গায়েহলুদের রাতে পাগলামি

পাখির দিনগুলো আজকাল নিখিলকে জ্বালিয়েই কেটে যাচ্ছিল। ক্যাম্পাসের করিডোর থেকে শুরু করে টিএসসির চায়ের টং, নিখিল মানেই একরাশ পাগলামি আর উপদ্রব।

"এই পাখি, শোন! আমার নতুন একটা গার্লফ্রেন্ড হয়েছে জানিস?"— চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হুট করে বলে উঠেছিল নিখিল।

পাখি কপালে ভাজ ফেলে নিখিলের দিকে তাকাল। নিখিলের এই এক অভ্যাস, যখন-তখন যাতামাতা কথা বলে মাথা খারাপ করে দেওয়া। পাখি মেকি বিরক্তি দেখিয়ে বলল, "হ্যাঁ, তোর আবার গার্লফ্রেন্ড! তোর এই বাঁদরামো সহ্য করার মতো মেয়ে বাংলাদেশে একটাও তৈরি হয়নি।"

নিখিল হি হি করে হেসে উঠে পাখির ব্যাগ থেকে চিপসের প্যাকেটটা টান মেরে ছিনিয়ে নিল। "আরে সত্যি বলছি! খুব শিগগিরই তাকে তোর সামনে আনব। তখন দেখবি আমার কত গুণ!"

পাখি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। নিখিল হেসেই খুন। সে পাখির সাথে সবসময় এমন ফাজিলামো আর দুষ্টুমিই করত। কিন্তু নিখিল কখনোই বুঝতে পারল না—অথবা হয়তো বুঝেও না বোঝার ভান করল—এই হাসিমুখের আড়ালে পাখির বুকে কেমন একটা অজানা তোলপাড় চলত।

নিখিল ছিল পাখির সবচেয়ে কাছের বন্ধু। নিখিলের হুটহাট সিদ্ধান্ত, অহেতুক চ্যাঁচামেচি আর ছেলেমানুষিগুলোকে পাখি ভেতর থেকে বড্ড ভালোবাসত। কিন্তু এই অনুভূতির কথা সে কোনোদিন মুখে ফুটতে দেয়নি। যদি নিখিল হুট করে দূরে সরে যায়? যদি এই মিষ্টি বন্ধুত্বের রসায়নটা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়?

বিকেলের হালকা রোদে নিখিল বাইকের স্টার্ট দিয়ে বলল, "উঠবি নাকি হেঁটে যাবি? বাইকে উঠলে কিন্তু ঢাকা শহরের সেরা রাইড পাবি!"

পাখি চোখ পাকিয়ে বাইকের পেছনে উঠে বসল, "তোর ওই ভাঙা বাইকে ওঠার চেয়ে হেঁটে যাওয়া ভালো, তাও তোর ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে ভালো লাগে না।"

"তাহলে শক্ত করে ধরে বস, আজকের বাতাসটা কিন্তু শুধুই তোর আর আমার!"— বলেই নিখিল এক ঝটকায় বাইক টান দিল।

পাখি সামলাতে না পেরে নিখিলের শার্ট শক্ত করে চেপে ধরল। বাতাস এসে গায়ে লাগছিল, আর পাখির মনে হচ্ছিল—এই নিখিলটা যদি সারাজীবন এভাবেই তাকে জ্বালিয়ে যেত, তবে কেমন হতো?

দিনগুলো নিজের নিয়মে গড়িয়ে চলছিল, কিন্তু হঠাৎ একদিন পাখির শান্ত দীঘির মতো জীবনে এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ল।

সেদিন বিকেলে টিএসসির মোড়ে ঝালমুড়ি খেতে খেতে নিখিল হুট করে বলে বসল, "পাখি, একটা খুব আনন্দের খবর আছে রে! তোকে না বলে আর থাকতে পারলাম না।"

পাখি মুখ ভর্তি ঝালমুড়ি নিয়ে নিখিলের উদ্দীপ্ত মুখের দিকে তাকাল। নিখিলের চোখদুটো যেন কেমন এক অজানা খুশিতে চকচক করছে। পাখি একটু ইতস্তত করে বলল, "কী খবর? আবার কোনো নতুন বাঁদরামো নাকি?"

নিখিল পাখির হাত দুটো হঠাৎ চেপে ধরে বলে উঠল, "আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে রে! মেয়েকে আমার আর বাবার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আগামী মাসেই বিয়ে।"

কথাটা শোনামাত্র পাখির হাতের ঝালমুড়ির ঠোঙাটা যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরে একমুহূর্তের জন্য সব রক্ত জমাট বেঁধে গেল। মাথার ওপর বৈশাখের প্রখর রোদ যেন এক নিমেষে কালবৈশাখীর কালো মেঘে ঢেকে গেল। নিখিল কিন্তু পাখির এই আকস্মিক পরিবর্তন খেয়ালই করল না। সে একটানা বলে যেতে লাগল, "মেয়েটা খুব মিষ্টি রে। নাম তানিয়া। আব্বা হুট করেই সব পাকা করে ফেলেছেন। আমি যে কত হ্যাপি, তোকে বোঝাতে পারব না!"

পাখি জোর করে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু সেই হাসি ঠোঁটের কোণে আসার আগেই মিলিয়ে গেল। সে কোনোমতে গলা পরিষ্কার করে বলল, "তাই? বাহ্‌... খুব ভালো তো। অভিনন্দন তোকে।"

"শুধু অভিনন্দন দিলে চলবে না!" নিখিল পাখির কাঁধে একটা হালকা চাপ দিয়ে হেসে বলল, "বিয়েতে তোকে কিন্তু সব দায়িত্ব নিতে হবে। তুই ছাড়া আমার এই পাগলামি সামলাবে কে বল?"

পাখি আর কিছু বলতে পারল না। সে কেবল মাথা নেড়ে সায় দিল। কিন্তু মনের ভেতরে তখন তোলপাড় চলছে। যে নিখিলকে সে নিজের অজান্তে মনের গভীরে এতটুকু এতটুকু করে সাজিয়ে তুলেছিল, সে নিখিল অন্য কারও হতে চলেছে? নিখিল এতটাই অবুঝ আর দুষ্টু ছিল যে, পাখির চোখের এই নীরব হাহাকার সে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারল না। সে তো পাখির ভেতরের সেই না-বলা ভালোবাসাটাকে দেখতেই পেল না।

সেদিন বাসায় ফিরে পাখি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে অঝোরে কাঁদল। সে নিখিলকে কখনো নিজের করে পাওয়ার দাবি জানায়নি সত্য, কিন্তু অন্য কারও সাথে নিখিলকে ভাগ করে নেওয়ার কথা ভাবতেই তার বুকটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল।

বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল, পাখি নিজেকে ততটাই গুটিয়ে নিতে শুরু করল। নিখিলের ফোন এলে রিসিভ করা কমিয়ে দিল, দেখা করার কথা বললে কোনো না কোনো অজুহাতে এড়িয়ে যেতে লাগল। কিন্তু নাছোড়বান্দা নিখিল কি আর ছাড়ার পাত্র?

একদিন বিকেলে পাখি যখন বাসার বারান্দায় বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে ছিল, তখনই বাসার নিচে বিকট শব্দে বাইকের হর্ন বেজে উঠল। পাখি ওপর থেকে তাকিয়ে দেখে, নিখিল বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। বাধ্য হয়ে পাখিকে নিচে নেমে আসতে হলো।

"কী ব্যাপার রে ম্যাডাম? আজকাল খুব ভিআইপি হয়ে গেছিস মনে হচ্ছে? ফোন ধরিস না, দেখা করিস না!" নিখিল কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল।

পাখি মাটির দিকে তাকিয়ে হালকা কণ্ঠে বলল, "না রে, শরীরটা একটু ভালো যাচ্ছিল না। আর পড়ালেখারও খুব চাপ।"

নিখিল বাইকের চাবি আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে পকেট থেকে একটা চকচকে হলুদ বিয়ের কার্ড বের করে পাখির দিকে বাড়িয়ে দিল। "নে, তোর কার্ড। শোন পাখি, বিয়ের সব শপিং আর আয়োজনে তোকে কিন্তু আমার সাথে থাকতে হবে। তুই না থাকলে আমার একদম ভালো লাগবে না।"

কার্ডটার গায়ে সোনালি অক্ষরে লেখা নিখিলের নামটা দেখে পাখির বুকটা আবার খাঁ খাঁ করে উঠল। কার্ডটা হাতে নিয়ে পাখি নিচু স্বরে বলল, "আমায় ক্ষমা করিস নিখিল। আমি তোর বিয়েতে যেতে পারব না।"

নিখিলের মুখের চঞ্চল ভাবটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে বলল, "মানে কী? তুই আসবি না মানে? তুই আমার একমাত্র সেরা দোস্ত, আর তুই-ই আসবি না?"

"আমার শরীরটা সত্যি ভালো নেই নিখিল," পাখি চোখ মেলাতে পারছিল না, "আর ওই ভিড়বাট্টা, শোরগোল আমার একদম সহ্য হবে না। তুই সুন্দর করে বিয়েটা কর্, আমার আশীর্বাদ সবসময় তোর সাথেই থাকবে।"

"তুই ফাজিল পাইসিস নাকি আমারে?" নিখিল হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গেল, কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার তার আগের মতো বাঁদরামি মার্কা হেসে উঠল, "ঠিক আছে, এখন নাটকমোড় নিচ্ছিস নে। আমি কিন্তু কোনো বাহানা শুনব না। তোকে আসতেই হবে, ব্যস!"

পাখি আর কোনো কথা না বলে কার্ডটা হাতে নিয়ে গটগট করে ভেতরে হেঁটে চলে গেল। সে জানত, নিখিল যতটাই দুষ্টু আর আলতু-ফালতু রসিকতা করুক না কেন, এই বিয়ের আসরে দাঁড়িয়ে অন্য কারও পাশে নিখিলকে হাসতে দেখাটা তার পক্ষে কোনোদিন সম্ভব না। নিখিলের এই হঠাৎ গায়ে পড়ে মাতব্বরি আর বুঝেও না বোঝার ভান করার স্বভাবটা পাখির বুকের জমানো কষ্টটাকে শুধু দ্বিগুণ বানিয়ে দিচ্ছিল।

পরদিন নিখিলের বিয়ের আগের দিন—গায়েহলুদের রাত। নিখিলদের পুরো বাসা তখন আলোয় ঝলমল করছে, আত্মীয়স্বজনের তুমুল ভিড় আর হইচই। অথচ এত কিছুর মাঝেও পাখির ঘরের জানালা ছিল একদম অন্ধকার। পাখি সেদিন ঘর থেকেই বের হয়নি।

হঠাৎ করে রাত আটটার দিকে পাখির বাসার সামনে বিকট শব্দে একটা বাইক এসে থামল। কলিংবেল বাজতেই পাখি দরজা খুলে দেখে সামনে নিখিল দাঁড়িয়ে। গায়েহলুদের হলুদ পাঞ্জাবি পরা, হাত-মুখে হালকা হলুদের ছোঁয়া।

পাখি অবাক হয়ে বলল, "তুই এই সময়ে এখানে? তোর না আজ গায়েহলুদ?"

নিখিল কোনো কথা না বলে পাখির হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখেম মুখে কেমন যেন এক পাগলাটে ভাব। "অনেক নাটক হয়ে গেছে পাখি। এবার চড় বাইকে।"

"কী বলছিস তুই? পাগল হয়েছিস নাকি? আমি কোথাও যাব না!" পাখি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল।

"একদম চিৎকার করবি না! তোকে আমার বাসায় নিয়ে যাচ্ছি, দেখি তুই আমার অনুষ্ঠানে কীভাবে না আসিস," নিখিল একপ্রকার জোর করেই পাখিকে টেনে নিয়ে বাইকে বসিয়ে দিল।

পাখি আর কিছু না ভেবে হেঁচকা টানে বাইকে চেপে বসল। সে ভাবল, নিখিল হয়তো তার হবু বউয়ের সাথে দেখা করাতে বা নিজের গায়েহলুদের অনুষ্ঠানেই জবরদস্তি করে নিয়ে যাচ্ছে। বাইকটা ঢাকার গর্জনশীল রাস্তা দিয়ে সাঁসাঁ করে ছুটে চলল।

কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই পাখির খটকা লাগল। নিখিলদের বাসার রাস্তা ডানে, কিন্তু নিখিল বাইক ঘোরাল বাঁ দিকে—মিরপুরের ভেতরের নির্জন রাস্তার দিকে।

"এই নিখিল! তুই তোদের বাসার দিকে যাচ্ছিস না কেন? বাইক থামাও বলছি!" পাখি নিখিলের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

নিখিল কোনো উত্তর দিল না, শুধু বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। বাতাস পাখির চুল ওড়াচ্ছিল, আর তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করছিল। নিখিল যে কখন কী পাগলামি করে বসে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা একতলা ভবনের সামনে বাইক এনে এক ঝটকায় ব্রেক কষল নিখিল। পাখি তাকিয়ে দেখে সামনে একটা বড় সাইনবোর্ড ঝুলছে—‘কাজী অফিস’।

পাখি চোখ কপালে তুলে বলল, "এখানে কেন এনেছিস আমাকে? কাজী অফিসে তোর কী কাজ?"

নিখিল বাইক থেকে নেমে পাখির দিকে তাকিয়ে সেই চেনা বাঁদরামি মার্কা মিষ্টি একটা হাসি দিল। "তোর সাথে আমার খুব জরুরি একটা সই-সাবুদের কাজ আছে ম্যাডাম, আয়!"

কাজী অফিসের ভেতরে পা রাখতেই পাখির মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ছিমছাম ঘরটার এক কোণে একজন বয়স্ক কাজী সাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। টেবিলের ওপর রাখা মোটা একটা লাল খাতা।

পাখি রাগে আর ক্ষোভে নিখিলের হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিল। "তোর ফাজলামোর একটা সীমা থাকা উচিত নিখিল! কাল তোর বিয়ে, আর তুই আমাকে এখানে ধরে এনেছিস? চল বলছি এখান থেকে!"

নিখিল এবার আর হাসল না। তার চেহারার সেই চিরচেনা বাঁদরামির ছাপটা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। খুব শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় সে বলল, "আমি কোনো ফাজলামো করছি না পাখি। আমি সত্যি সত্যি বিয়ে করতে এসেছি, আর সেটা তোমাকেই।"

পাখির চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে তোতলার মতো বলে উঠল, "মা-মানে? তুই পাগল হয়েছিস? তোর না তানিয়ার সাথে কাল বিয়ে! তোর বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন সবাই অপেক্ষা করছে। আর তুই..."

"সবাই অপেক্ষা করুক," নিখিল পাখির খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। "তানিয়া খুব ভালো মেয়ে, কিন্তু সে তো পাখি না। কাল যখন তুই আমার গায়েহলুদে যাবি না বলে জেদ ধরে বসে ছিলি, তখন আমি প্রথমবার অনুভব করেছি—তুই ছাড়া আমার এই ছন্নছাড়া জীবনটা আসলে পুরোপুরি অর্থহীন।"

পাখি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। যে ভালোবাসার কথা সে বছরের পর বছর নিজের ভেতর সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল, সেটা নিখিল এভাবে হুট করে বুঝে ফেলবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

"কিন্তু তোর পরিবার? তারা কী ভাববে?" পাখির গলা দিয়ে যেন স্বর বেরোচ্ছিল না।

"সেটা আমি সামলে নেব। তুই শুধু বল, সারাজীবন আমার এই পাগলামিগুলো সহ্য করবি কি না?" নিখিলের চোখে তখন এক অদ্ভুত মায়া।

পাখি আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কাজী সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে খাতাটা এগিয়ে দিলেন। নিখিল আগে সই করল, তারপর কলমটা পাখির হাতে তুলে দিল।

অবিশ্বাস্য ঘোরের মধ্যে দিয়ে তিনবার কবুল বলে খাতার পাতায় সই করে দিল পাখি। সবকিছু এত দ্রুত আর অদ্ভুতভাবে ঘটে গেল যে, পাখির মনে হচ্ছিল সে কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। নিখিল যে কখন কোন পাগলামি করে বসে, তার কোনো পূর্বাভাস কখনো থাকে না, কিন্তু আজকের এই পাগলামিটা যে পাখির জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা মুহূর্ত হয়ে উঠবে, তা কে জানত!

কাজী অফিসের মিষ্টি মুহূর্তটা কাটতেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখে এসে দাঁড়াল দুজন। কাজী অফিস থেকে বের হয়ে নিখিল যখন পাখিকে সরাসরি নিজেদের বাসার সামনে নিয়ে এল, তখন রাত প্রায় দশটা। আলোয় ঝলমল পুরো বাসা, মেহমানদের গুঞ্জন আর হাসির শব্দে মুখরিত।

কিন্তু নিখিল আর পাখিকে একসাথে গেটে দাঁড়াতে দেখে পুরো বাসার পরিবেশ হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নিখিলের বাবা-মা কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে এলেন। গায়েহলুদের রাতে নিখিল কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল, তা নিয়ে এমনিতেই সবাই চিন্তিত ছিল, আর এখন সাথে হাত ধরে পাখিকে নিয়ে ঢুকতে দেখে তারা বাকরুদ্ধ!

"এসবের মানে কী নিখিল? তুই গায়েহলুদের অনুষ্ঠান ছেড়ে এই মেয়েকে নিয়ে কোথায় গিয়েছিলি?" নিখিলের বাবা গুরুগম্ভীর কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন।

নিখিল পাখির হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে খুব শান্ত গলায় বলল, "আব্বা, আমি পাখিকে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা বিয়ে করেছি।"

কথাটা শোনামাত্র পুরো ড্রয়িংরুমে যেন বোমা ফাটল। নিখিলের মা হঠাৎ শকে সোফায় বসে পড়লেন, "কী বললি তুই? কাল তোর বিয়ে তানিয়ার সাথে, আর তুই এই কাজ করলি? আমাদের মান-সম্মান সব মাটিতে মিশিয়ে দিলি!"

পাখি তখন ভয়ে আর লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। মাথা নিচু করে নিখিলের হাতটা ধরে শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল সে। কিন্তু নিখিল একদমই নড়ল না। সে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "আব্বা, তানিয়ার সাথে আমার জোর করে বিয়েটা হলে আমরা কেউই সুখী হতাম না। আমি পাখিকে ভালোবাসি। ও ছাড়া আমার জীবনে কেউ নেই। যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দাও, কিন্তু পাখিকে কিছু বলো না।"

নিখিলের বাবার রাগটা প্রচণ্ড ছিল, কিন্তু নিখিলের এই একরোখা স্বভাব তিনি ভালো করেই চিনতেন। ছেলেটা যা একবার মাথায় চেপে নেয়, তা করেই ছাড়ে। দীর্ঘ এক গম্ভীর নীরবতার পর নিখিলের বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পাখির দিকে তাকিয়ে তিনি নরম কণ্ঠে বললেন, "পাখি মা, তোর সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই। তোকে আমরা চিনি। কিন্তু ছেলেটার এই পাগলামি আমাদের সবাইকে অবাক করে দিল।"

অবশেষে পরিবারের সবাই অনেক বুঝাপড়ার পর তাদের মেনে নিল। রাত বারোটার দিকে নিখিলের মা পাখির মাথায় হাত রেখে ছোট একটা লাল শাড়ি পরিয়ে ঘরে তুললেন। অচেনা অনুভূতি আর একটু অপরাধবোধে পাখির বুক কেঁপে উঠছিল, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিখিলের সেই চেনা দুষ্টু হাসিটা তাকে এক অদ্ভুত ভরসা দিল।

সংসারে হুট করে চলে আসা এই নতুন পরিচয়ে মানিয়ে নিতে পাখির বেশ অস্বস্তিই লাগছিল। নিখিলদের বড় যৌথ পরিবার, সকাল থেকেই শ্বাশুড়ি আর জা-দের সামনে লজ্জা আর লজ্জায় তার বুক ঢিপঢিপ করছিল। মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে, হাত দুটো গুটিয়ে সে যখন রান্নাঘরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন পেছন থেকে কেউ একজন তার শাড়ির আঁচল ধরে হালকা টান দিল।

পাখি চমকে উঠে পেছনে তাকাতেই দেখে নিখিল। হাত দুটি পেছনে লুকিয়ে বেশ ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে সেই চেনা বাঁদরামি মার্কা মিষ্টি হাসি।

"কী ব্যাপার বউমণি? নতুন বউয়ের মতো অত লজ্জা পাওয়ার ভান করছ কেন? কালকেও তো আমার সাথে ঝালমুড়ি খেয়ে আমার গায়ে হাত তুলেছ!" নিখিল ফিসফিস করে চোখের কোণে দুষ্টুমি নিয়ে বলল।

পাখি দ্রুত চারপাশটা দেখে নিয়ে নিখিলকে একটা হালকা ধমক দিল, "আস্তে কথা বলো! মা আর জাকি শুনলে কী ভাববে? ছাড়ো আমার আঁচল, আমি কাজ করছি।"

"উহু, ছাড়ব না!" নিখিল শাড়ির আঁচলটা আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল, "আমার নিজের বউয়ের আঁচল ধরেছি, কার কী তাতে? তবে শোন, আজ কিন্তু তোমাকে এক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হতে হবে। একটা জায়গায় যাব।"

"কোথায় যাব মানে? মাত্র কাল রাতে এত বড় একটা ঝড়ের পর আজকে আবার বাইরে বেরোব? মা-বাবা কী মনে করবেন?" পাখি ভ্রূ কুঁচকে বলল।

ঠিক তখনই নিখিলের মা সেখানে এসে হাজির হলেন। পাখিকে সংকোচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি মৃদু হেসে নিখিলকে বললেন, "তোর ওই পাগলটাকে নিয়ে বাইরে থেকে একটু ঘুরে আয় তো পাখি। কাল রাত থেকে তোকে যা ধকল পোহাতে হয়েছে, একটু খোলা বাতাসে গেলে মনটা ভালো লাগবে। আর নিখিল, খবরদার! মেয়েটাকে একদম জ্বালাবি না কিন্তু।"

মায়ের অনুমতি পেয়ে নিখিলের বাঁদরামি যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে হাত জোড় করে বলল, "জো হুকুম আম্মা! আজ ওকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব যে জীবনেও ভুলবে না।"

সাঁঝের মুখে নিখিলের বাইকে চেপে পাখি যখন আবার ঢাকার রাস্তায় বের হলো, তখন তার মনের ভেতরের সব অপরাধবোধ আর লজ্জা যেন হালকা বাতাসের সাথে উবে যেতে লাগল। নিখিল বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বোসো বউ, নইলে কিন্তু আমি আজ হাওয়ায় উদে যাব!"

পাখি আর কোনো দ্বিধা না রেখে দুই হাতে নিখিলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে মুখ লুকাল। বাইকটা তখন রাজপথ ছেড়ে হাইওয়ের দিকে ছুটে চলছিল। কিন্তু তারা কোথায় যাচ্ছে, তা পাখি জানত না। রাতের অন্ধকার যত ঘন হচ্ছিল, আকাশটাও তত মেঘলা হয়ে আসছিল।

বাইকটা যখন ঢাকার সীমানা ছাড়িয়ে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলছিল, চারপাশের বাতাস ক্রমশ ঠান্ডা আর ভারী হয়ে আসছিল। দূর দিগন্তে বিদ্যুতের চমক আর হালকা মেঘের গর্জন জানান দিচ্ছিল যে যেকোনো মুহূর্তে ঝুম বৃষ্টি নামবে।

পাখি নিখিলের শার্ট শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলল, "নিখিল! বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছ তুমি? এবার তো বাসার দিকে ফেরো!"

নিখিল হেডের আলোয় সামনের আঁকাবাঁকা রাস্তা পার হতে হতে হেসে উঠল, "আজ রাতে কোনো ফেরা নেই পাখি! এই ঝড়ের রাতে বাড়ি ফেরার চেয়ে বৃষ্টিতে ভেজা অনেক বেশি আনন্দের।"

কিছুদূর যাওয়ার পরই কালবৈশাখীর মতো তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। ঝাপসা আলো আর প্রবল বাতাসে বাইক চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। নিখিল আর পাখির গায়ের পোশাক এক নিমেষে চপচপে ভিজে গেল। রাস্তার পাশে একটা পুরোনো বাংলো টাইপ রিসোর্ট-হোটেল দেখে নিখিল ঝটপট বাইক থামাল।

হোটেলটির কাউন্টারে গিয়ে নিখিল ভেজা চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, "ভাই, একটা রুম হবে? বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি, আমরা আর সামনে যেতে পারছি না।"

রিসেপশনের লোকটা তাদের ভিজে একাকার অবস্থা দেখে হাসিমুখে একটা চাবি এগিয়ে দিল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই বাইরের বৃষ্টির তুমুল শব্দ যেন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঘরে এক ফালি আবছা আলো জ্বলছিল।

ভিজে গিয়ে পাখির ঠোঁট দুটো ঠকঠক করে কাঁপছিল, গায়ের শাড়িটা শরীরের সাথে পেঁচিয়ে একাকার। লজ্জা আর শীতের এক অদ্ভুত মিশেলে সে খাটের এক কোণে মাথা নিচু করে গিয়ে দাঁড়াল। নিখিল ঘর থেকে তোয়ালে এনে পাখির মাথার ভিজে চুলগুলো আস্তে আস্তে মুছে দিতে লাগল।

নিখিলের স্পর্শে পাখির শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল। এতদিন যে নিখিল ছিল পাখির শুধুই এক পাগল বন্ধু, সেই নিখিল আজ অন্য এক রূপ নিয়ে তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে। নিখিল পাখির ভেজা চুলের গা ঘেঁষে খুব নিচু স্বরে বলল, "শীত করছে খুব?"

পাখি চোখ তুলে তাকাতেই নিখিলের চোখের ভেতরের গভীর ভালোবাসা আর গভীর আকুলতা দেখতে পেল। সেই চোখে আজ আর কোনো ফাজলামো নেই, কোনো বাঁদরামি নেই—আছে শুধু পাখিকে নিজের করে নেওয়ার তীব্র এক ব্যাকুলতা।

বাইরে ঝুম বৃষ্টির শব্দ আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক। কামরার ভেতরের আবছা হলদেটে আলোয় দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। নিখিলের হাতের আলতো ছোঁয়ায় পাখির শরীরের সব ক্লান্তি আর শীতের কাঁপুনি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।

নিখিল আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পাখিকে খুব কাছে টেনে নিল। এতদিনের বন্ধুত্বের বাঁধন আজ রূপ নিয়েছে এক গভীর ব্যাকুলতায়। পাখির ভেজা কপালে নিখিল আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। পাখির চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে বুজে এলো, বুকটা এক অচেনা আবেগে দ্রুত ওঠা-নামা করতে লাগল।

"তোকে খুব ভালোবাসি রে পাখি..." নিখিলের গম্ভীর, মায়াবী কণ্ঠটা পাখির কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল। এই একটা কথা শোনার জন্য পাখির মন যে কত বছর ধরে ব্যাকুল হয়ে ছিল, তা আজ নিখিল বুঝতে পারছে।

নিখিল পাখির ভেজা গাল, থুতনি আর ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। সেই ছোঁয়ায় ছিল পরম তৃষ্ণা আর অগাধ আকুলতা। পাখিও আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। নিখিলের চওড়া পিঠে নিজের দু-হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল।

ঘরের ভেতরের উষ্ণতা আর বাইরের বৃষ্টির শীতলতা মিলে এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি করল। নিখিল সাবধানে পাখির ভেজা শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিল। পাখির ধড়ফড় করা বুকের ওপর নিখিল নিজের মুখ গুঁজতেই পাখি একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিখিলের চুলগুলো মুঠো করে চেপে ধরল।

সেদিনের সেই রাতটা কেবল দুটো দেহের মিলন ছিল না, ছিল দুটো মনের চিরকালের মতো এক হয়ে যাওয়ার রাত। ভালোবাসা, সোহাগ আর গভীর আবেগে দুজন হারিয়ে গেল এক অনন্য ভালোবাসার জগতে। নিখিলের গভীর ভালোবাসার ছোঁয়ায় পাখির সব দ্বিধা, লজ্জা আর অভিমান গলে জল হয়ে গেল।

সকালের তাজা রোদ যখন হোটেলের জানালা গলে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, পাখির চোখ দুটো তখন ধীরে ধীরে মেলল। বাইরের আকাশটা এখন একদম পরিষ্কার, কালকের ঝুম বৃষ্টির কোনো চিহ্নই নেই—ঠিক যেমন তাদের মনের সব সংশয় আর অভিমান ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে।

পাখি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল নিখিল তার পাশে গভীর ঘুমে কাদা হয়ে শুয়ে আছে। এক হাত দিয়ে পাখিকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন একটু আলগা হলেই পাখি কোথায় হারিয়ে যাবে! পাখির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। কাল রাতের সেই গভীর সোহাগ আর উষ্ণ স্পর্শের স্মৃতি মনে পড়তেই পাখির গা-টা আবার নতুন করে শিউরে উঠল।

পাখি নিখিলের গালে আলতো করে হাত রাখতেই নিখিল চোখ না খুলেই আধো ঘুমে বলে উঠল, "হয়েছে, আর উসখুস করতে হবে না বউমণি! আজ কিন্তু কোনো বাহানা শুনব না, পুরো দিনটাই আমার।"

পাখি হেসে ফেলে নিখিলের বুকে মাথা গুজে বলল, "তুই একটা আস্ত পাগল নিখিল! জীবনের এত বড় একটা মোড়ে এসেও তোর এই পাগলামি গেল না?"

নিখিল এবার চোখ খুলে পাখির দিকে তাকিয়ে গভীর চোখে তাকাল। তারপর পাখির কপালে একটা পরম ভালোবাসার চুমু দিয়ে বলল, "তোর জন্য এই পাগলামিটা আমি সারাজীবন ধরে রাখতে চাই পাখি। বন্ধুদের মতো ফাজলামো করব, আর বর হয়ে তোকে সারাজীবন বুকে আগলে রাখব।"

দুজন তৈরি হয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে আবার বাইকে চড়ে বসল। ঢাকা ফেরার পথে মিষ্টি রোদ আর হালকা হাওয়া তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

বাইকের পেছনের আয়নায় নিখিলকে দেখতে দেখতে পাখির মনে হলো—জীবনটা কত অদ্ভুত! যে মানুষটাকে হারানোর ভয়ে সে এতদিন নিজের ভালোবাসাকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই মানুষটাই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। নিখিলের সেই চেনা দুষ্টুমি আর হুটহাট সিদ্ধান্তের ঝড় তাদের সম্পর্ককে এনে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত।

পাখি এবার আর লজ্জায় দূরে সরে রইল না। সে নিখিলের পিঠে শক্ত করে মুখ গুজে জড়িয়ে ধরল তার সারাজীবনের ভালোবাসাকে। 

....
👁 70