স্বামী যখন মন জয় করল

হঠাৎ করেই আজ যূথির বিয়েটা হয়ে গেল। যূথির বর তার চেয়ে গুনে গুনে সাত বছরের বড়। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এপ্লাইড ফিজিক্সে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। এখন একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পড়ায়। যূথি বিয়েটা করতে চায়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারন হলো, তার এখনো লেখাপড়া শেষ হয়নি এবং ছেলেকে সে একদমই চেনে না। এই যুগে এসেও সম্পূর্ণ অচেনা অজানা কারো সাথে বাবা মা যে তাদের একমাত্র সন্তানকে বিয়ে দিতে পারে এটা যূথির কল্পনার বাইরে ছিল। যূথি প্রথমে কদিন খুব কান্নাকাটি করল। তারপর গোমড়া মুখে ছেলের সাথে পর পর দুই সপ্তাহ চাইনিজ খেয়েও এলো কিন্তু তার মন সায় দিল না। মাত্র দুইদিনের দেখাতে কারো সাথে সারাজীবন পার করার মত এত বড় সিদ্ধান্ত যূথির পক্ষে নেয়া সম্ভব ছিল না। যাই হোক, তার ভাগ্যে হয়ত এই ছেলের সাথে বিয়ে লেখা ছিল বলেই আজ বিকেলে যূথির বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়েটা হয়েছে যূথিদের এলাকার-ই একটি কমিউনিটি সেন্টারে। বিয়ের পর খাওয়াদাওয়া শেষে অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন। এবার যূথির বিদায় নেবার পালা। সহনীয় মাত্রায় কান্নাকাটি করে যূথি যখন বাবা মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তখন অদ্ভুৎ এক ঘটনা ঘটল। যূথির বর রাজন গম্ভীর গলায় ঘোষনা করল, সে তার সদ্য বিয়ে করা বৌকে নিয়ে তার বাবা-মার বাড়িতে যাবে না। কমিউনিটি সেন্টার থেকে যূথিকে নিয়ে সে সরাসরি নিজের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে উঠবে। যূথি ভাসা ভাসা শুনেছিল বটে তার বর নাকি বাবা মার বাড়ি ঢাকা হওয়া সত্ত্বেও দুই রুমের একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে ঢাকাতেই নিজের মত করে আলাদা থাকে। রাজনেরও কোনো ভাই বোন নেই। যূথির মত বাবা মার একমাত্র সন্তান। শুরুতে যূথি খুব একটা পাত্তা দেয়নি। তবে এখন বেশ অবাক হলো। যূথি ভেবেছিল, অন্তত আজকের দিন হয়ত রাজনের সাথে সে তার বাবা মার ওখানেই উঠবে। রাজনের বাবা, মাও ছেলের কথায় অবাক হলেন।

      রাজনের মা সবার সামনে বলেই ফেললেন, কী সব  কথা বলছিস রাজন! আজ নতুন বৌকে নিয়ে ওই বাড়িতে যাবি কিরে! আজ আমাদের ওখানে চল। ওটা তো তোরও বাড়ি। তাছাড়া বাড়ি ভর্তি কত আত্মীয় স্বজন আছে। তোর মামা, খালারা সবাই এসেছেন। ওইখানে তোদের বাসর ঘর সাজানো হয়েছে। তাছাড়া কাল আবার তোদের বৌভাতের অনুষ্ঠান রয়েছে!

 যূথির বর মুখ গোজ করে দাঁড়িয়ে রইল। বোঝায় যাচ্ছে মায়ের কথা তার পছন্দ হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাজনেরই জয় হলো। সে যূথিকে নিয়ে একা একাই নিজের ফ্ল্যাটে হাজির হলো।

          এতদিন এই ফ্ল্যাটে রাজন একা একা কাটালেও এখানে আসার পর যূথি বেশ অবাক হলো। সাধারণত ব্যাচেলর ছেলেদের বাসা এত গোছানো থাকে না। অথচ রাজনের পুরো ফ্ল্যাটটা ছবির মত করে সাজানো। কোথাও এক কণা ধুলোর চিহ্ন নেই। মনে হচ্ছে কেউ যেন একটু আগেই পানি দিয়ে পুরো আসবাবগুলো ধুয়ে মুছে রেখে গেছে।

     – যূথি তুমি কি আমার উপর খুব রাগ করেছ?

     যূথি রাজনের দিকে ফিরল। বিয়ের পর এই প্রথম   রাজন তাকে সরাসরি কিছু বলল। এখানে আসার পুরো সময়টা সে আপন মনে ড্রাইভিং করেছে। যূথিও গাড়িতে চুপচাপ বসেছিল। যূথি স্বাভাবিক ভাবে বলল, কেন বলুন তো?

      – তোমাকে আজ রাতে এই ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছি এই কারনে?

       – রাগ করিনি তবে অবাক হয়েছি।

       – কিছু মনে করো না প্লিজ। বিয়ের পরে কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো আমার খুব-ই বিরক্ত লাগে। এই যেমন, আজ তুমি যদি বাবা মার ওখানে যেতে তবে কাল ভোর হতে না হতেই আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী গুলো আমাদের বাড়িতে জড়ো হত। বৌ ভালো হয়েছে নাকি মন্দ হয়েছে, সে কালো নাকি ফর্সা এগুলো নিয়ে আলোচনা করত। আর বিয়ের পরদিন সকালে নতুন বৌ, জামাই বাসরর ঘর থেকে বের হওয়ার পর ভীষণ অস্বস্তিকর একটা সিচুয়েশন হয় যেটা আমার কাছে খুব-ই বিরক্তিকর।

        – এতকিছু আপনি জানলেন কীভাবে?

       – আমার বন্ধুর বিয়েতে দেখেছি।

       যূথি ঠোট ওল্টালো। এই যুগে এসে যে মানুষটা নিজে সম্পুর্ণ অচেনা একটা মেয়ের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে করতে রাজি হয় তার কাছে এমন আধুনিক চিন্তাধারার গল্প আশা করা যায় না। 

       যূথির দিকে তাকিয়ে রাজন কী বুঝলো কে জানে। নরম গলায় বলল, তুমি যাও ফ্রেস হয়ে এসো। আজ বোধহয় ভালোমত কিছু খেতেও পারোনি। আমারও বিরিয়ানি, রোস্ট তেমন একটা রোচে না। তুমি ফ্রেস হয়ে এলে দুজন মিলে একসাথে আরাম করে খাব। যূথি বিয়ের ভারী কাপড় ছেড়ে সুতি একটা শাড়ি পরে যতক্ষনে ডাইনিং রুমে এলো ততক্ষণে টেবিলে পারিপাটি করে খাবার সাজানো হয়েছে। মেনু খুব সাধারন। মুরগির মাংস ভুনা, আলু ভর্তা আর করল্লা ভাজি। খাবারগুলো দেখে যূথির মনে হলো, তার আসলেই ভীষণ খিদে পেয়েছে এবং এই মুহুর্তে এর চেয়ে ভালো খাবার তার জন্য আর কিছু হতে পারত না। খাবার টেবিলে বসে যূথি অবাক হয়ে বলল, এসব কে রান্না করেছে?

       – আমি।

        – কখন করলেন এত রান্না?

        – তোমাকে বিয়ে করতে যাবার আগে।

        যূথি বুঝল, খুব সাধারন চিন্তাধারার একটা মানুষের সাথে তার বিয়ে হয়নি। তার সাথে বিয়ে হয়েছে, এমন একজন মানুষের সাথে যিনি শুধু চিন্তাতেই আধুনিক নন, নিজের মাঝে সেই চিন্তা গুলো খুব ভালো মত ধারনও করেন এবং সেই ভাবে চলাফেরাও করেন। 

         রাতটা খুব স্বাভাবিক ভাবে কেটে গেল। যূথিকে নিজের বেডরুম ছেড়ে দিয়ে গেস্ট রুমে ঘুমুতে যাবার আগে রাজন নরম গলায় বলল, তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও। তোমাকে আমি বিরক্ত করব না। তোমার যেদিন মনে হবে আমার কাছাকাছি আসা যায়, আমার সাথে এক বিছানা শেয়ার করা যায় সেদিন আমাকে নিঃসঙ্কোচে জানাবে, কেমন?

এরপর ঝড়ের বেগে বেশ ক’টা দিন কেটে গেল। যুথি এ কদিনে বুঝল অন্তত রাতের সময়টুকু রাজন নিজের মত করে সময় কাটানোর ব্যাপারে অবসেসড্। ক’টাদিন বৌভাতের অনুষ্ঠান, আত্মীয় স্বজনের এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি, দাওয়াত এসব মিলিয়ে দিনগুলো ঝড়ের বেগে কেটে যাচ্ছিল বটে কিন্তু রাতের সময়টুকু রাজন যূথিকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরত। যূথিরও অবশ্য বিষয়টা খুব ভালো লাগত। বিয়ের পর অন্য সব মেয়েদের মত তাকেও নতুন পরিবেশে শ্বশুর শাশুড়ির সাথে মানিয়ে চলতে হচ্ছে বটে তবে কোথায় যেন রাজন যূথির জন্য একটা খোলা বারান্দা রেখে দিয়েছে যেখানে সে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারে, নিজের মত করে বাঁচতে পারে। 

       বিয়ের কারনে রাজন সাত দিন ছুটি নিয়েছিল। বিয়ের পরদিন থেকেই সবাই রাজন আর যূথিকে বলছিল, তারা যেন এই সুযোগে হানিমুনটা সেরে আসে। ভিন্ন দেশে না হোক অন্তত কক্সবাজার কিংবা রাঙামাটি তো ঘুরে আসায় যায়। সুযোগমত রাজন যূথিকে বলেছিল, কী যেতে চাও হানিমুনে?

        যূথি কোনো উত্তর দেয়নি। উত্তর দিবে কী  মনমতো কোনো জবাব সে খুঁজে পায়নি। যূথিকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে রাজন নিজেই বলেছিল, আমার মনে হয় তুমি আগে আমার সাথে সহজ হও, আমাদের মাঝে ভাব ভালোবাসা না হোক অন্তত বন্ধুটুকু হোক তারপর নাহয় আমরা হানিমুনে যাব। এরপর হানিমুনের বিষয়টা ওখানেই চাপা পড়ে গিয়েছিল।

        রাজনের ছুটি শেষ হবার পরেরদিন থেকেই দুজনের জীবনের কর্ম ব্যস্ততা শুরু হলো। অফিসে যাওয়ার আগে রাজন নিজেই নাস্তার আয়োজন করল। 

        যূথি নরম গলায় বলল, একজন মেইড রাখলেই তো পারেন?

        – এতদিন রাখি নাই কারন একা ছিলাম। এখন রাখব।

        – আমি কিন্তু রান্না কিছু পারি না।

        – তোমার কোনো চিন্তা নেই। আমি সব পারি।

        – বারে! আপনি রান্না করবেন আর আমি মেয়ে হয়ে বসে বসে খাব নাকি?

       – এখানে পুরুষ বা মহিলার কোনো বিষয় নেই যূথি, আমার মনে হয় প্রতিটি কাজই সবার জানা দরকার। ধরো, আজ সকালে আমার ভীষণ পরোটা খেতে ইচ্ছে করছ, এখন আমি যদি পরোটা যদি বানাতে না পারি তাহলে আমার কিন্তু তোমার কিংবা আমার মায়ের নিদেনপক্ষে মেইডের উপর ভরসা করে থাকতে হবে। আর যদি পারি তাহলে কোনো ব্যাপার নয়। চাইলেই নিজের চাওয়া যে কোনো সময় পূরণ করা সম্ভব।

রাজনের কথায় যূথি ভীষণ মুগ্ধ হলো। এভাবে সে বিষয়গুলো কখোনো ভেবে দেখেনি। যূথি নিজেই অবাক হয়ে দেখল, ক্যাম্পাসের পুরো সময়টা সে তার বান্ধবীদের সামনে রাজনের গল্প করে কাটাল। ক’দিনের মাঝেই ইউটিউব দেখে সে মজার মজার রান্না শিখল। তারা বাসায় কোনো মেইড রাখেনি। দুজন মিলে ভাগ করে সংসারের কাজগুলো সেরে নেয়। সন্ধ্যার পর দুজনেই নিয়ম করে পড়তে বসে। রাজন পি এইচ ডি করছে। সে তার থিসিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে আর দুই মাস পর যূথির অনার্স পরীক্ষা। সেও কোমর বেধে পড়াশোনা করছে।

         এর মাঝে এলো বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই মহেন্দ্রক্ষন। আজ তাদের বাসায় রাজনের পুরোনো কিছু বন্ধুরা এসেছে। এদের মাঝে তিনজন নারীও আছেন। পরিকল্পনা হলো, সন্ধ্যায় একসাথে একটা সিনেমা দেখে রাতে সবাই ডিনার সেরে যে যার মত বাসায় ফিরবে। রান্না নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। খাবার সব অনলাইন থেকে অর্ডার দেয়া হয়েছে। সিনেমা দেখার সময় রাজনের সব বন্ধুদের গল্পে গল্পে যুথীর জানা হলো, এদের মাঝে তন্বী নামের মেয়েটি নাকি রাজনকে খুব পছন্দ করত। রাজনের সাথে কোনোভাবে সম্পর্ক না হওয়ার কারনে মেয়েটি প্রবাসী একটি ছেলেকে বিয়ে করেছে এবং সামনে মাসেই সে ছেলেটার সাথে পাকাপাকি ভাবে কানাডায় সেটেল্ড হচ্ছে । মেয়েটি নাকি রাজনের চেয়ে চার বছরের ছোট। যূথি মিনমিন করে জিজ্ঞেস করেছিল, রাজনের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়েছিল, কীভাবে?

         রাজন যূথির প্রশ্ন হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, আরে বন্ধুত্বের মাঝে আবার বয়সের প্রশ্ন আসে নাকি!

       রাজনের বন্ধুরা সবাই একে একে বিদায় নিল। সবাই চলে যেতেই যূথি মাথা ধরেছে বলে নিজের বিছানায় যেয়ে শুয়ে পড়ল। রাজন একটা বাম নিয়ে এসে বলল, খুব মাথা ব্যথা? আমি কপালে বাম লাগিয়ে দেই? ভালো লাগবে তোমার।

        – লাগবে না আমার।

        – গরম লাগছে তোমার? এসির টেমপারেচারটা একটু কমিয়ে দেই?

       – এই ঘরের এসিটা নষ্ট। ঘর ভালোমত ঠান্ডা হয় না।

      রাজন অবাক হয়ে বলল, বিয়ের আগে এই ঘরে ঘুমাতাম বলে এই ঘরেই আমি ভালো এসিটা লাগিয়েছি। অথচ এই ঘরের এসি ঠান্ডা হচ্ছে না!

      – ভালো নাকি মন্দ আমি জানি না। এই ঘরে আমার গরম লাগে।

       – তবে আমার ঘরে যাবে?

       – হুম।

        – ঠিক আছে তবে তাই হোক। তুমি আজ আমার ঘরেই ঘুমাও। আমি নাহয় এই ঘরে ঘুমাচ্ছি।

        – আপনি এই ঘরে ঘুমাবেন কীভাবে? ঘরটা তো গরম।

        রাজন একটু হেসে বলল, তবে কি আজ আমরা এক ঘরে এক বিছনাতেই ঘুমাবো?

        যূথি বালিশে মুখ গুজে বলল, আমার কাছে শোয়া আপনার বারণ বুঝি?

 বাম বামের মত পড়ে রইল। মাথা ব্যথাটাও যেন এক নিমিষে পালিয়ে গেল। ঘরটাও আর পরিবর্তন করা হলো না। তীব্র রমনের শেষে যূথি যখন আদুরে বিড়ালের মত রাজনের গায়ের সাথে লেপ্টে রইল তখন রাজন যূথির চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।

           – কী?

         – আজ আমি ইচ্ছে করেই তন্বীকে দাওয়াত দিয়ে এখানে আনিয়েছি। ওর সাথে আমার তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। আর রাতুলকেও বলেছি সে যেন ইচ্ছে করে তোমার সামনে তন্বীর বিষয়গুলো তোলে।

       যূথি অবাক হয়ে বলল, কেন? আমার সাথে কেন এমন করলেন আপনি?

       – কারন আমি আর পারছিলাম না। তোমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। এদিকে আমি এটাও বুঝেছিলাম যে, তুমিও আমাকে সহজে মুখ ফুটে কিছু বলবে না। তাই আমাদের কাছাকাছি আসার জন্য তোমার এই ইমোশোনাল ব্রেকডাউনটা ভীষণ দরকার ছিল।

       যূথি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, আপনি কী খারাপ!

        – তুমি খুশী হওনি বলো?

        যূথি চোখ বুজে বলল, হয়েছি। খুব খুশী হয়েছি।

        – তবে চলো আমাদের হানিমুনটা এবার সেরে নিই।

         – বারে আমার ক্লাস, আপনার ভার্সিটি এগুলোর কী হবে?

         – সাতদিনে এমন কোনো ক্ষতি হবে না যূথি! তবে তুমি বিশ্বাস করো এমন সাতদিন আমাদের জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না।

       

....
👁 79