দুষ্টু ছেলেটাই হলো আপনজন

শহরের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু জায়গা থাকে, যেখানে বিকেল নামলেই কেমন যেন অন্যরকম শান্তি নেমে আসে। রাস্তার পাশে পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছ, ছোট্ট একটা লেক আর তার চারপাশে হাঁটার পথ—জায়গাটা ছিল শহরের অনেক মানুষের প্রিয়।

সেই জায়গাতেই প্রায় প্রতিদিন বিকেলে দেখা যেত নীলকে।

নীল বয়সে তরুণ, দেখতে বেশ সুদর্শন, কথা বলার সময় চোখেমুখে সবসময় দুষ্টু একটা হাসি লেগে থাকত। পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসায় যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও আপাতত সে নিজের মতো করে জীবন কাটাতেই বেশি পছন্দ করত।

বন্ধুদের কাছে নীল ছিল এক কথায় ঝামেলার আরেক নাম।

কাউকে একটু বিরক্ত না করলে তার দিনই যেন ভালো যেত না।

সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।

লেকের পাশে বেঞ্চে বসে নীল তার বন্ধু রাকিবের সঙ্গে গল্প করছিল।

হঠাৎ রাকিব বলল,

—ওই দেখ, মেয়েটাকে চিনিস?

নীল তাকিয়ে দেখল, একটু দূরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কয়েকটা বই। সাদা-নীল পোশাক, খোলা চুল আর মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব।

নীল কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসল।

—না। তবে এখন চিনতে ইচ্ছা করছে।

রাকিব সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল, বিপদ শুরু।

—তুই কোনো মেয়েকে শান্তিতে থাকতে দিবি না, তাই তো?

নীল হেসে বলল,

—আমি তো শুধু পরিচিত হতে চাই।

—তোর পরিচিত হওয়ার পদ্ধতি আমি জানি।

নীল আর কিছু বলল না। উঠে দাঁড়াল।

মেয়েটি তখন লেকের ধারে একটা বেঞ্চে বসে বই খুলেছে। চারপাশের কোলাহল যেন তার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়।

মেয়েটির নাম ঝর্ণা।

ঝর্ণা ছিল নীলের সম্পূর্ণ বিপরীত। সে খুব শান্ত, নিজের কাজ নিয়ে থাকতে ভালোবাসত এবং অকারণে কারও সঙ্গে কথা বলত না। বিশেষ করে অপরিচিত ছেলেদের সঙ্গে তো নয়ই।

নীল ধীরে ধীরে গিয়ে ঝর্ণার সামনে দাঁড়াল।

—মাফ করবেন।

ঝর্ণা বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,

—জি?

—আপনার বইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।

ঝর্ণা এবার তাকাল।

—কেন?

নীল গম্ভীর মুখ করে বলল,

—কারণ বইটা এতক্ষণ ধরে আপনার হাতে আছে, অথচ আপনি একবারও পৃষ্ঠা উল্টাননি।

ঝর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বুঝল, ছেলেটা তাকে বিরক্ত করার চেষ্টা করছে।

—আপনার কি কোনো কাজ নেই?

নীল হেসে বলল,

—ছিল। কিন্তু আপনাকে দেখে ভুলে গেছি।

ঝর্ণা বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করে ফেলল।

—আপনি কি সব মেয়েকেই এভাবে বিরক্ত করেন?

—না।

—তাহলে?

—শুধু যাদের দেখে মনে হয় তারা আমাকে সহজে পাত্তা দেবে না।

ঝর্ণার মুখে বিরক্তি থাকলেও কথাটা শুনে তার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল, যাতে নীল সেটা দেখতে না পায়।

নীল অবশ্য দেখে ফেলেছে।

—আপনি হাসলেন!

ঝর্ণা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল,

—না।

—আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করি।

—তাহলে চোখের চিকিৎসা করান।

নীল হেসে উঠল।

—আপনি তো বেশ রাগী!

—আর আপনি বেশ বিরক্তিকর।

—ধন্যবাদ।

ঝর্ণা অবাক হয়ে তাকাল।

—ধন্যবাদ কেন?

—আপনি অন্তত আমার একটা গুণ খুঁজে পেয়েছেন।

ঝর্ণা আর কথা বাড়াল না। উঠে চলে যেতে লাগল।

নীলও পিছু নিল।

—আপনার নামটা তো জানলাম না।

ঝর্ণা হাঁটতে হাঁটতেই বলল,

—জানার দরকার নেই।

—আমার কিন্তু খুব দরকার।

—কেন?

—কারণ কাল থেকে আপনাকে কী নামে ডাকব?

ঝর্ণা থেমে ফিরে তাকাল।

—কাল থেকে আমাকে ডাকবেন না।

এই বলে সে চলে গেল।

নীল কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

রাকিব দূর থেকে সব দেখছিল। কাছে এসে বলল,

—কী হলো? নাম জানলি?

নীল মাথা নাড়িয়ে বলল,

—না।

—তাহলে এত হাসছিস কেন?

নীল মুচকি হেসে বলল,

—নাম না জানলেও সমস্যা নেই। কাল আবার দেখা হবে।

রাকিব মাথায় হাত দিয়ে বলল,

—তুই শেষ!

নীল হেসে বলল,

—শুরু তো হলো মাত্র।

পরদিন বিকেলেও নীল ঠিক সময়ে লেকের পাশে এসে হাজির হলো।

কিন্তু ঝর্ণা এল না।

নীল প্রথমে ভাবল, হয়তো একটু পরে আসবে।

পাঁচ মিনিট।

দশ মিনিট।

আধা ঘণ্টা।

ঝর্ণা এল না।

নীল নিজের অজান্তেই বিরক্ত হয়ে গেল।

—মেয়েটা এত অহংকারী কেন?

কথাটা বললেও তার চোখ বারবার রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছিল।

পরের দিনও ঝর্ণা এল না।

তৃতীয় দিন বিকেলে নীল যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন দূর থেকে ঝর্ণাকে দেখা গেল।

নীলের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।

ঝর্ণা কাছে আসতেই নীল বলল,

—আপনি আমাকে অপেক্ষা করিয়েছেন।

ঝর্ণা অবাক।

—আমি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম?

—না।

—তাহলে?

—আমার মন বলেছিল আপনি আসবেন।

ঝর্ণা ভ্রু কুঁচকে বলল,

—আপনার মনকে বলবেন আমার ব্যাপারে বেশি সিদ্ধান্ত না নিতে।

নীল হেসে বলল,

—মনকে কি আর সবসময় বোঝানো যায়?

ঝর্ণা কিছু বলল না।

তারপর হঠাৎ নীল তার হাতে থাকা বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আজও একই বই?

ঝর্ণা বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে আজ পরীক্ষা নেব।

—কী পরীক্ষা?

—বইটার গল্প আমাকে বলতে হবে।

ঝর্ণা এবার হেসে ফেলল।

—আপনি সত্যিই অদ্ভুত।

—আপনি হাসলে কিন্তু আপনাকে অনেক সুন্দর লাগে।

ঝর্ণার হাসি থেমে গেল।

সে নীলের দিকে তাকিয়ে রইল।

নীলও এবার একটু চুপ হয়ে গেল।

কথার মাঝখানে হঠাৎ এমন একটা নীরবতা নেমে এলো, যেটা দুজনের কারও কাছে অস্বস্তিকর লাগল না।

ঝর্ণা ধীরে ধীরে বলল,

—আপনি সবসময় এমন কথা বলেন?

নীল মাথা নাড়িয়ে বলল,

—না।

—তাহলে?

—শুধু আপনার সঙ্গে।

ঝর্ণা চোখ নামিয়ে ফেলল।

সে বুঝতে পারছিল না, ছেলেটাকে বিরক্তিকর মনে করবে, নাকি তার কথাগুলো শুনে মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা হাসিটাকে স্বীকার করবে।

নীল হঠাৎ বলল,

—একটা কথা বলি?

—বলুন।

—আপনার নামটা আজ জানতে পারি?

ঝর্ণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—ঝর্ণা।

নীলের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল।

—অবশেষে!

—এত খুশি হওয়ার কী আছে?

—আছে। কারণ এখন থেকে আপনাকে ডাকার একটা নাম আছে।

ঝর্ণা মুচকি হেসে বলল,

—তবে বেশি ডাকাডাকি করবেন না।

নীল বলল,

—চেষ্টা করব।

—চেষ্টা নয়। করবেন না।

—ঠিক আছে, ঝর্ণা।

ঝর্ণা তার দিকে তাকিয়ে রাগ দেখানোর চেষ্টা করল।

কিন্তু নিজের অজান্তেই আবার হেসে ফেলল।

আর নীল সেই হাসিটাই দেখছিল।

সেদিন দুজনের মধ্যে খুব বেশি কথা হয়নি।

কিন্তু ফেরার সময় দুজনেই একবার করে পেছনে তাকিয়েছিল।

দুজনেই দেখেছিল, অন্যজনও তাকিয়ে আছে।

কেউ কিছু বলেনি।

ঝর্ণার সঙ্গে পরিচয়ের পর কয়েকটা দিন যেন নীলের কাছে অন্যরকম হয়ে গেল।

আগে বিকেল হলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি আর নানা রকম দুষ্টুমি করেই সময় কাটত। এখন বিকেল হলেই তার একটাই চিন্তা—ঝর্ণা কখন লেকের পাশে আসবে।

বন্ধুরা ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছিল।

একদিন রাকিব বলল,

—তুই প্রেমে পড়েছিস?

নীল সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—কে বলল?

—তোর মুখ বলছে।

—আমার মুখ আবার কথা বলে নাকি?

—তুই যখন ঝর্ণার নাম শুনিস, তখন তোর মুখে যে হাসি আসে, সেটা অনেক কিছু বলে।

নীল হেসে বলল,

—চুপ কর।

রাকিব মজা করে বলল,

—বিয়েতে কিন্তু আমাকে দাওয়াত দিবি।

নীল তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

—আগে বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছাই, তারপর দাওয়াতের কথা ভাবিস।

ওদিকে ঝর্ণাও নীলকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিল।

সে নিজেকে বোঝাত, নীল শুধু বিরক্ত করে, আর কিছু নয়।

কিন্তু সত্যিটা হলো, নীল একদিন না এলে তার নিজেরই কেমন যেন খারাপ লাগত।

সেদিন বিকেলে ঝর্ণা লেকের পাশে এসে দেখল, নীল নেই।

সে চারপাশে একবার তাকাল।

তারপর নিজের অজান্তেই একটু হতাশ হলো।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,

—কাকে খুঁজছেন?

ঝর্ণা চমকে ঘুরে দাঁড়াল।

নীল দাঁড়িয়ে আছে, হাতে দুটো আইসক্রিম।

ঝর্ণা বিরক্ত মুখে বলল,

—আপনাকে খুঁজছিলাম না।

নীল মুচকি হেসে বলল,

—আমি তো বলিনি আপনি আমাকে খুঁজছিলেন।

ঝর্ণা বুঝতে পারল, সে নিজেই ধরা খেয়ে গেছে।

—আমি... শুধু চারপাশে তাকাচ্ছিলাম।

—তা বুঝেছি।

নীল একটা আইসক্রিম তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

—এটা নিন।

ঝর্ণা নিল না।

—আমি খাব না।

—কেন?

—আপনি দিয়েছেন বলে।

—তাহলে আমি অন্য কারও কাছ থেকে এনে দিচ্ছি।

ঝর্ণা বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি না সত্যিই অসহ্য!

নীল হেসে বলল,

—তবু আপনি প্রতিদিন আমার সঙ্গে কথা বলেন।

ঝর্ণা এবার আইসক্রিমটা নিয়ে নিল।

—এটা শেষবার।

নীল বলল,

—আপনি প্রতিদিনই বলেন, এটা শেষবার।

ঝর্ণা চুপ করে গেল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

হঠাৎ নীল বলল,

—ঝর্ণা।

—হুম?

—আপনি সবসময় এত রাগ করে থাকেন কেন?

—আমি রাগ করি না।

—এই যে এখন করছেন।

—আপনার সঙ্গে কথা বললে রাগ হয়।

—তাহলে আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিন।

ঝর্ণা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি চুপ থাকলে ভালো লাগে না।

কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝর্ণা নিজেই থেমে গেল।

নীলও থেমে গেল।

—কী বললেন?

ঝর্ণা দ্রুত বলল,

—কিছু না।

—না, না। আমি পরিষ্কার শুনেছি।

—আপনি ভুল শুনেছেন।

নীল মুচকি হেসে বলল,

—ঠিক আছে। আমি ভুলই শুনেছি।

কিন্তু তার চোখের দুষ্টু হাসি দেখে ঝর্ণা বুঝতে পারল, সে কথাটা মনে রেখে দিয়েছে।

পরদিন নীল নতুন একটা দুষ্টুমি করার পরিকল্পনা করল।

ঝর্ণা লেকের বেঞ্চে বসে বই পড়ছিল। নীল একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল।

হঠাৎ সে চুপিচুপি গিয়ে ঝর্ণার বইটা নিয়ে দৌড় দিল।

ঝর্ণা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীল বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে।

—নীল!

নীল ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসল।

—জি?

—আমার বই দিন!

—আগে একটা শর্ত।

—কী শর্ত?

—আজ আমাকে রাগী বলবেন না।

ঝর্ণা রেগে বলল,

—বই দিন!

—না।

—নীল!

—আবার রাগ!

ঝর্ণা দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল।

—বইটা দিন, নাহলে কিন্তু...

—নাহলে কী?

—আমি সত্যিই রাগ করব।

নীল বইটা মাথার ওপরে তুলে বলল,

—আপনি তো এমনিতেই রাগ করেন।

ঝর্ণা বইটা নেওয়ার চেষ্টা করল। নীল একটু পিছিয়ে গেল।

কয়েকবার চেষ্টা করেও বইটা নিতে না পেরে ঝর্ণা শেষ পর্যন্ত রেগে গিয়ে বলল,

—আপনি একটা অসভ্য!

নীল সঙ্গে সঙ্গে বইটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

—এই নিন।

ঝর্ণা বইটা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি আমাকে বিরক্ত করে আনন্দ পান?

নীল একটু নরম হয়ে বলল,

—আপনি হাসলে ভালো লাগে।

ঝর্ণা থেমে গেল।

—কী?

—আপনি যখন রাগ করেন, তখন চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। আর যখন হাসেন, তখন পুরো মুখটা বদলে যায়।

ঝর্ণার রাগটা যেন একটু কমে গেল।

সে নিচু গলায় বলল,

—আপনি এত কথা কোথা থেকে শিখেছেন?

নীল হেসে বলল,

—আপনাকে দেখেই শিখছি।

ঝর্ণা এবার মুখ লুকিয়ে হাসল।

দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল।

তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়তে লাগল।

নীল মাঝে মাঝে ঝর্ণাকে খেপাত। ঝর্ণা রাগ করত। কখনো কথা বলা বন্ধ করে দিত।

আর নীল তখন তার রাগ ভাঙানোর জন্য নতুন নতুন কাণ্ড করত।

একদিন ঝর্ণা নীলের ওপর সত্যিই রাগ করল।

কারণ নীল তার বন্ধুদের সামনে বলে ফেলেছিল,

—ঝর্ণা আমাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারে না।

কথাটা শুনে ঝর্ণার মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।

সে কিছু না বলে সেখান থেকে চলে যায়।

পরদিনও নীলের সঙ্গে কথা বলল না।

তৃতীয় দিনও না।

নীল এবার বুঝল, মজা করতে গিয়ে সে একটু বেশি করে ফেলেছে।

সন্ধ্যায় সে ঝর্ণার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—রাগ করে আছেন?

ঝর্ণা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—না।

—তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন?

—ইচ্ছা করছে না।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি ভুল করেছি।

ঝর্ণা তাকাল না।

—মজা করতে গিয়ে আপনাকে সবার সামনে অস্বস্তিতে ফেলেছি। সত্যি দুঃখিত।

ঝর্ণা এবার তার দিকে তাকাল।

নীলের মুখে সেই দুষ্টু হাসি নেই।

সত্যিই অনুতপ্ত মনে হচ্ছে।

ঝর্ণা ধীরে বলল,

—আপনি সবসময় মজা করেন কেন?

—আপনাকে হাসানোর জন্য।

—সবসময়?

—হ্যাঁ।

ঝর্ণা কিছু বলল না।

নীল বলল,

—আপনি আমার ওপর রাগ করলে আমার ভালো লাগে না।

ঝর্ণার চোখে এবার কোমলতা ফুটে উঠল।

—আমিও বেশি রাগ করেছি।

—তাহলে মাফ করেছেন?

ঝর্ণা একটু ভেবে বলল,

—শর্ত আছে।

—কী?

—আর কখনো সবার সামনে এমন কথা বলবেন না।

নীল মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক আছে।

তারপর একটু থেমে যোগ করল,

—তবে একান্তে বললে সমস্যা নেই তো?

ঝর্ণা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

তারপর নীলের হাতে হালকা একটা চড় দিয়ে বলল,

—আপনি বদলাবেন না!

নীল হেসে উঠল।

ঝর্ণাও আর নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না।

সন্ধ্যার বাতাসে দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।

কথা ছিল অনেক।

তবু কিছু কথা তারা বলছিল না।

নীল আর ঝর্ণার সম্পর্কটা এখন আর শুধু পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিদিন দেখা করা, একে অপরকে খেপানো, ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করা—সবকিছুই যেন তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

তবে দুজনের কেউই মুখে স্বীকার করছিল না, এই সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু তৈরি হয়েছে।

ঝর্ণা অবশ্য মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করত।

নীল না এলে কেন তার মন খারাপ হয়?

নীল অন্য কারও সঙ্গে বেশি কথা বললে কেন তার ভালো লাগে না?

আর নীল যখন একটু বেশি কাছে এসে কথা বলে, তখন বুকের ভেতর অকারণে কেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়?

সে কোনো উত্তর খুঁজে পেত না।

বরং নিজেকেই বলত,

“নীল এমনই। সবার সঙ্গেই দুষ্টুমি করে।”

কিন্তু কথাটা বিশ্বাস করতে তার নিজেরই কষ্ট হতো।

একদিন বিকেলে ঝর্ণা লেকের পাশে এসে দেখল, নীল আগে থেকেই বসে আছে।

কিন্তু আজ নীলের পাশে একটা মেয়ে বসে কথা বলছে।

ঝর্ণা দূর থেকেই দৃশ্যটা দেখল।

মেয়েটা খুব হাসিমুখে নীলের সঙ্গে কথা বলছে। নীলও হাসছে।

ঝর্ণার মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।

সে আর কাছে গেল না।

চুপচাপ ঘুরে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল।

নীল কিছুক্ষণ পর মেয়েটার সঙ্গে কথা শেষ করে তাকাতেই ঝর্ণাকে দেখতে পেল।

—ঝর্ণা!

ঝর্ণা শুনেও শুনল না।

নীল দ্রুত তার পেছনে ছুটল।

—এই, দাঁড়ান!

ঝর্ণা থামল না।

নীল সামনে গিয়ে পথ আটকাল।

—কী হয়েছে?

—কিছু হয়নি।

—তাহলে চলে যাচ্ছেন কেন?

—আমার কাজ আছে।

—কী কাজ?

—আপনাকে বলতে হবে?

নীল অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনি রাগ করেছেন?

—না।

—আপনার মুখ বলছে রাগ করেছেন।

ঝর্ণা এবার সরাসরি বলল,

—আপনি যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তার কাছেই যান।

নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে ফেলল।

—ও!

ঝর্ণা আরও রেগে গেল।

—হাসছেন কেন?

—আপনি ঈর্ষা করছেন?

—একদম না!

—তাহলে এত রাগ কেন?

—আমি রাগ করিনি।

—তাহলে?

ঝর্ণা চুপ করে রইল।

নীল এবার একটু নরম স্বরে বলল,

—ও আমার মামাতো বোন। আজই ঢাকায় এসেছে।

ঝর্ণা থমকে গেল।

—মামাতো বোন?

—হ্যাঁ।

ঝর্ণা কিছু বলল না।

নীল মুচকি হেসে বলল,

—এখন বুঝলাম, কেন এত রাগ।

ঝর্ণা মুখ ফিরিয়ে বলল,

—আপনি যা খুশি ভাবুন।

—আমি কিন্তু খুব খুশি।

—কেন?

—কারণ আপনি আমার ব্যাপারে ভাবেন।

ঝর্ণা এবার লজ্জা পেয়ে বলল,

—আপনার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।

এই বলে সে আবার হাঁটতে শুরু করল।

নীল পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

—ঝর্ণা।

—কী?

—আপনি যদি কখনো আমাকে নিয়ে রাগ করেন, সরাসরি বলবেন।

—কেন?

—কারণ আপনার রাগ ভাঙাতে আমার ভালো লাগে।

ঝর্ণা চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর নীল বলল,

—আর একটা কথা।

—বলুন।

—আপনি যখন ঈর্ষা করেন, তখন আপনাকে আরও সুন্দর লাগে।

ঝর্ণা রেগে গিয়ে বলল,

—নীল!

নীল হেসে দৌড়ে পালাল।

ঝর্ণাও হেসে ফেলল।

তবে সেই দিনের পর থেকে ঝর্ণার ভেতরে একটা বিষয় আরও স্পষ্ট হয়ে গেল।

সে নীলকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখে না।

অন্যদিকে নীলও নিজের অনুভূতি নিয়ে আর আগের মতো নিশ্চিন্ত ছিল না।

সে বুঝতে পারছিল, ঝর্ণা তার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একদিন নীল ঝর্ণাকে ফোন করল।

—কোথায়?

—বাসায়।

—বাইরে আসবেন?

—কোথায়?

—আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।

—না।

—কেন?

—আম্মু বকা দেবে।

—তাহলে আমিই আপনার আম্মুর সঙ্গে কথা বলব।

ঝর্ণা হেসে বলল,

—আপনি কথা বললে তো উল্টো আমাকে আরও বকা দেবে।

—ঠিক আছে, তাহলে আপনি চুপিচুপি আসুন।

—আমি আসছি না।

—ঠিক আছে।

নীল ফোন কেটে দিল।

ঝর্ণা কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর নিজের অজান্তেই বলল,

—পাগল একটা!

দশ মিনিট পর নীলের আবার ফোন।

—আমি আপনার বাসার নিচে।

ঝর্ণা জানালার কাছে গিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।

—আপনি সত্যিই এসেছেন?

—হ্যাঁ।

—আপনি যাবেন না?

—আপনি না এলে যাব না।

ঝর্ণা বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি আমাকে খুব বিরক্ত করেন।

—জানি।

—পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন।

নীল হাসল।

—আমি পাঁচ ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে পারি।

কিছুক্ষণ পর ঝর্ণা নিচে এল।

নীল তাকে নিয়ে শহরের বাইরে একটা শান্ত জায়গায় গেল। সেখানে একটা ছোট্ট নদীর ধারে বসার জায়গা ছিল।

ঝর্ণা চারপাশ দেখে মুগ্ধ হয়ে বলল,

—জায়গাটা খুব সুন্দর।

নীল বলল,

—আপনার জন্যই খুঁজে বের করেছি।

—কেন?

—আপনি বলেছিলেন, শহরের ভিড় আপনার ভালো লাগে না।

ঝর্ণা চুপ করে গেল।

সে বুঝতে পারল, নীল তার বলা ছোট ছোট কথাগুলোও মনে রাখে।

দুজন নদীর ধারে বসে ছিল।

কিছুক্ষণ পর ঝর্ণা বলল,

—নীল।

—হুম?

—আপনি কি সবার জন্য এমন?

—কেমন?

—এত কিছু মনে রাখেন, এত যত্ন করেন?

নীল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—না।

—তাহলে?

—শুধু আপনার জন্য।

ঝর্ণার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

সে চোখ নামিয়ে ফেলল।

নীল আর কিছু বলল না।

সেদিন ফেরার সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো।

ঝর্ণা বৃষ্টিতে আটকে গেল।

নীল নিজের ছাতাটা তার হাতে দিয়ে বলল,

—আপনি এটা নিন।

—আপনি?

—আমি ভিজব।

—আপনি ভিজবেন কেন?

—আপনি যেন না ভেজেন।

ঝর্ণা ছাতাটা নিতে চাইছিল না।

—দুজনেই তো ছাতার নিচে থাকতে পারি।

নীল মৃদু হেসে বলল,

—পারব?

ঝর্ণা কিছু না বলে ছাতাটা একটু বড় করে ধরল।

নীল তার পাশে এসে দাঁড়াল।

দুজন খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল।

বৃষ্টির শব্দের মাঝে ঝর্ণা নিজের হৃদস্পন্দন যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।

নীলও চুপ।

কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছিল না।

কিছুক্ষণ পর ঝর্ণা আস্তে বলল,

—আপনি আজ এত চুপ কেন?

নীল হেসে বলল,

—ভয় হচ্ছে।

—কিসের?

—বেশি কথা বললে আপনি আবার রাগ করবেন।

ঝর্ণা মৃদু হেসে বলল,

—আজ রাগ করব না।

নীল তার দিকে তাকাল।

—সত্যি?

ঝর্ণা মাথা নেড়ে বলল,

—হুম।

নীল বলল,

—তাহলে একটা কথা বলি?

—বলুন।

—আপনি আমার জীবনে আসার পর থেকে সবকিছু বদলে গেছে।

ঝর্ণা চুপ করে রইল।

—আগে বিকেল মানে শুধু সময় কাটানো ছিল। এখন বিকেল মানে আপনাকে দেখা।

ঝর্ণার চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা ফুটে উঠল।

সে কিছু বলতে চেয়েও পারল না।

শুধু আস্তে বলল,

—নীল...

—হুম?

—বৃষ্টি থামছে।

নীল আকাশের দিকে তাকাল।

বৃষ্টি সত্যিই কমে এসেছে।

কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে যে অনুভূতিটা জন্ম নিয়েছে, সেটা আর থামার মতো ছিল না।

সেদিন রাতে নিজের ঘরে বসে ঝর্ণা অনেকক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

ফোনে নীলের একটা মেসেজ এল।

“আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল।”

ঝর্ণা মেসেজটা পড়ে কয়েকবার হাসল।

তারপর উত্তর লিখে আবার মুছে ফেলল।

শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল—

“বেশি কথা বলো না।”

কয়েক সেকেন্ড পর নীলের উত্তর এল—

“তবু তুমি আমার মেসেজের অপেক্ষায় ছিলে।”

ঝর্ণা ফোনটা বালিশের নিচে রেখে দিল।

মুখে হাসি লুকাতে পারল না।

নীল আর ঝর্ণার সম্পর্কটা দিন দিন আরও গভীর হয়ে উঠছিল। মুখে তারা এখনো নিজেদের সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলত, কিন্তু তাদের আচরণে সেই বন্ধুত্বের সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

ঝর্ণা সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলে প্রথমেই নীলের মেসেজ খুঁজত।

আর নীলের দিন শুরু হতো ঝর্ণাকে বিরক্ত করার নতুন কোনো অজুহাত দিয়ে।

কখনো নীল লিখত—

“আজ আমাকে মিস করেছ?”

ঝর্ণা উত্তর দিত—

“স্বপ্নেও না।”

নীল আবার লিখত—

“তাহলে রাতে এতবার আমার নাম মনে পড়ল কেন?”

ঝর্ণা বিরক্ত হয়ে ফোনটা রেখে দিত।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ফোন হাতে নিয়ে মেসেজটা পড়ত।

তারপর একা একাই হাসত।

এইভাবেই চলছিল তাদের দিন।

এক সকালে ঝর্ণা কলেজে যাওয়ার জন্য বের হওয়ার সময় দেখল, রাস্তার পাশে নীল দাঁড়িয়ে আছে।

ঝর্ণা অবাক হয়ে বলল,

—আপনি এখানে?

নীল হেসে বলল,

—আপনাকে নিতে এসেছি।

—কে বলেছে আপনাকে আসতে?

—আমার মন।

—আপনার মনকে একটু নিয়ন্ত্রণ করুন।

—আপনি করলে আমার মন খুব সহজে নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ঝর্ণা চোখ বড় করে তাকাল।

—আপনি কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না?

—আপনার সঙ্গে না।

ঝর্ণা মুখ লুকিয়ে হাসল।

তারপর দুজন একসঙ্গে হাঁটতে লাগল।

কিছুদূর যেতেই নীল বলল,

—আজ একটা জায়গায় যাবেন আমার সঙ্গে?

—কোথায়?

—বলব না।

—তাহলে যাব না।

—কেন?

—আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন, আমি জানি না।

নীল মজা করে বলল,

—আমাকে বিশ্বাস করেন না?

ঝর্ণা একটু থেমে বলল,

—করি।

—তাহলে চলুন।

ঝর্ণা শেষ পর্যন্ত রাজি হলো।

নীল তাকে শহরের একটা পুরোনো বইয়ের দোকানে নিয়ে গেল।

ঝর্ণা অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল।

—এখানে কেন?

নীল একটা বই হাতে নিয়ে বলল,

—আপনার জন্য।

—আমার জন্য?

—হ্যাঁ।

ঝর্ণা বইটা হাতে নিয়ে দেখল, তার পছন্দের লেখকের নতুন বই।

সে অবাক হয়ে বলল,

—আপনি জানলেন কীভাবে?

—আপনি একদিন বলেছিলেন।

ঝর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

ছোট্ট একটা কথাও নীল মনে রেখেছে।

সে ধীরে বলল,

—ধন্যবাদ।

নীল মুচকি হেসে বলল,

—শুধু ধন্যবাদ দিলে হবে?

—তাহলে কী দিতে হবে?

—একটা হাসি।

ঝর্ণা হেসে ফেলল।

—এই নিন।

—না, এইটা তো প্রতিদিনই দেখি।

—তাহলে?

—একটু সুন্দর করে।

ঝর্ণা রাগ দেখিয়ে বলল,

—আপনি বেশি বাড়াবাড়ি করছেন।

নীল হেসে বলল,

—আপনি রাগ করলে আমার খুব ভালো লাগে।

ঝর্ণা বই দিয়ে নীলের হাতে হালকা আঘাত করল।

—অসভ্য!

নীল হাসতে হাসতে বলল,

—এই জন্যই তো আপনাকে এত ভালো লাগে।

কথাটা বলেই নীল থেমে গেল।

ঝর্ণার মুখের হাসিও থেমে গেল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

নীল বুঝতে পারল, কথাটা হয়তো তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।

ঝর্ণা ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—কী বললেন?

নীল একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

—বললাম... আপনার রাগ ভালো লাগে।

ঝর্ণা কিছু বলল না।

কিন্তু সে কথাটার অন্য অর্থও বুঝেছিল।

ফেরার পথে দুজনই অস্বাভাবিক চুপ ছিল।

সেদিন রাতে ঝর্ণা অনেকক্ষণ নীলের কথাটা ভাবল।

“আপনাকে এত ভালো লাগে।”

এই একটা বাক্য বারবার তার মাথায় ঘুরছিল।

সে জানত, নীল তাকে পছন্দ করে।

কিন্তু নীল কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে?

এই প্রশ্নের উত্তর সে জানত না।

পরদিন বিকেলে নীলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ঝর্ণা দেখল, নীল কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মধ্যে একটি মেয়েও ছিল।

মেয়েটা নীলের খুব কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।

ঝর্ণা দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে থেমে গেল।

নীল তাকে দেখতে পায়নি।

ঝর্ণা এবার আর কাছে গেল না।

চুপচাপ ফিরে গেল।

কিছুক্ষণ পর নীল ফোন করল।

—কোথায়?

—বাসায়।

—আজ আসলেন না কেন?

—ইচ্ছা করেনি।

—কেন?

—এমনিই।

নীল বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।

—ঝর্ণা, কী হয়েছে?

—কিছু হয়নি।

—আপনি আবার রাগ করেছেন?

—না।

—তাহলে এত ঠান্ডা গলায় কথা বলছেন কেন?

ঝর্ণা চুপ।

নীল বলল,

—আমি কি কিছু করেছি?

ঝর্ণা হঠাৎ বলে ফেলল,

—আপনার অনেক মানুষ আছে কথা বলার জন্য। আমার সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই।

নীল অবাক হয়ে গেল।

—কী বলছেন?

—যা বলছি, সেটাই।

—আপনি কি আজ আমাকে কারও সঙ্গে দেখেছেন?

ঝর্ণা চুপ করে রইল।

নীল বুঝে গেল।

—ও আমার বন্ধু তানিয়া।

ঝর্ণা বলল,

—আমাকে ব্যাখ্যা দিতে হবে না।

—কিন্তু আপনি ভুল বুঝছেন।

—আমি কিছু বুঝিনি।

—তাহলে রাগ করছেন কেন?

ঝর্ণা এবার একটু কেঁপে ওঠা গলায় বলল,

—কারণ... আমি আপনাকে অন্য কারও সঙ্গে এভাবে দেখতে পারি না।

কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দিল।

নীল অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে হাসল।

কারণ সে প্রথমবার ঝর্ণার মুখ থেকে নিজের জন্য এমন অধিকার শুনেছে।

পরদিন নীল লেকের পাশে ঝর্ণার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

ঝর্ণা এল।

নীল তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—আমার দিকে তাকাবেন?

ঝর্ণা তাকাল না।

—আমি রাগ করিনি।

—জানি।

—তাহলে?

—আপনি অভিমান করেছেন।

ঝর্ণা এবার তাকাল।

—আমি অভিমান করিনি।

—আপনি যখন বলেন “আমি অভিমান করিনি”, তখনই বুঝি আপনি সবচেয়ে বেশি অভিমান করেছেন।

ঝর্ণা চুপ।

নীল ধীরে বলল,

—তানিয়া শুধু আমার বন্ধু। আর কারও সঙ্গে আমার এমন কোনো সম্পর্ক নেই।

ঝর্ণা নিচু গলায় বলল,

—আমার সঙ্গে?

নীল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

—আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম।

ঝর্ণার বুক ধক করে উঠল।

—কেমন?

নীল উত্তর দিল না।

বরং বলল,

—আপনি কি সত্যিই জানতে চান?

ঝর্ণা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ।

নীল তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তাহলে একটু সময় দিন।

ঝর্ণা অবাক হলো।

—সময় কেন?

—কারণ কিছু কথা আছে, যেগুলো মজা করে বলা যায় না।

ঝর্ণার চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল।

—কী কথা?

নীল মৃদু হেসে বলল,

—সঠিক সময় হলে বলব।

ঝর্ণা রাগ দেখিয়ে বলল,

—আপনি সবকিছু এত রহস্য করে বলেন কেন?

—কারণ আপনার মুখের কৌতূহল দেখতে ভালো লাগে।

ঝর্ণা হেসে ফেলল।

—আপনি একদম বদলাবেন না।

—আপনিও না।

—আমি কী করেছি?

—আপনি আমাকে নিয়ে অভিমান করেন, আবার বলেন অভিমান করেননি।

ঝর্ণা এবার সত্যিই হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।

নীল আসলে তাকে কী বলতে চায়?

সেদিন রাতে ঝর্ণার ফোনে নীলের মেসেজ এল—

“কাল তোমাকে একটা কথা বলব। হয়তো এরপর আমাদের সম্পর্কটা আর আগের মতো থাকবে না।”

মেসেজটা পড়ে ঝর্ণার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা ভয় ঢুকে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—

“কী কথা?”

অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

শেষ পর্যন্ত শুধু একটা মেসেজ এল—

“কাল দেখা করো। সামনে বসে বলব।”

ঝর্ণা সারা রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারল না।

নীলের শেষ মেসেজটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল—

“কাল তোমাকে একটা কথা বলব। হয়তো এরপর আমাদের সম্পর্কটা আর আগের মতো থাকবে না।”

কী এমন কথা বলতে পারে নীল?

সে কি দূরে চলে যাবে?

নাকি এতদিনের দুষ্টুমি, হাসি, অভিমান—সবকিছুর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল?

ঝর্ণা যতই নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল, ততই তার বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়ছিল।

পরদিন বিকেলে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সে লেকের পাশে এসে বসে রইল।

হাতে একটা বই ছিল, কিন্তু বইয়ের একটা পাতাও পড়া হলো না।

বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল সে।

অবশেষে দূর থেকে নীলকে দেখা গেল।

আজ নীলের মুখে সেই চেনা দুষ্টু হাসি নেই।

সে ধীরে ধীরে ঝর্ণার কাছে এসে দাঁড়াল।

—অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছ?

ঝর্ণা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

—না।

নীল হেসে বলল,

—মিথ্যা বলছ।

—আপনি এত দেরি করলেন কেন?

—কিছু একটা নিয়ে ভাবছিলাম।

—কী?

—আপনাকে কীভাবে কথাটা বলব।

ঝর্ণার বুকের ভেতর আবার ধক করে উঠল।

—তাহলে বলুন।

নীল পাশে এসে বসল।

কিছুক্ষণ দুজনই চুপ করে রইল।

লেকের পানিতে বিকেলের আলো ঝিলমিল করছিল। দূরে কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছিল।

নীল ধীরে বলল,

—ঝর্ণা, তোমার সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন থেকেই তুমি আমার কাছে অন্যরকম ছিলে।

ঝর্ণা চুপ করে শুনছিল।

—প্রথম দিন তুমি আমাকে খুব রাগ দেখিয়েছিলে।

ঝর্ণার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।

—কারণ আপনি আমাকে বিরক্ত করেছিলেন।

—জানি। কিন্তু তোমার সেই রাগটাই আমার ভালো লেগেছিল।

ঝর্ণা নিচু গলায় বলল,

—আপনি সবসময় আমাকে নিয়ে মজা করেন।

—কারণ তোমাকে হাসতে দেখলে আমার ভালো লাগে।

নীল একটু থামল।

—কিন্তু একটা সময়ের পর বুঝলাম, তোমাকে শুধু হাসাতে চাই না। তোমার মন খারাপ হলে আমারও মন খারাপ হয়। তুমি রাগ করলে আমার অস্থির লাগে। তুমি অন্য কারও সঙ্গে বেশি কথা বললে আমার ভালো লাগে না।

ঝর্ণা ধীরে তার দিকে তাকাল।

নীল এবার সরাসরি বলল,

—আমি তোমাকে ভালোবাসি, ঝর্ণা।

কথাটা শুনে ঝর্ণা একদম চুপ হয়ে গেল।

এতদিন যে কথাটা সে মনে মনে শুনতে চেয়েছিল, আজ সেটাই নীল নিজের মুখে বলেছে।

কিন্তু তার চোখে আনন্দের সঙ্গে অদ্ভুত এক ভয়ও ফুটে উঠল।

নীল বলল,

—কিছু বলবে না?

ঝর্ণা ঠোঁট নেড়ে বলল,

—আমি...

তারপর থেমে গেল।

নীল অপেক্ষা করছিল।

—আমি কী বলব বুঝতে পারছি না।

—তোমার যা মনে হচ্ছে, সেটাই বলো।

ঝর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন?

—খুব।

—কতটা?

নীল মুচকি হেসে বলল,

—এটার হিসাব হয়?

ঝর্ণা মাথা নিচু করল।

তার চোখে লজ্জা ফুটে উঠেছে।

নীল বলল,

—তুমি চাইলে আমি আজ থেকেই তোমার জীবন থেকে চলে যাব। কিন্তু তোমাকে মিথ্যা বলতে পারব না।

ঝর্ণা দ্রুত মাথা তুলে তাকাল।

—না!

নীল থেমে গেল।

ঝর্ণাও বুঝতে পারল, তার মুখ থেকে কথাটা খুব দ্রুত বেরিয়ে গেছে।

নীল ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—তাহলে?

ঝর্ণা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আপনি চলে গেলে... আমার ভালো লাগবে না।

নীলের মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

—এটাই কি তোমার উত্তর?

ঝর্ণা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে বলল,

—হয়তো।

—হয়তো?

—হ্যাঁ।

—আমি এত বড় কথা বললাম, আর তুমি আমাকে “হয়তো” দিয়ে বিদায় দিচ্ছ?

ঝর্ণা হেসে বলল,

—আপনাকে একটু অপেক্ষা করতেই হবে।

—কতদিন?

—জানি না।

—একদিন?

ঝর্ণা মাথা নাড়ল।

—এক সপ্তাহ?

—হতে পারে।

—এক মাস?

—আপনি এত প্রশ্ন করেন কেন?

নীল হেসে বলল,

—কারণ আমি এখন থেকেই তোমার উত্তর শোনার জন্য অস্থির।

ঝর্ণা এবার নরম গলায় বলল,

—আমারও আপনাকে ভালো লাগে।

নীল চুপ হয়ে গেল।

তার মুখের হাসিটা আরও গভীর হলো।

—আবার বলো।

—না।

—একবার বলেছ, আবার বলতে কী সমস্যা?

—আমি একবারই বলেছি।

—আমি ঠিকমতো শুনিনি।

ঝর্ণা হেসে ফেলল।

—আপনি খুব চালাক।

—তুমি যদি এভাবে আমাকে খেপাও, তাহলে কিন্তু আমি তোমার কাছ থেকে উত্তর আদায় করে ছাড়ব।

ঝর্ণা বলল,

—ঠিক আছে। শুনুন।

সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে বলল,

—আমি আপনাকে ভালোবাসি।

নীল কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।

ঝর্ণা অবাক হয়ে বলল,

—চুপ কেন?

নীল মৃদু হেসে বলল,

—আমি ভাবছি, এতদিন যে মেয়েটা আমাকে সারাক্ষণ বকত, সে আজ আমাকে ভালোবাসি বলল!

ঝর্ণা সঙ্গে সঙ্গে রেগে গেল।

—তাহলে আর বলব না।

—আরে না! আবার বলো।

—না।

—ঝর্ণা!

—কী?

—আমি খুব খুশি।

ঝর্ণার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সেদিন তারা অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে কথা বলল।

ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে।

নীল বলল,

—একদিন তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে যাব।

—কোথায়?

—যেখানে তুমি যেতে চাও।

—পাহাড়ে।

—ঠিক আছে।

—সমুদ্রেও।

—সেটাও হবে।

—আর একটা বড় বইয়ের ঘর চাই।

নীল হেসে বলল,

—তোমার বইয়ের জন্য আলাদা ঘর বানাব।

ঝর্ণা বলল,

—সত্যি?

—সত্যি।

তাদের কথার মাঝে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তারা বুঝতেই পারেনি।

ফেরার সময় নীল বলল,

—আজ থেকে একটা নিয়ম।

—কী?

—রাগ করলে আমাকে বলবে।

—কেন?

—চুপ করে দূরে সরে যাবে না।

ঝর্ণা মুচকি হেসে বলল,

—আপনিও একটা নিয়ম মানবেন।

—কী?

—আমাকে অকারণে জ্বালাবেন না।

নীল বলল,

—আমি চেষ্টা করব।

ঝর্ণা চোখ বড় করে তাকাল।

—চেষ্টা না। মানতে হবে।

—ঠিক আছে, ম্যাডাম।

ঝর্ণা হেসে ফেলল।

কিন্তু তাদের এই আনন্দ বেশিদিন গোপন রইল না।

কয়েকদিন পর ঝর্ণার বড় ভাই রায়হান তাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারল।

এক বিকেলে রায়হান ঝর্ণাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

—নীল কে?

ঝর্ণা চমকে গেল।

—কেন?

—তোমাকে কয়েকদিন ধরে ওর সঙ্গে দেখছি।

ঝর্ণা চুপ।

রায়হান কঠিন গলায় বলল,

—ওর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?

ঝর্ণা ধীরে বলল,

—ও আমার বন্ধু।

রায়হান বলল,

—শুধু বন্ধু?

ঝর্ণা উত্তর দিল না।

রায়হান বুঝে গেল।

—মা-বাবা এসব জানে?

—না।

—তাহলে এখনই জানাবে না।

ঝর্ণা অবাক হয়ে বলল,

—কেন?

—কারণ নীল সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।

ঝর্ণার মনে ভয় ঢুকে গেল।

—কিন্তু সে খারাপ ছেলে নয়।

রায়হান বলল,

—তুমি হয়তো তাকে অন্যভাবে দেখো। কিন্তু পরিবার হিসেবে আমাদেরও কিছু ভাবতে হবে।

সেদিন রাতে ঝর্ণা নীলকে সবকিছু জানাল।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি তোমাকে কোনো সমস্যায় ফেলতে চাই না।

ঝর্ণার চোখে পানি জমে উঠল।

—তাহলে?

—তাহলে আমি তোমার পরিবারের সামনে নিজেকে প্রমাণ করব।

—কীভাবে?

—আমি চাই না তুমি আমার জন্য পরিবারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়াও।

ঝর্ণা নীলের হাত শক্ত করে ধরে বলল,

—আমি শুধু চাই, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।

নীল তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আমি কোথাও যাচ্ছি না।

নীলের সঙ্গে সম্পর্কের কথা পরিবারে জানাজানি হওয়ার পর থেকেই ঝর্ণার জীবনটা যেন হঠাৎ বদলে গেল।

আগের মতো ইচ্ছেমতো বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে—সবকিছুর ওপর নজর রাখতে শুরু করল পরিবার।

ঝর্ণা বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি সহজ হবে না।

কিন্তু তার সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল নীলকে নিয়ে।

কারণ নীলকে হারানোর কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যেত।

সেদিন রাতে নীল ফোন করল।

—কেমন আছ?

ঝর্ণা চুপ করে রইল।

—ঝর্ণা?

—আছি।

—তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?

—বাসায় সবাই জেনে গেছে।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—আমি বুঝেছিলাম একদিন জানবে।

—ভাইয়া খুব রাগ করেছে।

—তোমাকে কিছু বলেছে?

—বলেছে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে না।

নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তুমি কী বলেছ?

ঝর্ণা ধীরে বলল,

—আমি বলেছি, আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর নীল বলল,

—তুমি এখন কোনো ঝামেলায় যেও না।

—কিন্তু তুমি?

—আমি আছি।

—শুধু “আছি” বললেই হবে?

নীল নরম স্বরে বলল,

—আমি তোমার পাশে আছি। এটা ভুলে যেও না।

ঝর্ণার চোখে পানি চলে এল।

—আমি তোমাকে হারাতে ভয় পাই।

—তুমি আমাকে হারাবে না।

—সত্যি?

—সত্যি।

কিন্তু পরদিনই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে গেল।

ঝর্ণার বাবা তাকে ডেকে বললেন,

—তোমার জন্য একটা সম্পর্ক এসেছে।

ঝর্ণা অবাক হয়ে বলল,

—কী সম্পর্ক?

—একটা ভালো পরিবার। ছেলেটা বিদেশে চাকরি করে। পরিবারও ভালো।

ঝর্ণা বুঝতে পারল, তারা তার বিয়ের কথা ভাবছেন।

—আমি বিয়ে করতে চাই না।

বাবা কঠিন গলায় বললেন,

—এখন তোমার মতামত না, আমাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঝর্ণা চোখে পানি নিয়ে বলল,

—আমি কাউকে ভালোবাসি।

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—নীল?

ঝর্ণা মাথা নিচু করল।

—হ্যাঁ।

বাবার মুখ কঠিন হয়ে গেল।

—ওকে তুমি কতদিন ধরে চেন?

—কিছুদিন।

—কিছুদিনের পরিচয়ে তুমি জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছ?

ঝর্ণা চুপ।

—তুমি জানো ওর পরিবার কেমন? ও কী করে? ভবিষ্যতে তোমাকে কী দিতে পারবে?

ঝর্ণার গলা কেঁপে উঠল।

—ও আমাকে সম্মান করে।

বাবা বললেন,

—শুধু সম্মান দিয়ে সংসার চলে না।

ঝর্ণা আর কথা বলতে পারল না।

সেদিন রাতে তার ফোনও নিয়ে নেওয়া হলো।

নীলের সঙ্গে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ।

অন্যদিকে নীল ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝর্ণার ফোনে কল করতে লাগল।

কোনো উত্তর নেই।

প্রথমে সে ভাবল, হয়তো ঝর্ণা রাগ করেছে।

তারপর বুঝল, ব্যাপারটা অন্যরকম।

সে রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল।

কিন্তু রায়হানও ফোন ধরল না।

নীল সারারাত ঘুমাতে পারল না।

পরদিন সকালে সে সরাসরি ঝর্ণাদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কিন্তু ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেল না।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রায়হান বলল,

—তুমি এখানে কেন?

নীল শান্তভাবে বলল,

—ঝর্ণার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

—ওর সঙ্গে আর দেখা করা সম্ভব নয়।

—কেন?

—পরিবারের সিদ্ধান্ত।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—আমি কোনো ঝামেলা করতে আসিনি। শুধু একবার ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই।

রায়হান কঠিন গলায় বলল,

—তোমার সঙ্গে ওর সম্পর্ক আমরা মেনে নিচ্ছি না।

নীল শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল,

—আপনারা আমাকে না জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

—আমাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদের আছে।

নীল মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক কথা। কিন্তু ঝর্ণারও তো নিজের জীবন নিয়ে কিছু বলার অধিকার আছে।

রায়হান কিছু বলল না।

নীল বলল,

—আমি ঝর্ণাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে আসিনি। আমি চাই, আপনারা আমাকে একটা সুযোগ দিন। আমি নিজের যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করতে চাই, আমি ওকে ভালো রাখতে পারব।

রায়হান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—তুমি এখন চলে যাও।

নীল আর কোনো কথা বলল না।

সে ফিরে গেল।

উপরের জানালা থেকে ঝর্ণা সবকিছু দেখছিল।

তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

সে জানত, নীল তাকে ছেড়ে যায়নি।

কিন্তু তার পরিবারও পিছিয়ে যাবে না।

কয়েকদিন পর ঝর্ণার পরিবার বিয়ের দিন ঠিক করার জন্য ছেলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলল।

ঝর্ণা খবরটা শুনে ভেঙে পড়ল।

সেদিন রাতে কোনোভাবে সে মায়ের ফোন নিয়ে নীলকে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠাল—

“আমার বিয়ের কথা ঠিক করছে।”

নীলের উত্তর এল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে—

“ভয় পেও না। আমি আছি।”

ঝর্ণা লিখল—

“কী করবে তুমি?”

নীল কিছুক্ষণ পর লিখল—

“এবার তোমার পরিবারের সামনে দাঁড়াব।”

পরদিন নীল নিজের বাবার সঙ্গে কথা বলল।

তার বাবা শহরের পরিচিত ব্যবসায়ী। নীল এতদিন বাবার ব্যবসা থেকে দূরে থাকলেও এবার সে বলল,

—আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই।

বাবা অবাক হয়ে বললেন,

—হঠাৎ?

নীল শান্তভাবে বলল,

—আমি নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চাই।

বাবা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

—কারণ?

নীল বলল,

—একজন মানুষকে কথা দিয়েছি।

বাবা মৃদু হাসলেন।

—মেয়েটাকে ভালোবাসিস?

নীল মাথা নিচু করে বলল,

—হ্যাঁ।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—তাহলে ভালোবাসা শুধু মুখে রাখিস না। দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতাও অর্জন কর।

সেদিন থেকেই নীল ব্যবসায় মন দিল।

আগের দুষ্টু, অলস নীলটা যেন ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।

সকালে অফিস, বিকেলে কাজ, রাতে হিসাব—তার জীবন এখন ব্যস্ত।

কিন্তু ব্যস্ততার মাঝেও ঝর্ণাকে ভুলত না।

একদিন ঝর্ণার মা গোপনে তার সঙ্গে কথা বললেন।

—তুমি কি সত্যিই নীলকে ভালোবাসো?

ঝর্ণা চোখ নামিয়ে বলল,

—হ্যাঁ।

—ও তোমার জন্য কী করতে পারবে?

ঝর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—জানি না। কিন্তু আমি জানি, ও আমাকে কখনো অসম্মান করবে না।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তোমার বাবাকে বোঝানো সহজ হবে না।

ঝর্ণা বলল,

—আমি অপেক্ষা করব।

অন্যদিকে নীলও হাল ছাড়েনি।

এক মাসের মধ্যে সে বাবার ব্যবসার একটা নতুন শাখার দায়িত্ব নিল এবং ভালো ফল করল।

নীলের বাবা এবার ঝর্ণার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

কিন্তু ঠিক সেই সময় নতুন একটা সমস্যা দেখা দিল।

ঝর্ণার বাবা জানালেন—

যে পরিবারের সঙ্গে ঝর্ণার বিয়ের কথা হচ্ছে, তারা ইতিমধ্যেই বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।

তারিখও ঠিক হয়ে গেছে।

ঝর্ণা খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার হাতে তখন মাত্র কয়েকটা দিন।

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

“নীল, তুমি বলেছিলে তুমি আছ। এবার সত্যিই তোমাকে আমার পাশে দাঁড়াতে হবে।”

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল।

নীলের।

“আগামীকাল তোমাদের বাসায় আসছি। একা নয়।”

ঝর্ণার বুকের ভেতর আশার আলো জ্বলে উঠল।

পরদিন সকাল থেকেই ঝর্ণাদের বাড়িতে ব্যস্ততা।

বিয়ের জন্য আত্মীয়স্বজন আসছে, ঘর সাজানোর আলোচনা চলছে, সবাই নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ বাড়ির এক কোণে বসে ঝর্ণা যেন একেবারে নিশ্চুপ।

তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন—

নীল কি সত্যিই আসবে?

গত রাতে নীল মেসেজ করেছিল, “আগামীকাল তোমাদের বাসায় আসছি। একা নয়।”

কিন্তু এরপর আর কোনো খবর নেই।

ঝর্ণা বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।

ফোনটা তার হাতেই ছিল, কিন্তু নীলকে কল করার সাহস হচ্ছিল না।

হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

ঝর্ণা জানালার কাছে গিয়ে তাকাল।

একটা কালো গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামল।

গাড়ি থেকে প্রথমে নীল নামল।

তারপর নীলের বাবা।

ঝর্ণার বুক ধক করে উঠল।

নীল আজ অন্যরকম লাগছিল। সাধারণত যে ছেলেটা সবসময় হাসি-ঠাট্টা করে, আজ তার মুখে কোনো দুষ্টু হাসি নেই। চোখেমুখে শুধু দৃঢ়তা।

ঝর্ণার বাবা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।

নীলের বাবা এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে বললেন,

—আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এসেছি।

ঝর্ণার বাবা কিছুটা অবাক হলেও তাদের ভেতরে বসতে দিলেন।

ঝর্ণা দূর থেকে সব দেখছিল।

তার পাশে রায়হান দাঁড়িয়ে ছিল।

রায়হান নিচু গলায় বলল,

—তুমি আগে থেকেই জানতেছিলে?

ঝর্ণা মাথা নাড়ল।

—না।

রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তোমার জন্য ছেলেটা সত্যিই অনেক কিছু করছে।

ঝর্ণা তার দিকে তাকাল।

—ভাইয়া...

রায়হান কিছু বলল না।

ড্রয়িংরুমে নীলের বাবা শান্ত গলায় বললেন,

—আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলে নীলের সম্পর্কের কথা আমরা জেনেছি।

ঝর্ণার বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন,

—আমি দুঃখিত। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত প্রায় হয়ে গেছে।

নীল এবার কথা বলল।

—স্যার, আমি জানি আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন না।

ঝর্ণার বাবা বললেন,

—বিশ্বাস করার মতো সময় তুমি আমাকে দাওনি।

নীল মাথা নেড়ে বলল,

—ঠিক বলেছেন।

তারপর সে একটা ফাইল টেবিলের ওপর রাখল।

—আমি গত এক মাস ধরে বাবার ব্যবসার একটা শাখার দায়িত্বে আছি। এই সময়ের হিসাব, কাজের ফলাফল আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখানে আছে।

ঝর্ণার বাবা ফাইলটা খুলে দেখলেন।

নীল বলল,

—আমি ঝর্ণাকে শুধু ভালোবাসি বলেই বিয়ে করতে চাই না। আমি চাই, তার দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্যতাও আমার থাকুক।

ঘরটা নীরব হয়ে গেল।

নীলের বাবা এবার বললেন,

—আমার ছেলে এতদিন নিজের জীবন নিয়ে খুব একটা সিরিয়াস ছিল না। কিন্তু ঝর্ণার সঙ্গে পরিচয়ের পর ও বদলেছে। আমি ওর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছি।

ঝর্ণার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—তুমি কি নিশ্চিত, কয়েক বছর পর এই ভালোবাসা থাকবে?

নীল শান্তভাবে বলল,

—ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। কিন্তু আমি একটা জিনিস জানি—ঝর্ণাকে সম্মান করা আর তার পাশে থাকা আমার দায়িত্ব হবে।

ঝর্ণার বাবা এবার ঝর্ণার দিকে তাকালেন।

—তুমি কী চাও?

প্রশ্নটা শুনে ঝর্ণার চোখে পানি এসে গেল।

সে ধীরে ধীরে সামনে এসে বলল,

—আমি নীলকে চাই।

তার গলা কাঁপছিল।

—আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু আমি জানি, নীলের সঙ্গে থাকলে আমি নিজের মতো থাকতে পারব।

বাবা কিছু বললেন না।

রায়হান এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—বাবা, আমি একটা কথা বলতে পারি?

—বল।

—আমি নীলকে কয়েকবার দেখেছি। ও ঝর্ণাকে নিয়ে কখনো অসম্মানজনক কিছু করেনি। বরং ও সবসময় ওকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছে।

নীল অবাক হয়ে রায়হানের দিকে তাকাল।

রায়হান মুচকি হেসে বলল,

—তবে একটা শর্ত আছে।

নীল বলল,

—কী শর্ত?

—আমার বোনকে আর অকারণে কাঁদাবি না।

নীল হেসে বলল,

—চেষ্টা করব।

ঝর্ণা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—এই “চেষ্টা করব” কথাটা আবার শুরু করেছ!

ঘরের সবাই হেসে ফেলল।

এতদিনের উত্তেজনার পর প্রথমবার পরিবেশটা একটু হালকা হলো।

কিন্তু ঝর্ণার বাবা তখনও চুপ।

তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।

কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,

—আমি মেয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে দিতে চাই না।

ঝর্ণা অবিশ্বাসের চোখে বাবার দিকে তাকাল।

—মানে?

বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—তোমার সিদ্ধান্ত যদি এতটাই দৃঢ় হয়, তাহলে আমি তোমাকে জোর করব না।

ঝর্ণার চোখ বেয়ে পানি নেমে এল।

সে বাবার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

—বাবা...

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তবে একটা কথা মনে রাখবে। সংসার শুধু ভালোবাসা দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু টিকিয়ে রাখতে হয় বিশ্বাস আর দায়িত্ব দিয়ে।

ঝর্ণা মাথা নাড়ল।

নীলও উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—আমি কথা দিচ্ছি, ঝর্ণার প্রতি আমার দায়িত্ব কখনো ভুলব না।

কিন্তু ঠিক তখনই ঝর্ণার বাবা বললেন,

—বিয়ের কথা বলার আগে একটা বিষয় আছে।

সবাই আবার চুপ হয়ে গেল।

—যে পরিবারের সঙ্গে ঝর্ণার বিয়ের কথা হয়েছিল, তাদের কাছে আমি কথা দিয়েছি। বিষয়টা সহজে শেষ হবে না।

নীল বলল,

—আমি কথা বলতে প্রস্তুত।

রায়হান বলল,

—আমিও যাব।

পরদিন নীল, তার বাবা এবং ঝর্ণার বাবা সেই পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

সেখানে অনেক কথা হলো।

প্রথমে তারা ক্ষুব্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত ঝর্ণার বাবার সিদ্ধান্তকে সম্মান করল।

তবে যাওয়ার আগে সেই পরিবারের একজন বলল,

—আপনার মেয়ের জন্য ভালোই হবে আশা করি।

ঝর্ণার বাবা উত্তর দিলেন,

—আমিও সেটাই চাই।

সব বাধা যেন ধীরে ধীরে দূর হতে লাগল।

কিন্তু সেই রাতে ঝর্ণা নীলকে ফোন করে বলল,

—আজ আপনাকে একটা কথা বলব।

—বলুন।

—আপনি যখন প্রথম আমাকে দেখেছিলেন, তখন কি সত্যিই ভালো লেগেছিল?

নীল হেসে বলল,

—তুমি তো প্রথম দিন আমাকে এমনভাবে বকেছিলে যে, ভালো লাগার সময়ই পাইনি।

ঝর্ণা হাসল।

—মিথ্যা।

—ঠিক আছে। সত্যি বলছি।

—বলুন।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তোমাকে প্রথম দেখার পর মনে হয়েছিল, মেয়েটা খুব শান্ত।

ঝর্ণা হেসে বলল,

—তারপর?

—তারপর বুঝলাম, আমি ভুল ভেবেছিলাম।

—নীল!

—কী?

—আপনি আবার শুরু করেছেন।

নীল হেসে বলল,

—কিন্তু একটা কথা সত্যি।

—কী?

—তোমার রাগ, তোমার অভিমান, তোমার হাসি—সবকিছুর সঙ্গেই আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

ঝর্ণা নরম গলায় বলল,

—আর আমি আপনার দুষ্টুমির সঙ্গে।

—তাহলে?

—তাহলে... এখন আর আপনাকে ছাড়া কল্পনা করতে পারি না।

কিছুক্ষণ দুজনই চুপ করে রইল।

নীল বলল,

—ঝর্ণা।

—হুম?

—আমাদের এত ঝগড়া হয়েছে, এত অভিমান হয়েছে। কখনো মনে হয়েছে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?

ঝর্ণা মৃদু হেসে বলল,

—অনেকবার।

—তাহলে যাওনি কেন?

—কারণ রাগ যতই হোক, মনটা আপনাকেই খুঁজেছে।

নীল আর কোনো কথা বলতে পারল না।

কিছুদিন পর দুই পরিবার বসে বিয়ের দিন ঠিক করল।

বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঝর্ণার বাড়িতে আবার আনন্দের পরিবেশ তৈরি হলো।

নীল অবশ্য সুযোগ পেলেই ঝর্ণাকে খেপাতে শুরু করল।

একদিন ফোনে বলল,

—বিয়ের পর কিন্তু তোমার এত রাগ চলবে না।

ঝর্ণা বলল,

—কেন?

—কারণ তখন আমি তোমাকে মানানোর জন্য সবসময় এত সময় পাব না।

ঝর্ণা রাগ করে বলল,

—তাহলে এখন থেকেই চলে যান।

নীল হেসে বলল,

—এই যে আবার রাগ!

—হ্যাঁ, রাগ করছি।

—ঠিক আছে। রাগ করো।

—করব।

—কিন্তু শেষে আমার কাছেই আসবে।

ঝর্ণা কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হেসে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা প্রায় শেষ।

কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল সেই দিন, যেদিন এতদিনের দুষ্টুমি, রাগ, অভিমান আর না-বলা কথাগুলো এক নতুন সম্পর্কে বাঁধা পড়বে।

বিয়ের আগের রাতে ঝর্ণা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার হাতে নীলের দেওয়া সেই বইটা।

বইয়ের প্রথম পাতায় নীল লিখেছিল—

“যেদিন তুমি আমাকে প্রথমবার হাসতে দিয়েছিলে, সেদিন থেকেই আমার গল্পটা বদলে গেছে।”

ঝর্ণা লেখাটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

তারপর আস্তে করে বলল,

—কাল থেকে গল্পটা আরও সুন্দর হবে, নীল।

বিয়ের দিন সকাল থেকেই ঝর্ণাদের বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ।

বাড়ির উঠানে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ আসছে। মেয়েরা ঝর্ণাকে সাজাতে ব্যস্ত। কেউ শাড়ি ঠিক করছে, কেউ চুলে ফুল গুঁজে দিচ্ছে।

কিন্তু ঝর্ণার মন বারবার চলে যাচ্ছিল নীলের কাছে।

আজ তাদের বিয়ে।

আজ থেকে নীল শুধু তার প্রিয় মানুষ নয়, তার জীবনের সঙ্গী হতে চলেছে।

ঝর্ণা আয়নার সামনে বসে মৃদু হাসছিল।

তার এক বান্ধবী বলল,

—কী ভাবছিস?

ঝর্ণা লজ্জা পেয়ে বলল,

—কিছু না।

—মিথ্যা বলিস না। বরকে নিয়ে ভাবছিস, তাই না?

ঝর্ণা মুখ নামিয়ে ফেলল।

—হুম।

অন্যদিকে নীলও বিয়ের পোশাকে প্রস্তুত হচ্ছিল।

রাকিব এসে বলল,

—কী রে, আজ তোকে খুব সিরিয়াস লাগছে।

নীল বলল,

—আজ একটু সিরিয়াস হওয়াই যায়।

—তোর দুষ্টুমি শেষ?

নীল মুচকি হেসে বলল,

—না। বিয়ের পর শুরু হবে আসল দুষ্টুমি।

রাকিব হেসে বলল,

—ঝর্ণা তোকে ছাড়বে না।

—সেটাই তো চাই।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল।

কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানের কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ ঝর্ণার বাবা নীলকে আলাদা করে ডাকলেন।

তার মুখটা চিন্তিত।

নীল জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

ঝর্ণার বাবা বললেন,

—একটা সমস্যা হয়েছে।

—কী সমস্যা?

—যে পরিবারের সঙ্গে আগে ঝর্ণার বিয়ের কথা হয়েছিল, তাদের একজন আজ এখানে এসে ঝামেলা করতে চাইছে।

নীলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—কে?

—ছেলেটার বড় ভাই। সে বলছে, বিয়ের আগে দেওয়া কিছু কথা ওরা ভুলে যায়নি।

নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—আমি কথা বলব।

ঝর্ণার বাবা বললেন,

—সাবধানে। আমি কোনো ঝামেলা চাই না।

নীল মাথা নেড়ে বলল,

—আমিও চাই না।

কিছুক্ষণ পর লোকটি এসে নীলের সামনে দাঁড়াল।

—তুমি জানো, আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঝর্ণার বিয়ের কথা প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল?

নীল শান্তভাবে বলল,

—জানি।

—তাহলে তুমি কীভাবে আজ বিয়ে করতে পারো?

—কারণ ঝর্ণা আমাকে বেছে নিয়েছে। আর তার পরিবারও এখন আমাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে।

লোকটি রাগ করে বলল,

—এভাবে কথা দিয়ে সরে যাওয়া ঠিক হয়নি।

নীল শান্ত গলায় বলল,

—আপনার রাগটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা মেয়ের জীবন নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, যেখানে তার নিজের মতামত নেই।

লোকটি কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখন ঝর্ণার বাবা এগিয়ে এলেন।

—এই বিয়েতে আমার মেয়ের সম্মতি আছে। আমিও এখন এই বিয়েতে রাজি।

লোকটি আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ উত্তেজনার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেল।

নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

রাকিব পাশে এসে বলল,

—বিয়ে হওয়ার আগেই এত ঝামেলা!

নীল হেসে বলল,

—ঝর্ণাকে পাওয়া এত সহজ হলে গল্পটা মজার হতো না।

ওদিকে ঝর্ণা কিছুই জানত না।

সে শুধু অপেক্ষা করছিল কখন নীলকে দেখবে।

অবশেষে বিয়ের সময় হলো।

ঝর্ণাকে যখন সাজিয়ে আনা হলো, নীল এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল।

ঝর্ণার মুখে লাজুক হাসি।

চোখে আনন্দ আর অল্প ভয়।

নীল তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

“এই মেয়েটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা।”

ঝর্ণাও নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

নীল ঠোঁট নেড়ে বলল,

—আজ কিন্তু অনেক সুন্দর লাগছে।

ঝর্ণা আস্তে বলল,

—আজও দুষ্টুমি করছেন?

—আমি তো সত্যি বলছি।

ঝর্ণা চোখ নামিয়ে ফেলল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।

দুই পরিবারের সবাই আনন্দে মেতে উঠল।

ঝর্ণার চোখে পানি চলে এল যখন সে বাবা-মাকে বিদায় জানাতে এগিয়ে গেল।

বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

—ভালো থাকিস মা।

ঝর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—বাবা, তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ?

বাবা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুই নিজের জীবন বেছে নিয়েছিস। এখন শুধু ভালো থাকিস।

নীল একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

ঝর্ণার চোখের পানি দেখে তারও মন ভার হয়ে গেল।

সে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

—চলবে?

ঝর্ণা চোখ মুছে বলল,

—হুম।

গাড়িতে ওঠার পর বেশ কিছুক্ষণ দুজনই চুপ করে রইল।

তারপর নীল বলল,

—আজ এত চুপ কেন?

ঝর্ণা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে।

—আমারও।

—আপনি খুশি?

নীল তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—খুব।

ঝর্ণা মৃদু হেসে বলল,

—আমিও।

কিছুক্ষণ পর নীল বলল,

—একটা কথা মনে আছে?

—কী?

—প্রথম দিন তুমি আমাকে বলেছিলে, “কাল থেকে আমাকে ডাকবেন না।”

ঝর্ণা হেসে ফেলল।

—আপনি তো কথা শোনেননি।

—শুনলে আজকের দিনটা পেতাম?

ঝর্ণা মাথা নাড়ল।

—না।

—তাহলে তোমাকে বিরক্ত করার সিদ্ধান্তটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ছিল।

ঝর্ণা বলল,

—আপনি আমাকে অনেক রাগিয়েছেন।

—জানি।

—অনেক কাঁদিয়েছেনও।

নীলের মুখটা একটু গম্ভীর হলো।

—ইচ্ছে করে কখনো না।

—জানি।

—আর তুমি?

—আমি কী?

—তুমি আমাকে কম কাঁদিয়েছ?

ঝর্ণা হেসে বলল,

—আপনাকে একটু শাস্তি না দিলে আপনি মানুষ হতেন না।

নীল হেসে উঠল।

—তাহলে বিয়ের পরও শাস্তি চলবে?

—অবশ্যই।

—ঠিক আছে। তবে আমারও একটা নিয়ম আছে।

—কী?

—তুমি যতবার রাগ করবে, আমি ততবার তোমাকে হাসাব।

ঝর্ণা মৃদু হেসে বলল,

—চেষ্টা করে দেখুন।

বাড়িতে পৌঁছে নতুন জীবনের শুরু হলো।

সন্ধ্যায় সবাই চলে যাওয়ার পর ঘরটা একটু শান্ত হলো।

ঝর্ণা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

নীল কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকে দেখল।

তারপর বলল,

—ঝর্ণা।

—হুম?

—একটা কথা বলব?

—আবার কী?

—তুমি কি সুখী?

ঝর্ণা ঘুরে তার দিকে তাকাল।

—হ্যাঁ।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

—আমার সঙ্গে?

ঝর্ণা হেসে বলল,

—আপনার সঙ্গে।

নীল মৃদু হাসল।

—তাহলে আমার আর কিছু চাই না।

ঝর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—নীল।

—হুম?

—আমাদের প্রথম দেখা মনে আছে?

—প্রতিদিন মনে পড়ে।

—তখন ভাবিনি, সেই বিরক্তিকর ছেলেটাই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে যাবে।

নীল হেসে বলল,

—আর আমি ভাবিনি, যে মেয়েটা আমাকে প্রথম দিন থেকেই বকবে, সে একদিন আমাকে এতটা ভালোবাসবে।

ঝর্ণা বলল,

—আমি কিন্তু এখনো রাগী।

—জানি।

—আর আপনার দুষ্টুমি এখনো সহ্য করতে পারি না।

—সেটাও জানি।

—তাহলে?

নীল মৃদু হেসে বলল,

—তবু তোমাকেই চাই।

ঝর্ণার চোখে আবার পানি এসে গেল।

সে মৃদু স্বরে বলল,

—আমিও আপনাকেই চাই।

বাইরে তখন রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে।

একসময় যে দুজন একে অপরকে শুধু খেপাত, তারা আজ একই জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

তাদের গল্পে ছিল দুষ্টুমি।

ছিল রাগ।

ছিল অভিমান।

ছিল ভুল বোঝাবুঝি।

ছিল দূরত্বের ভয়।

কিন্তু সবকিছুর ওপরে ছিল একে অপরকে হারিয়ে না ফেলার ইচ্ছা।

নীল আর ঝর্ণা জানত, বিয়ের পর জীবন সবসময় সহজ হবে না।

হয়তো আবার ঝগড়া হবে।

হয়তো ছোটখাটো অভিমান হবে।

কখনো একজন অন্যজনকে বুঝতে ভুল করবে।

কিন্তু তারা এটাও জানত—

যতবার দূরত্ব আসবে, ততবার তারা একে অপরের কাছে ফিরে আসবে।

কারণ তাদের সম্পর্কের শুরু হয়েছিল একটুখানি দুষ্টুমি দিয়ে, বড় হয়েছিল রাগ-অভিমানে, আর শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পেয়েছিল বিশ্বাসে।

ঝর্ণা জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—নীল?

—হুম?

—কাল কিন্তু আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেন।

নীল অবাক হয়ে বলল,

—বিয়ের পরের দিনই?

—হ্যাঁ।

—কোথায়?

ঝর্ণা হাসল।

—যেখানে প্রথমবার আপনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই নদীর ধারে।

নীল হেসে বলল,

—ঠিক আছে। তবে একটা শর্ত।

—আবার শর্ত?

—আজকের মতো আর রাগ করা যাবে না।

ঝর্ণা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—আমি রাগ করবই।

নীল হেসে বলল,

—তাহলে আমিও প্রস্তুত।

....
👁 70