অনিচ্ছার বিয়েতে নতুন অধ্যায়

মেহরিন কখনো ভাবেনি, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার পুরো জীবনটা বদলে যাবে।

সকালেও সে নিজের ঘরে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অ্যাসাইনমেন্ট করছিল। আর সন্ধ্যা নামার আগেই তার সামনে বসে ছিল দুই পরিবারের মানুষ। সবার মুখ গম্ভীর। অথচ মেহরিনের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন—

তার সঙ্গে আসলে কী হচ্ছে?

মেহরিন মায়ের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

—মা, তোমরা আমাকে এখানে কেন ডেকেছ?

মা কিছু বললেন না। পাশে বসা খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—মেহরিন, একটা কথা আছে। শান্তভাবে শুনবি।

মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠল।

—কী কথা?

খালা একটু ইতস্তত করে বললেন,

—আরিয়ানের সঙ্গে তোর বিয়ের কথা ঠিক হয়েছে।

মেহরিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর হেসে ফেলল।

—মজা করছ?

কেউ হাসল না।

মেহরিনের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

—সত্যি?

মা এবার চোখ নামিয়ে বললেন,

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আমি তো কাউকে বিয়ে করতে চাই না!

—আমরা জানি।

—তাহলে?

মেহরিন উঠে দাঁড়িয়ে গেল।

—আমার মতামতের কোনো দাম নেই?

তার বাবা ধীর গলায় বললেন,

—তোর মতামতের দাম আছে। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন যে আমাদের এখন এই সিদ্ধান্তটাই নিতে হচ্ছে।

—কী এমন পরিস্থিতি?

কেউ সরাসরি উত্তর দিল না।

মেহরিন বুঝে গেল, তার কাছ থেকে কিছু লুকানো হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর সে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়তেই চোখের কোণে পানি জমে গেল।

আরিয়ানকে সে চেনে।

খুব ভালোভাবে না, তবে নামটা অপরিচিত নয়।

কয়েকবার পারিবারিক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। বয়সে তার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। সবসময় শান্ত, গম্ভীর হয়ে থাকে। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না।

মেহরিনের সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় ছিল—ছেলেটা কখনো তাকে ঠিকমতো পাত্তাই দেয়নি।

একবার মেহরিন নিজে থেকে তাকে বলেছিল,

—আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন?

আরিয়ান তখন ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলেছিল,

—সবসময় কথা বলার প্রয়োজন হয় না।

সেদিন থেকেই মেহরিনের মনে হয়েছিল, লোকটা অসম্ভব বিরক্তিকর।

আর আজ সেই মানুষটাই তার স্বামী হতে যাচ্ছে!

রাত আটটার দিকে দরজায় টোকা পড়ল।

—মেহরিন?

মায়ের কণ্ঠ।

—এসো।

মা ঘরে ঢুকে মেয়ের পাশে বসলেন।

—রাগ করিস না মা।

মেহরিন মুখ ফিরিয়ে বলল,

—রাগ না করে কী করব?

মা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

—আরিয়ান খারাপ ছেলে না।

—আমি বলছি না সে খারাপ।

—তাহলে?

—আমি তাকে ভালোবাসি না।

মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—সব বিয়ে ভালোবাসা দিয়ে শুরু হয় না।

মেহরিন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

—কিন্তু আমারটা কেন হবে না?

মা কোনো উত্তর দিলেন না।

সেই রাতটা মেহরিনের আর ঘুম হলো না।

পরদিন বিকেলে আরিয়ান নিজেই তাদের বাড়িতে এল।

মেহরিন দূর থেকে তাকে দেখল।

সাদা পাঞ্জাবি, হাতে ঘড়ি, মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।

মেহরিনের বিরক্তি আরও বেড়ে গেল।

পরিবারের সবাই বসে কথা বলছিল। একসময় মেহরিনের মা বললেন,

—তোমরা দুজন একটু কথা বলো।

মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—কী কথা?

খালা হেসে বললেন,

—বিয়ের আগে একে অপরকে একটু জানাশোনা করে নাও।

মেহরিন বাধ্য হয়ে উঠে বারান্দায় গেল।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ানও এসে পাশে দাঁড়াল।

দুজনের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

মেহরিনই প্রথম বলল,

—আপনি কি সত্যিই এই বিয়েতে রাজি?

—হ্যাঁ।

—এত সহজে?

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—সবকিছু সহজ নয়।

—তাহলে?

—কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি সবসময় এমন করে কথা বলেন?

—কেমন?

—এক লাইনে। যেন প্রতিটা কথার সঙ্গে দশটা রহস্য লুকিয়ে রাখেন।

আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

এই প্রথম সে ছেলেটাকে হাসতে দেখল।

আরিয়ান বলল,

—তুমি চাইলে আমাকে প্রশ্ন করতে পারো।

—তাহলে একটা প্রশ্ন করি?

—করো।

—বিয়ের পর আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব?

—অবশ্যই।

—আমার চাকরি করার ইচ্ছে আছে।

—করবে।

—আমি নিজের মতো থাকতে চাই।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—যতক্ষণ তোমার স্বাধীনতা অন্য কারও ক্ষতি না করে, তোমাকে আটকানোর কোনো কারণ আমি দেখি না।

মেহরিন একটু অবাক হলো।

সে ভেবেছিল আরিয়ান হয়তো অনেক নিয়মকানুনের কথা বলবে।

কিন্তু ছেলেটা বরং সবকিছু সহজ করে দিল।

তবুও মেহরিনের মন মানছিল না।

—আর একটা কথা।

—হুম?

—আমি আপনাকে ভালোবাসি না।

আরিয়ান এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

কণ্ঠ শান্ত।

—জানি।

—তাতে আপনার সমস্যা নেই?

—না।

—কেন?

আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

—ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না, মেহরিন।

কথাটা শুনে মেহরিন আর কিছু বলতে পারল না।

সেদিনই তাদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেল।

মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে।

পাঁচ দিন যেন চোখের পলকে কেটে গেল।

বিয়ের দিন মেহরিন লাল শাড়ি পরে আয়নার সামনে বসে ছিল। চারপাশে সবাই ব্যস্ত। অথচ তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনের কোনো অনুষ্ঠানের দর্শক হয়ে বসে আছে।

কিছুক্ষণ পর বান্ধবী এসে বলল,

—মেহরিন, চল। বর এসেছে।

মেহরিনের বুকটা কেঁপে উঠল।

কিছুক্ষণ পর সে বিয়ের মঞ্চে গিয়ে বসল।

সামনে আরিয়ান।

দুজনের চোখ একবারের জন্য মিলল।

আরিয়ান খুব স্বাভাবিকভাবে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু মেহরিনের মনে হলো, আজ থেকে এই মানুষটার সঙ্গেই তার পুরো জীবন জড়িয়ে যাচ্ছে।

বিয়ে শেষ হলো।

রাত গভীর হলে নতুন বাড়িতে এসে মেহরিন নিজের ঘরে ঢুকল।

ঘরটা সুন্দর করে সাজানো।

বিছানার পাশে একটা ছোট টেবিল। তার ওপর ফুলের তোড়া আর একটা কাগজ।

মেহরিন কাগজটা তুলে নিল।

সেখানে লেখা—

“তোমার জন্য ঘরটা তোমার মতো করে সাজাতে পারো। এখানে তোমার কোনো কিছুই অপরিচিত মনে হওয়া উচিত নয়।”

নিচে কোনো নাম নেই।

তবুও মেহরিন বুঝে গেল কে লিখেছে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে আরিয়ান ঢুকল।

মেহরিন অপ্রস্তুত হয়ে কাগজটা লুকিয়ে ফেলল।

আরিয়ান সেটা লক্ষ্য করেও কিছু বলল না।

শুধু বলল,

—তুমি চাইলে আমি অন্য ঘরে থাকব।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।

—কেন?

—কারণ এই বিয়েটা তোমার ইচ্ছায় হয়নি।

মেহরিন চুপ করে রইল।

আরিয়ান দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

হঠাৎ মেহরিন ডাকল,

—আরিয়ান।

সে ফিরে তাকাল।

মেহরিন কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,

—আপনি কি সত্যিই আমাকে এই বিয়েতে কোনোদিন বাধ্য করবেন না?

আরিয়ান শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল,

—কখনো না।

তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মেহরিন দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতরটা হালকা লাগছিল।

বিয়ের পর প্রথম সকালটা মেহরিনের কাছে অদ্ভুত লাগছিল।

ঘুম ভাঙতেই কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতে পারল না, কোথায় আছে। তারপর পাশের টেবিলে রাখা ফুল, নতুন ঘরের সাজসজ্জা আর গত রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।

সে এখন আর বাবার বাড়িতে নেই।

এখন থেকে এটাই তার নতুন বাড়ি।

আর এই বাড়ির সবচেয়ে অপরিচিত মানুষটিই তার স্বামী।

মেহরিন ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের চেহারা দেখে বিরক্ত হলো। সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি।

চুল এলোমেলো করে সে বিড়বিড় করল,

—একটা মানুষ কীভাবে এত শান্ত থাকতে পারে!

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

—মেহরিন?

আরিয়ানের কণ্ঠ।

মেহরিন একটু চমকে উঠল।

—জি?

—নিচে সবাই অপেক্ষা করছে। নাশতা করবে?

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আমি আসছি।

দরজা খুলতেই আরিয়ান সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

আজ তার পরনে সাধারণ একটা শার্ট। হাতে ফোন। মুখে সেই শান্ত ভাব।

মেহরিন তাকে দেখে বলল,

—আপনি কি সবসময় এত সকালে ওঠেন?

—হ্যাঁ।

—কেন?

—অভ্যাস।

—আপনার কি কোনোদিন অলস হতে ইচ্ছে করে না?

আরিয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।

—করে।

—তাহলে হন না কেন?

—তুমি আমাকে এত প্রশ্ন করছ কেন?

মেহরিন একটু থমকে গিয়ে বলল,

—এমনিই।

আরিয়ান হালকা হেসে নিচে নেমে গেল।

মেহরিন কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেলল।

নিচে এসে সে দেখল, সবাই বেশ আনন্দের সঙ্গে নাশতা করছে।

আরিয়ানের মা তাকে পাশে বসিয়ে বললেন,

—মা, আজকে কোথাও যেতে হবে না। নতুন বাড়ি, একটু বিশ্রাম নাও।

মেহরিন মাথা নাড়ল।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের মা বললেন,

—আরিয়ান, মেহরিনের কলেজের ব্যাপারটা দেখেছিস?

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—হ্যাঁ। ওর ক্লাস শুরু হলে গাড়ি দিয়ে পৌঁছে দেব।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।

—না না, দরকার নেই। আমি নিজেই যেতে পারব।

আরিয়ান স্বাভাবিকভাবে বলল,

—জানি।

—তাহলে?

—প্রথম কয়েকদিন নতুন জায়গা। সঙ্গে গেলে সমস্যা কী?

মেহরিন আর কিছু বলল না।

খাওয়া শেষে সে নিজের ঘরে ফিরে এল।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ান একটা কাগজ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল।

—এটা কী?

—তোমার কলেজের রুটিন।

মেহরিন কাগজটা হাতে নিল।

—আপনি কোথায় পেলেন?

—তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে।

—আপনি আমার কলেজের রুটিন পর্যন্ত জোগাড় করেছেন?

—তোমার সুবিধার জন্য।

মেহরিন কিছু বলল না।

আরিয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

—আর একটা কথা।

—হুম?

—আজ বিকেলে তোমার কিছু লাগলে আমাকে বলবে।

—আমার কিছু লাগবে না।

—ঠিক আছে।

সে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

মেহরিন হঠাৎ বলল,

—আরিয়ান।

—হুম?

—গত রাতের জন্য ধন্যবাদ।

আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

—কিসের জন্য?

—আমাকে অস্বস্তিতে না ফেলার জন্য।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

মেহরিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

দুপুরের দিকে মেহরিন নিজের জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল।

বিয়ের পর অনেক জিনিসই বাক্সে পড়ে ছিল। একটা একটা করে বের করতে গিয়ে তার পুরোনো ছবি, বই, ডায়েরি—সবকিছু সামনে আসছিল।

হঠাৎ একটা পুরোনো ছবি হাতে নিয়ে সে থেমে গেল।

ছবিতে সে আর তার কয়েকজন বন্ধু।

ঠিক তখনই পেছন থেকে আরিয়ানের কণ্ঠ শোনা গেল,

—এটা কী?

মেহরিন ঘুরে তাকিয়ে বলল,

—পুরোনো ছবি।

আরিয়ান ছবিটার দিকে তাকাল।

—তোমার স্কুলের?

—হ্যাঁ।

—তুমি তখন অনেক ছোট ছিলে।

মেহরিন হেসে বলল,

—আপনিও তো তখন ছোট ছিলেন।

—আমি?

—হ্যাঁ। আপনারও তো শৈশব ছিল।

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—ছিল।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি হাসতেও পারেন!

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আমি কি হাসি না?

—খুব কম।

—তুমি বেশি কথা বলো।

—আমি কি খুব বেশি কথা বলি?

—হ্যাঁ।

মেহরিন মুখ ফুলিয়ে বলল,

—ঠিক আছে। আজ থেকে কথা বলব না।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—সেটা আরও ভয়ংকর হবে।

মেহরিন হাসি চেপে রাখতে পারল না।

এই প্রথম তাদের মধ্যে কথোপকথনটা এত স্বাভাবিক লাগল।

সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।

মেহরিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।

বৃষ্টির গন্ধ তার খুব পছন্দ।

হঠাৎ পেছন থেকে আরিয়ান এসে দাঁড়াল।

—বৃষ্টি ভালো লাগে?

—অনেক।

—ঠান্ডা লাগবে।

—আমি বৃষ্টিতে ভিজছি না।

—তবুও।

মেহরিন চোখ ছোট করে বলল,

—আপনি কি সবসময় এত চিন্তা করেন?

আরিয়ান একটু থেমে বলল,

—যাদের দায়িত্ব নিই, তাদের করি।

মেহরিনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল।

সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি কি আপনার দায়িত্ব?

আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,

—হ্যাঁ।

মাত্র একটা শব্দ।

কিন্তু মেহরিনের মনে হলো, শব্দটা তার ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।

রাতে খাওয়ার সময় মেহরিন লক্ষ্য করল, আরিয়ান খুব কম খাচ্ছে।

সে বলল,

—আপনি এত কম খান কেন?

—ক্ষুধা নেই।

—সকালে তো ঠিকমতো খেয়েছেন।

—আজ কাজ বেশি ছিল।

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের প্লেট থেকে একটা খাবার তার প্লেটে দিয়ে বলল,

—এটা খান।

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

—কেন?

—খেতে বলেছি।

—তুমি আমার জন্য খাবার দিচ্ছ?

—না। প্লেট পরিষ্কার করছি।

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—বুঝলাম।

মেহরিন মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কিন্তু নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে মেহরিন ডায়েরি খুলে লিখল—

“আরিয়ান মানুষটা যতটা গম্ভীর ভেবেছিলাম, আসলে ততটা নয়। বরং… একটু ভালোই।”

লিখে সে থেমে গেল।

তারপর নিজের লেখা দেখে দ্রুত ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

—আমি এসব কী লিখছি!

অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে আরিয়ানও জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখছিল।

তার ফোনে একটা মেসেজ এলো।

মেসেজটা পড়ে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুমি কি সত্যিই মেহরিনকে সব সত্যি বলবে?”

আরিয়ান অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।

তার জীবনের যে অতীত এতদিন সে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে, সেটাই কি একদিন মেহরিনকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে?

আরিয়ান জানত না।

শুধু জানত—

মেহরিনকে সে আর হারাতে চায় না।

বিয়ের পর কয়েকটা দিন কেটে গেছে।

এই কয়েক দিনে মেহরিন একটা বিষয় বুঝে গেছে—আরিয়ান মানুষটা যতটা গম্ভীর, তার চেয়েও বেশি যত্নশীল।

তবে তার যত্নটা খুব অদ্ভুত।

সে সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু মেহরিনের ছোট ছোট প্রয়োজনগুলো ঠিকই খেয়াল রাখে।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে নাশতা গরম করে রাখে।

কলেজে যাওয়ার সময় বৃষ্টি হলে ছাতা এগিয়ে দেয়।

মেহরিন কোনো বই খুঁজে না পেলে সেটা কোথা থেকে যেন এনে তার টেবিলে রেখে দেয়।

কিন্তু এসবের কোনো কিছুর কৃতিত্ব সে নেয় না।

যেন সবকিছুই স্বাভাবিক।

সেদিন সকালে মেহরিন কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।

হঠাৎ বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।

সে জানালার কাছে গিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,

—আজকেই বৃষ্টি হতে হলো!

পেছন থেকে আরিয়ান বলল,

—কেন?

—আজ আমার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে।

—আমি নিয়ে যাব।

মেহরিন ঘুরে তাকাল।

—না, দরকার নেই। রিকশা নেব।

—এই বৃষ্টিতে?

—হ্যাঁ।

আরিয়ান কিছু না বলে নিচে চলে গেল।

কয়েক মিনিট পর গাড়ির হর্ন শোনা গেল।

মেহরিন জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, গাড়ি বের করার জন্য আরিয়ান প্রস্তুত।

সে নিচে নেমে বলল,

—আমি তো বললাম দরকার নেই।

আরিয়ান গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল,

—আমি বললাম, আমি নিয়ে যাব।

—আপনি আমার কথা শুনবেন না?

—শুনেছি।

—তাহলে?

—তোমার কথা শুনেছি বলেই নিয়ে যাচ্ছি।

মেহরিন বিরক্ত মুখে গাড়িতে উঠে বসল।

কিন্তু গাড়ি চলতে শুরু করার পর তার মুখের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল।

কলেজের সামনে গাড়ি থামতেই মেহরিন দরজা খুলতে গেল।

আরিয়ান বলল,

—এক মিনিট।

—কী?

সে পেছনের সিট থেকে একটা ছাতা বের করে মেহরিনের হাতে দিল।

—নাও।

—আমার তো ছাতা আছে।

—তোমার ছাতাটা গতকাল ভেঙে গেছে।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি সেটা মনে রেখেছেন?

—হ্যাঁ।

মেহরিন আর কিছু বলল না।

ছাতাটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল।

কয়েক পা যাওয়ার পর সে ফিরে তাকাল।

আরিয়ান তখনও গাড়ির ভেতর বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

দুজনের চোখাচোখি হতেই আরিয়ান চোখ সরিয়ে নিল।

মেহরিনও দ্রুত সামনে এগিয়ে গেল।

কিন্তু সারা ক্লাসজুড়ে তার মাথায় একটা কথাই ঘুরতে থাকল—

“আপনি সেটা মনে রেখেছেন?”

সেদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে মেহরিন দেখল, আরিয়ান বাড়িতে নেই।

সে নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগটা রেখে নিচে নামল।

আরিয়ানের মা বললেন,

—আরিয়ান অফিসে গেছে। রাতে ফিরবে।

মেহরিন মাথা নেড়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

বাইরে গাড়ির শব্দে মেহরিন জানালার কাছে গেল।

আরিয়ান গাড়ি থেকে নামছে।

কিন্তু আজ তার মুখটা অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক নয়।

ক্লান্ত লাগছে।

মেহরিন নিচে গিয়ে বলল,

—আপনি খেয়েছেন?

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

—না।

—কেন?

—সময় হয়নি।

—এখন সময় হয়েছে। বসুন।

আরিয়ান হেসে বলল,

—তুমি কি আমার ওপর রাগ করছ?

—না।

—তাহলে এত গম্ভীর কেন?

—আপনি না খেয়ে থাকলে আমার ভালো লাগে না।

কথাটা বলেই মেহরিন থেমে গেল।

আরিয়ানও চুপ।

কয়েক সেকেন্ড পর মেহরিন অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

—মানে… মা চিন্তা করবেন।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—বুঝেছি।

মেহরিন রান্নাঘরে গিয়ে খাবার গরম করতে লাগল।

আরিয়ান দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে এমন একটা কোমলতা ছিল, যা মেহরিন দেখতে পেল না।

রাতের খাবার শেষে মেহরিন নিজের ঘরে বসে পড়ছিল।

হঠাৎ দরজায় টোকা।

—আসুন।

আরিয়ান ঢুকল।

তার হাতে একটা ছোট বাক্স।

—এটা তোমার জন্য।

মেহরিন অবাক।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

সে বাক্সটা খুলে দেখল একটা সুন্দর হাতঘড়ি।

মেহরিন বলল,

—এটা কেন?

—তোমার ঘড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে।

—কিন্তু এত দামি জিনিস কেন কিনলেন?

—কারণ তোমার প্রয়োজন ছিল।

মেহরিন ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর ধীরে বলল,

—আপনি সবকিছু এত খেয়াল করেন কেন?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—সবকিছু না।

—তাহলে?

—তোমার ব্যাপারগুলো করি।

মেহরিনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

সে চোখ নামিয়ে ফেলল।

আরিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর মেহরিন ঘড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, সম্পর্কটা কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে?

যে মানুষটার সঙ্গে বিয়ের দিন পর্যন্ত তার কোনো সম্পর্ক ছিল না, এখন তার ছোট্ট একটা বিষয়ও আরিয়ানের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না।

পরদিন দুপুরে মেহরিন তার পুরোনো বন্ধু নাবিলার সঙ্গে দেখা করতে গেল।

ক্যাফেতে বসে নাবিলা বলল,

—তোর বিয়ের পর তোকে একদম অন্যরকম লাগছে।

মেহরিন অবাক হয়ে বলল,

—কী রকম?

—আগে তুই সারাক্ষণ রাগ দেখাতি। এখন মুখে হাসি লেগেই আছে।

—তা নাকি?

—হ্যাঁ। বল তো, স্বামী কেমন?

মেহরিন একটু থেমে বলল,

—ভালো।

নাবিলা চোখ বড় বড় করে বলল,

—শুধু ভালো?

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

—অনেক ভালো।

কথাটা বলার পর নিজেই চুপ হয়ে গেল।

নাবিলা সেটা লক্ষ্য করে বলল,

—ওহ! ব্যাপারটা তাহলে সিরিয়াস!

—কিছু না।

—তোর চোখ কিন্তু অন্য কথা বলছে।

মেহরিন বিষয় বদলে ফেলল।

কিন্তু ফেরার পথে গাড়িতে বসে সে বারবার নিজের কথাটা মনে করতে লাগল।

“অনেক ভালো।”

সে কি সত্যিই আরিয়ানকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে?

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মেহরিন দেখল, আরিয়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।

মেহরিন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ শুনল—

—আমি জানি, অতীতটা একদিন সামনে আসবেই।

সে থেমে গেল।

আরিয়ান তাকে দেখতে পেয়ে ফোন কেটে দিল।

—কিছু বলবে?

মেহরিন ধীরে বলল,

—আপনি কী নিয়ে কথা বলছিলেন?

—কিছু না।

—আমি শুনেছি।

আরিয়ান কিছু বলল না।

মেহরিনের মনে সন্দেহ তৈরি হলো।

—আপনার কোনো সমস্যা আছে?

—না।

—আপনি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছেন?

আরিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।

কয়েক মুহূর্ত দুজনের চোখাচোখি হলো।

তারপর আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

—হ্যাঁ।

মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠল।

—কী?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—আমার অতীতের একটা বিষয়।

—কী বিষয়?

—এখন বলা সম্ভব না।

মেহরিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—কেন?

আরিয়ান উত্তর দিল,

—সময় হলে নিজেই সব বলব।

সে চলে গেল।

মেহরিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আরিয়ানের কথাগুলো সারারাত মেহরিনের মাথায় ঘুরতে থাকল।

“আমার অতীতের একটা বিষয়।”

কী এমন বিষয়, যেটা সে মেহরিনকে বলতে পারছে না?

বিয়ের আগে মেহরিন আরিয়ানকে খুব একটা চিনত না। কিন্তু বিয়ের পর এই মানুষটার যত্ন, নীরবতা আর অদ্ভুত দায়িত্ববোধ তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়েছে।

আর এখন সেই মানুষটাই তার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছে।

পরদিন সকালেও মেহরিনের মুখ গম্ভীর।

নাশতার টেবিলে আরিয়ানের মা বললেন,

—মা, তোর কী হয়েছে? শরীর খারাপ?

—না, আমি ঠিক আছি।

আরিয়ান পাশ থেকে একবার তাকাল।

সে বুঝতে পারল, মেহরিনের মন ভালো নেই।

কিন্তু কিছু বলল না।

নাশতা শেষে মেহরিন নিজের ঘরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ানও সেখানে এল।

—তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?

মেহরিন বই খুলে বসে বলল,

—না।

—মিথ্যা বলছ।

—আপনি এত কিছু বুঝতে পারেন?

—তোমাকে কিছুটা বুঝতে শিখেছি।

মেহরিন বই বন্ধ করে তার দিকে তাকাল।

—তাহলে এটাও বুঝুন, আমি এমন একটা সম্পর্কে থাকতে চাই না যেখানে আমার স্বামী আমার কাছ থেকে কিছু লুকাবে।

আরিয়ান চুপ করে রইল।

—আমি কি আপনার কাছে এতটাই অপরিচিত?

—না।

—তাহলে সত্যিটা বলুন।

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—সবকিছু এখন বলা সম্ভব না।

মেহরিনের চোখে অভিমান ফুটে উঠল।

—তাহলে কখন সম্ভব হবে?

—সময় হলে।

—এই “সময় হলে” কথাটা আর কত শুনব?

আরিয়ান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

মেহরিন মুখ ফিরিয়ে নিল।

—আপনি যেতে পারেন।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনে মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।

সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন এত কষ্ট হচ্ছে।

একসময় তো এই মানুষটার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথাই সে মানতে পারেনি।

তাহলে এখন তার কাছ থেকে সত্যিটা না পেয়ে এতটা কষ্ট কেন?

সেদিন বিকেলে মেহরিন বারান্দায় একা বসে ছিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এলো।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে একজন মহিলা বললেন,

—তুমি কি মেহরিন?

—জি। কে বলছেন?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মহিলা বললেন,

—আরিয়ানকে তুমি কতদিন ধরে চেনো?

মেহরিনের ভ্রু কুঁচকে গেল।

—আপনি কে?

—আমি আরিয়ানের অতীতের একজন মানুষ।

মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।

—মানে?

—তুমি কি জানো, সে কেন এত বছর বিয়ে করেনি?

মেহরিন চুপ।

মহিলা আবার বললেন,

—তুমি কি জানো, তোমার সঙ্গে এই বিয়েটা কেন হলো?

মেহরিনের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

—আপনি কী বলতে চাইছেন?

—সবকিছু জানার আগে হয়তো তোমার উচিত আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলা।

কল কেটে গেল।

মেহরিন অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর আরিয়ানের নম্বরে কল করল।

ফোন বন্ধ।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো।

আরিয়ান এখনও বাড়ি ফেরেনি।

মেহরিন বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

আরিয়ান ঘরে ঢুকতেই মেহরিন সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

—আপনি এত দেরি করলেন কেন?

—অফিসে কাজ ছিল।

—ফোন বন্ধ ছিল কেন?

আরিয়ান থেমে গেল।

—চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

মেহরিন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—আজ আমাকে একজন ফোন করেছিল।

আরিয়ানের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।

—কে?

—বলেছে, সে আপনার অতীতের একজন মানুষ।

আরিয়ান চুপ।

মেহরিন এবার সরাসরি প্রশ্ন করল,

—সে কে?

—আমি জানি না।

—আপনি মিথ্যা বলছেন।

—মেহরিন—

—না! এবার আমাকে সত্যিটা বলতেই হবে।

আরিয়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কিছুক্ষণ পর বলল,

—তার নাম নীলা।

মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠল।

—সে কে?

—একসময় আমার খুব কাছের মানুষ ছিল।

মেহরিনের চোখ স্থির হয়ে গেল।

—আপনি তাকে ভালোবাসতেন?

আরিয়ান উত্তর দিতে পারল না।

তার নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে গেল।

মেহরিন ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

—তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?

—কারণ—

—কারণ কী?

—কারণ তোমাকে আমি হারাতে চাইনি।

মেহরিন হতভম্ব।

—আমি তো তখন আপনার জীবনে ছিলামই না!

আরিয়ান চুপ।

মেহরিনের চোখে পানি জমে উঠল।

—আপনি কি আমাকে কখনো সত্যি করে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—হ্যাঁ।

—কখন থেকে?

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—যেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, তোমাকে ছাড়া আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ লাগছে।

মেহরিন কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তারপর বলল,

—কিন্তু নীলা?

আরিয়ান জানালার দিকে তাকাল।

—ওটা অনেক পুরোনো একটা অধ্যায়। শেষ হয়ে গেছে।

—তাহলে সে আবার কেন ফিরেছে?

—আমি জানি না।

মেহরিন কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে নামটা দেখে আরিয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

নীলা।

মেহরিনও নামটা দেখে ফেলল।

আরিয়ান কলটা কেটে দিল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোন বেজে উঠল।

এইবার মেহরিন কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান তার পেছনে যেতে চাইল।

কিন্তু ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এলো।

“তুমি সত্যিটা মেহরিনকে বলোনি। আমি কাল তোমাদের বাড়িতে আসছি।”

আরিয়ানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

পরদিন সকাল।

মেহরিন ঘুম থেকে উঠে দেখল, আরিয়ান ঘরে নেই।

সে নিচে নামতেই দরজার সামনে একজন অপরিচিত নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।

নারীটি মেহরিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—তুমিই মেহরিন?

মেহরিন থেমে গেল।

—জি।

নারীটি বললেন,

—আমি নীলা।

মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে আরিয়ানের কণ্ঠ ভেসে এলো—

—নীলা, তুমি এখানে কেন?

নীলা শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কারণ এতদিন পর তোমার জীবনে ফিরে আসার সময় হয়েছে।

মেহরিন আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আরিয়ানের চোখে যে ভয় সে দেখল, সেটা মেহরিন আগে কখনো দেখেনি।

নীলার কথার পর পুরো বাড়িটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

মেহরিন একবার নীলার দিকে, একবার আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আরিয়ান দ্রুত বলল,

—মেহরিন, তুমি ভেতরে যাও।

মেহরিন শান্ত গলায় বলল,

—কেন?

—আমি নীলার সঙ্গে কথা বলব।

—আমার সামনে বলুন।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—ওকে সবকিছু জানিয়ে দাও, আরিয়ান। লুকিয়ে আর কতদিন?

মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—কী লুকিয়েছেন আপনি?

আরিয়ান এবার নীলার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,

—তুমি এখানে এসেছ কেন?

নীলা বলল,

—তোমার সঙ্গে কথা বলতে।

—ফোনে বলতে পারতে।

—তুমি ফোন ধরছিলে না।

আরিয়ান আর কিছু না বলে নীলাকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল।

মেহরিন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, কয়েকদিন আগেও যে মানুষটাকে নিয়ে তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি তৈরি হয়েছিল, আজ সেই মানুষটাকেই যেন সে চিনতে পারছে না।

প্রায় আধা ঘণ্টা পর আরিয়ান ঘরে ফিরল।

মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিয়ান ধীরে বলল,

—মেহরিন।

সে ফিরে তাকাল না।

—কী?

—আমি তোমাকে সবকিছু বলতে চাই।

—তাহলে বলুন।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—নীলা আমার খুব কাছের মানুষ ছিল।

মেহরিন ধীরে বলল,

—ছিল?

—হ্যাঁ।

—এখন?

—কিছুই নেই।

—তাহলে সে আপনার কাছে কেন ফিরে এসেছে?

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—কারণ আমাদের সম্পর্কটা যেভাবে শেষ হয়েছিল, সেটা স্বাভাবিক ছিল না।

মেহরিন এবার তার দিকে তাকাল।

—কী হয়েছিল?

আরিয়ান উত্তর দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

—ও আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

—কেন?

—সেটা ওর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল।

মেহরিনের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

—আপনি এখনও ওর পক্ষ নিচ্ছেন?

—না।

—তাহলে আমার কাছ থেকে এত কিছু লুকালেন কেন?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।

—কিসের?

—তোমাকে হারানোর।

মেহরিন থমকে গেল।

আরিয়ান এগিয়ে এসে বলল,

—তোমার সঙ্গে আমার বিয়েটা হয়তো পরিস্থিতির কারণে হয়েছিল। কিন্তু তোমাকে আমি কখনো বাধ্য করতে চাইনি। আর গত কয়েক দিনে...

সে থেমে গেল।

—কী?

আরিয়ান নিচু গলায় বলল,

—আমি তোমাকে সত্যিই আমার জীবনের অংশ হিসেবে চাইতে শুরু করেছি।

মেহরিনের চোখে পানি এসে গেল।

কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

—এখন এসব বললে কী হবে?

—আমি জানি না।

—আপনি যখন আমাকে কাছে টানছিলেন, তখনও নীলার ব্যাপারটা লুকিয়ে রেখেছিলেন।

—হ্যাঁ।

—তাহলে কীভাবে বিশ্বাস করব আপনাকে?

আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।

কারণ এই প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেও ছিল না।

সেদিন থেকে মেহরিন বদলে গেল।

সে আরিয়ানের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলত না।

আগের মতো তার জন্য অপেক্ষা করত না।

রাতে আরিয়ান দেরি করে ফিরলে জিজ্ঞেস করত না—খেয়েছেন কি না।

আরিয়ান বিষয়টা বুঝতে পারছিল।

কিন্তু জোর করে কিছু বলতে চাইছিল না।

এক রাতে সে মেহরিনের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,

—আমি কি ভেতরে আসতে পারি?

মেহরিন বই থেকে চোখ না তুলে বলল,

—আসুন।

আরিয়ান এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর বলল,

—তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছ?

—না।

—আগের মতো নেই।

মেহরিন এবার বই বন্ধ করল।

—আগের মতো কীভাবে থাকব?

আরিয়ান চুপ।

মেহরিন ধীরে বলল,

—আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম।

কথাটা শুনে আরিয়ানের চোখ নরম হয়ে গেল।

—আমি জানি।

—না, আপনি জানেন না।

মেহরিনের চোখে পানি।

—আপনি জানেন না, আপনার জন্য আমি কতটা বদলে গেছি।

আরিয়ান কিছু বলতে পারল না।

মেহরিন চোখ মুছে বলল,

—আপনি যখন রাতে না খেয়ে ফিরতেন, আমার চিন্তা হতো। আপনি অসুস্থ হলে আমার ভয় লাগত। আপনি বাইরে থাকলে কখন ফিরবেন, সেটা দেখতাম। অথচ আমি জানতামই না, আপনার জীবনে অন্য একজন মানুষ এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আরিয়ান ধীরে বলল,

—নীলা এখন আমার জীবনে নেই।

—কিন্তু অতীত তো আছে।

—অতীতকে আমি বদলাতে পারব না।

—আমি সেটাই চাই না।

মেহরিনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

—আমি শুধু চাইছিলাম, আপনি আমার কাছে সত্যি থাকুন।

আরিয়ান এগিয়ে এসে থেমে গেল।

—আমি দুঃখিত।

মেহরিন কোনো উত্তর দিল না।

পরদিন দুপুরে মেহরিন তার বাবার বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

আরিয়ান শুনে বলল,

—কতদিন থাকবে?

—জানি না।

—আমি কি তোমাকে নিয়ে যাব?

—না।

—তাহলে গাড়ি পাঠিয়ে দিই।

—দরকার নেই।

মেহরিন ব্যাগ নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল।

আরিয়ান বলল,

—মেহরিন।

সে থেমে গেল।

—আমি চাই না তুমি আমার জন্য কষ্ট পাও।

মেহরিন ধীরে বলল,

—কষ্টটা আপনার জন্য নয়।

—তাহলে?

—আপনার ওপর বিশ্বাস করেছিলাম বলে।

এই কথাটা শুনে আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।

মেহরিন চলে গেল।

গাড়ি চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত আরিয়ান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

বাবার বাড়িতে ফিরে মেহরিন নিজের পুরোনো ঘরে ঢুকল।

সবকিছু আগের মতোই আছে।

তার বই, টেবিল, জানালার পাশে রাখা গাছ—সব।

তবু আজ ঘরটাকে অচেনা লাগছে।

কারণ সে জানে, তার মনটা আর এখানে নেই।

রাতে মা এসে পাশে বসে বললেন,

—তুই কি আরিয়ানের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস?

মেহরিন চুপ।

—কী হয়েছে?

মেহরিন সবকিছু খুলে বলল।

মা মন দিয়ে শুনলেন।

তারপর বললেন,

—মা, মানুষের অতীত থাকতে পারে। কিন্তু সেই অতীতের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার বর্তমান।

—কিন্তু সে আমাকে সত্যি বলেনি।

—হ্যাঁ, সেটা তার ভুল।

মেহরিন চোখ মুছে বলল,

—আমি জানি না কী করব।

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুই নিজের মনকে জিজ্ঞেস কর। তুই কি সত্যিই ওকে ছেড়ে থাকতে পারবি?

মেহরিন কোনো উত্তর দিল না।

কিন্তু রাতে একা ঘরে গিয়ে আরিয়ানের দেওয়া ঘড়িটা হাতে নিতেই তার চোখে পানি এসে গেল।

সে খুব আস্তে বলল,

—আপনাকে এতটা মিস করছি কেন?

অন্যদিকে আরিয়ানও একা বসে ছিল।

তার ফোনে নীলার মেসেজ এলো।

“তুমি চাইলে মেহরিনকে সব সত্যি বলতে পারো। কিন্তু সত্যিটা জানলে ও তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।”

আরিয়ান ফোনটা শক্ত করে ধরে রইল।

তারপর নিজের ডায়েরি খুলল।

ভেতরে বহু বছর আগের একটা ছবি।

ছবিতে আরিয়ান আর নীলা।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা ছিল আরেকটি নাম—

“সায়ান।”

আরিয়ান ছবিটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—এই সত্যিটা মেহরিন জানলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ হলো।

আরিয়ান দ্রুত ছবিটা লুকিয়ে ফেলল।

কিন্তু দরজা খুলতেই তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মেহরিন।

চোখে পানি।

আর মুখে একটাই প্রশ্ন—

—সায়ান কে?

মেহরিনের প্রশ্ন শুনে আরিয়ান যেন পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।

—সায়ান কে?

আরিয়ান কিছু বলল না।

মেহরিন ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

—আমি বাবার বাড়ি থেকে ফিরে এসেছি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে আপনার ডায়েরিটা দেখলাম।

আরিয়ান দ্রুত ডায়েরিটা বন্ধ করে রাখল।

—তুমি ভুল বুঝছ।

—তাহলে সত্যিটা বলুন।

—মেহরিন, এখন না।

—কেন এখন না?

মেহরিনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

—আপনি প্রতিবারই বলেন, “সময় হলে বলব।” কিন্তু সেই সময়টা কখন আসবে?

আরিয়ান চোখ নামিয়ে ফেলল।

মেহরিন এবার তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—সায়ান কে?

কিছুক্ষণ নীরবতার পর আরিয়ান ধীরে বলল,

—আমার ছোট ভাই।

মেহরিন অবাক হয়ে গেল।

—আপনার ভাই?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আমি তো কখনো শুনিনি আপনার কোনো ভাই আছে।

আরিয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কারণ সে আর আমাদের মধ্যে নেই।

মেহরিনের বুকটা কেঁপে উঠল।

—মানে?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—সায়ান আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট ছিল। খুব হাসিখুশি একটা ছেলে। ছোটবেলা থেকেই আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।

তার গলা ভারী হয়ে এল।

—একটা দুর্ঘটনার পর ও আমাদের ছেড়ে চলে যায়।

মেহরিন ধীরে বলল,

—আর নীলা?

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

—সায়ানের সঙ্গে নীলার সম্পর্ক ছিল।

মেহরিন যেন কিছুতেই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিল না।

—কী?

—নীলা আমার ভালোবাসার মানুষ ছিল না, মেহরিন। ও ছিল আমার ভাইয়ের ভালোবাসার মানুষ।

মেহরিন স্তব্ধ হয়ে গেল।

গত কয়েকদিন ধরে যে সন্দেহ তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছিল, মুহূর্তেই তার সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেল।

—তাহলে আপনি আমাকে সত্যিটা বলেননি কেন?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—সায়ানের মৃত্যুর পর নীলা আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল। সেখানে ও লিখেছিল, দুর্ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে। তারপর ও চলে যায়।

—কিন্তু এখন ফিরে এসেছে কেন?

—সেটাই আমি জানি না।

মেহরিন চুপ করে রইল।

আরিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।

—আমি ভয় পেয়েছিলাম।

—কিসের?

—তুমি যদি ভাবো, নীলা আমার অতীতের কোনো সম্পর্ক, তাহলে হয়তো আমাকে ভুল বুঝবে।

মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।

—আপনি আমাকে বিশ্বাস করেননি?

—নিজেকে বিশ্বাস করিনি।

মেহরিন কিছু বলতে পারল না।

পরদিন সকালে নীলা আবার বাড়িতে এল।

মেহরিন এবার নিজেই তার সঙ্গে কথা বলতে চাইল।

তিনজন বসার ঘরে বসে ছিল।

মেহরিন সরাসরি বলল,

—আপনি সায়ানকে ভালোবাসতেন?

নীলা মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

—তাহলে আরিয়ানের জীবনে কেন ফিরেছেন?

নীলার চোখে পানি এসে গেল।

—কারণ কিছু সত্যি এত বছর পরেও মানুষকে শান্তিতে থাকতে দেয় না।

আরিয়ান গম্ভীর হয়ে বলল,

—নীলা, যা বলার সরাসরি বলো।

নীলা তার দিকে তাকাল।

—সায়ানের দুর্ঘটনার আগের রাতে আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।

মেহরিন মন দিয়ে শুনছিল।

—সেদিন আমাদের ঝগড়া হয়েছিল। আমি রাগ করে চলে আসি। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, সায়ান রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—আমি সবসময় ভেবেছি, সেদিন আমি যদি ওকে রাগিয়ে না দিতাম, তাহলে হয়তো ও এত তাড়াহুড়ো করে বের হতো না।

আরিয়ান ধীরে বলল,

—সায়ানের দুর্ঘটনার জন্য তুমি দায়ী নও।

—কিন্তু আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারিনি।

মেহরিন নরম গলায় বলল,

—তাহলে এখন?

নীলা মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—এখন আমি শুধু সত্যিটা পরিষ্কার করতে চেয়েছি। আর একটা চিঠি তোমাদের দিতে।

সে ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাম বের করল।

আরিয়ানের হাতে দিয়ে বলল,

—সায়ান আমাকে দিয়েছিল। কিন্তু ওর মৃত্যুর পর আমি এটা খুলিনি।

আরিয়ান খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।

—এতদিন পর?

—আমি সাহস পাইনি।

নীলা উঠে দাঁড়াল।

—আমার আর এখানে থাকার অধিকার নেই। শুধু একটা কথা মনে রেখো, মেহরিন—আরিয়ান তোমাকে কখনো প্রতারণা করেনি।

মেহরিন নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,

—ধন্যবাদ।

নীলা চলে গেল।

সেদিন রাতে আরিয়ান খামটা খুলল।

ভেতরে একটা ছোট চিঠি।

চিঠিটা পড়ে তার চোখ ভিজে উঠল।

মেহরিন পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

—কী লিখেছে?

আরিয়ান চিঠিটা তার দিকে এগিয়ে দিল।

মেহরিন পড়তে শুরু করল।

সায়ান লিখেছিল, সে জানে নীলা নিজেকে অকারণে দোষ দেবে। আরিয়ান যেন কোনোদিন নীলাকে ঘৃণা না করে। কারণ দুর্ঘটনা কারও ইচ্ছায় হয়নি।

চিঠির শেষদিকে সায়ান আরেকটা কথা লিখেছিল—

আরিয়ান যেন নিজের জীবনটাকে অতীতের কাছে আটকে না রাখে।

মেহরিন চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—আমি এত বছর ধরে ভাবতাম, সায়ানের মৃত্যুর পর আমার নিজের ভালো থাকার অধিকার নেই।

মেহরিন ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

—কিন্তু আপনার ভাই তো নিজেই বলেছেন, আপনি যেন জীবনটা থামিয়ে না রাখেন।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে থামিয়ে রেখেছিলেন কেন?

আরিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।

—কারণ তোমাকে পাওয়ার আগে আমার মনে হতো, জীবনে আবার কাউকে ভালোবাসার মতো কিছু বাকি নেই।

মেহরিনের চোখে পানি জমল।

—আর এখন?

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—এখন মনে হয়, আমি দ্বিতীয়বার বাঁচতে শিখছি।

মেহরিনের বুকটা কেঁপে উঠল।

সে খুব আস্তে বলল,

—আপনি জানেন, আমি আপনার ওপর কেন রাগ করেছিলাম?

—কেন?

—কারণ আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন।

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

মেহরিন চোখ নামিয়ে বলল,

—আপনাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম।

আরিয়ান ধীরে তার হাতের ওপর হাত রাখল।

—আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

মেহরিন হাত সরিয়ে নিল না।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

তাদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল অনিচ্ছায়।

তারপর এসেছিল অভিমান।

তারপর সন্দেহ।

কিন্তু আজ প্রথমবার দুজনেই বুঝতে পারল—

তারা শুধু একই ছাদের নিচে থাকা দুজন মানুষ নয়।

তাদের মধ্যে সত্যিই একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

পরদিন সকালে মেহরিন রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছিল।

আরিয়ান এসে দাঁড়িয়ে বলল,

—কী করছ?

—আপনার জন্য চা।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

—এতদিন পর?

মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

—বেশি কথা বলবেন না।

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—আচ্ছা।

মেহরিন কাপটা এগিয়ে দিল।

—নিন।

আরিয়ান এক চুমুক দিয়ে বলল,

—চা ভালো হয়েছে।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—নাকি আমাকে খুশি করার জন্য বলছেন?

—তোমাকে খুশি করার জন্য মিথ্যা বলতে হবে না।

মেহরিন লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলো।

সে মেসেজটা পড়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।

মেহরিন জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

আরিয়ান ফোনটা নামিয়ে রাখল।

—কিছু না।

কিন্তু এবার মেহরিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—

এটা “কিছু না” নয়।

কারণ মেসেজে লেখা ছিল—

“সায়ানের মৃত্যুর আসল সত্যি তুমি এখনও জানো না।”

মেসেজটা দেখার পর আরিয়ানের মুখের স্বাভাবিক ভাবটা পুরোপুরি বদলে গেল।

মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কী হয়েছে?

আরিয়ান ফোনটা উল্টে রাখল।

—কিছু না।

মেহরিন এবার মৃদু হেসে বলল,

—এই কথাটা এখন আর বিশ্বাস করি না।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আমাকে একটু সময় দাও।

মেহরিন মাথা নাড়ল।

—ঠিক আছে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, এবার যদি কোনো সত্যি আমার কাছ থেকে লুকান, তাহলে আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাব।

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

—আর লুকাব না।

সেদিন দুপুরে আরিয়ান একা বেরিয়ে গেল।

সে সরাসরি শহরের এক পুরোনো অফিসে গেল, যেখানে সায়ানের দুর্ঘটনার সময়কার কিছু নথি রাখা ছিল।

কয়েক বছর ধরে সে ভেবেছিল, ঘটনাটা নিছক দুর্ঘটনা।

কিন্তু অচেনা নম্বরের মেসেজ তার মনে সন্দেহ তৈরি করেছে।

পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে একটা রিপোর্ট পেল।

রিপোর্টের একটা অংশে লেখা ছিল—

দুর্ঘটনার সময় গাড়িটা স্বাভাবিক গতিতে চলছিল না।

আরিয়ান থমকে গেল।

সায়ানের গাড়ি কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল?

নাকি অন্য কিছু ঘটেছিল?

ফাইলের সঙ্গে থাকা একটা পুরোনো ছবি হাতে নিতেই তার চোখ আটকে গেল।

ছবির পেছনে একটা গাড়ির নম্বর লেখা।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটা নিজের ফোনে নোট করে নিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন বৃদ্ধ কণ্ঠ বলল,

—আপনি সায়ানের ভাই?

আরিয়ান ফিরে তাকাল।

—জি।

লোকটা বললেন,

—অনেক বছর আগে আপনাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।

—কী কথা?

—সেদিনের দুর্ঘটনাটা আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম।

আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল।

—তাহলে এতদিন বলেননি কেন?

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—ভয় পেয়েছিলাম।

—কাকে?

লোকটা চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন,

—যে গাড়িটা সায়ানের গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেটা দুর্ঘটনার পর সেখান থেকে চলে যায়।

আরিয়ান স্তব্ধ।

—আপনি গাড়িটা দেখেছিলেন?

—হ্যাঁ।

—নম্বর?

লোকটা মাথা নাড়লেন।

—পুরোটা মনে নেই। তবে গাড়ির শেষের দুই সংখ্যা ছিল... ৭৩।

আরিয়ান ফাইলের ছবিটার দিকে তাকাল।

সেখানে গাড়ির নম্বরের শেষ দুই সংখ্যাও—

৭৩।

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আরিয়ান দেখল মেহরিন বারান্দায় বসে আছে।

সে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল।

মেহরিন কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ান নিজেই বলল,

—আজ আমি সায়ানের দুর্ঘটনার ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছি।

মেহরিন তার দিকে তাকাল।

—কী?

আরিয়ান সবকিছু খুলে বলল।

মেহরিন মন দিয়ে শুনল।

তারপর বলল,

—আপনি কি সত্যিটা খুঁজে বের করবেন?

—হ্যাঁ।

—আমি আপনার সঙ্গে আছি।

আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

—তুমি?

—হ্যাঁ।

—এটা বিপজ্জনকও হতে পারে।

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

—আপনি যখন আমার জীবনের অংশ হয়েছেন, তখন আপনার কষ্টও আমার কষ্ট।

আরিয়ানের চোখ নরম হয়ে গেল।

—মেহরিন...

—হুম?

—তুমি জানো, তুমি আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছ?

মেহরিন লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

—জানি না।

—আমি জানি।

দুজনেই চুপ করে রইল।

কয়েক দিন ধরে আরিয়ান পুরোনো ঘটনাটা নিয়ে খোঁজ করতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত গাড়ির নম্বরের সূত্র ধরে সে জানতে পারল, সেই গাড়িটা একজন ব্যবসায়ীর নামে ছিল।

আর সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে বহু বছর আগে আরিয়ানের বাবার ব্যবসায়িক বিরোধ ছিল।

আরিয়ান বিষয়টা শুনে অবাক হয়ে গেল।

এটা কি নিছক কাকতালীয়?

নাকি সায়ানের দুর্ঘটনার পেছনে সত্যিই অন্য কোনো কারণ ছিল?

সে যখন আরও তথ্য সংগ্রহ করছিল, তখন হঠাৎ একটা ফোন এলো।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে অচেনা কণ্ঠ।

—পুরোনো বিষয় নিয়ে বেশি খোঁজাখুঁজি করবেন না।

আরিয়ান গম্ভীর হয়ে বলল,

—আপনি কে?

—যেটুকু জানার দরকার, সেটুকুই জেনেছেন।

—সায়ানের মৃত্যুর সত্যিটা আমি জানবই।

ওপাশ থেকে ঠান্ডা হাসি শোনা গেল।

—তাহলে আপনার স্ত্রীকে সাবধানে রাখুন।

কল কেটে গেল।

আরিয়ানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে মেহরিনকে ফোন করল।

ফোন ধরল না।

আরিয়ান আবার কল করল।

এবারও না।

তার বুকের ভেতর অজানা ভয় তৈরি হলো।

অন্যদিকে মেহরিন তখন বাজারে গিয়েছিল।

ফোনটা ব্যাগের ভেতরে থাকায় সে কল শুনতে পায়নি।

বাজার থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ একজন লোক এসে বলল,

—আপনি কি মেহরিন?

মেহরিন থমকে গেল।

—জি। আপনি?

লোকটা একটা খাম এগিয়ে দিল।

—এটা আপনার জন্য।

—কে দিয়েছে?

—জানি না।

মেহরিন খামটা হাতে নিল।

লোকটা চলে গেল।

খাম খুলে একটা ছবি বের করতেই মেহরিনের চোখ স্থির হয়ে গেল।

ছবিতে সায়ান।

তার পাশে আরেকজন মানুষ।

মেহরিন মানুষটাকে চিনতে পারল না।

ছবির পেছনে লেখা—

“এই মানুষটাকে চিনলে সায়ানের মৃত্যুর সত্যিটাও জানতে পারবে।”

মেহরিন ছবিটা নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরল।

ঠিক তখনই আরিয়ানও বাড়িতে পৌঁছাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

আরিয়ান ছুটে এসে বলল,

—তুমি ঠিক আছ?

—হ্যাঁ।

—আমি তোমাকে কতবার ফোন করেছি!

—ফোন শুনিনি।

মেহরিন ছবিটা বের করে তার হাতে দিল।

আরিয়ান ছবিটা দেখেই থমকে গেল।

—এটা কোথায় পেয়েছ?

—একজন লোক দিয়েছিল।

আরিয়ান ছবির মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—আমি এই মানুষটাকে চিনি।

মেহরিন অবাক।

—কে?

আরিয়ান ছবিটা শক্ত করে ধরে বলল,

—এটা আমার বাবার ব্যবসার তৎকালীন ম্যানেজার।

মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।

—আপনার বাবার ম্যানেজার?

—হ্যাঁ।

আরিয়ান হঠাৎ ছবিটার পেছনের লেখাটা লক্ষ্য করল।

সেখানে আরও ছোট করে একটা তারিখ লেখা ছিল।

সায়ানের দুর্ঘটনার আগের দিন।

আরিয়ান ফিসফিস করে বলল,

—তাহলে এত বছর আমরা ভুল জায়গায় সত্যিটা খুঁজেছি।

মেহরিন তার হাত ধরল।

—এবার সত্যিটা বের হবে।

আরিয়ান তার হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—হ্যাঁ।

পরদিন সকাল থেকেই আরিয়ান পুরোনো ছবিটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

ছবিতে থাকা মানুষটির নাম ছিল কামাল হোসেন। বহু বছর আগে সে আরিয়ানের বাবার ব্যবসার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করত।

আরিয়ানের বাবা মারা যাওয়ার পর কামালও হঠাৎ চাকরি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গিয়েছিল।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, সায়ানের দুর্ঘটনার আগের দিন কামালের সঙ্গে সায়ানের দেখা হয়েছিল।

আরিয়ান পুরোনো পরিচিতদের মাধ্যমে অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে তার সন্ধান পেল।

সেদিন বিকেলে মেহরিনও তার সঙ্গে গেল।

একটা ছোট শহরতলির বাড়ির সামনে গাড়ি থামল।

দরজা খুলে একজন বয়স্ক মানুষ বেরিয়ে এলেন।

আরিয়ান সামনে যেতেই লোকটা থমকে গেল।

—আপনি?

—কামাল চাচা, আমাকে চিনতে পেরেছেন?

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোমাকে কীভাবে ভুলব, আরিয়ান?

আরিয়ান গম্ভীর হয়ে বলল,

—সায়ানের দুর্ঘটনার ব্যাপারে কিছু জানতে চাই।

কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—আমি জানতাম, একদিন তুমি আসবেই।

মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।

তারা ভেতরে গিয়ে বসল।

কামাল চাচা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,

—সায়ান মারা যাওয়ার আগে তোমাদের বাবার ব্যবসা নিয়ে একটা বড় সমস্যা হয়েছিল। তোমার বাবার একজন পুরোনো ব্যবসায়িক অংশীদার তখন কোম্পানির বিরুদ্ধে কিছু তথ্য ফাঁস করার চেষ্টা করছিল।

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

—এর সঙ্গে সায়ানের দুর্ঘটনার সম্পর্ক কী?

—সায়ান ঘটনাটা জেনে গিয়েছিল।

—কী জানতে পেরেছিল?

কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তোমাদের বাবার ব্যবসার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েব হয়েছিল। সায়ান সেগুলো খুঁজে পেয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল, বিষয়টা সে তোমার বাবাকে জানাবে।

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল।

—তারপর?

—পরদিনই দুর্ঘটনা।

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

মেহরিন ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—আপনি কি মনে করেন, দুর্ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত ছিল?

কামাল মাথা নিচু করলেন।

—আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে সেদিন যে গাড়িটা সায়ানের গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেটার নম্বর আমি দেখেছিলাম।

আরিয়ান দ্রুত বলল,

—৭৩?

কামাল মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ।

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

এত বছর পর একটা অসমাপ্ত প্রশ্ন যেন উত্তর পাওয়ার পথে।

কামাল আরও বললেন,

—দুর্ঘটনার পর আমি ভয় পেয়ে যাই। কারণ যে গাড়িটা সায়ানকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেটা তোমাদের ব্যবসায়িক অংশীদারের লোকের গাড়ি ছিল।

আরিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে গেল।

—তার নাম?

কামাল বললেন,

—রহমান সাহেব।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তিনি তো বহু বছর আগেই বিদেশে চলে গেছেন।

—হ্যাঁ। কিন্তু যাওয়ার আগে সব প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন।

মেহরিন আরিয়ানের দিকে তাকাল।

—তাহলে সায়ানের মৃত্যুর রহস্যের পেছনে সত্যিই অন্য কিছু ছিল।

কামাল ধীরে বললেন,

—হয়তো। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আরিয়ান—সব সত্যি জানলেও অতীতকে বদলানো যায় না।

আরিয়ান নিচু গলায় বলল,

—জানি।

তারপর মেহরিনের দিকে তাকাল।

—কিন্তু অন্তত আমার ভাইয়ের প্রতি ন্যায় করতে পারব।

বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির ভেতর দুজনেই চুপ ছিল।

অনেকক্ষণ পর মেহরিন বলল,

—আপনি ঠিক আছেন?

আরিয়ান স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখে বলল,

—জানি না।

—আপনি কি নিজেকে দোষী মনে করছেন?

আরিয়ান চুপ।

মেহরিন বুঝে গেল উত্তরটা হ্যাঁ।

সে ধীরে বলল,

—আপনি সায়ানকে হারিয়েছেন। এটা আপনার দোষ নয়।

—কিন্তু আমি যদি ওর কথা আরও মন দিয়ে শুনতাম...

—তাহলে কী হতো?

আরিয়ান উত্তর দিল না।

মেহরিন তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

—সবকিছু নিজের কাঁধে নেবেন না।

আরিয়ান একবার তার দিকে তাকাল।

—তুমি পাশে থাকলে মনে হয়, সবকিছু সামলে নিতে পারব।

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

—আমি তো আছি।

কয়েক সপ্তাহ পর তদন্তের মাধ্যমে পুরোনো ঘটনাটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল।

প্রমাণ পাওয়া গেল, সায়ানের দুর্ঘটনাটা পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না। ব্যবসায়িক বিরোধের কারণে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল, আর সেই ঘটনাই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।

রহমান সাহেব সরাসরি দুর্ঘটনা ঘটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তার লোকজন সায়ানকে অনুসরণ করছিল, সেটার প্রমাণ মিলল।

সত্যিটা পুরোপুরি জানার পরও আরিয়ানের মনে শান্তি এলো না।

বরং সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ একা বসে রইল।

মেহরিন এসে পাশে বসল।

—কী ভাবছেন?

—সায়ানের কথা।

—ও নিশ্চয়ই চাইত আপনি ভালো থাকুন।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—তুমি জানো, সায়ান কেমন ছিল?

—না।

—তোমার মতোই অনেক কথা বলত।

মেহরিন অবাক হয়ে বলল,

—আমার মতো?

—হ্যাঁ। আর আমার মতো গম্ভীর মানুষকে বিরক্ত করাই ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয় কাজ।

মেহরিন হেসে ফেলল।

—তাহলে ওকে আমার ভালো লাগত।

আরিয়ানও হাসল।

কিছুক্ষণ পর মেহরিন বলল,

—একটা কথা বলব?

—বলো।

—আপনি কি আমাকে এখনও অচেনা মনে করেন?

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—না।

—তাহলে?

আরিয়ান ধীরে তার হাত ধরল।

—তুমি এখন আমার সবচেয়ে আপন মানুষ।

মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।

—আমি কিন্তু একটা কথা বলতে চাই।

—কী?

—আমিও আপনাকে ভালোবাসি।

আরিয়ান যেন কয়েক মুহূর্ত বিশ্বাসই করতে পারল না।

—সত্যি?

মেহরিন লজ্জায় মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—তাহলে আমাদের বিয়েটা হয়তো এতটা অনিচ্ছার ছিল না।

মেহরিন হেসে বলল,

—শুরুটা ছিল।

—শেষটা?

—সেটা আমি ঠিক করে ফেলেছি।

—কী?

মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনার সঙ্গেই থাকবে।

আরিয়ানের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।

ঠিক তখনই দরজায় নক হলো।

নীলা দাঁড়িয়ে ছিল।

মেহরিন উঠে গিয়ে দরজা খুলল।

নীলা মৃদু হেসে বলল,

—আমি শুধু বিদায় বলতে এসেছি।

আরিয়ান এগিয়ে এল।

—কোথায় যাবে?

—বিদেশে। অনেকদিনের জন্য।

তারপর মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার ভাগ্য ভালো, মেহরিন। আরিয়ানকে তোমার মতো করে কেউ বুঝতে পারেনি।

মেহরিন মৃদু হেসে বলল,

—আমিও ভাগ্যবান।

নীলা চলে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর মেহরিন আরিয়ানের দিকে তাকাল।

—এবার আপনার অতীত সত্যিই শেষ?

আরিয়ান হেসে বলল,

—হ্যাঁ।

—আর আমাদের গল্প?

আরিয়ান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমাদের গল্প তো এখন শুরু।

মেহরিন হাসল।

....
👁 97