রাতের পর বদলে গেল সম্পর্ক

পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের লাল ইট বের হওয়া পুরোনো বাড়িটা আর যাই হোক, শান্তির জায়গা ছিল না। অন্তত নীলিমার জন্য তো নয়ই।

নীলিমা—সবাই তাকে সংক্ষেপে ‘নীলা’ বলে ডাকে। অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী, একটু গম্ভীর মেজাজের, কিন্তু মুখের ওপর কড়া কথা বলতে এক মুহূর্তও ভাবে না। তার দিনটা শুরু হয়েছিল দারুণ মুড নিয়ে। এক কাপ আদা চা হাতে নিয়ে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল সে, ঠিক তখনই উপর থেকে ঝরঝর করে নেমে এলো পানি! আর সেটা কোনো মেঘের বৃষ্টি ছিল না, ছিল চারতলার নতুন ভাড়াটিয়া সায়নের ঝুলন্ত টব থেকে চুইয়ে পড়া নোংরা কাদাজল।

"এই যে মশাই! মাথার ওপর কি মেঘালয় বানিয়ে রেখেছেন নাকি? চা-টার মধ্যে পুরোটাই তো ড্রেন বানিয়ে দিলেন!" নীলা চেঁচিয়ে ওপরের দিকে তাকাল।

চারতলার বারান্দা থেকে একটা ছেলে ঝুঁকে দেখল। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে, চুলগুলো একটু এলোমেলো, গায়ে সাধারণ টি-শার্ট। মুখে একরাশ অপরাধবোধের বদলে বেশ এক চিলতে দুষ্টুমি মাখা হাসি।

"আরে সরি আপা! আমি তো গাছে পানি দিচ্ছিলাম। আপনার চায়ের কাপ যে এত দূর পর্যন্ত ক্যাচ ধরতে পারবে, আমি তো বুঝি নাই," সায়নের গলায় কোনো অনুশোচনার বিন্দুমাত্র চিহ্ন ছিল না।

"আপা মানে? আপনার চোখের মাথা কি চাবিয়ে খেয়েছেন? আর কিসের ক্যাচ ধরা? সাধারণ সৌজন্যবোধও নেই আপনার?" নীলার রাগ তখন চড়চড় করে মাথায় উঠছে।

"রাগবেন না ম্যাডাম, রাগলে প্রেশার বাড়ে। আর সকাল সকাল ফ্রিতে একটু মিনারেল ওয়াটার পাইলেন, আমার তো শুকরিয়া আদায় করা উচিত!" সায়ন একগাল হেসে কথাটা বলেই ঘরের ভেতর চলে গেল।

নীলা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। এই ছেলের সাহস কত! সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে নাকি ঢাকা শহরে কোনো আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে, কিন্তু শিষ্টাচারের নামগন্ধও নেই।

সেই শুরু। এরপর থেকে নবাবপুর রোডের ওই গলিতে সায়ন আর নীলার বিবাদ যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়াল। কখনো রিকশা নিয়ে কাড়াকাড়ি, কখনো গলির মোড়ের দোকান থেকে শেষ মিষ্টির প্যাকেটটা কে নেবে তা নিয়ে ঝগড়া।

একদিন বিকেলে গলির মুখে মোড়ের টং দোকানে নীলা রিকশার জন্য দাঁড়িয়েছিল। বৃষ্টি নামবে নামবে করছে, অথচ কোনো ফাঁকা রিকশা নেই। হঠাৎ পাশেই একটা রিকশা এসে থামল, আর ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো সায়ন।

"কী ব্যাপার নীলপরী? রিকশা পাচ্ছেন না? আমার রিকশায় উঠবেন নাকি? অবশ্য আমার সাথে উঠলে তো আপনার ইজ্জত পাংচার হয়ে যাবে!" সায়ন চোখ টিপে বলল।

"আপনার মতো অসভ্য লোকের রিকশায় ওঠার চেয়ে হেঁটে জলে ভিজতে ভিজতে যাওয়া অনেক ভালো," নীলা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

"আচ্ছা বেশ, ভিজুন তাহলে! আমিও দেখি কতক্ষণ ভিজতে পারেন," সায়ন রিকশা থেকে নেমে হুট করে ছাতাটা বন্ধ করে নীলার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর নিজে পকেটে হাত গুঁজে হাঁটা দিল বৃষ্টির মধ্যে।

নীলা অবাক হয়ে ছাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা তো অদ্ভুত! এতক্ষণ মেজাজ খারাপ করাচ্ছিল, আর এখন নিজে ভিজে তাকে ছাতা দিয়ে গেল? নীলার মনে একটু খটকা লাগল, কিন্তু মুখের ওপর জমানো রাগটা সে কিছুতেই নামাতে পারল না।

কয়েকদিন পর মহল্লার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হলো বৈশাখী মেলা। নীলা তার বান্ধবীদের সাথে লাল-সাদা শাড়ি পরে মেলায় গিয়েছে, আর সায়ন পড়েছে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি।

নীলা একটা মাটির গহনার দোকানে চুড়ি দেখছিল। হঠাৎ পেছন থেকে সায়নের কণ্ঠ ভেসে এলো, "ছুড়ি না চুড়ি? অবশ্য দুটোর কাজই এক, মন আর পকেট দুটোই কাটা!"

নীলা তড়িৎ গতিতে পেছনে ঘুরল। "আপনার সমস্যা কী বলুন তো? যেখানে যাই, সেখানেই আপনার এই অহেতুক মন্তব্য কেন সহ্য করতে হবে?"

"আরে আমি তো চুড়ির কথা বলছিলাম, আপনার গায়ে কেন লাগছে? তা ছাড়া আপনাকে এই লাল শাড়িতে না, একদম লাল মরিচের মতো লাগছে—একদম ঝাল!" সায়ন ফিক করে হেসে ফেলল।

"আপনি..." নীলা রাগে লাল হয়ে উঠল। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল সে।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন অন্য কিছু ছিল। নীলার বাবা আর সায়নের বাবা দুজনেই পুরান ঢাকার পুরানো বন্ধু ছিলেন, যা এই দুজনের কেউ জানত না। নীলার বাবা কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন, আর মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সায়নের ভালো চাকরি, সুশৃঙ্খল পরিবার—সব মিলিয়ে নীলার বাবার প্রথম পছন্দই ছিল সায়ন।

একদিন সন্ধ্যায় নীলা কলেজ থেকে ফিরে দেখে তাদের বসার ঘরে সায়নের পরিবার বসে আছে। সায়নও সোফায় চুপচাপ বসে আছে, গায়ে ভদ্রছেলের মতো নীল শার্ট।

"নীলা মা, এদিকে এসো। এ হচ্ছে সায়ন, আমাদের রফিকের ছেলে," নীলার বাবা হাসিমুখে বললেন।

নীলা চোখ বড় বড় করে সায়নের দিকে তাকাল। সায়নও একটু চমকে উঠেছিল, কিন্তু পর মুহূর্তেই তার মুখে সেই পুরোনো বাঁকা হাসিটা ফিরে এলো। সে নিচু স্বরে শুধু বলল, "আস-সালামু আলাইকুম, ঝাল মরিচ ম্যাডাম!"

সেদিন রাতেই আনুষ্ঠানিকভাবে দুপক্ষের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। নীলা নিজের রুমে গিয়ে কান্নাকাটি করল, বাবার অসুস্থতার জন্য সে সরাসরি না করতে পারল না। কিন্তু সায়নের ওপর তার রাগটা দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে ভাবল, সায়ন নিশ্চয়ই ইচ্ছা করে এই বিয়েতে রাজী হয়েছে তাকে সারাজীবন জ্বালাতন করার জন্য।

বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদের সন্ধ্যায় সায়ন একটু লুকিয়ে নীলার বারান্দার নিচে এসে দাঁড়াল। নীলা তখন হলুদ শাড়ি পরে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সায়ন নিচ থেকে একটা ছোট পাথর ওপরের দিকে ছুড়ল।

নীলা নিচে তাকাতেই সায়ন ইশারায় বলল, "কনেজি, কান্নাকাটি বন্ধ করেন। বিয়ের পর তো রোজ আমায় সহ্য করতে হবে!"

নীলা হাত দিয়ে তাকে চলে যেতে বলল, কিন্তু মনের কোণে কোথাও একটা অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম হয়েছিল, যা সে নিজেও স্বীকার করতে চাইছিল না।

একটি জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নীলা আর সায়নের বিয়ে হয়ে গেল। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার, ঢাকের শব্দ আর আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে দিনটি কেটে গেল।

বাশার ঘরে যখন সায়ন ঢুকল, নীলা তখন খাটের কোণে বেশ শক্ত হয়ে বসে ছিল। মুখে এখনও সেই গম্ভীর ভাব।

সায়ন ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর কোটটা খুলে চেয়ারের ওপর রাখল। সে নীলার দিকে এগিয়ে এসে বলল, "কী ব্যাপার? এখনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নাকি?"

নীলা সোজা হয়ে বসল। "শুনুন সায়ন সাহেব, বাবা-মায়ের ভালোবাসার খাতিরে আমি এই বিয়েতে রাজী হয়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আপনার সব অন্যায় আবদার মেনে নেব। আমরা একে অপরকে পছন্দ করি না, এটা সত্যি।"

সায়ন কিছুক্ষণ নীলার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খাটের ওপর রাখা দুটো বালিশের মধ্যে একটা মাঝখানে টেনে নিয়ে একটা বর্ডার বানিয়ে দিল।

"বেশ! সীমান্তরেখা টানা হলো। এই বালিশের এপাশটা আপনার, ওপাশটা আমার। কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ সহ্য করা হবে না," সায়ন হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ল।

নীলা অবাক হয়ে গেল। সে ভেবেছিল সায়ন হয়তো তর্ক করবে বা জোর জাহির করবে। কিন্তু ছেলেটি এত সহজে বিষয়টা মেনে নিল?

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নীলা দেখল সায়ন টেবিলে গরম চা আর পরোটা সাজিয়ে রাখছে।

"আপনি রান্নাঘরে গিয়েছিলেন?" নীলা খানিকটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল।

"হুম, মা অসুস্থ, তাই সকালে নাস্তাটা আমিই বানালাম। নিন, খেয়ে দেখুন। বিষ মেশানো হয়নি, গ্যারান্টি দিচ্ছি," সায়ন চা-এর কাপটা তার দিকে এগিয়ে দিল।

চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে নীলা বাধ্য হলো স্বীকার করতে যে চা-টা সত্যিই দারুণ হয়েছে। কিন্তু সে মুখে কিছু বলল না।

"ধন্যবাদ বলাটা শিখুন ম্যাডাম," সায়ন মৃদু হেসে বলল।

দিন কাটতে লাগল। তাদের মধ্যে ঝগড়া কমেনি, তবে ঝগড়ার ধরন বদলে গেছে। এখন ঝগড়া হয় কে টিভির রিমোট নেবে, কিংবা কার চা বেশি মিষ্টি হয়েছে তা নিয়ে। সায়নের এই ছোটখাটো চঞ্চলতা আর দুষ্টুমি ধীরে ধীরে নীলার মনের শক্ত বরফ গলতে শুরু করেছিল, কিন্তু নীলা তার ইগো ধরে রাখার জন্য কোনো অনুভূতি প্রকাশ করছিল না।

 

বিয়ের মাসখানেক পর সায়নের অফিসে কাজের চাপ খুব বেড়ে গেল। প্রতিদিন রাতে ফিরতে দেরি হতো। নীলা টেবিলে খাবার ঢেকে রেখে একা একাই শুয়ে পড়ত।

একদিন রাতে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। সঙ্গে তীব্র ঝড়। ঘড়িতে রাত বারোটা বাজে, কিন্তু সায়ন এখনো ফেরেনি। ফোনও বন্ধ দেখাচ্ছে।

নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছটফট করছিল। আগে হলে সে হয়তো ভেবে নেতো সায়ন যেখানে খুশি যাক, তাতে তার কি? কিন্তু আজ তার মন মানছিল না। বুকের ভিতর অজানা এক ভয় চেপে বসছিল।

রাত একটায় দরজায় বেল বাজল। নীলা দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সায়ন—একদম জলে ভেজা, ঠকঠক করে কাঁপছে, আর জামায় রক্তের দাগ!

"সায়ন! কী হয়েছে আপনার?" নীলা আঁতকে উঠল।

"কিছু না... একটা বাইক এক্সিডেন্ট দেখে থামতে হয়েছিল... লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম..." সায়নের গলা জড়িয়ে আসছিল। জ্বর এসেছে তার।

নীলা আর কোনো কথা না ভেবে সায়নকে ধরে ভেতরে নিয়ে এলো। ভেজা শার্ট খুলে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিল। সায়নের হাতটা ছোঁয়া মাত্র নীলা বুঝল সায়নের গায় ১০৩ ডিগ্রি জ্বর।

সারা রাত নীলা সায়নের পাশে বসে রইল। কপালে জলপট্টি দিল, হাত-পা টিপে দিল। সায়ন জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করছিল, "নীলা... রাগ কোরো না... আমি ইচ্ছে করে দেরি করিনি..."

কথাটা শুনে নীলার চোখে পানি এসে গেল। এই ছেলেটা সবসময় তাকে হাসাত, রাগাত, কিন্তু ভেতের ভেতরে সে কতটা খেয়াল রাখে! নীলা বুঝল, এই অসভ্য সায়নকে সে কখন যেন নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে।

সকালে যখন সায়নের চোখ খুলল, সে দেখল নীলা খাটের পাশে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। তার হাতে তখনও জলপট্টির কাপড়টা ধরা।

সায়ন ধীরে ধীরে তার হাতটা বাড়িয়ে নীলার মাথার ওপর রাখল। নীলা সাথে সাথে জেগে উঠল।

"এখন কেমন লাগছে? জ্বর কমেছে?" নীলা উদ্বিগ্ন হয়ে সায়নের কপালে হাত দিল।

সায়ন কিছু বলল না, শুধু একদৃষ্টে নীলার ক্লান্ত কিন্তু মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখল, নীলার চোখে রাগের বদলে আজ কেবলই ভালোবাসা আর দুশ্চিন্তা।

"আপনি একদম বোকা," নীলা চোখ মুছে বলল। "নিজের কথা একটুও ভাবেন না!"

"আর আপনি একদম মিষ্টি," সায়ন মৃদু হেসে জবাব দিল।

সায়ন সুস্থ হয়ে ওঠার পর দুজনের সম্পর্কের মোড় ঘুরতে শুরু করল। বালিশের সেই ‘সীমান্তরেখা’ কখন যে উঠে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি।

একদিন শুক্রবার বিকেলে সায়ন নীলাকে বলল, "চলো, আজ তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাই।"

"কোথায়?" নীলা প্রশ্ন করল।

"গেলেই দেখতে পাবে। পুরান ঢাকার মেয়ে, কিন্তু আসল সৌন্দর্য বোধহয় দেখোইনি," সায়ন চোখ টিপল।

তারা গেল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে, সদরঘাট থেকে একটা ছোট নৌকা ভাড়া করে সন্ধ্যায় নদীতে ভেসে বেড়াল। নদীর ওপর সন্ধ্যার হালকা বাতাস আর শহরের আলো নদীর জলে ভেসে ওঠা—সব মিলিয়ে পরিবেশটা রূপকথার মতো লাগছিল।

নীলা নৌকায় বসে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে ছিল। সায়ন তার পাশে এসে বসল।

"নীলা," সায়ন খুব গম্ভীর গলায় ডাকল। এই প্রথম সায়নকে এত গম্ভীর হতে দেখল নীলা।

"বলুন?"

"যখন প্রথম তোমাকে দোতলার বারান্দায় দেখেছিলাম, ইচ্ছা করেই টবের পানি ফেলেছিলাম," সায়ন স্বীকার করল।

নীলা অবাক হয়ে তাকাল, "মানে? আপনি ইচ্ছা করে ফেলেছিলেন?"

"হুম। তোমার ওই গম্ভীর আর রাগি মুখটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। ভেবেছিলাম, মেয়েটাকে একটু হাসাতে হবে বা একটু রাগাতে হবে। তারপর যখন জানলাম বাবা তোমার কথা বলছেন, আমার মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব আনন্দ আমার হাতে এসে গেছে।"

নীলা কিছু বলতে পারল না। তার বুকটা ধক করে উঠল।

সায়ন নীলার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল। গরম রক্তের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল দুজনের শরীরে। "আমি ঝগড়া করতে পারি, তোমাকে উত্যক্ত করতে পারি, কিন্তু সত্যি বলছি নীলা, আমি তোমাকে প্রথম দিন থেকেই ভালোবাসি। তুমি কি আমাকে তোমার জীবনে সত্যি সত্যি জায়গা দেবে?"

নদীর হালকা বাতাসে নীলার চুল উড়ছিল। সে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। তারপর মৃদু হেসে সায়নের হাতের ওপর নিজের অন্য হাতটা রাখল।

"আপনাকে জায়গা না দিয়ে উপায় আছে? এত জ্বালান যে মন কেড়ে নেওয়া ছাড়া অন্য পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল," নীলা মিষ্টি করে হেসে বলল।

সেই রাতে প্রথমবার সায়ন নীলার কপালে আলতো করে ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিল। 

পরদিন সকালে নীলার ঘুম ভাঙল রোদের আলোয় নয়, সায়নের আনা একগুচ্ছ তাজা লাল গোলাপের সুবাসে।

নীলা চোখ খুলে দেখল সায়ন বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, হাতে গোলাপের তোড়া।

"সুপ্রভাত, আমার লাল মরিচ!" সায়ন মুচকি হাসল।

নীলা বালিশে মুখ লুকিয়ে হেসে ফেলল। "আপনি শুধরাবেন না, তাই না?"

"নাহ! তোমাকে উত্যক্ত না করলে আমার যে দিনটাই ভালো যায় না। তবে আজ একটা কথা বলতে চাই—ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য।"

নীলা গোলাপগুলো হাতে নিল। ভালোবাসা যে এত সুন্দর হতে পারে, সায়নের সান্নিধ্যে না এলে সে কখনো জানতেই পারত না।

দুপুরের দিকে তারা দুজনে মিলে রান্নাঘরে গেল। নীলা বিরিয়ানি রাঁধবে, আর সায়ন হবে তার ‘সহকারী’। কিন্তু সহকারী কাজ করার চেয়ে দুষ্টুমি করতেই বেশি ব্যস্ত রইল। কখনো নীলার গালে আটা মেখে দেওয়া, কখনো মশলা দিতে গিয়ে হাত ধরে ফেলা।

"সায়ন! সরুন তো, রান্না নষ্ট হয়ে যাবে!" নীলা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল।

"রান্না নষ্ট হলে হবে, আমি তো আমার বউকে একটু ভালো বাসছি," সায়ন নীলাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে থুতনি রাখল।

নীলা আর নিজেকে দূরে রাখতে পারল না। সায়নের বুকের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে এক অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি পেল সে।

সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। সায়ন আর নীলার সংসার এখন একদম জমজমাট। তাদের ভালোবাসার রসায়নটা ছিল বন্ধুত্বের ওপর দাঁড়িয়ে। তারা এখনো ঝগড়া করত, তবে সেই ঝগড়ায় এখন শুধুই আদরের পরশ থাকত।

নীলার মাস্টার্স পরীক্ষার ফলাফল দিল। সে প্রথম শ্রেণীতে পাস করেছে! খবরটা শুনে সায়ন অফিস থেকে সোজা কেক আর ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো।

"আজকে আমার ম্যাডামের বড় দিন! উদযাপনের জন্য কোথায় যেতে চান বলুন?" সায়ন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল।

"আমার কোথাও যেতে হবে না। আপনি শুধু আজকের দিনটা আমায় পুরো সময় দেবেন," নীলা আবদার করল।

সেদিন রাতে তারা ছাদে গেল। পুরান ঢাকার ছাদগুলো রাতের বেলা অন্যরকম লাগে। আকাশে চাঁদের আলো ছিল, হালকা বাতাস বইছিল।

সায়ন একটা মাদুর পেতে নীলাকে নিয়ে বসল। নীলা সায়নের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। সায়ন তার চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে লাগল।

"সায়ন, একটা কথা বলব?" নীলা ধীরকন্ঠে বলল।

"বলো।"

"আমি প্রতিদিন সৃষ্টিকর্তার কাছে ধন্যবাদ জানাই, সেদিন যদি আপনার টব থেকে পানিটা আমার চায়ের কাপে না পড়ত, তবে হয়তো এই সুন্দর জীবনটা আমি পেতাম না।"

সায়ন নীলার গালে আলতো করে হাত রাখল, "আর আমি ধন্যবাদ জানাই তোমার সেই চড়া মেজাজকে। যা আমাকে তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিল।"

দুজনের মাঝে নেমে এলো এক মায়াবী নীরবতা। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চারপাশ, আর দুটো হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছিল একই ছন্দে।


দু বছর পর...

নবাবপুর রোডের সেই পুরোনো বাড়ির চারতলার বারান্দায় এখন অনেক নতুন টব সাজানো। ফুল গাছে রঙিন হয়ে আছে চারপাশ।

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নীলা। তার কোলে এক ছোট্ট এক বছরের ফুটফুটে কন্যাপাখি। মেয়েটার চোখগুলো একদম সায়নের মতো দুষ্টুমিতে ভরা।

হঠাৎ চারতলা থেকে সামান্য একটু জল এসে পড়ল নীলার গায়ে।

নীলা হাসিমুখে ওপরের দিকে তাকাল। সেখানে সায়ন দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটা ছোট ওয়াটার ক্যান।

"এই যে মশাই! আবার সেই পুরোনো অভ্যাস?" নীলা হেসে চেঁচাল।

"কী করব বলুন? আপনার এই রাগি মুখটা দেখার জন্য আমি জীবনের যেকোনো ঝুঁকি নিতে পারি!" সায়ন ওপর থেকে জবাব দিল।

ছোট্ট মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। সায়ন ওপর থেকে নেমে এলো দৌড়ে। নীলার পাশে এসে দাঁড়াল, তাকে আর নিজের মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

"ভালোবাসি নীলা," সায়ন নীলার কানে কানে বলল।

"আমিও ভালোবাসি আপনাকে, আমার ঝগড়াটে বর," নীলা উত্তর দিল।

....
👁 93