শহরের এক প্রান্তে পুরোনো একটা মহল্লা। দিনের বেলায় জায়গাটা বেশ ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠলে চারপাশে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসত। সেই মহল্লাতেই থাকত রবিন।
রবিনকে সবাই চিনত। তবে ভালো ছেলে হিসেবে নয়।
ছোটবেলা থেকেই সে ছিল ভীষণ রাগী। সামান্য কথাতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলত। কারও সঙ্গে তর্ক হলে চুপ করে সরে যাওয়ার মানুষ সে ছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বাইকে ঘুরে বেড়ানো, অকারণে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া—এসবই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন।
রবিনের বাবা বহু বছর ধরে ব্যবসা করতেন। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি অনেকবার চিন্তা করেছেন। কিন্তু রবিন কারও কথা শুনত না।
এক সন্ধ্যায় রবিন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। হঠাৎ পাশের দোকানের এক ছেলের সঙ্গে সামান্য বিষয় নিয়ে তার তর্ক শুরু হলো।
—তুই আমার বাইকের সামনে দাঁড়িয়েছিলি কেন?
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
—আমি তো রাস্তার পাশেই ছিলাম। বাইকটা তুমিই আমার দিকে নিয়ে এসেছিলে।
রবিনের চোখ লাল হয়ে উঠল।
—আমার সঙ্গে তর্ক করিস না।
বন্ধুরা দ্রুত তাকে থামানোর চেষ্টা করল।
—রবিন, বাদ দে। চল এখান থেকে।
রবিন কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে বাইকে উঠে চলে গেল।
কিন্তু সেদিনই তার জীবনে এমন একজন মানুষের আগমন ঘটতে যাচ্ছিল, যে ধীরে ধীরে তার পুরো জীবন বদলে দেবে।
পরদিন বিকেলে রবিন তার বন্ধুর সঙ্গে শহরের পুরোনো লাইব্রেরির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখ আটকে গেল।
মেয়েটির নাম নীলা।
নীলা খুব সাধারণভাবে সালোয়ার-কামিজ পরেছিল। হাতে কয়েকটা বই। চেহারায় কোনো বাড়তি সাজসজ্জা নেই। কিন্তু তার শান্ত মুখ আর চোখের গভীরতা আশপাশের কোলাহলের মধ্যেও আলাদা করে নজর কাড়ছিল।
রবিন বাইকটা একটু ধীরে চালাল।
তার বন্ধু হাসতে হাসতে বলল,
—কী হলো? হঠাৎ বাইকের গতি কমে গেল কেন?
রবিন উত্তর দিল না।
নীলা রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই একটা দ্রুতগতির গাড়ি তার পাশ দিয়ে চলে গেল। নীলা একটু পিছিয়ে গেল। হাতে থাকা একটা বই মাটিতে পড়ে গেল।
রবিন বাইক থামিয়ে নেমে বইটা তুলে নিল।
—এই যে।
নীলা তাকাল।
—ধন্যবাদ।
রবিন বইটা এগিয়ে দিল।
—রাস্তা পার হওয়ার সময় একটু সাবধানে থাকবেন।
নীলা শান্ত গলায় বলল,
—আমি সাবধানেই ছিলাম।
রবিন একটু থমকে গেল।
মেয়েটা তার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন তার রাগী স্বভাবের কোনো গুরুত্বই নেই।
রবিন বলল,
—আমি শুধু বললাম সাবধানে থাকতে।
—আর আমি শুধু বললাম, আমি সাবধানেই ছিলাম।
কথাটা বলে নীলা চলে গেল।
রবিন কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
বন্ধু পাশ থেকে হেসে বলল,
—ভাই, মনে হচ্ছে আজকে তোর সঙ্গে কেউ প্রথমবার তর্ক করে জিতে গেল।
রবিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—চুপ কর।
কিন্তু তার নিজের মনেও তখন একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ঘুরছিল।
মেয়েটা কে?
সেদিন রাতে ঘুমানোর সময়ও নীলার শান্ত মুখটা বারবার তার মনে পড়ছিল। রবিন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, ব্যাপারটা সামান্য। রাস্তায় দেখা একজন অপরিচিত মানুষকে নিয়ে এত ভাবার কী আছে?
কিন্তু পরদিন বিকেলে সে আবার সেই লাইব্রেরির সামনে চলে গেল।
নিজেকেই বলল,
“এমনিই এসেছি।”
অথচ সে জানত, সে কেন এসেছে।
কিছুক্ষণ পর নীলা লাইব্রেরি থেকে বের হলো। রবিন দূর থেকে তাকে দেখল। নীলার হাতে আবার বই।
নীলা রবিনকে দেখে চিনতে পারল।
—আপনি এখানে?
রবিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—হ্যাঁ। এইদিকে কাজ ছিল।
নীলা মাথা নেড়ে বলল,
—ও।
তারপর চলে যেতে শুরু করল।
রবিন হঠাৎ বলল,
—আপনার নামটা জানতে পারি?
নীলা থেমে ফিরে তাকাল।
—নাম জেনে কী করবেন?
রবিনের মুখে কোনো উত্তর এল না।
নীলা মৃদু হেসে বলল,
—আমার নাম নীলা।
—আমি রবিন।
—জানি।
রবিন অবাক হলো।
—কীভাবে?
—আপনার বন্ধুরা আপনাকে নাম ধরে ডাকছিল।
এই বলে নীলা চলে গেল।
রবিন দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, অনেক দিন পর কেউ তাকে এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলল। কেউ তার ভয়ংকর স্বভাব দেখে ভয় পেল না, আবার অযথা প্রশংসাও করল না।
এরপর থেকে নীলাকে দেখার অদ্ভুত একটা অভ্যাস তৈরি হলো রবিনের।
কখনো লাইব্রেরির সামনে, কখনো রাস্তার মোড়ে, কখনো কাছের বইয়ের দোকানে—নীলার সঙ্গে তার দেখা হতে লাগল।
প্রথমে তাদের কথাবার্তা ছিল খুব সামান্য।
—কেমন আছেন?
—ভালো।
—আজ কী বই নিয়েছেন?
—উপন্যাস।
—পড়তে ভালো লাগে?
—খুব।
ধীরে ধীরে কথাগুলো বাড়তে লাগল।
রবিন অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, নীলার সঙ্গে কথা বলার সময় তার রাগ কমে যায়। যে ছেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে পারে, সেই ছেলে নীলার সামনে অকারণে নিজের গলার স্বরও উঁচু করতে পারত না।
একদিন নীলা তাকে বলল,
—আপনি সবসময় এত রাগ করেন কেন?
রবিন হেসে বলল,
—আমি এমনই।
—মানুষ এমন হয়ে জন্মায় না। সময়ের সঙ্গে হয়।
রবিন চুপ করে গেল।
নীলা আবার বলল,
—আপনি চাইলে বদলাতে পারেন।
—আপনি মনে করেন আমি খারাপ?
—আমি আপনাকে ভালো করে চিনি না। তাই খারাপ বলব না।
—তাহলে?
—আপনার মধ্যে ভালো কিছু আছে বলেই মনে হয়।
রবিন প্রথমবার কোনো উত্তর দিতে পারল না।
সেদিন রাতে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে ছিল।
নীলার কথাটা তার মাথায় ঘুরছিল।
“আপনি চাইলে বদলাতে পারেন।”
কেন যেন মনে হচ্ছিল, জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে বদলানোর জন্য জোর করছে না। বরং তার ওপর বিশ্বাস করছে।
কয়েকদিন পর রবিনের এক বন্ধু আবার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল। আগের মতো হলে রবিনও সেখানে গিয়ে মারামারি করত। কিন্তু সেদিন সে নিজেকে থামিয়ে দিল।
বন্ধু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তুই যাবি না?
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—না।
—কেন?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সব ঝামেলায় জড়ানো দরকার নেই।
বন্ধু হেসে বলল,
—তুই বদলে যাচ্ছিস নাকি?
রবিনও হেসে ফেলল।
কিন্তু সে জানত, পরিবর্তনের শুরুটা কোথা থেকে।
নীলা।
তবে রবিন তখনও জানত না, নীলার জীবন তার নিজের মতো সহজ নয়।
নীলার পরিবার ছিল কঠোর। তার বাবা মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব সচেতন ছিলেন। নীলা পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। পরিবারের কাছে প্রেম বা সম্পর্কের কোনো জায়গা ছিল না।
আর রবিন?
তার অতীতের কারণে শহরের অনেক মানুষই তাকে ভালো চোখে দেখত না।
একজন রাগী, বেপরোয়া ছেলের সঙ্গে নীলার বন্ধুত্বও যে একদিন বড় সমস্যার কারণ হবে, সেটা কেউ তখনও জানত না।
সন্ধ্যায় নীলা যখন বাড়ির পথে হাঁটছিল, তখন রবিন দূর থেকে তাকে দেখছিল।
নীলা হঠাৎ ফিরে তাকাল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
নীলা মৃদু হাসল।
রবিনও হাসল।
নীলার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে রবিনের জীবনটা যেন ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছিল।
আগে সন্ধ্যা নামলেই সে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত। কখনো বাইক নিয়ে অকারণে শহরের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত, কখনো সামান্য বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ত। কিন্তু এখন তার দিনগুলোতে একটা নতুন অপেক্ষা যোগ হয়েছে।
নীলাকে একবার দেখা।
কখনো লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো বইয়ের দোকানের পাশে, কখনো দূর থেকে নীলাকে বাড়ির পথে যেতে দেখে—রবিনের দিনটা যেন পূর্ণ হয়ে যেত।
তবে নীলা বুঝতে পারছিল, রবিন তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এক বিকেলে তারা লাইব্রেরির সামনের বেঞ্চে বসে কথা বলছিল।
নীলার হাতে একটা বই।
রবিন বলল,
—তুমি সবসময় বই নিয়ে থাকো কেন?
নীলা হেসে বলল,
—বইয়ের সঙ্গে থাকলে মানুষের অনেক কিছু শেখা যায়।
—মানুষের কাছ থেকে শেখা যায় না?
—যায়। তবে সব মানুষ ভালো শিক্ষক হয় না।
রবিন মুচকি হেসে বলল,
—আমি কি ভালো শিক্ষক?
নীলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি এখনো ছাত্র।
—কিসের ছাত্র?
—নিজেকে বদলানোর।
রবিন একটু চুপ করে থেকে বলল,
—তোমার কথা শুনে মনে হয়, আমি খুব খারাপ মানুষ।
নীলা মাথা নেড়ে বলল,
—আমি সেটা বলিনি। তোমার মধ্যে রাগ আছে, সেটা বলেছি। রাগ থাকা আর খারাপ মানুষ হওয়া এক জিনিস নয়।
রবিন মাটির দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল,
—তুমি জানো, আমি আগে খুব সহজে রেগে যেতাম?
—এখনও যাও।
—আগের মতো না।
নীলা হাসল।
—সেটা আমি লক্ষ্য করেছি।
রবিন অবাক হয়ে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—কীভাবে?
—আগে তুমি কারও সঙ্গে কথা বলার সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলতে। এখন কেউ কিছু বললে আগে ভাবো, তারপর উত্তর দাও।
রবিনের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।
সে বুঝতে পারল, নীলা তাকে শুধু দেখছে না, লক্ষ্যও করছে।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় রবিনের মনে অদ্ভুত আনন্দ ছিল।
কিন্তু বাড়িতে ঢুকতেই সেই আনন্দটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।
তার বাবা বসার ঘরে বসে ছিলেন।
—কোথায় ছিলে?
রবিন জুতা খুলতে খুলতে বলল,
—বাইরে।
—বাইরে মানে?
—বন্ধুদের সঙ্গে ছিলাম।
বাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
—তোমার মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখছি।
রবিন থেমে গেল।
—কী পরিবর্তন?
—আগের মতো ঝামেলায় জড়াচ্ছ না। রাতে বাইরে থাকছ না। সময়মতো বাড়ি ফিরছ।
রবিন হেসে বলল,
—ভালোই তো।
—ভালো। কিন্তু আমি জানতে চাই, কারণটা কী?
রবিন কোনো উত্তর দিল না।
সে নীলার কথা বাবাকে বলতে পারল না।
নিজের ঘরে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে।
রবিনের মনে হচ্ছিল, সে হয়তো সত্যিই বদলাতে পারবে।
শুধু নীলার জন্য।
পরদিন সকালে নীলার ফোন এল।
—আজ বিকেলে সময় আছে?
রবিন অবাক হয়ে বলল,
—আমাকে তুমি ফোন করেছ?
—হ্যাঁ। এতে এত অবাক হওয়ার কী আছে?
—না, মানে...
—বিকেলে একটা বইমেলা হচ্ছে। আমি যেতে চাচ্ছিলাম। তুমি গেলে ভালো লাগত।
রবিনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—আমি যাব।
—ঠিক আছে। বিকেল পাঁচটায় লাইব্রেরির সামনে আসবে।
—আমি তার আগেই চলে আসব।
—এত তাড়াতাড়ি কেন?
—তোমাকে অপেক্ষা করাতে চাই না।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—ঠিক আছে। তাহলে বিকেলে দেখা হবে।
ফোন কেটে যাওয়ার পর রবিন বেশ কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।
বিকেল পাঁচটার অনেক আগেই সে লাইব্রেরির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
নীলা যখন এল, রবিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
নীলা বলল,
—কী দেখছ?
—কিছু না।
—তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?
রবিন একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—আজ তোমাকে সুন্দর লাগছে।
নীলা সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলল।
—চলো।
বইমেলায় ঢোকার পর নীলা একের পর এক বই দেখতে লাগল। রবিন তার পেছনে পেছনে হাঁটছিল।
একসময় নীলা একটা বই হাতে নিয়ে বলল,
—এটা আমার অনেকদিনের পছন্দের বই।
রবিন বইটা নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করল।
নীলা বলল,
—আমি নিজেই কিনব।
—আমি কিনে দিচ্ছি।
—না।
—কেন?
—কারণ আমি চাই না তুমি আমার জন্য টাকা খরচ করো।
রবিন হেসে বলল,
—একটা বই কিনে দিলে আমি গরিব হয়ে যাব না।
নীলা মৃদু হেসে বলল,
—তবুও না।
শেষ পর্যন্ত নীলাই বইটি কিনল।
মেলার বাইরে এসে দুজন একটা নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়াল।
চারপাশে মানুষের ভিড়। দূরে মাইকে গান বাজছিল।
রবিন হঠাৎ বলল,
—নীলা।
—হুম?
—তোমাকে একটা কথা বলব?
—বলো।
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুমি আমার জীবনে আসার পর আমি অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি।
নীলা তার দিকে তাকাল।
—কী বুঝেছ?
—সবসময় রাগ দেখিয়ে শক্ত হওয়া যায় না।
নীলা চুপ করে শুনছিল।
রবিন আবার বলল,
—আর একটা জিনিস বুঝেছি।
—কী?
—কাউকে ভালো লাগলে তার সামনে নিজের সেরা মানুষটা হতে ইচ্ছে করে।
নীলার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় দেখা দিল।
সে বুঝতে পারল, রবিন কী বলতে চাইছে।
—রবিন...
—ভয় পেয়ো না। আমি তোমার ওপর কোনো চাপ দিতে চাই না।
—আমি ভয় পাইনি।
—তাহলে?
নীলা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমার পরিবার এসব পছন্দ করবে না।
রবিন শান্ত গলায় বলল,
—আমি এখনই তোমার কাছে কোনো উত্তর চাইছি না।
—তুমি জানো না, আমার বাবা কতটা কঠোর।
—জানতে হবে না। শুধু এটুকু জানি, আমি তোমাকে সম্মান করি।
নীলা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে একটা কোমলতা ফুটে উঠেছে।
—তুমি সত্যিই বদলাচ্ছ, রবিন।
—তুমি বলেছিলে, আমি পারব।
—তাহলে বদলে যাও।
রবিন হেসে বলল,
—চেষ্টা করছি।
সেদিন ফেরার পথে নীলা প্রথমবার নিজের ইচ্ছায় রবিনের পাশে হাঁটছিল।
তাদের মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।
কোনো সম্পর্কের নামও ছিল না।
তবুও দুজনেই বুঝতে পারছিল, তাদের বন্ধুত্বের ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।
কিন্তু সেই অনুভূতির কথা নীলার বাড়িতে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না।
সেদিন রাতে নীলা বাড়ি ফিরতেই তার বাবা বসার ঘর থেকে ডাকলেন।
—নীলা, এখানে এসো।
নীলা গিয়ে দাঁড়াল।
বাবা কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন,
—আজ তোমাকে একজন ছেলের সঙ্গে দেখেছি।
নীলার বুক ধক করে উঠল।
—কে?
—তুমি জানো আমি কাকে বলছি।
নীলা চুপ করে রইল।
—ছেলেটার নাম রবিন, তাই না?
নীলা এবার মাথা নিচু করল।
তার বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,
—ওর সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জানি। ওর সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।
—বাবা, সে খারাপ মানুষ নয়।
—তুমি তাকে কতদিন ধরে চেনো?
—কিছুদিন।
—আর সেই কয়েকদিনেই তুমি ওর চরিত্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দিলে?
নীলা চুপ করে গেল।
বাবা বললেন,
—আজ থেকে ওই ছেলের সঙ্গে তোমার দেখা করা বন্ধ।
নীলার চোখে পানি চলে এল।
—কিন্তু বাবা...
—কোনো কিন্তু নয়।
নীলা নিজের ঘরে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তার মনে শুধু রবিনের কথাই ঘুরছিল—
“আমি তোমার ওপর কোনো চাপ দিতে চাই না।”
সেদিন রাতে নীলা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।
বাবার কথাগুলো বারবার তার কানে বাজছিল।
“আজ থেকে ওই ছেলের সঙ্গে তোমার দেখা করা বন্ধ।”
নীলা জানত, তার বাবা রাগের মাথায় কথা বললেও পরে অনেক সময় সিদ্ধান্ত বদলাতেন না। ছোটবেলা থেকেই বাবার কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হয়েছে সে। পড়াশোনা, বন্ধুত্ব, বাইরে যাওয়া—সবকিছুরই নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল।
কিন্তু রবিনের ব্যাপারটা অন্যরকম।
রবিনের সঙ্গে পরিচয়ের পর সে প্রথমবার অনুভব করেছিল, একজন মানুষকে বুঝতে হলে শুধু তার অতীত দেখলেই হয় না। তার পরিবর্তনের চেষ্টাটাও দেখতে হয়।
রবিন আগে রাগী ছিল, ঝামেলায় জড়াত। কিন্তু নীলার সঙ্গে পরিচয়ের পর সে নিজেকে সামলাতে শুরু করেছে।
নীলা জানত, এই পরিবর্তনটা সত্যি।
পরদিন সকালে নীলা ফোন হাতে নিয়ে রবিনের নম্বরের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকবার কল করার কথা ভেবেও করল না।
তারপর একটা ছোট্ট মেসেজ লিখল—
“আজ দেখা করতে পারব না। বাড়িতে সমস্যা হয়েছে।”
মেসেজ পাঠিয়ে সে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
“ঠিক আছে। তুমি চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নীলা মেসেজটা পড়ে চুপ করে রইল।
রবিন কোনো প্রশ্ন করেনি।
কেন দেখা করতে পারবে না, কী হয়েছে—কিছুই জানতে চায়নি।
শুধু বলেছে, চিন্তা না করতে।
এই ছোট্ট কথাটাই নীলার চোখে পানি এনে দিল।
অন্যদিকে রবিনও বুঝতে পারছিল, কিছু একটা হয়েছে।
সে নীলাকে ফোন করতে চাইল। কিন্তু নিজের দেওয়া কথা মনে পড়ল—সে নীলার ওপর কোনো চাপ দেবে না।
সেদিন বিকেলে রবিন লাইব্রেরির সামনে গেল না।
তার বন্ধুরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—আজ তোর কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না?
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—না।
—কী হয়েছে?
—কিছু না।
কিন্তু কিছু একটা হয়েছিল।
রবিন প্রথমবার বুঝতে পারছিল, কাউকে পছন্দ করা আর কাউকে ভালো রাখা এক জিনিস নয়।
কাউকে ভালো রাখতে হলে তার পরিস্থিতিটাও বুঝতে হয়।
পরের কয়েকদিন নীলার সঙ্গে তার দেখা হলো না।
শুধু মাঝে মাঝে ফোনে কথা হতো।
এক রাতে নীলা বলল,
—রবিন, তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?
—না।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—আমি তোমাকে কিছু বলতে পারছি না বলে?
—তুমি যদি বলতে না চাও, তাহলে তোমাকে বলতে হবে না।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—আমার বাবা তোমাকে পছন্দ করেন না।
রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—আমি জানতাম এমন কিছু হবে।
—তিনি তোমার পুরোনো সবকিছু জানেন।
—জানাটাই স্বাভাবিক।
—তুমি কি তার সঙ্গে কখনো কথা বলবে?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—যদি কখনো সুযোগ আসে, অবশ্যই।
—কিন্তু তিনি হয়তো তোমাকে অপমান করবেন।
—তবুও কথা বলব।
—কেন?
রবিন শান্ত গলায় বলল,
—কারণ তোমার জীবনে আসতে হলে শুধু তোমাকে নয়, তোমার পরিবারকেও সম্মান করতে হবে।
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।
সে বুঝতে পারছিল, রবিন শুধু তাকে পাওয়ার জন্য ছুটছে না। সে নিজেকে প্রমাণ করতেও চাইছে।
দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল।
রবিন তার বাবার ব্যবসার কাজে নিয়মিত যেতে শুরু করল। আগে যেটা তার কাছে বিরক্তিকর মনে হতো, এখন সেটাই গুরুত্ব দিয়ে করতে লাগল।
বাবা একদিন অবাক হয়ে বললেন,
—তোমার কী হয়েছে?
রবিন হাসল।
—কিছু হয়নি।
—তুমি হঠাৎ এত দায়িত্বশীল হলে কীভাবে?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—মানুষের কখনো কখনো বদলানোর কারণ লাগে।
বাবা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
একদিন দুপুরে রবিন জানতে পারল, তার এক পুরোনো বন্ধু একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছে। আগে হলে সে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে যেত।
কিন্তু এবার সে প্রথমে পরিস্থিতি বুঝল।
তারপর কয়েকজন বড় মানুষের সাহায্যে সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলল।
বন্ধুটি অবাক হয়ে বলল,
—তুই আগের রবিন থাকলে এতক্ষণে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলতি।
রবিন হেসে বলল,
—আগের রবিনটা অনেক ভুল করত।
—কে তোকে এত বদলে দিল?
রবিন কিছু বলল না।
শুধু মনে মনে একটা নাম উচ্চারণ করল।
নীলা।
কয়েকদিন পর নীলা আবার বাবার কাছে রবিনের কথা তুলল।
—বাবা, রবিন সত্যিই বদলেছে।
তার বাবা কঠিন গলায় বললেন,
—মানুষ কয়েকদিন ভালো থাকলেই বদলে যায় না।
—কিন্তু সে চেষ্টা করছে।
—চেষ্টা করছে কেন?
নীলা চুপ করে গেল।
বাবা বললেন,
—তুমি ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ।
নীলার চোখ নিচু হয়ে গেল।
—আমি জানি না।
—তুমি জানো।
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
কিছুক্ষণ পর বাবা বললেন,
—তোমার জন্য আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নীলা তাকাল।
—কী সিদ্ধান্ত?
—তোমার মামাতো ভাইয়ের পরিচিত একজন ছেলের পরিবার তোমাকে দেখতে চায়। ছেলেটা ভালো চাকরি করে, পরিবারও ভালো।
নীলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
—এখন তোমার মতামত নেওয়ার কথা বলিনি। শুধু বললাম, পরিবার থেকে একটা প্রস্তাব এসেছে।
—আমি রাজি নই।
—তুমি রবিনের জন্য রাজি নও?
নীলা কোনো উত্তর দিল না।
তার বাবা বুঝে গেলেন।
—তাহলে ব্যাপারটা আরও গুরুতর।
নীলা চোখের পানি সামলাতে সামলাতে বলল,
—আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না।
—তাহলে এমন সম্পর্কেও জড়িও না, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
নীলা নিজের ঘরে চলে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে রবিনকে ফোন করল।
কণ্ঠে অস্বাভাবিক কাঁপুনি ছিল।
—রবিন...
—হ্যাঁ?
—আমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ হলো না।
রবিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নীলার কথাটা শুনে তার বুক ভার হয়ে গেল।
—তুমি কী বলেছ?
—আমি রাজি নই।
রবিন চোখ বন্ধ করল।
—তাহলে এত চিন্তা করছ কেন?
—কারণ বাবা তোমাকে কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।
রবিন ধীরে বলল,
—আমি তোমাকে একটা কথা বলব।
—বলো।
—তুমি তোমার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।
নীলা অবাক হয়ে গেল।
—তুমি এটা কীভাবে বলছ?
—কারণ আমি চাই না, আমার জন্য তুমি তোমার বাবাকে হারাও।
—কিন্তু আমি...
রবিন তাকে থামিয়ে বলল,
—আমি তোমাকে ভালো রাখতে চাই। নিজের কাছে রাখতে নয়।
নীলার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে কিছু বলতে পারল না।
রবিন আবার বলল,
—আমি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব।
—তিনি কথা বলবেন না।
—তবুও চেষ্টা করব।
পরদিন রবিন নীলার বাবার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
নীলা অনেকবার তাকে নিষেধ করল।
—রবিন, যেও না। বাবা রেগে গেলে তোমাকে অপমান করতে পারেন।
রবিন শান্তভাবে বলল,
—আমি যদি সত্যিই তোমাকে সম্মান করি, তাহলে তোমার বাবার সামনে দাঁড়ানোর সাহসও আমার থাকতে হবে।
পরদিন বিকেলে রবিন নীলাদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বুকের ভেতর তার নিজের অজান্তেই ভয় কাজ করছিল।
তবুও সে দরজায় কড়া নাড়ল।
দরজা খুললেন নীলার বাবা।
রবিন মাথা নিচু করে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।
নীলার বাবা কোনো উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইলেন।
রবিন বলল,
—আমি আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এসেছি।
—আমার সঙ্গে তোমার কথা বলার কিছু নেই।
—তবুও পাঁচ মিনিট সময় দিলে ভালো হয়।
—তুমি কি মনে করো, পাঁচ মিনিট কথা বললেই আমি আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দেব?
রবিন শান্ত রইল।
—আমি নীলাকে আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে আসিনি।
—তাহলে?
রবিন ধীরে বলল,
—আমি শুধু চাই, আপনি আমাকে আমার অতীত দিয়ে নয়, আমি এখন কী হতে চাই সেটা দিয়ে বিচার করুন।
নীলার বাবা কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন।
—তুমি জানো তোমার বিরুদ্ধে কত অভিযোগ আছে?
—জানি।
—তুমি কি বদলে গেছ?
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—পুরোপুরি না। কিন্তু বদলানোর চেষ্টা করছি।
—কেন?
রবিন একটু থেমে বলল,
—কারণ একজন মানুষকে ভালো লাগার পর বুঝেছি, নিজের জীবনটাকেও সম্মান করা দরকার।
নীলার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—তোমাকে আমি এখনো বিশ্বাস করি না।
রবিন মাথা নিচু করল।
—আমি বুঝতে পারছি।
—তাই নীলার কাছ থেকে দূরে থাকো।
রবিনের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
কিন্তু সে তর্ক করল না।
শুধু বলল,
—আমি আপনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। তবে একটা সুযোগ যদি কখনো দেন, আমি প্রমাণ করতে চাই যে আমি আগের মতো নেই।
এই বলে রবিন চলে গেল।
জানালার আড়াল থেকে নীলা সবকিছু দেখছিল।
তার চোখ ভিজে উঠেছিল।
রবিন নীলাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল।
তার মাথার ভেতর শুধু নীলার বাবার কথাগুলো ঘুরছিল।
“নীলার কাছ থেকে দূরে থাকো।”
কথাটা খুব সহজ ছিল, কিন্তু মেনে নেওয়া অসম্ভব কঠিন।
রবিন চাইলে সেদিনই নীলাকে নিয়ে অনেক কথা বলতে পারত। বলতে পারত, সে নীলাকে ভালোবাসে। বলতে পারত, নীলাও তাকে পছন্দ করে। কিন্তু সে কিছুই করেনি।
কারণ সে জানত, ভালোবাসা মানে শুধু নিজের ইচ্ছা পূরণ করা নয়।
নীলার বাবাকে সে অসম্মান করতে চায়নি।
বাড়িতে ফিরে রবিন নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর তার বাবা ঘরে ঢুকে বললেন,
—কী হয়েছে?
রবিন চুপ করে রইল।
—তোমাকে আজ খুব চিন্তিত লাগছে।
রবিন ধীরে বলল,
—বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—কর।
—কোনো মানুষকে ভালোবাসলে তাকে পাওয়ার জন্য কতটা লড়াই করা উচিত?
তার বাবা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
—কাকে ভালোবাসো?
রবিন অবাক হয়ে তাকাল।
বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—বাবা-মায়ের চোখ এড়ানো সহজ নয়।
রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—নীলা।
—সে কি তোমাকে ভালোবাসে?
—আমি জানি না। তবে আমাকে বিশ্বাস করে।
—তার পরিবার?
—তার বাবা আমাকে পছন্দ করেন না।
—কারণ?
রবিন নিজের অতীতের কথা বলল। ছোটখাটো ঝামেলা, রাগ, বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি—সবকিছু।
সব শুনে তার বাবা বললেন,
—তাহলে প্রথমে মেয়েটাকে পাওয়ার চেষ্টা না করে নিজেকে এমন মানুষ বানাও, যাকে তার পরিবারও বিশ্বাস করতে পারে।
রবিন চুপ করে রইল।
বাবা আবার বললেন,
—ভালোবাসার জন্য লড়াই করা আর ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দেওয়া এক জিনিস নয়।
কথাগুলো রবিনের মনে গেঁথে গেল।
পরদিন থেকে সে নিজেকে আরও বেশি কাজে ব্যস্ত করে ফেলল।
বাবার ব্যবসার কাজে নিয়মিত সময় দিতে লাগল। কর্মচারীদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলত। কোনো সমস্যা হলে রাগ না করে সমাধান করার চেষ্টা করত।
তার বন্ধুরাও অবাক হয়ে গিয়েছিল।
একদিন পুরোনো বন্ধু রাকিব বলল,
—তুই তো পুরোপুরি পাল্টে গেছিস।
রবিন হেসে বলল,
—মানুষ পাল্টাতে পারে।
—কিন্তু এতটা?
—কারও জন্য হলে পারে।
রাকিব বুঝতে পারল, রবিন এখনো নীলাকেই ভালোবাসে।
কিন্তু রবিনের সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল নীলার সঙ্গে দূরত্ব রাখা।
প্রথম কয়েকদিন নীলা নিজেই তাকে ফোন করত।
—আজ কোথায়?
—বাড়িতে।
—আমাদের দেখা হবে না?
রবিন একটু চুপ থেকে বলত,
—এখন হয়তো না।
—কেন?
—তোমার বাবা বলেছেন দূরে থাকতে।
—তুমি কি তার কথা মেনে নিচ্ছ?
—হ্যাঁ।
নীলার কণ্ঠ ভারী হয়ে যেত।
—তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
রবিন সঙ্গে সঙ্গে বলত,
—ভালোবাসি বলেই দূরে আছি।
নীলা আর কিছু বলতে পারত না।
এভাবেই কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।
নীলার বাবা লক্ষ্য করলেন, রবিন সত্যিই আর মেয়ের সঙ্গে দেখা করছে না।
তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কয়েকদিন পর ছেলেটা আবার আগের মতো জেদ করবে।
কিন্তু তা হলো না।
বরং রবিন নীলার জীবনে কোনো সমস্যা তৈরি না করে চুপচাপ নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে লাগল।
অন্যদিকে নীলার জন্য বিয়ের প্রস্তাবটা আরও এগোতে শুরু করল।
ছেলেটার নাম ছিল আরমান।
আরমান একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। পরিবারও স্বচ্ছল। নীলার বাবা তাকে পছন্দ করেছিলেন।
এক সন্ধ্যায় বাবা নীলাকে বললেন,
—আরমানের পরিবার আগামী শুক্রবার তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসবে।
নীলার বুক কেঁপে উঠল।
—বাবা, আমি তো বলেছি...
—আমি জানি তুমি কী বলেছ। কিন্তু তুমি আর কতদিন এভাবে থাকবে?
—আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
—কেন?
নীলা চুপ করে রইল।
তার বাবা বললেন,
—রবিনের জন্য?
নীলার চোখে পানি চলে এল।
—আমি জানি না।
—তাহলে তাকে ভুলে যাও।
এই কথাটা নীলার কাছে যেন খুব কঠিন শোনাল।
কারও কথা কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?
সে নিজের ঘরে গিয়ে রবিনের পুরোনো মেসেজগুলো পড়তে লাগল।
“চিন্তা করো না।”
“নিজের যত্ন নিও।”
“তোমার ওপর কোনো চাপ দিতে চাই না।”
“তোমার পরিবারের সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি।”
প্রতিটি কথাই নীলার চোখে পানি এনে দিল।
সে ফোন হাতে নিয়ে রবিনকে কল করল।
অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর রবিন ফোন ধরল।
—হ্যালো?
নীলা কিছু বলতে পারল না।
—নীলা?
—রবিন...
—হুম?
—বাবা আমার বিয়ে ঠিক করতে চাইছেন।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
রবিন চোখ বন্ধ করল।
তারপর শান্তভাবে বলল,
—তুমি কী চাও?
—আমি তোমাকে চাই।
এই কথাটা বলার পর নীলা নিজেই কেঁদে ফেলল।
রবিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে বলল,
—নীলা, তুমি কি নিশ্চিত?
—হ্যাঁ।
—তাহলে তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলো।
—তিনি শুনবেন না।
—তাহলে আমাকে আবার একবার সুযোগ দাও।
—কী করবে?
—আমি আবার তোমার বাবার কাছে যাব।
নীলা বলল,
—তিনি তোমাকে অপমান করতে পারেন।
—করলেও আমি সহ্য করব।
—কেন?
—কারণ আমি চাই না তুমি সারাজীবন ভাবো, আমি তোমার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করিনি।
পরদিন রবিন আবার নীলাদের বাড়িতে গেল।
নীলার বাবা তাকে দেখে অবাক হলেন।
—আবার এসেছ?
—জি।
—আমি তো তোমাকে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি।
—জানি।
—তাহলে?
রবিন শান্তভাবে বলল,
—আমি আপনার সিদ্ধান্ত বদলাতে বলছি না। শুধু একটা সুযোগ চাই।
—কী সুযোগ?
—আপনি আমাকে কিছুদিন সময় দিন। আমি প্রমাণ করতে চাই, আমি আগের রবিন নেই।
নীলার বাবা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন,
—কীভাবে প্রমাণ করবে?
—আপনার মেয়েকে নিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেব না। কোনো ঝামেলা করব না। নিজের দায়িত্ব নেব। আর আপনার অনুমতি ছাড়া নীলার সঙ্গে দেখা করব না।
নীলার বাবা এবার কিছুটা থমকে গেলেন।
—আর যদি আমি তবুও রাজি না হই?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।
—সত্যি?
—জি।
—তুমি নীলাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে না?
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—না।
—কেন?
রবিন ধীরে বলল,
—কারণ আমি নীলাকে ভালোবাসি। তাকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাই না।
নীলার বাবা প্রথমবার ছেলেটার দিকে অন্য চোখে তাকালেন।
তবে মুখে কিছু বললেন না।
—তুমি যাও।
রবিন মাথা নিচু করে চলে গেল।
সেদিন রাতে নীলার বাবা একা বসে অনেকক্ষণ ভাবলেন।
তিনি রবিনের অতীত জানতেন।
কিন্তু এই ছেলেটার মধ্যে একটা বিষয় তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন—
রবিন হয়তো সত্যিই বদলাতে চাইছে।
তবুও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না।
শুক্রবার আরমানের পরিবার এল।
নীলা সবার সামনে বসে ছিল, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও।
আরমান ভদ্রভাবে কথা বলছিল।
—আপনি কী নিয়ে পড়াশোনা করছেন?
—বাংলা সাহিত্য।
—ভালো। বই পড়তে আমারও ভালো লাগে।
নীলা শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিল।
আরমানের পরিবার চলে যাওয়ার পর বাবা নীলাকে ডাকলেন।
—ছেলেটা কেমন?
নীলা শান্তভাবে বলল,
—ভালো।
—তাহলে সমস্যা কী?
নীলা বাবার দিকে তাকাল।
—ভালো মানুষ হলেই তো তাকে বিয়ে করতে হবে না।
বাবা চুপ হয়ে গেলেন।
—আমি কাউকে অপমান করতে চাই না। কিন্তু আমার মন অন্য কোথাও।
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তুমি কি রবিনকে এতটাই ভালোবাসো?
নীলা এবার চোখ তুলে দৃঢ়ভাবে বলল,
—হ্যাঁ।
ঘরের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
তার বাবা ধীরে বললেন,
—তাহলে আমাকে সময় দাও।
নীলা অবাক হয়ে তাকাল।
এটা সম্মতি ছিল না।
কিন্তু পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানও ছিল না।
সেই রাতে নীলা রবিনকে ফোন করে সব জানাল।
রবিন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তোমার বাবা সময় চেয়েছেন?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমাদেরও সময় দিতে হবে।
—তুমি কি অপেক্ষা করবে?
রবিন মৃদু হেসে বলল,
—তুমি যদি সত্যিই আমার পাশে থাকো, আমি অপেক্ষা করব।
নীলা চোখ মুছে বলল,
—আমি থাকব।
রবিন আর নীলার জীবনে যেন একটু একটু করে আশার আলো ফিরছিল।
নীলার বাবা সরাসরি রাজি হননি, কিন্তু আগের মতো কঠোরও ছিলেন না। তিনি সময় চেয়েছিলেন। আর সেই সময়টুকুই রবিনের কাছে অনেক বড় সুযোগ।
সে নিজের জীবনটা আরও গুছিয়ে নিতে শুরু করল।
বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি সে নিজের পড়াশোনাও শেষ করার চেষ্টা করছিল। তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কমে গিয়েছিল। রাত করে বাইরে থাকা বন্ধ করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সামান্য কোনো বিষয়েও আর আগের মতো রেগে যেত না।
একদিন তার বাবা বললেন,
—তোমাকে নিয়ে এখন আমি গর্ব করতে পারি।
রবিন অবাক হয়ে তাকাল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ। তবে মনে রেখো, পরিবর্তন শুধু কাউকে পাওয়ার জন্য হলে সেটা বেশি দিন থাকে না। নিজের জন্যও বদলাতে হয়।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি বুঝেছি।
কিন্তু তার জীবনের পুরোনো অধ্যায় তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এক বিকেলে রবিন অফিসের কাজ শেষ করে বের হচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে দেখে সে থেমে গেল।
লোকটার নাম সজীব।
বহু বছর আগে রবিনের সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন ছিল সে। একসময় তারা একসঙ্গে ঘুরত, আড্ডা দিত, ঝামেলায় জড়াত।
কিন্তু কয়েক বছর আগে একটা বড় ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।
সজীব ধীরে ধীরে রবিনের কাছে এসে দাঁড়াল।
—অনেক বদলে গেছিস।
রবিন শান্তভাবে বলল,
—মানুষ বদলায়।
—শুনেছি এখন অনেক ভালো ছেলে হয়ে গেছিস।
রবিন কিছু বলল না।
সজীব হেসে বলল,
—একটা মেয়ের জন্য এত পরিবর্তন?
রবিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—তুই এখানে কেন এসেছিস?
—তোকে দেখতে।
—আমার মনে হয় আমাদের দেখা না করাই ভালো।
সজীবের হাসি মিলিয়ে গেল।
—তুই কি ভুলে গেছিস, আমরা একসময় কেমন ছিলাম?
—ভুলিনি।
—তাহলে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছিস কেন?
রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কারণ আমি সেই জীবন আর চাই না।
সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কিন্তু তোর অতীত তোকে ছাড়বে না, রবিন।
রবিন তার দিকে তাকাল।
—আমার অতীত আমি জানি। সেটা নিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর দরকার নেই।
সজীব আর কিছু না বলে চলে গেল।
রবিন সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অস্বস্তি অনুভব করছিল।
সে জানত, সজীব হঠাৎ ফিরে আসার পেছনে কোনো কারণ আছে।
তবুও নীলাকে সে কিছু বলল না।
সে চায়নি নীলা অকারণে চিন্তা করুক।
কয়েকদিন পর নীলা রবিনকে ফোন করল।
—আজ কোথায় তুমি?
—অফিসে।
—কাজ শেষ?
—হ্যাঁ, একটু পর বের হব।
—তাহলে আজ দেখা করবে?
রবিন হেসে বলল,
—তোমার বাবার অনুমতি আছে?
—না।
—তাহলে?
—আমার একটা বন্ধুর বাড়িতে যাব। সেখান থেকে তোমার সঙ্গে পাঁচ মিনিট দেখা করব।
রবিন একটু ভেবে বলল,
—ঠিক আছে। তবে বেশি সময় না।
সন্ধ্যায় শহরের একটা ছোট্ট পার্কে তাদের দেখা হলো।
নীলা এসে বলল,
—তুমি আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছ।
রবিন হেসে বলল,
—তুমি এতদিন পর আমাকে দেখছ বলে এমন মনে হচ্ছে।
—না। সত্যিই।
—তুমি কেমন আছ?
—তোমাকে দেখলে ভালো থাকি।
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—তোমার বাবা কি এখনো আমার ওপর রাগ করে আছেন?
নীলা বলল,
—আগের মতো না।
—কিছু বলেছেন?
—তিনি তোমার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন।
রবিন অবাক হলো।
—আমার ব্যাপারে?
—হ্যাঁ।
—কী জানতে চাচ্ছেন?
—তুমি কাজ করছ কি না, কার সঙ্গে মিশো, এখন কেমন আছ—এসব।
রবিনের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে হয়তো একদিন তিনি আমাকে বিশ্বাস করবেন।
নীলা বলল,
—আমি আশা করি।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর নীলা ধীরে বলল,
—রবিন, একটা কথা বলব?
—বলো।
—যদি কোনোদিন আমার বাবা তোমাকে মেনে নেন, তখন তুমি কি আমাকে সত্যিই বিয়ে করবে?
রবিন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
—এটা আবার কেমন প্রশ্ন?
—উত্তর দাও।
রবিন মৃদু হেসে বলল,
—তখন তোমাকে বিয়ে করার জন্য তোমার বাবার কাছে প্রথম আমিই যাব।
নীলা হেসে ফেলল।
—প্রতিশ্রুতি?
—প্রতিশ্রুতি।
নীলা হাত বাড়িয়ে বলল,
—তাহলে আমিও একটা কথা বলি।
—কী?
—তুমি যতদিন আমার পাশে থাকবে, আমি ততদিন তোমার পরিবর্তনের ওপর বিশ্বাস রাখব।
রবিন তার হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে কেউ তাদের ছবি তুলে ফেলল।
লোকটা ছিল সজীব।
সে কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেল।
পরদিন সকালে নীলার বাবার ফোনে একটা ছবি পৌঁছাল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রবিন আর নীলা পার্কে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির সঙ্গে একটা ছোট্ট মেসেজ—
“আপনি যাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, সে এখনো আপনার মেয়ের সঙ্গে গোপনে দেখা করছে।”
নীলার বাবা ছবিটা দেখে প্রচণ্ড রেগে গেলেন।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে নীলাকে ডাকলেন।
—তুমি কি গতকাল রবিনের সঙ্গে দেখা করেছিলে?
নীলা থমকে গেল।
সে বুঝতে পারল, সত্যি লুকানো সম্ভব নয়।
—হ্যাঁ।
—তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছ?
—বাবা, আমি...
—আমি তোমাকে সময় দিয়েছিলাম। আর তুমি আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছ।
নীলার চোখে পানি চলে এল।
—আমি শুধু ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে গিয়েছিলাম।
—তোমাকে আমি নিষেধ করেছিলাম।
—কিন্তু বাবা, রবিন খারাপ কিছু করেনি।
—আমি সেটা বিচার করব।
নীলা চুপ করে গেল।
তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে রবিনকে ফোন করলেন।
—আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে দেখা করো।
রবিন বুঝতে পারল, নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে।
—জি, আঙ্কেল।
—আর একটা কথা। নীলার সঙ্গে আজ থেকে সব যোগাযোগ বন্ধ করবে।
রবিনের বুক কেঁপে উঠল।
—কিন্তু কেন?
—সন্ধ্যায় দেখা হলে বলব।
ফোন কেটে গেল।
সন্ধ্যায় রবিন নীলার বাবার সামনে বসে ছিল।
টেবিলের ওপর সেই ছবিটা রাখা।
—এটা কী?
রবিন ছবিটার দিকে তাকাল।
—আমি নীলার সঙ্গে দেখা করেছিলাম।
—তোমাকে কি আমি অনুমতি দিয়েছিলাম?
—না।
—তাহলে তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছ।
রবিন মাথা নিচু করল।
—আমি ভুল করেছি।
নীলার বাবা কিছুটা অবাক হলেন।
তিনি ভেবেছিলেন রবিন হয়তো তর্ক করবে।
কিন্তু রবিন শান্তভাবে বলল,
—আপনি আমাকে সময় দিয়েছিলেন। আমি সেই সময়ের মূল্য ঠিকভাবে দিতে পারিনি। এজন্য আমি দুঃখিত।
—তাহলে আজ থেকে নীলার সঙ্গে দেখা করবে না?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আপনি যদি বলেন, আমি দেখা করব না।
—ফোন?
—না।
—কোনো যোগাযোগ?
—না।
নীলার বাবা বললেন,
—তাহলে তুমি সত্যিই তাকে ভালোবাসো?
রবিনের চোখ ভিজে উঠল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে এত সহজে দূরে থাকবে কীভাবে?
রবিন ধীরে বলল,
—কঠিন হবে। খুব কঠিন। কিন্তু আমি চাই না আমার জন্য নীলার সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক নষ্ট হোক।
নীলার বাবা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—তুমি যেতে পারো।
রবিন উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে বলল,
—আঙ্কেল।
—কী?
—আপনি যদি কখনো মনে করেন আমি আপনার বিশ্বাস পাওয়ার যোগ্য হয়েছি, তখন আমাকে নিজে ডাকবেন।
নীলার বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
রবিন বেরিয়ে গেল।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সে ছাতা ছাড়াই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
মোবাইল বের করে নীলার নামের দিকে তাকাল।
কল করতে ইচ্ছে করছিল।
অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
কিন্তু সে ফোনটা আবার পকেটে রেখে দিল।
অন্যদিকে নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।
সে জানত না, রবিন এখন কোথায়।
শুধু জানত, তাদের মধ্যে আবার একটা দেয়াল তৈরি হয়েছে।
আর এই দেয়ালটা আগের চেয়েও শক্ত।
কিন্তু সেদিন রাতেই নীলার বাবা একটা অদ্ভুত খবর পেলেন।
রবিনের পুরোনো বন্ধু সজীব তার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
সজীব দাবি করল, রবিনের অতীত সম্পর্কে এমন কিছু সে জানে, যা নীলার বাবার জানা নেই।
সজীব নীলার বাবার সামনে বসে ছিল।
ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। নীলার বাবা চুপচাপ সজীবের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
—তুমি বলছিলে রবিনের অতীত সম্পর্কে এমন কিছু জানো, যা আমি জানি না।
সজীব ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—জি।
—কী জানো?
সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—রবিন একসময় একটা বড় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিল। সেই ঘটনায় একজন মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছিল।
নীলার বাবার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
—কী হয়েছিল?
—রবিনের রাগের কারণেই সবকিছু হয়েছিল।
—তুমি কি সেখানে ছিলে?
—ছিলাম।
—তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?
সজীব নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ তখন রবিন আমার বন্ধু ছিল।
নীলার বাবা বললেন,
—আর এখন?
সজীব হালকা হেসে বলল,
—এখন সে আমাকে আর বন্ধু মনে করে না।
নীলার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—ঘটনাটা বিস্তারিত বলো।
সজীব ধীরে ধীরে পুরোনো ঘটনাটা বলতে শুরু করল।
কয়েক বছর আগে রবিন আর তার বন্ধুরা একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিল। কথা কাটাকাটি থেকে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। রবিন প্রচণ্ড রেগে গিয়ে একজনকে ধাক্কা দিয়েছিল। লোকটি পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়।
পরে রবিন নিজেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
ঘটনাটা মামলা পর্যন্ত গড়ায়নি, কারণ আহত ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ করেনি। কিন্তু সেই ঘটনার পর রবিন ভেতর থেকে বদলে যেতে শুরু করেছিল।
সজীব বলল,
—আপনি হয়তো ভাবছেন, রবিন আপনাকে এসব বলেনি কারণ সে সত্য লুকাতে চেয়েছে।
নীলার বাবা চুপ করে রইলেন।
সজীব আবার বলল,
—কিন্তু আসল ব্যাপার হলো, রবিন নিজেই অনেকদিন ধরে সেই ঘটনার জন্য অপরাধবোধে ভুগেছে।
—তুমি কীভাবে জানো?
—কারণ আমি ওর সঙ্গে ছিলাম।
নীলার বাবা এবার বুঝতে পারলেন, গল্পটা একপাক্ষিক নয়।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
—তাহলে তুমি এখন কেন এসব বলছ?
সজীবের মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটল।
—কারণ আমি চাই না রবিন আপনার মেয়ের জীবনে আসুক।
—কেন?
—কারণ আমি জানি, ও আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
নীলার বাবা বললেন,
—তুমি কি নিশ্চিত?
সজীব কোনো উত্তর দিল না।
ঠিক তখন দরজার বাইরে নীলা দাঁড়িয়ে ছিল।
সে কথাগুলোর বেশিরভাগই শুনে ফেলেছে।
তার চোখে পানি এসে গেল।
বাবা তাকে দেখে বললেন,
—তুমি এখানে কেন?
নীলা ঘরে ঢুকে বলল,
—আমি সব শুনেছি।
সজীব উঠে দাঁড়াল।
—নীলা, তুমি যা ভাবছ—
নীলা তাকে থামিয়ে বলল,
—তুমি রবিনকে ঘৃণা করো।
সজীব চুপ হয়ে গেল।
—তাই তো?
সজীব এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুমি রবিনকে চেনো না।
নীলা দৃঢ় গলায় বলল,
—হয়তো পুরোপুরি চিনি না। কিন্তু তুমি যেভাবে ওর কথা বলছ, তাতে মনে হচ্ছে তুমি শুধু ওর অতীত বলছ না, ওকে নিচে নামাতেও চাইছ।
সজীব কিছু বলতে পারল না।
নীলার বাবা বললেন,
—নীলা, তুমি এখন নিজের ঘরে যাও।
নীলা চলে গেল।
কিন্তু সেদিন রাতে তার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল—
রবিন কেন কখনো তাকে এই ঘটনার কথা বলেনি?
পরদিন সকালে নীলা রবিনকে ফোন করতে গিয়ে থেমে গেল।
বাবাকে কথা দিয়েছিল, আর গোপনে যোগাযোগ করবে না।
তবুও তার ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছিল।
অন্যদিকে রবিনও নিজের মতো করে সবকিছু সামলাচ্ছিল।
সে জানত, সজীব নিশ্চয়ই তার অতীতের কথা নীলার বাবাকে বলেছে।
তাই সে নিজেই নীলার বাবার সঙ্গে আবার দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
কিন্তু এবার তার উদ্দেশ্য নীলাকে পাওয়ার জন্য যুক্তি দেওয়া নয়।
নিজের সত্যিটা বলা।
দুপুরে সে নীলাদের বাড়িতে গেল।
নীলার বাবা তাকে দেখে বললেন,
—তুমি আবার এসেছ?
—জি।
—আমি তো তোমাকে দূরে থাকতে বলেছি।
—জানি। আজ নীলার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি।
—তাহলে?
রবিন ধীরে বলল,
—আমার অতীতের কথা সজীব আপনাকে বলেছে।
নীলার বাবা চুপ করে রইলেন।
—আমি জানি।
রবিন বলল,
—সে যা বলেছে, তার অনেকটাই সত্যি।
নীলার বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
—তুমি অস্বীকার করবে না?
—না।
—তুমি জানো, এতে তোমার বিরুদ্ধে আমার ধারণা আরও খারাপ হতে পারে?
রবিন শান্তভাবে বলল,
—জানি। কিন্তু আমি চাই না আপনি আমার সম্পর্কে কোনো মিথ্যা ধারণা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
তারপর সে পুরো ঘটনাটা নিজের মুখে বলল।
কীভাবে সে রেগে গিয়েছিল, কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, কীভাবে পরে আহত মানুষটিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল এবং সেই ঘটনার পর থেকে সে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছিল—সবকিছু।
সব শুনে নীলার বাবা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
—তুমি ভুল করেছিলে।
—জি।
—খুব বড় ভুল।
—জি।
—তবুও তুমি বলছ, তুমি বদলে গেছ?
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি কখনো বলব না যে আমার অতীত নেই। সেটা আমার জীবনের অংশ। আমি শুধু চাই, আমার ভবিষ্যৎটা যেন সেই অতীত দিয়ে ঠিক না হয়।
নীলার বাবা গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন।
—তুমি কি আমার মেয়েকে ভালোবাসো?
রবিনের চোখে পানি চলে এল।
—জি।
—কতটা?
রবিন একটু থেমে বলল,
—এতটা যে ওকে পাওয়ার জন্য আপনার বিরুদ্ধে যেতে পারি না।
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
নীলার বাবা এবার প্রথমবারের মতো রবিনের কথায় কোনো জেদ দেখলেন না।
শুধু দায়িত্ববোধ।
তিনি ধীরে বললেন,
—তুমি যেতে পারো।
রবিন মাথা নত করে বেরিয়ে গেল।
দরজার আড়াল থেকে নীলা সব শুনছিল।
তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
রবিন চলে যাওয়ার পর নীলা বাবার সামনে এসে দাঁড়াল।
—বাবা...
—কিছু বলবে?
—আপনি কি এখনো ওকে খারাপ মনে করেন?
তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি ওর অতীতকে ভালো মনে করি না।
—কিন্তু মানুষ কি সারাজীবন একই থাকে?
বাবা চুপ করে রইলেন।
নীলা বলল,
—আপনি নিজেই তো আমাকে শিখিয়েছেন, ভুল করলে ক্ষমা চাইতে হয় এবং ভুল থেকে শিখতে হয়।
বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন।
—তুমি ওকে খুব ভালোবাসো?
নীলা চোখ মুছে বলল,
—হ্যাঁ।
—আর যদি আমি তোমাদের সম্পর্ক মেনে না নিই?
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি আপনার সিদ্ধান্তকে অসম্মান করব না। কিন্তু আমার মন থেকে রবিনকে মুছে ফেলতে পারব না।
তার বাবা আর কিছু বললেন না।
সেদিন রাতে নীলার বাবা অনেকক্ষণ একা বসে ছিলেন।
তিনি ভাবছিলেন, রবিনের সবচেয়ে বড় ভুলটা কি তার বর্তমানকে বিচার করার যথেষ্ট কারণ?
নাকি একজন মানুষকে তার পরিবর্তনের চেষ্টার জন্যও একটা সুযোগ দেওয়া উচিত?
অন্যদিকে রবিন নিজের ঘরে বসে পুরোনো কিছু ছবি দেখছিল।
সজীবের সঙ্গে তার পুরোনো দিনের ছবি।
বন্ধুত্ব, আড্ডা, হাসি—সবকিছু।
তারপর ছবিগুলো সরিয়ে রেখে সে নীলার দেওয়া বইটা হাতে নিল।
বইটির প্রথম পাতায় নীলার ছোট্ট লেখা ছিল—
“নিজেকে হারিয়ে নয়, নিজেকে খুঁজে নিয়ে বাঁচবে।”
রবিন বইটা বুকে চেপে ধরল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
সে জানত না সামনে কী আছে।
কিন্তু একটা জিনিস সে জানত—
সে আর আগের রবিন হতে চায় না।
কয়েকদিন পর হঠাৎ নীলার বাবা রবিনকে নিজে ফোন করলেন।
—আগামীকাল বিকেলে আমার সঙ্গে দেখা করো।
রবিন অবাক হয়ে বলল,
—জি।
—একটা বিষয়ে কথা আছে।
—কী বিষয়ে?
—সেটা দেখা হলে বলব।
পরদিন বিকেলে রবিন নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখল, সেখানে শুধু নীলার বাবা নন, আরও একজন বসে আছেন।
রবিন থমকে গেল।
লোকটিকে সে চিনতে পারল।
কয়েক বছর আগে যে ঘটনার সময় সে ভুল করেছিল, সেই ঘটনার আহত ব্যক্তির বড় ভাই।
রবিনের বুক ধক করে উঠল।
লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—আমার সঙ্গে তোমার কথা আছে।
রবিন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, অতীতের সেই অধ্যায় আবার তার সামনে ফিরে এসেছে।
নীলার বাবা বললেন,
—আজ তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলতে হবে।
রবিন বুঝতে পারল, এবার আর কোনো কিছু লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই।
তার ভালোবাসা, তার ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সিদ্ধান্ত হয়তো এই কথোপকথনের ওপর নির্ভর করছে।
রবিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার সামনে বসে থাকা মানুষটির চোখে কঠোরতা ছিল। কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার পর থেকে তাদের পরিবারের সঙ্গে রবিনের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
লোকটি ধীরে বললেন,
—তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ?
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—জি।
—তাহলে এটাও জানো, আমার ভাইয়ের সঙ্গে কী হয়েছিল।
—জি।
—তুমি কি মনে করো, শুধু ক্ষমা চাইলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়?
রবিন মাথা নিচু করল।
—না। আমি তা মনে করি না।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তাহলে তুমি কী চাও?
রবিন ধীরে বলল,
—আমি চাই না আমার অতীতের ভুলের কারণে অন্য কারও জীবন নষ্ট হোক। আমি শুধু চাই, আমি যে বদলানোর চেষ্টা করছি, সেটা আপনারা একদিন বিশ্বাস করুন।
লোকটি বললেন,
—তোমার পরিবর্তনের কথা শুনেছি।
রবিন অবাক হয়ে তাকাল।
—কে বলেছে?
লোকটি নীলার বাবার দিকে তাকালেন।
—তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি।
রবিন চুপ করে রইল।
লোকটি আবার বললেন,
—আমার ভাই এখন সুস্থ। সে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। সে তোমার ওপর কোনো রাগও রাখে না।
রবিনের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
রবিন কিছু বলতে পারল না।
এতদিন ধরে যে অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে, আজ হঠাৎ মনে হলো সেই বোঝাটা একটু হালকা হচ্ছে।
লোকটি বললেন,
—কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। ভুলের জন্য ক্ষমা পাওয়া যায়, কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া না হলে সেই ক্ষমার কোনো মূল্য থাকে না।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি বুঝেছি।
নীলার বাবা এবার বললেন,
—রবিন, আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করব।
—জি।
—তুমি যদি নীলাকে বিয়ে করো, তুমি কি তাকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাবে?
রবিন দৃঢ়ভাবে বলল,
—না।
—তুমি কি তাকে নিজের ইচ্ছামতো চালাবে?
—না।
—রাগের মাথায় কোনোদিন তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
—আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, রাগকে আর আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে দেব না।
নীলার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর বললেন,
—আমি তোমাকে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না।
রবিন মাথা নিচু করল।
—আমি বুঝতে পারছি।
—কিন্তু আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিতে রাজি।
রবিন মাথা তুলল।
—কী সুযোগ?
—নিজেকে প্রমাণ করার।
রবিনের চোখে পানি এসে গেল।
—ধন্যবাদ।
—তবে একটা শর্ত আছে।
—কী শর্ত?
—তুমি নীলাকে নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করবে না। তোমাদের সম্পর্ককে সময় দিতে হবে। আর তুমি নিজের দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়াবে।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি রাজি।
কথা শেষ করে রবিন বাইরে বেরিয়ে এল।
তার মনে হচ্ছিল, অনেকদিন পর বুকের ভেতর একটু আলো ঢুকেছে।
কিন্তু সে জানত না, এই সুখবর নীলাকে কীভাবে জানাবে।
সে ফোন বের করল।
নীলার নামের ওপর আঙুল রাখল।
তারপর কল করল।
দুইবার রিং হওয়ার পর নীলা ফোন ধরল।
—হ্যালো?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
নীলা বলল,
—রবিন? কী হয়েছে?
রবিন মৃদু হেসে বলল,
—তোমার বাবা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন।
ওপাশে নীলা চুপ হয়ে গেল।
—কী বলেছেন?
—তিনি বলেছেন, আমাকে একটা সুযোগ দেবেন।
নীলার চোখে পানি চলে এল।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
—বাবা কি আমাদের মেনে নিয়েছেন?
রবিন একটু থেমে বলল,
—পুরোপুরি না। তবে আগের মতোও নেই।
নীলা হেসে কাঁদতে লাগল।
—আমি জানতাম তুমি পারবে।
রবিন বলল,
—আমি একা পারিনি।
—তাহলে?
—তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছ।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর নীলা বলল,
—তুমি কি জানো, আমি কতদিন ধরে এই কথাটা শোনার অপেক্ষায় ছিলাম?
—জানি না।
—অনেকদিন।
রবিন মৃদু হেসে বলল,
—এখনো আমাদের অনেক পথ বাকি।
—আমি জানি।
—তুমি কি পাশে থাকবে?
—থাকব।
সেদিন রাতে নীলা প্রথমবার বাবার ঘরে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
তার বাবা অবাক হয়ে বললেন,
—কী হয়েছে?
—ধন্যবাদ, বাবা।
—কিসের জন্য?
—আমার কথা একবার শুনেছ বলে।
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—আমি তোমার সুখ চাই। কিন্তু বাবা হিসেবে ভয় পাওয়াটাও আমার দায়িত্ব।
নীলা বলল,
—আমি বুঝি।
—রবিনকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি না এখনো।
—তাকে সময় দিন।
বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—তুমি তো তার পক্ষ নিচ্ছই।
নীলাও হেসে ফেলল।
কিন্তু এই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
কয়েকদিন পর রবিনের জীবনে আবার সমস্যা দেখা দিল।
সজীব এবার তাকে সরাসরি ফোন করল।
—তুই ভাবছিস সব ঠিক হয়ে গেছে?
রবিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—সজীব, আমার জীবন থেকে দূরে থাক।
—তুই জানিস না, আমি কী করতে পারি।
—আমি এসব ভয় পাই না।
—ভয় পাওয়া উচিত।
রবিন চুপ করে রইল।
সজীব বলল,
—তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেছিস। আমাকে সবার সামনে ছোট করেছিস। এখন ভাবছিস তোর জীবন সুন্দর হবে?
রবিন শান্ত গলায় বলল,
—তুই যা করতে চাস কর। আমি আর আগের মতো প্রতিশোধ নেব না।
—দেখা যাবে।
ফোন কেটে গেল।
রবিন বুঝতে পারল, সজীব সহজে থামবে না।
তবুও সে কাউকে কিছু বলল না।
কারণ সে জানত, সজীবকে গুরুত্ব দিলে আবার পুরোনো জীবনের দরজা খুলে যাবে।
কিন্তু কয়েকদিন পর একটা বড় সমস্যা হলো।
নীলার বাবা অফিস থেকে ফেরার পথে জানতে পারলেন, রবিনের নামে একটা মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, রবিন নাকি আবার ঝামেলায় জড়িয়েছে।
খবরটা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন।
সঙ্গে সঙ্গে রবিনকে ফোন করলেন।
—তুমি কোথায়?
—বাড়িতে।
—আজ কোথাও গিয়েছিলে?
—অফিসে ছিলাম।
—তোমার নামে একটা অভিযোগ এসেছে।
রবিন চুপ হয়ে গেল।
—আমি কিছু করিনি।
—আমি জানি না।
—আঙ্কেল, আমি সত্যিই কিছু করিনি।
—তাহলে প্রমাণ করো।
রবিন বুঝতে পারল, সজীবের কাজ।
সে অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ, সহকর্মীদের সাক্ষ্য—সব সংগ্রহ করতে শুরু করল।
তার বাবা বললেন,
—চাইলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—নেব। কিন্তু আমি নিজে কোনো ঝামেলায় যাব না।
আগের রবিন হলে হয়তো সজীবকে খুঁজে বের করে নিজের হাতে বিচার করতে যেত।
কিন্তু এবার সে শান্ত থাকল।
এই পরিবর্তনটাই নীলার বাবা দূর থেকে লক্ষ্য করছিলেন।
অভিযোগটা তদন্তের পর মিথ্যা প্রমাণিত হলো।
রবিনের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না।
সজীবের ভূমিকার কথাও সামনে এলো।
কিন্তু রবিন প্রতিশোধ নিল না।
সে শুধু বলল,
—ওর বিরুদ্ধে যা করার আইনই করবে।
নীলার বাবা সেই কথাটা শুনে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর একদিন রবিনকে ডেকে বললেন,
—আমি একটা কথা স্বীকার করছি।
—জি?
—তুমি সত্যিই বদলেছ।
রবিনের চোখ ভিজে উঠল।
—ধন্যবাদ, আঙ্কেল।
—এখনো তোমাকে পরীক্ষা করতে হবে।
রবিন হাসল।
—আমি প্রস্তুত।
কয়েকদিন পর নীলার বাবা নিজে রবিনের বাড়িতে গেলেন।
রবিনের বাবা তাকে স্বাগত জানালেন।
দুজন অনেকক্ষণ কথা বললেন।
তারপর নীলার বাবা বললেন,
—আপনার ছেলে ভুল করেছে। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পারছি, সে ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে।
রবিনের বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—আমিও চাই সে ভালো মানুষ হোক।
নীলার বাবা বললেন,
—আমি চাই আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হোক।
—আমি বুঝি।
—তাহলে আমরা দুই পরিবার মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
রবিনের বাবা অবাক হয়ে তাকালেন।
—কী সিদ্ধান্ত?
নীলার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—রবিন আর নীলার বিয়ের কথা ভাবা যায়।
ঠিক তখন পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা রবিন কথাটা শুনে ফেলল।
তার চোখে আনন্দের পানি চলে এল।
সে দৌড়ে বাইরে যেতে চাইল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল।
কিছুক্ষণ পর নীলা ফোন করল।
—রবিন?
—হুম?
—তোমাকে একটা খবর দেব?
—দাও।
—বাবা নাকি তোমাদের বাড়িতে গিয়েছেন।
রবিন হেসে বলল,
—জানি।
—কীভাবে?
—আমি সব শুনেছি।
নীলা চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল,
—তাহলে?
রবিন মৃদু গলায় বলল,
—মনে হচ্ছে আমাদের গল্পটা এবার সত্যিই নতুন পথে হাঁটতে যাচ্ছে।
নীলা হাসল।
রবিনের মনে হচ্ছিল, এতদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে তার জীবনে শান্তি ফিরতে শুরু করেছে।
নীলার বাবা প্রথমবার তার বাড়িতে এসে বিয়ের কথা বলেছেন। দুই পরিবারও একে অপরের সঙ্গে কথা বলেছে। সবকিছু যেন ধীরে ধীরে সুন্দর একটা পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল।
কিন্তু রবিন জানত, জীবনের কঠিন সময়গুলো কখনো একদিনে শেষ হয় না।
পরদিন সকালে নীলার বাবা তাকে ফোন করলেন।
—রবিন, আজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসো।
—জি, আঙ্কেল।
—কিছু কথা আছে।
রবিন বুঝতে পারল, আবার কোনো সমস্যা হয়েছে।
বিকেলে সে নীলাদের বাড়িতে পৌঁছাল।
দরজা খুলে নীলা তাকে দেখে মৃদু হাসল।
—এসেছ?
—হ্যাঁ।
নীলা বলল,
—বাবা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
রবিন ভেতরে ঢুকল।
নীলার বাবা বসার ঘরে বসে ছিলেন। তার পাশে নীলার মা।
রবিন সালাম দিয়ে বসে পড়ল।
নীলার বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আমরা তোমাদের বিয়ের ব্যাপারে রাজি।
রবিনের বুকের ভেতর আনন্দে ভরে গেল।
—সত্যি?
নীলার মা মৃদু হেসে বললেন,
—হ্যাঁ।
রবিনের চোখে পানি চলে এল।
সে মাথা নিচু করে বলল,
—আমি আপনাদের কখনো হতাশ করব না।
নীলার বাবা বললেন,
—এই কথাটা মনে রেখো। আর একটা বিষয়।
—জি?
—বিয়ে শুধু ভালোবাসা দিয়ে টেকে না। দায়িত্ব, সম্মান আর ধৈর্যও লাগে।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি বুঝেছি।
পাশ থেকে নীলা মৃদু হেসে তাকিয়ে ছিল।
তাদের চোখে চোখ পড়ল।
কতদিনের অপেক্ষা, কত কান্না, কত ভুল বোঝাবুঝি—সব যেন সেই এক মুহূর্তে দূরে সরে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামল সজীব।
রবিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সজীব দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
—রবিন, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
রবিন উঠে দাঁড়াল।
—এখন নয়।
সজীব বলল,
—এখনই।
নীলার বাবা বললেন,
—আপনি কে?
সজীব কিছু বলার আগেই রবিন বলল,
—আমার পুরোনো বন্ধু।
সজীব হেসে বলল,
—বন্ধু ছিলাম।
তারপর সে রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুই কি সত্যিই ভাবছিস সব শেষ হয়ে গেছে?
রবিন শান্ত গলায় বলল,
—আমি চাই তুই চলে যাস।
সজীব এবার একটা পুরোনো কাগজ বের করল।
—এটা দেখ।
রবিন কাগজটার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
এটা ছিল কয়েক বছর আগের একটা অভিযোগের কপি।
নীলার বাবা কাগজটা হাতে নিলেন।
—এটা কী?
রবিন বলল,
—পুরোনো একটা ঘটনার কাগজ।
সজীব বলল,
—পুরোনো বলেই কি সত্যি বদলে যায়?
নীলার বাবা কাগজটা পড়লেন।
তারপর রবিনের দিকে তাকালেন।
—তুমি বলেছিলে, সেই ঘটনায় কোনো অভিযোগ হয়নি।
রবিন বলল,
—আমি বলেছিলাম, বিষয়টা পরে মিটে গিয়েছিল।
—কিন্তু এখানে তো অভিযোগের কথা লেখা আছে।
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—হ্যাঁ, প্রথমে অভিযোগ হয়েছিল। পরে আহত ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ প্রত্যাহার করে।
নীলার বাবা কঠিন মুখে বললেন,
—তুমি আমাকে পুরো সত্যি বলোনি।
রবিন মাথা নিচু করল।
—আমি ভয় পেয়েছিলাম, আপনাকে সব বললে আপনি আমাকে আর কখনো বিশ্বাস করবেন না।
ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে গেল।
নীলা রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি আমাকে কেন বলোনি?
রবিন তার দিকে তাকাল।
—কারণ আমি তোমাকে হারাতে ভয় পেয়েছিলাম।
নীলার চোখে পানি এসে গেল।
—কিন্তু সত্য লুকিয়ে কি কাউকে ধরে রাখা যায়?
রবিন চুপ করে গেল।
সজীব মৃদু হেসে বলল,
—দেখলেন? এটাই আসল রবিন।
নীলার বাবা এবার সজীবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আপনি এখন যেতে পারেন।
সজীব অবাক হয়ে গেল।
—কিন্তু—
—আমি বলেছি, যেতে পারেন।
সজীব চলে গেল।
রবিন মাথা নিচু করে বসে রইল।
সে জানত, এবার তার সবচেয়ে বড় ভুলটা সামনে এসেছে।
নীলার বাবা বললেন,
—রবিন, আমি তোমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছি।
রবিন চোখ তুলে তাকাল।
—জি।
—তুমি সত্যিই বদলেছ, সেটা আমি মানি। কিন্তু তুমি একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়েছ।
রবিনের চোখ ভিজে গেল।
—আমি ভুল করেছি।
—কেন?
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের?
—আপনাদের হারানোর।
নীলার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ভালোবাসার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি বিশ্বাস। আর বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সেটা আবার তৈরি করতে সময় লাগে।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি জানি।
—তাই বিয়ের সিদ্ধান্ত আমরা কিছুদিন পিছিয়ে দিচ্ছি।
নীলার চোখে পানি চলে এল।
—বাবা...
—আমি তোমার ভালো চাই।
—কিন্তু...
—এখন আর কোনো কথা নয়।
রবিন ধীরে উঠে দাঁড়াল।
—আঙ্কেল, আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমি মেনে নিচ্ছি।
নীলা তার দিকে তাকাল।
—রবিন...
রবিন মৃদু হাসল।
—কেঁদো না।
—তুমি কি চলে যাবে?
—না। আমি কোথাও যাচ্ছি না।
—তাহলে?
—আমি অপেক্ষা করব।
সেদিন রাতে রবিন নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার বাবা এসে পাশে বসলেন।
—সব শুনেছি।
রবিন বলল,
—আমি ভুল করেছি।
—হ্যাঁ।
—আমি যদি সেদিন সব সত্যি বলতাম...
—তাহলে হয়তো আজকের পরিস্থিতি হতো না।
রবিন মাথা নিচু করল।
তার বাবা বললেন,
—কিন্তু একটা ভালো কাজ করেছিস।
—কী?
—শেষ মুহূর্তে হলেও সত্যি স্বীকার করেছিস।
রবিন কিছু বলল না।
বাবা বললেন,
—এখন নীলাকে পাওয়ার জন্য নয়, নিজের সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য বাঁচ।
রবিন মাথা নেড়ে বলল,
—আমি তাই করব।
পরবর্তী কয়েক মাস রবিন নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
সে বাবার ব্যবসার একটা নতুন শাখার দায়িত্ব নিল। নিয়মিত কাজ করল। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করল। পুরোনো বন্ধুদের অনেককেই ছেড়ে দিল।
আর নীলার সঙ্গে তার যোগাযোগ খুব সীমিত হয়ে গেল।
তবুও তাদের ভালোবাসা শেষ হয়নি।
কখনো নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরে রবিনের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকত।
কখনো রবিন রাতে নীলার দেওয়া বইটা খুলে বসত।
দুজনেই অপেক্ষা করছিল।
একদিন নীলার বাবা রবিনের বাবার সঙ্গে কথা বললেন।
—আপনার ছেলে গত কয়েক মাসে অনেক দায়িত্ব নিয়েছে।
রবিনের বাবা বললেন,
—হ্যাঁ।
—আমি এখন তাকে বিশ্বাস করতে পারছি।
—তাহলে?
নীলার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
—এবার বিয়েটা আর পিছিয়ে দেওয়ার কারণ দেখি না।
সেদিন সন্ধ্যায় নীলার বাবা মেয়েকে ডাকলেন।
—নীলা।
—জি, বাবা?
—তোমার জন্য একটা খবর আছে।
নীলা বাবার মুখের দিকে তাকাল।
—রবিনের সঙ্গে তোমার বিয়েতে আমি রাজি।
নীলা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না।
তারপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
—ধন্যবাদ, বাবা।
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—শুধু একটা কথা মনে রেখো। ভালোবাসার মানুষকে কখনো তার ভুলের জন্য সারাজীবন শাস্তি দিও না। তবে ভুল যেন আবার না ফিরে আসে, সেটাও নিশ্চিত করবে।
নীলা মাথা নেড়ে বলল,
—আমি পারব।
কয়েকদিন পর রবিনকে খবর দেওয়া হলো।
সে খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
তার মনে হলো, এতদিনের কষ্ট, অপেক্ষা আর ভয়—সবকিছুর শেষে সে সত্যিই নীলাকে ফিরে পেয়েছে।
বিয়ের দিন নীলা লাল শাড়ি পরে বসেছিল।
রবিন যখন তার পাশে এসে বসল, দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
নীলা মৃদু হেসে বলল,
—এতদিন পর?
রবিনও হাসল।
—হ্যাঁ।
—খুব অপেক্ষা করিয়েছ।
—তুমিও তো কম করনি।
নীলা নিচু গলায় বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুমি কি এখনো রাগী?
রবিন হেসে বলল,
—হয়তো একটু।
—তাহলে?
—তবে এখন আমার রাগের আগে তোমার কথা মনে পড়ে।
নীলা হেসে ফেলল।
বিয়ের পর তারা নতুন জীবনে পা রাখল।
রবিন আর নীলা দুজনেই বুঝেছিল, তাদের গল্পটা কোনো রূপকথার মতো সহজ ছিল না।
তাদের পথে ছিল ভুল, অভিমান, পরিবার, অতীত আর দীর্ঘ অপেক্ষা।
তবুও তারা একটা জিনিস শিখেছিল—
সত্যিকারের ভালোবাসা কাউকে নিজের করে নেওয়ার নাম নয়। বরং প্রিয় মানুষটির সম্মান, নিরাপত্তা আর বিশ্বাসকে নিজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নাম।
রবিন নিজের পুরোনো জীবনকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি।
কিন্তু সে সেই অতীতকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়নি।
আর নীলা তাকে ভালোবেসেছিল তার নিখুঁত হওয়ার জন্য নয়, বরং ভুলের পরেও নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টার জন্য।
বহু বছর পর এক সন্ধ্যায় তারা বারান্দায় বসে ছিল।
নীলা বলল,
—আমাদের গল্পটা যদি কেউ লিখত, কী নাম দিত?
রবিন একটু ভেবে বলল,
—“অপূর্ণ ভালোবাসা।”
নীলা মাথা নেড়ে বলল,
—না।
—তাহলে?
নীলা মৃদু হেসে বলল,
—“অপেক্ষার শেষে তুমি।”
রবিন তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
....