একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি

ঢাকার শীত খুব বেশি দিনের নয়। কয়েকটা সকাল কুয়াশায় ঢাকা থাকে, বাতাসে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হয়, তারপর আবার শহর ফিরে যায় তার চেনা ব্যস্ততায়।

মিরপুরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোর একটিতে থাকত প্রীতম।

পেশায় সে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। বেতন ভালো, নিজের গাড়ি ছিল, সুন্দর একটি ছোট ফ্ল্যাটও ছিল। বাইরে থেকে দেখলে তার জীবনে কোনো অভাব ছিল না।

কিন্তু প্রীতম নিজে জানত, তার জীবনটা ভীষণ একঘেয়ে হয়ে গেছে।

সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে যাওয়া, সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, মিটিং আর কাজের চাপ সামলানো, তারপর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসা—এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল।

বন্ধুরা প্রায়ই তাকে বলত,

“প্রীতম, তোর জীবনটা এত শুকনো কেন? একটু ঘোরাঘুরি কর, মানুষের সঙ্গে মিশ।”

প্রীতম হেসে বলত,

“মানুষের সঙ্গে মেশার সময় কোথায়?”

বন্ধুরা বলত,

“বিয়ে কর।”

প্রীতম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিত,

“বিয়ে করলে কি সময় বাড়বে?”

সবাই হেসে উঠত।

কিন্তু বন্ধুরা জানত না, হাসির আড়ালে প্রীতমের ভেতরে একটা শূন্যতা ছিল।

সে কাউকে খুঁজছিল না। শুধু মাঝে মাঝে মনে হতো, জীবনে এমন একজন মানুষ থাকলে ভালো হতো, যার সঙ্গে দিনের শেষে নিজের কথা বলা যায়।

এক শীতের সকালে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার।

ঘড়িতে তখন সাড়ে ছয়টা।

জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে প্রীতম অবাক হলো। চারপাশে হালকা কুয়াশা। ঠান্ডা বাতাস। রাস্তার পাশে গাছগুলোও যেন কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।

কেন যেন সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে একটু হাঁটতে ইচ্ছে হলো তার।

কাছেই একটা পার্ক ছিল।

অনেক দিন সেখানে যাওয়া হয়নি।

একটা জ্যাকেট পরে সে বেরিয়ে পড়ল।

পার্কে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। কয়েকজন বয়স্ক মানুষ হাঁটছিলেন। কেউ ব্যায়াম করছিলেন। দু-একজন বেঞ্চে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন।

প্রীতম ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল পার্কের এক কোণের বেঞ্চে।

একজন মেয়ে একা বসে বই পড়ছে।

মেয়েটির গায়ে হালকা নীল শাল। লম্বা কালো চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখ বইয়ের পাতায় স্থির। মুখে শান্ত একটা ভাব।

প্রীতম পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বইটির প্রচ্ছদ দেখতে পেল।

শেষের কবিতা।

সে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

মেয়েটা অবশ্য সেটা খেয়াল করল না।

প্রীতম আবার হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর কেন যেন পেছনে তাকাল।

মেয়েটা তখনও বই পড়ছে।

প্রীতম নিজেই অবাক হলো।

একজন অপরিচিত মেয়ের দিকে সে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?

নিজেকে সামলে সে পার্কের অন্যদিকে চলে গেল।

সেদিন আর কোনো কথা হয়নি।

কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল।

প্রীতমের প্রথমেই মনে হলো—

আজ কি মেয়েটা পার্কে আসবে?

নিজের চিন্তায় নিজেই হেসে ফেলল।

“আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?”

তবুও আগের দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে সে পার্কে চলে গেল।

পার্কে ঢুকেই তার চোখ বেঞ্চটার দিকে গেল।

মেয়েটা সেখানে বসে আছে।

আজও হাতে সেই বই।

প্রীতমের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বেঞ্চের কাছাকাছি গেল।

মেয়েটা হঠাৎ বই থেকে চোখ তুলে তাকাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

মেয়েটা মৃদু হাসল।

প্রীতমও হাসল।

কয়েক সেকেন্ড পর মেয়েটা আবার বইয়ের দিকে তাকিয়ে গেল।

প্রীতম কিছুদূর এগিয়ে গেল।

তারপর থেমে গেল।

মনে হলো, কথা না বলে চলে গেলে সুযোগটা নষ্ট হবে।

শেষ পর্যন্ত সাহস করে ফিরে এল।

বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“আপনি কি প্রতিদিন এখানে আসেন?”

মেয়েটা বই থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।

“প্রায় প্রতিদিন।”

“একা?”

মেয়েটা একটু হেসে বলল,

“বই থাকলে একা থাকা যায় নাকি?”

প্রীতম অবাক হয়ে গেল।

“মানে?”

মেয়েটা বইটা বন্ধ করে বলল,

“বইয়ের সঙ্গে থাকলে মানুষ কখনো পুরোপুরি একা থাকে না।”

প্রীতম হেসে বলল,

“আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে বই আপনার খুব ভালো বন্ধু।”

“হ্যাঁ। মানুষের সঙ্গে সব কথা বলা যায় না, বইয়ের সঙ্গে যায়।”

“তাহলে আমার মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন কীভাবে?”

মেয়েটা এবার একটু অবাক হয়ে তাকাল।

তারপর মুচকি হেসে বলল,

“আপনি কি সব অপরিচিত মানুষের সঙ্গে এমন কথা বলেন?”

প্রীতম একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

“না।”

“তাহলে?”

“জানি না।”

মেয়েটা হেসে ফেলল।

“আপনার নাম কী?”

“প্রীতম।”

“আমি ইরা।”

নামটা শুনে প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“ইরা... সুন্দর নাম।”

“ধন্যবাদ।”

“আপনি কি শিক্ষকতা করেন?”

ইরা অবাক হয়ে বলল,

“আপনি কীভাবে বুঝলেন?”

“আপনার কথাবার্তায়।”

“কী ধরনের কথাবার্তা?”

“মনে হয় সবাইকে বুঝিয়ে বলতে অভ্যস্ত।”

ইরা হাসল।

“আমি স্কুলে বাংলা পড়াই।”

“তাই তো।”

“তাই তো কী?”

“তাই বলেই হয়তো ‘শেষের কবিতা’ পড়ছেন।”

ইরা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি পড়েছেন?”

“না।”

“তাহলে কীভাবে জানলেন?”

“নামটা জানি।”

“তাহলে পড়বেন।”

“আপনি সাজেস্ট করছেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে পড়তেই হবে।”

ইরা মৃদু হেসে বইটা আবার খুলে ফেলল।

প্রীতম বুঝতে পারল, তার এখন চলে যাওয়া উচিত।

তবুও যাওয়ার আগে বলল,

“আপনি কালও আসবেন?”

ইরা বই থেকে চোখ না তুলে বলল,

“প্রতিদিনই আসি।”

প্রীতমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“তাহলে আমিও আসব।”

ইরা এবার তার দিকে তাকাল।

“আপনিও প্রতিদিন আসেন?”

“আজ থেকে আসব।”

ইরা কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হাসল।

প্রীতম সেদিন অফিসে যাওয়ার সময়ও হাসছিল।

কম্পিউটারের সামনে বসেও বারবার তার মনে পড়ছিল ইরার কথা।

বিশেষ করে একটা কথা—

“বইয়ের সঙ্গে থাকলে মানুষ কখনো পুরোপুরি একা থাকে না।”

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে প্রীতম নিজের বুকশেলফের সামনে দাঁড়াল।

সেখানে অনেক বই।

কিন্তু ‘শেষের কবিতা’ নেই।

পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে বইটি কিনে ফেলল।

বই হাতে নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

সে কি সত্যিই বই পড়তে চাইছে?

নাকি ইরার সঙ্গে কথা বলার একটা নতুন কারণ খুঁজছে?

পরদিন সকালে প্রীতম আবার পার্কে গেল।

ইরা তখনও আসেনি।

সে বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।

দশ মিনিট।

পনেরো মিনিট।

তারপর প্রায় আধা ঘণ্টা।

হঠাৎ দূর থেকে নীল শালটা দেখা গেল।

ইরা এগিয়ে আসছে।

প্রীতমের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

ইরা কাছে এসে প্রথমেই তার হাতে থাকা বইটির দিকে তাকাল।

“আপনি সত্যিই কিনেছেন?”

প্রীতম বইটা তুলে দেখাল।

“আপনার কথা অমান্য করার সাহস আমার নেই।”

ইরা হেসে বলল,

“তাহলে আজ থেকে আপনি আর একা নন।”

প্রীতম তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইরার সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রীতমের সকালগুলো বদলে গেল।

আগে ঘুম থেকে উঠেই তার মাথায় অফিসের চিন্তা ঘুরত। কোন কাজ শেষ করতে হবে, কোন মিটিং আছে, কোন ক্লায়েন্ট ফোন করবে—এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকত সে।

এখন ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে কথাটা মনে পড়ত, সেটা হলো—

আজ ইরার সঙ্গে দেখা হবে।

নিজের এই পরিবর্তন দেখে মাঝে মাঝে প্রীতম নিজেই হাসত।

একজন মানুষকে মাত্র কয়েকদিন হলো চেনে। অথচ সেই মানুষটা তার প্রতিদিনের জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে।

প্রতিদিন সকালে তারা মিরপুরের সেই পার্কে দেখা করত।

কখনো বেঞ্চে বসে গল্প করত।

কখনো পাশাপাশি হাঁটত।

কখনো আবার ইরা বই পড়ত আর প্রীতম চুপচাপ পাশে বসে থাকত।

প্রথমদিকে প্রীতমের কাছে বই পড়াটা ছিল শুধু ইরার সঙ্গে কথা বলার একটা অজুহাত।

কিন্তু ধীরে ধীরে সত্যিই তার বই ভালো লাগতে শুরু করল।

একদিন ইরা হেসে বলল,

“আপনি বই পড়ছেন, নাকি শুধু আমাকে দেখানোর জন্য বই হাতে নিয়ে বসে আছেন?”

প্রীতম বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে বলল,

“আমি সত্যিই পড়ছি।”

“কতদূর পড়েছেন?”

প্রীতম একটু থেমে বলল,

“অনেকদূর।”

“কী বুঝেছেন?”

এবার প্রীতম চুপ।

ইরা হেসে ফেলল।

“বুঝেছি। আপনি বই পড়েননি।”

“পড়েছি।”

“তাহলে বলুন।”

“সব বুঝিনি।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“তাহলে শুধু আমাকে খুশি করার জন্য পড়ছেন?”

প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“আপনি যেভাবে বইয়ের কথা বলেন, তাতে মনে হয় বইয়ের ভেতর একটা আলাদা পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীটা দেখতে চাই।”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু গলায় বলল,

“আপনি আসলে যতটা চুপচাপ দেখান, ততটা নন।”

প্রীতম হাসল।

“আপনার সঙ্গে থাকলে কথা বলতে ইচ্ছে করে।”

ইরা চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল।

ইরা তার স্কুলের গল্প করত।

কোনো ছাত্রের দুষ্টুমি, কারও পরীক্ষায় ভালো ফল, কোনো সহকর্মীর মজার ঘটনা—সবকিছুই প্রীতম মন দিয়ে শুনত।

আর প্রীতম বলত তার অফিসের গল্প।

ক্লায়েন্টের চাপ, বসের বকুনি, রাত জেগে কাজ করা—এসব শুনে ইরা প্রায়ই বলত,

“আপনার চাকরিটা খুব কষ্টের।”

প্রীতম বলত,

“আগে মনে হতো।”

“এখন মনে হয় না?”

“না।”

“কেন?”

প্রীতম তার দিকে তাকিয়ে বলত,

“কারণ সকালে একজনকে দেখার জন্য যদি সারাদিন অপেক্ষা করা যায়, তাহলে দিনের অন্য কষ্টগুলো খুব বড় মনে হয় না।”

ইরা তখন চুপ করে যেত।

তার গাল একটু লাল হয়ে উঠত।

কখনো বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে হাসত।

তাদের সম্পর্কের নাম তখনও কেউ দেয়নি।

কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারছিল, বন্ধুত্বের জায়গাটা ধীরে ধীরে অন্য কিছুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

একদিন ইরা স্কুলে যাওয়ার সময় বলল,

“আজ বিকেলে ফোন করবেন না।”

প্রীতম অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“আজ স্কুলে মিটিং আছে।”

“কতক্ষণ?”

“জানি না।”

“তাহলে আমি অপেক্ষা করব।”

ইরা হেসে বলল,

“অপেক্ষা করার দরকার নেই।”

প্রীতম বলল,

“আমার ভালো লাগে।”

ইরা চলে যাওয়ার পরও কথাটা তার মনে রয়ে গেল।

সেদিন রাতে সত্যিই ইরার ফোন আসেনি।

প্রীতম কয়েকবার ফোন হাতে নিয়েও কল করল না।

রাত প্রায় সাড়ে দশটার দিকে ফোন বেজে উঠল।

ইরা।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত গলা,

“হ্যালো।”

প্রীতম সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“এত দেরি হলো?”

“মিটিং শেষ হতে দেরি হয়েছে।”

“খেয়েছেন?”

“না।”

“আপনি এখনও খাননি?”

“বাসায় গিয়ে খাব।”

প্রীতম একটু রাগের ভান করে বলল,

“এভাবে না খেয়ে থাকবেন না।”

ইরা হেসে বলল,

“আপনি কি আমার মা?”

“না।”

“তাহলে এত চিন্তা করছেন কেন?”

প্রীতম একটু থেমে বলল,

“জানি না।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ইরা ধীরে বলল,

“আমারও আপনাকে না জানি কেন খুব কাছের মনে হয়।”

সেই রাতের কথোপকথন শেষ হতে হতে প্রায় একটা বেজে গেল।

পরদিন সকালে দেখা হলে দুজনেই একটু লজ্জা পাচ্ছিল।

ইরা বলল,

“কাল এত রাত পর্যন্ত কথা বললেন কেন?”

“আপনি তো ফোন রেখেই দিচ্ছিলেন না।”

“আমি?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি তো চাইলে ফোন রেখে দিতে পারতেন।”

প্রীতম হাসল।

“সেটা পারিনি।”

ইরা আর কিছু বলল না।

শুধু হাসল।

একদিন ইরা পার্কে এসে বলল,

“আজ আমার মনটা ভালো নেই।”

প্রীতম সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে?”

“একজন ছাত্রকে তার বাবা খুব বকেছে। ছেলেটা সারাদিন চুপ করে ছিল।”

“তাই আপনার মন খারাপ?”

“হ্যাঁ। ছোট বাচ্চাদের কষ্ট দেখলে আমার ভালো লাগে না।”

প্রীতম বলল,

“আপনি খুব বেশি ভাবেন।”

“ভাবা কি খারাপ?”

“না। তবে সবকিছু নিজের ভেতরে নিলে আপনিই কষ্ট পাবেন।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“তাই তো আপনি আছেন।”

প্রীতম থমকে গেল।

“কী?”

“আমার কথা শোনার জন্য।”

সেদিন প্রথমবার প্রীতম বুঝল, ইরার জীবনে তার একটা জায়গা তৈরি হয়েছে।

তারপর একদিন হঠাৎ ইরা পার্কে এল না।

প্রীতম সকাল থেকে অপেক্ষা করল।

সাড়ে সাতটা বাজল।

আটটা বাজল।

ইরা এল না।

সে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।

কিন্তু ইরার ফোন বন্ধ।

সেদিন অফিসে গিয়ে কোনো কাজেই মন দিতে পারল না।

দুপুরে বস এসে বললেন,

“প্রীতম, আজ তোমার কী হয়েছে?”

“কিছু না স্যার।”

“তাহলে এত ভুল করছ কেন?”

প্রীতম কিছু বলল না।

তার মাথায় শুধু ইরার কথা।

পরদিন সকালেও ইরা এল না।

প্রীতমের চিন্তা আরও বেড়ে গেল।

তৃতীয় দিন সকালে অবশেষে ইরা পার্কে এল।

তাকে দেখেই প্রীতম উঠে দাঁড়াল।

“কোথায় ছিলেন?”

ইরা একটু অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“দুই দিন আসেননি।”

“জ্বর ছিল।”

প্রীতমের মুখ সঙ্গে সঙ্গে চিন্তিত হয়ে গেল।

“এখন কেমন আছেন?”

“ভালো আছি।”

“ডাক্তার দেখিয়েছেন?”

“হ্যাঁ।”

“ওষুধ খেয়েছেন?”

ইরা হেসে বলল,

“আপনি কি ডাক্তার?”

“না।”

“তাহলে?”

“চিন্তা করেছি।”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“আমারও আপনাকে খুব মনে পড়েছে।”

প্রীতমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“কতটা?”

ইরা চোখ সরিয়ে বলল,

“অনেক।”

এরপর তাদের সম্পর্কের দূরত্ব আরও কমে গেল।

ফোনে কথা বাড়ল।

পার্কে দেখা করার সময় বাড়ল।

কখনো তারা একসঙ্গে চা খেতে যেত।

কখনো পার্কের পাশের রাস্তা ধরে হাঁটত।

একদিন ইরা বলল,

“আপনি জানেন, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”

“কী?”

“আপনি প্রথম দিন থেকে খুব অদ্ভুত।”

“কীভাবে?”

“প্রথম দিন অপরিচিত একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, সে প্রতিদিন পার্কে আসে কি না।”

প্রীতম হাসল।

“তারপর?”

“তারপর নিজেই প্রতিদিন আসা শুরু করলেন।”

“আপনি তো আসেন।”

“আমি তো আগে থেকেই আসতাম।”

“তাহলে আমি আসি আপনার জন্য।”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর মৃদু গলায় বলল,

“আমি বুঝি।”

সেদিন বিকেলে আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হলো।

পার্কের মানুষজন দ্রুত চলে যেতে লাগল।

ইরা আর প্রীতমও গেটের দিকে হাঁটছিল।

হঠাৎ বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।

ইরার হাতে ছোট একটা ছাতা ছিল।

প্রীতম তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“ছাতাটা একটু এদিকে ধরুন।”

ইরা ছাতাটা একটু এগিয়ে দিল।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।

ইরা বলল,

“আজ মনে হয় অনেকক্ষণ এখানে আটকে থাকতে হবে।”

প্রীতম বলল,

“আমার আপত্তি নেই।”

“কেন?”

“আপনার সঙ্গে থাকলে সময় দ্রুত চলে যায়।”

ইরা তার দিকে তাকাল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।

বৃষ্টির শব্দের মধ্যে চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

প্রীতম ধীরে বলল,

“ইরা।”

“হুম?”

“আমি একটা কথা বলব?”

“বলুন।”

“আমি মনে হয় আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”

ইরা স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে বিস্ময় ছিল, লজ্জা ছিল, আবার এক ধরনের শান্তিও ছিল।

কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরে মাথা নিচু করল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

“আমিও।”

প্রীতমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন তাদের ভালোবাসার কোনো বড় ঘোষণা ছিল না।

কোনো ফুল ছিল না।

কোনো বিশেষ আয়োজনও ছিল না।

ছিল শুধু বৃষ্টিভেজা একটা সন্ধ্যা আর দুজন মানুষের সত্যি কথা।
ইরা আর প্রীতমের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে আরও গভীর হতে লাগল।

আগে তারা শুধু পার্কে দেখা করত। এখন ফোনে দীর্ঘ সময় কথা বলত, ছুটির দিনে একসঙ্গে ঘুরতে যেত, কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খেত।

তাদের জীবনে খুব বড় কোনো ঘটনা ঘটছিল না, কিন্তু ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন তাদের কাছে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল।

একদিন বিকেলে ইরা বলল,

“প্রীতম, তোমার গ্রামের বাড়ি কোথায়?”

“কুষ্টিয়ার দিকে।”

“অনেক দূর?”

“ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টা।”

“তুমি কি নিয়মিত যাও?”

“মা থাকেন। সুযোগ পেলেই যাই।”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমি কি তোমার গ্রামের বাড়ি দেখতে যেতে পারি?”

প্রীতম অবাক হয়ে তাকাল।

“আমার গ্রামের বাড়ি?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু কেন?”

“তোমার শৈশবটা দেখতে ইচ্ছে করছে।”

প্রীতম হেসে বলল,

“তাহলে একদিন নিয়ে যাব।”

“কবে?”

“এই সপ্তাহেই।”

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তারা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে গাড়ি যখন গ্রামের রাস্তায় ঢুকল, ইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল।

সবুজ মাঠ, গাছের সারি, পুকুর, ছোট ছোট বাড়ি—সবকিছু যেন ঢাকার জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

ইরা বলল,

“তোমার ছোটবেলা এখানে কেটেছে?”

“হ্যাঁ।”

“তাই বুঝি তুমি এত শান্ত?”

প্রীতম হেসে বলল,

“আমি শান্ত?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি আমাকে রাগতে দেখেননি।”

“রাগলে কী করো?”

“চুপ করে থাকি।”

ইরা হাসল।

“তাহলে তুমি আসলেই শান্ত।”

বাড়িতে পৌঁছাতেই প্রীতমের মা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।

প্রীতম বলল,

“মা, এ ইরা।”

ইরা সালাম করল।

“কেমন আছেন?”

প্রীতমের মা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে বললেন,

“ভালো আছি মা। ভেতরে এসো।”

ইরা ভেবেছিল, হয়তো তাকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন করা হবে।

কিন্তু তার বদলে প্রীতমের মা প্রথম দেখাতেই তাকে খুব আপন করে নিলেন।

দুপুরে রান্নাঘরে ইরাকে পাশে বসিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।

“মা, তুমি কী খেতে ভালোবাসো?”

“মাছ।”

“তাহলে আজ মাছ রান্না করব।”

ইরা হেসে বলল,

“আমি রান্নায় সাহায্য করি?”

“না না, তুমি অতিথি।”

পাশ থেকে প্রীতম বলল,

“মা, আমি এত বছর ধরে ছেলে হয়েও কোনোদিন এত আদর পাইনি।”

মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“তুই তো আমার ছেলে। আর ও তো আজ প্রথম এসেছে।”

ইরা হেসে ফেলল।

বিকেলে উঠানে বসে চা খাওয়ার সময় প্রীতমের মা ইরার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি প্রীতমকে ভালোবাসো?”

ইরা একটু লজ্জা পেল।

তারপর ধীরে বলল,

“জি।”

মা মৃদু হেসে বললেন,

“তাহলে একটা কথা মনে রেখো। ও বাইরে থেকে শক্ত মনে হলেও ভেতরে খুব সহজ মানুষ।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“আমি বুঝি।”

মা বললেন,

“তোমাকে দেখে আমার ভালো লাগছে।”

প্রীতম দূর থেকে সব শুনছিল।

তার মনে হচ্ছিল, সবকিছু যেন খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু সে জানত না, সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন সময়।

ঢাকায় ফিরে ইরা একদিন সাহস করে বাবার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা বলল।

সন্ধ্যায় সবাই বসার ঘরে বসে ছিল।

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল,

“বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা বলব?”

বাবা খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে তাকালেন।

“বল।”

“আমি একজনকে ভালোবাসি।”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

“কে?”

“প্রীতম।”

“কী করে?”

“সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।”

“কোথায় থাকে?”

ইরা সব বলল।

বাবা মন দিয়ে শুনলেন।

তারপর বললেন,

“না।”

ইরা যেন প্রস্তুতই ছিল না এই উত্তরের জন্য।

“কেন?”

“আমি যা শুনেছি, তাতে এই সম্পর্ক তোমার জন্য ঠিক হবে না।”

“কিন্তু আপনি তো ওর সঙ্গে কথা বলেননি।”

“কথা বলার দরকার নেই।”

ইরার গলা কেঁপে উঠল।

“আপনি শুধু শুনেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন?”

“আমি তোমার বাবা। তোমার ভালো আমি বুঝি।”

“কিন্তু আমার ভালোটা কি আমি বুঝি না?”

বাবা কঠিন গলায় বললেন,

“তুমি এখন আবেগের মধ্যে আছ। কিছুদিন পর সব বুঝতে পারবে।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“না বাবা। আমি অনেক ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

“তুমি ওর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করবে না।”

ইরা কিছুক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

“আমি ওকে ভালোবাসি।”

বাবা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

“এই বিষয়ে আর কোনো কথা হবে না।”

সেদিন রাতেই ইরার ফোন নিয়ে নেওয়া হলো।

প্রীতম প্রথমে বুঝতেই পারল না কী হয়েছে।

সে ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

আবার করল।

বন্ধ।

মেসেজ পাঠাল।

কোনো উত্তর নেই।

প্রথম দিন সে ভাবল, হয়তো ইরা ব্যস্ত।

দ্বিতীয় দিন উদ্বেগ শুরু হলো।

তৃতীয় দিন সে ইরার স্কুলে গেল।

জানতে পারল, ইরা কয়েকদিনের ছুটিতে আছে।

প্রীতমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে ইরার বাড়ির সামনে যাওয়ার কথা ভাবল।

কিন্তু নিজেকে থামিয়ে দিল।

এভাবে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

দিন কেটে গেল।

এক সপ্তাহ।

দুই সপ্তাহ।

তিন সপ্তাহ।

ইরার কোনো খবর নেই।

প্রীতম প্রতিদিন সকালে পার্কে যেত।

সেই পুরোনো বেঞ্চে বসে থাকত।

যে বেঞ্চে প্রথম ইরাকে দেখেছিল।

তার হাতে এখন ‘শেষের কবিতা’ বইটা থাকত।

কিন্তু বইয়ের পাতায় চোখ পড়ত না।

সে শুধু রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত।

হয়তো ইরা হঠাৎ এসে বলবে,

“এত চিন্তা করছেন কেন?”

কিন্তু কেউ আসত না।

একদিন সন্ধ্যায় প্রীতম গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাছে সব বলল।

মা চুপ করে শুনলেন।

তারপর বললেন,

“তুই কি ওকে ছেড়ে দিবি?”

প্রীতম মাথা নাড়ল।

“না।”

“তাহলে?”

“অপেক্ষা করব।”

মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

“ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্য ধরতে হয়।”

প্রীতম মায়ের দিকে তাকাল।

“কিন্তু যদি ওকে আর কখনো না পাই?”

মা বললেন,

“তাহলে অন্তত তুই জানবি, তুই চেষ্টা করেছিলি।”

প্রীতম কিছু বলল না।

মা আরও বললেন,

“আর একটা কথা মনে রাখিস। কোনো সিদ্ধান্ত নিলে যেন ইরার সম্মতি আর নিরাপত্তার কথা আগে ভাবিস।”

প্রীতম মাথা নাড়ল।

“আমি বুঝেছি।”

এক মাস কেটে গেল।

এক মাস ধরে প্রীতম যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল, কিন্তু ভেতর থেকে সে প্রতিদিন ইরাকেই খুঁজছিল।

ঠিক এক মাস পর, এক সন্ধ্যায় তার ফোন বেজে উঠল।

অচেনা একটি নম্বর।

প্রীতম ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

“প্রীতম?”

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“ইরা?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ইরা বলল,

“আমি রাজশাহীতে আছি।”

প্রীতম উঠে দাঁড়াল।

“তুমি ঠিক আছ?”

“হ্যাঁ।”

“কীভাবে গেলে?”

“এক আত্মীয়ের বাসায় আছি।”

“তুমি আমাকে ফোন করলে কীভাবে?”

“অনেক কষ্টে একটা ফোন পেয়েছি।”

প্রীতমের গলা ভারী হয়ে গেল।

“তুমি কি বাড়ি ফিরবে?”

ইরা ধীরে বলল,

“আমি জানি না।”

“তাহলে?”

“তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

“কোথায়?”

ইরা রাজশাহীর একটি ঠিকানা বলল।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তুমি কি আসবে?”

প্রীতম এক মুহূর্তও দেরি করল না।

“আমি আসছি।”

ফোন রেখে সে মায়ের কাছে গেল।

সব শুনে মা বললেন,

“যা। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালো করে কথা বলিস।”

প্রীতম মাথা নাড়ল।

সেই রাতেই সে রাজশাহীর বাসের টিকিট করল।

ব্যাগ গোছাতে গোছাতে তার মনে হচ্ছিল, এক মাসের অপেক্ষার পর অবশেষে সে ইরার কাছে যাচ্ছে।

সারারাত বাস চলল।

জানালার বাইরে অন্ধকার রাস্তা, মাঝেমধ্যে দূরের কোনো দোকানের আলো, আবার দীর্ঘ নীরবতা। কিন্তু প্রীতমের চোখে ঘুম ছিল না।

এক মাস পর ইরার সঙ্গে দেখা হবে—এই ভাবনাটাই তার ভেতরটা অস্থির করে তুলেছিল।

ইরা ফোনে শুধু বলেছিল, “রাজশাহীতে আসো।”

কিন্তু কেন ডেকেছে, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার কিছুই বলেনি।

প্রীতম শুধু জানত, ইরার পাশে দাঁড়ানো দরকার।

ভোরের দিকে বাস রাজশাহীতে পৌঁছাল।

বাস থেকে নেমেই সে ইরাকে ফোন করল।

কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে ইরার কণ্ঠ শোনা গেল,

“তুমি এসে গেছ?”

“হ্যাঁ। তুমি কোথায়?”

“একটু অপেক্ষা করো। আমি আসছি।”

প্রীতম বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ইরাকে দেখা গেল।

এক মাস পর তাকে দেখে প্রীতমের বুকটা কেমন করে উঠল।

ইরার মুখে ক্লান্তির ছাপ। চোখের নিচে কালো দাগ। আগের চেয়ে যেন অনেক শান্ত হয়ে গেছে সে।

প্রীতম কাছে যেতেই বলল,

“তুমি কেমন আছ?”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“এখন ভালো আছি।”

“বাড়িতে কী হয়েছে?”

“অনেক কিছু।”

প্রীতম কিছু বলতে যাচ্ছিল।

ইরা থামিয়ে বলল,

“আগে কোথাও বসি। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।”

দুজন কাছের একটি শান্ত জায়গায় গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত ইরাই নীরবতা ভাঙল।

“প্রীতম, গত এক মাসে আমি অনেক ভেবেছি।”

“কী ভেবেছ?”

“আমাদের কথা।”

প্রীতম চুপ করে রইল।

ইরা ধীরে বলল,

“বাবা এখনও আমাদের সম্পর্ক মেনে নেননি।”

“আমি জানি।”

“তিনি চান আমি এই সম্পর্ক ভুলে যাই।”

“তুমি কী চাও?”

ইরা তার দিকে তাকাল।

“আমি তোমাকে ভুলতে চাই না।”

প্রীতমের চোখ ভিজে উঠল।

“তুমি নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু তোমার পরিবার?”

ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি বাবাকে খুব ভালোবাসি। তার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু নিজের জীবনটা মিথ্যা করে বাঁচতেও পারব না।”

প্রীতম ধীরে বলল,

“তাহলে কী করবে?”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”

প্রীতম অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

“এখন?”

“হ্যাঁ।”

“ইরা, তুমি কি ভেবে দেখেছ? এটা খুব বড় সিদ্ধান্ত।”

“আমি জানি।”

“শুধু বাবার ওপর রাগ করে যেন সিদ্ধান্তটা না নাও।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“আমি রাগ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। আমি এক মাস ধরে তোমার কাছ থেকে দূরে ছিলাম। সেই সময়টাতে বুঝেছি, আমি তোমাকে ছাড়া জীবনটা কল্পনাই করতে পারি না।”

প্রীতম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু আমি চাই না, একদিন তুমি মনে করো, আমি তোমাকে পরিবারের কাছ থেকে দূরে নিয়ে গেছি।”

ইরা বলল,

“তুমি আমাকে দূরে নিয়ে যাচ্ছ না। আমি নিজেই তোমার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”

প্রীতম তার হাত ধরল।

“তাহলে একটা কথা দাও।”

“কী?”

“যে কোনো পরিস্থিতিতে তুমি নিজের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেবে। কেউ তোমাকে জোর করবে না।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“কথা দিলাম।”

প্রীতম তখনই তার মাকে ফোন করল।

সব শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“তুই কি ওকে ভালোবাসিস?”

“হ্যাঁ।”

“ও কি তোকে ভালোবাসে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে ওকে একা রেখে আসিস না।”

প্রীতমের চোখ ভিজে উঠল।

“মা, তুমি রাজি?”

“তুই যদি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকিস, আমি কেন রাজি হব না?”

“ধন্যবাদ, মা।”

“তবে একটা কথা মনে রাখিস। ইরার বাবার জায়গাটাও বুঝতে হবে। আজ তিনি রাগ করছেন, কিন্তু একদিন হয়তো সব বুঝবেন।”

প্রীতম বলল,

“আমি অপেক্ষা করব।”

সেদিনই কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে খবর দেওয়া হলো।

প্রীতমের মা রাজশাহীতে চলে এলেন।

বিয়ের আয়োজন ছিল খুবই ছোট।

কোনো বড় অনুষ্ঠান নয়।

কোনো বিশাল অতিথির তালিকাও নয়।

শুধু কয়েকজন কাছের বন্ধু, প্রীতমের মা এবং তারা দুজন।

বিয়ের আগে ইরা একা বসে ছিল।

প্রীতম কাছে এসে দেখল, তার চোখে পানি।

সে পাশে বসে বলল,

“কাঁদছ কেন?”

ইরা চোখ মুছে বলল,

“বাবার কথা মনে পড়ছে।”

প্রীতম কিছু বলল না।

ইরা ধীরে বলল,

“জানো, ছোটবেলায় আমি কোথাও গেলে বাবা আমার হাত ধরে রাখতেন। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দিনে সেই মানুষটা পাশে নেই।”

প্রীতম বলল,

“আজ নেই। কিন্তু সবসময় থাকবে না—এটা কে বলেছে?”

ইরা তার দিকে তাকাল।

“তুমি সত্যিই বিশ্বাস করো, বাবা একদিন আমাদের মেনে নেবেন?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ তুমি তার মেয়ে। আর কোনো বাবা তার মেয়েকে চিরদিন দূরে রাখতে পারে না।”

ইরা চোখের পানি মুছে মৃদু হাসল।

“তুমি সবসময় এত আশাবাদী কেন?”

“কারণ তুমি হতাশ হলে তোমাকে তো কাউকে আশা দেখাতে হবে।”

ইরা হেসে ফেলল।

তারপর তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।

খুব সাধারণভাবে বিয়ে সম্পন্ন হলো।

কোনো জাঁকজমক ছিল না।

কিন্তু প্রীতমের কাছে সেই মুহূর্ত ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

বিয়ের পর প্রীতমের মা ইরার মাথায় হাত রেখে বললেন,

“আজ থেকে তুমি আমার মেয়েও।”

ইরার চোখ ভিজে উঠল।

সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“মা, আমি আপনাকে কখনো কষ্ট দিতে চাই না।”

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“সংসারে সুখ-দুঃখ দুটোই থাকবে। শুধু একে অপরের হাত ছেড়ো না।”

ইরা মাথা নাড়ল।

প্রীতম একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল।

তার বুকের ভেতরটা ভরে গেল।

সেই রাতে বিয়ের সব ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর প্রীতম আর ইরা কিছুক্ষণ পাশাপাশি বসে ছিল।

ইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

“আমরা সত্যিই বিয়ে করে ফেললাম?”

প্রীতম হেসে বলল,

“হ্যাঁ।”

“সবকিছু এত দ্রুত হয়ে গেল।”

“তুমি ভয় পাচ্ছ?”

“একটু।”

“আমিও।”

ইরা অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি?”

“হ্যাঁ। কারণ এখন তোমার দায়িত্ব আমার।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“শুধু আমার?”

“না। আমার দায়িত্বও তোমার।”

“তাহলে ঠিক আছে।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

পরদিন তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

মিরপুরের ছোট্ট ফ্ল্যাটে পৌঁছে ইরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল।

প্রীতম বলল,

“এই হলো আমাদের নতুন সংসার।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“খুব সুন্দর।”

“ফ্ল্যাটটা ছোট।”

“সংসার তো ঘরের আকারে বড় হয় না।”

প্রীতম তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তুমি জানো, তোমাকে নিয়ে আমার সবচেয়ে বেশি ভয় কী?”

“কী?”

“আমি তোমাকে সুখী রাখতে পারব তো?”

ইরা ধীরে তার হাত ধরল।

“তুমি চেষ্টা করবে—এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।”

সেই দিন থেকেই তাদের নতুন জীবন শুরু হলো।

সকালে প্রীতম অফিসে যায়।

ইরা স্কুলে যায়।

সন্ধ্যায় দুজন একসঙ্গে বসে চা খায়।

কখনো রান্না নিয়ে ঝগড়া হয়।

কখনো কে আগে গোসল করবে সেটা নিয়েও মজা করে তর্ক হয়।

কখনো রাত জেগে দুজন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে।

ইরা বলত,

“আমাদের একটা ছোট্ট ঘর হবে, জানালার পাশে অনেক গাছ থাকবে।”

প্রীতম বলত,

“আর একটা বড় বুকশেলফ।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বইয়ের জন্য।”

“শুধু আমার?”

“না। এখন থেকে আমারও।”

ইরা হেসে বলত,

“শেষের কবিতা পড়ার পর তুমি সত্যিই বদলে গেছ।”

প্রীতম বলত,

“বইটা না থাকলে হয়তো তোমাকেও পেতাম না।”

কয়েক মাস এভাবেই কেটে গেল।

তাদের ছোট্ট সংসারে অভাব ছিল না ভালোবাসার।

তবে একটা জায়গা খালি ছিল।

ইরার বাবার সঙ্গে সম্পর্কের জায়গা।

কখনো ইরা ফোন হাতে নিয়ে বাবার নম্বরের দিকে তাকিয়ে থাকত।

ফোন করার সাহস পেত না।

প্রীতম তাকে জোর করত না।

শুধু বলত,

“সময় দাও।”

ইরা বলত,

“তুমি কি মনে করো, বাবা আমাদের ক্ষমা করবেন?”

প্রীতম বলত,

“একদিন।”

“কখন?”

“যেদিন তিনি বুঝবেন, আমরা ভুল কিছু করিনি।”

ইরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসত।

সে জানত না, সেই দিন কবে আসবে।

কিন্তু তার পাশে এমন একজন মানুষ ছিল, যে তাকে একা হতে দেয়নি।

আর সেই ছোট্ট সংসারে খুব শিগগিরই এমন একটি খবর আসতে চলেছিল, যা তাদের জীবনের সব আনন্দকে আরও বড় করে দেবে।

এক সন্ধ্যায় ইরা প্রীতমকে ডাকল।

“প্রীতম?”

“হুম?”

“তোমাকে একটা কথা বলব।”

“কী?”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“আমাদের সংসারে আরেকজন আসছে।”

প্রীতম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর অবিশ্বাসের চোখে তাকাল ইরার দিকে।

“সত্যি?”

ইরা মাথা নাড়ল।

প্রীতমের মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

সে ইরার হাত ধরে বলল,

“আমরা বাবা-মা হতে যাচ্ছি?”

ইরা হেসে বলল,

“হ্যাঁ।”

প্রীতমের চোখ ভিজে উঠল।

ইরা যখন প্রীতমকে জানাল, তাদের সংসারে নতুন একজন আসতে চলেছে, তখন কিছুক্ষণ প্রীতম যেন কথাই বলতে পারছিল না।

সে শুধু ইরার দিকে তাকিয়ে ছিল।

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”

প্রীতম ধীরে বলল,

“আমি বাবা হতে যাচ্ছি—এটা বিশ্বাস হচ্ছে না।”

ইরা হাসল।

“আমারও পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছে না।”

প্রীতম তার হাত ধরে বলল,

“তুমি কেমন অনুভব করছ?”

“ভয়ও লাগছে, আবার ভালোও লাগছে।”

“ভয় কেন?”

“সবকিছু ঠিকঠাক হবে তো?”

প্রীতম সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“হবে।”

“এত নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ। কারণ আমরা দুজন একসঙ্গে আছি।”

ইরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

সেদিন রাতে তারা অনেকক্ষণ ধরে ভবিষ্যতের কথা বলল।

বাচ্চা ছেলে হবে নাকি মেয়ে—সেটা নিয়ে মজা করল।

ইরা বলল,

“আমার একটা মেয়ে হলে ভালো লাগবে।”

প্রীতম বলল,

“কেন?”

“মেয়েকে আমি নিজের মতো করে বড় করব।”

“আর ছেলে হলে?”

“তাহলেও ভালোবাসব।”

প্রীতম হেসে বলল,

“তাহলে আমি চাই, ও যেই হোক, তোমার মতো হোক।”

ইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“না। তোমার মতো হোক।”

“আমার মতো হলে তো সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে থাকবে।”

“তাহলে আমার মতো হোক।”

“তুমি তো সারাদিন বই পড়াবে।”

দুজনেই হেসে উঠল।

সেই সময়টায় ইরার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল তার বাবা।

নিজের জীবনে এত বড় একটা পরিবর্তন আসছে, অথচ বাবা জানেন না।

কখনো কখনো রাতে ঘুমানোর আগে ইরা চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত।

প্রীতম বুঝতে পারত।

এক রাতে সে জিজ্ঞেস করল,

“বাবার কথা মনে পড়ছে?”

ইরা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“ফোন করবে?”

“সাহস হয় না।”

“কেন?”

“যদি ফোন কেটে দেন?”

প্রীতম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তাহলে আবার ফোন করবে।”

ইরা অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি রাগ করবে না?”

“কেন রাগ করব?”

“তোমার জন্যই তো বাবা আমার ওপর রাগ করেছেন।”

প্রীতম ধীরে বলল,

“ইরা, তোমার বাবার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্কের মতো নয়। আমি চাই না আমার জন্য তুমি বাবাকে হারাও।”

ইরার চোখে পানি চলে এল।

“তুমি এত সহজভাবে বলো কীভাবে?”

“কারণ আমি জানি, বাবা-মাকে হারানোর কষ্ট কী।”

ইরা কিছু বলল না।

শুধু প্রীতমের হাতটা ধরে রাখল।

এরপর দিনগুলো একটু একটু করে এগোতে লাগল।

ইরার শরীরেও পরিবর্তন আসতে শুরু করল।

প্রীতম তার প্রতি আরও যত্নশীল হয়ে উঠল।

আগে অফিস থেকে ফিরে সে ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে থাকত। এখন বাসায় ঢুকেই প্রথমে ইরাকে খুঁজত।

“খেয়েছ?”

“হ্যাঁ।”

“ওষুধ?”

“হ্যাঁ।”

“বিশ্রাম নিয়েছ?”

ইরা হেসে বলত,

“তুমি কি আমার স্বামী, নাকি ডাক্তার?”

প্রীতম বলত,

“দুটোই।”

“ডাক্তার না হয়েও?”

“তোমার ক্ষেত্রে আমি সব পারি।”

ইরা হাসত।

একদিন ইরা স্কুল থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে পড়ল।

প্রীতম অফিসে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, সে যেন বেশি কাজ না করে।

কিন্তু ইরা স্কুলের কিছু কাগজপত্র নিয়ে বসেছিল।

প্রীতম অফিস থেকে ফিরে কাগজগুলো দেখে বলল,

“এগুলো এখনই করতে হবে?”

“কাল জমা দিতে হবে।”

“তাহলে আমি সাহায্য করি।”

“তুমি পারবে?”

“কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার সব পারে।”

ইরা হেসে বলল,

“তুমি আবার শুরু করলে।”

প্রীতম তার পাশে বসে কাজ করতে লাগল।

সেই ছোট্ট ঘরে দুজন পাশাপাশি বসে কাজ করছিল।

মাঝেমধ্যে ইরা তাকে নির্দেশ দিচ্ছিল।

প্রীতম ভুল করলে ইরা হাসছিল।

সাধারণ একটা সন্ধ্যা।

কিন্তু তাদের কাছে সেটাই ছিল সুখ।

কয়েকদিন পর প্রীতম ইরাকে নিয়ে তার মায়ের কাছে গ্রামের বাড়িতে গেল।

মাকে খবরটা দেওয়ার পর তিনি এতটাই খুশি হলেন যে, সঙ্গে সঙ্গে ইরাকে জড়িয়ে ধরলেন।

“সত্যি মা?”

ইরা লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ল।

“জি।”

মায়ের চোখে আনন্দের পানি এসে গেল।

“আল্লাহ তোমাদের সুখী রাখুক।”

প্রীতম মজা করে বলল,

“মা, আমাকে অভিনন্দন দেবে না?”

মা বললেন,

“তুই তো বাবা হওয়ার কাজ করেছিস। এখন আসল কাজ হলো বাচ্চার মাকে ভালো রাখা।”

ইরা হেসে ফেলল।

প্রীতম বলল,

“মা, তুমি সবসময় ইরার পক্ষ নাও।”

“কারণ ও আমার মেয়ে।”

ইরা মায়ের হাত ধরে বলল,

“আপনি আমাকে এত ভালোবাসেন কেন?”

মা বললেন,

“তুই আমার ছেলের জীবনে সুখ এনেছিস। তোর জন্য আমার কাছে কৃতজ্ঞ হওয়ার কথা।”

ইরার চোখ ভিজে উঠল।

সে মনে মনে ভাবল, যদি তার নিজের বাবাও একদিন এমন করে তাকে কাছে টেনে নিতেন!

সেদিন রাতে গ্রামের বাড়ির বারান্দায় বসে ইরা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

প্রীতম পাশে এসে দাঁড়াল।

“আবার বাবার কথা?”

ইরা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“তুমি চাইলে কাল ফোন করতে পারো।”

“ভয় লাগে।”

“আমি পাশে থাকব।”

ইরা ফোনটা হাতে নিল।

অনেকক্ষণ নম্বরটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

শেষ পর্যন্ত কল করল না।

“আজ পারলাম না।”

প্রীতম বলল,

“কোনো সমস্যা নেই। কাল করবে।”

কিন্তু পরদিনও সে ফোন করতে পারল না।

এভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

অন্যদিকে ইরার বাবা বাইরে থেকে কঠোর থাকলেও ভেতরে ভেতরে মেয়েকে খুব মিস করতেন।

তিনি প্রায়ই ইরার পুরোনো ছবিগুলো দেখতেন।

কখনো তার ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন।

একদিন ইরার মা বললেন,

“মেয়েটার সঙ্গে কথা বলবে না?”

তিনি কঠিন গলায় বললেন,

“সে তো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

“তবুও সে তোমার মেয়ে।”

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

কিন্তু সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারলেন না।

তার মনে পড়ল ছোট্ট ইরার কথা।

বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা।

অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকার কথা।

প্রথমবার কলেজে যাওয়ার দিন মেয়ের চোখের পানি।

সবকিছু মনে পড়তে লাগল।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, রাগ করে থাকলেও মেয়ের প্রতি তার ভালোবাসা কমেনি।

কিন্তু অহংকার তাকে এখনও আটকে রেখেছিল।

এদিকে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল।

একদিন সকালে ইরা হঠাৎ প্রীতমকে বলল,

“আমার মনে হয় বাচ্চাটা নড়ছে।”

প্রীতম সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে বসে পড়ল।

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“আমি বুঝতে পারব?”

ইরা তার হাত নিজের পেটের ওপর রাখল।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর খুব হালকা একটা নড়াচড়া অনুভূত হলো।

প্রীতমের চোখ বড় হয়ে গেল।

“আমি বুঝেছি!”

ইরা হেসে বলল,

“সত্যি?”

“হ্যাঁ!”

তার চোখে আনন্দের ঝিলিক।

সে ধীরে বলল,

“আমাদের বাচ্চা।”

ইরা মাথা তার কাঁধে রাখল।

“হ্যাঁ।”

সেই মুহূর্তে তাদের সব কষ্ট যেন দূরে সরে গেল।

তাদের মনে হলো, পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর কিছু হয় না।

প্রীতম বলল,

“আমাদের বাচ্চার নাম কী রাখব?”

ইরা বলল,

“মেয়ে হলে?”

“তুমি ঠিক করবে।”

“অনন্যা কেমন?”

প্রীতম একটু ভেবে বলল,

“অনন্যা... খুব সুন্দর।”

ইরা হেসে বলল,

“তাহলে মেয়ে হলে অনন্যা।”

“আর ছেলে?”

ইরা বলল,

“সেটা তুমি ঠিক করবে।”

প্রীতম হেসে বলল,

“তাহলে আগে মেয়ে আসুক।”

ইরা বলল,

“তুমি এত নিশ্চিত কেন?”

“আমার মনে হচ্ছে আমাদের একটা মেয়ে হবে।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“দেখা যাক।”

কয়েক মাস পর সেই অপেক্ষার দিনও এসে গেল।

হাসপাতালের করিডোরে প্রীতম অস্থির হয়ে হাঁটছিল।

তার মা পাশে বসে দোয়া করছিলেন।

অনেকক্ষণ পর ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এল।

প্রীতম থমকে দাঁড়াল।

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বাইরে এসে হাসিমুখে বললেন,

“অভিনন্দন। মা আর বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে।”

প্রীতমের চোখে সঙ্গে সঙ্গে পানি চলে এল।

“মেয়ে?”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ, মেয়ে।”

প্রীতম চোখ বন্ধ করে একবার গভীর শ্বাস নিল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

“অনন্যা।”

কিছুক্ষণ পর তাকে ইরার কাছে যেতে দেওয়া হলো।

ইরা ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকাল।

প্রীতম কাছে গিয়ে বলল,

“কেমন আছ?”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“ভালো।”

প্রীতম ছোট্ট শিশুটার দিকে তাকাল।

“আমাদের অনন্যা।”

ইরা চোখ বন্ধ করে হাসল।

“হ্যাঁ।”

প্রীতম মেয়ের ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলে ধরল।

সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, জীবনে সে যা কিছু পেয়েছে, তার মধ্যে এই ছোট্ট মানুষটিই সবচেয়ে বড় পাওয়া।

কিন্তু তাদের আনন্দের মাঝেও একটা শূন্যতা ছিল।

ইরার বাবা এখনও তাদের জীবনের বাইরে।

প্রীতম শিশুটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

“একদিন তোমার নানাও তোমাকে কোলে নেবেন।”

অনন্যার জন্মের পর প্রীতম আর ইরার জীবন যেন একেবারে বদলে গেল।

আগে তাদের সকাল শুরু হতো দুজনের গল্প দিয়ে। এখন সকাল শুরু হয় অনন্যার কান্না, হাসি আর ছোট্ট ছোট্ট শব্দে।

রাতের ঘুমও আগের মতো নেই।

অনন্যা একটু কেঁদে উঠলেই ইরা উঠে বসে।

প্রীতমও সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে যায়।

“তুমি শুয়ে থাকো, আমি দেখি।”

ইরা ক্লান্ত গলায় বলে,

“না, তুমি তো সকালে অফিসে যাবে।”

“তুমি সারারাত জেগেছ। এখন আমি একটু সামলাই।”

ইরা তাকিয়ে মৃদু হাসে।

“তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?”

প্রীতম হেসে বলে,

“আমিও জানি না তুমি না থাকলে আমি কী করতাম।”

তাদের ছোট্ট ঘরটা এখন অনন্যার জিনিসে ভরে গেছে।

ছোট ছোট জামা।

খেলনা।

বিছানার পাশে শিশুর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

দেয়ালে টাঙানো কয়েকটা ছবি।

প্রীতম অফিস থেকে ফিরলেই প্রথমে মেয়ের কাছে যায়।

“আমার রাজকন্যা কোথায়?”

অনন্যা তখন বাবার কণ্ঠ শুনে হাত-পা নাড়তে থাকে।

ইরা দূর থেকে বলে,

“ও তোমার গলা চিনে ফেলেছে।”

প্রীতম মেয়েকে কোলে তুলে নেয়।

“অবশ্যই চিনবে। আমি ওর বাবা।”

ইরা হাসে।

“বাবা হওয়ার পর তোমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।”

“কেন?”

“আগে তো এত কথা বলতে না।”

“আগে শ্রোতা ছিল না।”

“এখন?”

“এখন দুজন শ্রোতা। তুমি আর অনন্যা।”

ইরা হেসে ফেলে।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের সংসারকে পূর্ণ করে তুলেছিল।

তবে অনন্যার জন্মের পর ইরার মনে একটা ইচ্ছা আরও প্রবল হয়ে উঠল।

সে বাবাকে মেয়ের কথা জানাতে চেয়েছিল।

একদিন বিকেলে অনন্যাকে কোলে নিয়ে জানালার পাশে বসে ছিল ইরা।

প্রীতম অফিস থেকে ফিরে এসে দেখল, ইরা চুপচাপ।

“কী হয়েছে?”

ইরা বলল,

“আজ বাবাকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে।”

প্রীতম কিছু না বলে তার পাশে বসে পড়ল।

“করো।”

“যদি ফোন না ধরেন?”

“তাহলে আবার করবে।”

“যদি রাগ করেন?”

“তাহলে রাগটা শুনবে।”

ইরা তার দিকে তাকাল।

“তুমি এত সহজে সবকিছু বলো কীভাবে?”

প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“কারণ আমি জানি, তোমার বাবা যতই রাগ করে থাকুন, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন।”

ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি চাই, বাবা অনন্যাকে একবার দেখুক।”

“আমিও চাই।”

“তুমি সত্যিই কষ্ট পাওনি?”

“কিসের জন্য?”

“আমাদের বিয়েতে উনি ছিলেন না।”

প্রীতম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“কষ্ট পেয়েছিলাম।”

ইরা মাথা নিচু করল।

“কিন্তু আমি চাই না সেই কষ্টটা সারাজীবন থাকুক।”

“কেন?”

“কারণ এখন আমাদের একটা মেয়ে আছে। ও যেন কোনো অভিমান নিয়ে বড় না হয়।”

ইরার চোখে পানি এসে গেল।

সে অনন্যাকে আরও কাছে টেনে নিল।

সেদিন রাতে অনেক সাহস করে ইরা বাবার নম্বরে ফোন করল।

ফোন অনেকক্ষণ বাজল।

কেউ ধরল না।

ইরা ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার চোখে পানি।

প্রীতম পাশে এসে বলল,

“হয়তো এখনো সময় হয়নি।”

ইরা বলল,

“আমি শুধু চেয়েছিলাম বাবা একবার বলুক, ‘কেমন আছিস?’”

প্রীতম তার হাত ধরল।

“একদিন বলবেন।”

কয়েকদিন পর আবার ফোন করা হলো।

এবারও উত্তর নেই।

ইরা আর ফোন করল না।

কিন্তু প্রীতম হাল ছাড়ল না।

একদিন সে ইরার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল।

কিছুদিন পর অবশেষে কথা হলো।

ইরার মা প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন,

“ইরা কেমন আছে?”

“ভালো আছে।”

“বাচ্চা?”

“মেয়েটাও ভালো।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর তিনি ধীরে বললেন,

“মেয়েটার নাম কী রেখেছ?”

“অনন্যা।”

ইরার মা মৃদু হেসে বললেন,

“সুন্দর নাম।”

প্রীতম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আপনি কি... একদিন ওকে দেখতে আসবেন?”

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

“আমি আসতে চাই।”

প্রীতমের বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে গেল।

“তাহলে আসুন।”

“কিন্তু ওর বাবা...”

প্রীতম বুঝতে পারল।

“আমি জানি।”

“উনি এখনও খুব জেদ করে আছেন।”

প্রীতম শান্ত গলায় বলল,

“সময় দিন।”

ইরার মা বললেন,

“তোমার ওপরও অনেক রাগ ছিল।”

“আমি জানি।”

“তবুও তুমি ইরাকে ভালো রেখেছ।”

প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“ইরা আমাকে ভালো রেখেছে।”

কয়েকদিন পর ইরার মা একাই তাদের বাসায় এলেন।

ইরা দরজা খুলে মাকে দেখে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তারপর চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে মাকে জড়িয়ে ধরল।

“মা...”

ইরার মা মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

“কেমন আছিস?”

“ভালো।”

“আমাকে ক্ষমা করিস।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“তুমি তো আমার বিরুদ্ধে ছিলে না।”

“তোর বাবার জন্য অনেক কিছু করতে পারিনি।”

“আমি জানি।”

ইরার মা অনন্যার দিকে তাকালেন।

ছোট্ট মেয়েটা তখন ঘুমাচ্ছিল।

তিনি ধীরে এগিয়ে গিয়ে তার কপালে হাত রাখলেন।

চোখের কোণে পানি জমে গেল।

“আমার নাতনি...”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“আপনার নাতনি।”

প্রীতম একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল।

তার মনে হলো, হয়তো বরফ একটু একটু করে গলছে।

কিছুক্ষণ পর ইরার মা বললেন,

“তোমার বাবার কাছে একটা ছবি নিয়ে যাব?”

ইরা অনন্যার কয়েকটি ছবি তার ফোনে পাঠিয়ে দিল।

“নিয়ে যাও।”

“হয়তো ছবি দেখলে মনটা নরম হবে।”

ইরা কিছু বলল না।

শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

সেদিন রাতে ইরার মা বাড়ি ফিরে স্বামীকে অনন্যার ছবি দেখালেন।

ইরার বাবা প্রথমে মুখ ফিরিয়ে বললেন,

“আমি এসব দেখতে চাই না।”

কিন্তু স্ত্রী ফোনটা তার সামনে রেখে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর কৌতূহল সামলাতে না পেরে তিনি ফোনটা হাতে নিলেন।

স্ক্রিনে ছোট্ট একটা শিশুর ছবি।

গোল মুখ।

বন্ধ চোখ।

ছোট্ট হাত।

তিনি অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

“নাম কী রেখেছে?”

স্ত্রী বললেন,

“অনন্যা।”

তিনি আর কিছু বললেন না।

কিন্তু সেদিন রাতে তিনি মেয়ের ঘরের দরজা খুলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ইরার ছোটবেলার একটা ছবি এখনও সেখানে ছিল।

ছবিতে ছোট্ট ইরা হাসছে।

হঠাৎ তার মনে হলো, সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজ মা হয়েছে।

তিনি বিছানায় বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“মেয়েটা কি আমাকে এতটাই ঘৃণা করে?”

তার স্ত্রী বললেন,

“ও তোমাকে ঘৃণা করে না।”

“তাহলে?”

“ও শুধু তোমার কাছ থেকে একটা কথা শুনতে চায়—‘বাড়ি ফিরে আয়।’”

তিনি চুপ করে রইলেন।

অন্যদিকে ইরা কিছুই জানত না।

সে অনন্যাকে ঘুম পাড়িয়ে প্রীতমের পাশে এসে বসেছিল।

“আজ মা এসেছিল, ভালো লেগেছে।”

“হুম।”

“বাবা কি ছবিটা দেখেছেন?”

“জানি না।”

ইরা ধীরে বলল,

“আমি চাই না অনন্যা বড় হয়ে শুনুক, তার নানার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।”

প্রীতম বলল,

“তা হবে না।”

“কীভাবে?”

“আমরা চেষ্টা করব।”

ইরা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“তুমি সবসময় এত আশাবাদী কেন?”

“কারণ তোমার হাসিটা আমার খুব দরকার।”

ইরা হেসে বলল,

“তাহলে আমি হাসব।”

কয়েক সপ্তাহ পর একদিন দুপুরে ইরা স্কুল থেকে ফিরছিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

সে ফোন ধরল।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ—

“ইরা?”

ইরা থমকে দাঁড়াল।

তার বুক কেঁপে উঠল।

“বাবা?”

ওপাশে তার বাবা।

অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন,

“কেমন আছিস?”

ইরার চোখে সঙ্গে সঙ্গে পানি চলে এল।

“ভালো আছি।”

“বাচ্চা কেমন?”

ইরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“ভালো।”

“মেয়েটা... আমাকে একবার দেখাবি?”

ইরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“হ্যাঁ বাবা।”

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

“আমি অনেক ভুল করেছি।”

ইরা চোখ মুছে বলল,

“বাবা...”

“তুই কি আমাকে ক্ষমা করেছিস?”

ইরা মৃদু কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আপনি তো আমার বাবা। আপনাকে কি কখনো ক্ষমা না করে থাকা যায়?”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর তিনি শুধু বললেন,

“আমি অনন্যাকে দেখতে চাই।”

ইরা চোখ বন্ধ করল।

এক মাসের অপেক্ষা।

বিয়ের সময়ের কষ্ট।

বাবাকে হারানোর ভয়।

সবকিছু যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।

সে ফোন রেখে সঙ্গে সঙ্গে প্রীতমকে কল করল।

“প্রীতম!”

“হ্যাঁ?”

“বাবা ফোন করেছে।”

প্রীতম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“কী বলেছেন?”

ইরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“তিনি অনন্যাকে দেখতে চান।”

প্রীতমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“আমি বলেছিলাম না, একদিন সব ঠিক হবে?”

ইরা বলল,

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এবার তোমার বাবাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসো।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“হ্যাঁ। এবার আমাদের পরিবারটা হয়তো সত্যিই পূর্ণ হবে।”

ইরার বাবার ফোন পাওয়ার পর থেকে তার মনটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল।

এক মাস ধরে যে কথাটা শোনার জন্য সে অপেক্ষা করছিল, অবশেষে সেই কথাই শুনেছে—

“আমি অনন্যাকে দেখতে চাই।”

ফোন রাখার পরও ইরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।

তার চোখে পানি, কিন্তু মুখে হাসি।

প্রীতম পাশে বসে বলল,

“কী ভাবছ?”

ইরা মৃদু গলায় বলল,

“বিশ্বাস হচ্ছে না।”

“কোনটা?”

“বাবা সত্যিই আমাদের সঙ্গে কথা বললেন।”

প্রীতম হাসল।

“আমি তো বলেছিলাম, রাগ চিরদিন থাকে না।”

ইরা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি না থাকলে হয়তো আমি এতদিনে ভেঙে পড়তাম।”

“আর তুমি না থাকলে আমি?”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“তুমি তো খুব শক্ত মানুষ।”

“একদম না।”

“তাহলে?”

“তোমার সামনে আমি খুব দুর্বল।”

ইরা হেসে ফেলল।

সেদিন রাতে তারা অনন্যাকে ঘুম পাড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল।

ইরা বলল,

“বাবা যখন আসবেন, তুমি কি তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবে?”

প্রীতম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“চেষ্টা করব।”

“তোমার কি এখনও কষ্ট আছে?”

“আছে।”

ইরা চুপ করে গেল।

প্রীতম তার হাত ধরে বলল,

“কিন্তু সেই কষ্ট ধরে রাখলে তো আমাদের কোনো লাভ নেই।”

“তুমি কি বাবাকে ক্ষমা করতে পারবে?”

“হ্যাঁ।”

“এত সহজে?”

“তোমার জন্য পারব।”

ইরার চোখ আবার ভিজে উঠল।

“তুমি জানো, তোমার এই কথাগুলো আমাকে আরও বেশি ভালোবাসতে বাধ্য করে।”

প্রীতম হেসে বলল,

“তাহলে আমি মাঝে মাঝে ভালো কথা বলব।”

“মাঝে মাঝে?”

“বেশি বললে দাম কমে যাবে।”

ইরা হাসতে হাসতে তার কাঁধে মাথা রাখল।

দুদিন পর ইরার বাবা তাদের বাসায় আসার কথা জানালেন।

সেদিন সকাল থেকেই ইরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

বাড়ি পরিষ্কার করল।

অনন্যার জন্য সুন্দর একটা জামা বের করল।

রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে শেখা কয়েকটা পদ রান্না করার চেষ্টা করল।

প্রীতম অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় থাকল।

সে ইরাকে দেখে বলল,

“তুমি এত চিন্তা করছ কেন?”

“বাবা আসবেন।”

“জানি।”

“অনেক বছর পর উনি আমার ঘরে আসছেন।”

“এটা তোমার জন্য বড় ব্যাপার।”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“যেদিন বিয়ে করে এই বাসায় এসেছিলাম, সেদিন ভেবেছিলাম হয়তো আর কখনো বাবা এই দরজা দিয়ে ঢুকবেন না।”

প্রীতম বলল,

“কিন্তু আজ তিনি আসছেন।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আজ পুরোনো কথা মনে করে কষ্ট পেয়ো না।”

ইরা মাথা নাড়ল।

দুপুরের দিকে দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।

ইরা থমকে গেল।

প্রীতম দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই ইরার বাবা দাঁড়িয়ে।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।

প্রীতম প্রথমে সালাম করল।

“আসসালামু আলাইকুম, বাবা।”

ইরার বাবা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলেন,

“ওয়ালাইকুম সালাম।”

প্রীতম সরে দাঁড়িয়ে বলল,

“ভেতরে আসুন।”

ইরার বাবা ঘরে ঢুকলেন।

তার চোখ ঘুরে ঘুরে পুরো ঘরটা দেখছিল।

ছোট্ট বসার ঘর।

দেয়ালে কয়েকটা ছবি।

এক পাশে বইয়ের তাক।

আর টেবিলের ওপর অনন্যার খেলনা।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে অনন্যার ছোট্ট শব্দ শোনা গেল।

ইরার বাবা থেমে গেলেন।

“ও কোথায়?”

ইরা চোখের পানি সামলে বলল,

“ও ঘরে আছে।”

তিনি ধীরে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

অনন্যা তখন বিছানায় শুয়ে খেলছিল।

তার নানাকে দেখে প্রথমে কিছু বুঝল না।

ইরার বাবা কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

ছোট্ট মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

তিনি যেন মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেলেন।

তার চোখে পানি এসে গেল।

ধীরে ধীরে তিনি অনন্যাকে কোলে তুলে নিলেন।

অনন্যা তার জামা ধরে খেলতে লাগল।

তিনি কাঁপা গলায় বললেন,

“আমি তোমার নানা।”

অনন্যা কিছুই বুঝল না।

শুধু তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

এই ছোট্ট হাসিটাই যেন বহু বছরের অভিমান ভেঙে দিল।

ইরার বাবা চোখ মুছে বললেন,

“তুই এত সুন্দর কেন?”

ইরা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

প্রীতম তার পাশে এসে দাঁড়াল।

ইরার বাবা অনন্যার দিকে তাকিয়েই বললেন,

“আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।”

ইরা ধীরে বলল,

“বাবা...”

তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন।

“আমাকে ক্ষমা কর।”

ইরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“আপনি আমার বাবা। আপনার ওপর রাগ করে থাকব কীভাবে?”

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

“তোর বিয়েতে থাকতে পারিনি।”

“আমি জানি।”

“তোর সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে থাকতে পারিনি।”

ইরা মাথা নাড়ল।

“সবকিছু এখন অতীত।”

“তুই আমাকে এত সহজে ক্ষমা করে দিলি?”

“কারণ আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”

ইরার বাবা চোখ মুছে বললেন,

“আমি ভেবেছিলাম, তোকে রক্ষা করছি।”

“আমি জানি।”

“কিন্তু তোর সুখটা বুঝতে পারিনি।”

প্রীতম তখন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

ইরার বাবা এবার তার দিকে তাকালেন।

“প্রীতম।”

“জি।”

“তুই কি আমার মেয়েকে সুখে রেখেছিস?”

প্রীতম একটু থেমে বলল,

“আমি চেষ্টা করেছি।”

“শুধু চেষ্টা?”

“সংসারে সবসময় সবকিছু নিজের মতো হয় না। কিন্তু আমি কখনো ইরাকে একা থাকতে দিইনি।”

ইরার বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“তুই আমাকে একটা কথা প্রতিশ্রুতি দিবি?”

“জি।”

“আমার মেয়েকে কখনো কষ্ট দিস না।”

প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“আপনি যদি কখনো দেখেন, আমি ইরাকে কষ্ট দিচ্ছি, তখন আমাকে বকবেন।”

ইরার বাবা হেসে ফেললেন।

“বকবই।”

ইরা বলল,

“বাবা, আপনি আবার শুরু করলেন।”

সবাই হেসে উঠল।

সেদিন দুপুরে তারা সবাই একসঙ্গে খেতে বসল।

ইরার বাবা বারবার অনন্যার দিকে তাকাচ্ছিলেন।

মাঝেমধ্যে মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন।

“ও কী খেতে ভালোবাসে?”

ইরা বলল,

“সবকিছু না। কিছু কিছু খাবার দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়।”

প্রীতম বলল,

“মায়ের মতো হয়েছে।”

ইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“তুমি চুপ করো।”

ইরার বাবা হাসলেন।

“তোমাদের ঝগড়া এখনও আগের মতো আছে?”

প্রীতম বলল,

“জি।”

“ভালো। সংসারে একটু ঝগড়া না হলে সংসার জমে না।”

ইরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

“বাবা, তুমি এসব বলছ?”

“কেন? আমি কি মানুষ নই?”

আবার হাসির শব্দে ঘর ভরে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় ইরার বাবা চলে যাওয়ার সময় অনন্যাকে কোলে নিয়ে বললেন,

“নানা আবার আসবে।”

অনন্যা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

তিনি প্রীতমের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আমি কি আবার আসতে পারি?”

প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“এই বাড়ি আপনারও।”

ইরার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার কাঁধে হাত রাখলেন।

“ভালো থাকিস।”

“আপনিও।”

দরজা বন্ধ হওয়ার পর ইরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর প্রীতমের দিকে ফিরে বলল,

“আজ আমার মনে হচ্ছে, আমি সব ফিরে পেয়েছি।”

প্রীতম বলল,

“সব না।”

ইরা অবাক হয়ে তাকাল।

“কী বাকি?”

প্রীতম অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমাদের মেয়ের নানার সঙ্গে এখন নিয়মিত দেখা হবে। মানে আমাদের আরও বেশি খেতে হবে।”

ইরা হেসে বলল,

“তুমি শুধু খাওয়ার কথাই ভাবো।”

“সংসারে খাবার গুরুত্বপূর্ণ।”

ইরা হেসে তার হাতে হালকা চাপ দিল।

সেদিন রাতে ইরা অনন্যাকে কোলে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

প্রীতম পাশে এসে দাঁড়াল।

“আজ খুশি?”

ইরা মাথা নাড়ল।

“অনেক।”

“কেন?”

“কারণ আজ বুঝলাম, কিছু সম্পর্ক যত দূরেই যাক, সত্যিকারের টান থাকলে একদিন আবার কাছে ফিরে আসে।”

প্রীতম বলল,

“তোমার বাবার সঙ্গে এখন সব ঠিক?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমাদের গল্পের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শেষ।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“না।”

“না?”

“আমার মনে হয়, এটা একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু।”

ঠিক তখন অনন্যা ঘুমের মধ্যে একটু নড়ে উঠল।

ইরা তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

প্রীতম মৃদু গলায় বলল,

“আমাদের তিনজনের?”

ইরা হাসল।

“হ্যাঁ। আমাদের তিনজনের।”

তাদের ছোট্ট সংসারে সেদিন নতুন এক শান্তি নেমে এসেছিল।

অভিমান মুছে গিয়েছিল।

দূরত্ব কমে গিয়েছিল।

অনন্যার জন্মের পর দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল।

এই এক বছরে প্রীতম আর ইরার জীবন অনেক বদলে গেছে।

ছোট্ট অনন্যা এখন হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যায়। কখনো বাবার ল্যাপটপের কাছে গিয়ে বসে, কখনো মায়ের বইয়ের পাতা টেনে ধরে।

ইরা তখন হেসে বলে,

“অনন্যা, বই নষ্ট করা যাবে না।”

অনন্যা মায়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে।

প্রীতম দূর থেকে বলে,

“ওর মধ্যে তোমার স্বভাব এসেছে।”

ইরা বলত,

“আর তোমার দুষ্টুমি।”

তাদের সংসারে এখন প্রতিদিনই এমন ছোট ছোট হাসির মুহূর্ত।

ইরার বাবাও প্রায়ই আসতেন।

প্রথমদিকে তিনি অনন্যাকে কিছুক্ষণ কোলে নিয়ে আবার চলে যেতেন।

কিন্তু ধীরে ধীরে তার আসার সময় বাড়তে লাগল।

কখনো বাজার থেকে অনন্যার জন্য খেলনা নিয়ে আসতেন।

কখনো ছোট্ট জামা।

কখনো ফল।

আর অনন্যা তাকে দেখলেই হাত বাড়িয়ে দিত।

একদিন প্রীতম মজা করে বলল,

“বাবা, আপনি অনন্যাকে এত কিছু কিনে দিলে ও আমাদের চিনবেই না।”

ইরার বাবা হেসে বললেন,

“তোমাদের তো প্রতিদিনই দেখে। নানাকে তো মাঝে মাঝে দেখে।”

ইরা পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“বাবা, আপনি ওকে বেশি আদর করছেন।”

“নানা কি নাতনিকে আদর করবে না?”

“করবে। কিন্তু ওকে মাথায় তুলে রাখবেন না।”

“তুই ছোট থাকতে তোকে মাথায় তুলে রেখেছিলাম।”

ইরা হেসে বলল,

“সেটাই তো সমস্যা। এখন নাতনির পালা।”

সবাই হেসে উঠল।

একদিন বিকেলে প্রীতম পার্কে বসেছিল।

অনেকদিন পর সে একা সেখানে এসেছে।

একসময় এই পার্কেই তার জীবন বদলে গিয়েছিল।

শীতের সেই সকালটা তার মনে পড়ল।

একটা বেঞ্চ।

একজন বই হাতে বসে থাকা মেয়ে।

আর রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা।

কত বছর হয়ে গেল?

মনে হলো, সবকিছু যেন গতকালই ঘটেছিল।

কিছুক্ষণ পর ইরা অনন্যাকে নিয়ে সেখানে এল।

প্রীতম তাদের দেখে মুচকি হাসল।

“তোমরা এখানে?”

ইরা বলল,

“অনন্যাকে একটু হাঁটাতে নিয়ে এসেছি।”

প্রীতম মেয়েকে কোলে তুলে নিল।

“এই পার্কেই কিন্তু তোমার মায়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা।”

ইরা হেসে বলল,

“ওকে এখনই এসব গল্প শোনাতে হবে?”

“কেন?”

“বড় হলে শুনবে।”

“তখন তো বলবে, বাবা-মা কত পুরোনো ধাঁচের ছিল।”

ইরা বলল,

“হয়তো।”

তারা সেই পুরোনো বেঞ্চের কাছে গিয়ে বসল।

ইরা ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল।

প্রীতম বইটা দেখে অবাক হয়ে বলল,

“এটা এখনও তোমার কাছে আছে?”

ইরা হাসল।

“কেন থাকবে না?”

“এই বইটার জন্যই তো সব শুরু।”

“শুধু বইয়ের জন্য?”

“না।”

প্রীতম ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,

“বইটা হাতে না থাকলে হয়তো তোমাকে প্রথম দিন এত সহজে চিনতাম না।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“আর আমি হয়তো তোমাকে পাত্তাই দিতাম না।”

“তুমি তো প্রথম দিনই আমার সঙ্গে কথা বলেছিলে।”

“কারণ তুমি খুব বিরক্ত করেছিলে।”

“আমি?”

“হ্যাঁ।”

“আমি তো শুধু জানতে চেয়েছিলাম, বইটা কেমন।”

ইরা হেসে বলল,

“মিথ্যে কথা।”

অনন্যা তখন মাটিতে বসে ছোট্ট একটা পাতা নিয়ে খেলছিল।

দুজনেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল।

প্রীতম বলল,

“জীবনটা কেমন অদ্ভুত, তাই না?”

“কেন?”

“একটা সাধারণ শীতের সকাল থেকে শুরু হয়েছিল সবকিছু। তারপর প্রেম, ঝামেলা, বিয়ে, সংসার, অনন্যা...”

ইরা ধীরে বলল,

“আর এখন?”

“এখন মনে হয়, তখনকার সেই একঘেয়ে জীবনটা দরকার ছিল।”

ইরা অবাক হয়ে তাকাল।

“কেন?”

“কারণ জীবন যদি একঘেয়ে না হতো, তাহলে হয়তো আমি ওই সকালে পার্কে আসতাম না।”

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“তাহলে সবকিছুর পেছনে কোনো না কোনো কারণ ছিল।”

“হয়তো।”

“তোমার কি কখনো মনে হয়, আমাদের এত বাধা আসা উচিত ছিল না?”

প্রীতম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“মনে হয়।”

“তাহলে?”

“কিন্তু বাধাগুলো না এলে হয়তো আমরা বুঝতেই পারতাম না, একে অপরকে কতটা চাই।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“ঠিক বলেছ।”

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে পার্কের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল।

প্রীতম অনন্যাকে কোলে তুলে নিল।

ইরা পাশে হাঁটছিল।

হঠাৎ অনন্যা বাবার গাল ধরে টান দিল।

প্রীতম হেসে বলল,

“এই যে, আমাকে মারছ কেন?”

ইরা বলল,

“ও তোমাকে খুব ভালোবাসে।”

“তাহলে একটু আস্তে ভালোবাসুক।”

ইরা হেসে উঠল।

কিছুক্ষণ পর তারা বাড়ি ফিরল।

সেদিন রাতে অনন্যা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ইরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

প্রীতম দুই কাপ চা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল।

“নাও।”

ইরা কাপ হাতে নিয়ে বলল,

“ধন্যবাদ।”

“আজ তোমাকে খুব শান্ত লাগছে।”

“কারণ আজ মনে হচ্ছে, আমাদের জীবনের সব ঝড় শেষ।”

প্রীতম বলল,

“ঝড় হয়তো আবার আসবে।”

ইরা তার দিকে তাকাল।

“তাহলে?”

“আমরা এবার জানি কীভাবে একসঙ্গে দাঁড়াতে হয়।”

ইরা মৃদু হাসল।

“তুমি কি এখনও আমাকে প্রথম দিনের মতো ভালোবাসো?”

প্রীতম হেসে বলল,

“প্রথম দিনের চেয়েও বেশি।”

“কীভাবে?”

“প্রথম দিন তোমাকে চিনতাম না। শুধু ভালো লেগেছিল।”

ইরা চুপ করে শুনছিল।

প্রীতম বলল,

“তারপর তোমাকে চিনেছি। তোমার হাসি, রাগ, অভিমান, ভয়—সবকিছু। এখন শুধু তোমার ভালো দিক না, তোমার সবকিছুকেই ভালোবাসি।”

ইরার চোখে পানি এসে গেল।

“আর তুমি?”

“আমি?”

“তোমাকে তো অনেক কষ্ট দিয়েছি।”

প্রীতম মাথা নাড়ল।

“তুমি আমাকে কষ্ট দাওনি। পরিস্থিতি দিয়েছে।”

ইরা ধীরে বলল,

“তবুও আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।”

“কেন?”

“তুমি কখনো আমাকে আমার পরিবার আর তোমার মধ্যে বেছে নিতে বলোনি।”

প্রীতম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

“কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে নেওয়া নয়। তার আপন মানুষগুলোকেও সম্মান করা।”

ইরা তার হাত ধরে বলল,

“এই কথাটাই তোমাকে অন্যরকম করে।”

প্রীতম মৃদু হেসে বলল,

“তাহলে আমাকে ভালোবেসে যাও।”

“সেটা তো করবই।”

ভেতর থেকে অনন্যার হালকা কান্নার শব্দ ভেসে এল।

ইরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

“মেয়েটা উঠেছে।”

প্রীতম বলল,

“চলো।”

দুজন একসঙ্গে ঘরের ভেতর চলে গেল।

প্রীতম মেয়েকে কোলে নিল।

ইরা পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

অনন্যা কিছুক্ষণ পর আবার শান্ত হয়ে গেল।

তিনজনকে দেখে মনে হচ্ছিল, এটাই যেন তাদের পৃথিবী।

পরদিন সকালে ইরার বাবা এলেন।

হাতে একটা ছোট বাক্স।

প্রীতম জিজ্ঞেস করল,

“এটা কী?”

তিনি বললেন,

“অনন্যার জন্মদিনের জন্য।”

বাক্স খুলে দেখা গেল, ভেতরে ছোট্ট একটি রুপার ব্রেসলেট।

ইরা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত কিছু করার কী দরকার ছিল?”

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

“আমার নাতনির জন্য করতে পারব না?”

ইরা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

“বাবা...”

তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

“তুই সুখে থাকিস। এটাই চাই।”

প্রীতম দূর থেকে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

ইরার বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আর তুইও ভালো থাকিস।”

প্রীতম বলল,

“আপনি এখন আমাদের সঙ্গে আছেন, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।”

ইরার বাবা মৃদু হেসে বললেন,

“আগে বুঝিনি। এখন বুঝি—মেয়ের সুখের চেয়ে বড় কোনো জেদ নেই।”

ইরা চোখ মুছে ফেলল।

অনন্যা তখন দাদুর হাত ধরে খেলছিল।

বাইরে শীতের হালকা রোদ।

ঘরের ভেতর তিন প্রজন্মের হাসি।

প্রীতম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল।

তার মনে পড়ল বহু বছর আগের সেই শীতের সকাল।

যেদিন সে একা ছিল।

জীবন একঘেয়ে ছিল।

আর আজ?

তার পাশে ইরা।

কোলে অনন্যা।

কাছে মা।

আর শ্বশুরও এখন পরিবারের একজন আপন মানুষ।

প্রীতম ধীরে ইরার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

ইরা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

“কী ভাবছ?”

প্রীতম বলল,

“ভাবছি, আমার জীবনটা কত বদলে গেছে।”

“ভালো দিকে?”

“সবচেয়ে ভালো দিকে।”

ইরা মৃদু হেসে বলল,

“আমারও।”

প্রীতম অনন্যার ছোট্ট হাতটা নিজের হাতে নিল।

তারপর ইরার হাতও ধরল।

তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।

তাদের ভালোবাসা একদিন অনেক বাধার সামনে পড়েছিল।

পরিবারের বিরোধিতা এসেছিল।

দূরত্ব এসেছিল।

অভিমান এসেছিল।

কিন্তু তারা একে অপরের হাত ছাড়েনি।

কারণ সত্যিকারের সম্পর্ক শুধু সুখের দিনে পাশে থাকার নাম নয়।

ঝড়ের দিনেও পাশে দাঁড়ানোর নাম।

আর সেই কারণেই তাদের ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে কমেনি।

বরং আরও গভীর হয়েছে।

প্রীতম ইরার দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল,

“জানো, যদি আবার সেই শীতের সকালটা ফিরে আসত?”

ইরা বলল,

“তাহলে?”

“আমি আবার সেই পার্কে যেতাম।”

“আর?”

“তোমার পাশে গিয়ে বসতাম।”

ইরা হাসল।

“আর আমি আবার বই পড়ার ভান করতাম।”

“তারপর?”

“তারপর?”

প্রীতম বলল,

“আবার তোমার প্রেমে পড়তাম।”

ইরা কিছু বলল না।

শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।

....
👁 122