শ্রাবণের মেঘলা দুপুরে ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে রিমঝিম বৃষ্টি দেখছিল আনিকা। বাতাস লেগে ভিজছিল তার গাল আর ওড়নার আঁচল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না। তার মনজুড়ে কেবল একজনই—জিম। জিম ভাইয়া। সম্পর্ক তারা খালাতো ভাই-বোন। জিম তার চেয়ে চার বছরের বড়। আনিকার বয়স এখন উনিশ, অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আর জিম ছাব্বিশ বছরের এক গম্ভীর, রুক্ষ মেজাজের তরুণ, যে মাত্রই একটি বহুজাতিক সংস্থায় ভালো পদে যোগ দিয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই আনিকা লাজুক স্বভাবের। আর জিম? জিম শান্ত, কম কথা বলে এবং ভীষণ গম্ভীর। তাকে পুরো বাড়ির সবাই একটু সমীহ করেই চলে। অথচ আনিকা মনের কোনো এক গহীনে গোপনে ধারণ করে রেখেছে এই গম্ভীর মানুষটাকে। কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি, বলা সম্ভবও ছিল না। জিমকে দেখলে এমনিতেই আনিকার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, বুকে হাতুড়ি পেটার শব্দ হয়। একটু কিছু ভুল হলেই জিম যেভাবে চোখ তুলে তাকায়, তাতে লাজুক আনিকা যেন মাটি ফুঁড়ে ঢুকে যেতে চায়।
হঠাৎ নিচ তলা থেকে খালার গলা ভেসে এলো, "অনিকা! এই মেয়ে, বৃষ্টিতে ভিজছিস নাকি? নিচে নেমে আয় শিগগির!"
খালা, অর্থাৎ জিমের মা, আমেনা বেগম। তিনি আনিকাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। আনিকার নিজের মা মারা যাওয়ার পর খালাই তাকে নিজের কাছে এনে রেখেছেন। আনিকা তড়িঘড়ি করে ওড়নাটা ঠিক করে ছাদ থেকে নিচে নেমে এলো।
খালার ঘরের সামনে আসতেই সে দেখলো জিম সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। পরনে কালো শার্ট, চোখ দুটো স্ক্রিনে নিবদ্ধ। সেই গম্ভীর মুখ। আনিকা সোজা হেঁটে খালার ঘরের দিকে যেতে চাইল, কিন্তু জিমের থমথমে কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল।
"এতক্ষণ ছাদে কী হচ্ছিল? জ্বর বাঁধাতে চাও নাকি?" জিম ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলল।
আনিকা চমকে উঠে দাঁড়াল। তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে মাথা নিচু করে আঙুল দোলাতে দোলাতে বলল, "না... মানে, একটু বৃষ্টি দেখছিলাম, জিম ভাইয়া।"
"অনার্সে উঠেও বাচ্চা স্বভাব গেল না। এখন জ্বর আসলে খালার কষ্ট বাড়বে, এটা মাথায় থাকে না? ঘরে যাও," জিমের কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না, কিন্তু এক ধরনের তীব্র কঠোরতা ছিল যা আনিকাকে নিমেষে চুপ করিয়ে দিল।
"জি," অস্ফুট স্বরে বলে আনিকা দ্রুত খালার ঘরে ঢুকে গেল।
আমেনা বেগম বিছানায় শুয়ে ছিলেন। বেশ কিছু দিন ধরেই তিনি অসুস্থ। প্রেসার ওঠানামা করে, সাথে হৃদযন্ত্রেরও কিছু সমস্যা ধরা পড়েছে। আনিকাকে দেখে তিনি হালকা হাসলেন। "জিম তোকে বকা দিল বুঝি?"
আনিকা খালার পাশে বসে তার কপালে হাত রেখে বলল, "না খালা, বকেনি। এমনিই বারণ করছিল। তুমি কেমন বোধ করছ এখন?"
"শরীরটা ভালো ঠেকছে না রে মা," আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আমার তো বয়সের কোনো বিশ্বাস নেই। কখন কী হয়ে যায়। আমার এখন একটাই চিন্তা, তোকে নিয়ে।"
"কী যে বলো খালা! তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে," আনিকা আবেগপ্লুত হয়ে পড়ল।
"না রে মা। আমি চাই আমার চোখের সামনে তোকে একটা শক্ত আশ্রয়ে দিয়ে যেতে। জিম ছেলেটা বড্ড শক্ত মনের, কারো সাথে মেশে না। কিন্তু আমি জানি, তোকে ও সারা জীবন দেখে রাখবে।"
আমেনা বেগমের কথার অর্থ তখন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি আনিকা। কিন্তু তার পরদিনই যা ঘটল, তা আনিকার কল্পনার বাইরে ছিল।
পরদিন সকালে আমেনা বেগমের শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হলো। ডায়েবেটিস আর প্রেসার এক সাথে বেড়ে গিয়ে তিনি প্রায় অচেতন হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা জানালেন, আমেনা বেগমকে মানসিকভাবে চিন্তামুক্ত রাখতে হবে, যেকোনো বড় ধাক্কা তার জন্য মারাত্মক হতে পারে।
হাসপাতালের কেবিনে জ্ঞান ফেরার পর আমেনা বেগম প্রথম কথাই বললেন জিমকে উদ্দেশ্য করে। "জিম, আমার একটা কথা তোকে রাখতে হবে।"
জিম তার মায়ের হাত ধরে বলল, "কী বলছ আম্মা? তুমি যা বলবে আমি শুনব। তুমি আগে সুস্থ হও।"
"তুই আনিকাকে বিয়ে কর।"
কথাটা শুনে কেবিনের ভেতরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আনিকা মনে হলো যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার হূৎপিণ্ড থমকে গেল। সে ভয়ে আর লজ্জায় দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
জিম চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকাল। তার কঠোর মুখে স্পষ্ট অসম্মতির ছাপ ফুটে উঠল। "আম্মা! তুমি কী বলছ এসব? আনিকা ছোট, আর ও আমার খালাতো বোন! এসব কীসের আবদার?"
"আমি জানি ও তোর ছোট," আমেনা বেগম কষ্টে শ্বাস নিয়ে বললেন, "কিন্তু ও বড্ড একা। আমার পর ওকে দেখার কেউ নেই। আর তোকে আমি চিনি, তুই একটা উপযুক্ত মেয়েকে জীবনসঙ্গী করবি সে সময় তোর নেই। আনিকাই তোর সাথে মানিয়ে নিতে পারবে। তুই যদি না বলিস, তবে আমি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেব।"
"আম্মা, প্লিজ নাটক কোরো না," জিম চোয়াল শক্ত করে বলল।
"আমি সত্যি বলছি জিম। আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে এটা," আমেনা বেগমের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, তিনি হাঁপাতে লাগলেন।
যন্ত্রপাতি বিপ বিপ করে বাজতে শুরু করায় জিম আর নিজের মত ধরে রাখতে পারল না। মায়ের শারীরিক অবস্থা দেখে তার ভেতরের কঠোর ভাবটা চুরমার হয়ে গেল। জিম চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল, "ঠিক আছে। তুমি শান্ত হও। আমি তোমার কথা রাখব।"
কথাটা দরজার ওপাশ থেকে শুনে আনিকার পুরো শরীর কাঁপতে শুরু করল। এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করল। যে মানুষকে সে সারাজীবন দূর থেকে ভালোবেসে এসেছে, যার এক পলক চাহনিতে সে ভয়ে সিটিয়ে থাকে, সেই জিম ভাইয়াই হতে যাচ্ছে তার স্বামী? জিম যে কেবল মায়ের চাপে বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আনিকার বুঝতে বাকি রইল না।
দুই দিন পর হাসপাতাল থেকেই আমেনা বেগমকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো। আর তার পরেই ঘরোয়া পরিবেশে, কোনো বড় আয়োজন ছাড়াই, কাজী ডেকে জিম আর আনিকার আকদ করিয়ে দেওয়া হলো।
বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত প্রায় এগারোটা বাজল। খালা, অর্থাৎ এখন আনিকার শাশুড়ি, তাকে নিজের হাতে জিমের ঘরে পৌঁছে দিলেন। আনিকা লাল সুতি শাড়ি পরে ঘরের খাটের এক কোণে বসে কাঁপছিল। তার চোখ পানিতে ভরে আসছিল বারবার। জিম ভাইয়া তাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে তো? নাকি বাধ্য হয়ে বিয়ে করায় তার ওপর সব রাগ ঝাড়বে?
কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ হলো। ভারী পদক্ষেপে জিম ঘরে প্রবেশ করে ভেতরের লকটা আটকে দিল।
আনিকা ভয়ে নিজের শাড়ির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরল। সে মাথা তোলার সাহস পাচ্ছিল না। জিম ধীর পায়ে হেঁটে খাটের সামনে এসে দাঁড়াল। তার উপস্থিতির গাম্ভীর্য পুরো ঘরটাকে যেন আরও ভারী করে তুলল।
জিম এক নজর লাল শাড়ি পরা, ভয়ে দুমড়ে-মুচড়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো ভালোবাসার উত্তাপ ছিল না, কেবল ছিল এক গভীর বিরক্তি আর বাধ্যবাধকতার ছাপ।
"শোনো," জিমের ঠান্ডা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
আনিকা চমকে উঠে মাথা আরও নিচু করল।
"আম্মার অসুস্থতার কারণে এই বিয়েটা করতে হয়েছে, তা তুমি খুব ভালো করেই জানো," জিম রুক্ষ কণ্ঠে বলল। "কাজেই আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো আশা রাখবে না। আমি যেমন ছিলাম, তেমনই থাকব। তোমার এই লাজুক আর ভীতু মার্কা স্বভাবটা আমার একদম পছন্দ নয়। নিজেকে সামলে চলার চেষ্টা কোরো।"
কথাগুলো বলেই জিম তার আলমারি থেকে তোয়ালে আর চেঞ্জ করার কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। জিম চলে যেতেই আনিকার চোখ থেকে দু-ফোঁটা তপ্ত জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। যে ভালোবাসার ফুল সে মনে মনে ফুটিয়েছিল, তা প্রথম দিনেই যেন জিমের রুক্ষতার বরফে জমে পাথর হয়ে গেল।
বিয়েটা হয়েছে মাত্র সপ্তাহখানেক হলো। কিন্তু আনিকার কাছে এই সাতটি দিন যেন সাতটি যুগের মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে। জিমের সাথে একই ছাদের নিচে থাকা, একই ঘরে রাত কাটানো—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত দমবন্ধ করা পরিবেশ। জিম সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকে, আর বাড়ি ফিরেও তার সেই গম্ভীর, রাশভারী রূপ। কথা কম বলে, আর একটু এদিক-সেদিক হলেই আনিকাকে ঠান্ডা গলায় বকা দেয়। আনিকা ভয়ে ভয়ে থাকে, সবসময় চেষ্টা করে জিমের সামনে কম পড়তে।
তবে একটা পরিবর্তন আনিকা লক্ষ করেছে। জিমের রাগ বা বকাঝকার পেছনে একটা যত্ন লুকিয়ে থাকে, যা সে মুখে প্রকাশ করে না। আমেনা খালার শরীর আগের চেয়ে একটু ভালো, কিন্তু জিম নিয়ম করে রোজ মায়ের ওষুধপত্র এবং আনিকার পড়াশোনা বা খাওয়া-দাওয়ার খোঁজ নেয়। যদিও তার কণ্ঠের সুরটা সবসময়ই একটু কড়া থাকে।
সেদিন ছিল ছুটির দিন, বিকেলে হঠাৎ করেই আকাশের মুখ ভার হয়ে এলো। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। জিম তখন ল্যাপটপে অফিসের কোনো একটা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছিল। খালা ঘুমিয়ে আছেন। আনিকা রান্নাঘর থেকে এক কাপ চা বানিয়ে জিমের পড়ার টেবিলে রাখতেই জিম গম্ভীর গলায় বলল, "বৃষ্টির সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভেজার শখ হয়েছিল বুঝি?"
আনিকা চমকে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "না তো... আমি তো চা আনতে গিয়েছিলাম।"
"যাক গে, আজ আমার এক পুরোনো বন্ধুর রিসেপশন আছে ধানমন্ডিতে। আমাকে যেতেই হবে। তুমি তৈরি হয়ে নাও, আমাদের সাথে যেতে হবে," জিম ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতে বলল।
"আমি? আমি যাবো না তো!" আনিকা ভয়ে ভয়ে পিছিয়ে গেল। "আমার তো শাড়ি পরা বা এমন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কোনো অভ্যাস নেই।"
"আম্মা বলেছেন তোমাকে সাথে নিয়ে যেতে, যাতে সবাই নতুন বউকে দেখে। তাই কথা না বাড়িয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নাও," জিম এমনভাবে বলল যে আর দ্বিমুক্তি করার উপায় রইল না।
অগত্যা আনিকা আলমারি খুলে একটা হালকা নীল রঙের জামদানি শাড়ি বের করল। কোনোমতে হাত কাঁপাতে কাঁপাতে শাড়িটা পরে ফেলল সে। চুলগুলো খোপা করে একটু কাজল দিল চোখে। জিম দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছিল। আনিকাকে দেখে তার চোখ একবার জিরিয়ে গেল, তবে মুখে কিছু বলল না। কেবল বলল, "চলো।"
অনুষ্ঠান শেষে যখন তারা বাড়ি ফিরল, তখন রাত প্রায় বারোটা। আসার পথে হঠাৎ প্রবল বেগে কালবৈশাখীর মতো ঝড় শুরু হলো। ড্রাইভার গাড়ি গলির মুখে ঢুকিয়ে বলল যে পানির চাপে সামনে আর গাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে জিম আর আনিকাকে রিকশা নিতে হলো। কিন্তু রিকশাওয়ালা ছাতা থাকলেও বৃষ্টির ঝাপটায় দুজনেই সম্পূর্ণ ভিজে একাকার হয়ে গেল।
যখন তারা বাসায় পৌঁছাল, তখন আনিকার পরনের নীল শাড়িটা শরীর সাথে লেপ্টে আছে, চুল দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। আর সে থরথর করে কাঁপছে শীতে ও ভয়ে।
জিম ঘরের দরজা খুলে চাবিটা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে নিজের ভেজা শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল, "কী অবস্থা! যাও, দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটা শুকনো কাপড় পরে নাও, না হলে নিউমোনিয়া বাঁধাবে।"
আনিকা কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে নিজের তোয়ালে ও কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
বিশ মিনিট কেটে গেল, কিন্তু আনিকা বের হয় না। জিম তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুম থেকে এসে দরজায় মৃদু ধাক্কা দিল। "অনিকা? এখনো বেরোওনি কেন?"
ভেতর থেকে আনিকার থরথর করা কাঁপা গলা ভেসে এলো, "জিম ভাইয়া... আমার... আমার ব্লাউজের পেছনের হুকের চেনটা আটকে গেছে। খুলতে পারছি না, আবার পরার সময়ও লাগাতে পারছি না। আটকে গেছে শক্ত করে।"
জিমের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আলতো করে ওয়াশরুমের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।
বাথরুমের নরম হলদে বাতির আলোয় আনিকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ভেজা শাড়িটা শরীরের সাথে সেঁটে আছে, পিঠের দিককার ব্লাউজের চেনটা মাঝপথে আটকে গিয়ে কুঁকড়ে গেছে। ঠান্ডায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। জিমকে দরজায় দেখেই আনিকা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। তার বুকটা তখন ঢিপঢিপ করছে। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, এই বুঝি জিম আবার বিরক্ত হয়ে বকা দেবে।
কিন্তু জিম কোনো বকা দিল না। সে ধীর পায়ে আনিকার আরও কাছে এগিয়ে এল। আয়নার প্রতিবিম্বেই জিমের গম্ভীর ছায়া আনিকার ওপর পড়ল। জিম তার বড় বড় আঙুল দিয়ে আনিকার পিঠের ওপর আটকে যাওয়া চেনটার কাছে হাত রাখল।
জিমের হাতের স্পর্শ লাগতেই আনিকার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা বিদ্যুতের শিহরণ বয়ে গেল। সে ভয়ে চোখ বুজে নিজের অজান্তেই একটু কেঁপে উঠল। জিমের নিশ্বাস এসে পড়ল আনিকার ভেজা ঘাড়ের ওপর।
"এত কাঁপছ কেন?" জিমের গলাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিচু এবং ভারী শোনাল।
আনিকা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গাল দুটো লজ্জায় ও উত্তেজনায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। জিম খুব সাবধানে ও আলতোভাবে চেনটা উপর থেকে নিচে নামিয়ে দিল, যাতে সুতোয় টান না লাগে। তারপর ধীরে ধীরে চেনটা আবার ঠিক করে ওপরের দিকে তুলে আটকে দিল।
এই সামান্য কয়েক সেকেন্ড যেন সময়ের গতি থামিয়ে দিয়েছিল। জিমের বুক আনিকার পিঠের সাথে সামান্য ছুঁয়ে ছিল। সেই ছোঁয়া থেকে এক অদ্ভুত উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছিল আনিকার সারা শরীরে। জিমও বুঝতে পারছিল মেয়েটার কাঁপনটা কেবল শীতের নয়, অন্য কিছুর।
চেন লাগানোর পর জিম সাথে সাথে সরে গেল না। সে আনিকার কানের ঠিক পাশ দিয়ে মুখটা একটু নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এত জড়োসড়ো হয়ে থাকো কেন সবসময়? আমি কি তোমাকে খেয়ে ফেলব?"
আনিকার নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো। সে লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চাইছে। জিমের এই ছোঁয়া, এই গলার স্বরের আকুলতা—এর আগে সে কখনো দেখেনি।
জিম নিজেই আনিকার কাঁধে রাখা ভেজা ওড়নার আঁচলটা ঠিক করে দিয়ে পিছু হটল। তার গলাটা একটু খাদে নামানো। "এবার তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসো। গরম কফি দিচ্ছি খেয়ে নাও।"
কথাটা বলে জিম ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গেল। আনিকা আয়নার সামনে একা দাঁড়িয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দু'হাতে ঢেকে ফেলল। তার হৃদপিণ্ড তখন আর বশে নেই। যে মানুষটাকে সে এতদিন শুধু দূর থেকে ভয় আর ভালোবাসার মিশ্রণে দেখেছে, সেই মানুষটার ভেতরের একটা অন্য রূপ আজ তার সমস্ত অহংকার আর দূরত্বকে ধূলিসাৎ করে দিল।
সেই বৃষ্টির রাতের পর থেকে জিমের ব্যবহারে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করল আনিকা। রুক্ষতা যেন কিছুটা হলেও কমে এসেছিল। জিম আগের মতো কথায় কথায় ধমক দেওয়া কমিয়ে দিয়েছিল, বরং আনিকার প্রতি তার খেয়াল রাখাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অফিসে যাওয়ার সময় আগে যেখানে কিছুই বলত না, এখন নিয়ম করে বলে যেত—"দুপুরে সময়মতো খেয়ে নেবে, আর ঠান্ডা পানি একদম খাবে না।"
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় প্রায়ই আনিকার পছন্দের চকোলেট বা পছন্দের কোনো বই নিয়ে আসত জিম। টেবিলের ওপর সেগুলো গম্ভীর মুখে রেখে বলত, "রাস্তায় জ্যামে আটকে ছিলাম, ফেরিওয়ালা সামনে এলো তাই কিনে নিলাম।"
আনিকা মনে মনে হাসত। সে ভালো করেই জানত, ফেরিওয়ালা ধানমন্ডির সেই বিশেষ ব্র্যান্ডের চকোলেট বিক্রি করে না। জিমের এই ছদ্মবেশী যত্ন আনিকার হৃদয়ে জমে থাকা ভালোবাসার অনুভবে নতুন করে জল ঢালছিল। তার মনে হচ্ছিল, হয়তো সত্যি সত্যিই এই সম্পর্কটা একটা স্বাভাবিক পরিণতি পেতে চলেছে। কিন্তু সেই ভুল ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগল না।
পরদিন বিকেলে ঘটনাটা ঘটল। আমেনা বেগম তখন ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছেন। আনিকা ড্রয়িংরুমে বসে জিমের একজোড়া শার্ট ইস্ত্রি করছিল। ঠিক এমন সময় বাসার কলিংবেল বেজে উঠল।
আনিকা ইস্ত্রি বন্ধ করে গায়ের ওড়নাটা ঠিকঠাক সামলে নিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীকে দেখে আনিকা একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
পাশ্চাত্য পোশাক পরা, বেশ আধুনিকা আর পরিপাটি এক মেয়ে। নাম তার তানিয়া। জিমের সাথে ইউনিভার্সিটিতে পড়ত, জিমের পুরনো বান্ধবী। তানিয়া আনিকাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একনজর তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখল। আনিকার পরনে একটা সাধারণ সুতির থ্রি-পিস, চুলে তাড়াহুড়ো করে খোঁপা করা।
"জিম আছে?" তানিয়ার গলার স্বর বেশ চড়া আর ধারালো।
"না... মানে জিম ভাইয়া তো অফিসে। আপনি ভেতরে আসুন," আনিকা বিনীতভাবে সরে দাঁড়িয়ে পথ ছেড়ে দিল।
তানিয়া ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় বেশ আয়েশ করে বসল। হাই হিলের শব্দে ঘরটা যেন কাঁপছিল। সে চারপাশে চোখ বুলিয়ে আনিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "তুমি কে? বাসায় কাজের নতুন লোক রেখেছ নাকি জিম? তোমাকে তো আগে দেখিনি।"
আনিকার মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিজের বাড়িতেই তাকে বুয়া ভেবে বসছে কেউ! সে গলাটা পরিষ্কার করে বলল, "না... আমি এই বাসার বউ। জিমের স্ত্রী।"
তানিয়ার মুখ দিয়ে একটা অবজ্ঞার শব্দ বের হলো। সে যেন শুনে বিশ্বাসই করতে পারল না। একগাল হেসে উঠে দাঁড়িয়ে আনিকার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। "স্ত্রী? জিমের ওয়াইফ তুমি? ওয়াও! জিমের চয়েস এত নিচে নেমে গেছে নাকি আজকাল? তুমি তো একটা সাধারণ গাঁয়ের মেয়ের মতো দেখাচ্ছ। শোনো মেয়ে, আমি জিমের ফ্রেন্ড। জিমকে আমি বছরের পর বছর ধরে চিনি। ওর টেস্ট কেমন, ওর স্ট্যান্ডার্ড কেমন—সেটা আমার খুব ভালো জানা আছে।"
আনিকা থতমত খেয়ে গেল। তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে আমতা আমতা করে বলল, "আপনার জন্য চা নিয়ে আসি?"
"নো থ্যাঙ্কস! তোমার হাতের চা খাওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই," তানিয়া বিষাক্ত হেসে বলল। "আমি জাস্ট বিশ্বাস করতে পারছি না যে জিম তোমার মতো একটা আন কালচার্ড, সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করেছে! নিশ্চয়ই খালার ব্ল্যাকমেইলে পড়ে? আহা বেচারা জিম! ওর লাইফটা কীভাবে স্পয়েল হয়ে গেল দেখো। তোমার সাথে তো ও কোথাও গিয়ে দাঁড়াতেও পারবে না। কোনো হাই-সোসাইটি পার্টিতে তোমাকে নিয়ে যাবে? ছিঃ! মান-সম্মান সব যাবে ওঁর।"
প্রতিটা কথা ধারালো ছুরির মতো এসে আনিকার বুকে বিঁধছিল। তার লাজুক স্বভাব তাকে মুখের ওপর জবাব দিতে বাঁধা দিচ্ছিল। সে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। চোখ দুটো পানিতে কানায় কানায় ভরে উঠল। তানিয়ার বিষাক্ত হাসি আর অপমান সহ্য করতে না পেরে আনিকা নিঃশব্দে এক দৌড়ে করিডোর পার হয়ে তার ঘরে ঢুকে গেল এবং দরজায় খিল তুলে দিল।
বিছানায় মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে লাগল আনিকা। তানিয়ার কথাগুলো তার মনের ভেতরের সবচেয়ে বড় ভয়টাকে আবার জাগিয়ে দিয়েছে। সত্যি তো, সে তো জিমের যোগ্য নয়। জিম কত হ্যান্ডসাম, কত বড় অফিসার! আর সে? নিতান্তই সাধারণ এক লাজুক মেয়ে। জিম তো তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি, শুধু মায়ের কথা রাখতে গিয়ে এই বাঁধনে জড়িয়েছে। আনিকার বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।
ঠিক পৌনে এক ঘণ্টা পর জিম বাসা ফিরল। ঘরে ঢুকে তানিয়াকে বসে থাকতে দেখে সে একটু অবাকই হলো।
"তানিয়া? তুমি হঠাৎ এখানে?" জিম তার ব্যাগটা টেবিলে রাখল।
"ওহ জিম! অবশেষে তুমি এলে," তানিয়া সোফা থেকে উঠে জিমের দিকে এগিয়ে এসে কায়দা করে বলল। "আসলে একটা অফিশিয়াল কাজে এদিকটায় এসেছিলাম, ভাবলাম তোমার সাথে দেখা করে যাই। কিন্তু জিম... তোমার বাসায় এসে আমি তো জাস্ট শক্ড!"
"কেন? কী হয়েছে?" জিমের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে কুঁচকে গেল। সে ড্রয়িংরুমে আনিকাকে দেখতে না পেয়ে ইতস্তত চোখ বোলাচ্ছিল।
"তোমার ওই সো-কল্ড ওয়াইফ!" তানিয়া হাসতে হাসতে বলল, "কী ছিরি ওর! কোনো ম্যানার্স নেই, কথা বলার ধং নেই। ড্রয়িংরুমে কাজের মেয়ের মতো শার্ট ইস্ত্রি করছিল। আমি একটু ওর স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে সত্যি কথাটা কী বললাম, অমনি ঢং করে কেঁদে কেটে ঘরে গিয়ে খিল দিল! এসব ছোটলোকের মতো আচরণ কেন পাচ্ছ তুমি বাসায়? জিম, সিরিয়াসলি, তুমি কীভাবে সহ্য করছ ওকে? ও তো তোমার যোগ্যই নয়!"
তানিয়ার মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই জিমের চেহারার অভিব্যক্তি বদলে গেল। এতক্ষণ যে মুখটা শান্ত ছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র রোষে কঠোর হয়ে উঠল। তার চোখের মনি দুটো রাগে রি-রি করে উঠল। নিজের স্ত্রীর অপমান, তা-ও নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে অন্য এক নারীর মুখে—জিম এটা এক সেকেন্ডের জন্যও সহ্য করতে পারল না।
"মুখ সামলে কথা বলো, তানিয়া!" জিমের গলার আওয়াজ পুরো ড্রয়িংরুমে বাজের মতো গর্জে উঠল।
তানিয়া চমকে উঠে এক পা পিছিয়ে গেল। জিমকে সে কখনোই এভাবে রাগতে দেখেনি।
"আমার স্ত্রী কার যোগ্য আর কার যোগ্য নয়, সেটা বিচার করার অধিকার তোমাকে কেউ দেয়নি," জিম চোয়াল শক্ত করে এক পা এগিয়ে এলো। "আমার ঘরে এসে আমার স্ত্রীর ওপর আঙুল তোলার সাহস তুমি পাও কী করে? আনিকা এই বাড়ির মালকিন, আর ও যেমন, আমার জন্য তেমনই নিখুঁত। ওর সাথে কথা বলার বা ওকে বিচার করার কোনো যোগ্যতা তোমার নেই!"
"জিম, তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছ? একটা সাধারণ মেয়ের জন্য?" তানিয়ার মুখ ভয়ে আর অপমানে লাল হয়ে উঠল।
"হ্যাঁ, বলছি। আর শোনো, আজই প্রথম আর আজই শেষ। এরপর যেন এই বাড়ির তো দূরে থাক, আমার ত্রিসীমানায় তোমাকে আর কোনোদিন না দেখি! আউট অফ মাই হাউস! এখনই বের হও!" জিম দরজার দিকে আঙুল তুলে সশব্দে নির্দেশ দিল।
তানিয়া রাগে ও অপমানে ফোঁস ফোঁস করতে করতে তার ব্যাগটা তুলে নিয়ে সজোরে পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
জিম এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করল। তারপর দীর্ঘ পা ফেলে সে আনিকার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকল, "অনিকা! দরজা খোলো।"
দরজায় জিমের ভারী হাতের ধাক্কা আর গম্ভীর ডাক শুনে আনিকার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে খিল খুলে দরজার সামনে দাঁড়ালেই সে দেখল জিম ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নিচ্ছে, তার চোখ দুটো রাগে এখনো লাল।
জিম এক মুহূর্ত আনিকার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখ-মুখ লাল হয়ে ফুলে আছে, চোখের পাপড়িতে এখনো অশ্রুবিন্দু জমে আছে। তানিয়ার বিষাক্ত কথাগুলো যে এই লাজুক মেয়েটার বুকে কত বড় আঘাত করেছে, তা জিমের বুঝতে বাকি রইল না।
"তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর অপমান সহ্য করছিলে কেন?" জিমের গর্জন শুনে আনিকা চমকে এক পা পিছিয়ে গেল। জিম ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজাটা আটকে দিল।
"জিম ভাইয়া... আমি... আমি তো..." আনিকা আর কিছু বলতে পারল না, ঠোঁট কামড়ে ধরে আবার ফুঁকিয়ে কেঁদে উঠল।
আনিকার এই নীরব কান্না জিমের বুকের ভেতরে কোথায় যেন তীব্র এক মোচড় দিল। সমস্ত রাগ যেন এক নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল, তার জায়গায় জেগে উঠল এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা। জিম ধীর পায়ে আনিকার একদম কাছে এগিয়ে আসলো। আনিকা দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দমে গেল, কিন্তু এবার জিম তার ওপর কোনো রাগ দেখাল না।
জিম তার শক্ত দু হাত বাড়িয়ে দিল আনিকার দিকে। আলতো করে আনিকার ভেজা দু গাল নিজের হাতের তালুতে তুলে ধরে মুখটা ওপরের দিকে তুলল। জিমের হাতের স্পর্শে আনিকার কান্না থমকে গেল। সে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে জিমের দিকে তাকাল।
"ও যা ইচ্ছে বলবে, আর তুমি চুপচাপ সেটা মেনে নিয়ে নিজের ঘরে এসে কাঁদবে? নিজেকে এত ছোট ভাবো কেন তুমি?" জিমের গলার সুর হঠাৎ করেই ভীষণ নরম হয়ে এলো। তার চোখের রাগের জায়গায় এখন খেলা করছে গভীর এক ভালোবাসা আর অধিকারবোধ।
"আমি যে তোমার যোগ্য নই জিম ভাইয়া," আনিকা ফুঁপিয়ে বলল, "তুমি তো কেবল খালার কথা রাখতে..."
আনিকার কথা শেষ হতে দিল না জিম। একমুহূর্তের ব্যবধানে সে তার ঝুকে আসা ঠোঁট দুটো চাপিয়ে দিল আনিকার মিষ্টি ঠোঁটের ওপর।
আনিকার পুরো শরীর যেন এক পলকে অবশ হয়ে গেল। তার শ্বাস থমকে গেল, হাত থেকে ওড়নার খুঁট খসে পড়ল। জীবনের প্রথম এত গভীর, ভালোবাসাময় এক ছোঁয়া! জিমের প্রতিটি স্পর্শে আজ আর কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল কেবল চরম এক তীব্রতা ও ব্যাকুলতা। সে যে আনিকাকে কতখানি নিজের করে পেতে চায়, তা যেন এই একটি চুমুর মধ্য দিয়েই বুঝিয়ে দিতে চাইল।
কয়েক সেকেন্ড পর জিম ধীরেসুস্থে মাথা তুলল। আনিকা তখন লজ্জায় ও উত্তেজনায় কাঁপছিল, তার চোখ বন্ধ, গালে রক্তের আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
জিম তার বুড়ো আঙুল দিয়ে আনিকার ঠোঁটটা আলতো করে মুছে দিল। তারপর আনিকার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "কারো কথা শুনে নিজেকে কখনো আর ছোট ভাববে না। তুমি আমার স্ত্রী, আর তুমিই আমার একমাত্র পছন্দ। আমি মায়ের বাধ্য ছেলে হতে পারি, কিন্তু যে মেয়েকে বউ করে এনেছি, তাকে ভালোবেসেই নিজের ঘরে রেখেছি। বুঝেছ?"
কথাগুলো শুনে আনিকার বুক চিরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হলো। এতদিন মনের ভেতর জমিয়ে রাখা সমস্ত সন্দেহ, ভয় আর দ্বিধা যেন এক নিমিষেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। যে ভালোবাসার কথা জিম মুখ ফুটে কখনো বলেনি, আজ তার স্পর্শ আর অধিকারবোধ দিয়ে সব পরিষ্কার করে দিল।
আনিকা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এবার সব লজ্জা একপাশে সরিয়ে সে দু হাতে জিমের কোমর জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকাল। জিমও কোনো দ্বিধা না করে আনিকাকে নিজের বলিষ্ঠ বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
জিমের শক্ত বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে সেদিন যেন এক অলৌকিক শান্তি খুঁজে পেয়েছিল আনিকা। যে পুরুষটিকে সে বছরের পর বছর ধরে কেবল দূর থেকে ভয় মিশ্রিত এক গোপন ভালোবাসায় ভালোবেসে এসেছে, সেই মানুষটার হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন আজ তাকে বলছিল—আনিকা আর একা নয়, সে কেবল বাধ্যবাধকতার স্ত্রী নয়, সে জিমের ভালোবাসার মানুষ।
পরদিন সকালের সূর্যটা যেন এক নতুন আলোর বার্তা নিয়ে এলো আনিকার জীবনে।
আনিকা ঘুম ভাঙতেই দেখল সে জিমের বাহুবেষ্টনীর মধ্যে জড়িয়ে আছে। জিমের এক হাত আনিকার কোমরে জড়ানো, অন্য হাতটা তার মাথার নিচে। ভোরের নরম আলো এসে পড়েছে জিমের সেই চেনা গম্ভীর মুখে, যা এখন ভীষণ শান্ত আর নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। আনিকার মুখ জুড়ে রক্তের আভা ফুটে উঠল। এক অদ্ভুত লজ্জায় তার বুক ধড়ফড় করে উঠল, কিন্তু এবার সেই ভয় আর ছিল না। সে আলতো করে জিমের কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিল।
ঠিক তখনই জিম চোখের পাতা খুলল। ঘুমন্ত চোখে আনিকার লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে জিমের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিরল, মিষ্টি হাসি।
"সকাল সকালেই চুরি করে মুখ দেখা হচ্ছে?" জিমের ঘুমজড়ানো ভারী গলাটা আনিকার কানে একদম সুরের মতো শোনাল।
আনিকা আরও লজ্জা পেয়ে জিমের বুকে মুখ লুকাতে চাইল, "না... মানে, আমি তো উঠছিলাম।"
"উহু, এত সহজে ছাড়া পাওয়া যাবে না," জিম হাত দুটো আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আনিকাকে নিজের দিকে টেনে নিল। "কাল রাতে তো অনেক বড় বড় কথা শুনলে, আজ সকালে তার মাশুল দিতে হবে না?"
"কীসের মাশুল?" আনিকা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
জিম আনিকার নাকে নিজের নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল, "আমার শার্ট ইস্ত্রি করে দাওনি কাল। ওই তানিয়া এসে সব ভণ্ডুল করে দিল। তাই আজ সকালে আমাকে স্পেশাল এক কাপ চা আর একটা মিষ্টি হাসির সার্ভিস দিতে হবে।"
আনিকা মুখ টিপে হেসে দিল। জিম ভাইয়া যে এভাবেও দুষ্টুমি করতে পারে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। সে জিমের বুক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "ঠিক আছে, আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন, আমি চা নিয়ে আসছি।"
জিম কনুইয়ে ভর দিয়ে শুয়ে থেকে আনিকার শাড়ির আঁচল ধরে সামান্য টান দিল, "এখনো 'আপনি' আর 'জিম ভাইয়া'? বিয়েটা কিন্তু অনেক দিন আগেই হয়েছে ম্যাডাম।"
আনিকা দরজার কাছে গিয়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে লাজুক হেসে বলল, "অভ্যাস তো একদিনে যায় না... জিম!" বলেই এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। জিম খাটে বসে হেসে ফেলল—একমুক্ত, খোলামেলা হাসি, যা এই বাড়িতে বহু বছর কেউ দেখেনি।
রান্নাঘরে এসে চা বানানোর সময় আনিকার পা যেন মাটিতে পড়ছিল না। আমেনা বেগম তখন উঠানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আনিকার মুখের এই হাসি আর চঞ্চলতা দেখে বয়স্ক মহিলাটির চোখে স্বস্তির পানি চলে এলো। তিনি বুঝতে পারলেন, তার নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না।
চা বানিয়ে ঘরে নিয়ে যেতেই জিম ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধছিল। আনিকা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে এগিয়ে এলো। "আমি বেঁধে দিই?"
জিম হাত দুটো সরিয়ে আনিকার দিকে তাকাল, "পারবে?"
আনিকা কিছু না বলে ধীরহাতে জিমের টাইয়ের নটটা ধরে নিখুঁতভাবে টাই বেঁধে দিল। কাজের মাঝেই সে অনুভব করছিল জিমের গভীর দৃষ্টি তার ওপর স্থির হয়ে আছে। টাই বাঁধা শেষ হতেই জিম হঠাৎ আনিকার কোমর ধরে নিজের দিকে টেনে নিল এবং তার কপালে এক দীর্ঘ, গাঢ় চুমু আঁকল।
"অফিস থেকে আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরব," জিম আনিকার কানে ফিসফিস করল, "এক জায়গায় নিয়ে যাব তোমায়।"
"কোথায়?" আনিকা উৎসুক চোখে তাকাল।
"সারপ্রাইজ। তৈরি হয়ে থেকো," জিম চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে গেল।
সারাদিন যেন আনিকার কাটতেই চাইছিল না। জিমের দেওয়া ভালোবাসার এই মিষ্টি উপহার তাকে এক নতুন স্বপ্নে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বিকেলে সে একটা সুতি বাসন্তী রঙের শাড়ি পরল, চোখে একটু কাজল আর চুলে বেলী ফুলের একটা গজরা পেঁচিয়ে নিল।
সন্ধ্যা নামতেই বাড়ির সামনে এসে গাড়ির হর্ন বাজল। আনিকা খালার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। জিম ড্রাইভিং সিটে বসে ছিল। বাসন্তী রঙের শাড়িতে আনিকাকে দেখে তার চোখের মনি থমকে গেল কিছুক্ষণের জন্য।
"অনেক সুন্দর লাগছে," জিম গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে সহজ কণ্ঠে বলল।
কথাটা শুনে আনিকার গাল দুটো আবার গরম হয়ে উঠল। গাড়ি ছুটল শহরের কোলাহল পেরিয়ে নদীর ধারের এক শান্ত ক্যাফেটেরিয়ার দিকে। নদীর ওপার থেকে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসছিল। তারা নদীর পাড়ে কাঠের বেঞ্চে গিয়ে বসল। আকাশে তখন মায়াবী চাঁদ উঠেছে।
জিম আনিকার একটা হাত নিজের শক্ত হাতের তালুতে তুলে নিল। আঙুলে আঙুল জড়িয়ে ধরে সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আনিকার দিকে ফিরে বলল, "অনিকা, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি।"
"কী কথা?"
"তোমাকে যখন আম্মার অসুস্থতার কারণে বিয়ে করি, তখন রাগটা তোমার ওপর ছিল না। রাগ ছিল পরিস্থিতির ওপর। কিন্তু তোমাকে যত দেখেছি, তোমার ওই শান্ত, লাজুক রূপটা ততটাই আমার মনের গভীর দখল করে নিয়েছে। তোমাকে শাসন করতাম কারণ তুমি নিজের যত্ন নিতে না। কিন্তু আমি জানতাম না, কখন যে আমার এই রুক্ষ মনটা তোমার প্রেমে পড়ে গেছে।"
কথাগুলো শুনতে শুনতে আনিকার চোখে জল এসে গেল, তবে এ জল কষ্টের নয়, এক চরম প্রাপ্তির।
জিম আনিকার চোখের পানি আলতো করে মুছে দিয়ে হেসে বলল, "এখনো কাঁদছ? এখন তো কাঁদার কোনো কারণ নেই।"
"আমি খুব ভাগ্যবতী, জিম," আনিকা জিমের কাঁধে মাথা রাখল।
"না, ভাগ্যবতী তুমি নও, ভাগ্যবান আমি," জিম আনিকার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল।
নদীর ধারের সেই জোছনা রাতে দুজন নীরব ভালোবাসার পথিক যেন একে অপরের মাঝে খুঁজে পেল জীবনের আসল পথ। তবে নিয়তির খেলায় যে সুখের দিনগুলোর পেছনেই মেঘ জমে থাকে, তা তখনো তাদের জানা ছিল না।
দিনগুলো ডানা মেলে উড়ছিল। নদীর ধারের সেই জোছনাময় সন্ধ্যার পর থেকে জিম আর আনিকার সম্পর্কটা যেন এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল। জিমের রুক্ষ গাম্ভীর্যের জায়গায় এখন ঠাঁই পেয়েছে এক অদ্ভুত কোমলতা। প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরেই তার প্রথম খোঁজ হতো—"অনিকা কোথায়?" আর আনিকাও সারাদিন অপেক্ষা করে থাকত, কখন সেই চেনা গাড়ির হর্ন বাজবে, কখন সে ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়াবে।
তবে কয়েক দিন ধরে আনিকার শারীরিক অবস্থাটা খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। প্রায়ই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর গা গুলিয়ে আসত, শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগত। ভারী কোনো খাবারের গন্ধ পেলেই বমি বমি ভাব হতো।
একদিন সকালে ড্রয়িংরুমে জিমের শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতে দিতে হঠাৎ করেই আনিকার মাথাটা ঘুরে উঠল। সে চোখের সামনে সব অন্ধকার দেখে ঢলে পড়তে নিলেই জিম চট করে তাকে দু হাতে ধরে ফেলল।
"অনিকা! কী হয়েছে তোমার?" জিম অস্থির হয়ে উঠল। সে আনিকাকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে খাটে শুইয়ে দিল। "আম্মা! আম্মা শিগগির এসো তো!"
আমেনা বেগম লাঠি ভর দিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘরে এলেন। আনিকার ফ্যাকাশে মুখ আর জিমের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে অভিজ্ঞ মহিলার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি আনিকার কপালে হাত রেখে জিমকে বললেন, "অফিস যাওয়ার দরকার নেই আজ জিম। ডক্টর লতিফাকে ফোন দে, এখনই আসতে বল।"
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে লেডি ডাক্তার এসে আনিকাকে পরীক্ষা করলেন। চেকআপ শেষে ডাক্তার ম্যাডাম হাসিমুখে রুম থেকে বেরিয়ে এসে জিম আর খালার দিকে তাকালেন।
"কংগ্র্যাচুলেশনস জিম সাহেব! আপনি বাবা হতে চলেছেন। আনিকা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা," ডাক্তার কথাটি বলতেই জিম যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
সে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাবা হতে চলেছে সে? এই ছোট্ট, লাজুক মেয়েটা তার সন্তানের মা হতে যাচ্ছে? এক তীব্র আনন্দের জোয়ার জিমের বুকের ভেতর বয়ে গেল। আমেনা বেগম আনন্দে কেঁদে ফেলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন।
জিম দ্রুত ঘরে ঢুকে দরজার লক আটকে দিল। আনিকা তখন খাটে বসে লজ্জায় ও আনন্দে মাথা নিচু করে ছিল। জিম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে খাটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে আনিকার দুটো নরম হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চুমু খেল।
"ধন্যবাদ অনিকা," জিমের গলায় আবেগ ঝরে পড়ল। "আমার ভালোবাসাহীন রুক্ষ জীবনটাকে এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।"
আনিকা চোখের পানি মুছে জিমের চুলে হাত বুলিয়ে দিল, "আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেল জিম।"
এরপর থেকেই জিমের কেয়ারিং রূপটা বহুগুণ বেড়ে গেল। আনিকাকে বিছানা থেকে উঠতে দিতে চাইত না সে। ভারী কোনো কাজ করা একদম বারণ। প্রতিদিন নিয়ম করে ফলমূল, দুধ আর ভিটামিন ওষুধ নিজ হাতে খাইয়ে দিত। অফিসে থাকলেও প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর ফোন করে খোঁজ নিত। লাজুক আনিকা জিমের এই অতিরিক্ত আদিখ্যেতা দেখে মনে মনে হাসত, কিন্তু তার হৃদয়ে এক স্বর্গীয় সুখ বিরাজ করছিল।
কিন্তু সুখী জীবনের এই গতিতে হঠাৎই ছেদ পড়ল এক অলক্ষুণে বিকেলে।
আমেনা বেগম তখন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। আনিকা ড্রয়িংরুমে বসে বাচ্চার জন্য ছোট ছোট কাঁথা সেলাই করছিল। এমন সময় বাড়ির দরজায় একটা পার্সেল এলো। কুরিয়ার বয় ডাক দিয়ে পার্সেলটি আনিকার হাতে দিয়ে গেল। পার্সেলে বড় অক্ষরে জিমের নাম লেখা ছিল।
আনিকা ভাবল হয়তো জিমের অফিসের কোনো জরুরি কাগজপত্র। সে কৌতূহলবশত প্যাকেটটা খুলল। কিন্তু ভেতরে কোনো কাগজ ছিল না, ছিল কতগুলো প্রিন্ট করা ছবি আর একটা চিঠি।
ছবিগুলো হাতে নিতেই আনিকার বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল।
ছবিগুলোতে জিম আর একটি ভীষণ সুন্দরী মেয়ের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের দৃশ্য। মেয়েটি তানিয়া নয়, অন্য কেউ। ছবিগুলো বেশ কয়েক বছর আগের হলেও তাদের রসায়ন স্পষ্ট। আর সাথে থাকা চিঠিতে লেখা—
"আনিকা, তুমি হয়তো ভাবছ জিম তোমাকে খুব ভালোবাসে? কিন্তু তুমি কি জানো জিমের অতীতে কে ছিল? যার প্রেমে জিম আজও মগ্ন, সেই মেঘলা খুব শিগগিরই ফিরে আসছে। তুমি তো কেবল ওর মায়ের দেওয়া বাধ্যবাধকতা, ওর জীবনের আসল ভালোবাসা তুমি কখনোই হতে পারবে না।"
কথাগুলো পড়ার সাথে সাথে আনিকার হাতের ছবিগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। তার মাথার ভেতরটা রী রী করে উঠল, নিঃশ্বাস আটকে আসতে চাইল। এতদিন সে ভেবেছিল জিমের হৃদয়ে কেবল তারই ঠাঁই হয়েছে। কিন্তু এই ছবিগুলো? কে এই মেঘলা? জিম কি তবে এখনো তার পুরোনো অতীতকে ভুলে যেতে পারেনি? নাকি সে কেবল বাচ্চার খাতিরে আর মায়ের কথায় তার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করছে?
হঠাৎ আনিকার মনে হলো, যে ভালোবাসার প্রাসাদ সে গড়ে তুলেছিল, তা যেন বালির ঘরের মতো এক নিমেষে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। তার গর্ভের বাচ্চাটার ওপর হাত রেখে সে ফুঁকিয়ে কেঁদে উঠল।
ঠিক তখনই বাইরের দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ হলো। কাজ সেরে হাসিমুখে ঘরে প্রবেশ করল জিম, আনিকার জন্য মিষ্টি আর নতুন একটা বই হাতে নিয়ে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ঘরের থমথমে পরিবেশ আর মেঝেতে ছড়ানো ছবিগুলো দেখে জিমের মুখের হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল।
মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ছবিগুলো আর আনিকার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া তপ্ত জল দেখে জিমের পা দুটো যেন থমকে গেল। সে হাতের বই আর মিষ্টির প্যাকেটটা পাশের সোফায় রেখে দ্রুত এগিয়ে এল।
"অনিকা? কী হয়েছে তোমার? তুমি কাঁদছ কেন?" জিম ব্যাকুল হয়ে আনিকার কাঁধ ধরতে চাইল, কিন্তু আনিকা ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
জিম অবাক হয়ে আনিকার দিকে তাকাল। যে মেয়ে তার একটা মিষ্টি ছোঁয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকত, তার এই অনীহা আর চোখের ভেতরের তীব্র ঘৃণা জিমকে একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল।
"আমাকে স্পর্শ করবেন না!" আনিকার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত কঠোরতা। "আমার কাছাকাছি আসবেন না আপনি।"
"অনিকা! এসব কী বলছ তুমি? মাথা ঠিক আছে তোমার?" জিম বিরক্তি আর উদ্বেগের মিশ্রণে বলল।
"আমার মাথা একদম ঠিক আছে জিম সাহেব," আনিকা নিচে পড়ে থাকা একটা ছবি কুড়িয়ে নিয়ে জিমের বুকের ওপর ছুঁড়ে মারল। "কিন্তু আপনার কি মন ঠিক আছে? নাকি অন্য কারো স্মৃতির সাগরে ডুবে থেকেও প্রতিদিন আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে গেছেন?"
জিম হাত বাড়িয়ে ছবিটা ধরল। ছবিটার দিকে তাকাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, চোখ দুটো বিষাদে ছেয়ে গেল। ছবিতে বিশ বছর বয়সের এক তরুণ জিম আর তার পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা 'মেঘলা'। জিমের কলেজ জীবনের প্রথম ভুল, তার প্রথম ভালোবাসার তিক্ত অতীত।
"এসব ছবি তুমি কোথায় পেলে?" জিমের গলা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
"কোথায় পেলাম সেটা বড় কথা নয়," আনিকা চোখের পানি মুছে ফুঁকিয়ে উঠল, "বড় কথা হলো এই মেঘলা কে? ও আপনার অতীতে ছিল, নাকি এখনো আপনার মনে রাজত্ব করছে? যে চিঠিতে লেখা আছে ও ফিরে আসছে, আর আমি কেবল আপনার মায়ের চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যবাধকতা!"
জিম এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর পায়ে আনিকার দিকে এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলল, "অনিকা, শোনো... তুমি যা ভাবছ তা নয়। মেঘলা আমার অতীত ছিল, এটা সত্যি। কিন্তু..."
"কিন্তু ও আজও আপনার হৃদয়ে রয়ে গেছে, তাই না?" আনিকা চিৎকার করে উঠল। সাধারণত লাজুক আনিকা কখনোই গলা উঁচিয়ে কথা বলে না, কিন্তু আজ গর্ভবতী একটা নারীর সমস্ত আবেগ আর অধিকারবোধ যেন চুরমার হয়ে গিয়েছিল। "তাই তো এই ছবিটা দেখে আপনার চোখমুখের এক্সপ্রেশন বদলে গেল! আপনি এখনো ওকে ভুলতে পারেননি! তবে কেন আমার সাথে এই নাটক করলেন জিম? কেন আমাকে মা হওয়ার স্বপ্ন দেখালেন? কেন আমাকে বোঝালেন যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন?"
জিম এবার ধৈর্য হারিয়ে ফেলে আনিকার দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরল, "অনিকা! স্টপ ইট! উল্টোপাল্টা কথা বলা বন্ধ করো! তুমি রিঅ্যাক্ট করছ কারণ তুমি গর্ভবতী, তোমার হরমোনাল চেঞ্জ হচ্ছে। মেঘলার সাথে আমার সব সম্পর্ক পাঁচ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে!"
"তাহলে ও কেন আবার ফিরে আসছে? কেন আমাকে চিঠি পাঠাল?" আনিকা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল।
"আমি জানি না ও কেন পাঠিয়েছে বা কে পাঠিয়েছে!" জিম গর্জে উঠল। "কিন্তু তুমি আমাকে বিশ্বাস না করে একটা অজ্ঞাত চিঠির ওপর ভরসা করছ? আমাদের এতদিনের সম্পর্ক, আমার ভালোবাসা—সব তোমার কাছে একটা অভিনয় মনে হলো? শুধু কয়েকটা পুরনো কাগজের টুকরোর জন্য?"
জিমের গলার কঠোরতা আর অনমনীয় ভাব আনিকার বুকে আরও বড় আঘাত হানল। আনিকার মনে হলো, ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর জিম নিজের অপরাধ ঢাকতে আবার তার সেই পুরনো রুক্ষ রূপ ধারণ করছে।
"বিশ্বাস?" আনিকা এক গাল তেঁতো হেসে বলল, "যে সম্পর্কের ভিত্তিটাই তৈরি হয়েছিল একটা অসুস্থ মায়ের ব্ল্যাকমেইলে, সেখানে বিশ্বাসের কী দাম জিম ভাইয়া? আপনি আমাকে কোনোদিন মন থেকে ভালোবাসেননি। শুধু আমার ওপর দয়া করেছেন, আর এখন সন্তানের দায়িত্ব পালন করছেন।"
'দয়া' শব্দটা জিমের কানে তপ্ত সীসার মতো গিয়ে বিঁধল। তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। যে মেয়েটাকে সে নিজের সমস্ত রুক্ষতা ভুলে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, যে ভালোবাসার কথা বলতে তার নিজেরই লজ্জা লাগত—সেই ভালোবাসাটা নাকি মেয়েটার কাছে কেবল 'দয়া'!
জিমের মুখটা মুহূর্তে বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সে আনিকার হাত দুটো ছেড়ে দিল।
"বেশ," জিম একদম নিচু অথচ ভারী গলায় বলল, "তুমি যদি মনে করো আমার ভালোবাসাটা দয়া, তবে তাই সই। তোমাকে কোনো সাফাই দেওয়ার প্রয়োজন আমি মনে করি না। আর তুমি যদি আমাকে এতই অবিশ্বাস করো, তবে আমার সাথে একই ঘরে থাকারও কোনো দরকার নেই।"
কথাটা বলেই জিম আলমারি থেকে নিজের একটা ট্রাভেল ব্যাগ বের করল। দু-জোড়া কাপড় ব্যাগে ভরে সশব্দে জিপ আটকে দিল সে।
আনিকা বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবতেও পারেনি জিম তাকে শান্ত করার বদলে ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।
জিম দরজার কাছে গিয়ে থামল। পেছনের দিকে না তাকিয়েই বলল, "আমি অফিসের কাজে তিন দিনের জন্য চট্টগ্রাম যাচ্ছি। ফিরে আসা পর্যন্ত তুমি নিজের মতো ভেবে নাও, আমাদের এই অবিশ্বাসের সম্পর্ক তুমি রাখতে চাও কিনা। আম্মাকে সাবধানে রেখো, আর নিজের যত্ন নিও।"
কথাগুলো শেষ করেই জিম ধপধপ পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই গ্যারেজ থেকে জিমের গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ পাওয়া গেল, আর তা ধীরে ধীরে দূর থেকে আরও দূরে মিলিয়ে গেল।
আনিকা ড্রয়িংরুমের ঠান্ডা মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। ঘরটা আজ বড্ড খালি, বড্ড নিঃসঙ্গ। গর্ভের ভেতরে নতুন প্রাণের মৃদু স্পন্দন অনুভব করতেই আনিকার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগল। যে ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ তাদের জীবনে নেমে এলো
জিম চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটায় যেন এক শ্মশান নীরবতা নেমে এলো। তিনটি দিন কেটে গেল, কিন্তু জিমের কোনো ফোন এলো না। আগে যেখানে দিনে দশবার ফোন করে খবর নিত—খেয়েছে কিনা, সময়মতো ওষুধ খেয়েছে কিনা—এখন সেই ফোনটা নিশ্চুপ পড়ে আছে টেবিলের ওপর।
আনিকার মনের ভেতরে অপরাধবোধ আর অপমানের এক তীব্র লড়াই চলছিল। সে কি খুব বেশি বলে ফেলেছিল? কিন্তু ওই ছবিগুলো? ওই বিষাক্ত চিঠিটা? জিম তো তাকে শান্ত হয়ে পুরো সত্যিটা বুঝিয়ে বলতে পারত! সাফাই না দিয়ে এক নিমেষে রাগ করে চলে যাওয়াটাই কি প্রমাণ করে না যে মেঘলার নামটা এখনো তার মনে গভীর কোনো ক্ষত তৈরি করে রাখে?
আমেনা বেগম আনিকার শুকনো মুখ আর চোখের নিচের কালো দাগ দেখে বুঝেছিলেন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। তিনি আনিকার মাথায় হাত বুলিয়ে শুধালেন, "অনিকা, জিমের সাথে কোনো কথা কাটাকাটি হয়েছে রে মা?"
আনিকা চোখের পানি চেপে মিথ্যা হেসে বলল, "না খালা, অফিসের কাজে অনেক ব্যস্ত তো, তাই হয়তো ফোন করতে পারছে না।"
"ছেলেটা বড্ড একগুঁয়ে," আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ছোটবেলা থেকেই যা রাগ, মনে কষ্ট পেলে কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দেয় না। কিন্তু ও তোকে ভালোবাসে রে মা, ও তোর কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।"
খালার কথাগুলো শুনে আনিকার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ভালোবাসা? যে মানুষটা তাকে একা ফেলে চলে যেতে পারে, সে কেমন করে ভালোবাসে?
তৃতীয় দিনের মাথায় বিকেলে হঠাৎ বাসায় একজন অনাহূত অতিথি উপস্থিত হলো। দরজা খুলতেই আনিকা দেখল সামনে দাঁড়িয়ে এক অতি রূপসী নারী। পরনে গাঢ় নীল রঙের শাড়ি, চোখের কোণে এক অদ্ভুত চতুরতার ছোঁয়া। চেহারাটা চিনতে আনিকার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। পার্সেলের সেই ছবিগুলোর মেয়েটি—মেঘলা!
আনিকার পা জোড়া যেন মাটির সাথে জমে গেল।
"তুমিই আনিকা তো?" মেঘলা কোনো অনুমতি না নিয়েই ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ল। পারফিউমের তীব্র গন্ধে ঘরটা ভরে গেল। সে চারপাশে চোখ বুলিয়ে একটা মিষ্টি অথচ বিষাক্ত হাসি দিল। "আহা, জিম ভাইয়ার পছন্দ তো বেশ ভালোই বলতে হয়! নিতান্তই এক নিরীহ, লাজুক পুতুল এনে ঘরে বসিয়ে রেখেছে।"
আনিকা নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলল, "আপনি কে? আর আমার ঘরে এভাবে ঢুকে পড়ার সাহস পাচ্ছেন কোথায়?"
"আমি কে?" মেঘলা খিলখিল করে হেসে উঠল। "ছবিগুলো পাওনি বুঝি? আমি মেঘলা। জিমের অতীত, আর হয়তো ওর বর্তমানও! যে স্থানটা তুমি জোর করে দখল করে বসে আছ, সেই ভালোবাসার সত্যি দাবিদার আমি।"
"জিম আপনাকে অনেক আগেই ভুলে গেছে," আনিকা কেঁপে উঠলেও নিজের কণ্ঠ সোজা রাখার চেষ্টা করল। "আমাদের বিয়ে হয়েছে, আমরা সুখে আছি। আর আমি ওর বাচ্চার মা হতে চলেছি।"
মেঘলার চোখের মনি মুহূর্তের জন্য রাগে সংকুচিত হলো, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। "বাচ্চা? ওহ ডিয়ার! জিম তো আম্মার ব্ল্যাকমেইলে পড়ে তোমাকে বিয়ে করেছে, আর বাচ্চার কথা বলছ? ও তো কেবল পুরুষত্বের দায়িত্ব পালন করছে! তুমি কি সত্যিই ভাবো জিম তোমাকে ভালোবাসে? জিম যদি তোমাকেই ভালোবাসত, তবে রাগ করে তোমাকে এই অবস্থায় একা ফেলে তিন দিনের জন্য চট্টগ্রাম চলে যেত না, আমার সাথে দেখা করতে আসত না!"
"কী বললেন?" আনিকা যেন আকাশ থেকে পড়ল। "জিম আপনার সাথে দেখা করেছে?"
"অবশ্যই!" মেঘলা ব্যাগ থেকে নিজের ফোন বের করে একটা ছবি আনিকার সামনে ধরল। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক শান্ত রেস্তোরাঁয় জিম আর মেঘলা মুখোমুখি বসে কথা বলছে। তারিখটা গতকালের!
ছবিটা দেখা মাত্রই আনিকার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো। জিম অফিসে যাওয়ার কথা বলে মেঘলার সাথে দেখা করতে গেছে? তাকে মিথ্যা বলেছে?
"জিম আমাকে ভালোবাসে আনিকা," মেঘলা আনিকার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল। "ও তোমার এই ভীতু, লাজুক স্বভাবের কাছে বন্দি হয়ে থাকতে চায় না। ও কেবল খালার ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। তুমি যদি সত্যিই জিমের ভালো চাও, তবে ওর জীবন থেকে সরে দাঁড়াও। ও আমার কাছেই ফিরে আসবে।"
মেঘলা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। নিজের বিষাক্ত বিজয়ের হাসি হেসে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আনিকা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সোফার ওপর ঢলে পড়ল সে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে হাজার টুকরো করে কাটছিল। জিম তাকে এভাবে ধোঁকা দিল? এতবড় প্রতারণা? তার ভালোবাসার সবটাই কি তবে অভিনয় ছিল? গর্ভের সন্তানটার কথা ভেবে আনিকা দু'হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে লাগল। না, যে পুরুষ অন্য নারীর প্রেমে মগ্ন, যার মনে অন্য কারো স্থান—তার দয়ায়, তার ভালোবাসার ছদ্মবেশে সে আর এই বাড়িতে থাকবে না।
সন্ধ্যা নামার আগেই আনিকা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। একটা ছোট ব্যাগে নিজের সামান্য কিছু কাপড়চোপড় ভরে নিল সে। খালার উদ্দেশ্যে টেবিলে একটা ছোট্ট চিঠি লিখে রাখল—
"খালা, আমাকে ক্ষমা কোরো। আমি তোমার ছেলেকে মুক্তি দিয়ে যাচ্ছি। ও যাকে ভালোবাসে, তাকে নিয়েই সুখে থাকুক। আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোরো না।"
রাতের অন্ধকারে, আমেনা বেগম যখন ঘুমাচ্ছিলেন, তখন চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে আনিকা সেই ছাদ ঢাকা বাড়িটা ছেড়ে পথে নামল। তার গন্তব্য জানা ছিল না, কেবল জানা ছিল—জিমের মিথ্যে ভালোবাসার চেয়ে এই একাকীত্ব অনেক বেশি শান্তির।
রাতের নিঝুম অন্ধকারে আনিকা যখন রেলস্টেশনের এক কোণে বেঞ্চিতে বসে কাঁপছিল, তখন তার মনজুড়ে কেবল একটাই প্রশ্ন—ভালোবাসা কি তবে এতটাই ভঙ্গুর? গর্ভের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে সে নীরবে চোখের জল ফেলছিল। কিন্তু সে জানত না, পেছনে জিমের জগতে কী প্রলয় ঘটে গেছে।
চট্টগ্রাম থেকে কাজ শেষ করে রাতের প্রথম ফ্লাইটেই ঢাকায় ফিরেছিল জিম। মনে রাগ থাকলেও আনিকার জন্য তার মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। ভেবেছিল রাগ ভাঙিয়ে আনিকাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে ফেলবে। কিন্তু বাসায় ঢুকে খালার কান্নাকাটি আর টেবিলের ওপর আনিকার লেখা চিঠিটা দেখেই জিমের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
"অনিকা! কোথায় গেলে তুমি?" জিম পাগলের মতো পুরো বাসা খুঁজে চিৎকার করতে লাগল। চিঠির প্রতিটা শব্দ জিমের বুকে তপ্ত বাণের মতো বিধছিল। সে মুক্তি দিয়ে চলে গেছে? জিমকে সে এতটাও পর ভেবে নিল?
আমেনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে জিমকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "কী করলি রে জিম? মেয়েটা এই অবস্থায় কোথায় গেল? কাল বিকেলে তোদের সেই মেঘলা এসেছিল রে... ও নিশ্চয়ই আনিকাকে কিছু উল্টাপাল্টা বলেছে!"
'মেঘলা!' নামটা শুনতেই জিমের চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত করে সে নিজের ড্রয়ার থেকে ফোনটা বের করল।
আসলে, মেঘলা তিন দিন আগে জিমের সাথে চট্টগ্রামেই যোগাযোগ করেছিল। সে জিমকে হুমকি দিয়েছিল যে সে আনিকার ক্ষতি করবে যদি জিম তার সাথে দেখা না করে। জিম কেবল আনিকার নিরাপত্তার কথা ভেবে এবং মেঘলাকে চিরতরে তার জীবন থেকে দূর করার জন্য গতকাল এক রেস্তোরাঁয় দেখা করতে বাধ্য হয়েছিল। সেখানে সে মেঘলাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল—আনিকা তার স্ত্রী, তার সন্তানের মা এবং তার একমাত্র ভালোবাসা। মেঘলা যেন আর কোনোদিন তাদের আশেপাশে না আসে। কিন্তু জিম ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি মেঘলা সেই দেখা করার ছবি তুলে আনিকাকে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র আঁকবে!
জিম আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। গাড়ি নিয়ে সে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে পড়ল মেঘলার ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে।
মেঘলার দরজায় লাথি মেরে ভেতরে প্রবেশ করল জিম। তাকে ওভাবে হিংস্র রূপ নিয়ে ঢুকতে দেখে মেঘলা চমকে এক পা পিছিয়ে গেল।
"মেঘলা!" জিমের গর্জন পুরো ফ্ল্যাটে বাজের মতো কেঁপে উঠল। সে মেঘলার হাত শক্ত করে চেপে ধরে চোখ লাল করে বলল, "আমার স্ত্রীকে কী বলেছিস তুই? কোথায় ও?"
"জিম, তুমি ভুল করছ! ওই মেয়েটা তোমার যোগ্য নয়!" মেঘলা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
"একদম মুখ বন্ধ করবি!" জিম গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। "আমি তোকে আগেই বলেছি, আনিকাই আমার জীবন! তুই আমার সংসারে বিষ ঢালার চেষ্টা করেছিস। যদি আমার স্ত্রী আর সন্তানের সামান্যতম কোনো ক্ষতি হয়, তবে তোকে আমি পুলিশে দেব আর তোর জীবন ছারখার করে দেব! বল ও কোথায় যেতে পারে?"
জিমের এই রুদ্ররূপ দেখে মেঘলা বুঝতে পারল তার চাল ব্যর্থ হয়েছে। জিম আনিকাকে কত গভীর থেকে ভালোবাসে, তা এখন স্পষ্ট। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মেঘলা বলল, "আমি... আমি জানি না জিম! আমি শুধু ওকে বলেছি তুমি ওর কাছে আর ফিরবে না... ও হয়তো গ্রামের বাড়ি বা স্টেশনের দিকে গেছে!"
জিম মেঘলাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে গাড়িতে এসে বসল। তার বুক ধড়ফড় করছিল। গর্ভবতী আনিকা একা রাতে কোথায় যাবে? যদি কোনো বিপদ হয়?
জিম পাগলের মতো শহরের স্টেশনগুলোতে খুঁজতে লাগল। কমলাপুর রেলস্টেশনের প্রতিটি প্লাটফর্মে সে বৃষ্টির মতো ঘেমে দৌড়াতে লাগল, মুখে কেবল একটা নাম—"অনিকা! অনিকা!"
রাত তখন প্রায় তিনটা। স্টেশনের শেষ প্রান্তের এক অন্ধকার বেঞ্চে জিম দেখতে পেল নীল শাড়ি পরা সেই চেনা অবয়বটি। হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে সে নীরবে কাঁদছে।
জিমের পা দুটো যেন ভারী হয়ে এলো। চোখের কোনায় জল জমে উঠল তার। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আনিকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
"অনিকা..." জিমের কাঁপানো কণ্ঠ ভেসে এলো।
আনিকা চমকে মুখ তুলল। দেখল সামনে জিম দাঁড়িয়ে আছে—চোখ দুটো লাল, চুলগুলো উস্কোখুস্কো, চেহারায় চরম ক্লান্তি আর হার হারানোর তীব্র ভয়।
"আপনি... আপনি এখানে কেন এসেছেন?" আনিকা নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। "যান না আপনার মেঘলার কাছে! আমাকে কেন আর বিরক্ত করছেন?"
জিম আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে শক্ত করে আনিকার দু হাত ধরে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। জিমের হৃদপিণ্ড তখন বাজের মতো শব্দ করছিল।
"আমায় ছাড়ুন জিম সাহেব!" আনিকা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
"কোনো ছাড়ব না! জীবনে আর কোনোদিন ছাড়ব না!" জিম এক ঝটকায় আনিকাকে নিজের বলিষ্ঠ বুকে টেনে এনে আঁকড়ে ধরল। জিমের চোখের তপ্ত জল আনিকার ঘাড়ে এসে পড়ল। শক্ত, গম্ভীর জিমকে এভাবে কাঁদতে দেখে আনিকা স্তব্ধ হয়ে গেল।
"অনিকা, দয়া করে আমার কথা শোনো," জিম কেঁদে ফিসফিস করে বলল। "মেঘলা তোমাকে সব মিথ্যা বলেছে। আমি ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তোমাকেই রক্ষা করার জন্য! ও তোমাকে ভয় দেখাচ্ছিল। বিশ্বাস করো, আমার অতীত মরে গেছে। আমার বর্তমান, আমার ভবিষ্যৎ, আমার ভালোবাসা—সবটাই কেবল তুমি আর আমাদের এই বাচ্চা!"
জিমের বুকের ভেতরের তীব্র আকুলতা আর সত্যতা আনিকার হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছাল। সে অনুভব করতে পারল জিমের এই কান্না মিথ্যে নয়, এই ভালোবাসা কোনো অভিনয় নয়।
"তুমি ছাড়া আমি বাঁচব না অনিকা... প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না," জিম আনিকার কপালে, গালে ঘন ঘন চুমু এঁকে দিতে লাগল।
আনিকার এতদিন ধরে জমে থাকা সব অভিমান বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। সে জিমের জামাটা আঁকড়ে ধরে তার বুকের মাঝে মুখ গুঁজে অঝোরে কেঁদে উঠল। স্টেশনের নরম বাতির আলোয় দুজন হারিয়ে যাওয়া পথিকের ভাঙা ভালোবাসা যেন আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
কমলাপুর রেলস্টেশনের সেই কোলাহলহীন শেষ প্রান্তরটি যেন সেদিন তাদের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে নতুন করে ফিরিয়ে দিয়েছিল। জিমের ভেজা চোখ আর আকুল অনুনয় আনিকার মনের গহীনে জমে থাকা সব ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান আর সংশয় এক লহমায় ধুয়েমুশে সাফ করে দিয়েছিল। যে মানুষটি নিজের আবেগ কারো সামনে প্রকাশ করতে জানে না, সে আজ শত শত মানুষের ভিড় ভুলে আনিকাকে হারানোর ভয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেছে। এই ভালোবাসার সত্যতা প্রকাশের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ আর আনিকার প্রয়োজন ছিল না।
জিম পরম মমতায় আনিকাকে জড়িয়ে ধরে স্টেশন থেকে তুলে নিয়ে এলো। গাড়িতে তোলার পর নিজের গায়ের জ্যাকেটটি খুলে আনিকার গায়ে জড়িয়ে দিল। তার চোখজুড়ে তখনো অপরাধবোধ আর ভালোবাসার অদ্ভুত এক সংমিশ্রণ।
গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে জিম আনিকার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "আর কখনো এভাবে একা চলে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাবে না, অনিকা। তুমি জানো না, তোমাকে না পেয়ে আজ আমার কেমন মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার বুকের ভেতরের নিঃশ্বাসটাই বন্ধ হয়ে গেছে।"
আনিকা লাজুক হেসে জিমের হাতের ওপর নিজের হাতটি রাখল। সে আলতো কণ্ঠে বলল, "আর কখনো যাব না। কিন্তু জিম, তুমিও তো আমাকে সত্যিটা বলতে পারতে। ওই ছবিগুলো দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।"
"আমার ভুল হয়েছিল, পাখি," জিম আনিকার হাতটি তুলে ধরে নিজের ঠোঁটের সাথে ছোঁয়াাল। "ভাবতাম এসব ছোটখাটো ঝামেলা আমি নিজেই মিটিয়ে ফেলতে পারব, তোমায় দুশ্চিন্তায় ফেলব না। কিন্তু বুঝতে পারিনি যে আমাদের সম্পর্কের মাঝে স্বচ্ছতা কতটা জরুরি। মেঘলা আমাদের জীবনে আর কখনো আসবে না, সে সব হারিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর কখনো কোনো কালছায়া আমাদের মাঝে আসবে না, এটা আমার কথা।"
বাড়িতে পৌঁছাতেই আমেনা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আনিকাকে অক্ষত আর হাসিমুখে জিমের পাশে ফিরে আসতে দেখে বৃদ্ধা মায়ের চোখ দিয়ে স্বস্তির জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি আনিকাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বললেন, "বোন রে আমার, তোকে ছাড়া এই বাড়িটা আঁধার হয়ে গিয়েছিল। তুই ফিরে এসেছিস, আমার বুকটা জুড়িয়ে গেল।"
জিম মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "আম্মা, তোমার বউকে আর কেউ কোনোদিন এই বাড়ি থেকে দূরে পাঠাতে পারবে না। এমনকি ও নিজেও না।"
সেই রাতের পর থেকে তাদের জীবনে নেমে এলো এক অনাবিল শান্তির সুর। ভোরের সোনালী রোদের সাথে সাথে সংসারে ফিরল নতুন রূপ। জিম যেন পুরো বদলে গেল। তার গম্ভীর স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই রাশভারী জিম ভাইয়াটি এখন কেবলই একজন দায়িত্বশীল, প্রেমময় স্বামী। প্রতিদিন কাজ শেষ করে সোজা বাড়ি ফেরা, আনিকার পছন্দের খাবার নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়া, আর তার গর্ভের বাচ্চাটার সাথে অনবরত পেটে মুখ রেখে আদুরে গলায় কথা বলা—এ যেন এক নতুন জিম, যাকে আনিকা এতদিন স্বপ্নে কল্পনা করত।
কয়েকটি মাস সময়ের নিয়মে দ্রুত কেটে গেল। বর্ষার শেষ পেরিয়ে শরৎ, হেমন্ত পেরিয়ে শীতের আলতো পরশ ছুঁয়ে গেল তাদের সংসারে। আনিকার গর্ভকাল যত শেষ সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, জিমের ব্যস্ততা আর ব্যাকুলতা ততটাই বাড়ছিল। সে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ২৪ ঘণ্টা আনিকার পাশে থাকত। একটু হাত-পা ফুললে মালিশ করে দেওয়া, সাবধানে হাঁটানো—সব দায়িত্ব জিম একা হাতেই সামলাচ্ছিল।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এলো। বসন্তের এক মিষ্টি সকালে আনিকার কোলে জন্ম নিল এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। ধবধবে ফর্সা, ঠিক জিমের মতো টানা টানা চোখ আর আনিকার মতো লাজুক ঠোঁটের হাসি।
হাসপাতালের কেবিনে বেবি কটে শুয়ে থাকা এক ঘণ্টার পুতুলটার দিকে জিম নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের জল। সে ধীর পায়ে খাটে বসে আনিকার কপালে এক দীর্ঘ, গভীর গাঢ় ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল।
"ধন্যবাদ অনিকা... আমার শূন্য জীবনটাকে একদম পরিপূর্ণ করে দেওয়ার জন্য," জিম আবেগে আপ্লুত হয়ে ফিসফিস করল।
আনিকা ক্লান্ত মুখে মিষ্টি এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে জিমের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। "মেয়ে কার মতো হয়েছে জিম?"
জিম তার মেয়ের ছোট্ট হাতটি নিজের এক আঙুলে জড়িয়ে ধরে হেসে বলল, "একেবারে তার মায়ের মতো লাজুক আর মিষ্টি! কিন্তু খবরদার, ও কিন্তু ওর বাপের মতো একজন গুমোট আর রাগীকে ভালোবাসবে না, ওকে ভালোবাসবে কেবল এক রাজপুত্র!"
কথাটা শুনে আনিকা মুখ টিপে হেসে দিল, আর আমেনা বেগম পাশ থেকে আনন্দিত গলায় বলে উঠলেন, "রাজপুত্র আর খোঁজা লাগবে না রে জিম, তোর ভালোবাসাই তোদের এই সংসারটাকে রাজ্য বানিয়ে দিয়েছে।"
বড় খালা অর্থাৎ এখন শাশুড়ির এই কথায় পুরো কেবিনজুড়ে আনন্দের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
যে ভালোবাসার গল্প শুরু হয়েছিল ভয়, সংশয় আর জোর করে দেওয়া এক পারিবারিক বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে, আজ তা এসে পৌঁছাল পূর্ণতার এক স্বর্ণালী তীরে। নদীর পারের হাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজা শাড়ির বোতাম লাগানোর সেই গভীর ছোঁয়া, আর সব ভুল বোঝাবুঝি পেরিয়ে জিম আর আনিকা প্রমাণ করে দিল—সত্যিকারের ভালোবাসা কোনো বাঁধাধরা নিয়মে আসে না; তা আসে চুপচাপ, হৃদয়ের গহীনে এক নতুন ভোরের রূপ ধরে।
....