঞ্চলতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। আগে যে ছেলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখত, সে এখন অনেকটাই গম্ভীর। তবে তার মনের ভেতরে কেবল একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছিল—শাইমা। শাইমার সেই অহংকারী চোখ, চড় মারার পর তার ঘৃণাভরা চাহনি আর তর্জনী উঁচিয়ে হুমকি দেওয়া—সবকিছু রোহানের মাথায় বারবার ঘুরেফিরে আসছিল। সে ভালো করেই জানত, শাইমার এই অহংকার চূর্ণ করতে হলে তাকে নিজের আয়ত্তে আনতে হবে। আর তার একমাত্র উপায়—বিয়ে।

একদিন সকালে ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন রোহানের মা। শায়লা পাশে বসে শাশুড়ির সাথে সাংসারিক গল্প করছিল। রিফাত অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল। এমন সময় রোহান বেশ সুশৃঙ্খল ভঙ্গিতে ঘরে এসে ঢুকল। মায়ের পাশে বসে সে বেশ নরম সুরে বলল, "মা, তোমার সাথে একটা জরুরি কথা ছিল।"

মা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে হেসে বললেন, "বল তোরে! কী বায়না তোর? নতুন কোনো ফোন, নাকি বাইক?"

"না মা, কোনো জিনিস না," রোহান মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "আমি বিয়ে করতে চাই।"

রোহানের মুখে এই কথা শুনে ঘরে উপস্থিত সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। রিফাত দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থমকে গেল, আর শায়লা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে অবাক চোখে তাকাল। বাড়ির সবচেয়ে ছোট আর দুষ্টু ছেলেটা নিজে থেকে বিয়ের কথা বলছে—এ যেন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা!

মা কিছুক্ষণ থ হয়ে থেকে হেসে উঠলেন, "বলিস কী রে রোহান! তুই বিয়ে করবি? তোর তো মাত্র পড়ালেখা শেষ হলো, ক্যারিয়ারের কথা ভাববি, তা না করে বিয়ে?"

"আমার ক্যারিয়ারের কাজ তো বাবার ব্যবসাতেই শুরু হয়ে গেছে মা। আমি সিরিয়াস। আমি সংসার করতে চাই," রোহান বেশ দৃঢ়তার সাথে বলল।

রিফাত এগিয়ে এসে রোহানের পিঠ চাপড়ে বলল, "আরে বাহ্! ছোট মিঞার তো বেশ তাড়া দেখছি! তা মেয়ে কি কেউ পছন্দ আছে, নাকি মা খুঁজবে?"

রোহান শায়লার দিকে একবার তাকাল। তার চোখে তখন এক রহস্যময় আলো। সে মায়ের দিকে ফিরে খুব শান্ত গলায় বলল, "পছন্দ আছে মা। আর তাকে তোমরা সবাই চেনো। শায়লা ভাবীর ছোট বোন... শাইমা।"

কথাটা শোনামাত্র শায়লার হাত থেকে চায়ের চামচটা সশব্দে কাপে গিয়ে পড়ল। সে চোখ দুটো বড় বড় করে রোহানের দিকে তাকাল। রিফাতও বেশ অবাক হলো। মা কিছুক্ষণ চিন্তা করে হেসে বললেন, "শাইমা? শায়লার ছোট বোন? ওমা! এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব! দুই বোনের এক বাড়িতেই বিয়ে হবে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! শায়লা, তোর বোন তো বেশ গুণবতী আর দেখতেও মাশাল্লাহ।"

শায়লা ইতস্তত করে বলল, "মা... মানে, শাইমা তো একটু রাগী স্বভাবের। আর ও এখনও পড়াশোনা করছে, হুট করে রাজী হবে কিনা..."

"আহা, রাজী করানোর দায়িত্ব তো আমাদের!" মা একগাল হেসে বললেন, "রোহান যখন পছন্দ করেছে, আর ছেলে আমার এত আবদার করে একটা কথা বলল, আমি আজই তোর মায়ের সাথে কথা বলছি। রোহানের কথা এ বাড়িতে কেউ কোনোদিন ফেলে নাই, এবারও ফেলবে না।"

রোহান মনে মনে হাসল। সে জানত, বাড়িতে তার কথা কেউ ফেলবে না। তার মা যদি একবার কোনো জেদ ধরেন, তবে সেটা তিনি পূরণ করেই ছাড়েন। রোহানের চক্রান্তের প্রথম চালটা একদম নিখুঁতভাবে চালানো হয়ে গেছে।

ওদিকে শায়লাদের বাড়িতে যখন এই বিয়ের প্রস্তাব গেল, তখন শাইমা আকাশ থেকে পড়ল। খবরটা শুনেই রাগে তার মাথার চুল পর্যন্ত জ্বলে উঠল। নিজের ঘরে গিয়ে সে চিৎকার করে শায়লাকে ফোন করল, "আপু! তোদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ওই লম্পট, অভদ্র ছেলেটাকে আমি বিয়ে করব? কখনোই না! আমি মরে গেলেও ওই বানরটাকে বিয়ে করব না!"

শায়লা ফোনে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, "শাইমা, শান্ত হ। রোহান হয়তো একটু চঞ্চল, কিন্তু ছেলে হিসেবে অনেক ভালো। পুরো পরিবার ওকে ভালোবাসে। তাছাড়া আমাদের শ্বশুরবাড়ির মানুষজন খুব ভালো, তোর কোনো কষ্ট হবে না।"

"তুই বুঝবি না আপু! ওই ছেলের আসল রূপ তোরা কেউ দেখিসনি!" শাইমা দাঁতে দাঁত চেপে বলল। সে কিন্তু বিয়ের রাতের চড়ের কথাটা কাউকে বলতে পারল না। কারণ সেই লজ্জাজনক ঘটনার কথা প্রকাশ করলে তার নিজেরই সম্মান যাবে।

কিন্তু শাইমার জেদ আর প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত টিকল না। রোহানের মা নিজে শাইমাদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি শাইমার হাত ধরে অত্যন্ত স্নেহের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। শাইমার বাবা-মা এই সম্বন্ধ পেয়ে হাতে চাঁদ পেলেন। দুই বোনের একই সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হওয়া মানে তো ভাগ্যের ব্যাপার! বাবার আকুল আবেদন আর পরিবারের চাপের মুখে শাইমার সব অহংকার আর রাগ ভেস্তে গেল। বাধ্য হয়ে, বুকভরা ক্ষোভ নিয়ে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে সম্মতি দিতে হলো।

বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হতে বেশি সময় লাগল না। খুব ধুমধাম করে রোহান আর শাইমার বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে শাইমাকে নিয়ে আসা হলো রোহানদের বাড়িতে। শুভদৃষ্টি, বাসর ঘরের ফুল সাজানো—সবকিছুই শাইমার কাছে এক একটা বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছিল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, সে একটা বিশাল ফাঁদে পা দিয়েছে। রোহানের ওই হাসিমুখের পেছনে যে একটা ভয়ংকর প্রতিশোধ লুকিয়ে আছে, তা সে স্পষ্ট টের পাচ্ছিল।

রাত তখন প্রায় বারোটা। লাল বেনারসি আর ভারী গহনায় মুড়ি দিয়ে বাসর ঘরের বিছানায় বসে ছিল শাইমা। ঘরের চারপাশ রজনীগন্ধা আর গোলাপের গন্ধে ম ম করছে। বাইরে আত্মীয়স্বজনের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

শাইমার বুকের ভেতরটা দড়াস দড়াস করে কাঁপছিল। তার পুরো শরীর ভয়ে আর অনিশ্চয়তায় হিম হয়ে আসছিল। বিয়ের রাতের সেই থাপ্পড় মারার দৃশ্যটা তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল। সে তো সেদিন নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে চড় মেরেছিল, কিন্তু রোহান নিশ্চয়ই সেটা ভুলে যায়নি? রোহান কি আজ রাতে তার ওপর সেই চড়ের প্রতিশোধ নেবে? সে কি তাকে কোনো শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করবে?

হঠাৎ ঘরের দরজার লক খোলার শব্দ হলো। শাইমা চমকে উঠে বেনারসির আঁচলটা খামচে ধরল।

রোহান ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের দরজাটা লক করে দিয়ে সে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার পরনে সাদা শেরওয়ানি, কিন্তু মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেই হাসিখুশি, চঞ্চল রোহানের কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। তার চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে এক তীব্র, হিমশীতল রাগ।

রোহান এসে ঠিক শাইমার সামনে দাঁড়াল। তার ছায়াটা শাইমার ওপর পড়তেই শাইমার ভেতরের ভয়টা আরও একধাপ বেড়ে গেল। শাইমা মাথা নিচু করে বসে রইল, ভয়ে তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল।

রোহান পকেটে হাত দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর নিচু, গম্ভীর গলায় বলল, "মাথাটা তোলো শাইমা। আমার দিকে তাকাও।"

শাইমা পারল না। তার ভেতরের সমস্ত অহংকার যেন এই এক মুহূর্তে বাষ্প হয়ে উবে গেছে।

রোহান নিচু হয়ে শাইমার থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। শাইমা ভীতিবিহ্বল চোখে রোহানের দিকে তাকাল। রোহানের চোখের বিষাক্ত রাগী দৃষ্টি দেখে শাইমার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল।

রোহান শাইমার মুখের খুব কাছে গিয়ে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল, "মনে পড়ে সেই রাতের কথা? এই রাজকীয় রূপের অহংকারে আমায় চড় মেরেছিলে না? ভেবেছিলে রোহানকে চড় মেরে পার পেয়ে যাবে?"

শাইমার থুতনি ধরে রাখা রোহানের হাতের মুঠোটা শক্ত থেকে আরও শক্ত হচ্ছিল। শাইমার চোখে জল টলমল করে উঠল। রোহানের রাগী চোখের অগ্নিকুণ্ডে যেন শাইমার এতদিনের সমস্ত অহংকার পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। বাসর ঘরের সুবাসিত বাতাস হঠাৎ করেই শাইমার কাছে দমবন্ধ করা এক ভারী কুয়াশার মতো মনে হতে লাগল।

"কী হলো? জবাব দিচ্ছ না কেন?" রোহান আরও কিছুটা ফিসফিসিয়ে বলল, "যে হাত দিয়ে সেদিন আমায় চড় মেরেছিলে, সেই হাত দুটো এখন কাঁপছে কেন শাইমা? তুমি তো নিজেকে খুব বড় বীর মনে করতে, তাই না?"

শাইমা কোনোমতে ঢোক গিলে থমথমে গলায় বলল, "ছ... ছেড়ে দিন আমায়। আপনি অন্যায় করেছিলেন সেদিন, তাই আমি—"

"চুপ!" রোহানের গম্ভীর ধমকে শাইমার গলার স্বর ভেতরেই আটকে গেল। রোহান তার মুখের বাঁধন ছেড়ে দিয়ে একপা পিছিয়ে এলো। তারপর দুই হাত বুকে বেঁধে শাইমার ওপর ওপর থেকে এক অদ্ভুত, শাঁসানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

রোহান একটু বাঁকা হেসে বলল, "তুমি ভেবেছ আমি তোমাকে গায়ে হাত তুলে শাস্তি দেব? না শাইমা, রোহান ততটা নির্দয় বা অসভ্য নয়। তবে তোমার এই অন্যায়ের আর অহেতুক অহংকারের শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে। আজকেই পেতে হবে।"

শাইমা ভয়ে আশঙ্কায় চোখ দুটো বড় বড় করে তাকাল, "কী... কী শাস্তি?"

রোহান নিজের গালের দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে বলল, "বিয়ের রাতে তোমার ওই ঠোঁট দুটোকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলাম বলে তুমি এই গালে চড় মেরেছিলে, তাই তো? আজ তোমার শাস্তি হলো, তুমি নিজের ইচ্ছায়, ভয়ে নয়, এখনই আমাকে ৩টা কিস করবে। এই গালে।"

শাইমা শিউরে উঠল। সে ভাবতেও পারেনি রোহান এমন একটা অদ্ভুত আর অপমানজনক দাবি করে বসবে! সে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

রোহানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই আরও কঠোর হয়ে উঠল। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না শাইমা। যদি নিজ থেকে না দাও, তবে পুরো রাতটা কীভাবে কাটবে সেটা নিশ্চয়ই আমায় বুঝিয়ে বলতে হবে না? চয়েস ইজ ইউরস।"

রোহানের শেষ কথাটার হুমকি শাইমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয় ঢুকিয়ে দিল। সে ভালো করেই জানে, আজ সে এই ঘরের ভেতর রোহানের হাতে বন্দি। বাইরের কেউ তাকে বাঁচাতে আসবে না। আর রোহান যে মেজাজে আছে, কথা না শুনলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

শাইমা কাঁপতে কাঁপতে বিছানা থেকে সামান্য একটু উঠে দাঁড়াল। তার পা দুটো থরথর করে কাঁপছিল, চোখে অশ্রুর ফোটা গড়িয়ে পড়তে চাইল। সে কোনোমতে রোহানের কাছে এগিয়ে এলো। রোহান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার মুখে কোনো দয়া বা অনুভূতির ছাপ নেই।

শাইমা চোখ দুটো বন্ধ করে, কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো দিয়ে রোহানের ডান গালে প্রথম স্পর্শটা দিল—হালকা একটা চুমু।

রোহান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। শাইমা আবার কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে দ্বিতীয়বার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। আর শেষবার, বিষাদের এক সুদীর্ঘ শ্বাস ফেলে তিন নম্বর কিসটা দিয়ে শাইমা একঝটকায় পিছিয়ে এলো। তার বুক তখন দ্রুত ওঠানামা করছে, অপমানে আর লজ্জায় লাল হয়ে গেছে ফর্সা মুখটা।

রোহান ঘড়ির দিকে তাকাল। তার মুখে একটা জঘন্য জয়ীর হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ঠাণ্ডা গলায় শাইমার দিকে তাকিয়ে বলল, "গুড। জাস্ট পারফেক্ট। যাও, শাড়ি বদলে শুয়ে পড়ো। আজকের মতো ছেড়ে দিলাম।"

শাইমা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বেনারসির ভারী আঁচল সামলে প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকল। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার মনে হচ্ছিল, তার বহু বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব আর অহংকার আজ রোহানের সামনে পুরোপুরি তছনছ হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর শাইমা জামাকাপড় বদলে ঘরে ফিরে দেখল, রোহান সোফায় হেলান দিয়ে ফোন স্ক্রল করছে। সে শাইমার দিকে একবার চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু একটা কথাও বলল না। শাইমা চুপচাপ গিয়ে বিছানার এক কোণে শুয়ে পড়ল। সারা রাতের ক্লান্তি আর মানসিক অত্যাচারে সে কখন যেন চোখের জলে ঘুমে ঢলে পড়ল।

পরদিন সকাল থেকে শুরু হলো নতুন এক জীবন। কিন্তু এই জীবনটা শাইমা যেমনটা ভেবেছিল, তেমন হলো না।

বাড়ির সবার সামনে রোহান ভীষণ ভালো ছেলে, আদর্শ ছোট ভাই আর শায়লার লক্ষ্মী দেবর। কিন্তু শাইমার সাথে তার আচরণ একদম পাল্টে গেল। সে শাইমার সাথে অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা বলত না। যখনই কথা বলত, তার গলায় থাকত এক কঠিন, গম্ভীর আর রাগী মেজাজ।

সকালের নাস্তার টেবিলে যখন সবাই একসাথে বসত, রোহান সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলত। কিন্তু শাইমা যদি তাকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিত, সে মুখ ঘুরিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বলত, "টেবিলে রেখে দাও।"

একদিন দুপুরে শায়লা আর শাইমা একসাথে রান্নাঘরে কাজ করছিল। রোহান পানি খেতে রান্নাঘরে এলো। শায়লা তখন অন্যদিকে মুখ করে কাজ করছিল। রোহানকে দেখে শাইমা একটু ইতস্তত করে বলল, "রোহান... তোমার কি কিছু লাগবে?"

রোহান গ্লাস হাতে নিয়ে শাইমার দিকে একটা রক্তহিম করা দৃষ্টিতে তাকাল। ক্ষীন কণ্ঠে, কেবল শাইমা শুনতে পায় এমনভাবে বলল, "আমার নাম ধরে ডাকার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে? বড় ভাইকে যেমন সম্মান দাও, আমাকেও সেই সম্মান দিয়ে কথা বলবে। বাড়াবাড়ি একদম সহ্য করব না।"

কথাটা বলে রোহান গ্লাসটা টেবিলে সশব্দে রেখে চলে গেল। শাইমা সেখানে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

এই যে রোহানের সারাক্ষণ রাগী মেজাজ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা আর এড়িয়ে চলা—এটা শাইমার বুকের ভেতর এক অজানা যন্ত্রণা তৈরি করতে লাগল। সে ভাবত রোহান হয়তো তাকে জ্বালানোর জন্য দুষ্টুমি করবে, তাকে জ্বালাতন করবে—যেমনটা বিয়ের আগে করত। কিন্তু এই নিস্তব্ধ, রাগী রোহানকে সে যেন সহ্য করতে পারছিল না।

কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। বাড়ির বড় বউ শায়লা আর ছোট বউ শাইমা সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। শাইমা এখন আর সেই আগের ধামাকাদার, অহংকারী মেয়েটা নেই। রোহানের এই রূপ তার ভেতরের সব তেজ মুছে দিয়েছে। সে এখন অনেকটাই শান্ত, চুপচাপ। কিন্তু তার মন সারাক্ষণ একটা অস্থিরতায় ভুগত—কেন রোহান তার সাথে এমন রুক্ষ আচরণ করে? কেন তার সেই আগের মিষ্টি দুষ্টুমিগুলো হারিয়ে গেল?

শাইমা একা ঘরে বসে ভাবত, সেদিন ছাদে রোহানকে চড় মারাটা কি তার সত্যিই খুব বড় ভুল ছিল? একটা চড়ের বদলা নিতে গিয়ে রোহান কেন তার হৃদয়টাকে প্রতিদিন এভাবে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে?

বাড়ির বাতাসটা শাইমার জন্য দিন দিন আরও ভারী হয়ে উঠছিল। বিয়ের পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে, কিন্তু রোহানের রুক্ষ আর শীতল ব্যবহারে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। যে ছেলেটার উপস্থিতি পুরো বাড়িতে আনন্দের জোয়ার ভাসিয়ে দিত, সেই ছেলেটাই শাইমার সামনে এলে একেবারে বরফের মতো শক্ত হয়ে যেত। সবার সঙ্গে হাসিমুখের রোহান আর শাইমার সামনে এক কঠিন, রাগী রোহান—এই দুই রূপের পার্থক্য শাইমাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

শাইমা এখন আর আগের মতো অহংকার দেখায় না। তার চালচলন, কথাবার্তায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। ঘরের দায়িত্ব পালন করা থেকে শুরু করে শাশুড়ি ও বড় বোন শায়লার যত্ন নেওয়া—সবকিছুতেই সে সুপ্রশিক্ষিত বড় বাড়ির লক্ষ্মী বধূর মতো আচরণ করতে লাগল। কিন্তু মনের ভেতর এক গভীর হাহাকার তাকে তাড়িয়ে বেড়াত।

একদিন রাতে রোহান বেশ দেরিতে ঘরে ফিরল। অফিস আর বাবার ব্যবসার কাজ সামলে সে বেশ ক্লান্ত। ঘরে ঢুকে দেখল শাইমা বিছানায় বসে বই পড়ছিল। রোহানকে দেখেই সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।

"আপনি খাবেন? আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি..." শাইমা খুব সাবধানে, নিচু স্বরে বলল।

রোহান শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে শাইমার দিকে না তাকিয়েই রুক্ষ গলায় বলল, "না। বাইরে খেয়ে এসেছি। আমায় নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, নিজের কাজ করো।"

রোহানের এই কাটা কাটা কথাটায় শাইমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে একটু এগিয়ে এসে বলল, "আপনাকে তো আজকাল ঘরেই পাওয়া যায় না। সারাদিন এভাবে এড়িয়ে চলছেন কেন? আমার ওপর রাগ থাকলে সামনাসামনি বলুন, কিন্তু এমন অচেনা মানুষের মতো আচরণ করবেন না প্লিজ।"

রোহান থমকে দাঁড়াল। তারপর শাইমার খুব কাছে এসে তার চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে মিষ্টি কোনো ছোঁয়া ছিল না, ছিল কেবল শাঁসানো এক গভীরতা।

"অচেনা মানুয?" রোহান একটু বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, "তুমি তো এটাই চেয়েছিলে শাইমা, তাই না? আমি যেন তোমার সীমানার বাইরে থাকি! তোমার অহংকারে যেন আঘাত না লাগে! এখন আমি আমার সীমানায় আছি, তাতেও তোমার সমস্যা?"

"রোহান, আমি... আমি সেদিন ভুল করেছি," শাইমা অপরাধীর মতো চোখ নিচু করে ফেলল। জীবনের প্রথমবার সে নিজের ভুল স্বীকার করল।

রোহান গম্ভীর গলায় বলল, "ভুল আর অন্যায়ের তফাত আছে শাইমা। যাই হোক, আমার ঘুমানোর সময় হয়েছে। দয়া করে তর্ক কোরো না।"

কথাটা বলে রোহান তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। শাইমা বিছানার এক কোণে বসে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। সে আজ স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, রোহানের মন থেকে সেই অপমানটা মোছা এত সহজ নয়। সে নিজের হাতেই তাদের সম্পর্কের সব সম্ভাবনা পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।

পরদিন বিকেলে রোহানের হঠাৎ ভীষণ জ্বর এলো। গায়ে প্রচণ্ড তাপ, কপালে হাত রাখা যাচ্ছে না। খবর পেয়ে শাশুড়ি আর শায়লা ব্যস্ত হয়ে উঠলেও শাইমা পুরো সময়টা রোহানের পাশে বসে রইল। সে বরফজল দিয়ে রোহানের কপালে পট্টি দিতে লাগল, সারা রাত একফোঁটা চোখের পাতা এক করল না।

জ্বরের ঘোরে রোহান একবার শাইমার হাতটা আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে উঠল, "খুব অহংকার না তোমার... সব ভাঙব আমি..."

শাইমা রোহানের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চোখে জল নিয়ে বলল, "ভেঙে তো গেছে রোহান। আমার সব অহংকার তো তোমার কাছেই হেরে গেছে। আর কত শাস্তি দেবে আমাকে?"

সকালে যখন রোহানের জ্ঞান ফিরল, সে দেখল শাইমা তার খাটের পাশে মেঝেবসে মাথা হেলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কপালে তখনও জলপট্টির কাপড়টা ভেজা। রোহান কিছুক্ষণ নিঃশব্দে শাইমার শান্ত, ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শাইমার চোখের কোণে জল শুকিয়ে যাওয়ার দাগ স্পষ্ট। রোহানের কঠোর মনের কোনো এক কোণে কি যেন একটা ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, শাইমা আর সেই আগের রাগী, অহংকারী মেয়েটি নেই।

কিন্তু রোহান এত সহজে নিজের জেদ ছাড়ার পাত্র নয়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার সেই গম্ভীর ভাবটা ফিরিয়ে আনল।

কয়েক দিন পর, রোহান সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের মধ্যের এই অদৃশ্য দেয়ালটা যেন আরও রহস্যময় রূপ নিল। শাইমা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রোহানের খেয়াল রাখতে শুরু করেছে, আর রোহানও তা চুপচাপ সহ্য করছে, যদিও মুখে সেই রাগী ভাবটা বজায় রেখেছিল।

একদিন সকালে বৃষ্টি নামল। ঝুম বৃষ্টিতে চারপাশ ঝাপসা হয়ে এসেছে। রোহান অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু আবহাওয়ার কারণে বের হতে পারছিল না। সে ঘরে ঢুকেই দেখল শাইমা সবেমাত্র গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে।

ভিজা চুলে গামছা পেঁচানো, পরনে হালকা রঙের একটা সুতির শাড়ি। শাইমাকে দেখে রোহানের বুকের ভেতর হঠাৎ এক অনাস্বাদিত আলোড়ন সৃষ্টি হলো। সে দরজার কাছেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

ভিজা চুলে গামছা পেঁচিয়ে শাইমা যখন ওয়াশরুম থেকে বের হলো, তখন ঘরের আবহাওয়া একদম বদলে গেছে। বাইরের ঝুম বৃষ্টির শব্দ আর ঘরের ভেতরের এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা মিলে পরিবেশটাকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। শাইমা তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল মুছতে মুছতে এগোচ্ছিল, কিন্তু দরজার কাছে রোহানকে একদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে আচমকা থমকে গেল।

রোহানের চোখ দুটি শাইমার ওপর স্থির। সেই চোখে আগের মতো কোনো শাঁসানো রাগ বা বরফের মতো শীতলতা ছিল না; সেখানে জ্বলজ্বল করছিল এক তীব্র আকুলতা আর গভীর ভালোবাসা।

শাইমা একটু ইতস্তত করে নিচু স্বরে বলল, "আ... আপনি অফিসে যাবেন না? বৃষ্টি তো খুব জোরে এসেছে..."

রোহান কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে শাইমার দিকে পা বাড়াল। রোহানের এই নিঃশব্দ অগ্রগতি দেখে শাইমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এতদিনের সেই রাগী রোহানকে দেখে সে অভ্যস্থ, কিন্তু আজকের এই শান্ত অথচ গভীর রোহানকে দেখে তার হাত-পা কাঁপতে লাগল।

রোহান শাইমার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে এখন কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। শাইমা ভয়ে আর লজ্জায় চোখ নিচু করে ফেলল।

হঠাৎ রোহান নিজের হাত বাড়িয়ে শাইমার হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে নিল। শাইমা চমকে উঠে রোহানের দিকে তাকাল। রোহান শাইমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব যত্ন করে, পরম মমতায় তোয়ালেটা দিয়ে তার ভেজা চুলগুলো মুছিয়ে দিতে শুরু করল। রোহানের হাতের স্পর্শে শাইমার শরীরজুড়ে এক অচেনা শিউরোন বয়ে গেল।

"রোহান... আপনি..." শাইমার গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।

"চুপ," রোহান ফিসফিস করে বলল। তার গলার স্বর ভারী আর নেশাক্ত। "অনেক দিন তো হলো রাগ আর প্রতিজ্ঞার খেলা। আজ একটু থামি?"

রোহান তোয়ালেটা পাশে ফেলে দিল। তারপর শাইমার গালের পাশে জমে থাকা একফোটা জল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে মুছে দিল। শাইমার মুখের খুব কাছাকাছি ঝুকে এসে রোহান বলল, "অনেক শাস্তি দিয়েছ আমাকে, আবার আমিও কম দিইনি। কিন্তু জানো শাইমা? তোমাকে ছাদের রাতে প্রথম দেখার পর থেকে এই মনটা কেবল তোমাকেই চেয়ে এসেছে। তোমার ওই অহংকার ভাঙার জেদটা আসলে তোমাকে নিজের করে পাওয়ার এক বাহানা ছিল মাত্র।"

কথাগুলো বলতে বলতে রোহান শাইমার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে এক ঝটকায় নিজের একদম কাছে টেনে নিল। শাইমার বুকটা রোহানের চওড়া বুকের সাথে মিশে গেল।

"আজও কি চড় মারবে?" রোহান শাইমার ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এনে রহস্যময় হেসে জিজ্ঞেস করল। "আজও কি অহংকার দেখাবে?"

শাইমার চোখে তখন আর কোনো রাগ নেই, কোনো ভয় নেই। সেখানে কেবল জমা হয়ে আছে এতদিন ধরে জমতে থাকা এক রাশ ভালোবাসা। রোহানের এমন মিষ্টি আর রোমান্টিক রূপ দেখে শাইমার চোখের কোণ দিয়ে দু-ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।

শাইমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার দুই হাত দিয়ে রোহানের গলা জড়িয়ে ধরল। নিজের সব লজ্জা, সব ভয় আর অতীত দুঃখ ভুলে গিয়ে সে রোহানের বুকের মধ্যে মুখ লুকাল। সে শক্ত করে রোহানকে জড়িয়ে ধরে রইল, যেন এই পরম আশ্রয়টা সে আর কোনোদিন হারাতে চায় না।

রোহান শাইমার মাথায় নিজের মুখ রেখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির সুবাস নিল। সে শাইমার চুলগুলো স্পর্শ করে একটু দুষ্টুমির ছলে ফিসফিস করে বলল, "যাক! অবশেষে অহংকারী রাজকন্যাকে কাবু করা গেল! তবে মনে রেখো, আমার ওপর রাগ দেখালে কিন্তু আবার সেই তিন কিসের শাস্তি জারি হবে!"

শাইমা রোহানের বুকে মুখ গুঁজেই একগাল হেসে উঠল। রোহানও হেসে ফেলল।

....
👁 64