যাকে প্রথমে বিরক্ত লাগত

রিকশায় বসে অফিসের দিকে যাচ্ছিল ওishi।

আজ তার নতুন চাকরির প্রথম দিন।

নতুন অফিস, নতুন সহকর্মী, নতুন পরিবেশ—সবকিছু নিয়েই ওishi-র মনে একসঙ্গে উত্তেজনা আর অস্বস্তি কাজ করছিল।

অফিসের সামনে এসে রিকশা থেকে নামল সে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে একবার বড় বিল্ডিংটার দিকে তাকাল।

নিজেকে সাহস দিয়ে বলল,

—“ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভালোভাবে কাজ করলেই হবে।”

তারপর ভেতরে ঢুকে রিসেপশনের কাছে গিয়ে বলল,

—“আমি আজ থেকে জয়েন করছি। আমার নাম ওishi।”

রিসেপশনের মেয়েটি হাসিমুখে বলল,

—“আপনি নতুন? তৃতীয় তলায় ম্যানেজারের কেবিনে চলে যান।”

ওishi লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই পাশ থেকে একজন দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এসে তার সঙ্গে ধাক্কা খেল।

ওishi-র হাত থেকে কয়েকটা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।

—“সরি!”

ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে কাগজগুলো তুলে নিল।

ওishi একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

—“দেখে হাঁটতে পারেন না?”

ছেলেটি কাগজগুলো এগিয়ে দিয়ে শান্তভাবে বলল,

—“পারতাম। কিন্তু আপনি হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াবেন, সেটা বুঝতে পারিনি।”

ওishi অবাক হয়ে তাকাল।

—“দোষটাও আমার?”

ছেলেটি মুচকি হেসে বলল,

—“আমি তো সেটা বলিনি।”

—“আপনার কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে।”

—“আপনি নতুন, তাই না?”

—“হ্যাঁ। কিন্তু বুঝলেন কীভাবে?”

—“এই অফিসে নতুন কেউ ছাড়া আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষই করে।”

ওishi ভ্রু কুঁচকে বলল,

—“আপনি কি খুব বড় কেউ?”

ছেলেটি হেসে বলল,

—“তা না। তবে সবাই আমাকে একটু ভয় পায়।”

—“আমি পাই না।”

কথাটা বলেই ওishi লিফটের দিকে চলে গেল।

পেছনে দাঁড়িয়ে ছেলেটা মুচকি হাসল।

কিছুক্ষণ পর ওishi জানতে পারল, সেই ছেলেটির নাম জয়।

সে এই অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা। কাজের ব্যাপারে কঠোর, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে বেশ হাসিখুশি।

ওishi নিজের ডেস্কে বসে কাজ শুরু করল।

প্রথম দিন হওয়ায় অনেক নতুন নিয়ম জানতে হলো। সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় হলো। দুপুরের দিকে পাশের ডেস্কের মায়ার সঙ্গে তার ভালো বন্ধুত্বও হয়ে গেল।

লাঞ্চের সময় মায়া বলল,

—“তুমি জয় স্যারের সঙ্গে দেখা করেছ?”

ওishi হেসে বলল,

—“সকালে ধাক্কাও খেয়েছি।”

মায়া হেসে ফেলল।

—“তুমি প্রথম দিনেই বিপদ ডেকে এনেছ!”

—“কেন?”

—“জয় স্যারকে সবাই একটু ভয় পায়।”

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“আমার তো তেমন মনে হয়নি।”

—“তুমি ভাগ্যবান।”

ঠিক তখনই জয় ক্যান্টিনে ঢুকল।

তার চোখ গিয়ে থামল ওishi-র ওপর।

মায়া সেটা লক্ষ্য করে মুচকি হাসল।

জয় কাছে এসে বলল,

—“ওishi, আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।”

—“আমার সঙ্গে?”

—“হ্যাঁ।”

ওishi উঠে তার সঙ্গে বাইরে গেল।

জয় বলল,

—“আপনার ডেস্কে যে ফাইলটা আছে, সেটা আজকের মধ্যে আমার দরকার।”

ওishi বলল,

—“কিন্তু আমাকে তো বলা হয়েছিল কাল দিলেও হবে।”

—“কে বলেছে?”

—“রুবেল ভাই।”

জয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“ঠিক আছে। তাহলে কাল দিন।”

ওishi বিরক্ত হয়ে বলল,

—“তাহলে আমাকে এখন ডাকলেন কেন?”

জয় মুচকি হেসে বলল,

—“দেখতে চেয়েছিলাম, আপনি অফিসের প্রথম দিনেই কতটা রাগ করতে পারেন।”

ওishi হতভম্ব হয়ে গেল।

—“মানে?”

—“সকালের কথাটা মনে আছে?”

ওishi বুঝতে পারল, জয় ইচ্ছে করেই তাকে বিরক্ত করছে।

—“আপনি খুব বিরক্তিকর মানুষ।”

—“ধন্যবাদ।”

—“এটা প্রশংসা ছিল না।”

—“আমি প্রশংসা হিসেবেই নিলাম।”

জয় চলে গেল।

ওishi তার দিকে তাকিয়ে রইল।

মনে মনে বলল,

‘লোকটা আসলেই অদ্ভুত।’

তবুও অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।

বিকেলে অফিস ছুটির সময় হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি।

এক এক করে সবাই অফিস থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু ওishi-র সঙ্গে কোনো ছাতা ছিল না।

মায়া বলল,

—“তুমি কীভাবে যাবে?”

—“বৃষ্টি একটু কমলে বের হব।”

মায়া চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর অফিস প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।

ওishi ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নিচে নামল। গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই বুঝল, বৃষ্টি আরও বেড়েছে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।

—“ছাতা নেই?”

ওishi ঘুরে তাকাল।

জয় দাঁড়িয়ে আছে।

হাতে কালো ছাতা।

ওishi বলল,

—“না।”

জয় ছাতাটা তার দিকে এগিয়ে দিল।

—“নিন।”

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি?”

—“আমার গাড়ি আছে।”

—“আপনি ছাতা ছাড়া যাবেন?”

—“বৃষ্টিতে ভিজতে আমার আপত্তি নেই।”

—“কিন্তু আমি আপনার ছাতা নিলে?”

জয় মৃদু হেসে বলল,

—“তাহলে অন্তত আপনি ভিজবেন না।”

ওishi ছাতাটা নিতে গিয়ে থেমে গেল।

—“আপনি সবসময় এমন কথা বলেন?”

—“কেমন?”

—“যে কথার উত্তর দেওয়া কঠিন।”

জয় কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—“সব কথার উত্তর দিতে হয় না।”

ওishi ছাতাটা হাতে নিল।

—“ধন্যবাদ।”

—“কাল ফিরিয়ে দেবেন।”

—“অবশ্যই।”

ওishi বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করল।

কয়েক পা যাওয়ার পর পেছনে তাকিয়ে দেখল, জয় এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

জয় হেসে ফেলল।

ওishi-ও অজান্তেই হেসে ফেলল।

সেদিন রাতে বাসায় ফিরে ছাতাটা টেবিলের ওপর রেখে ওishi অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজেকেই বলল,

—“একজন মানুষ এত অদ্ভুত কেন হতে পারে?”

অন্যদিকে নিজের গাড়িতে বসে জয়ও ভাবছিল,

‘নতুন মেয়েটা অন্য সবার মতো নয়।’

পরদিন সকালে অফিসে ঢুকেই ওishi প্রথমে নিজের ডেস্কের দিকে তাকাল। তারপর অজান্তেই জয়ের কেবিনের দিকে চোখ চলে গেল।

কেবিনের দরজা খোলা।

কিন্তু জয় নেই।

ওishi নিজেই অবাক হলো। কেন সে প্রথমেই জয়কে খুঁজল, সে বুঝতে পারল না।

মায়া পাশ থেকে বলল,

—“কাকে খুঁজছ?”

—“কাউকে না।”

—“তাহলে কেবিনের দিকে তাকিয়ে আছ কেন?”

ওishi হেসে বলল,

—“এমনিই।”

মায়া কিছু না বলে নিজের কাজে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর জয় অফিসে ঢুকল। হাতে কয়েকটা ফাইল, মুখে স্বাভাবিক হাসি।

ওishi তাকে দেখে দ্রুত কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে কাজ করার ভান করল।

জয় তার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।

—“সুপ্রভাত।”

ওishi তাকিয়ে বলল,

—“সুপ্রভাত।”

জয় বলল,

—“আমার ছাতাটা?”

ওishi সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ খুলে ছাতাটা বের করল।

—“এই নিন।”

জয় ছাতা নিয়ে বলল,

—“ধন্যবাদ।”

—“আপনাকেও।”

জয় অবাক হয়ে বলল,

—“আমাকে ধন্যবাদ কেন?”

—“গতকালের জন্য।”

—“ছাতার জন্য?”

—“হ্যাঁ।”

জয় মুচকি হেসে বলল,

—“শুধু ছাতার জন্য?”

ওishi একটু থেমে বলল,

—“আর কীসের জন্য?”

—“জানি না। আপনি বললে জানতে পারতাম।”

ওishi বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আপনি সব কথাকে এত ঘুরিয়ে বলেন কেন?”

জয় হেসে নিজের কেবিনে চলে গেল।

ওishi কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের মনেই বলল,

—“এই মানুষটার সঙ্গে কথা বললেই কেন যেন হাসি পায়?”

দিন যত যাচ্ছিল, জয় আর ওishi-র মধ্যে কথাবার্তাও বাড়ছিল।

কাজের ফাঁকে ছোট ছোট কথা, দুপুরের খাবার নিয়ে মজা, কখনো কোনো ভুল নিয়ে খুনসুটি—সব মিলিয়ে অফিসের পরিবেশটা ওishi-র কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত হয়ে উঠছিল।

একদিন দুপুরে ওishi কাজ করতে করতে খেয়াল করল, তার খাবার আনা হয়নি।

মায়া বলল,

—“চলো ক্যান্টিনে।”

ওishi মাথা নাড়িয়ে বলল,

—“তুমি যাও। আমার একটা কাজ শেষ করতে হবে।”

কিছুক্ষণ পর জয় তার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।

—“লাঞ্চ করেছেন?”

—“না।”

—“কেন?”

—“কাজ শেষ করছি।”

—“কাজ কি আপনার খাবারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?”

ওishi হেসে বলল,

—“আজকে মনে হচ্ছে তাই।”

জয় কিছু না বলে চলে গেল।

দশ মিনিট পর তার হাতে একটা খাবারের প্যাকেট।

—“নিন।”

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“এটা কী?”

—“খাবার।”

—“আমার জন্য?”

—“না। আমার জন্য এনেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনাকেই দিতে হবে।”

ওishi হেসে বলল,

—“আপনি কি সবসময় এমন করেন?”

—“কী?”

—“ভালো কিছু করেও এমনভাবে বলেন যেন কিছুই করেননি।”

জয় বলল,

—“আপনি খেয়ে নিন। বেশি কথা বললে খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

ওishi খাবারটা নিল।

—“ধন্যবাদ।”

—“স্বাগতম।”

জয় চলে যাওয়ার পর ওishi কিছুক্ষণ খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকল।

মনে হলো, মানুষটা সত্যিই অন্যরকম।

কয়েক দিন পর অফিসে নতুন একটি প্রজেক্ট এলো। কাজটা গুরুত্বপূর্ণ। জয় মিটিংয়ে বলল,

—“এই প্রজেক্টের রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব ওishi নেবে।”

ওishi একটু অবাক হলো।

—“আমি?”

জয় বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“আমি তো নতুন।”

—“নতুন হলেই কি কাজ পারবেন না?”

—“তা না।”

—“তাহলে সমস্যা কী?”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“কিছু না।”

মিটিং শেষে জয় তাকে বলল,

—“ভয় পাচ্ছেন?”

—“না।”

—“তাহলে ভালো। কারণ আমি জানি আপনি পারবেন।”

এই কথাটা ওishi-র মনে দাগ কাটল।

কাজের প্রয়োজনে এরপর তাদের প্রায় প্রতিদিন একসঙ্গে বসতে হলো।

কখনো রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হতো।

এক সন্ধ্যায় সবাই চলে যাওয়ার পরও ওishi কাজ করছিল।

জয় কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বলল,

—“এখনও কাজ করছেন?”

—“হ্যাঁ। রিপোর্টটা শেষ করতে হবে।”

—“বাকি কাল করবেন।”

—“না, আজ শেষ করব।”

জয় কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আপনি ভীষণ জেদি।”

ওishi হাসল।

—“আপনিও কম নন।”

—“তাহলে দুজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে।”

—“দেখা যাবে কে জেতে।”

রাত প্রায় আটটা।

কাজ শেষ করে ওishi নিচে নামল।

বাইরে আবার বৃষ্টি।

সে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

জয়ও কিছুক্ষণ পর বের হলো।

—“আবার বৃষ্টি!”

ওishi বলল,

—“মনে হয় বৃষ্টি আমাকে খুব পছন্দ করে।”

জয় হেসে বলল,

—“নাকি আপনি বৃষ্টিকে পছন্দ করেন?”

—“হয়তো।”

জয় নিজের গাড়ির দরজা খুলে বলল,

—“চলুন।”

ওishi একটু ইতস্তত করল।

—“না, আমি বাসে চলে যাব।”

—“এত রাতে?”

—“আমি অভ্যস্ত।”

জয় শান্তভাবে বলল,

—“আমি আপনাকে বাসায় নামিয়ে দেব। এতে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।”

ওishi শেষ পর্যন্ত গাড়িতে উঠে বসল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

জয় হঠাৎ বলল,

—“আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন কেন?”

—“আমি কি চুপচাপ?”

—“হ্যাঁ।”

—“আপনার সঙ্গে কথা বললে তো আপনি মজা করেন।”

—“আপনি কি আমার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পান?”

ওishi হেসে বলল,

—“ভয় না। সাবধান থাকি।”

—“কেন?”

—“আপনি কখন কী বলেন, বোঝা যায় না।”

জয় হাসল।

—“আপনি চাইলে আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন।”

—“কী প্রশ্ন?”

—“যেকোনো কিছু।”

ওishi কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—“আপনি কি সবসময় এমন ছিলেন?”

জয়ের হাসি একটু থেমে গেল।

—“কেমন?”

—“মানুষকে নিয়ে এত ভাবেন?”

জয় জানালার বাইরে তাকাল।

—“সবসময় না।”

—“তাহলে?”

—“কিছু মানুষ জীবনে এসে মানুষকে বদলে দেয়।”

ওishi চুপ করে গেল।

তারপর বলল,

—“আপনার জীবনে এমন কেউ এসেছে?”

জয় এবার তার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ড চোখাচোখি হলো।

—“হয়তো এসেছে।”

ওishi-র বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

গাড়ি তার বাসার সামনে থামল।

ওishi নামতে গিয়ে বলল,

—“ধন্যবাদ।”

জয় বলল,

—“কাল দেখা হবে।”

ওishi দরজা বন্ধ করে কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

জয় তখনও তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

ওishi মৃদু হাসল।

জয়ও হাসল।

সেদিন রাতে ওishi বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ভাবল।

জয়ের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।

“কিছু মানুষ জীবনে এসে মানুষকে বদলে দেয়।”

সে কি সেই মানুষ?

নিজের এই ভাবনায় ওishi নিজেই লজ্জা পেল।

অন্যদিকে জয়ও ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোন হাতে নিয়ে ওishi-র নম্বরের দিকে তাকিয়ে রইল।

অনেকক্ষণ পর একটা মেসেজ লিখল—

“বাসায় পৌঁছেছেন?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এলো—

“হ্যাঁ। আপনি?”

জয় লিখল—

“আমিও।”

তারপর দুজনেই ফোন নামিয়ে রাখল।

কথা খুব সামান্য।

কিন্তু সেই সামান্য কথার মধ্যেই সম্পর্কটা যেন ধীরে ধীরে অন্য এক জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছিল।

পরদিন সকালে অফিসে এসে ওishi দেখল, তার ডেস্কের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ রাখা।

তাতে লেখা—

“আজ হাসতে ভুলবেন না।”

ওishi অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল।

দূরে নিজের কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে জয় মুচকি হাসছিল।

ওishi কাগজটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল।

তার ঠোঁটেও ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

কেউ কিছু বলেনি।

সেদিনের ছোট্ট কাগজটা ওishi সারাদিন নিজের ব্যাগের ভেতর যত্ন করে রেখে দিল।

“আজ হাসতে ভুলবেন না।”

মাত্র চারটা শব্দ। অথচ বারবার পড়লেই তার মুখে হাসি চলে আসছিল।

মায়া কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পেল না।

শেষ পর্যন্ত মায়া বলেই ফেলল,

—“কার কাছ থেকে?”

ওishi ভান করে বলল,

—“কী?”

—“এই কাগজটা।”

—“কোন কাগজ?”

মায়া ওishi-র ব্যাগ থেকে কাগজটা বের করে বলল,

—“এইটা।”

ওishi তাড়াতাড়ি সেটা নিয়ে নিল।

—“কেউ দিয়েছে।”

—“কে?”

—“জানি না।”

মায়া মুচকি হেসে বলল,

—“জয় স্যার?”

ওishi চুপ করে গেল।

মায়া হেসে বলল,

—“তোমার চুপ করাটাই উত্তর।”

ওishi লজ্জা পেয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে গেল।

কিন্তু তার মনটা সারাদিন ভালো ছিল।

অন্যদিকে জয় নিজের কেবিনে বসে কাজ করছিল। মাঝে মাঝে কাঁচের দরজা দিয়ে ওishi-র দিকে তাকাচ্ছিল।

ওishi যখনই তার দিকে তাকাচ্ছিল, জয় চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল।

দুজনের এই লুকোচুরি ধীরে ধীরে অফিসের আরও কয়েকজনের চোখে পড়তে শুরু করল।

তবে কেউ কিছু বলছিল না।

সেদিন বিকেলে বড় একটা মিটিং ছিল।

প্রজেক্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। জয় ওishi-কে বলল,

—“আজ আপনাকেই প্রেজেন্টেশন দিতে হবে।”

ওishi একটু নার্ভাস হয়ে বলল,

—“আমি?”

—“হ্যাঁ।”

—“যদি ভুল করি?”

জয় শান্তভাবে বলল,

—“আমি আছি।”

দুটি শব্দ।

কিন্তু ওishi-র ভয়টা যেন সঙ্গে সঙ্গে কমে গেল।

মিটিং শুরু হলো।

ওishi সুন্দরভাবে পুরো প্রেজেন্টেশন শেষ করল। সবাই তার কাজের প্রশংসা করল।

মিটিং শেষে জয় বলল,

—“দেখলেন? বলেছিলাম পারবেন।”

ওishi মুচকি হেসে বলল,

—“আপনি পাশে ছিলেন বলেই পেরেছি।”

জয় কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—“আমি সবসময় পাশে থাকব।”

কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হলেও ওishi-র বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ঢেউ উঠল।

সেদিন অফিস ছুটির পর জয় বলল,

—“আপনার জন্য একটা জায়গা দেখাব।”

—“কোথায়?”

—“চলুন, গেলেই বুঝবেন।”

ওishi কিছুটা দ্বিধায় পড়ল।

—“এখন?”

—“হ্যাঁ। বেশি সময় লাগবে না।”

শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো।

জয় তাকে শহরের একটা শান্ত জায়গায় নিয়ে গেল। ছোট্ট একটা লেকের পাশে সুন্দর একটা ক্যাফে।

সন্ধ্যার আলোয় জায়গাটা বেশ শান্ত।

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“এখানে কেন?”

জয় বলল,

—“আপনি বলেছিলেন, বৃষ্টি আর শান্ত জায়গা পছন্দ করেন।”

—“আমি কবে বললাম?”

—“সেদিন গাড়িতে।”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি এত কিছু মনে রাখেন?”

—“আপনার কথা হলে রাখি।”

ওishi আর কোনো উত্তর দিল না।

দুজন একটা টেবিলে বসে কফি অর্ডার করল।

কিছুক্ষণ পর ওishi বলল,

—“আপনার একটা সমস্যা আছে।”

জয় অবাক হয়ে বলল,

—“কী?”

—“আপনি মানুষকে খুব সহজে অস্বস্তিতে ফেলেন।”

—“আমি?”

—“হ্যাঁ।”

—“কীভাবে?”

—“এমন সব কথা বলেন, যার উত্তর দিতে গেলে নিজেই লজ্জা লাগে।”

জয় হেসে বলল,

—“তাহলে উত্তর না দিলেও চলবে।”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি খুব চালাক।”

—“আপনি চাইলে আরও অনেক কিছু বলতে পারেন।”

—“না, আজ থাক।”

কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ লেকের দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ জয় বলল,

—“ওishi।”

—“হুম?”

—“আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন?”

ওishi তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

—“জানি না। তবে মনে হয় আপনি খারাপ কিছু করবেন না।”

জয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“আমি চেষ্টা করব কখনো আপনার বিশ্বাসটা ভাঙতে না।”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আমিও।”

সেদিনের পর তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগল।

অফিসে দেখা হওয়া, মেসেজে কথা বলা, মাঝে মাঝে একসঙ্গে চা খাওয়া—সবকিছুই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেল।

একদিন সকালে জয় অফিসে এসে দেখল, ওishi নেই।

সে মায়াকে জিজ্ঞেস করল,

—“ওishi আজ আসেনি?”

মায়া বলল,

—“না। ফোনও ধরছে না।”

জয়ের মুখে সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।

সে কয়েকবার ওishi-কে ফোন করল।

কোনো উত্তর নেই।

দুপুরের দিকে ওishi ফোন করল।

—“হ্যালো?”

জয় একটু রাগী গলায় বলল,

—“আপনি কোথায়?”

—“বাসায়।”

—“অফিসে আসেননি কেন?”

—“সকালে হঠাৎ মাথা ঘুরছিল। তাই আসিনি।”

জয়ের গলা নরম হয়ে গেল।

—“এখন কেমন আছেন?”

—“ভালো।”

—“ডাক্তার দেখিয়েছেন?”

—“না। দরকার হয়নি।”

—“ওষুধ খেয়েছেন?”

ওishi হেসে বলল,

—“আপনি কি আমার ডাক্তার?”

—“না। কিন্তু চিন্তা করার অধিকারটা কি নেই?”

ওishi চুপ করে গেল।

তারপর ধীরে বলল,

—“আছে।”

জয় কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

—“কাল অফিসে আসবেন না। পুরোপুরি ভালো হয়ে তারপর আসবেন।”

—“কিন্তু কাজ…”

—“কাজ আমি দেখব।”

—“আপনি এত চিন্তা করছেন কেন?”

জয় কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

—“কারণ আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”

ওishi-র চোখে হাসি ফুটে উঠল।

—“ঠিক আছে।”

ফোন কেটে যাওয়ার পর ওishi অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার মনে হলো, সে হয়তো জয়ের প্রতি সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

কিন্তু একটা ভয়ও ছিল।

এই সম্পর্কের কোনো নাম এখনো নেই।

তারা কেউ সরাসরি কিছু বলেনি।

পরদিন ওishi অফিসে এলো।

জয় তাকে দেখেই বলল,

—“কেমন আছেন?”

—“ভালো।”

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

জয় তার দিকে একটা ছোট্ট প্যাকেট এগিয়ে দিল।

—“এটা কী?”

—“আপনার জন্য।”

ওishi খুলে দেখল, ভেতরে একটা সুন্দর কলম।

—“এটা কেন?”

—“আপনার প্রথম বড় প্রজেক্টের জন্য।”

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“এত সুন্দর!”

—“আপনার মতো সুন্দর না।”

ওishi হঠাৎ চুপ করে গেল।

জয়ও বুঝতে পারল, সে কথাটা একটু বেশি বলে ফেলেছে।

দুজনেই কয়েক সেকেন্ড নীরব।

তারপর ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি আজকাল বেশি কথা বলছেন।”

জয় বলল,

—“হয়তো।”

—“কেন?”

জয় তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কারণ কিছু কথা আর নিজের মধ্যে রাখতে পারছি না।”

ওishi-র বুক ধক করে উঠল।

—“কী কথা?”

জয় কিছু বলার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।

সে ফোন ধরল।

ওishi দেখল, জয়ের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেছে।

—“কখন?”

কিছুক্ষণ শুনে জয় বলল,

—“ঠিক আছে। আমি আসছি।”

ফোন কেটে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

ওishi জিজ্ঞেস করল,

—“কী হয়েছে?”

জয় বলল,

—“বাসা থেকে ফোন এসেছে।”

—“সব ঠিক আছে?”

—“জানি না।”

তারপর সে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যায় ওishi-র ফোনে জয়ের একটা মেসেজ এলো।

“আজ হয়তো কথা বলতে পারব না। একটা পারিবারিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত আছি। কাল সব বলব।”

ওishi মেসেজটা পড়ে চিন্তিত হয়ে গেল।

পরদিন জয় অফিসে এল ঠিকই, কিন্তু তার মুখে কোনো হাসি নেই।

ওishi কাছে গিয়ে বলল,

—“কী হয়েছে?”

জয় কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—“আমার পরিবার চায় আমি বিয়ে করি।”

ওishi-র মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—“বিয়ে?”

জয় মাথা নেড়ে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“কার সঙ্গে?”

জয় উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“মেয়েটার নাম মেহরিন।”

ওishi কিছু বলল না।

তার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ একটা অজানা ভয় ঢুকে গেল।

জয় ধীরে বলল,

—“কিন্তু আমি তাকে বিয়ে করতে চাই না।”

ওishi তার দিকে তাকাল।

—“কেন?”

জয় শান্ত গলায় বলল,

—“কারণ আমার মন অন্য কারও কাছে।”

ওishi কিছু বলতে পারল না।

জয় তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

জয়ের মুখে “আমার মন অন্য কারও কাছে” কথাটা শুনে ওishi কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে হচ্ছিল, জয় হয়তো তাকে নিয়েই কথা বলছে। কিন্তু মনের ভেতরের সেই আনন্দকে মুখে প্রকাশ করার সাহস হলো না।

ওishi ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—“আপনার পরিবার কি জানে?”

জয় মাথা নেড়ে বলল,

—“না।”

—“তাহলে?”

—“আমি আজই বলব।”

ওishi কিছুটা ভয় পেয়ে বলল,

—“যদি তারা রাজি না হয়?”

জয় শান্ত গলায় বলল,

—“তাহলে তাদের বোঝাব।”

—“সব পরিবার কি এত সহজে বোঝে?”

—“আমার পরিবারকে আমি চিনি। সময় লাগবে, কিন্তু আমি চেষ্টা করব।”

ওishi চুপ করে রইল।

জয় তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”

—“হ্যাঁ।”

—“কিসের?”

ওishi নিচু গলায় বলল,

—“আপনাকে হারানোর।”

কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল।

জয় কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—“তাহলে আমি একা ভয় পাচ্ছি না।”

ওishi অবাক হয়ে তাকাল।

জয় বলল,

—“আমিও আপনাকে হারাতে ভয় পাই।”

সেদিন বিকেলে জয় বাসায় গিয়ে তার বাবা-মায়ের সামনে বসে সবকিছু বলল।

—“আমি একজনকে পছন্দ করি।”

তার মা হাসিমুখে বললেন,

—“কে?”

—“ওishi।”

মায়ের মুখে হাসি থাকলেও বাবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—“ওishi কে?”

—“আমাদের অফিসে কাজ করে।”

—“তার পরিবার সম্পর্কে কিছু জানো?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে জানো না?”

জয় অবাক হয়ে বলল,

—“কী?”

তার বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—“ওishi-র বাবা সেই মানুষটির মেয়ে, যার কারণে আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছিলাম।”

জয় স্তব্ধ হয়ে গেল।

—“কিন্তু বাবা, সেই ঘটনা তো অনেক পুরোনো।”

—“পুরোনো হলেই কি কষ্ট পুরোনো হয়ে যায়?”

—“কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে দোষটা তার বাবার ছিল?”

বাবা কঠিন গলায় বললেন,

—“আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

জয় শান্তভাবে বলল,

—“তবুও আমি সত্যিটা জানতে চাই।”

সে সেই রাতেই পুরোনো অফিসের কিছু নথি খুঁজতে শুরু করল।

অনেক পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে এমন কিছু হিসাব পেল, যা তার বাবার গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছিল না।

জয় অবাক হয়ে গেল।

সে আরও কিছু নথি বের করল।

এক জায়গায় দেখা গেল, যে অর্থের জন্য ওishi-র বাবাকে দায়ী করা হয়েছিল, সেটি অন্য একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হয়েছিল।

জয় বুঝতে পারল, বহু বছর আগে একটা বড় ভুল হয়েছিল।

কিন্তু সেই ভুলের কারণে দুই পরিবার এত বছর একে অপরকে দূরে রেখেছে।

পরদিন সকালে জয় ওishi-কে সব বলল।

ওishi অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

—“তাহলে আমাদের পরিবার আগে থেকেই একে অপরকে চেনে?”

—“হ্যাঁ।”

—“আর সেই পুরোনো সমস্যার জন্য আমাদের সম্পর্কও কি ভেঙে যাবে?”

জয় তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি সেটা হতে দেব না।”

—“কিন্তু আপনার বাবা?”

—“আমি তাকে সত্যিটা দেখাব।”

ওishi চোখ নামিয়ে বলল,

—“জয়, আমি চাই না আমার জন্য আপনার পরিবারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক খারাপ হোক।”

—“তুমি আমার সমস্যা নও, ওishi।”

—“তাহলে?”

—“তুমি আমার সিদ্ধান্ত।”

ওishi-র চোখ ভিজে উঠল।

—“আপনি সবসময় এত সুন্দর কথা বলেন কীভাবে?”

জয় হেসে বলল,

—“আপনার সঙ্গে কথা বললেই কথাগুলো নিজে থেকেই আসে।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

কিন্তু সমস্যা তখনও শেষ হয়নি।

সেদিন বিকেলে জয়ের বাবা তাকে ডেকে বললেন,

—“তুমি যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চাও, আগে তার বাবার সঙ্গে আমার দেখা করতে হবে।”

জয় অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি রাজি?”

—“আমি রাজি বলিনি। শুধু কথা বলতে চাই।”

জয় মাথা নেড়ে বলল,

—“ঠিক আছে।”

ওishi-র বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো।

পরদিন দুই পরিবার মুখোমুখি বসলো।

প্রথমে পরিবেশটা ছিল খুব অস্বস্তিকর।

জয়ের বাবা কঠিন মুখে বসেছিলেন।

ওishi-র বাবা ধীরে বললেন,

—“অনেক বছর হয়ে গেছে।”

জয়ের বাবা উত্তর দিলেন,

—“কিন্তু সেই ঘটনা আমি ভুলিনি।”

ওishi-র বাবা কিছু পুরোনো কাগজ বের করলেন।

—“এই কাগজগুলো আপনি কখনো দেখেননি।”

জয়ের বাবা কাগজগুলো হাতে নিলেন।

একটা একটা করে পড়তে লাগলেন।

তার মুখের কঠোরতা ধীরে ধীরে কমে গেল।

—“তাহলে… এত বছর আমি ভুল মানুষকে দোষ দিয়েছি?”

ওishi-র বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—“আমিও তখন সবকিছু পরিষ্কার করতে পারিনি।”

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

তারপর জয়ের বাবা ধীরে বললেন,

—“আমাদের ভুলের শাস্তি যেন আমাদের সন্তানদের না পেতে হয়।”

জয় প্রথমবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

ওishi-র বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তুমি কি সত্যিই আমার মেয়েকে ভালোবাসো?”

জয় এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“কতটা?”

জয় ওishi-র দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—“যতটা ভালোবাসলে একজন মানুষ অন্যজনের হাসিকে নিজের আনন্দ মনে করে।”

ওishi-র চোখে পানি চলে এলো।

জয়ের মা এগিয়ে এসে ওishi-র হাত ধরলেন।

—“তোমাকে একটা কথা বলি?”

ওishi মাথা নেড়ে বলল,

—“জি।”

—“আমার ছেলেকে হাসতে অনেকদিন পর দেখেছি।”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আমিও ওকে হাসাতে চাই।”

জয়ের মা তাকে কাছে টেনে নিলেন।

সব ভুল বোঝাবুঝি যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল।

তবে মেহরিনের বিষয়টি তখনও বাকি ছিল।

জয় নিজেই মেহরিনকে ফোন করল।

—“মেহরিন, আমার পরিবার এখন সব জানে।”

ওপাশ থেকে মেহরিন শান্ত গলায় বলল,

—“তাহলে তোমার সমস্যা শেষ।”

—“তুমি রাগ করনি?”

—“কেন করব?”

—“আমাদের তো একসময় বিয়ের কথা ছিল।”

মেহরিন হেসে বলল,

—“সব সম্পর্ক বিয়েতে শেষ হয় না, জয়। কিছু সম্পর্ক মানুষকে বুঝতে শেখায়।”

জয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

মেহরিন আবার বলল,

—“তুমি যাকে সত্যি ভালোবাসো, তার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখো।”

—“ধন্যবাদ।”

—“আমাকে ধন্যবাদ দিও না। শুধু সুখে থেকো।”

ফোন কেটে জয় কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ওishi-কে ফোন করল।

—“কোথায়?”

—“বাসায়।”

—“বাইরে আসবেন?”

—“এখন?”

—“হ্যাঁ। একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”

কিছুক্ষণ পর ওishi বাইরে এলো।

জয় তাকে সেই পুরোনো লেকের পাশে নিয়ে গেল, যেখানে কয়েকদিন আগে তারা প্রথম একসঙ্গে বসেছিল।

আকাশে তখন হালকা বৃষ্টি।

ওishi হেসে বলল,

—“আবার বৃষ্টি!”

জয় বলল,

—“আমাদের গল্পে বৃষ্টি না থাকলে যেন গল্পটাই অসম্পূর্ণ।”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আজ এত খুশি কেন?”

জয় তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কারণ আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, তোমাকে হারানোর ভয়টা নেই।”

ওishi কিছু বলল না।

জয় ধীরে বলল,

—“ওishi, একটা কথা বলব?”

—“বলুন।”

—“তুমি কি আমার জীবনের বাকি পথটাও আমার সঙ্গে হাঁটবে?”

ওishi-র চোখে পানি চলে এলো।

সে মৃদু হেসে বলল,

—“আপনি যদি মাঝপথে বিরক্ত না করেন।”

জয় হেসে বলল,

—“সেটা পারব না।”

ওishi-ও হেসে ফেলল।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন সকালটা ওishi-র কাছে অন্যরকম ছিল।

গত রাতের পর থেকে তার মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়টা যেন কেটে গেছে। জয় তাকে হারাতে চায় না, দুই পরিবারও পুরোনো ভুল বোঝাবুঝি ভুলে নতুন করে সম্পর্ক শুরু করতে রাজি হয়েছে।

তবুও জয়ের আচরণে একটা রহস্য ছিল।

সকালে জয় শুধু একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল—

“আজ একটু সময় নিয়ে অফিসে আসবেন। আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”

ওishi মেসেজটা পড়ে হেসে ফেলল।

সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

“কী সারপ্রাইজ?”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এলো,

“বললে তো সারপ্রাইজ থাকবে না।”

ওishi ফোনটা রেখে নিজের মনেই বলল,

—“মানুষটা কখনো সহজভাবে কিছু বলতে পারে না।”

অফিসে পৌঁছাতেই ওishi বুঝল, আজ পরিবেশটা অস্বাভাবিক শান্ত।

মায়া তাকে দেখে মুচকি হেসে বলল,

—“আজ কিন্তু তোমার জন্য কিছু একটা অপেক্ষা করছে।”

—“তুমিও জানো?”

—“সবাই জানে। শুধু তুমি জানো না।”

ওishi অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল।

তার ডেস্কের ওপর একটা ছোট্ট ফুলের তোড়া রাখা।

সঙ্গে একটা কাগজ।

“যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, সেদিন ভাবিনি তুমি আমার প্রতিদিনের সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাস হয়ে যাবে।”

ওishi কাগজটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে অজান্তেই পানি চলে এলো।

পেছন থেকে জয় বলল,

—“পছন্দ হয়েছে?”

ওishi ঘুরে তাকাল।

জয় দাঁড়িয়ে আছে।

—“এগুলো কেন?”

—“কারণ আজ একটা বিশেষ দিন।”

—“কী বিশেষ?”

জয় হাসল।

—“আজ থেকে এক মাস আগে আপনি এই অফিসে প্রথম এসেছিলেন।”

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি তারিখটাও মনে রেখেছেন?”

—“আপনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ভুলে যাওয়া কঠিন।”

ওishi কিছু বলতে পারল না।

জয় বলল,

—“চলুন।”

—“কোথায়?”

—“সারপ্রাইজের দ্বিতীয় অংশ।”

অফিসের সবাই মুচকি হাসতে লাগল।

ওishi বুঝতে পারল, সবাই কিছু একটা জানে।

জয় তাকে নিয়ে অফিসের ছাদে গেল।

ছাদটা সুন্দর করে সাজানো।

ছোট ছোট আলো, ফুল আর একটা টেবিল।

ওishi বিস্মিত হয়ে বলল,

—“এসব আপনি করেছেন?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

জয় তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—“কারণ আমি চাইছিলাম, আমাদের গল্পের একটা দিন শুধু আমাদের জন্য থাকুক।”

ওishi চুপ করে রইল।

জয় ধীরে বলল,

—“প্রথম দিন তোমার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিলাম। তুমি আমার ওপর রাগ করেছিলে।”

ওishi হেসে বলল,

—“কারণ দোষ আপনারই ছিল।”

—“এখনও তাই মনে করেন?”

—“হ্যাঁ।”

জয়ও হেসে বলল,

—“ঠিক আছে। আমি মেনে নিলাম।”

তারপর সে একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

—“কিন্তু ওই দিনের একটা জিনিসের জন্য আমি আজও কৃতজ্ঞ।”

—“কী?”

—“তুমি আমার জীবনে এসেছিলে।”

ওishi-র চোখ ভিজে উঠল।

জয় বলল,

—“আমি জানি, আমাদের সম্পর্কের শুরুটা খুব সাধারণ ছিল। কিছু খুনসুটি, কিছু মজা, কিছু বৃষ্টির দিন। কিন্তু ধীরে ধীরে তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গেছ।”

ওishi নিচু গলায় বলল,

—“আমিও কখন যে আপনার প্রতি এতটা জড়িয়ে গেছি, বুঝতেই পারিনি।”

জয় মৃদু হেসে বলল,

—“তাহলে একটা কথা বলবে?”

—“কী?”

—“আজ নিজের মুখে বলবে?”

ওishi বুঝতে পারল, জয় কী শুনতে চাইছে।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর ধীরে বলল,

—“আমি আপনাকে ভালোবাসি, জয়।”

জয়ের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।

সে মৃদু হেসে বলল,

—“আরেকবার বলবেন?”

ওishi লজ্জা পেয়ে বলল,

—“একবারই যথেষ্ট।”

—“আমার জন্য না।”

ওishi হেসে মাথা নেড়ে বলল,

—“হ্যাঁ, ভালোবাসি।”

জয় কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—“এই কথাটার জন্যই এতদিন অপেক্ষা করছিলাম।”

ওishi বলল,

—“আপনি জানতেন না?”

—“জানতাম। কিন্তু শুনতে চেয়েছিলাম।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই নিচ থেকে মায়ার কণ্ঠ ভেসে এলো,

—“আপনারা দুজন কি সারাদিন ছাদেই থাকবেন?”

ওishi লজ্জায় হেসে ফেলল।

জয় বলল,

—“চলুন, সবাইকে অপেক্ষা করানো ঠিক হবে না।”

দুজন নিচে নামল।

অফিসের সবাই হাততালি দিয়ে তাদের অভিনন্দন জানাল।

ওishi অবাক হয়ে বলল,

—“এরা সবাই জানত?”

মায়া বলল,

—“তোমাদের দুজনকে দেখে বোঝা যায় না নাকি?”

সবাই হেসে উঠল।

কিছুদিন পর দুই পরিবার মিলে তাদের বিয়ের দিন ঠিক করল।

বিয়ের আগের রাতে ওishi ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

জয় ফোন করল।

—“ঘুমাওনি?”

—“না।”

—“কী ভাবছেন?”

ওishi হেসে বলল,

—“ভাবছি, সবকিছু এত সুন্দরভাবে কীভাবে হয়ে গেল।”

জয় বলল,

—“কারণ আমরা দুজনেই হাল ছাড়িনি।”

—“আর যদি প্রথম দিন আপনার সঙ্গে আমার ধাক্কা না লাগত?”

জয় হেসে বলল,

—“তাহলে আমি ইচ্ছে করে আরেকদিন ধাক্কা খেতাম।”

ওishi হেসে ফেলল।

—“আপনি সত্যিই অসম্ভব।”

—“কিন্তু আপনার।”

কথাটা শুনে ওishi কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“হ্যাঁ। আমার।”

পরদিন তাদের বিয়ে হলো।

বিয়ের পর সন্ধ্যায় জয় ওishi-কে সেই একই লেকের পাশে নিয়ে গেল, যেখানে একদিন তারা প্রথম নিজেদের অনুভূতির কথা বুঝতে শুরু করেছিল।

হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।

ওishi বলল,

—“আবার বৃষ্টি!”

জয় বলল,

—“মনে হচ্ছে বৃষ্টিটাও আমাদের বিয়েতে এসেছে।”

ওishi হাসল।

জয় তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

—“মনে আছে, প্রথম দিন তোমাকে ছাতা দিয়েছিলাম?”

—“মনে আছে।”

—“তখন ভাবিনি, সেই ছাতার নিচে একদিন সারাজীবনের সঙ্গীকে খুঁজে পাব।”

ওishi মৃদু হেসে বলল,

—“আমিও ভাবিনি, যে মানুষটাকে প্রথম দিন এত বিরক্তিকর মনে হয়েছিল, তাকেই একদিন এতটা ভালোবেসে ফেলব।”

....
👁 52