যে কথাগুলো কখনো বলা হয়নি

বয়স ছাব্বিশ। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সকাল সাড়ে আটটায় বাসা থেকে বের হওয়া, অফিসের কাজ, বিকেলে চা, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা—এই ছিল তার নিয়মিত জীবন। খুব বেশি বন্ধু নেই, আড্ডাবাজিও পছন্দ করে না। নিজের কাজ আর পরিবারের মধ্যেই সে স্বচ্ছন্দ।

তবে শায়নের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—সে নিজের মনের কথা সহজে কাউকে বলতে পারে না।

কেউ কষ্ট দিলে চুপ করে থাকে। কাউকে ভালো লাগলে সেটাও চুপ করে রাখে। এমনকি মা যখন মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করেন, “তোর কি কাউকে পছন্দ হয়েছে?”

শায়ন হেসে উত্তর দেয়,

“না মা। এসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?”

কিন্তু সেদিন থেকে তার এই উত্তরটা একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল।

সেদিন অফিসে নতুন একজন কর্মী যোগ দিয়েছিল।

নাম—জারা।

জারা একই প্রতিষ্ঠানের অন্য একটি বিভাগে কাজ করবে। প্রথম দিন দুপুরে ক্যান্টিনে শায়নের সঙ্গে তার দেখা।

শায়ন একা বসে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ সামনে এসে একটা মেয়ের কণ্ঠ শুনল,

“এই চেয়ারটা খালি?”

শায়ন তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“জি, খালি।”

জারা বসে পড়ল।

“ধন্যবাদ।”

শায়ন আবার নিজের চায়ের দিকে তাকাল।

কিছুক্ষণ পর জারা নিজেই বলল,

“আপনি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?”

শায়ন একটু অবাক হয়ে তাকাল।

“কেন?”

“না, দেখলাম সবাই কথা বলছে। আপনি একা বসে চা খাচ্ছেন। তাই মনে হলো।”

শায়ন হালকা হাসল।

“আমি একটু কম কথা বলি।”

“বুঝলাম। তাহলে আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হলে আমাকে বেশি কথা বলতে হবে।”

কথাটা বলে জারা হেসে ফেলল।

শায়নও হাসল।

সেটাই ছিল তাদের প্রথম কথা।

খুব সাধারণ একটা কথা।

কিন্তু কিছু কিছু সাধারণ মুহূর্তই পরে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে দাঁড়ায়।

পরের কয়েকদিন অফিসে তাদের দেখা হতো। কখনো লিফটে, কখনো ক্যান্টিনে, কখনো করিডোরে। জারা দেখলেই হাসত।

“কেমন আছেন?”

শায়ন বলত,

“ভালো। আপনি?”

“আমিও ভালো।”

এর বেশি কিছু হতো না।

তবে এক সপ্তাহ পর জারা একদিন শায়নের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।

“একটা সাহায্য করবেন?”

“কী?”

“এই রিপোর্টটা একটু বুঝতে পারছি না। আপনারা আগেও এই ধরনের কাজ করেছেন, তাই না?”

শায়ন কম্পিউটারের সামনে থেকে উঠে বলল,

“দেখি।”

জারা চেয়ার টেনে পাশে বসে পড়ল।

শায়ন ধীরে ধীরে তাকে কাজটা বুঝিয়ে দিতে লাগল। জারা মন দিয়ে শুনছিল।

“আপনি খুব ভালো করে বোঝান।”

“এটা তো কঠিন কিছু না।”

“আমার কাছে কঠিন ছিল।”

শায়ন হেসে বলল,

“তাহলে আজ থেকে সহজ।”

জারা তাকিয়ে রইল তার দিকে।

“আপনি জানেন, আপনার একটা সমস্যা আছে?”

শায়ন অবাক।

“কী সমস্যা?”

“আপনি সব কথা খুব সিরিয়াসভাবে বলেন।”

“আমি কি হাসতে হাসতে কথা বলব?”

“হ্যাঁ। মাঝে মাঝে।”

শায়ন এবার সত্যিই হেসে ফেলল।

সেদিনের পর থেকেই তাদের কথাবার্তা বাড়তে লাগল।

প্রথমে শুধু অফিসের কাজ নিয়ে। তারপর দুপুরের খাবার। এরপর বাসা কোথায়, কে কে আছে পরিবারে, কে কোন খাবার পছন্দ করে—এসব ছোটখাটো বিষয়।

শায়ন জানতে পারল, জারা তার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। মা স্কুলশিক্ষিকা ছিলেন। জারা খুব সাধারণ পরিবারে বড় হয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা ইচ্ছা তার অনেক দিনের।

জারাও শায়নের কথা জানতে পারল।

শায়নের বাবা ছোট ব্যবসা করেন। মা সংসার সামলান। ছোট একটা বোন আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

একদিন অফিস শেষে বৃষ্টি নামল।

জারা অফিসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে ছাতা ছিল না।

শায়ন কিছু দূরে দাঁড়িয়ে নিজের ছাতা খুলছিল।

জারা তাকিয়ে বলল,

“আজ তো মনে হচ্ছে আটকে গেলাম।”

শায়ন কিছু না বলে তার দিকে ছাতাটা এগিয়ে দিল।

“চলুন।”

“আপনি?”

“আমার বাসা কাছেই। দৌড়ে চলে যেতে পারব।”

জারা মাথা নাড়ল।

“না, আপনি ছাতা নিয়ে যান। আমি রিকশা নেব।”

“রিকশা পেতে সময় লাগবে।”

“তাহলে?”

“একসঙ্গে গেটের বাইরে যাই। রিকশা পেলে উঠে যাবেন।”

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

বৃষ্টির শব্দে চারপাশটা প্রায় ঢেকে গিয়েছিল।

জারা হঠাৎ বলল,

“শায়ন?”

“হুম?”

“আপনি কি সব মানুষের জন্যই এমন?”

“কেমন?”

“চুপচাপ সাহায্য করেন, কিন্তু এমনভাবে করেন যেন কিছুই করেননি।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“জানি না।”

জারা আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর একটা রিকশা পাওয়া গেল।

জারা ওঠার আগে বলল,

“কাল দেখা হবে।”

“হুম।”

রিকশা চলে গেল।

শায়ন দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।

তারপর নিজের অজান্তেই মুখে একটা হাসি চলে এল।

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে শায়নের ফোনে একটা মেসেজ এল।

জারা: বাসায় পৌঁছেছেন?

শায়ন কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর লিখল,

শায়ন: হ্যাঁ। আপনি?

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।

জারা: আমিও। আজ ছাতাটা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

শায়ন লিখল,

শায়ন: ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।

জারা আবার লিখল,

জারা: আচ্ছা। তাহলে কাল কফি খাওয়াব।

শায়ন মেসেজটা পড়ে হেসে ফেলল।

শায়ন: ঠিক আছে।

তারপর ফোনটা পাশে রেখে শুয়ে পড়ল।

কিন্তু ঘুম এল না।

বারবার মনে হচ্ছিল, জারা কেন তাকে কফি খাওয়াতে চাইছে?

এটা কি শুধুই বন্ধুত্ব?

নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো অর্থ আছে?

পরদিন সকালটা শায়নের কাছে অন্যরকম লাগছিল।

প্রতিদিনের মতোই অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল সে। একই রাস্তা, একই যানজট, একই ব্যস্ততা। কিন্তু আজ সবকিছুর মাঝেও একটা বিষয় বারবার তার মাথায় আসছিল—জারা তাকে কফি খাওয়াবে।

বিষয়টা খুব সাধারণ।

একজন সহকর্মী আরেকজন সহকর্মীকে কফি খাওয়াবে—এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

তবু শায়নের মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা একটু আলাদা।

অফিসে পৌঁছে নিজের ডেস্কে বসার কিছুক্ষণ পর জারা এসে দাঁড়াল।

“সুপ্রভাত।”

শায়ন তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“সুপ্রভাত।”

জারা একটু তাকিয়ে থেকে বলল,

“আজ এত সকালে?”

“আমি তো প্রতিদিনই এই সময়ে আসি।”

“ওহ, তাই?”

“আপনি কি ভেবেছিলেন আজ শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য আগে এসেছি?”

কথাটা বলেই শায়ন নিজেই একটু থেমে গেল।

জারাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

তারপর মুচকি হেসে বলল,

“আপনি তো দেখি মাঝে মাঝে মজাও করতে পারেন।”

শায়ন বুঝতে পারল, কথাটা একটু বেশি হয়ে গেছে।

“এমনিই বললাম।”

“জানি।”

জারা চলে গেল।

কিন্তু যাওয়ার সময় তার মুখের হাসিটা শায়নের চোখে আটকে রইল।

দুপুরে জারা সত্যিই তাকে কফি খাওয়াতে নিয়ে গেল।

অফিসের কাছেই ছোট একটা ক্যাফে। জায়গাটা খুব বড় নয়। জানালার পাশে কয়েকটা টেবিল, দেয়ালে পুরোনো কিছু ছবি, আর সবসময় হালকা গান বাজে।

দুজন মুখোমুখি বসেছিল।

জারা কফির কাপ হাতে নিয়ে বলল,

“আপনি সবসময় এত কম কথা বলেন কেন?”

শায়ন হেসে বলল,

“আপনি সবসময় এত বেশি কথা বলেন কেন?”

“কারণ আমি চুপ থাকতে পারি না।”

“আমি পারি।”

“সেটা বুঝেছি।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর জারা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

“আচ্ছা, একটা কথা বলি?”

“বলুন।”

“আপনি কি কখনো কাউকে পছন্দ করেছেন?”

শায়ন কাপটা টেবিলে রেখে বলল,

“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“এমনিই।”

“না।”

জারা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“একবারও না?”

“হয়তো।”

“হয়তো মানে?”

“কাউকে ভালো লাগতে পারে। কিন্তু পছন্দ করা আর সম্পর্কের কথা ভাবা তো এক নয়।”

জারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আপনি খুব হিসাব করে কথা বলেন।”

“কেন?”

“কারণ আপনার কথার মধ্যে সবসময় একটা ‘কিন্তু’ থাকে।”

শায়ন হেসে ফেলল।

“আপনার?”

জারা একটু থেমে বলল,

“আমারও একসময় একজনকে ভালো লেগেছিল।”

শায়ন অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গেল।

“তারপর?”

“কিছু হয়নি।”

“কেন?”

“বলিনি।”

“কেন বলেননি?”

জারা কফির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভয় হয়েছিল।”

“কিসের ভয়?”

“যদি সে একইভাবে না ভাবে?”

শায়ন কোনো উত্তর দিল না।

জারা হালকা হেসে বলল,

“দেখলেন? এই জায়গাতেই আপনার সঙ্গে আমার মিল।”

শায়ন তাকিয়ে রইল তার দিকে।

“হয়তো।”

কফি শেষ হওয়ার পর দুজন আবার অফিসে ফিরে গেল।

সেদিন বিকেলে কাজের চাপ বেশি ছিল। তাই তেমন কথা হয়নি।

তবে সন্ধ্যার দিকে জারা একটা মেসেজ পাঠাল।

জারা: আজকের কফি কেমন ছিল?

শায়ন লিখল,

শায়ন: ভালো।

জারা: শুধু ভালো?

শায়ন: খুব ভালো।

জারা: কফি, নাকি সঙ্গ?

শায়ন মেসেজটা পড়ে থেমে গেল।

কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না।

শেষ পর্যন্ত লিখল,

শায়ন: দুটোই।

মেসেজ পাঠানোর পরই তার বুকের ভেতর কেমন যেন করল।

জারা অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।

শায়ন ভাবল, হয়তো বেশি কিছু বলে ফেলেছে।

প্রায় দশ মিনিট পর মেসেজ এল।

জারা: আমিও তাই ভাবছিলাম।

শায়ন আর কোনো উত্তর দিল না।

কিন্তু সেদিন রাতে তার ঘুম ভালো হলো।

এরপর থেকে তাদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।

তারা প্রতিদিন কথা বলত না, কিন্তু যেদিন কথা হতো, সেদিন অনেকক্ষণ কথা চলত।

কখনো অফিসের কাজ নিয়ে, কখনো পরিবার নিয়ে, কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে।

জারা একদিন বলল,

“আপনি ভবিষ্যতে কোথায় থাকতে চান?”

শায়ন বলল,

“জানি না। তবে এমন একটা জায়গায়, যেখানে খুব বেশি শব্দ নেই।”

“আপনি গ্রামে থাকতে পারবেন?”

“কিছুদিন পারব।”

“আমি পারব না।”

“কেন?”

“আমি শহরের মানুষ। আমার চারপাশে মানুষ না থাকলে ভালো লাগে না।”

শায়ন বলল,

“তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মিলছে না।”

জারা হেসে বলল,

“আমাদের?”

শায়ন থমকে গেল।

জারা হেসে বলল,

“ভয় পেয়েছেন?”

“না।”

“তাহলে এত চুপ হয়ে গেলেন কেন?”

শায়ন কোনো উত্তর দিল না।

জারা মজা করলেও তার নিজের মনেও একটা প্রশ্ন জন্মেছিল।

শায়ন কি সত্যিই তাকে নিয়ে ভাবছে?

নাকি সে একাই বেশি কিছু ভাবছে?

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অফিসের সবাই বুঝে গেল, শায়ন আর জারা ভালো বন্ধু হয়ে গেছে।

তবে কেউ তাদের সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলত না।

একদিন দুপুরে শায়নের বন্ধু রাফি তাকে বলল,

“তোর মধ্যে পরিবর্তন এসেছে।”

শায়ন অবাক হয়ে বলল,

“কী পরিবর্তন?”

“আগে অফিস থেকে বের হলেই বাসায় চলে যেতিস। এখন কাজ শেষ হওয়ার পরও বসে থাকিস।”

“কাজ থাকে।”

রাফি হেসে বলল,

“কাজ থাকে, নাকি জারা থাকে?”

শায়ন কিছু বলল না।

রাফি এবার সিরিয়াস হয়ে বলল,

“দেখ, কাউকে ভালো লাগলে বলতে হয়।”

শায়ন ধীরে বলল,

“সবকিছু বলা যায় না।”

“কেন?”

“কারণ কিছু সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।”

রাফি বলল,

“কথা না বললেও তো মানুষকে হারানো যায়।”

শায়ন চুপ করে রইল।

সেদিন সন্ধ্যায় জারা তাকে ফোন করল।

“কোথায়?”

“বাসায় যাওয়ার পথে।”

“একটু কথা বলবেন?”

“হ্যাঁ।”

জারার কণ্ঠে আজ অন্যরকম একটা ভাব ছিল।

“আমার বাসা থেকে বিয়ের কথা বলছে।”

শায়ন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গেল।

কিছুক্ষণ তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।

তারপর বলল,

“আপনি কী বলেছেন?”

“আমি কিছু বলিনি।”

“কেন?”

“জানি না।”

“ছেলেটা কেমন?”

“দেখিনি।”

“তাহলে?”

“আমার মন চাইছে না।”

শায়ন খুব ধীরে বলল,

“আপনার কি অন্য কাউকে পছন্দ?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর জারা বলল,

“হয়তো।”

শায়নের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল।

“সে কি জানে?”

“না।”

“আপনি তাকে বলেননি?”

“না।”

শায়ন চোখ বন্ধ করল।

একটা কথা তার মুখের কাছে এসে থেমে গেল।

‘আমাকে কি আপনার ভালো লাগে?’

কিন্তু সে বলতে পারল না।

জারা বলল,

“শায়ন?”

“হুম?”

“আপনি কিছু বলবেন?”

শায়ন অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আপনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই করবেন।”

জারা খুব শান্ত গলায় বলল,

“আপনি সবসময় এমন কেন?”

“কেমন?”

“আমি যখন আপনার কাছ থেকে একটা উত্তর চাই, তখন আপনি আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বলে দেন।”

শায়ন কিছু বলল না।

জারা ফোন কেটে দিল।

সেদিন রাতে শায়ন অনেকক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, এতদিন ধরে যে কথাটা বলতে চেয়েছে, আজই হয়তো বলা উচিত ছিল।

কিন্তু আবার ভয় হচ্ছিল।

যদি জারা তাকে শুধু বন্ধু হিসেবেই দেখে?

যদি তার কথা শুনে জারা দূরে সরে যায়?

আর ঠিক একই সময়ে জারা নিজের ঘরে বসে শায়নের শেষ কথাগুলো ভাবছিল।

‘আপনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই করবেন।’

কথাটা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল।

কারণ সে শায়নের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত চায়নি।

সে চেয়েছিল, শায়ন অন্তত একবার বলুক—

‘থাকুন।’

কিন্তু সেই কথাটা শায়ন বলেনি।

পরদিন অফিসে শায়ন আর জারার দেখা হলো।

প্রতিদিনের মতোই দেখা হলো, কিন্তু আজ তাদের মধ্যে আগের মতো স্বাভাবিকতা ছিল না।

সকালে জারা অফিসে ঢোকার সময় শায়নের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,

“সুপ্রভাত।”

শায়নও বলল,

“সুপ্রভাত।”

তারপর দুজন যার যার কাজে চলে গেল।

আগে এমন হতো না।

জারা কোনো না কোনো অজুহাতে শায়নের ডেস্কে আসত। কখনো চা খেতে ডাকত, কখনো কোনো কাজের কথা বলত। শায়নও দিনের মধ্যে অন্তত একবার জারাকে খুঁজে নিত।

আজ কেউ কাউকে খুঁজল না।

শায়ন নিজের কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বারবার তার চোখ ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছিল।

সে ভাবছিল, জারা কি সত্যিই বিয়ের ব্যাপারে রাজি হয়ে যাবে?

আর যদি হয়?

তাহলে সে কী করবে?

একটা সময় শায়ন নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে গেল।

সে এতদিন কী করছিল?

জারার সঙ্গে কথা বলেছে, তার হাসি দেখেছে, তার মন খারাপের কথা শুনেছে। নিজের অনেক ব্যক্তিগত কথা বলেছে। কিন্তু একটা কথাও বলেনি—

জারা তার কাছে আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

দুপুরের দিকে রাফি এসে বলল,

“কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

“মিথ্যা বলিস না।”

শায়ন চুপ করে থাকল।

রাফি বলল,

“জারার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে?”

“না।”

“তাহলে মুখটা এমন কেন?”

শায়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“ওর বাসা থেকে বিয়ের কথা বলছে।”

রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তুই কী বলেছিস?”

“কিছু না।”

“কিছু না মানে?”

“বলেছি, ও যেটা ভালো মনে করবে, সেটাই করবে।”

রাফি অবাক হয়ে তাকাল।

“তুই সত্যিই এটা বলেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“তুই কি পাগল?”

শায়ন মৃদু হেসে বলল,

“হয়তো।”

রাফি এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

“তুই যদি ওকে পছন্দ করিস, তাহলে বল।”

শায়ন ধীরে বলল,

“যদি ও আমাকে পছন্দ না করে?”

“তাহলে না করবে। অন্তত তুই জানবি।”

“আর যদি বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে যায়?”

রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“বন্ধুত্ব বাঁচানোর জন্য যদি নিজের সত্যিটাই লুকিয়ে রাখিস, তাহলে একদিন দেখবি বন্ধুত্বও নেই, তুইও নেই।”

কথাটা শায়নের মনে গেঁথে গেল।

সেদিন অফিস শেষে জারা আগে বের হয়ে গেল।

শায়ন দূর থেকে দেখল, জারা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।

কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি এসে থামল।

জারা গাড়িতে উঠে চলে গেল।

শায়নের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হলো।

সে জানত না গাড়িতে কে ছিল।

তবু তার মাথায় প্রথম যে কথাটা এল—

হয়তো সেই ছেলেটা।

সেদিন রাতে শায়ন নিজেই জারাকে ফোন করল।

জারা ফোন ধরতে একটু সময় নিল।

“হ্যালো?”

“বাসায় পৌঁছেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“আজ আপনাকে একটা গাড়িতে উঠতে দেখলাম।”

“হুম।”

“কে এসেছিল?”

জারা একটু থেমে বলল,

“আমার মামাতো ভাই।”

শায়ন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

“ওহ।”

জারা বুঝতে পারল, শায়ন কেন প্রশ্নটা করেছিল।

“আপনি কি ভেবেছিলেন অন্য কেউ?”

শায়ন চুপ।

জারা আবার বলল,

“যদি অন্য কেউ হতো?”

শায়ন এবার উত্তর দিল,

“জানি না।”

“আপনি কিছুই জানেন না।”

“হয়তো।”

জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“শায়ন, আমি একটা কথা জানতে চাই।”

“বলুন।”

“আমি যদি অন্য কাউকে বিয়ে করি, আপনি কি খুশি হবেন?”

প্রশ্নটা শুনে শায়ন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব ধীরে বলল,

“আপনি সুখী হলে আমি খুশি হব।”

জারা আর কিছু বলল না।

কয়েক সেকেন্ড পর ফোন কেটে গেল।

শায়ন ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

সে জানত, জারা হয়তো তার কাছ থেকে অন্য একটা উত্তর আশা করেছিল।

কিন্তু সে সেই উত্তর দিতে পারেনি।

পরের সপ্তাহে জারা অফিসে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে গেল।

দুজনের কথাবার্তা কমে গেল।

শায়ন বুঝতে পারছিল, জারা ইচ্ছে করেই দূরত্ব রাখছে।

একদিন বিকেলে জারা একটা কাগজ নিয়ে শায়নের কাছে এল।

“এই রিপোর্টটা দেখে দেবেন?”

“হ্যাঁ।”

শায়ন রিপোর্টটা নিয়ে কাজ করতে লাগল।

জারা দাঁড়িয়ে রইল।

“আর কিছু?”

“না।”

“তাহলে?”

“কিছু না।”

জারা চলে যেতে উদ্যত হলে শায়ন ডাকল,

“জারা।”

জারা ফিরে তাকাল।

“হুম?”

শায়ন কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।

“আপনি… ভালো আছেন?”

জারা মৃদু হেসে বলল,

“ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”

“কেন?”

“সবসময় তো মানুষ নিজের মতো থাকতে পারে না।”

শায়ন আর কিছু বলল না।

জারা চলে গেল।

সেদিন রাতে জারার মা তাকে আবার বিয়ের ব্যাপারে কথা বললেন।

“ছেলেটা ভালো। পরিবারও ভালো। তুই শুধু একবার দেখা কর।”

জারা চুপ করে বসে ছিল।

“কী হয়েছে তোর?”

“কিছু না।”

“কাউকে পছন্দ করিস?”

জারা মাথা নিচু করে ফেলল।

মা বুঝে গেলেন।

“আছে কেউ?”

জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“জানি না।”

“জানি না মানে?”

“আমি একজনকে খুব পছন্দ করি। কিন্তু সে আমাকে কীভাবে দেখে, সেটা জানি না।”

“তাকে বলেছিস?”

“না।”

“কেন?”

জারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“ভয় হয়।”

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

“ভালো লাগার কথা বলতে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সারাজীবন আফসোস করে থাকা আরও কঠিন।”

জারা মায়ের দিকে তাকাল।

কথাগুলো তার মনে একটা সাহস তৈরি করল।

পরদিন অফিসে গিয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, শায়নের সঙ্গে কথা বলবে।

কিন্তু সেদিনই একটা নতুন সমস্যা হলো।

দুপুরের পর অফিস থেকে খবর এল, শায়নকে অন্য একটি শাখায় বদলি করা হতে পারে।

অফিসের ম্যানেজার তাকে ডেকে বললেন,

“তোমাকে হয়তো তিন মাসের জন্য চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চে পাঠানো হবে। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট আছে।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“কতদিনের জন্য?”

“তিন মাস। প্রয়োজন হলে আরও বাড়তে পারে।”

“কবে যেতে হবে?”

“সম্ভবত আগামী সপ্তাহে।”

শায়ন মাথা নাড়ল।

তার মনে প্রথম যে মানুষটার কথা এল, সে জারা।

সে বুঝতে পারছিল না, এই খবরটা জারাকে কীভাবে বলবে।

সন্ধ্যায় অফিস ছুটির পর জারা তার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।

“আজ একটু সময় আছে?”

“হ্যাঁ।”

“আমার সঙ্গে বাইরে যাবেন?”

শায়ন অবাক হয়ে বলল,

“কোথায়?”

“কাছের পার্কে। একটু কথা ছিল।”

দুজন অফিসের বাইরে বের হলো।

পার্কের এক পাশে একটা বেঞ্চে বসে রইল।

কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত জারা বলল,

“আমি একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।”

“আমিও।”

জারা তাকাল।

“আপনি আগে বলুন।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আমাকে হয়তো তিন মাসের জন্য চট্টগ্রাম যেতে হবে।”

জারার মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল।

“কবে?”

“আগামী সপ্তাহে।”

“তিন মাস?”

“হ্যাঁ।”

জারা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“আপনি যেতে চান?”

“চাকরির ব্যাপার। যেতে হবে।”

“বুঝলাম।”

শায়ন বলল,

“আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন?”

জারা তার দিকে তাকাল।

চোখে যেন অনেক কথা।

কিন্তু ঠোঁট খুলেও সে কিছু বলতে পারল না।

শেষ পর্যন্ত শুধু বলল,

“কিছু না।”

শায়ন বুঝতে পারল, আজও সেই কথাটা বলা হলো না।

দুজন পাশাপাশি বসে ছিল।

চারপাশে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে কমে আসছিল।

জারা মনে মনে ভাবছিল—

‘আমি আপনাকে হারাতে চাই না।’

শায়ন মনে মনে ভাবছিল—

‘আপনাকে ছেড়ে যেতে আমার ভালো লাগছে না।’

কিন্তু দুজনের কেউই কথাগুলো মুখে আনল না।

সেদিন ফেরার সময় জারা শুধু বলল,

“চট্টগ্রাম গিয়ে আমাকে ভুলে যাবেন না যেন।”

শায়ন মৃদু হেসে বলল,

“ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ আপনি নন।”

জারা থমকে দাঁড়াল।

শায়নও বুঝতে পারল, সে হয়তো প্রথমবার নিজের অনুভূতির একটু কাছাকাছি গিয়ে কথা বলেছে।

জারা কিছু না বলে চলে গেল।

আর শায়ন দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, হয়তো আর বেশি দেরি করা ঠিক হবে না।

চলে যাওয়ার আগে তাকে অন্তত একবার বলতে হবে—

জারা তার কাছে শুধু একজন বন্ধু নয়।

চট্টগ্রাম যাওয়ার খবরটা জানার পর থেকে জারার মনটা অদ্ভুত হয়ে গেল।

শায়ন মাত্র তিন মাসের জন্য যাচ্ছে। খুব বেশি সময় নয়। তবু জারার কাছে মনে হচ্ছিল, তিন মাস যেন অনেক দীর্ঘ একটা সময়।

কারণ গত কয়েক সপ্তাহে শায়ন তার জীবনের এমন একটা অংশ হয়ে উঠেছিল, যেটা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলে শায়নের মেসেজ আছে কি না দেখা, অফিসে গিয়ে তাকে একবার দেখার চেষ্টা করা, দুপুরে একসঙ্গে চা খাওয়া—সবকিছু যেন খুব স্বাভাবিক একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

এখন সেই অভ্যাসটাই হঠাৎ বদলে যাবে।

আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, শায়ন তাকে কিছুই পরিষ্কার করে বলেনি।

সে কি সত্যিই তাকে পছন্দ করে?

নাকি তাদের বন্ধুত্বের বাইরে কিছুই ভাবে না?

এই প্রশ্নটার উত্তর জারা যত দিন যাচ্ছে, তত বেশি জানতে চাইছিল।

অন্যদিকে শায়নেরও একই অবস্থা।

চট্টগ্রামে যাওয়ার আগে সে জারাকে নিজের মনের কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু কীভাবে বলবে, সেটা বুঝতে পারছিল না।

তার মনে হচ্ছিল, মুখোমুখি বসে বলাটাই ভালো।

ফোনে বা মেসেজে নয়।

একটা বিকেল সে ঠিক করল, জারাকে অফিসের পর কোথাও নিয়ে যাবে।

কিন্তু সেদিন জারা নিজেই বলল,

“আজ বাসায় একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে।”

শায়ন মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে।”

“কিছু বলবেন?”

“না।”

জারা চলে গেল।

শায়ন আবার নিজের ডেস্কে ফিরে এল।

সন্ধ্যার দিকে তার ফোনে জারার মেসেজ এল।

জারা: আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?

শায়ন অবাক হয়ে উত্তর দিল,

শায়ন: না তো।

জারা: তাহলে এত চুপচাপ কেন?

শায়ন: যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর জারা লিখল,

জারা: যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে একটু সময় কাটাবেন?

শায়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

শায়ন: অবশ্যই।

পরদিন তারা অফিসের কাছের একটা ছোট রেস্টুরেন্টে বসেছিল।

জারা খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল।

“চট্টগ্রামে গিয়ে কী করবেন?”

“কাজ।”

“সেটা তো জানি। কাজের বাইরে?”

“হোটেলে থাকব, ঘুমাব, খাব।”

জারা হেসে ফেলল।

“আপনি কি কোনোদিন একটু রোমান্টিকভাবে কথা বলতে পারবেন?”

শায়ন হেসে বলল,

“চেষ্টা করব।”

“চেষ্টা করলেই হবে?”

“না হলে কী করতে হবে?”

“জানি না।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

জারা ধীরে বলল,

“আপনি গেলে আমাকে ফোন করবেন?”

“প্রতিদিন।”

“প্রতিদিন?”

“হ্যাঁ।”

“এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছেন কেন?”

“কারণ আমি চাই।”

জারা তাকিয়ে রইল।

“আপনি কি আমাকে মিস করবেন?”

প্রশ্নটা শুনে শায়ন এবার আর হেসে উড়িয়ে দিল না।

“খুব।”

জারার চোখে এক মুহূর্তের জন্য আনন্দ ফুটে উঠল।

সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমিও।”

শায়ন তার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই তো সেই মুহূর্ত।

সে চাইলে এখনই বলতে পারে।

‘জারা, আমি আপনাকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখি না।’

কিন্তু ঠিক তখনই জারার ফোন বেজে উঠল।

জারা ফোনটা দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়ল।

“মা।”

সে ফোন ধরল।

“হ্যাঁ মা… এখনই ফিরছি… না, অফিসের একজনের সঙ্গে আছি… হ্যাঁ… ঠিক আছে।”

ফোন রেখে জারা বলল,

“আমাকে যেতে হবে।”

শায়ন মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে।”

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় শায়ন ভাবল, আজও বলা হলো না।

তবে এবার সে ঠিক করল, চট্টগ্রাম যাওয়ার আগের দিন যেভাবেই হোক বলবে।

পরদিন অফিসে শায়ন জানতে পারল, তার যাওয়ার সময় একদিন এগিয়ে এসেছে।

আগামীকাল সকালেই তাকে রওনা দিতে হবে।

খবরটা শুনে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

আজই তাকে বলতে হবে।

সে জারাকে মেসেজ করল।

শায়ন: আজ অফিস শেষে একটু দেখা করবেন? জরুরি কথা আছে।

অনেকক্ষণ পর জবাব এল।

জারা: হ্যাঁ।

সন্ধ্যায় অফিস ছুটির পর তারা সেই পার্কেই গেল, যেখানে কয়েকদিন আগে বসেছিল।

আকাশে মেঘ ছিল। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।

দুজন একটা বেঞ্চে বসে রইল।

শায়নের হাতে একটা ছোট প্যাকেট ছিল।

জারা তাকিয়ে বলল,

“ওটা কী?”

“আপনার জন্য।”

“কী আছে?”

“আপনি খুলে দেখবেন।”

জারা প্যাকেটটা খুলে দেখল, ভেতরে একটা সুন্দর ডায়েরি।

“ডায়েরি?”

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

শায়ন মৃদু হেসে বলল,

“আপনি তো অনেক কথা বলেন। ভাবলাম, যেগুলো আমাকে বলা সম্ভব হবে না, সেগুলো লিখে রাখবেন।”

জারা ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

“আপনি জানেন, আপনি মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত কথা বলেন?”

“জানি।”

“এই ডায়েরিতে আমি কী লিখব?”

“যা ইচ্ছা।”

জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন?”

শায়নের বুক ধক করে উঠল।

“হ্যাঁ।”

“বলুন।”

শায়ন গভীর শ্বাস নিল।

“জারা…”

ঠিক তখনই আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।

প্রথমে কয়েক ফোঁটা।

তারপর ধীরে ধীরে বৃষ্টি বাড়তে লাগল।

জারা উঠে দাঁড়াল।

“চলুন, কোথাও দাঁড়াই।”

দুজন কাছের একটা ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াল।

বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ভরে গেল।

শায়ন আবার বলল,

“আমি আসলে…”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই জারা বলল,

“শায়ন, আমিও একটা কথা বলতে চাই।”

“বলুন।”

জারা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“আমি আপনাকে খুব পছন্দ করি।”

শায়ন যেন কিছুক্ষণের জন্য কথা হারিয়ে ফেলল।

সে শুধু তাকিয়ে রইল।

জারা হালকা কাঁপা গলায় বলল,

“কিন্তু আমি জানি না আপনি আমাকে কীভাবে দেখেন। তাই এতদিন কিছু বলিনি।”

শায়নের চোখে বিস্ময়।

“আপনি… আমাকে পছন্দ করেন?”

জারা মৃদু হেসে বলল,

“হ্যাঁ।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আমি ভেবেছিলাম আপনি অন্য কাউকে…”

“না।”

“তাহলে বিয়ের কথা?”

“বাড়ি থেকে বলছে। আমি রাজি হইনি।”

শায়ন মাথা নিচু করল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“আমি আপনাকে অনেকদিন ধরেই পছন্দ করি।”

জারার চোখে পানি এসে গেল।

“তাহলে বলেননি কেন?”

“ভয় পেয়েছিলাম।”

“কিসের?”

“আপনাকে হারানোর।”

জারা মৃদু হেসে বলল,

“কথা না বলেও তো আমাকে হারাতে বসেছিলেন।”

শায়নও হেসে ফেলল।

“জানি।”

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

এবার নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না।

কারণ দুজনেই জেনে গেছে, তাদের মনের কথাগুলো একই জায়গায় এসে মিলেছে।

শায়ন বলল,

“আমি কাল চলে যাচ্ছি।”

“জানি।”

“তিন মাসের জন্য।”

“জানি।”

“আপনি অপেক্ষা করবেন?”

জারা একটু ভেবে বলল,

“আপনি কি ফিরে আসবেন?”

“অবশ্যই।”

“তাহলে অপেক্ষা করব।”

শায়ন মৃদু হেসে বলল,

“প্রতিদিন ফোন করব।”

“প্রতিদিন করতে হবে।”

“ঠিক আছে।”

বৃষ্টি তখনও পড়ছিল।

তারা ছাউনির নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।

কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতি ছিল না।

ছিল না বড় কোনো কথা।

শুধু দুজন মানুষের একটা সহজ সিদ্ধান্ত—

দূরত্ব আসবে, কিন্তু তারা চেষ্টা করবে সম্পর্কটা ধরে রাখতে।

পরদিন সকালে শায়ন চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হলো।

বাস ছাড়ার আগে জারা তাকে ফোন করেছিল।

“পৌঁছে ফোন করবেন।”

“করব।”

“শায়ন?”

“হুম?”

“সাবধানে থাকবেন।”

“আপনিও।”

“আর…”

“আর কী?”

জারা একটু থেমে বলল,

“আমাকে ভুলে যাবেন না।”

শায়ন হেসে বলল,

“যে মানুষকে এতদিন না বলেও মনে রেখেছি, তাকে এখন বলে দেওয়ার পর কীভাবে ভুলব?”

জারা চুপ করে গেল।

ফোন কেটে যাওয়ার পর শায়ন জানালার বাইরে তাকাল।

বাস ধীরে ধীরে শহর ছাড়ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, জীবনে প্রথমবার কোনো দূরত্ব তাকে ভয় দেখাচ্ছে না।

চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েকটা দিন শায়নের কাছে বেশ ব্যস্ততায় কেটে গেল।

নতুন অফিস, নতুন সহকর্মী, নতুন দায়িত্ব—সবকিছু বুঝে নিতে তার সময় লাগছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজের চাপ থাকত। রাতে হোটেলে ফিরে শরীর এতটাই ক্লান্ত থাকত যে বিছানায় শুয়ে পড়লেই ঘুম চলে আসত।

তবু একটা অভ্যাস সে বদলায়নি।

প্রতিদিন রাতে জারাকে ফোন করা।

প্রথম রাতেই শায়ন ফোন করেছিল।

“পৌঁছেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“কেমন লাগছে?”

“শহরটা সুন্দর। তবে…”

“তবে?”

“পরিচিত মানুষ নেই।”

জারা হেসে বলেছিল,

“আমি তো আছি।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,

“হ্যাঁ। আপনি আছেন বলেই ভালো লাগছে।”

জারা সেই কথার পর আর কিছু বলেনি।

কিন্তু ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ হাসছিল।

প্রথম সপ্তাহটা ভালোই গেল।

তারা প্রতিদিন কথা বলত। কখনো দশ মিনিট, কখনো আধঘণ্টা।

জারা তার অফিসের গল্প বলত। শায়ন চট্টগ্রামের নতুন কাজের কথা বলত।

কখনো জারা বলত,

“আজ খুব মন খারাপ।”

শায়ন জিজ্ঞেস করত,

“কেন?”

“আপনার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছে।”

শায়ন হেসে বলত,

“আর মাত্র দুই মাস তিন সপ্তাহ।”

“এত হিসাব রাখছেন?”

“অবশ্যই।”

এভাবেই তাদের সম্পর্ক চলছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহে শায়নের কাজের চাপ হঠাৎ বেড়ে গেল।

অফিসের গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের সময়সীমা এগিয়ে আনা হলো। দিনের পর দিন তাকে রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হচ্ছিল।

প্রথম দিন সে জারাকে ফোন করতে পারেনি।

রাত প্রায় বারোটায় কাজ শেষ করে ফোন হাতে নিয়ে দেখল, জারার চারটা মিসড কল।

সঙ্গে একটা মেসেজ।

জারা: সব ঠিক আছে তো?

শায়ন সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।

জারা ধরল না।

কয়েক মিনিট পর ফোন করে বলল,

“এত রাতে ফোন করছেন কেন?”

“কাজে আটকে গিয়েছিলাম।”

“একটা মেসেজ তো দিতে পারতেন।”

“দুঃখিত।”

“আমি চিন্তা করছিলাম।”

শায়ন বুঝতে পারল, জারা সত্যিই কষ্ট পেয়েছে।

“আর হবে না।”

জারা কিছু বলল না।

পরদিন আবার শায়ন রাত পর্যন্ত অফিসে থাকল।

এবারও ফোন করতে দেরি হলো।

জারা নিজে থেকে ফোন করল না।

শায়ন রাত এগারোটায় ফোন করল।

জারা ধরল।

“হ্যালো?”

“কী করছেন?”

“কিছু না।”

“খেয়েছেন?”

“হ্যাঁ।”

“রাগ করেছেন?”

“না।”

শায়ন বুঝল, এই ‘না’ কথাটার মধ্যে অনেক রাগ লুকিয়ে আছে।

“জারা…”

“হুম?”

“সত্যিই খুব কাজের চাপ।”

“আমি বুঝি।”

“তাহলে?”

“কিছু না।”

“আপনি চুপ কেন?”

জারা ধীরে বলল,

“আমি আপনার কাছ থেকে সারাদিন কথা চাই না। শুধু চাই, আপনি ব্যস্ত থাকলে একটা কথা জানান।”

শায়ন চুপ হয়ে গেল।

“আপনি জানেন, দূরে থাকলে ছোট বিষয়গুলোও বড় মনে হয়?”

“জানি।”

“আমি জানি না আপনি কী করছেন, কার সঙ্গে আছেন। শুধু জানি, আপনি দূরে।”

শায়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি চেষ্টা করব।”

“শুধু চেষ্টা না। মনে রাখবেন।”

“ঠিক আছে।”

সেদিনের পর শায়ন যত ব্যস্তই থাকুক, অন্তত একটা মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করত।

তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায় শুরু হলো।

একদিন রাতে জারা শায়নকে ফোন করে বলল,

“আজ একটা ছেলে আমাকে কফি খাওয়াতে চেয়েছে।”

শায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

“কে?”

“আমাদের অফিসের একজন।”

“আপনি গেছেন?”

“না।”

“কেন?”

“ইচ্ছা হয়নি।”

শায়নের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা স্বস্তি হলো।

কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করল না।

“আপনার ইচ্ছা হলে যেতে পারেন।”

জারা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

“আবার শুরু করলেন?”

“কী?”

“সবকিছুতেই বলেন, ‘আপনার ইচ্ছা।’”

শায়ন চুপ।

জারা বলল,

“আমি জানতে চাইছিলাম, আপনি কী ভাবেন।”

“আমি চাই না আপনি এমন কিছু করুন যাতে আপনি অস্বস্তিতে পড়েন।”

“আমি আপনার মতামত চাই।”

শায়ন এবার একটু থেমে বলল,

“আমার ভালো লাগবে না।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর জারা মৃদু হেসে বলল,

“এই কথাটাই তো শুনতে চেয়েছিলাম।”

শায়নও হাসল।

তাদের সম্পর্কটা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।

কিন্তু দূরত্বের আরেকটা সমস্যা ছিল—ভুল বোঝাবুঝি।

এক সন্ধ্যায় জারা শায়নকে ফোন করেছিল।

শায়ন ফোন ধরেনি।

কিছুক্ষণ পর সে আবার ফোন করল।

তখনও ধরেনি।

পরে জারা দেখল, শায়ন অনলাইনে আছে।

তারপরও ফোন ধরছে না।

জারার মনে সন্দেহ হলো।

সে কোনো মেসেজও দিল না।

সেদিন রাতে শায়ন ফোন করলে জারা ধরল না।

পরদিনও তাদের কথা হলো না।

শায়ন বুঝতে পারছিল না, কী হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত সে মেসেজ করল—

শায়ন: রাগ করেছেন?

কোনো উত্তর নেই।

শায়ন: ফোন ধরছেন না কেন?

কোনো উত্তর নেই।

তৃতীয়বার লিখল—

শায়ন: কিছু হয়ে থাকলে আমাকে বলুন।

অনেকক্ষণ পর জবাব এল।

জারা: আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।

শায়নের বুকটা কেমন করে উঠল।

সে ফোন করল।

জারা ধরল না।

শেষ পর্যন্ত শায়ন লিখল,

শায়ন: আমি কিছু ভুল করে থাকলে বলুন।

কিছুক্ষণ পর জারা উত্তর দিল,

জারা: আপনি অনলাইনে ছিলেন। অথচ আমার ফোন ধরেননি।

শায়ন বুঝতে পারল বিষয়টা।

“আমি অফিসের গ্রুপে একটা ফাইল পাঠাচ্ছিলাম। তাই অনলাইনে ছিলাম। ফোনটা সাইলেন্টে ছিল।”

জারা কিছু লিখল না।

শায়ন আবার বলল,

“আপনি চাইলে আমি স্ক্রিনশট পাঠাতে পারি।”

জারা উত্তর দিল,

“না।”

“তাহলে?”

“আমি শুধু ভয় পেয়েছিলাম।”

শায়ন ধীরে বলল,

“কীসের ভয়?”

“আপনি দূরে গিয়ে বদলে যাচ্ছেন।”

শায়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“জারা, আমি ব্যস্ত হতে পারি। কিন্তু বদলে যাইনি।”

“সত্যি?”

“সত্যি।”

“তাহলে একটা কথা বলুন।”

“কী?”

“আপনি কি এখনও আমাকে আগের মতোই পছন্দ করেন?”

শায়ন বিনা দ্বিধায় বলল,

“আগের চেয়েও বেশি।”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর জারা বলল,

“তাহলে ঠিক আছে।”

শায়ন হেসে ফেলল।

“এত সহজ?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এতক্ষণ রাগ করে ছিলেন কেন?”

“আপনাকে একটু ভয় দেখালাম।”

“ভালো করেছেন।”

“কেন?”

“কারণ বুঝলাম, আপনিও আমাকে হারানোর ভয় পান।”

জারা মৃদু হেসে বলল,

“পাই।”

সেই রাতের কথোপকথনের পর তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো।

তারা বুঝতে শুরু করল, শুধু ভালো লাগা দিয়ে সম্পর্ক টেকে না।

বিশ্বাস করতে হয়।

অন্যজনের ব্যস্ততা বুঝতে হয়।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মনের কথা লুকিয়ে না রেখে বলতে হয়।

এক মাস কেটে গেল।

শায়নের চট্টগ্রামে থাকার সময় প্রায় অর্ধেক শেষ।

এক রাতে সে জারাকে বলল,

“আমি একটা সারপ্রাইজ দেব।”

“কী সারপ্রাইজ?”

“বললে তো সারপ্রাইজ থাকবে না।”

“কোথাও যাচ্ছেন?”

“হয়তো।”

“আপনি খুব রহস্য করেন।”

“আর কয়েকদিন অপেক্ষা করুন।”

জারা হাসল।

কিন্তু পরদিন অফিসে শায়ন জানতে পারল, প্রজেক্টের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

তার চট্টগ্রামে থাকার সময় আরও এক মাস বাড়তে পারে।

খবরটা শুনে তার মন খারাপ হয়ে গেল।

সে জানত, জারা এই খবরটা সহজভাবে নেবে না।

সন্ধ্যায় সে জারাকে ফোন করল।

“একটা খবর আছে।”

জারা বলল,

“কী?”

“আমার প্রজেক্টের সময় বাড়ানো হয়েছে।”

“মানে?”

“হয়তো আরও এক মাস থাকতে হবে।”

ওপাশে অনেকক্ষণ নীরবতা।

তারপর জারা শুধু বলল,

“বুঝলাম।”

“আপনি রাগ করেছেন?”

“না।”

“মন খারাপ?”

“হ্যাঁ।”

শায়ন চুপ করে গেল।

জারা ধীরে বলল,

“আমি জানি আপনার দোষ না। কিন্তু মানুষ তো সবসময় যুক্তি দিয়ে মন সামলাতে পারে না।”

শায়ন বলল,

“আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসব।”

“জানি।”

“আপনি অপেক্ষা করবেন?”

জারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“অপেক্ষা করব।”

তারপর হঠাৎ জারা বলল,

“কিন্তু একটা কথা।”

“হুম?”

“আপনি ফিরে এসে যদি দেখেন, আমি আগের জায়গায় নেই?”

শায়নের বুক কেঁপে উঠল।

“মানে?”

“জানি না। সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।”

শায়ন আর কোনো কথা বলতে পারল না।

ফোন কেটে যাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে প্রথমবার একটা ভয় জন্ম নিল—

ভালোবাসা পাওয়া যতটা কঠিন, সেটা ধরে রাখা হয়তো তার থেকেও কঠিন।

চট্টগ্রামে শায়নের থাকার সময় শেষ হওয়ার কথা ছিল তিন মাসে। কিন্তু প্রজেক্টের কাজ বাড়ায় সময়টা আরও এক মাস পিছিয়ে গেল।

এই একটা মাস যেন দুজনের কাছেই খুব দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল।

প্রথমদিকে প্রতিদিন ফোনে কথা বলা, একে অপরের দিন কেমন গেল জানতে চাওয়া—সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, দুজনের মধ্যেই একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল।

জারা বুঝতে পারছিল, শায়নকে সে শুধু পছন্দ করে না। তার জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন শায়নকে ভাবতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে শায়নও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, চট্টগ্রাম থেকে ফিরে সে আর কোনো কথা নিজের মধ্যে আটকে রাখবে না।

কিন্তু মানুষ যত পরিকল্পনাই করুক, জীবন সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না।

এক শুক্রবার সকালে জারার মা তাকে ডেকে বললেন,

“ছেলেটার পরিবার আবার ফোন করেছে।”

জারা চুপ করে রইল।

“তুই যদি কাউকে পছন্দ করিস, আমাদের বল।”

জারা মাথা নিচু করে বলল,

“আছে একজন।”

মা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“সে কি তোকে বিয়ে করতে চায়?”

জারা থেমে গেল।

এই প্রশ্নটার উত্তর তার জানা নেই।

শায়ন তাকে ভালোবাসে, এটা সে জানে।

কিন্তু বিয়ের কথা তারা কখনো বলেনি।

মা বললেন,

“শুধু ভালো লাগা দিয়ে তো সংসার হয় না। মানুষটার ইচ্ছাটাও জানতে হয়।”

জারা বুঝল, এবার তাকে শায়নের সঙ্গে পরিষ্কার কথা বলতেই হবে।

সেদিন রাতেই সে শায়নকে ফোন করল।

“আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”

“বলুন।”

“আপনি কবে ফিরবেন?”

“আর দশ দিন।”

“তারপর?”

“তারপর সরাসরি বাসায় যাব।”

“আমার সঙ্গে দেখা করবেন?”

শায়ন একটু হেসে বলল,

“অবশ্যই।”

জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“শায়ন, আপনি কি আমাকে বিয়ে করতে চান?”

প্রশ্নটা শুনে শায়ন একেবারে নীরব হয়ে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

“হ্যাঁ।”

জারার চোখ ভিজে উঠল।

“সত্যি?”

“সত্যি।”

“তাহলে এতদিন বলেননি কেন?”

শায়ন হেসে বলল,

“আমি ভেবেছিলাম, আগে আপনাকে নিশ্চিত হতে দিই।”

“আমি তো অনেক আগেই নিশ্চিত।”

“তাহলে?”

“আপনি তো কখনো জিজ্ঞেস করেননি।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

কথার শেষে শায়ন বলল,

“আমি ফিরে এসে আপনার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

“আমার পরিবারকে আমি বলব।”

“ঠিক আছে।”

“আর একটা কথা।”

“হুম?”

“এবার কিন্তু কোনো কথা লুকাবেন না।”

“লুকাব না।”

দশ দিন পর শায়ন ঢাকায় ফিরল।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই সে প্রথমে জারাকে ফোন করল।

“আমি ফিরে এসেছি।”

ওপাশ থেকে জারার হাসির শব্দ শোনা গেল।

“জানি।”

“কীভাবে?”

“আপনার ফ্লাইটের সময় আমি জানতাম।”

শায়ন হেসে বলল,

“তাহলে আপনি আমাকে সারপ্রাইজ করার সুযোগ দিলেন না।”

“আপনিও তো আমাকে আগে থেকে বলেননি।”

“আজ দেখা হবে?”

“হবে।”

সন্ধ্যায় তারা দেখা করল সেই পুরোনো পার্কে।

যেখানে প্রথমবার তারা নিজেদের অনুভূতির কথা বলেছিল।

জারা একটা হালকা রঙের পোশাক পরে এসেছিল। শায়ন তাকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

জারা বলল,

“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

“অনেকদিন পর দেখছি।”

“চার মাস।”

“হ্যাঁ।”

“মনে হয়েছিল ভুলে যাবেন?”

শায়ন মাথা নাড়ল।

“অসম্ভব।”

তারা বেঞ্চে বসে অনেকক্ষণ কথা বলল।

চট্টগ্রামের গল্প, অফিসের গল্প, দূরে থাকার সময়কার ভুল বোঝাবুঝি—সবকিছু।

একসময় জারা বলল,

“আমরা একটা জিনিস শিখেছি।”

“কী?”

“মনের কথা না বললে সম্পর্ক খুব সহজেই ভুল বোঝাবুঝিতে চলে যায়।”

শায়ন বলল,

“তাই তো এখন থেকে কিছু লুকাব না।”

“আমিও না।”

কয়েকদিন পর শায়ন জারার পরিবারের সঙ্গে দেখা করল।

প্রথমে জারার বাবা কিছুটা কঠিন ছিলেন।

তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,

“আপনি আমার মেয়েকে কেন বিয়ে করতে চান?”

শায়ন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

“কারণ ওর সঙ্গে থাকলে আমার মনে হয়, আমি নিজের মতো থাকতে পারি।”

জারার বাবা চুপ করে শুনলেন।

শায়ন আবার বলল,

“আমি ওকে বড় কোনো স্বপ্ন দেখাতে চাই না। শুধু চাই, আমরা দুজন মিলে নিজেদের জীবনটা গুছিয়ে নিতে পারি। আমার হয়তো সবকিছু এখনই দেওয়ার সামর্থ্য নেই। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা আছে।”

জারার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“তুমি কি আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে?”

শায়ন মৃদু হেসে বলল,

“আমি চেষ্টা করব। তবে একটা কথা বলতে পারি—ও যদি কোনোদিন কষ্ট পায়, আমি চাই না সেটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখুক।”

জারার বাবা তাকিয়ে রইলেন।

“কেন?”

“কারণ আমরা দুজনেই বুঝেছি, না বলা কথাই সবচেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি করে।”

ঘরের একপাশে বসে থাকা জারা চুপচাপ কথাগুলো শুনছিল।

তার চোখে তখন পানি।

কিছুক্ষণ পর জারার বাবা বললেন,

“তোমাদের সম্পর্ক যদি সত্যিই এতটা বোঝাপড়ার হয়, তাহলে আমার আপত্তি নেই।”

জারা মাথা নিচু করে ফেলল।

শায়ন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

তবে গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি।

কারণ শায়নের পরিবারেও কিছু প্রশ্ন ছিল।

তার মা জানতে চাইলেন,

“মেয়েটা কি চাকরি করবে?”

শায়ন বলল,

“ও চাইলে করবে।”

“বিয়ের পর?”

“হ্যাঁ।”

মা একটু চুপ করে থেকে বললেন,

“সংসার আর চাকরি দুটো সামলানো সহজ না।”

শায়ন শান্ত গলায় বলল,

“সিদ্ধান্তটা ওরও হওয়া উচিত।”

মা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“তুই সত্যিই মেয়েটাকে খুব পছন্দ করিস।”

শায়নও হেসে বলল,

“হ্যাঁ।”

শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারই রাজি হলো।

বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার আগে এক সন্ধ্যায় শায়ন আর জারা আবার সেই পার্কে বসেছিল।

জারা বলল,

“মনে আছে, প্রথম দিন আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—আপনি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?”

শায়ন হেসে বলল,

“মনে আছে।”

“আপনি এখনও চুপচাপ।”

“আগের চেয়ে কম।”

“কেন?”

“কারণ এখন আমার একজন আছে, যার কাছে কথা বলতে ইচ্ছে করে।”

জারা মৃদু হেসে বলল,

“আর যদি আমি কোনোদিন আপনার ওপর রাগ করি?”

“তখন কথা বলব।”

“আমি যদি কথা না বলি?”

“তাহলে অপেক্ষা করব।”

“কতক্ষণ?”

“যতক্ষণ না আপনি বলেন।”

জারা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আর যদি আমি বলি, আপনি আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকবেন?”

শায়ন হেসে বলল,

“তাহলে আমি বলব—তুমি যদি বলো, আমি থাকব।”

জারা হেসে ফেলল।

তারপর কিছুক্ষণ দুজন নীরবে বসে রইল।

এই নীরবতা আগের মতো ছিল না।

এখন সেখানে ভয় ছিল না।

ছিল না অনিশ্চয়তা।

ছিল এক ধরনের শান্তি।

তারা বুঝে গিয়েছিল, ভালোবাসা শুধু একে অপরকে পছন্দ করার নাম নয়।

ভালোবাসা মানে নিজের মনের কথা বলতে পারা।

অন্যজনের কথা শুনতে পারা।

ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া।

দূরে থাকলেও বিশ্বাস রাখা।

আর সবচেয়ে বড় কথা—কোনো সিদ্ধান্ত একা না নিয়ে দুজন মিলে নেওয়া।

কয়েক মাস পর তাদের বিয়ে হলো।

বিয়ের দিন জারা শায়নকে বলল,

“একটা কথা মনে আছে?”

“কী?”

“আপনি একদিন বলেছিলেন, আমাকে ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ আমি নই।”

“মনে আছে।”

“তখন বিশ্বাস করিনি।”

“এখন?”

জারা মৃদু হেসে বলল,

“এখন জানি।”

শায়ন বলল,

“আর আমি জানি, কিছু কথা সময়মতো না বললে সম্পর্ক হারিয়ে যেতে পারে।”

জারা বলল,

“তাই তো বলেছিলাম—কথা লুকাবেন না।”

“আর লুকাব না।”

....
👁 51