নীরবতার দেয়াল ভাঙার রাত

বৃষ্টিস্নাত এক সকালে বাবার বদলির চাকরি ব্যবসার খাতিরে নতুন শহরে পা রেখেছিল নিশি। এক চিলতে নতুন বাড়ি, অচেনা পরিবেশ আর অপরিচিত কিছু মানুষের ভিড়ে সে একেবারেই মানিয়ে নিতে পারছিল না। তবে সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল তার নতুন স্কুল নিয়ে। নবম শ্রেণীতে মাঝপথে এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়াটা তার জন্য বেশ কষ্টের এক অভিজ্ঞতা।

স্কুলের লাল ইটের চারতলা ভবনটার সামনে দাঁড়িয়ে নিশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে স্বভাবগতভাবেই ভীষণ প্রাণবন্ত আর দুষ্টু প্রকৃতির মেয়ে। পড়াশোনায় কোনোমতে পার পেয়ে গেলেও হাসি-ঠাট্টা আর চঞ্চলতায় মাতিয়ে রাখাই ছিল তার অভ্যাস। নিজের ক্লাসরুমে ঢুকে সবাইকে একটু পরখ করে নিতে নিতেই শিক্ষকের আগমন।

শিক্ষক নিশিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পেছনের একটি বেঞ্চে বসতে বললেন। ঠিক তখনই নিশির চোখ গেল প্রথম বেঞ্চে বসা এক শান্ত, গম্ভীর ছেলের দিকে। চোখে চশমা, একদম চুপচাপ নিজের বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিয়ে বসে আছে সে।

ক্লাস শেষ হতেই নিশি তার পাশের মেয়েটির দিকে ফিরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, ওই সামনের রো-তে গম্ভীর হয়ে বসে থাকা ছেলেটা কে রে?"

মেয়েটি হেসে বলল, "ও আদনান। আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়। পড়াশোনা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো দিকে ওর কোনো খেয়াল নেই। কারও সাথে অপ্রয়োজনে কথাও বলে না।"

নিশি এক ভ্রূ উঁচিয়ে আদনানের দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, "এত ভাব কিসের লোকটার? দেখি তো কতদিন এভাবে গম্ভীর থাকা যায়!"

কিন্তু আদনান ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ধাতুতে গড়া। নিশির মতো চঞ্চল মেয়ে যেখানে সারাদিন ক্লাসে হাসাহাসি আর দুষ্টুমিতে মেতে থাকত, আদনান সেখানে বইয়ের পাতায় ডুবে শান্ত এক পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে নিজের দায়িত্ব সামলাত। প্রথম দিন থেকেই এই দুটি বিপরীত মেরুর মানুষের এক অদ্ভুত নীরব যাত্রা শুরু হলো।

দিন যত যেতে লাগল, নিশির চঞ্চলতা আর দুষ্টুমিতে ক্লাস যেন সবসময় মুখরিত থাকত। কিন্তু এত হাসাহাসির মাঝেও নিশির নজর বারবার আটকে যেত ক্লাসের সেই শান্ত, গম্ভীর ছেলেটির ওপর। আদনানের আত্মমর্যাদা আর বইয়ের পাতায় ডুবে থাকার শান্ত স্বভাবটা অদ্ভুত এক আকর্ষণে বাঁধতে শুরু করল নিশিকে। পড়াশোনায় নিশি ছিল একেবারে ঢিলেঢালা, যাকে বলে পুরোপুরি ‘গাধা’ টাইপ। পড়া না পারার জন্য শিক্ষকদের বকুনি খাওয়াটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর অন্যদিকে আদনান প্রতিটা প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর দিয়ে শিক্ষকদের প্রশংসা কুড়াত।

ধীরে ধীরে নিশির মনের এক কোণে আদনানের জন্য ভালো লাগা ডালপালা মেলতে শুরু করল। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসে সে না চাইতেও বারবার আদনানের কথা তুলে ফেলত।

বান্ধবীরা নিশির এই পরিবর্তন খেয়াল করে ওকে নিয়ে খ্যাপাতে ছাড়ত না। ক্লাসের ফাঁকে নিশির এক বান্ধবী চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলল, "নিশি, তুই যেভাবে সারাদিন আদনানের দিকে তাকিয়ে থাকিস, সরাসরি গিয়ে একটা ‘আই লাভ ইউ’ বললেই তো পারিস! এত ভেবে লাভ কী?"

নিশি চোখ বড় বড় করে বলল, "ধুর! তোরা কী যা তা বলিস! ওই রোবটটাকে দেখে মনে হয় না ও জীবনে পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু বোঝে।"

বান্ধবীরা হেসে ওঠে, "চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? কে জানে, হয়তো তোর চঞ্চলতা ওর ওই গম্ভীর মনের বরফ গলিয়ে দেবে!"

বান্ধবীদের কথায় নিশি গা না দিলেও, মনে মনে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকতে পারত না। আদনানকে লুকিয়ে দেখার মিষ্টি অনুভূতিগুলো তার মনজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

নিশিরা যে ভাড়া বাড়িতে থাকত, তার সামনের রাস্তাটা ছিল চমৎকার শান্ত ও গাছপালায় ঘেরা। প্রতিদিন বিকেলে সেই নিরিবিলি রাস্তায় একটু হাঁটা নিশির অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তেমনি এক বিকেলে, নিশি একা একা রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল। বিকেল গড়িয়ে তখন গোধূলির লাল আলো ছেয়ে গেছে চারপাশে।

হঠাৎ পেছন থেকে প্যাডেলের পরিচিত একটা শব্দ পেয়ে নিশি পেছনে ফিরে তাকাল। দেখে, আদনান ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে তার দিকেই আসছে।


সাইকেল চালিয়ে আদনান নিশির পাশ দিয়ে একপলক না তাকিয়েই পেরিয়ে গেল। নিশি একটু অবাক হলো। মনে মনে ভেবেছিল অন্তত একটা কুশল বিনিময় হবে, কিন্তু আদনান সোজা তাকিয়ে অন্য রাস্তায় মোড় নিল।

মনটা একটু খারাপ করেই নিশি বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে সাইকেলের ব্রেকের আওয়াজ। নিশি ফিরে তাকিয়ে দেখে আদনান সাইকেল ঘুরিয়ে ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আদনানের শান্ত চোখ দুটি নিশির ওপর নিবদ্ধ। গম্ভীর গলায় সে বলে উঠল, "এই শুনশান রাস্তায় মেয়েদের একা একা এভাবে ঘুরে বেড়াতে নেই।"

নিশি মেজাজ একটু চড়িয়ে জবাব দিল, "আমি থাকব কি না থাকব, তাতে তোমার কী?"

আদনান সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নিশি এবার তার ভেতরের জমে থাকা কৌতুহল আর ধরে রাখতে পারল না। কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে চেপে রাখা মিষ্টি গলায় বলল, "আচ্ছা, আমি তো অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম... কিন্তু তুমি তো আমার প্রশ্নের উত্তরই দাওনি কখনো।"

আদনান নিশির দিকে এক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে নিচু গলায় বলল, "আই লাভ ইউ টু।"

কথাটা বলেই আদনান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। প্যাডেলে চাপ দিয়ে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে চলে গেল।

নিশি হতবাক হয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে রইল। আদনানের মুখ থেকে আসা এই তিনটি শব্দ যেন পুরো পৃথিবীর আলো এক নিমেষে তার চোখের সামনে জ্বেলে দিল। খুশিতে আর আনন্দে নিশির আড়ালে থাকা মনটা আত্মহারা হয়ে উঠল। সে এক ছুটে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল, তার মনে হচ্ছিল সে যেন ডানায় ভর দিয়ে উড়ছে।

সেই বিকেলের পর থেকে নিশি আর আদনানের রসায়নটা একদম বদলে গেল। দুজন লুকিয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করল। আদনান প্রেম করলেও তার দায়িত্ববোধ কখনোই কমেনি। ফোনেও সে নিশিকে নিয়ে ভীষণ যত্নশীল ছিল। সবসময় ভালোবাসার মিষ্টি কথা ছাড়াও পড়াশোনার তাগিদ দিত।

"নিশি, কাল কিন্তু গণিত পরীক্ষা। আড্ডা না মেরে বই নিয়ে বসো। ভালো করে পড়তে হবে," আদনান ফোনে বললেই নিশি একটু অভিমান করে রাগত, "উফ! তুমি কি আমার প্রেমিক নাকি টিউশন টিচার? সারাদিন খালি পড়তে বলো!"

আদনান হালকা হেসে বলত, "পড়াশোনা না করলে কিন্তু ফিউচারে আমার পাশে মানাবে না, তাই ভালো করে পড়ো।"

এই মধুর দিনগুলোর মাঝেই স্কুলে নেমে এলো এক কালো ছায়া। নিশিকে স্কুলের একটা ছেলে বেশ পছন্দ করত। ছেলেটা একটু গুন্ডা টাইপের, মাস্তান প্রকৃতির—যার ভয়ে স্কুলের বাকি ছাত্ররা সবসময় কাঁপত।

একদিন ক্লাসের ফাঁকে নিশি, আদনান আর তাদের বন্ধুরা মিলে কাগজের বিমান বানিয়ে ছোড়াছুড়ি করছিল। হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকা নিশিকে দেখে ওই গুন্ডা টাইপের ছেলেটার সহ্য হলো না। সে রাগে গজগজ করতে করতে ক্লাসে ঢুকে সোজাসুজি আদনানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আদনানের কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও ছেলেটা হিংসার বশে আদনানের শার্টের কলার চেপে ধরতে গেল। আদনান শান্ত থাকলেও পুরো ক্লাসে একটা থমথমে পরিবেশ তৈরি হলো।

ঠিক তখনই নিশি এক মুহূর্তে ছিটকে এসে ছেলেটার আর আদনানের মাঝে দাঁড়াল। ছেলেটার হাত সরিয়ে দিয়ে চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল, "খবরদার! একদম ওর গায়ে হাত দেবে না! সাহস কত তোর!"

নিশির এই সাহসী রূপ দেখে ক্লাসের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। ছেলেটা থতমত খেয়ে কটমট করে তাকিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হলো।

ঘটনাটির পর থেকে আদনান নিশিকে আরও গভীর নজর আর যত্নে আগলে রাখতে শুরু করল। পরদিন বিকেলে ফোনে নিশিকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "নিশি, কাল থেকে স্কুলে আসার সময় শালীনভাবে বোরকা পরে আসবে। বাইরে চারপাশের মানুষ ভালো না, আমি চাই না কেউ তোমার দিকে অন্যভাবে তাকাক।"

আদনানের এই ভালোবাসা ভরা আবদার নিশি হাসিমুখে মেনে নিল এবং বোরকা পরেই স্কুলে যাওয়া শুরু করল। কিন্তু সুখের এই আবহাওয়া যে দীর্ঘস্থায়ী হবে না, তা নিশির জানা ছিল না।

বোরকা পরে স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর নিশির জীবনটা যেন আরও শান্ত আর মিষ্টি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আদনানের সবকথার মাঝে একটা জেদ সবসময় একই থাকত—"পড়াশোনাটা ঠিকঠাক করো, নিশি।" নিশি বানাও বানাও করে পড়াশোনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আদনানের ধমক আর ভালোবাসার চাপে বই খুলতেই হতো।

সবকিছু যখন স্বপ্নের মতো সুন্দর চলছিল, ঠিক তখনই একদিন টিফিনের সময়ে ঘটে গেল বড় একটা ধাক্কা।

নিশি ক্লাসের কোণে বসে বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিল। হঠাৎ তার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মুখ থমথমে করে এসে তার পাশে বসল। চারপাশটা ভালো করে দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "নিশি, তোকে একটা কথা না বললেই নয়। তুই আদনানকে নিয়ে এত ভাবিস, কিন্তু আদনান তোকে ধোঁকা দিচ্ছে!"

নিশি চমকে উঠে বান্ধবীর দিকে তাকাল। হেসে বলল, "কী যা তা বলছিস? আদনান আমাকে খুব ভালোবাসে, আমি জানি।"

"ভালোবাসে ছাই!" বান্ধবী রেগে বলল, "ওর অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে, আর সেটা তোদের প্রেমের অনেক আগে থেকেই চলে আসছে।"

নিশির বুকের ভেতরে যেন একটা বরফখণ্ড এসে জমা হলো। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার। থমকে যাওয়া গলায় সে জিজ্ঞেস করল, "কে... কে সে মেয়ে?"

বান্ধবী মাথা নেড়ে বলল, "নামটা আমি এখন বলতে পারব না। তবে তুই একটু চোখ-কান খোলা রাখ, নিজেই বুঝতে পারবি।"

সেই দিনের পর থেকে নিশি খেয়াল করল, আদনান সত্যিই যেন ওকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। ফোনে আগের মতো দীর্ঘ সময় কথা বলে না, দেখা হলে নজর সরিয়ে নেয়, স্কুলের মাঠে ওকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায়।

নিশির মনের ওপর কষ্টের এক মস্ত পাহাড় চেপে বসল। একদিন সহ্যের বাঁধ ভাঙলে সে আবার সেই বান্ধবীকে ডেকে চাপ দিল।

বান্ধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "নিশি, বৃথা আশা করিস না। আদনান আমাকে স্পষ্ট বলেছে যেন তোকে ওর পেছনে ঘুরতে নিষেধ করি। ও অন্য মেয়ের সাথেই সিরিয়াস রিলেশনে আছে।"

"আমাকে শুধু বল মেয়েটা কে?" নিশির চোখে তখন জল টলমল করছে।

বান্ধবী এবার সত্যিটা বলেই দিল, "আরে, আমরা যে কোচিংয়ে প্রাইভেট পড়তে যাই, সেখানে যে অন্য স্কুলের মেয়েটা পড়ে—ওই মেয়েটাই আদনানের আসল প্রেমিকা।"

কথাটা শোনামাত্র নিশির পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। যে আদনান ওকে শালীনতার পাঠ দিত, পড়াশোনার কথা বলে আগলে রাখত—সে আদনান এতদিন ধরে তার সাথে স্রেফ একটা অভিনয় করছিল!

বুকের ভেতর অসীম যন্ত্রণা আর অভিমান চেপে নিশি সিদ্ধান্ত নিল, সে আর কখনো এই লোকটার সামনে নিজেকে ছোট করবে না। নিজেকে আড়াল করে নীরব এক দূরত্বে সরিয়ে নিল সে।

আদনানের প্রতারণার ধাক্কা সামলানো নিশির জন্য সহজ ছিল না। প্রতিদিন ক্লাসে একই ঘরে বসে তাকে দেখেও না দেখার ভান করে থাকাটা ছিল মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক। তবু নিশি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়নি। আদনানের সাথে সব যোগাযোগ পুরোপুরি ছিন্ন করে সে এক নীরব দেয়াল তুলে দিল।

ধীরে ধীরে কেটে গেল তিন তিনটি বছর।

এসএসসি পরীক্ষার পর নিশির বাবার ব্যবসার সুবিধার্থে তারা সেই ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানায় নিজ শহরে ফিরে গেল। পুরনো শহরের ধুলাবালি, স্কুলের স্মৃতি আর আদনানের প্রতারণার ইতিহাসকে নিশি অতীতেই চাপা দিয়ে রেখে এলো।

নতুন শহর, নতুন কলেজ আর এক সম্পূর্ণ নতুন নিশি। আগের সেই পড়ালেখায় ‘গাধা’ আর সারাদিন দুষ্টুমি করে বেড়ানো চঞ্চল মেয়েটি যেন একঝটকায় পরিণত হয়ে গেল। জীবনের মোড় ঘোরাতে পড়াশোনায় মন দিল সে পুরোদমে। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় তাকে সাফল্যের মুখ দেখাতে শুরু করল। গ্রাজুয়েশন শেষ করে নিশি নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে মনোযোগ দিল।

এদিকে, তার বয়সের সাথে সাথে পরিবার থেকে বিয়ের একের পর এক ভালো প্রস্তাব আসতে লাগল। কিন্তু নিশি কোনো প্রস্তাবেই রাজি হতো না। পুরুষের প্রতি, বিশেষ করে ভালোবাসার ওপর থেকে তার বিশ্বাসটা যেন চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। মনটা তার সবসময় গম্ভীর আর শান্ত থাকত।

অন্যদিকে, আদনানের জীবনে ঘটেছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক নাটকীয়তা। নিশিদের চলে যাওয়ার কিছুদিন পর যে মেয়েটির জন্য আদনান নিশিকে ঠকিয়েছিল, সেই মেয়েটি আদনানকে ধোঁকা দিয়ে অন্য এক ধনী ছেলের সাথে পালিয়ে যায়।

পাপের প্রায়শ্চিত্ত যেন হাতেনাতে পেল আদনান। নিশির সাথে যা করেছিল, ঠিক সেটাই ওর সাথে ঘটল। চরম অনুশোচনা আর কষ্টে আদনানের মন ভেঙে খানখান হয়ে গেল। তবে ভেঙে পড়লেও আদনান নিজেকে সামলে নিয়ে পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারে ডুবে গিয়েছিল।

কাউকে কিছু না জানিয়ে সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে দুটি মানুষকে একই শহরের অচেনা এক ঠিকানায় নিয়ে এলো। ভাগ্যের এক অদ্ভুত খেলায় নিশি আর আদনান দুজনেই শহরের একটি নামজাদা বহুজাতিক সংস্থায় (Corporate Office) উচ্চ পদে চাকরি পেল। কিন্তু কেউই জানত না, এক ছাদের নিচেই কাজ করতে চলেছে তাদের অতীত।

নতুন অফিসে জয়েন করার পর কাজের চাপে নিশির দিনগুলো বেশ ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই কাটছিল। চমৎকার কাজের দক্ষতায় খুব দ্রুতই সে বসের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তবে ভাগ্যের পরিহাস যে কতখানি নিখুঁত, তা নিশির ধারণার বাইরে ছিল।

অফিসের প্রথম সপ্তাহে এক জরুরি মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। নিশি মিটিং রুমের গ্লাস ডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকে নিজের জন্য একটা চেয়ার টেনে বসল। ঠিক তখনই উল্টো দিকের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো একজন সুপুরুষ, ব্ল্যাক সুট পরা তরুণ।

চোখা চশমা, গম্ভীর চেহারা আর চেনা হাঁটার ধরণ—এক পলক তাকাতেই নিশির হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। আদনান!

আদনানও ফাইল হাতে নিশির দিকে চোখ ফেলতেই থমকে দাঁড়াল। নিশির পরিপক্ক সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব আর চোখের শান্ত চাহনি তাকে এক লহমায় অতীতের সেই বোরকা পরা চঞ্চল মেয়েটার কথা মনে করিয়ে দিল।

দুজনের চোখাচোখি হলো। দীর্ঘ বছরের জমে থাকা নীরবতা আর কষ্ট যেন সেই কয়েক সেকেন্ডে বাতাসের মতো ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু নিশি নিজেকে সামলে নিল দ্রুত। সে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ফাইলের পাতায় মন দিল, যেন আদনান ওর কাছে সম্পূর্ণ অচেনা একজন সাধারণ সহকর্মী মাত্র।

মিটিং শেষে সবাই বের হয়ে গেলেও নিশি নিজের টেবিলে গিয়ে কাজে ডুবে গেল। আদনান দূর থেকে নিশিকে খেয়াল করছিল। তার ভেতরে অনুশোচনার আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল। যে নিশি একসময় তার একটি কথার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত, আজ সে তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের মতো শান্ত ভঙ্গিতে কাজ করে যাচ্ছে।

অফিসের করিডোরে বা লিফটে প্রায়ই তাদের মুখোমুখি দেখা হতো। আদনান কিছু বলতে চাইলেও নিশির বরফশীতল নীরবতা তাকে থামিয়ে দিত। নিশি কখনো আদনানের দিকে দ্বিতীয়বার তাকাত না, কথা বলা তো দূরের কথা।

আদনান বুঝতে পারছিল, নিশির এই নীরবতা কোনো সাধারণ রাগ নয়—এটা এক গভীর অভিমানের দেয়াল, যা পার হওয়া বড্ড কঠিন।

দিনের পর দিন অফিসে একই ফ্লোরে কাজ করলেও নিশির সেই অনমনীয় দূরত্ব আদনানকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। সে হাজারবার চেষ্টা করেছে নিশির মুখোমুখি হয়ে নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করতে, কিন্তু নিশি তাকে সেই সুযোগ বিন্দুমাত্র দেয়নি।

সেদিন সকাল থেকেই আকাশ ছিল চরম মেঘলা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। সাথে কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর গুমোট এক পরিবেশ। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা বেজে গেছে। অফিসের স্বাভাবিক ছুটির সময় পার হয়ে যাওয়ায় একে একে সব সহকর্মীই বাড়ি ফিরে গেছে।

কিন্তু নিশির তখনও জরুরি একটা প্রেজেন্টেশনের কাজ বাকি ছিল। টেবিলে ল্যাপটপ খুলে একমনে কাজ করে যাচ্ছিল সে।

পুরো ফ্লোরে তখন নিশি ছাড়া আর একজন মানুষই উপস্থিত ছিল—আদনান। নিজের কাঁচের কেবিন থেকে নিশিকে একা বসে কাজ করতে দেখে আদনান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এতদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা অনুশোচনার ভারটা সে আজ হালকা করতে চায়।

আদনান ধীরপায়ে কেবিন থেকে বের হয়ে নিশির টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

নিশি টাইপিং থামিয়ে ঠান্ডা চোখে একপলক আদনানের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো কথা বলল না। একদম উদাসীন ভঙ্গিতে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে নজর দিল।

আদনান একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু, করুণ গলায় বলে উঠল, "নিশি... প্লিজ, একটা মিনিট আমার কথা শুনবে? আমি জানি আমি অতীতে তোমার সাথে অনেক বড় অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি আমার ভুলের শাস্তি পেয়েছি। আমি ক্ষমা চাওয়ার যোগ্যও নই, তাও বলছি... আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না?"

নিশি কাজ থামাল। শান্ত ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর অফিসের বড় গ্লাস উইন্ডো বা কাঁচের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি পড়ে চলেছে, কাঁচের ওপর ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে।

নিশি জানালার বাইরে তাকিয়ে এক গাল তিক্ত মিষ্টি হাসি হেসে অভিমানী গলায় বলল, "তোমাকে তো আমি অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি আদনান। ক্ষমা না করলে এই কষ্টটা বুকে নিয়ে এতদিন বাঁচতে পারতাম না। কিন্তু ক্ষমা করা আর ভুল ভুলে যাওয়া দুটো এক জিনিস নয়।"

আদনান অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল।

ঠিক সেই মুহূর্তে এক বিকট শব্দে মেঘ ডেকে উঠল আর পুরো অফিসের কারেন্ট চলে গেল! চারপাশ মুহূর্তের মধ্যে নিছক অন্ধকার আর শুনশান নীরবতায় ডুবে গেল।

অন্ধকারকে নিশি চিরকালই ভীষণ ভয় পায়। হঠাৎ আলো নিভে যাওয়ায় ভয়ে নিশির গলা দিয়ে মৃদু চিৎকার বের হয়ে এলো, "আহা!"

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পুরো অফিস ফ্লোর নিমিষে গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেল। বাইরে বৃষ্টির অঝোর ধারা আর থেকে থেকে মেঘের গর্জন—সব মিলিয়ে পরিবেশটা নিশির ভেতরের শৈশবের ভয়টাকে এক মুহূর্তে জাগিয়ে তুলল। ছোটবেলা থেকেই অন্ধকারের ভয়টা তার সঙ্গী, আর হঠাৎ এমন আঁধারে সে দিশেহারা হয়ে নিজের অজান্তেই পিছিয়ে গেল।

আদনান নিশির অন্ধকারের ভয়ের কথা ভুলেনি। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে অন্ধকারের মধ্যেই হাতড়ে নিশির কাছে চলে এলো। আলতো কিন্তু শক্ত করে নিশির হিমশীতল হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।

আদনানের স্পর্শ পেতেই নিশির হুঁশ ফিরল। বুকের ভেতরের জমে থাকা বহু বছরের রাগ, ক্ষোভ আর অভিমান আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠল। সে হাত ছাড়ানোর প্রাণপন চেষ্টা করে চিল চিৎকার করে উঠল, "ছাড়ো! আমার হাত ছাড়ো বলছি! একদম দূরে যাও আমার থেকে! এত বছর পর আবার কেন এসেছ আমার সামনে?"

কিন্তু আদনান হাত ছাড়ল না। বরং আরেকটু কাছে এসে নিশিকে আগলে ধরে অনুশোচনায় ভরা গলায় বলল, "নিশি, শান্ত হও। প্লিজ, আমি তোমাকে কোনো ক্ষতি করব না। খালি একটু শান্ত থাকো।"

ঠিক তখনই জানালার বাইরে এক বিকট শব্দে বিজলি চমকে উঠল। তীব্র সাদা আলো এক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘরটাকে আলোকিত করে তুলল, সাথে কানফাটা গর্জন। ভয়ে নিশির হাত-পা একদম অবশ হয়ে এলো। আত্মরক্ষার সহজাত টানে নিশি নিজের সব অভিমান আর দূরত্ব ভুলে একঝটকায় আদনানের বুকে মুখ লুকিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আদনানের গায়ের চেনা সুবাস, বুকের ধুকপুকানি আর ওম—সবকিছু নিশিকে বহু বছর পেছনে সেই কিশোরী বয়সে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। আদনানের হাত দুটিও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিশির পিঠে জড়িয়ে গেল। অন্ধকার ঘরে, ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে দুটো ক্ষতবিক্ষত হৃদয় যেন বহু বছর পর আবার এক পরম আশ্রয়ের সন্ধান পেল।

আদনান নিশির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে আর কোনোদিন ছেড়ে যেও না নিশি... আমি সত্যি খুব একা।"

নিশি আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না। আদনানের উষ্ণ বুকে কান দিয়ে সে অনুভব করল, অপরাধবোধ আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত দোলাচল তাদের দুজনকেই ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টির শব্দ আর অন্ধকার ঘরে নিশির হৃদস্পন্দন তখন আদনানের বুকের ধুকপুকানির সাথে মিশে গেছে। কিছুটা সময় পর যখন নিশির ভয়টা একটু কমল, সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আদনান এবার আর নিশিকে দূরে যেতে দিল না। আলতো করে নিশির দু'হাত ধরে জানালার কাছে নিয়ে এলো।

বাইরে তখন বিজলির আলোয় শহরের পথঘাট ভিজে একাকার। আদনান নিশির চোখে চোখ রেখে বলল, "নিশি, অতীতের প্রতিটি ভুলের জন্য আমি অনুতপ্ত। যে অন্ধকার আজ আমাদের এক করল, আমি আর কখনো সেই আঁধার আমাদের মাঝে আসতে দেব না। তুমি কি আমাকে শেষ একটা সুযোগ দেবে? তোমার বাকি জীবনটার সঙ্গী হওয়ার সুযোগ?"

নিশির চোখ দিয়ে দু-ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। তবে সেটা আর কষ্টের জল ছিল না, ছিল বহু বছরের জমানো বরফ গলে যাওয়ার জল। সে আর কোনো কথা না বলে নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতির বার্তা দিল।

কয়েকটা দিন পর, কারোর কোনো তাড়া বা সামাজিক ঘটাটপ ছাড়াই দুটি পরিবারকে একসাথে যুক্ত করা হলো। নিশি আর আদনানের অতীতের ভুলবোঝাবুঝি দূর করে পারিবারিকভাবেই অত্যন্ত সসম্মানে ও সাধারণ আয়োজনে তাদের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হলো।

বিয়ের রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল নিশি। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। আদনান পেছন থেকে এসে নিশির গায়ে একটা সুতির চাদর জড়িয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল, "মনে আছে সেই শুনশান রাস্তার কথা? সেদিন বলেছিলাম মেয়েদের একা থাকতে নেই। আজ থেকে সারা জীবনের জন্য আমি তোমার পাশে আছি।"

নিশি হেসে আদনানের দিকে ফিরে তাকাল। সেই একসময়ের দুষ্টু, চঞ্চল মেয়েটির মুখে আজ এক পূর্ণতার হাসি। জীবনের দীর্ঘ ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে দুটি ব্যাকুল হৃদয় অবশেষে খুঁজে পেল তাদের ভালোবাসার শান্ত নীড়।

....
👁 108