গোপন সম্পর্ক থেকে বিয়ে

ঢাকার একটা পুরনো পাড়ায়, ছোট্ট একটা গলির ভিতরে দুটো বাড়ি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একটাতে থাকে প্রিয়া। বয়স মাত্র আঠারো। স্কুলের শেষ বর্ষে পড়ে। চুল কোমর পর্যন্ত, চোখ দুটো একটু বড় আর কথা বললেই হাসি ফুটে ওঠে। বাড়ির ছাদে বসতে ভালোবাসে। প্রতিদিন বিকেলবেলা ছাদে উঠে পাশের বাড়ির আপুর সঙ্গে গল্প করে।
আপুটা নাম রুমা। প্রিয়ার থেকে এক বছরের বড়। দুজনেই প্রায় একসঙ্গে বড় হয়েছে। ছাদের কংক্রিটের মেঝেতে পা ঝুলিয়ে বসে চা খায়, স্কুলের গল্প করে, কখনো কখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে হাসাহাসি করে।
এদিকে প্রিয়ার বাড়ির ঠিক সামনের রাস্তার ওপারে থাকে আশিক। বয়স পঁচিশ। প্রাইভেট টিউশনি করে। চোখদুটো একটু গম্ভীর, কিন্তু হাসি হলে মুখটা সম্পূর্ণ বদলে যায়। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাফি। রাফি প্রিয়ার পাশের বাড়ির রুমাকে পছন্দ করে। অনেকদিন ধরে। কিন্তু কথা বলার সাহস পায় না।
একদিন বিকেল। প্রিয়া আর রুমা ছাদে বসে আছে। পা দুটো রেলিংয়ের ওপর ঝুলিয়ে, হাতে চা-এর কাপ। নিচের রাস্তায় হঠাৎ দুজন ছেলে দাঁড়ায়। রাফি আর আশিক।
রাফি চোখ তুলে ছাদের দিকে তাকায়। রুমাকে দেখার জন্যই এসেছে। আশিক শুধু সঙ্গী হয়ে এসেছে। সেও চোখ তোলে। আর সেই মুহূর্তেই তার চোখে পড়ে প্রিয়া।
সূর্যটা তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আলোর রেখা প্রিয়ার চুলে এসে পড়েছে। সে হাসছে রুমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে। আশিকের বুকের ভিতরটা একটু অদ্ভুত লাগে। যেন কেউ হালকা করে টেনে ধরেছে।
রাফি ফিসফিস করে বলে, “ওই যে রুমা। দেখলি?”
আশিক উত্তর দেয় না। তার চোখ তখনো প্রিয়ার দিকে।
প্রিয়াও নিচের দিকে তাকায় একবার। দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে দেখে একটু অবাক হয়। তারপর আবার রুমার দিকে ফিরে যায়। কিন্তু আশিকের চোখ থেকে সে মুহূর্তটা আর সরতে চায় না।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করে। আশিক আর রাফি চলে যায়। কিন্তু আশিকের মনে প্রিয়ার সেই হাসি আর সূর্যের আলোতে ঝলমল করা চুলটা থেকে যায়।
সেদিন রাতে আশিক জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। মনে মনে বলে, “কে ও?”

সেই প্রথম দেখার পর থেকে আশিকের মন আর স্থির নেই। প্রতিদিন স্কুল ছুটির সময় সে প্রিয়ার বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। কখনো কখনো দূরে দাঁড়িয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রিয়াও লক্ষ করেছে। কিন্তু কিছু বলেনি।
একদিন সকালে প্রিয়া স্কুলে যাচ্ছিল। ইউনিফর্ম পরা, ব্যাগ কাঁধে। রাস্তার মোড়ে হঠাৎ আশিক এসে দাঁড়ায়।
“প্রিয়া…”
প্রিয়া থমকে যায়। চেনে না, কিন্তু ছেলেটাকে আগে দেখেছে।
আশিক সোজাসুজি বলে, “আমি তোমাকে পছন্দ করি। আমার সঙ্গে—”
প্রিয়া থামিয়ে দেয়। “না। আমি কাউকে চিনি না। দয়া করে সরিয়ে দাও।”
আশিক কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু প্রিয়া মাথা নিচু করে হেঁটে চলে যায়।
কয়েকদিন পর। বিকেলবেলা। প্রিয়া আবার ছাদে। একা। পা রেলিংয়ের ওপর ঝুলিয়ে বসে আছে। চুল বাতাসে উড়ছে। নিচে রাস্তায় আশিক এসে দাঁড়ায়।
সে উপরে তাকিয়ে ডাকে, “প্রিয়া…”
প্রিয়া নিচু হয়ে তাকায়।
আশিক বলে, “তুমি আমায় ভালোবাসো? আমায় একবারও এক্সেপ্ট করবে না?”
প্রিয়া হেসে ফেলে। “না। কখনো না।”
আশিকের মুখটা এক মুহূর্তে শক্ত হয়ে যায়। সে পকেট থেকে একটা ছোট্ট ছুরি বের করে।
“তাহলে আজকে আমি এখানেই শেষ হয়ে যাব।”
প্রিয়ার হাসি মিলিয়ে যায়। “কী করছ তুমি?”
আশিক ছুরিটা হাতের কাছে নিয়ে আসে। “তুমি যদি না বলো, তাহলে—”
প্রিয়া উঠে দাঁড়ায়। “আচ্ছা, তাহলে আমিও এখান থেকে লাফ দেব!”
আশিক থামে না। ছুরিটা তার কব্জির কাছে ঠেকায়। ধারালো অংশটা চামড়া কেটে একটু রক্ত বেরোয়।
প্রিয়া চিৎকার করে ওঠে। “না—এটা করো না!”
সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। রাস্তায় এসে আশিকের সামনে দাঁড়ায়। তার হাতের রক্ত দেখে চোখ জলে ভরে যায়। ওড়না দিয়ে আশিকের হাত মুছে দিতে দিতে কাঁদতে থাকে।
“এটা কেন করলে? পাগল নাকি তুমি?”
আশিক হালকা হেসে বলে, “এবার বলো।”
প্রিয়া চোখ মুছতে মুছতে ফিসফিস করে, “হা… আই লাভ ইউ।”
আশিকের মুখে বড় একটা হাসি ফুটে ওঠে। সে আর কিছু বলে না। শুধু একটু দূরে সরে গিয়ে প্রিয়ার দিকে উড়ে যাওয়া চুমু পাঠায়। তারপর হেঁটে চলে যায়।
প্রিয়া দাঁড়িয়ে থাকে। হাতে ওড়নার রক্তের দাগ। বুকে অদ্ভুত একটা অনুভূতি। ভয়, রাগ, আর কিছু একটা… যেটা সে এখনো নাম দিতে পারে না।
সেই রক্তমাখা ওড়নার দিনের পর থেকে আশিক আর প্রিয়ার মধ্যে একটা অদৃশ্য সূতো বেঁধে যায়।
প্রতিদিন স্কুলের পথে আশিক অপেক্ষা করে। প্রিয়া প্রথমে রেগে যেত, তারপর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কখনো কখনো দুজনে ছাদে বসে গল্প করে—রুমা জানে না। আশিকের হাতের ক্ষতটা শুকিয়ে যায়, কিন্তু প্রিয়ার মনে সেই দিনের ভয় আর আশিকের সেই হাসি দুটোই থেকে যায়।
মাসখানেক পর। একদিন সন্ধ্যায় ছাদে বসে আশিক বলে, “চল, আমরা বিয়ে করে ফেলি। তারপর বাবা-মাকে জানাব।”
প্রিয়া চমকে ওঠে। “বিয়ে? এত তাড়াতাড়ি?”
আশিক তার হাত ধরে। “আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তুমি যদি রাজি থাকো…”
প্রিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মাথা নেড়ে রাজি হয়ে যায়।
তারা গোপনে কাজী অফিসে বিয়ে করে। কোনো সাজগোজ নেই, কোনো আত্মীয় নেই। শুধু দুজন। প্রিয়া সেদিন সাদা পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরেছিল। আশিকের চোখে জল এসেছিল।
বিয়ের পর প্রিয়া আগের মতোই বাড়িতে থাকে। কেউ কিছু জানে না।
কিন্তু গোপন কথা কতদিন লুকানো যায়?
একদিন প্রিয়ার মা তার মোবাইলে আশিকের মেসেজ দেখে ফেলে। তারপর সব খুলে যায়। বাবা-মায়ের রাগের সীমা থাকে না।
“তুই পাগল হয়ে গেছিস? পঁচিশ বছরের ছেলের সঙ্গে বিয়ে? আমাদের মুখ দেখবি কী করে?”
প্রিয়াকে সেদিন অনেক বকা হয়, মারধরও হয়। মা চুল ধরে টানে, বাবা জুতা ছুড়ে মারে। প্রিয়া শুধু কেঁদে যায়। কিছু বলে না।
রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রিয়া চুপিচুপি ছাদে উঠে বসে। হাঁটু দুটো বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। বাতাস ঠান্ডা, চোখের জল আরও ঠান্ডা।
হঠাৎ তার মোবাইল বাজে।
আশিক।
প্রিয়া অবাক হয়ে ফোন ধরে।
“কোথায় আছো?” আশিকের গলা।
“ছাদে…”
“নিচে এসো। আমি অপেক্ষা করছি।”
প্রিয়া সিঁড়ি দিয়ে নামে। রাস্তায় আশিক দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ছোট ব্যাগ।
“চলো,” সে শুধু এটুকু বলে।
প্রিয়া পেছনে তাকায় একবার। বাড়ির দিকে। তারপর আশিকের হাত ধরে। দুজনে রাতের অন্ধকারে হেঁটে চলে যায়।
পালিয়ে যাওয়ার পর আশিক আর প্রিয়া শহরের একটা সস্তা মেসে উঠে। একটা ছোট ঘর। রান্নাবান্নার জায়গা আলাদা নেই, বিছানা আর একটা টেবিল—এই নিয়েই শংসার।
প্রিয়া প্রথমে ভয় পেত। রাত্রে ঘুম হতো না। কিন্তু আশিক থাকত পাশে। হাত ধরে ঘুমাত। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
আশিক আগের মতোই প্রাইভেট পড়াত। একটা কলেজপড়ুয়া মেয়ের বাড়িতে যেত। মেয়েটার নাম সায়মা। বয়স বিশ। পড়াশোনায় খুব ভালো, কথাবার্তা নম্র। আশিক প্রথমে শুধু পড়াত। তারপর একদিন সায়মা চা নিয়ে এল, গল্প জমে গেল। তারপর আরেকদিন…
প্রিয়া ঘরে বসে অপেক্ষা করত। আশিক দেরি করে ফিরত। কখনো কখনো মোবাইলে ফোন দিলেও ধরত না।
“কোথায় ছিলে এতক্ষণ?” প্রিয়া একদিন জিজ্ঞেস করে।
আশিক বিরক্ত হয়ে বলে, “পড়ানোর বাড়িতে। এত জিজ্ঞেস কেন?”
প্রিয়ার কথা আটকে যায়। সে চুপ হয়ে যায়।
দিন যত যায়, আশিকের সঙ্গে কথা কমে আসে। সে আর আগের মতো প্রিয়ার চুল স্পর্শ করে না, আর “ভালোবাসি” বলে না। রাতে পাশে শুয়েও দূরত্ব থাকে।
প্রিয়া একা একা কাঁদে। বাবার বাড়ি ছেড়েছে, মায়ের কোলে মাথা রাখার জায়গা নেই। শুধু আশিক ছিল। এখন সেই আশিকও যেন অন্য কেউ হয়ে যাচ্ছে।
একদিন রাতে প্রিয়া জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি আর আমাকে ভালোবাসো?”
আশিক বিছানায় শুয়ে থাকে। চোখ বন্ধ করে বলে, “ঘুমাও। সকালে কথা হবে।”
প্রিয়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে মুখ ঘুরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সেই রাত থেকে প্রিয়ার মনে একটা ভয় জন্মায়—যে আশিক হয়তো আর তার নয়।
আর আশিক? সে জানে না, সায়মার হাসি আর কথার মধ্যে সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রিয়ার শরীরটা কিছুদিন ধরে অদ্ভুত লাগছিল। বমি হচ্ছিল সকালে, মাথা ঘুরছিল, আর খিদেও যেন কমে গেছে। একদিন সে নিজেই একটা টেস্ট কিট কিনে আনে।
বাথরুমে দাঁড়িয়ে ফলাফল দেখে তার পা কেঁপে ওঠে।
পজিটিভ।
সে গর্ভবতী।
প্রিয়ার চোখে জল চলে আসে। আনন্দ আর ভয় দুটোই একসঙ্গে। সে আশিককে বলবে—ভেবেছিল। কিন্তু আশিক তখন অন্য জগতে।
সায়মার বাড়ি থেকে ফিরে এসে আশিক আর কথা বলে না। ফোনে হাসে, মেসেজ করে, আর প্রিয়ার দিকে তাকালে যেন বিরক্ত হয়। একদিন প্রিয়া তার হাত ধরতে গিয়েছিল, আশিক সরিয়ে নিয়েছিল।
“আমার মাথা ব্যথা করছে, একটু শান্তিতে থাকতে দাও।”
প্রিয়া সেদিন আর কিছু বলেনি। শুধু পেটের দিকে হাত দিয়ে বসেছিল।
আরও কয়েকদিন কাটে। প্রিয়া একবারও মুখ খোলেনি। আশিকও জিজ্ঞেস করেনি কেন সে এত চুপ।
এক রাত। আশিক আবার দেরি করে ফিরল। ঘরে ঢুকেই মোবাইলে কথা বলতে বলতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। প্রিয়া রান্নাঘর থেকে এসে দাঁড়াল।
“আশিক…”
আশিক ফোন থেকে মুখ তুলে বিরক্ত গলায় বলল, “কী?”
প্রিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বলল, “কিছু না।”
সে রাতে প্রিয়া ঘুমোয়নি। জানালার পাশে বসে শহরের আলো দেখছিল। মনে মনে ভেবেছিল—এই সন্তানকে নিয়ে সে কী করবে? আশিক যদি না চায়? যদি সায়মার জন্য তাকে ছেড়ে দেয়?
ভোর হওয়ার আগেই প্রিয়া একটা ছোট ব্যাগে কয়েকটা জামাকাপড় ভরল। টেবিলে একটা চিরকুট রেখে দিল—
“আমি যাচ্ছি। তোমার আর আমার দরকার নেই। খুঁজো না।”
তারপর চুপিচুপি দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
আশিক ঘুম থেকে উঠে যখন খালি ঘর দেখল, তখন সকালের রোদ ঘরে ঢুকে পড়েছে। চিরকুটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
প্রথমবারের মতো তার বুকে ভয় লাগল।

আশিক চিরকুটটা হাতে নিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকে। প্রথমে রাগ হয়। “চলে গেল কেন? এত সহজে?”
তারপর ধীরে ধীরে ভয় চাপে। প্রিয়ার জিনিসপত্র নেই, ওড়নাটাও নেই। শুধু একটা পুরনো চিরকুট আর খালি বিছানা।
সে মোবাইলে ফোন করে। বন্ধ। মেসেজ পাঠায়—কোনো উত্তর নেই।
সারাদিন খোঁজে। পরিচিত জায়গায়, স্কুলের আশেপাশে, এমনকি প্রিয়ার পুরনো বাড়ির কাছেও যায়। কিন্তু সাহস করে ভিতরে ঢোকে না।
তিনদিন পর।
আশিক একটা ব্যস্ত বাজারের গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ চোখে পড়ে একটা পরিচিত পিঠ। চুল বাঁধা, শরীর একটু দুর্বল লাগছে। প্রিয়া।
সে দৌড়ে যায়। পেছন থেকে ডাকে, “প্রিয়া!”
প্রিয়া শোনে না। হেঁটে চলে যায়।
আশিক আরও জোরে ডাকে। “প্রিয়া… দাঁড়া!”
এবার প্রিয়া থামে। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায়। চোখদুটো কালো, ঠোঁট শুকনো।
আশিক কাছে গিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, “আমার ভুল হয়েছে… আমি সব বুঝেছি। ফিরে আয়।”
প্রিয়া কিছু বলার আগেই তার মাথাটা ঘুরতে শুরু করে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। সে হঠাৎ আশিকের বুকের ওপর ঢলে পড়ে।
আশিক তাকে ধরে ফেলে। ভয়ে চিৎকার করে রিকশা ডাকে। হাসপাতালে নিয়ে যায়।
ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে, “ওনার শরীরে পানি ও পুষ্টির অভাব। আর…” ডাক্তার একটু থেমে হাসে, “আপনি বাবা হতে চলেছেন। প্রায় তিন মাসের গর্ভবতী।”
আশিকের হাত কাঁপে। সে প্রিয়ার বিছানার পাশে বসে তার কপালে চুমু দেয়। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
“আমি ফিরে এসেছি,” সে ফিসফিস করে বলে। “আর কখনো তোমাকে একা ছাড়ব না।”
প্রিয়া তখনো অচেতন। কিন্তু আশিকের হাত তার হাতের ওপর রাখা।

প্রিয়া যখন চোখ মেলে, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ঔষধের গন্ধ, আর পাশে আশিকের মুখ।
আশিক তার হাত ধরে আছে। চোখ লাল।
প্রিয়া ফিসফিস করে বলে, “তুমি… কেন এলে?”
আশিক মাথা নিচু করে। “কারণ আমি বোকা। কারণ আমি তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছি। কারণ…” সে থামে, তারপর বলে, “তুমি আমার সন্তানের মা।”
প্রিয়ার চোখে জল এসে যায়। সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। “তুমি তো সায়মাকে—”
আশিক তার কথা কেটে দেয়। “সায়মাকে আর পড়াব না। আজই বলে দিয়েছি। তুমি ছাড়া আমার কিছু নেই, প্রিয়া। বিশ্বাস করো।”
প্রিয়া অনেকক্ষণ চুপ থাকে। তারপর আশিকের হাত চেপে ধরে। কিছু বলে না, শুধু কেঁদে ওঠে। আশিক তাকে বুকে টেনে নেয়।
পরের দিন প্রিয়াকে ছাড়িয়ে আনা হয়। তারা আবার সেই ছোট মেসে ফিরে যায়। এবার ঘরটা অন্যরকম লাগে। আশিক নিজে রান্না করে, প্রিয়াকে খাওয়ায়, রাতে তার পেটে হাত দিয়ে বসে থাকে।
“ও কি লাথি মারছে?” একদিন আশিক হেসে জিজ্ঞেস করে।
প্রিয়া মাথা নাড়ে। “এখনো না। কিন্তু শীঘ্রই মারবে।”
দুজনেই হাসে। অনেকদিন পর প্রথমবারের মতো সত্যিকারের হাসি।
আশিক ধীরে ধীরে প্রাইভেট টিউশনি কমিয়ে দেয়। অন্য জায়গায় চাকরির খোঁজ শুরু করে। প্রিয়াও তাকে সাহস জোগায়।
রাতের পর রাত তারা গল্প করে—সন্তানের নাম কী রাখবে, কেমন করে বড় করবে, কোনদিন বাবা-মায়ের কাছে ফিরবে।
প্রিয়ার মনে আগের আঘাত একেবারে যায়নি। কিন্তু আশিকের চোখে এখন শুধু তার আর তাদের অজাত সন্তানের ছায়া।
সে বিশ্বাস করতে শুরু করে আবার।

মাসখানেক কেটে যায়। প্রিয়ার পেটটা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আশিক প্রতিদিন সকালে তার পেটে কান পেতে শোনে—যেন সন্তানের লাথি শুনতে পাবে।
একদিন আশিক চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যায়। একটা ছোট কোম্পানিতে অ্যাকাউন্টস সেকশনে। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়েই বলে, “পেয়ে গেছি!”
প্রিয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মুখে হাসি। আশিক তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুরতে থাকে ঘরের মধ্যে। দুজনেই হাসে, কেঁদেও ফেলে একটু।
এবার আর সস্তা মেসে থাকতে হয় না। তারা একটু ভালো একটা বাসা ভাড়া নেয়। দুটো ঘর, ছোট্ট বারান্দা। প্রিয়া বারান্দায় বসে রোদ পোহায়, আশিক সন্ধ্যায় ফুল এনে দেয়।
সন্তানের নাম নিয়ে তর্ক হয় প্রায়ই।
আশিক বলে, “ছেলে হলে আরিয়ান।”
প্রিয়া বলে, “মেয়ে হলে আরিয়া।”
শেষে দুজনেই একমত হয়—যাই হোক, নামের আগে “আমাদের” থাকবে।
একদিন সন্ধ্যায় প্রিয়া চুপ করে বসে থাকে। আশিক জিজ্ঞেস করে, “কী ভাবছো?”
প্রিয়া ধীরে বলে, “মাকে খুব মনে পড়ছে। বাবাকেও। ওরা কি আর আমাকে চাইবে?”
আশিক তার কাঁধে হাত রাখে। “চাইবে। আমি নিজে গিয়ে বলব। তুমি আর একা লড়বে না।”
প্রিয়া মাথা রাখে আশিকের কাঁধে। বাইরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। ঘরের ভিতরটা উষ্ণ।
সেই রাতে প্রথমবারের মতো প্রিয়া স্বপ্ন দেখে—মা তার মাথায় হাত বুলাচ্ছে, বাবা দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। আর আশিক তাদের সবার মাঝখানে।
সকালে উঠে প্রিয়া আশিককে বলে, “চলো, একদিন ওদের কাছে যাই।”
আশিক হেসে মাথা নাড়ে। “যাব। তোমার যখন ইচ্ছে।”

কয়েকদিন পর। সকালবেলা। প্রিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে। পেটটা এখন বেশ বড়। আশিক পেছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখে।
“রেডি?”
প্রিয়া গভীর নিঃশ্বাস নেয়। “হ্যাঁ।”
তারা প্রিয়ার পুরনো বাড়ির দিকে রওনা দেয়। রাস্তা ঘরের মতোই চেনা, কিন্তু প্রিয়ার বুকটা ধড়ফড় করছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই মা খুলে দেন। চোখদুটো প্রথমে প্রিয়ার দিকে যায়, তারপর পেটের দিকে। হাত কাঁপে।
“প্রিয়া…”
বাবা ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন। মুখ কঠিন। “তুই ফিরে এলি?”
প্রিয়া মাথা নিচু করে। “মা… বাবা… আমি—”
আশিক এক পা এগিয়ে বলে, “আমি আশিক। আপনাদের মেয়ের স্বামী। আমি ভুল করেছিলাম অনেক। কিন্তু এখন আর কোনো ভুল করব না। প্রিয়া আর আমাদের সন্তানকে আমি সারাজীবন দেখব।”
মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়ে। তিনি প্রিয়াকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরেন। “পাগল মেয়ে… এতদিন কোথায় ছিলি?”
বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। রাগ এখনো আছে, কিন্তু প্রিয়ার পেটের দিকে তাকিয়ে তাঁর গলা ভাঙে। “সন্তান…?”
প্রিয়া মাথা নাড়ে। “হ্যাঁ, বাবা।”
বাবা ধীরে ধীরে ঘুরে ভিতরে চলে যান। মা প্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “আসো ভিতরে। কথা হবে।”
তারা বসার ঘরে বসে। চা আসে, কিন্তু কেউ খায় না। আশিক সব খুলে বলে—কীভাবে শুরু, কীভাবে ভুল, কীভাবে প্রিয়া চলে গিয়েছিল, আর কীভাবে সে ফিরে পেয়েছে।
বাবা শেষে বলেন, “আমি এখনো রাজি নই। কিন্তু… আমার নাতি/নাতনিকে দেখতে চাই। তোরা থাক। দেখি কী হয়।”
প্রিয়ার চোখে আবার জল। সে বাবার পায়ে হাত দিয়ে বলে, “ধন্যবাদ, বাবা।”
আশিক মাথা নিচু করে সালাম করে।
আরও কয়েক মাস কেটে যায়।
প্রিয়ার প্রসবের দিন হাসপাতালের করিডোরে আশিক পায়ে পায়ে হাঁটছিল। হাতে ফোন, কপালে ঘাম। হঠাৎ নার্স বেরিয়ে এসে বলে, “বাবা হয়েছেন। মেয়ে।”
আশিকের পা কেঁপে ওঠে। সে দৌড়ে ভিতরে ঢোকে। প্রিয়া বিছানায় শুয়ে, ক্লান্ত কিন্তু হাসি মুখে। কোলে একটা ছোট্ট লালচে মুখ।
“আরিয়া,” প্রিয়া ফিসফিস করে বলে।
আশিক কপালে চুমু দেয় দুজনেরই। “আমাদের আরিয়া।”
পরের দিন প্রিয়ার বাবা-মা এসে পৌঁছান। মা নাতনিকে কোলে নিয়ে কাঁদতে থাকেন। বাবা একপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আশিকের কাঁধে হাত রাখেন।
“দেখলি তো… ভালো করে রাখবি।”
আশিক মাথা নিচু করে। “জীবন দিয়ে রাখব, বাবা।”
সেই দিন থেকে সব হিসেব মিটে যায়।
এক বছর পর।
তারা এখন একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকে। আশিকের চাকরি স্থিতিশীল, প্রিয়া আরিয়াকে নিয়ে দিন কাটায়। সন্ধ্যা হলেই বাবা-মা চলে আসেন। নাতনির সঙ্গে খেলেন, প্রিয়ার রান্না খান, আশিকের সঙ্গে চা খেয়ে গল্প করেন।
একদিন সন্ধ্যায় সবাই বারান্দায় বসে আছে। আরিয়া হামা দিয়ে আশিকের কাছে যাচ্ছে। প্রিয়া আশিকের দিকে তাকিয়ে হাসছে। বাবা-মাও হাসছেন।
প্রিয়া মনে মনে বলে—এত কষ্ট, এত ভুল, এত কাঁদার পরও শেষমেশ এভাবেই থেমেছে গল্পটা।
আশিক তার হাত ধরে। চোখের ভাষায় বলে, “আর কখনো হারাব না।”
প্রিয়া মাথা রাখে তার কাঁধে।
আরিয়া দুজনের মাঝখানে এসে বসে।

....
👁 104