ছাদের দুর্ঘটনায় বদলালো সম্পর্ক

পুরান ঢাকার বেশ পরিচিত এক দোতলা বাড়ি, নাম ‘খান ভিলা’। লাল ইটের পুরোনো দিনের বাড়ি হলেও সংস্কার করে বেশ চকচকে রাখা হয়েছে। এই বিশাল যৌথ পরিবারে মান-অভিমান, হাঁস-মুরগির ডাক, আর বাচ্চাদের হইচই কখনো থামে না। বাড়ির পুরো নিয়ন্ত্রণ বড় চাচা আর ছোট চাচার হাতে। বাংলাদেশি গৃহস্থ বাড়ির আসল যে আবহ—সকালে চায়ের কাপে খবরের কাগজ ঝাঁকানো, উঠোনে রোদ পোহানো, আর মেজ খালার মসলা বাটার ঠকঠক শব্দ—সবকিছুই এই পরিবারে আছে।

এই যৌথ পরিবারের দুই মেরুর দুই ব্যক্তিত্ব হলো নিরব আর দিয়া। তারা সম্পর্কে আপন চাচাতো ভাই-বোন। নিরব ছোট চাচার ছেলে, আর দিয়া বড় চাচার মেয়ে। নিরব দেখতে যেমন লম্বা-চওড়া, স্বভাবটা ঠিক ততটাই ফাজিল আর দুষ্টু। সারা দিন তার কাজই হলো পুরো বাড়ির মানুষকে কোনো না কোনো ঝামেলায় ফেলা, আর বিশেষ করে দিয়াকে জ্বালানো। অন্যদিকে দিয়া হলো প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, অসম্ভব রাগী আর পড়াশোনায় দারুণ সিরিয়াস এক মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রী সে। দিয়ার রাগ আবার এক সেকেন্ডে মাথায় ওঠে। আর নিরবের কাজই যেন সেই রাগের আগুনে ঘি ঢালা।

সকাল সকাল খান ভিলার চারতলা ছাদটা বেশ নীরব থাকে। শীতের মিঠে রোদ উঠেছে। দিয়া তার ভালোবাসার গাছগুলোতে পানি দিতে ছাদে এসেছে। নীল রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পরে চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। হাতে নীল রঙের একটা প্লাস্টিকের মগ, তা দিয়ে ভালোবাসার পাতাবাহার আর গোলাপ গাছগুলোতে পানি ঢালছিল সে। গুণগুণ করে একটা রবীন্দ্রসংগীতও গাইছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে কোনো শব্দ না করে নিরব এসে দাঁড়াল। হাতে তার প্রকাণ্ড এক কাগজের ঠোঙা। মুখটা টিপে টিপে হাসছে। নিরব পরনে একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর জিন্স পরে আছে। তার চোখেমুখী দুষ্টুমির এক অদ্ভুত ঝলক।

দিয়া যখন গোলাপ গাছে পানি দিতে ব্যস্ত, নিরব একদম দিয়ার পিঠের কাছে গিয়ে খুব জোর গলায় চ্যাঁচাল, "ওরে বাপরে! গাছে মেছো ভূত ধরেছে রে!"

হঠাৎ এই বিকট শব্দে লাফিয়ে উঠল দিয়া। হাতের পানির মগটা ছিটকে পড়ল নিচে। জামার অর্ধেকাংশ ভিজে গেল। বুকের ভেতর হাত দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পেছনে ঘুরল দিয়া। নিরব তখন দুই হাত পেটে দিয়ে হা-হা করে হাসছে।

দিয়ার চোখ দিয়ে যেন একেবারে আগুন ঝরছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "নিরব! তোমার লজ্জা করে না? দিনে দুপুরে এভাবে কেউ কাউকে ভয় দেখায়? তুমি কি কখনো মানুষ হবে না?"

নিরব হাসতে হাসতেই পকেট থেকে একটা শুকনা মরিচ বের করে বলল, "রাগলে তোকে ঠিক এই বঙ্গাল শুকনা মরিচটার মতো লাল দেখায়, রে রাক্ষসী! তোর রাগের থার্মোমিটার দেখলে তো এখন বৈজ্ঞানিকরাও গবেষণা ছেড়ে দেবে।"

"তুমি আমাকে রাক্ষসী বললে?" দিয়া এক পা এগিয়ে গেল। "বড় ফুপি ঠিকই বলে, তুমি একটা আস্ত বাঁদর! বাড়ির সবচেয়ে বেয়াদব ছেলে।"

"আহা, ছোট ফুপি কিন্তু বলে আমি এই বাড়ির সবচেয়ে হ্যান্ডসাম আর লক্ষ্মী ছেলে," নিরব দিয়ার দিকে মুখ বিকৃত করে ভেংচি কাটল। "তোর মতো সব সময় চণ্ডী রূপ ধরে থাকি না তো, তাই সবাই আমাকে ভালোবাসে।"

দিয়া আর সহ্য করতে পারল না। পাশের টব থেকে শুকনো মাটির একটা টুকরো তুলে নিয়ে সোজা ছুড়ে মারল নিরবের দিকে। নিরব চট করে মাথা সরিয়ে চোর-পুলিশের মতো হেসে তা এড়িয়ে গেল।

"ইস! নিশানা একদম বাজে! ক্লাসে তো খুব ফিজিক্সের গতিবিদ্যা পড়িস, বলের প্রয়োগটা তো ঠিকমতো হলো না রে ম্যাডাম!" নিরব মিটিমিটি হাসতে লাগল।

"তুমি আজ আমার হাতে মরবে নিরব! একদম শেষ করে ফেলব তোমাকে!" দিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চারপাশের যা পাচ্ছে তা-ই কুড়াতে লাগল।

নিরব ছাদের এক কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভেংচি কেটে বলল, "ধর তো দেখি! এত বড় তেজ দেখাচ্ছিস, আয় ধর দেখি আমাকে!"

ছাদের এক পাশে ইটের কিছু পুরোনো গাঁথুনি আর ভিজে থাকা শ্যাওলা পড়া অংশ ছিল। সেদিকে দিয়ার খেয়াল ছিল না। সে রাগের মাথায় একদৃষ্টে নিরবের দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে এগোতে লাগল।

নিরব হাসতে হাসতেই সতর্ক করতে চাইল, "এই দিয়া, থাম! ওদিকটা কিন্তু পিছল—"

কিন্তু নিরবের কথাটা শেষ করার আগেই যা ঘটার ঘটে গেল।

দিয়া দ্রুত এগোতে গিয়ে শ্যাওলা পড়া পিচ্ছিল ইটগুলোতে পা দিয়ে আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। তার ডান পা পিছলে গেল। শরীরটা উল্টে গিয়ে ছাদের কম উচ্চতার বাউন্ডারি ওয়ালের দিকে হেলে পড়ল।

"নিরব—!" দিয়ার মুখ থেকে শুধু একটা বিকট আতঙ্কের চিৎকার বের হলো।

নিরবের মুখের সব হাসি এক সেকেন্ডে উবে গেল। চোখের পলকে সে বুঝতে পারল কী মারাত্মক বিপদ হতে যাচ্ছে। দিয়া ছাদের কিনারা দিয়ে সোজা নিচে পড়ে যাচ্ছে!

"দিয়া!"

নিরব এক দৌড়ে ছাদের সীমানার দিকে ছুটল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দিয়ার হাত ছাদের দেয়াল ঘেসে ছিটকে গেল, আর তার দেহটি বাতাস চিরে সোজা চারতলা ছাদ থেকে নিচের উঠোনের দিকে পড়ে গেল।

এক বিকট শব্দ আর তার পরপরই সব নিস্তব্ধ।

নিরব থমকে দাঁড়িয়ে গেল ছাদের কার্নিশে। নিচে তাকিয়ে দেখতে পেল—বাড়ির সিমেন্ট বাঁধানো উঠোনে দিয়া নিথর হয়ে পড়ে আছে। তার শাড়ির আঁচল ধুলোয় লুটাচ্ছে, আর মাথায় থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে ফ্লোরটা ভেসে যাচ্ছে।

"দিয়া...!" নিরব বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল। তার পুরো পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। দুষ্টুমি, শয়তানি, হাসি—সব কিছু বিলীন হয়ে এক মারাত্মক শূন্যতা আর ভয়াবহ আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে ফেলল। সে এক সেকেন্ডও না ভেবে পাগলের মতো চারতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল।

সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে নামার সময় নিরবের পা দুবার মচকে যাওয়ার উপক্রম হলো, কিন্তু তার কোনো খেয়াল নেই। তার মাথায় তখন শুধু একটা দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে—উঠোনে নিথর হয়ে পড়ে থাকা রক্তে ভেজা দিয়া। চারতলা থেকে উঠোনে নেমে আসতে নিরবের মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল, অথচ মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল।

উঠোনে আসতেই বাড়িতে এক হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে গেল। দিয়ার মা, অর্থাৎ বড় চাচি চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন, "আমার দিয়া রে! কে আমার বুক খালি করল রে!"

বড় চাচা থমকে দাঁড়িয়ে আছেন, তার শরীর কাঁপছে। ছোট চাচা আর বাড়ির চাকুরটি দৌড়ে এসে দিয়াকে তোলার চেষ্টা করছেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সিমেন্টের ফ্লোর। দিয়ার কোনো সাড়াশব্দ নেই, চোখ দুটো আধবোজা, কপাল আর মাথার এক পাশ দিয়ে অঝোরে রক্ত ঝরছে।

নিরব এক দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল দিয়ার পাশে। তার নিজের হাত দুটি থরথর করে কাঁপছিল।

"দিয়া! দিয়া, চোখ খোল! প্লিজ, আমার দিকে তাকা!" নিরব দিয়ার মুখটা আলতো করে নিজের কোলে তুলে নিল। তার ধবধবে সাদা টি-শার্টের হাতা মুহূর্তেই দিয়ার লাল রক্তে ভিজে গেল।

দিয়া হালকা একটু গোঙানির শব্দ করল, তারপর পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ল।

"চাচা! কান্না করার সময় এটা না, গাড়ি বের করুন! তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিয়ে যেতে হবে!" নিরব একরকম চিৎকার করে উঠল। তার গলায় ভয়ের চরম রূপ স্পষ্ট।

বাড়ি থেকে কাছেই পুরান ঢাকার এক বড় বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলো দিয়াকে। নিরব নিজে কোলে করে দিয়াকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেল। তার শার্ট, ট্রাউজার আর হাত—সব জায়গায় দিয়ার জমাট বাঁধা রক্ত। হাসপাতালে ঢোকার পর ডাক্তাররা দ্রুত স্ট্রেচারে করে দিয়াকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলেন।

"আপনারা বাইরে অপেক্ষা করুন," একজন নার্স আইসিইউ আর ইমার্জেন্সির মাঝের দরজাটা আটকে দিলেন।

হাসপাতালের ঠান্ডা আর স্যাঁতসেঁতে করিডোরে খান ভিলার সবাই এসে জমা হলো। বড় চাচি ফ্লোরে বসে বিলাপ করছেন, বড় চাচা দেয়াল ধরে চোখ মুছে যাচ্ছেন। ছোট চাচা আর ছোট মামী সবাই এসে পড়েছেন। সবার মুখে একটাই কথা—কীভাবে ঘটল এমন ঘটনা?

বড় চাচি হঠাৎ নিরবের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ। "তুই! তুই-ই তো ছিলি ছাদে! আমার মেয়েটা একা কোনো দিন চারতলার ছাদের ওই কোণে যায় না! কী করেছিস তুই আমার মেয়ের সাথে? বল নিরব!"

নিরব দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কথা বলার মতো ভাষা বা ক্ষমতা কোনোটাই তার ছিল না। তার চোখের সামনে কেবল দিয়ার সেই ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ঘুরছিল। সে যদি আজ ফাজিলামো না করত, সে যদি শুকনো মরিচ দেখিয়ে রাগিয়ে না তুলত, তবে দিয়া কখনো ওভাবে দৌড়ে আসতে যেত না। এই রক্ত, এই মৃত্যুযন্ত্রণা—সবকিছুর পেছনে একমাত্র দায়ী সে নিজে।

"আমি... আমি শুধু একটু ফাজিলামো করছিলাম চাচি..." নিরবের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। এই ফাজিল, বেপরোয়া নিরবকে বাড়ির কেউ কখনো কাঁদতে দেখেনি।

"তোর ফাজিলামোর খেসারত কি আজ আমার মেয়ে তার জীবন দিয়ে দেবে?" বড় চাচি চিৎকার করে উঠলেন।

ছোট চাচা এগিয়ে এসে বড় চাচিকে থামানোর চেষ্টা করলেন, "ভাবি, শান্ত হন। নিরব ইচ্ছা করে কিছু করেনি। এখন কান্নাকাটি বা ঝগড়া করার সময় নয়, দিয়ার জন্য দোয়া করুন।"

কিন্তু নিরব নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিল না। সে ধপ করে ইমার্জেন্সির দরজার সামনের বেঞ্চে বসে পড়ল। দুহাতে মাথা চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। মনে মনে বারবার বলতে লাগল, 'আল্লাহ, তুমি আমার প্রাণ কেড়ে নাও, কিন্তু দিয়াকে ভালো করে দাও। আমি আর কখনো ওকে জ্বালাব না, কোনো দিন ওর সামনে গিয়ে বেয়াদবি করব না। খালি ও একবার চোখ মেলুক।'

প্রায় দুই ঘণ্টা পর ইমার্জেন্সি রুম থেকে প্রবীণ ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।

সবাই ডাক্তারকে ঘিরে ধরল। বড় চাচা হাতজোড় করে জিজ্ঞেস করলেন, "ডাক্তার সাহেব, আমার মেয়েটা কেমন আছে?"

ডাক্তার সিরিয়াস মুখে মাস্কটা থুতনিতে নামিয়ে বললেন, "প্যাশেন্টের অবস্থা ভালো নয়। চারতলা থেকে পড়ার কারণে মাথায় মারাত্মক আঘাত লেগেছে। মাথায় ইমার্জেন্সি সার্জারি করতে হবে। এছাড়া ডান হাতের হাড় ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেছে আর রিবসের দুটো হাড় ক্রেক করেছে। ইন্টারনাল ব্লিডিং থামানোটা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত ক্রিটিকাল।"

কথাটা শুনেই বড় চাচি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ছোট চাচি আর নার্সরা তাঁকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ডাক্তার ফাইল সই করার জন্য কাগজ এগিয়ে দিলেন, "তাড়াতাড়ি ব্লাড ম্যানেজ করুন। 'ও পজিটিভ' ব্লাড লাগবে অন্তত চার ব্যাগ। অপারেশনের জন্য প্রিপারেশন নিন।"

"আমার রক্ত 'ও পজিটিভ'!" নিরব সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার গলাটা কাঁপলেও চোখে একটা অদ্ভুত জেদ ফুটে উঠল। "আমার যতটুকু ব্লাড লাগে নিন ডাক্তার সাহেব। আমার পুরো শরীর কেটে রক্ত নিলেও নেন, কিন্তু দিয়ার যেন কিছু না হয়।"

ডাক্তার নিরবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঠিক আছে, আপনি ব্লাড ব্যাংকে চলুন। রক্ত দেওয়ার পর অপারেশনের পেপারসে সই করতে হবে।"

রক্ত দেওয়ার জন্য বেডে শুয়ে যখন রক্ত নেওয়া হচ্ছিল, নিরব স্যালাইনের স্ট্যান্ডের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। রগে ছুঁচ ফোটার ব্যথাটা তার কাছে কিছুই মনে হচ্ছিল না। তার বুকের ভেতর একটা নতুন অনভূতি দানা বাঁধতে শুরু করেছে—এক অদ্ভুত যন্ত্রণা আর ব্যাকুলতা। সে বুঝতে পারল, যাকে সে সারা দিন জ্বালিয়ে মারত, যার রাগী মুখটা দেখার জন্য হাজারটা শয়তানি করত, সেই দিয়া তার জীবনের কতটা জুড়ে আছে।

নিরব চোখ বন্ধ করল। নলের ভেতর দিয়ে লাল রক্ত ক্যাথেটারে জমা হচ্ছে, আর নিরব মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছে, দিয়াকে সুস্থ করে তোলার জন্য সে নিজের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত বাজি রাখবে।

অপারেশন থিয়েটারের বাইরের লাল বাতিটা টানা চার ঘণ্টা ধরে জ্বলছে। খান ভিলার পরিবেশটা একদম নিস্তব্ধ, থমথমে। কেউ কোনো কথা বলছে না। নিরব হাসপাতালের করিডোরের এক কোণে ও পজিটিভ রক্তের দুটি ব্যাগ খালি করে একাই চুপচাপ বসে ছিল। তার পরনে এখনো দিয়ার রক্তে ভেজা টি-শার্ট। কাকিমা কিংবা অন্য কেউ তাকে শার্ট পরিবর্তন করার কথা বললেও সে শোনেনি। এই রক্ত যেন তার অপরাধবোধের প্রতীক।

রাত প্রায় তিনটার দিকে অপারেশন থিয়েটারের বাতি নিভে গেল। ডক্টর রশীদ বাইরে বেরিয়ে এলেন। চোখেমুখে ক্লান্তি।

বড় চাচা ছুটে গেলেন, "ডাক্তার সাহেব! আমার মেয়ে?"

"অপারেশন সফল হয়েছে," ডাক্তার রশীদের কথায় সবাই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তবে তিনি থামলেন না, "কিন্তু এখনই কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। ব্রেইনের হেমাটোমা সরাতে পেরেছি, তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টা ওনাকে ভেন্টিলেশনে আইসিইউতে রাখা হবে। নিউরোলজিক্যাল রেসপন্স কেমন আসে তা দেখার পরেই আমরা নিশ্চিত হতে পারব কোনো স্থায়ী ক্ষতি হলো কি না।"

দিয়াকে ইমার্জেন্সি থেকে আইসিইউতে শিফট করা হলো। কাচের বড় জানালার ওপারে বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে দিয়া। মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকে আর হাতে বিভিন্ন সেন্সরের তার জড়ানো। পাশে থাকা মেশিনে তার হৃদস্পন্দনের 'বীপ বীপ' শব্দ।

সবাই যখন নিচে চা খেতে বা ঘরে বিশ্রাম নিতে গেল, নিরব আইসিইউর বাইরে বেঞ্চে একা বসে রইল। সে কাচের ওপর হাত রেখে একদৃষ্টে দিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। যে মেয়েটা গতকাল সকালেও তার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে শাসন করছিল, আগুনঝরা চোখে রাগ দেখাচ্ছিল, সে আজ যন্ত্রের ভরসায় নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

নিরব ফিসফিস করে কাচে কপাল ঠেকিয়ে বলল, "দিয়া... তোকে আজ বকা দেওয়ার জন্য হলেও একবার চোখ মেলতে হবে। তুই রাগে লাল হয়ে আমার দিকে টব ছুড়ে মারবি না? আমি আর কোনো দিন তোর সামনে বেয়াদবি করব না, তোকে বাঁদর বলব না। প্লিজ তুই একবার ওঠ..."

পরদিন সকাল থেকে নিরব যেন অন্য এক মানুষে পরিণত হলো। বাড়ির সেই ফাজিল, বাচাল ছেলেটা এক নিমেষে উধাও। সে হাসপাতালের বেড শিট পরিবর্তন করা, ওষুধ আনা, টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহ করা—সব একা হাতে সামলাতে শুরু করল। খাবার খাওয়ার কথা বললে সাফ মানা করে দিল।

পরদিন বিকেলে ডক্টর রশীদ নিরবকে আইসিইউতে ঢোকার একটা ছোট অনুমতি দিলেন—একমাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য, জীবাণুমুক্ত বিশেষ পোশাক পরে।

নিরব পা টিপে টিপে দিয়ার বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দিয়ার ফ্যাকাশে, ঠান্ডা হাতটা আলতো করে নিজের হাতের তালুতে নিল। সেই চঞ্চল, সতেজ দিয়া আজ বরফের মতো ঠান্ডা।

নিরব দিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো স্বরে বলল, "তোর সাথে আর কখনো লাগতে যাব না রে দিয়া। তুই শুধু বল তুই কবে বাড়ি ফিরবি? তোর গাছগুলো ছাদ থেকে শুকিয়ে যাচ্ছে, কেউ পানি দিচ্ছে না। তুই না গেলে ওরা যে মরে যাবে।"

বলতে বলতে নিরবের চোখের পানি দিয়ার অবশ হাতের ওপর টপটপ করে গড়িয়ে পড়ল।

ঠিক তখনই এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। দিয়ার হাতের আঙুলটা খুব আলতো করে একটু কেঁপে উঠল। আইসিইউর মনিটরের হৃদস্পন্দনের গতি কিছুটা বেড়ে গেল।

নিরব চমকে উঠে দিয়ার মুখের দিকে তাকাল। দিয়ার চোখের পাতা দুটো খুব ধীরে ধীরে নড়ে উঠছিল, যেন সে গভীর কোনো অন্ধকার থেকে কারো পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।

দিয়ার আঙুল নড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই নিরব পাগলের মতো বাইরে দৌড়ে গেল। "ডাক্তার সাহেব! দেখুন, দিয়ার সেন্স ফিরছে! ওর আঙুল নড়েছে!"

ডাক্তার রশীদ ও ডিউটি নার্সরা দ্রুত আইসিইউতে ঢুকে দিয়াকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর ডাক্তার বাইরে এসে মুখে স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে তুললেন।

"ইটস আ মিরাকেল! দিয়া ভেন্টিলেশনের সাপোর্ট ছাড়াই রেসপন্স করছে। আমরা ওকে সাধারণ কেবিনে শিফট করছি। তবে এখন খুব সাবধানে রাখতে হবে, মানসিকভাবে যেন কোনো চাপ না পায়।"

কথাটা শুনে পুরো খান ভিলার ওপর থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেল। কিন্তু নিরবের মনে যেন এক নতুন অনুভূতি দানা বাঁধতে শুরু করল। সে অনুসূচনার আগুনে পুড়তে পুড়তে বুঝে গেছে, দিয়াকে ছাড়া তার অস্তিত্ব কতটা অর্থহীন। দিয়ার কেবিনে শিফট হওয়ার পর থেকে নিরব দিন-রাত এক করে কেবিনের বাইরে বা এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকত।

দিয়ার যখন পূর্ণ জ্ঞান ফিরল, তখন তার পাশে বসা ছিল বড় চাচি। দিয়া দুর্বল কণ্ঠে আশপাশে কাউকে খুঁজছিল। তার চোখ দুটো কেবিনের দরজার দিকে তাকাতেই সেখানে দেখতে পেল নিরবকে। নিরবের মুখটা শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কালি, আগের সেই চঞ্চল ভাবটার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই।

দিয়া হালকা হেসে ফিসফিস করে বলল, "বাঁদরটার চেহারা একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে..."

কথাটা নিরবের কানে যেতেই তার চোখ আবার জলে ভরে উঠল। সে কাছে এসে মাথা নিচু করে বলল, "আমাকে মাফ করে দে দিয়া। আমার জন্যই আজ তোর এই অবস্থা। আমি আর কখনো তোকে ডিস্টার্ব করব না।"

দিয়া খুব কষ্ট করে তার হাতটা একটু বাড়াল। নিরব সে হাতটা ছুঁতেই দিয়া আস্তে করে বলল, "আমার ওপর রাগ করে এভাবে ভূত হয়ে থাকার কোনো দরকার নেই। তুই তো ইচ্ছা করে ফেলে দিসনি..."

পরের কয়েকদিন নিরব ছায়ার মতো দিয়ার সেবা করে গেল। নার্সরা ড্রেসিং করতে এলে দিয়া যখন যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠত, নিরব তখন শক্ত করে দিয়ার হাত চেপে ধরে রাখত। দিয়াকে চামচে করে স্যুপ খাইয়ে দেওয়া, সময়মতো ওষুধ দেওয়া—সবকিছু নিরব নিজ হাতে করতে লাগল। দিয়াও লক্ষ্য করল, সেই ফাজিল ছেলেটার বদলে এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পরম যত্নশীল এক পুরুষ, যার চোখে তার জন্য সীমাহীন ভালোবাসা আর উদ্বেগ।

এক রাতে, দিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর কেবিনে শুধু নিরব আর বড় চাচা ছিল। নিরব হঠাৎ বড় চাচার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

বড় চাচা অবাক হয়ে বললেন, "কী রে নিরব, কী করছিস?"

নিরব ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, "বড় চাচা, আমি দিয়াকে অনেক ভালোবাসি। এতদিন বুঝতে পারিনি, কিন্তু ওকে হারানোর ভয়ে আমার বুক চিরে যাচ্ছিল। আমি দিয়াকে এই হাসপাতালেই, এই অবস্থাতেই নিজের স্ত্রী করে নিতে চাই। আমি ওর দায়িত্ব সারাজীবনের জন্য নিতে চাই।"

কথাটা শুনে বড় চাচা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বড় চাচি আর ছোট চাচাও কথাটা শুনলেন। বড় চাচি সাথে সাথে কেবিনে ঢুকে তীব্র বিরোধিতা করলেন, "এ কোনোভাবেই সম্ভব না! ছেলেমানুষি করার জায়গা পাওনি? দিয়া এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, আর তুই আজ অপরাধবোধ থেকে এসব বলছিস! কাল সকালে অন্য কিছু মনে হলে তখন কী হবে?"

খান ভিলার যৌথ পরিবারে এক বিশাল ঝড়ের হাওয়া বইতে শুরু করল। পরম ভালোবাসার মাঝেই পরিবারে তৈরি হলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব ও পারিবারিক টানাপোড়েন।

নিরবের আকস্মিক প্রস্তাব খান ভিলার শান্ত দীঘিতে এক বিশাল পাথর ছুড়ে মারল। কেবিনের ভেতরেই শুরু হলো পারিবারিক তর্কাতর্কি। বড় চাচি কিছুতেই এই বিয়ে মেনে নিতে রাজি নন। তাঁর সোজা কথা—অনুতাপের মাথায় এসে নিরব এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা আবেগ ছাড়া আর কিছু নয়। অন্যদিকে, ছোট চাচা ও চাচি নিরবের পক্ষে দাঁড়ালেন। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারে বেড়ে ওঠা দুই ছেলে-মেয়ের মন বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

বড় চাচি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, "আমার মেয়েটা হাসপাতালের বেডে জীবন-মৃত্যুর সাথে লড়ছে, আর তোমরা এসব সম্পর্কের খেলা খেলছ? নিরব নিজের ভুল ঢাকতে আমার মেয়েকে দয়া করতে চাইছে!"

"দয়া নয় চাচি, এটা প্রেম," নিরবের চোখ দিয়ে তখনো অশ্রু গড়াচ্ছে, কিন্তু গলার আওয়াজ দৃঢ। "দিয়া সুস্থ হলেও আমি ওকে একইভাবে চাইতাম। ও যদি সারা জীবন বিছানায় শুয়েও থাকে, আমি ওর পাশে থাকব। আমাকে শুধু একটা সুযোগ দিন।"

বিছানা থেকে দিয়া দুর্বল হাতে স্যালাইনের নলটা ধরে সব শুনছিল। সে আস্তে করে ডাকল, "মা..."

সবাই চুপ হয়ে গেল। দিয়া বড় চাচির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "নিরব অনুশোচনায় ভুগছে না মা। ও যেদিন থেকে হাসপাতালে আমার সেবা করছে, ওর চোখ দেখে আমি বুঝেছি সে আমাকে কতটা আগলে রাখে। আমি নিরবকে বিশ্বাস করি। তুমি ওদের ভুল বুঝো না।"

দিয়ার কথা শুনে বড় চাচির চোখের পানি আর আটকে রইল না। তিনি বুঝতে পারলেন, দুই তরফেই অনুভূতির গভীরতা কতটা সত্য। পরিবারের অন্য মুরুব্বিরাও এগিয়ে এলেন। বড় চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিরবের কাঁধে হাত রাখলেন, "তোর ভালোবাসা যদি এতটাই খাঁটি হয় নিরব, তবে আমরা আর বাঁধা দেব না। কিন্তু তোকে কথা দিতে হবে, দিয়ার এই অসুস্থ সময়ে ওর গায় একটুও আঁচ আসতে দিবি না।"

সেদিন রাতেই হাসপাতালের কেবিনেই এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হলো। কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো ব্যান্ড বা আলোকসজ্জা। কেবিনের ভেতরেই কাজি ডেকে আনা হলো।

রোগীর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে এক সাধারণ সাদা পাঞ্জাবি পরা নিরব এবং মাথায় হালকা লাল ওড়না জড়ানো অসুস্থ দিয়া। হাসপাতালের ওই ঠান্ডা ঘরে, বিপি মনিটরের হালকা শব্দের মাঝে কাজি সাহেব কাবিননামা এগিয়ে দিলেন।

দিয়া কাঁপা হাতে সই করল, আর নিরব দৃঢ় হাতে নিজের নাম লিখল। কবুল বলার পর নিরব যখন দিয়ার কপালে এক পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় প্রথম চুমু খেল, তখন পুরো কেবিনে এক আনন্দ-অশ্রুর বন্যা বয়ে গেল।

বিয়ের পরদিন থেকেই নিরবের সেবার মাত্রা আরো বেড়ে গেল। সে শুধু এখন আর চাচাতো ভাই নয়, সে এখন দিয়ার স্বামী ও জীবনসঙ্গী। দিয়াকে নতুন করে হাঁটার ফিজিওথেরাপি দেওয়া, চামচে করে খাইয়ে দেওয়া আর তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেওয়া—সবকিছু নিরব নিজের দায়িত্বে তুলে নিল।

ডাক্তাররা বেশ অবাক হলেন দিয়ার দ্রুত উন্নতির গতি দেখে। ভালোবাসার ওষুধ যেন কোনো কেমিক্যাল ওষুধের চেয়েও দ্রুত কাজ করছিল। কয়েক সপ্তাহের চিকিৎসায় দিয়া আস্তে আস্তে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে শিখল। অবশেষে সেই দিনটি এলো, যখন ডাক্তাররা দিয়াকে ছাড়পত্র দিলেন এবং নিরব দিয়ার হাত ধরে তাকে খান ভিলায় ফিরিয়ে নিয়ে এলো—এবার বোন হিসেবে নয়, বাড়ির বউ হিসেবে।

হাসপাতাল থেকে খান ভিলায় ফিরে আসাটা দিয়ার জন্য ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতার সূচনা। গৃহপ্রবেশের পর বড় চাচি দিয়াকে বরণ করে নিলেন ভালোবাসা আর স্নেহে। এতদিন যে পরিবারে নিরব আর দিয়ার সম্পর্ক ছিল বিড়াল আর ইঁদুরের মতো, সেই ঘরেই এখন এক পরম অনুরাগের ছায়া।

নিরব দিয়াকে নিজের ঘরের শয্যায় আলতো করে বসিয়ে দিল। ঘরটাকে চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। বেলকোনি থেকে শীতের শেষ মিষ্টি রোদ এসে পড়ছে বিছানার এক কোণে।

দিয়া ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে মুচকি হেসে বলল, "এত সুন্দর সাজিয়েছ? বাঁদরটা তো সত্যি সত্যি বদলে গেছে।"

নিরব দিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার দুটো নরম হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অতীতে এই হাত দুটোতেই সে কেবল চিমটি কাটত কিংবা রাগিয়ে দিত, আজ সেই হাতে পরম মমতা।

"আমি তোকে হাসাতে ভালোবাসতাম দিয়া, কিন্তু তোকে কাঁদাতে বা যন্ত্রণায় ফেলতে চাইনি কখনো," নিরব দিয়ার কপালে লেগে থাকা হালকা চুলগুলো সরাতে সরাতে ফিসফিস করে বলল। "এখন থেকে তোর জীবনের সব কষ্ট, সব ব্যথা আমার।"

দিয়া লাজুক হেসে নিরবের গালে আলতো করে হাত রাখল, "তুমি এত বেশি দায়িত্বশীল হয়ে গেছ যে আমার মাঝেমধ্যে পুরোনো সেই শয়তান নিরবটাকেই মিস হয়!"

"তাই নাকি?" নিরব একচিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি দিল, যা অনেক দিন পর দিয়া দেখতে পেল। "তাহলে কি আবার তোকে ছাদ থেকে—"

"নিরব!" দিয়া কৃত্রিম রাগে চেঁচিয়ে উঠল, যদিও চোখ দুটোতে কানায় কানায় ভরা ছিল প্রেম।

পরবর্তী কয়েকটা সপ্তাহ নিরব দিয়াকে একদম নিজের মতো করে আগলে রাখল। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফিজিওথেরাপি দেওয়া, ঘরের ভেতরেই অল্প অল্প করে হাঁটানো—সব নিরব নিজেই করত।

প্রতিদিন বিকেলে নিরব দিয়াকে বেলকোনির চেয়ারে বসিয়ে দিত। দিয়ার ভাঙা হাতটা আস্তে আস্তে সেরে উঠছিল, কিন্তু শরীরের মারাত্মক দুর্বলতা আর মানসিকভাবে সেই দুর্ঘটনার ট্রমা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। রাতে মাঝেমধ্যে দিয়া চমকে উঠত, যেন এখনো সে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে!

এমনই এক গভীর রাতে দিয়া ভয় পেয়ে আঁতকে উঠে বসেছিল। নিরব সাথে সাথে তাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেয়।

"কিছু হয়নি দিয়া, আমি আছি তো... তোর কোনো ভয় নেই," নিরব দিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে, গালে আলতো চুমু একে দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।

দিয়া নিরবের বুকটার মাঝে মুখ লুকিয়ে বুকভরে শ্বাস নিল। নিরবের বুকের ধুকধুক শব্দ আর উষ্ণ ভালোবাসা তাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা অনুভব করাল। আস্তে আস্তে সে আবার শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

কয়েক সপ্তাহের টানা যত্ন ও ভালোবাসায় দিয়া অনেকটাই শারীরিক শক্তি ফিরে পেল। লাঠির ওপর ভর না দিয়ে এখন সে একাই কয়েক পা হাঁটতে পারে। একদিন সকালে নিরব দিয়ার কাছে এসে তার হাত দুটো ধরে বলল, "অনেক দিন তো ঘরের চার দেয়ালে বন্দী হয়ে রইলি। এবার তোকে বাইরের বাতাসে নিয়ে যাওয়া দরকার। চল, কাল আমরা একটু দূরে কোথাও ঘুরে আসি।"

দিয়া নিরবের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করল, কিন্তু নিরবের চোখের সেই ব্যাকুলতা দেখে আর মানা করতে পারল না।

পরদিন সকালে নিরব আর দিয়া গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। নিরব বেছে নিয়েছিল নদীর পার আর ধানক্ষেতে ঘেরা গ্রামীণ এক রিসোর্ট, যেখানে নিরিবিলি বাতাস আর প্রকৃতির সবুজ ছোঁয়া থৈ থৈ করছে। শহরের ধোঁয়া আর হাসপাতালের ওষুধের গন্ধ থেকে দূরে এসে দিয়ার মনটা মুহূর্তেই ভালো হয়ে গেল।

বিকেলের সূর্যটা তখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে হেলে পড়েছে পশ্চিমে। বাতাস বইছে বেশ ঝিরঝির করে। দিয়া হালকা নীল রঙের একটা সুতির শাড়ি পরেছে, কপালে ছোট টিপ। নিরব তাকে ধরে ধরে কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটাচ্ছিল।

"কেমন লাগছে ম্যাডাম?" নিরব দিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল।

দিয়া নিরবের কাঁধে মাথা রেখে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল, "অনেক দিন পর নিজেকে এতটা জীবন্ত মনে হচ্ছে নিরব। ধন্যবাদ আমাকে এভাবে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।"

"ধন্যবাদ দিতে হবে না, তবে পারিশ্রমিক কিন্তু লাগবে," নিরব দিয়ার গালের কাছে মুখ এনে মৃদু হেসে বলল।

দিয়া লাজুক মুখে নিরবের বুকে একটা কিল মেরে বলল, "তুমি কখনো শুধরাবে না!"

দুজনে বেশ কিছুক্ষণ নদীর পাড় ধরে হেঁটে চলল। কিন্তু কিছুটা পথ এগোতেই দিয়া কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়তে লাগল। তার হাঁটার গতি ধীর হয়ে এলো। দীর্ঘদিনের শারীরিক দুর্বলতা আর দীর্ঘক্ষণ হাঁটার ধকল হয়তো সে নিতে পারছিল না।

"নিরব... আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরছে," দিয়া থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল।

নিরব সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে উঠল, "কী হলো দিয়া? চল, ওই বেঞ্চটায় গিয়ে বসি।"

কিন্তু বেঞ্চের দিকে পা বাড়ানোর আগেই দিয়ার হাত দুটি অবশ হয়ে এলো। তার চোখের সামনে যেন হঠাৎ করে ঘোর অন্ধকার নেমে এলো। মস্তিষ্কের রক্তচাপ আচমকা নেমে যাওয়ার কারণে এবং শারীরিক ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে দিয়া এক সেকেন্ডের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

"দিয়া!"

নিরব চট করে তাকে নিজের কোলে ধরে ফেলল। কিন্তু দিয়া সম্পূর্ণ নিস্তেজ। তার শ্বাস-প্রশ্বাস একদম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম! কোনো নড়াচড়া নেই, মুখের ভেতরের অক্সিজেন যেন শেষ হয়ে আসছে। দিয়ার ঠোঁট দুটো নীল হতে শুরু করেছে।

পাগলের মতো হয়ে গেল নিরব। চারপাশে লোকজন খুব বেশি নেই, রিসোর্টও কিছুটা দূরে। গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মতো সময়ও হয়তো নেই! দিয়ার ফুসফুস যদি পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পায়, তবে আবার মারাত্মক বিপদ ঘটে যেতে পারে।

"দিয়া! চোখ খোল! প্লিজ দিয়া!" নিরব দিয়াকে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিল।

সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ফার্স্ট এইডের ট্রেইনিংয়ের কথা মনে করে নিরব দিয়ার মুখটা সোজা করল, তার নাকটা দুই আঙুলে চেপে ধরে নিজের ঠোঁট সোজা এনে মিলালো দিয়ার রক্তহীন নীলচে ঠোঁটের ওপর।

নিরব তার সমস্ত ভালোবাসা আর আকুলতা দিয়ে নিজের বুকের ভেতরের অক্সিজেন দিয়ার ফুসফুসে পাম্প করতে শুরু করল। পরম অনুরাগে, অত্যন্ত আবেগভরে সে দিয়ার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বারবার কৃত্রিম শ্বাস দিতে লাগল।

"তোকে আমি যেতে দেব না দিয়া... তোকে বাঁচতেই হবে!" প্রতিবার শ্বাস দেওয়ার মাঝে নিরব ফিসফিস করে দিয়ার গালে, কপালে হাত বুলিয়ে কান্নাভেজা গলায় বলে উঠছিল।

টানা কয়েকবার ভালোবাসায় মোড়ানো সেই কৃত্রিম শ্বাস আর আকুল চেষ্টার পর হঠাৎ দিয়ার বুকটা জোরে একবার কেঁপে উঠল। দিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কাশতে শুরু করল।

ধীরে ধীরে তার বন্ধ চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল। দিয়া হালকা চোখ মেলে দেখতে পেল, তার ওপর ঝুঁকিয়ে আছে নিরব। নিরবের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে দিয়ার গালের ওপর, আর তার ঠোঁট দুটো এখনো দিয়ার ঠোঁটের ঠিক কাছাকাছি, হাঁপাচ্ছে ব্যাকুলতায়।

দিয়া চোখ মেলেই দেখতে পেল নিরবের আকুল, কান্নাভেজা মুখটা। তার কপালে এসে পড়ছে নিরবের চোখের টলটলে পানি। কিছুক্ষণ আগেই যে ঠোঁট থেকে সে ভালোবাসার অক্সিজেন গ্রহণ করেছে, সেই ঠোঁট দুটো এখনো কাঁপছে চরম আতঙ্কে।

দিয়া খুব দুর্বলভাবে হাতটা বাড়িয়ে নিরবের চোখের পানি মুছে দিল। ফিসফিস করে বলল, "তুমি কাঁদছ নিরব? আমি তো কোথাও যাইনি..."

নিরব মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল দিয়াকে নিজের বুকের ভেতরে। তার বুকের দ্রুত ধুকধুক শব্দ দিয়ার কানে বাজতে লাগল।

"তুই আমাকে মেরে ফেলতি দিয়া! আমি তোকে আর কোনো দিন চোখের আড়াল করব না, কখনো এত দূরে হাঁটতে নিয়ে আসব না!" নিরব গলার ভেজা স্বরে অনুযোগ করতে লাগল।

দিয়া নিরবের পিঠে হাত রেখে আলতো করে হেসে উঠল, "তুমি থাকতে আমার কিছু হতে পারে? তুমি তো আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকেও টেনে ফেরত নিয়ে আসতে পারো।"

নিরব দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বিকেলে হেলে পড়া রক্তিম সূর্য তখন তাদের ওপর এক মায়াবী আলো ফেলছিল।

কয়েক মাস কেটে গেল।

খান ভিলার রূপ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ছাদের সেই পুরোনো শ্যাওলা পড়া অংশটা নিরব নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মেরামত করিয়েছে। কার্নিশে উঁচু করে দেওয়া হয়েছে লোহার মজবুত গ্রিল, আর সেখানে দিয়ার ভালোবাসার সব গাছগুলোকে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।

আজ বিকেলে মিষ্টি রোদ উঠেছে। দিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ। সে আগের মতোই নীল সালোয়ার-কামিজ পরে গাছে পানি দিচ্ছে। তবে এখন আর সে একা নয়, তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে নিরব।

নিরব দিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে থুতনিটা এনে রাখল দিয়ার কাঁধে। দিয়া মৃদু হেসে বলল, "কী ব্যাপার? আজ আবার শয়তানি করার মতলব আছে নাকি?"

"শয়তানি করার বয়স কি আর আছে ম্যাডাম? এখন তো শুধুই ভালোবাসার বয়স," নিরব দিয়ার গালে একটা মিষ্টি চুমু একে দিয়ে বলল।

দিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে নিরবের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই কোনো অস্থিরতা—সেখানে এখন শুধুই এক গভীর, শান্ত ভালোবাসা। যে নিরব একসময় দিয়াকে জ্বালানো ছাড়া আর কিছু বুঝত না, সে আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী।

দিয়া নিরবের বুকে মাথা রেখে বলল, "জানো নিরব, সেদিন যদি আমি ছাদ থেকে না পড়তাম, হয়তো কখনোই বুঝতে পারতাম না তুমি আমাকে এতটা ভালোবাসো।"

নিরব দিয়ার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। "আর আমি যদি সেদিন তোকে হারানোর ভয়ে না কেঁদে উঠতাম, তবে কখনো জানতে পারতাম না তুই-ই আমার পুরো পৃথিবী।"

....
👁 81